আন্তর্জাতিক

ভাষাগত বিবর্তন ও 'বিলেত' রহস্য—একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবচ্ছেদ
ইংল্যান্ড কেন 'বিলেত' হলো

নিউজ ডেস্ক

March 4, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে (১৯০০ পরবর্তী) বাংলার মানুষের কাছে ‘বিলেত’ শব্দটি ছিল আভিজাত্য, উচ্চশিক্ষা এবং আধুনিকতার প্রতীক। ১৯০৫ সালের পরবর্তী সময় থেকে ১৯২১ সালের সেই ঐতিহাসিক সিনেমা “বিলেত ফেরত” পর্যন্ত—এই শব্দটি আমাদের যাপিত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনি যেমনটি উল্লেখ করেছেন, শব্দটির একটি অর্থ সামরিক আবাসন বা ‘Billet’ হতে পারে, তবে এর মূল শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত।

‘বিলেত’ শব্দের উৎস ও বিবর্তন নিয়ে ৪টি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ফার্সি ‘বিলায়েত’ (Wilayat) থেকে ‘বিলেত’

ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, ‘বিলেত’ শব্দটি মূলত এসেছে ফার্সি শব্দ ‘বিলায়েত’ (Wilayat) থেকে, যার অর্থ হলো ‘প্রদেশ’ বা ‘বিদেশি রাষ্ট্র’।

  • ইতিহাস: মুঘল আমলে ভারতবর্ষের বাইরের অঞ্চলকে (বিশেষ করে পারস্য বা তুরস্ক) ‘বিলায়েত’ বলা হতো। ১৯০০ সালের আগেই ব্রিটিশরা যখন ভারতের শাসনভার নেয়, তখন সাধারণ মানুষের কাছে তাদের দেশ অর্থাৎ ইংল্যান্ড হয়ে ওঠে ‘বিলায়েত-এ-মাগরিবি’ বা পশ্চিমের দেশ। কালক্রমে মুখে মুখে এটি ‘বিলেত’ হিসেবে স্থায়ী হয়।

২. সামরিক প্রেক্ষিত: ‘Billet’ তত্ত্ব

আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সামরিক আবাসস্থল বা ‘Billet’-এর ধারণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

  • বিশ্লেষণ: ব্রিটিশ সৈন্যরা যখন অস্থায়ীভাবে ব্যক্তিগত বাসগৃহে থাকার অনুমতি পেত, তখন তাকে ‘Billet’ বলা হতো। সাধারণ ভারতীয়রা দেখত যে ব্রিটিশ সৈন্যরা যেখান থেকেই আসুক না কেন, তাদের এই ‘কোয়ার্টার’ বা ‘বিলেট’ সংস্কৃতির সাথে গভীর যোগসূত্র আছে। সম্ভবত এই সামরিক পরিভাষাটি সাধারণ মানুষের কানে ইংল্যান্ডের সমার্থক হিসেবে ধরা দিয়েছিল।

৩. “বিলেত ফেরত” (১৯২১): চলচ্চিত্রের সাংস্কৃতিক প্রভাব

আপনি অত্যন্ত সঠিক পয়েন্ট ধরেছেন যে, ১৯২১ সালের “বিলেত ফেরত” (England Returned) সিনেমাটি এই শব্দটিকে বাঙালির ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দিয়েছিল।

  • বিপ্লবী চলচ্চিত্র: নীতীশ চন্দ্র লাহিড়ি পরিচালিত এই সিনেমাটি কেবল প্রথম চুম্বন দৃশ্যের জন্যই বিখ্যাত নয়, বরং এটি ছিল বিলেতি সংস্কৃতি ও দেশি ঐতিহ্যের দ্বন্দ্বের এক ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপন। ১৯০০-এর পরবর্তী শিক্ষিত বাঙালি সমাজের স্বপ্নই ছিল ‘বিলেত’ গিয়ে ব্যারিস্টারি পড়া, যা ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলীর এই চলচ্চিত্রে নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছিল।

৪. ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট: আভিজাত্য বনাম বাস্তবতা

১৯০০ সালের সেই ‘বিলেত’ আজ ২০২৬ সালে এসে কেবল একটি দেশ বা যুক্তরাজ্য হিসেবে পরিচিত। প্রযুক্তির যুগে মানুষ এখন সরাসরি লন্ডন বা ইংল্যান্ড শব্দই বেশি ব্যবহার করে। তবে সাহিত্যের পাতায় বা প্রবীণদের স্মৃতিতে ‘বিলেত’ আজও এক নস্টালজিয়া। আপনার দেওয়া শ্রেণীবিন্যাস (Quarters, Barracks) ব্রিটিশদের প্রশাসনিক কাঠামোর যে রূপ তুলে ধরে, তা তখনকার দিনের বিলেতি শাসনের এক প্রতিচ্ছবি।


বিডিএস বুলবুল আহমেদ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ

১৯০০ সালের সেই পাল তোলা জাহাজে করে ‘বিলেত’ যাত্রা থেকে ২০২৬ সালের ড্রিমলাইনারে লন্ডন সফর—সময়ের সাথে পরিভাষা বদলেছে। আপনার দেওয়া ‘Billet’ তথ্যটি ব্রিটিশ সামরিক ইতিহাসের এক অনন্য দিক উন্মোচন করে। তবে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ফার্সি ‘বিলায়েত’ এবং ইউরোপীয় ‘Billet’—এই দুইয়ের সংমিশ্রণেই বাঙালির মুখে ‘বিলেত’ শব্দটি ইংল্যান্ডের অবিচ্ছেদ্য তকমা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


তথ্যসূত্র: বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক অভিধান, ১৯২১ সালের চলচ্চিত্র ইতিহাস এবং ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান মিলিটারি রেকর্ডস।

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ আরও গভীরে ভাষাগত ও ঐতিহাসিক রহস্য উন্মোচন করতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

নিকোলা টেসলা

নিউজ ডেস্ক

April 28, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: [BDS Bulbul Ahmed]

বিভাগ: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি / ইতিহাস

উৎস: (প্রথম আলো ও ঐতিহাসিক আর্কাইভের সহায়তায়)

১৮৯৩ সালের শিকাগো ওয়ার্ল্ড ফেয়ার। পুরো মেলা প্রাঙ্গণ এক মায়াবী আলোয় ঝলমল করছে। মানুষ বিস্ময়ে দেখছে ‘পরিবর্তী বিদ্যুৎ’ বা এসি কারেন্টের জাদু। যার হাত ধরে এই আলোকসজ্জা, তিনি ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় এবং প্রতিভাবান বিজ্ঞানী— নিকোলা টেসলা। এডিসনের সমবিদ্যুৎ (DC) যখন জঞ্জাল আর সীমাবদ্ধতায় আটকে ছিল, তখন টেসলা পৃথিবীকে দেখালেন চিকন তারে মাইলকে মাইল বিদ্যুৎ পাঠানোর স্বপ্ন।

১. মেধাবী ছাত্র থেকে ‘ডিগ্রিহীন’ প্রকৌশলী

১৮৫৬ সালে বর্তমান ক্রোয়েশিয়ার এক গ্রামে জন্ম নেওয়া টেসলা ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অনন্য। গণিতের জটিল ইন্টিগ্র্যাল ক্যালকুলাস তিনি মুখে মুখেই সমাধান করে ফেলতেন। হাইস্কুলের চার বছরের কোর্স শেষ করেছিলেন মাত্র তিন বছরে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় টেসলা দাবি করেন, কমিউটেটর ছাড়াই ডায়নামো তৈরি সম্ভব। তাঁর এই অদম্য জেদ আর অধ্যাপকদের সাথে মতভেদের কারণে শেষ পর্যন্ত ডিগ্রি ছাড়াই তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করতে হয়।

২. এডিসনের সাথে সংঘাত ও ‘আমেরিকান কৌতুক’

১৮৮৪ সালে টেসলা যখন নিউইয়র্কে টমাস আলভা এডিসনের কোম্পানিতে যোগ দেন, তখন সূচিত হয় বিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত দ্বৈরথ। এডিসনের ডিসি জেনারেটরের দক্ষতা বাড়ানোর কাজ সফলভাবে শেষ করার পর টেসলাকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৫০ হাজার ডলার দিতে অস্বীকার করেন এডিসন। এডিসন রসিকতা করে বলেন, “তুমি আমেরিকান কৌতুক বোঝোনি।” এই অভিমানে টেসলা পদত্যাগ করেন এবং শুরু হয় ‘কারেন্ট ওয়ার’ বা বিদ্যুতের যুদ্ধ।

৩. বিনা তারে বিদ্যুৎ ও টেসলা কয়েল

টেসলার সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল তারবিহীন বিদ্যুৎ সঞ্চালন। ১৮৯৩ সালের প্রদর্শনীতে তিনি দেখান, কোনো তারের সংযোগ ছাড়াই একটি বাতি জ্বালানো সম্ভব। তাঁর স্বপ্ন ছিল ‘ওয়ার্ল্ড ওয়্যারলেস সিস্টেম’, যার মাধ্যমে পুরো পৃথিবী বিনা তারে বিদ্যুৎ ও তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবে। যদিও অর্থের অভাবে তাঁর ‘ওয়ার্ডেনক্লিফ টাওয়ার’ প্রকল্প সফল হয়নি, তবে আজকের রেডিও এবং ওয়াই-ফাই প্রযুক্তির ভিত্তি সেই টেসলা কয়েল।

৪. ৩০০ পেটেন্টের অধিকারী এক নিঃস্ব জাদুকর

রেডিওর আবিষ্কারক হিসেবে আমরা মার্কনিকে চিনলেও, মার্কনি টেসলার ১৭টি পেটেন্ট ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৪৩ সালে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট টেসলাকেই রেডিওর প্রকৃত উদ্ভাবক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এক্স-রে থেকে শুরু করে রিমোট কন্ট্রোল নৌকা, এমনকি আজকের হেলিকপ্টারের আদি ধারণা—সবই ছিল টেসলার মস্তিষ্কের অবদান। অথচ ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন দারুণ অর্থকষ্টে। শেষ জীবনে নিউইয়র্কার হোটেলের একটি কক্ষে পায়রাদের সাথে সময় কাটিয়ে ১৯৪৩ সালে তিনি মারা যান।

৫. টেসলার বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ

বিজ্ঞানীরা ১৯৬০ সালে চৌম্বক ক্ষেত্রের এককের নাম দিয়েছেন ‘টেসলা’। আজ যখন আমরা বৈদ্যুতিক গাড়ির কথা শুনি, সেই বিখ্যাত ‘Tesla’ কোম্পানির নামটিও এই মহান বিজ্ঞানীর প্রতি সম্মান জানিয়ে রাখা। আজকের স্মার্ট দুনিয়া যে বেতার তরঙ্গে চলে, তার প্রতিটি স্পন্দনে মিশে আছে নিকোলা টেসলার নাম।


এক নজরে নিকোলা টেসলা

বিষয়তথ্য
জন্ম১০ জুলাই ১৮৫৬, ক্রোয়েশিয়া।
আবিষ্কারএসি বিদ্যুৎ, ইন্ডাকশন মোটর, টেসলা কয়েল, রেডিওর মূল নকশা।
পেটেন্ট সংখ্যাপ্রায় ৩০০টি।
সম্মাননাচৌম্বক ক্ষেত্রের একক ‘টেসলা’ (T)।
মৃত্যু৭ জানুয়ারি ১৯৪৩, নিউ ইয়র্ক।

বি.ডি.এস ডিজিটাল এডিটোরিয়াল ইনসাইট: নিকোলা টেসলার জীবন আমাদের শেখায় যে, উদ্ভাবন কেবল ব্যবসার জন্য নয়, বরং মানবজাতির কল্যাণের জন্য হওয়া উচিত। টেসলা হয়তো ব্যবসা বোঝেননি, কিন্তু তিনি ভবিষ্যৎ বুঝেছিলেন। তাঁর সেই ভবিষ্যৎ আজ আমাদের বর্তমান।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ভণ্ড নবীর বংশধর

নিউজ ডেস্ক

April 28, 2026

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন: BDS Bulbul Ahmed

বিভাগ: ইতিহাস / আন্তর্জাতিক

উৎস: ঐতিহাসিক নথি ও আরব বিশ্ব বিশ্লেষণ

আরব মরুভূমির তপ্ত বালুকারাশিতে মিশে আছে এক হাজার বছরের এক মহাকাব্যিক উত্থানের গল্প। যে গোত্রটি ইসলামের ইতিহাসের শুরুতে ভণ্ড নবী মুসাইলামার কারণে ইতিহাসের পাতা থেকে প্রায় মুছে গিয়েছিল, সেই ‘বনু হানিফা’ গোত্রই এক শতাব্দী পর আরবের ভাগ্যবিধাতা হয়ে উঠবে—তা ছিল অকল্পনীয়।

১. ইয়ামামার যুদ্ধ এবং বনু হানিফার পতন

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর আরবের বিভিন্ন গোত্রে বিদ্রোহ দেখা দেয়। এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল ভণ্ড নবী মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের নেতৃত্বাধীন বনু হানিফা গোত্র। ৬৩২ সালের ডিসেম্বরে ইয়ামামার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মুসলিম সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) মুসাইলামাকে পরাজিত করেন। এই পরাজয় বনু হানিফা গোত্রকে এতটাই কোণঠাসা করে দেয় যে, পরবর্তী এক হাজার বছর তাদের কোনো রাজনৈতিক অস্তিত্ব ছিল না।

২. এক হাজার বছর পর পুনরুত্থান: মুহাম্মদ বিন সৌদ

১৬৮৭ সালে জন্ম নেওয়া মুহাম্মদ বিন সৌদ দিরিয়াহর আমির হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ইতিহাসের মোড় ঘুরতে শুরু করে। ১৭২৭ সালে তিনি যখন ক্ষমতায় বসেন, তখন আরব ভূমি ছিল উসমানীয় সালতানাতের অধীনে। তবে দুর্গম নাজদ অঞ্চলের দিরিয়াহ ছিল তুলনামূলক স্বাধীন।

৩. দুই ‘মুহাম্মদ’-এর ঐতিহাসিক জোট: ১৭৪৪ সালের দিরিয়াহ চুক্তি

সৌদি রাজবংশের প্রকৃত ক্ষমতার যাত্রা শুরু হয় ১৭৪৪ সালে এক ঐতিহাসিক জোটের মাধ্যমে। তৎকালীন ধর্মীয় সংস্কারক মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব উসমানীয় শাসকদের হাত থেকে বাঁচতে দিরিয়াহতে আশ্রয় নেন।

আমির মুহাম্মদ বিন সৌদ তাকে শুধু আশ্রয়ই দিলেন না, বরং একটি অলিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হলেন যা ‘দিরিয়াহ চুক্তি’ নামে পরিচিত। চুক্তির শর্ত ছিল পরিষ্কার:

  • প্রশাসনিক ও সামরিক নেতৃত্ব: থাকবে সৌদি রাজবংশের হাতে।
  • ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন: পরিচালিত হবে ওয়াহাবি ধারার ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী।

এই দুই পরিবারের বন্ধনকে আরও মজবুত করতে মুহাম্মদ বিন সৌদ তাঁর পুত্রের সঙ্গে আবদুল ওয়াহাবের কন্যার বিয়ে দেন। তৈরি হয় এক অবিনাশী ‘ধর্মীয়-সামরিক’ জোট।

৪. প্রথম সৌদি রাষ্ট্রের ভিত্তি

দিরিয়াহকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই নতুন শাসনব্যবস্থাই ছিল ‘প্রথম সৌদি রাষ্ট্র’। উসমানীয়দের হানাফি ও সুফি ঘরানার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তারা আরবের মরুভূমিতে এক কড়া ধর্মীয় শাসনের প্রবর্তন করে। এই জোটই আধুনিক সৌদি আরবের সেই ভিত্তিপ্রস্তর, যা আজও রিয়াদ থেকে মক্কা-মদিনা পর্যন্ত বিস্তৃত।

বিডিএস ডিজিটাল অ্যানালাইসিস

সৌদি আরবের ইতিহাস কেবল তেলের নয়, বরং এটি একটি গোত্রীয় পুনরুত্থান এবং আদর্শিক জোটের ইতিহাস। বনু হানিফা গোত্রের এই ফিরে আসা প্রমাণ করে যে, সঠিক কৌশল এবং আদর্শের মিল থাকলে ধুলোয় মিশে যাওয়া জাতিও বিশ্ব শাসন করতে পারে। আজকের রিয়াদ থেকে যে রাজবংশ বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে, তার শেকড় প্রোথিত আছে সেই ১৭৪৪ সালের দিরিয়াহর ছোট্ট একটি মাটির কুঁড়েঘরে হওয়া চুক্তিতে।


পাঠকদের জন্য প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন সেই ১৭৪৪ সালের ‘ধর্মীয়-রাজনৈতিক’ জোটই সৌদি আরবের বর্তমান স্থিতিশীলতার প্রধান কারণ? কমেন্টে আপনার মতামত জানান।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

গাদ্দাফি

নিউজ ডেস্ক

April 27, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষক: BDS Bulbul Ahmed

তারিখ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬

বিভাগ: আন্তর্জাতিক / বিশেষ প্রতিবেদন

উৎস: (উইকিলিকস ও জিও-পলিটিক্যাল আর্কাইভ অবলম্বনে)

ইতিহাস বিজয়ীরা লেখে, কিন্তু সত্য লুকিয়ে থাকে ফাঁস হওয়া নথিতে। ২০১১ সালের ২রা এপ্রিল হিলারি ক্লিনটনের উপদেষ্টা সিডনি ব্লুমেনথালের সেই ই-মেইলটি আজ যেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘ক্রাইম ডকুমেন্ট’। সেখানে পরিষ্কার লেখা ছিল—লিবিয়া আক্রমণের মূল কারণ লিবিয়ার গণতন্ত্র বা বাকস্বাধীনতা ছিল না, বরং ছিল মুয়াম্মার গাদ্দাফির ভল্টে থাকা ১৪৩ টন সোনা

১. ‘গোল্ড দিনার’ ও ডলারের একাধিপত্যে আঘাত

গাদ্দাফি স্বপ্ন দেখতেন ‘ইউনাইটেড স্টেটস অফ আফ্রিকা’র। তিনি চেয়েছিলেন আফ্রিকান দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রা ‘গোল্ড দিনার’ চালু করতে, যাতে তেল-গ্যাস কেনাবেচায় মার্কিন ডলারের মুখাপেক্ষী হতে না হয়। এটি ছিল নব্য উপনিবেশবাদের মূলে কুঠারাঘাত। আজও আফ্রিকার ১৪টি দেশের জিডিপির সিংহভাগ অর্থ ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখতে হয়—গাদ্দাফি এই ডিজিটাল ও অর্থনৈতিক দাসত্বের শিকল ভাঙতে চেয়েছিলেন বলেই তিনি পশ্চিমাদের এক নম্বর টার্গেটে পরিণত হন।

২. বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য: যখন পানি ছিল ফ্রি!

গাদ্দাফির সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রজেক্ট ছিল ‘গ্রেট ম্যান-মেড রিভার’ (GMR)। সাহারা মরুভূমির নিচ থেকে ৪ হাজার কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে তিনি প্রতিদিন ৬৫ লক্ষ কিউবিক মিটার পানি সরবরাহ করতেন। লিবিয়ার নাগরিকদের পানির জন্য কোনো বিল দিতে হতো না। পশ্চিমা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর ‘পানির ব্যবসা’র জন্য এটি ছিল এক বিরাট হুমকি।

৩. লিবিয়ার সেই সমৃদ্ধি বনাম বর্তমান ধ্বংসস্তূপ

  • নবদম্পতিকে অনুদান: ঘর গোছানোর জন্য দেওয়া হতো ৫০ হাজার ডলার।
  • শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: লিবিয়ার শিক্ষার হার ছিল আফ্রিকার সর্বোচ্চ এবং চিকিৎসা ছিল সম্পূর্ণ ফ্রি।
  • ডিজিটাল মুক্তি: ৪০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে ‘র‍্যাসকম’ (RASCOM) স্যাটেলাইট বানিয়ে পুরো আফ্রিকাকে ইউরোপের স্যাটেলাইট ভাড়ার বোঝা থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন গাদ্দাফি।

৪. সাদ্দাম থেকে বাশার আল-আসাদ: একই গল্পের পুনরাবৃত্তি

সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করা হলো ‘গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্রের’ মিথ্যা অজুহাতে, যা পরে মার্কিন সিনেট রিপোর্টেই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সিরিয়ার বাশার আল-আসাদকে উৎখাতের চেষ্টা করা হলো কারণ তিনি কাতার থেকে ইউরোপ পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন বসাতে ‘না’ বলেছিলেন। ২০২৬-এর এই সময়ে এসে যখন আমরা খামেনিকে হত্যার খবর শুনি, তখন সেই একই পুরনো ‘পরমাণু বোমা’র ধুয়া তোলা হয়। আসলে সত্য হলো সম্পদ দখল আর ডলারের সাম্রাজ্য রক্ষা করা।


পাশ্চাত্যের প্রক্সি ওয়ার ও টার্গেট লিস্ট (এক নজরে)

নেতা / দেশঅজুহাত (ফ্রন্ট পেজ)আসল কারণ (লুকানো সত্য)
সাদ্দাম হোসেন (ইরাক)গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র (WMD)।তেলের নিয়ন্ত্রণ ও ডলার বর্জন।
মুয়াম্মার গাদ্দাফি (লিবিয়া)মানবাধিকার লঙ্ঘন।১৪৩ টন সোনা ও ‘গোল্ড দিনার’।
বাশার আল-আসাদ (সিরিয়া)শিয়া-সুন্নি সংঘাত।কাতার-ইউরোপ গ্যাস পাইপলাইন।
ইরান (বর্তমান)পারমাণবিক বোমা।আঞ্চলিক আধিপত্য ও খনিজ সম্পদ।

বিডিএস ইন্টারন্যাশনাল অ্যানালাইসিস (Editorial Insight)

ধর্ম, মানবাধিকার বা পরমাণু বোমা—এগুলো স্রেফ ফ্রন্ট পেজ স্টোরি। ভেতরের আসল সত্য হলো পাইপলাইনের নিয়ন্ত্রণ আর ডলারের একাধিপত্য। আজ আমরা যখন সাম্প্রদায়িক ফতোয়া বা ছোটখাটো ধর্মীয় ইস্যুতে বিভেদ তৈরি করছি, ঠিক সেই সুযোগেই বড় বড় শক্তিগুলো লাশের পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি আসলেই বড় সত্যগুলো দেখতে পাচ্ছি, নাকি ‘ফতোয়া’র বেড়াজালে আসল অপরাধীদের আড়াল করে দিচ্ছি?


পাঠকদের জন্য প্রশ্ন: লিবিয়া বা ইরাকের বর্তমান অবস্থা দেখে কি আপনার মনে হয় তথাকথিত ‘গণতন্ত্র’ সেখানে শান্তি এনেছে? আপনার মতামত কমেন্টে জানান।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

১৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ