ইতিহাস
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতা ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২৬
ইসলাম একটি গতিশীল এবং বৈশ্বিক ধর্ম। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলিমের মূল আকিদা বা বিশ্বাস এক হলেও, ভৌগোলিক বিস্তার, ঐতিহাসিক বিবর্তন এবং পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আইনি ব্যাখ্যার (Jurisprudence) ভিন্নতার কারণে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভিন্ন শাখা, উপ-শাখা এবং মাযহাবের সৃষ্টি হয়েছে। ইসলামের একটি বিখ্যাত হাদিস অনুযায়ী, মুসলিম উম্মাহ ভবিষ্যতে ৭৩টি দলে বা ফিরকায় বিভক্ত হবে, যার মধ্যে কেবল একটি দল সঠিক বা নাজাতপ্রাপ্ত (ফিরকায়ে নাজিয়াহ) হবে।

বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহর প্রধান বিভাজন এবং বিশেষ করে বাংলাদেশে হানাফি মাযহাবের একচ্ছত্র প্রভাব ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের একটি পূর্ণাঙ্গ ও বস্তুনিষ্ঠ রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ইসলামের প্রধান শাখা ও উপ-শাখাসমূহ
সমগ্র বিশ্বের মুসলিম জনসংখ্যা মূলত দুটি প্রধান এবং একটি ছোট স্বতন্ত্র শাখায় বিভক্ত:
ক. সুন্নি ইসলাম (Sunni Islam):
বিশ্বের মোট মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ সুন্নি শাখার অনুসারী। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর গণতান্ত্রিক বা পরামর্শভিত্তিক (শুরা) খলিফা নির্বাচনের নীতিতে তারা বিশ্বাসী। সুন্নিরা মূলত দুটি প্রেক্ষাপটে বিভক্ত:
- ফেকহ বা মাযহাব (আইনগত স্কুল): হানাফি, শাফিঈ, মালিকি এবং হাম্বলি—এই চারটি প্রধান মাযহাবে তারা বিভক্ত।
- আকিদাগত ধারা: ঐতিহ্যবাহী আশআরি ও মাতুরিদি আকিদা; সরাসরি কুরআন-হাদিসপন্থী সালাফি/আহলে হাদিস এবং উপমহাদেশীয় দেওবন্দি ও বেরেলভি ধারা।
খ. শিয়া ইসলাম (Shia Islam):
মোট মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ১০ থেকে ১৩ শতাংশ শিয়া শাখার অন্তর্গত। তারা বিশ্বাস করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পর তাঁর জামাতা হযরত আলী (রা.) এবং তাঁর বংশধরেরাই (ইমামগণ) মুসলিম সমাজের প্রকৃত ঐশ্বরিক নেতা। এরা প্রধানত তিনটি উপ-শাখায় বিভক্ত:
- ইসনা আশারিয়া (Twelvers): শিয়াদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দল (৮৫%)। ইরান, ইরাক ও আজারবাইজানে এরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।
- ইসমাইলি (Ismailis): আগা খান হলেন এই ধারার একটি বড় অংশের বর্তমান ইমাম।
- জায়েদি (Zaidis): এরা মূলত ইয়েমেনে বসবাস করে এবং আকিদাগতভাবে সুন্নিদের খুব কাছাকাছি।
গ. স্বতন্ত্র শাখা ও আধ্যাত্মিক ধারা:
- ইবাদি (Ibadi): ওমানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এই ধারার অনুসারী, যা সুন্নি বা শিয়া কোনো দলেই পড়ে না।
- সুফিবাদ (Sufism): এটি কোনো আলাদা ফিরকা নয়, বরং এটি ইসলামের আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক ধারা (যেমন: চিশতিয়া, কাদেরিয়া, নকশবন্দিয়া), যা সুন্নি বা শিয়া উভয় দরের মুসলিমরাই চর্চা করতে পারেন।
২. সুন্নি ইসলামের চার মাযহাব: ব্যবহারিক পার্থক্যের তুলনা

সুন্নিদের চার মাযহাব কোনো ভিন্ন ধর্ম নয়, বরং এগুলো ইসলামের মূল বিশ্বাসকে অক্ষুণ্ণ রেখে দৈনন্দিন ইবাদত ও আইনি খুঁটিনাটি ব্যাখ্যার ৪টি পদ্ধতি। হাদিস পৌঁছানোর ভিন্নতা, হাদিস গ্রহণের শর্ত এবং যুক্তি (কিয়াস) বা স্থানীয় প্রথার ব্যবহারের কারণে এদের মধ্যে কিছু ব্যবহারিক পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
| মাসয়ালা বা বিষয় | হানাফি মাযহাব | শাফিঈ, মালিকি ও হাম্বলি মাযহাব |
| রফু ইয়াদাইন (হাত তোলা) | রুকুতে যাওয়া বা ওঠার সময় হাত তোলা হয় না। কেবল নামাজের শুরুতে তোলা হয়। | রুকুতে যাওয়ার আগে এবং রুকু থেকে ওঠার পর হাত তোলা সুন্নাত। |
| বিসমিল্লাহ জোরে পড়া | নামাজে সূরা ফাতেহার আগে ‘বিসমিল্লাহ’ মনে মনে পড়া হয়। | শাফিঈ মাযহাবে জাহরি (জোরে পড়ার) নামাজে বিসমিল্লাহ জোরে পড়া হয়। |
| সমুদ্রের খাবার | মাছ ছাড়া সমুদ্রের অন্য কোনো জলজ প্রাণী (যেমন: কাঁকড়া, স্কুইড) খাওয়া জায়েজ নয়। | সমুদ্রের সব ধরণের জীব, জলজ প্রাণী ও মাছ খাওয়া সম্পূর্ণ জায়েজ। |
| ওজু ভঙ্গের কারণ | শরীর থেকে রক্ত বা পুঁঁজ বের হয়ে গড়িয়ে পড়লে ওজু ভেঙে যায়। | শাফিঈ মাযহাবে রক্তে ওজু ভাঙে না, তবে নিজের স্ত্রী বা কোনো নারীকে স্পর্শ করলে ওজু ভেঙে যায়। |
| নামাজে হাত বাঁধার স্থান | পুরুষদের জন্য নাভির নিচে হাত বাঁধতে হয়। | বুকের ওপর বা নাভির ওপরে হাত বাঁধতে হয় (মালিকি মাযহাবে অনেকে হাত ছেড়েও নামাজ পড়েন)। |
চার ইমামের পারস্পরিক শ্রদ্ধা: এই চারজন ইমাম (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফিঈ এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল) একে অপরের শিক্ষক বা ছাত্র ছিলেন এবং গভীর শ্রদ্ধাবোধ পোষণ করতেন। তাঁদের সবারই মূল কথা ছিল—“যদি কোনো সহীহ হাদিস পাও, তবে সেটিই আমার মাযহাব।”
৩. বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: হানাফি মাযহাবের আধিপত্য ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য

বাংলাদেশসহ সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় ৯০% বা তার বেশি সুন্নি মুসলিম হানাফি মাযহাব অনুসরণ করেন। উপমহাদেশে হানাফি ফেকহের এই একচ্ছত্র প্রভাবের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে:
- মুসলিম শাসকদের রাজকীয় সমর্থন: সুলতানি ও মোঘল আমলের শাসকেরা মধ্য এশিয়া থেকে এসেছিলেন, যারা ব্যক্তিগতভাবে হানাফি ছিলেন এবং হানাফি ফেকহকেই আদালতের রাষ্ট্রীয় আইন করেছিলেন (যেমন: সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে রচিত ফাতাওয়া-এ-আলমগীরী)।
- সুফি সাধকদের অবদান: খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (র.), হযরত শাহ জালাল (র.)-এর মতো মহান সুফি সাধকেরা হানাফি ধারার অনুসারী ছিলেন। ফলে তাঁদের মাধ্যমে যারা ইসলাম গ্রহণ করেন, তারা প্রাকৃতিকভাবেই হানাফি মাযহাব আপন করে নেন।
- উদারতা ও সহজবোধ্যতা: ইমাম আবু হানিফা (র.) আইনি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে স্থানীয় সংস্কৃতি ও মানুষের সুবিধাকে (কিয়াস) গুরুত্ব দেওয়ায় অমুসলিম প্রধান এই অঞ্চলে নতুন মুসলিমদের জন্য এটি সহজ ও মানানসই ছিল।
- মাদ্রাসা শিক্ষার প্রভাব: উপমহাদেশের ইসলামি শিক্ষার প্রধান দুই ধারা—দেওবন্দি (কওমি) এবং বেরেলভি—উভয়ই হানাফি মাযহাবের কঠোর অনুসারী।
বাংলাদেশে বর্তমান ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও ফিকহী পরিবর্তন:
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হানাফি মাযহাব প্রধান হলেও, আধুনিক বাংলাদেশে বেশ কিছু বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে:
১. শিয়া সম্প্রদায়: মোট মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ১% থেকে ২% শিয়া (জাফরি/ইসনা আশারিয়া)। পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক হোসাইনী দালান ইমামবারা-কে কেন্দ্র করে তারা মহরমে পবিত্র আশুরা ও তাজিয়া মিছিল নির্বিঘ্নে পালন করেন।
২. আহলে হাদিস / সালাফি ধারা: কোনো নির্দিষ্ট মাযহাব না মেনে সরাসরি কুরআন ও সহীহ হাদিস অনুসরণের এই ধারার ব্যাপক উত্থান ঘটেছে (বিশেষ করে রাজশাহী ও উত্তরবঙ্গে)।
৩. প্রবাসী ও বিশ্বায়নের প্রভাব: মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সময় প্রবাস জীবন কাটিয়ে অনেক বাংলাদেশি দেশে ফিরে হানাফি মাযহাবের পাশাপাশি শাফিঈ বা হাম্বলি মাযহাবের কিছু আমল (যেমন: নামাজে জোরে আমিন বলা বা রফু ইয়াদাইন) ব্যক্তিগত জীবনে চর্চা করছেন।
৪. তরুণ প্রজন্মের ফিকহী বৈচিত্র্য: ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম মদিনা বা আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারদের লেকচার শুনে অন্ধ অনুকরণ না করে, দলিলের ভিত্তিতে অন্য মাযহাবের শক্তিশালী মাসয়ালাগুলোকেও ব্যক্তিগত জীবনে গ্রহণ করছেন।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত মূল্যায়ন
ইসলামের বিভিন্ন মাযহাব ও উপ-শাখা মূলত একই বৃক্ষের ভিন্ন ভিন্ন শাখা। বাংলাদেশে হানাফি মাযহাবের ঐতিহাসিক ভিত্তি অত্যন্ত সুদৃঢ় হলেও, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি এবং ধর্মীয় সহনশীলতার কারণে শিয়া, সালাফি কিংবা অন্যান্য মাযহাবের আমলগত বৈচিত্র্য এখন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করছে। মূল বিশ্বাসের একতাই মুসলিম উম্মাহর আসল শক্তি, আর এই বৈচিত্র্য আসলে ইসলামের আইনি ও বুদ্ধিবৃত্তিক উদারতারই বহিঃপ্রকাশ।
নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও তথ্যের সূত্রসমূহ (Sources)
১. ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও আল-আজহার আল-শরিফ আর্কাইভ: ইসলামের ইতিহাস, সুন্নি চার মাযহাবের ফিকহী উৎস এবং উপমহাদেশের ইসলাম প্রচারের ঐতিহাসিক দলিল।
২. “ফাতাওয়া-এ-আলমগীরী” ও মোঘল জুডিশিয়াল রেকর্ডস: ভারতীয় উপমহাদেশে হানাফি আইনের প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাস।
ইসলামের ইতিহাস, ফিকহ শাস্ত্রের গভীর ব্যাখ্যা এবং সমসাময়িক ধর্মীয় তত্ত্বের এমন তথ্যবহুল ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ পড়তে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদনের শিরোনাম: ‘আয়নাঘর’, এনটিএমসি ও সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক: আইনি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
- প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): রাজনীতি, আইন ও মানবাধিকার
- প্রকাশের তারিখ: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): ডিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবানবন্দি রেকর্ড, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদন ও এনএইচআরসি প্রকাশনা।
‘আয়নাঘর’, এনটিএমসি (NTMC) এবং সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক—এই তিনটি উপাদান বাংলাদেশের বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত বলপূর্বক গুম ও রাজনৈতিক নিপীড়নের এক অন্ধকার অধ্যায়ের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর এই তিন স্তম্ভের পারস্পরিক সংযোগ এবং এর গভীর আইনি ও রাজনৈতিক প্রভাব সর্বসমক্ষে উন্মোচিত হয়।

১. পারস্পরিক সংযোগ: আয়নাঘর, এনটিএমসি ও তারিক সিদ্দিক

বিগত সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও গোপন আটক প্রক্রিয়ার একটি ত্রিমাত্রিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল:
- তারিক আহমেদ সিদ্দিক (মাস্টারমাইন্ড): শেখ হাসিনার অত্যন্ত প্রভাবশালী এই নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং শেখ রেহানার ভাসুর, দৃশ্যত প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ওপর একক আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। বিভিন্ন তদন্ত ও রিমান্ডে থাকা কর্মকর্তাদের জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে গড়ে ওঠা এই গোপন আটক ব্যবস্থা বা ‘আয়নাঘর’ পরিচালনার পেছনে তিনি ছিলেন অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী ও নিয়ন্ত্রক।
- এনটিএমসি (ডিজিটাল ট্র্যাকিং টুল): ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার বা এনটিএমসি-কে (যার সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান রিমান্ডে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন) রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ভিন্নমতালম্বীদের ওপর ব্যাপক নজরদারির জন্য ব্যবহার করা হতো। এনটিএমসি-র মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুর ফোন কল রেকর্ড, লোকেশন ও ব্যক্তিগত তথ্য ট্র্যাকিং করা হতো, যা পরবর্তীতে তাদের নিখোঁজ বা গুম করার কাজ সহজ করে দিত।
- আয়নাঘর (চূড়ান্ত গন্তব্য): এনটিএমসি এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে যাদের তুলে নেওয়া হতো, তাদের অনেককেই ডিজিএফআই বা বিশেষ বাহিনী নিয়ন্ত্রিত এই কুখ্যাত গোপন বন্দিশালায় বছরের পর বছর সম্পূর্ণ যোগাযোগহীনভাবে আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো।
২. রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
রাজনৈতিকভাবে এই ত্রয়ী ব্যবস্থা একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ব্যবহৃত হয়েছিল:
- ভিন্নমত ও বিরোধী দল দমন: বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী, সামরিক বাহিনীর অসন্তুষ্ট কর্মকর্তা এবং সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচকদের রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে দিতে এই পরিকাঠামো ব্যবহার করা হয়।
- কর্তৃত্ববাদী শাসন একীভূতকরণ: গুম ও গুপ্ত আটক কেন্দ্রের অস্তিত্বের ভয়কে চাদর হিসেবে ব্যবহার করে সমাজে একটি ‘সংস্কৃতি অব ফেয়ার’ বা ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছিল, যা টানা ১৫ বছর ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
- ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিল: গুম ও জোরপূর্বক নিখোঁজের তদন্ত কমিশনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, কেবল রাজনৈতিক কারণে নয়, তারিক সিদ্দিক ও তার অনুসারীদের ব্যক্তিগত শত্রুতা ও জমি দখলের মতো অপরাধের ক্ষেত্রেও মানুষকে তুলে এনে আয়নাঘরে বন্দি রেখে দলিল সই করিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে
৩. আইনি প্রেক্ষাপট ও চলমান বিচার প্রক্রিয়া
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই ঘটনাগুলোর বিপরীতে আইনি পদক্ষেপ দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে:
- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) বিচার: গুম, নির্যাতন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। ইন্টারপোলের মাধ্যমে তারিক সিদ্দিককে (যিনি বর্তমানে বিদেশে পলাতক বলে ধারণা করা হয়) দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া চলছে।
- গুম তদন্ত কমিশনের অকাট্য রিপোর্ট: ২০২৬ সালের শুরুতে সরকারের জমা দেওয়া গুম সংক্রান্ত বিশেষ তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত রিপোর্টে বলপূর্বক গুমের কাঠামোগত অপরাধের জন্য সরাসরি শেখ হাসিনা, তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে প্রত্যক্ষভাবে দায়ী করা হয়েছে।
- সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও ব্যাংক হিসাব স্থগিত: মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) তারিক সিদ্দিক ও তার পরিবারের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অবরুদ্ধ করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (ACC) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত গাজীপুর ও ঢাকার প্রায় ১৫ কোটি টাকার জমি ও বহুতল ভবনসহ তার দৃশ্যমান সম্পত্তি ক্রোক বা বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ জারি করেছে।
উপসংহার:
বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘আয়নাঘর’ ও ‘এনটিএমসি’-র অপব্যবহার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং তারিক আহমেদ সিদ্দিকের মতো শীর্ষ ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের নির্দেশনায় পরিচালিত এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় অপরাধ। বর্তমানে আইনিভাবে একে “মানবতাবিরোধী অপরাধ” হিসেবে গণ্য করে বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
বিষয়ঃ
আন্তর্জাতিক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদনের শিরোনাম: চীন দেশের ১০টি অবাক করা ও বিস্ময়কর তথ্য
প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
বিভাগ (Category): বিশ্ব সংস্কৃতি, সাধারণ জ্ঞান ও বৈচিত্র্য
প্রকাশের তারিখ: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তথ্যসূত্র (Sources): ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO), বিশ্বসংস্কৃতি রেকর্ড ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম।
পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময় দেশ চীন। ইতিহাস, ভৌগোলিক ক্ষেত্র ও জনসংখ্যা—সব দিক দিয়েই চীনের অবস্থান বিশ্বমঞ্চে অনন্য। প্রাচ্যের এই বিশাল দেশে এমন বহু ঐতিহ্য ও সামাজিক চর্চা রয়েছে যা বাইরের দেশের মানুষের কাছে যেমন বিস্ময়কর, তেমনই বেশ কৌতুহল উদ্দীপক।

চীন দেশ সম্পর্কে ১০টি অবাক করা ও বিস্ময়কর তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
- এক টাইম জোন: বিশাল আয়তনের দেশ হওয়া সত্ত্বেও পুরো চীনে মাত্র একটি টাইম জোন (Beijing Time) চালু রয়েছে। এর ফলে দেশের পশ্চিম প্রান্তে সকালের সূর্য উঠতে অনেক সময় সকাল ১০টা বেজে যায়।
- বর্ণমালা ছাড়াই ভাষা: চীনা ভাষার কোনো বর্ণমালা বা অ্যালফাবেট নেই। এর বদলে হাজার হাজার পিকটোগ্রাফিক ক্যারেক্টার বা চিত্রভিত্তিক বর্ণ ব্যবহার করা হয়। স্বাভাবিক কাজের জন্য প্রায় ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ ক্যারেক্টার জানতে হয়।
- গুহায় বসবাস: আধুনিক যুগেও চীনের লক্ষ লক্ষ মানুষ (প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখের বেশি) ঐতিহ্যগতভাবে পাহাড়ি অঞ্চলের গুহায় বা মাটির নিচে তৈরি বিশেষ ধরনের বাড়িতে বসবাস করেন।
- বিশ্বের দীর্ঘতম রেল নেটওয়ার্ক: চীনের হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক এতটাই বিশাল যে এর রেলপথ দিয়ে পৃথিবীকে প্রায় চারবার পেঁচিয়ে ফেলা সম্ভব।
- প্রাচীরের দৈর্ঘ্য: বিখ্যাত গ্রেট ওয়াল অব চায়না-এর মূল দৈর্ঘ্য প্রায় ২১,১৯৬ কিলোমিটার, যা মানবসৃষ্ট প্রাচীন স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।
- বর্ষার রঙ সাদা: পশ্চিমা সংস্কৃতির মতো চীনে কালো নয়, বরং সাদা রঙকে শোক, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও দুঃখের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।
- টয়লেট পেপারের প্রচলন: ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চীনে প্রথম টয়লেট পেপারের ব্যবহার শুরু হয়, যা সে সময় শুধুমাত্র রাজপরিবারের সম্রাট ও তাদের সদস্যদের ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট ছিল।
- পাহারায় রাজহাঁস: চীনের অনেক পুলিশ স্টেশন ও খামারে কুকুরের পাশাপাশি বা বিকল্প হিসেবে পাহারাদার হিসেবে রাজহাঁস ব্যবহার করা হয়। হাঁসের দৃষ্টিশক্তি ও তীক্ষ্ণ শব্দ করার ক্ষমতা বেশ কার্যকর।
- চপস্টিকের ব্যবহার: চীনে প্রতি বছর প্রায় ৪৫ বিলিয়ন বা সাড়ে চার হাজার কোটি চপস্টিক ব্যবহার করা হয়, যার বেশিরভাগই কাঠের তৈরি।
- প্রাচীন আবিষ্কার: বর্তমান বিশ্বের জনপ্রিয় খেলা ফুটবল, ঘুড়ি ও কম্পাসের আদি রূপ প্রাচীন চীনেই প্রথম উদ্ভাবিত হয়েছিল।
প্রাচীন ইতিহাস ও রাজবংশ সম্পর্কে আর অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত আধুনিক অগ্রগতি নিয়ে আমাকে বিস্তারিত
চীনের প্রাচীন ইতিহাস ও রাজবংশ এবং আধুনিক যুগে এসে তাদের যে অভাবনীয় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর ঘটেছে, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম এক বিস্ময়। নিচে দুটি বিষয়ই বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

প্রাচীন ইতিহাস ও রাজবংশ (Ancient History & Dynasties)
চীনের সভ্যতাকে পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী এবং ধারাবাহিক সভ্যতা বলা হয়। প্রায় ৫,০০০ বছর আগে হলুদ নদী (Yellow River) বা হুয়াং হো নদীর অববাহিকায় এই সভ্যতার সূচনা ঘটেছিল। চীনের ইতিহাস মূলত বিভিন্ন শক্তিশালী রাজবংশের উত্থান ও পতনের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়েছে:
- শিয়া ও শাং রাজবংশ (Xia & Shang Dynasty): শিয়া রাজবংশকে চীনের প্রথম কিংবদন্তি রাজবংশ ধরা হলেও, শাং রাজবংশ (১৬০০–১০৪৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) থেকে চীনের লিখিত ইতিহাসের অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়। এই যুগেই প্রথম চিনা লিপির আদি রূপ আবিষ্কৃত হয়।
- ঝৌ রাজবংশ (Zhou Dynasty): এটি চীনের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় (প্রায় ৮০০ বছর) শাসন করা রাজবংশ। এই যুগেই চীনের বিখ্যাত দুই দার্শনিক কনফুসিয়াস এবং লাও জে (তাওবাদের প্রতিষ্ঠাতা) তাদের দর্শন প্রচার করেন, যা চিনা সমাজকে চিরতরে বদলে দেয়।
- কিন রাজবংশ (Qin Dynasty): মাত্র ১৫ বছর টিকলেও এই রাজবংশের রাজা কিন শি হুয়াং ২২১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে টুকরো টুকরো চীনকে একত্রিত করে প্রথম চিনা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নাম থেকেই ‘চায়না’ বা ‘চীন’ নামের উৎপত্তি। তিনি মুদ্রা, ওজন ও পরিমাপের একক এক করেন এবং বহিরাগত আক্রমণ ঠেকাতে গ্রেট ওয়াল বা চীনের প্রাচীর নির্মাণ শুরু করেন।
- হান রাজবংশ (Han Dynasty): (২০৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ – ২২০ খ্রিষ্টাব্দ) একে চীনের ইতিহাসের ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হয়। এই সময়েই এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যের মূল পথ সিল্ক রোড (Silk Road) প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া কাগজ আবিষ্কার এবং সরকারি চাকরিতে পরীক্ষা পদ্ধতির সূচনা এই বংশেরই অবদান।
- ট্যাং ও সং রাজবংশ (Tang & Song Dynasty): ট্যাং আমলে কবিতা ও শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটে এবং সং আমলে বারুদ, কম্পাস ও কাঠের ব্লকে মুদ্রণ পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়, যা বিশ্বের ইতিহাসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।
- মিং ও কিং রাজবংশ (Ming & Qing Dynasty): মিং রাজবংশ (১৩৬৮–১৬৪৪) চীনের প্রাচীরের আধুনিক সংস্করণ এবং বেইজিংয়ের বিখ্যাত ‘ফরবিডেন সিটি’ তৈরি করে। আর কিং রাজবংশ (১৬ party–১৯১২) ছিল চীনের শেষ রাজবংশ, যার পতনের মধ্য দিয়ে চীনে ২,০০০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং ১৯১২ সালে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
আধুনিক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি
১৯৪৯ সালে মাও সেতুং-এর নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন (PRC) গঠিত হওয়ার পর দেশটি সমাজতান্ত্রিক ধারায় চলতে থাকে। তবে ১৯৭৮ সালে লিডার দং শিয়াওপিং-এর “সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ” (Reform and Opening-up) নীতির পর চীনের অর্থনীতিতে এক অলৌকিক পরিবর্তন আসে। [
অর্থনৈতিক রূপান্তর:
- বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি: গত চার দশকে চীন প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে এনেছে, যা বিশ্ব ইতিহাসে এক রেকর্ড। বর্তমানে জিডিপির (GDP) দিক থেকে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র।
- বিশ্বের কারখানা (The World’s Factory): সস্তা শ্রম, উন্নত অবকাঠামো এবং বিশাল উৎপাদন ক্ষমতার কারণে পৃথিবীর সিংহভাগ ইলেকট্রনিক্স, পোশাক ও ভারী যন্ত্রপাতি চীনেই তৈরি হয়।
- বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI): প্রাচীন সিল্ক রোডের আদলে চীন বিশ্বের শতাধিক দেশের সাথে সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথের এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে。
প্রযুক্তিগত আধিপত্য:
বর্তমান যুগে চীন কেবল পণ্য নকল বা সস্তা উৎপাদনের দেশ নয়, বরং তারা বৈশ্বিক প্রযুক্তির নেতৃত্ব দিচ্ছে:
- টেলিকমিউনিকেশন ও ৫জি (5G): অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট (ASPI)-এর গবেষণা অনুযায়ী, ৪৪টি জটিল ও উদীয়মান প্রযুক্তির মধ্যে ৩৭টিতেই চীন বিশ্বে সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ৫জি ইন্টারনেট অবকাঠামোতে তারা একক আধিপত্য বজায় রেখেছে।
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতি (AI & Digital Economy): ফেসিয়াল রিকগনিশন, এআই (AI) চালিত অ্যালগরিদম এবং বিগ ডেটা ব্যবহারে চীন অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে। হুয়াওয়ে (Huawei), আলিবাবা (Alibaba) এবং টেনসেন্ট (Tencent)-এর মতো টেক জায়ান্টরা এখন সিলিকন ভ্যালির কোম্পানিগুলোকে টক্কর দিচ্ছে।
- গ্রিন এনার্জি ও ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV): জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে চীন বিশ্বের বৃহত্তম সৌর প্যানেল, উইন্ড মিল এবং ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারি উৎপাদনকারী দেশ। বিওয়াইডি (BYD) এর মতো চিনা কোম্পানি এখন বিশ্ব বাজারে টেসলার অন্যতম বড় প্রতিযোগী।
- মহাকাশ ও মেগা-ইঞ্জিনিয়ারিং: চীন নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন ‘তিয়ানগং’ (Tiangong) তৈরি করেছে এবং চাঁদের দুর্গম দূরবর্তী অংশে (Far Side of the Moon) রোভার পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সেতু, বুলেট ট্রেন নেটওয়ার্ক এবং বিশাল সব ড্যাম (যেমন- থ্রি গর্জেস ড্যাম) তাদের মেগা-ইঞ্জিনিয়ারিং ক্ষমতার প্রমাণ。
বিখ্যাত কনফুসীয় দর্শন বা চীনের প্রাচীর নির্মাণের পেছনের গল্প

কনফুসীয় দর্শন এবং চীনের প্রাচীর—এই দুটিই চীনের হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির মূল স্তম্ভ। এর একটি মানুষের মন ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, আর অন্যটি বাইরের শত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করেছে। নিচে এই দুটির পেছনের গল্প বিস্তারিত দেওয়া হলো:
বিখ্যাত কনফুসীয় দর্শনের গল্প (The Story of Confucianism)
খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে (৫৫১–৪৭৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) চীনে যখন ঝৌ রাজবংশ শাসন করছিল, তখন চিনা সমাজ মারাত্মক বিশৃঙ্খলা, যুদ্ধ এবং নৈতিক অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সেই অশান্ত সময়ে আবির্ভূত হন চিনের সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক ও শিক্ষক কনফুসিয়াস (চিনা নাম: কোং কিউ)।
দর্শনের পেছনের মূল উদ্দেশ্য:
কনফুসিয়াস কোনো নতুন ধর্ম প্রচার করেননি। তিনি চেয়েছিলেন সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা এবং নৈতিকতা ফিরিয়ে আনতে। তাঁর মতে, সমাজকে যদি সুন্দর করতে হয়, তবে মানুষকে ভেতর থেকে সৎ ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
কনফুসীয় দর্শনের মূল ভিত্তি বা স্তম্ভগুলো:
- রেন (Ren – মানবতা ও পরোপকার): মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, দয়া এবং সহমর্মিতা থাকতে হবে। এটিই চিনা সংস্কৃতির মূল ভিত্তি।
- শাও (Xiao – সন্তানসুলভ ভক্তি): পরিবারের বড়দের, বিশেষ করে বাবা-মার প্রতি সন্তানদের পরম শ্রদ্ধা ও বাধ্য থাকা। কনফুসিয়াস মনে করতেন, পরিবারে যদি শৃঙ্খলা থাকে, তবে রাষ্ট্রেও শান্তি বজায় থাকবে。
- লি (Li – আচার-অনুষ্ঠান ও সদাচরণ): সমাজে বা রাষ্ট্রে কার কী ভূমিকা (যেমন: শাসকের প্রতি প্রজার, শিক্ষকের প্রতি ছাত্রের দায়িত্ব) তা যথাযথভাবে পালন করা এবং ভদ্রতা বজায় রাখা।
- সৎ শাসক: কনফুসিয়াস বিশ্বাস করতেন, একজন রাজাকে অবশ্যই নৈতিকভাবে নিখুঁত হতে হবে। রাজা যদি প্রজাদের প্রতি দয়ালু ও ন্যায়পরায়ণ হন, তবে প্রজারাও রাজাকে শ্রদ্ধা করবে এবং রাজ্যে কোনো বিদ্রোহ হবে না।
ঐতিহাসিক মোড়: প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং এই দর্শনকে নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং কনফুসীয় বই পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী হান রাজবংশের আমলে একে চীনের রাষ্ট্রীয় দর্শন হিসেবে গ্রহণ করা হয়। প্রায় দুই হাজার বছর ধরে চীনের রাজকীয় আমলাতন্ত্র ও সরকারি চাকুরির পরীক্ষা এই কনফুসীয় দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হতো।
চীনের প্রাচীর নির্মাণের পেছনের গল্প (The Story of the Great Wall)
অনেকেই মনে করেন চীনের প্রাচীর একবারে বা একটি নির্দিষ্ট রাজবংশের আমলে তৈরি হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভুল। এটি মূলত ২,০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন রাজবংশের টুকরো টুকরো কাজের এক বিশাল সমষ্টি।
নির্মাণের পেছনের আসল কারণ:
চীনের উত্তর সীমান্তে ছিল মঙ্গোলিয়া ও মাঞ্চুরিয়ার বিশাল বিস্তীর্ণ তৃণভূমি (Steppes)। সেখানে বসবাস করত যাযাবর ও দুর্ধর্ষ যুদ্ধবাজ উপজাতিরা (যেমন: শিয়ংনু, মঙ্গোল)। কৃষিপ্রধান এবং উন্নত চিনা সাম্রাজ্যগুলোতে এই যাযাবর ঘোড়সওয়াররা প্রায়ই আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে ধন-সম্পদ, ফসল ও গবাদিপশু লুট করে নিয়ে যেত। এই যাযাবর দস্যুদের হাত থেকে চিনা সীমান্ত ও প্রাচীন বাণিজ্যের মূল পথ সিল্ক রোড রক্ষা করাই ছিল প্রাচীর নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য।
যেভাবে শুরু ও শেষ হয়েছিল:
- টুকরো দেয়াল (৭ম খ্রিষ্টপূর্বাব্দ): প্রাচীন চীনের ছোট ছোট রাজ্যগুলো নিজেদের সুরক্ষার জন্য নিজ নিজ সীমান্তে ছোট ছোট মাটির দেয়াল তৈরি করেছিল।
- একত্রীকরণ (২২১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ): চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং পুরো চীনকে একত্রিত করার পর ভেতরের রাজ্যগুলোর দেয়াল ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। তিনি উত্তরের যাযাবরদের ঠেকাতে পূর্বের তৈরি টুকরো দেয়ালগুলোকে একসাথে জুড়ে দিয়ে একটি বিশাল প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরির কাজ শুরু করেন। এটিই ছিল গ্রেট ওয়ালের প্রথম আদি রূপ।
- আধুনিক রূপ (১৩৬৮–১৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দ): আজ আমরা পর্যটক হিসেবে পাথরের তৈরি যে সুন্দর ও মজবুত প্রাচীর দেখতে পাই, তা মূলত মিং রাজবংশের আমলে তৈরি। মঙ্গোল নেতা চেঙ্গিস খানের বংশধরদের আক্রমণ ঠেকাতে তারা ইট ও পাথর দিয়ে ওয়াচটাওয়ারসহ এই আধুনিক প্রাচীর নির্মাণ করে।
“বিশ্বের দীর্ঘতম কবরস্থান” এর ট্র্যাজেডি:
প্রাচীর নির্মাণের পেছনের গল্পটি যেমন বীরত্বের, তেমনই চরম নিষ্ঠুরতার। সম্রাট কিন শি হুয়াং এই প্রাচীর তৈরির জন্য দেশের লাখ লাখ সাধারণ কৃষক, অপরাধী এবং বন্দি সেনাদের জোরপূর্বক উত্তর সীমান্তে পাঠাতেন।
পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চল, হাড়কাঁপানো শীত, খাদ্যাভাব এবং প্রচণ্ড শারীরিক খাটাখাটুনির কারণে প্রাচীর নির্মাণ করতে গিয়ে প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ মারা যায়। লোককথা অনুযায়ী, যেসব শ্রমিক কাজ করতে করতে মারা যেতেন, তাদের মৃতদেহ অন্য কোথাও না নিয়ে প্রাচীরের ভেতরেই মাটি চাপা দেওয়া হতো। এই চরম মানবিক ট্র্যাজেডির কারণে চীনের প্রাচীরকে অনানুষ্ঠানিকভাবে “বিশ্বের দীর্ঘতম কবরস্থান” (The World’s Longest Cemetery) বলা হয়ে থাকে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): ইতিহাস, রাজনীতি ও বায়োগ্রাফি
- প্রকাশের তারিখ: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): প্রখ্যাত রাজনৈতিক ইতিহাস নথিপত্র, আর্কাইভাল রেকর্ড ও পারিবারিক ইতিহাস গাইড।
একটি পরিবারের বা ব্যক্তির পৈতৃক শিকড়, জন্মস্থান, কর্মস্থল, স্থায়ী বসবাস এবং মৃত্যুর পর সমাহিত হওয়ার স্থান—এই বিষয়গুলো ইতিহাস ও জীবনযাত্রার ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় নির্দেশ করে। চাকরি, ব্যবসা, রাজনীতি কিংবা দেশভাগের মতো ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে মানুষের জীবনধারা স্থানান্তরিত হওয়া ইতিহাসজুড়ে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিএনপি নেতা তারেক রহমানের পারিবারিক ইতিহাস এবং তাঁর দাদা-দাদির করাচিতে সমাহিত হওয়ার মূল কারণও এই ঐতিহাসিক ও পেশাগত পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত।
১. পৈতৃক শিকড় ও পরিবারের ধারাবাহিকতা

বীর উত্তম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পৈতৃক পরিবার মূলত বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী এলাকার বাসিন্দা।
- পৈতৃক মূল রূপরেখা: জিয়াউর রহমানের নিজের দাদা মৌলভী কামালউদ্দিন মণ্ডল বগুড়ার মহিষাবান এলাকা থেকে বাগবাড়ীতে আগমন করেন এবং মেহেরুন্নিসাকে বিয়ে করেন। তিনি বাগবাড়ী মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
- জিয়াউর রহমানের জন্ম: ১৯৩৬ সালে জিয়াউর রহমান বগুড়ার বাগবাড়ীতেই জন্মগ্রহণ করেন।
- মনসুর রহমান ও জাহানারা খাতুন: জিয়াউর রহমানের বাবা মনসুর রহমান ছিলেন পেশায় একজন রসায়নবিদ এবং তিনি সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন।
২. দেশভাগ, চাকরি ও করাচিতে স্থানান্তরের প্রেক্ষাপট
মনসুর রহমান ব্রিটিশ আমলে কলকাতার একটি সরকারি দপ্তরে রসায়নবিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
- দেশভাগের প্রভাব (১৯৪৭): ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান বিভক্ত হলে মনসুর রহমান সরকারি চাকরি সূত্রে এবং পরিবারসহ তৎকালীন পাকিস্তানের নতুন রাজধানী করাচিতে স্থানান্তরিত হন।
- জিয়াউর রহমানের শৈশব ও শিক্ষা: জিয়াউর রহমানও তখন বাবার কর্মস্থল সূত্রে করাচিতে যান এবং সেখানেই তাঁর স্কুল শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
- কবরের অবস্থান: ১৯৪৭ সালের পর মনসুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী জাহানারা খাতুন (তারেক রহমানের দাদা ও দাদি) করাচীতেই স্থায়িভাবে বসবাস শুরু করেন এবং পরবর্তী সময়ে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই তাঁদের দাফন করাচিতে সম্পন্ন হয়।
৩. ইতিহাসে পৈতৃক শিকড় ও দাফনের স্থানের বৈচিত্র্যের নজির

পৈতৃক শিকড় বা জন্মভূমি এক জায়গায়, কিন্তু জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে দাফন বা শেষ শয্যা অন্য দেশে হওয়া ইতিহাসে কোনো বিরল ঘটনা নয়। মানব ইতিহাসের হাজার বছর ধরে যুদ্ধ, রাজনৈতিক নির্বাসন, সাম্রাজ্য বিস্তার, পেশাগত কারণ এবং দেশভাগের মতো ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে অসংখ্য বিখ্যাত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এমন বৈচিত্র্য দেখা গেছে।
| ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব | পৈতৃক শিকড় / জন্মস্থান | শেষ জীবন / সমাহিত হওয়ার স্থান |
| কাজী নজরুল ইসলাম | চুরুলিয়া, বর্ধমান (ভারত) | ঢাকা, বাংলাদেশ |
| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | পূর্ববঙ্গের জমিদারি অঞ্চল (শিলাইদহ/শাহজাদপুর) | কলকাতা, ভারত |
| শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক-এর পরিবার: শিকড় বাকেরগঞ্জ (বরিশাল), চাচার কবর কলকাতায় | বরিশাল | বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের পৈতৃক শিকড় বর্তমান বাংলাদেশের বরিশাল (তৎকালীন বাকেরগঞ্জ) অঞ্চলে হলেও তাঁর চাচা ও ওস্তাদ ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দি সুরাওয়ার্দীর মতো পরিবারের অনেক সদস্যের কর্মজীবন ও শেষ শয্যা হয়েছিল তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায়। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী এবং বড় শহরের কেন্দ্রিকতার কারণে এটি ঘটেছিল। |
| মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ | গুজরাট (ভারত) | করাচি, পাকিস্তান |
| হযরত ইব্রাহিম (আ.) | মেসোপটেমিয়া (ইরাক) | হেবরন (ফিলিস্তিন/ইসরায়েল) |
ইতিহাসের পাতা থেকে পৈতৃক শিকড় ও দাফনের স্থানের বৈচিত্র্যের আরো ৪ টি উল্লেখযোগ্য নজির নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর: পৈতৃক শিকড় দিল্লি, দাফন ইয়াঙ্গুন (মিয়ানমার)
মুঘল রাজবংশের পৈতৃক শিকড় ছিল ভারতের দিল্লি এবং আগ্রা কেন্দ্রিক। তবে সিপাহি বিদ্রোহের (১৮৫৭) পর ব্রিটিশরা শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে রেঙ্গুনে (বর্তমান ইয়াঙ্গুন, মিয়ানমার) নির্বাসিত করে। ১৮৬২ সালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয় এবং ব্রিটিশরা অত্যন্ত গোপনে একটি গ্যারিসনের কাছে তাঁকে সমাহিত করে। বর্তমান যুগেও তাঁর মাজার মিয়ানমারে একটি ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান।
২. বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন: পৈতৃক শিকড় জার্মানি, শেষকৃত্য নিউ জার্সি (যুক্তরাষ্ট্র)
সর্বকালের অন্যতম সেরা এই বিজ্ঞানীর পৈতৃক শিকড় ও জন্ম ছিল জার্মানিতে। তবে ১৯৩০-এর দশকে নাৎসি বাহিনীর উত্থান এবং ইহুদি নিধনের প্রেক্ষাপটে তিনি জার্মানি ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে নিউ জার্সির প্রিন্সটনে তাঁর মৃত্যু হয় এবং তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী কোনো জাঁকজমকপূর্ণ কবর না বানিয়ে মৃতদেহ পুড়িয়ে ছাই বাতাসে উড়িয়ে দেওয়া হয়।
৩. কার্ল মার্ক্স: পৈতৃক শিকড় জার্মানি, দাফন লন্ডন (যুক্তরাজ্য)
সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা কার্ল মার্ক্সের পৈতৃক শিকড় ও জন্ম ছিল জার্মানির প্রুশিয়ায়। তাঁর বৈপ্লবিক রাজনৈতিক লেখার কারণে তিনি জার্মানি, ফ্রান্স ও বেলজিয়াম থেকে বহিষ্কৃত হন। জীবনের শেষ তিন দশক তিনি লন্ডনে কাটান এবং ১৮৮৩ সালে সেখানেই মারা যান। লন্ডনের বিখ্যাত হাইগেট সেমেটারিতে (Highgate Cemetery) তাঁর সমাধি অবস্থিত।
৪. মুঘল সম্রাট বাবর: পৈতৃক শিকড় ফারগানা (উজবেকিস্তান), জন্ম ও মৃত্যু ভারত, চূড়ান্ত দাফন কাবুল (আফগানিস্তান)
মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের পৈতৃক শিকড় ছিল মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানের ফারগানা উপত্যকায়। তিনি ভারত জয় করে সাম্রাজ্য গড়েন এবং ১৫৩০ সালে ভারতের আগ্রায় মারা যান। প্রথমে তাঁকে আগ্রার আরামবাগে দাফন করা হলেও, তাঁর পূর্ব ইচ্ছা অনুযায়ী পরবর্তীতে তাঁর দেহাবশেষ আফগানিস্তানের কাবুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং “বাগ-ই-বাবর” (বাবরের বাগান) নামক স্থানে চূড়ান্তভাবে সমাহিত করা হয়।
এই বৈচিত্র্যের মূল কারণগুলো কী কী?
- ভূ-রাজনৈতিক সীমানা পরিবর্তন: ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ বা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতার মতো ঘটনার কারণে বহু মানুষের পৈতৃক ভিটা এক দেশে আর বর্তমান নাগরিকত্ব বা শেষ ঠিকানা অন্য দেশে পরিণত হয়েছে।
- পেশাগত স্থানান্তর: ব্রিটিশ আমল বা পাকিস্তান আমলে চাকুরিসূত্রে এক অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলে গিয়ে স্থায়ী হয়েছেন এবং সেখানেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
- রাজনৈতিক নির্বাসন: ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা যুদ্ধের কারণে ইতিহাসের বহু রাজপরিবার বা রাজনৈতিক নেতাকে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে হয়েছে এবং সেখানেই সমাহিত হতে হয়েছে।
মূল নির্যাস
পৈতৃক শিকড়, জন্মস্থান, বসবাসের স্থান, কর্মস্থল, মৃত্যুর স্থান এবং সমাহিত হওয়ার স্থান—এই ছয়টি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কোনো ব্যক্তির পরিবারের কেউ ভিন্ন দেশে সমাহিত হওয়া মানে এই নয় যে তাঁর ঐতিহাসিক বা পারিবারিক পৈতৃক শিকড় বদলে গেছে। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও বগুড়া তাঁর বংশানুক্রমিক পৈতৃক মাটি, আর করাচীতে তাঁর দাদা-দাদির সমাহিত হওয়াটা ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং সরকারি চাকরির ঐতিহাসিক স্থানান্তরের একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



