অপরাধ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শাপলা চত্বর গণহত্যা মামলা: সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল
শাপলা চত্বর

নিউজ ডেস্ক

August 3, 2026

শেয়ার করুন

বিশেষ সংবাদ প্রতিবেদন | পালস বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ২০১৩ সালের ৫ মে একটি ভয়াবহ ও রক্তঝরা মাইলফলক। ওই দিন রাজধানী ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আয়োজিত ‘ঢাকা অবরোধ’ ও পরবর্তী মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে মধ্যরাতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ লীগ সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে বলপ্রয়োগ করে, তা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ঘটনার সঠিক তদন্ত, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ও দায়ীদের বিচার নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একধরনের নীরবতা ও তথ্য গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটার পর, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবির মুখে শাপলা চত্বরে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) আইনি বিচার প্রক্রিয়া নতুন মাত্রা লাভ করে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জন উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তি ও নীতি-নির্ধারকের বিরুদ্ধে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (Formal Charge) দাখিল ও আমলে নেওয়া হয়েছে। এই নিবন্ধে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের পটভূমি, হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি, ৫ মে মধ্যরাতের যৌথ অভিযান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত প্রতিবেদন, আসামিদের তালিকা এবং আইনগত পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।

১. বিচার প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সম্প্রতি ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত নির্মম গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) আনুষ্ঠানিকভাবে আমলে নিয়েছেন।

মামলার প্রধান ধারা ও আইনি কাঠামো

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩ (সি) ধারা (Crimes against Humanity and Genocide) অনুযায়ী তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পদাধিকারী ও নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধে এই চার্জ গঠন করা হয়েছে। তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ৫ মে মধ্যরাতে unarmed বা নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর আধুনিক রাষ্ট্রীয় অস্ত্র, প্রাণঘাতী গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও নির্বিচার গুলিবর্ষণ করে যে অপারেশন চালানো হয়েছে, তা ছিল একটি সুপরিকল্পিত ‘গণহত্যা’ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ।

[১৩ দফা দাবি ও শাপলা চত্বরে অবস্থান (৫ মে ২০১৩)] 
                      ↓
['অপারেশন সিকিউর শাপলা' ও নির্বিচার গুলিবর্ষণ (৫-৬ মে মধ্যরাত)]
                      ↓
[এক দশকের তথ্য গোপনীয়তা ও আওয়ামী সরকারের রাজনৈতিক নিপীড়ন]
                      ↓
[ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ২০২৪ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পুনস্তদন্ত]
                      ↓
[শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ দাখিল ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা]

হাইপ্রোফাইল অভিযুক্তদের তালিকা (৪১ জন)

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা ফরমাল চার্জে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সামরিক-পুলিশ কর্মকর্তা, আমলা এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বসহ তৎকালীন আওয়ামী লীগ শাসনব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তিদের অভিযুক্ত করা হয়েছে:

১. প্রধান আসামি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব:

  • শেখ হাসিনা: তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মূল নির্দেশদাতা আসামি।
  • মহীউদ্দীন খান আলমগীর: তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
  • শামসুল হক টুকু: তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
  • হাসানুল হক ইনু: তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী।
  • ডা. দীপু মনি: তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেত্রী।
  • আবদুল লতিফ সিদ্দিকী: তৎকালীন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতা।

২. শীর্ষ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা:

  • জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ: তৎকালীন বিজিবি প্রধান ও সাবেক সেনাপ্রধান।
  • বেনজীর আহমেদ: তৎকালীন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (DMP) কমিশনার ও সাবেক আইজিপি।
  • হাসান মাহমুদ খন্দকার: তৎকালীন আইজিপি।
  • এ কে এম শহীদুল হক: তৎকালীন অতিরিক্ত আইজিপি ও সাবেক আইজিপি।
  • মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান: তৎকালীন এনটিএমসি (NTMC) প্রধান ও র‍্যাবের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।

৩. সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব:

  • শাহরিয়ার কবির: সভাপতি, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।
  • ইমরান এইচ সরকার: মুখপাত্র, গণজাগরণ মঞ্চ।
  • মোজাম্মেল বাবু: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, একাত্তর টিভি।
  • ফারজানা রুপা: সাবেক প্রধান প্রতিবেদক, একাত্তর টিভি।

বর্তমান আইনি পরিস্থিতি ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

বর্তমানে ৪১ জন আসামির মধ্যে ৯ জন আসামি কারাগারে আটক রয়েছেন (যাঁদের মধ্যে দীপু মনি, শামসুল হক টুকু, জিয়াউল আহসান, শহীদুল হক, শাহরিয়ার কবির, মোজাম্মেল বাবু এবং ফারজানা রুপা অন্যতম)।

ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাসহ মামলার অন্য সকল পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন। একই সাথে কারাগারে থাকা আসামিদের পরবর্তী নির্দিষ্ট ধার্য তারিখে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত করার জন্য পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

৩. পটভূমি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি

২০১৩ সালের প্রথমভাগে শাহবাগ কেন্দ্রিক ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ গঠন এবং কতিপয় ব্লগারের ইসলামবিদ্বেষী লেখার প্রতিক্রিয়ায় কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ধর্মীয় সংগঠন ‘হেফাজেত ইসলাম বাংলাদেশ’ চট্টগ্রাম থেকে তাদের আন্দোলন শুরু করে। চট্টগ্রামভিত্তিক শীর্ষ আলেম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে গঠিত এই সংগঠনটি সরকারের কাছে তাদের ১৩ দফা দাবি পেশ করে এবং ৫ মে ২০১৩ তারিখে ঢাকা স্তব্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্যে ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচির ডাক দেয়।

┌────────────────────────────────────────────────────────────────────────┐
│                   হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ১৩ দফা দাবি                 │
├────────────────────────────────────────────────────────────────────────┤
│ ১. সংবিধানে মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন।         │
│ ২. ইসলাম অবমাননা ও মহানবী (সা.)-এর শানে কটুুক্তিকারীদের মৃত্যুদণ্ড।     │
│ ৩. শাহবাগ কেন্দ্রিক নাস্তিক্যবাদী ব্লগারদের গ্রেফতার ও কঠোর শাস্তি।    │
│ ৪. নারী নীতি ও শিক্ষানীতির ইসলামবিরোধী ধারা বাতিল।                     │
│ ৫. প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ইসলামি শিক্ষা বাধ্যবাধকতা।       │
│ ৬. কাদিয়ানীদের সরকারিভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা।                          │
│ ৭. সামাজিক অনাচার, নগ্নতা, ও ফ্রি-মিক্সিং বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।        │
│ ৮. খ্রিষ্টান মিশনারি ও এনজিওগুলোর বিতর্কিত ধর্মান্তরকরণ বন্ধ।          │
│ ৯. মসজিদ-মাদ্রাসার ওপর প্রশাসনিক নজরদারি ও চাপ সৃষ্টি বন্ধ।            │
│ ১০. আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংক্রান্ত বিতর্ক নিরসন ও আলেম মুক্তি। │
│ ১১. আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার।         │
│ ১২. পার্বত্য অঞ্চলে বিদেশি এনজিও ও খ্রিষ্টান মিশনারি নিয়ন্ত্রণ।         │
│ ১৩. গণমাধ্যমে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার বন্ধ ও ইসলামি সংস্কৃতি প্রচার।      │
└────────────────────────────────────────────────────────────────────────┘

১৩ দফা দাবির বিস্তারিত বিশ্লেষণ

১. সংবিধানের মূলনীতি: সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ ফিরিয়ে আনা এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন পাস না করার আইনি বাধ্যবাধকতা।

২. ব্লাসফেমি আইন প্রবর্তন: মহানবী (সা.) এবং ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি বা অবমাননা করার অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ড’-র বিধান রেখে কঠোর ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন করা।

৩. ব্লগারদের গ্রেফতার: মহানবী (সা.)-এর চরিত্র হরণকারী এবং ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তিকারী ব্লগারদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি করা।

৪. শিক্ষানীতি ও নারী নীতি সংশোধন: তৎকালীন সরকারের নারী উন্নয়ন নীতি এবং শিক্ষানীতির ইসলামবিরোধী ধারাগুলো বাতিল করা।

৫. ইসলামি শিক্ষা বাধ্যবাধকতা: সর্বস্তরের শিক্ষা পাঠ্যক্রমে ইসলামি ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।

৬. কাদিয়ানী ইস্যু: আহমেদিয়া (কাদিয়ানী) সম্প্রদায়কে সরকারি ও আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করা।

৭. সংস্কৃতি ও সামাজিক নীতি: সমাজ থেকে নগ্নতা, অনাচার, মেলামেশা ও পশ্চিমা ‘লাইফস্টাইল’ প্রচার বন্ধ করা।

৮. মিশনারি ও এনজিও নিয়ন্ত্রণ: পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে খ্রিষ্টান মিশনারি ও বিদেশি এনজিওর কার্যক্রম কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা।

৯. আলেমদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহার: বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতারকৃত আলেম-ওলামাদের মুক্তি প্রদান এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা মামলা বাতিল করা।

তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী এবং ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল সমাজ এই ১৩ দফার কঠোর সমালোচনা করে এটিকে আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো ও নারী স্বাধীনতার পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে। তবে লক্ষ লক্ষ সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ এই দাবির সপক্ষে শাপলা চত্বরের সমাবেশে যোগ দেন।

৪. ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’: ৫ মে মধ্যরাতের অভিযান ও যৌথ বাহিনীর ভূমিকা

২০১৩ সালের ৫ মে সকাল থেকেই ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। দুপুরের মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত লাখ লাখ হেফাজত কর্মী মতিঝিল, পল্টন, গুলিস্তান, বিজয়নগর ও বায়তুল মোকাররম এলাকা পূর্ণ করে ফেলে। সমাবেশ শেষে রাত ঘনিয়ে এলে তৎকালীন সরকার তাদের শাপলা চত্বর ছেড়ে চলে যেতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু আয়োজকরা সেখানে অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

অভিযানে ব্যবহৃত বাহিনী ও কমান্ড স্ট্রাকচার

রাত আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ মহলের নির্দেশে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে শুরু হয় ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’ বা ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’

  • বাংলাদেশ পুলিশ (DMP): তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদের সাঁজোয়া ও পদাতিক ইউনিট।
  • র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB): অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানের সরাসরি কমান্ডে থাকা স্ট্রাইকিং ফোর্স।
  • বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB): তৎকালীন প্রধান আজিজ আহমেদের অধীনে সাঁজোয়া যান ও বিজিবি ব্যাটালিয়ন।

অভিযানের কৌশল ও বর্বরতা

অপারেশনের কৌশল হিসেবে পুরো মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ঘোর অন্ধকার তৈরি করা হয়। সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল, গ্যাস গান, লেজার গান এবং স্বয়ংক্রিয় আধুনিক মারণাস্ত্র থেকে হাজার হাজার রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে চতুর্দিক থেকে বেষ্টনী তৈরি করা হয়।

ঘোর অন্ধকারে ঘুমন্ত ও ক্লান্ত সমাবেশকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চালানো এই যৌথ অভিযান তৎকালীন সময়ে এক চরম বিভীষিকার জন্ম দেয়।

৫. নিহতের তথ্য ও ভৌগোলিক বিশ্লেষণ (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত প্রতিবেদন)

তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অভিযানের পরপরই দাবি করেছিল যে শাপলা চত্বরের অভিযানে কোনো নিহতের ঘটনা ঘটেনি এবং পুলিশ কেবল সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ব্যবহার করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। তবে ট্রাইব্যুনালের সাম্প্রতিক নিরপেক্ষ তদন্তে এই তথ্যের অসত্যতা প্রমাণিত হয়েছে।

                                      [শাপলা চত্বর গণহত্যা ও বিস্তৃত সহিংসতা]
                                                         │
         ┌──────────────────────────────┬────────────────┴──────────────────────────────┐
         ▼                              ▼                                               ▼
   [ঢাকার শাপলা চত্বর]         [সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ]                        [চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা]
   - তারিখ: ৫ মে মধ্যরাত         - তারিখ: ৬ মে সকাল-দুপুর                         - তারিখ: ৫-৬ মে
   - নিহত: ৩২ জন                - নিহত: ২০ জন                                   - নিহত: ৬ জন (চট্টগ্রাম ৫, কুমিল্লা ১)

এলাকাভিত্তিক নিহতের সংখ্যা (মোট নিশ্চিত: ৫৮ জন, আনুমানিক: ৬১ জন)

স্থান/এলাকানিহতের সংখ্যাঅভিযানের বিবরণ ও সময়
ঢাকা (শাপলা চত্বর, মতিঝিল)৩২ জন৫ মে মধ্যরাতের ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’ অভিযানের সময় সরাসরি গুলিতে নিহত।
সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)২০ জন৬ মে সকালে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিক্ষোভে গুলি।
চট্টগ্রাম০৫ জন৫ ও ৬ মে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ দমনে গুলিবর্ষণ।
কুমিল্লা০১ জনমহাসড়ক অবরোধকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহত।
মোট শনাক্তকৃত৫৮ জনতদন্ত সংস্থা কর্তৃক প্রতিটি নিহতের নাম, ঠিকানা ও জাতীয় পরিচযপত্র যাচাই করে নিশ্চিত করা হয়েছে।

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: তদন্ত সংস্থার সার্বিক প্রতিবেদনে অভিযান সংক্রান্ত সংঘাত ও পরবর্তী সহিংসতায় ৭ জন নিরাপত্তাকর্মীসহ মোট নিহতের সংখ্যা ৬১ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত হওয়া গেছে।)

৬. আইনি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

শাপলা চত্বরের এই ঘটনা কেবল দেশের অভ্যন্তরেই রাজনীতিতে গভীর দাগ কাটে নাই, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এর তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

১. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার ভূমিকা:

  • হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW): ঘটনার পরপরই ‘উই ড্রাইভ দেম আউট লাইক ডগস’ (We Drive Them Out Like Dogs) শীর্ষক রিপোর্ট প্রকাশ করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত দাবি করে।
  • এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড লঙ্ঘন করে unarmed বা নিরস্ত্র মানুষের ওপর মারণাস্ত্র ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানায়।
  • অধিকার (Odhikar): অধিকার নামক বাংলাদেশি মানবাধিকার সংস্থা ৬১ জন নিহতের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করেছিল, যার জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অধিকার-এর সম্পাদক আদিলুর রহমান খান ও পরিচালক নাসিরুদ্দিন এলানকে গ্রেপ্তার করে ও সাজা দেয়।

২. বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব:

  • ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর রূপান্তর: শাপলা চত্বরের ঘটনার পর দেশের দক্ষিণপন্থি ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র আকার ধারণ করে।
  • তৎকালীন সরকারের দমন-পীড়ন: ৫ মে-র পর থেকে দেশে বিরোধী রাজনৈতিক মত, আলেম-ওলামা এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ অভূতপূর্ব পর্যায়ে বৃদ্ধি পায়। একই রাতে দিগন্ত টিভি এবং ইসলামিক টিভির সম্প্রচার চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

৭. উপসংহার ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ণ

২০১৩ সালের ৫ মে-র শাপলা চত্বর ঘটনাটি কেবল একটি রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সমাবেশের ওপর হামলা ছিল না; এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মানবাধিকার, মৌলিক স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের ওপর রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের এক চরম দৃষ্টান্ত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জন উচ্চপর্যায়ের দায়ীদের অভিযুক্ত করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কেবল এই হত্যাকাণ্ডে জীবন উৎসর্গকারী ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দীর্ঘ এক দশক পর কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার লাভ করতে পারে। ট্রাইব্যুনালের এই আইনি পদক্ষেপ ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও যেকোনো ধরনের ‘গণহত্যা’ প্রতিরোধে ঐতিহাসিক নজির হিসেবে কাজ করবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দেশের রাজনৈতিক রদবদল, স্বরাষ্ট্র ও এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই প্রধান নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ ও শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি

নিউজ ডেস্ক

August 13, 2026

শেয়ার করুন

বিভাগ: রাজনীতি বিশেষ প্রতিবেদন

সম্পাদকীয় প্যানেল: রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বিভাগ

প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬ | বিকেল ০৪:২৮ (বিএসটি)

বিশেষ প্রতিবেদন: ২০২৬ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড রক্ষা ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সরকারের উচ্চপর্যায়ে দুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল মন্ত্রণালয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। দেশের বর্তমান নীতিনির্ধারণী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দুই হেভিওয়েট নেতা—সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এখন যথাক্রমে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দুটি দপ্তরের নীতিনির্ধারক।

রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, রাজপথের সংগ্রাম, আমলাতান্ত্রিক জ্ঞান এবং তৃণমূলের সংগঠনের দিক থেকে এ দুই নেতার ভূমিকা কেমন এবং রাজনৈতিক সমীকরণে কার গুরুত্ব কতখানি—তা নিয়ে নিচে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো।

১. সালাহউদ্দিন আহমেদ: রাজনীতি, প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণের শীর্ষ মুখ

কক্সবাজারের চকরিয়া-পেকুয়া অঞ্চল থেকে চারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বর্তমানে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য। সাবেক বিসিএস ক্যাডার হওয়ায় সরকারি আমলাতন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তাঁর অভিজ্ঞতা বিদ্যমান।

                       [ সালাহউদ্দিন আহমেদ: ক্যারিয়ার প্রোফাইল ]
                                         │
        ┌────────────────────────────────┼────────────────────────────────┐
        ▼                                ▼                                ▼
[ প্রশাসনিক সূচনা ]            [ রাজপথের সংগ্রাম ও নিখোঁজ ]         [ বর্তমান ভূমিকা ]
• বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডার       • ২০১৫ সালে অজ্ঞাত স্থান থেকে     • বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য
• প্রধানমন্ত্রীর সাবেক এপিএস      দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দান   • সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
• সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী   • দীর্ঘ ৯ বছরের নির্বাসন ও ত্যাগ   • বর্তমান এলজিআরডি মন্ত্রী

রাজনৈতিক প্রোফাইল ও সাফল্য:

  • প্রশাসনিক প্রজ্ঞা: বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডার থেকে রাজনীতিতে আসা এই নেতা যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর আমলাতান্ত্রিক দক্ষতা প্রমাণ করেছেন।
  • দুঃসময়ের কাণ্ডারি: ২০১৫ সালের তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় দলের শীর্ষ নেতৃত্ব যখন অবরুদ্ধ বা আত্মগোপনে, তখন তিনি অজ্ঞাত স্থান থেকে ভিডিও বিবৃতির মাধ্যমে আন্দোলন পরিচালনা করে সাধারণ নেতাকর্মীদের ধরে রেখেছিলেন।
  • বিশাল ত্যাগ: দীর্ঘ ৯ বছর ভারতের শিলংয়ে নির্বাসিত জীবন ও গুম হওয়ার ক্ষত কাটিয়ে স্বদেশে ফেরা তাঁকে নেতাকর্মীদের কাছে এক অনন্য ত্যাগের প্রতীকে পরিণত করেছে।

সীমাবদ্ধতা ও বিতর্ক:

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নীতি-নির্ধারক ও বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যেমন ত্যাগ ও সাহসিকতার জন্য প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি তাঁর কিছু সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো সমালোচনা ও বিতর্কও রয়েছে

নিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে তাঁর প্রধান সীমাবদ্ধতা ও বিতর্কগুলো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

প্রধান সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক দুর্বলতা

  • আঞ্চলিক ও পারিবারিক রাজনীতির একচেটিয়া প্রভাব: কক্সবাজারের চকরিয়া-পেকুয়া (কক্সবাজার-১) আসনে তাঁর এবং তাঁর পরিবারের একক রাজনৈতিক আধিপত্য নিয়ে দলের ভেতরেই এক ধরণের চাপা ক্ষোভ রয়েছে [১.৩.৪]। তিনি নিজে যখন দীর্ঘ ৯ বছর ভারতে নির্বাসিত ছিলেন, তখন তাঁর আসনে স্ত্রী হাসিনা আহমেদকে দলের মনোনয়ন দেওয়া হয় । স্থানীয় পুরোনো ও ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতিকে প্রাধান্য দেওয়ার নীতি তাঁর অন্যতম বড় সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা হয়।
  • সমঝোতা বা নমনীয়তার অভাব: সাবেক আমলা বা বিসিএস ক্যাডার হওয়ার কারণে তাঁর কাজের মধ্যে এক ধরণের অনমনীয় ‘ব্যুরোক্রেটিক’ বা প্রশাসনিক মানসিকতা লক্ষ্য করা যায় । অন্য সমমনা রাজনৈতিক দল বা জোটের সাথে রাজনৈতিক দরকষাকষির ক্ষেত্রে তিনি অনেক সময় অতিরিক্ত কট্টর অবস্থান নেন, যা বহুদলীয় জোটে অস্বস্তি তৈরি করে।
  • দীর্ঘ নির্বাসনজনিত মাঠের সংযোগ বিচ্ছিন্নতা: ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ বছর দেশের বাইরে থাকায় সারা দেশের নতুন প্রজন্মের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সাথে তাঁর সরাসরি ও গভীর সংযোগে এক ধরণের শূন্যতা তৈরি হয়েছিল।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় বিতর্কসমূহ

১. ‘এস আলম গ্রুপ’-এর গাড়ি ব্যবহার বিতর্ক (২০২৪)

স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কক্সবাজার বিমানবন্দরে নামার পর তিনি বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী ‘এস আলম গ্রুপ’-এর একটি বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করে নিজ নির্বাচনী এলাকায় যান । এই ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে আসার পর সারা দেশে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। বিতর্ক চরম আকার ধারণ করলে তিনি সংবাদ সম্মেলন করে দেশবাসীর কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং বলেন যে অসাবধানতাবশত ও না জেনে তিনি গাড়িটিতে উঠেছিলেন

২. কট্টর রাজনৈতিক বক্তব্য ও জামায়াত-বিরোধিতা

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সেমিনার ও সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্য রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর কিছু কৌশল নিয়ে তাঁর দেওয়া কিছু কড়া ও প্রকাশ্য মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয় । এছাড়া আওয়ামী লীগকে সরাসরি একটি ‘মাফিয়া গ্রুপ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দলটিকে রাজনীতি থেকে চিরতরে নিষিদ্ধ করার জন্য তাঁর অনড় অবস্থান ও চাপ দেশের একটি অংশের বুদ্ধিজীবী ও সমালোচকদের মতে অতিরিক্ত উগ্র রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করছে। [

৩. ‘গুম’ ও ভারতে উদ্ধার হওয়া নিয়ে ধোঁয়াশা (২০১৫)

২০১৫ সালে উত্তরার একটি বাসা থেকে নিখোঁজ হওয়ার ৬২ দিন পর ভারতের শিলংয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করা হয় [ তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার একে ‘স্বেচ্ছায় আত্মগোপন’ বলে প্রচার করার চেষ্টা করে, যদিও বিএনপি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে ‘রাষ্ট্রীয় গুম’ হিসেবে প্রমাণ করে তিনি কীভাবে এবং কার মাধ্যমে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে পৌঁছালেন—এই রহস্যের সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যাখ্যা বা তদন্তের অভাব রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের আজীবন সমালোচনার খোরাক জুগিয়েছে [


সারসংক্ষেপ: সালাহউদ্দিন আহমেদ একজন মেধাবী এবং বিশ্বস্ত নীতি-নির্ধারক হলেও তাঁর কট্টর রাজনৈতিক ভাষা এবং পরিবারকেন্দ্রিক আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের প্রধান বিতর্কিত দিক

২. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি: তৃণমূল ও ছাত্ররাজনীতির সংগঠক

নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর উপকূলীয় অঞ্চলে বিএনপির প্রধান ভিত্তি হিসেবে খ্যাত শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বর্তমানে দলের কেন্দ্রীয় যৌথ মহাসচিব। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগের তুখোর ছাত্রনেতা হিসেবে তাঁর মূল পরিচয় তৈরি হয়।

রাজনৈতিক প্রোফাইল ও সাফল্য:

  • ছাত্ররাজনীতির নেটওয়ার্ক: ১৯৯৬-১৯৯৮ মেয়াদের জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি হওয়ায় সারা দেশের ছাত্র ও যুব নেতাকর্মীদের মধ্যে তাঁর এক বিশাল নিজস্ব গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
  • মাঠের যোদ্ধা: রাজপথের আন্দোলনে শতাধিক মামলার শিকার হওয়া এবং অন্তত ১১ বার কারাবরণকারী এ্যানি ১/১১ থেকে পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটগুলোতে অনমনীয় অবস্থান ধরে রাখেন।
  • সংসদীয় অভিজ্ঞতা: লক্ষ্মীপুর-৩ আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি তৃণমূলের জনগণের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন।

সীমাবদ্ধতা ও বিতর্ক:

শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির রাজনৈতিক ক্যারিয়ার যেমন তৃণমূলের আন্দোলন ও যুবশক্তির সংযোগের কারণে সফল, তেমনই তাঁর কট্টর রাজনৈতিক অবস্থান, মাঠপর্যায়ের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ও বড় বিতর্ক রয়েছে。

নিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে তাঁর প্রধান সীমাবদ্ধতা ও বিতর্কগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রধান সীমাবদ্ধতা ও সাংগঠনিক দুর্বলতা

  • আঞ্চলিক কোন্দল ও গ্রুপ পলিটিক্স: লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির রাজনীতিতে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, তিনি দলে নিজের একক বলয় তৈরি করতে গিয়ে অনেক পুরোনো, ত্যাগী ও সিনিয়র নেতাদের কোন্দলের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। লক্ষ্মীপুরে বিএনপির রাজনীতি মূলত ‘এ্যানি গ্রুপ’ এবং তাঁর বিরোধী শিবিরের কোন্দলে প্রায়শই জর্জরিত থাকে।
  • মাঠপর্যায়ের উগ্রতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা: মাঠের সংগঠক হিসেবে তাঁর কর্মীবাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী ও আগ্রাসী। তবে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল কিংবা সমমনা জোটের (যেমন: জামায়াতে ইসলামী) কর্মীদের সাথে তাঁর অনুসারীদের যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, তা নিয়ন্ত্রণে তিনি অনেক সময় ব্যর্থতার পরিচয় দেন。
  • জাতীয় নীতিনির্ধারণে দূরদর্শিতার অভাব: এ্যানি মূলত একজন ‘মাঠের নেতা’ ও ‘বিক্ষোভ সংগঠক’। কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে লিয়াজোঁ বা দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় পলিসি তৈরির ক্ষেত্রে সালাহউদ্দিন আহমেদের মতো শীর্ষ নেতাদের তুলনায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্ত্বিক দূরদর্শিতা কিছুটা কম বলে মনে করা হয়।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় বিতর্কসমূহ

১. জামায়াত কর্মীদের সাথে সংঘর্ষ ও আধিপত্যের বিতর্ক (২০২৪-২০২৬)

বিগত ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সমীকরণের মাঝে বৃহত্তর নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর অঞ্চলে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় কর্মীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বেশ কয়েকটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে。 সমালোচকদের অভিযোগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে এবং পরে—উভয় সময়েই লক্ষ্মীপুরে জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে তিনি তাঁর নিজস্ব ক্যাডার বাহিনীকে মৌন সম্মতি দিয়েছিলেন, যা অন্তর্বর্তীকালীন রাজনৈতিক ঐক্যে ফাটল ধরায়।

২. উগ্র ও উস্কানিমূলক রাজনৈতিক ভাষা

বিভিন্ন জনসভা ও রাজনৈতিক আন্দোলনে তাঁর দেওয়া অনেক বক্তব্য তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রতিপক্ষকে রাজপথে ‘পিষে ফেলা’ বা ‘লাঠিপেটা’ করার মতো প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দেওয়ার কারণে সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরা তাঁর রাজনৈতিক ভাষার তীব্র সমালোচনা করেছেন। সমালোচকদের মতে, তাঁর এই আগ্রাসী বক্তব্য কর্মীদের আরও বেশি উগ্র হতে প্ররোচিত করে।

৩. ১/১১-এর সংস্কারপন্থী হওয়ার গুঞ্জন ও পরবর্তী ভোলবদল

২০০৭ সালের ১/১১-এর রাজনৈতিক সংকটের সময় বিএনপির অনেক নেতার মতো তাঁর বিরুদ্ধেও পরোক্ষভাবে ‘সংস্কারপন্থী’ (দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা অংশ) হওয়ার মৃদু গুঞ্জন উঠেছিল। যদিও পরবর্তীতে তিনি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন এবং খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের প্রতি শতভাগ আনুগত্য প্রদর্শন করে মূল ধারায় ফিরে আসেন। কিন্তু পুরোনো অনেক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এখনো সুযোগ পেলেই তাঁর সেই সময়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।


সারসংক্ষেপ: শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বিএনপির আন্দোলনের জন্য একজন অপরিহার্য ‘অ্যাক্টিভিস্ট’ হলেও, ক্ষমতার রাজনীতিতে তাঁর অতি-আগ্রাসী মনোভাব, স্থানীয় কোন্দল এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাঁর উগ্র দলীয় মানসিকতা তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত।

৩. দলীয় রাজনীতিতে সালাহউদ্দিন আহমেদ বনাম শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি: তুলনামূলক অবস্থান

দলের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা, সিনিয়রিটি এবং নীতিনির্ধারণের ক্ষমতার কথা বিবেচনা করলে সালাহউদ্দিন আহমেদ দলীয় গুরুত্বের দিক থেকে স্পষ্টভাবেই এগিয়ে রয়েছেন। তবে তৃণমূল সংগঠিত করার ক্ষেত্রে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির ভূমিকাও অপরিসীম।

বিচ্যুতি / মানদণ্ডসালাহউদ্দিন আহমেদশহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি
দলীয় পদমর্যাদাজাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য (সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম)কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব (দ্বিতীয় সারি)
রাজনৈতিক শক্তিগভীর নীতিনির্ধারণী মেধা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও আমলাতান্ত্রিক অভিজ্ঞতারাজপথের যুবশক্তি, ছাত্রনেতাদের সাথে সংযোগ ও মাঠপর্যায়ের আন্দোলন
অভিজ্ঞতা৪ বারের এমপি, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বিসিএস ক্যাডার৩ বারের এমপি ও সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ
প্রধান পরিচিতিরাজনৈতিক নীতিনির্ধারক ও ‘লিভিং লেজেন্ড’ ত্যাগের প্রতীকতৃণমূল গোছানোর সংগঠক ও অনমনীয় ছাত্রনেতা

৪. সংক্ষেপে মূল নির্যাস

বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষিত বিবেচনা করলে:

  1. সালাহউদ্দিন আহমেদ হলেন মূলত বিএনপির একজন ‘পলিসি মেকার’ (Policy Maker) বা নীতিনির্ধারক, যাঁর সিদ্ধান্ত দল ও সরকারের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক গতিপথ নির্ধারণ করে।
  2. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি হলেন দলের ‘গ্রাসরুট মোবিলাইজার’ (Grassroot Mobilizer) বা সংগঠক, যাঁর কাজ হলো দেশের তারুণ্য ও মাঠের কর্মীদের একতাবদ্ধ রেখে রাজপথ ও নিরাপত্তা খাত সচল রাখা।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ফারাক্কা বাঁধের ইতিহাস

নিউজ ডেস্ক

August 13, 2026

শেয়ার করুন

বিভাগ: পরিবেশ ও প্রকৃতি

প্রতিবেদন: আন্তর্জাতিক ও পরিবেশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ দল

প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬ | বিকেল ০৪:১৬ (বিএসটি)

বিশেষ প্রতিবেদন: আন্তর্জাতিক নদীর বহমান স্রোত কোনো নির্দিষ্ট দেশের একক সম্পদ নয়—আন্তর্জাতিক নদী আইনে এটি স্বীকৃত নীতি। তবে দীর্ঘ ৫ দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের একতরফা ফারাক্কা বাঁধের পরিচালনা বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য নদী মরুময়তা, খরা, লবণাক্ততা এবং আকস্মিক বন্যার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চলমান ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে ১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে ফারাক্কা বাঁধের সৃষ্টি, এর ক্ষতিকর প্রভাব এবং ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

১. ফারাক্কা বাঁধ কী এবং কেন এটি নির্মাণ করা হয়েছিল?

ফারাক্কা বাঁধ হলো গঙ্গা নদীর ওপর ভারত কর্তৃক নির্মিত ২,২৪০ মিটার (প্রায় ২.২৪ কিমি) দীর্ঘ একটি ব্যারেজ। এটি বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ ও মালদা জেলায় অবস্থিত। ১৯৬১ সালে কাজ শুরু হয়ে ১৯৭৫ সালে এটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়।

ভারতের ঘোষিত উদ্দেশ্য:

  • কলকাতা বন্দরের নাব্য রক্ষা: ভারতের প্রধান যুক্তি ছিল গঙ্গার শাখা নদী হুগলী-ভাগীরথীতে পলি জমে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা কমে যাচ্ছে। গঙ্গা নদী থেকে ফিডার ক্যানেলের (Feeder Canal) মাধ্যমে পানি সরিয়ে হুগলী নদীতে ফেলে পলি পরিষ্কার করা এবং সেখানে সমুদ্রগামী বড় জাহাজ ভেড়ানোর পথ সুগম করাই ছিল এর প্রধান লক্ষ্য।
  • নগরীর পানি সরবরাহ ও যোগাযোগ: কলকাতা মহানগরীর সুপেয় পানির চাহিদা পূরণ এবং উত্তর ও দক্ষিণ পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে রেল ও সড়ক যোগাযোগ সহজ করা।

২. ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশে সৃষ্ট বহুমুখী ক্ষতি

উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের পরিবেশ, অর্থনীতি ও বাস্তুতন্ত্রে যে মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো:

                                  [ ফারাক্কা বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব ]
                                                  │
         ┌────────────────────────────────────────┼────────────────────────────────────────┐
         ▼                                        ▼                                        ▼
 [ নদী ও ভৌগোলিক খরা ]                      [ সুন্দরবন ও বাস্তুতন্ত্র ]                [ কৃষি ও মৎস্য সম্পদ ]
• শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি হ্রাস ও মরুময়তা  • মিষ্টি পানি কমে সমুদ্রের লোনা পানি প্রবেশ   • ১০ লাখ হেক্টরের বেশি জমি লবণাক্ত
• বর্ষায় একযোগে গেট খুলে আকস্মিক বন্যা       • সুন্দরী গাছের 'শীর্ষ মরণ' রোগ বৃদ্ধি      • ইলিশ ও গাঙ্গেয় ডলফিনের বিনাশ

ক) মরুময়তা ও বর্ষায় কৃত্রিম বন্যা

  • শুষ্ক মৌসুমে খরা: জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে বাংলাদেশে পদ্মার পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। ফলে পদ্মা এবং এর শাখা নদীগুলো (গড়াই, মধুমতি, মাথাভাঙা) শুকিয়ে বালুচরে পরিণত হয়।
  • বর্ষায় বন্যা ও নদীভাঙন: বর্ষাকালে উজানে পানি অতিরিক্ত বেড়ে গেলে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজ্য বাঁচাতে ফারাক্কার সবগুলো গেট একসাথে খুলে দেওয়া হয়, যা বাংলাদেশে আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ নদীভাঙন তৈরি করে।

খ) সুন্দরবনের ওপর মারাত্মক আঘাত

  • লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধি: গড়াই ও মধুমতি নদীর মাধ্যমে সুন্দরবনে মিষ্টি পানির প্রবেশ কমে যাওয়ায় বঙ্গোপসাগরের লোনা পানি সুন্দরবনের গভীরে ঢুকে পড়ে।
  • সুন্দরী গাছের ‘শীর্ষ মরণ’ (Top Dying Disease): মাত্রাতিরিক্ত লোনা পানির কারণে বনের প্রধান প্রজাতি সুন্দরী গাছ ওপর থেকে শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বনের প্রায় ২৮-৩০% সুন্দরী গাছ এই রোগে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
  • বন্যপ্রাণীর পানীয় জলের সংকট: মিষ্টি পানির জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণসহ অন্যান্য প্রাণীর পানের পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।

গ) কৃষি ও মৎস্য সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি

  • আবাদি জমিতে লোনা পানি: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ লাখ হেক্টরের বেশি কৃষি জমি লোনা পানির আগ্রাসনে পড়ে অনুর্বর হয়ে পড়েছে।
  • ইলিশের পরিযায়ন পথ অবরুদ্ধ: ইলিশ মাছ ডিম ছাড়ার জন্য সাগর থেকে নদীর গভীর ও মিষ্টি পানির উজান স্রোতে উঠে আসে। ফারাক্কার কারণে পানির গভীরতা কমে মোহনায় চর জাগায় ইলিশের এই ঐতিহ্যবাহী পরিযায়ন পথ ধ্বংস হয়ে গেছে।

৩. ফারাক্কা বাঁধ ইস্যুতে ভারত কেন অনমনীয় ও আগ্রাসী অবস্থান নেয়?

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গঙ্গা পানি বণ্টন ও ফারাক্কা ইস্যুতে ভারতের অনমনীয় কৌশলের পেছনে প্রধান ৪টি ভূরাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ কাজ করে:

১. ‘আপার রিপারিয়ান’ বা উজানের দেশের সুবিধাজনক অবস্থান

ভৌগোলিক কারণে ভারত গঙ্গার উজান অঞ্চলে অবস্থিত। আন্তর্জাতিক জলনীতিতে ভারত এই ‘উজান রাষ্ট্রের অবস্থান’-কে একটি কৌশলগত ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, যাতে ভাটির দেশ বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখা যায়।

২. ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অঙ্গরাজ্যগুলোর বিরোধিতা

ফারাক্কা ইস্যুটি শুধু দুই দেশের সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নয়, ভারতের নিজস্ব রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সাথে যুক্ত:

  • বিহারের আপত্তি: বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন যে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজানে (বিহারে) গঙ্গা নদীতে অস্বাভাবিক পলি জমছে এবং প্রতি বছর রেকর্ড বন্যা হচ্ছে। তাই বিহার চায় বাঁধটি হয় ভেঙে ফেলা হোক, না হয় পানির পুনর্মূল্যায়ন করা হোক।
  • পশ্চিমবঙ্গের অনমনীয়তা: পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিজেদের কৃষি ও কলকাতা বন্দরের দোহাই দিয়ে গঙ্গার প্রবাহের একটি ফোঁটাও বাংলাদেশকে দিতে সম্মত হতে চায় না।

৩. দ্বিপাক্ষিক বনাম অববাহিকাভিত্তিক (Basin-wide) আলোচনা

গঙ্গার পানির বড় অংশ আসে নেপালের নদীগুলো থেকে। আন্তর্জাতিক নদী বিশেষজ্ঞরা বহুপাক্ষিক বা অববাহিকাভিত্তিক (বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল) চুক্তির পরামর্শ দিলেও ভারত বিষয়টি শুধুমাত্র ‘দ্বিপাক্ষিক’ আলোচনার মধ্যে আটকে রাখতে চায়, যাতে তারা দরকষাকষিতে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকে।

৪. ২০২৬ সালের চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ এড়ানোর চেষ্টা

১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গা চুক্তিতে কোনো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ (শুষ্ক মৌসুমে নদীপ্রবাহ যাই থাক না কেন বাংলাদেশকে আইনগতভাবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি দেওয়ার গ্যারান্টি) ছিল না। ২০২৬ সালের নতুন চুক্তি নবায়নে বাংলাদেশ যাতে এই গ্যারান্টি ক্লজ জোরালোভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে না পারে, সেজন্য ভারত কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখার চেষ্টা করে।

৪. সংক্ষেপে: বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান প্রেক্ষাপট

বিষয়চ্যালেঞ্জ / সমস্যাবাংলাদেশের সম্ভাব্য সমাধান
২০২৬ গঙ্গা চুক্তি নবায়ন১৯৯৬ সালের চুক্তিতে আইনি নিশ্চয়তা না থাকানতুন চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ও রিয়েল-টাইম ডিজিটাল ডেটা শেয়ারিং যুক্ত করা।
একমুখী পানির নির্ভরতাউজান থেকে পানি না পেলে নদী শুকিয়ে যাওয়ানিজস্ব ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করে বর্ষার উদ্বৃত্ত পানি সঞ্চয় রাখা।
আন্তর্জাতিক আইনি প্রয়োগদ্বিপাক্ষিক আলোচনায় কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের ‘আন্তর্জাতিক নদী ব্যবহার কনভেনশন’ অনুযায়ী বৈশ্বিক চাপ সৃষ্টি করা।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:

  1. বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB): গঙ্গা পানিপ্রবাহ ও ফারাক্কা পয়েন্টের ঐতিহাসিক সমীক্ষা ফাইল
  2. আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশন (UN 1997 Convention): আঞ্চলিক ও অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবহারের নীতিমালা
  3. বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI): উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও কৃষি বিপর্যয় সম্পর্কিত রিপোর্ট
  4. পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় (MOEFCC): সুন্দরবনের সুন্দরী গাছের টপ-ডাইং ও ইকোসিস্টেম ক্ষয়ক্ষতি সমীক্ষা

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

বাঙালি বিজ্ঞানী

নিউজ ডেস্ক

August 13, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদন প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬ | প্রতিবেদক: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ

বিশ্বের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মানচিত্রে বাঙালি বিজ্ঞানীদের অবদান অনস্বীকার্য। বিশ্বখ্যাত নামগুলোর পাশাপাশি আমাদের দেশে এমন কিছু উদ্ভাবক ও বিজ্ঞানী রয়েছেন, যাদের প্রাকৃতিক দূরদর্শিতা ও ল্যাবরেটরির আবিষ্কার বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে বিশাল বিপ্লব ঘটিয়েছে।

বিজ্ঞান চর্চাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এমন ৫ জন কৃতী ব্যক্তিত্বের বিস্তারিত প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ‘হরি ধান’-এর আসল উদ্ভাবক: কৃষক বিজ্ঞানী হরিপদ কাপালী (১৯২২ – ২০১৭)

পূর্বে অনেকের ধারণায় “ড. হরিপদ সরকার” নামে বিভ্রান্তি থাকলেও, অতি ফলনশীল ‘হরি ধান’-এর আসল উদ্ভাবক কোনো ডিগ্রিধারী ডক্টর ছিলেন না। তিনি ছিলেন ঝিনাইদহের সাধুহাটি ইউনিয়নের আসাননগর গ্রামের এক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন সাধারণ কৃষক।

আবিষ্কারের নেপথ্য ও বৈশিষ্ট্য:

  • প্রাকৃতিক নির্বাচন (Natural Selection): ১৯৯২-১৯৯৬ সালের দিকে বিআর-১১ (BR-11) ধানের জমিতে একটি ব্যতিক্রমী ও শক্তিশালী ধানের গোছা লক্ষ্য করেন তিনি। সেই গোছার বীজ আলাদা করে সংরক্ষণ ও বপন করে তিনি এই নতুন জাতের বিকাশ ঘটান।
  • কম খরচে উচ্চ ফলন: এই ধানে সার ও কীটনাশক অনেক কম লাগে এবং বিঘা প্রতি ১৮ থেকে ২২ মণ ফলন পাওয়া যায়।
  • জাতীয় স্বীকৃতি: তাঁর এই অবদান এখন ষষ্ঠ ও নবম-দশম শ্রেণির বিজ্ঞান ও কৃষি শিক্ষা পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হয়।

২. বৈজ্ঞানিক গবেষণার জনক’: ড. মুহম্মদ কুদরাত-এ-খুদা (১৯০০ – ১৯৭৭)

জৈব রসায়নবিদ, দূরদর্শী শিক্ষাবিদ এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (BCSIR) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ড. কুদরাত-এ-খুদা দেশের স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে শিল্পায়নের পথ দেখিয়েছিলেন।

যুগান্তকারী অবদানসমূহ:

  • পারটেক্স (Partex) ও বিকল্প জ্বালানি: পাটকাঠি থেকে শক্ত বোর্ড (Partex) এবং পাট থেকে বায়ো-ফুয়েল বা বিকল্প পেট্রোল তৈরির সফল সূত্র আবিষ্কার করেন।
  • তেলাকুচা থেকে ডায়াবেটিসের ওষুধ: দেশীয় ঔষধি গাছ ‘তেলাকুচা’ থেকে ১২টি আলাদা রাসায়নিক যৌগ পৃথক করেন।
  • কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন (১৯৭৪): স্বাধীন বাংলাদেশের ১ম শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে ১ম থেকে ৮ ১ম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ঐতিহাসিক সুপারিশ করেন।

৩. ‘পাটের জাদুকর’: ড. মোবারক আহমদ খান (জন্ম: ১৯৫৮)

বিজেএমসি (BJMC)-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ড. মোবারক আহমদ খান পাট ও পলিমার কেমিস্ট্রির ওপর গবেষণা করে বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক দূষণ সমাধানের পথ দেখিয়েছেন।

                  [ ড. মোবারক আহমদ খানের প্রধান উদ্ভাবন ]
                                     │
     ┌───────────────────────────────┼───────────────────────────────┐
     ▼                               ▼                               ▼
 [ সোনালী ব্যাগ ]               [ জুটিন (Jutin) ]            [ পাটের হেলমেট ও টাইলস ]
• পলিথিনের পচনশীল বিকল্প        • পারটেক্সের মতোই মজবুত        • মোটরসাইকেল আরোহীদের জন্য
• মাটিতে ৩-৪ মাসে মিশে যায়      হালকা ও মরিচারোধী টিন          হালকা ও বুলেটপ্রুফ কভার

৪. ‘সনো ফিল্টার’ ও আর্সেনিক মুক্তি: ড. আবুল হুসাম

কুষ্টিয়ার সন্তান অধ্যাপক ড. আবুল হুসাম ভূগর্ভস্থ পানির বিষাক্ত আর্সেনিক দূর করার জন্য ‘সনো ফিল্টার’ (SONO Filter) উদ্ভাবন করেন।

  • বৈশ্বিক প্রভাব: অত্যন্ত কম খরচে তৈরি এই ফিল্টারটি লাখ লাখ মানুষকে আর্সেনিকযুক্ত বিষাক্ত পানি থেকে রক্ষা করেছে।
  • আন্তর্জাতিক সম্মাননা: এই উদ্ভাবনের জন্য ২০০৭ সালে জাতীয় প্রকৌশল একাডেমি তাঁকে বিশ্বখ্যাত ‘গ্রেঞ্জার চ্যালেঞ্জ প্রাইজ’ ($1 Million) প্রদান করে।

৫. পেঁপে ও পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন: ড. মাকসুদুল আলম (১৯৫৪ – ২০১৪)

ফরিদপুরের সন্তান আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অণুজীব বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম জিনোম সিকোয়েন্সিং বা জীবনরহস্য উন্মোচনে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।

  • ঐতিহাসিক সাফল্য: তিনি পরপর পেঁপে, রাবার এবং বাংলাদেশের প্রাণ ‘তোষা ও সাদা পাট’-এর জেনোম সিকোয়েন্স (Genome Sequence) সফলভাবে আবিষ্কার করেন।
  • কৃষি খাতে প্রভাব: এর ফলে রোগপ্রতিরোধী এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকার মতো পাটের নতুন জাত উদ্ভাবনের পথ উন্মুক্ত হয়।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:

  1. বিসিএসআইআর অফিশিয়াল পেপার্স: ড. কুদরাত-এ-খুদার পেটেন্ট ও গবেষণা আর্কাইভ
  2. কৃষি তথ্য সার্ভিস (AIS): কৃষক বিজ্ঞানী হরিপদ কাপালীর উদ্ভাবন ও হরি ধানের ব্যাকগ্রাউন্ড
  3. ন্যাশনাল একাডেমি অব ইঞ্জিনিয়ারিং (USA): ড. আবুল হুসামের সনো ফিল্টার ও গ্রেঞ্জার প্রাইজ রিকগনিশন
  4. বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন (BJMC): ড. মোবারক আহমদ খানের সোনালী ব্যাগ প্রজেক্ট ফাইল

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২৯শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ