অর্থনীতি

জিপিএ-৫-এর বন্যা, প্রকৌশলীদের বিসিএস-প্রেম এবং ৯১ হাজার কোটি টাকার মাশুল: আমাদের শিক্ষা ও মেধা ব্যবস্থার নগ্ন বাস্তবতা
বিসিএস

নিউজ ডেস্ক

July 21, 2026

শেয়ার করুন

বিশেষ ইন-ডেপ্থ ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট | পালস বাংলাদেশ ডেস্ক

প্রতিবেদক ও কন্টেন্ট অ্যানালিস্ট: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant)

ঢাকা

দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দাবিদার বাংলাদেশে বর্তমানে চারিদিকে জিপিএ-৫ আর ‘গোল্ডেন প্লাস’-এর উল্লাস। অথচ এই কৃত্রিম মেধার জোয়ারের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে দেশীয় সক্ষমতার চরম ট্র্যাজেডি। চীনের প্রকৌশলীরা পদ্মা সেতুর জটিল নির্মাণকাজ শেষ করে দিয়ে যান, জাপানের প্রকৌশলীরা উপহার দেন আধুনিক মেট্রোরেল, রাশিয়ার মেধা ও প্রযুক্তিতে মাথা তুলে দাঁড়ায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, আর দক্ষিণ কোরিয়ার টেকনিশিয়ানরা পার্বতীপুরের খনি থেকে কয়লা তুলে আনে।

অন্যদিকে, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বুয়েট, চুয়েট, কুয়েট ও রুয়েট থেকে কোটি কোটি টাকার পাবলিক মানিতে ডিগ্রি নেওয়া প্রকৌশলীরা ল্যাব বা ফিল্ড ছেড়ে লাইব্রেরিতে বসে মুখস্থ করছেন—‘পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য কত?’, ‘মেট্রোরেলের পিলারের সংখ্যা কত?’, কিংবা ‘রূপপুর পাওয়ার হাউজের চুল্লির উচ্চতা কত?’—উদ্দেশ্য, বিসিএস ক্যাডার হয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতার চেয়ারে বসা!

একদিকে মেগা প্রজেক্টে বিলিয়ন ডলারের বিদেশি নির্ভরতা, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় খরচে তৈরি প্রকৌশলীদের আমলা হওয়ার এই দৌড়—আমাদের জাতীয় উন্নয়নকে ঠেলে দিচ্ছে এক নজিরবিহীন কাঠামোগত বিপর্যয়ের মুখে।

১. বিসিএসে প্রকৌশলীদের ঢল: পরিসংখ্যান কী বলে?

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (BPSC)-এর সাম্প্রতিক ব্যাচগুলোর চূড়ান্ত ফলাফলের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশেষায়িত শিক্ষার শিক্ষার্থীদের সাধারণ ক্যাডারে (প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র) যোগ দেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে:

  • ৪০তম বিসিএস: সাধারণ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে শুধু প্রশাসন ক্যাডারেই বুয়েটের ৫০ জন প্রাক্তন শিক্ষার্থীসহ মোট ১৭৩ জন প্রকৌশলী স্থান করে নেন।
  • ৪১তম ও ৪৩তম বিসিএস: ৪১তম বিসিএসে ১৯৫ জন এবং ৪৩তম বিসিএসে ১৮৩ জন প্রকৌশলী তাঁদের মূল পেশা ছেড়ে সাধারণ ক্যাডারে যোগ দিয়েছেন।
  • ৩০% কোটা দখল: পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩৫তম থেকে ৪০তম বিসিএস (৩৯তম বিশেষ বিসিএস বাদে) পর্যন্ত শীর্ষ তিনটি সাধারণ ক্যাডারে মোট ১,৯৮০ জন কর্মকর্তার মধ্যে প্রায় ৩৮৭ জনই ছিলেন প্রকৌশলী ও চিকিৎসক।

গাণিতিক ও যৌক্তিক দক্ষতায় এগিয়ে থাকার কারণে তারা সাধারণ ক্যাডারের মেধা তালিকায় শীর্ষস্থানগুলো দখল করে নিচ্ছেন। কিন্তু একজন সিভিল, কেমিক্যাল বা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার যখন মাঠ প্রশাসনের এসিল্যান্ড বা ইউএনও হিসেবে প্রশাসনিক ফাইল সামলান, তখন তাঁর দীর্ঘ ৪-৫ বছরের অর্জিত বিশেষায়িত জ্ঞান রাষ্ট্রের কোনো প্রত্যক্ষ কাজে আসে না।

[আমাদের জাতীয় মেধার রূপান্তর চিত্র]
উচ্চতর কারিগরি ডিগ্রি (বুয়েট/চুয়েট/কুয়েট) 
            ↓
গবেষণা ও উপযুক্ত কাজের পরিবেশের অভাব
            ↓
সাধারণ জ্ঞানের মুখস্থনির্ভর বিসিএস প্রস্তুতি 
            ↓
প্রশাসনিক ক্যাডারে যোগদান ➔ (বিশেষায়িত মেধার চূড়ান্ত অপচয়)

২. পরনির্ভরশীলতার খতিয়ান: ৯১,৭৪৪ কোটি টাকার আর্থিক লোকসান

দেশীয় শীর্ষ প্রকৌশলীরা টেকনিক্যাল ফিল্ড ছেড়ে প্রশাসনিক ক্যাডারে চলে যাওয়ায় মেগা প্রজেক্টগুলোর মূল কারিগরি সিদ্ধান্তের জন্য সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হচ্ছে বিদেশি পরামর্শক ও ঠিকাদারদের ওপর।

정 সরকারের অর্থনৈতিক টাস্কফোর্স এবং শ্বেতপত্র কমিটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষ দেশীয় প্রকৌশলীর অভাব এবং বিদেশি কনসালট্যান্টদের ওপর অতি-নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশের প্রধান মেগা প্রকল্পগুলোতে প্রায় ৭.৫২ বিলিয়ন ডলার (বা ৯১ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা) অতিরিক্ত আর্থিক লোকসান ও অপচয় হয়েছে!

প্রজেক্টের খাত / সূচকপ্রাথমিক প্রাক্কলিত বাজেটসংশোধিত চূড়ান্ত বাজেটঅতিরিক্ত অপচয় ও ক্ষতি
৮টি প্রধান মেগা প্রকল্প (পদ্মা রেল সংযোগ, রূপপুর, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল ইত্যাদি)$১১.২০ বিলিয়ন \vert{} $১৮.৬৪ বিলিয়ন$৭.৫২ বিলিয়ন (৬৮% বৃদ্ধি)
প্রকল্পের বাস্তবায়নকালনির্দিষ্ট সময়গড়ে ৫ বছর অতিরিক্তবিপুল কনসালট্যান্সি ফি ও ডেডলাইন মিস
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত––ক্যাপাসিটি চার্জ ও ভর্তুকিতে বার্ষিক $৫ বিলিয়ন অপচয়

উন্নত দেশগুলোতে মেগা প্রজেক্টের সাথে দেশীয় নলেজ ট্র্যান্সফার (Knowledge Transfer) বাধ্যতামূলক করা হলেও, আমাদের দেশে তদারকির জন্য দক্ষ দেশীয় রিভিউ প্রকৌশলীর অভাবে বৈদেশিক ফান্ডের একটি বিশাল অংশ ‘কনসালট্যান্সি ফি’ হিসেবেই দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।

৩. কেন এই ‘দলবদল’? গভীরে লুকানো ৪টি মূল কারণ

১. প্রশাসনিক ক্ষমতা ও সামাজিক মোহ: সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কারিগরি বা টেকনিক্যাল ক্যাডারের চেয়ে সাধারণ প্রশাসনিক ক্যাডারে দ্রুত পদোন্নতি, গাড়ি-বাড়ি সুবিধা, নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা এবং সামাজিক মর্যাদা অনেক বেশি।

২. বেসরকারি খাতের সীমাবদ্ধতা: দেশে ভারী শিল্প ও গবেষণাভিত্তিক বেসরকারি খাত সেভাবে বিকশিত হয়নি। ফলে অনেক মেধা পর্যাপ্ত বেতন ও ক্যারিয়ার অগ্রগতির অভাবে হতাশ হয়ে পড়েন।

৩. কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য: বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী (৯ম গ্রেড) পদে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে। এমনকি প্রকৌশল মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পদগুলোতেও (যেমন সচিব) প্রকৌশলীদের বদলে প্রশাসনিক ক্যাডারের আধিপত্য দেখা যায়।

৪. জিপিএ-৫-এর সনদসর্বস্ব শিক্ষা: প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত ‘জিপিএ-৫’ পাওয়ার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, তা প্র্যাকটিক্যাল ল্যাব ও স্কিলভিত্তিক নলেজ তৈরির বদলে মুখস্থভিত্তিক পরীক্ষা জয়ের মানসিকতা তৈরি করছে।

উত্তরণের পথ: কী করা প্রয়োজন?

  • টেকনিক্যাল ক্যাডারের মর্যাদা বৃদ্ধি: প্রশাসনিক ক্যাডারের সমকক্ষ বেতন, পদোন্নতি ও নীতি-নির্ধারণী ক্ষমতা টেকনিক্যাল ক্যাডারদের প্রদান করতে হবে।
  • বাধ্যতামূলক নলেজ ট্র্যান্সফার: প্রতিটি মেগা প্রজেক্টে বিদেশি কনসালট্যান্টদের পাশাপাশি দেশীয় প্রকৌশলীদের কোর ডিজাইনিং টিমে যুক্ত করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  • শিক্ষা পদ্ধতির আমূল সংস্কার: জিপিএ-৫ নির্ভর পরীক্ষা বাদ দিয়ে ল্যাব-ভিত্তিক, কোডিং, রোবোটিক্স এবং প্র্যাকটিক্যাল প্রবলেম সলভিং নির্ভর কারিগরি শিক্ষা জোরদার করতে হবে।

প্রতিবেদকের মতামত: জিপিএ-৫-এর বন্যায় ভাসলেও রাষ্ট্র যদি তার নিজস্ব প্রকৌশলীকে দিয়ে একটি সেতুর ডিজাইন বা পাওয়ার প্ল্যান্টের তদারকি করাতে না পারে, তবে সেই মেধা দিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব। সিভিল সার্ভিসের মোহ ছেড়ে প্রকৌশলীদের নিজস্ব প্রযুক্তির উদ্ভাবক বানাতে না পারলে, প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার বিদেশি ঋণ ও মাশুল গুনেই যেতে হবে।

বিসিএসে প্রকৌশলীদের তথ্য ও পরিসংখ্যানের উৎস

  • বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (BPSC): ৩৮তম, ৪০তম, ৪১তম এবং ৪৩তম বিসিএস-এর চূড়ান্ত ফলাফল ও ক্যাডার বণ্টন সংক্রান্ত অফিশিয়াল প্রেস রিলিজ ও বার্ষিক প্রতিবেদন।
  • দৈনিক প্রথম আলো (ইন-ডেপ্থ রিপোর্ট): “সাধারণ ক্যাডারে প্রকৌশলী ও চিকিৎসকদের আধিপত্য” এবং “বিসিএসে পেশাগত মেধার স্থানান্তর” বিষয়ক বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন (২০২১-২০২৪)।
  • দ্য ডেইলি স্টার (The Daily Star): “Why engineers are opting for civil services in Bangladesh” সংক্রান্ত ফিচার ও বিপিএসসির ডেটা অ্যানালিসিস।

মেগা প্রজেক্টের অপচয় ও আর্থিক লোকসানের উৎস (৭.৫২ বিলিয়ন ডলার)

  • শ্বেতপত্র প্রকাশনা কমিটি (White Paper on Bangladesh Economy): ২০২৪-২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন ‘অর্থনীতির শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি’-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন। (যেখানে মেগা প্রজেক্টের বাজেট বৃদ্ধি, দুর্নীতি ও প্রাক্কলন ত্রুটি নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়)।
  • সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD): সিপিডি কর্তৃক আয়োজিত “বাংলাদেশের মেগা প্রজেক্ট ও অবকাঠামোগত অর্থায়ন” শীর্ষক পলিসি ব্রিফিং ও গবেষণা পত্র।
  • পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (IMED): বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর বার্ষিক অডিট ও সময়/ব্যয় বৃদ্ধির (Cost and Time Overrun) সরকারি পর্যালোচনা রিপোর্ট।

৩বিদেশে প্রকৌশলীদের সুযোগ ও শিক্ষা ব্যবস্থার তথ্য

  • ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF): Future of Jobs Report (কারিগরি ও স্কিলভিত্তিক শিক্ষার বৈশ্বিক প্রয়োজনীয়তা)।
  • ইউনেস্কো (UNESCO Global Education Monitoring Report): দক্ষিণ এশিয়ায় জিপিএ/সনদভিত্তিক পরীক্ষা বনাম প্র্যাকটিক্যাল টেকনিক্যাল স্কিলের ব্যবধান বিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা।

শিক্ষা, অর্থনীতি, জাতীয় অবকাঠামো ও ক্যারিয়ার বিষয়ক গভীরে যাওয়া ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট নিয়মিত পড়তে চোখ রাখুন পালস বাংলাদেশ-এ। আপনার অনলাইন নিউজ পোর্টাল, টেক ব্লগ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইটের জন্য প্রফেশনাল ও শতভাগ এসইও ফ্রেন্ডলি কন্টেন্ট সেবার জন্য সরাসরি ভিজিট করুন bdsbulbulahmed.com-এ (সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট হিসেবে ৬ বছরের অভিজ্ঞতা ও ২৫০+ প্রজেক্টের লাইভ প্রমাণ দেখুন আমার গুগল ড্রাইভ পোর্টফোলিও লিংক-এ)।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

প্রফেশনাল সিভি

নিউজ ডেস্ক

November 6, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৬ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: শিক্ষা ও চাকুরী
তথ্যসূত্র: বিডিজবস (Bdjobs) ক্যারিয়ার গাইডলাইন, লিংকডইন (LinkedIn) ট্যালেন্ট সলিউশন এবং হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি ক্যারিয়ার সার্ভিসেস রিপোর্ট 

বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে চাকরির বাজারে প্রবেশের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো একটি আকর্ষণীয় জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি (Curriculum Vitae) তৈরি করা। একজন ফ্রেশার বা সদ্য স্নাতক পাস করা চাকরিপ্রার্থীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা ছাড়া কীভাবে নিজের সিভিটিকে নিয়োগকর্তার (Recruiter) কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়। বর্তমান সময়ে আধুনিক করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো শত শত সিভির মধ্য থেকে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করতে ATS (Applicant Tracking System) সফটওয়্যার ব্যবহার করে। গুগলের ২০২৬ সালের ক্যারিয়ার ও এমপ্লয়বিলিটি গাইডলাইন অনুযায়ী, ফ্রেশারদের জন্য একটি প্রফেশনাল ও এটিএস-ফ্রেন্ডলি সিভি তৈরির ১১টি পাকা ও আধুনিক নিয়ম নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো: 

১. সিভির সঠিক ফরম্যাট ও লেআউট নির্বাচন (ATS-Friendly Design)
অনেকে সিভিতে অতিরিক্ত গ্রাফিক্স, লোগো, আইকন বা রঙিন বর্ডার ব্যবহার করেন, যা এটিএস (ATS) সফটওয়্যার সঠিকভাবে রিড বা পড়তে পারে না। ফ্রেশারদের জন্য সবসময় একটি ‘ক্লিন’ এবং ‘মিনিমালিস্ট’ লেআউট ব্যবহার করা উচিত। ফন্টের ক্ষেত্রে টাইমস নিউ রোমান, এরিয়াল (Arial) বা ক্যালিব্রির মতো স্ট্যান্ডার্ড ফন্ট ব্যবহার করুন (ফন্ট সাইজ ১০ থেকে ১২-এর মধ্যে রাখুন)। পুরো সিভিটি অবশ্যই এক পৃষ্ঠার (১ পেজ) মধ্যে শেষ করার চেষ্টা করুন, কারণ ফ্রেশারদের জন্য দুই পৃষ্ঠার সিভি নিয়োগকর্তারা সাধারণত পছন্দ করেন না। 

২. সঠিক ও সংক্ষিপ্ত কন্টাক্ট ইনফরমেশন (Contact Information)
সিভির একদম শুরুতে আপনার নাম বড় অক্ষরে লিখুন। এরপর আপনার সক্রিয় মোবাইল নম্বর, প্রফেশনাল ইমেইল আইডি (যেমন- rahim.khan@email.com, কোনো ভুয়া বা অদ্ভুত নাম পরিহার করুন) এবং আপনার বর্তমান ঠিকানা উল্লেখ করুন। বর্তমান সময়ে সিভিতে আপনার লিংকডইন (LinkedIn) প্রোফাইলের লিংক এবং যদি আপনি টেকনিক্যাল বা ক্রিয়েটিভ লাইনের হন, তবে পোর্টফোলিও বা গিটহাব (GitHub) লিংক যুক্ত করা বাধ্যতামূলক। 

৩. অবজেক্টিভের পরিবর্তে ‘ক্যারিয়ার সামারি’ (Career Summary/Profile)
পুরোনো আমলের “আই ওয়ান্ট টু ওয়ার্ক ইন আ চ্যালেঞ্জিং এনভায়রনমেন্ট…” মার্কা গৎবাঁধা ক্যারিয়ার অবজেক্টিভ লেখা পুরোপুরি বর্জন করুন। এর পরিবর্তে ৩-৪ লাইনের একটি চমৎকার ‘ক্যারিয়ার সামারি’ লিখুন। এখানে উল্লেখ করুন আপনি কোন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেছেন, আপনার মূল টেকনিক্যাল স্কিলগুলো কী কী এবং আপনি কীভাবে কোম্পানির লক্ষ্য অর্জনে অবদান রাখতে পারেন। 

৪. শিক্ষাগত যোগ্যতা উপস্থাপনের নিয়ম (Education Section)
যেহেতু আপনার প্রাতিষ্ঠানিক কাজের অভিজ্ঞতা নেই, তাই ‘এডুকেশন সেকশন’টি সিভির ওপরের দিকে থাকা উচিত। এটি লেখার সময় সবসময় ‘রিভার্স ক্রোনোলজিক্যাল অর্ডার’ বা উল্টো ক্রমানুসার পদ্ধতি ব্যবহার করুন। অর্থাৎ, আপনার সর্বশেষ ডিগ্রি (যেমন- সিজিপিএসহ স্নাতক বা অনার্স)-এর তথ্য সবার আগে লিখুন, এরপর পর্যায়ক্রমে এইচএসসি এবং এসএসসি-এর বিবরণ দিন। পাসিং ইয়ার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন। 

৫. একাডেমিক প্রজেক্ট ও থিসিসের বিবরণ (Academic Projects)
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে করা যেকোনো প্রজেক্ট, প্রেজেন্টেশন, থিসিস বা অ্যাসাইনমেন্টকে আপনার কাজের অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন। আপনি যদি সিএসই-এর ছাত্র হন তবে আপনার করা কোডিং প্রজেক্ট, কিংবা বিবিএ-এর ছাত্র হলে আপনার করা মার্কেট রিসার্চ বা ইন্টার্নশিপের বিবরণ এখানে ৩-৪টি বুলেট পয়েন্টে লিখুন। প্রজেক্টে আপনার ভূমিকা কী ছিল এবং তার ফলাফল কী হয়েছিল, তা স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলুন। 

৬. স্কিলস সেকশন: হার্ড স্কিল বনাম সফট স্কিল (Skills Optimization)


আপনার স্কিল বা দক্ষতাগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করে লিখুন: 

  • হার্ড স্কিল (Technical Skills): যেমন- মাইক্রোসফট এক্সেল (Advanced Excel), পাইথন, এসইও (SEO), ডাটা এন্ট্রি, গ্রাফিক ডিজাইন ইত্যাদি। 
  • সফট স্কিল (Interpersonal Skills): যেমন- টিমওয়ার্ক, প্রবলেম সলভিং, চমৎকার যোগাযোগ দক্ষতা (Communication), এবং টাইম ম্যানেজমেন্ট।
    চাকরির বিজ্ঞাপনে (Job Description) যে কিওয়ার্ডগুলো চাওয়া হয়েছে, সেগুলোর সাথে মিল রেখে আপনার স্কিলস সেকশনটি সাজালে সিভিটি সহজেই শর্টলিস্ট হবে। 

৭. সহ-শিক্ষা কার্যক্রম এবং নেতৃত্ব গুণাবলী (Co-curricular Activities)
ফ্রেশারদের সিভিতে এই অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আপনি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ক্লাব, ডিবেটিং সোসাইটি, বা ভলান্টিয়ার অর্গানাইজেশনের (যেমন- রোভার স্কাউট, রেড ক্রিসেন্ট) সাথে যুক্ত থাকেন, তবে তা এখানে উল্লেখ করুন। ক্লাবের কোনো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট বা লিডারশিপ রোলে থাকার অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে আপনি কাজের প্রতি দায়িত্বশীল এবং দলগতভাবে কাজ করতে পারেন। 

৮. ভাষা ও আইটি দক্ষতা (Language & IT Literacy)
বাংলা ও ইংরেজি ভাষার ওপর আপনার দখল কেমন (যেমন- স্পোকেন এবং রাইটিং-এ ফ্লুয়েন্সি) তা আলাদাভাবে উল্লেখ করুন। এছাড়া বর্তমান করপোরেট যুগে বেসিক কম্পিউটার লিটারেসি (যেমন- গুগল ড্রাইভের ব্যবহার, জুম/টিমস মিটিং হেন্ডলিং, ইমেইল রাইটিং) জানা থাকা আবশ্যক, যা সিভিতে উল্লেখ করা উচিত। 

৯. অর্জুন ও পুরস্কার (Achievements & Awards)
শিক্ষা জীবন বা সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে আপনার কোনো বিশেষ অর্জন থাকলে তা সিভিতে যোগ করুন। যেমন- মেধা তালিকায় স্থান পাওয়া, কোনো প্রতিযোগিতায় (যেমন- বিজনেস কেস স্টাডি, হ্যাকাথন, বা খেলাধুলা) চ্যাম্পিয়ন বা রানার্স-আপ হওয়া কিংবা কোনো স্কলারশিপ পাওয়া। এটি আপনাকে অন্য প্রার্থীদের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে রাখবে। 

১০. রেফারেন্স ব্যবহারের আধুনিক নিয়ম (References)
সিভির শেষে রেফারেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন দুজনকে নির্বাচন করুন যারা আপনার একাডেমিক বা ভলান্টিয়ারিং কাজের সাথে পরিচিত। আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজেক্ট গাইড বা বিভাগীয় প্রধানের নাম, পদবি, প্রাতিষ্ঠানিক ইমেইল এবং ফোন নম্বর রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। তবে রেফারেন্স দেওয়ার আগে অবশ্যই তাদের অনুমতি নিয়ে নেওয়া উচিত। 

১১. প্রুফরিডিং এবং পিডিএফ (PDF) ফরম্যাটে সেভ করা
সিভি লেখা শেষ হলে বানান ও ব্যাকরণগত ভুল (Grammar/Typo) চেক করার জন্য অন্তত ৩ বার রিডিং পড়ুন। প্রয়োজনে ‘Grammarly’ সফটওয়্যারের সাহায্য নিতে পারেন। সম্পূর্ণ ভুলমুক্ত সিভিটি সবসময় .pdf (PDF) ফরম্যাটে সেভ করুন এবং ফাইলের নাম দিন YourName_CV_Position.pdf (যেমন- Rahim_Khan_CV_Management_Trainee.pdf)। 


কখনোই সব চাকরির জন্য একটিমাত্র কমন সিভি ব্যবহার করবেন না। প্রতিটা ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানিতে আবেদনের সময় তাদের ‘জব ডেসক্রিপশন’ খুব ভালো করে পড়ুন এবং সেই অনুযায়ী আপনার স্কিল ও প্রজেক্টের কিওয়ার্ডগুলো সিভিতে সামান্য কাস্টমাইজ বা টিউন করে নিন। একটি গোছানো, সৎ এবং তথ্যবহুল সিভিই আপনাকে প্রথম চাকরির ইন্টারভিউ কল পেতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করবে। 

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

বিকাশ

নিউজ ডেস্ক

November 6, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৬ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ডিজিটাল ও সাইবার জগৎ
তথ্যসূত্র: বিকাশ (bKash) সিকিউরিটি গাইডলাইন, বাংলাদেশ ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) এবং সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ) 

ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সাথে সাথে অনলাইন শপিং এবং মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ) আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এই সুবিধার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অভিনব সব সাইবার জালিয়াতি ও প্রতারণা। প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ বিভিন্ন লোভনীয় অফার বা চতুর ফিশিংয়ের ফাঁদে পড়ে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ও বিকাশ অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন। গুগলের ২০২৬ সালের সর্বশেষ ইউজার সেফটি ও সিকিউরিটি গাইডলাইন অনুযায়ী, অনলাইন শপিং ও বিকাশ ব্যবহার করার সময় জালিয়াতি চক্রকে ধরার ৭টি পাকা ও প্রমাণিত উপায় নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো: 

১. অস্বাভাবিক মূল্যছাড় এবং “অবাস্তব” অফার (Too Good to be True)
প্রতারক চক্রের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো লোভ। বাজারে যে প্রোডাক্টটির আসল দাম ৫,০০০ টাকা, কোনো পেজ বা ওয়েবসাইটে যদি সেটি মাত্র ১,৫০০ টাকায় ‘অফারের’ নামে বিক্রি করার বিজ্ঞাপন দেখেন, তবে শুরুতেই সতর্ক হন। আইফোন, প্রিমিয়াম গ্যাজেট বা ব্র্যন্ডেড পোশাকের ক্ষেত্রে এই ধরনের অবাস্তব ছাড় মূলত ক্রেতাদের ফাঁদে ফেলার প্রথম ধাপ। 

২. শুধু ‘অ্যাডভান্স ফুল পেমেন্ট’ বা অগ্রিম টাকা নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া
বিশ্বস্ত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময় ক্যাশ অন ডেলিভারি (COD) বা কন্ডিশনাল ডেলিভারির সুবিধা দেয়। কিন্তু কোনো নতুন বা স্বল্প পরিচিত পেজ যদি পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার আগেই বিকাশের মাধ্যমে সম্পূর্ণ টাকা বা অতিরিক্ত ডেলিভারি চার্জ অগ্রিম পরিশোধ করার জন্য অনবরত চাপ দিতে থাকে, তবে বুঝতে হবে এখানে বড় ধরনের গড়মিল রয়েছে। নির্ভরযোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠান কাস্টমারকে পেমেন্টের জন্য বারবার তাগাদা দেয় না। 

৩. ভুয়া বিকাশ কল এবং পিন/ওটিপি (PIN/OTP) চাওয়া
বিকাশ প্রতারণার অন্যতম সাধারণ পদ্ধতি হলো গ্রাহককে ফোন করে বলা যে, “আমি বিকাশ অফিস থেকে বলছি, আপনার অ্যাকাউন্টটি ব্লক হয়ে গেছে” অথবা “ভুল করে আপনার অ্যাকাউন্টে টাকা চলে গেছে, ওটিপি (OTP) কোডটি বলুন।” মনে রাখবেন, বিকাশের কোনো কর্মকর্তা বা কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি কখনোই আপনার ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (OTP) কিংবা ৪ বা ৫ ডিজিটের গোপন পিন (PIN) নম্বর জানতে চাইবে না। কেউ এটি চাইলেই নিশ্চিতভাবে সে একজন প্রতারক। 

৪. ভুয়া এসএমএস (Fake SMS) ও স্পুফিং লিংকের ব্যবহার
অনেক সময় প্রতারকেরা হুবহু বিকাশের মেসেজ ফরম্যাট নকল করে আপনার ফোনে বার্তা পাঠায়, যাতে লেখা থাকে “You have received TK. 5,000″। এই মেসেজগুলো কিন্তু আপনার আসল বিকাশ অ্যাপের ব্যালেন্স বাড়ায় না। এছাড়া ‘বিকাশ বোনাস’ বা ‘সরকারি অনুদান’ পাওয়ার লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন ফিশিং লিংক পাঠানো হয়। কোনো লিংকে ক্লিক করে আপনার বিকাশ নম্বর এবং পিন সাবমিট করার আগে অবশ্যই ওয়েবসাইটের ইউআরএল (URL) চেক করুন। বিকাশের আসল ওয়েবসাইট লিংক সবসময় https://www.bkash.com/ দিয়ে শুরু হয়। 

৫. ফেসবুক পেজের লাইক, কমেন্ট ও রিভিউ সেকশন হাইড বা অফ থাকা
অনলাইন শপিং পেজটি আসল নাকি নকল তা চেনার একটি সহজ উপায় হলো তাদের রিভিউ সেকশন। প্রতারক চক্রের পেজগুলোতে সাধারণত কাস্টমার রিভিউ অপশন বন্ধ থাকে এবং পোস্টের কমেন্ট সেকশন হাইড (Hide) বা লিমিটেড করা থাকে, যাতে প্রতারিত হওয়া অন্য ভুক্তভোগীরা সেখানে নেতিবাচক মন্তব্য করতে না পারেন। এছাড়া পেজের ‘Page Transparency’ অপশনে গিয়ে পেজটি কবে তৈরি হয়েছে এবং এর আগে কতবার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে তা দেখে এর নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা যায়। 

৬. ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে (Personal Number) ‘সেন্ড মানি’ করার তাগিদ
যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রফেশনাল অনলাইন শপের নিজস্ব ‘বিকাশ মার্চেন্ট’ (Merchant Account) অ্যাকাউন্ট থাকে, যেখানে গ্রাহক ‘মেক পেমেন্ট’ অপশন ব্যবহার করে কেনাকাটা করেন। কিন্তু বিক্রেতা যদি কোনো মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট না দেখিয়ে আপনাকে বারবার পার্সোনাল নম্বরে ‘সেন্ড মানি’ বা ‘ক্যাশ ইন’ করতে বলে, তবে সাবধান হোন। পার্সোনাল নম্বরে টাকা পাঠালে পরবর্তীতে প্রতারণার শিকার হলেও সেই টাকা ট্র্যাক করা বা রিফান্ড পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। 

৭. লাইভ চ্যাটে ফেসবুক আইডির সত্যতা এবং ট্র্যাকিং আইডি না দেওয়া
পণ্য অর্ডার করার পর যদি তারা কোনো কুরিয়ার সার্ভিসের (যেমন- সুন্দরবন, স্টিডফাস্ট, পাথao) মেমো বা ট্র্যাকিং আইডি দিতে টালবাহানা করে অথবা বারবার কুরিয়ারে বুকিং দেওয়ার নাম করে অতিরিক্ত ‘প্রসেসিং ফি’ দাবি করে, তবে ধরে নেবেন আপনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। জালিয়াতি চক্র সাধারণত টাকা পাওয়ার পরপরই গ্রাহকের ফেসবুক আইডি বা ফোন নম্বর ব্লক করে দেয়। 

প্রতারিত হলে তাৎক্ষণিক করণীয় ও আইনি প্রতিকার:
১. বিকাশ হেল্পলাইন ১৬২৪৭: যদি ভুলবশত কোনো প্রতারককে টাকা পাঠিয়ে দেন বা ওটিপি শেয়ার করে ফেলেন, তবে এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে সরাসরি বিকাশের হটলাইন নম্বর ১৬২৪৭-এ কল করে আপনার অ্যাকাউন্টটি সাময়িকভাবে লক করুন এবং যে নম্বরে টাকা গেছে সেটি রিপোর্ট করুন।
২. জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP): অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারিত হলে মেমো, চ্যাটের স্ক্রিনশট এবং পেমেন্ট প্রুফসহ ভোক্তা অধিকারে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।
৩. সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন: বিকাশ বা অনলাইন শপিং জালিয়াতির শিকার হলে নিকটস্থ থানায় জিডি (GD) করুন এবং ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের ফেসবুক পেজে বা সরাসরি হ্যালো সিটি (Hello CT) অ্যাপের মাধ্যমে অভিযোগ জানান। ডিজিটাল সিকিউরিটি ও সাইবার ক্রাইম টিম এই ধরনের অপরাধীদের আইপি ও লোকেশন ট্র্যাক করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে সক্ষম। 

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

সংবিধান দিবস

নিউজ ডেস্ক

November 4, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: জাতীয়
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ গণপরিষদের কার্যবিবরণী, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের সংবিধানের মূল প্রস্তাবনা। 

আজ ৪ নভেম্বর, ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ সংবিধান দিবস’। ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ সময় এই দিনটি উপেক্ষিত থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭২ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয়েছিল। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ১১ মাসের মাথায় কীভাবে একটি বিশ্বমানের ও যুগোপযোগী সংবিধান লাভ করেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। নিচে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা ও গ্রহণের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বিস্তারিত তুলে ধরা হলো। 

১. পটভূমি ও গণপরিষদ আদেশ জারি
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করার পর একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নিজস্ব আইনি কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। এর পরদিনই অর্থাৎ ১১ জানুয়ারি তিনি ‘অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’ জারি করেন। এর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তন করা হয়। 

পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ জারি করা হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে এই গণপরিষদ গঠিত হয়, যার মূল দায়িত্ব ছিল দেশের জন্য একটি স্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন করা। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। 

২. খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন
গণপরিষদের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘সংবিধান প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটিতে একমাত্র নারী সদস্য ছিলেন বেগম রাজিয়া বানু। এছাড়া তৎকালীন বিরোধী দলের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। 

কমিটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের কাজ শুরু করে। বিভিন্ন দেশের সংবিধান পর্যালোচনা এবং দেশের আপামর জনসাধারণের মতামত সংগ্রহের জন্য তারা ব্যাপক উদ্যোগ নেন। সর্বস্তরের জনগণের কাছ থেকে মোট ৯৮টি লিখিত প্রস্তাব সংগ্রহ করা হয়েছিল। ভারত ও যুক্তরাজ্যের সংবিধানকে মূল ভিত্তি ধরে খসড়া তৈরির কাজ এগিয়ে চলে। 

৩. খসড়া উত্থাপন ও বিতর্ক
দীর্ঘ কঠোর পরিশ্রমের পর ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ড. কামাল হোসেন খসড়া সংবিধান বিল আকারে উত্থাপন করেন। ১৯ অক্টোবর থেকে এর ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়। 

সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদ ও ধারা নিয়ে গণপরিষদে ব্যাপক বিতর্ক ও আলোচনা হয়। গণপরিষদের সদস্যরা বিভিন্ন সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। মোট ৪১টি অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার পর সংবিধানের প্রতিটি বিষয়কে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়। 

৪. সংবিধান গ্রহণ ও কার্যকর
অবশেষে ৪ নভেম্বর, ১৯৭২ সালে গণপরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে ‘বাংলাদেশের সংবিধান’ গৃহীত হয়। সংবিধান গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, “এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত, এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।” 

এর ঠিক দেড় মাস পর, অর্থাৎ বিজয়ের প্রথম বার্ষিকী—১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২ থেকে এই সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়। সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপিটি ছিল হাতে লেখা, যা শিল্পী হাশেম খানের নকশায় এবং প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার আবদুর রউফের হাতের লেখায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। এতে স্বাক্ষর করেছিলেন গণপরিষদের সদস্যবৃন্দ। 


একটি দেশের সংবিধান কেবল কিছু আইনের সমষ্টি নয়, এটি রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল স্তম্ভ ছিল চারটি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সময়ের আবর্তে এই সংবিধানে বহু পরিবর্তন ও সংশোধনী আনা হলেও, ৪ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সবসময়ই অনস্বীকার্য। তরুণ প্রজন্মের জন্য নিজেদের অধিকার ও রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা বুঝতে সংবিধান রচনার এই ইতিহাস জানা অত্যন্ত জরুরি। 

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২২শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ