অর্থনীতি

আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন: এশিয়া মহাদেশের ৪৯টি দেশের রাজধানী ও পূর্ণাঙ্গ পরিচিতি
এশিয়ার ৪৯টি দেশের রাজধানী

নিউজ ডেস্ক

July 26, 2026

শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক ভূগোল ও ভূ-রাজনীতি ডেস্ক: পৃথিবীর বৃহত্তম ও সবচেয়ে জনবহুল মহাদেশ এশিয়া। আয়তন, জনসংখ্যা, প্রাচীন সভ্যতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক আধিপত্য—সব দিক থেকেই এশিয়া বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র। সাধারণ জ্ঞান অনুরাগী, বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পরীক্ষার্থী, শিক্ষার্থী ও পর্যটকদের সুবিধার্থে এশিয়া মহাদেশের ৪৯টি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানীগুলোর প্রশাসনিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা হলো।এশিয়া মহাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানা, AI generated

এশিয়া মহাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানা. Source: PeterHermesFurian / Getty Images

১. দক্ষিণ এশিয়া (South Asia)

১. বাংলাদেশ — রাজধানী: ঢাকা

বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ঢাকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। প্রায় চারশত বছর পূর্বে ১৬০৮ সালে মোগল সুবাদার ইসলাম খান প্রথম ঢাকাকে বাংলার রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। মোগল আমল থেকে আজ অব্দি এটি তৈরি পোশাক শিল্প, বাণিজ্য এবং সমৃদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

২. ভারত — রাজধানী: নতুন দিল্লি

১৯১১ সালে ব্রিটিশ আমলে কলকাতা থেকে রাজধানী স্থানান্তর করে নতুন দিল্লির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এটি ভারতের বিচারবিভাগ, শাসনবিভাগ এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু। ঐতিহাসিক প্রাচীন দিল্লি এবং আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামোর নতুন দিল্লি মিলে এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মেট্রোপলিটন এলাকা।

৩. পাকিস্তান — রাজধানী: ইসলামাবাদ

১৯৬০-এর দশকে একটি সুপরিকল্পিত শহর হিসেবে ইসলামাবাদকে পাকিস্তানের নতুন রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হয়; এর পূর্বে করাচি ও রাওয়ালপিন্ডি সাময়িক রাজধানী ছিল। মারগাল্লা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই শহরটি পাকিস্তানের সামরিক ও প্রশাসনিক হেডকোয়ার্টার।

৪. আফগানিস্তান — রাজধানী: কাবুল

হিন্দুখুশ পর্বতমালার সংকীর্ণ উপত্যকায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৮০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত কাবুল দেশটির বৃহত্তম শহর। প্রাচীন রেশম পথের ওপর অবস্থিত এই ঐতিহাসিক শহরটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সত্ত্বে়ও আফগান রাজনীতি ও বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র।

৫. নেপাল — রাজধানী: কাঠমান্ডু

হিমালয়ের কোলে অবস্থিত কাঠমান্ডু নেপালের ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক হাব। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সমৃদ্ধ এই শহরটি কাঠমান্ডু উপত্যকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এবং বিশ্বজুড়ে এভারেস্টগামী পর্বত আরোহীদের প্রধান প্রবেশদ্বার।

৬. ভুটান — রাজধানী: থিম্পু

হিমালয়ের পশ্চিমাঞ্চলের পর্বতে অবস্থিত থিম্পু বিশ্বের একমাত্র ট্রাফিক লাইট-বিহীন রাজধানী শহর। ঐতিহ্যবাহী ভুটানি স্থাপত্যশৈলী এবং তিব্বতি বৌদ্ধ সংস্কৃতির স্পর্শে লালিত এই শহরটি ভুটানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রধান কার্যালয়।

৭. শ্রীলঙ্কা — রাজধানী: শ্রী জয়বর্ধনেপুরা কোট্টে (প্রশাসনিক) / কলম্বো (বাণিজ্যিক)

কলম্বোর একটি উপশহর কোট্টে শ্রীলঙ্কার মূল প্রশাসনিক ও আইনসভা রাজধানী, যেখানে দেশটির জাতীয় সংসদ অবস্থিত। তবে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কার্যাবলীর মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে এখনও কলম্বো শহরই কাজ করে।

৮. মালদ্বীপ — রাজধানী: মালে

ভারত মহাসাগরের প্রবাল প্রাচীর বা অ্যাটলে অবস্থিত মালে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দ্বীপ শহর। মালদ্বীপের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে সাথে দেশটির আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্পের প্রবেশদ্বার হিসেবে মালে কাজ করে।

২. পূর্ব এশিয়া (East Asia)

৯. চীন — রাজধানী: বেইজিং

তিন হাজার বছরেরও বেশি পুরনো ইতিহাসের শহর বেইজিং বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র। মহাপ্রাচীর (Great Wall) ও নিষিদ্ধ নগরী (Forbidden City)-র মতো ঐতিহাসিক ঐতিহ্যে ঘেরা এই শহরটি চীনের কমিউনিস্ট সরকার ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল হাব।

১০. জাপান — রাজধানী: টোকিও

টোকিও বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে অন্যতম শীর্ষ শহর। পূর্বের ছোট মাছ ধরার গ্রাম ‘এদো’ ১৮৬৮ সালে জাপানের রাজধানী হিসেবে পুনর্নামকরণ লাভ করে টোকিও নাম ধারণ করে। এটি উচ্চপ্রযুক্তি, ফ্যাশন ও আধুনিক শিল্পের আন্তর্জাতিক হাব।

১১. উত্তর কোরিয়া — রাজধানী: পিয়ংইয়ং

কোরীয় উপদ্বীপের অন্যতম প্রাচীন শহর পিয়ংইয়ং উত্তর কোরিয়ার একক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সামাজিক অবকাঠামো ও সামরিক প্রদর্শনী কেন্দ্র। তায়েদং নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।

১২. দক্ষিণ কোরিয়া — রাজধানী: সিউল

হান নদীর তীরে অবস্থিত সিউল দক্ষিণ কোরিয়ার আধুনিক বিশ্বমানের শহর, যা সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কে-পপ সংস্কৃতি এবং তথ্যপ্রযুক্তির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতি লাভ করেছে। ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদ এবং আকাশচুম্বী অট্টালিকার অপূর্ব মিশ্রণ এই সিউল।

১৩. মঙ্গোলিয়া — রাজধানী: উলানবাটোর

তুউল নদী উপত্যকায় অবস্থিত উলানবাটোর মঙ্গোলিয়ার বৃহত্তম শহর এবং বিশ্বের সবচেয়ে শীতলতম রাজধানী। যাযাবর মোঙ্গল ঐতিহ্য ও আধুনিক নগরজীবনের এক মেলবন্ধন ঘটেছে এই ঐতিহাসিক শহরে।

১৪. তাইওয়ান — রাজধানী: তাইপে

তাইওয়ানের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত তাইপে বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বৈশ্বিক কেন্দ্র। ‘তাইপে ১০১’ স্কাইস্ক্র্যাপারের জন্য বিখ্যাত এই শহরটি পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাব।

৩. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (Southeast Asia)

১৫. ভিয়েতনাম — রাজধানী: হ্যানয়

রেড রিভারের তীরে অবস্থিত হ্যানয় হাজার বছরেরও বেশি সময়ের সমৃদ্ধ ইতিহাসের শহর। ফরাসি স্থাপত্যশৈলী, ঐতিহ্যবাহী চীনা প্রভাব এবং আধুনিক ভিয়েতনামী অর্থনীতির মেলবন্ধনে তৈরি এই শহরটি ভিয়েতনামের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রধান বিন্দু।

১৬. থাইল্যান্ড — রাজধানী: ব্যাংকক

স্থানীয়ভাবে ‘ক্রুং থেক’ নামে পরিচিত ব্যাংকক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান বাণিজ্য, অর্থনীতি ও পর্যটনকেন্দ্র। চাও ফ্রায়া নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটি বৌদ্ধ মন্দির, আধুনিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র এবং বর্ণিল নাইটলাইফের জন্য বিখ্যাত।

১৭. মিয়ানমার — রাজধানী: নেপিডো

২০০৫ সালে মিয়ানমারের সামরিক সরকার সুপরিকল্পিতভাবে ইয়াঙ্গুন থেকে প্রায় ৩২০ কিলোমিটার উত্তরে নেপিডো শহরে রাজধানী স্থানান্তর করে। সুবিশাল রাজপথ, সামরিক কমপ্লেক্স এবং প্রশাসনিক ভবনে ঘেরা এই শহরটি অত্যন্ত সুসংগঠিত।

১৮. ইন্দোনেশিয়া — রাজধানী: নুসানতারা (নতুন পরিকল্পিত) / জাকার্তা (সাবেক)

দীর্ঘদিন ধরে জাভা দ্বীপের জাকার্তা ইন্দোনেশিয়ার রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হলেও ভূ-প্রাকৃতিক ঝুঁকি এবং অতিরিক্ত ঘনবসতির কারণে দেশটির সরকার বোর্নিও দ্বীপে ‘নুসানতারা’ নামে একটি আধুনিক সুপরিকল্পিত পরিবেশবান্ধব রাজধানী গড়ে তোলার কার্যক্রম সম্পন্ন করছে।

১৯. মালয়েশিয়া — রাজধানী: কুয়ালালামপুর (প্রশাসনিক সেন্টার: পুত্রজায়া)

পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের শহর কুয়ালালামপুর মালয়েশিয়ার রাজকীয়, বাণিজ্যিক ও আর্থিক রাজধানী। তবে শহরটির ক্রমবর্ধমান যানজট কমাতে নব্বইয়ের দশকে নিকটবর্তী পুত্রজায়াতে সরকারের প্রশাসনিক ভবন ও দপ্তরগুলো স্থানান্তরিত করা হয়।

২০. সিঙ্গাপুর — রাজধানী: সিঙ্গাপুর সিটি

দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের মূল রাজধানী এর একমাত্র প্রধান শহর সিঙ্গাপুর সিটি। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর, প্রধান আর্থিক লেনদেন কেন্দ্র এবং উচ্চমানের জীবনযাত্রার সূচকের শহর হিসেবে এটি স্বীকৃত।

২১. ফিলিপাইন — রাজধানী: ম্যানিলা

ম্যানিলা উপসাগরের তীরে অবস্থিত ম্যানিলা ফিলিপাইনের রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র। ফরাসি ও স্পেনীয় উপনিবেশিক স্থাপত্য ঐতিহ্যের মিশ্রণে গড়ে ওঠা এই শহরটি অন্যতম ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক বন্দর।

২২. কম্বোডিয়া — রাজধানী: নমপেন

মেকং, বাসাক ও টনলে সাপ নদীর সংযোগস্থলে অবস্থিত নমপেন শহরটি ‘এশিয়ার মুক্তা’ নামে পরিচিত ছিল। খমের স্থাপত্যশৈলী ও ফরাসি উপনিবেশের সুবাতাস লেগে থাকা এই শহরটি কম্বোডিয়ার রাজনীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রাণকেন্দ্র।

২৩. লাওস — রাজধানী: ভিয়েনতিয়েন

মেকং নদীর তীরে থাইল্যান্ড সীমান্তের কাছে অবস্থিত ভিয়েনতিয়েন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে শান্ত পরিবেশের একটি রাজধানী। ফরাসি উপনিবেশের প্রভাব ও বৌদ্ধ ধর্মীয় মনুমেন্ট দিয়ে সাজানো এই শহরটি দেশটির প্রশাসন পরিচালনা করে।

২৪. ব্রুনাই — রাজধানী: বন্দর সেড়ি বেগাওয়ান

ব্রুনাই নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটি খনিজ তেল ও গ্যাসে সমৃদ্ধ সম্পদশালী রাষ্ট্র ব্রুনাইয়ের সুলতানের রাজকীয় কেন্দ্র। বর্ণিল মসজিদ ও জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ সংবলিত এই শহরটি শান্ত জীবনযাত্রার জন্য খ্যাত।

২৫. পূর্ব তিমুর — রাজধানী: দিলি

তিমুর সাগরের উপকূলে स्थित দিলি ২০০২ সালে স্বাধীন হওয়া নতুন রাষ্ট্র পূর্ব তিমুরের প্রধান বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। পর্তুগিজ উপনিবেশিক ঐতিহ্য ও স্থানীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সংমিশ্রণ ঘটেছে এই উপকূলীয় শহরে।

৪. পশ্চিম এশিয়া / মধ্যপ্রাচ্য (West Asia / Middle East)

২৬. সৌদি আরব — রাজধানী: রিয়াদ

আরব উপদ্বীপের মালভূমি মরুভূমিতে অবস্থিত রিয়াদ আজ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও অবকাঠামোগত শহর। সৌদি আরবের রাজনৈতিক কার্যালয়, রাজপ্রাসাদ এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান আর্থিক কর্পোরেশনের মূল কেন্দ্র এই শহর।

২৭. সংযুক্ত আরব আমিরাত — রাজধানী: আবুধাবি

পারস্য উপসাগরের একটি দ্বীপে অবস্থিত আবুধাবি আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, ব্যবসা এবং জ্বালানি তেলের ব্যবসার মূল কেন্দ্র। দুবাই পর্যটনের জন্য খ্যাত হলেও আমিরাতের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত আবুধাবি থেকেই গৃহীত হয়।

২৮. কাতার — রাজধানী: দোহা

পারস্য উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত দোহা বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল আধুনিক শহর। প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবসায় সমৃদ্ধ কাতার আন্তর্জাতিক কূটনীতি, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা (যেমন ২০২২ বিশ্বকাপ) এবং চ্যানেল আল জাজিরার হেডকোয়ার্টার হিসেবে দোহাকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

২৯. কুয়েত — রাজধানী: কুয়েত সিটি

পারস্য উপসাগরের শীর্ষ শহর কুয়েত সিটি দেশটির খনিজ তেলনির্ভর অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রধান কার্যালয়। এখানকার কুয়েত টাওয়ার্স এবং বিশাল ব্যাংক অবকাঠামো দেশটির বাণিজ্যিক শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে।

৩০. বাহরাইন — রাজধানী: মানামা

পারস্য উপসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইনের মানামা মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র। ইসলামপূর্ব আমল থেকেই কৌশলগত সমুদ্রপথের অংশ হিসেবে এটি পরিচালিত হয়ে আসছে।

৩১. ওমান — রাজধানী: মাস্কাট

ওমান উপসাগর এবং পাথুরে আল হাজার পর্বতমালার মাঝে অবস্থিত মাস্কাট এক ঐতিহাসিক বন্দর নগরী। অন্যান্য আরব শহরের মতো অতিরিক্ত উঁচুদালান না বানিয়ে ঐতিহ্যবাহী আরব স্থাপত্যকলাকে ধরে রেখে শহরটিকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে।

৩২. ইয়েমেন — রাজধানী: সানা

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,২০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত সানা বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ধারাবাহিক জনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর অন্যতম। এর অনন্য স্থাপত্যশৈলীর মাল্টি-স্টোরি কাদামাটির ভবনগুলোর জন্য শহরটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে ঘোষিত।

৩৩. ইরান — রাজধানী: তেহরান

আলবোর্জ পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত তেহরান ইরানের অর্থনৈতিক, শিল্প ও রাজনৈতিক হাব। পারস্য ঐতিহ্যের শহর এটি, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি এবং শতবর্ষী সংস্কৃতির এক অনন্য সহাবস্থান দেখা যায়।

৩৪. ইরাক — রাজধানী: বাগদাদ

টাইগ্রিস নদীর তীরে অবস্থিত বাগদাদ ইসলামিক স্বর্ণযুগ (Islamic Golden Age)-এর সময় বিশ্বের সবচেয়ে প্রধান জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা পার করে শহরটি বর্তমানে তার প্রাচীন ঐতিহ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

৩৫. সিরিয়া — রাজধানী: দামেস্ক

বিশ্বের প্রাচীনতম অবিচ্ছিন্ন জনবসতিপূর্ণ শহর দামেস্ক। প্রাচ্যের প্রাচীন রেশম পথ ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ঐতিহাসিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে রয়েছে।

৩৬. লেবানন — রাজধানী: বৈরুত

ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত বৈরুত দীর্ঘদিন ‘মধ্যপ্রাচ্যের প্যারিস’ নামে খ্যাত ছিল। ফরাসি সাংস্কৃতিক প্রভাব, ব্যাংকিং খাত এবং ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের জন্য শহরটির বৈশ্বিক খ্যাতি রয়েছে।

৩৭. জর্ডান — রাজধানী: আম্মান

সাতটি পাহাড়ের ওপর মূল ভিত্তি গড়ে ওঠা আম্মান বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন শহর। এটি জর্ডানের রাজনৈতিক হাব এবং মধ্যপ্রাচ্যের একটি নিরাপদ ও গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র।

৩৮. ইসরায়েল — রাজধানী: জেরুজালেম

জেরুজালেম বিশ্বের তিনটি প্রধান একেশ্বরবাদী ধর্ম—ইসলাম, খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের পবিত্রতম স্থান। তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও এটি দেশটির প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।

৩৯. তুরস্ক — রাজধানী: আঙ্কারা

১৯২৩ সালে মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক ঐতিহ্যবাহী ইস্তাম্বুল থেকে রাজধানী সরিয়ে মধ্য এনাতোলিয়ার আঙ্কারায় রূপান্তর করেন। আঙ্কারা তুরস্কের রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা ও সামরিক সিদ্ধান্তের প্রাণকেন্দ্র।

৪০. সাইপ্রাস — রাজধানী: নিকোশিয়া

নিকোশিয়া বিশ্বের একমাত্র বিভক্ত রাজধানী, যা গ্রিক সাইপ্রাস ও তুর্কি সাইপ্রাস—দুই অংশের মাঝে গ্রিন লাইন দিয়ে বিভক্ত। এটি ইউরেশিয়ান দ্বীপটির রাজনীতি ও শিক্ষার কেন্দ্র।

৪১. আর্মেনিয়া — রাজধানী: ইয়েরেভান

হাজার হাজার বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ইয়েরেভানকে ‘পিঙ্ক সিটি’ বলা হয়, কারণ এখানকার বেশিরভাগ ভবনের নির্মাণকাজে গোলাপী রঙের আগ্নেয়গিরির পাথর ব্যবহৃত হয়েছে। আরারাত পর্বতের ছায়াতলে এটি আর্মেনিয়ার প্রাণকেন্দ্র।

৪২. আজারবাইজান — রাজধানী: বাকু

কাস্পিয়ান সাগরের উপকূলে অবস্থিত বাকু ‘বাতাসের শহর’ নামে পরিচিত। তেল সমৃদ্ধ অর্থনীতি, ‘ফ্লেম টাওয়ার্স’ এবং প্রাচীন সুরক্ষিত আইচেরি শেহেরের (Inner City) জন্য এটি ককশাস অঞ্চলের প্রধান আন্তর্জাতিক কেন্দ্র।

৪৩. জর্জিয়া — রাজধানী: তিবিলিসি

কুরা (এমটকভারি) নদীর উপত্যকায় অবস্থিত তিবিলিসি ইউরোপ ও এশিয়ার মিলনস্থলে তৈরি এক প্রাচীন ঐতিহাসিক শহর। সালফার বাথ, পাথুরে দুর্গ এবং ইউরেশীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেছে এই ভূখণ্ডে।

৫. মধ্য এশিয়া (Central Asia)

৪৪. কাজাখস্তান — রাজধানী: আস্তানা

ইশিম নদীর তীরে অবস্থিত আস্তানা (যা পূর্বে নুর-সুলতান নামেও পরিচিত ছিল) আধুনিক ফিউচারিস্টিক স্থাপত্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। বিশাল প্রান্তরে অবস্থিত এই শহরটি সেন্ট্রাল এশিয়ার অর্থনৈতিক কেন্দ্র।

৪৫. উজবেকিস্তান — রাজধানী: তাসখন্দ

ভূমিকম্প ও সোভিয়েত পুনর্নির্মাণের পর তৈরি তাসখন্দ মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে জনবহুল শহর। রেশম পথের সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং সুসংগঠিত মেট্রো ব্যবস্থার জন্য এটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

৪৬. তাজিকিস্তান — রাজধানী: দুশানবে

তাজিক ভাষার ‘দুশানবে’ শব্দের অর্থ সোমবার। প্রাচীনকালে সোমবারে বসা বড় বাজারের নাম থেকে শহরটির নামকরণ হয়। পামির পর্বতমালার কোলঘেঁষে থাকা এই শহরটি দেশটির প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্র।

৪৭. কিরগিজস্তান — রাজধানী: বিশকেক

তিয়েন শান পর্বতমালার ঠিক উত্তর দিকে চুই উপত্যকায় অবস্থিত বিশকেক সোভিয়েত ধাঁচের চওড়া রাস্তা, সুবিশাল পার্ক এবং পর্বত বেষ্টিত এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের শহর।

৪৮. তুর্কমেনিস্তান — রাজধানী: আশগাবাত

কোপেত দাগ পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত আশগাবাত সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি ভবনের ঘনত্বের জন্য গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের অন্তর্ভুক্ত। প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ এই দেশের রাজধানী শহরটি অত্যাধুনিক ও সংরক্ষিত।

৬. উত্তর এশিয়া (North Asia)

৪৯. রাশিয়া — রাজধানী: মস্কো

ইউরেশীয় পরাশক্তি রাশিয়ার রাজধানী মস্কো ইউরো-এশিয়ান রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সামরিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু। ক্রেমলিন, রেড স্কয়ার এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্যের নিদর্শন সমৃদ্ধ এই শহরটি এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যবর্তী সেতু হিসেবে কাজ করে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আধুনিক ও জটিল সমাজে মানসিক শান্তি ও সঠিক পথের সন্ধানে নবী-রাসূলদের আদর্শের গুরুত্ব অপরিসীম। জেনে নিন নবী রাসূলদের জীবনী থেকে শিক্ষা

নিউজ ডেস্ক

November 6, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৬ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইসলাম ও জীবন
তথ্যসূত্র: আল-কোরআনের তাফসির (তাফসির ইবনে কাসির), সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিস এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত নবী-রাসূলদের জীবনী গ্রন্থ। 

বর্তমান ২০২৬ সালের আধুনিক ও তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ যুগে মানুষ বাহ্যিক ও বস্তুগত দিক থেকে অনেক উন্নত হলেও, মানসিক প্রশান্তি, নৈতিকতা ও জীবনবোধের দিক থেকে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতি-ব্যবহার, পারস্পরিক দূরত্বের এই যুগে সঠিক জীবনদর্শনের অভাব স্পষ্ট। মানবজাতির হেদায়েত ও সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে যে নবী-রাসূলদের পাঠিয়েছেন, তাদের জীবন কেবল ইতিহাসের কিছু গল্প নয়; বরং তা কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য এক জীবন্ত ও কালজয়ী গাইডলাইন। এই বিশেষ সিরিজের ১ম পর্বে আমরা আলোচনা করব নবী-রাসূলদের অনন্য জীবন থেকে আজকের দিনে আমাদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার মতো ৩টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। 

১. হযরত আইয়ুব (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: চরম বিপদেও মানসিক শক্তি ও ধৈর্য (Patience)
আজকের যুগে সামান্য আর্থিক ক্ষতি, চাকরি হারানো কিংবা পারিবারিক বা শারীরিক অসুস্থতায় মানুষ দ্রুত হতাশ হয়ে পড়ে, এমনকি অনেকে আত্মহননের পথও বেছে নেয়। এই মানসিক সংকটে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আদর্শ হলেন হযরত আইয়ুব (আ.)। 

আল্লাহ তাআলা তাঁকে দীর্ঘ বছর ধরে কঠিন রোগ, সন্তানদের মৃত্যু এবং সমস্ত ধন-সম্পদ হারানোর মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলেন। কিন্তু এমন চরম সংকটেও তিনি আল্লাহর প্রতি বিন্দুমাত্র অভিযোগ করেননি, বরং চরম ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন। 

  • আজকের দিনের শিক্ষা: আধুনিক জীবনে বিষণ্ণতা (Depression) বা যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে ভেঙে না পড়ে ইতিবাচক থাকা এবং বিশ্বাস রাখা যে—কষ্টের পরেই স্বস্তি আসে। বিপদে অধৈর্য না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাই হলো সফলতার মূল চাবি। 

২. হযরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: নৈতিক স্খলন ও প্রলোভন থেকে নিজেকে রক্ষা করা (Self-Control)
বর্তমান ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক মাধ্যমের উন্মুক্ততার কারণে তরুণ প্রজন্মের সামনে পর্নোগ্রাফি, অবৈধ সম্পর্ক এবং নৈতিক স্খলনের নানামুখী প্রলোভন প্রতিনিয়ত আসছে। নিজের চরিত্র ও নৈতিকতা ধরে রাখা আজকের দিনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 

হযরত ইউসুফ (আ.) ছিলেন অপরূপ সুন্দর এবং যুবক। মিশরের আজিজের স্ত্রী যখন ঘরের সমস্ত দরজা বন্ধ করে উনাকে পাপের দিকে আহ্বান করেছিল, তখন তিনি সমস্ত প্রলোভন ও ক্ষমতার দাপটকে তুচ্ছ করে বলেছিলেন, “আমি আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি।” পাপের চেয়ে তিনি কারাগারের বন্দিজীবনকে বেছে নিয়েছিলেন। 

  • আজকের দিনের শিক্ষা: চারপাশে যত বড় বা সহজ প্রলোভনই থাকুক না কেন, আল্লাহর ভয়কে অন্তরে জাগ্রত রেখে নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ (Self-Control) বজায় রাখা। ক্যারিয়ার বা জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে সাময়িক আনন্দের চেয়ে চিরস্থায়ী নৈতিকতা ও সততাকে প্রাধান্য দেওয়া। 

৩. হযরত নূহ (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: সামাজিক সমালোচনা উপেক্ষা করে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকা (Perseverance)
আজকের দিনে তরুণ বা উদ্যোক্তারা যখন নতুন বা ভালো কোনো কাজ করতে যায়, তখন সমাজের মানুষের সমালোচনা, ট্রল বা উপহাসের শিকার হয়ে অনেকেই মাঝপথে কাজ ছেড়ে দেয়। মানুষের কথা বা সামাজিক চাপের মুখে নিজের সৎ লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া খুবই সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

হযরত নূহ (আ.) যখন আল্লাহর নির্দেশে মরুভূমির বুকে বিশাল নৌকা তৈরি করছিলেন, তখন সমকালীন সমাজের মানুষ উনাকে দেখে চরম উপহাস করত, পাগল বলত। কিন্তু তিনি মানুষের কোনো উপহাস বা ট্রলের দিকে কান না দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই নৌকাই বিশ্বাসীদের রক্ষা করেছিল। 

  • আজকের দিনের শিক্ষা: আপনি যদি নিশ্চিত হন যে আপনার কাজটি সৎ, সঠিক এবং মানবকল্যাণকর, তবে সমাজ বা সোশ্যাল মিডিয়ার মানুষ কী বলল বা কী ট্রল করল—তাতে কান না দিয়ে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকা। দৃঢ় সংকল্প এবং কঠোর পরিশ্রমই শেষ পর্যন্ত সত্যকে জয়ী করে। 


নবী-রাসূলদের এই চমৎকার ঐতিহাসিক শিক্ষাগুলো কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং আমাদের প্রতিদিনের আচরণ, কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক জীবনে চর্চা করা উচিত। তবেই আমরা এই আধুনিক ও জটিল পৃথিবীতে একটি শান্তিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে সক্ষম হব। 

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

বিকাশ

নিউজ ডেস্ক

November 6, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৬ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ডিজিটাল ও সাইবার জগৎ
তথ্যসূত্র: বিকাশ (bKash) সিকিউরিটি গাইডলাইন, বাংলাদেশ ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) এবং সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ) 

ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সাথে সাথে অনলাইন শপিং এবং মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ) আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এই সুবিধার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অভিনব সব সাইবার জালিয়াতি ও প্রতারণা। প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ বিভিন্ন লোভনীয় অফার বা চতুর ফিশিংয়ের ফাঁদে পড়ে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ও বিকাশ অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন। গুগলের ২০২৬ সালের সর্বশেষ ইউজার সেফটি ও সিকিউরিটি গাইডলাইন অনুযায়ী, অনলাইন শপিং ও বিকাশ ব্যবহার করার সময় জালিয়াতি চক্রকে ধরার ৭টি পাকা ও প্রমাণিত উপায় নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো: 

১. অস্বাভাবিক মূল্যছাড় এবং “অবাস্তব” অফার (Too Good to be True)
প্রতারক চক্রের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো লোভ। বাজারে যে প্রোডাক্টটির আসল দাম ৫,০০০ টাকা, কোনো পেজ বা ওয়েবসাইটে যদি সেটি মাত্র ১,৫০০ টাকায় ‘অফারের’ নামে বিক্রি করার বিজ্ঞাপন দেখেন, তবে শুরুতেই সতর্ক হন। আইফোন, প্রিমিয়াম গ্যাজেট বা ব্র্যন্ডেড পোশাকের ক্ষেত্রে এই ধরনের অবাস্তব ছাড় মূলত ক্রেতাদের ফাঁদে ফেলার প্রথম ধাপ। 

২. শুধু ‘অ্যাডভান্স ফুল পেমেন্ট’ বা অগ্রিম টাকা নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া
বিশ্বস্ত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময় ক্যাশ অন ডেলিভারি (COD) বা কন্ডিশনাল ডেলিভারির সুবিধা দেয়। কিন্তু কোনো নতুন বা স্বল্প পরিচিত পেজ যদি পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার আগেই বিকাশের মাধ্যমে সম্পূর্ণ টাকা বা অতিরিক্ত ডেলিভারি চার্জ অগ্রিম পরিশোধ করার জন্য অনবরত চাপ দিতে থাকে, তবে বুঝতে হবে এখানে বড় ধরনের গড়মিল রয়েছে। নির্ভরযোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠান কাস্টমারকে পেমেন্টের জন্য বারবার তাগাদা দেয় না। 

৩. ভুয়া বিকাশ কল এবং পিন/ওটিপি (PIN/OTP) চাওয়া
বিকাশ প্রতারণার অন্যতম সাধারণ পদ্ধতি হলো গ্রাহককে ফোন করে বলা যে, “আমি বিকাশ অফিস থেকে বলছি, আপনার অ্যাকাউন্টটি ব্লক হয়ে গেছে” অথবা “ভুল করে আপনার অ্যাকাউন্টে টাকা চলে গেছে, ওটিপি (OTP) কোডটি বলুন।” মনে রাখবেন, বিকাশের কোনো কর্মকর্তা বা কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি কখনোই আপনার ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (OTP) কিংবা ৪ বা ৫ ডিজিটের গোপন পিন (PIN) নম্বর জানতে চাইবে না। কেউ এটি চাইলেই নিশ্চিতভাবে সে একজন প্রতারক। 

৪. ভুয়া এসএমএস (Fake SMS) ও স্পুফিং লিংকের ব্যবহার
অনেক সময় প্রতারকেরা হুবহু বিকাশের মেসেজ ফরম্যাট নকল করে আপনার ফোনে বার্তা পাঠায়, যাতে লেখা থাকে “You have received TK. 5,000″। এই মেসেজগুলো কিন্তু আপনার আসল বিকাশ অ্যাপের ব্যালেন্স বাড়ায় না। এছাড়া ‘বিকাশ বোনাস’ বা ‘সরকারি অনুদান’ পাওয়ার লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন ফিশিং লিংক পাঠানো হয়। কোনো লিংকে ক্লিক করে আপনার বিকাশ নম্বর এবং পিন সাবমিট করার আগে অবশ্যই ওয়েবসাইটের ইউআরএল (URL) চেক করুন। বিকাশের আসল ওয়েবসাইট লিংক সবসময় https://www.bkash.com/ দিয়ে শুরু হয়। 

৫. ফেসবুক পেজের লাইক, কমেন্ট ও রিভিউ সেকশন হাইড বা অফ থাকা
অনলাইন শপিং পেজটি আসল নাকি নকল তা চেনার একটি সহজ উপায় হলো তাদের রিভিউ সেকশন। প্রতারক চক্রের পেজগুলোতে সাধারণত কাস্টমার রিভিউ অপশন বন্ধ থাকে এবং পোস্টের কমেন্ট সেকশন হাইড (Hide) বা লিমিটেড করা থাকে, যাতে প্রতারিত হওয়া অন্য ভুক্তভোগীরা সেখানে নেতিবাচক মন্তব্য করতে না পারেন। এছাড়া পেজের ‘Page Transparency’ অপশনে গিয়ে পেজটি কবে তৈরি হয়েছে এবং এর আগে কতবার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে তা দেখে এর নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা যায়। 

৬. ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে (Personal Number) ‘সেন্ড মানি’ করার তাগিদ
যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রফেশনাল অনলাইন শপের নিজস্ব ‘বিকাশ মার্চেন্ট’ (Merchant Account) অ্যাকাউন্ট থাকে, যেখানে গ্রাহক ‘মেক পেমেন্ট’ অপশন ব্যবহার করে কেনাকাটা করেন। কিন্তু বিক্রেতা যদি কোনো মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট না দেখিয়ে আপনাকে বারবার পার্সোনাল নম্বরে ‘সেন্ড মানি’ বা ‘ক্যাশ ইন’ করতে বলে, তবে সাবধান হোন। পার্সোনাল নম্বরে টাকা পাঠালে পরবর্তীতে প্রতারণার শিকার হলেও সেই টাকা ট্র্যাক করা বা রিফান্ড পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। 

৭. লাইভ চ্যাটে ফেসবুক আইডির সত্যতা এবং ট্র্যাকিং আইডি না দেওয়া
পণ্য অর্ডার করার পর যদি তারা কোনো কুরিয়ার সার্ভিসের (যেমন- সুন্দরবন, স্টিডফাস্ট, পাথao) মেমো বা ট্র্যাকিং আইডি দিতে টালবাহানা করে অথবা বারবার কুরিয়ারে বুকিং দেওয়ার নাম করে অতিরিক্ত ‘প্রসেসিং ফি’ দাবি করে, তবে ধরে নেবেন আপনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। জালিয়াতি চক্র সাধারণত টাকা পাওয়ার পরপরই গ্রাহকের ফেসবুক আইডি বা ফোন নম্বর ব্লক করে দেয়। 

প্রতারিত হলে তাৎক্ষণিক করণীয় ও আইনি প্রতিকার:
১. বিকাশ হেল্পলাইন ১৬২৪৭: যদি ভুলবশত কোনো প্রতারককে টাকা পাঠিয়ে দেন বা ওটিপি শেয়ার করে ফেলেন, তবে এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে সরাসরি বিকাশের হটলাইন নম্বর ১৬২৪৭-এ কল করে আপনার অ্যাকাউন্টটি সাময়িকভাবে লক করুন এবং যে নম্বরে টাকা গেছে সেটি রিপোর্ট করুন।
২. জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP): অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারিত হলে মেমো, চ্যাটের স্ক্রিনশট এবং পেমেন্ট প্রুফসহ ভোক্তা অধিকারে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।
৩. সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন: বিকাশ বা অনলাইন শপিং জালিয়াতির শিকার হলে নিকটস্থ থানায় জিডি (GD) করুন এবং ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের ফেসবুক পেজে বা সরাসরি হ্যালো সিটি (Hello CT) অ্যাপের মাধ্যমে অভিযোগ জানান। ডিজিটাল সিকিউরিটি ও সাইবার ক্রাইম টিম এই ধরনের অপরাধীদের আইপি ও লোকেশন ট্র্যাক করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে সক্ষম। 

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

সংবিধান দিবস

নিউজ ডেস্ক

November 4, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: জাতীয়
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ গণপরিষদের কার্যবিবরণী, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের সংবিধানের মূল প্রস্তাবনা। 

আজ ৪ নভেম্বর, ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ সংবিধান দিবস’। ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ সময় এই দিনটি উপেক্ষিত থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭২ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয়েছিল। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ১১ মাসের মাথায় কীভাবে একটি বিশ্বমানের ও যুগোপযোগী সংবিধান লাভ করেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। নিচে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা ও গ্রহণের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বিস্তারিত তুলে ধরা হলো। 

১. পটভূমি ও গণপরিষদ আদেশ জারি
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করার পর একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নিজস্ব আইনি কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। এর পরদিনই অর্থাৎ ১১ জানুয়ারি তিনি ‘অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’ জারি করেন। এর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তন করা হয়। 

পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ জারি করা হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে এই গণপরিষদ গঠিত হয়, যার মূল দায়িত্ব ছিল দেশের জন্য একটি স্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন করা। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। 

২. খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন
গণপরিষদের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘সংবিধান প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটিতে একমাত্র নারী সদস্য ছিলেন বেগম রাজিয়া বানু। এছাড়া তৎকালীন বিরোধী দলের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। 

কমিটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের কাজ শুরু করে। বিভিন্ন দেশের সংবিধান পর্যালোচনা এবং দেশের আপামর জনসাধারণের মতামত সংগ্রহের জন্য তারা ব্যাপক উদ্যোগ নেন। সর্বস্তরের জনগণের কাছ থেকে মোট ৯৮টি লিখিত প্রস্তাব সংগ্রহ করা হয়েছিল। ভারত ও যুক্তরাজ্যের সংবিধানকে মূল ভিত্তি ধরে খসড়া তৈরির কাজ এগিয়ে চলে। 

৩. খসড়া উত্থাপন ও বিতর্ক
দীর্ঘ কঠোর পরিশ্রমের পর ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ড. কামাল হোসেন খসড়া সংবিধান বিল আকারে উত্থাপন করেন। ১৯ অক্টোবর থেকে এর ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়। 

সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদ ও ধারা নিয়ে গণপরিষদে ব্যাপক বিতর্ক ও আলোচনা হয়। গণপরিষদের সদস্যরা বিভিন্ন সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। মোট ৪১টি অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার পর সংবিধানের প্রতিটি বিষয়কে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়। 

৪. সংবিধান গ্রহণ ও কার্যকর
অবশেষে ৪ নভেম্বর, ১৯৭২ সালে গণপরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে ‘বাংলাদেশের সংবিধান’ গৃহীত হয়। সংবিধান গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, “এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত, এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।” 

এর ঠিক দেড় মাস পর, অর্থাৎ বিজয়ের প্রথম বার্ষিকী—১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২ থেকে এই সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়। সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপিটি ছিল হাতে লেখা, যা শিল্পী হাশেম খানের নকশায় এবং প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার আবদুর রউফের হাতের লেখায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। এতে স্বাক্ষর করেছিলেন গণপরিষদের সদস্যবৃন্দ। 


একটি দেশের সংবিধান কেবল কিছু আইনের সমষ্টি নয়, এটি রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল স্তম্ভ ছিল চারটি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সময়ের আবর্তে এই সংবিধানে বহু পরিবর্তন ও সংশোধনী আনা হলেও, ৪ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সবসময়ই অনস্বীকার্য। তরুণ প্রজন্মের জন্য নিজেদের অধিকার ও রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা বুঝতে সংবিধান রচনার এই ইতিহাস জানা অত্যন্ত জরুরি। 

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২১শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ