অপরাধ

মৃত্যুদন্ড দেওয়ার পরে বিচারকরা কলমের নিব ভেঙে ফেলেন কেন?
কলমের নিব ভাঙা

নিউজ ডেস্ক

June 6, 2026

শেয়ার করুন

রাজনৈতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ

প্রকাশিত: 7 জুন ২০২৬

ফাঁসির আদেশ বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর বিচারকদের কলমের নিব ভেঙে ফেলার পেছনে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই, বরং এটি একটি ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও প্রতীকী প্রথা ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হওয়া এই প্রথার পেছনে মূলত চারটি গভীর মানসিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে:

১. দণ্ডটি যেন আর পরিবর্তন করা না যায় (প্রতীকী অর্থ)

একটি আইনি রায় বা আদেশ যখন বিচারক একবার লিখে স্বাক্ষর করে দেন, তখন আইনগতভাবে বিচারক নিজেই সেই রায় আর সংশোধন বা বাতিল করতে পারেন না। কলমের নিবটি ভেঙে ফেলার অর্থ হলো—যে রায় একবার দেওয়া হয়ে গেছে, তা চিরতরে চূড়ান্ত এবং ওই কলম দিয়ে সেই রায় আর কোনোভাবেই বদলানো সম্ভব নয়।

২. অনুশোচনা ও মানসিক দায়মুক্তি

ইসলামী আইন বা সাধারণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে, জীবন দেওয়ার মালিক একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। একজন মানুষ হয়ে অন্য একজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার আদেশ দেওয়া অত্যন্ত কঠিন এবং মানসিক চাপেরই কাজ। বিচারকরা এই নিব ভেঙে মূলত বোঝাতে চান যে, তারা আইনের শাসন বজায় রাখতে বাধ্য হয়ে এই আদেশ দিয়েছেন, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে একজন মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে চাননি। এটি এক ধরণের মানসিক দায়মুক্তির প্রতীক।

৩. কলমটিকে ‘অপবিত্রতা’ থেকে রক্ষা করা

যে কলমটি একজনের জীবন কেড়ে নেওয়ার বা ফাঁসির আদেশের মতো একটি চরম নির্মম কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, তা যেন পরবর্তীতে অন্য কোনো সাধারণ বা শুভ কাজে ব্যবহৃত না হয়, সেই ধারণা থেকে নিবটি নষ্ট করে দেওয়া হয়।

৪. ‘অপরাধের’ প্রতীকী সমাপ্তি

যেহেতু ফাঁসির আদেশ পাওয়া ব্যক্তিটি সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক বা ক্ষতিকর কোনো অপরাধ করেছে, তাই বিচারক নিবটি ভেঙে ফেলার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে এই বার্তা দেন যে—অপরাধীর অপরাধের অধ্যায়ের সাথে সাথে এই কলমের আয়ুও এখানেই শেষ হলো।

বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের বিচার ব্যবস্থায় ফাঁসি বা মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া এবং কিছু ঐতিহাসিক দিক নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনি প্রক্রিয়া

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (CrPC)-এর নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশে কোনো আসামির ফাঁসির রায় এক দিনের সিদ্ধান্তেই কার্যকর হয় না। এটি একটি দীর্ঘ এবং অত্যন্ত সতর্ক আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়

  • ডেথ রেফারেন্স (Death Reference): জেলা ও দায়রা জজ আদালত কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে আইন অনুযায়ী তা সরাসরি কার্যকর করা যায় না ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী, নিম্ন আদালতের এই রায় অনুমোদনের জন্য উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট বিভাগে) পাঠাতে হয়, যাকে ‘ডেথ রেফারেন্স’ বলা হয়
  • আপিল বিভাগ ও রিভিউ: হাইকোর্ট বিভাগ যদি নিম্ন আদালতের দেওয়া ফাঁসির রায় বহাল রাখে, তবে আসামির সুযোগ থাকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার [lawyersnjurists.com, researchgate.net]। আপিল বিভাগেও রায় বহাল থাকলে আসামি শেষ আইনি লড়াই হিসেবে ‘রিভিউ’ বা পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারেন।
  • রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা: সব আইনি প্রক্রিয়া (আপিল ও রিভিউ) খারিজ হয়ে যাওয়ার পর আসামির শেষ আশ্রয় থাকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কাছে সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘মার্সি পিটিশন’ বা প্রাণভিক্ষার আবেদন করা [old.seu.edu.bd]。 রাষ্ট্রপতি এই আবেদন নাকচ করে দিলে রায় কার্যকরের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয় [ntvbd.com]।
  • কারাগারের শেষ ধাপ: রাষ্ট্রপতির চিঠি কারাগারে পৌঁছানোর পর কারা কর্তৃপক্ষ আসামির পরিবারকে শেষবার দেখা করার সুযোগ দেয় [ntvbd.com]। রায় কার্যকরের আগে আসামির স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী তওবা বা শেষ প্রার্থনা করানো হয় [ntvbd.com]। আইনের নিয়ম অনুযায়ী (CrPC Section 368), আসামিকে “ঘাড়ের সাহায্যে ঝুলিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত” (Hanged by the neck until he be dead) ফাঁসি দেওয়া হয় [en.wikipedia.org]।

২. উপমহাদেশের বিচার ব্যবস্থার কিছু ঐতিহাসিক রায় ও মাইলফলক

ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর সময় পর্যন্ত এ অঞ্চলের বিচার ব্যবস্থায় কিছু ঐতিহাসিক মামলা সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে:

  • ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি (১৯০৮): ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সর্বকনিষ্ঠ বাঙালি বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। বিহারের মুজাফফরপুরে অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রফুল্ল চাকীর সাথে মিলে তিনি বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন। অল্পের জন্য কিংসফোর্ড বেঁচে গেলেও দুই ব্রিটিশ নারী নিহত হন। মাত্র ১৮ বছর ৭ মাস ১১ দিন বয়সে ফাঁসির মঞ্চে হাসিমুখে আত্মদান করেন তিনি।

মুজাফফরপুর ষড়যন্ত্র মামলা ও ফাঁসি

  • ঘটনা: ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল বিহারের মুজাফফরপুরে রাতের অন্ধকারে ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডের গাড়িতে বোমা ছোড়া হয়। কিন্তু সেই গাড়িতে কিংসফোর্ড না থাকায় মিসেস কেনেডি ও তাঁর কন্যা নিহত হন।
  • গ্রেপ্তার: ঘটনার পর প্রফুল্ল চাকী গ্রেপ্তারের আগে আত্মহত্যা করেন এবং ক্ষুদিরাম গ্রেপ্তার হন। বিচারে তাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। [
  • ফাঁসি: ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ভোর ৪টায় মুজাফফরপুর জেলে ক্ষুদিরামের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। [
  • সাহসিকতা: মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ ইচ্ছা জানতে চাওয়া হলে তিনি নির্ভীকভাবে বলেছিলেন, “আমি ভালো বোমা বানাতে পারি, মৃত্যুর আগে সারা ভারতবাসীকে সেটা শিখিয়ে দিয়ে যেতে চাই।”
  • বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড মামলা: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড মামলা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সহকারী এ এফ এম মোহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেন। ১৯৭৫ সালে জারি করা ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশের কারণে সুদীর্ঘ সময় এই হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ ছিল।

আইনি প্রতিবন্ধকতা ও বিচারের পথ উন্মুক্তকরণ

  • ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ: ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ খুনিদের আইনি সুরক্ষা দিতে এই অধ্যাদেশ জারি করেন।
  • অধ্যাদেশ বাতিল: ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১২ নভেম্বর জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বিচারের পথ উন্মুক্ত করে。
  • অভিযোগপত্র: ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি পুলিশের সিআইডি (CID) ২০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রথম চার্জশিট দাখিল করে।

বিচার প্রক্রিয়ার সময়রেখা ও রায়

  • নিম্ন আদালতের রায়: ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকার তৎকালীন জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল মামলার রায়ে ১৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেন।
  • হাইকোর্টের রায়: ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চের বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম ১২ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে বাকিদের খালাস দেন।
  • আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়: ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আসামিদের আপিল খারিজ করে চূড়ান্তভাবে ১২ জনের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখে

সাজা কার্যকরের সর্বশেষ অবস্থা

মামলায় চূড়ান্ত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জন আসামির মধ্যে এখন পর্যন্ত ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে, ১ জন বিদেশে পলাতক অবস্থায় মারা গেছেন এবং বাকি ৫ জন এখনও বিভিন্ন দেশে আত্মগোপন করে আছেন।

সাজা ও বর্তমান স্থিতি আসামিদের নামবিবরণ ও কার্যকরের সময়
ফাঁসি কার্যকর (প্রথম পর্যায়)১. সৈয়দ ফারুক রহমান
২. সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান
৩. বজলুল হুদা
৪. এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ
৫. মহিউদ্দিন আহমেদ
২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি দিবাগত রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে একযোগে এই ৫ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
ফাঁসি কার্যকর (দ্বিতীয় পর্যায়)৬. আবদুল মাজেদদীর্ঘকাল ভারতে পালিয়ে থাকার পর ২০২০ সালের এপ্রিলে ঢাকায় গ্রেপ্তার হন এবং ১২ এপ্রিল কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁর ফাঁসি কার্যকর হয়।
পলাতক অবস্থায় মৃত্যু७. আবদুল আজিজ পাশা২০০১ সালের ২ জুন জিম্বাবুয়েতে পলাতক থাকা অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে মারা যান।
এখনও পলাতক আসামি৮. খন্দকার আবদুর রশিদ
৯. শরিফুল হক ডালিম
১০. এ এম রাশেদ চৌধুরী (যুক্তরাষ্ট্র)
১১. এস এইচ বি এম নূর চৌধুরী (কানাডা)
১২. মোসলেম উদ্দিন
ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি থাকা সত্ত্বেও এই ৫ খুনিকে এখনো দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

এই বিচার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার মাধ্যমে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে গণ্য হয়।

  • মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল):

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত বিশেষ আদালত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের আমলে প্রণীত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর অধীনে এই আদালত পরিচালিত হয়ে আসছে।

ট্রাইব্যুনাল গঠনের ইতিহাস ও বিবর্তন

  • ১১৯৩ সালের আইন: ১৯৭৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য মূল আইনটি পাস করা হয়।
  • ২০১০ সালের পুনর্গঠন: মুক্তিযুদ্ধের ৩৯ বছর পর ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করা হয়।
  • ২০২৪ সালের রূপান্তর: ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচারের লক্ষ্যে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে। [

আইনি সংস্কার ও সাম্প্রতিক সংশোধনীসমূহ

বিচারের পরিধি বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে ট্রাইব্যুনাল আইনে ধারাবাহিক কিছু ঐতিহাসিক সংশোধন আনা হয়েছে:

  • রাজনৈতিক দল ও সংগঠন নিষিদ্ধকরণ: ২০২৫ সালের মে মাসে আইনে বড় সংশোধনী এনে ব্যক্তি ছাড়াও কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী করে তাদের নিবন্ধন বাতিল বা নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া হয়।
  • জনপ্রতিনিধিত্ব ও নির্বাচনে নিষেধাজ্ঞা: ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে জারি করা তৃতীয় সংশোধনী অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালে কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (Formal Charge) দাখিল হলে তিনি আর জাতীয় বা স্থানীয় কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না এবং সরকারি পদে বসতে পারবেন না।
  • গুমের (Enforced Disappearance) বিচার: ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পাস করে গুমের ঘটনাকে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক এক্তিয়ারভুক্ত করা হয়।

বিচার প্রক্রিয়ার মাইলফলক রায়সমূহ

১. ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার

২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের মোট ৫৭টি মামলার রায় দেয়। এর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ৬ জন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়:

  • জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা আব্দুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামী এবং মীর কাসেম আলী।
  • বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।

২. ২০২৪ সালের জুলাই গণহত্যার বিচার

অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ট্রাইব্যুনালে জুলাই বিপ্লবের গণহত্যা ও নির্যাতনের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা ও প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় দেয়।

ট্রাইব্যুনালের বর্তমান বিচারিক কাঠামো

পদের নাম বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব
চীফ প্রসিকিউটরঅ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
তদন্ত সংস্থাআন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তদন্ত সংস্থা
বিচারিক বেঞ্চট্রাইব্যুনাল-১ এবং ট্রাইব্যুনাল-২ (সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের সমন্বয়ে গঠিত)

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শিকার পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ইতিহাস, রাজনীতি ও সমসাময়িক বিষয়ের এমন চমৎকার ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণ নিয়মিত পড়তে ভিজিট করুন পালস বাংলাদেশ | Pulse Bangladesh

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন ১৯৬৬

নিউজ ডেস্ক

June 6, 2026

শেয়ার করুন

বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৬৬ সালের জুন মাস ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা আইয়ুব-মোনায়েম খানের শোষণের শৃঙ্খল ভাঙতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ দাবির সপক্ষে এই দিনগুলোতে পূর্ব পাকিস্তান, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা পরিণত হয়েছিল এক অগ্নিগর্ভ রণক্ষেত্রে।

৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬: লাহোরে বাঙালির ‘ম্যাগনা কার্টা’ ঘোষণা

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে সম্মিলিত বিরোধী দলগুলোর এক কনভেনশনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন ও মুক্তির সনদ হিসেবে ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণ অরক্ষিত থাকায় বাঙালিদের মধ্যে যে চরম ক্ষোভের জন্ম নেয়, এটি ছিল তারই রাজনৈতিক বহিঃপ্রকাশ।

সাবজেক্ট কমিটির সভায় এই দাবি অগ্রাহ্য হলে বঙ্গবন্ধু সম্মেলন বয়কট করেন এবং পরবর্তীতে ২৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে এটি ঘোষণা করা হয়। পাকিস্তানি শাসকদের দীর্ঘদিনের শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এটি ছিল অধিকার আদায়ের এক যুগান্তকারী দলিল, যা ইতিহাসে বাঙালির ‘ম্যাগনা কার্টা’ বা মুক্তির মহাসনদ নামে পরিচিত।

ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি কী ছিল?

  • ১. শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি: লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে একটি ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থাকবে।
  • ২. কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা: কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে কেবল দুটি বিষয়—’প্রতিরক্ষা’ ও ‘পররাষ্ট্র বিষয়’। অন্যান্য সব বিষয় অঙ্গরাজ্যগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
  • ৩. মুদ্রা ও অর্থ বিষয়ক ক্ষমতা: দুই অঞ্চলের জন্য সহজে বিনিময়যোগ্য দুটি পৃথক মুদ্রা থাকবে, অথবা এক মুদ্রা থাকলে পূর্ব পাকিস্তানের পুঁজি যাতে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হতে না পারে, তার জন্য সুনির্দিষ্ট সংবিধিবদ্ধ ব্যবস্থা থাকতে হবে।
  • ৪. राजस्व, কর ও শুল্ক বিষয়ক ক্ষমতা: কর ও শুল্ক ধার্য করার চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। আদায়কৃত রাজস্বের একটি নির্দিষ্ট অংশ কেন্দ্রীয় সরকারকে দেওয়া হবে।
  • ৫. বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা: প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার ওপর সংশ্লিষ্ট রাজ্যের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ থাকবে এবং বিদেশের সাথে বাণিজ্য চুক্তির অধিকার পাবে।
  • ৬. আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা: পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার জন্য আধা-সামরিক বাহিনী (প্যারা-মিলিটারি) বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদের লাগাতার আন্দোলন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাস ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৬৬ সালের জুনের শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসজুড়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে লাগাতার মিছিল ও সমাবেশ করা হতে থাকে। তৎকালীন ছাত্রনেতাদের আহ্বানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হল থেকে হাজার হাজার সাধারণ শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে রাজপথে নেমে আসেন।

“ছয় দফা মানতে হবে”, “বাঙালির মুক্তি চাই”—এমন সব বজ্রকঠিন স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে কলাভবন, মধুর ক্যান্টিন এবং কার্জন হল প্রাঙ্গণ। ছাত্রদের এই লাগাতার আন্দোলনই মূলত ৭ জুনের ঐতিহাসিক হরতাল সফল করার মূল ভিত্তি প্রস্তুত করেছিল।

৭ই জুন: ঢাকার রাজপথে নারীদের অভূতপূর্ব মিছিল ও প্রতিরোধ

১৯৬৬ সালের ৭ই জুন ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবির সমর্থনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আহূত সর্বাত্মক হরতালে ঢাকার রাজপথে নারীদের অভূতপূর্ব মিছিল, পিকেটিং ও সাহসী প্রতিরোধ প্রথমবার প্রত্যক্ষ করে পুরো বিশ্ব। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের রক্তচক্ষু ও কারফিউ উপেক্ষা করে হাজার হাজার সাধারণ ও শ্রমজীবী নারী সেদিন অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন।

নারীদের ঐতিহাসিক প্রতিরোধের প্রধান দিকগুলো:

  • রাজপথে অভাবনীয় পিকেটিং: তেজগাঁও, সদরঘাট ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ গৃহিণী এবং বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা দলে দলে রাজপথে নেমে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইডেন কলেজের ছাত্রীরা লাঠি হাতে মিছিল নিয়ে ঢাকার প্রধান সড়কগুলো কাঁপিয়ে তোলেন।
  • তেজগাঁওয়ে নারী শ্রমিকদের বীরত্ব: ৭ই জুনের হরতালের অন্যতম মূল কেন্দ্র ছিল ঢাকার তেজগাঁও শিল্প এলাকা। পুলিশ যখন আন্দোলনকারীদের ওপর বেধড়ক লাঠিচার্জ ও গুলি শুরু করে, তখন এখানকার বিভিন্ন চটকল ও সুতাকলের হাজার হাজার নারী শ্রমিক ঝাঁটা, লাঠি ও ইট-পাটকেল নিয়ে পুলিশের ওপর চড়াও হন।
  • রেনেসাঁর অন্তরালে ফজিলাতুন্নেছা মুজিব: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা তখন কারাবন্দি। এই চরম সংকটে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবসহ অন্য নেতাদের পরিবারের নারীরা গোপনে সাধারণ নারী সমাজকে সংগঠিত করতে এবং হরতাল সফল করার বার্তা পৌঁছে দিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।

এই ৭ই জুনের সফল গণজাগরণই প্রমাণ করেছিল ৬ দফা শুধু শিক্ষিত মধ্যবিত্তের আন্দোলন নয়, এটি বাংলার খেটে খাওয়া সাধারণ নারী সমাজেরও বাঁচার দাবি।

আজ একুশে পদকপ্রাপ্ত সমাজসেবক জিয়াউল হকের ৯২তম জন্মদিন

ঐতিহাসিক এই উত্তাল দিনগুলোর স্মরণের মাঝেই আজ ৬ জুন, বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছিলেন এক অনন্য আলোকবর্তিকা। একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত সমাজসেবক এবং “বেচি দই, কিনি বই” খ্যাত মো: জিয়াউল হকের ৯২তম জন্মদিন আজ। তিনি ১৯৩৪ সালের ৬ জুন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট উপজেলার চামা মুশরিভুজা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

জীবনসংগ্রাম ও অনন্য আদর্শ:

  • “বেচি দই, কিনি বই”: অতি দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া জিয়াউল হক টাকার অভাবে পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা করতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে মাথায় ফেরি করে দই বিক্রি শুরু করলেও, অন্য কোনো শিশু যেন টাকার অভাবে ঝরে না পড়ে, সেই চিন্তা থেকে তিনি দই বিক্রির লভ্যাংশ দিয়ে বই কেনা শুরু করেন। বিগত ছয় দশক ধরে তিনি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে বই, খাতা ও শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ করছেন।
  • পারিবারিক লাইব্রেরি: শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে তিনি নিজের বাড়িতেই গড়ে তুলেছেন প্রায় ১৫,০০০ বইয়ের একটি বিশাল লাইব্রেরি, যা এলাকার সর্বস্তরের পাঠক ও শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত।
  • রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি: সমাজসেবামূলক কাজের জন্য ২০০৬ সালে তিনি দেশব্যাপী বিখ্যাত “সাদা মনের মানুষ” উপাধিতে ভূষিত হন। পরবর্তীতে সমাজসেবায় অবিনাশী ও নিঃস্বার্থ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০২৪ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ civilian সম্মাননা একুশে পদক প্রদান করে।

বাঙালির গৌরবময় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস, মহান মনীষীদের জীবনী এবং জাতীয় রাজনীতির সব বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন ও ব্রেকিং নিউজ সবার আগে নির্ভরযোগ্যভাবে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন পালস বাংলাদেশ | Pulse Bangladesh।ওয়েবসাইটে।

তথ্যসূত্র: এই বিশেষ ঐতিহাসিক ও জাতীয় প্রতিবেদনটি ১৯৬৬ সালের স্বাধিকার আন্দোলনের নথিপত্র, জাতীয় আর্কাইভ এবং বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়ক ডেস্কের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক মূল্যায়ন

নিউজ ডেস্ক

June 5, 2026

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ও মেরুকরণ সৃষ্টিকারী চরিত্র। তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়নে প্রধানত ব্যক্তিগত সততা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও বিতর্ক—এই দুটি পরস্পরবিরোধী দিক উঠে আসে।

ব্যক্তিগত সততা ও দেশপ্রেম

  • উচ্চ নৈতিক মান: জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত সততা ও নিয়মানুবর্তিতা তাঁর রাজনৈতিক ও সামরিক জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও সাধারণত তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনার সময় তাঁর ব্যক্তিগত দুর্নীতির অভিযোগ থেকে তাঁকে মুক্ত রাখেন।
  • কর্মীবান্ধব নেতৃত্ব: সাদাসিধে জীবনযাপন, কঠোর পরিশ্রম এবং দেশের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের মানসিকতা তাঁকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে একটি স্থায়ী আসন এনে দেয়।
  • অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দূরদর্শিতা: খাল খনন কর্মসূচি, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপগুলো আধুনিক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করতে ভূমিকা রেখেছিল বলে তাঁর সমর্থকরা মনে করেন।

আদর্শিক বিতর্ক ও সমালোচনা

  • বহুদলীয় গণতন্ত্র ও পুনর্বাসন: একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা থেকে ফিরিয়ে এনে তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে পুনর্বাসন করেন। তবে, এর ফলে স্বাধীনতাবিরোধী অনেক রাজনৈতিক শক্তিও রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ পায়, যা বাংলাদেশের আদর্শিক রাজনীতিতে গভীর বিতর্কের জন্ম দেয়।
  • বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ: তিনি ‘বাঙালি’ পরিচয়ের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রবর্তন করেন, যা সব ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে একটি ছাতার নিচে আনার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল। সমালোচকদের মতে, এটি মূল বাঙালি সংস্কৃতির স্বকীয়তা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিপন্থী ছিল।
  • সামরিক শাসন ও বিতর্কিত আইন: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাঁর ক্ষমতায় আরোহণ এবং পরবর্তীতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বলবৎ রাখার মতো বিষয়গুলো তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়।

জিয়াউর রহমান এমন এক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন যা একদিকে তাঁর সততা ও উন্নয়নের জন্য প্রশংসিত, অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক কৌশল ও গৃহীত পদক্ষেপের জন্য তীব্র আদর্শিক সমালোচনার সম্মুখীন

ব্যক্তিগত সততা ও জীবনযাপন

জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত সততা ও জীবনযাপন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত বিষয়। তাঁর অতি সাধারণ জীবনযাত্রার অনেক বিবরণ সমসাময়িক রাজনীতিবিদ এবং ইতিহাসবিদদের লেখায় উঠে এসেছে।

সাধারণ জীবনযাপন ও বাসস্থান

  • সরকারি বাসভবন বর্জন: রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও তিনি বিলাসবহুল বঙ্গভবনে বসবাস না করে ঢাকা সেনানিবাসের একটি সাধারণ মঈনুল রোডস্থ বাসভবনে থাকতেন
  • আসবাবপত্রের অভাব: তাঁর মৃত্যুর পর দেখা যায়, রাষ্ট্রপতির বাসভবনেও অত্যন্ত সাধারণ এবং সীমিত আসবাবপত্র ছিল [১]।
  • ভাঙা সুটকেস ও ছেঁড়া গেঞ্জি: তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের মধ্যে একটি ভাঙা সুটকেস এবং কয়েকটি ছেঁড়া গেঞ্জি পাওয়া যায়, যা তাঁর অতি সাধারণ জীবনযাপনের প্রতীক হিসেবে ব্যাপকভাবে আলোচিত ।

আর্থিক সততা

  • দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তি: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার পরও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি।
  • পরিবারের জন্য সম্পদ না রাখা: মৃত্যুর সময় তিনি তাঁর স্ত্রী বা সন্তানদের জন্য কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স, দামি গাড়ি বা বিলাসবহুল বাড়ি রেখে যাননি।
  • সরকারি তহবিলের সাশ্রয়: রাষ্ট্রীয় সফরে বিদেশে যাওয়ার সময় তিনি অত্যন্ত সীমিত খরচ করতেন এবং সরকারি অর্থের অপচয় কঠোরভাবে বন্ধ করেছিলেন।

কঠোর নিয়মানুবর্তিতা ও পরিশ্রম

  • দীর্ঘ কর্মঘণ্টা: তিনি প্রতিদিন প্রায় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করতেন এবং গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ফাইল পর্যালোচনা করতেন।
  • মাঠপর্যায়ে তদারকি: শীত-গ্রীষ্ম উপেক্ষা করে তিনি সরাসরি গ্রামে চলে যেতেন এবং সাধারণ মানুষের সাথে মাটিতে বসে কথা বলতেন।

জিয়াউর রহমানের এই সততা ও সাধারণ জীবনযাপন তাঁর সমর্থকদের কাছে তাঁকে এক অনন্য ও অনুকরণীয় নেতার মর্যাদা দিয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষাগত দক্ষতা নিয়ে বিতর্ক

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক মূল্যায়নে তাঁর ‘মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা’ এবং ‘ভাষাগত দক্ষতা’—এই দুটি বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘকাল ধরে গভীর বিতর্ক ও ভিন্নমত বিদ্যমান [১.২.২]।

১. মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক

মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কিছু দিক নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ রয়েছে [১.২.২]:

  • স্বাধীনতার ঘোষণা বিতর্ক: ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন [১.২.১, ১.২.৮]। তাঁর সমর্থক ও দল (বিএনপি)-এর মতে, এই ঘোষণা দিশেহারা বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল [১.২.১, ১.৩.৮]। অপরদিকে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ (আওয়ামী লীগ)-এর দাবি, তিনি ছিলেন কেবল একজন পাঠক বা ঘোষক, এবং স্বাধীনতার মূল কৃতিত্ব ও একক নেতৃত্ব সম্পূর্ণভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের।
  • সেক্টর কমান্ডার বনাম ‘আকস্মিক’ মুক্তিযোদ্ধা: জিয়াউর রহমান ১ নম্বর সেক্টর এবং পরবর্তীতে ‘জেড ফোর্স’-এর প্রধান হিসেবে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেন, যার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে রাষ্ট্রীয় ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয় [১.২.৭]। তবে সমালোচকদের একটি অংশ দাবি করে, তিনি ২৫ মার্চের আগে পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিদ্রোহ করেননি, বরং পাকিস্তানি জাহাজ ‘এমভি সোয়াত’ থেকে অস্ত্র খালাস করতে গিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আকস্মিকভাবে বিদ্রোহে যোগ দিতে বাধ্য হন [১.২.৪]। তাঁর সমর্থকরা এই তত্ত্বকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ইতিহাস বিকৃতি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন [১.২.৪, ১.২.৫]।

২. ভাষাগত দক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিতর্ক

জিয়াউর রহমানের শিক্ষা, বেড়ে ওঠা এবং দাপ্তরিক ভাষা ব্যবহারের ধরন নিয়েও এক ধরনের বিতর্ক রয়েছে:

  • বাংলা ভাষা ও শৈশব: জিয়াউর রহমানের শৈশব ও শিক্ষার একটি বড় অংশ কেটেছিল অবিভক্ত ভারতের কলকাতা এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের করাচিতে । করাচির ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করার কারণে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলা লেখার চর্চা তাঁর কম ছিল । এই কারণে সমালোচকরা প্রায়শই দাবি করেন যে তিনি শুদ্ধভাবে বাংলা পড়তে বা লিখতে পারতেন না । তবে জীবনীকারদের মতে, দাপ্তরিক কাজে তিনি ইংরেজি ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও বাংলা বলতে পারতেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সময় সব স্তরে বাংলা ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছিলেন।
  • জাতীয়তাবাদের ভাষাগত বনাম ভৌগোলিক রূপান্তর: ১৯৭২ সালের সংবিধানে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর মূল ভিত্তি ছিল মূলত ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক একক সত্তা । কিন্তু জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে একে পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রবর্তন করেন ধর্মনিরপেক্ষ ও ভাষাভিত্তিক সংস্কৃতির পরিবর্তে ভূখণ্ড এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের মিশ্রণে এই নতুন পরিচয় তৈরি করা হয়। সমালোচকদের মতে, এটি ভাষা আন্দোলনের মূল চেতনা ও ভাষাভিত্তিক বাঙালি পরিচয়কে অবমূল্যায়ন করার একটি রাজনৈতিক কৌশল ছিল

জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা ও তাঁর আদর্শিক দর্শন আজও বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান তর্কের উপাদান, যা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও ক্ষমতা দখল

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং তীব্র মেরুকরণ সৃষ্টিকারী অধ্যায় । এই ঘটনাপ্রবাহে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এবং তাঁর ক্ষমতায় আরোহণের প্রক্রিয়াকে প্রধানত দুটি বিপরীতমুখী রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা হয়

১. আওয়ামী লীগ ও সমালোচকদের মূল্যায়ন (হত্যাকাণ্ডের সুবিধাভোগী ও নেপথ্য কুশীলব)

এই দৃষ্টিকোণ থেকে জিয়াউর রহমানকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়

  • পূর্বজ্ঞাত ও পরোক্ষ সম্মতি: খুনি ফারুক ও রশিদের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার এবং মামলার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে দাবি করা হয়, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সম্পর্কে তৎকালীন উপ-সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান আগে থেকেই জানতেন । তিনি এতে সরাসরি অংশ না নিলেও “তোমরা সফল হলে আমার আপত্তি নেই” ধরনের মনোভাব দেখিয়ে পরোক্ষ সম্মতি দিয়েছিলেন
  • খুনিদের পুনর্বাসন ও পুরস্কৃতকরণ: ক্ষমতা গ্রহণের পর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে জড়িত ১২ জন সামরিক কর্মকর্তাকে বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে উচ্চপদে চাকরি ও কূটনৈতিক কূটনৈতিক সুবিধা দিয়ে পুরস্কৃত করেন
  • ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে আইনি রূপ: খন্দকার মোশতাক আহমেদ কর্তৃক জারিকৃত বিতর্কিত ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ ১৯৭৫’ (যা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার থেকে আইনি সুরক্ষা দিয়েছিল) ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংসদের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয় । এর ফলে দীর্ঘ ২১ বছর বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ রুদ্ধ ছিল
  • সংবিধান ধ্বংসকারী ও অবৈধ দখলদার: দেশের উচ্চ আদালত পরবর্তীতে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে এই সময়ের ক্ষমতা দখলকে অসাংবিধানিক ও জবরদখল হিসেবে আখ্যায়িত করেন

২. বিএনপি ও সমর্থকদের মূল্যায়ন (পরিস্থিতির দাবি ও শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারকারী)

জিয়াউর রহমানের সমর্থক ও রাজনৈতিক অনুসারীদের মতে, তিনি কোনো ষড়যন্ত্র বা হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন না, বরং একটি বিশৃঙ্খল জাতীয় সংকটের মুখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন

  • পেশাদারিত্ব ও আনুগত্য: সমর্থকরা দাবি করেন, জিয়াউর রহমান একজন সুশৃঙ্খল সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন। ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানটি ছিল জুনিয়র অফিসারদের একটি বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ, যার সাথে চেইন অব কমান্ডের বাইরে থাকা উপ-সেনাপ্রধান জিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো যোগসূত্র ছিল না।
  • ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব: ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। এরপর ৭ নভেম্বর কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সাধারণ সৈনিক ও জনতার এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান মুক্ত হন এবং সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নেতৃত্বের কেন্দ্রে চলে আসেন
  • সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা: জিয়াউর রহমান সরাসরি ক্ষমতা দখল করেননি; প্রথমে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদে রেখে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন এবং পরবর্তীতে সায়েমের পদত্যাগের পর আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন
  • ইনডেমনিটি পাসের ভিন্ন প্রেক্ষাপট: সমর্থকদের যুক্তি অনুযায়ী, ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত দেশে একাধিক সামরিক অভ্যুত্থান ও বিশৃঙ্খলা ঘটেছিল । সেই অস্থির সময়ে রাষ্ট্রের সার্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সামরিক বাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা ও আপস বজায় রাখার কৌশল হিসেবেই ওই সময় সংসদীয় আইনের মাধ্যমে পঞ্চম সংশোধনী পাস করতে হয়েছিল, যা এককভাবে কোনো খুনিকে রক্ষার উদ্দেশ্যে ছিল না

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় আরোহণ বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক জটিল সন্ধিক্ষণ, যা আজও দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক শিবিরের আদর্শিক দ্বন্দ্বের মূল কেন্দ্রবিন্দু

সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসন

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পুনরুত্থান এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান এবং তীব্র সমালোচিত একটি অধ্যায়। ১৯৭২ সালের সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে সরে এসে রাষ্ট্রীয় আদর্শে এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটিকে প্রধানত দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়।

১. আওয়ামী লীগ ও ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের মূল্যায়ন (সংবিধানের সাম্প্রদায়িকীকরণ ও পুনর্বাসন)

এই দৃষ্টিকোণ থেকে জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের মূল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক ভিত্তিকে ধ্বংস করার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হয়:

  • ধর্মনিরপেক্ষতা বিলোপ ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি: ১৯৭৭ সালে সামরিক ফরমানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান সংবিধানে আমূল পরিবর্তন আনেন। তিনি সংবিধানের অন্যতম মূল স্তম্ভ ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাতিল করেন এবং এর পরিবর্তে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” প্রতিস্থাপন করেন। একই সাথে বাহাত্তরের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন, যার ফলে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দল পুনরায় রাজনীতি করার আইনি অধিকার পায়।
  • শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ: বাংলাদেশের স্বাধীনতার সরাসরি বিরোধিতা করা এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে জাতিসংঘে ওকালতি করা মুসলিম লীগ নেতা শাহ আজিজুর রহমানকে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। এটিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে দেখা হয়।
  • গোলাম আযমের প্রত্যাবর্তন: ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের প্রধান অভিযুক্ত এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির গোলাম আযমকে ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানি পাসপোর্টে বাংলাদেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তিনি দেশেই অবস্থান করেন।
  • দালাল আইন বাতিল: ১৯৭২ সালে প্রণীত ‘দালাল আইন’ (Collaborators Act), যার অধীনে যুদ্ধাপরাধী ও পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগীদের বিচার চলছিল, ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তা বাতিল করা হয় এবং কারাবন্দি ও বিচারাধীন হাজার হাজার স্বাধীনতাবিরোধী মুক্তি পায়।

২. বিএনপি ও সমর্থকদের মূল্যায়ন (বহুদলীয় গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্য)

জিয়াউর রহমানের সমর্থক এবং দলীয় তাত্ত্বিকদের মতে, এই পদক্ষেপগুলো কোনো সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা থেকে নেওয়া হয়নি, বরং দেশের তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনে নেওয়া হয়েছিল:

  • প্রকৃত বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা: সমর্থকদের মতে, শেখ মুজিবুর রহমানের আমলের একদলীয় ‘বাকশাল’ ব্যবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করে সব মত ও পথের মানুষকে রাজনীতি করার অধিকার দেওয়াই ছিল জিয়ার লক্ষ্য। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের দলকে নিষিদ্ধ না রেখে চরম ডানপন্থী থেকে শুরু করে চরম বামপন্থী (যেমন জাসদ বা কমিউনিস্ট পার্টি)—সবাইকে রাজনৈতিক মূলধারায় ফিরিয়ে আনার কৌশল ছিল এটি।
  • জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ মূল্যবোধের স্বীকৃতি: বিএনপি দাবি করে, সংবিধানে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্তি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনসংখ্যার ধর্মীয় অনুভূতির প্রতিফলন ছিল, যা রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রকে পুরোপুরি নষ্ট করেনি, বরং রাষ্ট্রকে একটি টেকসই নৈতিক ভিত্তি দিয়েছিল।
  • জাতীয় সংহতি ও ক্ষমতার ভারসাম্য: যুদ্ধ-পরবর্তী বিভক্ত বাংলাদেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ কমিয়ে একটি ‘জাতীয় সংহতি’ বা ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন তৈরির উদ্দেশ্যে তিনি পূর্বের রাজনৈতিক বিরোধ ভুলে সবাইকে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করেছিলেন।

জিয়াউর রহমানের এই রাজনৈতিক পুনর্গঠন বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর দূরগামী প্রভাব ফেলে, যা আজও দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বনাম ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রধান বিভাজন রেখা হিসেবে কাজ করছে।

জাতীয় রাজনীতি, ইতিহাস এবং সমসাময়িক সব ব্রেকিং নিউজ ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ সবার আগে নির্ভরযোগ্যভাবে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন বাংলাদেশ প্রতিদিন ওয়েবসাইটে।

পাকিস্তান

নিউজ ডেস্ক

June 3, 2026

শেয়ার করুন

রাজনৈতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ

প্রকাশিত: ৩ জুন ২০২৬

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৪ বছরের পাকিস্তানের ইতিহাস মূলত ছিল বাঙালি জাতির ওপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের চরম রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বৈষম্যের ইতিহাস। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা বেশি হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে।

কিন্তু ইতিহাসের পাত উল্টে যদি একটি “বিকল্প রাজনৈতিক সমীকরণ” বা হাইপোথেটিক্যাল মডেল চিন্তা করা যায়, যেখানে বাঙালিদের অধিকার সুরক্ষায় ৫টি কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হতো—তবে কেমন হতো তৎকালীন শাসনব্যবস্থা? চলুন পালস বাংলাদেশের আজকের বিশেষ আয়োজনে এই অভিনব সমীকরণের একটি যৌক্তিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করা যাক।

১. সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীতে ১০০% বাংলাদেশি (বাঙালি)

তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব ছিল মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ। আপনার প্রস্তাব অনুযায়ী যদি সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর শতভাগ সদস্যই হতো বাংলাদেশি, তবে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মতো কোনো “অপারেশন সার্চলাইট” বা নির্মম গণহত্যা চালানো পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষে কখনোই সম্ভব হতো না। দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকত সম্পূর্ণ বাঙালিদের হাতে, যা যেকোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক ষড়যন্ত্র থেকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে চিরতরে নিরাপদ রাখত।

২. রাজধানী হতো ঢাকা

পাকিস্তানের শুরু থেকেই করাচি, পরবর্তীতে রাওয়ালপিন্ডি এবং ইসলামাবাদকে রাজধানী করা হয়। যেহেতু দেশের সিংহভাগ মানুষ (প্রায় ৫৬%) পূর্ব পাকিস্তানে বাস করত, তাই যৌক্তিক কারণেই রাজধানী ঢাকার হওয়া উচিত ছিল। ঢাকা রাজধানী হলে সমস্ত বড় বড় সরকারি দফতর, বৈদেশিক দূতাবাস এবং নীতি-নির্ধারণী কেন্দ্র এখানে গড়ে উঠত। ফলে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু পশ্চিম পাকিস্তান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে ঢাকায় চলে আসত এবং বাঙালিরাই রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রধান ভূমিকা পালন করত।

৩. রাজনীতি ও বৈষম্যহীন ভোটাধিকার (বাংলাদেশি ১.০ বনাম পাকিস্তানি ০.৫)

এটি অত্যন্ত চমৎকার এবং কৌশলগত একটি প্রস্তাব। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা সবসময় বাঙালিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ভয় পেত এবং সে কারণেই তারা ‘ওয়ান ইউনিট’ প্রথার মতো নানা রাজনৈতিক চক্রান্ত করেছিল। যদি নিয়ম হতো যে—শুধু বাংলাদেশের নাগরিকরাই রাজনৈতিক দল খুলতে পারবে এবং ভোটের মানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষের ভোটের মান হবে ১.০ আর পাকিস্তানিদের হবে ০.৫, তবে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে পশ্চিম পাকিস্তানি সামন্তবাদী ও সামরিক জান্তাদের আধিপত্য চিরতরে খর্ব হয়ে যেত। জনসংখ্যার অনুপাতে এবং ভোটের ওজনে বাঙালিরাই হতো পাকিস্তানের চিরস্থায়ী ও একমাত্র নীতিনির্ধারক।

৪. রাষ্ট্রভাষা বাধ্যতামূলক বাংলা

১৯৪৮ এবং ১৯৫২ সালে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার যে অপচেষ্টা পশ্চিম পাকিস্তানিরা করেছিল, তার জবাবেই রক্তের বিনিময়ে সংঘটিত হয়েছিল ভাষা আন্দোলন। যদি শুরু থেকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে একমাত্র ‘বাংলা’কে বাধ্যতামূলক করা হতো, তবে তা হতো বাঙালিদের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক বিজয়। এর ফলে সরকারি চাকরি, শিক্ষা এবং গণমাধ্যমে বাঙালিরা জন্মগতভাবেই এগিয়ে থাকত এবং কোনো ধরনের ভাষাগত বৈষম্যের শিকার হতে হতো না।

৫. রাজস্ব আয়ের ৪০ শতাংশ দিতে হতো ঢাকাকে (কেন্দ্রীয় সরকার)

তৎকালীন সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের পাট ও চামড়া রপ্তানির সিংহভাগ টাকা দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি ও ইসলামাবাদ গড়ে তোলা হয়েছিল। আপনার প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক মডেলে যদি উল্টো নিয়ম করা হতো—অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তানের মোট রাজস্ব আয়ের ৪০ শতাংশ ঢাকাকে (কেন্দ্রীয় সরকার) দিয়ে দিতে হতো, তবে পূর্ব পাকিস্তান হতো সে সময়ের এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ অর্থনৈতিক পরাশক্তি। পশ্চিম পাকিস্তানের টাকায় উন্নত হতো ঢাকার রাস্তাঘাট, বন্দর এবং কলকারখানা।

চূড়ান্ত মূল্যায়ন

আপনার উত্থাপিত এই ৫টি শর্ত যদি বাস্তবে রূপ পেত, তবে “পাকিস্তান” নামক রাষ্ট্রটির নাম বহাল থাকলেও, তার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতা এবং চাবিকাঠি থাকত সম্পূর্ণ বাঙালিদের হাতে। পশ্চিম পাকিস্তান মূলত পূর্ব পাকিস্তানের একটি ‘অধীনস্থ অঞ্চল’ বা কলোনিতে পরিণত হতো।

তবে ঐতিহাসিক বাস্তবতায় পশ্চিম পাকিস্তানি শোষকরা কখনোই এই সমতা ও অধিকার মেনে নিত না, যা শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই অর্জিত হয়েছে। বাঙালির এই গৌরবময় ইতিহাস এবং অধিকারের লড়াই আমাদের আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ।

আপনার কি মনে হয়?

এই শর্তগুলো কার্যকর হলে কি অবিভক্ত পাকিস্তান টিকে থাকতে পারত? আপনার মতামত নিচে কমেন্ট করে জানান।

ইতিহাস, রাজনীতি ও সমসাময়িক বিষয়ের এমন চমৎকার ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণ নিয়মিত পড়তে ভিজিট করুন পালস বাংলাদেশ | Pulse Bangladesh

২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ