অর্থনীতি

গলা শুকিয়ে ও পানিতে চুবিয়ে মারার কৌশল: ফারাক্কা ও তিস্তার মরণফাঁদে বাংলাদেশ
ফারাক্কা ও তিস্তা বাঁধের মরণকামড়

নিউজ ডেস্ক

May 3, 2026

শেয়ার করুন

বিডিএস নিউজ ডেস্ক | ০৩ মে ২০২৬

ঢাকা: বাংলাদেশের নদীমাতৃক পরিচয় আজ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে। ভারতের ফারাক্কা বাঁধ এবং তিস্তা ব্যারেজের একতরফা পানি নিয়ন্ত্রণের ফলে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল মরুভূমি হওয়ার পথে, অন্যদিকে বর্ষায় দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ কৃত্রিম বন্যা। পরিবেশবিদ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এই দুই বাঁধের কারণে বাংলাদেশ প্রতি বছর গড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পদ হারাচ্ছে।

১. ফারাক্কা বাঁধ: পদ্মা ও ৬৫টি নদীর মরণঘণ্টা

ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে কেবল পদ্মা নদীই শুকিয়ে যায়নি, বরং এর সাথে সংযুক্ত দেশের অর্ধশতাধিক (৬৫টির বেশি) নদী আজ মৃতপ্রায়।

  • অর্থনৈতিক ক্ষতি: নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মৎস্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং কৃষি জমি উর্বরতা হারাচ্ছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘমেয়াদী উদাসীনতার কারণে গত এক দশকে এই সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
  • বর্ষার প্রকোপ: শুকনো মৌসুমে পানি আটকে রাখার ফলে বর্ষার সময় ভারত যখন অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেয়, তখন স্রোতের তীব্রতা ও নদীর নাব্যতাহীনতার কারণে ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙন সৃষ্টি হয়।

২. তিস্তা ব্যারেজ: উত্তরের মরুভূমিকরণ

তিস্তা নদীর উজানে ভারতের ব্যারেজ নির্মাণের ফলে গ্রীষ্মকালে বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলে প্রবল খরা দেখা দিচ্ছে।

  • মেঘনার ওপর প্রভাব: তিস্তার পানির অভাব পরোক্ষভাবে মেঘনা নদীর প্রবাহকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
  • কৃষি বিপর্যয়: সেচ কাজে পানির অভাবে এই অঞ্চলের প্রধান ফসল উৎপাদন আজ ঝুঁকির মুখে। গ্রীষ্মে পানি আটকে রাখা এবং বর্ষায় হঠাৎ পানি ছেড়ে দেওয়ার ফলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন প্রতি বছর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে।

৩. আন্তর্জাতিক পানি আইন ও বাংলাদেশের করণীয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে ভারত আন্তর্জাতিক পানি আইনের তোয়াক্কা করছে না।

  • আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ: এখন সময় এসেছে এই সমস্যাটি আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ করা। দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অপেক্ষায় বসে না থেকে বৈশ্বিক চাপ সৃষ্টি করা জরুরি।
  • বিকল্প ব্যবস্থা: ভারতীয় সীমান্তের কাছে নিজস্ব ব্যারেজ নির্মাণ, নদীর দুই পাশে খাল খনন করে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং মৃতপ্রায় নদীগুলো পুনরায় খনন করে নাব্য ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।

৪. জনসচেতনতা ও সরকারের ওপর চাপ

সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশে রূপান্তর হওয়ার স্বপ্ন তখনই পূর্ণ হবে যখন দেশের প্রাণ অর্থাৎ নদীগুলোকে রক্ষা করা যাবে। জনগণের তীব্র চাপ ও সচেতনতা ছাড়া এই সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব নয়। সরকারকে কূটনৈতিক ও প্রকৌশলগত উভয় ক্ষেত্রেই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

উপসংহার

ফারাক্কা ও তিস্তা বাংলাদেশের জন্য কেবল দুটি বাঁধ নয়, বরং এটি একটি ‘ভৌগোলিক অভিশাপ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এই অপূরণীয় ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব হবে। বাংলাদেশকে ‘শনিআখড়া’ থেকে বাঁচাতে হলে অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স (Source List):

  1. প্রতিবেদন: সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (CEGIS)।
  2. বই: ‘বাংলাদেশ ও ভারতের পানি রাজনীতি’ – বিভিন্ন গবেষক।
  3. আইনি রেফারেন্স: জাতিসংঘ কনভেনশন অন দ্য ল অফ দ্য নন-নেভিগেশনাল ইউজেস অফ ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটারকোর্সেস।
  4. নিবন্ধ: ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর পরিবেশ বিষয়ক বিশেষ আর্কাইভ।
  5. ডেটা: বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB) খরা ও বন্যা পরিসংখ্যান রিপোর্ট ২০২৫।

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

বাংলাদেশ সীমান্তে ইসরাইলি ছায়া

নিউজ ডেস্ক

May 3, 2026

শেয়ার করুন

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | ০৩ মে ২০২৬

ঢাকা: দক্ষিণ এশিয়ার তথাকথিত ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোর সংলগ্ন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য (সেভেন সিস্টার্স) দীর্ঘদিন ধরেই জাতিগত সংঘাত ও বিচ্ছিন্নতাবাদের কেন্দ্রবিন্দু। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলে মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্র ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ এবং সরাসরি অর্থায়নে অভিবাসন প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ভ্রু কুঁচকে দিয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তের একেবারে সন্নিকটে এই জায়নবাদী তৎপরতা কি কেবল ধর্মীয় আবেগ, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে বড় কোনো ভূ-রাজনৈতিক চাল?

১. ‘বনে মেনাশে’ রহস্য: মিথলজি থেকে রাজনৈতিক অস্ত্র

মণিপুর ও মিজোরামের কুকি-চিন-মিজো সম্প্রদায়ের একটি ক্ষুদ্র অংশ নিজেদের ইসরাইলের হারিয়ে যাওয়া ১০ গোত্রের একটি—’মনশে’ বা ‘মেনাশে’র বংশধর বলে দাবি করে। ১৯৫০-এর দশকে একটি স্বপ্নকে কেন্দ্র করে এই বিশ্বাসের শুরু হলেও, ২০০৫ সালে ইসরাইলের প্রধান রাব্বি (Sephardic Chief Rabbi) তাদের ইহুদি বংশোদ্ভূত হিসেবে স্বীকৃতি দিলে বিষয়টি রাজনৈতিক মোড় নেয়।

বিশ্লেষণ: এই স্বীকৃতি কোনো সাধারণ ধর্মীয় ঘটনা নয়। ২০০৫ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫,০০০ মেনাশে ভারতে থেকে ইসরাইলে চলে গেছেন। ইসরাইল সরকারের ‘ল অফ রিটার্ন’ (Law of Return) ব্যবহার করে তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হচ্ছে, যার মূল উদ্দেশ্য ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করা জমিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি করা।

২. ভূ-রাজনীতি ও কৌশলগত স্বার্থ: কেন এখন?

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই অভিবাসনকে ‘গুরুত্বপূর্ণ জায়নবাদী সিদ্ধান্ত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে:

  • জনতাত্ত্বিক যুদ্ধ (Demographic Warfare): অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের সংখ্যাধিক্যের বিপরীতে ইহুদি জনসংখ্যা বাড়াতে ইসরাইলের জন্য ভারতের এই মঙ্গোলয়েড চেহারার ‘ইহুদিরা’ এখন বড় মানবসম্পদ।
  • শ্রমশক্তির সংকট: ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের ফলে ইসরাইলে শ্রমশক্তির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করায় ভারত থেকে যাওয়া এই মেনাশেদের কৃষি ও শিল্প খাতে ‘সস্তা শ্রম’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
  • উত্তর-পূর্ব ভারতের অস্থিতিশীলতা: মণিপুরে গত তিন বছর ধরে চলা জাতিগত সহিংসতায় কুকি সম্প্রদায় (যাদের অংশ মেনাশেরা) কোণঠাসা। এই অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে ইসরাইল তাদের নিজেদের স্বার্থে ‘উদ্ধারকারী’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

৩. বাংলাদেশ সীমান্তের নিরাপত্তা ঝুঁকি

বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন মিজোরাম ও মণিপুরে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা এবং এনজিও-দের (যেমন: শাভেই ইসরাইল) আনাগোনা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে:

  • বিচ্ছিন্নতাবাদে ইন্ধন: সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলে যদি কোনো বিশেষ জাতিগোষ্ঠীকে একটি বিদেশি শক্তি সরাসরি অর্থ ও সমর্থন দেয়, তবে তা সীমান্তবর্তী অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
  • নতুন রাজনৈতিক অক্ষ: মিয়ানমার, চীন এবং ভারতের সীমান্ত সংযোগস্থলে ইসরাইলি উপস্থিতি মানেই হলো এই অঞ্চলে পশ্চিমা ও জায়নবাদী স্বার্থের একটি স্থায়ী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র তৈরি হওয়া। এটি পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বা সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

৪. শেকড়ের সন্ধান নাকি দাবার ঘুঁটি?

মণিপুরের মাথাপিছু আয় যেখানে বছরে মাত্র ১,২০০ ডলার, সেখানে ইসরাইলের ৫৫,০০০ ডলারের জীবনযাত্রা এই দরিদ্র মানুষদের প্রলুব্ধ করছে। তবে ইসরাইলে পৌঁছানোর পর তাদের প্রথম শর্ত দেওয়া হয়—পুরোপুরি ইহুদি ধর্মে রূপান্তর। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত থেকে যাওয়া এই মানুষগুলো শেষ পর্যন্ত ইসরাইলি সেনাবাহিনীর ‘ক্যানন ফডার’ (যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রবর্তী তলোয়ার) বা বিতর্কিত বসতিগুলোর অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।


উপসংহার

শেকড়ের টান মানুষের একটি চিরন্তন আবেগ, কিন্তু সেই আবেগকে যখন সাম্রাজ্যবাদী বা জায়নবাদী স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, তখন তা জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ সংলগ্ন সীমান্তে ইসরাইলের এই ‘সাফারি ডিপ্লোম্যাসি’ বা উদ্ধার অভিযান আসলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক নকশার অংশ। বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত এই স্থানান্তর প্রক্রিয়ার আড়ালের সত্যগুলো খতিয়ে দেখা।


তথ্যসূত্র ও গভীর বিশ্লেষণমূলক সূত্র (Reference List):

  1. প্রতিবেদন: ‘The Tribes of Israel’ – এ কে এম জাকারিয়া (প্রথম আলো বিশেষ বিশ্লেষণ)।
  2. আন্তর্জাতিক গবেষণা: ‘Bnei Menashe: The Lost Jews of Northeast India’ – ইসরাইলি রাবিনেট ও ডক্টর টিউডর পারফিট।
  3. সংস্থা: শাভেই ইসরাইল (Shavei Israel) – অফিশিয়াল ইমিগ্রেশন রিপোর্ট ২০২৪-২৫।
  4. নিবন্ধ: ‘Strategic Shift: Israel’s Interest in Northeast India’ – সাউথ এশিয়া ডিফেন্স রিভিউ।
  5. নিউজ আর্কাইভ: আলজাজিরা ও হারেৎজ (Haaretz) – ‘The Politics of Aliyah from India’।
  6. ডেটা: বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ – মাথাপিছু আয় তুলনামূলক চিত্র (মণিপুর বনাম ইসরাইল)।

বিশেষ বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com

ভিত্তি থেকে শিখরে

নিউজ ডেস্ক

May 3, 2026

শেয়ার করুন

বিডিএস নিউজ ডেস্ক | ৩০ এপ্রিল ২০২৬

ঢাকা: একটি জাতিরাষ্ট্রের উন্নয়ন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাসের এক ধারাবাহিক পরিক্রমা। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যখন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে সমৃদ্ধির পরবর্তী ধাপে পা রাখছে, তখন ইতিহাসের ধূলো ঝেড়ে আলোচনা উঠছে—আজকের এই আধুনিক অবকাঠামোর গোড়াপত্তন ও বিকাশের নেপথ্য কারিগর কারা? ১৯৪৭-এর দেশভাগ থেকে ১৯৭১-এর মুক্তি সংগ্রাম এবং বর্তমানের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’—প্রতিটি অধ্যায়ই একে অপরের পরিপূরক।

১. প্রাতিষ্ঠানিক গোড়াপত্তন: পাকিস্তান আমলের উত্তরাধিকার (১৯৪৭–১৯৭১)

ব্রিটিশদের ২০০ বছরের শাসনামলে পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ) শিক্ষা ও অবকাঠামোতে চরম অবহেলার শিকার ছিল। ১৯২১ সালে অনেক বাধা পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরে এ অঞ্চলে উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি কাঠামোর ব্যাপক বিস্তার ঘটে।

  • শিক্ষা ও প্রযুক্তি: বর্তমানের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠগুলোর বড় অংশই পাকিস্তান আমলের অবদান। ৪টি প্রধান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট, রুয়েট, চুয়েট ও কুয়েট) এবং গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ও মেডিকেল কলেজগুলো ১৯৪৯ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ইস্ট পাকিস্তান টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট’ (বর্তমান বুটেক্স) ছিল এ অঞ্চলের বস্ত্র শিল্পের প্রথম সোপান।
  • নগরায়ন ও স্থাপত্য: কমলাপুর রেলস্টেশন, শেরেবাংলা নগরের সেকেন্ড ক্যাপিটাল পরিকল্পনা, এমনকি যমুনা সেতুর প্রাথমিক প্রশাসনিক অনুমোদন (১৯৬৬) পাকিস্তান আমলেই সম্পন্ন হয়েছিল। ঢাকা জাদুঘর থেকে শুরু করে ধানমন্ডি-বনানীর মতো আবাসিক এলাকার পত্তনও ওই সময়েই ঘটে।
  • শিল্পায়ন: আদমজী জুট মিল, কর্ণফুলী পেপার মিল এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির মতো ভারী শিল্পগুলো এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড তৈরি করেছিল।

২. স্বনির্ভরতার যুদ্ধ: ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে ‘উদীয়মান বাঘ’

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ এক প্রায় অসম্ভব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। তৎকালীন অনেক অর্থনীতিবিদ হতাশাবাদ ব্যক্ত করলেও, গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ নিজেকে বিশ্বমঞ্চে এক ‘উন্নয়ন বিস্ময়’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

  • খাদ্য ও কৃষি: পাকিস্তান আমলে যে অঞ্চল খাদ্য ঘাটতিতে ছিল, আজ ১৮ কোটি মানুষের দেশে বাংলাদেশ ধান, মাছ ও সবজি উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি।
  • অবকাঠামোগত বিপ্লব: নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। এছাড়া মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশটিকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পথে নিয়ে যাচ্ছে।
  • পোশাক শিল্প ও সামাজিক সূচক: বিশ্ব বাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক হিসেবে বাংলাদেশ আজ অজেয়। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সূচকে অনেক ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোকেও বাংলাদেশ পেছনে ফেলেছে।

৩. ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ভিন্ন পথ

বর্তমান ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ দুটি ভিন্ন ধারায় উন্নয়ন করেছে। পাকিস্তান সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে শক্তিশালী হয়েছে। তাদের রয়েছে অত্যাধুনিক পারমাণবিক অস্ত্রাগার (শাহীন-৩, গৌরী মিসাইল) এবং চীনের সহযোগিতায় তৈরি শক্তিশালী বিমান বাহিনী। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সামরিক শক্তির চেয়ে অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

৪. ব্রিটিশ বনাম উত্তর-স্বাধীনতা যুগ: একটি পরিসংখ্যানগত পাঠ

ব্রিটিশদের ২০০ বছরে যেখানে মাত্র ১টি বিশ্ববিদ্যালয় ও ১টি মেডিকেল কলেজ ছিল, সেখানে বর্তমানে বাংলাদেশে ১৬০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শতাধিক মেডিকেল কলেজ রয়েছে। পাকিস্তান আমলে স্বাক্ষরিত হওয়া ১৭টি পলিটেকনিকের বিপরীতে আজ ৪৯টি সরকারি পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠান কারিগরি শিক্ষা দিচ্ছে।


বিশ্লেষকের পর্যবেক্ষণ

উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। ১৯৪৭-এর পর যে অবকাঠামোগত বীজ বপন করা হয়েছিল, ১৯৭১-এর স্বাধীনতার পর তাকে আধুনিক প্রযুক্তি ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে আজকের মহীরুহে পরিণত করেছে এ দেশের মানুষ। পাকিস্তান আমলের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি হয় ‘ভিত্তি’, তবে স্বাধীন বাংলাদেশের অর্জন হলো সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আকাশ ছোঁয়ার এক ‘সাফল্য গাঁথা’।


তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স (Reference List):

  1. ঐতিহাসিক দলিল: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং ঐতিহাসিক শিক্ষা গেজেট।
  2. বই: ‘বাংলাদেশ: উন্নয়নের বিস্ময়’ – আতিউর রহমান।
  3. বই: ‘The Economy of Pakistan’ – বিভিন্ন গবেষক (ঐতিহাসিক তথ্য)।
  4. নিবন্ধ: ‘Social Development in Bangladesh’ – অমর্ত্য সেন (২০১৩/২০১৫ বক্তৃতা)।
  5. আন্তর্জাতিক তথ্য: বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ কান্ট্রি প্রোফাইল ২০২৬।
  6. টকশো: এনটিভি ও সময় টিভির ‘রাজনীতি ও উন্নয়ন’ বিশেষ আলাপচারিতা।

নিউজ ডেস্ক: বিডিএস ডিজিটাল মিডিয়া

সার্বিক তত্ত্বাবধানে: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com

জাকের পার্টি

নিউজ ডেস্ক

May 2, 2026

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক | ৩০ এপ্রিল ২০২৬

ফরিদপুর: বিশ্ব ওলী খাজা বাবা ফরিদপুরী (র.) যখন জাকের সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তখন তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল একটি আদর্শিক সমাজ ও মানুষের আত্মিক মুক্তি। পরবর্তীতে জাকের পার্টির মাধ্যমে তিনি দরবারের সকল কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেন। লক্ষ্য ছিল আর্তমানবতার সেবা এবং প্রতিটি অনুসারীকে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করা। কিন্তু আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই দরবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। খাজা বাবার প্রতিষ্ঠিত সেই আদর্শ আজ অর্থের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ তুলছেন খোদ নিবেদিতপ্রাণ জাকের ও প্রবীণ খাদেমরা।

১. খেদমতের আড়ালে ‘আর্থিক চেইন’

বর্তমানে জাকের পার্টি এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলোর প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থ সংগ্রহ। ‘গুগল অ্যানালিটিক্স’ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বর্তমান ট্রেন্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দরবারের অনুসারীদের মধ্যে আধ্যাত্মিক আলোচনার চেয়ে ‘কিস্তি’ বা ‘মাসিক খেদমত’ নিয়ে আলোচনা ও অসন্তোষ সবচেয়ে বেশি। অভিযোগ উঠেছে, একটি শক্তিশালী চেইন সিস্টেমের মাধ্যমে সাধারণ জাকেরদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হচ্ছে, যেখানে টাকা থাকলে পদ পাওয়া সহজ, কিন্তু ভক্তির কোনো মূল্যায়ন নেই।

২. ভিআইপি সংস্কৃতি ও সাধারণের বঞ্চনা

দরবারে এখন স্পষ্ট বিভাজন বিদ্যমান। ধনী ও প্রভাবশালী জাকেরদের জন্য প্রোটোকলবিহীন অবাধ যাতায়াত এবং বিশেষ আতিথেয়তার ব্যবস্থা থাকলেও, সাধারণ জাকেরদের জন্য দরজার খিল যেন আগের চেয়েও শক্ত। এই বৈষম্য খাজা বাবার সেই সাম্যবাদের আদর্শকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

৩. প্রবীণ খাদেমদের অবহেলা ও করুণ মৃত্যু

একটি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি গড়ে তোলেন যাঁরা, সেই প্রবীণ খাদেমদের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। চাউল ভান্ডার, গোশালা, পাথর ভাঙা গ্রুপ বা পাওয়ার হাউজে যাঁরা যৌবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের শেষ জীবনে জোটেনি ন্যূনতম সম্মান বা চিকিৎসা।

  • ইসমাইল ভাই (ড্রাইভার): হুজুর পাকের এই বিশ্বস্ত সহচর অসুস্থ অবস্থায় কোনো সহায়তা পাননি। তাঁর চিকিৎসার জন্য সাহায্য চাওয়া হলে বর্তমান নেতৃত্বের পক্ষ থেকে আসা নিষ্ঠুর উক্তি—“আমি কি টাকার গাছ লাগিয়েছি?”—আজও দরবারের বাতাসে বিষাদ ছড়ায়।
  • নিভৃতে প্রস্থান: ইব্রাহিম মিস্ত্রি, ওয়াহেদ ফকির, আক্তার, সেলিম ভাই বা মমিন ভাইদের মতো অসংখ্য মানুষ জীবনের শেষ সময়ে চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মারা গেছেন। তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে গড়া অট্টালিকায় তাঁদেরই কোনো স্থান হয়নি।

৪. অমানবিক বৈষম্য: মানুষ বনাম পোষা প্রাণী

সবচেয়ে বড় নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র ফুটে ওঠে যখন দেখা যায় একজন প্রবীণ খাদেমের চিকিৎসার টাকা না থাকলেও পোষা কুকুরের পেছনে সপ্তাহে হাজার হাজার টাকার শ্যাম্পু আর বিলাসবহুল খাবার খরচ করা হয়। কুকুরের মৃত্যুতে শরীয়তসম্মত জানাজা ও দাফনের মতো বিতর্কিত কাজ করা হলেও, আজীবন সেবা করা খাদেমদের পরিবার আজ অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। এমনকি নিকটাত্মীয় যেমন মাসুম মামার সন্তানদেরও আজ বাস্তুচ্যুত করার পাঁয়তারা চলছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।

৫. নেতৃত্বের সংকট ও ভবিষ্যৎ

বর্তমানে ৫৪টি বিভাগ থাকলেও তথাকথিত স্থলাভিষিক্ত নেতৃত্ব অধিকাংশ খাদেমকেই চেনেন না। তাঁর যোগাযোগ কেবল তাঁদের সাথেই যাঁদের হাতে অর্থের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। উরস শরীফের আগে একদিনের লোকদেখানো বৈঠক ছাড়া সারা বছর প্রবীণদের কোনো খোঁজ নেওয়া হয় না। এর ফলে প্রবীণ খাদেমদের পরবর্তী প্রজন্ম আজ দরবার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।


উপসংহার:

বিগত দিনের বিভিন্ন টক-শো এবং ধর্মীয় আলোচনায় ‘আধ্যাত্মিক ব্যবসায়িকীকরণ’ নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি যেন তারই প্রতিফলন। খেদমত কোনো ব্যবসা হতে পারে না। যেখানে মানবতার চেয়ে অর্থের মূল্য বেশি, সেখানে সেই ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি ধসে পড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। আজ মানুষ নীরব থাকলেও অন্ধ নয়; প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের হিসাব একদিন প্রকৃতি ঠিকই বুঝে নেবে।


তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স: ১. বাংলাদেশ প্রতিদিন – বিশেষ কলাম: ‘দরবার ও বর্তমান রাজনীতি’। ২. ‘সত্যের সন্ধানে’ (বেসরকারি টেলিভিশন টক-শো) – আধ্যাত্মিকতা বনাম অর্থ কেন্দ্রিকতা বিষয়ক আলোচনা। ৩. দরবার শরীফের প্রবীণ খাদেম ও ভুক্তভোগী পরিবারসমূহের প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎকার। ৪. সোশ্যাল মিডিয়া সেন্টিমেন্টাল অ্যানালাইসিস (২০২৬) – জাকের পার্টির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা।

তদন্ত ও বিশ্লেষণে: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com

২০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ