অপরাধ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
রাজনৈতিক বিশ্লেষক | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ৩ জুন ২০২৬
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন দীর্ঘ ১৫ বছর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা। তাঁর এই আকস্মিক বিদায়ের পর থেকে দেশের রাজনৈতিক মহলে এবং সাধারণ মানুষের মনে একটি বড় প্রশ্ন প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছে—শেখ হাসিনা কি কখনো আবার বাংলাদেশে ফিরে আসবেন?
ইতিহাসের চাকা এবং আইনি বাস্তবতার দিকে তাকালে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা খুব একটা কঠিন নয়। বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নজির, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) ভূমিকা এবং বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা কতটা ক্ষীণ, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১. স্বৈরশাসকদের দেশ ছেড়ে পালানোর বৈশ্বিক নজির

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তীব্র গণ-আন্দোলন, বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে স্বৈরশাসকদের দেশ ছেড়ে পালানোর দীর্ঘ ঐতিহাসিক নজির রয়েছে। ইতিহাসে দেখা যায়, জনরোষের মুখে প্রাণ বাঁচাতে কিংবা বিচারের হাত থেকে বাঁচতে তারা সাধারণত নিরাপদ আশ্রয়, বন্ধুভাবাপন্ন দেশ বা প্রবাসে নির্বাসনে চলে যান।
বিশ্বের অন্যতম আলোচিত কয়েকজন ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসকের দেশত্যাগের ঘটনা নিচে দেওয়া হলো:
- ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভি: ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর তিনি আর কখনো ইরানে ফিরতে পারেননি, প্রবাসেই তাঁর মৃত্যু হয়।

- ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোস: ১৯৮৬ সালে ‘পিপল পাওয়ার রেভোলিউশন’-এর মুখে দেশ ছেড়ে হাওয়াই দ্বীপে আশ্রয় নেন। তিনিও জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরতে পারেননি। (যদিও কয়েক দশক পর তাঁর ছেলে ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু মার্কোস নিজে ফিরতে পারেননি)।

- তিউনিসিয়ার জিনে আল-আবেদিন বেন আলী: ২০১১ সালের আরব বসন্তের মুখে দেশ ছেড়ে সৌদি আরবে পালিয়ে যান এবং সেখানেই নির্বাসিত অবস্থায় মারা যান।
- শেখ হাসিনা (বাংলাদেশ, ২০২৪): ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে তীব্র ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সামরিক হেলিকপ্টারে গোপনে দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন।
- গোটাভায়া রাজাপাকসে (শ্রীলঙ্কা, ২০২২): ব্যাপক অর্থনৈতিক সংকট ও তীব্র গণবিক্ষোভের মুখে ২০২২ সালের জুলাই মাসে বিক্ষোভকারীরা তার সরকারি বাসভবনে ঢুকে পড়ে। এরপর তিনি প্রথমে মালদ্বীপে ও পরে সিঙ্গাপুরে পালিয়ে যান।
- পারভেজ মোশাররফ (পাকিস্তান, ২০০৮): রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৯৯ সালে ক্ষমতা দখল করা এই সামরিক শাসক ২০০৮ সালে অভিশংসন ও ব্যাপক চাপের মুখে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তিনি স্বেচ্ছায় নির্বাসনে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (দুবাই) চলে যান।
- জিনে এল আবিদিন বেন আলী (তিউনিসিয়া, ২০১১): ‘আরব বসন্ত’ নামে পরিচিত গণ-আন্দোলনের মুখে ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি তিউনিসিয়ার ২৩ বছরের স্বৈরশাসক বেন আলী ক্ষমতাচ্যুত হন এবং সৌদি আরবে পালিয়ে যান। সেখানেই ২০১৯ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
- হোসনি মুবারক (মিশর, ২০১১): আরব বসন্তের জের ধরে ২০১১ সালের শুরুতে মিশরে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। দীর্ঘ ৩০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন এবং পরে গ্রেপ্তার ও বিচারের সম্মুখীন হন।
- ইদি আমিন (উগান্ডা, ১৯৭৯): উগান্ডার এই সামরিক একনায়ক ১৯৭৯ সালে উগান্ডা-তাঞ্জানিয়া যুদ্ধের সময় রাজধানী কাম্পালার পতন হলে দেশ ছেড়ে প্রথমে লিবিয়া এবং পরবর্তীতে সৌদি আরবে পালিয়ে যান।
- ফার্ডিন্যান্ড মার্কোস (ফিলিপাইন, ১৯৮৬): ফিলিপাইনে রক্তক্ষয়ী ‘পিপল পাওয়ার’ বিপ্লবের মুখে ১৯৮৬ সালে মার্কোস ক্ষমতাচ্যুত হন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় সপরিবারে দেশ থেকে পালিয়ে হাওয়াইয়ে নির্বাসনে যান।
- মোহাম্মদ রেজা পাহলভি (ইরান, ১৯৭৯): ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মুখে ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি প্রথমে মিশর, মরক্কো, বাহামা ও মেক্সিকো ঘুরে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন এবং ১৯৮০ সালে কায়রোতে মারা যান। পালিয়ে যাওয়া অনেক স্বৈরশাসকের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভিন্ন চিত্রও দেখা যায়। আন্দোলনের মুখে অনেকে দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেও পরবর্তীতে নিজ দেশে ফেরত এসে বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। আবার কেউ কেউ সারা জীবন প্রবাসেই নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন।
ইতিহাস বলে, ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে যাওয়া শাসকরা তখনই দেশে ফেরার সাহস পান, যখন দেশে তাঁদের রাজনৈতিক দল বা আদর্শ পুনরায় একচ্ছত্র ক্ষমতায় আসে। বর্তমান বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের যে রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটেছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে দলটির এককভাবে ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
২. আইনি বেড়াজাল: শতাধিক মামলা ও সম্ভাব্য সাজা

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে শতাধিক ফৌজদারি মামলা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সারা দেশে মোট ৬৬৩টি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৫৩টিই সরাসরি হত্যা মামলা।
ইতিমধ্যে কয়েকটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে তার মৃত্যুদণ্ডসহ দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের আদেশ এসেছে। পলাতক থাকায় এই বিচারিক প্রক্রিয়াগুলো তার অনুপস্থিতিতেই (In Absentia) সম্পন্ন হয়। [
প্রধান মামলার রায় ও সম্ভাব্য সাজাসমূহ

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সম্পন্ন হওয়া এবং চলমান প্রধান প্রধান মামলা ও সাজার বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
- মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা (মৃত্যুদণ্ড): ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান দমনে নির্বিচারে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে বাংলাদেশের বিশেষ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়।
- পূর্বাচল প্লট কেলেঙ্কারি মামলা (২১ বছরের কারাদণ্ড): দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা তিনটি পৃথক প্লট জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মামলায় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত শেখ হাসিনাকে সর্বমোট ২১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে।
- আদালত অবমাননা মামলা (৬ মাসের কারাদণ্ড): একটি গোপন অডিও রেকর্ডিং ফাঁসের জেরে—যেখানে তিনি বিচারব্যবস্থাকে উদ্দেশ্য করে অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন—পৃথক এক শুনানিতে ট্রাইব্যুনাল তাকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেয়।
- সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ: মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পাশাপাশি আদালত ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার লক্ষ্যে শেখ হাসিনার সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করারও নির্দেশ দেয়।
মামলার বর্তমান পরিস্থিতি ও আইনি সীমাবদ্ধতা
| আইনি দিক | বর্তমান অবস্থা ও প্রভাব |
|---|---|
| মোট মামলার সংখ্যা | সারা দেশে ৬৬৩টি মামলা (যার মধ্যে ৪৫৩টি হত্যা মামলা)। |
| আপিলের অধিকার | আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিধান অনুযায়ী, পলাতক আসামির আপিল করার কোনো সুযোগ নেই। আপিল করতে হলে তাকে অবশ্যই সশরীরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে। |
| প্রত্যর্পণ চ্যালেঞ্জ | শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করায় বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে The Hindu-র তথ্যমতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণ বা এক্সট্রাডিশনের প্রক্রিয়া শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে। |
| অন্যান্য তদন্ত | গুমের ঘটনা এবং ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আরও বেশ কয়েকটি মামলার তদন্তাধীন বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। |
আইনি বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হত্যা ও দুর্নীতির বিপুল মামলার কারণে তিনি এক নজিরবিহীন আইনি বেড়াজালে আবদ্ধ হয়েছেন। তার অনুপস্থিতিতে রায়গুলো কার্যকর করা না গেলেও, আন্তর্জাতিকভাবে তাকে ফেরত আনার কূটনৈতিক ও আইনি চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
৩. আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) ও বৈশ্বিক চাপ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে নির্বিচারে গণহত্যা এবং বিগত ১৫ বছরের গুম-খুনের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়া অভ্যন্তরীণ গণ্ডি পেরিয়ে এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর পর্যবেক্ষণে রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইনি চাপ ও বিচার প্রক্রিয়া মূলত দুটি ভিন্ন ধারায় অগ্রসর হচ্ছে: একটি হেগের মূল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) এবং অন্যটি বাংলাদেশের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT)।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) ও এ সংক্রান্ত বৈশ্বিক চাপের মূল বিষয়গুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICC) নালিশ ও তদন্ত
- ফরমাল কমপ্লেইন্ট বা অভিযোগ দায়ের: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে ১,৪০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু এবং নৃশংস বলপ্রয়োগের ঘটনাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করে বেশ কয়েকজন আন্তর্জাতিক আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী হেগের আইসিসি (ICC)-তে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পেশ করেছেন।
- রোম সনদের বাধ্যবাধকতা: বাংলাদেশ যেহেতু আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ‘রোম সনদে’ (Rome Statute) স্বাক্ষরকারী একটি দেশ, সেহেতু আইসিসি-র প্রসিকিউশন টিমের পক্ষে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া যেকোনো বড় ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রাথমিক তদন্ত করার একতিয়ার রয়েছে। [
- আইসিসি প্রতিনিধি দলের সফর: এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পরিস্থিতির গভীরতা এবং তথ্যপ্রমাণ যাচাই করতে আইসিসি (ICC)-র একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করেছে।
২. জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট ও বৈশ্বিক চাপ
- জাতিসংঘের ওএইচসিএইচআর (OHCHR) প্রতিবেদন: জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের (OHCHR) ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং দল ২০২৫ সালের শুরুতে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আন্দোলনকারীদের দমনে “নিষ্ঠুর ও পদ্ধতিগত দমনপীড়ন” চালানো হয়েছিল এবং নিরাপত্তা বাহিনী নির্বিচারে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
- আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভূমিকা: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল শুরু থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের জন্য তৎকালীন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়ে আসছে।
৩. অভ্যন্তরীণ ট্রাইব্যুনাল (ICT) বনাম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড
- গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি: বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) ইতিমধ্যে শেখ হাসিনাসহ তার মন্ত্রিসভার সদস্য ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।
- সুষ্ঠু বিচারের আন্তর্জাতিক চাপ: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) এবং অন্যান্য বৈশ্বিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে আসামিপক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ পায় এবং পুরো বিচার প্রক্রিয়াটি যেন রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও ফেয়ার ট্রায়াল (Fair Trial) মেনে সম্পন্ন হয়।
৪. কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও ভারতের ওপর চাপ
- প্রত্যর্পণ (Extradition) চুক্তি: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালের একটি অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইলে ভারতের ওপর দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক আইনি চাপ তৈরি হবে।
- ভারতের ভূ-রাজনৈতিক দ্বিধা: শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া ভারত এখন আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা এবং বাংলাদেশের সাথে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার এক বড় ধরনের টানাপোড়েনের মুখোমুখি।
আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, আইসিসি (ICC)-তে দায়ের হওয়া অভিযোগ এবং জাতিসংঘের ওএইচসিএইচআর (OHCHR) রিপোর্টের কারণে শেখ হাসিনার ওপর বৈশ্বিক চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি শুধু তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার আইনি লড়াইকেই বেগবান করছে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার রাজনৈতিক আশ্রয়ের পথকেও অত্যন্ত সংকুচিত করে তুলছে।
চূড়ান্ত মূল্যায়ন: প্রত্যাবর্তন কি একেবারেই অসম্ভব?
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন বা তাকে ফিরিয়ে আনা আইনি এবং ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার কারণে অত্যন্ত কঠিন হলেও, একে একেবারেই অসম্ভব বলা যায় না। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে ভারতের কাছে তার প্রত্যর্পণের জন্য আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
তার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা এবং প্রতিবন্ধকতাগুলোর একটি চূড়ান্ত মূল্যায়ন নিচে দেওয়া হলো:
১. কেন প্রত্যাবর্তন অসম্ভব নয় (অনুকূল উপাদানসমূহ)
- আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ: বাংলাদেশের নবনির্বাচিত বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক নোট ভার্বালের (Note Verbale) মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছে। মে ২০২৬-এ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ নিশ্চিত করেছেন যে, বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী তাকে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
- বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক চুক্তি: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালের একটি অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty) কার্যকর রয়েছে। এই চুক্তির ধারা অনুযায়ী, হত্যা বা গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো আসামি “রাজনৈতিক অপরাধের” অজুহাত দেখিয়ে পার পেতে পারেন না।
- মৃত্যুদণ্ডের রায় ও আইনি চাপ: বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) শেখ হাসিনাকে গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। এই রায়ের পর ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি এবং ভারতের ওপর আন্তর্জাতিক আইনি চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
- ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা (Realpolitik): বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সাথে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত, সীমান্ত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে ভারত সরকার একসময় শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে পারে, যা সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষির ওপর নির্ভরশীল।
২. প্রধান প্রধান আইনি ও রাজনৈতিক বাধা (কেন এটি কঠিন)
- ভারতের অভ্যন্তরীণ আইনি সুরক্ষাকবচ: চুক্তিতে একটি ধারা রয়েছে যে, যদি ভারত মনে করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো “ন্যায়বিচারের স্বার্থে বা সদ্বিশ্বাসে” করা হয়নি, কিংবা দেশে ফিরলে তিনি রাজনৈতিক নিপীড়ন বা পক্ষপাতমূলক বিচারের মুখোমুখি হবেন, তবে ভারত প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান বা দীর্ঘায়িত করতে পারে। বর্তমানে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MEA) অনুরোধটি দীর্ঘ আইনি পর্যালোচনার অধীনে রেখেছে।
- রাজনৈতিক আশ্রয়ের বিকল্প: শেখ হাসিনা যদি ভারত থেকে অন্য কোনো বন্ধুভাবাপন্ন দেশে (যেমন রাশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ) চলে যান, তবে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াটি আরও জটিল রূপ নেবে।
- ঐতিহাসিক মিত্রতা: ভারতের বর্তমান মোদি সরকারের জন্য শেখ হাসিনা দীর্ঘদিনের এক বিশ্বস্ত রাজনৈতিক মিত্র। তাকে সরাসরি বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনালের হাতে তুলে দেওয়া ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বিশ্বস্ততার ভাবমূর্তির জন্য একটি বড় ধাক্কা হতে পারে。
৩. স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা ও আইনি ঝুঁকি
সম্প্রতি শেখ হাসিনা নিজেই ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন যে, দেশে গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অধিকার ফিরে এলে তিনি “খুব শীঘ্রই” বাংলাদেশে ফিরবেন। তবে আইনি বিশ্লেষকদের মতে, তার এই রাজনৈতিক বক্তব্য বাস্তবে রূপ নেওয়া প্রায় অসম্ভব, কারণ:
- তার বিরুদ্ধে সক্রিয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।
- তিনি ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত এবং পলাতক থাকায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপিল করার সুযোগ হারিয়েছেন।
- ফলস্বরূপ, তিনি যদি স্বেচ্ছায় বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন, তবে বিমানবন্দরে পৌঁছানো মাত্রই তাকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার এবং কারাগারে প্রেরণ করা হবে।
সংক্ষেপে: শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিকভাবে ভারতের সদিচ্ছা এবং আইনিভাবে প্রত্যর্পণ চুক্তির ধারাগুলোর ব্যাখ্যার ওপর ঝুলে রয়েছে। তাই এটি রাতারাতি বা খুব সহজে সম্ভব না হলেও, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় ও কূটনৈতিক চাপের মুখে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রত্যাবর্তন একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না
আপনার মতামত কি?
আইনি ও রাজনৈতিক এই বাস্তবতার মুখে শেখ হাসিনা কি আর কখনো দেশে ফিরতে পারবেন বলে আপনি মনে করেন? আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্ট করে জানান।
দেশ-বিদেশের রাজনীতি, সুশাসন এবং সমসাময়িক ঘটনার এমন গভীর ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ নিয়মিত পড়তে ভিজিট করুন পালস বাংলাদেশ | Pulse Bangladesh।
বিষয়ঃ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: জাতীয়
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ গণপরিষদের কার্যবিবরণী, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের সংবিধানের মূল প্রস্তাবনা।
আজ ৪ নভেম্বর, ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ সংবিধান দিবস’। ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ সময় এই দিনটি উপেক্ষিত থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭২ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয়েছিল। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ১১ মাসের মাথায় কীভাবে একটি বিশ্বমানের ও যুগোপযোগী সংবিধান লাভ করেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। নিচে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা ও গ্রহণের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

১. পটভূমি ও গণপরিষদ আদেশ জারি
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করার পর একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নিজস্ব আইনি কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। এর পরদিনই অর্থাৎ ১১ জানুয়ারি তিনি ‘অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’ জারি করেন। এর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তন করা হয়।
পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ জারি করা হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে এই গণপরিষদ গঠিত হয়, যার মূল দায়িত্ব ছিল দেশের জন্য একটি স্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন করা। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়।
২. খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন
গণপরিষদের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘সংবিধান প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটিতে একমাত্র নারী সদস্য ছিলেন বেগম রাজিয়া বানু। এছাড়া তৎকালীন বিরোধী দলের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
কমিটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের কাজ শুরু করে। বিভিন্ন দেশের সংবিধান পর্যালোচনা এবং দেশের আপামর জনসাধারণের মতামত সংগ্রহের জন্য তারা ব্যাপক উদ্যোগ নেন। সর্বস্তরের জনগণের কাছ থেকে মোট ৯৮টি লিখিত প্রস্তাব সংগ্রহ করা হয়েছিল। ভারত ও যুক্তরাজ্যের সংবিধানকে মূল ভিত্তি ধরে খসড়া তৈরির কাজ এগিয়ে চলে।
৩. খসড়া উত্থাপন ও বিতর্ক
দীর্ঘ কঠোর পরিশ্রমের পর ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ড. কামাল হোসেন খসড়া সংবিধান বিল আকারে উত্থাপন করেন। ১৯ অক্টোবর থেকে এর ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়।
সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদ ও ধারা নিয়ে গণপরিষদে ব্যাপক বিতর্ক ও আলোচনা হয়। গণপরিষদের সদস্যরা বিভিন্ন সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। মোট ৪১টি অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার পর সংবিধানের প্রতিটি বিষয়কে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়।
৪. সংবিধান গ্রহণ ও কার্যকর
অবশেষে ৪ নভেম্বর, ১৯৭২ সালে গণপরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে ‘বাংলাদেশের সংবিধান’ গৃহীত হয়। সংবিধান গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, “এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত, এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।”
এর ঠিক দেড় মাস পর, অর্থাৎ বিজয়ের প্রথম বার্ষিকী—১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২ থেকে এই সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়। সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপিটি ছিল হাতে লেখা, যা শিল্পী হাশেম খানের নকশায় এবং প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার আবদুর রউফের হাতের লেখায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। এতে স্বাক্ষর করেছিলেন গণপরিষদের সদস্যবৃন্দ।
একটি দেশের সংবিধান কেবল কিছু আইনের সমষ্টি নয়, এটি রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল স্তম্ভ ছিল চারটি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সময়ের আবর্তে এই সংবিধানে বহু পরিবর্তন ও সংশোধনী আনা হলেও, ৪ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সবসময়ই অনস্বীকার্য। তরুণ প্রজন্মের জন্য নিজেদের অধিকার ও রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা বুঝতে সংবিধান রচনার এই ইতিহাস জানা অত্যন্ত জরুরি।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: অর্থনীতি
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank FX Reference), ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (EBL Currency Tracker), জাগোনিউজ২৪ মুদ্রা বাজার প্রতিবেদন এবং ওয়াইজ (Wise) রিয়েল-টাইম এক্সচেঞ্জ ডেটা।
বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিনিময় হার বা এক্সচেঞ্জ রেট পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশেষ করে প্রবাসী আয় (Remittance) পাঠানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ডলার, ইউরো ও মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতের বর্তমান রেট জানা অত্যন্ত জরুরি। ৪ নভেম্বর ২০২৬ তারিখের সর্বশেষ অফিসিয়াল ডেটা এবং খোলা বাজারের লেনদেন হারের ওপর ভিত্তি করে আজকের বিস্তারিত রেট নিচে তুলে ধরা হলো।
১. একনজরে আজকের প্রধান প্রধান বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার
আন্তর্জাতিক ইন্টারব্যাংক মার্কেট এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী আজকের প্রধান তিনটি মুদ্রার গড় ক্রয় (Buying Rate) ও বিক্রয় মূল্য (Selling Rate) নিচে দেওয়া হলো:
- মার্কিন ডলার (USD): বাংলাদেশ ব্যাংকের আজকের অফিসিয়াল এফএক্স রেফারেন্স রেট অনুযায়ী প্রতি ডলারের মূল্য ১২৪.৩৫ টাকা থেকে ১২৪.৫০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। ব্যাংকভেদে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য এটি ১২৩.৩০ টাকা (ক্রয়) এবং ১২৪.৮০ টাকা (বিক্রয়) পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে।
- ইউরো (EUR): ইউরোপীয় একক মুদ্রা ইউরোর দাম আন্তর্জাতিক বাজারে আজ কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশি টাকায় আজ ১ ইউরোর গড় বাজার মূল্য বা মিড-মার্কেট রেট প্রায় ১৪০.১১ টাকা। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে এটি সর্বোচ্চ ১৪১.৭৪ টাকা পর্যন্ত বিক্রয় হচ্ছে।
- মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (MYR): মালয়েশিয়া প্রবাসী ভাই-বোনদের জন্য আজ রিঙ্গিতের রেট বেশ স্থিতিশীল। ৪ নভেম্বর ২০২৬-এর লাইভ কারেন্সি চার্ট অনুযায়ী ১ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত সমান ৩০.৬৩ টাকা (মিড-মার্কেট রেট)। বিভিন্ন রেমিট্যান্স হাউজ ও ব্যাংকে এটি ৩০.২৫ টাকা (ক্রয়) এবং ৩০.৬৬ টাকা (বিক্রয়) সীমার মধ্যে লেনদেন হচ্ছে।

২. বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেলে মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (MYR) রেটের তুলনা
প্রবাসীদের সুবিধার্থে নিচে একটি তুলনামূলক তালিকা দেওয়া হলো। মালয়েশিয়া থেকে ১০০০ রিঙ্গিত বাংলাদেশে পাঠালে আজ কোন মাধ্যমে চার্জ ছাড়া আনুমানিক কত টাকা পাওয়া যাবে তা দেখে নিন:
- Wise (অনলাইন ট্রান্সফার): বিনিময় হার ৩০.৫৪ টাকা। ১০০০ রিঙ্গিতে পাবেন ৩০,৫৪০ টাকা।
- Agrani Remittance House: বিনিময় হার ৩০.৪৫ টাকা। ১০০০ রিঙ্গিতে পাবেন ৩০,৪৫০ টাকা।
- Al-Rajhi Bank: বিনিময় হার ৩০.৪৪ টাকা। ১০০০ রিঙ্গিতে পাবেন ৩০,৪৪Tokens বা টাকা।
- Western Union (ক্যাশ পিকআপ): বিনিময় হার ৩০.৩৯ টাকা। ১০০০ রিঙ্গিতে পাবেন ৩০,৩৯০ টাকা।
৩. আন্তর্জাতিক কার্ড পেমেন্ট ও ই-কমার্স রেট
আপনি যদি আন্তর্জাতিক ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড (যেমন- EBL, City Bank, বা অন্যান্য ডুয়াল কারেন্সি কার্ড) ব্যবহার করে ই-কমার্স পারচেজ কিংবা ফেসবুক/গুগল বিজ্ঞাপনের বিল পরিশোধ করতে চান, তবে আপনার জন্য রেট কিছুটা ভিন্ন হবে। আজ বিভিন্ন ব্যাংকের কার্ড এনডোর্সমেন্ট রেট প্রতি ডলারের জন্য ১২৪.৯৫ টাকা থেকে ১২৫.২০ টাকা পর্যন্ত ধার্য করা হয়েছে (ভ্যাট ও ব্যাংক প্রসেসিং ফি আলাদা প্রযোজ্য)।
- রেট পরিবর্তনশীল: কারেন্সি এক্সচেঞ্জ রেট বা মুদ্রার মান প্রতি সেকেন্ডে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। তাই টাকা কিংবা রেমিট্যান্স পাঠানোর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে আপনার নিকটস্থ ব্যাংক শাখা বা অনুমোদিত মানি চেঞ্জারের লাইভ স্ক্রিন থেকে রেটটি কনফার্ম করে নিন।
- হুন্ডি বা অবৈধ মাধ্যম বর্জন করুন: যেকোনো ধরনের অবৈধ হুন্ডি চ্যানেলে টাকা পাঠানো আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল কিংবা সরকার অনুমোদিত মানি ট্রান্সফার অ্যাপের মাধ্যমে টাকা পাঠালে সরকার ঘোষিত ২.৫% নগদ প্রণোদনা সরাসরি আপনার অ্যাকাউন্টে যুক্ত হবে এবং আপনার কষ্টার্জিত অর্থ শতভাগ নিরাপদ থাকবে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
বিষয়ঃ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৩ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইতিহাস
তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট, বণিক বার্তা, প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪, বাংলা ট্রিবিউন ও যুগান্তরের প্রতিবেদন এবং আদালতের রায়-সংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদন
৩ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত, অন্ধকারের दिन এবং দ্বিতীয় কলঙ্কময় অধ্যায়, যা ‘জেল হত্যা দিবস’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নিরাপদ প্রকোষ্ঠে বন্দি অবস্থায় স্বাধীন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার চার জাতীয় নেতা হলেন:
- সৈয়দ নজরুল ইসলাম (মুজিবনগর সরকারের সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি)
- তাজউদ্দীন আহমদ (বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী)
- ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী (মুজিবনগর সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী ও পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী)
- এ এইচ এম কামারুজ্জামান (মুজিবনগর সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী)
নেপথ্যের প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক ক্রান্তিকাল
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে একদল সেনা সদস্য। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। তৎকালীন এই খুনি সরকার আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে, যার ধারাবাহিকতায় এই শীর্ষ চার নেতাকেও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে খন্দকার মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে একটি পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান (Counter-coup) শুরু হয়। খুনি চক্র বুঝতে পেরেছিল যে তাদের পতন আসন্ন। যদি আওয়ামী লীগের এই শীর্ষ চার নেতা জীবিত থাকেন, তবে তারা পুনরায় দেশের হাল ধরবেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ পরিচালিত হবে। তাই দেশকে সম্পূর্ণ নেতৃত্বহীন ও অভিভাবকহীন করার চূড়ান্ত নীল নকশা হিসেবে কারাগারে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।

সেই ভয়াল রাতে কারাগারে যা ঘটেছিল
৩ নভেম্বর ভোররাত আনুমানিক ৪টার দিকে খাকি পোশাক পরিহিত এবং স্টেনগান ও এসএলআর (SLR)-এ সজ্জিত পাঁচজন সেনাসদস্য একটি পিকআপ ভ্যানে করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আসে। এদের নেতৃত্বে ছিলেন রিসালদার মোসলেম উদ্দিন।
তৎকালীন উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজনস) কাজী আবদুল আউয়াল প্রথমে তাদের কারাগারে ঢুকতে বাধা দেন। তবে বঙ্গভবন থেকে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদের সরাসরি নির্দেশ পাওয়ার পর কারা কর্তৃপক্ষ খুনিদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। এরপর জেলার আমিনুর রহমানকে নির্দেশ দেওয়া হয় আলাদা আলাদা সেলে থাকা চার নেতাকে ডেকে এনে একটি কক্ষে একত্রিত করার জন্য। চার নেতাকে একটি কক্ষে একত্র করার পর ঘাতকেরা তাদের ওপর ব্রাশফায়ার করে। গুলি করার পর মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাদের শরীর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়।
মামলার এজাহার (FIR) ও তদন্তের বিবরণ
হত্যাকাণ্ডের পরদিন, অর্থাৎ ৪ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে তৎকালীন ডিআইজি প্রিজনস কাজী আবদুল আউয়াল বাদী হয়ে লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলার প্রথম তথ্য বিবরণী বা এজাহারে (FIR) উল্লেখ করা হয় যে, ৩ নভেম্বর ভোররাতে রাষ্ট্রপতির মৌখিক নির্দেশের কথা বলে কয়েকজন অবাধ্য সেনাসদস্য জোরপূর্বক কারাগারে প্রবেশ করে। তারা তৎকালীন জেনারেলে সেলে বন্দি জাতীয় চার নেতাকে এক কক্ষে জড়ো করে স্টেনগান ও রাইফেল দিয়ে ব্রাশফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করে।
মামলার পর তৎকালীন উপ-পুলিশ সুপার সাইফুদ্দিন আহমেদকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হলেও তাকে কারাগারে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে সামরিক সরকারগুলোর অনীহার কারণে দীর্ঘ ২১ বছর মামলার নথিপত্র, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং বিচার বিভাগীয় কমিশনের ফাইল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে গায়েব করে দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে আইনগত বাধা দূর হওয়ার পর সিআইডি (CID)-র তৎকালীন কর্মকর্তা আব্দুল কাহাত আকন্দ নতুনভাবে তদন্তভার গ্রহণ করেন এবং ১৯৯৮ সালে ২৩ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেন।
তৎকালীন আইনি নথি ও আদালতের চূড়ান্ত রায়
দীর্ঘ আইনি জটিলতা শেষে বিচারিক আদালত ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক সর্বমোট ১৫ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়:
- মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি (৩ জন): সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী শাহ এবং দফাদার আবুল হাসেম মৃধাকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
- যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি (১২ জন): অপরাধের ষড়যন্ত্র ও সহযোগিতার জন্য (দণ্ডবিধির ৩০২/১০৯ ধারা) খন্দকার আব্দুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, রাশেদ চৌধুরী, আহমেদ শরিফুল হোসেন, আব্দুল মাজেদ, মোহাম্মদ কিসমত হাশেম এবং নাজমুল হোসেন আনসারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
(উল্লেখ্য, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে ফারুক রহমান, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও মহিউদ্দিন আহমেদকে অন্য একটি মামলা অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে)।
২০০৮ সালের হাইকোর্টের বিতর্কিত রায় ও ২০১৩ সালের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন
২০০৪ সালের বিচারিক (নিম্ন) আদালত রায় দিলেও ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে (تৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে) হাইকোর্ট বিভাগ এই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর একটি অত্যন্ত বিতর্কিত রায় প্রদান করেন।
হাইকোর্টের তৎকালীন বেঞ্চ নিম্ন আদালতের রায় সংশোধন করে কেবল ১ জন আসামির (রিসালদার মোসলেম উদ্দিন) মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। অন্যদিকে, নিম্ন আদালত কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য ২ জন আসামি—দফাদার মারফত আলী শাহ এবং দফাদার আবুল হাসেম মৃধাকে সম্পূর্ণ খালাস দেওয়া হয়। সেই সাথে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৪ জন আসামি—সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা এবং এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকেও এই মামলা থেকে খালাস দেওয়া হয়। আদালতের যুক্তি ছিল, এই চারজনের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রে সরাসরি জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ প্রসিকিউশন উপস্থাপন করতে পারেনি।
২০০৯ সালে এই বিতর্কিত রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি) দায়ের করা হয়। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ হাইকোর্টের ২০০৮ সালের রায়টিকে আইনি ভিত্তির অভাব ও ভুল পর্যালোচনার কারণে সম্পূর্ণ বাতিল (Dismiss) করে দেন।
আপিল বিভাগ তাদের রায়ে উল্লেখ করেন যে, জাতীয় চার নেতাকে হত্যার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। এটি ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতা এবং একই খুনি চক্রের পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক নীল নকশা। তাই ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকে আসামিদের খালাস দেওয়া আইনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ ছিল। আপিল বিভাগ ২০০৮ সালের হাইকোর্টের খালাসের সিদ্ধান্ত বাতিল করে ২০০৪ সালের নিম্ন আদালতের মূল রায়টিকেই হুবহু বহাল রাখেন। এর ফলে খালাস পাওয়া দফাদার মারফত আলী শাহ এবং দফাদার আবুল হাসেম মৃধার মৃত্যুদণ্ড পুনরায় পুনর্বহাল হয় এবং বাকিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকে।
পলাতক আসামিদের বর্তমান অবস্থা ও প্রত্যর্পণের আইনি বাধা
আইনি নথির ১১ জন সাজাপ্রাপ্ত মূল আসামির মধ্যে ১০ জনই দীর্ঘ সময় ধরে পলাতক রয়েছেন এবং ১ জনের সাজা কার্যকর করা হয়েছে। এদের বর্তমান সর্বশেষ অবস্থা নিম্নরূপ:
১. রিসালদার মোসলেম উদ্দিন (মৃত্যুদণ্ড): পলাতক; ভারতে আত্মগোপনে থাকার গুঞ্জন থাকলেও সুনির্দিষ্ট অবস্থান এখনও অজানা।
২. দফাদার মারফত আলী শাহ (মৃত্যুদণ্ড): পলাতক; তার বর্তমান অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি।
3. দফাদার আবুল হাসেম মৃধা (মৃত্যুদণ্ড): পলাতক; নিখোঁজ ও অবস্থান অজানা।
৪. লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আব্দুর রশিদ (যাবজ্জীবন): পলাতক; লিবিয়া ও পাকিস্তানে বিভিন্ন সময়ে অবস্থান করার তথ্য রয়েছে।
৫. লে. কর্নেল (অব্যাহতি) শরিফুল হক ডালিম (যাবজ্জীবন): পলাতক; পাকিস্তান ও যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হয়।
৬. লে. কর্নেল এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী (যাবজ্জীবন): পলাতক;加拿大য় রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন।
৭. লে. কর্নেল রাশেদ চৌধুরী (যাবজ্জীবন): পলাতক; যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন।
৮. ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসার (যাবজ্জীবন): পলাতক; কানাডায় অবস্থান করছেন।
৯. মেজর (অব.) আহমেদ শরিফুল হোসেন (যাবজ্জীবন): পলাতক; অবস্থান অজ্ঞাত।
১০. াক্যাপ্টেন (অব.) মোহাম্মদ কিসমত হাশেম (যাবজ্জীবন): পলাতক থাকা অবস্থায় কানাডায় মৃত্যুবরণ করেছেন।
১১. ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আব্দুল মাজেদ (যাবজ্জীবন): সাজা কার্যকর। দীর্ঘদিন ভারতে পলাতক থাকার পর ২০২০ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০২০ সালের ১২ এপ্রিল তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসামিদের ফিরিয়ে আনার আইনি বাধা:
লে. কর্নেল এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী কানাডায় এবং লে. কর্নেল রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক থাকলেও দেশ দুটির অভ্যন্তরীণ আইনি জটিলতার কারণে তাদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
কানাডার ‘Extradition Act’ (কানাডিয়ান প্রত্যর্পণ আইন) এবং ‘কানাডিয়ান চার্টার অব রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমস’-এর ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী—কানাডা সরকার এমন কোনো দেশে কোনো ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ বা ফেরত পাঠাতে পারে না যেখানে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যেহেতু নূর চৌধুরী বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, তাই কানাডা তাকে ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।
অন্যদিকে, রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় (Asylum) নিয়ে অবস্থান করছেন। আমেরিকার আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে নিজ দেশে ফেরত গেলে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা অবিচারের শিকার হতে পারেন, তবে তাকে সুরক্ষামূলক আশ্রয় দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত চাওয়ার পর মার্কিন বিচার বিভাগ (DOJ) তার রাজনৈতিক আশ্রয়ের ফাইলটি নতুন করে পর্যালোচনার উদ্যোগ নিলেও, সে দেশের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং আদালতের আপিল ব্যবস্থার কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও ঝুলে রয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশের সাথে কানাডা বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দ্বিপাক্ষিক ও কার্যকর প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty) না থাকাও একটি বড় আইনি প্রতিবন্ধকতা।
জাতীয় চার নেতার রাজনৈতিক সততা, সাহস এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অবিচল আনুগত্য চিরকাল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



