ইতিহাস
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ইনফোটেনমেন্ট ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ৩ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গতিপথ পরিবর্তনকারী এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যদি ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে নির্মমভাবে নিহত না হতেন, তবে আজকের বাংলাদেশের চেহারা কেমন হতো? তিনি যদি আরও ২০ থেকে ৩০ বছর (অর্থাৎ ২০০০ বা২০১০ সাল পর্যন্ত) রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকতেন, তবে কি বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ার ‘সিঙ্গাপুর’ বা ‘মালয়েশিয়া’ হতে পারত?

ইতিহাসের কোনো ‘যদি’ বা ‘তবে’র সুনির্দিষ্ট উত্তর হয় না। তবে একজন রাষ্ট্রনায়কের দূরদর্শিতা, তাঁর গৃহীত নীতি এবং সমসাময়িক বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে জিয়াউর রহমানের দীর্ঘস্থায়ী শাসনের একটি বাস্তবসম্মত এবং নির্মোহ রূপরেখা দাঁড় করানো সম্ভব।
আজকের বিশেষ ফিচারে আমরা আলোচনা করব জিয়ার দীর্ঘ শাসনামল বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজব্যবস্থায় কী ধরনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারত।

১. অর্থনৈতিক রূপান্তর: মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের কাতার?
অনেকেই জিয়াউর রহমানকে মালয়েশিয়ার আধুনিক রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ কিংবা সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ-এর সমকক্ষ মনে করেন। তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থিতিশীল অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটত—এ কথা অনস্বীকার্য।

- কৃষি বিপ্লব ও খাদ্য নিরাপত্তা: জিয়াউর রহমানের শুরু করা দেশব্যাপী ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ এবং গ্রামীণ অর্থনীতি-ভিত্তিক উৎপাদনশীলতা যদি আরও দুই দশক নিরবচ্ছিন্নভাবে চলত, তবে বাংলাদেশ আশির দশকের শেষেই খাদ্য উৎপাদনে সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করত। দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতিকে যেভাবে তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন, তার গতি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেত।
- শিল্পায়ন ও তৈরি পোশাক খাতের বিকাশ: বাংলাদেশে আজকের তৈরি পোশাক শিল্পের (RMG) ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির (ম্যানপাওয়ার এক্সপোর্ট) প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই। তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে আশির দশকেই দেশে ব্যাপক বেসরকারীকরণ ও শিল্পায়ন ঘটত। ফলে, ২০২৬ সালের আজকের বাংলাদেশ হয়তো জিডিপি ও মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের সমকক্ষ অবস্থানে থাকত।
২. সফল জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও মানবসম্পদ উন্নয়ন
জিয়াউর রহমানই প্রথম দূরদর্শিতার সাথে জনসংখ্যাকে বাংলাদেশের ‘এক নম্বর সমস্যা’ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর নির্দেশে শুরু হয়েছিল জন্মনিয়ন্ত্রণের এক মহা পরিকল্পনা।

এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা যদি আরও ২০ বছর কঠোরভাবে রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে বজায় থাকত, তবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা আজ ১৭-১৮ কোটির পরিবর্তে হয়তো ১২ থেকে ১৩ কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। জনসংখ্যাকে ‘জনস্ফীতি’ না বানিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের কারণে মাথাপিছু সম্পদের বণ্টন আরও উন্নত হতো এবং দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান ও মাথাপিছু আয় আজকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হতো। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে যে সাফল্য দেখিয়েছে, তার পুরো কৃতিত্বই এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার।
৩. পররাষ্ট্রনীতি: মুসলিম বিশ্ব ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘মিডল পাওয়ার’
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল আকাশচুম্বী। তিনি ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে গঠিত ওআইসি (OIC) মধ্যস্থতাকারী টিমের অন্যতম শীর্ষ নেতা ছিলেন। এছাড়া আল-কুদস কমিটিতে তাঁর অনবদ্য ভূমিকার কারণে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী নেতা ইয়াসির আরাফাত বারবার বাংলাদেশ সফর করেছিলেন।

তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে:
- সার্ক (SAARC) হতো আরও শক্তিশালী: জিয়াউর রহমানের মস্তিষ্কপ্রসূত ‘সার্ক’ দক্ষিণ এশিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্লকে পরিণত হতে পারত। এর ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্যে ভারতের একক আধিপত্যের ভারসাম্য বজায় থাকত।
- ভূ-রাজনৈতিক শক্তি: মুসলিম বিশ্ব, মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিমা ব্লকের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাত এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশ একটি ‘মিডল পাওয়ার’ বা মধ্যম শক্তির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতো।
৪. রাজনীতির উল্টো পিঠ: বহুদলীয় গণতন্ত্র বনাম পুনর্বাসন বিতর্ক

ইতিহাসের খতিয়ান যেমন জিয়াউর রহমানের অভাবনীয় সাফল্যকে স্বীকৃতি দেয়, তেমনি তাঁর কিছু নীতিকে ঘিরে ঐতিহাসিক বিতর্ককেও সামনে আনে। রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে এই বিষয়গুলোর প্রভাব আরও সুদূরপ্রসারী হতে পারত:
- ডানপন্থী রাজনীতির স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: একদলীয় শাসন বা বাকশাল ব্যবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করে ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’ চালু করা জিয়ার অন্যতম বড় রাজনৈতিক সাফল্য। তবে এই বহুদলীয় গণতন্ত্রের আড়ালে জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের মতো ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের যে প্রক্রিয়া তিনি শুরু করেছিলেন, তা অনেকেই ‘চাঁদের কলঙ্কের’ মতো দাগ হিসেবে দেখেন। তিনি আরও ২০-৩০ বছর ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডানপন্থী ও ধর্মীয় মেরুকরণের শিকড় আরও গভীরে প্রবেশ করত।
- সামরিকায়িত বেসামরিক শাসন ও ভিন্নমত দমন: জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিল—তিনি ক্ষমতায় থাকার জন্য অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সহজে সহ্য করতেন না। তাঁর ৫ বছরের শাসনামলেই প্রায় ২০টির মতো ছোট-বড় সামরিক অভ্যুত্থান (Coup) হয়েছিল এবং তা দমনে বহু সেনা সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে হয়তো দেশ সম্পূর্ণ একটি “সামরিকায়িত বেসামরিক শাসনে” (Militarized Civilian Rule) রূপ নিত, যেখানে বাকস্বাধীনতা বা উদার গণতান্ত্রিক স্পেস সংকুচিত থাকত।
৫. দুর্নীতিমুক্ত শীর্ষ নেতৃত্ব বনাম প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতন্ত্র

ব্যক্তিগতভাবে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ নেই। তাঁর সততা, সাধারণ জীবনযাপন এবং ছেঁড়া গেঞ্জি ও ভাঙা সুটকেসের গল্প সর্বজনবিদিত। বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি এবং বিরোধী দলীয় নেতাদের মধ্যে আর্থিক দুর্নীতি চরম আকার ধারণ করলেও জিয়ার ব্যক্তিগত সততা আজও অনুকরণীয়।
তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে হয়তো রাষ্ট্রীয় শীর্ষ পর্যায়ে আর্থিক দুর্নীতি আজকের মতো এতটা নজিরবিহীন ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেত না। তবে, দীর্ঘস্থায়ী এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনে নিচের দিকের আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক সুবিধাভোগী শ্রেণীর মধ্যে এক ধরণের ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা তোষামোদের অর্থনীতি গড়ে ওঠার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বাংলাদেশের গঠনে ও উন্নয়নে জিয়াউর রহমানের প্রধান অবদানসমূহ:
জিয়াউর রহমান মাত্র ৫ বছর (১৯৭৬-১৯৮১) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। এই স্বল্প সময়ে তিনি যেসমস্ত যুগান্তকারী অবদান রেখে গেছেন, তা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
১. অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও মুক্তবাজার অর্থনীতি
- বেসরকারীকরণ: স্বাধীনতার পর দেশের সিংহভাগ শিল্পকারখানা রাষ্ট্রীয়করণ (Nationalized) করা হয়েছিল, যার ফলে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছিল। জিয়াউর রহমান এসে প্রথম মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু করেন এবং বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করেন।
- তৈরি পোশাক শিল্প (RMG): বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের লাইসেন্স ও বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রথম তাঁর সময়েই দেওয়া হয়। ‘দেশ গার্মেন্টস’-এর মাধ্যমে এই খাতের সূচনা তাঁর হাত ধরেই হয়েছিল।
- জনশক্তি রপ্তানি: মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে বাংলাদেশী শ্রমিক পাঠানোর আনুষ্ঠানিক ও সরকারি প্রক্রিয়া তিনি শুরু করেন, যা আজ আমাদের রেমিট্যান্সের মূল ভিত্তি।
২. কৃষি বিপ্লব ও স্বনির্ভরতা (খাল কাটা কর্মসূচি)
- দেশব্যাপী খাল কাটা: কৃষিতে সেচ সুবিধা পৌঁছানোর জন্য তিনি নিজে কোদাল হাতে নিয়ে সারা দেশে “খাল কাটা কর্মসূচি” শুরু করেছিলেন। এর মাধ্যমে হাজার হাজার মাইল খাল খনন ও পুনর্খনন করা হয়, যা দেশের খাদ্য উৎপাদন হুটকরে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
- গ্রাম সরকার ও পল্লি বিদ্যুৎ: গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে তিনি ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা এবং গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার জন্য ‘পল্লি বিদ্যুতায়ন বোর্ড’ (REB) গঠন করেন।
৩. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে ‘এক নম্বর সমস্যা’ ঘোষণা
- স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল আশঙ্কাজনক। জিয়াউর রহমান দূরদর্শিতার সাথে জনসংখ্যাকে দেশের ১ নম্বর সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করেন।
- তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবার পরিকল্পনার সামগ্রী ও সচেতনতা ছড়ানোর জন্য হাজার হাজার নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করেন। আজ মুসলিম বিশ্বের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের যে অভাবনীয় সাফল্য, তার মূল ভিত্তি এটিই।
৪. পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি
- সার্ক (SAARC) প্রতিষ্ঠা: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য সার্ক গঠনের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা এবং উদ্যোক্তা ছিলেন জিয়াউর রহমান।
- মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক: সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যুক্তকরণ এবং ওআইসি (OIC)-তে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান, যা পূর্বে অত্যন্ত শীতল ছিল।
- জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশ: তাঁর সফল কূটনীতির ফলেই বাংলাদেশ ১৯৭৯ সালে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের (UN Security Council) অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল।
৫. জাতীয়তাবাদ ও বহুদলীয় গণতন্ত্র
- বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ: তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের ভূখণ্ডের সব মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর তত্ত্ব দেন, যা দেশের সার্বভৌমত্বকে এক নতুন পরিচয় দেয়।
- বহুদলীয় গণতন্ত্র: ১৯৭৫ সালের একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) বিলুপ্ত করে তিনি দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন এবং সব রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি করার অধিকার দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেন।
চূড়ান্ত মূল্যায়ন
সব মিলিয়ে বলা যায়, জিয়াউর রহমান যদি আরও ২০-৩০ বছর বেঁচে থেকে দেশ শাসন করতে পারতেন, তবে আজকের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত দিক থেকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, উন্নত ও সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রে পরিণত হতো—এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এর বিনিময়ে রাষ্ট্রকে হয়তো রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, বাকস্বাধীনতা এবং উদার পশ্চিমা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কিছুটা আপস করতে হতো। সহজ কথায়, আজকের বাংলাদেশ হয়তো দেখতে অনেকটা মাহাথিরের মালয়েশিয়া কিংবা আধুনিক ভিয়েতনামের মতো—একটি নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি হতো।
আপনার মতামত জানান:
জিয়াউর রহমান দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে আজকের বাংলাদেশ কেমন হতো বলে আপনি মনে করেন? আপনার মূল্যবান মতামত নিচে কমেন্ট করে জানান।
দেশ-বিদেশের রাজনীতি, ইতিহাস এবং সমসাময়িক বিষয়ের গভীর ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণমূলক কন্টেন্ট নিয়মিত পড়তে বুকমার্ক করে রাখুন আপনার পছন্দের তথ্যমাধ্যম পালস বাংলাদেশ | Pulse Bangladesh।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
রাজনৈতিক বিশ্লেষক | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ৩ জুন ২০২৬
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন দীর্ঘ ১৫ বছর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা। তাঁর এই আকস্মিক বিদায়ের পর থেকে দেশের রাজনৈতিক মহলে এবং সাধারণ মানুষের মনে একটি বড় প্রশ্ন প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছে—শেখ হাসিনা কি কখনো আবার বাংলাদেশে ফিরে আসবেন?
ইতিহাসের চাকা এবং আইনি বাস্তবতার দিকে তাকালে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা খুব একটা কঠিন নয়। বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নজির, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) ভূমিকা এবং বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা কতটা ক্ষীণ, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১. স্বৈরশাসকদের দেশ ছেড়ে পালানোর বৈশ্বিক নজির

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তীব্র গণ-আন্দোলন, বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে স্বৈরশাসকদের দেশ ছেড়ে পালানোর দীর্ঘ ঐতিহাসিক নজির রয়েছে। ইতিহাসে দেখা যায়, জনরোষের মুখে প্রাণ বাঁচাতে কিংবা বিচারের হাত থেকে বাঁচতে তারা সাধারণত নিরাপদ আশ্রয়, বন্ধুভাবাপন্ন দেশ বা প্রবাসে নির্বাসনে চলে যান।
বিশ্বের অন্যতম আলোচিত কয়েকজন ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসকের দেশত্যাগের ঘটনা নিচে দেওয়া হলো:
- ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভি: ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর তিনি আর কখনো ইরানে ফিরতে পারেননি, প্রবাসেই তাঁর মৃত্যু হয়।

- ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোস: ১৯৮৬ সালে ‘পিপল পাওয়ার রেভোলিউশন’-এর মুখে দেশ ছেড়ে হাওয়াই দ্বীপে আশ্রয় নেন। তিনিও জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরতে পারেননি। (যদিও কয়েক দশক পর তাঁর ছেলে ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু মার্কোস নিজে ফিরতে পারেননি)।

- তিউনিসিয়ার জিনে আল-আবেদিন বেন আলী: ২০১১ সালের আরব বসন্তের মুখে দেশ ছেড়ে সৌদি আরবে পালিয়ে যান এবং সেখানেই নির্বাসিত অবস্থায় মারা যান।
- শেখ হাসিনা (বাংলাদেশ, ২০২৪): ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে তীব্র ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সামরিক হেলিকপ্টারে গোপনে দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন।
- গোটাভায়া রাজাপাকসে (শ্রীলঙ্কা, ২০২২): ব্যাপক অর্থনৈতিক সংকট ও তীব্র গণবিক্ষোভের মুখে ২০২২ সালের জুলাই মাসে বিক্ষোভকারীরা তার সরকারি বাসভবনে ঢুকে পড়ে। এরপর তিনি প্রথমে মালদ্বীপে ও পরে সিঙ্গাপুরে পালিয়ে যান।
- পারভেজ মোশাররফ (পাকিস্তান, ২০০৮): রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৯৯ সালে ক্ষমতা দখল করা এই সামরিক শাসক ২০০৮ সালে অভিশংসন ও ব্যাপক চাপের মুখে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তিনি স্বেচ্ছায় নির্বাসনে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (দুবাই) চলে যান।
- জিনে এল আবিদিন বেন আলী (তিউনিসিয়া, ২০১১): ‘আরব বসন্ত’ নামে পরিচিত গণ-আন্দোলনের মুখে ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি তিউনিসিয়ার ২৩ বছরের স্বৈরশাসক বেন আলী ক্ষমতাচ্যুত হন এবং সৌদি আরবে পালিয়ে যান। সেখানেই ২০১৯ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
- হোসনি মুবারক (মিশর, ২০১১): আরব বসন্তের জের ধরে ২০১১ সালের শুরুতে মিশরে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। দীর্ঘ ৩০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন এবং পরে গ্রেপ্তার ও বিচারের সম্মুখীন হন।
- ইদি আমিন (উগান্ডা, ১৯৭৯): উগান্ডার এই সামরিক একনায়ক ১৯৭৯ সালে উগান্ডা-তাঞ্জানিয়া যুদ্ধের সময় রাজধানী কাম্পালার পতন হলে দেশ ছেড়ে প্রথমে লিবিয়া এবং পরবর্তীতে সৌদি আরবে পালিয়ে যান।
- ফার্ডিন্যান্ড মার্কোস (ফিলিপাইন, ১৯৮৬): ফিলিপাইনে রক্তক্ষয়ী ‘পিপল পাওয়ার’ বিপ্লবের মুখে ১৯৮৬ সালে মার্কোস ক্ষমতাচ্যুত হন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় সপরিবারে দেশ থেকে পালিয়ে হাওয়াইয়ে নির্বাসনে যান।
- মোহাম্মদ রেজা পাহলভি (ইরান, ১৯৭৯): ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মুখে ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি প্রথমে মিশর, মরক্কো, বাহামা ও মেক্সিকো ঘুরে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন এবং ১৯৮০ সালে কায়রোতে মারা যান। পালিয়ে যাওয়া অনেক স্বৈরশাসকের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভিন্ন চিত্রও দেখা যায়। আন্দোলনের মুখে অনেকে দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেও পরবর্তীতে নিজ দেশে ফেরত এসে বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। আবার কেউ কেউ সারা জীবন প্রবাসেই নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন।
ইতিহাস বলে, ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে যাওয়া শাসকরা তখনই দেশে ফেরার সাহস পান, যখন দেশে তাঁদের রাজনৈতিক দল বা আদর্শ পুনরায় একচ্ছত্র ক্ষমতায় আসে। বর্তমান বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের যে রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটেছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে দলটির এককভাবে ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
২. আইনি বেড়াজাল: শতাধিক মামলা ও সম্ভাব্য সাজা

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে শতাধিক ফৌজদারি মামলা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সারা দেশে মোট ৬৬৩টি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৫৩টিই সরাসরি হত্যা মামলা।
ইতিমধ্যে কয়েকটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে তার মৃত্যুদণ্ডসহ দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের আদেশ এসেছে। পলাতক থাকায় এই বিচারিক প্রক্রিয়াগুলো তার অনুপস্থিতিতেই (In Absentia) সম্পন্ন হয়। [
প্রধান মামলার রায় ও সম্ভাব্য সাজাসমূহ

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সম্পন্ন হওয়া এবং চলমান প্রধান প্রধান মামলা ও সাজার বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
- মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা (মৃত্যুদণ্ড): ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান দমনে নির্বিচারে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে বাংলাদেশের বিশেষ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়।
- পূর্বাচল প্লট কেলেঙ্কারি মামলা (২১ বছরের কারাদণ্ড): দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা তিনটি পৃথক প্লট জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মামলায় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত শেখ হাসিনাকে সর্বমোট ২১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে।
- আদালত অবমাননা মামলা (৬ মাসের কারাদণ্ড): একটি গোপন অডিও রেকর্ডিং ফাঁসের জেরে—যেখানে তিনি বিচারব্যবস্থাকে উদ্দেশ্য করে অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন—পৃথক এক শুনানিতে ট্রাইব্যুনাল তাকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেয়।
- সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ: মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পাশাপাশি আদালত ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার লক্ষ্যে শেখ হাসিনার সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করারও নির্দেশ দেয়।
মামলার বর্তমান পরিস্থিতি ও আইনি সীমাবদ্ধতা
| আইনি দিক | বর্তমান অবস্থা ও প্রভাব |
|---|---|
| মোট মামলার সংখ্যা | সারা দেশে ৬৬৩টি মামলা (যার মধ্যে ৪৫৩টি হত্যা মামলা)। |
| আপিলের অধিকার | আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিধান অনুযায়ী, পলাতক আসামির আপিল করার কোনো সুযোগ নেই। আপিল করতে হলে তাকে অবশ্যই সশরীরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে। |
| প্রত্যর্পণ চ্যালেঞ্জ | শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করায় বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে The Hindu-র তথ্যমতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণ বা এক্সট্রাডিশনের প্রক্রিয়া শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে। |
| অন্যান্য তদন্ত | গুমের ঘটনা এবং ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আরও বেশ কয়েকটি মামলার তদন্তাধীন বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। |
আইনি বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হত্যা ও দুর্নীতির বিপুল মামলার কারণে তিনি এক নজিরবিহীন আইনি বেড়াজালে আবদ্ধ হয়েছেন। তার অনুপস্থিতিতে রায়গুলো কার্যকর করা না গেলেও, আন্তর্জাতিকভাবে তাকে ফেরত আনার কূটনৈতিক ও আইনি চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
৩. আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) ও বৈশ্বিক চাপ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে নির্বিচারে গণহত্যা এবং বিগত ১৫ বছরের গুম-খুনের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়া অভ্যন্তরীণ গণ্ডি পেরিয়ে এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর পর্যবেক্ষণে রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইনি চাপ ও বিচার প্রক্রিয়া মূলত দুটি ভিন্ন ধারায় অগ্রসর হচ্ছে: একটি হেগের মূল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) এবং অন্যটি বাংলাদেশের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT)।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) ও এ সংক্রান্ত বৈশ্বিক চাপের মূল বিষয়গুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICC) নালিশ ও তদন্ত
- ফরমাল কমপ্লেইন্ট বা অভিযোগ দায়ের: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে ১,৪০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু এবং নৃশংস বলপ্রয়োগের ঘটনাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করে বেশ কয়েকজন আন্তর্জাতিক আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী হেগের আইসিসি (ICC)-তে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পেশ করেছেন।
- রোম সনদের বাধ্যবাধকতা: বাংলাদেশ যেহেতু আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ‘রোম সনদে’ (Rome Statute) স্বাক্ষরকারী একটি দেশ, সেহেতু আইসিসি-র প্রসিকিউশন টিমের পক্ষে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া যেকোনো বড় ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রাথমিক তদন্ত করার একতিয়ার রয়েছে। [
- আইসিসি প্রতিনিধি দলের সফর: এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পরিস্থিতির গভীরতা এবং তথ্যপ্রমাণ যাচাই করতে আইসিসি (ICC)-র একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করেছে।
২. জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট ও বৈশ্বিক চাপ
- জাতিসংঘের ওএইচসিএইচআর (OHCHR) প্রতিবেদন: জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের (OHCHR) ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং দল ২০২৫ সালের শুরুতে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আন্দোলনকারীদের দমনে “নিষ্ঠুর ও পদ্ধতিগত দমনপীড়ন” চালানো হয়েছিল এবং নিরাপত্তা বাহিনী নির্বিচারে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
- আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভূমিকা: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল শুরু থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের জন্য তৎকালীন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়ে আসছে।
৩. অভ্যন্তরীণ ট্রাইব্যুনাল (ICT) বনাম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড
- গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি: বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) ইতিমধ্যে শেখ হাসিনাসহ তার মন্ত্রিসভার সদস্য ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।
- সুষ্ঠু বিচারের আন্তর্জাতিক চাপ: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) এবং অন্যান্য বৈশ্বিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে আসামিপক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ পায় এবং পুরো বিচার প্রক্রিয়াটি যেন রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও ফেয়ার ট্রায়াল (Fair Trial) মেনে সম্পন্ন হয়।
৪. কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও ভারতের ওপর চাপ
- প্রত্যর্পণ (Extradition) চুক্তি: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালের একটি অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইলে ভারতের ওপর দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক আইনি চাপ তৈরি হবে।
- ভারতের ভূ-রাজনৈতিক দ্বিধা: শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া ভারত এখন আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা এবং বাংলাদেশের সাথে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার এক বড় ধরনের টানাপোড়েনের মুখোমুখি।
আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, আইসিসি (ICC)-তে দায়ের হওয়া অভিযোগ এবং জাতিসংঘের ওএইচসিএইচআর (OHCHR) রিপোর্টের কারণে শেখ হাসিনার ওপর বৈশ্বিক চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি শুধু তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার আইনি লড়াইকেই বেগবান করছে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার রাজনৈতিক আশ্রয়ের পথকেও অত্যন্ত সংকুচিত করে তুলছে।
চূড়ান্ত মূল্যায়ন: প্রত্যাবর্তন কি একেবারেই অসম্ভব?
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন বা তাকে ফিরিয়ে আনা আইনি এবং ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার কারণে অত্যন্ত কঠিন হলেও, একে একেবারেই অসম্ভব বলা যায় না। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে ভারতের কাছে তার প্রত্যর্পণের জন্য আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
তার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা এবং প্রতিবন্ধকতাগুলোর একটি চূড়ান্ত মূল্যায়ন নিচে দেওয়া হলো:
১. কেন প্রত্যাবর্তন অসম্ভব নয় (অনুকূল উপাদানসমূহ)
- আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ: বাংলাদেশের নবনির্বাচিত বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক নোট ভার্বালের (Note Verbale) মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছে। মে ২০২৬-এ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ নিশ্চিত করেছেন যে, বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী তাকে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
- বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক চুক্তি: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালের একটি অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty) কার্যকর রয়েছে। এই চুক্তির ধারা অনুযায়ী, হত্যা বা গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো আসামি “রাজনৈতিক অপরাধের” অজুহাত দেখিয়ে পার পেতে পারেন না।
- মৃত্যুদণ্ডের রায় ও আইনি চাপ: বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) শেখ হাসিনাকে গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। এই রায়ের পর ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি এবং ভারতের ওপর আন্তর্জাতিক আইনি চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
- ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা (Realpolitik): বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সাথে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত, সীমান্ত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে ভারত সরকার একসময় শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে পারে, যা সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষির ওপর নির্ভরশীল।
২. প্রধান প্রধান আইনি ও রাজনৈতিক বাধা (কেন এটি কঠিন)
- ভারতের অভ্যন্তরীণ আইনি সুরক্ষাকবচ: চুক্তিতে একটি ধারা রয়েছে যে, যদি ভারত মনে করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো “ন্যায়বিচারের স্বার্থে বা সদ্বিশ্বাসে” করা হয়নি, কিংবা দেশে ফিরলে তিনি রাজনৈতিক নিপীড়ন বা পক্ষপাতমূলক বিচারের মুখোমুখি হবেন, তবে ভারত প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান বা দীর্ঘায়িত করতে পারে। বর্তমানে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MEA) অনুরোধটি দীর্ঘ আইনি পর্যালোচনার অধীনে রেখেছে।
- রাজনৈতিক আশ্রয়ের বিকল্প: শেখ হাসিনা যদি ভারত থেকে অন্য কোনো বন্ধুভাবাপন্ন দেশে (যেমন রাশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ) চলে যান, তবে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াটি আরও জটিল রূপ নেবে।
- ঐতিহাসিক মিত্রতা: ভারতের বর্তমান মোদি সরকারের জন্য শেখ হাসিনা দীর্ঘদিনের এক বিশ্বস্ত রাজনৈতিক মিত্র। তাকে সরাসরি বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনালের হাতে তুলে দেওয়া ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বিশ্বস্ততার ভাবমূর্তির জন্য একটি বড় ধাক্কা হতে পারে。
৩. স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা ও আইনি ঝুঁকি
সম্প্রতি শেখ হাসিনা নিজেই ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন যে, দেশে গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অধিকার ফিরে এলে তিনি “খুব শীঘ্রই” বাংলাদেশে ফিরবেন। তবে আইনি বিশ্লেষকদের মতে, তার এই রাজনৈতিক বক্তব্য বাস্তবে রূপ নেওয়া প্রায় অসম্ভব, কারণ:
- তার বিরুদ্ধে সক্রিয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।
- তিনি ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত এবং পলাতক থাকায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপিল করার সুযোগ হারিয়েছেন।
- ফলস্বরূপ, তিনি যদি স্বেচ্ছায় বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন, তবে বিমানবন্দরে পৌঁছানো মাত্রই তাকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার এবং কারাগারে প্রেরণ করা হবে।
সংক্ষেপে: শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিকভাবে ভারতের সদিচ্ছা এবং আইনিভাবে প্রত্যর্পণ চুক্তির ধারাগুলোর ব্যাখ্যার ওপর ঝুলে রয়েছে। তাই এটি রাতারাতি বা খুব সহজে সম্ভব না হলেও, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় ও কূটনৈতিক চাপের মুখে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রত্যাবর্তন একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না
আপনার মতামত কি?
আইনি ও রাজনৈতিক এই বাস্তবতার মুখে শেখ হাসিনা কি আর কখনো দেশে ফিরতে পারবেন বলে আপনি মনে করেন? আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্ট করে জানান।
দেশ-বিদেশের রাজনীতি, সুশাসন এবং সমসাময়িক ঘটনার এমন গভীর ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ নিয়মিত পড়তে ভিজিট করুন পালস বাংলাদেশ | Pulse Bangladesh।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
১. নিষেধাজ্ঞার ঐতিহাসিক টাইমলাইন (১৯৪৯–২০২৫)
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৬ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে দলটি একাধিকবার সামরিক জান্তা, ঔপনিবেশিক শাসক এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নিজস্ব স্বৈরতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের দায়ে আইনি ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৫ সালে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া পর্যন্ত ঐতিহাসিক নিষেধাজ্ঞার কালপঞ্জি বা টাইমলাইন নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. পাকিস্তান আমল (১৯৪৯-১৯৭১): ঔপনিবেশিক ও সামরিক দমননীতি
- ১৯৫৮ (অক্টোবর): আইয়ুব খানের সামরিক শাসন ও দল নিষিদ্ধকরণ
- প্রেক্ষাপট: ৭ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা দেশে সামরিক আইন জারি করেন। এর মাত্র ২০ দিন পর জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেন।
- নিষেধাজ্ঞা: আইয়ুব খান ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ ইলেক্টেড বডিজ ডিসকোয়ালিফাইড অর্ডিন্যান্স’ (PPODO) জারি করে আওয়ামী লীগসহ পাকিস্তানের সমস্ত প্রধান রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবুর রহমানসহ শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত কড়া নজরদারিতে রাখা হয়।
- ১৯৭১ (মার্চ): ইয়াহিয়া খানের নিষেধাজ্ঞা ও মুক্তিযুদ্ধ
- প্রেক্ষাপট: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়।
- নিষেধাজ্ঞা: ২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি নিধনযজ্ঞ (অপারেশন সার্চলাইট) শুরুর পর, ২৬ মার্চ ১৯৭১ তারিখে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ “বেআইনি ও নিষিদ্ধ” ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তামাদি হয়।
২. স্বাধীন বাংলাদেশ আমল (১৯৭৫-২০০৮): রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও জরুরি অবস্থা

- ১৯৭৫ (আগস্ট): বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও সামরিক অধ্যাদেশ
- প্রেক্ষাপট: ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নিজেই বহুদলীয় গণতন্ত্র বিলুপ্ত করে একমাত্র রাষ্ট্রীয় দল ‘বাকশাল’ গঠন করেছিল।
- নিষেধাজ্ঞা: ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর ক্ষমতা দখলকারী খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও পরবর্তী সামরিক সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাকশাল ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে স্থগিত ও নিষিদ্ধ করে। ১৯৭৬ সালের শেষের দিকে ‘রাজনৈতিক দল অধ্যাদেশ’ (PPR) জারির মাধ্যমে সীমিত পরিসরে দল পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়।
- ২০০৭ (জানুয়ারি): ১/১১-এর জরুরি অবস্থা ও মাইনাস-টু ফর্মুলা
- নিষেধাজ্ঞা (পরোক্ষ): সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে সমস্ত রাজনৈতিক দলের ইনডোর ও আউটডোর রাজনীতি নিষিদ্ধ করে。 শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার চেষ্টা করা হয়, যা ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে প্রত্যাহার করা হয়।
৩. আধুনিক আমল (২০২৪-২০২৫): জুলাই গণহত্যা ও চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা

- ২০২৪ (অক্টোবর): ছাত্রলীগ নিষিদ্ধকরণ
- কারণ: দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালীন বৈষম্য ও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বর সশস্ত্র হামলা ও নিধনযজ্ঞের দায়ে অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে
- ২০২৫ (মে): আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন স্থগিত

- কারণ: গত ১৫ বছর ধরে বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর নির্যাতন, গুম, খুন, আয়নাঘর তৈরি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, ব্যাংকিং খাত ধ্বংস ও অর্থ পাচার এবং সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ১,৪০০-এর বেশি মানুষকে নির্বিচারে হত্যার (গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ) সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দেশজুড়ে তীব্র গণদাবি ওঠে।
- নিষেধাজ্ঞা: ১২ মে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’ এবং নতুন অধ্যাদেশের আওতায় আওয়ামী লীগ এবং এর সমস্ত অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অফলাইন-অনলাইনসহ সব ধরণের রাজনৈতিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করে। একই দিনে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (EC) দলটির রাজনৈতিক নিবন্ধন স্থগিত করে।
ঐতিহাসিক সারসংক্ষেপ টেবিল:
| সাল | নিষেধাজ্ঞা প্রদানকারী | প্রধান কারণ | নিষেধাজ্ঞার ধরণ |
|---|---|---|---|
| ১৯৫৮ | জেনারেল আইয়ুব খান | সামরিক শাসন জারি ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল | সমস্ত রাজনৈতিক দলসহ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ |
| ১৯৭১ | জেনারেল ইয়াহিয়া খান | বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন দমন ও যুদ্ধ ঘোষণা | আওয়ামী লীগকে বেআইনি ঘোষণা ও লোগো নিষিদ্ধ |
| ১৯৭৫ | মোশতাক ও পরবর্তী সামরিক জান্তা | বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও বাকশাল আমলের অবসান | বাকশাল ও আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত |
| ২০২৪ | অন্তর্বর্তী সরকার | জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলা | শুধু ‘ছাত্রলীগ’ নিষিদ্ধ (সন্ত্রাসবিরোধী আইন) |
| ২০২৫ | অন্তর্বর্তী সরকার ও ইসি | ১৫ বছরের স্বৈরাচার, গুম, দুর্নীতি ও জুলাই গণহত্যা | মূল দলসহ সমস্ত অঙ্গসংগঠন নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন স্থগিত |
দ্রষ্টব্য: ২০২৫ সালের মে মাসে জারিকৃত এই নিষেধাজ্ঞাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও এর শীর্ষ নেতাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের এপ্রিলে দেশের আইনসভায় এই সংক্রান্ত নতুন আইনি সংশোধনী ও শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়।
২. শাসন আমলের গভীর বিশ্লেষণ: ভালো ও মন্দ দিক

🇦) প্রথম আমল (১৯৭২–১৯৭৫): রাষ্ট্র গঠন বনাম বাকশাল
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রথম শাসন আমলটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় ও রূপান্তরকামী অধ্যায়। এই ৩ বছর ৭ মাসের শাসনকালকে মূলত দুটি বিপরীতমুখী ধারায় ভাগ করা হয়: প্রথম অংশটি ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন ও একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের (State-Building) ঐতিহাসিক প্রয়াস, এবং শেষ অংশটি ছিল সমস্ত গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে একক ক্ষমতার ‘বাকশাল’ (BAKSAL) একদলীয় একনায়কতন্ত্রের সূচনা [bn.wikipedia.org]।
নিচে এই দুই বিপরীতমুখী অধ্যায়ের একটি গভীর ও বিশ্লেষণাত্মক তুলনা তুলে ধরা হলো:
১. রাষ্ট্র গঠন অধ্যায় (১৯৭২–১৯৭৪): একটি নতুন দেশের ভিত্তিপ্রস্তর
দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সরকার শূন্য থেকে একটি রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলার কাজে হাত দেয়। এই পর্বের প্রধান অর্জনগুলো ছিল:
- মাত্র ১০ মাসে আধুনিক সংবিধান (১৯৭২): একটি সদ্য স্বাধীন দেশের জন্য মাত্র ১০ মাসের মধ্যে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। এতে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
- ভারতীয় মিত্রবাহিনীর প্রত্যাহার: বঙ্গবন্ধুর সফল কূটনৈতিক তৎপরতায় ১৯৭২ সালের মার্চের মধ্যেই ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণভাবে স্বদেশে ফেরত পাঠানো হয়, যা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।
- বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি ও জাতিসংঘ পদ লাভ: অতি অল্প সময়ে পরাশক্তিগুলোসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের স্বীকৃতি লাভ এবং ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে (UN) বাংলাদেশের সাধারণ সদস্যপদ নিশ্চিত করা হয়। বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দেন।
- যুদ্ধবিধ্বস্ত পুনর্বাসন ও অবকাঠামো: পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ধ্বংস করে দিয়ে যাওয়া সেতু, রেললাইন, ও সমুদ্রবন্দর (চট্টগ্রাম ও মংলা) দ্রুততম সময়ে চালু করা এবং ভারত থেকে ফেরত আসা ১ কোটি শরণার্থীকে পুনর্বাসন করা হয়।
২. বাকশাল অধ্যায় (১৯৭৫): বহুদলীয় গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক
রাষ্ট্র গঠনের এই ইতিবাচক ধারাটি ১৯৭৪ সালের শেষভাগ থেকে চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, জাসদের সশস্ত্র গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির রাজনৈতিক সহিংসতা এবং রক্ষীবাহিনীর দমনপীড়নের পটভূমিতে ১৯৭৫ সালের শুরুতে সরকার সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নেয়:
- সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী (২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫): এই কালো সংশোধনীর মাধ্যমে মাত্র কয়েক মিনিটের সংসদীয় অধিবেশনে দেশের সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা বাতিল করে একক রাষ্ট্রপতির শাসন ব্যবস্থা চালু করা হয়।
- বহুদলীয় রাজনীতির অবসান ও বাকশাল গঠন: আওয়ামী লীগসহ দেশের সকল রাজনৈতিক দল এবং পেশাজীবী সংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এর পরিবর্তে গঠিত হয় একমাত্র জাতীয় রাজনৈতিক দল—‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল)। সরকারি কর্মকর্তা, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং সাংবাদিকদের জন্য এই রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়।
- একনায়কতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার হরণ: আদালত ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রপতির অধীনে নিয়ে যাওয়া হয়। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, স্বাধীন মতামত প্রকাশ এবং রাজনৈতিক সমাবেশের অধিকার পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া হয় [bn.wikipedia.org]।
- সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ (জুন ১৯৭৫): ৪টি সরকারি মালিকানাধীন পত্রিকা (দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার ও বাংলাদেশ টাইমস) বাদে দেশের অন্য সব স্বাধীন জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদপত্র এক ডিক্রির মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়া হয়। হাজার হাজার সাংবাদিক রাতারাতি বেকার হয়ে পড়েন।
রাষ্ট্র গঠন বনাম বাকশাল: ঐতিহাসিক সংঘাত
| সূচক | রাষ্ট্র গঠন আমল (১৯Nz–১৯৭৪) | বাকশাল আমল (১৯৭৫) |
|---|---|---|
| শাসন ব্যবস্থা | বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র | একদলীয় রাষ্ট্রপতি শাসিত একনায়কতন্ত্র |
| রাজনৈতিক দল | আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, জাসদ, কমিউনিস্ট পার্টি ইত্যাদি সক্রিয় ছিল। | একমাত্র ‘বাকশাল’ বৈধ, বাকি সব দল আইনত নিষিদ্ধ [bn.wikipedia.org]। |
| সংবাদপত্র ও গণমাধ্যম | স্বাধীন ও বেসরকারি সংবাদপত্রের অনুমতি ছিল। | মাত্র ৪টি রাষ্ট্রীয় পত্রিকা বাদে সব মিডিয়া বন্ধ। |
| নাগরিক অধিকার | সংবিধানে মৌলিক অধিকারের আইনি নিশ্চয়তা ছিল। | মৌলিক অধিকার ও আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার অধিকার স্থগিত। |
| মূল্যায়ন | একটি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন। | ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক রূপ। |
সমাপ্তি ও পতন:
ইতিহাসবিদদের মতে, ‘রাষ্ট্র গঠন’ থেকে ‘বাকশাল’-এ রূপান্তরের এই রাজনৈতিক বিবর্তনটি ছিল আওয়ামী লীগের প্রথম আমলের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। দলটির ভেতরে ও বাইরে এই একদলীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধে। শেষ পর্যন্ত, বাকশাল গঠনের মাত্র ৭ মাসের মাথায়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক নির্মম ও রক্তাক্ত সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয় এবং এই ব্যবস্থার অবসান ঘটে।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় শাসন আমলটি ছিল দেশের রাজনীতিতে এক বড় ধরনের বৈপরীত্যের সময়। একদিকে এই আমলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চুক্তি এবং দৃশ্যমান কিছু অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হয়, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে চরম রাজনৈতিক সহিংসতা ও আঞ্চলিক “গডফাদার” সংস্কৃতির উত্থান ঘটে, যা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নাজুক করে তোলে।
নিচে এই আমলের দুই বিপরীতমুখী ধারা—উন্নয়ন বনাম গডফাদার সংস্কৃতির একটি গভীর বিশ্লেষণাত্মক রূপরেখা তুলে ধরা হলো:
১. উন্নয়ন অধ্যায়: অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অর্জন
দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে আওয়ামী লীগ সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়:
- পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি (১৯৯৭): দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা পাহাড়ের সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর জনসংহতি সমিতির (PCJSS) সাথে ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়, যা এই আমলের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য।
- গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি (১৯৯৬): ভারতের সাথে ৩০ বছর মেয়াদী ঐতিহাসিক গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার ফলে শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়।
- খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন: কৃষি খাতে বিশেষ প্রণোদনা, সার ও ডিজেলের মূল্য হ্রাস এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থার ফলে এই মেয়াদের শেষ দিকে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে (বিশেষ করে চালে) স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে।
- বঙ্গবন্ধু সেতু উদ্বোধন (১৯৯৮): যমুনা নদীর ওপর নির্মিত দেশের তৎকালীন দীর্ঘতম ‘বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু’ ১৯৯৮ সালে উন্মুক্ত করা হয়, যা উত্তরবঙ্গের সাথে সমগ্র দেশের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।
৩ঃদ্বিতীয় আমল (১৯৯৬–২০০১): উন্নয়ন বনাম গডফাদার সংস্কৃতি

গডফাদার সংস্কৃতি: রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও আইনহীনতা
উন্নয়নের এই খতিয়ানের বিপরীতে, মাঠপর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতার একক আধিপত্য ও সন্ত্রাসী রাজত্ব দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। এই অধ্যায়টি ইতিহাসে “গডফাদার সংস্কৃতি” নামে পরিচিত:
- আঞ্চলিক সন্ত্রাস ও নিজস্ব বাহিনী: দেশের কয়েকটি জেলায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য ও নেতারা প্রশাসনের সমান্তরালে নিজস্ব ‘ক্যাডার বাহিনী’ গড়ে তোলেন। ফেনীতে জয়নাল হাজারী (হাজারী বাহিনী), লক্ষ্মীপুরে আবু তাহের এবং নারায়ণগঞ্জে শামীম ওসমানের নাম এই সংস্কৃতির সমার্থক হয়ে ওঠে।
- প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হরণ: এই গডফাদারদের ক্ষমতার দাপটে স্থানীয় পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও আদালত সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফেনীর তৎকালীন পুলিশ সুপারকে (SP) সরকারি বাসভবনে অবরুদ্ধ করা এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো রাষ্ট্রীয় আইন-শৃঙ্খলার দুর্বলতা প্রকাশ করে।
- ক্যাম্পাসে চরম নৈরাজ্য: দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্রলীগ’ হল দখল ও সিট বাণিজ্যের একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করে। এর চরম রূপ দেখা যায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জসিমউদ্দিন মানিকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ধর্ষণ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে তীব্র ছাত্র-শিক্ষক আন্দোলন গড়ে ওঠে।
- রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক হত্যাকাণ্ড: এই মেয়াদে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। ২০০০ সালে সাংবাদিক শামছুর রহমান খুন হন এবং দেশজুড়ে বোমা হামলার ঘটনা (যেমন উদীচীর সমাবেশ ও রমনার বটমূল) বৃদ্ধি পায়, যা জনমনে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে।
উন্নয়ন বনাম গডফাদার সংস্কৃতি: সংক্ষেপিত তুলনা
| সূচক | উন্নয়ন অধ্যায় (ইতিবাচক) | গডফাদার সংস্কৃতি (নেতিবাচক) |
|---|---|---|
| জাতীয় নিরাপত্তা | পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও অস্ত্র সমর্পণ। | দেশের সমতল জেলাগুলোতে রাজনৈতিক ক্যাডারদের সশস্ত্র মহড়া। |
| শাসন ব্যবস্থা | আন্তর্জাতিক মঞ্চে কূটনৈতিক ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সফল। | স্থানীয় পর্যায়ে আমলাতন্ত্র ও পুলিশের ওপর দলীয় নিয়ন্ত্রণ। |
| সামাজিক পরিবেশ | কৃষি ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অগ্রগতি। | বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও বিচার ব্যবস্থায় দলীয়করণ ও সহিংসতা। |
সমাপ্তি:
আওয়ামী লীগের এই দ্বিতীয় আমলটিকে বিশ্লেষকরা একটি “মিশ্র অধ্যায়” হিসেবে দেখেন। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভূ-রাজনৈতিক সাফল্য সত্ত্বেও, তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক ক্যাডারদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড এবং গডফাদার সংস্কৃতির কারণে সাধারণ মানুষের মাঝে সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। এই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিই মূলত ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছিল।
দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিক আমল (২০০৯–২০২৪): মেগা প্রজেক্ট বনাম মেগা দুর্নীতি ও গুম
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলকে সমসাময়িক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একটি বিশুদ্ধ “স্বৈরতান্ত্রিক উন্নয়ন মডেল” (Authoritarian Development Model) হিসেবে আখ্যায়িত করেন । এই দেড় দশকে সরকার দৃশ্যমান ও চোখধাঁধানো বেশ কিছু ‘মেগা প্রজেক্ট’ বা মেগা অবকাঠামো গড়ে তুললেও, তার আড়ালে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল ‘মেগা দুর্নীতি’, অর্থ পাচার এবং ভিন্নমত দমনে ‘গুম ও আয়নাঘর’-এর মতো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস
নিচে এই দীর্ঘ আমলের দুই বিপরীতমুখী ও চরম বৈপরীত্যপূর্ণ অধ্যায়টির একটি গভীর বিশ্লেষণমূলক রূপরেখা তুলে ধরা হলো:
১. মেগা প্রজেক্ট অধ্যায়: দৃশ্যমান কাঠামোগত রূপান্তর
এই ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার দেশের যোগাযোগ ও জ্বালানি খাতে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করে:
- পদ্মা বহুমুখী সেতু (২০২২): বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বাতিলের পর সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণ করা হয়। এটি দক্ষিণ-পশ্চিমবঙ্গের ২১টি জেলাকে সরাসরি ঢাকার সাথে যুক্ত করে দেশের জিডিপিতে বড় অবদান রাখে।
- ঢাকা মেট্রোরেল (MRT Line-6): রাজধানীর তীব্র যানজট নিরসনে জাইকা (JICA)-র অর্থায়নে দেশের প্রথম সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত ও আধুনিক এলিভেটেড মেট্রোরেল ব্যবস্থা চালু করা হয়।
- কর্ণফুলী টানেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে: চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম আন্ডারওয়াটার রোড টানেল (বঙ্গবন্ধু টানেল) এবং ঢাকার যানজট এড়াতে এয়ারপোর্ট থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত পিয়ার-ভিত্তিক এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হয়।
- পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর ও রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র: দেশের তৃতীয় গভীর সমুদ্র বন্দর চালু এবং রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় পাবনার রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (১২০০×২ মেগাওয়াট) নির্মাণের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
২. মেগা দুর্নীতি ও গুম অধ্যায়: ফ্যাসিবাদ ও লুটপাটের অন্ধকার দিক
দৃশ্যমান এই উন্নয়নের আড়ালে দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ও মানবাধিকারকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়:
ক. মেগা দুর্নীতি ও বিদ্যুৎ খাতের ‘ইনডেমনিটি’
- প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থ পাচার: প্রতিটি মেগা প্রজেক্টে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি প্রাক্কলিত ব্যয় দেখিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এই অর্থ পরবর্তীতে কানাডার ‘বেগম পাড়া’, দুবাই, মালয়েশিয়া ও লন্ডনে পাচার করা হয়।
- কুইক রেন্টাল ও ক্যাপাসিটি চার্জ: বিদ্যুৎ খাতের কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বিশেষ ‘দায়মুক্তি (Indemnity) আইন’ পাস করা হয়। এর ফলে কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই বছরের পর বছর বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ হিসেবে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি অর্থ দলীয় ব্যবসায়ীদের পকেটে ঢোকানো হয়।
- ব্যাংকিং খাতের ধ্বংসসাধন: আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক ও তাঁদের ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেটের (যেমন এস আলম গ্রুপ) মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে ভুয়া ও বেনামী ঋণের নামে প্রায় কয়েক লাখ কোটি টাকা লুটপাট করা হয়।
খ. রাষ্ট্রীয় গুম সংস্কৃতি ও ‘আয়নাঘর’
- ভিন্নমত নিশ্চিহ্নকরণ: সরকারের সমালোচনা, রাজনৈতিক বিরোধিতা বা ভিন্নমত প্রকাশের শাস্তি হিসেবে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (DGFI) এবং বিশেষ পুলিশ বাহিনীকে (RAB ও DB) ব্যবহার করে ‘গুম’ বা জোরপূর্বক নিখোঁজ করার এক ভয়ঙ্কর সংস্কৃতি চালু করা হয়।
- গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’: রাজনৈতিক নেতা, সামরিক কর্মকর্তা ও মানবাধিকার কর্মীদের তুলে নিয়ে বছরের পর বছর আলো-বাতাসহীন গোপন সামরিক বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এ আটকে রেখে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। ২০২৪ সালের আগস্টে স্বৈরাচারের পতনের পর এই বন্দিশালা থেকে বেশ কয়েকজন দীর্ঘ বছর পর জীবিত মুক্ত হন।
- বিচারবহির্ভূত হত্যা বা ক্রসফায়ার: গুমের পাশাপাশি ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজিয়ে হাজার হাজার বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়, যার ফলে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে র্যাবের ওপর বিশেষ নিষেধাজ্ঞা (Sanction) জারি করা হয়।
মেগা প্রজেক্ট বনাম মেগা দুর্নীতি ও গুম: সংক্ষেপিত তুলনা
| সূচক | মেগা প্রজেক্ট (দৃশ্যমান দিক) | মেগা দুর্নীতি ও গুম (অন্ধকার দিক) |
|---|---|---|
| অবকাঠামো ও অর্থনীতি | নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেল নির্মাণ। | প্রাক্কলিত ব্যয়ের কয়েক গুণ বেশি মূল্যে মেগা লুটপাট ও ব্যাংক দেউলিয়াত্ব। |
| নাগরিক জীবন | দ্রুত যোগাযোগ ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার সূচনা। | বাকস্বাধীনতা হরণ (DSA আইন), গুমের ভয় এবং ‘আয়নাঘর’ আতঙ্ক। |
| মানবাধিকার ও সুশাসন | আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের বৈশ্বিক প্রচারণা। | ১,৪০০-এর বেশি ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যা ও ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত রূপ [thediplomat.com]। |
ঐতিহাসিক পতন:
উন্নয়নের মোড়কে মেগা দুর্নীতি, গুমের আতঙ্ক এবং জনগণের ভোটাধিকার পুরোপুরি কেড়ে নেওয়ার এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সরকার নির্বিচারে ১,৪০০-এর বেশি মানুষকে গুলি করে হত্যা করলেও শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট ২০২৪-এ শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও ভারতে পলায়নের মধ্য দিয়ে এই চরম কর্তৃত্ববাদী মেয়াদের অবসান ঘটে
৪. স্থানীয় নির্বাচন ও তৃণমূল রাজনীতির গভীর বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৬ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থানীয় সরকার নির্বাচন (সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ) এবং তৃণমূল রাজনীতি দলটির ক্ষমতা সারণী ধরে রাখার সবচেয়ে বড় ভিত্তি ছিল। তবে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ২০২৫ সালে দলটির কার্যক্রমের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা এবং নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক বিধিমালা দলটির তৃণমূল কাঠামোকে সম্পূর্ণ অস্তিত্ব সংকটের মুখে ফেলেছে [bn.wikipedia.org]।
নিচে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও তৃণমূল রাজনীতির ভালো (ইতিবাচক) ও মন্দ (নেতিবাচক) দিকগুলোর একটি গভীর বিশ্লেষণমূলক রূপরেখা তুলে ধরা হলো:
ভালো দিকসমূহ: তৃণমূলের ক্ষমতায়ন ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক
দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকাকালীন এবং এর পূর্বেও বিরোধী দলে থাকার সময়, আওয়ামী লীগ গ্রামীণ পর্যায় পর্যন্ত একটি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল:
১. দেশের বৃহত্তম সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক
- ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত কমিটি: দেশের প্রতিটি ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সুনির্দিষ্ট কমিটি ও কর্মী বাহিনী ছিল। এই তৃণমূল নেটওয়ার্কের কারণে দলটি যেকোনো সময় দেশজুড়ে দ্রুত রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারত।
- পারিবারিক ও ঐতিহ্যগত আনুগত্য: গ্রামীণ বাংলাদেশে বহু পরিবার বংশানুক্রমিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত। এই “স্থায়ী ভোটব্যাংক” ও পারিবারিক ঐতিহ্য দলটিকে স্থানীয় নির্বাচনে সবসময় সুবিধাজনক অবস্থানে রাখত।
২. স্থানীয় সরকার কাঠামোর উন্নয়ন ও বাজেট বৃদ্ধি
- ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষমতায়ন: আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর (বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা) বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়।
- গ্রামীণ অবকাঠামোগত রূপান্তর: “আমার গ্রাম, আমার শহর” প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ রাস্তাঘাট পাকা করা, শতভাগ বিদ্যুতায়ন এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা তৃণমূল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া দলটির স্থানীয় রাজনীতির একটি বড় ইতিবাচক দিক ছিল।
মন্দ দিকসমূহ: একচ্ছত্র আধিপত্য, সহিংসতা ও ‘নৌকা’ বিতর্ক
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের দীর্ঘ শাসনামলে দলটির স্থানীয় রাজনীতি ও নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের শিকার হয়:
১. দলীয় প্রতীকে নির্বাচন ও তৃণমূলের কোন্দল
- ‘নৌকা’ মার্কা বনাম বিদ্রোহী প্রার্থী: ২০১৫ সালে আইন সংশোধন করে স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে (নৌকা, ধানের শীষ ইত্যাদি) করার নিয়ম চালু করা হয়। এর ফলে স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে যোগ্য প্রার্থীর চেয়ে কেন্দ্রের ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ প্রধান হয়ে ওঠে।
- অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষয়ী সংঘাত: বিএনপি-জামায়াতসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো স্থানীয় নির্বাচন বর্জন করায়, আওয়ামী লীগের বনাম আওয়ামী লীগের (বিদ্রোহী প্রার্থী) মাঝেই দেশজুড়ে নির্বাচন ঘিরে শত শত সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
২. ভোটের সংস্কৃতি ধ্বংস ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়
- ভোট ডাকাতি ও প্রশাসন নির্ভরতা: জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবহার করে ভোটকেন্দ্র দখল ও ব্যালট সিল মারার সংস্কৃতি চালু করা হয়।
- চেয়ারম্যানদের ‘বিনা ভোটে’ জয়: শত শত ইউনিয়ন ও উপজেলায় বিরোধী কোনো প্রার্থীকে দাঁড়াতেই দেওয়া হয়নি। ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য করে শত শত আওয়ামী লীগ নেতা বিনা ভোটেই চেয়ারম্যান ও মেয়র নির্বাচিত হন, যা তৃণমূলের জবাবদিহিতা শূন্যে নামিয়ে আনে।
৩. তৃণমূলের দুর্নীতি ও পেশী শক্তির দাপট
- টিআর, কাবিখা ও ভাতার টাকা আত্মসাৎ: গ্রামীণ গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত টিআর (টেস্ট রিলিফ), কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) এবং ওএমএস-এর চাল দলীয় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মাধ্যমে হরিলুট করা হয়। সামাজিক নিরাপত্তা খাতের (বয়স্ক বা বিধবা ভাতা) কার্ড দেওয়ার বিনিময়ে তৃণমূলের দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
বর্তমান ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপট: তৃণমূলের অস্তিত্ব সংকট
২০২৪ সালের আগস্টে কেন্দ্র থেকে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর এবং ২০২৫ সালের মে মাসে দলটির ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা ও নিবন্ধন স্থগিতের পর তৃণমূল রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন শূন্যতা তৈরি হয়েছে:
- নেতৃত্বহীন ও পলাতক তৃণমূল: স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রায় ৯৫% আওয়ামীপন্থী মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউপি চেয়ারম্যানরা আত্মগোপনে রয়েছেন বা বরখাস্ত হয়েছেন। ফলে দলটির চেইন অব কমান্ড বা নেতৃত্বের কোনো কাঠামো বর্তমানে মাঠপর্যায়ে অবশিষ্ট নেই।
- আইনি অঙ্গীকারনামার বাধ্যবাধকতা: নির্বাচন কমিশনের নতুন বিধিমালা (২০২৬) অনুযায়ী, স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে হলে প্রার্থীদের অঙ্গীকারনামা দিতে হবে যে তারা নিষিদ্ধ বা স্থগিত থাকা কোনো দলের (যেমন- আওয়ামী লীগ) সাথে যুক্ত নন। ফলে ছদ্মবেশে বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের স্থানীয় রাজনীতিতে ফেরার পথ সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে।
সমাপ্তি:
আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতি একসময় দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলেও, অতিরিক্ত ক্ষমতার লোভ, নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস এবং তৃণমূলের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে তা সাধারণ মানুষের কাছে চরম ঘৃণার বিষয়ে পরিণত হয়। ফলস্বরূপ, কেন্দ্র থেকে ক্ষমতাচ্যুতির সাথে সাথেই দলটির শক্তিশালী তৃণমূল নেটওয়ার্ক তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সিনিয়র এসইও কনসালটেন্ট ও কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট
তথ্যসূত্র ও সমসাময়িক বিষয়ের গভীর বিশ্লেষণের জন্য ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইট।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
তোফায়েল আহমেদ (২২ অক্টোবর ১৯৪৩ – ১ জুন ২০২৪) ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম রূপকার এই নেতা ডাকসুর ভিপি ও সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা

তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ব্যাকেরগঞ্জ জেলার (বর্তমান ভোলা দ্বীপের) দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
পারিবারিক পরিচিতি
- পিতা: তাঁর পিতা মৌলভী আজহার আলী ছিলেন এলাকার একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব।
- মাতা: তাঁর মাতা ফাতেমা বেগম (মতান্তরে ফাতেমা খানম)।
- শৈশব: গ্রামীণ ও সাধারণ পরিবেশে তাঁর শৈশবকাল কেটেছে।
শিক্ষাজীবন
- মাধ্যমিক (ম্যাট্রিক): তিনি ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সফলতার সাথে ম্যাট্রিক (এসএসসি) পাস করেন।
- উচ্চ মাধ্যমিক (আইএসসি): মাধ্যমিক শেষে তিনি বরিশালে চলে যান এবং ১৯৬২ সালে বিখ্যাত ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন।
- স্নাতক (বিএসসি): একই কলেজ (বিএম কলেজ) থেকে তিনি ১৯৬৪ সালে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন।
- স্নাতকোত্তর (এমএসসি): এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞান (Soil Science) বিভাগ থেকে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।
প্রাথমিক নেতৃত্ব ও গুণাবলী
- স্কুল জীবন: ছাত্র হিসেবে তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং স্কুল জীবনেই ক্লাস ক্যাপ্টেন ও স্কুল ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন করেন।
- প্রথম রাজনৈতিক পাঠ: ১৯৫৭ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ভোলায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগমন ঘটে, যা তাঁর মনে রাজনৈতিক চেতনার জন্ম দেয়।
- কলেজ রাজনীতি: বিএম কলেজে অধ্যয়নকালেই তিনি সরাসরি ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ১৯৬২ সালে কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক এবং অশ্বিনী কুমার হল হোস্টেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন।
রাজনৈতিক জীবন
তোফায়েল আহমেদ ( ছাত্ররাজনীতি ও ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি ( ১৯৬০-এর দশক)

- ডাকসুর ভিপি: ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ মেয়াদে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
- ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান: ১৯৬৯ সালে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি আইয়ুববিরোধী ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মূল নেতৃত্ব দেন।
- বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রদান: ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান কারামুক্ত হলে, ২৩ রেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশে তোফায়েল আহমেদ তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিব বাহিনী (১৯৭১)
- মুক্তিসংগ্রামের রূপকার: তিনি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
- মুজিব বাহিনী (BLF): মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন গঠিত ‘মুজিব বাহিনী’র (বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট) চার প্রধান অধিনায়কের একজন ছিলেন তিনি, যার অধীনে প্রায় ২০,০০০ মুক্তিসেনা প্রশিক্ষিত হয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়।
জাতীয় রাজনীতি ও সংসদীয় জীবন (১৯৭০-২০২৪)
- সর্বকনিষ্ঠ সদস্য (১৯৭০): মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য (MNA) নির্বাচিত হন। [
- ৯ বার সংসদ সদস্য: স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি ১৯৭৩ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মেয়াদে (সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনেও) মোট ৯ বার সংসদ সদস্য (MP) নির্বাচিত হন। মূলত ভোলা-১ ও ভোলা-২ আসন থেকে তিনি বারবার নির্বাচিত হয়েছেন।
- রাজনৈতিক উপদেষ্টা: ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা) হিসেবে নিযুক্ত হন।
মন্ত্রিত্ব ও দলীয় শীর্ষ পদ
- বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়: ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০১৪ থেকে ২০১৮ মেয়াদে তিনি পুনরায় দেশের বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব সামলান।
- দলীয় পদ: তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর (প্রেসিডিয়াম) প্রভাবশালী সদস্য এবং পরবর্তীতে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘উপদেষ্টা পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তোফায়েল আহমেদের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী দীর্ঘ সংসদীয় জীবন—উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নিচে তাঁর মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা এবং সংসদীয় জীবনের সুনির্দিষ্ট মেয়াদসমূহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
মহান মুক্তিযুদ্ধে তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা

- কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন: ১৯৭১ সালের মার্চের শুরুতে শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে গঠিত ‘স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর অন্যতম শীর্ষ নেতা ছিলেন তিনি। দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন সফল করতে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেন।
- মুজিব বাহিনী (BLF) গঠন: মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ভারতে গিয়ে তিনি চার প্রধানের একজন হিসেবে ‘মুজিব বাহিনী’ (বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট) গঠন করেন। এই বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক বিভক্তিতে তিনি ছিলেন দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের (বৃহত্তর খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, যশোর ও ফরিদপুর) প্রধান অধিনায়ক।
- মুক্তিসেনা তৈরি ও যুদ্ধ পরিচালনা: ভারতের দেরাদুনে প্রায় ২০,০০০ বাছাইকৃত ছাত্র ও যুবকদের উচ্চতর গেরিলা ও সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদানের পুরো প্রক্রিয়া তিনি সরাসরি তদারকি করেন। এই বিশেষ বাহিনী মূল যুদ্ধক্ষেত্রে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বহু সফল প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
- আন্তর্জাতিক জনমত গঠন: যুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বৈশ্বিক জনমত গঠনে ও তহবিল সংগ্রহে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
সংসদীয় জীবনের সুনির্দিষ্ট মেয়াদসমূহ
তিনি মোট ৮ বার বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং এর পূর্বে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন:
১. ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন (পাকিস্তান আমল): মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি তৎকালীন ভোলা থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের কনিষ্ঠতম সদস্য (MNA) নির্বাচিত হন।
২. প্রথম জাতীয় সংসদ (১৯৭৩–১৯৭৫): স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি তৎকালীন বাকেরগঞ্জ-১ (ভোলা) আসন থেকে সংসদ সদস্য (MP) নির্বাচিত হন। এই মেয়াদেই তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
৩. তৃতীয় জাতীয় সংসদ (১৯৮৬–১৯৮৮): এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি পুনরায় ভোলা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
৪. পঞ্চম জাতীয় সংসদ (১৯৯১–১৯৯৫): ১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক অবাধ নির্বাচনে ভোলা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য হন এবং সংসদে বিরোধী দলীয় প্রধান হুইপ ও দলের গুরুত্বপূর্ণ মুখপাত্র হিসেবে ভূমিকা রাখেন।
৫. সপ্তম জাতীয় সংসদ (১৯৯৬–২০০১): ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তিনি শেখ হাসিনার প্রথম মন্ত্রিসভায় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং সফলভাবে এই মেয়াদ সম্পন্ন করেন।
৬. নবম জাতীয় সংসদ (২০০৮–২০১৩): ১/১১ এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি পুনরায় ভোলা-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন।
৭. দশম জাতীয় সংসদ (২০১৪–২০১৮): এই মেয়াদে নির্বাচিত হয়ে তিনি সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন।
৮. একাদশ জাতীয় সংসদ (২০১৮–২০২৪): ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোলা-১ আসন থেকে পুনরায় নির্বাচিত হন।
৯. দ্বাদশ জাতীয় সংসদ (২০২৪): ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন। (পরবর্তীতে ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে এই সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়)।
তোফায়েল আহমেদের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে তাঁর সাফল্য এবং তাঁর রাজনৈতিক কারাবাসের ইতিহাস নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
১. বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী হিসেবে সাফল্যসমূহ
তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের দুটি ভিন্ন মেয়াদে দেশের বাণিজ্য ও শিল্প খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন:
- রপ্তানি খাতের প্রবৃদ্ধি (২০১৪-২০১৮): বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে তাঁর মেয়াদে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত—তৈরি পোশাক শিল্পে (RMG) ব্যাপক প্রবৃদ্ধি ঘটে। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং নতুন নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিতে জোরালো কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করেন।
- রপ্তানি বহুমুখীকরণ: শুধু পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমাতে তিনি চামড়া, ওষুধ, পাটজাত পণ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি (IT) খাতকে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে রপ্তানি তালিকায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেন।
- আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ও কূটনীতি: প্রতি বছর ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা (DITF) সফলভাবে আয়োজন এবং বিদেশে বাংলাদেশের পণ্যের একক প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে দেশের ব্র্যান্ডিং শক্তিশালী করেন।
- শিল্প নীতি প্রণয়ন (১৯৯৬-২০০১): শিল্প মন্ত্রী থাকাকালীন দেশের বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে এবং সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণে তিনি আধুনিক শিল্প নীতি প্রণয়নে নেতৃত্ব দেন।
২. রাজনৈতিক কারাবাস ও নির্যাতনের ইতিহাস
বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর হওয়ার কারণে পাকিস্তানি আমল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশেও বিভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক শাসনামলে তোফায়েল আহমেদকে দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটাতে হয়েছে:
- ১৯৭১-এর পূর্ববর্তী সময়: ছাত্র আন্দোলন, ৬৬-এর ছয় দফা এবং ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে পাকিস্তানি শাসনামলে তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন।
- বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর (১৯৭৫): ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর সামরিক জান্তা তোফায়েল আহমেদকে গ্রেপ্তার করে। এরপর দীর্ঘ প্রায় ৩৩ মাস তিনি অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি ছিলেন।
- এরশাদ বিরোধী আন্দোলন (১৯৮০-এর দশক): আশির দশকে স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে তাঁকে বারবার গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় প্রায় প্রতি বছরই তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল।
- ১/১১-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন (২০০৭): ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের সাথে তোফায়েল আহমেদকেও গ্রেপ্তার করা হয় এবং দীর্ঘ সময় তিনি কাশিমপুর কারাগারে বন্দি ছিলেন।
সব মিলিয়ে তিনি তাঁর জীবনে প্রায় ৭ বছরেরও বেশি সময় রাজনৈতিক কারণে কারাবরণ করেছেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও মৃত্যু
তোফায়েল আহমেদ ২০২৬ সালের ১ জুন (সোমবার) বিকেল ৩:৩০ মিনিটে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন. মৃত্যুকালে প্রবীণ এই রাজনৈতিক নেতার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর.
মৃত্যুর কারণ ও শেষ দিনগুলো
- শারীরিক অসুস্থতা: তিনি দীর্ঘ দিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানাবিধ জটিলতা, প্যারালাইসিস (পক্ষাঘাত) এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন.
- লাইফ সাপোর্ট: শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলে গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরবর্তী মাসগুলোতে তিনি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (ICU) লাইফ সাপোর্টে ছিলেন.
- চিকিৎসকদের বিবৃতি: হাসপাতালের পক্ষ থেকে ডা. রায়হান রব্বানী ও তোফায়েল আহমেদের জামাতা ডা. মো. তৌহিদুজ্জামান তুহিনের যৌথ স্বাক্ষরে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়.
পরিবার ও শোক প্রকাশ
- পরিবার: মৃত্যুকালে তিনি তাঁর একমাত্র কন্যা ড. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী (আইভী আহমেদ) এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী ও রাজনৈতিক অনুসারী রেখে গেছেন.
- শোকের ছায়া: তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর নির্বাচনী এলাকা ভোলাসহ দেশজুড়ে রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে এবং তাঁর নিজ গ্রাম কোড়ালিয়ায় শোকের মাতম শুরু হয়.
তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু-পরবর্তী জানাজা, দাফন প্রক্রিয়া এবং তাঁর স্মরণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়া
- প্রথম জানাজা (ঢাকা): মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ঢাকায় তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্মৃতিবিজড়িত স্থানে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। ঢাকার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ বা নির্ধারিত প্রাঙ্গণে তাঁর প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের একাংশ রাজনৈতিক স্লোগান দিলে সেখান থেকে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়।
- দ্বিতীয় জানাজা ও দাফন (ভোলা): ঢাকার আনুষ্ঠানিকতা শেষে হেলিকপ্টারযোগে তাঁর মরদেহ তাঁর নিজ নির্বাচনী এলাকা এবং জন্মস্থান ভোলায় নিয়ে যাওয়া হয়। ভোলার সরকারি হাই স্কুল মাঠ এবং তাঁর নিজ গ্রাম কোড়ালিয়ায় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক অনুসারী অংশ নেন।
- পারিবারিক কবরস্থান: জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় (গার্ড অব অনার) ভোলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে তাঁর পারিবারিক কবরস্থানে পিতা-মাতার কবরের পাশে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
দেশী-বিদেশী রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া ও শোকবার্তা
- দলীয় শোক: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে (যার ক্রিয়াকলাপ বর্তমানে সাময়িকভাবে স্থগিত বা নিষিদ্ধ রয়েছে) প্রবীণ এই নেতার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁর মৃত্যুকে দলের একটি যুগের অবসান এবং অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
- জাতীয় নেতাদের সমবেদনা: দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা তোফায়েল আহমেদের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তাঁরা বিশেষ করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য নেতৃত্বের কথা স্মরণ করেন।
- আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ঢাকাস্থ বিভিন্ন বিদেশী দূতাবাসের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অন্যতম এই সংবিধান প্রণেতা ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রীর মৃত্যুতে শোকবার্তা পাঠানো হয়েছে এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে।
প্রধান অনলাইন উৎস ও প্রতিবেদন
- উইকিপিডিয়া (বাংলা)
- Wikipedia (English)
- প্রথম আলো
- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর
- দ্য ডেইলি স্টার (The Daily Star
- বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



