ইতিহাস

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক মূল্যায়ন: ব্যক্তিগত সততা বনাম আদর্শিক বিতর্ক
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক মূল্যায়ন

নিউজ ডেস্ক

June 5, 2026

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ও মেরুকরণ সৃষ্টিকারী চরিত্র। তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়নে প্রধানত ব্যক্তিগত সততা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও বিতর্ক—এই দুটি পরস্পরবিরোধী দিক উঠে আসে।

ব্যক্তিগত সততা ও দেশপ্রেম

  • উচ্চ নৈতিক মান: জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত সততা ও নিয়মানুবর্তিতা তাঁর রাজনৈতিক ও সামরিক জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও সাধারণত তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনার সময় তাঁর ব্যক্তিগত দুর্নীতির অভিযোগ থেকে তাঁকে মুক্ত রাখেন।
  • কর্মীবান্ধব নেতৃত্ব: সাদাসিধে জীবনযাপন, কঠোর পরিশ্রম এবং দেশের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের মানসিকতা তাঁকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে একটি স্থায়ী আসন এনে দেয়।
  • অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দূরদর্শিতা: খাল খনন কর্মসূচি, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপগুলো আধুনিক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করতে ভূমিকা রেখেছিল বলে তাঁর সমর্থকরা মনে করেন।

আদর্শিক বিতর্ক ও সমালোচনা

  • বহুদলীয় গণতন্ত্র ও পুনর্বাসন: একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা থেকে ফিরিয়ে এনে তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে পুনর্বাসন করেন। তবে, এর ফলে স্বাধীনতাবিরোধী অনেক রাজনৈতিক শক্তিও রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ পায়, যা বাংলাদেশের আদর্শিক রাজনীতিতে গভীর বিতর্কের জন্ম দেয়।
  • বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ: তিনি ‘বাঙালি’ পরিচয়ের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রবর্তন করেন, যা সব ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে একটি ছাতার নিচে আনার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল। সমালোচকদের মতে, এটি মূল বাঙালি সংস্কৃতির স্বকীয়তা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিপন্থী ছিল।
  • সামরিক শাসন ও বিতর্কিত আইন: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাঁর ক্ষমতায় আরোহণ এবং পরবর্তীতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বলবৎ রাখার মতো বিষয়গুলো তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়।

জিয়াউর রহমান এমন এক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন যা একদিকে তাঁর সততা ও উন্নয়নের জন্য প্রশংসিত, অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক কৌশল ও গৃহীত পদক্ষেপের জন্য তীব্র আদর্শিক সমালোচনার সম্মুখীন

ব্যক্তিগত সততা ও জীবনযাপন

জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত সততা ও জীবনযাপন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত বিষয়। তাঁর অতি সাধারণ জীবনযাত্রার অনেক বিবরণ সমসাময়িক রাজনীতিবিদ এবং ইতিহাসবিদদের লেখায় উঠে এসেছে।

সাধারণ জীবনযাপন ও বাসস্থান

  • সরকারি বাসভবন বর্জন: রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও তিনি বিলাসবহুল বঙ্গভবনে বসবাস না করে ঢাকা সেনানিবাসের একটি সাধারণ মঈনুল রোডস্থ বাসভবনে থাকতেন
  • আসবাবপত্রের অভাব: তাঁর মৃত্যুর পর দেখা যায়, রাষ্ট্রপতির বাসভবনেও অত্যন্ত সাধারণ এবং সীমিত আসবাবপত্র ছিল [১]।
  • ভাঙা সুটকেস ও ছেঁড়া গেঞ্জি: তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের মধ্যে একটি ভাঙা সুটকেস এবং কয়েকটি ছেঁড়া গেঞ্জি পাওয়া যায়, যা তাঁর অতি সাধারণ জীবনযাপনের প্রতীক হিসেবে ব্যাপকভাবে আলোচিত ।

আর্থিক সততা

  • দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তি: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার পরও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি।
  • পরিবারের জন্য সম্পদ না রাখা: মৃত্যুর সময় তিনি তাঁর স্ত্রী বা সন্তানদের জন্য কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স, দামি গাড়ি বা বিলাসবহুল বাড়ি রেখে যাননি।
  • সরকারি তহবিলের সাশ্রয়: রাষ্ট্রীয় সফরে বিদেশে যাওয়ার সময় তিনি অত্যন্ত সীমিত খরচ করতেন এবং সরকারি অর্থের অপচয় কঠোরভাবে বন্ধ করেছিলেন।

কঠোর নিয়মানুবর্তিতা ও পরিশ্রম

  • দীর্ঘ কর্মঘণ্টা: তিনি প্রতিদিন প্রায় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করতেন এবং গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ফাইল পর্যালোচনা করতেন।
  • মাঠপর্যায়ে তদারকি: শীত-গ্রীষ্ম উপেক্ষা করে তিনি সরাসরি গ্রামে চলে যেতেন এবং সাধারণ মানুষের সাথে মাটিতে বসে কথা বলতেন।

জিয়াউর রহমানের এই সততা ও সাধারণ জীবনযাপন তাঁর সমর্থকদের কাছে তাঁকে এক অনন্য ও অনুকরণীয় নেতার মর্যাদা দিয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষাগত দক্ষতা নিয়ে বিতর্ক

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক মূল্যায়নে তাঁর ‘মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা’ এবং ‘ভাষাগত দক্ষতা’—এই দুটি বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘকাল ধরে গভীর বিতর্ক ও ভিন্নমত বিদ্যমান [১.২.২]।

১. মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক

মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কিছু দিক নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ রয়েছে [১.২.২]:

  • স্বাধীনতার ঘোষণা বিতর্ক: ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন [১.২.১, ১.২.৮]। তাঁর সমর্থক ও দল (বিএনপি)-এর মতে, এই ঘোষণা দিশেহারা বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল [১.২.১, ১.৩.৮]। অপরদিকে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ (আওয়ামী লীগ)-এর দাবি, তিনি ছিলেন কেবল একজন পাঠক বা ঘোষক, এবং স্বাধীনতার মূল কৃতিত্ব ও একক নেতৃত্ব সম্পূর্ণভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের।
  • সেক্টর কমান্ডার বনাম ‘আকস্মিক’ মুক্তিযোদ্ধা: জিয়াউর রহমান ১ নম্বর সেক্টর এবং পরবর্তীতে ‘জেড ফোর্স’-এর প্রধান হিসেবে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেন, যার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে রাষ্ট্রীয় ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয় [১.২.৭]। তবে সমালোচকদের একটি অংশ দাবি করে, তিনি ২৫ মার্চের আগে পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিদ্রোহ করেননি, বরং পাকিস্তানি জাহাজ ‘এমভি সোয়াত’ থেকে অস্ত্র খালাস করতে গিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আকস্মিকভাবে বিদ্রোহে যোগ দিতে বাধ্য হন [১.২.৪]। তাঁর সমর্থকরা এই তত্ত্বকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ইতিহাস বিকৃতি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন [১.২.৪, ১.২.৫]।

২. ভাষাগত দক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিতর্ক

জিয়াউর রহমানের শিক্ষা, বেড়ে ওঠা এবং দাপ্তরিক ভাষা ব্যবহারের ধরন নিয়েও এক ধরনের বিতর্ক রয়েছে:

  • বাংলা ভাষা ও শৈশব: জিয়াউর রহমানের শৈশব ও শিক্ষার একটি বড় অংশ কেটেছিল অবিভক্ত ভারতের কলকাতা এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের করাচিতে । করাচির ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করার কারণে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলা লেখার চর্চা তাঁর কম ছিল । এই কারণে সমালোচকরা প্রায়শই দাবি করেন যে তিনি শুদ্ধভাবে বাংলা পড়তে বা লিখতে পারতেন না । তবে জীবনীকারদের মতে, দাপ্তরিক কাজে তিনি ইংরেজি ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও বাংলা বলতে পারতেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সময় সব স্তরে বাংলা ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছিলেন।
  • জাতীয়তাবাদের ভাষাগত বনাম ভৌগোলিক রূপান্তর: ১৯৭২ সালের সংবিধানে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর মূল ভিত্তি ছিল মূলত ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক একক সত্তা । কিন্তু জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে একে পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রবর্তন করেন ধর্মনিরপেক্ষ ও ভাষাভিত্তিক সংস্কৃতির পরিবর্তে ভূখণ্ড এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের মিশ্রণে এই নতুন পরিচয় তৈরি করা হয়। সমালোচকদের মতে, এটি ভাষা আন্দোলনের মূল চেতনা ও ভাষাভিত্তিক বাঙালি পরিচয়কে অবমূল্যায়ন করার একটি রাজনৈতিক কৌশল ছিল

জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা ও তাঁর আদর্শিক দর্শন আজও বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান তর্কের উপাদান, যা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও ক্ষমতা দখল

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং তীব্র মেরুকরণ সৃষ্টিকারী অধ্যায় । এই ঘটনাপ্রবাহে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এবং তাঁর ক্ষমতায় আরোহণের প্রক্রিয়াকে প্রধানত দুটি বিপরীতমুখী রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা হয়

১. আওয়ামী লীগ ও সমালোচকদের মূল্যায়ন (হত্যাকাণ্ডের সুবিধাভোগী ও নেপথ্য কুশীলব)

এই দৃষ্টিকোণ থেকে জিয়াউর রহমানকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়

  • পূর্বজ্ঞাত ও পরোক্ষ সম্মতি: খুনি ফারুক ও রশিদের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার এবং মামলার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে দাবি করা হয়, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সম্পর্কে তৎকালীন উপ-সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান আগে থেকেই জানতেন । তিনি এতে সরাসরি অংশ না নিলেও “তোমরা সফল হলে আমার আপত্তি নেই” ধরনের মনোভাব দেখিয়ে পরোক্ষ সম্মতি দিয়েছিলেন
  • খুনিদের পুনর্বাসন ও পুরস্কৃতকরণ: ক্ষমতা গ্রহণের পর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে জড়িত ১২ জন সামরিক কর্মকর্তাকে বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে উচ্চপদে চাকরি ও কূটনৈতিক কূটনৈতিক সুবিধা দিয়ে পুরস্কৃত করেন
  • ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে আইনি রূপ: খন্দকার মোশতাক আহমেদ কর্তৃক জারিকৃত বিতর্কিত ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ ১৯৭৫’ (যা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার থেকে আইনি সুরক্ষা দিয়েছিল) ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংসদের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয় । এর ফলে দীর্ঘ ২১ বছর বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ রুদ্ধ ছিল
  • সংবিধান ধ্বংসকারী ও অবৈধ দখলদার: দেশের উচ্চ আদালত পরবর্তীতে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে এই সময়ের ক্ষমতা দখলকে অসাংবিধানিক ও জবরদখল হিসেবে আখ্যায়িত করেন

২. বিএনপি ও সমর্থকদের মূল্যায়ন (পরিস্থিতির দাবি ও শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারকারী)

জিয়াউর রহমানের সমর্থক ও রাজনৈতিক অনুসারীদের মতে, তিনি কোনো ষড়যন্ত্র বা হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন না, বরং একটি বিশৃঙ্খল জাতীয় সংকটের মুখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন

  • পেশাদারিত্ব ও আনুগত্য: সমর্থকরা দাবি করেন, জিয়াউর রহমান একজন সুশৃঙ্খল সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন। ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানটি ছিল জুনিয়র অফিসারদের একটি বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ, যার সাথে চেইন অব কমান্ডের বাইরে থাকা উপ-সেনাপ্রধান জিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো যোগসূত্র ছিল না।
  • ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব: ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। এরপর ৭ নভেম্বর কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সাধারণ সৈনিক ও জনতার এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান মুক্ত হন এবং সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নেতৃত্বের কেন্দ্রে চলে আসেন
  • সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা: জিয়াউর রহমান সরাসরি ক্ষমতা দখল করেননি; প্রথমে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদে রেখে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন এবং পরবর্তীতে সায়েমের পদত্যাগের পর আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন
  • ইনডেমনিটি পাসের ভিন্ন প্রেক্ষাপট: সমর্থকদের যুক্তি অনুযায়ী, ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত দেশে একাধিক সামরিক অভ্যুত্থান ও বিশৃঙ্খলা ঘটেছিল । সেই অস্থির সময়ে রাষ্ট্রের সার্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সামরিক বাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা ও আপস বজায় রাখার কৌশল হিসেবেই ওই সময় সংসদীয় আইনের মাধ্যমে পঞ্চম সংশোধনী পাস করতে হয়েছিল, যা এককভাবে কোনো খুনিকে রক্ষার উদ্দেশ্যে ছিল না

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় আরোহণ বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক জটিল সন্ধিক্ষণ, যা আজও দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক শিবিরের আদর্শিক দ্বন্দ্বের মূল কেন্দ্রবিন্দু

সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসন

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পুনরুত্থান এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান এবং তীব্র সমালোচিত একটি অধ্যায়। ১৯৭২ সালের সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে সরে এসে রাষ্ট্রীয় আদর্শে এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটিকে প্রধানত দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়।

১. আওয়ামী লীগ ও ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের মূল্যায়ন (সংবিধানের সাম্প্রদায়িকীকরণ ও পুনর্বাসন)

এই দৃষ্টিকোণ থেকে জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের মূল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক ভিত্তিকে ধ্বংস করার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হয়:

  • ধর্মনিরপেক্ষতা বিলোপ ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি: ১৯৭৭ সালে সামরিক ফরমানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান সংবিধানে আমূল পরিবর্তন আনেন। তিনি সংবিধানের অন্যতম মূল স্তম্ভ ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাতিল করেন এবং এর পরিবর্তে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” প্রতিস্থাপন করেন। একই সাথে বাহাত্তরের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন, যার ফলে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দল পুনরায় রাজনীতি করার আইনি অধিকার পায়।
  • শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ: বাংলাদেশের স্বাধীনতার সরাসরি বিরোধিতা করা এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে জাতিসংঘে ওকালতি করা মুসলিম লীগ নেতা শাহ আজিজুর রহমানকে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। এটিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে দেখা হয়।
  • গোলাম আযমের প্রত্যাবর্তন: ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের প্রধান অভিযুক্ত এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির গোলাম আযমকে ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানি পাসপোর্টে বাংলাদেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তিনি দেশেই অবস্থান করেন।
  • দালাল আইন বাতিল: ১৯৭২ সালে প্রণীত ‘দালাল আইন’ (Collaborators Act), যার অধীনে যুদ্ধাপরাধী ও পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগীদের বিচার চলছিল, ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তা বাতিল করা হয় এবং কারাবন্দি ও বিচারাধীন হাজার হাজার স্বাধীনতাবিরোধী মুক্তি পায়।

২. বিএনপি ও সমর্থকদের মূল্যায়ন (বহুদলীয় গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্য)

জিয়াউর রহমানের সমর্থক এবং দলীয় তাত্ত্বিকদের মতে, এই পদক্ষেপগুলো কোনো সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা থেকে নেওয়া হয়নি, বরং দেশের তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনে নেওয়া হয়েছিল:

  • প্রকৃত বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা: সমর্থকদের মতে, শেখ মুজিবুর রহমানের আমলের একদলীয় ‘বাকশাল’ ব্যবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করে সব মত ও পথের মানুষকে রাজনীতি করার অধিকার দেওয়াই ছিল জিয়ার লক্ষ্য। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের দলকে নিষিদ্ধ না রেখে চরম ডানপন্থী থেকে শুরু করে চরম বামপন্থী (যেমন জাসদ বা কমিউনিস্ট পার্টি)—সবাইকে রাজনৈতিক মূলধারায় ফিরিয়ে আনার কৌশল ছিল এটি।
  • জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ মূল্যবোধের স্বীকৃতি: বিএনপি দাবি করে, সংবিধানে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্তি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনসংখ্যার ধর্মীয় অনুভূতির প্রতিফলন ছিল, যা রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রকে পুরোপুরি নষ্ট করেনি, বরং রাষ্ট্রকে একটি টেকসই নৈতিক ভিত্তি দিয়েছিল।
  • জাতীয় সংহতি ও ক্ষমতার ভারসাম্য: যুদ্ধ-পরবর্তী বিভক্ত বাংলাদেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ কমিয়ে একটি ‘জাতীয় সংহতি’ বা ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন তৈরির উদ্দেশ্যে তিনি পূর্বের রাজনৈতিক বিরোধ ভুলে সবাইকে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করেছিলেন।

জিয়াউর রহমানের এই রাজনৈতিক পুনর্গঠন বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর দূরগামী প্রভাব ফেলে, যা আজও দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বনাম ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রধান বিভাজন রেখা হিসেবে কাজ করছে।

জাতীয় রাজনীতি, ইতিহাস এবং সমসাময়িক সব ব্রেকিং নিউজ ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ সবার আগে নির্ভরযোগ্যভাবে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন বাংলাদেশ প্রতিদিন ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

১৯তম শিক্ষক নিবন্ধন

নিউজ ডেস্ক

October 29, 2026

শেয়ার করুন

  • প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
  • বিভাগ (Category): শিক্ষক নিয়োগ, এনটিআরসিএ, প্রাথমিক শিক্ষা ও জব প্রিপারেশন
  • প্রকাশের তারিখ: ২৯ অক্টোবর, ২০২৬
  • তথ্যসূত্র (Sources): বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (NTRCA) অফিশিয়াল নোটিশ, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (DPE) পোর্টাল এবং Teletalk Recruitment System।

বাংলাদেশে শিক্ষকতার মতো সম্মানজনক পেশায় ক্যারিয়ার গড়ার চিন্তা করছেন? তাহলে আপনার জন্য এখন একদম গোল্ডেন টাইম চলছে! একদিকে এনটিআরসিএ (NTRCA)-এর ১৯তম শিক্ষক নিবন্ধন ও ৮ম বিশেষ নিয়োগের আপডেট, অন্যদিকে সরকারি প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তুতি—দুটো নিয়েই চাকরির বাজারে এখন তুঙ্গস্পর্শী জল্পনা-কল্পনা।

কোনটির আবেদন প্রক্রিয়া কেমন, ১৯তম নিবন্ধনের প্রিলি পরীক্ষা কবে নাগাদ হতে পারে, আর অল্প সময়ে কীভাবে স্মার্ট প্রিপারেশন নেবেন—চলুন একদম সোজা সাপটা ভাষায় পুরো হিসাবটা বুঝে নেওয়া যাক!

১. ১৯তম শিক্ষক নিবন্ধন: সার্কুলার ও সম্ভাব্য পরীক্ষার তারিখ (AEO Strategy)

আপনি যদি ১৯তম এনটিআরসিএ প্রিলিমিনারি পরীক্ষার সম্ভাব্য ডেট জানতে চান, তবে সোজা উত্তর হলো—২০২৭ সালের প্রথম তিন মাসের (জানুয়ারি-মার্চ) মধ্যে ১৯তম নিবন্ধনের প্রিলি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

  • সার্কুলার আপডেট: এনটিআরসিএ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠান প্রধানদের মৌখিক পরীক্ষা ও অভ্যন্তরীণ এমপিও বদলি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের অক্টোবরের শেষভাগ বা নভেম্বরের দিকেই অফিশিয়াল সার্কুলার চলে আসবে।
  • পরীক্ষার সম্ভাব্য সময়: সার্কুলারে আবেদনের জন্য ১ মাস সময় দেওয়া হবে। সে হিসাবে ২০২৭-এর শুরুর দিকেই আপনি ১০০ নম্বরের প্রিলি যুদ্ধের মুখোমুখি হবেন!

২. ৮ম এনটিআরসিএ (প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান) নিয়োগের লেটেস্ট খবর

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান (অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক, সুপার) ও সহকারী প্রধান পদের জন্য প্রকাশিত ৮ম বিশেষ এনটিআরসিএ নিয়োগের আপডেট বেশ স্বস্তিদায়ক:

[৫৩ হাজার আবেদন] ➔ [প্রিলিতে উত্তীর্ণ ১৪,৯৪২ জন] ➔ [০৪ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ভাইভা শুরু] ➔ [চূড়ান্ত সুপারিশের অপেক্ষা]
  • প্রায় ৫৩ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষকের আবেদনের মধ্য থেকে প্রিলিতে উত্তীর্ণ ১৪,৯৪২ জন প্রার্থীর মৌখিক পরীক্ষা (ভাইভা) চলছে।
  • এনটিআরসিএ-এর গত ০৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের সংশোধিত নোটিশ অনুযায়ী ভাইভা প্যানেল চলমান রয়েছে। ভাইভা শেষেই আসবে চূড়ান্ত এমপিও সুপারিশ।

৩. এনটিআরসিএ vs প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ: এক নজরে তুলনামূলক ছক

শিক্ষকতার এই দুটি ভিন্ন প্ল্যাটফর্মের যোগ্যতা ও পরীক্ষার মানবন্টন বুঝে নেওয়া যাক:

মানদণ্ডএনটিআরসিএ (স্কুল/কলেজ)প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ (DPE)
আবেদন পোর্টালntrca.teletalk.com.bd (ফি ৩৫০ টাকা)dpe.teletalk.com.bd
যোগ্যতাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক/স্নাতকোত্তর (সর্বোচ্চ ১টি ৩য় বিভাগ)ন্যূনতম ২য় শ্রেণী/সিজিপিএ সহ স্নাতক ডিগ্রি
বয়সসীমা১৮ থেকে ৩৫ বছর২১ থেকে ৩০ বছর (কোটাভেদে ৩২ বছর)
পরীক্ষার ধাপপ্রিলি (১০০) ➔ লিখিত (১০০) ➔ ভাইভা (২০-৩০)লিখিত MCQ (৮০) ➔ ভাইভা (২০)
নেগেটিভ মার্কিংপ্রতি ভুল উত্তরে ০.২৫ কাটা যাবেপ্রতি ভুল উত্তরে ০.২৫ কাটা যাবে

৪. ১৯তম নিবন্ধন ও প্রাথমিক শিক্ষক পরীক্ষার প্রিলি সিলেবাস ও স্মার্ট প্রস্তুতি

বাস্তব অভিজ্ঞতা: ভাই, পরীক্ষার হলে হাজার হাজার ক্যান্ডিডেটের সাথে টেক্কা দিতে গাধার খাটুনি খেটে লাভ নেই! প্রিলিতে পাস মার্কস (৪০%) তোলা কঠিন কিছু নয়, যদি আপনি বিগত বছরের কোশ্চেন ব্যাংক ধরে বিষয়ভিত্তিক ফোকাস ঠিক রাখেন।

বিষয়ভিত্তিক কাট-ছাট প্রিপারেশন হ্যাকস:

  1. বাংলা (২৫ নম্বর): ব্যাকরণের কারক-বিভক্তি, সমাস, সন্ধি, শুদ্ধ বানান, সমার্থক ও বিপরীত শব্দ একদম মুখস্থ করে ফেলুন। সাহিত্যের অংশে প্রধান ৫-৬ জন কবি-সাহিত্যিকের জীবন ও রচনা থেকে প্রতি বছর প্রশ্ন রিপিট হয়।
  2. ইংরেজি (২৫ নম্বর): গ্রামারের Parts of Speech, Right forms of verbs, Tense, Voice, Narration, Translation এবং Appropriate Preposition-এ ভালো দখল থাকলে প্রিলির বৈতরণী পার হওয়া পানির মতো সহজ।
  3. সাধারণ গণিত (২৫ নম্বর): বীজগণিতের মান নির্ণয় ও সূচক, পাটিগণিতের শতকরা, লাভ-ক্ষতি, সুদকষা এবং অনুপাতের নিয়ম চর্চা করুন।
  4. সাধারণ জ্ঞান (২৫ নম্বর): বাংলাদেশের ইতিহাস, ১৯৫২ থেকে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান, মেগা প্রজেক্ট এবং সাম্প্রতিক জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীতে চোখ রাখুন।
[বিগত প্রশ্নব্যাংক সমাধান] ➔ [দুর্বল টপিকের নোট তৈরি] ➔ [টাইমার ধরে ওএমআর প্র্যাকটিস] ➔ [প্রিলি ক্র্যাক!]

সংক্ষেপিত পর্যালোচনা (Takeaway)

আপনি ১৯তম নিবন্ধন প্রার্থী হন কিংবা প্রাথমিকে স্বপ্নের শিক্ষকতা খুঁজছেন—এখনই সেরা সময় পড়ার টেবিলে নিজেকে গুঁটিয়ে ফেলার। সময় নষ্ট না করে বিগত অন্তত ১০ বছরের এনটিআরসিএ এবং ডিপিই (DPE)-এর প্রশ্ন ব্যাংকটা সমাধান করে ফেলুন। আত্মবিশ্বাস আর সঠিক স্ট্র্যাটেজি থাকলে ২০২৭ সালের শুরুতেই চাকরিটা আপনার ঝুলিতে আসছে!

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

জুলাই জাতীয় সনদ

নিউজ ডেস্ক

October 24, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant & Political Analyst)

বিভাগ (Category): রাজনীতি, জাতীয়

প্রকাশের তারিখ: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

তথ্যসূত্র (Sources): জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ সংক্রান্ত দলিল, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের (NCC) প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর সরকারি বিবৃতি এবং প্রথম আলো, সমকাল, বিডিনিউজ২৪ বাংলার প্রতিবেদন।


ঢাকা: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোয় যে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফসল ছিল ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কমিশন ও দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে প্রণীত এই সনদ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক জাতীয় গণভোটে প্রায় ৬৮.২৬ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পায়। কিন্তু স্বাক্ষরের এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে দেশের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে গভীর মেরুকরণ—যা বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি।

জুলাই সনদে কী আছে?

সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যার মধ্যে ৪৮টি বাস্তবায়নের জন্য সরাসরি সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন। সনদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা প্রবর্তন, যেখানে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক হারে গঠিত হবে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও মেয়াদে স্পষ্ট সীমারেখা টানা হয়েছে—একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকতে পারবেন না, এবং প্রধানমন্ত্রী পদে থাকাকালীন একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের দায়িত্বও পালন করতে পারবেন না। জাতীয় নির্বাচনের সময় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করার প্রস্তাবও সনদের একটি মূল স্তম্ভ। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০ সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের বাজেট ও অনাস্থা প্রস্তাব ব্যতীত অন্যান্য বিলে দলীয় সিদ্ধান্তের বিপরীতে স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও সনদে গুরুত্ব পেয়েছে।

সনদে কী নেই বা অস্পষ্ট রয়ে গেছে?

ব্যাপক পরিসরের এই সংস্কার প্রস্তাবনার পরও সনদে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, সংবিধানের মৌলিক চারটি মূলনীতি পরিবর্তন বা পরিমার্জনের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো চূড়ান্ত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নারী অধিকার, গণমাধ্যম, শ্রম অধিকার ও স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের দেওয়া সুনির্দিষ্ট সুপারিশগুলো জাতীয় ঐকমত্য কমিশন (NCC) এই সনদে পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত করেনি—এগুলোকে দ্বিতীয় ধাপের সংস্কার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংসদে নারীর আসন সংখ্যা বাড়ানোর সাধারণ প্রতিশ্রুতি থাকলেও সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা চূড়ান্ত হয়নি। আর সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট সময়সীমার অনুপস্থিতি—গণভোটে জয়লাভের পর ঠিক কবে নাগাদ এই সংস্কারগুলো আইনি রূপ পাবে, তার কোনো বাধ্যতামূলক সময়সীমা রাজনৈতিক সংকটের কারণে কার্যত থমকে গেছে।

দুই পক্ষের অবস্থান: কোথায় মূল বিরোধ?

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন স্পষ্টভাবে দুটি পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি ও তাদের মিত্র দলগুলোর অবস্থান হলো, জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবগুলো অবশ্যই বাস্তবায়িত হতে হবে, তবে তা দেশের বিদ্যমান সাংবিধানিক ও সংসদীয় কাঠামোর মধ্য দিয়েই করতে হবে। তাদের যুক্তি, রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশের মাধ্যমে সংসদকে বাইপাস করে পৃথক কোনো ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করা আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে; বরং সংবিধান সংশোধনের কাজ নির্বাচিত সংসদের স্বাভাবিক সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটাভুটির মাধ্যমেই সম্পন্ন হওয়া উচিত। বিএনপি নিজেকে সনদের অন্যতম স্বাক্ষরকারী হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, তারা সনদের মূল চেতনার বিরোধী নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রেখে প্রচলিত সংসদীয় পদ্ধতিতেই এটি বাস্তবায়ন করতে চায়।

অন্যদিকে সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের দাবি হলো, গণভোটের রায় অনুযায়ী সনদকে হুবহু এবং দ্রুততার সাথে কার্যকর করতে হবে। তাদের মতে, যেহেতু দেশের প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি মানুষ গণভোটে সনদের পক্ষে রায় দিয়েছেন, তাই কোনো নির্বাচিত সংসদ বা রাজনৈতিক দলের এই গণরায়কে বিলম্বিত করার বা একে সাধারণ সংশোধনী প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত করার নৈতিক অধিকার নেই। তারা অভিযোগ করছে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ক্ষমতার রাজনীতির কারণে সংস্কার প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে, যা জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনার সঙ্গে এক ধরনের আপসের শামিল। এই পক্ষের যুক্তি হলো, পুরনো সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে সংশোধনী আনলে ভবিষ্যতে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার পুনর্বাসনের ঝুঁকি থেকে যায়—তাই সনদে প্রস্তাবিত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর মাধ্যমেই নতুন আইনি রূপরেখা প্রণয়ন করা উচিত।

বর্তমান পরিস্থিতি: অনিশ্চয়তা অব্যাহত

২০২৬ সালের অক্টোবরে এসেও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রশ্নে স্পষ্ট কোনো সমাধান আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিবেদনে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও বিতর্কের খবর উঠে এসেছে, এবং স্বচ্ছতা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-ও সংস্কার বাস্তবায়নের গতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গণভোটের ফলাফলের সাথে বাস্তবায়নের সময়রেখার সম্পর্ক নিয়েও সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এসেছে। এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দেয় যে, একটি সংস্কার সনদে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা যতটা কঠিন, তার চেয়েও বেশি জটিল হতে পারে সেই ঐকমত্যকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া।

বিশ্লেষণ: গণভোট বনাম সাংবিধানিক প্রক্রিয়া—একটি চিরন্তন দ্বন্দ্ব

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে এই বিতর্ক আসলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি চিরন্তন প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে এসেছে—প্রত্যক্ষ গণরায় (গণভোট) এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্বমূলক প্রক্রিয়া (সংসদ)-এর মধ্যে কোনটির অগ্রাধিকার থাকা উচিত। বিএনপির অবস্থান সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার যুক্তিতে দাঁড়িয়ে, যেখানে জামায়াত-এনসিপি জোটের অবস্থান সরাসরি জনরায়ের অগ্রাধিকারের যুক্তিতে প্রতিষ্ঠিত। উভয় অবস্থানেরই নিজস্ব গণতান্ত্রিক যুক্তি রয়েছে, এবং এই দ্বন্দ্বের সমাধান কীভাবে হয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামোর চরিত্র।

উপসংহার

জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কারের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে স্বীকৃত, যা গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমর্থনও অর্জন করেছে। তবে এই বিপুল জনসমর্থন সত্ত্বেও বাস্তবায়নের পথ মসৃণ হয়নি—বরং তা পরিণত হয়েছে দেশের বর্তমান রাজনীতির অন্যতম বড় মেরুকরণের ক্ষেত্রে। আগামী দিনগুলোতে এই বিতর্কের সমাধান কীভাবে হয়, তা শুধু সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎই নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থিতিশীলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

নতুন শ্রমবাজার আপডেট ২০২৬

নিউজ ডেস্ক

October 23, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিনিধি ও তথ্যের বিবরণ:BDS Bulbul AHmed

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

প্রকাশের সময় ও তারিখ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২০ অপরাহ্ন

স্থান: অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা

বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানে এশিয়ার শীর্ষ চার অর্থনৈতিক পরাশক্তি—মালয়েশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং থাইল্যান্ডের শ্রমবাজার নিয়ে একযোগে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী শ্রমবাজারগুলোর পাশাপাশি বিকল্প ও উচ্চ আয়ের গন্তব্য হিসেবে এই দেশগুলোর সাথে একের পর এক যুগান্তকারী চুক্তি ও সরকারি নীতিগত পরিবর্তন প্রবাসীদের জন্য দক্ষ ও সুরক্ষিত কর্মসংস্থানের বিশাল ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

২০২৬ সালের অক্টোবর মাসের সর্বশেষ সরকারি ঘোষণা ও আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী চার দেশের শ্রমবাজারের সুনির্দিষ্ট আপডেট নিচে তুলে ধরা হলো:

মালয়েশিয়া: উন্মুক্ত হলো শ্রমবাজার, ১০ হাজার কর্মী যাচ্ছেন শূন্য খরচে

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য অফিশিয়ালি পুনরায় চালু হয়েছে।

  • সর্বশেষ আপডেট: প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মালয়েশিয়া সরকার কর্মী নিয়োগে স্বচ্ছতা আনতে বাংলাদেশের ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত (Enlisted) করেছে, যার মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘বোয়েসেল’ (BOESL) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
  • শূন্য অভিবাসন ব্যয় (Zero Cost): বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে ১০,০০০ বাংলাদেশি কর্মীকে সম্পূর্ণ ‘শূন্য খরচে’ (Free of Cost) নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়েছে।
  • পরিকল্পনা: আগামী ৬ মাসে ধাপে ধাপে বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে প্রায় ২,০০,০০০ কর্মী নিয়োগের রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। মূলত উৎপাদন, কনস্ট্রাকশন ও সেবা খাতে এই কর্মীরা কাজ পাবেন।

জাপান: ঐতিহাসিক চুক্তি, ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে সরাসরি কর্মী নিয়োগ

দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি ও অভিবাসী সুরক্ষায় জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশ একটি যুগান্তকারী মেমোরেন্ডাম অব কো-অপারেশন (MoC) সম্পাদন করেছে।

  • সর্বশেষ আপডেট: গত ১৭ অক্টোবর ২০২৬-এ দুই দেশের মধ্যে ‘ইএসডিপি-এমওসি’ (ESDP-MOC – Memorandum of Cooperation on Employment Skills Development) চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির প্রথম মেয়াদ ৫ বছর, যা পরবর্তীতে আরও ৫ বছরের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে (মোট ১০ বছর)।
  • নিয়োগের সময়কাল: এই নতুন কাঠামোর অধীনে আগামী ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে সরাসরি বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেবে জাপান।
  • সুযোগ ও অধিকার: চুক্তির শর্তানুযায়ী, জাপানে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীরা জাপানের স্থানীয় নাগরিকদের সমপরিমাণ আইনি সুরক্ষা, বেতন-ভাতা এবং নারী-পুরুষের সমান কর্মক্ষেত্রের অধিকার পাবেন। ৫ বছরে ১ লক্ষাধিক দক্ষ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া: নির্মাণ ও মৌসুমি খাতে সুযোগ বৃদ্ধির জোর প্রচেষ্টা

ইপিএস (Employment Permit System) বা সরকারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে।

  • সর্বশেষ আপডেট: ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর সিউলে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘ন্যাশনাল এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন’ (NESA) এবং ‘কন্সট্রাকশন অ্যাসোসিয়েশন অব কোরিয়া’ (CAK) এর সাথে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর একটি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
  • নতুন কাজের ক্ষেত্র: প্রথাগত ম্যানুফ্যাকচারিং ও কৃষি খাতের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার বড় বড় নির্মাণশিল্প (Construction Sector) এবং স্বল্পমেয়াদি মৌসুমি কর্মসংস্থানে (Seasonal Jobs) বাংলাদেশি দক্ষ কর্মীদের যুক্ত করার বিষয়ে কোরিয়ান কর্তৃপক্ষ ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।
  • পূর্বশর্ত: কোরিয়ায় যাওয়ার জন্য ব্যবহারিক কোরিয়ান ভাষা শিক্ষা (EPS-TOPIK) এবং কর্মক্ষেত্রভিত্তিক কারিগরি দক্ষতা অর্জন করা বাধ্যতামূলক।

৪. থাইল্যান্ড: কারিগরি ও ট্যুরিজম খাতে নতুন উইন্ডো

সাধারণত থাইল্যান্ডে বাংলাদেশিদের শ্রমবাজার সেভাবে পরিচিত না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সরকারিভাবে এই বাজার উন্মোচনের বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে

  • সর্বশেষ আপডেট: মধ্যপ্রাচ্যের ওপর একক নির্ভরতা কমাতে থাইল্যান্ডের সেবা খাত, বিশেষ করে ট্যুরিজম, হসপিটালিটি এবং নির্দিষ্ট কিছু টেকনিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্টে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ ও আধা-দক্ষ কর্মী নেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা চুক্তি ও কূটনৈতিক আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

চার দেশের শ্রমবাজারের তুলনামূলক চিত্র

দেশনিয়োগের মূল মাধ্যমপ্রধান চাহিদাসম্পন্ন খাতসমূহমূল যোগ্যতা/প্রয়োজনীয়তা
মালয়েশিয়া৩৩৮টি অনুমোদিত বেসরকারি ও সরকারি এজেন্সিউৎপাদন (Manufacturing), নির্মাণ ও প্ল্যান্টেশনমেডিকেল ফিটনেস এবং সাধারণ কাজের অভিজ্ঞতা
জাপাননতুন ESDP-MOC চুক্তির আওতাভুক্ত প্রক্রিয়াকেয়ারগিভিং, নির্মাণ, এভিয়েশন ও গার্মেন্টসজাপানি ভাষা দক্ষতা এবং নির্দিষ্ট কাজের টেকনিক্যাল জ্ঞান
দক্ষিণ কোরিয়াসরাসরি সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘বোয়েসেল’ (BOESL)ম্যানুফ্যাকচারিং, নির্মাণশিল্প এবং কৃষিকোরীয় ভাষা (EPS-TOPIK) এবং পেশাভিত্তিক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ
থাইল্যান্ডজি-টু-জি (G2G) ও অনুমোদিত সরকারি কাঠামোহসপিটালিটি, সেবা শিল্প এবং টেকনিক্যাল কাজইংরেজি বা থাই ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ উন্নত দেশগুলোতে কেয়ারগিভার, নির্মাণকর্মী এবং আইটি প্রফেশনাল হিসেবে যাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম (সিস্টেম) অনুসরণ করতে হয়। নিচে প্রতিটি কাজের জন্য নির্দিষ্ট আবেদন প্রক্রিয়া, যোগ্যতা এবং সঠিক সিস্টেমের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

কেয়ারগিভার (Caregiver) বা সেবামূলক পেশা

জাপানে বয়স্কদের সেবা করার জন্য বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে প্রচুর কেয়ারগিভার নেওয়া হচ্ছে।

  • প্রধান সিস্টেম: জাপানের ক্ষেত্রে এটি মূলত দুটি সিস্টেমে হয়—SSW (Specified Skilled Worker) এবং TITP (Technical Intern Training Program)। এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল (BOESL) মাঝে মাঝে বিশেষ সার্কুলার দেয়।
  • প্রয়োজনীয় যোগ্যতা:
    • ভাষা দক্ষতা: জাপানি ভাষার দক্ষতা পরীক্ষা JLPT N4 অথবা JFT-Basic A2 পাস করতে হবে।
    • কারিগরি দক্ষতা: নার্সিং বা সেবামূলক কাজের ওপর Caregiving Skills Evaluation Test পাস করতে হবে (SSW-এর জন্য)।
  • আবেদন প্রক্রিয়া: ভাষা ও দক্ষতার সার্টিফিকেট অর্জনের পর জাপানের অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি (যেমন বোয়েসেল বা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত বৈধ এজেন্সি) এর মাধ্যমে জাপানি কোম্পানির সাথে ইন্টারভিউ দিয়ে ভিসা প্রসেস করতে হয়।

নির্মাণকর্মী (Construction Worker)

মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ায় কনস্ট্রাকশন খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের বিশাল চাহিদা রয়েছে।

  • প্রধান সিস্টেম:
    • দক্ষিণ কোরিয়া: সম্পূর্ণ সরকারি EPS (Employment Permit System) এর মাধ্যমে।
    • মালয়েশিয়া: সরকারের অনুমোদিত ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে (যার মধ্যে বোয়েসেলও অন্তর্ভুক্ত)।
  • প্রয়োজনীয় যোগ্যতা:
    • দক্ষিণ কোরিয়া: কোরিয়ান ভাষার পরীক্ষা EPS-TOPIK পাস করতে হবে এবং নির্মাণকাজের বেসিক ট্রেনিং থাকতে হবে।
    • মালয়েশিয়া: শারীরিক সক্ষমতা, মেডিকেল ফিটনেস এবং বিএমইটি (BMET) ডাটাবেজে নাম নিবন্ধন থাকতে হবে।
  • আবেদন প্রক্রিয়া: কোরিয়ার জন্য বোয়েসেলের (BOESL) ওয়েবসাইটে যখন কনস্ট্রাকশন খাতের সার্কুলার দেবে, তখন আবেদন করে লটারি বা ভাষা পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। মালয়েশিয়ার জন্য অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে বা সরকারি জিরো-কস্ট পুলে নাম নিবন্ধন করে অগ্রসর হতে হবে।

আইটি প্রফেশনাল (IT Professional / Engineer)

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় আইটি খাতের চাকরিগুলো উচ্চ বেতনের এবং এটি সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক।

  • প্রধান সিস্টেম: এটি মূলত সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগ (Direct Corporate Hiring) এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল (BOESL)-এর বিশেষ টেকনিক্যাল রিক্রুটমেন্ট ড্রাইভের মাধ্যমে হয়ে থাকে।
  • প্রয়োজনীয় যোগ্যতা:
    • শিক্ষাগত যোগ্যতা: কম্পিউটার সায়েন্স (CSE), আইটি বা রিলেটেড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি।
    • দক্ষতা: সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডাটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি বা নেটওয়ার্কিংয়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা।
    • ভাষা: জাপানের জন্য সাধারণত JLPT N3 বা N2 লেভেল খোঁজা হয়। তবে কিছু গ্লোবাল কোম্পানিতে শুধু ইংরেজি (TOEFL/IELTS) জানলেও সুযোগ মেলে।
  • আবেদন প্রক্রিয়া: বোয়েসেল প্রতি বছর জাপান ও কোরিয়ার আইটি কোম্পানির জন্য সরাসরি নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এছাড়া Daijob, Wantedly, LinkedIn-এর মতো আন্তর্জাতিক জব পোর্টাল ব্যবহার করে সরাসরি জাপানি বা কোরিয়ান কোম্পানিতে স্পন্সরশিপ ভিসার জন্য আবেদন করা যায়।

তিনটি বিষয়ের একটি সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক ছক

পেশামূল গন্তব্য দেশপ্রধান মাধ্যম (System)ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব
কেয়ারগিভারজাপানSSW / TITP (সরকারি ও বৈধ প্রাইভেট এজেন্সি)খুবই উচ্চ (N4 বা সমমান আবশ্যক)
নির্মাণকর্মীদক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়াEPS (কোরিয়া) / অনুমোদিত এজেন্সি (মালয়েশিয়া)মাঝারি থেকে উচ্চ (কোরিয়ার জন্য বাধ্যতামূলক)
আইটি প্রফেশনালজাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসরাসরি কোম্পানি ইন্টারভিউ / BOESL সার্কুলারমাঝারি (ইংরেজি বা বেসিক ভাষা জানলে অগ্রাধিকার)

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশে আইটি প্রফেশনাল (Software Engineer, Web Developer, Data Scientist, Cyber Security Expert ইত্যাদি) হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত চমৎকার এবং দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত লাভজনক। এই খাতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এখানে কোনো লটারি বা শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা নেই; সম্পূর্ণ মেধা ও কারিগরি দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে ভিসা পাওয়া যায়।

একজন আইটি প্রফেশনাল হিসেবে বিদেশ যাওয়ার জন্য আপনাকে প্রধানত ২টি অফিশিয়াল সিস্টেম অনুসরণ করতে হবে:

সরকারি মাধ্যম: বোয়েসেল (BOESL) আইটি রিক্রুটমেন্ট

বাংলাদেশ সরকারের একমাত্র রাষ্ট্রীয় জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান BOESL (Bangladesh Overseas Employment and Services Limited) প্রতি বছর জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন নামী আইটি কোম্পানির সাথে যৌথভাবে “Direct Hiring Drive” বা সরাসরি নিয়োগ মেলার আয়োজন করে।

  • পদ্ধতি: বোয়েসেল তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে (boesl.gov.bd) সার্কুলার দেয়। সেখানে দেওয়া লিংকে আপনার রিজিউমি/সিভি (Resume) জমা দিতে হয়।
  • বাছাই প্রক্রিয়া: কোম্পানির প্রতিনিধিরা প্রাথমিক সিভি শর্টলিস্ট করে সরাসরি বা অনলাইনের মাধ্যমে টেকনিক্যাল ইন্টারভিউ এবং কোডিং টেস্ট নেন।
  • সুবিধা: সরকারি মাধ্যমে হওয়ায় কোনো বাড়তি এজেন্সির খরচ বা প্রতারিত হওয়ার ভয় থাকে না। ভিসা প্রসেসিং খুব দ্রুত ও স্বচ্ছ হয়।

প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম: সরাসরি আন্তর্জাতিক জব পোর্টাল (Direct Hiring)

জাপান ও কোরিয়ার অনেক গ্লোবাল কোম্পানি এখন বিশ্বজুড়ে দক্ষ কর্মী খুঁজছে, যারা সরাসরি স্পন্সরশিপ ভিসা (যেমন জাপানের জন্য Engineer/Specialist in Humanities/International Services Visa) দিয়ে কর্মী নিয়ে যায়।

  • পদ্ধতি: আপনাকে আন্তর্জাতিক জব পোর্টালগুলোতে নিয়মিত চোখ রাখতে হবে এবং আপনার প্রোফাইল অনুযায়ী আবেদন করতে হবে।
  • সেরা কিছু প্ল্যাটফর্ম:
    • জাপানের জন্য: Daijob.com, Wantedly, TokyoDev, Japan Dev, এবং LinkedIn.
    • দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য: Seoul Startups, Wanted.co.kr, এবং LinkedIn.

সফলভাবে যাওয়ার জন্য ৩টি মূল প্রস্তুতি (Action Plan)

যদি আপনি ২০২৭ সালের মধ্যে একজন আইটি প্রফেশনাল হিসেবে বিদেশে যেতে চান, তবে আজ থেকেই এই ৩টি বিষয়ে প্রস্তুতি শুরু করুন:

  • ক. শক্তিশালী টেকনিক্যাল পোর্টফোলিও: আপনার GitHub প্রোফাইল অত্যন্ত চমৎকার হতে হবে। আপনি যে প্রযুক্তিতে (যেমন: Python, JavaScript, Java, DevOps, Multi-Cloud) দক্ষ, তার প্রাক্টিক্যাল প্রজেক্টগুলো পোর্টফোলিওতে প্রদর্শন করুন।
  • খ. গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড সিভি (Resume): জাপানি বা কোরিয়ান কোম্পানিগুলোর জন্য সিভি হতে হবে এক বা সর্বোচ্চ দুই পৃষ্ঠার, যা হবে সম্পূর্ণ অ্যাকশন-অরিয়েন্টেড (আপনি কোন প্রজেক্টে কী ভূমিকা রেখেছেন এবং তার আউটপুট কী ছিল)।
  • গ. ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা:
    • জাপান: কিছু কোম্পানি শুধু ইংরেজিতে কর্মী নিলেও, আপনি যদি JLPT N3 বা N2 লেভেলের জাপানি ভাষা শিখে রাখেন, তবে আপনার চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা ৯০% বেড়ে যাবে এবং বেতনও অনেক বেশি হবে।
    • দক্ষিণ কোরিয়া: ইংরেজি জানা বাধ্যতামূলক, পাশাপাশি কোরিয়ান ভাষার বেসিক (TOPIK Level 2/3) জানা থাকলে ইন্টারভিউতে বিশাল অ্যাডভান্টেজ পাওয়া যায়।
  • আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
১৩ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ