অর্থনীতি
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক ভাবনা
কলমে: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে এই পৃথিবীতে ব্রিটিশদের প্রতাপ কেমন ছিল, তা আমরা সবাই জানি। তাদেরও আগে বিশ্ব শাসন করেছে স্প্যানিশরা, তারও আগে অটোমানরা এবং আরও অতীতে মঙ্গোলিয়ানরা। ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই এমন অসংখ্য বিশাল সাম্রাজ্যের উত্থান আর নির্মম পতনের গল্প দেখা যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে পতন হওয়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কথাই ধরা যাক। ব্রিটিশদের অহংকার করে বলা হতো—“ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে কখনো সূর্য অস্ত যায় না।” কিন্তু আজ সেই দাপট বা প্রতাপের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।
ব্রিটিশদের উত্থান ও পতনের আসল রহস্য

ব্রিটিশরা এতো দূর আসতে পেরেছিল প্রধানত তাদের শক্তিশালী নৌ-বাহিনীর কারণে। চারদিকে সমুদ্র হওয়ায় ভৌগোলিক কারণেই তাদের বিশাল নৌ-বহর গড়ে তুলতে হয়েছিল। পরবর্তীতে স্টিল ইন্ডাস্ট্রি ও ভারী শিল্পে পিছিয়ে পড়া এবং কেবল লুণ্ঠিত সম্পদ আর কৃষিভিত্তিক পণ্যের (চা, আফিম, মসলা) ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে তারা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে শিল্প বিপ্লবের পরের ধাপে আমেরিকা যখন নিউক্লিয়ার সায়েন্স, স্টিল ইন্ডাস্ট্রি ও আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে সামনে আসে, তখন ব্রিটিশদের সরিয়ে আমেরিকা বিশ্ব সিংহাসন দখল করে নেয়।
┌─────────────────────────────────────────────────────────────────────────┐
│ সাম্রাজ্যের চালিকাশক্তির পরিবর্তন │
├──────────────────┬──────────────────────┬───────────────────────────────┤
│ যুগের নাম │ ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি │ উদাহরণ │
├──────────────────┼──────────────────────┼───────────────────────────────┤
│ প্রাচীন ও মধ্যযুগ │ বিশাল পদাতিক সৈন্য ও জমি │ মঙ্গোল, অটোমান, প্রাচীন চীন │
│ ঔপনিবেশিক যুগ │ শক্তিশালী নৌ-বহর (Navy) │ স্প্যানিশ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য │
│ শিল্প ও পারমাণবিক│ এয়ারফোর্স, পরমাণু ও স্টিল │ আমেরিকা, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন │
│ বর্তমান ও ভবিষ্যৎ │ এআই (AI), ড্রোন ও সাইবার শক্তি │ মাল্টিপোলার বৈশ্বিক জোট (Zot) │
└──────────────────┴──────────────────────┴───────────────────────────────┘
আমেরিকা, এআই (AI) এবং বদলে যাওয়া যুদ্ধের ময়দান
একসময় প্রাচীন সমরবিদরা বলতেন, “যার নৌ-প্রতাপ থাকবে, সেই হবে বিশ্ব সিংহাসনের অধিকারী।” আমেরিকাও ঠিক ব্রিটিশদের মতো বিশাল নৌ-বহর এবং শক্তিশালী এয়ারফোর্স বানিয়ে বিশ্বে নিজেদের একক মোড়ল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালে এসে আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি—পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে:
- নৌ-শক্তির দুর্বলতা: আধুনিক হাইপারসনিক মিসাইল, ড্রোন ঝাঁক (Drone Swarms) এবং উন্নত সাবমেরিন প্রযুক্তির সামনে কোটি কোটি ডলারের বিশাল যুদ্ধজাহাজগুলো এখন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এয়ারফোর্স, সাইবার ও ড্রোন প্রযুক্তিই হবে সামরিক ক্ষমতার মূল চালিকাশক্তি।
- এআই (AI) ও অর্থনীতির পরিবর্তন: আমেরিকা এতদিন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ও বাজার হিসেবে প্রভাব খাটিয়েছে। কিন্তু এআই এবং অটোমেশনের যুগে কোনো দেশের অন্য দেশের সস্তা শ্রম বা ম্যানপাওয়ারের ওপর আগের মতো নির্ভর করতে হবে না। ফলে একক কোনো দেশ আর পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক মোড়ল থাকতে পারবে না।
- একক ক্ষমতার অবসান: এখন প্রযুক্তি বা সাইবার ওয়ারফেয়ারে বিপ্লব ঘটানো একক কোনো দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই একক পরাশক্তির দিন শেষ হয়ে বিশ্ব এখন ‘মাল্টিপোলার’ বা বহুকেন্দ্রীক সিস্টেমে রূপ নিচ্ছে। ন্যাটোর মতো বিভিন্ন জোট বা আঞ্চলিক পাওয়ার-ব্লকের মাধ্যমেই ভবিষ্যতে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত হবে।
তবে কি পশ্চিমা সভ্যতার পতন ঘটতে যাচ্ছে?

ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়ম হলো—যে বদলায় না, তার পতন ঘটে। ব্রিটিশরা যেমন বাষ্পীয় ইঞ্জিন বানানোর পর ইলেকট্রনিক্স ও নিউক্লিয়ার যুগের সাথে খাপ খাওয়াতে পারেনি, ঠিক তেমনি আমেরিকা ও ইউরোপ কেন্দ্রিক পশ্চিমা সমাজও আজ নতুন এআই বিপ্লব এবং বহুকেন্দ্রীক বিশ্ব ব্যবস্থার সামনে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।
সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক হিসাব বিবেচনা করলে:
- একক মোড়ল হিসেবে পতন (আগামী ১০ থেকে ১৫ বছর): আমেরিকা তার একক বিশ্বনেতার (Unipolar World) তকমা খুব দ্রুত হারিয়ে ফেলবে। ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য কমে গিয়ে নতুন নতুন আঞ্চলিক ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি হবে।
- সভ্যতা হিসেবে সামর্থ্য হ্রাস (আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছর): অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জনসংখ্যার বয়োবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্যের কারণে ইউরোপ ও আমেরিকা বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সাধারণ একটি আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হবে।
আমার শেষ কথা: ইতিহাস প্রমাণ করে, পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এককভাবে কেউ চিরকাল সেরা থাকতে পারে না। প্রযুক্তি ও বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান গতিপথ স্পষ্ট জানান দিচ্ছে—আগামী দিনে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে বাধ্য। আর চূড়ান্ত নিয়তি ও ভবিষ্যতের সব ফয়সালা তো মহান সৃষ্টিকর্তার হাতেই ন্যস্ত!
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
আন্তর্জাতিক ভূগোল ও ভূ-রাজনীতি ডেস্ক: পৃথিবীর বৃহত্তম ও সবচেয়ে জনবহুল মহাদেশ এশিয়া। আয়তন, জনসংখ্যা, প্রাচীন সভ্যতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক আধিপত্য—সব দিক থেকেই এশিয়া বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র। সাধারণ জ্ঞান অনুরাগী, বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পরীক্ষার্থী, শিক্ষার্থী ও পর্যটকদের সুবিধার্থে এশিয়া মহাদেশের ৪৯টি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানীগুলোর প্রশাসনিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা হলো।
এশিয়া মহাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানা. Source: PeterHermesFurian / Getty Images
১. দক্ষিণ এশিয়া (South Asia)
১. বাংলাদেশ — রাজধানী: ঢাকা
বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ঢাকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। প্রায় চারশত বছর পূর্বে ১৬০৮ সালে মোগল সুবাদার ইসলাম খান প্রথম ঢাকাকে বাংলার রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। মোগল আমল থেকে আজ অব্দি এটি তৈরি পোশাক শিল্প, বাণিজ্য এবং সমৃদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
২. ভারত — রাজধানী: নতুন দিল্লি
১৯১১ সালে ব্রিটিশ আমলে কলকাতা থেকে রাজধানী স্থানান্তর করে নতুন দিল্লির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এটি ভারতের বিচারবিভাগ, শাসনবিভাগ এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু। ঐতিহাসিক প্রাচীন দিল্লি এবং আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামোর নতুন দিল্লি মিলে এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মেট্রোপলিটন এলাকা।
৩. পাকিস্তান — রাজধানী: ইসলামাবাদ
১৯৬০-এর দশকে একটি সুপরিকল্পিত শহর হিসেবে ইসলামাবাদকে পাকিস্তানের নতুন রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হয়; এর পূর্বে করাচি ও রাওয়ালপিন্ডি সাময়িক রাজধানী ছিল। মারগাল্লা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই শহরটি পাকিস্তানের সামরিক ও প্রশাসনিক হেডকোয়ার্টার।
৪. আফগানিস্তান — রাজধানী: কাবুল
হিন্দুখুশ পর্বতমালার সংকীর্ণ উপত্যকায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৮০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত কাবুল দেশটির বৃহত্তম শহর। প্রাচীন রেশম পথের ওপর অবস্থিত এই ঐতিহাসিক শহরটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সত্ত্বে়ও আফগান রাজনীতি ও বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র।
৫. নেপাল — রাজধানী: কাঠমান্ডু
হিমালয়ের কোলে অবস্থিত কাঠমান্ডু নেপালের ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক হাব। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সমৃদ্ধ এই শহরটি কাঠমান্ডু উপত্যকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এবং বিশ্বজুড়ে এভারেস্টগামী পর্বত আরোহীদের প্রধান প্রবেশদ্বার।
৬. ভুটান — রাজধানী: থিম্পু
হিমালয়ের পশ্চিমাঞ্চলের পর্বতে অবস্থিত থিম্পু বিশ্বের একমাত্র ট্রাফিক লাইট-বিহীন রাজধানী শহর। ঐতিহ্যবাহী ভুটানি স্থাপত্যশৈলী এবং তিব্বতি বৌদ্ধ সংস্কৃতির স্পর্শে লালিত এই শহরটি ভুটানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রধান কার্যালয়।
৭. শ্রীলঙ্কা — রাজধানী: শ্রী জয়বর্ধনেপুরা কোট্টে (প্রশাসনিক) / কলম্বো (বাণিজ্যিক)
কলম্বোর একটি উপশহর কোট্টে শ্রীলঙ্কার মূল প্রশাসনিক ও আইনসভা রাজধানী, যেখানে দেশটির জাতীয় সংসদ অবস্থিত। তবে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কার্যাবলীর মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে এখনও কলম্বো শহরই কাজ করে।
৮. মালদ্বীপ — রাজধানী: মালে
ভারত মহাসাগরের প্রবাল প্রাচীর বা অ্যাটলে অবস্থিত মালে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দ্বীপ শহর। মালদ্বীপের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে সাথে দেশটির আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্পের প্রবেশদ্বার হিসেবে মালে কাজ করে।
২. পূর্ব এশিয়া (East Asia)
৯. চীন — রাজধানী: বেইজিং
তিন হাজার বছরেরও বেশি পুরনো ইতিহাসের শহর বেইজিং বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র। মহাপ্রাচীর (Great Wall) ও নিষিদ্ধ নগরী (Forbidden City)-র মতো ঐতিহাসিক ঐতিহ্যে ঘেরা এই শহরটি চীনের কমিউনিস্ট সরকার ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল হাব।
১০. জাপান — রাজধানী: টোকিও
টোকিও বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে অন্যতম শীর্ষ শহর। পূর্বের ছোট মাছ ধরার গ্রাম ‘এদো’ ১৮৬৮ সালে জাপানের রাজধানী হিসেবে পুনর্নামকরণ লাভ করে টোকিও নাম ধারণ করে। এটি উচ্চপ্রযুক্তি, ফ্যাশন ও আধুনিক শিল্পের আন্তর্জাতিক হাব।
১১. উত্তর কোরিয়া — রাজধানী: পিয়ংইয়ং
কোরীয় উপদ্বীপের অন্যতম প্রাচীন শহর পিয়ংইয়ং উত্তর কোরিয়ার একক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সামাজিক অবকাঠামো ও সামরিক প্রদর্শনী কেন্দ্র। তায়েদং নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।
১২. দক্ষিণ কোরিয়া — রাজধানী: সিউল
হান নদীর তীরে অবস্থিত সিউল দক্ষিণ কোরিয়ার আধুনিক বিশ্বমানের শহর, যা সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কে-পপ সংস্কৃতি এবং তথ্যপ্রযুক্তির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতি লাভ করেছে। ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদ এবং আকাশচুম্বী অট্টালিকার অপূর্ব মিশ্রণ এই সিউল।
১৩. মঙ্গোলিয়া — রাজধানী: উলানবাটোর
তুউল নদী উপত্যকায় অবস্থিত উলানবাটোর মঙ্গোলিয়ার বৃহত্তম শহর এবং বিশ্বের সবচেয়ে শীতলতম রাজধানী। যাযাবর মোঙ্গল ঐতিহ্য ও আধুনিক নগরজীবনের এক মেলবন্ধন ঘটেছে এই ঐতিহাসিক শহরে।
১৪. তাইওয়ান — রাজধানী: তাইপে
তাইওয়ানের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত তাইপে বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বৈশ্বিক কেন্দ্র। ‘তাইপে ১০১’ স্কাইস্ক্র্যাপারের জন্য বিখ্যাত এই শহরটি পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাব।
৩. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (Southeast Asia)
১৫. ভিয়েতনাম — রাজধানী: হ্যানয়
রেড রিভারের তীরে অবস্থিত হ্যানয় হাজার বছরেরও বেশি সময়ের সমৃদ্ধ ইতিহাসের শহর। ফরাসি স্থাপত্যশৈলী, ঐতিহ্যবাহী চীনা প্রভাব এবং আধুনিক ভিয়েতনামী অর্থনীতির মেলবন্ধনে তৈরি এই শহরটি ভিয়েতনামের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রধান বিন্দু।
১৬. থাইল্যান্ড — রাজধানী: ব্যাংকক
স্থানীয়ভাবে ‘ক্রুং থেক’ নামে পরিচিত ব্যাংকক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান বাণিজ্য, অর্থনীতি ও পর্যটনকেন্দ্র। চাও ফ্রায়া নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটি বৌদ্ধ মন্দির, আধুনিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র এবং বর্ণিল নাইটলাইফের জন্য বিখ্যাত।
১৭. মিয়ানমার — রাজধানী: নেপিডো
২০০৫ সালে মিয়ানমারের সামরিক সরকার সুপরিকল্পিতভাবে ইয়াঙ্গুন থেকে প্রায় ৩২০ কিলোমিটার উত্তরে নেপিডো শহরে রাজধানী স্থানান্তর করে। সুবিশাল রাজপথ, সামরিক কমপ্লেক্স এবং প্রশাসনিক ভবনে ঘেরা এই শহরটি অত্যন্ত সুসংগঠিত।
১৮. ইন্দোনেশিয়া — রাজধানী: নুসানতারা (নতুন পরিকল্পিত) / জাকার্তা (সাবেক)
দীর্ঘদিন ধরে জাভা দ্বীপের জাকার্তা ইন্দোনেশিয়ার রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হলেও ভূ-প্রাকৃতিক ঝুঁকি এবং অতিরিক্ত ঘনবসতির কারণে দেশটির সরকার বোর্নিও দ্বীপে ‘নুসানতারা’ নামে একটি আধুনিক সুপরিকল্পিত পরিবেশবান্ধব রাজধানী গড়ে তোলার কার্যক্রম সম্পন্ন করছে।
১৯. মালয়েশিয়া — রাজধানী: কুয়ালালামপুর (প্রশাসনিক সেন্টার: পুত্রজায়া)
পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের শহর কুয়ালালামপুর মালয়েশিয়ার রাজকীয়, বাণিজ্যিক ও আর্থিক রাজধানী। তবে শহরটির ক্রমবর্ধমান যানজট কমাতে নব্বইয়ের দশকে নিকটবর্তী পুত্রজায়াতে সরকারের প্রশাসনিক ভবন ও দপ্তরগুলো স্থানান্তরিত করা হয়।
২০. সিঙ্গাপুর — রাজধানী: সিঙ্গাপুর সিটি
দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের মূল রাজধানী এর একমাত্র প্রধান শহর সিঙ্গাপুর সিটি। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর, প্রধান আর্থিক লেনদেন কেন্দ্র এবং উচ্চমানের জীবনযাত্রার সূচকের শহর হিসেবে এটি স্বীকৃত।
২১. ফিলিপাইন — রাজধানী: ম্যানিলা
ম্যানিলা উপসাগরের তীরে অবস্থিত ম্যানিলা ফিলিপাইনের রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র। ফরাসি ও স্পেনীয় উপনিবেশিক স্থাপত্য ঐতিহ্যের মিশ্রণে গড়ে ওঠা এই শহরটি অন্যতম ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক বন্দর।
২২. কম্বোডিয়া — রাজধানী: নমপেন
মেকং, বাসাক ও টনলে সাপ নদীর সংযোগস্থলে অবস্থিত নমপেন শহরটি ‘এশিয়ার মুক্তা’ নামে পরিচিত ছিল। খমের স্থাপত্যশৈলী ও ফরাসি উপনিবেশের সুবাতাস লেগে থাকা এই শহরটি কম্বোডিয়ার রাজনীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রাণকেন্দ্র।
২৩. লাওস — রাজধানী: ভিয়েনতিয়েন
মেকং নদীর তীরে থাইল্যান্ড সীমান্তের কাছে অবস্থিত ভিয়েনতিয়েন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে শান্ত পরিবেশের একটি রাজধানী। ফরাসি উপনিবেশের প্রভাব ও বৌদ্ধ ধর্মীয় মনুমেন্ট দিয়ে সাজানো এই শহরটি দেশটির প্রশাসন পরিচালনা করে।
২৪. ব্রুনাই — রাজধানী: বন্দর সেড়ি বেগাওয়ান
ব্রুনাই নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটি খনিজ তেল ও গ্যাসে সমৃদ্ধ সম্পদশালী রাষ্ট্র ব্রুনাইয়ের সুলতানের রাজকীয় কেন্দ্র। বর্ণিল মসজিদ ও জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ সংবলিত এই শহরটি শান্ত জীবনযাত্রার জন্য খ্যাত।
২৫. পূর্ব তিমুর — রাজধানী: দিলি
তিমুর সাগরের উপকূলে स्थित দিলি ২০০২ সালে স্বাধীন হওয়া নতুন রাষ্ট্র পূর্ব তিমুরের প্রধান বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। পর্তুগিজ উপনিবেশিক ঐতিহ্য ও স্থানীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সংমিশ্রণ ঘটেছে এই উপকূলীয় শহরে।
৪. পশ্চিম এশিয়া / মধ্যপ্রাচ্য (West Asia / Middle East)
২৬. সৌদি আরব — রাজধানী: রিয়াদ
আরব উপদ্বীপের মালভূমি মরুভূমিতে অবস্থিত রিয়াদ আজ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও অবকাঠামোগত শহর। সৌদি আরবের রাজনৈতিক কার্যালয়, রাজপ্রাসাদ এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান আর্থিক কর্পোরেশনের মূল কেন্দ্র এই শহর।
২৭. সংযুক্ত আরব আমিরাত — রাজধানী: আবুধাবি
পারস্য উপসাগরের একটি দ্বীপে অবস্থিত আবুধাবি আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, ব্যবসা এবং জ্বালানি তেলের ব্যবসার মূল কেন্দ্র। দুবাই পর্যটনের জন্য খ্যাত হলেও আমিরাতের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত আবুধাবি থেকেই গৃহীত হয়।
২৮. কাতার — রাজধানী: দোহা
পারস্য উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত দোহা বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল আধুনিক শহর। প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবসায় সমৃদ্ধ কাতার আন্তর্জাতিক কূটনীতি, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা (যেমন ২০২২ বিশ্বকাপ) এবং চ্যানেল আল জাজিরার হেডকোয়ার্টার হিসেবে দোহাকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২৯. কুয়েত — রাজধানী: কুয়েত সিটি
পারস্য উপসাগরের শীর্ষ শহর কুয়েত সিটি দেশটির খনিজ তেলনির্ভর অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রধান কার্যালয়। এখানকার কুয়েত টাওয়ার্স এবং বিশাল ব্যাংক অবকাঠামো দেশটির বাণিজ্যিক শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে।
৩০. বাহরাইন — রাজধানী: মানামা
পারস্য উপসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইনের মানামা মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র। ইসলামপূর্ব আমল থেকেই কৌশলগত সমুদ্রপথের অংশ হিসেবে এটি পরিচালিত হয়ে আসছে।
৩১. ওমান — রাজধানী: মাস্কাট
ওমান উপসাগর এবং পাথুরে আল হাজার পর্বতমালার মাঝে অবস্থিত মাস্কাট এক ঐতিহাসিক বন্দর নগরী। অন্যান্য আরব শহরের মতো অতিরিক্ত উঁচুদালান না বানিয়ে ঐতিহ্যবাহী আরব স্থাপত্যকলাকে ধরে রেখে শহরটিকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে।
৩২. ইয়েমেন — রাজধানী: সানা
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,২০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত সানা বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ধারাবাহিক জনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর অন্যতম। এর অনন্য স্থাপত্যশৈলীর মাল্টি-স্টোরি কাদামাটির ভবনগুলোর জন্য শহরটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে ঘোষিত।
৩৩. ইরান — রাজধানী: তেহরান
আলবোর্জ পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত তেহরান ইরানের অর্থনৈতিক, শিল্প ও রাজনৈতিক হাব। পারস্য ঐতিহ্যের শহর এটি, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি এবং শতবর্ষী সংস্কৃতির এক অনন্য সহাবস্থান দেখা যায়।
৩৪. ইরাক — রাজধানী: বাগদাদ
টাইগ্রিস নদীর তীরে অবস্থিত বাগদাদ ইসলামিক স্বর্ণযুগ (Islamic Golden Age)-এর সময় বিশ্বের সবচেয়ে প্রধান জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা পার করে শহরটি বর্তমানে তার প্রাচীন ঐতিহ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
৩৫. সিরিয়া — রাজধানী: দামেস্ক
বিশ্বের প্রাচীনতম অবিচ্ছিন্ন জনবসতিপূর্ণ শহর দামেস্ক। প্রাচ্যের প্রাচীন রেশম পথ ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ঐতিহাসিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে রয়েছে।
৩৬. লেবানন — রাজধানী: বৈরুত
ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত বৈরুত দীর্ঘদিন ‘মধ্যপ্রাচ্যের প্যারিস’ নামে খ্যাত ছিল। ফরাসি সাংস্কৃতিক প্রভাব, ব্যাংকিং খাত এবং ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের জন্য শহরটির বৈশ্বিক খ্যাতি রয়েছে।
৩৭. জর্ডান — রাজধানী: আম্মান
সাতটি পাহাড়ের ওপর মূল ভিত্তি গড়ে ওঠা আম্মান বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন শহর। এটি জর্ডানের রাজনৈতিক হাব এবং মধ্যপ্রাচ্যের একটি নিরাপদ ও গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র।
৩৮. ইসরায়েল — রাজধানী: জেরুজালেম
জেরুজালেম বিশ্বের তিনটি প্রধান একেশ্বরবাদী ধর্ম—ইসলাম, খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের পবিত্রতম স্থান। তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও এটি দেশটির প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
৩৯. তুরস্ক — রাজধানী: আঙ্কারা
১৯২৩ সালে মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক ঐতিহ্যবাহী ইস্তাম্বুল থেকে রাজধানী সরিয়ে মধ্য এনাতোলিয়ার আঙ্কারায় রূপান্তর করেন। আঙ্কারা তুরস্কের রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা ও সামরিক সিদ্ধান্তের প্রাণকেন্দ্র।
৪০. সাইপ্রাস — রাজধানী: নিকোশিয়া
নিকোশিয়া বিশ্বের একমাত্র বিভক্ত রাজধানী, যা গ্রিক সাইপ্রাস ও তুর্কি সাইপ্রাস—দুই অংশের মাঝে গ্রিন লাইন দিয়ে বিভক্ত। এটি ইউরেশিয়ান দ্বীপটির রাজনীতি ও শিক্ষার কেন্দ্র।
৪১. আর্মেনিয়া — রাজধানী: ইয়েরেভান
হাজার হাজার বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ইয়েরেভানকে ‘পিঙ্ক সিটি’ বলা হয়, কারণ এখানকার বেশিরভাগ ভবনের নির্মাণকাজে গোলাপী রঙের আগ্নেয়গিরির পাথর ব্যবহৃত হয়েছে। আরারাত পর্বতের ছায়াতলে এটি আর্মেনিয়ার প্রাণকেন্দ্র।
৪২. আজারবাইজান — রাজধানী: বাকু
কাস্পিয়ান সাগরের উপকূলে অবস্থিত বাকু ‘বাতাসের শহর’ নামে পরিচিত। তেল সমৃদ্ধ অর্থনীতি, ‘ফ্লেম টাওয়ার্স’ এবং প্রাচীন সুরক্ষিত আইচেরি শেহেরের (Inner City) জন্য এটি ককশাস অঞ্চলের প্রধান আন্তর্জাতিক কেন্দ্র।
৪৩. জর্জিয়া — রাজধানী: তিবিলিসি
কুরা (এমটকভারি) নদীর উপত্যকায় অবস্থিত তিবিলিসি ইউরোপ ও এশিয়ার মিলনস্থলে তৈরি এক প্রাচীন ঐতিহাসিক শহর। সালফার বাথ, পাথুরে দুর্গ এবং ইউরেশীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেছে এই ভূখণ্ডে।
৫. মধ্য এশিয়া (Central Asia)
৪৪. কাজাখস্তান — রাজধানী: আস্তানা
ইশিম নদীর তীরে অবস্থিত আস্তানা (যা পূর্বে নুর-সুলতান নামেও পরিচিত ছিল) আধুনিক ফিউচারিস্টিক স্থাপত্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। বিশাল প্রান্তরে অবস্থিত এই শহরটি সেন্ট্রাল এশিয়ার অর্থনৈতিক কেন্দ্র।
৪৫. উজবেকিস্তান — রাজধানী: তাসখন্দ
ভূমিকম্প ও সোভিয়েত পুনর্নির্মাণের পর তৈরি তাসখন্দ মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে জনবহুল শহর। রেশম পথের সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং সুসংগঠিত মেট্রো ব্যবস্থার জন্য এটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
৪৬. তাজিকিস্তান — রাজধানী: দুশানবে
তাজিক ভাষার ‘দুশানবে’ শব্দের অর্থ সোমবার। প্রাচীনকালে সোমবারে বসা বড় বাজারের নাম থেকে শহরটির নামকরণ হয়। পামির পর্বতমালার কোলঘেঁষে থাকা এই শহরটি দেশটির প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্র।
৪৭. কিরগিজস্তান — রাজধানী: বিশকেক
তিয়েন শান পর্বতমালার ঠিক উত্তর দিকে চুই উপত্যকায় অবস্থিত বিশকেক সোভিয়েত ধাঁচের চওড়া রাস্তা, সুবিশাল পার্ক এবং পর্বত বেষ্টিত এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের শহর।
৪৮. তুর্কমেনিস্তান — রাজধানী: আশগাবাত
কোপেত দাগ পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত আশগাবাত সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি ভবনের ঘনত্বের জন্য গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের অন্তর্ভুক্ত। প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ এই দেশের রাজধানী শহরটি অত্যাধুনিক ও সংরক্ষিত।
৬. উত্তর এশিয়া (North Asia)
৪৯. রাশিয়া — রাজধানী: মস্কো
ইউরেশীয় পরাশক্তি রাশিয়ার রাজধানী মস্কো ইউরো-এশিয়ান রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সামরিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু। ক্রেমলিন, রেড স্কয়ার এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্যের নিদর্শন সমৃদ্ধ এই শহরটি এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যবর্তী সেতু হিসেবে কাজ করে
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন
পর্যালোচনা ও সম্পাদনা: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সম্প্রতি পদত্যাগের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানের শূন্য পদটি পূরণে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করার পর বঙ্গভবনের পরবর্তী অভিভাবক হিসেবে কাকে নির্বাচন করা হবে—তা এখন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সূত্র অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে সংসদীয় সেশন চলাকালীন জাতীয় সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটাভুটির মাধ্যমে সংবিধান অনুযায়ী দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হবে। রাজনৈতিক অঙ্গন ও দলীয় সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, দলীয় বলয়ের বাইরে অরাজনৈতিক ব্যক্তিতে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে; বরং বিএনপির সর্বোচ্চ নীতীনিরূপক পর্ষদ ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটির’ জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারকদের মধ্য থেকেই চূড়ান্ত রাষ্ট্রপতি মনোনীত হতে যাচ্ছেন।
আলোচনার শীর্ষ প্রার্থীরা: ব্যাকগ্রাউন্ড ও স্ট্র্যাটেজিক এনালাইসিস
┌─────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────┐
│ রাষ্ট্রপতি পদের শীর্ষ প্রাবল্য বিশ্লেষণ │
├──────────────────────────┬─────────────────────────────┬────────────────────────────────┤
│ প্রার্থী │ পদবী/ভূমিকা │ মূল রাজনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি │
├──────────────────────────┼─────────────────────────────┼────────────────────────────────┤
│ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর │ মহাসচিব ও মন্ত্রী (LGRD) │ সর্বজনগ্রাহ্য ভাবমূর্তি, কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা │
│ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন │ প্রবীণতম জ্যেষ্ঠ সদস্য (স্থায়ী) │ সংসদীয় অভিজ্ঞতা, বিশ্বমানের স্কলারশীপ │
│ ড. আবদুল মঈন খান │ স্থায়ী কমিটির সদস্য │ আন্তর্জাতিক ডিপ্লোমেসি ও ক্লিন ইমেজ │
│ নজরুল ইসলাম খান │ প্রধান রাজনৈতিক উপদেষ্টা │ শ্রমিক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন (ILO)│
└──────────────────────────┴─────────────────────────────┴────────────────────────────────┘
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ রাজনীতিবিদ এবং বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব। বর্তমানে দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পটভূমিতে গঠিত সরকারে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার মার্জিত ভাষা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের জন্য দলমত নির্বিশেষে সমাদৃত।
১. পারিবারিক ও শিক্ষাগত ব্যাকগ্রাউন্ড
- জন্ম ও পরিবার: তিনি ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন প্রখ্যাত আইনজীবী এবং সাবেক সংসদ সদস্য। তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন বাংলাদেশের ২য় জাতীয় সংসদের স্পিকার ও সাবেক আইনমন্ত্রী।
- শিক্ষা: তিনি ঢাকার নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) এবং স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি অর্জন করেন।
২. পেশাগত জীবন ও শিক্ষকতা
রাজনীতিতে পুরোপুরি যুক্ত হওয়ার আগে তিনি মূলত শিক্ষাকতা পেশার সাথে জড়িত ছিলেন:
- অর্থনীতির প্রভাষক: ১৯৭২ সালে বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে সরকারের বিভিন্ন সরকারি কলেজে অর্থনীতি বিভাগে সুনামের সাথে অধ্যাপনা করেন।
- সরকারি কর্মকর্তা: ১৯৭৯ সালে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারির একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন।
৩. ছাত্র রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা
- ছাত্র রাজনীতি: ১৯৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালে তিনি ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (ইপিএসইউ) এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন।
- মহান মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি অন্যতম সংগঠক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
৪. রাজনৈতিক কর্মজীবন ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার রাজনৈতিক জীবনে তৃণমূল থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ও দলীয় পর্যায়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন:
- তৃণমূল জনপ্রতিনিধি: ১৯৮৮ সালে তিনি কোনো দলীয় ব্যানার ছাড়াই ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯০-এর দশকে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি হন।
- সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী (২০০১-২০০৬): ২০০১ সালের ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত তৎকালীন সরকারে তিনি প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
- বিএনপির মহাসচিব (২০১১-বর্তমান): ২০০৯ সালে বিএনপির ৫ম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত হন। ২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি দলের ‘ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব’ হন এবং ২০১৬ সালের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির ৮ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, যা তিনি এখনো পালন করছেন।
- সংগ্রাম ও কারাবরণ: গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধী দলের রাজনীতি করতে গিয়ে তাকে চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ১১২টিরও বেশি রাজনৈতিক মামলা দায়ের করা হয় এবং তিনি অন্তত ১০ বার কারাবরণ করেন।
- বর্তমান রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব (২০২৬): সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত নতুন সরকারে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমানে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের পরবর্তী ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির এই বর্ষীয়ান ও সর্বজনগ্রাহ্য নেতার নাম সবচেয়ে জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। তার জীবনী সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে উইকিপিডিয়া এবং সরকারি স্থানীয় সরকার বিভাগ-এর পোর্টাল দেখতে পারেন।
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বাংলাদেশের একজন অত্যন্ত জ্যেষ্ঠ ও প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ, প্রখ্যাত ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানী এবং শিক্ষাবিদ। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠতম সদস্য। সম্প্রতি ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার নাম অত্যন্ত জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে।
তার ব্যাকগ্রাউন্ড, কর্মজীবন এবং রাজনৈতিক জীবনের ভূমিকা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. পারিবারিক ও শিক্ষাগত ব্যাকগ্রাউন্ড
- জন্ম ও পরিবার: তিনি ১৯৪৬ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার গয়েশপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা খন্দকার আশরাফ আলী এবং মাতা হোসনে আরা হাসনা হেনা।
- উচ্চশিক্ষা: তিনি ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্ত্ব (Geology) বিষয়ে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং ১৯৭০ সালে লন্ডনের খ্যাতনামা ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে আরেকটি এমএসসি এবং ১৯৭৩ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্ত্ব বিষয়ে পিএইচডি (PhD) ডিগ্রি লাভ করেন।
২. পেশাগত জীবন ও শিক্ষাবিদ ভূমিকা
জাতীয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ও গবেষক ছিলেন:
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক: ১৯৭৫ সালে দেশে ফিরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি এই বিভাগের অধ্যাপক হন এবং ১৯৮৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বিভাগীয় চেয়ারম্যান (Chairman) হিসেবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
- গবেষক ও লেখক: ভূতত্ত্ব বিজ্ঞান এবং দেশের সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে তার বহু গবেষণামূলক প্রবন্ধ ও বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি একাধিক বইয়ের রচয়িতা।
৩. ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ড. মোশাররফ লন্ডনে উচ্চশিক্ষারত ছিলেন। সেখানে প্রবাসীদের সংগঠিত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠন, তহবিল সংগ্রহ এবং কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে তিনি অত্যন্ত অগ্রণী ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
৪. রাজনৈতিক কর্মজীবন ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
১৯৭৯ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন। এরপর থেকে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে বহু গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছেন:
- সংসদ সদস্য (৫ বার): তিনি কুমিল্লা-১ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য (MP) নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ১৩শ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
- সফল মন্ত্রী (বিভিন্ন মেয়াদে): ১৯৯১-১৯৯৬ মেয়াদে খালেদা জিয়ার সরকারে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০০১-২০০Role মেয়াদে তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
- আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের ভাবমূর্তি (WHO): স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ২০০৩ সালে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ৫৬তম ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বাংলাদেশে তামাকবিরোধী আইন প্রণয়ন ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য তাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড নো টোব্যাকো অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত করে।
- সংসদের প্রথম অধিবেশন পরিচালনা (২০২৬): ২০২৬ সালের ১২ মার্চ বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হলে প্রবীণতম ও অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি স্পিকার নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তর্বর্তীকালীন সভাপতি বা চেয়ার হিসেবে অধিবেশন পরিচালনা করেন।
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে দলমত নির্বিশেষে একজন অত্যন্ত মার্জিত, সুশিক্ষিত ও ‘ক্লিন ইমেজ’ বা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিবিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। তার বর্ণাঢ্য জীবন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে উইকিপিডিয়া-এর মূল নিবন্ধটি পড়তে পারেন। [
ড. আবদুল মঈন খান

ড. আবদুল মঈন খান বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম জ্যেষ্ট সদস্য। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, উচ্চশিক্ষা এবং মৃদুভাষী সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে দলমত নির্বিশেষে তার বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সম্প্রতি দেশের পরবর্তী ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদের সম্ভাব্য তালিকায় তার নাম অন্যতম প্রধান প্রার্থী হিসেবে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।
তার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড, শিক্ষাজীবন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
১. পারিবারিক ও শিক্ষাগত ব্যাকগ্রাউন্ড
- জন্ম ও পরিবার: তিনি ১৯৪৭ সালের ১ জানুয়ারি নরসিংদী জেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আবদুল মোমেন খান ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা (সচিব) এবং পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান সরকারের অত্যন্ত সফল খাদ্যমন্ত্রী। বাবার হাত ধরেই মূলত মঈন খানের রাজনীতিতে আগমন ঘটে।
- উচ্চশিক্ষা: তিনি ঢাকার বিখ্যাত নটর ডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং সেখানের নামকরা ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স (University of Sussex) থেকে পদার্থবিজ্ঞান (Physics) বিষয়ে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে পিএইচডি (D.Phil) ডিগ্রি অর্জন করেন।
২. পেশাগত জীবন ও শিক্ষাবিদ ভূমিকা
রাজনীতিতে সার্বক্ষণিকভাবে যুক্ত হওয়ার আগে ড. মঈন খান একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা ও বিজ্ঞান চর্চায় অবদান রাখেন।
৩. রাজনৈতিক কর্মজীবন ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
তিনি নরসিংদী-২ (পলাশ) আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে একাধিকবার সংসদ সদস্য (MP) নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ১৩শ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি এই আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো পালন করেছেন:
- সফল মন্ত্রী (বিভিন্ন মেয়াদে): ১৯৯৩-১৯৯৬ মেয়াদে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারে তিনি পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০০১-২০০২ মেয়াদে তথ্যমন্ত্রী এবং ২০০২-২০০৬ মেয়াদে দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আধুনিকায়নে নবগঠিত বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
- বিএনপির কূটনৈতিক উইং পরিচালনা: ড. মঈন খান বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশী কূটনীতিকদের সাথে দলের নীতি ও আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করতে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছেন।
- দলের দুঃসময়ের কাণ্ডারি ও স্থায়ী কমিটির সদস্য: ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটি’র সদস্য মনোনীত হন। গত দেড় দশকে বিএনপির রাজপথের আন্দোলন এবং দলের বৈরী পরিস্থিতিতে তিনি সবসময় সামনের সারিতে থেকে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ড. আবদুল মঈন খানকে বিএনপির একজন অত্যন্ত সৎ ও প্রজ্ঞাবান ‘ক্লিন ইমেজ’ বা পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। রাষ্ট্রপতি পদের পাশাপাশি নতুন সরকারের সংসদীয় স্পিকার হিসেবেও তার নাম দলের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। তার সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে উইকিপিডিয়া দেখতে পারেন।
নজরুল ইসলাম খান

নজরুল ইসলাম খান বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৃণমূল ও শ্রমিক আন্দোলন থেকে উঠে আসা একজন অত্যন্ত ত্যাগী, বিশ্বস্ত এবং প্রবীণ রাজনীতিবিদ। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম সিনিয়র সদস্য। বর্তমানে দেশের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে তিনি সরকারের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর বিএনপির পক্ষ থেকে পরবর্তী ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদের তালিকায় তার নামটিও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড ও আদি নিবাস
- জন্ম ও পরিবার: নজরুল ইসলাম খান জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলার কুলকান্দি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
- জীবনধারা: তিনি দলের ভেতর ও বাইরে অত্যন্ত সহজ-সরল, সাদামাটা জীবনযাপন এবং সুদৃঢ় দেশপ্রেমের জন্য ‘সাদামাটা ক্লিন ইমেজ’-এর নেতা হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত।
২. শ্রমিক রাজনীতি ও অধিকার আদায়ে ভূমিকা
অন্যান্য অনেক শীর্ষ নেতার মতো তিনি উচ্চ প্রশাসনিক বা পারিবারিকভাবে রাজনীতিতে আসেননি, বরং তার উত্থান সরাসরি মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে:
- শ্রমিক দল গঠন: তিনি বিএনপির অন্যতম প্রধান অঙ্গ সংগঠন ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল’-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশে শ্রমিকবান্ধব শিল্প পরিবেশ ও শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি আদায়ে তার অবদান অনস্বীকার্য।
- আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিনিধিত্ব (ILO): আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) সহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ফোরামে তিনি বাংলাদেশের শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অধিকারের পক্ষে অত্যন্ত সফলভাবে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
৩. বিএনপির রাজনীতি ও সর্বোচ্চ বিশ্বস্ততা
তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই দলের আদর্শের সাথে যুক্ত। দলের প্রতিটি দুঃসময়ে তার ভূমিকা ছিল অনন্য:
- স্থায়ী কমিটির সদস্য: দলের প্রতি অবিচল আনুগত্য এবং সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তাকে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটি’র সদস্য মনোনীত করা হয়।
- নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান (২০২৬): ২০২৬ সালের ১৩শ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা ও সমন্বয় কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানতম দায়িত্ব পালন করেন। দেশজুড়ে দলীয় প্রার্থীদের সমন্বয় ও নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
- সংস্কারের প্রবক্তা: বিএনপির বহুল আলোচিত রাষ্ট্র সংস্কারের ‘৩১ দফা’ রূপরেখা প্রণয়নে তিনি অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন।
৪. বর্তমান রাষ্ট্রীয় ভূমিকা (২০২৬)
২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অন্যতম প্রধান সহযোদ্ধা হিসেবে তিনি কাজ করছেন:
- প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা: তিনি বর্তমানে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং একই সাথে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণী ভূমিকা রাখছেন।
- কূটনৈতিক সমন্বয়: দলের সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের সময় রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন বিদেশী কূটনীতিকদের আগমন এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া তদারকির পুরো ব্যবস্থাটি তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেন।
নজরুল ইসলাম খানকে বিএনপির রাজনীতির অন্যতম ‘সংকটের কাণ্ডারি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সাথে গভীর সংযোগের কারণে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার নাম রাজনৈতিক মহলে বেশ প্রশংসিত হচ্ছে। তার জীবনী সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে উইকিপিডিয়া দেখতে পারেন।
অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বনাম দলীয় বলয়ের সমীকরণ
যদিও রাজনৈতিক মহলে প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে ড. নাসিমুল গনি (বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব) এবং নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী হিসেবে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ্-র নাম আলোচনায় ভেসে উঠেছে; তবে দলীয় দায়িত্বশীল সূত্রসমূহ নিশ্চিত করেছে যে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে একজন পোড় খাওয়া ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেশি পছন্দ করছেন বিএনপি প্রধান তারেক রহমান।
নির্বাচন প্রক্রিয়া ও সাংবিধানিক পথরেখা
সংবিধান অনুযায়ী সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের অভিভাবক বেছে নেওয়ার আইনি ধাপগুলো নিম্নরূপ:
┌─────────────────────────────────────────────────────────────────────────┐
│ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ধাপসমূহ │
├─────────────────────────────────────────────────────────────────────────┤
│ ১. দলীয় সর্বোচ্চ ফোরামে (স্থায়ী কমিটি) আলোচনা ও মতামত সংগ্রহ │
│ ─────────────────────────────────────────────────────────────────────── │
│ ২. প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি প্রধান তারেক রহমান কর্তৃক চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাই │
│ ─────────────────────────────────────────────────────────────────────── │
│ ৩. নির্বাচন কমিশন (EC) কর্তৃক তফসিল ঘোষণা ও মনোনয়নপত্র দাখিল │
│ ─────────────────────────────────────────────────────────────────────── │
│ ৪. সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের খোলা/গোপন ব্যালটে ভোট গ্রহণ │
└─────────────────────────────────────────────────────────────────────────┘
- চূড়ান্ত সংকেত: বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্পষ্ট করেছেন যে, স্থায়ী কমিটির মতামত এবং সংসদীয় দলের সম্মতি নিয়ে মূল প্রার্থীর নাম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই চূড়ান্ত করে ঘোষণা করবেন।
- সংসদে ভোটাভুটি: যেহেতু বিএনপি একক দল হিসেবে ১৩তম জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে জয় লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতায় রয়েছে, তাই দলের মনোনীত প্রার্থীই কার্যত জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণ করবেন।
পরিশেষ: পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নতুন রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সর্বজনগ্রাহ্য রাষ্ট্রনৈতিক ব্যক্তিত্ব অথবা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিশ্বমানের একাডেমিক অভিজ্ঞতা—এই দুজনের মধ্য থেকেই কেউ একজন হতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। সেপ্টেম্বর সেশনেই মিলবে বঙ্গভবনের নতুন অধ্যায়ের চূড়ান্ত উত্তর।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
পর্যালোচনায়: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
একটি রাজনৈতিক দলের দীর্ঘপথচলায় সময়ের সাথে সাথে তার নীতিনির্ধারণী ফোরাম, প্রচারকৌশল, মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট এবং গভর্নেন্স মডেলের ধরনে রূপান্তর আসা অত্যন্ত স্বাভাবিক। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় বহুল আলোচিত একটি রাজনৈতিক কোলাজকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র দুই শীর্ষ অধ্যায়ের দুই ভিন্ন ঘরানার “সহায়ক” বা অনুসারীদের চিত্র সামনে এসেছে।

একদিকে রয়েছেন প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির ধারক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, অন্যদিকে আধুনিক যোগাযোগ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সময়োপযোগী নীতি-কৌশলে চালিত নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান।
এই দুই সময়ে দলের বার্তা পৌঁছে দেওয়া, রাষ্ট্রীয় নীতি তৈরি এবং সাইবার স্পেসে ‘জনমত’ বা ‘ন্যারেটিভ’ গঠনে যাদের ভূমিকা দেখা গেছে—তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড ও প্রভাব বিশ্লেষণ করলে একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতির কৌশলগত বিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১. বেগম খালেদা জিয়ার আমল: ঝানু রাজনীতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মেধার আধিপত্য
বেগম খালেদা জিয়ার নীতিনির্ধারণী ফোরামে (স্থায়ী কমিটি বা উপদেষ্টা পরিষদ) মূলত মাঠপর্যায়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রাজনীতিক, প্রথিতযশা আইনজ্ঞ, আন্তর্জাতিক মানের অর্থনীতিবিদ এবং সাবেক উচ্চপদস্থ আমলাদের প্রাধান্য ছিল:
- এম সাইফুর রহমান (অর্থনীতি ও উন্নয়ন): চার্টার্ড একাউন্টেন্ট (FCA) এবং দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিবার বাজেট পেশকারী অর্থমন্ত্রী। ১৯৯২ সালে ভ্যাট (VAT) প্রবর্তন ও ফ্লোটিং এক্সচেঞ্জ রেট চালুর মাধ্যমে মুক্তবাজার অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপনে তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক।
- ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ (আইন ও কূটনৈতিক কৌশল): যুক্তরাজ্যের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করা প্রবীণ রাজনীতিবীদ। আইনি লড়াই, সংবিধান ব্যাখ্যা এবং রাজনৈতিক জটিলতা সামলাতে তিনি ছিলেন দলের অন্যতম প্রধান ভরসা।
- এম কে আনোয়ার (আমলাতন্ত্র ও প্রশাসন): সিভিল সার্ভিসের সাবেক ক্যাবিনেট সেক্রেটারি (মন্ত্রিপরিষদ সচিব)। প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসনে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বিএনপি সরকারের মূল শক্তি ছিল।
- ড. ওসমান ফারুক (আন্তর্জাতিক অর্থনীতি): যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি এবং বিশ্বব্যাংকের সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। খালেদা জিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
- ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও তরিকুল ইসলাম: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক (মোশাররফ) এবং তৃণমূলের রাজপথ থেকে উঠে আসা পরীক্ষিত জননেতা (তরিকুল)।
কৌশলের মূল ভিত্তি: এই আমলের রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা, সংসদীয় বিতর্ক, ফাইলভিত্তিক নীতি-নির্ধারণ, প্রথাগত আন্তর্জাতিক ডিপ্লোমেসি এবং রাজপথের সরাসরি আন্দোলন।
২. তারেক রহমানের আমল: ডিজিটাল ন্যারেটিভ বনাম রাষ্ট্র পরিচালন কৌশল

তারেক রহমানের আমলকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করে দেখতে হয়—একদিকে বিগত রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় সাইবার স্পেসে গড়ে ওঠা বিকল্প মিডিয়া যোদ্ধা, অন্যদিকে নতুন সরকারে গঠিত আধুনিক ও দক্ষ উপদেষ্টামণ্ডলী।
ক. সাইবার স্পেস ও বিকল্প ন্যারেটিভ মেকারস:

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবিতে যাদের প্রতীকী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, তারা দলের প্রাতিষ্ঠানিক পদে না থাকলেও প্রতিকূল সময়ে সাইবার স্পেসে বিরোধী রাজনৈতিক জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছেন:
- পিনাকী ভট্টাচার্য (লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক): ফ্রান্সে অবস্থান করে সোশ্যাল মিডিয়ায় কন্টেন্ট তৈরির মাধ্যমে নিয়মিত অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট ন্যারেটিভ তৈরি ও তরুণসমাজকে প্রভাবিত করেছেন।
- ইলিয়াস হোসেন (সাবেক সাংবাদিক ও ভ্লগার): ডিজিটাল মিডিয়ার ইনভেস্টিগেটিভ ভিডিওর মাধ্যমে বিকল্প তথ্য প্রবাসীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
খ. তারেক রহমানের সরকারি উপদেষ্টামণ্ডলী ও নীতি-প্রণেতা (২০২৬):
১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকারে তারেক রহমান প্রথাগত রাজনীতিবিদ, প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, আমলা ও তরুণ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে অত্যন্ত ব্যালেন্সড এক উপদেষ্টামণ্ডলী গঠন করেন:
- রাজনৈতিক প্রজ্ঞা: মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম খান এবং রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ (রাজনৈতিক উপদেষ্টা)।
- প্রশাসনিক সুশাসন: মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ (জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা)।
- ম্যাক্রো-ইকোনমি সংস্কার: অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর (অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়)।
- তরুণ ও টেকনোক্র্যাট ব্রেইনস (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা): হুমায়ুন কবির (পররাষ্ট্র, দুর্যোগ ও বিমান), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামসুল ইসলাম (প্রতিরক্ষা), ডা. জাহেদ উর রহমান (পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি), মাহদী আমিন (শিক্ষা ও প্রবাসী কল্যাণ) এবং রেহান আসিফ আসাম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আইসিটি)।
কৌশলের মূল ভিত্তি: আধুনিক ডাটা-ড্রিভেন পলিসি, আইসিটি ও টেকনোলজির সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা, দ্রুত তথ্য প্রচার (Information War) এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি ‘ন্যারেটিভ কন্ট্রোল’ বজায় রাখা।
৩. দুই পদ্ধতির তুলনামূলক চিত্র
| বৈশিষ্ট্য | বেগম খালেদা জিয়ার আমল | তারেক রহমানের আমল |
| মূল থিংক-ট্যাংক/সহায়ক | প্রজ্ঞাবান প্রবীণ রাজনীতিবিদ, আমলা ও আইনি বিশেষজ্ঞ | প্রবীণদের রাজনীতির পাশাপাশি তরুন টেকনোক্র্যাট ও নীতি-বিশেষজ্ঞ |
| প্রচার ও মতামত গঠন | প্রেস কনফারেন্স, সংসদীয় বিতর্ক ও জাতীয় সংবাদপত্র | ইউটিউব, ফেসবুক লাইভ, ভ্লগ, ডিজিটাল অ্যালগরিদম ও ইনফ্লুয়েন্সার |
| রণক্ষেত্র | জাতীয় সংসদ ও রাজপথের সরাসরি আন্দোলন | প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সচিবালয় ও সাইবার স্পেসের ‘ইনফরমেশন ওয়ার’ |
| কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি | ‘ইনস্টিটিউশনাল থিংক-ট্যাংক’ নির্ভর প্রথাগত রাষ্ট্র পরিচালনা | ‘স্মার্ট গভর্নেন্স’ ও আধুনিক ‘ন্যারেটিভ কন্ট্রোল’ এর সমবায় |
৪. মেধার বিবর্তন নাকি সময়ের দাবি? (বিশ্লেষণাত্মক মূল্যায়ন)
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি রাজনীতির এই বিবর্তনকে দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়:
- সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গি: একটি প্রথাগত বড় রাজনৈতিক দল যখন রাজপথের প্রবীণ রাজনীতিবিদদের অর্জিত প্রজ্ঞার চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার তাৎক্ষণিক ইনফ্লুয়েন্সার বা ডিজিটাল প্রচারণায় বেশি প্রভাব লক্ষ্য করে, তখন দলের কাঠামোগত গভীরতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- সমর্থকদের দৃষ্টিভঙ্গি: আধুনিক বিশ্বরাজনীতি এখন সম্পূর্ণ মিডিয়া ও ডাটা-ভিত্তিক। মূলধারার মাধ্যম সংকুচিত হলে যেমন বিকল্প ইনফ্লুয়েন্সারদের গুরুত্ব বাড়ে, তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ড. তিতুমীর বা মাহদী আমিনের মতো আধুনিক বিশ্বমানের স্কলারদের যুক্ত করে তারেক রহমান প্রমান করেছেন যে বিএনপি প্রথাগত এনালগ যুগ থেকে ডিজিটাল যুগের উপযোগী একটি স্মার্ট রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
উপসংহার: সংক্ষেপে বলতে গেলে, বেগম খালেদা জিয়ার আমলটি ছিল “ইনস্টিটিউশনাল অ্যানালগ থিংক-ট্যাংক” কেন্দ্রিক, আর তারেক রহমানের বর্তমান অধ্যায়টি হলো “স্মার্ট গভর্নেন্স ও ডিজিটাল ন্যারেটিভ মেকিং”-এর অনন্য মিশ্রণ। এটি কেবল নেতৃত্ব বা ব্যক্তি পছন্দের পার্থক্য নয়, বরং সময়ের সাথে বদলে যাওয়া বৈশ্বিক রাজনৈতিক যোগাযোগ ও শাসনব্যবস্থার এক অনিবার্য বাস্তবতা।



