অনলাইনে আয়

ইন্টারনেটের ইতিহাস ও বাংলাদেশে ৫জি বিপ্লব: আর্পানেট থেকে আধুনিক সাবমেরিন ক্যাবল
৫জি প্রযুক্তি

নিউজ ডেস্ক

August 9, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বিশেষ প্রতিবেদন — আধুনিক সভ্যতার চালিকাশক্তি হলো ইন্টারনেট। ১৯৬০-এর দশকে স্নায়ুযুদ্ধের আবহে শুরু হওয়া একটি সামরিক গবেষণা প্রকল্প থেকে আজকের বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হাই-স্পিড ৫জি নেটওয়ার্ক—ইন্টারনেটের এই রূপান্তর মানব ইতিহাসের অন্যতম যুগান্তকারী ঘটনা। বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেটের উৎপত্তি, বিকাশের ইতিহাস এবং বাংলাদেশে ইন্টারনেটের আগমন থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের নতুন সাবমেরিন ক্যাবল ও ৫জি প্রযুক্তির বর্তমান চিত্র এই প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

১. বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট আবিষ্কারের ইতিহাস

ইন্টারনেটের উদ্ভব কোনো একক বিজ্ঞানীর হাত ধরে হয়নি; বরং এটি বহু দশক ধরে বিজ্ঞানের ধারাবাহিক গবেষণার ফল।

[ কোল্ড ওয়ার / ARPANET (১৯৬৯) ] ──► [ TCP/IP প্রোটোকল (১৯৭৪) ] ──► [ WWW ও পাবলিক ইন্টারনেট (১৯৯১) ]

ক. আর্পানেট (ARPANET): বিশ্বের প্রথম ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক

  • উৎপত্তি: ১৯৬৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের অধীনস্থ ‘Advanced Research Projects Agency’ (ARPA) স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন পারমাণবিক হামলায় অক্ষত থাকতে পারে এমন যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে ARPANET তৈরি করে।
  • প্রথম বার্তা (২৯ অক্টোবর, ১৯৬৯): আর্পানেটের মাধ্যমে প্রথম বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। বার্তাটি ছিল “LOGIN”, তবে “LO” লেখার পরই সিস্টেম ক্র্যাশ করে। এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম ডিস্ট্রিবিউটেড নেটওয়ার্ক বার্তা।
  • প্যাকেট সুইচিং (Packet Switching): পল বারান ও লিওনার্ড ক্লেইনরক উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বড় ডেটাকে ছোট ছোট প্যাকেটে ভাগ করে ভিন্ন ভিন্ন রুটে গন্তব্যে পাঠানো শুরু হয়।

খ. ইন্টারনেটের জনক ও WWW-এর উন্মোচন

  • TCP/IP প্রোটোকল (১৯৭৪): ভিন্টন সার্ফ (Vint Cerf) ও বব কান (Bob Kahn) আবিষ্কার করেন TCP/IP প্রোটোকল, যা বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন নেটওয়ার্ককে একত্রিত করার ভাষা জোগায়। তাদের ‘ইন্টারনেটের জনক’ বলা হয়।
  • ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (১৯৮৯-১৯৯১): স্যার টিম বার্নার্স-লি (Tim Berners-Lee) উদ্ভাবন করেন WWW (World Wide Web) এবং HTML ল্যাঙ্গুয়েজ। ১৯৯১ সালে ইন্টারনেট সর্বসাধারণের জন্য উম্মুক্ত করা হয়।

২. বাংলাদেশে ইন্টারনেটের আগমন ও বিবর্তন

বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তিতে রূপান্তর শুরু হয় ধাপে ধাপে:

সময়কালপ্রযুক্তির ধরনবিবরণ ও মাইলফলক
১৯৯২ – ১৯৯৪অফলাইন ইমেইল (UUCP)‘ড্রিক আইসিটি’ প্রথম অফলাইন ইমেইল চালু করে। মেসেজ জমা রেখে দিনে কয়েকবার বিদেশের সার্ভারে ডায়াল-আপ করা হতো।
৬ জুন, ১৯৯৬অনলাইন ইন্টারনেটISN (Information Services Network)-এর মাধ্যমে দেশে প্রথম অনলাইন ইন্টারনেট চালু হয় (bangla.net)। ভি-স্যাটভিত্তিক ৬ কেবিপিএস গতির ডায়াল-আপ কানেকশনে মিনিটে খরচ হতো ৩ টাকা।
২০০৬ (মে)সাবমেরিন ক্যাবল (SEA-ME-WE 4)বাংলাদেশ প্রথম আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবল কনসোর্টিয়ামে যুক্ত হয়ে কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশনের মাধ্যমে উচ্চগতির অপটিক্যাল ফাইবার যুগে প্রবেশ করে।

৩. বাংলাদেশে সাবমেরিন ক্যাবল ও ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা (২০২৬ হালনাগাদ)

বর্তমানে দেশের ক্রমবর্ধমান ডেটা চাহিদা মেটাতে এবং একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমাতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্প যুক্ত হচ্ছে:

                          [ বাংলাদেশের মোট ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা ]
                                            │
      ┌─────────────────────────────────────┼─────────────────────────────────────┐
      ▼                                     ▼                                     ▼
[ SEA-ME-WE 6 (সরকারি) ]            [ BPCS Consortium (বেসরকারি) ]               [ বাঘা-১ (Bagha-1) ]
(অতিরিক্ত ১৩.২ Tbps যুক্ত)           (কক্সবাজার-সিঙ্গাপুর রুটে ৫১ Tbps)             (ব্যাকআপ ও সাইবার নিরাপত্তা)
  1. তৃতীয় সরকারি সাবমেরিন ক্যাবল (SEA-ME-WE 6): সরকারি প্রতিষ্ঠান BSCCL-এর অধীনে সিঙ্গাপুর থেকে ফ্রান্স পর্যন্ত বিস্তৃত এই ক্যাবলটি কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশনের সাথে যুক্ত হচ্ছে, যা দেশে ১৩.২ টিবিপিএস (Tbps) নতুন ব্যান্ডউইথ যুক্ত করবে।
  2. প্রথম বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল (BPCS Consortium): নোኪያ (Nokia)-র ইকুইপমেন্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে বেসরকারি কনসোর্টিয়াম সিঙ্গাপুরের সাথে সরাসরি নিজস্ব ক্যাবল বসাচ্ছে। এর ফলে দেশে ৫১ টিবিপিএস (Tbps) সক্ষমতা বাড়বে এবং লেটেন্সি কমে মাত্র ৩৩ মিলি-সেকেন্ডে নামবে।
  3. বাঘা-১ (Bagha-1): সিডিনেট (CdNet) ও মার্কিন USTDA-এর অর্থায়নে অতিরিক্ত সাবমেরিন ক্যাবলের কাজ চলছে, যা দেশের সাইবার সিকিউরিটি ও ব্যাকআপ নিশ্চিত করবে।

৪. বাংলাদেশে ৫জি (5G) প্রযুক্তির বর্তমান অবস্থা ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে শহর ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে ৫জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কাজ এগিয়ে চলেছে:

  • বাণিজ্যিক কভারেজ: গ্রামীণফোন ও রবি বিভাগীয় শহরসহ দেশের ৪৪০টিরও বেশি নির্দিষ্ট লোকেশনে (বিমানবন্দর, বিশ্ববিদ্যালয় ও বাণিজ্যিক এলাকা) ৫জি সেবা সচল করেছে। টেলিটকও তাদের অবকাঠামো প্রস্তুত করছে।
  • নতুন স্পেকট্রাম পরিকল্পনা: বিটিআরসি (BTRC) ৫জি-র পূর্ণাঙ্গ কভারেজের জন্য ৩.৫ গিগাহার্টজ (GHz) ব্যান্ডের নতুন তরঙ্গ বরাদ্দের রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করছে।

৫জি বিস্তারের প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ

চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রবর্তমান চিত্র ও বাধা
৫জি হ্যান্ডসেটের অভাবস্থানীয় বাজারে উৎপাদিত ফোনের মাত্র ৪.৭৪% ৫জি সমর্থিত। এখনও ৬১% ফিচার ফোন এবং ৩৪% ৪জি হ্যান্ডসেট ব্যবহার হচ্ছে।
শিল্প খাতের ইকোসিস্টেমস্মার্ট পোর্ট, কৃষি ও অটোমেটেড ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে ৫জি-র পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার গড়ে উঠতে আরও সময়ের প্রয়োজন।

ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি

নতুন সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পগুলো সম্পূর্ণ সচল হলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা ৫০,০০০ জিবিপিএস (Gbps) ছাড়িয়ে যাবে। এর ফলে একদিকে যেমন গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের খরচ হ্রাস পাবে, অন্যদিকে ৫জি প্রযুক্তির পূর্ণ সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়ে ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত শক্ত হবে।

১. আন্তর্জাতিক ইন্টারনেটের ইতিহাস ও আর্পানেট (ARPANET)

  • আর্পানেট ও প্রথম বার্তার ইতিহাস:
    • উৎস: US Defense Advanced Research Projects Agency (DARPA)UCLA Computer Science Department Archive
    • তথ্য: ১৯৬৯ সালের ২৯ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (UCLA)-র অধ্যাপক লিওনার্ড ক্লেইনরক (Leonard Kleinrock) ও তার দল প্রথম “LOGIN” বার্তাটি পাঠাতে গিয়ে “LO” লেখার পর সিস্টেম ক্র্যাশ করে।
  • TCP/IP ও ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (WWW):
    • উৎস: Internet Hall of Fame এবং CERN (European Organization for Nuclear Research)
    • তথ্য: ১৯৭৪ সালে ভিন্টন সার্ফ ও বব কান কর্তৃক TCP/IP প্রোটোকল আবিষ্কার এবং ১৯৮৯-১৯৯১ সালে স্যার টিম বার্নার্স-লি কর্তৃক WWW আবিষ্কারের মাধ্যমে পাবলিক ইন্টারনেট উন্মুক্ত হয়।

🇧🇩 ২. বাংলাদেশে ইন্টারনেটের আগমন ও বিবর্তন

  • প্রথম অনলাইন ইন্টারনেট ও ISN (১৯৯৬):
    • উৎস: বাংলাদেশ টেলিকম বা রেজিস্টার্ড আইএসপি আর্কাইভ এবং তৎকালীন সংবাদপত্র ও জাতীয় প্রযুক্তি আর্কাইভ।
    • তথ্য: ১৯৯৬ সালের ৬ জুন ‘ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক’ (ISN)-এর মাধ্যমে bangla.net ডোমেইনে ভি-স্যাট (VSAT) প্রযুক্তিতে ডায়াল-আপ ৬ কেবিপিএস ইন্টারনেটের প্রথম বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয়।
  • প্রথম সাবমেরিন ক্যাবল SEA-ME-WE 4 (২০০৬):
    • উৎস: বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেড (BSCCL) প্রেস রিলিজ।
    • তথ্য: ২০০৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ফাইবার অপটিক ক্যাবল কনসোর্টিয়ামের সাথে যুক্ত হয়ে কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশন চালু করে।

📡 ৩. বাংলাদেশে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল ও ৫জি প্রযুক্তি (২০২৬)

  • SEA-ME-WE 6 ও বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল (BPCS):
    • উৎস: BSCCL অফিসিয়াল রিপোর্ট এবং BTRC (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন) বিজ্ঞাপিত নীতিমালা ও নোটিফিকেশন।
    • তথ্য: সি-মি-উই ৬ ক্যাবল সংযোগের মাধ্যমে নতুন ব্যান্ডউইথ সংযোজন এবং বেসরকারী খাতের বিপিসিএস কনসোর্টিয়াম ও নোকিয়ার (Nokia) মধ্যে অবকাঠামোগত চুক্তি সংক্রান্ত প্রতিবেদন।
  • বাংলাদেশে ৫জি স্পেকট্রাম ও কভারেজ রিপোর্ট:
    • উৎস: BTRC Annual/Periodic Reports এবং মোবাইল অপারেটর (গ্রামীণফোন, রবি ও টেলিটক)-এর অফিসিয়াল নেটওয়ার্ক আপডেট।
    • তথ্য: দেশের প্রধান প্রধান বিভাগীয় শহর ও নির্দিষ্ট হটস্পটে ৫জি কভারেজ প্রদান এবং বিটিআরসি কর্তৃক হ্যান্ডসেট উৎপাদন সংক্রান্ত পরিসংখ্যান (যেখানে দেশের মোট চাহিদার অধিকাংশ এখনো ৪জি ও ফিচার ফোন নির্ভর)।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে

নিউজ ডেস্ক

September 10, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিনিধি : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
বিভাগ (Category): জাতীয়

নিজস্ব প্রতিবেদক, অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশের সময় ও তারিখ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,

স্থান: ঢাকা

ঢাকা: মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ (১৯৩৯-১৯৪৫)-এর ফলাফলে যে সামরিক শক্তিটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল, তা হলো অবিভক্ত ভারতের সামরিক বাহিনী। বিশ্বজুড়ে তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপস্থিতি থাকলেও, যুদ্ধের ময়দানে মিত্রবাহিনীর অন্যতম মূল শক্তি ছিল ভারতীয় তরুণরা। বর্তমান ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ একত্রিত হয়ে এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শক্তির যুদ্ধ হলেও ভারতীয় সেনাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক সামরিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছে।

ইতিহাসের সর্ববৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী

১৯৩৯ সালে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তখন অবিভক্ত ভারতীয় সাঁজোয়া বহরে সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র ২ লাখের কাছাকাছি। কিন্তু ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়া নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২৫ লাক্ষে (২.৫ মিলিয়ন)।

এই বিশাল সামরিক সমাবেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—এতে কোনো বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ (Conscription) ছিল না। সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই বাহিনীটি ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ‘অল-ভলান্টিয়ার আর্মি’ বা স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী হিসেবে বিশ্ব রেকর্ডে স্থান করে নেয়।

[১৯৩৯: ২ লাখ সৈন্য] ──► স্বেচ্ছাসেবী অংশগ্রহণ ──► [১৯৪৫: ২৫ লাখ সৈন্য (সর্ববৃহৎ ভলান্টিয়ার বাহিনী)]

তিন মহাদেশের রণক্ষেত্র ও বীরত্বের চিহ্ন

ভারতীয় সৈন্যরা কেবল এশিয়ার মাটিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তারা এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ—এই তিন মহাদেশের বিভিন্ন দুর্গম ও প্রতিকূল যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে লড়াই করেছেন।

  • আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য অভিযান: উত্তর আফ্রিকায় জার্মানি ও ইতালির যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে এবং মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানে ভারতীয় সৈন্যরা কৌশলগত সাফল্য এনে দেন।
  • ইতালি অভিযান ও মন্টি ক্যাসিনো: ইউরোপের ইতালি অভিযানে মিত্রবাহিনীর জয়ে ভারতীয়দের ভূমিকা ছিল অসামান্য। বিশেষ করে রক্তক্ষয়ী ‘ব্যাটল অফ মন্টি ক্যাসিনো’ মুক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের পরাক্রম বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়।
  • বার্মা ও ইম্ফল-কোহিমার যুদ্ধ: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মিত্রবাহিনীর অবস্থান টিকিয়ে রাখতে ভারতীয় সৈন্যরা বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) অভিযানে অংশ নেন। ১৯৪৪ সালে ভারতের ইম্ফল ও কোহিমার যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ লড়াই চালিয়ে তারা জাপানি বাহিনীর ভারত আক্রমণের চূড়ান্ত আগ্রাসন রুখে দেন।

যুদ্ধের ময়দানে অসাধারণ সাহসিকতা ও বীরত্ব প্রদর্শনের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতীয় সৈন্যদের ৩১টি ‘ভিক্টোরিয়া ক্রস’ (ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ সম্মাননা) প্রদান করা হয়, যা সমগ্র মিত্রবাহিনীর অর্জিত মোট ভিক্টোরিয়া ক্রসের প্রায় ১৫ শতাংশ।

ক্ষয়ক্ষতি ও বাংলার ছিয়াত্তরের মন্বন্তর

এই যুদ্ধে বিজয় অর্জন করতে গিয়ে ভারতীয় বাহিনীকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রায় ৮৭,০০০ থেকে ৮৯,০০০ ভারতীয় সৈন্য শহীদ হন। এছাড়া হাজার হাজার সেনা গুরুতর আহত হন এবং একটি বিশাল অংশ শত্রু শিবিরে বন্দী হিসেবে আটক থাকেন।

সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি এই যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব পড়েছিল তৎকালীন বাংলায়। যুদ্ধের রশদ ও খাদ্যসামগ্রী যুদ্ধক্ষেত্রে জোগাতে গিয়ে তৈরি হয় ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ বা দুর্ভিক্ষ। প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও যুদ্ধের বলি হয়ে বাংলায় প্রায় ৩০ লাখ সাধারণ বেসামরিক নাগরিক অনাহারে প্রাণ হারান।

[দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ] ──► রসদ ও খাদ্য স্থানান্তর ──► ১৯৪৩-এর বাংলা দুর্ভিক্ষ ──► ৩০ লাখ বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু

দ্বিমুখী ধারা: ব্রিটিশ রাজ বনাম আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যদের অবস্থান দুটি ভিন্ন ও ঐতিহাসিক ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল:

১. ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনী: একটি বিশাল অংশ ব্রিটিশ পতাকাতলে থেকে মিত্রবাহিনীর হয়ে অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায়।

২. আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA): অন্যদিকে, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় জাপানিদের হাতে বন্দী হওয়া হাজার হাজার ব্রিটিশ-ভারতীয় সৈন্য নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আহবানে সাড়া দিয়ে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এ যোগ দেন। তারা অক্ষশক্তির সমর্থন নিয়ে ব্রিটিশদের হাত থেকে জন্মভূমিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সরাসরি ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

স্বাধীনতার সূচনা ও ইতিহাসের মূল্যায়ন

যুদ্ধের সমাপ্তি এবং ভারতীয় সেনাদের রাজনৈতিক সচেতনতা ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভকে ত্বরান্বিত করতে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ কমান্ডার-ইন-চিফ ফিল্ড মার্শাল ক্লদ অচিনলেক স্বীকার করেছিলেন যে, ভারতীয় সৈন্যদের অসামান্য অবদান ছাড়া ব্রিটেন দুটি বিশ্বযুদ্ধের কোনোটিতেই জয়লাভ করতে পারত না।

স্বাধীনতার পর বহু বছর ধরে এই ইতিহাসকে কিছুটা আড়ালে রাখা হয়েছিল—কেননা রাজনৈতিকভাবে এটিকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি রক্ষার যুদ্ধ হিসেবে দেখা হতো। তবে আধুনিক সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশ্ব রাজনীতি পুনর্গঠনে এবং স্বাধীন উপমহাদেশের ভিত্তি তৈরিতে ২৫ লাখ ভারতীয় সেনার এই মহাকাব্যিক বীরত্ব ও আত্মত্যাগ ছিল অন্যতম প্রধান ভিত্তিপ্রস্তর।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ব্লু স্টার

নিউজ ডেস্ক

September 10, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
বিভাগ (Category): আন্তর্জাতিক, ইতিহাস
প্রকাশের তারিখ: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তথ্যসূত্র (Sources): Encyclopaedia Britannica, BBC আর্কাইভ প্রতিবেদন, ভারতীয় সরকারি নথি ও সংসদীয় বিবৃতি, শিখ ঐতিহাসিক সংকলন (SikhiWiki), সমসাময়িক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ।

অপারেশন ব্লু স্টার ছিল ১৯৮৪ সালের জুন মাসে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি সামরিক অভিযান, যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে পাঞ্জাবের অমৃতসরে অবস্থিত শিখ ধর্মের পবিত্রতম স্থান স্বর্ণমন্দির (হরমন্দির সাহিব) কমপ্লেক্সে পরিচালিত হয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ার আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ও গভীর প্রভাব ফেলা ঘটনা হিসেবে বিবেচিত এই অভিযান শুধু পাঞ্জাবের রাজনীতিই নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সমীকরণকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করেছে।

পটভূমি: ১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া অসন্তোষ

১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া অসন্তোষের পটভূমি মূলত ভারতের স্বাধীনতার পর পাঞ্জাবের ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অধিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান বিভাজনের সময় শিখ সম্প্রদায় ভারতে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে খুব দ্রুতই তাদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হতে শুরু করে।

এই অসন্তোষের মূল কারণ এবং ঘটনাক্রম নিচে দেওয়া হলো:

  • পাঞ্জাবি সুবা আন্দোলন: স্বাধীনতার পর ভারত সরকার ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে। শিখদের মূল দাবি ছিল পাঞ্জাবি ভাষী অঞ্চলগুলোকে নিয়ে ‘পাঞ্জাবি সুবা’ বা একটি পৃথক রাজ্য গঠন করা। তবে তৎকালীন নেহেরু সরকার শুরুতে এই দাবি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, যা শিখদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৬৬ সালে পাঞ্জাবকে ভেঙে পাঞ্জাবিভাষী পাঞ্জাব এবং হিন্দিভাষী হরিয়ানা রাজ্য গঠন করা হয়।
  • চণ্ডীগড় এবং জলবণ্টন নিয়ে বিরোধ: ১৯৬৬ সালের বিভাজনের সময় পাঞ্জাবের ঐতিহাসিক শহর চণ্ডীগড়কে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা—উভয় রাজ্যের যৌথ রাজধানী এবং একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করা হয়। শিখদের দাবি ছিল চণ্ডীগড়কে পুরোপুরি পাঞ্জাবের অন্তর্ভুক্ত করা। এর পাশাপাশি পাঞ্জাবের নদীগুলোর পানির একটি বড় অংশ অন্য রাজ্যে সরিয়ে নেওয়ার কারণে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
  • আনন্দপুর সাহিব প্রস্তাব (১৯৭৩): ১৯৭৩ সালে শিখদের প্রধান রাজনৈতিক দল শিরোমণি আকালি দল ‘আনন্দপুর সাহিব প্রস্তাব’ উত্থাপন করে। এই প্রস্তাবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সীমিত করে পাঞ্জাবকে আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার দাবি জানানো হয়। এর মধ্যে ছিল প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ ছাড়া অন্য সব বিষয়ে রাজ্যের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এবং শিখ ধর্মের বিশেষ স্বীকৃতি। তবে তৎকালীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এটিকে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রস্তাব হিসেবে গণ্য করে প্রত্যাখ্যান করে।
  • ধর্মীয় ও সামাজিক রূপান্তর: ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে পাঞ্জাবে ‘সবুজ বিপ্লব’ বা কৃষিক্ষেত্রে বিশাল উন্নতি হয়। এর ফলে অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটলেও যুবসমাজের মধ্যে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব এবং শিখ ধর্মীয় রীতিনীতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। এই প্রেক্ষাপটে জারনাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের মতো ধর্মীয় প্রচারকরা শিখদের ঐতিহ্যগত ও গোঁড়া ধর্মীয় রীতিনীতিতে ফিরে আসার আহ্বান জানান, যা গ্রামীণ ও অসন্তুষ্ট শিখ যুবকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া এই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় অসন্তোষই পরবর্তীতে আশির দশকে খালিস্তান আন্দোলন এবং অপারেশন ব্লু স্টারের মতো চরম সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে মোড় নেয়।

জার্নেল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের উত্থান

জারনাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের উত্থান ছিল আধুনিক ভারতের ইতিহাসে অন্যতম একটি জটিল ও প্রভাববিস্তারকারী অধ্যায়। একজন সাধারণ গ্রামীণ ধর্মীয় প্রচারক থেকে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে তিনি শিখ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন [১.২.২, ১.২.৫]।

তাঁর এই নাটকীয় উত্থানের মূল ধাপ ও কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • দমদমি টাকশালের প্রধান পদ লাভ: ১৯৪৭ সালে জন্ম নেওয়া ভিন্দ্রানওয়ালে শুরুতে পাঞ্জাবের একটি ঐতিহ্যবাহী শিখ ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘দমদমি টাকশাল’-এ ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন । ১৯৭৭ সালে এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান করতার সিং খলসার আকস্মিক মৃত্যুর পর ভিন্দ্রানওয়ালেকে দমদমি টাকশালের পরবর্তী প্রধান বা ‘সন্ত’ হিসেবে ঘোষণা করা হয় । এখান থেকেই তাঁর জনসাধারণের সামনে আসার সুযোগ তৈরি হয় ।
  • ধর্মীয় সংস্কার ও জনপ্রিয়তা: টাকশালের প্রধান হয়ে তিনি পাঞ্জাবের গ্রামে গ্রামে ঘুরে কট্টর শিখ ধর্মের প্রচার শুরু করেন। তিনি শিখ যুবসমাজকে মাদক, তামাক ও মদ্যপান ত্যাগ করার আহ্বান জানান এবং শিখ ধর্মের মৌলিক রীতিনীতি (যেমন চুল ও দাড়ি না কাটা) কঠোরভাবে মেনে চলতে বলেন । আধুনিকায়নের ফলে দিকভ্রান্ত গ্রামীণ যুবসমাজ এবং প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে তাঁর এই আহ্বান ব্যাপক সাড়া ফেলে।
  • ১৯৭৮ সালের অমৃতসর সংঘর্ষ: ১৯৭৮ সালের ১৩ এপ্রিল বৈশাখী দিবসে অমৃতসরে ভিন্দ্রানওয়ালের অনুসারীদের সাথে ‘নিরঙ্কারী’ নামক একটি শিখ উপদলের বড় ধরণের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষে ভিন্দ্রানওয়ালের পক্ষের বেশ কয়েকজন শিখ মারা যান । এই ঘটনার পর ভিন্দ্রানওয়ালে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে এবং শিখদের সুরক্ষায় আরও উগ্র ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নেন, যা তাঁকে শিখ উগ্রপন্থীদের প্রধান নেতায় পরিণত করে।
  • কংগ্রেসের রাজনৈতিক সমর্থন ও ব্যবহার: ভিন্দ্রানওয়ালের উত্থানের পেছনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের একাংশের পরোক্ষ ভূমিকা ছিল । পাঞ্জাবের আঞ্চলিক শিখ দল ‘শিরোমণি আকালি দল’-এর রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করার জন্য ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র সঞ্জয় গান্ধী এবং কংগ্রেস নেতা জ্ঞানী জৈল সিং প্রথম দিকে ভিন্দ্রানওয়ালেকে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা প্রশ্রয় ও সমর্থন দিয়েছিলেন। তবে কংগ্রেসের এই কৌশল পরবর্তীতে বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়, কারণ ভিন্দ্রানওয়ালে খুব দ্রুতই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ লাইনের বাইরে চলে যান
  • লালা জগত নারায়ণের হত্যাকাণ্ড ও গ্রেফতারের নাটক: ১৯৮১ সালে পাঞ্জাবের উগ্রপন্থা বিরোধী প্রভাবশালী সংবাদপত্র সম্পাদক লালা জগত নারায়ণ নিহত হন । এই হত্যাকাণ্ডে ভিন্দ্রানওয়ালের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি হলে তিনি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণের জন্য কঠোর শর্ত দেন । পরবর্তীতে প্রমাণের অভাবে তিনি যখন জেল থেকে মুক্তি পান, তখন শিখদের একটি বড় অংশের কাছে তিনি এমন এক ‘নায়ক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন যিনি সরাসরি ভারত সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে জয়ী হয়েছেন ।
  • চরমপন্থা ও স্বর্ণমন্দির দখল: ১৯৮২ সালের পর থেকে ভিন্দ্রানওয়ালে আকালি দলের সাথে যুক্ত হয়ে পাঞ্জাবের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ‘ধরম যুদ্ধ মোর্চা’ আন্দোলন শুরু করেন । গ্রেফতার এড়াতে এবং নিজের সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তিনি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে শিখদের পবিত্রতম স্থান স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থান নেন এবং পরবর্তীতে আকাল তখত ভবনটি দখল করে সেটিকে দুর্গে পরিণত করেন ।

স্বর্ণমন্দিরের ভেতর থেকে তাঁর সমান্তরাল শাসন এবং সশস্ত্র আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবেই ১৯৮৪ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী সেখানে ‘অপারেশন ব্লু স্টার’ পরিচালনা করতে বাধ্য হয়, যেখানে তিনি নিহত হন ।

অভিযানের বিবরণ (১ জুন – ৮ জুন, ১৯৮৪)

১৯৮৪ সালের ১ থেকে ৮ জুন তারিখের মধ্যে প্রধান ভিন্ন ভিন্ন ভিন্ন ভিন্ন দিনকে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দিনগুলোতে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির অবরুদ্ধ থেকে শুরু করা পুরো চত্বর নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ করা হয় :

১ জুন ১৯৮৪: প্রাথমিক গোলাবর্ষণ ও অবরোধ

  • দুপুরের দিকে স্বর্ণমন্দির চত্বরের বাইরে অবস্থান নেওয়া আধাসামরিক বাহিনী এবং ভেতর থেকে শিখ চরমপন্থীদের মধ্যে প্রথম বড় ধরণের বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়
  • এই প্রাথমিক গোলাবর্ষণে স্বর্ণমন্দিরের মূল ভবন ও লঙ্গরখানার দেয়ালে বেশ কিছু গুলির আঘাত লাগে [১.২.৩]। এই সংঘর্ষে ১১ জন নিহত এবং ২৫ জন আহত হন [

২ জুন ১৯৮৪: রাজ্য অবরুদ্ধ ও কার্ফিউ

  • ভারতীয় সেনাবাহিনী পাঞ্জাবের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় এবং পুরো রাজ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় ।
  • রাজ্যজুড়ে কড়া কার্ফিউ জারি করা হয় এবং সড়ক ও রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয় । সব বিদেশী সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যমকে পাঞ্জাব থেকে বের করে দেওয়া হয় ।

৩ জুন ১৯৮৪: তীর্থযাত্রীদের অবরুদ্ধ হওয়া

  • এই দিনটি ছিল শিখদের পঞ্চম গুরু, গুরু অর্জুন দেবের শহীদ দিবস । এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কারণে হাজার হাজার সাধারণ শিখ তীর্থযাত্রী আগে থেকেই স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থান করছিলেন ।
  • কার্ফিউর কারণে প্রায় ১০ হাজার তীর্থযাত্রী মন্দিরের ভেতরে আটকা পড়েন । সামরিক বাহিনী পুরো স্বর্ণমন্দিরের প্রবেশ ও নিকাশ পথগুলো চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে ।

৪ জুন ১৯৮৪: বড় ধরণের আক্রমণ শুরু

  • সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে স্বর্ণমন্দিরের উগ্রপন্থীদের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে ভারী অস্ত্র ও মর্টার দিয়ে গোলাবর্ষণ শুরু করা হয়।
  • মন্দিরের বাইরের প্রাচীর এবং রামগড়িয়া বুঙ্গাসহ বেশ কয়েকটি ওয়াচ টাওয়ার ধ্বংস করে দেওয়া হয়, যাতে ভেতরে থাকা উগ্রপন্থীদের নজরদারি বন্ধ করা যায়। ভেতর থেকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হলেও শিখ চরমপন্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করে।

৫ জুন ১৯৮৪: মূল চত্বরে প্রবেশ ও তীব্র প্রতিরোধ

  • রাত ১০টার দিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডো এবং পদাতিক বাহিনী মূল মন্দির চত্বরের ভেতরে (পরিক্রমা এলাকায়) প্রবেশের চেষ্টা করে।
  • মেজর জেনারেল কে এস ব্রার এবং জেনারেল সুন্দরজীর নেতৃত্বে সেনারা ভেতরে ঢুকলে জারনাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের সামরিক উপদেষ্টা সাবেক মেজর জেনারেল সাবেগ সিংয়ের সুপরিকল্পিত হালকা ও মাঝারি মেশিনগানের প্রতিরোধের মুখে পড়ে। তীব্র প্রতিরক্ষার কারণে সেনাবাহিনীর প্রথম দিকের কমান্ডো অপারেশন ব্যর্থ হয় এবং বহু সেনা সদস্য হতাহত হন।

৬ জুন ১৯৮৪: ট্যাংকের ব্যবহার ও আকাল তখত ধ্বংস

  • প্রথম সারির পদাতিক বাহিনী চরমপন্থীদের বাঙ্কার ও সুরক্ষিত অবস্থানগুলো ভাঙতে ব্যর্থ হলে, ৬ জুন ভোরের দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে মূল চত্বরের ভেতরে ভারী বিজয়ন্ত ট্যাংক প্রবেশ করানো হয় ।
  • ট্যাংকের ১০৫ মিলিমিটার কামানের শক্তিশালী গোলাবর্ষণে শিখদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও প্রশাসনিক আসন ‘আকাল তখত’ ভবনটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় । এই দিনই ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে জারনাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে, সাবেগ সিং এবং আমরিক সিংয়ের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় ।

৭ জুন ১৯৮৪: তল্লাশি ও ছোটখাটো প্রতিরোধ দমন

  • স্বর্ণমন্দিরের মূল প্রতিরোধ ভেঙে পড়ার পর সেনাবাহিনী পুরো কমপ্লেক্সের প্রতিটি ঘর, বেজমেন্ট এবং সুড়ঙ্গে তল্লাশি অভিযান শুরু করে।
  • আকাল তখতের আশেপাশের বিভিন্ন গোপন বাঙ্কারে লুকিয়ে থাকা বাকি চরমপন্থীদের সাথে সেনাবাহিনীর বিক্ষিপ্ত বন্দুকযুদ্ধ চলতে থাকে এবং অনেকেই আত্মসমর্পণ করতে শুরু করে।

৮ জুন ১৯৮৪: সম্পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা

  • ৮ জুনের মধ্যে স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্সের ভেতরের সব ধরণের প্রতিরোধ পুরোপুরি দমন করা হয় এবং পুরো চত্বরটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে
  • তবে এই অভিযানের সময় বা এর পরপরই স্বর্ণমন্দির প্রাঙ্গণে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘শিখ রেফারেন্স লাইব্রেরি’ আগুনে পুড়ে যায়, যার ফলে বহু প্রাচীন ও অমূল্য শিখ পাণ্ডুলিপি ধ্বংস হয়ে যায় ।

এই ৮ দিনের তীব্র লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে স্বর্ণমন্দিরের মূল সামরিক অপারেশনটি সমাপ্ত হয়, যা পরবর্তীতে পাঞ্জাবে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেয়

হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক

অপারেশন ব্লু স্টারে কত মানুষ মারা গিয়েছিলেন, সেই হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভারত সরকার এবং শিখ সংগঠন ও স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে শুরু থেকেই তীব্র বিতর্ক ও মতপার্থক্য রয়েছে । ঘটনার সময় গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় কোনো নিরপেক্ষ পরিসংখ্যান তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

হতাহতের সংখ্যা নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রধান দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

ভারত সরকারের অফিশিয়াল হিসাব (শ্বেতপত্র):

  • ১৯৮৪ সালের জুলাই মাসে ভারত সরকার কর্তৃক প্রকাশিত শ্বেতপত্র বা অফিশিয়াল রিপোর্ট অনুযায়ী, স্বর্ণমন্দির চত্বরের ভেতরে সব মিলিয়ে ৪৯৩ জন চরমপন্থী ও বেসামরিক লোক নিহত হয়েছিলেন ।
  • এই অভিযানে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ৪ জন অফিসারসহ মোট ৮৩ জন সেনা সদস্য নিহত এবং ২৪৯ জন আহত হন বলে সরকারি নথিতে উল্লেখ করা হয় ।

শিখ সংগঠন ও স্বাধীন সংস্থাগুলোর দাবি:

  • শিখ সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংগঠন এই সরকারি তথ্যকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে । তাদের দাবি অনুযায়ী, অভিযানে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার, যার একটি বড় অংশই ছিল সাধারণ শিখ তীর্থযাত্রী ।
  • যেহেতু ৫ জুন শিখদের পঞ্চম গুরু, গুরু অর্জুন দেবের শহীদ দিবসের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছিল, তাই আগে থেকেই মন্দিরের ভেতরে প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি সাধারণ মানুষ আটকা পড়েছিলেন । আক্রমণের সময় তারা ক্রসফায়ারে পড়ে প্রাণ হারান ।

মানবাধিকার সংস্থা ও সাংবাদিকদের অনুমান:

  • বিভিন্ন স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্স এবং এর আশেপাশের এলাকায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ এর কাছাকাছি ছিল । কোনো কোনো নিরপেক্ষ মানবাধিকার ফোরামের মতে, মোট নিহতের সংখ্যা ১০,০০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল ।
  • প্রখ্যাত সাংবাদিকদের একাংশের মতে, ঘটনার পর প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে তড়িঘড়ি করে শত শত মরদেহ ট্রাকে করে নিয়ে গণকবর বা একসঙ্গে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল (সিক্রেট মাস ক্রিমেশন), যার কারণে প্রকৃত সংখ্যাটি কখনো অফিশিয়ালি সামনে আসেনি ।

এমনকি পরবর্তীতে পাঞ্জাবের তৎকালীন গভর্নর বি ডি পান্ডে সহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সরকারের দেওয়া ৭০০ বা ৮০০ জনের হতাহতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং জানান যে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা অন্তত ১,২০০ বা তার বেশি ছিল । এই তথ্যের বিশাল ব্যবধানের কারণেই অপারেশন ব্লু স্টারকে কেন্দ্র করে হতাহতের সংখ্যাটি আজও একটি বড় বিতর্কের বিষয়

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব: ইন্দিরা গান্ধী হত্যা ও পরবর্তী সহিংসতা

অপারেশন ব্লু স্টার শিখ সম্প্রদায়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের জন্ম দেয়, যা ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। এর মাত্র চার মাস পর, ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁরই দুই শিখ দেহরক্ষী কর্তৃক নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের পরপরই ভারতজুড়ে, বিশেষত দিল্লিতে, ভয়াবহ শিখবিরোধী দাঙ্গা সংঘটিত হয়, যাতে বহু নিরীহ শিখ নাগরিক প্রাণ হারান — যা ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

চার দশক পরের প্রাসঙ্গিকতা

২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও অপারেশন ব্লু স্টার দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে একটি স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ হয়ে আছে। প্রতি বছর জুন মাসে এর বার্ষিকীতে অমৃতসরে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়, আর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শিখ প্রবাসী সম্প্রদায়ের রাজনীতিতে এই ঘটনার স্মৃতি এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে ভারত সরকারের দৃষ্টিতে এটি জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে — এই দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গিই ঘটনাটিকে আজও একটি জটিল ও বিতর্কিত ঐতিহাসিক অধ্যায়ে পরিণত করে রেখেছে।

উপসংহার

১৯৫০-এর দশকের পাঞ্জাবি স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক টানাপোড়েন কীভাবে ১৯৮৪ সালে একটি পবিত্র ধর্মীয় স্থানে সামরিক অভিযানে রূপ নিল, আর তার পরিণতিতে কীভাবে একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নিহত হলেন এবং ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সংঘটিত হলো — অপারেশন ব্লু স্টার তারই একটি মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত। এই ঘটনা আজও ধর্ম, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মধ্যকার জটিল সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মুদ্রা

নিউজ ডেস্ক

September 9, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant & Economic Content Analyst)

বিভাগ (Category): অর্থনীতি প্রকাশের তারিখ: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

তথ্যসূত্র (Sources): আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ইতিহাস সংকলন, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ প্রতিবেদন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ট্রেডিং ইকোনমিক্স এবং প্রাসঙ্গিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ।


ঢাকা: প্রশ্নটা শুনতে সহজ, কিন্তু উত্তরটা লুকিয়ে আছে বিংশ শতাব্দীর কিছু সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে। “সরকার তো নিজেই টাকা ছাপায়, তাহলে ইচ্ছেমতো ছাপিয়ে সব সমস্যার সমাধান করে ফেলে না কেন?”—এই প্রশ্ন প্রায় সবার মনেই একবার না একবার এসেছে। উত্তর জানতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ইতিহাসের সেইসব অধ্যায়ে, যেখানে ঠিক এই কাজটাই করা হয়েছিল—এবং ফলাফল ছিল ভয়াবহ।

এক টুকরো রুটির জন্য ঠেলাগাড়ি ভর্তি টাকা: জার্মানির ১৯২৩

১৯২৩ সালে জার্মানির ‘হাইপার-ইনফ্লেশন’ (Hyperinflation) মানব ইতিহাসের অন্যতম এক চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়, যেখানে এক টুকরো রুটি বা সামান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে মানুষকে আক্ষরিক অর্থেই ঠেলাগাড়ি বা স্যুটকেসভর্তি টাকা নিয়ে বাজারে যেতে হতো [১]।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির মুদ্রা ‘মার্ক’ (Mark) তার সমস্ত মূল্য হারিয়ে কাগজের টুকরোয় পরিণত হয়েছিল [১]। এই নির্মম বাস্তবতার পেছনের কারণ এবং এর কিছু অবিশ্বাস্য ঐতিহাসিক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

১. কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল?

  • যুদ্ধের বিশাল ঋণ ও জরিমানা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর ১৯১৯ সালের ‘ভার্সাই চুক্তি’ অনুযায়ী জার্মানির ওপর মিত্রবাহিনী (বিশেষ করে ফ্রান্স ও ব্রিটেন) বিশাল অঙ্কের যুদ্ধক্ষতিপূরণ বা জরিমানা চাপিয়ে দেয়।
  • নির্বিচারে টাকা ছাপানো: এই বিপুল পরিমাণ জরিমানা শোধ করার মতো কোনো স্বর্ণ বা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ জার্মানির ছিল না। সংকট কাটাতে জার্মান সরকার কোনো উৎপাদন না বাড়িয়েই দিন-রাত দেদারসে কাগজের মুদ্রা (মার্ক) ছাপাতে শুরু করে [১]।
  • মুদ্রার ধস: বাজারে কাগজের নোটের বন্যা বয়ে যাওয়ার কারণে মুদ্রার মান অবিশ্বাস্য দ্রুততায় কমতে থাকে। ১৯১৪ সালে যেখানে ৪ মার্কে ১ ডলার পাওয়া যেত, ১৯২৩ সালের নভেম্বরের মধ্যে তা দাঁড়ায় ৪.২ ট্রিলিয়ন (৪,২০০,০০০,০০০,০০০) মার্কে ১ ডলার!

২. ১৯২৩ সালের কিছু অবিশ্বাস্য ও নির্মম বাস্তব চিত্র

  • ঠেলাগাড়ির ব্যবহার: কাগজের নোটের মান এতই কমে গিয়েছিল যে, একটি পাউরুটি বা এক কেজি আলু কিনতে কোটি কোটি মার্কের প্রয়োজন হতো। পকেটে বা মানিব্যাগে সেই টাকা আস্ত না বলে মানুষ ঠেলাগাড়ি, বড় লন্ড্রি ঝুড়ি বা স্যুটকেস ভরে টাকা নিয়ে বাজারে যেত [১]।
  • টাকা গোনার চেয়ে ওজন করা সস্তা: দোকানে কেনাকাটার সময় দোকানিরা টাকা গুনে নেওয়ার সময় পেতেন না। তারা স্কেলে মেপে কিলোগ্রাম বা পাউন্ড হিসেবে টাকা জমা নিতেন।
  • কয়লার চেয়ে টাকা পোড়ানো সাশ্রয়ী: শীতকালে ঘর গরম রাখার জন্য কয়লা বা কাঠ কেনার চেয়ে কাগজের নোট পুড়িয়ে আগুন পোহানো অনেক বেশি সস্তা ছিল। গৃহিণীরা ঘরের উনুন ধরাতে বা রান্নার কাজে টাকার বান্ডিল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতেন।
  • বাচ্চাদের খেলার সামগ্রী: নোটের কোনো মূল্য না থাকায় অনেক পরিবারে শিশুদের খেলার জন্য ঘুড়ি বানাতে বা ঘর সাজানোর ওয়ালপেপার হিসেবে কোটি কোটি মার্কের নোট দেয়াল তৈরিতে আঠা দিয়ে লাগানো হতো।
  • দিনে দুইবার বেতন: মুদ্রাস্ফীতি প্রতি ঘণ্টায় বাড়ত। সকালে যে বেতনের টাকা দিয়ে একটি জুতো কেনা যেত, বিকেলে তা দিয়ে হয়তো একটি ডিমও পাওয়া যেত না। তাই শ্রমিকদের দিনে দুইবার বেতন দেওয়া হতো এবং বেতন পাওয়ার সাথে সাথে তারা কাজ ফেলে বাজারে ছুটতেন, যাতে টাকাটা কাগজের টুকরো হওয়ার আগেই কিছু কিনে ফেলা যায়।

৩. এই সংকট থেকে জার্মানির মুক্তি

১৯২৩ সালের শেষের দিকে জার্মানি তাদের পুরনো কারেন্সি ‘মার্ক’ সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়। এরপর ‘রেন্টেনমার্ক’ (Rentenmark) নামে একটি নতুন মুদ্রা চালু করা হয়, যার ভিত্তি ছিল দেশের বন্ধকী জমি ও শিল্পসম্পদ। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে জার্মানির অর্থনীতি স্থিতিশীলতায় ফেরে।

যখন নোটের চেয়ে সস্তা ছিল জ্বালানি কাঠ: হাঙ্গেরি ১৯৪৬

জার্মানির ১৯২৩ সালের অর্থনৈতিক সংকট যদি রূপকথার মতো শোনায়, তবে ১৯৪৬ সালের হাঙ্গেরির ‘হাইপার-ইনফ্লেশন’ (Hyperinflation) ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে চরম ও ভয়ংকর অর্থনৈতিক বিপর্যয় জার্মানি বা জিম্বাবুয়ে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে আজ পর্যন্ত নথিভুক্ত সবচেয়ে দ্রুতগতির এবং ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী হাঙ্গেরিতে

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, হাঙ্গেরির মুদ্রা ‘পেঙ্গো’ (Pengő) তার সমস্ত ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে আক্ষরিক অর্থেই আবর্জনায় পরিণত হয়েছিল । কাগজের নোটের মান এত নিচে নেমে গিয়েছিল যে, শীতের রাতে ঘর গরম রাখতে জ্বালানি কাঠ বা কয়লা কেনার চেয়ে কাগজের নোটের বান্ডিল পোড়ানো অনেক বেশি সস্তা ও সাশ্রয়ী ছিল

নিচে এই অবিশ্বাস্য ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির মূল চিত্রগুলো তুলে ধরা হলো:

১. ইতিহাসের দ্রুততম ও চরম মুদ্রাস্ফীতি

  • প্রতি ১৫ ঘণ্টায় দাম দ্বিগুণ: ১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে হাঙ্গেরির মাসিক মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৪১.৯ কোয়াড্রিলিয়ন শতাংশ (৪১.৯ এর পর ১৪টি শূন্য) ! এর মানে বাজারে প্রতি ১৫ ঘণ্টায় পণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়ে যেত
  • সকালের বেতন বিকেলে পকেটমানি: একজন শ্রমিক সকালে যে বেতন পেতেন, দুপুরের মধ্যে তার ৪০% মান কমে যেত এবং রাতের খাবারের সময় নাগাদ তা স্রেফ পকেটমানিতে পরিণত হতো । মানুষ বেতন পাওয়ার সাথে সাথে বাজারে দৌড়াতেন, কারণ কয়েক ঘণ্টা দেরি করলেই সেই টাকা দিয়ে আর কিছুই কেনা সম্ভব হতো না

২. কাগজের নোটের চেয়ে জ্বালানি কাঠ দামি হওয়ার কারণ

  • কাগজের চেয়ে সস্তা টাকা: হাঙ্গেরির মুদ্রা এতটাই মূল্যহীন হয়ে পড়েছিল যে, সমপরিমাণ মূল্যের জ্বালানি কাঠ, সাধারণ কয়লা বা এমনকি সাধারণ লেখার সাদা কাগজ কিনতে যে পরিমাণ নোট দিতে হতো, তার চেয়ে সেই নোটগুলো সরাসরি আগুনে পুড়িয়ে ফেলা অনেক লাভজনক ছিল
  • রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার সামগ্রী: সে সময় হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের রাস্তায় সাধারণ মানুষ কোটি কোটি পেঙ্গোর নোট ফেলে দিত। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা থেকে ময়লার মতো টাকার নোটের স্তূপ ডাস্টবিনে ফেলতেন।
  • নোটের সাহায্যে আগুন জ্বালানো: ইতিহাসের কিছু বিখ্যাত ছবিতে দেখা যায় হাঙ্গেরির নারীরা তাঁদের উনুন ধরাতে বা সিগারেটে আগুন ধরাতে ম্যাচের কাঠির বদলে জ্বলন্ত পেঙ্গো নোটের মোড়ক ব্যবহার করছেন

৩. পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ অঙ্কের নোট

মুদ্রাস্ফীতির সাথে তাল মেলাতে হাঙ্গেরির কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকার অঙ্কের পেছনে একের পর এক শূন্য বসাতে থাকে তারা প্রথমে ‘মিলপেঙ্গো’ (১০ লাখ পেঙ্গো) এবং পরে ‘বিলপেঙ্গো’ (১ লাখ কোটি পেঙ্গো) চালু করে । হাঙ্গেরিই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রচলিত হওয়া সর্বোচ্চ অঙ্কের নোট ছাপিয়েছিল, যার মান ছিল ১০০ কুইন্টিলিয়ন (১০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ বা ১০^২০) পেঙ্গো !

৪. কেন হয়েছিল এই বিপর্যয়?

  • যুদ্ধের ধ্বংসলীলা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হাঙ্গেরির প্রায় ৪০% জাতীয় সম্পদ এবং ৯০% শিল্পকারখানা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়
  • সোভিয়েত দখলদারিত্ব ও জরিমানা: যুদ্ধের পর হাঙ্গেরি সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং তাদের ওপর বিশাল অঙ্কের যুদ্ধক্ষতিপূরণ চাপানো হয় । এই খরচ মেটাতে কোনো ব্যাক-আপ ছাড়াই হাঙ্গেরির সরকার দিন-রাত নির্বিচারে টাকা ছাপাতে শুরু করে, যা অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়

৫. যেভাবে এলো মুক্তি

১৯৪৬ সালের ১লা আগস্ট হাঙ্গেরি সরকার এক ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নেয় । তারা মৃতপ্রায় কারেন্সি ‘পেঙ্গো’ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে । এর পরিবর্তে ‘ফোরিন্ট’ (Forint) নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন মুদ্রা চালু করা হয় । ১টি নতুন ফোরিন্ট পেতে হাঙ্গেরীয়দের দিতে হয়েছিল ৪০০ অক্ট্রিলিয়ন (৪-এর পিঠে ২৯টি শূন্য) পুরনো পেঙ্গো ! এই মুদ্রা পরিবর্তনের মাধ্যমে হাঙ্গেরির অর্থনীতিতে আবার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরে আসে ।

একুশ শতকের উদাহরণ: জিম্বাবুয়ে ও ভেনেজুয়েলা

ইতিহাসের এই শিক্ষা যে শুধু অতীতের বিষয় নয়, তার প্রমাণ মিলেছে একুশ শতকেও। ২০০০-এর দশকে জিম্বাবুয়ের সরকার সরকারি ব্যয় মেটাতে অবিরাম টাকা ছাপাতে থাকে, যার ফলে দেশটির মুদ্রাস্ফীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে শেষ পর্যন্ত ১০০ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যমানের নোট পর্যন্ত ছাপাতে হয়েছিল—যা বাস্তবে কার্যত মূল্যহীন ছিল। একই ধরনের সংকট দেখা গেছে ভেনেজুয়েলায়, যেখানে তেল রাজস্ব কমে যাওয়ার পর সরকার ঘাটতি পূরণে ব্যাপক হারে মুদ্রা ছাপায়, ফলে দেশের মুদ্রার মূল্য কার্যত ধসে পড়ে এবং লাখো মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়।

অর্থনীতির সহজ নিয়ম: টাকা বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ে, টাকার মূল্য কমে

এই সব ঘটনার পেছনে কাজ করে একটি সহজ কিন্তু কঠোর অর্থনৈতিক নিয়ম। একটি দেশের অর্থনীতিতে পণ্য ও সেবার পরিমাণ যদি স্থির থাকে, কিন্তু টাকার সরবরাহ হঠাৎ বহুগুণ বেড়ে যায়, তাহলে একই পরিমাণ পণ্য কেনার জন্য মানুষের হাতে বেশি টাকা চলে আসে। ফলে বিক্রেতারা দাম বাড়িয়ে দেন, কারণ চাহিদা বেড়ে গেলেও উৎপাদন বাড়েনি। এই প্রক্রিয়া একবার শুরু হলে থামানো কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ মানুষ যখন বুঝতে পারে টাকার মূল্য দ্রুত কমছে, তখন তারা যত দ্রুত সম্ভব টাকা খরচ করে ফেলতে চায়—যা দামকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এভাবেই তৈরি হয় একটি ধ্বংসাত্মক চক্র।

তাহলে সরকার ঋণ নেয় কেন, টাকা ছাপায় না কেন?

এই প্রশ্নের উত্তরও লুকিয়ে আছে উপরের উদাহরণগুলোর মধ্যে। সরকার যখন আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ঋণ নেয়, তখন সেই অর্থ বাজারে থাকা বিদ্যমান টাকারই পুনর্বণ্টন হয়—নতুন করে টাকা ছাপানো হয় না, তাই মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে। বিপরীতে, নতুন টাকা ছাপিয়ে খরচ মেটানো মানে অর্থনীতিতে “বাস্তব উৎপাদন” ছাড়াই টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া, যা সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। এই কারণেই আধুনিক অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বতন্ত্র রাখার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে—যাতে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক চাপে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন না হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: সতর্কতার পাঠ

বাংলাদেশ ব্যাংকও একই আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও বিনিময় হারের চাপের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মুদ্রানীতি নিয়ে আলোচনা বেড়েছে, যেখানে অর্থনীতিবিদরা বারবার সতর্ক করেছেন—অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ স্বল্পমেয়াদে সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে—ঠিক যেভাবে তা ঘটেছিল জার্মানি, হাঙ্গেরি, জিম্বাবুয়ে ও ভেনেজুয়েলায়।

উপসংহার

ইতিহাস বারবার একই শিক্ষা দিয়েছে—মুদ্রা ছাপানো কোনো জাদুকরী সমাধান নয়, বরং এটি একটি দ্বিধারী তলোয়ার। সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত মুদ্রা সরবরাহ অর্থনীতিকে সচল রাখে, কিন্তু লাগামহীন মুদ্রা সরবরাহ একটি দেশের সমগ্র অর্থব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিতে পারে কয়েক মাসের মধ্যেই। এই কারণেই আধুনিক বিশ্বের প্রতিটি দায়িত্বশীল সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা সরবরাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ও নিয়ন্ত্রিত নীতি অনুসরণ করে চলে।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২৭শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ