আন্তর্জাতিক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ভূমিকা: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একজন বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হতে পারেন, তার আদর্শ নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে; কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তিনি কতটা সফল, তার প্রমাণ মেলে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সাথে তার সুসম্পর্ক দেখলে। সম্প্রতি বাংলাদেশে তার আগমন ঘিরে যে তোলপাড় ও বিক্ষোভ দেখা যায়, তার বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেন আরব দেশগুলো তাকে সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করে, আর কেন আমাদের দেশের একটি অংশ রাজপথে কুশপুত্তলিকা দাহ করে? এই পার্থক্যের মূলে কি কেবল ধর্মীয় আবেগ, নাকি বাস্তববোধের অভাব?
নরেন্দ্র মোদি কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার পর ২০১৯ সালে বাহরাইন সফরকালে বাহরাইনের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘দ্য কিং হামাদ অর্ডার অব দ্য রেনেসাঁস’ লাভ করেন।
একই বছরই কাশ্মীর সমস্যার মধ্যেই মোদি সযুক্ত আরব আমিরাতের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘অর্ডার অফ জায়েদ’ গ্রহণ করেন।
২০১৮ সালে তিনি প্যালেস্টাইন থেকে সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘গ্রান্ড কলার অব দ্য স্টেট অব প্যালেস্টাইন’ করেন।
মোদি ২০১৬ সালে সৌদি আরব থেকে পান ‘কিং আব্দুল আজিজ সাশ অ্যাওয়ার্ড’।
২০১৯ সালে সৌদি যুবরাজ সালমান ভারত সফরকালে বলেন ‘মোদি আমার বড় ভাই, আমি তার ছোট ভাই‘।
এই যে কাশ্মীর সংকটের মধ্যেও আরব দেশগুলো থেকে মোদির বড় বড় সম্মাননা গ্রহণ, তাতে কি কোন দেশের মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে বিক্ষোভ, ভাংচুর করেছে? করেনি। একই সময়ে বাংলাদেশে কী হয়েছে দেখুন।
কুশপুত্তলিকা দাহ!
মোদির প্রায় হাফ ডজন সম্মাননার ফিরিস্তি দেয়া মানে এই নয় যে তিনি ধোয়া তুলসীপাতা, এসব পুরস্কার পাওয়া মানে এই নয় যে তিনি একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। তিনি একজন চরম সাম্প্রদায়িক মানুষ, ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সমর্থন লাভ করার চেষ্টা করেন, ভারতকে একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি ও তার সহযোগীরা, তার সময়েই ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা সম্ভবত সবথেকে বেশি নিরাপত্তাহীনতায় আছে। এসবই সত্য। তিনি যে সম্মাননাগুলো পাচ্ছেন তাকে অনেকাংশেই রাজনৈতিক লাভক্ষতির হিসেবে বিবেচনা করা যায়, তিনি ব্যক্তিগতভাবে কেমন আদর্শের মানুষ সেই হিসেব করে কেউ সম্মাননা দেয়নি। সম্মাননা দিয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। এই নিয়ে ওইসব দেশের মানুষ সামান্য প্রতিবাদ করারও প্রয়োজন মনে করেনি। কারণ তাদের অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোন মাথাব্যথা নেই। তারা এই সম্পর্ককে কূটনৈতিক বিবেচনায় দেখে। বাংলাদেশের মানুষদের মত সবকিছু আবেগের চশমায় দেখে না। বাংলাদেশ বাদে অন্য কোন দেশের মানুষই সম্ভবত এতটা আবেগী না। তারা বাস্তববাদী।
এবার ভাবুন ২০১৯ এ একই সময়ে বাংলাদেশ মোদিকে এমন সম্মাননা দিলো! ঢাকার রাজপথ তো কুরুক্ষেত্র হয়ে যেত! গত বছরে ফ্রান্সের কথাই চিন্তা করুন না! ফ্রান্সের ঘটনা নিয়ে অনেক দেশেই কমবেশি প্রতিবাদ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মত এত ব্যাপক মাত্রায় কুশপুত্তলিকা দাহ, প্রেসিডেন্টের ছবিতে লাথি মারা, মূর্তি বানিয়ে তাতে জুতার মালা পরানো— এমনটা কোন দেশে হয়নি!
এতে করে কী হয়েছে? নরেন্দ্র মোদি কি কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়েছে? বাংলাদেশের মানুষের হুংকার দেখে কি ফ্রান্স ভয় পেয়ে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে? করেনি। উল্টো এই যে অন্য দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর গলায় জুতার মালা পরানো, তাদের পতাকা পোড়ানো, ছবিতে লাথি মারা, মূর্তি পোড়ানো– এসব ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যায় এবং উগ্র ধর্মান্ধ আগ্রাসী লোকদের দেশ হিসেবে দেশের পরিচিতি পায়!
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে “চীনের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে!(উইঘুর)”, “আমেরিকার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে!(ইজরায়েল), “ভারতের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে!(কাশ্মীর)”… এই যুগে এত বিচ্ছেদ করে যে ছয় মাসও দেশ চালানো যাবে না সেই বাস্তব বিবেচনাবোধ এদের নেই!
মোদির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো কী কী একটু দেখি। প্রথমত, কাশ্মীর সমস্যা। জম্মু ও কাশ্মীর ১৯৪৭ সাল থেকে ভারতের ভেতর৷ ভারত তাদের স্বায়ত্তশাসন দেবে নাকি দেবে না এটা একান্ত তাদের ব্যাপার। এই নিয়ে কোন আরব দেশেরও মাথাব্যথা নেই। কিন্তু মাথাব্যথা আছে কেবল পাকিস্তানের আর বাংলাদেশের একদল মানুষের! আজ বাংলাদেশের পার্বত্য ৩ জেলার আদিবাসীরা যদি গণভোটের মাধ্যমে স্বাধীনতা চায় বাংলাদেশ কি গণভোটকে অনুমোদন দেবে? পার্বত্য তিন জেলায় জমি ক্রয়ে সীমাবদ্ধতা থাকলেও যারা সেখানে গিয়ে আদিবাসীদের এলাকায় ঢুকে বসতি স্থাপন করে তাদের স্বতন্ত্র জীবনযাত্রাকে ব্যহত করে কাশ্মীরের বিশেষ অধিকার বাতিলে তাদের বিক্ষোভ করার নৈতিক অধিকার নেই। দ্বিতীয়ত, মোদি একজন সাম্প্রদায়িক মানুষ। একদম সত্য অভিযোগ। কিন্তু আমাদের দেশেও একজন সাম্প্রদায়িক মানুষ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে যেমন আমাদের মানতে হয়/হবে, সেই সাথে সারা বিশ্বেরও এটা মানতে হবে, তেমনি অন্য দেশের ক্ষেত্রেও একথা সত্য। একারণেই মোদির বিরুদ্ধে আমেরিকান নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আমেরিকা সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। কারণ ভারতের সাথে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের স্বার্থে আমেরিকার ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানাতেই হবে! তৃতীয়ত, মোদির আমলে ভারতের সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হচ্ছে। এটাও সত্য। সেই সমাধান আপনি এদেশে রাস্তা আটকিয়ে করতে চান? এদেশে আবার সেই প্রতিবাদ কারা করছে? যারা একটা অজুহাত বের করতে পারলেই এদেশে সংখ্যালঘুদের ৫০-১০০ খানা ঘরবাড়ি, মন্দির পুড়িয়ে দেয়! কী ভণ্ডামি!!!
সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচার হয় না
আরো একটা ভণ্ডামির কথা না বললেই নয়। এই জনতা গুজরাটের কশাই’কে চেনে। কিন্তু ইয়েমেনের কশাইকে(সৌদি যুবরাজ) চেনে? ইয়েমেনে গত পাঁচ বছর ধরে লাগাতার বিমান হামলায় এ পর্যন্ত লাখেরও বেশি মুসলমান প্রাণ হারিয়েছে, মোদি আরো বিশ বছর ক্ষমতায় থাকলেও মনে হয়না এই সংখ্যা অতিক্রম করতে পারবে! কিন্তু কোন হৈচৈ আছে? নেই! কারণ এটা নিয়ে হৈচৈ করে তো ভাবাবেগ জাগানো যাবে না! সব আন্দোলন বিক্ষোভেরই লাভক্ষতির হিসেব আছে!
এবার দেখা যাক কারা এই বিক্ষোভ, ভাংচুরে জড়িত এবং কেন। একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী ও তাদের অনুসারীরা। আর বামদল।
ধর্মীয় গোষ্ঠীর নেতাদের একটা স্বার্থ আছে। তাদের রাজনৈতিক খায়েশের কথা কারোরই অজানা নয়। যত ঘনঘন জনগণের ধর্মীয় সুড়সুড়ি জাগানো যাবে ততই লাভ! খেয়াল করে দেখবেন এরা ইদানীং বেশ ঘনঘন বিভিন্ন ইস্যুতে মাঠে নামছে! এরা একটা অরাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য বলে নিজেদের পরিচয় দিলেও কার্যত এরা প্রত্যেকেই রাজনৈতিক দলের সদস্য। প্রত্যেকটাই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল এবং এরা বিভিন্ন সময়ে এই দেশে ভাস্কর্য চলবে না, জাতীয় সঙ্গীত চলবে না, জাতীয় পতাকা টানানো যাবে না, শহীদ মিনারে ফুল দেয়া যাবে না বলে বলে উস্কানি দেয়, আবার মোদিকে সাম্প্রদায়িক বলে তার আসাকে প্রতিহত করতে চায়! কী হাস্যকর! আর এদের সাথে যে একটা বড় অংশ বিক্ষোভে শামিল হয় তারা রাজনীতি বোঝে না। কিন্তু তাদের ধর্মীয় আবেগকে উপরের নেতারা ব্যবহার করে এবং এই বড় অংশকে ক্রমশ উগ্রপন্থী মতাদর্শের দিকে ধাবিত করে। এরপর আসে বামদল। বামদলগুলো বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে সত্তরের দশকের পরপরই। এদের কোন রাজনৈতিক কার্যক্রম নেই, শুধু বড় শহরের দেয়াল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে কিছু চিকামারা, ৪-৫ জন কর্মী, একটা মাইক ও একটা ব্যানার নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ‘বুর্জোয়া হটাও, শ্রমিক বাঁচাও’ এই টাইপ শ্লোগান ছাড়া। এরা ক্রমশ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং জনগণ থেকে দূরে গিয়ে এদের রাজনীতি কেবল আদর্শের বইতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে! তো হঠাৎ করে তাদের মনে হয়েছে সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করা যাক, তাহলে কিছু সমর্থন পাওয়া যেতে পারে! একদম ভুল চিন্তাভাবনা! এরা এখন যা করছে তাতে এদের এক পয়সার লাভও হবে না, উল্টো উগ্র ডানপন্থীদেরই এরা পরোক্ষভাবে সাহায্য করছে!
শেষে এটাই বলবো যে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ভারতের মত একটা দেশ যারা একাত্তরে স্বাধীনতায় সবথেকে বেশি অবদান রেখেছিলো, সেই সাথে তারা ক্ষমতাধর নিকট প্রতিবেশী, তাদের সর্বোচ্চ নির্বাহী ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ না করার চিন্তাটা একেবারেই অবাস্তব, তাদের এড়িয়ে অনুষ্ঠান করা সম্ভব ছিলো না। পছন্দ করুক আর না করুক দেশে অন্য কোন দল ক্ষমতায় থাকলেও ভারতকে বাদ দিয়ে এই অনুষ্ঠান করতে পারতো না! আমি তাকে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করলেও মেনে নিয়েছি। অন্য দেশগুলোর নাগরিকদের মত বাস্তবতার কথা চিন্তা করে মেনে নেওয়ার অভ্যাস করুন।
মোদির বিরুদ্ধে আমেরিকান নিষেধাজ্ঞা ছিল, কিন্তু তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আমেরিকা তা তুলে নেয়। কারণ ভারতের মতো রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক রাখতে হলে তার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান জানাতেই হবে। একইভাবে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রতিবেশী ভারতের সর্বোচ্চ ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ না করা ছিল এক অবাস্তব চিন্তা।
উপসংহার: রাষ্ট্র পরিচালনা আর রাজপথের স্লোগান এক নয়। মিয়ানমারে গণতন্ত্র না থাকলেও বাংলাদেশ তাদের সাথে সম্পর্ক রাখছে কারণ ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় সম্পর্কচ্ছেদ কোনো সমাধান নয়। যারা “অমুক দেশের সাথে বিচ্ছেদ চাই” বলে হুংকার দেন, তারা রাষ্ট্র চালাতে পারবেন না। আবেগ বর্জন করে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার অভ্যাসই একটি জাতিকে আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত করতে পারে।
তথ্যসূত্র (Sources):
১. আন্তর্জাতিক সংবাদ: আল জাজিরা, বিবিসি ও রয়টার্স (মোদির আরব দেশ সফর ও সম্মাননা সংক্রান্ত রিপোর্ট)। ২. ঐতিহাসিক নথি: চাবাহার বন্দর চুক্তি ও কাশ্মীর ইস্যু সংক্রান্ত ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি। ৩. বিশ্লেষণাত্মক তথ্য: বিডিএস বুলবুল আহমেদ-এর সংগৃহীত মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও রাজনৈতিক আর্কাইভ।
সম্পাদনা: বিডিএস বুলবুল আহমেদ তারিখ: ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের মানুষের চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষায় এক আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে। মানুষ এখন আর শুধু ‘বাপ-মায়ের পরিচয়’ দিয়ে নেতৃত্ব মেনে নিতে নারাজ। এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে তারেক রহমান কেন বড় সংকটের মুখে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বইছে সমালোচনার ঝড়। চলুন নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করি তারেক রহমানের নেতৃত্বের কিছু প্রশ্নবিদ্ধ দিক।

১. শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক দূরত্ব
আধুনিক বিশ্বে একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নেতার যে একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড প্রয়োজন, তারেক রহমানের ক্ষেত্রে তা নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। উইকিপিডিয়া ও অন্যান্য তথ্যমতে, তিনি গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন এমন কোনো দাপ্তরিক রেকর্ড নেই। অক্সফোর্ড বা ক্যামব্রিজের মতো বিশ্বসেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় গত ১৭ বছরে তাঁকে কোনো সেমিনার বা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় দেখা যায়নি, যা একজন বৈশ্বিক নেতার জন্য অপরিহার্য ছিল।
২. লন্ডনের ১৭ বছর: নীরবতা না ইমেজ সংকট?
দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে অবস্থান করলেও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর বলিষ্ঠ উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। প্রবাসী ছাত্র বা বুদ্ধিজীবীদের মাঝে তিনি নিজের কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক ইমেজ তৈরি করতে পারেননি। প্রশ্ন উঠেছে, একজন নেতা হয়েও কেন তিনি আন্তর্জাতিক জনমত তৈরিতে ব্যর্থ হলেন?
৩. জীবনযাত্রার ব্যয় ও আয়ের উৎস নিয়ে ধোঁয়াশা
লন্ডনের মতো ব্যয়বহুল শহরে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে বসবাস করার জন্য প্রয়োজন বিপুল অর্থ। কিন্তু তারেক রহমান সেখানে কী ব্যবসা বা চাকরি করেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা জনসমক্ষে নেই। একজন পাবলিক লিডারের আয়ের উৎস স্বচ্ছ না থাকাটা রাজনৈতিক নৈতিকতার পরিপন্থী বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
৪. ৯০-এর আন্দোলন ও রাজনৈতিক অনুপস্থিতি
১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে যখন বেগম খালেদা জিয়া রাজপথে জীবন বাজি রেখে লড়ছিলেন, তখন ২৫ বছরের টগবগে যুবক তারেক রহমান ছিলেন পর্দার আড়ালে। তাঁর জীবনে রাজপথের লড়াইয়ের চেয়ে ‘ক্ষমতায় বসে রাজনীতি’ করার ইতিহাসই বেশি স্পষ্ট, যা ২০০১ সালের ‘হাওয়া ভবন’ কেন্দ্রিক রাজনীতিতে প্রমাণিত হয়েছে।
৫. নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা বনাম উত্তরাধিকার
জুলাই বিপ্লবের পর আজকের তরুণ সমাজ মেধা এবং কাজের ভিত্তিতে নেতৃত্ব দেখতে চায়। ডাকসু বা জাকসু নির্বাচনের সাম্প্রতিক ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মানুষ এখন আর বংশপরম্পরার রাজনীতিতে আস্থা রাখছে না। তারেক রহমানের আশেপাশে থাকা ব্যক্তিদের ইমেজও তাঁর নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
গুগল অ্যানালাইসিস ও নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র (Sources):
১. উইকিপিডিয়া ও বায়োগ্রাফি রেকর্ড: তারেক রহমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রারম্ভিক রাজনৈতিক জীবন। ২. আন্তর্জাতিক মিডিয়া আর্কাইভ (বিবিসি, আল-জাজিরা): গত ১৭ বছরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারেক রহমানের উপস্থিতি ও বক্তব্যের রেকর্ড। ৩. নির্বাচন কমিশন ও হলফনামা রেকর্ড (২০০১, ২০০৮): তৎকালীন সময়ে বিএনপি নেতৃত্বের সম্পদ ও আয়ের বিবরণের তুলনা। ৪. বিডিএস বুলবুল আহমেদ সোশ্যাল অ্যানালিটিকস: জুলাই বিপ্লব পরবর্তী জেনারেশন জেড (Gen-Z) এর রাজনৈতিক পছন্দ ও নেতৃত্বের প্যারামিটার বিশ্লেষণ।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একজন মানুষ কি খুঁজে পাওয়া সম্ভব, যিনি একাধারে রণাঙ্গনের শ্রেষ্ঠ বীর, বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তি এবং একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক? অবিশ্বাস্য মনে হলেও, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নতুন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ঠিক তেমনই এক জীবন্ত রূপকথা।
তারেক রহমানের এই একটি মনোনয়ন বাংলাদেশের রাজনীতির সব সমীকরণ বদলে দিয়েছে। কেন মেজর হাফিজকে বলা হয় ‘অলরাউন্ডার অফ দ্য সেঞ্চুরি’? চলুন জেনে নিই তাঁর জীবনের ৫টি রোমাঞ্চকর তথ্য।
১. বঞ্চিত এক ‘বীরশ্রেষ্ঠ’?
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়, মেজর হাফিজ ছিলেন যশোর সেনানিবাসের সেই অকুতোভয় বাঙালি অফিসার, যিনি প্রথম বিদ্রোহের পতাকা উড়িয়েছিলেন। তাঁর রণকৌশল আর সাহসিকতা দেখে সহযোদ্ধারা তাঁকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাব দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। শুধুমাত্র রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে তিনি সর্বোচ্চ খেতাব পাননি, কিন্তু সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তিনি ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ হয়েই আছেন।
২. পাকিস্তান দলের একমাত্র বাঙালি অধিনায়ক ও ‘দ্রুততম মানব’

আপনি কি জানেন, ফুটবল মাঠেও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজা?
- তিনি পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের নেতৃত্ব দেওয়া ইতিহাসের একমাত্র বাঙালি।
- ষাটের দশকে ট্র্যাকে তিনি ছিলেন দেশের ‘দ্রুততম মানব’ (Fastest Man)।
- অ্যাথলেটিক্স, হকি আর ফুটবল—তিন জায়গাতেই তাঁর সমান শ্রেষ্ঠত্ব ছিল, যা বিশ্বের খুব কম মানুষেরই আছে।
৩. যখন তিনি ম্যারাডোনার ‘বিচারক’ হলেন!
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি হলো বিশ্ব ফুটবলে তাঁর প্রভাব। ১৯৯৪ সালে যখন ফুটবল জাদুকর দিয়েগো ম্যারাডোনা ডোপ কেলেঙ্কারিতে জড়ান, তখন ফিফা যে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত বোর্ড গঠন করেছিল, তার অন্যতম সদস্য ছিলেন এই মেজর হাফিজ। ফিফাতে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল আকাশচুম্বী।
৪. ৭ বারের এমপি ও বর্তমান স্পিকার
রাজনীতির মাঠেও তিনি ক্লীন ইমেজের প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়ার ডাকে রাজনীতিতে এসে ভোলার লালমোহন-তজুমদ্দিন আসন থেকে টানা ৭ বার তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ২০২৬ সালের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁকে স্পিকারের আসনে বসানো সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য এক বড় প্রাপ্তি।
৫. আগামী দিনের রাষ্ট্রপতি?
সামরিক ডিসিপ্লিন, ফুটবল মাঠের গতি আর রাজনীতির প্রজ্ঞা—এই তিনের সংমিশ্রণ মেজর হাফিজকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর নাম আসার সম্ভাবনা প্রবল।
গুগল এনালাইসিস ও নির্ভরযোগ্য সূত্র (Sources):
- বিএফএফ ও ফিফা আর্কাইভ: ম্যারাডোনা ডোপ টেস্ট ইনভেস্টিগেশন বোর্ড (১৯৯৪) মেম্বার লিস্ট।
- মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়: বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্তদের অফিশিয়াল গেজেট।
- সংসদ সচিবালয়: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার মনোনয়ন ও নির্বাচনী ইতিহাস।
- বিডিএস বুলবুল আহমেদ পলিটিক্যাল অ্যানালিটিকস ২০২৬: বর্তমান সরকারের সংস্কার ও সংসদীয় নেতৃত্ব বিশ্লেষণ।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
রাজনীতির মাঠে ‘স্মৃতিশক্তি’ বড় বিচিত্র এক বিষয়। প্রয়োজন ফুরোলে বা সমীকরণ বদলে গেলে নেতারা কত দ্রুত অতীতকে মুছে ফেলে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারেন, তার বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শেখ হাসিনার একদা করা বিজেপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার তুলনা। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি অতীতে এই দুই দলকেই একই রাজনৈতিক চরিত্রের বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। অথচ সময়ের বিবর্তনে সেই বিজেপি আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক অনিবার্য শক্তিকেন্দ্র।
১. ‘স্মৃতিশক্তি যখন রাজনীতির দাস’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন রাষ্ট্রনায়কের বক্তব্য শুধু বর্তমানের জন্য হয় না, তা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে। জামায়াতে ইসলামীর সাথে বিজেপিকে একই পাল্লায় মাপার সেই মন্তব্যটি মূলত বাবরি মসজিদ ইস্যু এবং তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ছিল। কিন্তু বর্তমানে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের যে ‘ফ্যাভিকল’ বন্ধন, তাতে এই পুরনো মন্তব্য যেন এক অমীমাংসিত অস্বস্তি। নরেন্দ্র মোদীর ‘অজ্ঞতা’ আসলে কোনো বিস্মৃতি নয়, বরং এটি কূটনীতির এক বিশেষ কৌশল—যেখানে অস্বস্তিকর অতীতকে উপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
২. আদভানি কানেকশন: এক রহস্যময় অতীত
প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, জামায়াত নেতাদের ভারত সফর এবং লালকৃষ্ণ আদভানির সাথে তাদের সংযোগ একদা বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিতর্কের ঝড় তুলেছিল। এখন প্রশ্ন উঠছে, যে দলটি ভারতের তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপির সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করেছিল, সেই দলটিই কেন পরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবল ভারতবিরোধী মেরুকরণের প্রধান শক্তি হয়ে উঠল? এই প্যারাডক্সটিই আজকের রাজনীতির সবচেয়ে বড় রহস্য।
৩. সোশ্যাল মিডিয়া ও ট্রল সংস্কৃতির প্রভাব
ডিজিটাল যুগে কিছুই হারিয়ে যায় না। নেটিজেনরা আজ পুরনো নিউজ ক্লিপিং খুঁড়ে বের করছেন, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য এক বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করছে। বিজেপির মতো শক্তিশালী দলের সাথে জামায়াতের তুলনাকে এখন ট্রলাররা ‘পলিটিক্যাল স্যাটায়ার’ হিসেবে দেখছেন। এটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ এখন রাজনীতির এই ‘ইউ-টার্ন’গুলোকে বেশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতেই পর্যবেক্ষণ করে।
৪. সুবিধাবাদ নাকি পরিস্থিতির দাবি?
রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই—এই প্রবাদের বাস্তব রূপ আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি। শেখ হাসিনার সেই সময়কার ‘লিবারেল’ ইমেজ বনাম বর্তমানের ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা—এই দুটি সত্তার সংঘাতই আসলে আমাদের বর্তমান কূটনীতির সারমর্ম। মোদীজির ‘বিস্মৃতি’ আসলে সেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞারই অংশ, যেখানে বন্ধুত্বের খাতিরে অতীতকে ঝেড়ে ফেলে ভবিষ্যতের লক্ষ্যপূরণই প্রধান কাজ।
বিডিএস বুলবুল আহমেদ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ:
রাজনৈতিক স্মৃতির এই সংকট কেবল শেখ হাসিনা বা নরেন্দ্র মোদীর নয়, এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক চিরন্তন রূপ। ইতিহাস যখন রাজনীতির দাস হয়ে যায়, তখন সত্যের চেয়ে সুবিধার পাল্লাই ভারি থাকে। আজকের এই ট্রল বা বিতর্ক হয়তো কিছুদিন পর চাপা পড়ে যাবে, কিন্তু এটি আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল যে, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বা মিত্র বাড়াতে নেতারা কত সহজে নিজের পুরনো অবস্থান বদলে ফেলতে পারেন। আর সাধারণ মানুষ? তারা কেবলই দর্শক, যারা এই ‘ইতিহাসের বিস্মৃতি’ দেখে মুচকি হাসে!
বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
দেশের রাজনৈতিক বিবর্তন ও সমসাময়িক খবরের গভীর বিশ্লেষণ পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
সূত্র: ১. তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদপত্রের আর্কাইভ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রতিবেদন। ২. দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক ও ক্ষমতার পালাবদল বিষয়ক বিশ্লেষণ।



