ইতিহাস

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক মূল্যায়ন: ব্যক্তিগত সততা বনাম আদর্শিক বিতর্ক
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক মূল্যায়ন

নিউজ ডেস্ক

June 5, 2026

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ও মেরুকরণ সৃষ্টিকারী চরিত্র। তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়নে প্রধানত ব্যক্তিগত সততা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও বিতর্ক—এই দুটি পরস্পরবিরোধী দিক উঠে আসে।

ব্যক্তিগত সততা ও দেশপ্রেম

  • উচ্চ নৈতিক মান: জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত সততা ও নিয়মানুবর্তিতা তাঁর রাজনৈতিক ও সামরিক জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও সাধারণত তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনার সময় তাঁর ব্যক্তিগত দুর্নীতির অভিযোগ থেকে তাঁকে মুক্ত রাখেন।
  • কর্মীবান্ধব নেতৃত্ব: সাদাসিধে জীবনযাপন, কঠোর পরিশ্রম এবং দেশের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের মানসিকতা তাঁকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে একটি স্থায়ী আসন এনে দেয়।
  • অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দূরদর্শিতা: খাল খনন কর্মসূচি, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপগুলো আধুনিক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করতে ভূমিকা রেখেছিল বলে তাঁর সমর্থকরা মনে করেন।

আদর্শিক বিতর্ক ও সমালোচনা

  • বহুদলীয় গণতন্ত্র ও পুনর্বাসন: একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা থেকে ফিরিয়ে এনে তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে পুনর্বাসন করেন। তবে, এর ফলে স্বাধীনতাবিরোধী অনেক রাজনৈতিক শক্তিও রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ পায়, যা বাংলাদেশের আদর্শিক রাজনীতিতে গভীর বিতর্কের জন্ম দেয়।
  • বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ: তিনি ‘বাঙালি’ পরিচয়ের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রবর্তন করেন, যা সব ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে একটি ছাতার নিচে আনার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল। সমালোচকদের মতে, এটি মূল বাঙালি সংস্কৃতির স্বকীয়তা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিপন্থী ছিল।
  • সামরিক শাসন ও বিতর্কিত আইন: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাঁর ক্ষমতায় আরোহণ এবং পরবর্তীতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বলবৎ রাখার মতো বিষয়গুলো তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়।

জিয়াউর রহমান এমন এক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন যা একদিকে তাঁর সততা ও উন্নয়নের জন্য প্রশংসিত, অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক কৌশল ও গৃহীত পদক্ষেপের জন্য তীব্র আদর্শিক সমালোচনার সম্মুখীন

ব্যক্তিগত সততা ও জীবনযাপন

জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত সততা ও জীবনযাপন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত বিষয়। তাঁর অতি সাধারণ জীবনযাত্রার অনেক বিবরণ সমসাময়িক রাজনীতিবিদ এবং ইতিহাসবিদদের লেখায় উঠে এসেছে।

সাধারণ জীবনযাপন ও বাসস্থান

  • সরকারি বাসভবন বর্জন: রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও তিনি বিলাসবহুল বঙ্গভবনে বসবাস না করে ঢাকা সেনানিবাসের একটি সাধারণ মঈনুল রোডস্থ বাসভবনে থাকতেন
  • আসবাবপত্রের অভাব: তাঁর মৃত্যুর পর দেখা যায়, রাষ্ট্রপতির বাসভবনেও অত্যন্ত সাধারণ এবং সীমিত আসবাবপত্র ছিল [১]।
  • ভাঙা সুটকেস ও ছেঁড়া গেঞ্জি: তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের মধ্যে একটি ভাঙা সুটকেস এবং কয়েকটি ছেঁড়া গেঞ্জি পাওয়া যায়, যা তাঁর অতি সাধারণ জীবনযাপনের প্রতীক হিসেবে ব্যাপকভাবে আলোচিত ।

আর্থিক সততা

  • দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তি: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার পরও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি।
  • পরিবারের জন্য সম্পদ না রাখা: মৃত্যুর সময় তিনি তাঁর স্ত্রী বা সন্তানদের জন্য কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স, দামি গাড়ি বা বিলাসবহুল বাড়ি রেখে যাননি।
  • সরকারি তহবিলের সাশ্রয়: রাষ্ট্রীয় সফরে বিদেশে যাওয়ার সময় তিনি অত্যন্ত সীমিত খরচ করতেন এবং সরকারি অর্থের অপচয় কঠোরভাবে বন্ধ করেছিলেন।

কঠোর নিয়মানুবর্তিতা ও পরিশ্রম

  • দীর্ঘ কর্মঘণ্টা: তিনি প্রতিদিন প্রায় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করতেন এবং গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ফাইল পর্যালোচনা করতেন।
  • মাঠপর্যায়ে তদারকি: শীত-গ্রীষ্ম উপেক্ষা করে তিনি সরাসরি গ্রামে চলে যেতেন এবং সাধারণ মানুষের সাথে মাটিতে বসে কথা বলতেন।

জিয়াউর রহমানের এই সততা ও সাধারণ জীবনযাপন তাঁর সমর্থকদের কাছে তাঁকে এক অনন্য ও অনুকরণীয় নেতার মর্যাদা দিয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষাগত দক্ষতা নিয়ে বিতর্ক

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক মূল্যায়নে তাঁর ‘মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা’ এবং ‘ভাষাগত দক্ষতা’—এই দুটি বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘকাল ধরে গভীর বিতর্ক ও ভিন্নমত বিদ্যমান [১.২.২]।

১. মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক

মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কিছু দিক নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ রয়েছে [১.২.২]:

  • স্বাধীনতার ঘোষণা বিতর্ক: ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন [১.২.১, ১.২.৮]। তাঁর সমর্থক ও দল (বিএনপি)-এর মতে, এই ঘোষণা দিশেহারা বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল [১.২.১, ১.৩.৮]। অপরদিকে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ (আওয়ামী লীগ)-এর দাবি, তিনি ছিলেন কেবল একজন পাঠক বা ঘোষক, এবং স্বাধীনতার মূল কৃতিত্ব ও একক নেতৃত্ব সম্পূর্ণভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের।
  • সেক্টর কমান্ডার বনাম ‘আকস্মিক’ মুক্তিযোদ্ধা: জিয়াউর রহমান ১ নম্বর সেক্টর এবং পরবর্তীতে ‘জেড ফোর্স’-এর প্রধান হিসেবে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেন, যার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে রাষ্ট্রীয় ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয় [১.২.৭]। তবে সমালোচকদের একটি অংশ দাবি করে, তিনি ২৫ মার্চের আগে পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিদ্রোহ করেননি, বরং পাকিস্তানি জাহাজ ‘এমভি সোয়াত’ থেকে অস্ত্র খালাস করতে গিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আকস্মিকভাবে বিদ্রোহে যোগ দিতে বাধ্য হন [১.২.৪]। তাঁর সমর্থকরা এই তত্ত্বকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ইতিহাস বিকৃতি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন [১.২.৪, ১.২.৫]।

২. ভাষাগত দক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিতর্ক

জিয়াউর রহমানের শিক্ষা, বেড়ে ওঠা এবং দাপ্তরিক ভাষা ব্যবহারের ধরন নিয়েও এক ধরনের বিতর্ক রয়েছে:

  • বাংলা ভাষা ও শৈশব: জিয়াউর রহমানের শৈশব ও শিক্ষার একটি বড় অংশ কেটেছিল অবিভক্ত ভারতের কলকাতা এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের করাচিতে । করাচির ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করার কারণে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলা লেখার চর্চা তাঁর কম ছিল । এই কারণে সমালোচকরা প্রায়শই দাবি করেন যে তিনি শুদ্ধভাবে বাংলা পড়তে বা লিখতে পারতেন না । তবে জীবনীকারদের মতে, দাপ্তরিক কাজে তিনি ইংরেজি ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও বাংলা বলতে পারতেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সময় সব স্তরে বাংলা ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছিলেন।
  • জাতীয়তাবাদের ভাষাগত বনাম ভৌগোলিক রূপান্তর: ১৯৭২ সালের সংবিধানে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর মূল ভিত্তি ছিল মূলত ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক একক সত্তা । কিন্তু জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে একে পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রবর্তন করেন ধর্মনিরপেক্ষ ও ভাষাভিত্তিক সংস্কৃতির পরিবর্তে ভূখণ্ড এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের মিশ্রণে এই নতুন পরিচয় তৈরি করা হয়। সমালোচকদের মতে, এটি ভাষা আন্দোলনের মূল চেতনা ও ভাষাভিত্তিক বাঙালি পরিচয়কে অবমূল্যায়ন করার একটি রাজনৈতিক কৌশল ছিল

জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা ও তাঁর আদর্শিক দর্শন আজও বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান তর্কের উপাদান, যা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও ক্ষমতা দখল

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং তীব্র মেরুকরণ সৃষ্টিকারী অধ্যায় । এই ঘটনাপ্রবাহে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এবং তাঁর ক্ষমতায় আরোহণের প্রক্রিয়াকে প্রধানত দুটি বিপরীতমুখী রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা হয়

১. আওয়ামী লীগ ও সমালোচকদের মূল্যায়ন (হত্যাকাণ্ডের সুবিধাভোগী ও নেপথ্য কুশীলব)

এই দৃষ্টিকোণ থেকে জিয়াউর রহমানকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়

  • পূর্বজ্ঞাত ও পরোক্ষ সম্মতি: খুনি ফারুক ও রশিদের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার এবং মামলার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে দাবি করা হয়, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সম্পর্কে তৎকালীন উপ-সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান আগে থেকেই জানতেন । তিনি এতে সরাসরি অংশ না নিলেও “তোমরা সফল হলে আমার আপত্তি নেই” ধরনের মনোভাব দেখিয়ে পরোক্ষ সম্মতি দিয়েছিলেন
  • খুনিদের পুনর্বাসন ও পুরস্কৃতকরণ: ক্ষমতা গ্রহণের পর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে জড়িত ১২ জন সামরিক কর্মকর্তাকে বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে উচ্চপদে চাকরি ও কূটনৈতিক কূটনৈতিক সুবিধা দিয়ে পুরস্কৃত করেন
  • ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে আইনি রূপ: খন্দকার মোশতাক আহমেদ কর্তৃক জারিকৃত বিতর্কিত ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ ১৯৭৫’ (যা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার থেকে আইনি সুরক্ষা দিয়েছিল) ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংসদের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয় । এর ফলে দীর্ঘ ২১ বছর বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ রুদ্ধ ছিল
  • সংবিধান ধ্বংসকারী ও অবৈধ দখলদার: দেশের উচ্চ আদালত পরবর্তীতে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে এই সময়ের ক্ষমতা দখলকে অসাংবিধানিক ও জবরদখল হিসেবে আখ্যায়িত করেন

২. বিএনপি ও সমর্থকদের মূল্যায়ন (পরিস্থিতির দাবি ও শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারকারী)

জিয়াউর রহমানের সমর্থক ও রাজনৈতিক অনুসারীদের মতে, তিনি কোনো ষড়যন্ত্র বা হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন না, বরং একটি বিশৃঙ্খল জাতীয় সংকটের মুখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন

  • পেশাদারিত্ব ও আনুগত্য: সমর্থকরা দাবি করেন, জিয়াউর রহমান একজন সুশৃঙ্খল সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন। ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানটি ছিল জুনিয়র অফিসারদের একটি বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ, যার সাথে চেইন অব কমান্ডের বাইরে থাকা উপ-সেনাপ্রধান জিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো যোগসূত্র ছিল না।
  • ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব: ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। এরপর ৭ নভেম্বর কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সাধারণ সৈনিক ও জনতার এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান মুক্ত হন এবং সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নেতৃত্বের কেন্দ্রে চলে আসেন
  • সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা: জিয়াউর রহমান সরাসরি ক্ষমতা দখল করেননি; প্রথমে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদে রেখে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন এবং পরবর্তীতে সায়েমের পদত্যাগের পর আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন
  • ইনডেমনিটি পাসের ভিন্ন প্রেক্ষাপট: সমর্থকদের যুক্তি অনুযায়ী, ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত দেশে একাধিক সামরিক অভ্যুত্থান ও বিশৃঙ্খলা ঘটেছিল । সেই অস্থির সময়ে রাষ্ট্রের সার্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সামরিক বাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা ও আপস বজায় রাখার কৌশল হিসেবেই ওই সময় সংসদীয় আইনের মাধ্যমে পঞ্চম সংশোধনী পাস করতে হয়েছিল, যা এককভাবে কোনো খুনিকে রক্ষার উদ্দেশ্যে ছিল না

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় আরোহণ বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক জটিল সন্ধিক্ষণ, যা আজও দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক শিবিরের আদর্শিক দ্বন্দ্বের মূল কেন্দ্রবিন্দু

সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসন

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পুনরুত্থান এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান এবং তীব্র সমালোচিত একটি অধ্যায়। ১৯৭২ সালের সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে সরে এসে রাষ্ট্রীয় আদর্শে এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটিকে প্রধানত দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়।

১. আওয়ামী লীগ ও ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের মূল্যায়ন (সংবিধানের সাম্প্রদায়িকীকরণ ও পুনর্বাসন)

এই দৃষ্টিকোণ থেকে জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের মূল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক ভিত্তিকে ধ্বংস করার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হয়:

  • ধর্মনিরপেক্ষতা বিলোপ ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি: ১৯৭৭ সালে সামরিক ফরমানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান সংবিধানে আমূল পরিবর্তন আনেন। তিনি সংবিধানের অন্যতম মূল স্তম্ভ ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাতিল করেন এবং এর পরিবর্তে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” প্রতিস্থাপন করেন। একই সাথে বাহাত্তরের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন, যার ফলে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দল পুনরায় রাজনীতি করার আইনি অধিকার পায়।
  • শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ: বাংলাদেশের স্বাধীনতার সরাসরি বিরোধিতা করা এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে জাতিসংঘে ওকালতি করা মুসলিম লীগ নেতা শাহ আজিজুর রহমানকে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। এটিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে দেখা হয়।
  • গোলাম আযমের প্রত্যাবর্তন: ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের প্রধান অভিযুক্ত এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির গোলাম আযমকে ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানি পাসপোর্টে বাংলাদেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তিনি দেশেই অবস্থান করেন।
  • দালাল আইন বাতিল: ১৯৭২ সালে প্রণীত ‘দালাল আইন’ (Collaborators Act), যার অধীনে যুদ্ধাপরাধী ও পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগীদের বিচার চলছিল, ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তা বাতিল করা হয় এবং কারাবন্দি ও বিচারাধীন হাজার হাজার স্বাধীনতাবিরোধী মুক্তি পায়।

২. বিএনপি ও সমর্থকদের মূল্যায়ন (বহুদলীয় গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্য)

জিয়াউর রহমানের সমর্থক এবং দলীয় তাত্ত্বিকদের মতে, এই পদক্ষেপগুলো কোনো সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা থেকে নেওয়া হয়নি, বরং দেশের তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনে নেওয়া হয়েছিল:

  • প্রকৃত বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা: সমর্থকদের মতে, শেখ মুজিবুর রহমানের আমলের একদলীয় ‘বাকশাল’ ব্যবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করে সব মত ও পথের মানুষকে রাজনীতি করার অধিকার দেওয়াই ছিল জিয়ার লক্ষ্য। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের দলকে নিষিদ্ধ না রেখে চরম ডানপন্থী থেকে শুরু করে চরম বামপন্থী (যেমন জাসদ বা কমিউনিস্ট পার্টি)—সবাইকে রাজনৈতিক মূলধারায় ফিরিয়ে আনার কৌশল ছিল এটি।
  • জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ মূল্যবোধের স্বীকৃতি: বিএনপি দাবি করে, সংবিধানে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্তি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনসংখ্যার ধর্মীয় অনুভূতির প্রতিফলন ছিল, যা রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রকে পুরোপুরি নষ্ট করেনি, বরং রাষ্ট্রকে একটি টেকসই নৈতিক ভিত্তি দিয়েছিল।
  • জাতীয় সংহতি ও ক্ষমতার ভারসাম্য: যুদ্ধ-পরবর্তী বিভক্ত বাংলাদেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ কমিয়ে একটি ‘জাতীয় সংহতি’ বা ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন তৈরির উদ্দেশ্যে তিনি পূর্বের রাজনৈতিক বিরোধ ভুলে সবাইকে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করেছিলেন।

জিয়াউর রহমানের এই রাজনৈতিক পুনর্গঠন বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর দূরগামী প্রভাব ফেলে, যা আজও দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বনাম ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রধান বিভাজন রেখা হিসেবে কাজ করছে।

জাতীয় রাজনীতি, ইতিহাস এবং সমসাময়িক সব ব্রেকিং নিউজ ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ সবার আগে নির্ভরযোগ্যভাবে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন বাংলাদেশ প্রতিদিন ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

নিউজ ডেস্ক

July 25, 2026

শেয়ার করুন

বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন

পর্যালোচনা ও সম্পাদনা: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সম্প্রতি পদত্যাগের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানের শূন্য পদটি পূরণে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করার পর বঙ্গভবনের পরবর্তী অভিভাবক হিসেবে কাকে নির্বাচন করা হবে—তা এখন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সূত্র অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে সংসদীয় সেশন চলাকালীন জাতীয় সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটাভুটির মাধ্যমে সংবিধান অনুযায়ী দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হবে। রাজনৈতিক অঙ্গন ও দলীয় সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, দলীয় বলয়ের বাইরে অরাজনৈতিক ব্যক্তিতে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে; বরং বিএনপির সর্বোচ্চ নীতীনিরূপক পর্ষদ ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটির’ জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারকদের মধ্য থেকেই চূড়ান্ত রাষ্ট্রপতি মনোনীত হতে যাচ্ছেন।

আলোচনার শীর্ষ প্রার্থীরা: ব্যাকগ্রাউন্ড ও স্ট্র্যাটেজিক এনালাইসিস

┌─────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────┐
│                          রাষ্ট্রপতি পদের শীর্ষ প্রাবল্য বিশ্লেষণ                            │
├──────────────────────────┬─────────────────────────────┬────────────────────────────────┤
│ প্রার্থী                  │ পদবী/ভূমিকা                 │ মূল রাজনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি    │
├──────────────────────────┼─────────────────────────────┼────────────────────────────────┤
│ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর │ মহাসচিব ও মন্ত্রী (LGRD)     │ সর্বজনগ্রাহ্য ভাবমূর্তি, কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা │
│ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন  │ প্রবীণতম জ্যেষ্ঠ সদস্য (স্থায়ী) │ সংসদীয় অভিজ্ঞতা, বিশ্বমানের স্কলারশীপ │
│ ড. আবদুল মঈন খান         │ স্থায়ী কমিটির সদস্য          │ আন্তর্জাতিক ডিপ্লোমেসি ও ক্লিন ইমেজ     │
│ নজরুল ইসলাম খান          │ প্রধান রাজনৈতিক উপদেষ্টা    │ শ্রমিক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন (ILO)│
└──────────────────────────┴─────────────────────────────┴────────────────────────────────┘

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ রাজনীতিবিদ এবং বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব। বর্তমানে দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পটভূমিতে গঠিত সরকারে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার মার্জিত ভাষা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের জন্য দলমত নির্বিশেষে সমাদৃত।

১. পারিবারিক ও শিক্ষাগত ব্যাকগ্রাউন্ড

  • জন্ম ও পরিবার: তিনি ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন প্রখ্যাত আইনজীবী এবং সাবেক সংসদ সদস্য। তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন বাংলাদেশের ২য় জাতীয় সংসদের স্পিকার ও সাবেক আইনমন্ত্রী।
  • শিক্ষা: তিনি ঢাকার নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) এবং স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি অর্জন করেন।

২. পেশাগত জীবন ও শিক্ষকতা

রাজনীতিতে পুরোপুরি যুক্ত হওয়ার আগে তিনি মূলত শিক্ষাকতা পেশার সাথে জড়িত ছিলেন:

  • অর্থনীতির প্রভাষক: ১৯৭২ সালে বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে সরকারের বিভিন্ন সরকারি কলেজে অর্থনীতি বিভাগে সুনামের সাথে অধ্যাপনা করেন।
  • সরকারি কর্মকর্তা: ১৯৭৯ সালে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারির একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন।

৩. ছাত্র রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা

  • ছাত্র রাজনীতি: ১৯৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালে তিনি ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (ইপিএসইউ) এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন।
  • মহান মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি অন্যতম সংগঠক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

৪. রাজনৈতিক কর্মজীবন ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার রাজনৈতিক জীবনে তৃণমূল থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ও দলীয় পর্যায়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন:

  • তৃণমূল জনপ্রতিনিধি: ১৯৮৮ সালে তিনি কোনো দলীয় ব্যানার ছাড়াই ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯০-এর দশকে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি হন।
  • সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী (২০০১-২০০৬): ২০০১ সালের ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত তৎকালীন সরকারে তিনি প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
  • বিএনপির মহাসচিব (২০১১-বর্তমান): ২০০৯ সালে বিএনপির ৫ম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত হন। ২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি দলের ‘ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব’ হন এবং ২০১৬ সালের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির ৮ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, যা তিনি এখনো পালন করছেন।
  • সংগ্রাম ও কারাবরণ: গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধী দলের রাজনীতি করতে গিয়ে তাকে চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ১১২টিরও বেশি রাজনৈতিক মামলা দায়ের করা হয় এবং তিনি অন্তত ১০ বার কারাবরণ করেন।
  • বর্তমান রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব (২০২৬): সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত নতুন সরকারে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বর্তমানে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের পরবর্তী ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির এই বর্ষীয়ান ও সর্বজনগ্রাহ্য নেতার নাম সবচেয়ে জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। তার জীবনী সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে উইকিপিডিয়া এবং সরকারি স্থানীয় সরকার বিভাগ-এর পোর্টাল দেখতে পারেন।

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বাংলাদেশের একজন অত্যন্ত জ্যেষ্ঠ ও প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ, প্রখ্যাত ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানী এবং শিক্ষাবিদ। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠতম সদস্য। সম্প্রতি ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার নাম অত্যন্ত জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে।

তার ব্যাকগ্রাউন্ড, কর্মজীবন এবং রাজনৈতিক জীবনের ভূমিকা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

১. পারিবারিক ও শিক্ষাগত ব্যাকগ্রাউন্ড

  • জন্ম ও পরিবার: তিনি ১৯৪৬ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার গয়েশপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা খন্দকার আশরাফ আলী এবং মাতা হোসনে আরা হাসনা হেনা।
  • উচ্চশিক্ষা: তিনি ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্ত্ব (Geology) বিষয়ে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং ১৯৭০ সালে লন্ডনের খ্যাতনামা ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে আরেকটি এমএসসি এবং ১৯৭৩ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্ত্ব বিষয়ে পিএইচডি (PhD) ডিগ্রি লাভ করেন।

২. পেশাগত জীবন ও শিক্ষাবিদ ভূমিকা

জাতীয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ও গবেষক ছিলেন:

  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক: ১৯৭৫ সালে দেশে ফিরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি এই বিভাগের অধ্যাপক হন এবং ১৯৮৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বিভাগীয় চেয়ারম্যান (Chairman) হিসেবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
  • গবেষক ও লেখক: ভূতত্ত্ব বিজ্ঞান এবং দেশের সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে তার বহু গবেষণামূলক প্রবন্ধ ও বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি একাধিক বইয়ের রচয়িতা।

৩. ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ড. মোশাররফ লন্ডনে উচ্চশিক্ষারত ছিলেন। সেখানে প্রবাসীদের সংগঠিত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠন, তহবিল সংগ্রহ এবং কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে তিনি অত্যন্ত অগ্রণী ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

৪. রাজনৈতিক কর্মজীবন ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

১৯৭৯ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন। এরপর থেকে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে বহু গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছেন:

  • সংসদ সদস্য (৫ বার): তিনি কুমিল্লা-১ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য (MP) নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ১৩শ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
  • সফল মন্ত্রী (বিভিন্ন মেয়াদে): ১৯৯১-১৯৯৬ মেয়াদে খালেদা জিয়ার সরকারে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০০১-২০০Role মেয়াদে তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
  • আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের ভাবমূর্তি (WHO): স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ২০০৩ সালে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ৫৬তম ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বাংলাদেশে তামাকবিরোধী আইন প্রণয়ন ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য তাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড নো টোব্যাকো অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত করে।
  • সংসদের প্রথম অধিবেশন পরিচালনা (২০২৬): ২০২৬ সালের ১২ মার্চ বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হলে প্রবীণতম ও অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি স্পিকার নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তর্বর্তীকালীন সভাপতি বা চেয়ার হিসেবে অধিবেশন পরিচালনা করেন

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে দলমত নির্বিশেষে একজন অত্যন্ত মার্জিত, সুশিক্ষিত ও ‘ক্লিন ইমেজ’ বা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিবিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। তার বর্ণাঢ্য জীবন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে উইকিপিডিয়া-এর মূল নিবন্ধটি পড়তে পারেন। [

    ড. আবদুল মঈন খান

    ড. আবদুল মঈন খান বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম জ্যেষ্ট সদস্য। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, উচ্চশিক্ষা এবং মৃদুভাষী সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে দলমত নির্বিশেষে তার বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সম্প্রতি দেশের পরবর্তী ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদের সম্ভাব্য তালিকায় তার নাম অন্যতম প্রধান প্রার্থী হিসেবে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।

    তার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড, শিক্ষাজীবন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:

    ১. পারিবারিক ও শিক্ষাগত ব্যাকগ্রাউন্ড

    • জন্ম ও পরিবার: তিনি ১৯৪৭ সালের ১ জানুয়ারি নরসিংদী জেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আবদুল মোমেন খান ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা (সচিব) এবং পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান সরকারের অত্যন্ত সফল খাদ্যমন্ত্রী। বাবার হাত ধরেই মূলত মঈন খানের রাজনীতিতে আগমন ঘটে।
    • উচ্চশিক্ষা: তিনি ঢাকার বিখ্যাত নটর ডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং সেখানের নামকরা ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স (University of Sussex) থেকে পদার্থবিজ্ঞান (Physics) বিষয়ে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে পিএইচডি (D.Phil) ডিগ্রি অর্জন করেন।

    ২. পেশাগত জীবন ও শিক্ষাবিদ ভূমিকা

    রাজনীতিতে সার্বক্ষণিকভাবে যুক্ত হওয়ার আগে ড. মঈন খান একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা ও বিজ্ঞান চর্চায় অবদান রাখেন।

    ৩. রাজনৈতিক কর্মজীবন ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

    তিনি নরসিংদী-২ (পলাশ) আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে একাধিকবার সংসদ সদস্য (MP) নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ১৩শ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি এই আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো পালন করেছেন:

    • সফল মন্ত্রী (বিভিন্ন মেয়াদে): ১৯৯৩-১৯৯৬ মেয়াদে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারে তিনি পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০০১-২০০২ মেয়াদে তথ্যমন্ত্রী এবং ২০০২-২০০৬ মেয়াদে দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আধুনিকায়নে নবগঠিত বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
    • বিএনপির কূটনৈতিক উইং পরিচালনা: ড. মঈন খান বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশী কূটনীতিকদের সাথে দলের নীতি ও আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করতে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছেন।
    • দলের দুঃসময়ের কাণ্ডারি ও স্থায়ী কমিটির সদস্য: ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটি’র সদস্য মনোনীত হন। গত দেড় দশকে বিএনপির রাজপথের আন্দোলন এবং দলের বৈরী পরিস্থিতিতে তিনি সবসময় সামনের সারিতে থেকে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

    ড. আবদুল মঈন খানকে বিএনপির একজন অত্যন্ত সৎ ও প্রজ্ঞাবান ‘ক্লিন ইমেজ’ বা পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। রাষ্ট্রপতি পদের পাশাপাশি নতুন সরকারের সংসদীয় স্পিকার হিসেবেও তার নাম দলের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। তার সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে উইকিপিডিয়া দেখতে পারেন।

    নজরুল ইসলাম খান

    নজরুল ইসলাম খান বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৃণমূল ও শ্রমিক আন্দোলন থেকে উঠে আসা একজন অত্যন্ত ত্যাগী, বিশ্বস্ত এবং প্রবীণ রাজনীতিবিদ। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম সিনিয়র সদস্য। বর্তমানে দেশের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে তিনি সরকারের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন।

    সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর বিএনপির পক্ষ থেকে পরবর্তী ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদের তালিকায় তার নামটিও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।

    তার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

    ১. পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড ও আদি নিবাস

    • জন্ম ও পরিবার: নজরুল ইসলাম খান জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলার কুলকান্দি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
    • জীবনধারা: তিনি দলের ভেতর ও বাইরে অত্যন্ত সহজ-সরল, সাদামাটা জীবনযাপন এবং সুদৃঢ় দেশপ্রেমের জন্য ‘সাদামাটা ক্লিন ইমেজ’-এর নেতা হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত।

    ২. শ্রমিক রাজনীতি ও অধিকার আদায়ে ভূমিকা

    অন্যান্য অনেক শীর্ষ নেতার মতো তিনি উচ্চ প্রশাসনিক বা পারিবারিকভাবে রাজনীতিতে আসেননি, বরং তার উত্থান সরাসরি মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে:

    • শ্রমিক দল গঠন: তিনি বিএনপির অন্যতম প্রধান অঙ্গ সংগঠন ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল’-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশে শ্রমিকবান্ধব শিল্প পরিবেশ ও শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি আদায়ে তার অবদান অনস্বীকার্য।
    • আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিনিধিত্ব (ILO): আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) সহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ফোরামে তিনি বাংলাদেশের শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অধিকারের পক্ষে অত্যন্ত সফলভাবে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

    ৩. বিএনপির রাজনীতি ও সর্বোচ্চ বিশ্বস্ততা

    তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই দলের আদর্শের সাথে যুক্ত। দলের প্রতিটি দুঃসময়ে তার ভূমিকা ছিল অনন্য:

    • স্থায়ী কমিটির সদস্য: দলের প্রতি অবিচল আনুগত্য এবং সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তাকে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটি’র সদস্য মনোনীত করা হয়।
    • নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান (২০২৬): ২০২৬ সালের ১৩শ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা ও সমন্বয় কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানতম দায়িত্ব পালন করেন। দেশজুড়ে দলীয় প্রার্থীদের সমন্বয় ও নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
    • সংস্কারের প্রবক্তা: বিএনপির বহুল আলোচিত রাষ্ট্র সংস্কারের ‘৩১ দফা’ রূপরেখা প্রণয়নে তিনি অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন।

    ৪. বর্তমান রাষ্ট্রীয় ভূমিকা (২০২৬)

    ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অন্যতম প্রধান সহযোদ্ধা হিসেবে তিনি কাজ করছেন:

    • প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা: তিনি বর্তমানে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং একই সাথে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণী ভূমিকা রাখছেন।
    • কূটনৈতিক সমন্বয়: দলের সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের সময় রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন বিদেশী কূটনীতিকদের আগমন এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া তদারকির পুরো ব্যবস্থাটি তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেন।

    নজরুল ইসলাম খানকে বিএনপির রাজনীতির অন্যতম ‘সংকটের কাণ্ডারি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সাথে গভীর সংযোগের কারণে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার নাম রাজনৈতিক মহলে বেশ প্রশংসিত হচ্ছে। তার জীবনী সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে উইকিপিডিয়া দেখতে পারেন।

    অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বনাম দলীয় বলয়ের সমীকরণ

    যদিও রাজনৈতিক মহলে প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে ড. নাসিমুল গনি (বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব) এবং নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী হিসেবে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ্-র নাম আলোচনায় ভেসে উঠেছে; তবে দলীয় দায়িত্বশীল সূত্রসমূহ নিশ্চিত করেছে যে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে একজন পোড় খাওয়া ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেশি পছন্দ করছেন বিএনপি প্রধান তারেক রহমান।

    নির্বাচন প্রক্রিয়া ও সাংবিধানিক পথরেখা

    সংবিধান অনুযায়ী সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের অভিভাবক বেছে নেওয়ার আইনি ধাপগুলো নিম্নরূপ:

    ┌─────────────────────────────────────────────────────────────────────────┐
    │                      রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ধাপসমূহ                      │
    ├─────────────────────────────────────────────────────────────────────────┤
    │ ১. দলীয় সর্বোচ্চ ফোরামে (স্থায়ী কমিটি) আলোচনা ও মতামত সংগ্রহ           │
    │ ─────────────────────────────────────────────────────────────────────── │
    │ ২. প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি প্রধান তারেক রহমান কর্তৃক চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাই   │
    │ ─────────────────────────────────────────────────────────────────────── │
    │ ৩. নির্বাচন কমিশন (EC) কর্তৃক তফসিল ঘোষণা ও মনোনয়নপত্র দাখিল           │
    │ ─────────────────────────────────────────────────────────────────────── │
    │ ৪. সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের খোলা/গোপন ব্যালটে ভোট গ্রহণ │
    └─────────────────────────────────────────────────────────────────────────┘
    
    1. চূড়ান্ত সংকেত: বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্পষ্ট করেছেন যে, স্থায়ী কমিটির মতামত এবং সংসদীয় দলের সম্মতি নিয়ে মূল প্রার্থীর নাম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই চূড়ান্ত করে ঘোষণা করবেন।
    2. সংসদে ভোটাভুটি: যেহেতু বিএনপি একক দল হিসেবে ১৩তম জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে জয় লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতায় রয়েছে, তাই দলের মনোনীত প্রার্থীই কার্যত জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণ করবেন।

    পরিশেষ: পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নতুন রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সর্বজনগ্রাহ্য রাষ্ট্রনৈতিক ব্যক্তিত্ব অথবা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিশ্বমানের একাডেমিক অভিজ্ঞতা—এই দুজনের মধ্য থেকেই কেউ একজন হতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। সেপ্টেম্বর সেশনেই মিলবে বঙ্গভবনের নতুন অধ্যায়ের চূড়ান্ত উত্তর।

    বিএনপি রাজনীতি

    নিউজ ডেস্ক

    July 24, 2026

    শেয়ার করুন

    বিশেষ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

    পর্যালোচনায়: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

    একটি রাজনৈতিক দলের দীর্ঘপথচলায় সময়ের সাথে সাথে তার নীতিনির্ধারণী ফোরাম, প্রচারকৌশল, মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট এবং গভর্নেন্স মডেলের ধরনে রূপান্তর আসা অত্যন্ত স্বাভাবিক। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় বহুল আলোচিত একটি রাজনৈতিক কোলাজকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র দুই শীর্ষ অধ্যায়ের দুই ভিন্ন ঘরানার “সহায়ক” বা অনুসারীদের চিত্র সামনে এসেছে।

    একদিকে রয়েছেন প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির ধারক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, অন্যদিকে আধুনিক যোগাযোগ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সময়োপযোগী নীতি-কৌশলে চালিত নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান

    এই দুই সময়ে দলের বার্তা পৌঁছে দেওয়া, রাষ্ট্রীয় নীতি তৈরি এবং সাইবার স্পেসে ‘জনমত’ বা ‘ন্যারেটিভ’ গঠনে যাদের ভূমিকা দেখা গেছে—তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড ও প্রভাব বিশ্লেষণ করলে একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতির কৌশলগত বিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

    ১. বেগম খালেদা জিয়ার আমল: ঝানু রাজনীতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মেধার আধিপত্য

    বেগম খালেদা জিয়ার নীতিনির্ধারণী ফোরামে (স্থায়ী কমিটি বা উপদেষ্টা পরিষদ) মূলত মাঠপর্যায়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রাজনীতিক, প্রথিতযশা আইনজ্ঞ, আন্তর্জাতিক মানের অর্থনীতিবিদ এবং সাবেক উচ্চপদস্থ আমলাদের প্রাধান্য ছিল:

    • এম সাইফুর রহমান (অর্থনীতি ও উন্নয়ন): চার্টার্ড একাউন্টেন্ট (FCA) এবং দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিবার বাজেট পেশকারী অর্থমন্ত্রী। ১৯৯২ সালে ভ্যাট (VAT) প্রবর্তন ও ফ্লোটিং এক্সচেঞ্জ রেট চালুর মাধ্যমে মুক্তবাজার অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপনে তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক।
    • ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ (আইন ও কূটনৈতিক কৌশল): যুক্তরাজ্যের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করা প্রবীণ রাজনীতিবীদ। আইনি লড়াই, সংবিধান ব্যাখ্যা এবং রাজনৈতিক জটিলতা সামলাতে তিনি ছিলেন দলের অন্যতম প্রধান ভরসা।
    • এম কে আনোয়ার (আমলাতন্ত্র ও প্রশাসন): সিভিল সার্ভিসের সাবেক ক্যাবিনেট সেক্রেটারি (মন্ত্রিপরিষদ সচিব)। প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসনে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বিএনপি সরকারের মূল শক্তি ছিল।
    • ড. ওসমান ফারুক (আন্তর্জাতিক অর্থনীতি): যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি এবং বিশ্বব্যাংকের সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। খালেদা জিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
    • ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও তরিকুল ইসলাম: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক (মোশাররফ) এবং তৃণমূলের রাজপথ থেকে উঠে আসা পরীক্ষিত জননেতা (তরিকুল)।

    কৌশলের মূল ভিত্তি: এই আমলের রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা, সংসদীয় বিতর্ক, ফাইলভিত্তিক নীতি-নির্ধারণ, প্রথাগত আন্তর্জাতিক ডিপ্লোমেসি এবং রাজপথের সরাসরি আন্দোলন।

    ২. তারেক রহমানের আমল: ডিজিটাল ন্যারেটিভ বনাম রাষ্ট্র পরিচালন কৌশল

    তারেক রহমানের আমলকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করে দেখতে হয়—একদিকে বিগত রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় সাইবার স্পেসে গড়ে ওঠা বিকল্প মিডিয়া যোদ্ধা, অন্যদিকে নতুন সরকারে গঠিত আধুনিক ও দক্ষ উপদেষ্টামণ্ডলী।

    ক. সাইবার স্পেস ও বিকল্প ন্যারেটিভ মেকারস:

    সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবিতে যাদের প্রতীকী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, তারা দলের প্রাতিষ্ঠানিক পদে না থাকলেও প্রতিকূল সময়ে সাইবার স্পেসে বিরোধী রাজনৈতিক জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছেন:

    • পিনাকী ভট্টাচার্য (লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক): ফ্রান্সে অবস্থান করে সোশ্যাল মিডিয়ায় কন্টেন্ট তৈরির মাধ্যমে নিয়মিত অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট ন্যারেটিভ তৈরি ও তরুণসমাজকে প্রভাবিত করেছেন।
    • ইলিয়াস হোসেন (সাবেক সাংবাদিক ও ভ্লগার): ডিজিটাল মিডিয়ার ইনভেস্টিগেটিভ ভিডিওর মাধ্যমে বিকল্প তথ্য প্রবাসীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

    খ. তারেক রহমানের সরকারি উপদেষ্টামণ্ডলী ও নীতি-প্রণেতা (২০২৬):

    ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকারে তারেক রহমান প্রথাগত রাজনীতিবিদ, প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, আমলা ও তরুণ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে অত্যন্ত ব্যালেন্সড এক উপদেষ্টামণ্ডলী গঠন করেন:

    1. রাজনৈতিক প্রজ্ঞা: মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম খান এবং রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ (রাজনৈতিক উপদেষ্টা)।
    2. প্রশাসনিক সুশাসন: মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ (জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা)।
    3. ম্যাক্রো-ইকোনমি সংস্কার: অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর (অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়)।
    4. তরুণ ও টেকনোক্র্যাট ব্রেইনস (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা): হুমায়ুন কবির (পররাষ্ট্র, দুর্যোগ ও বিমান), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামসুল ইসলাম (প্রতিরক্ষা), ডা. জাহেদ উর রহমান (পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি), মাহদী আমিন (শিক্ষা ও প্রবাসী কল্যাণ) এবং রেহান আসিফ আসাম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আইসিটি)।

    কৌশলের মূল ভিত্তি: আধুনিক ডাটা-ড্রিভেন পলিসি, আইসিটি ও টেকনোলজির সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা, দ্রুত তথ্য প্রচার (Information War) এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি ‘ন্যারেটিভ কন্ট্রোল’ বজায় রাখা।

    ৩. দুই পদ্ধতির তুলনামূলক চিত্র

    বৈশিষ্ট্যবেগম খালেদা জিয়ার আমলতারেক রহমানের আমল
    মূল থিংক-ট্যাংক/সহায়কপ্রজ্ঞাবান প্রবীণ রাজনীতিবিদ, আমলা ও আইনি বিশেষজ্ঞপ্রবীণদের রাজনীতির পাশাপাশি তরুন টেকনোক্র্যাট ও নীতি-বিশেষজ্ঞ
    প্রচার ও মতামত গঠনপ্রেস কনফারেন্স, সংসদীয় বিতর্ক ও জাতীয় সংবাদপত্রইউটিউব, ফেসবুক লাইভ, ভ্লগ, ডিজিটাল অ্যালগরিদম ও ইনফ্লুয়েন্সার
    রণক্ষেত্রজাতীয় সংসদ ও রাজপথের সরাসরি আন্দোলনপ্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সচিবালয় ও সাইবার স্পেসের ‘ইনফরমেশন ওয়ার’
    কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি‘ইনস্টিটিউশনাল থিংক-ট্যাংক’ নির্ভর প্রথাগত রাষ্ট্র পরিচালনা‘স্মার্ট গভর্নেন্স’ ও আধুনিক ‘ন্যারেটিভ কন্ট্রোল’ এর সমবায়

    ৪. মেধার বিবর্তন নাকি সময়ের দাবি? (বিশ্লেষণাত্মক মূল্যায়ন)

    রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি রাজনীতির এই বিবর্তনকে দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়:

    1. সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গি: একটি প্রথাগত বড় রাজনৈতিক দল যখন রাজপথের প্রবীণ রাজনীতিবিদদের অর্জিত প্রজ্ঞার চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার তাৎক্ষণিক ইনফ্লুয়েন্সার বা ডিজিটাল প্রচারণায় বেশি প্রভাব লক্ষ্য করে, তখন দলের কাঠামোগত গভীরতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
    2. সমর্থকদের দৃষ্টিভঙ্গি: আধুনিক বিশ্বরাজনীতি এখন সম্পূর্ণ মিডিয়া ও ডাটা-ভিত্তিক। মূলধারার মাধ্যম সংকুচিত হলে যেমন বিকল্প ইনফ্লুয়েন্সারদের গুরুত্ব বাড়ে, তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ড. তিতুমীর বা মাহদী আমিনের মতো আধুনিক বিশ্বমানের স্কলারদের যুক্ত করে তারেক রহমান প্রমান করেছেন যে বিএনপি প্রথাগত এনালগ যুগ থেকে ডিজিটাল যুগের উপযোগী একটি স্মার্ট রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

    উপসংহার: সংক্ষেপে বলতে গেলে, বেগম খালেদা জিয়ার আমলটি ছিল “ইনস্টিটিউশনাল অ্যানালগ থিংক-ট্যাংক” কেন্দ্রিক, আর তারেক রহমানের বর্তমান অধ্যায়টি হলো “স্মার্ট গভর্নেন্স ও ডিজিটাল ন্যারেটিভ মেকিং”-এর অনন্য মিশ্রণ। এটি কেবল নেতৃত্ব বা ব্যক্তি পছন্দের পার্থক্য নয়, বরং সময়ের সাথে বদলে যাওয়া বৈশ্বিক রাজনৈতিক যোগাযোগ ও শাসনব্যবস্থার এক অনিবার্য বাস্তবতা।

    পদ্মা সেতু

    নিউজ ডেস্ক

    July 24, 2026

    শেয়ার করুন

    বিশেষ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও ইকোনমিক রিপোর্ট

    প্রতিনিধি/বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

    বাংলাদেশের মেগা প্রজেক্টগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও প্রযুক্তিগতভাবে জটিল প্রকল্প হলো পদ্মা বহুমুখী সেতু এবং এর সাথে যুক্ত পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প (PBRLP)। এটি কেবল নদীর এপার-ওপারকে যুক্ত করেনি, বরং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলাকে যুক্ত করে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক রূপান্তর এনেছে।

    ১. উচ্চ বাজেট: কেন এই বিপুল ব্যয়?

    পদ্মা সেতুর চূড়ান্ত নির্মাণ ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০,৭৭০ কোটি টাকা (৩.০৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি)। প্রাথমিক অনুমানের তুলনায় ব্যয়ের বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো:

    • নকশায় যুগান্তকারী পরিবর্তন: শুরুতে শুধু একক স্তরের সড়ক সেতুর পরিকল্পনা থাকলেও পরবর্তীতে এটিকে দ্বিতল বিশিষ্ট (উপরে ৪ লেনের সড়ক এবং নিচে সিঙ্গেল ট্র্যাকিং রেল) বহুমুখী সেতুতে রূপান্তর করা হয়।
    • বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নদীশাসন: খরস্রোতা প্রমত্তা পদ্মার দিক পরিবর্তন ও তীব্র ভাঙন সামলাতে প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলার শুধু নদীশাসন ও তীর প্রতিরক্ষায় খরচ করা হয়েছে।
    • ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও বিলম্ব: বিশ্বব্যাংক সংক্রান্ত জটিলতা ও কোভিডের কারণে সময়ক্ষেপণ হওয়ায় ঠিকাদারি খরচ এবং বৈদেশিক মুদ্রার হারের পার্থক্যে বাজেট বৃদ্ধি পায়।

    ২. কারিগরি প্রকৌশল ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিস্ময়

    বিশ্বজুড়ে পদ্মা সেতু সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক অনন্য দলিল হিসেবে গণ্য হয়:

    • গভীরতম পাইলিং (১২৭ মিটার): নদীর তলদেশের নরম মাটির দরুন মাটির নিচে সর্বোচ্চ ১২৭ থেকে ১২৮ মিটার (প্রায় ৪১৭ ফুট) পর্যন্ত স্টিলের টিউবুলার পাইল ঢুকানো হয়েছে, যা বিশ্বের যেকোনো সেতুর জন্য গভীরতম পাইলিংয়ের রেকর্ড।
    • ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিং: রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সামলাতে পিলার ও স্প্যানের মাঝে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও আধুনিক ‘ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিং’ বসানো হয়েছে।
    • ইউটিলিটি সংযোগ: সেতুর নিচের ডেকে রেললাইনের সাথে ৭৬০ মিমি ব্যাসের উচ্চচাপ সম্পন্ন গ্যাস পাইপলাইন, ফাইবার অপটিক cables এবং ৪০০ কেভির পাওয়ার ট্রান্সমিশন লাইন যুক্ত রয়েছে।
    ┌─────────────────────────────────────────────────────────────────────────┐
    │                        পদ্মা সেতুর কারিগরি প্রোফাইল                      │
    ├─────────────────────────┬───────────────────────────────────────────────┤
    │ মূল সেতুর দৈর্ঘ্য      │ ৬.১৫ কিমি (ভায়াডাক্টসহ মোট ৯.৮৩ কিমি)         │
    │ কাঠামো                  │ দ্বিতল (Upper: ৪-লেন সড়ক, Lower: রেললাইন)     │
    │ পিলার ও স্প্যান          │ ৪২টি পিলার, ৪১টি ট্রাস স্প্যান (১৫০ মিটার প্রতিটি)│
    │ সর্বোচ্চ পাইলিং গভীরতা  │ ১২৭-১২৮ মিটার (বিশ্ব রেকর্ড)                 │
    └─────────────────────────┴───────────────────────────────────────────────┘
    

    ৩. পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প (PBRLP)

    ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটারের নতুন রেলপথ নির্মাণ বাংলাদেশের রেলের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও ব্যয়বহুল (প্রায় ৩৯,২৪৭ কোটি টাকা) প্রকল্প।

    • ব্যালাস্টলেস বা পাথরবিহীন ট্র্যাক: দেশে প্রথমবারের মতো সেতুর উপর ও ভায়াডাক্টে ঝাঁকুনিমুক্ত ও শব্দহীন পাথরবিহীন রেললাইন (Ballastless Track) ব্যবহার করা হয়েছে।
    • ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি: ঘণ্টায় ১২০ থেকে ১৩০ কিলোমিটারের গতিতে ট্রেন চলাচলের উপযোগী করে ব্রডগেজ ট্র্যাক তৈরি করা হয়েছে।
    • স্টেশন নেটওয়ার্ক (২০টি স্টেশন): ঢাকা (কমলাপুর) থেকে যশোর পর্যন্ত বিস্তৃত রুটটিতে ১৪টি নতুন ও ৬টি আধুনিকায়িত জংশন রয়েছে।

    ঢাকা-যশোর রুটের প্রধান স্টেশনসমূহ:

    ঢাকা (কমলাপুর)গেন্ডারিয়াকেরানীগঞ্জনিমতলাশ্রীনগরমাওয়াজাজিরাপদ্মা (শিবচর)ভাঙ্গা জংশনকাশিয়ানীনড়াইলসিঙ্গিয়া জংশন (যশোর)

    স্টেশন সুবিধা: শারীরিকভাবে অক্ষমদের জন্য লিফট/র‍্যাম্প, মেটাল শেডসহ সেম-লেভেল প্ল্যাটফর্ম, এসসি ওয়েটিং লাউঞ্জ, ব্রেস্টফিডিং কর্নার এবং দুর্ঘটনা এড়াতে কম্পিউটার-ভিত্তিক ‘রিলে ইন্টারলকড’ সিগন্যালিং সিস্টেম।

    ৪. অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্বনির্ভরতার সফল মডেল

    ┌─────────────────────────┐     ┌─────────────────────────┐     ┌─────────────────────────┐
    │  জিডিপিতে বৈপ্লবিক বৃদ্ধি │ ──► │  পণ্য পরিবহন ও লজিস্টিকস│ ──► │     টোল আয়ে স্বাবলম্বী   │
    │  জাতীয়: +১.২৩%        │     │  ১০+ ঘণ্টা সময় সাশ্রয়,   │     │  ৩,৪২৯+ কোটি টাকা রাজস্ব │
    │  আঞ্চলিক: +২.৫০%      │     │  কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত│     │  ১৬ কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ  │
    └─────────────────────────┘     └─────────────────────────┘     └─────────────────────────┘
    
    1. টোল রাজস্ব আদায়: উদ্বোধনের পর থেকে এ পর্যন্ত ৩,৪২৯ কোটি টাকার বেশি টোল আদায় হয়েছে। অর্জিত টাকা থেকে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (BBA) ইতোমধ্যে সরকার দেওয়া ঋণের ১৬টি কিস্তিতে ২,৫১৬ কোটি টাকা সফলভাবে পরিশোধ করেছে।
    2. দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান: পরিবহন সময় ১০ ঘণ্টার বেশি কমে যাওয়ায় যশোর-বরিশালের কৃষি ও মৎস্য পণ্য দ্রুত ঢাকায় পৌঁছে যাচ্ছে। এই রুটে নতুন ১৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দারিদ্র্যের হার প্রায় ১.০০% কমেছে।

    ৫. সহজে অনলাইনে টিকিট কাটার নির্দেশিকা

    পদ্মা সেতু রুটের ট্রেনের টিকিট এখন ঘরে বসেই কাটতে পারেন:

    1. প্লাটফর্ম লগ-ইন: eticket.railway.gov.bd ওয়েবসাইটে ঢুকুন অথবা ‘Rail Sheba’ মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন।
    2. স্টেশন নির্বাচন: ‘From’ এ Dhaka এবং ‘To’ এ আপনার গন্তব্য (যেমন: Bhanga, Jessore, Benapole) নির্বাচন করে যাত্রার তারিখ ও আসন শ্রেণী দিন।
    3. পেমেন্ট ও ই-টিকিট: বিকাশ, নগদ, রকেট বা যেকোনো ব্যাংক কার্ড দিয়ে মূল্য পরিশোধ করলে ই-টিকিট ইমেইলে ও স্ক্রিনে চলে আসবে। (কাউন্টার থেকে কাটতে চাইলে যাত্রীর NID সংগে থাকা বাধ্যতামূলক। অগ্রিম টিকিট ১০ দিন আগে পাওয়া যায়)।

    সারসংক্ষেপ: কারিগরি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও উচ্চ বাজেটের কারণে শুরুতে সমালোচনা হলেও—পদ্মা সেতু এবং এর রেল নেটওয়ার্ক আজ দৈনিক কোটি কোটি টাকার রাজস্ব এনে দিচ্ছে এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখে নিজের বিনিয়োগের শতভাগ সার্থকতা প্রমাণ করছে।

    ১১ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ