অপরাধ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ সংবাদ প্রতিবেদন | পালস বাংলাদেশ
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ২০১৩ সালের ৫ মে একটি ভয়াবহ ও রক্তঝরা মাইলফলক। ওই দিন রাজধানী ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আয়োজিত ‘ঢাকা অবরোধ’ ও পরবর্তী মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে মধ্যরাতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ লীগ সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে বলপ্রয়োগ করে, তা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ঘটনার সঠিক তদন্ত, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ও দায়ীদের বিচার নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একধরনের নীরবতা ও তথ্য গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটার পর, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবির মুখে শাপলা চত্বরে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) আইনি বিচার প্রক্রিয়া নতুন মাত্রা লাভ করে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জন উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তি ও নীতি-নির্ধারকের বিরুদ্ধে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (Formal Charge) দাখিল ও আমলে নেওয়া হয়েছে। এই নিবন্ধে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের পটভূমি, হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি, ৫ মে মধ্যরাতের যৌথ অভিযান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত প্রতিবেদন, আসামিদের তালিকা এবং আইনগত পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।
১. বিচার প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সম্প্রতি ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত নির্মম গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) আনুষ্ঠানিকভাবে আমলে নিয়েছেন।
মামলার প্রধান ধারা ও আইনি কাঠামো
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩ (সি) ধারা (Crimes against Humanity and Genocide) অনুযায়ী তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পদাধিকারী ও নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধে এই চার্জ গঠন করা হয়েছে। তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ৫ মে মধ্যরাতে unarmed বা নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর আধুনিক রাষ্ট্রীয় অস্ত্র, প্রাণঘাতী গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও নির্বিচার গুলিবর্ষণ করে যে অপারেশন চালানো হয়েছে, তা ছিল একটি সুপরিকল্পিত ‘গণহত্যা’ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ।
[১৩ দফা দাবি ও শাপলা চত্বরে অবস্থান (৫ মে ২০১৩)]
↓
['অপারেশন সিকিউর শাপলা' ও নির্বিচার গুলিবর্ষণ (৫-৬ মে মধ্যরাত)]
↓
[এক দশকের তথ্য গোপনীয়তা ও আওয়ামী সরকারের রাজনৈতিক নিপীড়ন]
↓
[ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ২০২৪ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পুনস্তদন্ত]
↓
[শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ দাখিল ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা]
হাইপ্রোফাইল অভিযুক্তদের তালিকা (৪১ জন)
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা ফরমাল চার্জে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সামরিক-পুলিশ কর্মকর্তা, আমলা এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বসহ তৎকালীন আওয়ামী লীগ শাসনব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তিদের অভিযুক্ত করা হয়েছে:
১. প্রধান আসামি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব:
- শেখ হাসিনা: তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মূল নির্দেশদাতা আসামি।
- মহীউদ্দীন খান আলমগীর: তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
- শামসুল হক টুকু: তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
- হাসানুল হক ইনু: তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী।
- ডা. দীপু মনি: তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেত্রী।
- আবদুল লতিফ সিদ্দিকী: তৎকালীন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতা।
২. শীর্ষ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা:
- জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ: তৎকালীন বিজিবি প্রধান ও সাবেক সেনাপ্রধান।
- বেনজীর আহমেদ: তৎকালীন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (DMP) কমিশনার ও সাবেক আইজিপি।
- হাসান মাহমুদ খন্দকার: তৎকালীন আইজিপি।
- এ কে এম শহীদুল হক: তৎকালীন অতিরিক্ত আইজিপি ও সাবেক আইজিপি।
- মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান: তৎকালীন এনটিএমসি (NTMC) প্রধান ও র্যাবের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।
৩. সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব:
- শাহরিয়ার কবির: সভাপতি, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।
- ইমরান এইচ সরকার: মুখপাত্র, গণজাগরণ মঞ্চ।
- মোজাম্মেল বাবু: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, একাত্তর টিভি।
- ফারজানা রুপা: সাবেক প্রধান প্রতিবেদক, একাত্তর টিভি।
বর্তমান আইনি পরিস্থিতি ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
বর্তমানে ৪১ জন আসামির মধ্যে ৯ জন আসামি কারাগারে আটক রয়েছেন (যাঁদের মধ্যে দীপু মনি, শামসুল হক টুকু, জিয়াউল আহসান, শহীদুল হক, শাহরিয়ার কবির, মোজাম্মেল বাবু এবং ফারজানা রুপা অন্যতম)।
ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাসহ মামলার অন্য সকল পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন। একই সাথে কারাগারে থাকা আসামিদের পরবর্তী নির্দিষ্ট ধার্য তারিখে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত করার জন্য পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৩. পটভূমি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি

২০১৩ সালের প্রথমভাগে শাহবাগ কেন্দ্রিক ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ গঠন এবং কতিপয় ব্লগারের ইসলামবিদ্বেষী লেখার প্রতিক্রিয়ায় কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ধর্মীয় সংগঠন ‘হেফাজেত ইসলাম বাংলাদেশ’ চট্টগ্রাম থেকে তাদের আন্দোলন শুরু করে। চট্টগ্রামভিত্তিক শীর্ষ আলেম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে গঠিত এই সংগঠনটি সরকারের কাছে তাদের ১৩ দফা দাবি পেশ করে এবং ৫ মে ২০১৩ তারিখে ঢাকা স্তব্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্যে ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচির ডাক দেয়।
┌────────────────────────────────────────────────────────────────────────┐
│ হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ১৩ দফা দাবি │
├────────────────────────────────────────────────────────────────────────┤
│ ১. সংবিধানে মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন। │
│ ২. ইসলাম অবমাননা ও মহানবী (সা.)-এর শানে কটুুক্তিকারীদের মৃত্যুদণ্ড। │
│ ৩. শাহবাগ কেন্দ্রিক নাস্তিক্যবাদী ব্লগারদের গ্রেফতার ও কঠোর শাস্তি। │
│ ৪. নারী নীতি ও শিক্ষানীতির ইসলামবিরোধী ধারা বাতিল। │
│ ৫. প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ইসলামি শিক্ষা বাধ্যবাধকতা। │
│ ৬. কাদিয়ানীদের সরকারিভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা। │
│ ৭. সামাজিক অনাচার, নগ্নতা, ও ফ্রি-মিক্সিং বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। │
│ ৮. খ্রিষ্টান মিশনারি ও এনজিওগুলোর বিতর্কিত ধর্মান্তরকরণ বন্ধ। │
│ ৯. মসজিদ-মাদ্রাসার ওপর প্রশাসনিক নজরদারি ও চাপ সৃষ্টি বন্ধ। │
│ ১০. আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংক্রান্ত বিতর্ক নিরসন ও আলেম মুক্তি। │
│ ১১. আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার। │
│ ১২. পার্বত্য অঞ্চলে বিদেশি এনজিও ও খ্রিষ্টান মিশনারি নিয়ন্ত্রণ। │
│ ১৩. গণমাধ্যমে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার বন্ধ ও ইসলামি সংস্কৃতি প্রচার। │
└────────────────────────────────────────────────────────────────────────┘
১৩ দফা দাবির বিস্তারিত বিশ্লেষণ
১. সংবিধানের মূলনীতি: সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ ফিরিয়ে আনা এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন পাস না করার আইনি বাধ্যবাধকতা।
২. ব্লাসফেমি আইন প্রবর্তন: মহানবী (সা.) এবং ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি বা অবমাননা করার অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ড’-র বিধান রেখে কঠোর ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন করা।
৩. ব্লগারদের গ্রেফতার: মহানবী (সা.)-এর চরিত্র হরণকারী এবং ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তিকারী ব্লগারদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি করা।
৪. শিক্ষানীতি ও নারী নীতি সংশোধন: তৎকালীন সরকারের নারী উন্নয়ন নীতি এবং শিক্ষানীতির ইসলামবিরোধী ধারাগুলো বাতিল করা।
৫. ইসলামি শিক্ষা বাধ্যবাধকতা: সর্বস্তরের শিক্ষা পাঠ্যক্রমে ইসলামি ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
৬. কাদিয়ানী ইস্যু: আহমেদিয়া (কাদিয়ানী) সম্প্রদায়কে সরকারি ও আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করা।
৭. সংস্কৃতি ও সামাজিক নীতি: সমাজ থেকে নগ্নতা, অনাচার, মেলামেশা ও পশ্চিমা ‘লাইফস্টাইল’ প্রচার বন্ধ করা।
৮. মিশনারি ও এনজিও নিয়ন্ত্রণ: পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে খ্রিষ্টান মিশনারি ও বিদেশি এনজিওর কার্যক্রম কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা।
৯. আলেমদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহার: বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতারকৃত আলেম-ওলামাদের মুক্তি প্রদান এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা মামলা বাতিল করা।
তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী এবং ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল সমাজ এই ১৩ দফার কঠোর সমালোচনা করে এটিকে আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো ও নারী স্বাধীনতার পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে। তবে লক্ষ লক্ষ সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ এই দাবির সপক্ষে শাপলা চত্বরের সমাবেশে যোগ দেন।
৪. ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’: ৫ মে মধ্যরাতের অভিযান ও যৌথ বাহিনীর ভূমিকা

২০১৩ সালের ৫ মে সকাল থেকেই ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। দুপুরের মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত লাখ লাখ হেফাজত কর্মী মতিঝিল, পল্টন, গুলিস্তান, বিজয়নগর ও বায়তুল মোকাররম এলাকা পূর্ণ করে ফেলে। সমাবেশ শেষে রাত ঘনিয়ে এলে তৎকালীন সরকার তাদের শাপলা চত্বর ছেড়ে চলে যেতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু আয়োজকরা সেখানে অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
অভিযানে ব্যবহৃত বাহিনী ও কমান্ড স্ট্রাকচার
রাত আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ মহলের নির্দেশে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে শুরু হয় ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’ বা ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’।
- বাংলাদেশ পুলিশ (DMP): তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদের সাঁজোয়া ও পদাতিক ইউনিট।
- র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB): অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানের সরাসরি কমান্ডে থাকা স্ট্রাইকিং ফোর্স।
- বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB): তৎকালীন প্রধান আজিজ আহমেদের অধীনে সাঁজোয়া যান ও বিজিবি ব্যাটালিয়ন।
অভিযানের কৌশল ও বর্বরতা
অপারেশনের কৌশল হিসেবে পুরো মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ঘোর অন্ধকার তৈরি করা হয়। সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল, গ্যাস গান, লেজার গান এবং স্বয়ংক্রিয় আধুনিক মারণাস্ত্র থেকে হাজার হাজার রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে চতুর্দিক থেকে বেষ্টনী তৈরি করা হয়।
ঘোর অন্ধকারে ঘুমন্ত ও ক্লান্ত সমাবেশকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চালানো এই যৌথ অভিযান তৎকালীন সময়ে এক চরম বিভীষিকার জন্ম দেয়।
৫. নিহতের তথ্য ও ভৌগোলিক বিশ্লেষণ (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত প্রতিবেদন)
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অভিযানের পরপরই দাবি করেছিল যে শাপলা চত্বরের অভিযানে কোনো নিহতের ঘটনা ঘটেনি এবং পুলিশ কেবল সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ব্যবহার করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। তবে ট্রাইব্যুনালের সাম্প্রতিক নিরপেক্ষ তদন্তে এই তথ্যের অসত্যতা প্রমাণিত হয়েছে।
[শাপলা চত্বর গণহত্যা ও বিস্তৃত সহিংসতা]
│
┌──────────────────────────────┬────────────────┴──────────────────────────────┐
▼ ▼ ▼
[ঢাকার শাপলা চত্বর] [সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ] [চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা]
- তারিখ: ৫ মে মধ্যরাত - তারিখ: ৬ মে সকাল-দুপুর - তারিখ: ৫-৬ মে
- নিহত: ৩২ জন - নিহত: ২০ জন - নিহত: ৬ জন (চট্টগ্রাম ৫, কুমিল্লা ১)
এলাকাভিত্তিক নিহতের সংখ্যা (মোট নিশ্চিত: ৫৮ জন, আনুমানিক: ৬১ জন)
| স্থান/এলাকা | নিহতের সংখ্যা | অভিযানের বিবরণ ও সময় |
| ঢাকা (শাপলা চত্বর, মতিঝিল) | ৩২ জন | ৫ মে মধ্যরাতের ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’ অভিযানের সময় সরাসরি গুলিতে নিহত। |
| সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) | ২০ জন | ৬ মে সকালে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিক্ষোভে গুলি। |
| চট্টগ্রাম | ০৫ জন | ৫ ও ৬ মে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ দমনে গুলিবর্ষণ। |
| কুমিল্লা | ০১ জন | মহাসড়ক অবরোধকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহত। |
| মোট শনাক্তকৃত | ৫৮ জন | তদন্ত সংস্থা কর্তৃক প্রতিটি নিহতের নাম, ঠিকানা ও জাতীয় পরিচযপত্র যাচাই করে নিশ্চিত করা হয়েছে। |
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: তদন্ত সংস্থার সার্বিক প্রতিবেদনে অভিযান সংক্রান্ত সংঘাত ও পরবর্তী সহিংসতায় ৭ জন নিরাপত্তাকর্মীসহ মোট নিহতের সংখ্যা ৬১ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত হওয়া গেছে।)
৬. আইনি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
শাপলা চত্বরের এই ঘটনা কেবল দেশের অভ্যন্তরেই রাজনীতিতে গভীর দাগ কাটে নাই, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এর তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
১. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার ভূমিকা:
- হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW): ঘটনার পরপরই ‘উই ড্রাইভ দেম আউট লাইক ডগস’ (We Drive Them Out Like Dogs) শীর্ষক রিপোর্ট প্রকাশ করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত দাবি করে।
- এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড লঙ্ঘন করে unarmed বা নিরস্ত্র মানুষের ওপর মারণাস্ত্র ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানায়।
- অধিকার (Odhikar): অধিকার নামক বাংলাদেশি মানবাধিকার সংস্থা ৬১ জন নিহতের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করেছিল, যার জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অধিকার-এর সম্পাদক আদিলুর রহমান খান ও পরিচালক নাসিরুদ্দিন এলানকে গ্রেপ্তার করে ও সাজা দেয়।
২. বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব:
- ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর রূপান্তর: শাপলা চত্বরের ঘটনার পর দেশের দক্ষিণপন্থি ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র আকার ধারণ করে।
- তৎকালীন সরকারের দমন-পীড়ন: ৫ মে-র পর থেকে দেশে বিরোধী রাজনৈতিক মত, আলেম-ওলামা এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ অভূতপূর্ব পর্যায়ে বৃদ্ধি পায়। একই রাতে দিগন্ত টিভি এবং ইসলামিক টিভির সম্প্রচার চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
৭. উপসংহার ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ণ
২০১৩ সালের ৫ মে-র শাপলা চত্বর ঘটনাটি কেবল একটি রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সমাবেশের ওপর হামলা ছিল না; এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মানবাধিকার, মৌলিক স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের ওপর রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের এক চরম দৃষ্টান্ত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জন উচ্চপর্যায়ের দায়ীদের অভিযুক্ত করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কেবল এই হত্যাকাণ্ডে জীবন উৎসর্গকারী ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দীর্ঘ এক দশক পর কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার লাভ করতে পারে। ট্রাইব্যুনালের এই আইনি পদক্ষেপ ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও যেকোনো ধরনের ‘গণহত্যা’ প্রতিরোধে ঐতিহাসিক নজির হিসেবে কাজ করবে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৬ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইসলাম ও জীবন
তথ্যসূত্র: আল-কোরআনের তাফসির (তাফসির ইবনে কাসির), সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিস এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত নবী-রাসূলদের জীবনী গ্রন্থ।
বর্তমান ২০২৬ সালের আধুনিক ও তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ যুগে মানুষ বাহ্যিক ও বস্তুগত দিক থেকে অনেক উন্নত হলেও, মানসিক প্রশান্তি, নৈতিকতা ও জীবনবোধের দিক থেকে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতি-ব্যবহার, পারস্পরিক দূরত্বের এই যুগে সঠিক জীবনদর্শনের অভাব স্পষ্ট। মানবজাতির হেদায়েত ও সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে যে নবী-রাসূলদের পাঠিয়েছেন, তাদের জীবন কেবল ইতিহাসের কিছু গল্প নয়; বরং তা কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য এক জীবন্ত ও কালজয়ী গাইডলাইন। এই বিশেষ সিরিজের ১ম পর্বে আমরা আলোচনা করব নবী-রাসূলদের অনন্য জীবন থেকে আজকের দিনে আমাদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার মতো ৩টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
১. হযরত আইয়ুব (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: চরম বিপদেও মানসিক শক্তি ও ধৈর্য (Patience)
আজকের যুগে সামান্য আর্থিক ক্ষতি, চাকরি হারানো কিংবা পারিবারিক বা শারীরিক অসুস্থতায় মানুষ দ্রুত হতাশ হয়ে পড়ে, এমনকি অনেকে আত্মহননের পথও বেছে নেয়। এই মানসিক সংকটে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আদর্শ হলেন হযরত আইয়ুব (আ.)।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে দীর্ঘ বছর ধরে কঠিন রোগ, সন্তানদের মৃত্যু এবং সমস্ত ধন-সম্পদ হারানোর মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলেন। কিন্তু এমন চরম সংকটেও তিনি আল্লাহর প্রতি বিন্দুমাত্র অভিযোগ করেননি, বরং চরম ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন।
- আজকের দিনের শিক্ষা: আধুনিক জীবনে বিষণ্ণতা (Depression) বা যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে ভেঙে না পড়ে ইতিবাচক থাকা এবং বিশ্বাস রাখা যে—কষ্টের পরেই স্বস্তি আসে। বিপদে অধৈর্য না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাই হলো সফলতার মূল চাবি।
২. হযরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: নৈতিক স্খলন ও প্রলোভন থেকে নিজেকে রক্ষা করা (Self-Control)
বর্তমান ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক মাধ্যমের উন্মুক্ততার কারণে তরুণ প্রজন্মের সামনে পর্নোগ্রাফি, অবৈধ সম্পর্ক এবং নৈতিক স্খলনের নানামুখী প্রলোভন প্রতিনিয়ত আসছে। নিজের চরিত্র ও নৈতিকতা ধরে রাখা আজকের দিনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
হযরত ইউসুফ (আ.) ছিলেন অপরূপ সুন্দর এবং যুবক। মিশরের আজিজের স্ত্রী যখন ঘরের সমস্ত দরজা বন্ধ করে উনাকে পাপের দিকে আহ্বান করেছিল, তখন তিনি সমস্ত প্রলোভন ও ক্ষমতার দাপটকে তুচ্ছ করে বলেছিলেন, “আমি আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি।” পাপের চেয়ে তিনি কারাগারের বন্দিজীবনকে বেছে নিয়েছিলেন।

- আজকের দিনের শিক্ষা: চারপাশে যত বড় বা সহজ প্রলোভনই থাকুক না কেন, আল্লাহর ভয়কে অন্তরে জাগ্রত রেখে নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ (Self-Control) বজায় রাখা। ক্যারিয়ার বা জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে সাময়িক আনন্দের চেয়ে চিরস্থায়ী নৈতিকতা ও সততাকে প্রাধান্য দেওয়া।
৩. হযরত নূহ (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: সামাজিক সমালোচনা উপেক্ষা করে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকা (Perseverance)
আজকের দিনে তরুণ বা উদ্যোক্তারা যখন নতুন বা ভালো কোনো কাজ করতে যায়, তখন সমাজের মানুষের সমালোচনা, ট্রল বা উপহাসের শিকার হয়ে অনেকেই মাঝপথে কাজ ছেড়ে দেয়। মানুষের কথা বা সামাজিক চাপের মুখে নিজের সৎ লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া খুবই সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হযরত নূহ (আ.) যখন আল্লাহর নির্দেশে মরুভূমির বুকে বিশাল নৌকা তৈরি করছিলেন, তখন সমকালীন সমাজের মানুষ উনাকে দেখে চরম উপহাস করত, পাগল বলত। কিন্তু তিনি মানুষের কোনো উপহাস বা ট্রলের দিকে কান না দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই নৌকাই বিশ্বাসীদের রক্ষা করেছিল।
- আজকের দিনের শিক্ষা: আপনি যদি নিশ্চিত হন যে আপনার কাজটি সৎ, সঠিক এবং মানবকল্যাণকর, তবে সমাজ বা সোশ্যাল মিডিয়ার মানুষ কী বলল বা কী ট্রল করল—তাতে কান না দিয়ে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকা। দৃঢ় সংকল্প এবং কঠোর পরিশ্রমই শেষ পর্যন্ত সত্যকে জয়ী করে।
নবী-রাসূলদের এই চমৎকার ঐতিহাসিক শিক্ষাগুলো কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং আমাদের প্রতিদিনের আচরণ, কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক জীবনে চর্চা করা উচিত। তবেই আমরা এই আধুনিক ও জটিল পৃথিবীতে একটি শান্তিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে সক্ষম হব।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: জাতীয়
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ গণপরিষদের কার্যবিবরণী, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের সংবিধানের মূল প্রস্তাবনা।
আজ ৪ নভেম্বর, ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ সংবিধান দিবস’। ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ সময় এই দিনটি উপেক্ষিত থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭২ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয়েছিল। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ১১ মাসের মাথায় কীভাবে একটি বিশ্বমানের ও যুগোপযোগী সংবিধান লাভ করেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। নিচে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা ও গ্রহণের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

১. পটভূমি ও গণপরিষদ আদেশ জারি
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করার পর একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নিজস্ব আইনি কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। এর পরদিনই অর্থাৎ ১১ জানুয়ারি তিনি ‘অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’ জারি করেন। এর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তন করা হয়।
পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ জারি করা হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে এই গণপরিষদ গঠিত হয়, যার মূল দায়িত্ব ছিল দেশের জন্য একটি স্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন করা। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়।
২. খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন
গণপরিষদের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘সংবিধান প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটিতে একমাত্র নারী সদস্য ছিলেন বেগম রাজিয়া বানু। এছাড়া তৎকালীন বিরোধী দলের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
কমিটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের কাজ শুরু করে। বিভিন্ন দেশের সংবিধান পর্যালোচনা এবং দেশের আপামর জনসাধারণের মতামত সংগ্রহের জন্য তারা ব্যাপক উদ্যোগ নেন। সর্বস্তরের জনগণের কাছ থেকে মোট ৯৮টি লিখিত প্রস্তাব সংগ্রহ করা হয়েছিল। ভারত ও যুক্তরাজ্যের সংবিধানকে মূল ভিত্তি ধরে খসড়া তৈরির কাজ এগিয়ে চলে।
৩. খসড়া উত্থাপন ও বিতর্ক
দীর্ঘ কঠোর পরিশ্রমের পর ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ড. কামাল হোসেন খসড়া সংবিধান বিল আকারে উত্থাপন করেন। ১৯ অক্টোবর থেকে এর ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়।
সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদ ও ধারা নিয়ে গণপরিষদে ব্যাপক বিতর্ক ও আলোচনা হয়। গণপরিষদের সদস্যরা বিভিন্ন সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। মোট ৪১টি অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার পর সংবিধানের প্রতিটি বিষয়কে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়।
৪. সংবিধান গ্রহণ ও কার্যকর
অবশেষে ৪ নভেম্বর, ১৯৭২ সালে গণপরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে ‘বাংলাদেশের সংবিধান’ গৃহীত হয়। সংবিধান গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, “এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত, এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।”
এর ঠিক দেড় মাস পর, অর্থাৎ বিজয়ের প্রথম বার্ষিকী—১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২ থেকে এই সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়। সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপিটি ছিল হাতে লেখা, যা শিল্পী হাশেম খানের নকশায় এবং প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার আবদুর রউফের হাতের লেখায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। এতে স্বাক্ষর করেছিলেন গণপরিষদের সদস্যবৃন্দ।
একটি দেশের সংবিধান কেবল কিছু আইনের সমষ্টি নয়, এটি রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল স্তম্ভ ছিল চারটি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সময়ের আবর্তে এই সংবিধানে বহু পরিবর্তন ও সংশোধনী আনা হলেও, ৪ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সবসময়ই অনস্বীকার্য। তরুণ প্রজন্মের জন্য নিজেদের অধিকার ও রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা বুঝতে সংবিধান রচনার এই ইতিহাস জানা অত্যন্ত জরুরি।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: অর্থনীতি
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank FX Reference), ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (EBL Currency Tracker), জাগোনিউজ২৪ মুদ্রা বাজার প্রতিবেদন এবং ওয়াইজ (Wise) রিয়েল-টাইম এক্সচেঞ্জ ডেটা।
বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিনিময় হার বা এক্সচেঞ্জ রেট পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশেষ করে প্রবাসী আয় (Remittance) পাঠানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ডলার, ইউরো ও মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতের বর্তমান রেট জানা অত্যন্ত জরুরি। ৪ নভেম্বর ২০২৬ তারিখের সর্বশেষ অফিসিয়াল ডেটা এবং খোলা বাজারের লেনদেন হারের ওপর ভিত্তি করে আজকের বিস্তারিত রেট নিচে তুলে ধরা হলো।
১. একনজরে আজকের প্রধান প্রধান বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার
আন্তর্জাতিক ইন্টারব্যাংক মার্কেট এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী আজকের প্রধান তিনটি মুদ্রার গড় ক্রয় (Buying Rate) ও বিক্রয় মূল্য (Selling Rate) নিচে দেওয়া হলো:
- মার্কিন ডলার (USD): বাংলাদেশ ব্যাংকের আজকের অফিসিয়াল এফএক্স রেফারেন্স রেট অনুযায়ী প্রতি ডলারের মূল্য ১২৪.৩৫ টাকা থেকে ১২৪.৫০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। ব্যাংকভেদে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য এটি ১২৩.৩০ টাকা (ক্রয়) এবং ১২৪.৮০ টাকা (বিক্রয়) পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে।
- ইউরো (EUR): ইউরোপীয় একক মুদ্রা ইউরোর দাম আন্তর্জাতিক বাজারে আজ কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশি টাকায় আজ ১ ইউরোর গড় বাজার মূল্য বা মিড-মার্কেট রেট প্রায় ১৪০.১১ টাকা। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে এটি সর্বোচ্চ ১৪১.৭৪ টাকা পর্যন্ত বিক্রয় হচ্ছে।
- মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (MYR): মালয়েশিয়া প্রবাসী ভাই-বোনদের জন্য আজ রিঙ্গিতের রেট বেশ স্থিতিশীল। ৪ নভেম্বর ২০২৬-এর লাইভ কারেন্সি চার্ট অনুযায়ী ১ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত সমান ৩০.৬৩ টাকা (মিড-মার্কেট রেট)। বিভিন্ন রেমিট্যান্স হাউজ ও ব্যাংকে এটি ৩০.২৫ টাকা (ক্রয়) এবং ৩০.৬৬ টাকা (বিক্রয়) সীমার মধ্যে লেনদেন হচ্ছে।

২. বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেলে মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (MYR) রেটের তুলনা
প্রবাসীদের সুবিধার্থে নিচে একটি তুলনামূলক তালিকা দেওয়া হলো। মালয়েশিয়া থেকে ১০০০ রিঙ্গিত বাংলাদেশে পাঠালে আজ কোন মাধ্যমে চার্জ ছাড়া আনুমানিক কত টাকা পাওয়া যাবে তা দেখে নিন:
- Wise (অনলাইন ট্রান্সফার): বিনিময় হার ৩০.৫৪ টাকা। ১০০০ রিঙ্গিতে পাবেন ৩০,৫৪০ টাকা।
- Agrani Remittance House: বিনিময় হার ৩০.৪৫ টাকা। ১০০০ রিঙ্গিতে পাবেন ৩০,৪৫০ টাকা।
- Al-Rajhi Bank: বিনিময় হার ৩০.৪৪ টাকা। ১০০০ রিঙ্গিতে পাবেন ৩০,৪৪Tokens বা টাকা।
- Western Union (ক্যাশ পিকআপ): বিনিময় হার ৩০.৩৯ টাকা। ১০০০ রিঙ্গিতে পাবেন ৩০,৩৯০ টাকা।
৩. আন্তর্জাতিক কার্ড পেমেন্ট ও ই-কমার্স রেট
আপনি যদি আন্তর্জাতিক ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড (যেমন- EBL, City Bank, বা অন্যান্য ডুয়াল কারেন্সি কার্ড) ব্যবহার করে ই-কমার্স পারচেজ কিংবা ফেসবুক/গুগল বিজ্ঞাপনের বিল পরিশোধ করতে চান, তবে আপনার জন্য রেট কিছুটা ভিন্ন হবে। আজ বিভিন্ন ব্যাংকের কার্ড এনডোর্সমেন্ট রেট প্রতি ডলারের জন্য ১২৪.৯৫ টাকা থেকে ১২৫.২০ টাকা পর্যন্ত ধার্য করা হয়েছে (ভ্যাট ও ব্যাংক প্রসেসিং ফি আলাদা প্রযোজ্য)।
- রেট পরিবর্তনশীল: কারেন্সি এক্সচেঞ্জ রেট বা মুদ্রার মান প্রতি সেকেন্ডে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। তাই টাকা কিংবা রেমিট্যান্স পাঠানোর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে আপনার নিকটস্থ ব্যাংক শাখা বা অনুমোদিত মানি চেঞ্জারের লাইভ স্ক্রিন থেকে রেটটি কনফার্ম করে নিন।
- হুন্ডি বা অবৈধ মাধ্যম বর্জন করুন: যেকোনো ধরনের অবৈধ হুন্ডি চ্যানেলে টাকা পাঠানো আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল কিংবা সরকার অনুমোদিত মানি ট্রান্সফার অ্যাপের মাধ্যমে টাকা পাঠালে সরকার ঘোষিত ২.৫% নগদ প্রণোদনা সরাসরি আপনার অ্যাকাউন্টে যুক্ত হবে এবং আপনার কষ্টার্জিত অর্থ শতভাগ নিরাপদ থাকবে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



