আন্তর্জাতিক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
আন্তর্জাতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
২০২৬ সালের মে মাসে ভারতে আম আদমি পার্টির সাবেক সোশাল মিডিয়া স্ট্র্যাটেজিস্ট অভিজিৎ দীপকের হাত ধরে শুরু হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (Cockroach Janata Party – CJP) বা ‘ককরোচ আন্দোলন’ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতির প্রতিবাদে মিম কালচার ও ব্যঙ্গাত্মক প্রতীক নিয়ে শুরু হওয়া এই ছাত্র-যুব আন্দোলন অবশেষে কেন্দ্র সরকারকে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করেছে।
টানা ৩৬ দিনের তীব্র আন্দোলন এবং ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচির মুখে ২০২৬ সালের ২৫ জুলাই পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ভারতের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। ভারতের মতো ফেডারেল কাঠামোর দেশে এই ‘জেন-জি’ (Gen-Z) বিপ্লব কেবল দেশীয় রাজনীতিতেই নয়, বরং বাংলাদেশ ও ভারতের মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কেও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
১. মিম থেকে রাজপথ: ‘ককরোচ আন্দোলন’-এর উত্থান ও বিজয়

ককরোচ আন্দোলন’ (Cockroach Movement) বা ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) উত্থান ও বিজয় মূলত ভারতের ইতিহাসে জেন-জি (Gen-Z) বা তরুণ প্রজন্মের সফল মনস্তাত্ত্বিক ও রাজপথের প্রতিরোধের এক অনন্য দলিল। ২০২৬ সালের মে মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হওয়া একটি ব্যঙ্গাত্মক মিম পেজ থেকে কীভাবে এটি মাত্র দুই মাসের মধ্যে মোদি সরকারের শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করল, তার একটি কাঠামোগত বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
১. আন্দোলনের উত্থানের প্রেক্ষাপট
- প্রশ্নপত্র ফাঁসের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ: ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (NEET) সহ একাধিক বড় সরকারি চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং দুর্নীতির কারণে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
- আদালতের একটি মন্তব্য ও প্রতীকায়ন: সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ২০২৬ সালের ১৬ মে সাবেক আপ (AAP) কৌশলবিদ অভিজিৎ দীপক “ককরোচ জনতা পার্টি” (CJP) গঠন করেন।
- তেলাপোকার মনস্তত্ত্ব: তারা প্রচার করে যে, পারমাণবিক বিস্ফোরণেও তেলাপোকা যেমন মরে না, তেমনি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার শত নিপীড়নেও দেশের সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা টিকে থাকবে।
২. সোশ্যাল মিডিয়া থেকে রাজপথে রূপান্তর
- মিম ও ডিজিটাল প্রচারণা: প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে গিয়ে এই তরুণরা ইনস্টাগ্রাম, এক্স (টুইটার) এবং টিকটককে হাতিয়ার বানায়। ব্যঙ্গাত্মক মিম ও রিলসের মাধ্যমে তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করে, যা দ্রুত ভাইরাল হয়।
- জন্তর-মন্তরে জমায়েত: জুনের শেষ এবং জুলাইয়ের শুরুতে আন্দোলন অনলাইন থেকে দিল্লির জন্তর-মন্তরের রাজপথে নেমে আসে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী তেলাপোকার মুখোশ ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে অভিনব প্রতিবাদ শুরু করে।
৩. তীব্র সংঘাত ও সরকারের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ
- চলো সংসদ ও পুলিশি অ্যাকশন: ২০২৬ সালের ২০ জুলাই আন্দোলনকারীদের ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লির রাস্তা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ করলে আন্দোলন আরও বেগবান হয়।
- জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমর্থন: প্রকাশ রাজ ও সোনাক্ষী সিনহার মতো বলিউড তারকা থেকে শুরু করে অঞ্জন দত্তের মতো বিশিষ্টজনরা রাজপথে নামা এই তরুণদের সমর্থন জানান। এমনকি খোদ বিজেপি নেতাদের সন্তানরাও এই আন্দোলনের পক্ষে সামাজিক মাধ্যমে সোচ্চার হন, যা সরকারের ওপর তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে।
৪. আন্দোলনের চূড়ান্ত বিজয় ও ফলাফল
- শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ: টানা ৩৬ দিনের তীব্র ও আপসহীন আন্দোলনের মুখে নতি স্বীকার করে ২০২৬ সালের ২৫ জুলাই ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
- আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার: মোদি সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর নন-বেইলেবল (জামিন অযোগ্য) আইন প্রণয়ন এবং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয়। এই দাবি পূরণের পর ককরোচ জনতা পার্টি সাময়িকভাবে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়।
এই আন্দোলন প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে প্রথাগত অস্ত্র বা বড় রাজনৈতিক ব্যানার ছাড়াই কেবল ডিজিটাল ন্যারেটিভ এবং তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক একতার মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী স্বৈরতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী কাঠামোকেও কাঁপিয়ে দেওয়া সম্ভব।
ককরোচ আন্দোলন’-এর চূড়ান্ত বিজয় ২০২৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ার ছাত্র রাজনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্যে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। এই আন্দোলন প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর ছক ভেঙে দিয়েছে।
১. ভারতে ছাত্র রাজনীতির ধারায় পরিবর্তন
- অরাজনৈতিক মোর্চার প্রাধান্য: কংগ্রেসের NSUI বা বিজেপির ABVP-র মতো প্রথাগত ছাত্র সংগঠনগুলোর বাইরে গিয়ে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র মতো সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও অরাজনৈতিক মোর্চার গ্রহণযোগ্যতা তরুণদের কাছে ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।
- মিম ও ডিজিটাল অস্ত্রায়ন: রাজপথের প্রতিবাদের পাশাপাশি ইনস্টাগ্রাম রিলস, এক্স (টুইটার) ট্রেন্ড এবং এআই-জেনারেটেড মিম এখন ভারতের ছাত্র রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। ফলে প্রথাগত রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে ডিজিটাল ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
- দলের আনুগত্যের চেয়ে ইস্যুভিত্তিক ঐক্য: তরুণরা এখন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের (ডানপন্থী বা বামপন্থী) অন্ধ অনুসারী না হয়ে সরাসরি কর্মসংস্থান, শিক্ষা সংস্কার এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো নির্দিষ্ট অধিকারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে।
২. দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক রাজনীতিতে প্রভাব
- সীমান্তহীন যুব সংহতি (Cross-Border Youth Solidarity): ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৬ সালে ভারতের ককরোচ আন্দোলনের মধ্যে তরুণরা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার এক দেশের তরুণদের সফল প্রতিরোধ অন্য দেশের জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্মকে স্বৈরতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে তীব্রভাবে অনুপ্রাণিত করছে।
- হাইব্রিড যুদ্ধের নতুন ক্ষেত্র: এই অঞ্চলজুড়ে রাষ্ট্রগুলো এখন বুঝতে পারছে যে কেবল সামরিক শক্তি বা গোয়েন্দা নজরদারি দিয়ে তরুণদের দমন করা অসম্ভব। ডিজিটাল স্পেসে গড়ে ওঠা এই মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ মোকাবিলায় সার্ক (SAARC) অঞ্চলের সরকারগুলো এখন সোশ্যাল মিডিয়া সেন্সরশিপ ও সাইবার নিয়ন্ত্রণ আইন আরও কঠোর করার চেষ্টা করছে।
- ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর রাজনৈতিক সংকট: পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং নেপালের তরুণদের মধ্যেও এই ধরণের স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক আন্দোলনের প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে এই অঞ্চলের পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলো তাদের চিরচেনা ভোটব্যাংক হারাচ্ছে এবং তরুণদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে।
২. বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক কাঠামোর মৌলিক পার্থক্য

বিশ্লেষকদের একাংশ এই আন্দোলনকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সাথে তুলনা করলেও, দুই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোর ভিন্নতার কারণে এর প্রভাব ভিন্ন রূপ নেয়।
| দিকসমূহ | বাংলাদেশ (এককেন্দ্রিক শাসন) | ভারত (যুক্তরাষ্ট্রীয়/ফেডারেল ব্যবস্থা) |
| রাজনৈতিক কাঠামো | এককেন্দ্রিক সংসদীয় গণতন্ত্র; সিদ্ধান্ত মূল কেন্দ্র বা রাজধানী কেন্দ্রিক। | কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন করা। বৈচিত্র্যময় ও বহুভাষিক সমাজ। |
| সামরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান | রাজনৈতিক সংকটে সামরিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস রয়েছে। | সশস্ত্র বাহিনী, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং সংবিধান অনুগত। |
| আন্দোলনের বিস্তার | ক্ষোভ দ্রুত পুরো দেশে একইভাবে ছড়িয়ে পড়ে (Homogeneous culture)। | একটি ইস্যুতে পুরো ২৮টি রাজ্যকে একই সময়ে সম্পূর্ণ অচল করা জটিল। |
৩. গোয়েন্দা ব্যর্থতা, ‘ডিপ স্টেট’ ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Grey Zone Warfare)
গোয়েন্দা ব্যর্থতা, ‘ডিপ স্টেট’ (Deep State) এবং গ্রে জোন ওয়ারফেয়ার (Grey Zone Warfare) বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ মূলত আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে ভেতর থেকে ধসিয়ে দেওয়ার আন্তঃসম্পর্কিত তিনটি হাতিয়ার। প্রথাগত সামরিক যুদ্ধ ব্যতিরেকে তথ্য, বিভ্রান্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে ব্যবহার করে কীভাবে একটি দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়, বাংলাদেশ ও ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রেক্ষাপটে তার বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
১. গোয়েন্দা ব্যর্থতা (Intelligence Failure)
- মনস্তাত্ত্বিক অন্ধত্ব: গোয়েন্দা ব্যর্থতা কেবল শত্রুর আক্রমণের তথ্য না পাওয়া নয়; বরং প্রতিবেশীর ঘরের ভেতরের সামাজিক অসন্তোষ, তরুণদের ক্ষোভ এবং মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনগুলো পড়তে না পারা।
- আস্থার সংকট ও ভুল পলিসি: ঢাকা ও দিল্লি—উভয় পক্ষই গত কয়েক বছরে একে অপরের তৃণমূলের পালস বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। ঢাকা যেমন ভারতের কূটনৈতিক ব্যাকআপের ওপর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ছিল, তেমনি দিল্লির গোয়েন্দা সংস্থাও (RAW) বাংলাদেশে জনক্ষোভের চরম বহিঃপ্রকাশ এবং ২০২৪ ও ২০২৬ সালের ছাত্র আন্দোলনের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা আগে থেকে আঁচ করতে পারেনি।
২. ‘ডিপ স্টেট’ (Deep State) এর ভূমিকা
- অদৃশ্য ক্ষমতার সমান্তরাল কাঠামো: ‘ডিপ স্টেট’ বলতে নির্বাচিত সরকারের বাইরে আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক বাহিনীর একাংশ এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত এমন এক অদৃশ্য শক্তিকে বোঝায়, যারা পর্দার আড়াল থেকে দেশের মূল নীতি নির্ধারণ করে।
- সার্বভৌমত্বের সমীকরণ: বাংলাদেশ ও ভারতের ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনে এই ‘ডিপ স্টেট’ বা ছায়া সরকারগুলো প্রায়ই দৃশ্যমান রাজনীতির চেয়ে ভিন্ন সমীকরণ তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, দিল্লিতে সরকার পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশের প্রতি ভারতের ‘নিরাপত্তা আমলাতন্ত্রের’ (Security Bureaucracy) মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি বা ‘ডিপ স্টেট’-এর নীতি অপরিবর্তিত থাকে।
৩. গ্রে জোন ওয়ারফেয়ার ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Grey Zone Warfare)
- যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যবর্তী ধূসর এলাকা: গ্রে জোন ওয়ারফেয়ার হলো এমন এক যুদ্ধকৌশল যেখানে সরাসরি সামরিক বলপ্রয়োগ না করে প্রোপাগান্ডা, সাইবার আক্রমণ, অর্থনৈতিক চাপ এবং ফেক নিউজ বা ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে একটি সমাজ বা রাষ্ট্র কাঠামোকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া হয়।
- তথ্য স্পেসে আধিপত্য (Information Warfare): বাংলাদেশ ও ভারতের ডিজিটাল স্পেসে এটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুপরিকল্পিত বয়ান বা ন্যারেটিভ তৈরি করে একদিকে যেমন বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাব বা বয়কট প্রবণতা উসকে দেওয়া হয়, অন্যদিকে ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ভীতি বা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়।
- হাইব্রিড থ্রেট: প্রথাগত বর্ডার গার্ডিং বা সীমান্ত পাহারার চেয়ে এই ডিজিটাল ও মনস্তাত্ত্বিক অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ করা ঢাকার কৌশলগত কাঠামোর জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ ঢাকা প্রযুক্তিগতভাবে এই মনস্তাত্ত্বিক প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।
এই ত্রিমুখী কৌশলের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় এখন আর যুদ্ধ কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা প্রতিটি নাগরিকের স্মার্টফোনের স্ক্রিনে এবং মনস্তাত্ত্বিক বয়ানের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।
৪. দক্ষিণ এশিয়ার আগামী ভূ-রাজনীতি

দক্ষিণ এশিয়ার আগামী ভূ-রাজনীতি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের ত্রিমুখী কৌশলগত প্রতিযোগিতা, জেন-জি (Gen-Z) চালিত স্বতস্ফূর্ত নাগরিক আন্দোলন এবং ডিজিটাল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের (Grey Zone Warfare) এক জটিল রণক্ষেত্রে পরিণত হতে যাচ্ছে। প্রথাগত আঞ্চলিক আধিপত্যের দিন শেষ হয়ে এখন এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
আগামী দিনগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি যে ৫টি মূল স্তম্ভের ওপর আবর্তিত হবে, তার একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো:
১. বেইজিং-ওয়াশিংটন-দিল্লি ত্রিমুখী ক্ষমতার লড়াই
- বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব: ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের (IPS) অংশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরে তার সামুদ্রিক উপস্থিতি জোরদার করতে বদ্ধপরিকর। অন্যদিকে চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) এবং গভীর সমুদ্রবন্দরের অ্যাক্সেস ধরে রাখতে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ আরও বাড়াবে।
- ভারতের কৌশলগত পুনর্বিন্যাস: ককরোচ আন্দোলনের মতো অভ্যন্তরীণ ধাক্কা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, ভারত এখন তার প্রথাগত ‘একক আধিপত্যের’ নীতি থেকে সরে এসে বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক ভারসাম্যের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে।
২. জেন-জি (Gen-Z) ও অরাজনৈতিক শক্তির উত্থান
- সীমান্তহীন যুব বিপ্লব: বাংলাদেশ ও ভারতের সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলো প্রমাণ করেছে যে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ সমাজ প্রথাগত রাজনৈতিক দল বা ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের (যেমন ভারতপন্থী বনাম চীনপন্থী) ধার ধারে না। আগামী দিনে এই অঞ্চলের পররাষ্ট্রনীতি সাধারণ জনগণের মনস্তত্ত্ব এবং তরুণদের অধিকার-ভিত্তিক আন্দোলনের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হবে।
- ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর পতন: পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল এবং বাংলাদেশে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর জনভিত্তি দুর্বল হতে থাকবে এবং ইস্যুভিত্তিক বা নাগরিক প্ল্যাটফর্মগুলো ক্ষমতার মূল অংশীদার হয়ে উঠবে।
৩. গ্রে জোন ওয়ারফেয়ার ও ডেটা সার্বভৌমত্ব
- তথ্যযুদ্ধের তীব্রতা: সাইবার আক্রমণ, এআই-জেনারেটেড প্রোপাগান্ডা এবং সোশ্যাল মিডিয়া ন্যারেটিভের মাধ্যমে একে অপরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার প্রবণতা বহুগুণ বাড়বে।
- ডিজিটাল বর্ডার: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এখন ভৌগোলিক সীমান্তের চেয়ে ‘ডিজিটাল সীমান্ত’ বা ডেটা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বেশি মনোযোগ দেবে। তথ্য নিয়ন্ত্রণ এবং সাইবার নজরদারি আইন নিয়ে রাষ্ট্র ও নাগরিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হবে।
৪. জলবায়ু ভূ-রাজনীতি ও সম্পদ বণ্টন
- অভিন্ন নদী ও পরিবেশ সংকট: হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়া এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশ ও ভারতসহ এই অঞ্চলের দেশগুলো তীব্র পরিবেশগত ঝুঁকিতে পড়বে। অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানি বণ্টন এবং জলবায়ু তহবিল নিয়ে নতুন কূটনৈতিক দরকষাকষি শুরু হবে।
- জ্বালানি করিডোর: নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ ভারত হয়ে বাংলাদেশে সরবরাহের মতো আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা আগামী দিনের ভূ-রাজনৈতিক বন্ধুত্বের নতুন মাপকাঠি হবে।
৫. জোট নিরপেক্ষতা ও ‘মিনিল্যাটারালিজম’ (Minilateralism)
- সার্ক (SAARC) এর স্থবিরতা: আঞ্চলিক জোট হিসেবে সার্কের পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। এর পরিবর্তে দেশগুলো ছোট ছোট বা ইস্যুভিত্তিক উপ-আঞ্চলিক জোটের (যেমন BIMSTEC বা নির্দিষ্ট ত্রিপক্ষীয় চুক্তি) দিকে ঝুঁকবে।
- কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন: বাংলাদেশ বা মালদ্বীপের মতো মাঝারি ও ছোট দেশগুলো কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির পক্ষে সরাসরি অবস্থান না নিয়ে, সবার সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার “কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন” (Strategic Autonomy) নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করবে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিনিধি ও তথ্যের বিবরণ:নিজস্ব প্রতিবেদক, অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময় ও তারিখ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৭ অপরাহ্ন
স্থান: ঢাকা
ঢাকা: ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক চালচিত্র ছিল অত্যন্ত জটিল ও তরঙ্গাকুল। শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল (১৯৭২–১৯৭৫) থেকে শুরু করে ১৫ আগস্টের রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডি, ৩ ও ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব, জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা সুসংহতকরণ এবং পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার এরশাদের পতন—প্রতিটি অধ্যায়ই বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর দাগ কেটেছে।
রাজনৈতিক গবেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়া এবং পরবর্তীতে রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ দেশের গণতান্ত্রিক চর্চাকে বহু বছর পিছিয়ে দিয়েছিল।
১. শেখ মুজিব আমলে জিয়াউর রহমানের কৌশলগত নীরবতার কারণ

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট এবং স্বাধীন বাংলাদেশে সেনা কর্মকর্তাদের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তৎকালীন সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান (Deputy Chief of Army Staff) হিসেবে জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের জীবদ্দশায় কোনো সরাসরি বিদ্রোহে জড়াননি। এর নেপথ্যে মূল কারণগুলো ছিল:
- নেতৃত্বের বৈধতা ও আনুগত্য: শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন জাতির অবিসংবাদিত নেতা ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় রাষ্ট্রপ্রধান। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হলেও একটি স্বাধীন দেশের গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হতো সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতা।
- জাতীয় রক্ষীবাহিনীর চাপ: শেখ মুজিব সরকার গঠিত বিশেষ আধাসামরিক বাহিনী ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’ সমান্তরাল শক্তি হিসেবে সেনাবাহিনীর ওপর সার্বিক নজরদারি বজায় রাখত, যা যেকোনো ক্যু চক্রান্তের জন্য বড় বাধা ছিল।
- পেশাদারিত্ব ও চেইন অব কমান্ড: সেনাপ্রধান কে এম সফিউল্লাহসহ শীর্ষ পদস্থ কর্মকর্তারা সরকারের অনুগত থাকায় জিয়াউর রহমান সেনাসদরের পেশাদার শৃঙ্খলা রক্ষা এবং বাহিনীর ভেতরে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন।
২. ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ও ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মেজর শরীফুল হক ডালিম, মেজর খন্দকার আব্দুর রশীদ ও মেজর সৈয়দ ফারুক রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। হত্যাকাণ্ডের পর জুনিয়র অফিসাররা সেনাসদরের আদেশ অমান্য করে খন্দকার মোশতাক আহমেদকে সাথে নিয়ে বঙ্গভবন থেকে দেশ চালাতে শুরু করেন।
[১৫ আগস্ট: বঙ্গভবনে ঘাতক মেজরেরা] ──► ৩ নভেম্বর: খালেদ মোশাররফের পাল্টা ক্যু ──► ৭ই নভেম্বর: সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও জিয়ার মুক্তি
- ৩রা নভেম্বরের পাল্টা ক্যু: চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ৩রা নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটান। জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয় এবং মোশতাক পদত্যাগ করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ঘাতক মেজরেরা ব্যাংকক পালিয়ে যাওয়ার আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করে।
- ৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থান: খালেদ মোশাররফের ক্ষমতা গ্রহণ সাধারণ সিপাহীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। এই সুযোগে জাসদের (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) সামরিক শাখা ‘গণবাহিনী’ ও কর্নেল (অব.) আবু তাহেরের নেতৃত্বে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সিপাহীরা সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত করে আনেন। সকালে শেরেবাংলা নগরে খালেদ মোশাররফ, এটিএম হায়দার ও নাজমুল হুদা নিহত হন।
৩. কর্নেল তাহেরের বিচার ও জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা সুসংহতকরণ

৭ই নভেম্বরের বিপ্লবের পর কর্নেল তাহের চেয়েছিলেন একটি “শ্রেণিহীন বিপ্লবী সেনাবাহিনী” গঠন করতে। তবে মুক্ত হওয়ার পর জিয়াউর রহমান সেনাশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে কঠোর অবস্থান নেন।
- গোপন বিচার ও ফাঁসি: সেনাবাহিনীর ভেতরের বিশৃঙ্খলা দমনে জিয়া কঠোর হন। ১৯৭৫ সালের ২৪শে নভেম্বর কর্নেল তাহেরসহ জাসদ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৭৬ সালের জুন মাসে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গোপনে বিচার চালিয়ে ২১শে জুলাই কর্নেল তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। (উল্লেখ্য, ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই বিচারকে অবৈধ ঘোষণা করে)।
- বেসামরিকীকরণ ও দল গঠন: জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৭৭ সালের গণভোটে বৈধতা অর্জনের পর তিনি রাজনীতিকে বেসামরিকীকরণের লক্ষ্যে প্রথমে ‘জাগদল’ এবং ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (BNP) গঠন করেন। ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি পূর্ণ আইনি ভিত্তি লাভ করেন।
[সামরিক শাসন ও ক্যু দমন] ──► ইনডেমনিটি ও ৫ম সংশোধনী পাস ──► জাগদল ও বিএনপি গঠন ──► ১৯৭৯ সালের বেসামরিক সরকার
৪. ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ এবং সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী

সামরিক সরকারের সিদ্ধান্তসমূহকে আইনি সুরক্ষা দিতে জিয়াউর রহমানের আমলে দুটি অত্যন্ত বিতর্কিত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়:
- ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ: ১৯৭৫ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমেদ ১৫ আগস্টের খুনিদের বিচারে আইনি বাধা দিতে এই অধ্যাদেশ জারি করেন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এই অধ্যাদেশটি বহাল রাখা হয় এবং খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেওয়া হয়।
- পঞ্চম সংশোধনী (১৯৭৯): ১৯৭৯ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী পাসের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক শাসনের অধীন নেওয়া সকল অধ্যাদেশ ও সিদ্ধান্তকে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়। একই সাথে সংবিধানে “বিসমিল্লাহির-রহমানির-রহিম” সংযোজন, “ধর্মনিরপেক্ষতা”-র পরিবর্তে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” এবং জাতীয়তা “বাংলাদেশি” নির্ধারণ করা হয়। (২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্ট ৫ম সংশোধনী বাতিল করেন)।
৫. ১৯ দফা, একের পর এক ক্যু এবং জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড
ক্ষমতা সুসংহত করার পর জিয়াউর রহমান আত্মনির্ভরশীল অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্য ১৯ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করেন এবং ‘খাল খনন’ ও ‘পল্লী বিদ্যুৎ’ কর্মসূচি চালু করেন।
তবে তার সাড়ে পাঁচ বছরের শাসনামলে সেনাবাহিনীতে প্রায় ২১-২২টি রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের চেষ্টা ঘটে। বিশেষ করে ১৯৭৭ সালের ঢাকা ও বগুড়া বিমান বাহিনীর বিদ্রোহের পর সামরিক আদালতে প্রায় সহস্রাধিক সেনাসদস্য ও অফিসারকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
[চট্টগ্রাম সফর] ──► ৩০ মে ১৯৮১: মেজর জেনারেল মঞ্জুরের ক্যু ──► সার্কিট হাউজে জিয়া নিহত ──► এরশাদের সামরিক ক্ষমতা দখল
হত্যাকাণ্ড (৩০ মে, ১৯৮১): ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অবস্থানকালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুরের নেতৃত্বে একদল সেনা কর্মকর্তা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে গুলি করে হত্যা করে। বিদ্রোহটি তিন দিনের মধ্যে ব্যর্থ হয় এবং জেনারেল মঞ্জুর রহস্যজনকভাবে নিহত হন। পরবর্তী সময়ে ১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদ রক্তপাতহীন ক্যু-এর মাধ্যমে দেশ পরিচালনা শুরু করেন।
৬. ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান ও স্বৈরাচারের পতন
লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ৯ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটেছিল ৯০-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আন্দোলনের মাধ্যমে।
- তিন জোটের রূপরেখা: আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮-দলীয় জোট, বিএনপির ৭-দলীয় জোট এবং বামপন্থীদের ৫-দলীয় জোট একত্রিত হয়ে স্বৈরাচার পতন ও নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলে।
- সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য ও আত্মত্যাগ: ডাকসু ও শীর্ষ ছাত্র সংগঠনগুলোর গঠিত ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’ আন্দোলনে নতুন গতি আনে। ১০ই অক্টোবর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি এবং ২৭শে নভেম্বর ডা. শামসুল আলম খান মিলনের শাহাদাত আন্দোলনের দাবানল জ্বালিয়ে দেয়।
- সেনাবাহিনীর অনীহা ও পতন: আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নিলে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল নূরউদ্দিন খান বেসামরিক জনগণের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানান। সম্পূর্ণ একঘরে হয়ে ৪ঠা ডিসেম্বর রাতে এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
৬ই ডিসেম্বর, ১৯৯০ আনুষ্ঠানিকভাবে এরশাদ পদত্যাগ করেন এবং প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে প্রথম নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে দীর্ঘ সামরিক ও আধা-সামরিক শাসনের ইতি ঘটে এবং ১৯৯১ সালের নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ পুনরায় গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিনিধি ও তথ্যের বিবরণ: নিজস্ব প্রতিবেদক, অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময় ও তারিখ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৭ অপরাহ্ন
স্থান: ঢাকা
ঢাকা: প্রাচীন মানব সভ্যতার প্রকৌশল ও স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম এক বিস্ময় তুরস্কের মধ্য-অ্যানাটোলিয়া অঞ্চলের ক্যাাপাডোকিয়ায় অবস্থিত ‘ডেরিংকুয়ো’ (Derinkuyu) ভূগর্ভস্থ শহর। মাটির তলদেশে প্রায় ৮৫ মিটার (২৮০ ফুট) গভীরে খোদাই করে তৈরি এই ঐতিহাসিক নগরীতে একসময় প্রায় ২০,০০০ মানুষ তাদের গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীসহ দীর্ঘকাল নিরাপদে বসবাস করতে পারত। ইতিহাসবিদদের মতে, এই শহরটি প্রায় ৩,০০০ বছরের প্রাচীন এবং এটি মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ও জটিলতম ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র।
আকস্মিক আবিষ্কারের ইতিহাস

১৯৬৩ সালে আধুনিক বিশ্ব প্রথম এই ভূগর্ভস্থ শহরের অস্তিত্ব জানতে পারে। ডেরিংকুয়ো এলাকার এক স্থানীয় বাসিন্দা তার বাড়ির বেসমেন্ট বা দেয়াল সংস্কারের কাজ করার সময় হঠাৎ মাটির নিচে একটি রহস্যময় কক্ষ ও গোপন দরজার সন্ধান পান।
সেই দেয়ালের পেছনের সুরঙ্গ ধরে অনুসন্ধান ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের খননকাজ চালাতেই বেরিয়ে আসে একের পর এক পাথরে খোদাই করা কক্ষ ও সুদীর্ঘ জনপদ। পরবর্তীতে প্রকাশ পায় যে, এটি সাধারণ কোনো গুহা নয়, বরং মাটির নিচে সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা এক বিশাল প্রাচীন নগরী।
ইতিহাস ও নির্মাণের প্রেক্ষাপট
ইতিহাসবিদদের ধারণামতে, খ্রিষ্টপূর্ব ৮ম থেকে ৭ম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইন্দো-ইউরোপীয় ‘ফ্রিজিয়ান’ (Phrygians) জনগোষ্ঠী নরম আগ্নেয়গিরির শিলা (Tuff) কেটে এই শহরের প্রাথমিক অংশ নির্মাণ শুরু করে।

পরবর্তীকালে বাইজেন্টাইন যুগে (খ্রিষ্টীয় ৫ম থেকে ১২শ শতাব্দী) রোমান ও পারস্য আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে স্থানীয় খ্রিষ্টান বাসিন্দারা শহরটিকে আরও বিস্তৃত ও আধুনিক করে তোলে। মূলত বহিরাগত শত্রু ও প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করতে আত্মরক্ষার নিরাপদ দুর্গ হিসেবে এই শহরটি ব্যবহৃত হতো।
[ফ্রিজিয়ানদের প্রাথমিক নির্মাণ] ──► বাইজেন্টাইন যুগের সম্প্রসারণ ──► আক্রমণ থেকে সুরক্ষা ও বসবাস
শহরের গঠন, স্থাপত্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

মাটির নিচে ১৮টি স্তর বিশিষ্ট এই ভূগর্ভস্থ শহরটি কেবল বসবাসের জন্য নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ নগর জীবনের সব সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ছিল:
- বায়ু চলাচলের সুদৃশ্য নালী: শহরজুড়ে প্রায় ১৫,০০০টি ভেন্টিলেশন শ্যাফট বা সুদৃশ্য বায়ুনালী ছিল, যার মাধ্যমে মাটির গভীরতম স্তরেও পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছে যেত।
- বিশাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা: বহিরাগত শত্রুদের আক্রমণ ঠেকানোর জন্য প্রবেশপথ ও সুড়ঙ্গের সংযোগস্থলে ভারী ও গোলাকার বিশাল পাথরের দরজা স্থাপন করা হয়েছিল, যা কেবল ভেতরের দিক থেকেই সহজে বন্ধ বা খোলা যেত, কিন্তু বাইরে থেকে খোলা অসম্ভব ছিল।
- দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যবস্থা: শহরের ভেতরে ছিল খাদ্য ও শস্য সংরক্ষণের বিশাল গুদাম, স্থানভিত্তিক রান্নাঘর, গোয়ালঘর বা আস্তাবল, ওয়াইন ও তেলের প্রেস, ভাণ্ডার ঘর, খাবার ঘর, ধর্মীয় প্রার্থনালয় (চার্চ) এবং শিশুদের পাঠদানের জন্য একটি বিশেষ স্কুল ঘর।
- সুপেয় পানির স্বাধীন কূপ: শত্রুরা যেন পানিতে বিষ মিশিয়ে দিতে না পারে, সেজন্য ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থা বাইরের কূপের সাথে সরাসরি যুক্ত না রেখে ভেতরের স্বাধীন ব্যবস্থা হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল।
[১৫,০০০ বায়ুনালী] ──► বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ──► পাথরের সুরক্ষা দরজা ──► স্বয়ংসম্পূর্ণ ভূগর্ভস্থ জীবন
ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বর্তমান অবস্থা
ডেরিংকুয়ো কেবল একক কোনো শহর নয়; এটি মাটির নিচে প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথের মাধ্যমে ক্যাাপাডোকিয়ার আরেকটি বিখ্যাত ভূগর্ভস্থ শহর ‘কাইমাকলি’ (Kaymakli)-র সাথে সরাসরি সংযুক্ত ছিল।
১৯৬৯ সালে শহরটি সাধারণ দর্শনার্থী ও পর্যটকদের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং বর্তমানে এর প্রায় ১০% অংশ উন্মুক্ত রয়েছে। ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘের ইউনেস্কো (UNESCO) এলাকাটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান (World Heritage Site) হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। প্রাচীনকালের প্রতিকূল পরিবেশ ও যুদ্ধবিগ্রহে টিকে থাকার অদম্য তাগিদ এবং বিস্ময়কর প্রকৌশল বিদ্যার নিদর্শন হিসেবে ডেরিংকুয়ো আজও বিশ্বজুড়ে গবেষক ও পর্যটকদের অভিভূত করে চলেছে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদনের শিরোনাম: চতুর্দশ দলাই লামা, তিব্বত-চীন সংকট ও অহিংস আন্দোলনের আধ্যাত্মিক দর্শন
- প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ভূ-রাজনীতি ও দর্শন
- প্রকাশের তারিখ: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি, বিবিসি (BBC), দ্য সেন্ট্রাল তিব্বতান অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (CTA) ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আর্কাইভ।
চতুর্দশ দলাই লামা (তেনজিন গিয়াৎসো) হলেন সমসাময়িক বিশ্বের অহিংসা, করুণা এবং আধ্যাত্মিকতার এক জীবন্ত প্রতীক। তিব্বত-চীন সংকটের মতো দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল রাজনৈতিক সংঘাতের মুখোমুখি হয়েও তিনি যেভাবে তাঁর অহিংস আন্দোলনের আধ্যাত্মিক দর্শনকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছেন, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম এক অনন্য অধ্যায়।
নিচে তাঁর এই আধ্যাত্মিক দর্শনের মূল স্তম্ভ ও আন্দোলনের স্বরূপ বিশ্লেষণ করা হলো:
১. অহিংসা (Non-violence) ও মহাত্মা গান্ধীর উত্তরাধিকার
দলাই লামার রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংগ্রামের মূল ভিত্তি হলো অহিংসা। ১৯৫৯ সালে চীন তিব্বত দখল করার পর এবং তিব্বতিদের ওপর চরম দমন-পীড়ন সত্ত্বেও তিনি কখনো অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার কথা বলেননি।
- তিনি ভারতের মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতি (Satyagraha) দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত।
- তিনি বিশ্বাস করেন, সহিংসতা সাময়িক জয় এনে দিতে পারলেও তা কখনো স্থায়ী শান্তি বা মানসিক স্বস্তি দিতে পারে না। সহিংসতা কেবল নতুন আরও একটি শত্রুতা ও সহিংসতার জন্ম দেয়।
২. সর্বজনীন দায়িত্ববোধ (Universal Responsibility)
দলাই লামার দর্শনের একটি প্রধান স্তম্ভ হলো ‘সর্বজনীন দায়িত্ববোধ’। তাঁর মতে, আধুনিক বিশ্বে আমরা প্রত্যেকে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।
- মানবতার একাত্মতা: তিনি বিশ্বকে একটি পরিবার হিসেবে দেখেন, যেখানে এক দেশের মানুষের কষ্ট অন্য দেশকে প্রভাবিত করে।
- শত্রুর প্রতি করুণা: তিব্বতি বৌদ্ধ দর্শন অনুযায়ী, তিনি চীনা শাসকদের শত্রু হিসেবে না দেখে এমন এক সত্তা হিসেবে দেখেন যারা অজ্ঞতা ও মোহের বশবর্তী হয়ে অত্যাচার করছে। তাই ক্ষোভের বদলে তিনি তাদের প্রতি করুণা বা দয়া প্রদর্শনের কথা বলেন, যা চরম আধ্যাত্মিক উচ্চতার প্রমাণ।
৩. মধ্যপন্থা নীতি (Middle-Way Approach)
রাজনৈতিকভাবে দলাই লামা যে আধ্যাত্মিক বাস্তবতাবোধের পরিচয় দিয়েছেন, তাকে বলা হয় ‘মধ্যপন্থা’ বা ‘উমে মে’ (Umaylam)।
- তিনি চীনের কাছ থেকে তিব্বতের সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক স্বাধীনতা বা বিচ্ছিন্নতা দাবি করেন না।
- এর পরিবর্তে তিনি চীনের সংবিধানের অধীনে থেকেই তিব্বতের জন্য একটি “প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন” (Genuine Autonomy) চান, যেখানে তিব্বতিরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ধর্ম, ভাষা এবং পরিবেশ রক্ষা করতে পারবে, আর পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি থাকবে চীনের হাতে। এটি মূলত বৌদ্ধ ধর্মের চরমপন্থা বর্জনের দর্শনেরই রাজনৈতিক রূপ।
৪. মন ও অন্তরের শান্তি (Inner Peace)

দলাই লামা বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেন যে, বাহ্যিক শান্তি কখনোই সম্ভব নয় যদি না মানুষের অন্তরে শান্তি থাকে। যুদ্ধ ও সংঘাতের মূল উৎস মানুষের মনের ভেতর থাকা লোভ, হিংসা এবং অহংকার। মনকে ধ্যানের মাধ্যমে শান্ত ও করুণাময় করে তোলার মাধ্যমেই কেবল একটি অহিংস সমাজ গঠন করা সম্ভব।
১৯৮৯ সালে তাঁকে যখন নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়, তখন নোবেল কমিটি তাঁর এই দর্শনকে বিশ্ব শান্তির জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। আজ নব্বই বছর পার করার পরও তিনি বিশ্বজুড়ে ঘৃণা ও সংঘাতের বিপরীতে মৈত্রী ও অহিংসার বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৮৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার ও তিনটি মূল ভিত্তি

১৯৮৯ সালে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি চতুর্দশ দলাই লামাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করে The Nobel Prize। চীনের সামরিক আগ্রাসন এবং তিব্বতি জনগণের ওপর চরম দমন-পীড়ন সত্ত্বেও তিনি যেভাবে কোনো প্রকার সহিংসতা ছাড়াই তিব্বতের মুক্তির জন্য সংগ্রাম পরিচালনা করেছেন, তার স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মান দেওয়া হয়।
নোবেল কমিটি দলাই লামার শান্তি দর্শনের প্রধান তিনটি মূল ভিত্তির ওপর ভিত্তি করে তাকে এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছিল:
- ১. অহিংস ও শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম (Non-violent Struggle): ১৯৫৯ সালে নির্বাসিত হওয়ার পর থেকে দলাই লামা তিব্বতের মুক্তির জন্য অস্ত্রের পরিবর্তে সবসময় অহিংসার পথ বেছে নিয়েছেন The Nobel Prize। নোবেল কমিটি তাকে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির একজন প্রকৃত ও সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে উল্লেখ করে, যিনি চরম উস্কানির মুখেও কখনো শান্তির পথ থেকে বিচ্যুত হননি The Nobel Prize।
- ২. পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমঝোতা (Tolerance and Mutual Respect): দলাই লামা আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক সংঘাত নিরসনের জন্য সবসময় সংলাপ, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর জোর দিয়েছেন The Nobel Prize। তিনি বিশ্বাস করেন, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার লড়াইয়ে কোনো পক্ষের প্রতি ঘৃণা বা প্রতিহিংসা না রেখে কেবল শান্তিপূর্ণ সমঝোতার মাধ্যমেই স্থায়ী সমাধান সম্ভব The Nobel Prize।
- ৩. সর্বজনীন দায়িত্ববোধ (Universal Responsibility): তাঁর দর্শনের অন্যতম বড় ভিত্তি হলো পরিবেশ এবং মহাবিশ্বের প্রতি মানুষের দায়িত্ব The Nobel Prize। নোবেল কমিটি বিশেষভাবে প্রশংসা করে যে, দলাই লামা কেবল মানুষের রাজনৈতিক অধিকারের কথা বলেননি, বরং মানবজাতির কল্যাণ এবং প্রকৃতির সুরক্ষাকে একটি সামগ্রিক ও সর্বজনীন দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন The Nobel Prize।
এই তিনটি ভিত্তিই ১৯৮৯ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারকে বিশ্বজুড়ে অহিংস আন্দোলনের একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তিব্বত-চীন সংকট ও দলাই লামার বর্তমান স্থিতি

তিব্বত-চীন সংকট এবং তিব্বতিদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা চতুর্দশ দলাই লামার বর্তমান স্থিতি ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই সংকটের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ ধারণ করেছে।
নিচে এর সমসাময়িক রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থান বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
দলাই লামার বর্তমান স্থিতি (Current Status of Dalai Lama)
চতুর্দশ দলাই লামা (তেনজিন গিয়াৎসো) বর্তমানে ৯১ বছর বয়সে পদার্পণ করেছেন Dalai Lama Official। দীর্ঘকাল ধরে ভারতের হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালায় নির্বাসিত জীবনযাপন করলেও সমসাময়িক সময়ে তাঁর অবস্থান নিম্নরূপ:
- শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসা: বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি এখন আগের মতো দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সফর করেন না এবং তাঁর কম্পাউন্ডের ভেতরে চলাচলের জন্য গলফ কার্ট ব্যবহার করেন Reuters। ২০২৬ সালের জুন মাসে ভারতের নয়াদিল্লির অ্যাপোলো হাসপাতালে তাঁর বাঁ-পায়ে একটি সফল হাঁটু প্রতিস্থাপন (Knee Replacement) অস্ত্রোপচার করা হয় এবং বর্তমানে তিনি স্থিতিশীল ও সুস্থ আছেন Dalai Lama Official।
- উত্তরসূরি নির্বাচন ও চীনের হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান: দলাই লামার বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তাঁর উত্তরসূরি বা ১৫তম দলাই লামার পুনর্জন্ম নিয়ে বিতর্ক চরম আকার ধারণ করেছে। দলাই লামা এবং নির্বাসিত তিব্বতি প্রশাসনের অবস্থান পরিষ্কার—পরবর্তী দলাই লামা কোনো স্বাধীন দেশেই (সম্ভবত ভারতের তিব্বতি উদ্বাস্তুদের মাঝে) জন্ম নেবেন এবং কেবল ভারতের ‘গাহদেন ফোড্রাং ট্রাস্ট’-এরই তাঁকে নির্বাচনের আধ্যাত্মিক অধিকার রয়েছে BBC Bengali। বেইজিং-এর কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ তাঁর অনুসারীরা মেনে নেবেন না Sky News via Facebook।
- রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ অবসর: ২০১১ সাল থেকেই তিনি সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে অবসর নিয়ে নিজেকে খাঁটি আধ্যাত্মিক নেতায় রূপান্তর করেছেন Britannica। নির্বাসিত তিব্বতি সরকারের (Central Tibetan Administration – CTA) সম্পূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্ব এখন একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বডির হাতে ন্যস্ত Britannica।
তিব্বত-চীন সংকট (Sino-Tibetan Conflict Current Status)
১৯৫০ সালে চীন কর্তৃক তিব্বত দখলের পর থেকে শুরু হওয়া এই সংকট ২০২৬ সালে এসে এক নতুন দমনমূলক ও আগ্রাসী রূপ নিয়েছে:
- নতুন ‘জাতীয় ঐক্য’ আইন (Ethnic Unity Law): ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে চীন সরকার তিব্বতে একটি নতুন বিতর্কিত আইন কার্যকর করেছে, যার নাম “Law on the Promotion of Ethnic Unity and Progress” Tibet.net। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর (যেমন: International Campaign for Tibet) মতে, এটি তিব্বতিদের জোরপূর্বক চীনা সংস্কৃতির সাথে একীভূত করার (Forced Assimilation) এবং তাদের নিজস্ব ভাষা ও ধর্মীয় সংস্কৃতি মুছে ফেলার একটি আইনি হাতিয়ার International Campaign for Tibet।
- সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আগ্রাসন: তিব্বতের স্কুলগুলোতে মাতৃভাষা তিব্বতির পরিবর্তে ম্যান্ডারিন (চীনা ভাষা) শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে Facebook। তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে মঠগুলোতে সাধারণের প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছে এবং দলাই লামার ছবি রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে Facebook।
- তথ্য ও গণমাধ্যম ব্ল্যাকআউট: অতি সম্প্রতি তিব্বত ও নেপাল সীমান্তে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় চীন তিব্বত অঞ্চলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় Tibet.net। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির আসল তথ্য প্রকাশ করায় স্থানীয় তিব্বতিদের “গুজব ছড়ানোর” অভিযোগে প্রশাসনিক শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, যা সেখানে তীব্র রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপের প্রমাণ The Guardian।
- সীমান্ত উত্তেজনা ও ভূ-রাজনীতি: ভারত-চীন সীমান্তের তিব্বত অংশে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্বাসিত তিব্বতি যুব সমাজ দিল্লির মতো আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মঞ্চে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর নীতির বিরুদ্ধে নিয়মিত অহিংস বিক্ষোভ প্রদর্শন করে আসছে Tibetan Review।
সংক্ষেপে, দলাই লামা এখনো তিব্বতের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য অহিংস লড়াইয়ের বৈশ্বিক প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে চীন সরকার তিব্বতকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও আইনিভাবে বেইজিং-এর ছাঁচে ঢেলে সাজানোর চূড়ান্ত চেষ্টা চালাচ্ছে।
ধর্মশালায় নির্বাসিত জীবন ও আধুনিক সংগ্রাম
১৯৫৯ সাল থেকে ভারতের হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালায় বসবাসরত দলাই লামা ২০১১ সালে সব রাজনৈতিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণভাবে ধর্মীয় ও নৈতিক অভিভাবকের ভূমিকা পালন করছেন। চীনের ব্যাপক সাংস্কৃতিক ছাঁচে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়ার মধ্যেও বিশ্বের বুকে তিব্বতিদের আত্মপরিচয় ও অহিংস আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠিত।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



