ইতিহাস

ইতিহাসে অনালোকিত অধ্যায়: যেভাবে লাঠি-দা নিয়ে শেখ কামালকে সীমান্ত পার করালেন ওড়াকান্দির ঠাকুরবাড়ির সদস্যরা
শেখ কামাল

নিউজ ডেস্ক

December 10, 2025

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ

মুক্তিযুদ্ধে গোপালগঞ্জ থেকে ভারত যাত্রা: এক অভূতপূর্ব মানবিক সহায়তার গল্প

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র শহীদ শেখ কামালের (১৯৪৯-১৯৭৫) মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ভারত যাত্রার ঘটনাটি অনেক ক্ষেত্রেই আড়ালে থেকে গেছে। একাত্তরের সেই উত্তাল সময়ে, নিজের জীবন বিপন্ন করে গোপালগঞ্জ ও খুলনার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে ওড়াকান্দির ঠাকুরবাড়ির সদস্যরা কীভাবে শেখ কামাল ও তার বড় ভাগ্নে ইলিয়াস আম্মেদ চৌধুরীকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন—সেই ঐতিহাসিক বিবরণ তুলে ধরেছেন রঞ্জনা বিশ্বাস। এই ঘটনা শুধু শেখ কামালের ব্যক্তিগত সাহসিকতাই নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের সময় তৃণমূল পর্যায়ে গণমানুষের প্রতিরোধ ও সংহতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

ঠাকুরবাড়ির সদস্যদের লাঠি ও দা নিয়ে কামালকে অভ্যর্থনা

১৯৭১ সালের মে মাসের কোনো এক সময় শেখ কামাল এবং ইলিয়াস আম্মেদ চৌধুরী ভারতে যাওয়ার উদ্দেশে গোপালগঞ্জের শুক্তা গ্রামের নূরুল কাদির জুনুর বাড়িতে আসেন। জুনু সাহেব শেখ কামালের ভারতে যাওয়ার বিষয়ে সহযোগিতার জন্য ঐতিহাসিক ঠাকুরবাড়িতে যোগাযোগ করেন।

খবর পেয়ে ওড়াকান্দি থেকে হিমাংশুপতি ঠাকুর, প্রভাষ বিশ্বাস, সুবির ঠাকুর, ভরত বিশ্বাস এবং মন্মথ বিশ্বাস শুক্তা গ্রামের উদ্দেশে রওনা হন। শেখ কামালকে নিরাপদে আনতে তারা সঙ্গে নিয়েছিলেন কেবল লাঠি ও দা—যা সেই সময় পাক হানাদার ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের প্রতীক ছিল। তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শেখ কামাল ও ইলিয়াস আহম্মেদকে নিরাপদে ঠাকুরবাড়িতে নিয়ে আসেন।

  • আপ্যায়ন ও মানবিকতা: ঠাকুর বাড়িতে তাদের যথাযথ আপ্যায়ন করা হয়। তবে ঠাকুরবাড়িতে লুঙ্গির প্রচলন না থাকায় তাদের জন্য রামদিয়া বাজার থেকে লুঙ্গি ও গামছা কিনে আনা হয়—যা ছিল চরম সঙ্কটের মধ্যে স্থানীয় মানুষের আন্তরিকতা ও মানবিকতার দৃষ্টান্ত।

হিমাংশুপতি ঠাকুরের ৩০০ টাকা অনুদান ও আবেগময় বিদায়

সেই রাতে ঠাকুরবাড়িতে রাত্রি যাপনের পর, পরদিন সকালে তাদের ঠাকুরবাড়ির চিরপরিচিত রাতইল ইউনিয়নের চাপ্তা গ্রামের আবদুর রহমান মিনার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। রহমান মিনা ভারতে লোক পাঠানোর কাজ করতেন।

সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রভাষ বিশ্বাস ও মন্মথ বিশ্বাস বঙ্গবন্ধুপুত্র ও ভাগ্নেকে রহমান মিনার বাড়ি পৌঁছে দেন। ওড়াকান্দি থেকে বিদায় দেওয়ার সময় হিমাংশুপতি ঠাকুর রহমান মিনার খরচ বাবদ ২০০ টাকাসহ আরও ৩০০ টাকা শেখ কামালের হাতে তুলে দেন

শেখ কামাল তখন আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন:

“আপনারা যেভাবে আমাদের যত্ন করলেন, নিজেদের পরিবারের সদস্যদের কথা চিন্তা না করে আমাদের যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন, তার কোনো তুলনা হয় না।”

আরশাদ আলী ও সীমান্ত পেরোনোর বিপজ্জনক পথ

চাপ্তার আবদুর রহমান মিনার বাড়িতে পৌঁছানোর পর তাদের দুজনের দায়িত্ব নেন সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামের আরশাদ আলী (বয়স তখন ৩৪ বছর)। আরশাদ আলী ভোরে শেখ কামালকে নিয়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা হন।

  • দীর্ঘ পথ পাড়ি: তারা পাসকার নদী পার হন এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের চোখ ফাঁকি দিয়ে নড়াইল জেলার সীমান্ত এলাকা গাজীরহাটে পৌঁছান। হামু চেয়ারম্যানের সহায়তায় তারা রেলগেট, সুশীলগাতি হয়ে দৌলতপুর এবং খুলনার গল্লামারী গণরেডিও সেন্টারের পাশ দিয়ে বেলা আড়াইটার দিকে বটিয়াঘাটা এলাকার সরাফপুর পৌঁছান।
  • রাজাকারদের হাতে ধরা: সরাফপুর থেকে নৌকায় পাইকগাছার উদ্দেশে রওনা হলে পথে কাটাখালীতে তাঁরা রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন। তবে পরিচয় গোপন করে টাকা-পয়সা দিয়ে কোনোমতে ছাড়া পান।
  • এক সপ্তাহের বিশ্রাম: দীর্ঘ যাত্রার পর পথের ক্লান্তি দূর করতে এক সপ্তাহ সেই কাটান সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের পাইকাড়া গ্রামের ঠাণ্ডাই গাজীর বাড়িতে। ঠাণ্ডাই গাজীর তিন ছেলে রাইফেল নিয়ে পালাক্রমে ডিউটি করতেন শেখ কামালের নিরাপত্তার জন্য।

এক সপ্তাহ পর আরশাদ আলী তাদের নিয়ে দেবহাটা উপজেলার ছুটিপুর ঘাট দিয়ে সীমান্ত পার হওয়ার জন্য নাংলা গ্রামে অবস্থান নেন। নাংলা গ্রামের গৃহবধূ মোমেনা খাতুন তাদের জন্য পুকুর থেকে ধরা মাছ, ডাল আর ডিম রান্না করেন। সন্ধ্যায় আরশাদ আলী তাদের সীমান্ত পার করে ভারতের হাসনাবাদ ৯ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন নুরুল হুদার কাছে পৌঁছে দেন।

সামরিক প্রশিক্ষণ ও জেনারেল ওসমানীর এডিসি

ভারতে পৌঁছে সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে শেখ কামাল ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট ওয়ার কোর্স’-এর কমিশন পান। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর এডিসি (aide-de-camp) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যদিও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি কোনো মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেননি।

এই ঘটনা প্রমাণ করে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দেশের আপামর জনগণ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে রক্ষা করতে এবং দেশকে স্বাধীন করার জন্য নিজেদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত ছিল।


সূত্র

  • রঞ্জনা বিশ্বাস রচিত বিবরণ।
  • মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষকদের নথি।
  • শেখ কামালের জীবনী ও পারিবারিক তথ্য।

বিশ্লেষণ প্রতিবেদন কারির নাম

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

বাংলাদেশের রাজনীতি' বনাম 'রাজনীতির বাংলাদেশ

নিউজ ডেস্ক

June 11, 2026

শেয়ার করুন

রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতি ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

প্রকাশিত: ১১ জুন ২০২৬

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ‘বাংলাদেশের রাজনীতি’-র থেকে ‘রাজনীতির বাংলাদেশ’ বলাটাই হয়তো বেশি গ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশ আজ এক জটিল রাজনীতির পাঁকে পড়ে গিয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিশ্বমঞ্চে ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, দেশি-বিদেশি নানা শক্তির টক্করের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এই ভূখণ্ড। চীন, পাকিস্তান, ভারত এবং পর্দার আড়ালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থের দ্বন্দ্বে এক জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে, যার কুপ্রভাব আগামী দিনে দৃশ্যমান হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার এই দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ৪টি খণ্ডের মেরুকরণ এবং আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাব নিয়ে একটি গভীর পর্যবেক্ষণমূলক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ৪ খণ্ড ও ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্তমানে দেশের শাসন ক্ষমতায় রয়েছে বিএনপি। তবে ক্ষমতার এই নতুন বিন্যাসের ভেতরেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রধানত ৪টি খণ্ডে বিভক্ত এবং তাদের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন স্পষ্ট:

  • ক্ষমতায় বিএনপি ও তাদের কৌশল: দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। তবে ক্ষমতায় বসার পর তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণ, ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া ‘জুলাই চার্টার’ বা সাংবিধানিক সংস্কারের অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করা।
  • মুহাম্মদ ইউনূসের মেয়াদের পর ছাত্রদল: ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সফলভাবে নির্বাচন দিয়ে বিএনপির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। তবে আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছাত্ররা এখন নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে দেশের জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে। তবে অভিজ্ঞতাহীন এই তরুণ নেতৃত্ব দীর্ঘমেয়াদে কতটা রাজনৈতিক পরিপক্বতা দেখাতে পারে, তার ওপর তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
  • আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থা: শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে চরম কোণঠাসা। তবে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব, জোট গড়ার ক্ষমতা ও একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক (বিশেষ করে সংখ্যালঘু সমীকরণ ও দীর্ঘদিনের দলীয় সমর্থক) একেবারে মুছে যায়নি। গত কয়েক মাসে ইতিহাসের কাটা ঘা বা ক্ষত কিছুটা হলেও শুকিয়েছে, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ বর্তমান ছাত্রনেতারাও অনুধাবন করতে পারছেন। একই সাথে, বাংলাদেশে হিন্দু ভোটারের সংখ্যা ১০%-এর কম হলেও নির্বাচনী অংকে তা মোটেও অ-গুরুত্বপূর্ণ নয়।

২. রাজনীতিতে ‘চিরস্থায়ী শত্রু বা মিত্র’ বলে কিছু নেই

রাজনীতি বিষয়টি সরল নয়, বরং অত্যন্ত জটিল। আন্তর্জাতিক শক্তি বা অভ্যন্তরীণ হাওয়া যতই পক্ষে থাকুক না কেন—গাছে উঠতে না জানলে বা শক্ত ডাল জড়িয়ে ধরে থাকার পরিপক্বতা না থাকলে ক্ষমতা ধরে রাখা যায় না। ছাত্ররা জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করলেও অভিজ্ঞতার অভাবে তাদের অন্যদের ওপর নির্ভরশীল থাকতেই হবে; কারণ জন্ম নিয়েই কোনো শিশু হাঁটতে পারে না। অন্যদের অবলম্বন তাকে করতেই হয়।

সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় ঘটতে পারে দলগুলোর কৌশলগত জোটে। বিএনপি নীতিগতভাবে ভারতবিরোধী অবস্থান দেখালেও মূলত তারা ক্ষমতাবিরোধী নয়। ক্ষমতার জন্য ভারতের সমর্থন বা সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তারা প্রকাশ্যে ভারতবিরোধিতা করলেও প্রকৃত অর্থে বা পর্দার আড়ালে তা করবে না। বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার স্বার্থে চরম আদেশিক বিপরীত মেরুর দলও (যেমন ভারতের মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ও মিমের পরোক্ষ সমীকরণ কিংবা ঔরঙ্গজেবের বিরোধিতার ইতিহাস) এক হয়ে যায়। সেই হিসেবে, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা ও ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজনে ভবিষ্যতে অভিজ্ঞ ও পরিপক্ব দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যদি এক থালায় বা জোটে বসে, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। উভয় দলই যথেষ্ট পরিপক্ব এবং অভিজ্ঞ।

৩. আন্তর্জাতিক শক্তির আগ্রাসন ও ‘ভবিষ্যতের সিরিয়া’ হওয়ার শঙ্কা়

বাংলাদেশের এই অভ্যন্তরীণ বিন্যাস ও অস্থিরতার সুযোগ নিচ্ছে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো।

  • ত্রিমুখী চাপ: এখানে পাকিস্তান নতুন করে এন্ট্রি নেওয়ার চেষ্টা করছে, পাশাপাশি ভারতের শক্তিশালী গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক নজরদারি তো রয়েছেই। এর সাথে যুক্ত হয়েছে লাভের গন্ধে ছটফট করা aggression বা আগ্রাসী চীন এবং চীন-বিরোধী ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
  • ঝুঁকির মেঘ: এই বহুপাক্ষিক ভূ-রাজনৈতিক টানাটানি যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে সিরিয়ার মতো বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর প্রক্সি-ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

তবে ভারত নিজের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা ও শিলিগুড়ি করিডোরের (চিকেনস নেক) সুরক্ষার স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশকে কখনোই হাতছাড়া হতে দিতে চাইবে না। ভারত নিজের প্রভাব খাটিয়ে এখানে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ বা তাদের অনুকূল সরকার ধরে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। আর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ‘ভারতবিরোধী সরকার’ কীভাবে সময়ের প্রয়োজনে ‘ভারতপন্থী’ হয়ে ওঠে, তার উদাহরণ দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন কিছু নয়। ভারতের জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি করার চেষ্টা চালানো হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে যে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে, তার বার্তা তিস্তা, যমুনা ও পদ্মার জলবণ্টন এবং প্রাকৃতিক ভূগোলের ওপরই নির্ভর করে। প্রকৃতির ওপর যেমন মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই, আন্তর্জাতিক আইনের নিয়ন্ত্রণও অনেক সময় পরাশক্তিগুলোর ওপর খাটে না।

৪. দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক অস্থিতিশীলতা: পাকিস্তান ও নেপাল প্রসঙ্গ

বাংলাদেশের বাইরে পুরো দক্ষিণ এশিয়া জুড়েই এখন এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অস্থিরতা চলছে:

পাকিস্তানের শোচনীয় দশা:

ইসলামাবাদ বর্তমানে ত্রিমুখী ঝামেলা, চরম অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে হিমশিম খাচ্ছে। ভারত ইতিমধ্যে পাক-অধিকৃত কাশ্মীর (POK) পুনরুদ্ধারের ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে, আফগানিস্তান খাইবার পখতুনখোয়া নিয়ে চাপ দিচ্ছে এবং ঐতিহাসিকভাবে শোষিত ও বঞ্চিত বেলুচিস্তান নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে আন্দোলন তীব্র করছে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনার শিকার বেলুচিস্তানের এই স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দাবি এবং আফগান সীমান্তের অস্থিতিশীলতা সামলাতে পাকিস্তানের পেছনে চীনের সমর্থন থাকলেও ইসলামাবাদ পুরোপুরি হিমশিম খাচ্ছে।

নেপালের রাজতন্ত্রের পুনরুত্থান ও হিন্দুরাষ্ট্রের দাবি:

নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক বড় ধরনের আদর্শিক মোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নেপালে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে গণতন্ত্র আনার বয়স ২০ বছরও পার হয়নি, কিন্তু এই অল্প সময়ে এতবার সরকার পরিবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে যে দেশটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। ফলে উন্নতির আশায় ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র আনা হলেও তা নেপালের জন্য হিতে বিপরীত বা অভিশাপ হয়েছে। বর্তমানে নেপালী হিন্দুরা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর আস্থা হারিয়ে পুনরায় রাজতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন এবং নেপালকে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষণার দাবি তুলছেন, যা তাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জোরালো ও সমর্থনযোগ্য হয়ে উঠছে।

পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত विश्लेषण

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এখন এক অত্যন্ত সংবেদনশীল মোড় পার করছে। পাকিস্তান দেউলিয়া হওয়ার পথে, নেপাল তার পরিচয়ের সংকটে ভুগছে, আর বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন রাজনৈতিক মোড়ে। এই পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ দলগুলোর ক্ষমতার লোভ বা বিদেশী শক্তির ওপর অন্ধ নির্ভরশীলতা দেশের সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করতে পারে। বাংলাদেশকে যদি ‘ভবিষ্যতের সিরিয়া’ হওয়া থেকে বাঁচতে হয়, তবে ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও তথ্যের সূত্রসমূহ (Sources)

১. দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা সমীক্ষা: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কৌশলগত কূটনীতি গবেষণা সেল (South Asian Strategic Studies)।

২. আঞ্চলিক সীমান্ত ও রাজনৈতিক ডাটা: দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক রদবদল, বেলুচিস্তান সংকট এবং নেপালের সাংবিধানিক রূপান্তর বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদন।

দেশ-বিদেশের রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক কূটনীতির এমন সব নিরপেক্ষ ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণ পড়তে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে

এক দেশ এক নির্বাচন

নিউজ ডেস্ক

June 10, 2026

শেয়ার করুন

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও অভূতপূর্ব পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। “এক দেশ, এক নির্বাচন” (One Nation, One Election)—এনডিএ (NDA) শিবিরের দীর্ঘদিনের এই স্বপ্ন ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এবার তৃতীয় মোদি সরকারের আমলেই ঘটানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জোর দাবি করা হচ্ছে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বছরভর একের পর এক নির্বাচন চলতে থাকায় দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়—এই যুক্তিকে সামনে রেখেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশবাসীকে এই ঐতিহাসিক ব্যবস্থার সমর্থনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

এই মেগা প্রজেক্টের কাজের অগ্রগতি, প্রস্তাবিত রোডম্যাপ এবং এর বিপরীতে থাকা নানাবিধ জটিলতা নিয়ে একটি বিশেষ পর্যালোচনা নিচে তুলে ধরা হলো:

কীভাবে ও কবে থেকে কার্যকর হবে? রামনাথ কোবিন্দ কমিটির প্রস্তাব

এই মহাগুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াটি খতিয়ে দেখতে ও কার্যকর করতে ইতিমধ্যেই ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। উক্ত কমিটি ইতিমধ্যে তাদের চূড়ান্ত রিপোর্টও পেশ করেছে।

কমিটি ও আইন কমিশনের সম্ভাব্য প্রস্তাবনার মূল বিষয়গুলো হলো:

  • প্রথম ধাপ: প্রাথমিকভাবে সারা দেশের লোকসভা এবং সবকটি राज्यों বিধানসভা নির্বাচন একই সাথে সম্পন্ন করা হবে।
  • দ্বিতীয় ধাপ: লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরবর্তী ১০০ দিনের মধ্যে সমস্ত আঞ্চলিক বা স্থানীয় নির্বাচনগুলি একত্রে করা যেতে পারে।
  • শুরুর সময়: আইনসভার তিনটি স্তর—অর্থাৎ লোকসভা, রাজ্য বিধানসভাসমূহ এবং পুরসভা, পৌর নিগম ও গ্রাম পঞ্চায়েতের মতো আঞ্চলিক প্রশাসনকে একই সুতোয় গেঁথে ২০২৯ সাল থেকে এই যৌথ নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করার কথা ভাবা হচ্ছে।
  • বিকল্প আইনি ব্যবস্থা: যদি কোথাও কোনো নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়া যায় কিংবা সরকার গঠনের পর অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয়, তবে যাতে রাজনৈতিক সংকট তৈরি না হয়, সেজন্য নির্বাচনী ব্যবস্থায় জোট সরকার গঠনের বিশেষ বিধিও রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিরোধীদের আপত্তির মূল কারণ ও বাস্তব কিছু বড়

বিজেপি ও তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এই প্রক্রিয়া চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, দেশের বিরোধী দলগুলো এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক দল কিন্তু ইতিমধ্যেই এই ভাবনার তীব্র বিরোধিতা করেছে। তাদের মতে, সাংবিধানিক ও ব্যবহারিক নানাবিধ কারণে ভারতে এটি কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব। বিরোধীদের মূল আপত্তি ও চ্যালেঞ্জগুলো হলো:

১. স্থানীয় ইস্যু ও আঞ্চলিক দলগুলোর অস্তিত্বের সংকট:

আঞ্চলিক দলগুলির প্রধান আপত্তি হলো—তাদের আর্থিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতা বড় জাতীয় দলগুলির মতো বিপুল নয়। যদি একই সাথে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে প্রচারণায় বিপুল অর্থ ও সম্পদশালী দলগুলো অনেক এগিয়ে যাবে। এর ফলে জাতীয় ইস্যুগুলোই মূলত প্রচারের আলোয় চলে আসবে এবং জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় বা আঞ্চলিক সমস্যাগুলো পুরোপুরি ঢাকা পড়ে যাবে।

২. সাংবিধানিক ও আইনি অস্পষ্টতা:

বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, মোদি সরকারের এই খসড়া প্রস্তাবে মাঝপথে কোনো আইনসভা ভেঙে দেওয়া হলে কী হবে, রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে কিংবা মিলিজুলি সরকার গঠন নিয়ে আইনি কাঠামোর কোনো পরিষ্কার বা স্বচ্ছ রূপরেখা এখনও দেওয়া হয়নি।

৩. ইভিএম (EVM) সংকট ও বিশাল আর্থিক ব্যয়ভার:

বর্তমানে ভারতের নির্বাচন কমিশন একই ইভিএম মেশিন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বিভিন্ন राज्यों নির্বাচনে ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু একই সাথে সারা দেশে সমস্ত স্তরের নির্বাচন করতে গেলে এক ধাক্কায় কোটি কোটি নতুন ইভিএম ও আনুষঙ্গিক技术的 প্রয়োজন হবে।

  • ব্যয়ভারের অংক: এই বিশাল সংখ্যক নতুন ইভিএম তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের বিপুল খরচের বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে—এর জন্য আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। তবে এই বিশাল তহবিলের সঠিক ব্যয়ভার কীভাবে বহন করা হবে, তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে।

পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত বিশ্লেষণ

“এক দেশ, এক নির্বাচন” ব্যবস্থাটি যদি কেবল জাতীয় ইস্যুকে মুখ্য করে তোলে, তবে ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশের আঞ্চলিক দাবি-দাওয়াগুলো হারিয়ে যাওয়ার একটা বড় ঝুঁকি থেকে যায়, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বা সামাজিক ক্ষতের সৃষ্টি করতে পারে। লোকসভা নির্বাচনে একক দাপট কিছুটা ধাক্কা খাওয়ার পর বর্তমান মোদি সরকারের জন্য সব পক্ষকে এক টেবিলে আনা এবং এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করা নিঃসন্দেহে এক চরম পরীক্ষা। তবে সরকার যদি সমস্ত আইনি, আর্থিক ও আঞ্চলিক জটিলতা সঠিকভাবে সামলে এই প্রক্রিয়াটি সুসম্পন্ন করতে পারে, তবে সাধারণ নাগরিক হিসেবে ভারতের বিশাল একটি অংশ একে স্বাগত জানাবে।

নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও তথ্যের সূত্রসমূহ (Sources)

১. ভারতের নির্বাচন ও রাজনৈতিক ঘোষণা: ভারতের প্রধানমন্ত্রীর স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ এবং এনডিএ (NDA) সরকারের অভ্যন্তরীণ সূত্র।

২. রামনাথ কোবিন্দ কমিটি ও আইন কমিশন রিপোর্ট: কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচনী সংস্কার বিষয়ক বিশেষ কমিটির খসড়া প্রস্তাব ও ব্যয়নির্বাহ সংক্রান্ত সরকারি ডেটা।

উপদেশের ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির এমন সব বিশ্লেষণধর্মী খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে

আমেরিকা-জাপান

নিউজ ডেস্ক

June 9, 2026

শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

প্রকাশিত: ৯ জুন ২০২৬

বিশ্বমঞ্চে পরাশক্তি চীনের ক্রমাগত ও নীরব আধিপত্য বিস্তার ওয়াশিংটনকে এক চরম অস্বস্তিকর ও তেতো বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমেরিকা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, একা হাতে এই প্রযুক্তির মহাযুদ্ধে চীনের সাথে জেতা তাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর ঠিক এই কারণেই, চীনের সেই অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার লাগাম টেনে ধরতে আমেরিকা এই সপ্তাহে দাবার বোর্ডে তাদের সবচেয়ে বড় ও অপরিহার্য ঘুঁটি—‘জাপান’-কে মাঠে নামিয়ে দিয়েছে।

চলতি সপ্তাহে আমেরিকা ও জাপানের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। কাগজে-কলমে এটিকে অত্যন্ত সাধারণ ও চিরাচরিত একটি বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা চুক্তি মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এই চুক্তির ভেতরের সমীকরণই নির্ধারণ করবে একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে পুরো পৃথিবীর ওপর কার একচ্ছত্র শাসন ও মোড়লগিরি কায়েম থাকবে।

বিশ্বজয়ের ৪ স্তম্ভ: কেন এই চুক্তি সাধারণ কোনো বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা নয়?

এই চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশ মূলত ৪টি উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একযোগে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এগুলো কোনো সাধারণ আবিষ্কার বা সস্তা গ্যাজেট নয়; এর প্রতিটির মধ্যে লুকিয়ে আছে আগামী ১০০ বছরের জন্য পুরো পৃথিবীর ওপর একাধিপত্য বিস্তার করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা:

১. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence):

এআই হলো এই আধুনিক যুগের মূল মগজ। এটি এমন এক ডিজিটাল বুদ্ধিমত্তা যা একটি দেশের সমগ্র অর্থনীতি, সামরিক বাহিনী এবং বিজ্ঞান চর্চাকে একাই নিয়ন্ত্রণ করবে। যার হাতে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী এআই থাকবে, সে যেকোনো প্রতিপক্ষের চেয়ে বহুগুণ দ্রুত চিন্তা করতে পারবে এবং দিনশেষে সেই জিতবে।

২. কোয়ান্টাম কম্পিউটিং (Quantum Computing):

এটি হলো এমন এক জাদুকরী চাবি যা দিয়ে দুনিয়ার সমস্ত গোপন তালা এক নিমেষে খুলে ফেলা সম্ভব। আজকের দিনে ব্যাংকের পাসওয়ার্ড, রাষ্ট্রীয় গোপন নথিপত্র কিংবা সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ—সবকিছুই ডিজিটাল এনক্রিপশনে সুরক্ষিত থাকে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার পুরোপুরি চূড়ান্ত রূপ পেলে সে যেকোনো জটিল শৃঙ্খল তুড়ি মেরে ভেঙে ফেলার ক্ষমতা রাখবে। যে দেশ এই প্রযুক্তি প্রথম আয়ত্তে আনবে, সে নিজের ড্রয়িংরুমে বসে পুরো পৃথিবীর সমস্ত গোপন রহস্য পড়তে পারবে, অথচ নিজের দেশের একটি গোপন তথ্যও অন্য কাউকে ছুঁতে দেবে না।

৩. নিউক্লিয়ার ফিউশন (Nuclear Fusion):

এই প্রযুক্তি হলো আক্ষরিক অর্থেই—উত্তপ্ত সূর্যকে একটি কৃত্রিম বাক্সের মধ্যে বন্দি করে ফেলার মতো এক অলৌকিক কাণ্ড। যে রাষ্ট্র একবার এই প্রযুক্তির রহস্য ভেদ করতে পারবে, তাকে শক্তির সুরক্ষার জন্য আর কোনোদিন অন্য কোনো দেশের খনিজ তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের দিকে ভিখারির মতো হাত বাড়াতে হবে না। সে চিরতরের জন্য এক অন্তহীন ও সীমাহীন শক্তির মালিক বনে যাবে।

৪. বায়োটেকনোলজি (Biotechnology):

এটি হলো চিকিৎসা বিজ্ঞানের আসল ভবিষ্যৎ। অন্য কোনো পরাশক্তির মুখাপেক্ষী না হয়ে একটি দেশ যেন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজেদের মহামারী বা রোগের ওষুধ এবং জিনগত চিকিৎসা নিজেদের মাটিতেই উৎপাদন করতে পারে, এটি হলো সেই সক্ষমতা।

সহজ কথায়—বুদ্ধি, গোপন রহস্য, অন্তহীন শক্তি এবং জীবন—এই চারটি স্তম্ভ যার হাতের মুঠোয় থাকবে, একবিংশ শতাব্দীর আসল জমিদারি মূলত তারই থাকবে।

নীরবে এগিয়ে যাওয়া জেদি চীন ও ওয়াশিংটনের উদ্বেগ

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই মরণপণ লড়াইয়ের মাঠে চীন কোথায় দাঁড়িয়ে ছিল? চীন বিগত বহু বছর ধরে অত্যন্ত নীরবে ও সুনিপুণ চাতুরিতে এই দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল।

  • পেটেন্টের একক মালিক: আজ কোয়ান্টাম প্রযুক্তির ক্ষেত্রে গোটা বিশ্বে যত পেটেন্ট বা স্বত্ব রয়েছে, তার সিংহভাগের একক মালিক খোদ বেইজিং।
  • বিলিয়ন ডলারের ফান্ড: ওদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফিউশন রিঅ্যাক্টর এবং হাই-টেক উৎপাদনের পেছনে তারা প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অবিশ্বাস্য ফান্ড ঢালছে।
  • অভিন্ন লক্ষ্য: চীনের কমিউনিস্ট সরকার, তাদের পিপলস লিবারেশন আর্মি এবং দেশের বড় বড় টেক কোম্পানিগুলো আজ স্রেফ একটিমাত্র অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে—যেকোনো উপায়ে এই চারটি প্রযুক্তির ওপর নিজেদের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

আমেরিকার কেন হঠাৎ জাপানের দরজায় কড়া নাড়তে হলো?

আমেরিকার কাছে টাকার কোনো অভাব নেই, সিলিকন ভ্যালির মতো বিশ্বের সেরা সফটওয়্যার বা কোডিং ইন্ডাস্ট্রিও তাদের হাতের মুঠোয়। তাহলে এই অসম লড়াইয়ে জেতার জন্য তাদের হঠাৎ জাপানের দরজায় কেন কড়া নাড়তে হলো?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে এই উচ্চ প্রযুক্তিগুলোর এক অত্যন্ত গোপন ও অলিখিত নিয়মের মধ্যে। এই প্রযুক্তিগুলোর কোনোটিই স্রেফ কম্পিউটারের চমৎকার কিছু কোডিং বা কাগজের কাড়ি কাড়ি টাকা দিয়ে রাতারাতি ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা যায় না। এর প্রতিটির পেছনেই প্রয়োজন হয় এক অত্যন্ত জটিল ও দৃশ্যমান ভৌত বা ফিজিক্যাল পরিকাঠামো। এর জন্য দরকার হয় পৃথিবীর সবচেয়ে খাঁটি ও নিখুঁত কাঁচামাল, ন্যানোমিটার লেভেলের অতি সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি এবং সেই যন্ত্রগুলোকে কোনো প্রকার ত্রুটি ছাড়া পরিচালনা করার মতো এক ইস্পাতকঠিন ইঞ্জিনিয়ারিং শৃঙ্খলা।

আর এই ভৌত পরিকাঠামো, আসল যান্ত্রিক শক্তি এবং এক চুল বা এক মাইক্রনও এদিক-ওদিক না করে নিখুঁতভাবে কাজ করার কিংবদন্তিতুল্য ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতা আজ একচেটিয়াভাবে জাপানেরই হাতের মুঠোয় বন্দি। আপনি চাইলে রাতারাতি কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ করে এক সপ্তাহের মধ্যে একটি চমৎকার সফটওয়্যার লিখে ফেলতে পারবেন, কিন্তু জাপানিদের এই শত বছরের মজ্জাগত উৎপাদন শৃঙ্খলা কোনোদিনও টাকা দিয়ে এক রাতে তৈরি করতে পারবেননা।

মাঠের বাস্তব উদাহরণ: জাপানের অপরিহার্য কারিগরি শক্তি

  • মাইক্রোচিপের পরাশক্তি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা কোয়ান্টাম কম্পিউটিং—এর প্রতিটির বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য উপাদান হলো সর্বাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপ। আর এই চিপ তৈরির মূল কাঁচামাল এবং জাপানি নিখুঁত আল্ট্রা-প্রিসিশন মেশিন ছাড়া চিপের একটি কণাও উৎপাদন করা অসম্ভব। আজ পুরো বিশ্বের মোট চিপ উৎপাদনকারী দানবীয় মেশিনগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই একচেটিয়াভাবে তৈরি হয় জাপানের মাটিতে। এছাড়া চিপ তৈরিতে ব্যবহৃত বিশেষ রাসায়নিক উপাদান এবং শতভাগ খাঁটি ও পরিশোধিত সিলিকন সরবরাহের ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে জাপানের কোনো সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীই নেই।
  • নিউক্লিয়ার ফিউশনের জাদুকরী চুম্বক: ফিউশন প্রক্রিয়াকে বাস্তবে সচল রাখতে হলে প্রয়োজন হয় অত্যন্ত শক্তিশালী সুপার-কন্ডাক্টিং ম্যাগনেট বা চৌম্বকীয় ক্ষেত্র। এই বিশেষ চুম্বক ছাড়া কোনো ফিউশন রিঅ্যাক্টর চালু করা অবাস্তব কল্পনা। আর বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও উচ্চাভিলাষী যে আন্তর্জাতিক ফিউশন প্রজেক্ট চলছে, তার প্রয়োজনীয় চুম্বকগুলোর প্রায় অর্ধেকই এককভাবে সরবরাহ করছে জাপান।

সহজ কথায় বলতে গেলে—আমেরিকার কাছে হয়তো এক বিশাল প্রগতিশীল মগজ বা আইডিয়া রয়েছে, কিন্তু সেই মগজের কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য যে জাদুকরী হাত, অকাট্য কাঁচামাল আর কঠোর শৃঙ্খলা প্রয়োজন—তা রয়েছে একমাত্র জাপানের কাছে। আমেরিকা আজ জাপানকে কোনো পরম বন্ধুত্বের টানে বেছে নেয়নি, বরং এটি ছিল ওয়াশিংটনের এক চরম নিরুপায় বাধ্যবাধকতা। জাপানের এই নিখুঁত ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাকআপ ছাড়া আমেরিকা কোনোদিনও চীনের এই অগ্রযাত্রাকে রুখে দিতে পারবে না।

পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত বিশ্লেষণ

সুতরাং, এই মুহূর্তে আমরা এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে একবিংশ শতাব্দীর আসল নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা কিন্তু আর কার কাছে কত বড় সেনাবাহিনী আছে কিংবা কার ভল্টে কত ট্রিলিয়ন ক্যাশ টাকা আছে—তার ওপর নির্ভর করছে না। বরং যে পক্ষ এই চারটি প্রযুক্তির ওপর প্রথমে নিজেদের একক আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে, দিনশেষে মুকুট তারই মাথায় উঠবে।

দাবার বোর্ডের একদিকে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে অত্যন্ত নিঃশব্দে ও কৌশলে এগিয়ে যাওয়া এক জেদি চীন। আর অন্যদিকে রয়েছে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দুনিয়ার সবচেয়ে ক্রুশাল বা অপরিহার্য পার্টনারকে পাশে টেনে নেওয়া এক চতুর আমেরিকা। ভবিষ্যৎ কোনোদিনও স্রেফ ডায়েরির পাতায় চমৎকার আইডিয়া রাখা মানুষের কথা শুনে চলে না; ভবিষ্যৎ চলে মূলত তার ইশারায়—যে সেই আইডিয়াকে বাস্তবে নিখুঁতভাবে নির্মাণ করার ক্ষমতা রাখে।

নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও তথ্যের সূত্রসমূহ (Sources)

১. আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি: হোয়াইট হাউস ও জাপানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল প্রেস রিলিজ এবং আন্তর্জাতিক স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালিসিস রিপোর্ট (সংযুক্ত কন্টেন্ট ফাইল)।

২. বিশ্ব চিপ ও ফিউশন প্রযুক্তি বাজার: গ্লোবাল সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন এবং আন্তর্জাতিক ফিউশন প্রজেক্ট (ITER) ডাটাবেজ।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে

২৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ