অপরাধ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
রাজনৈতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: 7 জুন ২০২৬
ফাঁসির আদেশ বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর বিচারকদের কলমের নিব ভেঙে ফেলার পেছনে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই, বরং এটি একটি ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও প্রতীকী প্রথা। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হওয়া এই প্রথার পেছনে মূলত চারটি গভীর মানসিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে:
১. দণ্ডটি যেন আর পরিবর্তন করা না যায় (প্রতীকী অর্থ)

একটি আইনি রায় বা আদেশ যখন বিচারক একবার লিখে স্বাক্ষর করে দেন, তখন আইনগতভাবে বিচারক নিজেই সেই রায় আর সংশোধন বা বাতিল করতে পারেন না। কলমের নিবটি ভেঙে ফেলার অর্থ হলো—যে রায় একবার দেওয়া হয়ে গেছে, তা চিরতরে চূড়ান্ত এবং ওই কলম দিয়ে সেই রায় আর কোনোভাবেই বদলানো সম্ভব নয়।
২. অনুশোচনা ও মানসিক দায়মুক্তি
ইসলামী আইন বা সাধারণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে, জীবন দেওয়ার মালিক একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। একজন মানুষ হয়ে অন্য একজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার আদেশ দেওয়া অত্যন্ত কঠিন এবং মানসিক চাপেরই কাজ। বিচারকরা এই নিব ভেঙে মূলত বোঝাতে চান যে, তারা আইনের শাসন বজায় রাখতে বাধ্য হয়ে এই আদেশ দিয়েছেন, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে একজন মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে চাননি। এটি এক ধরণের মানসিক দায়মুক্তির প্রতীক।
৩. কলমটিকে ‘অপবিত্রতা’ থেকে রক্ষা করা
যে কলমটি একজনের জীবন কেড়ে নেওয়ার বা ফাঁসির আদেশের মতো একটি চরম নির্মম কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, তা যেন পরবর্তীতে অন্য কোনো সাধারণ বা শুভ কাজে ব্যবহৃত না হয়, সেই ধারণা থেকে নিবটি নষ্ট করে দেওয়া হয়।
৪. ‘অপরাধের’ প্রতীকী সমাপ্তি
যেহেতু ফাঁসির আদেশ পাওয়া ব্যক্তিটি সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক বা ক্ষতিকর কোনো অপরাধ করেছে, তাই বিচারক নিবটি ভেঙে ফেলার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে এই বার্তা দেন যে—অপরাধীর অপরাধের অধ্যায়ের সাথে সাথে এই কলমের আয়ুও এখানেই শেষ হলো।
বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের বিচার ব্যবস্থায় ফাঁসি বা মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া এবং কিছু ঐতিহাসিক দিক নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনি প্রক্রিয়া
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (CrPC)-এর নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশে কোনো আসামির ফাঁসির রায় এক দিনের সিদ্ধান্তেই কার্যকর হয় না। এটি একটি দীর্ঘ এবং অত্যন্ত সতর্ক আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়
- ডেথ রেফারেন্স (Death Reference): জেলা ও দায়রা জজ আদালত কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে আইন অনুযায়ী তা সরাসরি কার্যকর করা যায় না ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী, নিম্ন আদালতের এই রায় অনুমোদনের জন্য উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট বিভাগে) পাঠাতে হয়, যাকে ‘ডেথ রেফারেন্স’ বলা হয়
- আপিল বিভাগ ও রিভিউ: হাইকোর্ট বিভাগ যদি নিম্ন আদালতের দেওয়া ফাঁসির রায় বহাল রাখে, তবে আসামির সুযোগ থাকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার [lawyersnjurists.com, researchgate.net]। আপিল বিভাগেও রায় বহাল থাকলে আসামি শেষ আইনি লড়াই হিসেবে ‘রিভিউ’ বা পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারেন।
- রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা: সব আইনি প্রক্রিয়া (আপিল ও রিভিউ) খারিজ হয়ে যাওয়ার পর আসামির শেষ আশ্রয় থাকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কাছে সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘মার্সি পিটিশন’ বা প্রাণভিক্ষার আবেদন করা [old.seu.edu.bd]。 রাষ্ট্রপতি এই আবেদন নাকচ করে দিলে রায় কার্যকরের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয় [ntvbd.com]।
- কারাগারের শেষ ধাপ: রাষ্ট্রপতির চিঠি কারাগারে পৌঁছানোর পর কারা কর্তৃপক্ষ আসামির পরিবারকে শেষবার দেখা করার সুযোগ দেয় [ntvbd.com]। রায় কার্যকরের আগে আসামির স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী তওবা বা শেষ প্রার্থনা করানো হয় [ntvbd.com]। আইনের নিয়ম অনুযায়ী (CrPC Section 368), আসামিকে “ঘাড়ের সাহায্যে ঝুলিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত” (Hanged by the neck until he be dead) ফাঁসি দেওয়া হয় [en.wikipedia.org]।
২. উপমহাদেশের বিচার ব্যবস্থার কিছু ঐতিহাসিক রায় ও মাইলফলক

ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর সময় পর্যন্ত এ অঞ্চলের বিচার ব্যবস্থায় কিছু ঐতিহাসিক মামলা সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে:
- ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি (১৯০৮): ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সর্বকনিষ্ঠ বাঙালি বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। বিহারের মুজাফফরপুরে অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রফুল্ল চাকীর সাথে মিলে তিনি বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন। অল্পের জন্য কিংসফোর্ড বেঁচে গেলেও দুই ব্রিটিশ নারী নিহত হন। মাত্র ১৮ বছর ৭ মাস ১১ দিন বয়সে ফাঁসির মঞ্চে হাসিমুখে আত্মদান করেন তিনি।

মুজাফফরপুর ষড়যন্ত্র মামলা ও ফাঁসি
- ঘটনা: ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল বিহারের মুজাফফরপুরে রাতের অন্ধকারে ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডের গাড়িতে বোমা ছোড়া হয়। কিন্তু সেই গাড়িতে কিংসফোর্ড না থাকায় মিসেস কেনেডি ও তাঁর কন্যা নিহত হন।
- গ্রেপ্তার: ঘটনার পর প্রফুল্ল চাকী গ্রেপ্তারের আগে আত্মহত্যা করেন এবং ক্ষুদিরাম গ্রেপ্তার হন। বিচারে তাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। [
- ফাঁসি: ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ভোর ৪টায় মুজাফফরপুর জেলে ক্ষুদিরামের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। [
- সাহসিকতা: মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ ইচ্ছা জানতে চাওয়া হলে তিনি নির্ভীকভাবে বলেছিলেন, “আমি ভালো বোমা বানাতে পারি, মৃত্যুর আগে সারা ভারতবাসীকে সেটা শিখিয়ে দিয়ে যেতে চাই।”
- বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড মামলা: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড মামলা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সহকারী এ এফ এম মোহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেন। ১৯৭৫ সালে জারি করা ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশের কারণে সুদীর্ঘ সময় এই হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ ছিল।

আইনি প্রতিবন্ধকতা ও বিচারের পথ উন্মুক্তকরণ
- ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ: ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ খুনিদের আইনি সুরক্ষা দিতে এই অধ্যাদেশ জারি করেন।
- অধ্যাদেশ বাতিল: ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১২ নভেম্বর জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বিচারের পথ উন্মুক্ত করে。
- অভিযোগপত্র: ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি পুলিশের সিআইডি (CID) ২০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রথম চার্জশিট দাখিল করে।
বিচার প্রক্রিয়ার সময়রেখা ও রায়
- নিম্ন আদালতের রায়: ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকার তৎকালীন জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল মামলার রায়ে ১৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেন।
- হাইকোর্টের রায়: ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চের বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম ১২ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে বাকিদের খালাস দেন।
- আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়: ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আসামিদের আপিল খারিজ করে চূড়ান্তভাবে ১২ জনের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখে
সাজা কার্যকরের সর্বশেষ অবস্থা
মামলায় চূড়ান্ত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জন আসামির মধ্যে এখন পর্যন্ত ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে, ১ জন বিদেশে পলাতক অবস্থায় মারা গেছেন এবং বাকি ৫ জন এখনও বিভিন্ন দেশে আত্মগোপন করে আছেন।
| সাজা ও বর্তমান স্থিতি | আসামিদের নাম | বিবরণ ও কার্যকরের সময় |
|---|---|---|
| ফাঁসি কার্যকর (প্রথম পর্যায়) | ১. সৈয়দ ফারুক রহমান ২. সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান ৩. বজলুল হুদা ৪. এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ ৫. মহিউদ্দিন আহমেদ | ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি দিবাগত রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে একযোগে এই ৫ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। |
| ফাঁসি কার্যকর (দ্বিতীয় পর্যায়) | ৬. আবদুল মাজেদ | দীর্ঘকাল ভারতে পালিয়ে থাকার পর ২০২০ সালের এপ্রিলে ঢাকায় গ্রেপ্তার হন এবং ১২ এপ্রিল কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁর ফাঁসি কার্যকর হয়। |
| পলাতক অবস্থায় মৃত্যু | ७. আবদুল আজিজ পাশা | ২০০১ সালের ২ জুন জিম্বাবুয়েতে পলাতক থাকা অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে মারা যান। |
| এখনও পলাতক আসামি | ৮. খন্দকার আবদুর রশিদ ৯. শরিফুল হক ডালিম ১০. এ এম রাশেদ চৌধুরী (যুক্তরাষ্ট্র) ১১. এস এইচ বি এম নূর চৌধুরী (কানাডা) ১২. মোসলেম উদ্দিন | ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি থাকা সত্ত্বেও এই ৫ খুনিকে এখনো দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। |
এই বিচার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার মাধ্যমে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে গণ্য হয়।
- মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল):
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত বিশেষ আদালত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের আমলে প্রণীত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর অধীনে এই আদালত পরিচালিত হয়ে আসছে।

ট্রাইব্যুনাল গঠনের ইতিহাস ও বিবর্তন
- ১১৯৩ সালের আইন: ১৯৭৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য মূল আইনটি পাস করা হয়।
- ২০১০ সালের পুনর্গঠন: মুক্তিযুদ্ধের ৩৯ বছর পর ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করা হয়।
- ২০২৪ সালের রূপান্তর: ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচারের লক্ষ্যে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে। [
আইনি সংস্কার ও সাম্প্রতিক সংশোধনীসমূহ
বিচারের পরিধি বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে ট্রাইব্যুনাল আইনে ধারাবাহিক কিছু ঐতিহাসিক সংশোধন আনা হয়েছে:
- রাজনৈতিক দল ও সংগঠন নিষিদ্ধকরণ: ২০২৫ সালের মে মাসে আইনে বড় সংশোধনী এনে ব্যক্তি ছাড়াও কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী করে তাদের নিবন্ধন বাতিল বা নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া হয়।
- জনপ্রতিনিধিত্ব ও নির্বাচনে নিষেধাজ্ঞা: ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে জারি করা তৃতীয় সংশোধনী অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালে কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (Formal Charge) দাখিল হলে তিনি আর জাতীয় বা স্থানীয় কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না এবং সরকারি পদে বসতে পারবেন না।
- গুমের (Enforced Disappearance) বিচার: ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পাস করে গুমের ঘটনাকে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক এক্তিয়ারভুক্ত করা হয়।
বিচার প্রক্রিয়ার মাইলফলক রায়সমূহ
১. ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার
২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের মোট ৫৭টি মামলার রায় দেয়। এর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ৬ জন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়:
- জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা আব্দুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামী এবং মীর কাসেম আলী।
- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।
২. ২০২৪ সালের জুলাই গণহত্যার বিচার
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ট্রাইব্যুনালে জুলাই বিপ্লবের গণহত্যা ও নির্যাতনের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা ও প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় দেয়।
ট্রাইব্যুনালের বর্তমান বিচারিক কাঠামো
| পদের নাম | বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব |
|---|---|
| চীফ প্রসিকিউটর | অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম |
| তদন্ত সংস্থা | আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তদন্ত সংস্থা |
| বিচারিক বেঞ্চ | ট্রাইব্যুনাল-১ এবং ট্রাইব্যুনাল-২ (সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের সমন্বয়ে গঠিত) |
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শিকার পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ইতিহাস, রাজনীতি ও সমসাময়িক বিষয়ের এমন চমৎকার ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণ নিয়মিত পড়তে ভিজিট করুন পালস বাংলাদেশ | Pulse Bangladesh।
বিষয়ঃ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): ইতিহাস, বাঙালি সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আন্দোলন
- প্রকাশের তারিখ: ১২ অক্টোবর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): ১৯৬৫ সালের যুদ্ধভিত্তিক ঐতিহাসিক দলিল, খাজা শাহাবুদ্দীনের বেতার নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত ঘোষণা, এবং বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রামাণ্য ইতিহাস।
বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াই এবং রাজনৈতিক মুক্তির ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অবিচ্ছেদ্য প্রেরণার নাম। বিশেষ করে পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭-১৯৭১) যখনই বাঙালির জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আগ্রাসনের “কালো মেঘ” ঘনিয়ে এসেছে, তখনই রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছিলেন প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।
সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সেই লড়াইয়ে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা ও প্রাসঙ্গিকতার মূল দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানে। তারা বাঙালি সংস্কৃতিকে “ইসলাম-বিরোধী” বা “ভারতীয় সংস্কৃতি” হিসেবে তকমা দিয়ে তা মুছে ফেলার চেষ্টা করে। এই কৃত্রিম সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রসাহিত্য ও রবীন্দ্রসংগীত বাঙালির জন্য আত্মপরিচয় রক্ষার ঢাল হিসেবে কাজ করেছিল।
২. রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও বুদ্ধিজীবীদের লড়াই
১৯৬১ সালে বিশ্বকবির জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে পাকিস্তানি সরকার নানা বাধা সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে বাঙালি তাদের সংস্কৃতির ওপর সরাসরি চরম আঘাত হিসেবে গণ্য করে।
- এর প্রতিবাদে তৎকালীন পূর্ব বাংলার কবি, লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
- ছায়ানটের মতো সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন ও রবীন্দ্রসংগীতের চর্চাকে আন্দোলনের রূপ দেয়।
- এই লড়াইটি কেবল গান গাওয়ার অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছিল পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ সংগ্রাম।
৩. রাজনৈতিক আন্দোলনে রবীন্দ্রচেতনা
রাজনৈতিক শোষণের কালো মেঘ যখনই পূর্ব বাংলার আকাশকে গ্রাস করতে চেয়েছিল, তখনই রবীন্দ্রসংগীত বাঙালির মুক্তিকামী চেতনাকে উজ্জীবিত করেছে।
- ছয় দফা ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান: ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি জনসভায় রবীন্দ্রসংগীতের পরিবেশনা ছিল নিয়মিত ঘটনা।
- জাতীয় সংগীতের রূপরেখা: ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গানটি গেয়ে বাঙালি তাদের স্বাধীন সত্তার জানান দেয়, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্থান পায়।
৪. অন্ধত্ব ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে আলোকবর্তিকা
রবীন্দ্রনাথের দর্শন তার ভাল দিক কি কি ?
রবীন্দ্রনাথের দর্শন ছিল মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। পাকিস্তানি শাসকেরা যখন ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে বাঙালিদের বিভক্ত করতে চেয়েছিল, তখন রবীন্দ্র রচনাবলী বাঙালিকে শিখিয়েছে কীভাবে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে উদার ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন করতে হয়।

সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াই ও রাজনৈতিক মুক্তি অর্জনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দর্শন ও তার সৃষ্টির ইতিবাচক বা ভালো দিকগুলো ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। বাঙালির চেতনা গঠনে তার চিন্তাধারার প্রধান ভালো দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- অসাম্প্রদায়িক চেতনা: রবীন্দ্রনাথের পুরো দর্শনই ছিল মানুষের জয়গানে মুখর। তিনি ধর্ম, বর্ণ বা জাতির সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। পাকিস্তানি শাসকেরা যখন ধর্মকে পুঁজি করে বিভেদ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, তখন তাঁর এই অসাম্প্রদায়িক চিন্তা বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সাহায্য করেছে।
- মানবিক মূল্যবোধ ও উদারতা: তাঁর সাহিত্য ও কবিতা মানুষকে কূপমণ্ডূকতা, অন্ধত্ব এবং কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে উদার হতে অনুপ্রাণিত করে। এটি সমাজের গোঁড়ামি দূর করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
- ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অহংকার: রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাকে বিশ্বদরবারে এক অনন্য মর্যাদায় আসীন করেছেন। তাঁর সমৃদ্ধ সাহিত্যকর্মের কারণেই বাঙালি নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করার সাহস এবং শক্তি পেয়েছিল।
- প্রতিরোধের মানসিকতা: তাঁর গান ও কবিতা (যেমন: “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে” বা “সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান”) যেকোনো অন্যায়, শোষণ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এবং প্রতিবাদ করার সাহস জোগায়।
- প্রকৃতি ও স্বদেশের প্রতি নিখাদ প্রেম: তাঁর প্রতিটি দেশাত্মবোধক গান মানুষের মনে দেশের মাটির প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং দায়বদ্ধতা তৈরি করে, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দেশের মানুষের জন্য চরম আত্মত্যাগের মূল অনুপ্রেরণা ছিল।
রবীন্দ্রনাথের নেতিবাচক প্রচার ও সমালোচনার দিকগুলো
রবীন্দ্রনাথের চিন্তা, সাহিত্য এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদে তাঁর প্রভাবের কোনো বস্তুগত বা নৈতিক “খারাপ দিক” ছিল না। তবে, পাকিস্তান আমলের শাসকগোষ্ঠী ও কট্টরপন্থী মহল রবীন্দ্রচর্চাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিল এবং রবীন্দ্রচেতনার অতি-ব্যবহার নিয়ে পরবর্তী সময়ে কিছু সমাজতাত্ত্বিক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

সেই নেতিবাচক প্রচার ও সমালোচনার দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- পাকিস্তান সরকারের চোখে “ভারতের সাংস্কৃতিক আধিপত্য”: পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এবং তৎকালীন কট্টরপন্থী বুদ্ধিজীবীরা রবীন্দ্রনাথকে একজন “অমুসলিম এবং ভারতীয় কবি” হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, রবীন্দ্রচর্চার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানরা তাদের ইসলামী সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং ভারতের সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে মেনে নিচ্ছে।
- বাঙালি সংস্কৃতির বুর্জোয়া বা উচ্চবিত্ত রূপায়ণ: সমাজতাত্ত্বিক ও বামপন্থী সমালোচকদের একাংশের মতে, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও দর্শন মূলত জোড়াসাঁকোর জমিদার পরিবারের জমিদারি আমেজ এবং উচ্চবিত্ত (বুর্জোয়া) শ্রেণির জীবনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। ফলে পাকিস্তানি আমলে রবীন্দ্রচর্চাকে যখন বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান প্রতীক করা হয়, তখন তা সাধারণ খেটে খাওয়া গ্রামীণ মানুষের সংস্কৃতির চেয়ে শহুরে উচ্চ-মধ্যবিত্তের সংস্কৃতিকেই বেশি প্রতিনিধিত্ব করেছিল।
- অন্যান্য দেশীয় উপাদান উপেক্ষিত হওয়ার বিতর্ক: স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, বাঙালির সাংস্কৃতিক মুক্তির লড়াইয়ে রবীন্দ্রনাথের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীলতার কারণে বাংলার নিজস্ব লোকসংস্কৃতি (যেমন: লালন, হাসন রাজা বা গ্রামীণ লোকগান) এবং কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী ও গণমুখী চেতনা সাময়িকভাবে কিছুটা কম গুরুত্ব পেয়েছিল।
সংক্ষেপে, রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় কোনো ত্রুটি ছিল না; বরং তাঁর সৃষ্টিকে তৎকালীন পাকিস্তানি রাজনীতি যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছিল এবং পরবর্তীকালে রবীন্দ্রচর্চাকে যেভাবে শ্রেণি-স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে, সমালোচনাগুলো মূলত সেই চর্চাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত।
পাকিস্তান আমলে খাজা শাহাবুদ্দিনের রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধের যুক্তিগুলো
১৯৬৭ সালের ২২ জুন পাকিস্তানের তৎকালীন তথ্য ও বেতার মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন জাতীয় পরিষদে বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধের ঘোষণা দেন । এই সিদ্ধান্তের পেছনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের কট্টরপন্থী তল্পিবাহকদের প্রধান যুক্তিগুলো ছিল মূলত রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি ।
তাদের উত্থাপিত প্রধান যুক্তিগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- “পাকিস্তানের আদর্শের” পরিপন্থী: খাজা শাহাবুদ্দিনের মূল আনুষ্ঠানিক যুক্তি ছিল যে, রবীন্দ্রনাথের গান ও সৃষ্টি “পাকিস্তানি আদর্শের” (Ideology of Pakistan) সাথে খাপ খায় না । তিনি দাবি করেছিলেন, রেডিও-টেলিভিশনে এমন কোনো কিছু প্রচার করা যাবে না যা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শ ও সাংস্কৃতিক মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করে।
- রবীন্দ্রনাথ আমাদের সংস্কৃতির অংশ নন: জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে খাজা শাহাবুদ্দিন সরাসরি মন্তব্য করেছিলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির কেউ নন” । তাঁর যুক্তি ছিল, যেহেতু রবীন্দ্রনাথ একজন অমুসলিম এবং তাঁর জীবন ও কর্মের মূল ভিত্তি ছিল অবিভক্ত ভারত (বিশেষ করে হিন্দু সংস্কৃতি-ঘেঁষা), তাই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তানের জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে তাকে গণ্য করা যায় না ।
- “মুসলিম তমদ্দুন” বা ইসলামী সংস্কৃতির অবমাননা: সরকারের পক্ষ থেকে এবং তাদের সমর্থক কট্টরপন্থী বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, রবীন্দ্রসংগীতের ভাষা, সুর ও ধারণা পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম ঐতিহ্য বা “মুসলিম তমদ্দুনকে” অবজ্ঞা করে । তাদের মতে, রবীন্দ্রচর্চা বজায় রাখার অর্থ হলো পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া।
- ভারতের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও রাজনৈতিক প্রচার: ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর এই রবীন্দ্র-বিরোধী মনোভাব আরও চরম আকার ধারণ করে । পাকিস্তানি শাসকদের যুক্তি ছিল, পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীতের জনপ্রিয়তা আসলে ভারতের মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যেরই অংশ। তারা দাবি করেছিল, রবীন্দ্রচর্চাকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচারণা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে
বাঙালির প্রতিক্রিয়া:
খাজা শাহাবুদ্দিনের এই সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক যুক্তিগুলোকে বাঙালি বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন । তৎকালীন পূর্ব বাংলার শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদলিপি প্রকাশ করেন এবং ছায়ানটের মতো সংগঠনগুলোর মাধ্যমে রবীন্দ্রসংগীতকে পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে প্রধান সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রতীক বানিয়ে তোলেন
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): বিজ্ঞানের ইতিহাস, দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব
- প্রকাশের তারিখ: ১১ অক্টোবর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): Stanford Encyclopedia of Philosophy, Nobel Prize Archives, এবং Isaac Newton’s Theological Manuscripts.
সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের ধর্মীয়, ঈশ্বরসংক্রান্ত ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাস নিয়ে ইতিহাসবিদ, বিজ্ঞান লেখক এবং গবেষকদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে ব্যাপক আলোচনা ও গবেষণা চলমান। অনেক বিজ্ঞানী তাঁদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ডায়েরি বা ব্যক্তিগত চিঠিপত্রে লিপিবদ্ধ করেছেন, যা পরবর্তীতে তাঁদের মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস কেবল “আস্তিক” বা “নাস্তিক”—এই দুটি সরলরেখায় সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা প্রথাগত ঈশ্বরে বিশ্বাস (Theism/Deism), সর্বেশ্বরবাদ (Pantheism/Spinoza’s God), এবং সংশয়বাদ (Agnosticism)-এর মতো বহুমাত্রিক দর্শনে বিভক্ত ছিল।
১. প্রথাগত ঈশ্বরে বিশ্বাসী ও প্রজ্ঞাবান দেউইস্ট (Theist / Deist)
সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানীদের একটি বিশাল অংশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে মহাবিশ্বের সুনির্দিষ্ট গাণিতিক নিয়ম ও সুশৃঙ্খল নকশার পেছনে একজন স্রষ্টা বা প্রজ্ঞাবান সত্তা বিদ্যমান:
স্যার আইজ্যাক নিউটন (Sir Isaac Newton)

- স্যার আইজ্যাক নিউটন (Sir Isaac Newton):স্যার আইজ্যাক নিউটনের জীবনের এই দিকটি সত্যিই অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। আমরা তাকে আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী হিসেবে জানলেও, ঐতিহাসিক তথ্য ও তাঁর নিজস্ব পাণ্ডুলিপি প্রমাণ করে যে তিনি বিজ্ঞানের চেয়ে ধর্মতত্ত্ব, বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী এবং অ্যালকেমি (Alchemy) চর্চায় অনেক বেশি সময় ব্যয় করেছিলেন। নিউটন এবং তাঁর এই ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও চমৎকার তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
- বিপুল পরিমাণ ধর্মীয় লেখা: নিউটন জীবদ্দশায় যত পৃষ্ঠা লিখেছেন, তার সিংহভাগই ছিল ধর্মতত্ত্ব ও বাইবেলের ব্যাখ্যার ওপর। আনুমানিক হিসাবে, তিনি বিজ্ঞানের চেয়ে ধর্ম বিষয়ে প্রায় কয়েক গুণ বেশি (প্রায় ৩০ লক্ষ শব্দ) লিখে গেছেন।
- ধর্মকে বিজ্ঞানের পরিপূরক ভাবা: নিউটনের কাছে বিজ্ঞান এবং ধর্ম আলাদা কোনো বিষয় ছিল না। তিনি মনে করতেন, মহাবিশ্বের প্রাকৃতিক নিয়মগুলো (যেমন অভিকর্ষ বা গতির সূত্র) আবিষ্কার করার অর্থ হলো ঈশ্বরের তৈরি করা নকশাকে আরও ভালোভাবে অনুধাবন করা।
- মহাবিশ্বের সুশৃঙ্খলতা (Order of the Universe): আপনার উল্লেখ করা Principia গ্রন্থের উক্তিটি নিউটনের মূল দর্শনকে প্রকাশ করে। তিনি মনে করতেন, গ্রহগুলোর নিখুঁত কক্ষপথ এবং মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা কোনো দুর্ঘটনা হতে পারে না; এর পেছনে একজন ‘মহাজাগতিক স্থপতি’ (Divine Architect) রয়েছেন।
- পৃথিবীর ধ্বংসের সময় গণনা: বাইবেলের বুক অব ড্যানিয়েল (Book of Daniel) এবং বুক অব রেভেলেশন (Book of Revelation) গভীরভাবে অধ্যয়ন করে নিউটন একটি হিসাব করেছিলেন। তাঁর গণনা অনুযায়ী, ২০৬০ সালের আগে এই পৃথিবী ধ্বংস বা বড় কোনো পরিবর্তনের মুখোমুখি হবে না। অবশ্য তিনি এটি ভবিষ্যৎবাণী হিসেবে নয়, বরং উগ্র ভবিষ্যৎবাণীকারীদের ভুল প্রমাণ করার জন্য হিসাব করেছিলেন।
- নিউটনের এই গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্বাসই তাকে প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনে অনুপ্রাণিত করেছিল। বিজ্ঞান জগতের আরেক মহানায়ক আলবার্ট আইনস্টাইনও নিউটনের এই চিন্তাধারার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন।
গ্যালিলিও গ্যালিলি ও জোহানেস কেপলার:

- গ্যালিলিও গ্যালিলি ও জোহানেস কেপলার:গ্যালিলিও গ্যালিলি এবং জোহানেস কেপলার—উভয়েই আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং তারা দুজনেই বিজ্ঞান চর্চাকে ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখতেন।
- এই দুই মহান বিজ্ঞানীর আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক দর্শনের মূল দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
- গ্যালিলিও গ্যালিলি এবং ঈশ্বরের ‘দুই গ্রন্থ’ দর্শন
- গ্যালিলিও চার্চের সাথে দ্বন্দ্বে জড়ালেও (সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বের কারণে), তিনি নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস কখনো হারাননি।
- প্রকৃতি ও বাইবেল: গ্যালিলিও একটি বিখ্যাত তত্ত্ব দিয়েছিলেন যে, ঈশ্বর মানুষের জন্য দুটি বই লিখেছেন—একটি হলো পবিত্র বাইবেল (The Book of Scripture) এবং অন্যটি হলো প্রকৃতি (The Book of Nature)। তিনি বলতেন, বাইবেল লেখা হয়েছে রূপক ভাষায় যাতে সাধারণ মানুষ নৈতিক পথ খুঁজে পায়, আর প্রকৃতি লেখা হয়েছে গণিতের ভাষায়। দুটিই যেহেতু একই ঈশ্বরের সৃষ্টি, তাই সত্যিকারের বিজ্ঞান এবং সত্যিকারের ধর্ম কখনো একে অপরের বিরোধী হতে পারে না।
- একটি বিখ্যাত উক্তি: গ্যালিলিও লিখেছিলেন, “আমি এটা বিশ্বাস করতে বাধ্য নই যে, যে ঈশ্বর আমাদের ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি ও বিবেক দিয়েছেন, তিনি আমাদের এগুলোর ব্যবহার বন্ধ রাখতে বলেছেন।”
- জোহানেস কেপলার এবং ‘ঈশ্বরের চিন্তা’
- কেপলার প্রথমে ধর্মতত্ত্ব (Theology) নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন এবং যাজক হতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানে আসেন, তবে তার উদ্দেশ্য ছিল আধ্যাত্মিক।
- মহাজাগতিক জ্যামিতি: কেপলার বিশ্বাস করতেন যে ঈশ্বর একজন মহান জ্যামিতিক কারিগর। তিনি যখন গ্রহের গতি সম্পর্কিত তিনটি বিখ্যাত সূত্র আবিষ্কার করেন, তখন তিনি আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে লিখেছিলেন যে, তিনি মূলত “ঈশ্বরের চিন্তাকে তাঁর পেছনে পেছনে পুনরায় ভাবছেন” (Thinking God’s thoughts after Him)।
- উপাসনা হিসেবে বিজ্ঞান: কেপলার বিজ্ঞান চর্চাকে ঈশ্বরের এক ধরণের উপাসনা বা আরাধনা মনে করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মহাবিশ্বের গাণিতিক সামঞ্জস্য আবিষ্কার করার মাধ্যমে মানুষ ঈশ্বরের বুদ্ধিমত্তার সরাসরি প্রমাণ পায়।
- এই দুই বিজ্ঞানীর জীবন ও দর্শন প্রমাণ করে যে, সপ্তদশ শতকের বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূচনা নাস্তিকতা থেকে হয়নি, বরং সৃষ্টিজগতের সুশৃঙ্খল নিয়মগুলোর পেছনে একজন বুদ্ধিমান সৃষ্টিকর্তাকে খোঁজার গভীর আগ্রহ থেকে হয়েছিল।
ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ও ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ:

- ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ও ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ: ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক এবং ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ-এর বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার মধ্যকার গভীর সম্পর্কের দর্শনের শ্রেষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। পদার্থের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরমাণু জগত নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তারা দুজনেই প্রকৃতির এমন এক সুশৃঙ্খল নকশা ও রহস্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যা তাদের মহাবিশ্বের পেছনে একটি উচ্চতর চেতনার অস্তিত্ব বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছিল।
- এই দুই নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানীর চিন্তাধারাকে সংক্ষেপে এভাবে বিশ্লেষণ করা যায়:
- ১. ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক (Max Planck): বিজ্ঞান ও ধর্মের পরিপূরকতা
- ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক বিশ্বাস করতেন যে বিজ্ঞান ও ধর্ম একে অপরের শত্রু নয়, বরং তারা একই সত্যকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার দুটি মাধ্যম।
- যুক্তি ও বিশ্বাস: তাঁর মতে, বিজ্ঞান মানুষকে বস্তুগত জগতের কার্যকারণ বুঝতে সাহায্য করে (যার প্রতীক হলো ‘যুক্তি’), আর ধর্ম মানুষকে জীবনের নৈতিক দিক ও মূল্যবোধ শেখায় (যার প্রতীক হলো ‘বিশ্বাস’)।
- একটি বিখ্যাত দর্শন: ১৯৩৭ সালে তাঁর এক বিখ্যাত বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, “উভয় বিজ্ঞান এবং ধর্মের জন্য ঈশ্বরের অস্তিত্বই সমস্ত চিন্তার সূচনা।” তিনি মনে করতেন, পদার্থের গভীরে এমন কোনো স্বাধীন শক্তি নেই, বরং সমস্ত ম্যাটার বা পদার্থের পেছনে একটি সচেতন ও বুদ্ধিমান মনের (Conscious and Intelligent Mind) অস্তিত্ব রয়েছে।
- ২. ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ (Werner Heisenberg): পাত্রের তলায় ঈশ্বরের অপেক্ষা
- হাইজেনবার্গের এই উক্তিটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় ও গভীর ভাবার্থপূর্ণ একটি উক্তি। এর পেছনের মূল ভাবটি হলো:
- অল্প বিদ্যার ফাঁদ: একজন মানুষ যখন বিজ্ঞান পড়া শুরু করে এবং প্রকৃতির ওপরের স্তরের কিছু নিয়ম (যেমন অভিকর্ষ বা রাসায়নিক বিক্রিয়া) শেখে, তখন তার মনে হতে পারে সবকিছুই যান্ত্রিক এবং এর জন্য কোনো সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন নেই। এটিই হলো বিজ্ঞানের পাত্র থেকে নেওয়া “প্রথম ঢোক”, যা মানুষকে সাময়িকভাবে নাস্তিক বা অহংকারী করে তুলতে পারে।
- গভীর সত্যের সন্ধান: কিন্তু সেই মানুষটিই যখন বিজ্ঞানের গভীরে প্রবেশ করে—যেমনটা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অনিশ্চয়তা তত্ত্ব (Uncertainty Principle) বা মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করতে গেলে হয়—তখন সে দেখে যে প্রকৃতির নিয়মগুলো কত নিখুঁত, গাণিতিক এবং রহস্যময়। বিজ্ঞানের সেই চূড়ান্ত গভীরতাই হলো “পাত্রের তলা”, যেখানে পৌঁছালে মানুষ প্রকৃতির এই মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তার সামনে নত হতে বাধ্য হয়।
- কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের এই দুই পথপ্রদর্শকের চিন্তাভাবনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিজ্ঞান যত আধুনিক ও সূক্ষ্ম হয়েছে, বিজ্ঞানীদের একাংশের মধ্যে মহাবিশ্বের পেছনের মূল চালিকাশক্তিকে জানার আধ্যাত্মিক আগ্রহ ততটাই তীব্র হয়েছে।
২. স্পিনোজার ঈশ্বর ও সার্বজনীন সুশৃঙ্খলা (Pantheism)
অনেকে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ঈশ্বর বা মানুষের রূপ দেওয়া স্রষ্টায় বিশ্বাস করতেন না, কিন্তু প্রকৃতির সুনির্দিষ্ট সৌন্দর্য ও ভৌত নিয়মকে ঈশ্বর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন:

[প্রথাগত ব্যক্তিগত ঈশ্বর প্রত্যাখ্যান] ➔ [মহাজাগতিক সুশৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণ] ➔ [প্রকৃতির নিয়মকেই ঈশ্বর মানা (Pantheism)]
- আলবার্ট আইনস্টাইন (Albert Einstein): আইনস্টাইন স্পষ্ট করেছিলেন যে তিনি কোনো ব্যক্তিগত প্রাতিষ্ঠানিক ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না যিনি মানুষের বিচার করেন। তিনি বলতেন, “আমি স্পিনোজার ঈশ্বরে বিশ্বাস করি, যিনি বিদ্যমান সকল বস্তুর সুশৃঙ্খল সামঞ্জস্যের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করেন।” তিনি মহাবিশ্বের গাণিতিক নিখুঁত ভাবকে এক ধরণের আধ্যাত্মিক বিস্ময় (Cosmic Religious Feeling) বলে মনে করতেন।
৩. সংশয়বাদী ও বিবর্তনীয় দৃষ্টিভঙ্গি (Agnostic / Skeptic)
কিছু বিজ্ঞানী প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সরাসরি নাস্তিক হওয়ার চেয়ে নিজেদের সংশয়বাদী (Agnostic) বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন:
| বিজ্ঞানী ও ক্ষেত্র | বিশ্বাসের ধরন | প্রধান বক্তব্য ও ঐতিহাসিক প্রমাণ |
| চার্লস ডারউইন (বিবর্তনবাদ) | সংশয়বাদী (Agnostic) | জীবনের শেষভাগে তিনি জানান যে তিনি কখনোই চরম নাস্তিক ছিলেন না; বরং মহাবিশ্বের উৎপত্তি মানুষের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে সম্পূর্ণ বোঝা অসম্ভব বলে নিজেকে ‘Agnostic’ মনে করতেন। |
| নিকোলা টেসলা (তড়িৎ প্রকৌশল) | বৈদিক ও বিশ্বজনীন চেতনা | টেসলা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অনুশাসন না মানলেও বৈদিক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন এবং পুরো মহাবিশ্বকে শক্তি, কম্পন ও স্পন্দনের এক মহান উৎস মনে করতেন। |
| মাদাম কুরি (তেজস্ক্রিয়তা) | ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদী | ব্যক্তিগত জীবনে পারিবারিক বিয়োগান্তক ঘটনার পর তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম থেকে দূরে সরে আসেন এবং বিজ্ঞান ও মানবসেবায় জীবন উৎসর্গ করেন। |
সংক্ষেপিত পর্যালোচনা
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, আধুনিক বিজ্ঞানের জন্ম ও বিকাশ ঘটেছে এমন বহু ভাবুকের হাত ধরে, যারা ঈশ্বর বা মহাজাগতিক চেতনায় গভীর আস্থাশীল ছিলেন। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস নিয়ে কট্টর কোনো একপেশে সিদ্ধান্ত টানার সুযোগ নেই; বরং সত্য অনুসন্ধান ও প্রকৃতিকে গভীরভাবে জানার ভালোবাসাই তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসে পৌঁছে দিয়েছিল।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): সুশাসন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সামাজিক বিশ্লেষণ
- প্রকাশেশনের তারিখ: ১১ অক্টোবর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD), পলিটিক্যাল সায়েন্স রিভিউ, এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ডাইনামিকস ডাটা।
রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন প্রণয়ন এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সরাসরি রাজনীতির মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই একজন সচেতন নাগরিকের জন্য রাজনীতি থেকে দূরে থাকা বা নির্লিপ্ত থাকা কার্যত নিজের জীবনযাত্রার নিয়ন্ত্রণ অন্য কারও হাতে সঁপে দেওয়ার শামিল।
১. একজন সচেতন নাগরিকের কেন রাজনীতি করা বা সচেতন হওয়া উচিত?

রাষ্ট্রের সকল কর্মকাণ্ড নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। তাই সচেতন নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকা অত্যন্ত জরুরি:
[নাগরিক সচেতনতা ও ভূমিকা] ➔ [সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ] ➔ [দুর্নীতি প্রতিরোধ] ➔ [মৌলিক অধিকার সুরক্ষা]
- দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব: আপনার প্রাত্যহিক জীবনের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিত্যপণ্যের বাজারদর, কর কাঠামো এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন সবকিছুই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল।
- গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতা শক্তিশালীকরণ: শিক্ষিত ও সৎ মানুষের নিষ্ক্রিয়তা মূলত অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করে। সচেতন নাগরিকদের অংশগ্রহণ সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনে।
- অধিকার আদায় ও অনিয়ম প্রতিরোধ: নিজের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা এবং প্রশাসনিক অনিয়ম রুখে দাঁড়াতে রাজনৈতিক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।
২. মানুষ কিছুটা বিত্তবান হলেই কেন রাজনীতিবিদ হতে চায়?

সমাজে অর্থ ও রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্ক বহুকাল ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে। বিত্তবান ব্যক্তিদের রাজনীতিতে আসার পেছনে কিছু বাস্তব ও বৈচিত্র্যময় কারণ কাজ করে:
| প্রধান দিক | নেপথ্য কারণ ও বাস্তব রূপরেখা |
| সামাজিক ক্ষমতা ও মর্যাদা | অর্থ মানুষকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিলেও সরাসরি প্রশাসনিক নীতি-নির্ধারণী ক্ষমতা দেয় না। বিত্তবানরা সমাজে শীর্ষ মর্যাদা ও ক্ষমতা পেতে রাজনৈতিক পদে আসেন। |
| সম্পদ সুরক্ষা ও ব্যবসার বিস্তার | রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নিজের ব্যবসা প্রসারিত করা, সরকারি ঠিকাদারি, বাণিজ্যিক লাইসেন্স পাওয়া এবং অর্জিত সম্পদ সুরক্ষিত রাখা সহজ হয়। |
| আইন ও নীতিতে প্রভাব | নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অনুকূলে কর নীতি ও আইন গঠনে ভূমিকা রাখতে ধনী ব্যক্তিরা আইনসভায় ঢুকতে চান। |
| ব্যয়বহুল নির্বাচনী ব্যবস্থা | বর্তমান যুগে নির্বাচন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় সাধারণ যোগ্য প্রার্থীর চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোও অর্থবিত্তসম্পন্ন প্রার্থীদের মনোনয়ন দিতে অগ্রাধিকার দেয়। |
| আইনি ‘রক্ষাকবচ’ | রাজনৈতিক পরিচয় বা পদবী অনেক সময় বাণিজ্যিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব খাটাতে এবং আইনি চাপ থেকে সুরক্ষা পেতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। |
৩. রাজনীতিতে সচেতন হতে কি কোনো রাজনৈতিক দল পছন্দ করা অত্যাবশ্যক?
একদমই নয়। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশ বা রাজনীতি নিয়ে সচেতন থাকার জন্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের লেবেল লাগানো বা কোনো দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রকাশ করা মোটেও প্রয়োজনীয় নয়।
প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা বিচার
পদ্ধতি ১
অন্ধভাবে দলীয় প্রতীক না দেখে প্রার্থীর ব্যক্তিগত সততা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, অতীত ভূমিকা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড দেখে ভোট প্রদান করা।
ইস্যু-ভিত্তিক সমর্থন ও সমালোচনা
পদ্ধতি ২
যেকোনো দলের ভালো নীতিকে (যেমন: পরিবেশ সুরক্ষা বা স্বাস্থ্য সংস্কার) সমর্থন করা এবং ক্ষতিকর সিদ্ধান্তের গঠনমূলক সমালোচনা করা।
সুশীল সমাজ ও নাগরিক আন্দোলন
পদ্ধতি ৩
দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকে সামাজিক সংগঠন বা মানবাধিকার সংস্থার মাধ্যমে সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করা।
স্বাধীন বা ফ্লোটিং ভোটারের ভূমিকা
পদ্ধতি ৪
কোনো দলের ক্যাডার বা অন্ধ সমর্থক না হয়ে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ রাখা। আধুনিক গণতন্ত্রে এই ‘ফ্লোটিং ভোটাররাই’ যেকোনো নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
সংক্ষেপিত পর্যালোচনা
রাজনীতি কোনো নির্দিষ্ট দলীয় কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্যের সাথে যুক্ত। কোনো দলের দাসত্ব না করেও কেবল সচেতন, নিরপেক্ষ ও সৎ নাগরিক হিসেবে নিজের ভোটাধিকার এবং গঠনমূলক মতামত প্রকাশ করাই হলো একটি উন্নত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান শক্তি।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



