অর্থনীতি

বাংলাদেশে বিমানের ওভারফ্লাইট ফি ও আকাশসীমা ব্যবহারের সম্পূর্ণ নিয়মাবলী (২০২৬ আপডেট)
ওভারফ্লাইট

নিউজ ডেস্ক

August 6, 2026

শেয়ার করুন

এভিয়েশন ও আকাশপথ প্রতিরক্ষা ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

যেকোনো স্বাধীন দেশের উপর দিয়ে আন্তর্জাতিক বা ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ নিয়ে যাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নেওয়া আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী বাধ্যতামূলক। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (ICAO) নীতিমালা অনুসরণ করে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (CAAB) এই অনুমতি প্রদান করে এবং নির্দিষ্ট ফি আদায় করে। এভিয়েশন পরিভাষায় একে ‘ওভারফ্লাইট পারমিট’ এবং আদায়কৃত ফি-কে ‘রুট নেভিগেশন চার্জ’ (Route Navigation Fee) বলা হয়।

বাংলাদেশের আকাশসীমা (যা এভিয়েশন চার্টে Dhaka FIR / VGFR নামে পরিচিত) অতিক্রম করার সময় একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিমানকে প্রতিবার গড়ে আনুমানিক ৬০,০০০ টাকা (বা সর্বনিম্ন ৫০০ মার্কিন ডলার) পর্যন্ত চার্জ প্রদান করতে হয়।

১. স্বয়ংক্রিয় বিলিং ব্যবস্থা ও হাজার কোটি টাকার রাজস্ব

বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারে সিভিল অ্যাভিয়েশনের রাজস্ব আদায়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে ফরাসি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থ্যালস গ্রুপ (Thales Group)-এর নির্মিত অত্যাধুনিক রাডার ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (ATC) সিস্টেম।

  • পূর্ণাঙ্গ নজরদারি: বঙ্গোপসাগরের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ (EEZ) বাংলাদেশের সম্পূর্ণ আকাশসীমা এখন শতভাগ ডিজিটাল রাডার ট্র্যাকিংয়ের আওতাভুক্ত।
  • অটোমেটিক বিলিং: ঢাকা FIR-এ কোনো বিমান প্রবেশের সাথে সাথেই সিস্টেম তার সর্বোচ্চ উড্ডয়ন ওজন (MTOW) এবং অতিক্রান্ত দূরত্ব হিসাব করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেভিগেশন বিল তৈরি করে।
  • বার্ষিক রাজস্ব: আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিমান সংস্থা থেকে ওভারফ্লাইট ও নেভিগেশন ফি বাবদ বাংলাদেশ বছরে গড়ে ১,০০০ কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে।
  • কঠোর নিয়মকানুন: নির্ধারিত বকেয়া পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান রয়েছে (যেমনটি পূর্বে ভারতের স্পাইসজেট এয়ারলাইন্সের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছিল)।

২. বিমানের ওজন (MTOW) অনুযায়ী ফি-এর পরিমাপ (CAAB Chart)

আন্তর্জাতিক এভিয়েশন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বিমানের ব্র্যান্ড বা মডেল নয়; বরং তার Maximum Take-Off Weight (MTOW) বা সর্বোচ্চ উড্ডয়ন ওজনের ভিত্তিতে ফি নির্ধারিত হয়। নিচে সিভিল অ্যাভিয়েশনের রুট নেভিগেশন ফি এবং প্রাথমিক পারমিট প্রসেসিং ফি ($২০৯) একত্রিত করে আনুমানিক তালিকা তুলে ধরা হলো:

বিমানের বিভাগ ও মডেল (উদাহরণ)সর্বোচ্চ ওজন (MTOW)রুট নেভিগেশন ফি (USD)মোট আনুমানিক খরচ (BDT)*
ছোট বিমান: ATR 72, Dash 8-Q400১০,০০০ – ২০,০০০ কেজি$৫০৳৬,০০০ – ৳১২,০০০
মাঝারি ন্যারো-বডি: Airbus A320, Boeing 737২০,০০০ – ৫০,০০০ কেজি$১০০ – $১৫০৳১২,০০০ – ৳১৮,০০০
বড় ওয়াইড-বডি: Boeing 787, Airbus A330৫০,০০০ – ১০০,০০০ কেজি$২০০ – $ ৩০০৳২৪,০০০ – ৳৩৬,০০০
হেভি বাণিজ্যিক বিমান: Boeing 777-300ER, B747১০০,০০০ – ২০০,০০০ কেজি$২৮০ – $৪২০৳৩৩,৬০০ – ৳৫০,৪০০
সুপার জাম্বো: Airbus A380২০০,০০০ কেজির বেশি$৩০০+৳৩৬,০০০+

(দ্রষ্টব্য: প্রসেসিং ফি হিসেবে প্রতি ফ্লাইটে অতিরিক্ত $১৯৫–$২০৯ যোগ হয়। ১ মার্কিন ডলার = ১২০ টাকা ধরে রূপান্তর হিসাব করা হয়েছে।)

৩. ওভারফ্লাইট পারমিট নেওয়ার পদ্ধতি ও নিয়মাবলী

বাংলাদেশের আকাশপথ ব্যবহারের জন্য যেকোনো বাণিজ্যিক বা অনিয়মিত (Non-Scheduled) চার্টার্ড উড়োজাহাজকে নিম্নোক্ত ধাপগুলো অনুসরণ করতে হয়:

  1. আবেদনের সময়সূচি: উড্ডয়নের অন্তত ৪৮ থেকে ৭২ কর্মঘণ্টা পূর্বে CAAB-এর এয়ার ট্রান্সপোর্ট (AT) উইং বরাবর আবেদন জমা দিতে হয়।
  2. প্রসেসিং ফি: পারমিট প্রসেসিং বাবদ ২০৯ মার্কিন ডলার নন-রিফান্ডেবল সরকারি ফি প্রদান করতে হয়।
  3. অনুমতির মেয়াদ: পারমিট ইস্যুর পর তা সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত বৈধ থাকে। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ফ্লাইট অতিরিক্ত বিলম্বিত হলে পুনরায় রি-শিডিউল ফি দিয়ে অনুমোদন নিতে হয়।
  4. ফ্লাইট সাপোর্ট এজেন্ট: আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স বা প্রাইভেট জেট মালিকেরা আইনি প্রক্রিয়া ও ফি জমা দেওয়ার কাজটি সাধারণত বাংলাদেশে নিবন্ধিত অনুমোদিত ‘ফ্লাইট সাপোর্ট এজেন্ট’-এর মাধ্যমে সম্পন্ন করে থাকে।

৪. প্রাইভেট ও চার্টার্ড ফ্লাইটের স্ট্যান্ডার্ড আবেদন ফরম্যাট

বেসরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক চার্টার্ড ফ্লাইটের ক্ষেত্রে সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটিতে নিম্নোক্ত আইসিএও স্ট্যান্ডার্ড ফরম্যাটে আবেদন জমা দিতে হয়:

Standard Application Format for Overflight / Landing Clearance

To:

The Director (Air Transport & Regulation)

Civil Aviation Authority of Bangladesh (CAAB)

Headquarters, Kurmitola, Dhaka-1229, Bangladesh.

Email: ddtrans@caab.gov.bd / adathq@caab.gov.bd

AFTN: VGHQYAYR

Subject: Application for Overflight / Landing Permission for Non-Scheduled Private Charter Flight.

  1. Name of the Operator / Owner: [কোম্পানি বা মালিকের নাম]
  2. Aircraft Type & Model: [যেমন- Gulfstream G650 / Bombardier Global 6000]
  3. Nationality & Registration Marks: [রেজিস্ট্রেশন নম্বর, যেমন- N12345]
  4. Aircraft Call Sign: [এয়ার ট্রাফিক যোগাযোগের কোড]
  5. Maximum Take-Off Weight (MTOW): [কেজিতে বিমানের সর্বোচ্চ ওজন]
  6. Purpose of Flight: [যেমন- Business Trip / Medical Evacuation / Private Tourism]
  7. Complete Flight Schedule (UTC): [যেমন- Date / VMMC (Macau) to VABB (Mumbai)]
  8. ATS Routes to be Flown:
    • Entry Point & Time (UTC): [যেমন- PONTA / 04:30 UTC]
    • Exit Point & Time (UTC): [যেমন- MEKLA / 05:15 UTC]
  9. Pilot & Crew Details: [পাইলট ও ক্রুদের নাম, জাতীয়তা এবং পাসপোর্ট নম্বর]
  10. Passenger Details: [যাত্রীদের নাম, জাতীয়তা ও পাসপোর্ট নম্বর]
  11. Local Sponsor / Receiving Party: (অবতরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে অবস্থানরত কোম্পানির বিবরণ)
  12. Billing Address & Contact Info: [ইমেইল ও নেভিগেশন ফি বিলিং ঠিকানা]

আবেদনের সাথে যেসব ডকুমেন্ট সংযুক্ত করতে হয়:

  • COR (Certificate of Registration): বিমানের মূল নিবন্ধন সনদ।
  • COA (Certificate of Airworthiness): উড্ডয়ন যোগ্যতা বা ফিটনেস সনদ।
  • Insurance Certificate: বিশ্বব্যাপী বৈধ বিমান বীমাপত্র।
  • AOC (Air Operator Certificate): চার্টার্ড কোম্পানি পরিচালনার লাইসেন্স।
  • Crew Documentation: ককপিট ক্রুদের বৈধ লাইসেন্স ও পাসপোর্টের স্ক্যান কপি।

তথ্যসূত্র (References & Sources)

  1. বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (CAAB): AIP Bangladesh & Air Navigation Regulations (Overflight Permit Protocols). caab.gov.bd
  2. ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (ICAO): Manual on Air Navigation Services Economics (Doc 9161) & Overflight Charge Guidelines. icao.int
  3. থ্যালস গ্রুপ (Thales Group Press Release): Air Traffic Management (ATM) & Radar Automation System in Dhaka FIR. thalesgroup.com
  4. ডেইলি স্টার এভিয়েশন রিপোর্ট (The Daily Star): Bangladesh Earns Revenue via Airspace Navigation Fees. thedailystar.net

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ফারাক্কা বাঁধের ইতিহাস

নিউজ ডেস্ক

August 13, 2026

শেয়ার করুন

বিভাগ: পরিবেশ ও প্রকৃতি

প্রতিবেদন: আন্তর্জাতিক ও পরিবেশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ দল

প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬ | বিকেল ০৪:১৬ (বিএসটি)

বিশেষ প্রতিবেদন: আন্তর্জাতিক নদীর বহমান স্রোত কোনো নির্দিষ্ট দেশের একক সম্পদ নয়—আন্তর্জাতিক নদী আইনে এটি স্বীকৃত নীতি। তবে দীর্ঘ ৫ দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের একতরফা ফারাক্কা বাঁধের পরিচালনা বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য নদী মরুময়তা, খরা, লবণাক্ততা এবং আকস্মিক বন্যার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চলমান ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে ১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে ফারাক্কা বাঁধের সৃষ্টি, এর ক্ষতিকর প্রভাব এবং ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

১. ফারাক্কা বাঁধ কী এবং কেন এটি নির্মাণ করা হয়েছিল?

ফারাক্কা বাঁধ হলো গঙ্গা নদীর ওপর ভারত কর্তৃক নির্মিত ২,২৪০ মিটার (প্রায় ২.২৪ কিমি) দীর্ঘ একটি ব্যারেজ। এটি বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ ও মালদা জেলায় অবস্থিত। ১৯৬১ সালে কাজ শুরু হয়ে ১৯৭৫ সালে এটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়।

ভারতের ঘোষিত উদ্দেশ্য:

  • কলকাতা বন্দরের নাব্য রক্ষা: ভারতের প্রধান যুক্তি ছিল গঙ্গার শাখা নদী হুগলী-ভাগীরথীতে পলি জমে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা কমে যাচ্ছে। গঙ্গা নদী থেকে ফিডার ক্যানেলের (Feeder Canal) মাধ্যমে পানি সরিয়ে হুগলী নদীতে ফেলে পলি পরিষ্কার করা এবং সেখানে সমুদ্রগামী বড় জাহাজ ভেড়ানোর পথ সুগম করাই ছিল এর প্রধান লক্ষ্য।
  • নগরীর পানি সরবরাহ ও যোগাযোগ: কলকাতা মহানগরীর সুপেয় পানির চাহিদা পূরণ এবং উত্তর ও দক্ষিণ পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে রেল ও সড়ক যোগাযোগ সহজ করা।

২. ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশে সৃষ্ট বহুমুখী ক্ষতি

উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের পরিবেশ, অর্থনীতি ও বাস্তুতন্ত্রে যে মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো:

                                  [ ফারাক্কা বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব ]
                                                  │
         ┌────────────────────────────────────────┼────────────────────────────────────────┐
         ▼                                        ▼                                        ▼
 [ নদী ও ভৌগোলিক খরা ]                      [ সুন্দরবন ও বাস্তুতন্ত্র ]                [ কৃষি ও মৎস্য সম্পদ ]
• শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি হ্রাস ও মরুময়তা  • মিষ্টি পানি কমে সমুদ্রের লোনা পানি প্রবেশ   • ১০ লাখ হেক্টরের বেশি জমি লবণাক্ত
• বর্ষায় একযোগে গেট খুলে আকস্মিক বন্যা       • সুন্দরী গাছের 'শীর্ষ মরণ' রোগ বৃদ্ধি      • ইলিশ ও গাঙ্গেয় ডলফিনের বিনাশ

ক) মরুময়তা ও বর্ষায় কৃত্রিম বন্যা

  • শুষ্ক মৌসুমে খরা: জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে বাংলাদেশে পদ্মার পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। ফলে পদ্মা এবং এর শাখা নদীগুলো (গড়াই, মধুমতি, মাথাভাঙা) শুকিয়ে বালুচরে পরিণত হয়।
  • বর্ষায় বন্যা ও নদীভাঙন: বর্ষাকালে উজানে পানি অতিরিক্ত বেড়ে গেলে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজ্য বাঁচাতে ফারাক্কার সবগুলো গেট একসাথে খুলে দেওয়া হয়, যা বাংলাদেশে আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ নদীভাঙন তৈরি করে।

খ) সুন্দরবনের ওপর মারাত্মক আঘাত

  • লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধি: গড়াই ও মধুমতি নদীর মাধ্যমে সুন্দরবনে মিষ্টি পানির প্রবেশ কমে যাওয়ায় বঙ্গোপসাগরের লোনা পানি সুন্দরবনের গভীরে ঢুকে পড়ে।
  • সুন্দরী গাছের ‘শীর্ষ মরণ’ (Top Dying Disease): মাত্রাতিরিক্ত লোনা পানির কারণে বনের প্রধান প্রজাতি সুন্দরী গাছ ওপর থেকে শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বনের প্রায় ২৮-৩০% সুন্দরী গাছ এই রোগে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
  • বন্যপ্রাণীর পানীয় জলের সংকট: মিষ্টি পানির জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণসহ অন্যান্য প্রাণীর পানের পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।

গ) কৃষি ও মৎস্য সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি

  • আবাদি জমিতে লোনা পানি: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ লাখ হেক্টরের বেশি কৃষি জমি লোনা পানির আগ্রাসনে পড়ে অনুর্বর হয়ে পড়েছে।
  • ইলিশের পরিযায়ন পথ অবরুদ্ধ: ইলিশ মাছ ডিম ছাড়ার জন্য সাগর থেকে নদীর গভীর ও মিষ্টি পানির উজান স্রোতে উঠে আসে। ফারাক্কার কারণে পানির গভীরতা কমে মোহনায় চর জাগায় ইলিশের এই ঐতিহ্যবাহী পরিযায়ন পথ ধ্বংস হয়ে গেছে।

৩. ফারাক্কা বাঁধ ইস্যুতে ভারত কেন অনমনীয় ও আগ্রাসী অবস্থান নেয়?

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গঙ্গা পানি বণ্টন ও ফারাক্কা ইস্যুতে ভারতের অনমনীয় কৌশলের পেছনে প্রধান ৪টি ভূরাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ কাজ করে:

১. ‘আপার রিপারিয়ান’ বা উজানের দেশের সুবিধাজনক অবস্থান

ভৌগোলিক কারণে ভারত গঙ্গার উজান অঞ্চলে অবস্থিত। আন্তর্জাতিক জলনীতিতে ভারত এই ‘উজান রাষ্ট্রের অবস্থান’-কে একটি কৌশলগত ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, যাতে ভাটির দেশ বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখা যায়।

২. ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অঙ্গরাজ্যগুলোর বিরোধিতা

ফারাক্কা ইস্যুটি শুধু দুই দেশের সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নয়, ভারতের নিজস্ব রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সাথে যুক্ত:

  • বিহারের আপত্তি: বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন যে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজানে (বিহারে) গঙ্গা নদীতে অস্বাভাবিক পলি জমছে এবং প্রতি বছর রেকর্ড বন্যা হচ্ছে। তাই বিহার চায় বাঁধটি হয় ভেঙে ফেলা হোক, না হয় পানির পুনর্মূল্যায়ন করা হোক।
  • পশ্চিমবঙ্গের অনমনীয়তা: পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিজেদের কৃষি ও কলকাতা বন্দরের দোহাই দিয়ে গঙ্গার প্রবাহের একটি ফোঁটাও বাংলাদেশকে দিতে সম্মত হতে চায় না।

৩. দ্বিপাক্ষিক বনাম অববাহিকাভিত্তিক (Basin-wide) আলোচনা

গঙ্গার পানির বড় অংশ আসে নেপালের নদীগুলো থেকে। আন্তর্জাতিক নদী বিশেষজ্ঞরা বহুপাক্ষিক বা অববাহিকাভিত্তিক (বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল) চুক্তির পরামর্শ দিলেও ভারত বিষয়টি শুধুমাত্র ‘দ্বিপাক্ষিক’ আলোচনার মধ্যে আটকে রাখতে চায়, যাতে তারা দরকষাকষিতে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকে।

৪. ২০২৬ সালের চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ এড়ানোর চেষ্টা

১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গা চুক্তিতে কোনো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ (শুষ্ক মৌসুমে নদীপ্রবাহ যাই থাক না কেন বাংলাদেশকে আইনগতভাবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি দেওয়ার গ্যারান্টি) ছিল না। ২০২৬ সালের নতুন চুক্তি নবায়নে বাংলাদেশ যাতে এই গ্যারান্টি ক্লজ জোরালোভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে না পারে, সেজন্য ভারত কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখার চেষ্টা করে।

৪. সংক্ষেপে: বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান প্রেক্ষাপট

বিষয়চ্যালেঞ্জ / সমস্যাবাংলাদেশের সম্ভাব্য সমাধান
২০২৬ গঙ্গা চুক্তি নবায়ন১৯৯৬ সালের চুক্তিতে আইনি নিশ্চয়তা না থাকানতুন চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ও রিয়েল-টাইম ডিজিটাল ডেটা শেয়ারিং যুক্ত করা।
একমুখী পানির নির্ভরতাউজান থেকে পানি না পেলে নদী শুকিয়ে যাওয়ানিজস্ব ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করে বর্ষার উদ্বৃত্ত পানি সঞ্চয় রাখা।
আন্তর্জাতিক আইনি প্রয়োগদ্বিপাক্ষিক আলোচনায় কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের ‘আন্তর্জাতিক নদী ব্যবহার কনভেনশন’ অনুযায়ী বৈশ্বিক চাপ সৃষ্টি করা।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:

  1. বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB): গঙ্গা পানিপ্রবাহ ও ফারাক্কা পয়েন্টের ঐতিহাসিক সমীক্ষা ফাইল
  2. আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশন (UN 1997 Convention): আঞ্চলিক ও অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবহারের নীতিমালা
  3. বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI): উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও কৃষি বিপর্যয় সম্পর্কিত রিপোর্ট
  4. পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় (MOEFCC): সুন্দরবনের সুন্দরী গাছের টপ-ডাইং ও ইকোসিস্টেম ক্ষয়ক্ষতি সমীক্ষা

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

Google Gemini

নিউজ ডেস্ক

August 13, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদন প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬ |

বিশেষ প্রযুক্তি প্রতিনিধি প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ

ওপেনএআই (OpenAI) এবং অ্যানথ্রোপিক (Anthropic)-এর মতো নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে বিশ্বব্যাপী এআই আধিপত্যের দৌড়ে টিকে থাকতে গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট (Alphabet Inc.) তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক রদবদল সম্পন্ন করেছে। দীর্ঘমেয়াদি তত্ত্বীয় গবেষণার গণ্ডি পেরিয়ে এআই মডেলের বাণিজ্যিকীকরণ, জেমিনির বিকাশ এবং দ্রুত প্রোডাক্ট ডেলিভারি নিশ্চিত করাই এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য।

একদিকে ডিপমাইন্ডের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক পরিবর্তন ও তিন দশকের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শীর্ষ চার বিজ্ঞানীদের গুগল ত্যাগ, অন্যদিকে গুগলের ফ্ল্যাগশিপ এআই অ্যাপ ‘জেমিনি’ (Gemini)-এর ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) মাসিক ব্যবহারকারীর মাইলফলক স্পর্শ—সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের আগস্টে বৈশ্বিক প্রযুক্তি বিশ্বে এক বিশাল আলোড়ন তৈরি হয়েছে।

১. শীর্ষ নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন: বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্টে ক্ষমতা স্থানান্তর

অ্যালফাবেটের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই গত ৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে এক ঘোষণায় ডিপমাইন্ড এবং জেমিনি ডেভেলপমেন্টের নতুন নেতৃত্ব কাঠামো প্রকাশ করেন:

  • ডেমিস হাসাবিস (Demis Hassabis): নোবেলজয়ী এই খ্যাতনামা বিজ্ঞানী গুগল ডিপমাইন্ডের সিইও পদ এবং দৈনন্দিন প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তাঁকে ডিপমাইন্ডের চেয়ারপারসন এবং অ্যালফাবেটের ‘চিফ সায়েন্টিস্ট’ হিসেবে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে তিনি মূলত দীর্ঘমেয়াদি ফ্রন্টিয়ার এআই এবং এজিআই (AGI) স্ট্র্যাটেজি নিয়ে কাজ করবেন।
  • কোরাই কাভুকচুওগ্লু (Koray Kavukcuoglu): ডিপমাইন্ডের সাবেক প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা এবং বাণিজ্যিকীকরণে সফল কাভুকচুওগ্লুকে ডিপমাইন্ডের নতুন সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (SVP) করা হয়েছে। জেমিনি মডেল ডেভেলপমেন্ট ও এআই অ্যাপের সমস্ত নির্বাহী ক্ষমতা এখন তাঁর হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে।
  • সহ-প্রতিষ্ঠাতা সার্গেই ব্রিনের উপস্থিতি: গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সার্গেই ব্রিন সক্রিয়ভাবে ডেভেলপমেন্ট টিমের পাশে বসে সরাসরি নজরদারি বাড়িয়েছেন এবং জেমিনি মডেলের দ্রুত আপডেটে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

২. জেফ ডিনের গুগল ত্যাগ এবং নতুন স্টার্টআপ ‘ডিসকভারি লুপ’

গুগলের প্রায় ২৭ বছরের পুরনো মূল প্রযুক্তি কাঠামোর প্রধান স্থপতি ও চিফ সায়েন্টিস্ট জেফ ডিন (Jeff Dean)-এর আকস্মিক বিদায় পুরো টেক বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। ডিনের সাথে একযোগে গুগল ছেড়েছেন সিনিয়র ফেলো সঞ্জয় ঘেমাওয়াত, ভিপি ওরিওল ভিনিয়ালস এবং কোয়াক লে।

                    [ চার শীর্ষ বিজ্ঞানীদের গুগল ত্যাগ ] 
                                     │
                                     ▼
                [ নতুন স্টার্টআপ: 'Discovery Loop' (PBC) ]
                                     │
           ┌─────────────────────────┴─────────────────────────┐
           ▼                                                   ▼
[ উদ্দেশ্য: বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে এআই-এর প্রয়োগ ]     [ অ্যালফাবেট: প্রতিষ্ঠাতা বিনিয়োগকারী ও ক্লাউড পার্টনার ]

কেন এই বিদায়?

গুগল যখন চ্যাটবটের বাণিজ্যিকীকরণ এবং রাজস্ব বাড়ানোর ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছিল, তখন এই বিজ্ঞানীরা এআই-এর মাধ্যমে মেডিসিন, সায়েন্স এবং ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষণার কাজে পূর্ণ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা করছিলেন। তারা সবাই মিলে গঠন করেছেন পাবলিক বেনিফিট কর্পোরেশন ‘ডিসকভারি লুপ’ (Discovery Loop)

তবে এই বিচ্ছেদ কোনো দ্বন্দ্ব থেকে হয়নি। অ্যালফাবেট নিজেই এই নতুন স্টার্টআপের অন্যতম প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে যুক্ত হয়েছে এবং গুগল ক্লাউড কম্পিউটিং সাপোর্ট দেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সম্পাদন করেছে।

৩. বিশ্বরেকর্ড: জেমিনির ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) সক্রিয় ব্যবহারকারী

অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত রদবদলের মধ্যেই ১১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সুন্দর পিচাই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন যে, গুগল জেমিনি অ্যাপ ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর (MAU) বিশ্বরেকর্ড অতিক্রম করেছে। এটি গুগলের ইতিহাসে দ্রুততম সময়ে বৃদ্ধি পাওয়া এবং জিমেইল, ইউটিউব বা অ্যানড্রয়েডের পর ১৪তম বিলিয়ন-ইউজার প্রোডাক্ট।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের এক নজরে:

  • আইওএস (iOS) ব্যাকবোন: অ্যান্ড্রয়েড ইকোসিস্টেমের বাইরে কেবল অ্যাপল (iOS) ডিভাইসেই জেমিনির ব্যবহারকারী ১০ কোটির বেশি।
  • গুগল সার্চ ও এআই ওভারভিউ: গুগলের ‘AI Overviews’ ফিচারের মাধ্যমে প্রতি মাসে বিশ্বের প্রায় ২৫০ কোটিরও বেশি মানুষ পরোক্ষভাবে জেমিনির এআই সুবিধা পাচ্ছেন।
  • বাণিজ্যিক সফলতা: বিশ্বের ২,৮০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানে জেমিনি এন্টারপ্রাইজের ৮০ লাখের বেশি পেইড সিট বিক্রি হয়েছে।

৪. ব্যবহারকারীরা যেভাবে জেমিনি ব্যবহার করছেন

গুগল কিওয়ার্ড ব্লগে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুসারে ব্যবহারকারীদের অভ্যাসে বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে:

  1. ভয়েস কমান্ডের প্রাধান্য: প্রায় ৬৩% ব্যবহারকারী এখন সরাসরি টাইপ না করে জেমিনি লাইভের মাধ্যমে কথা বলে কাজ সারছেন।
  2. ইমেজ জেনারেশন: জেমিনি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিশ্বে প্রতিদিন ১৫ কোটিরও বেশি ছবি তৈরি হচ্ছে।
  3. লাইভ ক্যামেরা সমাধান: প্রতি ৫টি ইন্টারঅ্যাকশনের ১টিতে ব্যবহারকারীরা সরাসরি মোবাইল ক্যামেরা বা স্ক্রিন শেয়ার করে বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান খুঁজছেন।

সংগৃহীত তথ্যসূত্র ও সাইটেশন তালিকা:

  • **** অ্যালফাবেট ইনকর্পোরেটেড অফিসিয়াল প্রেস রিলিজ ও ডিপমাইন্ড লিডারশিপ স্টেটমেন্ট (প্রকাশিত: ৫ আগস্ট ২০২৬)
  • **** দ্য ভার্জ ও টেকক্রাঞ্চ রিপোর্ট: জেফ ডিন ও সিনিয়র ফেলোদের নতুন এআই ইনিশিয়েটিভ ‘ডিসকভারি লুপ’ (প্রকাশিত: ৯ আগস্ট ২০২৬)
  • **** গুগল কিওয়ার্ড ব্লগ ও সিইও সুন্দর পিচাইয়ের বিবৃতি: জেমিনি অ্যাপ ১ বিলিয়ন ব্যবহারকারীর মাইলফলক (প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০২৬)

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

কাজী নজরুল

নিউজ ডেস্ক

August 12, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাক

“বিদ্রোহী” কিংবা “সাম্যবাদী” পরিচয়ের বাইরে কাজী নজরুল ইসলামের জীবন এতটাই বর্ণিল ও বৈচিত্র্যময় যে, সাধারণ কোনো ফ্রেমে তাঁকে বন্দি করা অসম্ভব। আমরা তাঁকে চিনি আমাদের ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে, অনুধাবন করি তাঁর অগ্নিঝরা কবিতার শক্তি। কিন্তু পর্দার নেপথ্যে নারদমুনির বেশে তাঁর দুর্দান্ত অভিনয়, ফুটবল মাঠে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের হয়ে উল্লাস কিংবা সপ্তাহের নির্দিষ্ট একদিনের নীরব মৌনব্রতের কথা কজনই বা জানেন?

ইতিহাসের পাতা ও নজরুল গবেষকদের অনুসন্ধানে বিদ্রোহী কবির জীবনের এমন কিছু চাঞ্চল্যকর ও চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে, যা সাধারণ পাঠকের চোখের আড়ালেই রয়ে গেছে।

১. আইনি জটিলতার অবসান: এখন তিনি দাপ্তরিকভাবেও ‘জাতীয় কবি’

দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে গণমানুষের হৃদয়ে ও পাঠ্যপুস্তকে ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে পরিচিত থাকলেও দীর্ঘকাল ধরে কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি প্রজ্ঞাপন বা গেজেট ছিল না। অবশেষে ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি ঐতিহাসিক গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলামকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

উক্ত গেজেটে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭২ সালের ২৪ মে (কবির সপরিবারে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশে আগমনের দিন) থেকেই এই রাষ্ট্রীয় মর্যাদাটি ভূতাপেক্ষভাবে (Retroactively) কার্যকর হবে। এর মাধ্যমে নজরুলের জাতীয় কবির খেতাব সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের দাপ্তরিক অস্পষ্টতার চিরসংগ্রাম শেষ হয়।

২. রূপালি পর্দায় অল-রাউন্ডার নজরুল: পরিচালক, অভিনেতা ও ‘সুর ভাণ্ডারি’

১৯৩১ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত কলকাতার চলচ্চিত্রে নজরুল একাধারে সফল অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার এবং সংগীত পরিচালক হিসেবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন:

                  [ নজরুল: টকি সিনেমার স্বর্ণযুগ (১৯৩১-১৯৪২) ]
                                       │
     ┌─────────────────────────────────┼─────────────────────────────────┐
     ▼                                 ▼                                 ▼
 [ অভিনয় ]                        [ পরিচালনা ]                      [ সংগীত ]
• 'ধ্রুব' (১৯৩৪): নারদ চরিত্র     • সত্যেন্দ্রনাথের সাথে যৌথভাবে     • 'জামাই ষষ্ঠী'-তে সুর ভাণ্ডারি
• 'পাতালপুরী': খনি শ্রমিক           'ধ্রুব' চলচ্চিত্র পরিচালনা      • 'গোরা', 'বিদ্যাপতি', 'সাপুড়ে'
• 'হাল বাংলা': রসাত্মক চরিত্র    • 'বেঙ্গল টাইগার পিকচার্স'-এর প্রধান     ছবিতে বিখ্যাত কালজয়ী সুর
  • দেবর্ষি নারদ চরিত্রে আত্মপ্রকাশ: ১৯৩৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রে নজরুল স্বয়ং ‘নারদ’ চরিত্রে অভিনয় করেন। কেবল অভিনয়ই নয়, এই ছবির ১৮টির মধ্যে ১৭টি গান তাঁর লেখা ছিল এবং তিনি নিজে ৪টি গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন।
  • সুর ভাণ্ডারি: ১৯৩১ সালে নির্মিত প্রথম বাংলা সবাক ছবি ‘জামাই ষষ্ঠী’-তে সুরকার ও গায়কদের উচ্চারণ শুধরে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করায় তাঁকে সেসময় চলচ্চিত্র পাড়ায় ‘সুর ভাণ্ডারি’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ‘গোরা’ (১৯৩৮) সিনেমার সংগীতেও তাঁর সুরের জাদুকরী ছোঁয়া ছিল।

৩. লাল-হলুদ ব্রিগেডের ইস্টবেঙ্গল সমর্থক

আজকের ফুটবল উন্মাদনার বহু আগেই কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ‘ইস্টবেঙ্গল ক্লাব’-এর অন্ধ ভক্ত। মাঠে গিয়ে খেলা দেখার পাশাপাশি ১৯৩৪ সালে ইস্টবেঙ্গল দল যখন আইএফএ শিল্ডের ফাইনালে ওঠে, তখন প্রিয় ক্লাবের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের উৎসাহ দিতে তিনি একটি উদ্দীপনামূলক গানও রচনা করেছিলেন।

৪. সুস্থ অবস্থাতেও বৃহস্পতিবারের ‘মৌনব্রত’

জীবনের শেষ ৩৪টি বছর নজরুল ‘পিকস ডিজিজ’ (Pick’s Disease) নামের স্নায়বিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে নির্বাক কাটিয়েছেন। তবে প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী মোস্তফা জামান আব্বাসী ও কবি পরিবারের স্মৃতি থেকে জানা যায়—নজরুল যখন শতভাগ সুস্থ ও চঞ্চল ছিলেন, তখনও তিনি আধ্যাত্মিক চর্চার অংশ হিসেবে সপ্তাহে একদিন (বৃহস্পতিবার) সম্পূর্ণ নীরব বা মৌনব্রত পালন করতেন। এই দিনটিতে তিনি কারো সাথে কথা বলতেন না।

৫. আসানসোলের রুটির দোকান থেকে ময়মনসিংহের স্কুল

আমাদের জাতীয় কবির প্রতিভা বিকাশের নেপথ্যে অন্যতম অবদান ছিল এক পুলিশ অফিসারের। আসানসোলের রুটির দোকানে কাজ করা কিশোর নজরুলের অসাধারণ মেধা লক্ষ্য করে দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন তাঁকে নিজ দায়িত্বে ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে এনে ভর্তি করিয়ে দেন।

পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে নজরুল ‘৪৯তম বাঙালি ব্যাটালিয়ন’-এর সৈনিক হিসেবে করাচি সেনানিবাসে যোগ দেন এবং পদোন্নতি পেয়ে ‘হাবিলেদার’ পদে উন্নীত হন।

৬. রবীন্দ্রনাথের সেই ঐতিহাসিক অনশন ভাঙার বার্তা

১৯২৩ সালে রাজনৈতিক কারণে হুগলি জেলে বন্দী থাকাকালীন ব্রিটিশদের অন্যায়ের প্রতিবাদে নজরুল টানা ৩৯ দিন আমরণ অনশন করেন। কবির সংকটাপন্ন অবস্থা দেখে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলং থেকে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন:

“GIVE UP HUNGER STRIKE. OUR LITERATURE CLAIMS YOU.”

ব্রিটিশ জেল কর্তৃপক্ষ চরম হীনম্মন্যতার পরিচয় দিয়ে টেলিগ্রামটির গায়ে “Addressee not found” লিখে ফেরত পাঠায়। পরবর্তীতে মাতৃসম বিরজাসুন্দরী দেবী জেলে গিয়ে লেবুর রস খাইয়ে কবির অনশন ভাঙান।

৭. অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক

১৯২৮ সালে রচিত তাঁর ‘চল চল চল’ গানটি স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীর অফিশিয়াল রণসঙ্গীত (National Marching Song) হিসেবে সংরক্ষিত। তিনি একদিকে যেমন লিখেছিলেন ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’, তেমনি অন্য হাতে সৃষ্টি করেছিলেন ৫০০-র বেশি কালজয়ী ‘শ্যামাসঙ্গীত’ ও ভজন। অসাম্প্রদায়িক চেতনার লালন করতেই তিনি নিজের সন্তানদের নাম রেখেছিলেন দুই ধর্মের সংস্কৃতির সমন্বয়ে—’কাজী কৃষ্ণ মোহাম্মদ’ এবং ‘কাজী অনিরুদ্ধ’।

সংগৃহীত তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:

  1. সরকারি প্রজ্ঞাপন দাপ্তরিক কপি: সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় গেজেট (২৪ ডিসেম্বর ২০২৪)
  2. জাতীয় আর্কাইভ ও নজরুল ইনস্টিটিউট: কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্য কর্মসংকলন
  3. চলচ্চিত্র ইতিহাস গ্রন্থ: বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিবৃত্ত ও কাজী নজরুল ইসলাম (বাংলা একাডেমি প্রকাশনা)
  4. স্মৃতিগ্রন্থ: মোস্তফা জামান আব্বাসী লিখিত নজরুলের স্মৃতিকথা

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২৯শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ