ইতিহাস
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
In the dynamic world of WordPress, we emerge as a beacon of innovation and excellence. Our popular products, like CoverNews, ChromeNews, Newsphere, and Shopical, alongside powerful plugins such as WP Post Author, Blockspare, and Elespare, serve as the building blocks of your digital journey.
We’re passionate about quality code and elegant design, ensuring your website creation is an effortless blend of sophistication and simplicity. With unwavering support from our dedicated team, you’re never alone.
Templatespare: Create Your Dream Website with Easy Starter Sites!
A beautiful collection of Ready to Import Starter Sites with just one click. Get modern & creative websites in minutes!
Newspaper, Magazine, Blog, and eCommerce Ready
Forget About Starting From Scratch
Explore a world of creativity with 365+ ready-to-use website templates! From chic blogs to dynamic news platforms, engaging magazines, and professional agency websites – find your perfect online space!
One Click Import: No Coding Hassle! Three Simple Steps
Embark on your website journey with simplicity and style. Follow these 3 easy steps to create your online masterpiece effortlessly
- Choose a Site
Explore a rich selection of over 350 pre-built websites. With a single click, import the site that resonates with your vision. - Customize & Personalize
Unleash your creativity! Customize your chosen site with complete design freedom. Tailor every element to build and personalize your website exactly the way you envision it. - Publish & Go Live!
With the editing and customization complete, it’s time to go live! In just minutes, your website will be ready to share with the world.
Join the AF themes family, where excellence meets ease. Explore the endless possibilities and embark on your web journey with us today!
Together, we’re shaping the future of the web.
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
রাজনৈতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ৩ জুন ২০২৬
১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৪ বছরের পাকিস্তানের ইতিহাস মূলত ছিল বাঙালি জাতির ওপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের চরম রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বৈষম্যের ইতিহাস। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা বেশি হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে।

কিন্তু ইতিহাসের পাত উল্টে যদি একটি “বিকল্প রাজনৈতিক সমীকরণ” বা হাইপোথেটিক্যাল মডেল চিন্তা করা যায়, যেখানে বাঙালিদের অধিকার সুরক্ষায় ৫টি কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হতো—তবে কেমন হতো তৎকালীন শাসনব্যবস্থা? চলুন পালস বাংলাদেশের আজকের বিশেষ আয়োজনে এই অভিনব সমীকরণের একটি যৌক্তিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করা যাক।
১. সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীতে ১০০% বাংলাদেশি (বাঙালি)
তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব ছিল মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ। আপনার প্রস্তাব অনুযায়ী যদি সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর শতভাগ সদস্যই হতো বাংলাদেশি, তবে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মতো কোনো “অপারেশন সার্চলাইট” বা নির্মম গণহত্যা চালানো পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষে কখনোই সম্ভব হতো না। দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকত সম্পূর্ণ বাঙালিদের হাতে, যা যেকোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক ষড়যন্ত্র থেকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে চিরতরে নিরাপদ রাখত।

২. রাজধানী হতো ঢাকা
পাকিস্তানের শুরু থেকেই করাচি, পরবর্তীতে রাওয়ালপিন্ডি এবং ইসলামাবাদকে রাজধানী করা হয়। যেহেতু দেশের সিংহভাগ মানুষ (প্রায় ৫৬%) পূর্ব পাকিস্তানে বাস করত, তাই যৌক্তিক কারণেই রাজধানী ঢাকার হওয়া উচিত ছিল। ঢাকা রাজধানী হলে সমস্ত বড় বড় সরকারি দফতর, বৈদেশিক দূতাবাস এবং নীতি-নির্ধারণী কেন্দ্র এখানে গড়ে উঠত। ফলে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু পশ্চিম পাকিস্তান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে ঢাকায় চলে আসত এবং বাঙালিরাই রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রধান ভূমিকা পালন করত।

৩. রাজনীতি ও বৈষম্যহীন ভোটাধিকার (বাংলাদেশি ১.০ বনাম পাকিস্তানি ০.৫)
এটি অত্যন্ত চমৎকার এবং কৌশলগত একটি প্রস্তাব। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা সবসময় বাঙালিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ভয় পেত এবং সে কারণেই তারা ‘ওয়ান ইউনিট’ প্রথার মতো নানা রাজনৈতিক চক্রান্ত করেছিল। যদি নিয়ম হতো যে—শুধু বাংলাদেশের নাগরিকরাই রাজনৈতিক দল খুলতে পারবে এবং ভোটের মানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষের ভোটের মান হবে ১.০ আর পাকিস্তানিদের হবে ০.৫, তবে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে পশ্চিম পাকিস্তানি সামন্তবাদী ও সামরিক জান্তাদের আধিপত্য চিরতরে খর্ব হয়ে যেত। জনসংখ্যার অনুপাতে এবং ভোটের ওজনে বাঙালিরাই হতো পাকিস্তানের চিরস্থায়ী ও একমাত্র নীতিনির্ধারক।

৪. রাষ্ট্রভাষা বাধ্যতামূলক বাংলা
১৯৪৮ এবং ১৯৫২ সালে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার যে অপচেষ্টা পশ্চিম পাকিস্তানিরা করেছিল, তার জবাবেই রক্তের বিনিময়ে সংঘটিত হয়েছিল ভাষা আন্দোলন। যদি শুরু থেকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে একমাত্র ‘বাংলা’কে বাধ্যতামূলক করা হতো, তবে তা হতো বাঙালিদের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক বিজয়। এর ফলে সরকারি চাকরি, শিক্ষা এবং গণমাধ্যমে বাঙালিরা জন্মগতভাবেই এগিয়ে থাকত এবং কোনো ধরনের ভাষাগত বৈষম্যের শিকার হতে হতো না।

৫. রাজস্ব আয়ের ৪০ শতাংশ দিতে হতো ঢাকাকে (কেন্দ্রীয় সরকার)
তৎকালীন সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের পাট ও চামড়া রপ্তানির সিংহভাগ টাকা দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি ও ইসলামাবাদ গড়ে তোলা হয়েছিল। আপনার প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক মডেলে যদি উল্টো নিয়ম করা হতো—অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তানের মোট রাজস্ব আয়ের ৪০ শতাংশ ঢাকাকে (কেন্দ্রীয় সরকার) দিয়ে দিতে হতো, তবে পূর্ব পাকিস্তান হতো সে সময়ের এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ অর্থনৈতিক পরাশক্তি। পশ্চিম পাকিস্তানের টাকায় উন্নত হতো ঢাকার রাস্তাঘাট, বন্দর এবং কলকারখানা।

চূড়ান্ত মূল্যায়ন
আপনার উত্থাপিত এই ৫টি শর্ত যদি বাস্তবে রূপ পেত, তবে “পাকিস্তান” নামক রাষ্ট্রটির নাম বহাল থাকলেও, তার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতা এবং চাবিকাঠি থাকত সম্পূর্ণ বাঙালিদের হাতে। পশ্চিম পাকিস্তান মূলত পূর্ব পাকিস্তানের একটি ‘অধীনস্থ অঞ্চল’ বা কলোনিতে পরিণত হতো।
তবে ঐতিহাসিক বাস্তবতায় পশ্চিম পাকিস্তানি শোষকরা কখনোই এই সমতা ও অধিকার মেনে নিত না, যা শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই অর্জিত হয়েছে। বাঙালির এই গৌরবময় ইতিহাস এবং অধিকারের লড়াই আমাদের আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ।
আপনার কি মনে হয়?
এই শর্তগুলো কার্যকর হলে কি অবিভক্ত পাকিস্তান টিকে থাকতে পারত? আপনার মতামত নিচে কমেন্ট করে জানান।
ইতিহাস, রাজনীতি ও সমসাময়িক বিষয়ের এমন চমৎকার ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণ নিয়মিত পড়তে ভিজিট করুন পালস বাংলাদেশ | Pulse Bangladesh।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ইনফোটেনমেন্ট ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ৩ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গতিপথ পরিবর্তনকারী এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যদি ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে নির্মমভাবে নিহত না হতেন, তবে আজকের বাংলাদেশের চেহারা কেমন হতো? তিনি যদি আরও ২০ থেকে ৩০ বছর (অর্থাৎ ২০০০ বা২০১০ সাল পর্যন্ত) রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকতেন, তবে কি বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ার ‘সিঙ্গাপুর’ বা ‘মালয়েশিয়া’ হতে পারত?

ইতিহাসের কোনো ‘যদি’ বা ‘তবে’র সুনির্দিষ্ট উত্তর হয় না। তবে একজন রাষ্ট্রনায়কের দূরদর্শিতা, তাঁর গৃহীত নীতি এবং সমসাময়িক বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে জিয়াউর রহমানের দীর্ঘস্থায়ী শাসনের একটি বাস্তবসম্মত এবং নির্মোহ রূপরেখা দাঁড় করানো সম্ভব।
আজকের বিশেষ ফিচারে আমরা আলোচনা করব জিয়ার দীর্ঘ শাসনামল বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজব্যবস্থায় কী ধরনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারত।

১. অর্থনৈতিক রূপান্তর: মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের কাতার?
অনেকেই জিয়াউর রহমানকে মালয়েশিয়ার আধুনিক রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ কিংবা সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ-এর সমকক্ষ মনে করেন। তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থিতিশীল অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটত—এ কথা অনস্বীকার্য।

- কৃষি বিপ্লব ও খাদ্য নিরাপত্তা: জিয়াউর রহমানের শুরু করা দেশব্যাপী ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ এবং গ্রামীণ অর্থনীতি-ভিত্তিক উৎপাদনশীলতা যদি আরও দুই দশক নিরবচ্ছিন্নভাবে চলত, তবে বাংলাদেশ আশির দশকের শেষেই খাদ্য উৎপাদনে সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করত। দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতিকে যেভাবে তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন, তার গতি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেত।
- শিল্পায়ন ও তৈরি পোশাক খাতের বিকাশ: বাংলাদেশে আজকের তৈরি পোশাক শিল্পের (RMG) ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির (ম্যানপাওয়ার এক্সপোর্ট) প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই। তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে আশির দশকেই দেশে ব্যাপক বেসরকারীকরণ ও শিল্পায়ন ঘটত। ফলে, ২০২৬ সালের আজকের বাংলাদেশ হয়তো জিডিপি ও মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের সমকক্ষ অবস্থানে থাকত।
২. সফল জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও মানবসম্পদ উন্নয়ন
জিয়াউর রহমানই প্রথম দূরদর্শিতার সাথে জনসংখ্যাকে বাংলাদেশের ‘এক নম্বর সমস্যা’ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর নির্দেশে শুরু হয়েছিল জন্মনিয়ন্ত্রণের এক মহা পরিকল্পনা।

এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা যদি আরও ২০ বছর কঠোরভাবে রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে বজায় থাকত, তবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা আজ ১৭-১৮ কোটির পরিবর্তে হয়তো ১২ থেকে ১৩ কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। জনসংখ্যাকে ‘জনস্ফীতি’ না বানিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের কারণে মাথাপিছু সম্পদের বণ্টন আরও উন্নত হতো এবং দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান ও মাথাপিছু আয় আজকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হতো। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে যে সাফল্য দেখিয়েছে, তার পুরো কৃতিত্বই এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার।
৩. পররাষ্ট্রনীতি: মুসলিম বিশ্ব ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘মিডল পাওয়ার’
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল আকাশচুম্বী। তিনি ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে গঠিত ওআইসি (OIC) মধ্যস্থতাকারী টিমের অন্যতম শীর্ষ নেতা ছিলেন। এছাড়া আল-কুদস কমিটিতে তাঁর অনবদ্য ভূমিকার কারণে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী নেতা ইয়াসির আরাফাত বারবার বাংলাদেশ সফর করেছিলেন।

তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে:
- সার্ক (SAARC) হতো আরও শক্তিশালী: জিয়াউর রহমানের মস্তিষ্কপ্রসূত ‘সার্ক’ দক্ষিণ এশিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্লকে পরিণত হতে পারত। এর ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্যে ভারতের একক আধিপত্যের ভারসাম্য বজায় থাকত।
- ভূ-রাজনৈতিক শক্তি: মুসলিম বিশ্ব, মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিমা ব্লকের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাত এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশ একটি ‘মিডল পাওয়ার’ বা মধ্যম শক্তির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতো।
৪. রাজনীতির উল্টো পিঠ: বহুদলীয় গণতন্ত্র বনাম পুনর্বাসন বিতর্ক

ইতিহাসের খতিয়ান যেমন জিয়াউর রহমানের অভাবনীয় সাফল্যকে স্বীকৃতি দেয়, তেমনি তাঁর কিছু নীতিকে ঘিরে ঐতিহাসিক বিতর্ককেও সামনে আনে। রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে এই বিষয়গুলোর প্রভাব আরও সুদূরপ্রসারী হতে পারত:
- ডানপন্থী রাজনীতির স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: একদলীয় শাসন বা বাকশাল ব্যবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করে ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’ চালু করা জিয়ার অন্যতম বড় রাজনৈতিক সাফল্য। তবে এই বহুদলীয় গণতন্ত্রের আড়ালে জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের মতো ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের যে প্রক্রিয়া তিনি শুরু করেছিলেন, তা অনেকেই ‘চাঁদের কলঙ্কের’ মতো দাগ হিসেবে দেখেন। তিনি আরও ২০-৩০ বছর ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডানপন্থী ও ধর্মীয় মেরুকরণের শিকড় আরও গভীরে প্রবেশ করত।
- সামরিকায়িত বেসামরিক শাসন ও ভিন্নমত দমন: জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিল—তিনি ক্ষমতায় থাকার জন্য অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সহজে সহ্য করতেন না। তাঁর ৫ বছরের শাসনামলেই প্রায় ২০টির মতো ছোট-বড় সামরিক অভ্যুত্থান (Coup) হয়েছিল এবং তা দমনে বহু সেনা সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে হয়তো দেশ সম্পূর্ণ একটি “সামরিকায়িত বেসামরিক শাসনে” (Militarized Civilian Rule) রূপ নিত, যেখানে বাকস্বাধীনতা বা উদার গণতান্ত্রিক স্পেস সংকুচিত থাকত।
৫. দুর্নীতিমুক্ত শীর্ষ নেতৃত্ব বনাম প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতন্ত্র

ব্যক্তিগতভাবে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ নেই। তাঁর সততা, সাধারণ জীবনযাপন এবং ছেঁড়া গেঞ্জি ও ভাঙা সুটকেসের গল্প সর্বজনবিদিত। বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি এবং বিরোধী দলীয় নেতাদের মধ্যে আর্থিক দুর্নীতি চরম আকার ধারণ করলেও জিয়ার ব্যক্তিগত সততা আজও অনুকরণীয়।
তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে হয়তো রাষ্ট্রীয় শীর্ষ পর্যায়ে আর্থিক দুর্নীতি আজকের মতো এতটা নজিরবিহীন ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেত না। তবে, দীর্ঘস্থায়ী এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনে নিচের দিকের আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক সুবিধাভোগী শ্রেণীর মধ্যে এক ধরণের ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা তোষামোদের অর্থনীতি গড়ে ওঠার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বাংলাদেশের গঠনে ও উন্নয়নে জিয়াউর রহমানের প্রধান অবদানসমূহ:
জিয়াউর রহমান মাত্র ৫ বছর (১৯৭৬-১৯৮১) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। এই স্বল্প সময়ে তিনি যেসমস্ত যুগান্তকারী অবদান রেখে গেছেন, তা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
১. অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও মুক্তবাজার অর্থনীতি
- বেসরকারীকরণ: স্বাধীনতার পর দেশের সিংহভাগ শিল্পকারখানা রাষ্ট্রীয়করণ (Nationalized) করা হয়েছিল, যার ফলে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছিল। জিয়াউর রহমান এসে প্রথম মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু করেন এবং বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করেন।
- তৈরি পোশাক শিল্প (RMG): বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের লাইসেন্স ও বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রথম তাঁর সময়েই দেওয়া হয়। ‘দেশ গার্মেন্টস’-এর মাধ্যমে এই খাতের সূচনা তাঁর হাত ধরেই হয়েছিল।
- জনশক্তি রপ্তানি: মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে বাংলাদেশী শ্রমিক পাঠানোর আনুষ্ঠানিক ও সরকারি প্রক্রিয়া তিনি শুরু করেন, যা আজ আমাদের রেমিট্যান্সের মূল ভিত্তি।
২. কৃষি বিপ্লব ও স্বনির্ভরতা (খাল কাটা কর্মসূচি)
- দেশব্যাপী খাল কাটা: কৃষিতে সেচ সুবিধা পৌঁছানোর জন্য তিনি নিজে কোদাল হাতে নিয়ে সারা দেশে “খাল কাটা কর্মসূচি” শুরু করেছিলেন। এর মাধ্যমে হাজার হাজার মাইল খাল খনন ও পুনর্খনন করা হয়, যা দেশের খাদ্য উৎপাদন হুটকরে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
- গ্রাম সরকার ও পল্লি বিদ্যুৎ: গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে তিনি ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা এবং গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার জন্য ‘পল্লি বিদ্যুতায়ন বোর্ড’ (REB) গঠন করেন।
৩. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে ‘এক নম্বর সমস্যা’ ঘোষণা
- স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল আশঙ্কাজনক। জিয়াউর রহমান দূরদর্শিতার সাথে জনসংখ্যাকে দেশের ১ নম্বর সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করেন।
- তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবার পরিকল্পনার সামগ্রী ও সচেতনতা ছড়ানোর জন্য হাজার হাজার নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করেন। আজ মুসলিম বিশ্বের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের যে অভাবনীয় সাফল্য, তার মূল ভিত্তি এটিই।
৪. পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি
- সার্ক (SAARC) প্রতিষ্ঠা: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য সার্ক গঠনের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা এবং উদ্যোক্তা ছিলেন জিয়াউর রহমান।
- মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক: সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যুক্তকরণ এবং ওআইসি (OIC)-তে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান, যা পূর্বে অত্যন্ত শীতল ছিল।
- জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশ: তাঁর সফল কূটনীতির ফলেই বাংলাদেশ ১৯৭৯ সালে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের (UN Security Council) অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল।
৫. জাতীয়তাবাদ ও বহুদলীয় গণতন্ত্র
- বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ: তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের ভূখণ্ডের সব মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর তত্ত্ব দেন, যা দেশের সার্বভৌমত্বকে এক নতুন পরিচয় দেয়।
- বহুদলীয় গণতন্ত্র: ১৯৭৫ সালের একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) বিলুপ্ত করে তিনি দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন এবং সব রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি করার অধিকার দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেন।
চূড়ান্ত মূল্যায়ন
সব মিলিয়ে বলা যায়, জিয়াউর রহমান যদি আরও ২০-৩০ বছর বেঁচে থেকে দেশ শাসন করতে পারতেন, তবে আজকের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত দিক থেকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, উন্নত ও সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রে পরিণত হতো—এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এর বিনিময়ে রাষ্ট্রকে হয়তো রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, বাকস্বাধীনতা এবং উদার পশ্চিমা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কিছুটা আপস করতে হতো। সহজ কথায়, আজকের বাংলাদেশ হয়তো দেখতে অনেকটা মাহাথিরের মালয়েশিয়া কিংবা আধুনিক ভিয়েতনামের মতো—একটি নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি হতো।
আপনার মতামত জানান:
জিয়াউর রহমান দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে আজকের বাংলাদেশ কেমন হতো বলে আপনি মনে করেন? আপনার মূল্যবান মতামত নিচে কমেন্ট করে জানান।
দেশ-বিদেশের রাজনীতি, ইতিহাস এবং সমসাময়িক বিষয়ের গভীর ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণমূলক কন্টেন্ট নিয়মিত পড়তে বুকমার্ক করে রাখুন আপনার পছন্দের তথ্যমাধ্যম পালস বাংলাদেশ | Pulse Bangladesh।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
১. নিষেধাজ্ঞার ঐতিহাসিক টাইমলাইন (১৯৪৯–২০২৫)
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৬ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে দলটি একাধিকবার সামরিক জান্তা, ঔপনিবেশিক শাসক এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নিজস্ব স্বৈরতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের দায়ে আইনি ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৫ সালে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া পর্যন্ত ঐতিহাসিক নিষেধাজ্ঞার কালপঞ্জি বা টাইমলাইন নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. পাকিস্তান আমল (১৯৪৯-১৯৭১): ঔপনিবেশিক ও সামরিক দমননীতি
- ১৯৫৮ (অক্টোবর): আইয়ুব খানের সামরিক শাসন ও দল নিষিদ্ধকরণ
- প্রেক্ষাপট: ৭ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা দেশে সামরিক আইন জারি করেন। এর মাত্র ২০ দিন পর জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেন।
- নিষেধাজ্ঞা: আইয়ুব খান ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ ইলেক্টেড বডিজ ডিসকোয়ালিফাইড অর্ডিন্যান্স’ (PPODO) জারি করে আওয়ামী লীগসহ পাকিস্তানের সমস্ত প্রধান রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবুর রহমানসহ শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত কড়া নজরদারিতে রাখা হয়।
- ১৯৭১ (মার্চ): ইয়াহিয়া খানের নিষেধাজ্ঞা ও মুক্তিযুদ্ধ
- প্রেক্ষাপট: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়।
- নিষেধাজ্ঞা: ২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি নিধনযজ্ঞ (অপারেশন সার্চলাইট) শুরুর পর, ২৬ মার্চ ১৯৭১ তারিখে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ “বেআইনি ও নিষিদ্ধ” ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তামাদি হয়।
২. স্বাধীন বাংলাদেশ আমল (১৯৭৫-২০০৮): রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও জরুরি অবস্থা

- ১৯৭৫ (আগস্ট): বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও সামরিক অধ্যাদেশ
- প্রেক্ষাপট: ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নিজেই বহুদলীয় গণতন্ত্র বিলুপ্ত করে একমাত্র রাষ্ট্রীয় দল ‘বাকশাল’ গঠন করেছিল।
- নিষেধাজ্ঞা: ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর ক্ষমতা দখলকারী খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও পরবর্তী সামরিক সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাকশাল ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে স্থগিত ও নিষিদ্ধ করে। ১৯৭৬ সালের শেষের দিকে ‘রাজনৈতিক দল অধ্যাদেশ’ (PPR) জারির মাধ্যমে সীমিত পরিসরে দল পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়।
- ২০০৭ (জানুয়ারি): ১/১১-এর জরুরি অবস্থা ও মাইনাস-টু ফর্মুলা
- নিষেধাজ্ঞা (পরোক্ষ): সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে সমস্ত রাজনৈতিক দলের ইনডোর ও আউটডোর রাজনীতি নিষিদ্ধ করে。 শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার চেষ্টা করা হয়, যা ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে প্রত্যাহার করা হয়।
৩. আধুনিক আমল (২০২৪-২০২৫): জুলাই গণহত্যা ও চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা

- ২০২৪ (অক্টোবর): ছাত্রলীগ নিষিদ্ধকরণ
- কারণ: দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালীন বৈষম্য ও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বর সশস্ত্র হামলা ও নিধনযজ্ঞের দায়ে অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে
- ২০২৫ (মে): আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন স্থগিত

- কারণ: গত ১৫ বছর ধরে বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর নির্যাতন, গুম, খুন, আয়নাঘর তৈরি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, ব্যাংকিং খাত ধ্বংস ও অর্থ পাচার এবং সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ১,৪০০-এর বেশি মানুষকে নির্বিচারে হত্যার (গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ) সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দেশজুড়ে তীব্র গণদাবি ওঠে।
- নিষেধাজ্ঞা: ১২ মে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’ এবং নতুন অধ্যাদেশের আওতায় আওয়ামী লীগ এবং এর সমস্ত অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অফলাইন-অনলাইনসহ সব ধরণের রাজনৈতিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করে। একই দিনে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (EC) দলটির রাজনৈতিক নিবন্ধন স্থগিত করে।
ঐতিহাসিক সারসংক্ষেপ টেবিল:
| সাল | নিষেধাজ্ঞা প্রদানকারী | প্রধান কারণ | নিষেধাজ্ঞার ধরণ |
|---|---|---|---|
| ১৯৫৮ | জেনারেল আইয়ুব খান | সামরিক শাসন জারি ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল | সমস্ত রাজনৈতিক দলসহ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ |
| ১৯৭১ | জেনারেল ইয়াহিয়া খান | বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন দমন ও যুদ্ধ ঘোষণা | আওয়ামী লীগকে বেআইনি ঘোষণা ও লোগো নিষিদ্ধ |
| ১৯৭৫ | মোশতাক ও পরবর্তী সামরিক জান্তা | বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও বাকশাল আমলের অবসান | বাকশাল ও আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত |
| ২০২৪ | অন্তর্বর্তী সরকার | জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলা | শুধু ‘ছাত্রলীগ’ নিষিদ্ধ (সন্ত্রাসবিরোধী আইন) |
| ২০২৫ | অন্তর্বর্তী সরকার ও ইসি | ১৫ বছরের স্বৈরাচার, গুম, দুর্নীতি ও জুলাই গণহত্যা | মূল দলসহ সমস্ত অঙ্গসংগঠন নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন স্থগিত |
দ্রষ্টব্য: ২০২৫ সালের মে মাসে জারিকৃত এই নিষেধাজ্ঞাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও এর শীর্ষ নেতাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের এপ্রিলে দেশের আইনসভায় এই সংক্রান্ত নতুন আইনি সংশোধনী ও শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়।
২. শাসন আমলের গভীর বিশ্লেষণ: ভালো ও মন্দ দিক

🇦) প্রথম আমল (১৯৭২–১৯৭৫): রাষ্ট্র গঠন বনাম বাকশাল
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রথম শাসন আমলটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় ও রূপান্তরকামী অধ্যায়। এই ৩ বছর ৭ মাসের শাসনকালকে মূলত দুটি বিপরীতমুখী ধারায় ভাগ করা হয়: প্রথম অংশটি ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন ও একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের (State-Building) ঐতিহাসিক প্রয়াস, এবং শেষ অংশটি ছিল সমস্ত গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে একক ক্ষমতার ‘বাকশাল’ (BAKSAL) একদলীয় একনায়কতন্ত্রের সূচনা [bn.wikipedia.org]।
নিচে এই দুই বিপরীতমুখী অধ্যায়ের একটি গভীর ও বিশ্লেষণাত্মক তুলনা তুলে ধরা হলো:
১. রাষ্ট্র গঠন অধ্যায় (১৯৭২–১৯৭৪): একটি নতুন দেশের ভিত্তিপ্রস্তর
দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সরকার শূন্য থেকে একটি রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলার কাজে হাত দেয়। এই পর্বের প্রধান অর্জনগুলো ছিল:
- মাত্র ১০ মাসে আধুনিক সংবিধান (১৯৭২): একটি সদ্য স্বাধীন দেশের জন্য মাত্র ১০ মাসের মধ্যে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। এতে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
- ভারতীয় মিত্রবাহিনীর প্রত্যাহার: বঙ্গবন্ধুর সফল কূটনৈতিক তৎপরতায় ১৯৭২ সালের মার্চের মধ্যেই ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণভাবে স্বদেশে ফেরত পাঠানো হয়, যা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।
- বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি ও জাতিসংঘ পদ লাভ: অতি অল্প সময়ে পরাশক্তিগুলোসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের স্বীকৃতি লাভ এবং ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে (UN) বাংলাদেশের সাধারণ সদস্যপদ নিশ্চিত করা হয়। বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দেন।
- যুদ্ধবিধ্বস্ত পুনর্বাসন ও অবকাঠামো: পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ধ্বংস করে দিয়ে যাওয়া সেতু, রেললাইন, ও সমুদ্রবন্দর (চট্টগ্রাম ও মংলা) দ্রুততম সময়ে চালু করা এবং ভারত থেকে ফেরত আসা ১ কোটি শরণার্থীকে পুনর্বাসন করা হয়।
২. বাকশাল অধ্যায় (১৯৭৫): বহুদলীয় গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক
রাষ্ট্র গঠনের এই ইতিবাচক ধারাটি ১৯৭৪ সালের শেষভাগ থেকে চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, জাসদের সশস্ত্র গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির রাজনৈতিক সহিংসতা এবং রক্ষীবাহিনীর দমনপীড়নের পটভূমিতে ১৯৭৫ সালের শুরুতে সরকার সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নেয়:
- সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী (২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫): এই কালো সংশোধনীর মাধ্যমে মাত্র কয়েক মিনিটের সংসদীয় অধিবেশনে দেশের সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা বাতিল করে একক রাষ্ট্রপতির শাসন ব্যবস্থা চালু করা হয়।
- বহুদলীয় রাজনীতির অবসান ও বাকশাল গঠন: আওয়ামী লীগসহ দেশের সকল রাজনৈতিক দল এবং পেশাজীবী সংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এর পরিবর্তে গঠিত হয় একমাত্র জাতীয় রাজনৈতিক দল—‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল)। সরকারি কর্মকর্তা, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং সাংবাদিকদের জন্য এই রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়।
- একনায়কতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার হরণ: আদালত ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রপতির অধীনে নিয়ে যাওয়া হয়। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, স্বাধীন মতামত প্রকাশ এবং রাজনৈতিক সমাবেশের অধিকার পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া হয় [bn.wikipedia.org]।
- সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ (জুন ১৯৭৫): ৪টি সরকারি মালিকানাধীন পত্রিকা (দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার ও বাংলাদেশ টাইমস) বাদে দেশের অন্য সব স্বাধীন জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদপত্র এক ডিক্রির মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়া হয়। হাজার হাজার সাংবাদিক রাতারাতি বেকার হয়ে পড়েন।
রাষ্ট্র গঠন বনাম বাকশাল: ঐতিহাসিক সংঘাত
| সূচক | রাষ্ট্র গঠন আমল (১৯Nz–১৯৭৪) | বাকশাল আমল (১৯৭৫) |
|---|---|---|
| শাসন ব্যবস্থা | বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র | একদলীয় রাষ্ট্রপতি শাসিত একনায়কতন্ত্র |
| রাজনৈতিক দল | আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, জাসদ, কমিউনিস্ট পার্টি ইত্যাদি সক্রিয় ছিল। | একমাত্র ‘বাকশাল’ বৈধ, বাকি সব দল আইনত নিষিদ্ধ [bn.wikipedia.org]। |
| সংবাদপত্র ও গণমাধ্যম | স্বাধীন ও বেসরকারি সংবাদপত্রের অনুমতি ছিল। | মাত্র ৪টি রাষ্ট্রীয় পত্রিকা বাদে সব মিডিয়া বন্ধ। |
| নাগরিক অধিকার | সংবিধানে মৌলিক অধিকারের আইনি নিশ্চয়তা ছিল। | মৌলিক অধিকার ও আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার অধিকার স্থগিত। |
| মূল্যায়ন | একটি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন। | ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক রূপ। |
সমাপ্তি ও পতন:
ইতিহাসবিদদের মতে, ‘রাষ্ট্র গঠন’ থেকে ‘বাকশাল’-এ রূপান্তরের এই রাজনৈতিক বিবর্তনটি ছিল আওয়ামী লীগের প্রথম আমলের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। দলটির ভেতরে ও বাইরে এই একদলীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধে। শেষ পর্যন্ত, বাকশাল গঠনের মাত্র ৭ মাসের মাথায়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক নির্মম ও রক্তাক্ত সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয় এবং এই ব্যবস্থার অবসান ঘটে।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় শাসন আমলটি ছিল দেশের রাজনীতিতে এক বড় ধরনের বৈপরীত্যের সময়। একদিকে এই আমলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চুক্তি এবং দৃশ্যমান কিছু অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হয়, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে চরম রাজনৈতিক সহিংসতা ও আঞ্চলিক “গডফাদার” সংস্কৃতির উত্থান ঘটে, যা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নাজুক করে তোলে।
নিচে এই আমলের দুই বিপরীতমুখী ধারা—উন্নয়ন বনাম গডফাদার সংস্কৃতির একটি গভীর বিশ্লেষণাত্মক রূপরেখা তুলে ধরা হলো:
১. উন্নয়ন অধ্যায়: অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অর্জন
দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে আওয়ামী লীগ সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়:
- পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি (১৯৯৭): দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা পাহাড়ের সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর জনসংহতি সমিতির (PCJSS) সাথে ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়, যা এই আমলের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য।
- গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি (১৯৯৬): ভারতের সাথে ৩০ বছর মেয়াদী ঐতিহাসিক গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার ফলে শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়।
- খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন: কৃষি খাতে বিশেষ প্রণোদনা, সার ও ডিজেলের মূল্য হ্রাস এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থার ফলে এই মেয়াদের শেষ দিকে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে (বিশেষ করে চালে) স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে।
- বঙ্গবন্ধু সেতু উদ্বোধন (১৯৯৮): যমুনা নদীর ওপর নির্মিত দেশের তৎকালীন দীর্ঘতম ‘বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু’ ১৯৯৮ সালে উন্মুক্ত করা হয়, যা উত্তরবঙ্গের সাথে সমগ্র দেশের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।
৩ঃদ্বিতীয় আমল (১৯৯৬–২০০১): উন্নয়ন বনাম গডফাদার সংস্কৃতি

গডফাদার সংস্কৃতি: রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও আইনহীনতা
উন্নয়নের এই খতিয়ানের বিপরীতে, মাঠপর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতার একক আধিপত্য ও সন্ত্রাসী রাজত্ব দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। এই অধ্যায়টি ইতিহাসে “গডফাদার সংস্কৃতি” নামে পরিচিত:
- আঞ্চলিক সন্ত্রাস ও নিজস্ব বাহিনী: দেশের কয়েকটি জেলায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য ও নেতারা প্রশাসনের সমান্তরালে নিজস্ব ‘ক্যাডার বাহিনী’ গড়ে তোলেন। ফেনীতে জয়নাল হাজারী (হাজারী বাহিনী), লক্ষ্মীপুরে আবু তাহের এবং নারায়ণগঞ্জে শামীম ওসমানের নাম এই সংস্কৃতির সমার্থক হয়ে ওঠে।
- প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হরণ: এই গডফাদারদের ক্ষমতার দাপটে স্থানীয় পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও আদালত সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফেনীর তৎকালীন পুলিশ সুপারকে (SP) সরকারি বাসভবনে অবরুদ্ধ করা এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো রাষ্ট্রীয় আইন-শৃঙ্খলার দুর্বলতা প্রকাশ করে।
- ক্যাম্পাসে চরম নৈরাজ্য: দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্রলীগ’ হল দখল ও সিট বাণিজ্যের একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করে। এর চরম রূপ দেখা যায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জসিমউদ্দিন মানিকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ধর্ষণ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে তীব্র ছাত্র-শিক্ষক আন্দোলন গড়ে ওঠে।
- রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক হত্যাকাণ্ড: এই মেয়াদে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। ২০০০ সালে সাংবাদিক শামছুর রহমান খুন হন এবং দেশজুড়ে বোমা হামলার ঘটনা (যেমন উদীচীর সমাবেশ ও রমনার বটমূল) বৃদ্ধি পায়, যা জনমনে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে।
উন্নয়ন বনাম গডফাদার সংস্কৃতি: সংক্ষেপিত তুলনা
| সূচক | উন্নয়ন অধ্যায় (ইতিবাচক) | গডফাদার সংস্কৃতি (নেতিবাচক) |
|---|---|---|
| জাতীয় নিরাপত্তা | পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও অস্ত্র সমর্পণ। | দেশের সমতল জেলাগুলোতে রাজনৈতিক ক্যাডারদের সশস্ত্র মহড়া। |
| শাসন ব্যবস্থা | আন্তর্জাতিক মঞ্চে কূটনৈতিক ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সফল। | স্থানীয় পর্যায়ে আমলাতন্ত্র ও পুলিশের ওপর দলীয় নিয়ন্ত্রণ। |
| সামাজিক পরিবেশ | কৃষি ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অগ্রগতি। | বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও বিচার ব্যবস্থায় দলীয়করণ ও সহিংসতা। |
সমাপ্তি:
আওয়ামী লীগের এই দ্বিতীয় আমলটিকে বিশ্লেষকরা একটি “মিশ্র অধ্যায়” হিসেবে দেখেন। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভূ-রাজনৈতিক সাফল্য সত্ত্বেও, তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক ক্যাডারদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড এবং গডফাদার সংস্কৃতির কারণে সাধারণ মানুষের মাঝে সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। এই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিই মূলত ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছিল।
দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিক আমল (২০০৯–২০২৪): মেগা প্রজেক্ট বনাম মেগা দুর্নীতি ও গুম
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলকে সমসাময়িক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একটি বিশুদ্ধ “স্বৈরতান্ত্রিক উন্নয়ন মডেল” (Authoritarian Development Model) হিসেবে আখ্যায়িত করেন । এই দেড় দশকে সরকার দৃশ্যমান ও চোখধাঁধানো বেশ কিছু ‘মেগা প্রজেক্ট’ বা মেগা অবকাঠামো গড়ে তুললেও, তার আড়ালে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল ‘মেগা দুর্নীতি’, অর্থ পাচার এবং ভিন্নমত দমনে ‘গুম ও আয়নাঘর’-এর মতো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস
নিচে এই দীর্ঘ আমলের দুই বিপরীতমুখী ও চরম বৈপরীত্যপূর্ণ অধ্যায়টির একটি গভীর বিশ্লেষণমূলক রূপরেখা তুলে ধরা হলো:
১. মেগা প্রজেক্ট অধ্যায়: দৃশ্যমান কাঠামোগত রূপান্তর
এই ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার দেশের যোগাযোগ ও জ্বালানি খাতে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করে:
- পদ্মা বহুমুখী সেতু (২০২২): বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বাতিলের পর সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণ করা হয়। এটি দক্ষিণ-পশ্চিমবঙ্গের ২১টি জেলাকে সরাসরি ঢাকার সাথে যুক্ত করে দেশের জিডিপিতে বড় অবদান রাখে।
- ঢাকা মেট্রোরেল (MRT Line-6): রাজধানীর তীব্র যানজট নিরসনে জাইকা (JICA)-র অর্থায়নে দেশের প্রথম সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত ও আধুনিক এলিভেটেড মেট্রোরেল ব্যবস্থা চালু করা হয়।
- কর্ণফুলী টানেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে: চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম আন্ডারওয়াটার রোড টানেল (বঙ্গবন্ধু টানেল) এবং ঢাকার যানজট এড়াতে এয়ারপোর্ট থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত পিয়ার-ভিত্তিক এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হয়।
- পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর ও রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র: দেশের তৃতীয় গভীর সমুদ্র বন্দর চালু এবং রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় পাবনার রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (১২০০×২ মেগাওয়াট) নির্মাণের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
২. মেগা দুর্নীতি ও গুম অধ্যায়: ফ্যাসিবাদ ও লুটপাটের অন্ধকার দিক
দৃশ্যমান এই উন্নয়নের আড়ালে দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ও মানবাধিকারকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়:
ক. মেগা দুর্নীতি ও বিদ্যুৎ খাতের ‘ইনডেমনিটি’
- প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থ পাচার: প্রতিটি মেগা প্রজেক্টে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি প্রাক্কলিত ব্যয় দেখিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এই অর্থ পরবর্তীতে কানাডার ‘বেগম পাড়া’, দুবাই, মালয়েশিয়া ও লন্ডনে পাচার করা হয়।
- কুইক রেন্টাল ও ক্যাপাসিটি চার্জ: বিদ্যুৎ খাতের কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বিশেষ ‘দায়মুক্তি (Indemnity) আইন’ পাস করা হয়। এর ফলে কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই বছরের পর বছর বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ হিসেবে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি অর্থ দলীয় ব্যবসায়ীদের পকেটে ঢোকানো হয়।
- ব্যাংকিং খাতের ধ্বংসসাধন: আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক ও তাঁদের ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেটের (যেমন এস আলম গ্রুপ) মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে ভুয়া ও বেনামী ঋণের নামে প্রায় কয়েক লাখ কোটি টাকা লুটপাট করা হয়।
খ. রাষ্ট্রীয় গুম সংস্কৃতি ও ‘আয়নাঘর’
- ভিন্নমত নিশ্চিহ্নকরণ: সরকারের সমালোচনা, রাজনৈতিক বিরোধিতা বা ভিন্নমত প্রকাশের শাস্তি হিসেবে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (DGFI) এবং বিশেষ পুলিশ বাহিনীকে (RAB ও DB) ব্যবহার করে ‘গুম’ বা জোরপূর্বক নিখোঁজ করার এক ভয়ঙ্কর সংস্কৃতি চালু করা হয়।
- গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’: রাজনৈতিক নেতা, সামরিক কর্মকর্তা ও মানবাধিকার কর্মীদের তুলে নিয়ে বছরের পর বছর আলো-বাতাসহীন গোপন সামরিক বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এ আটকে রেখে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। ২০২৪ সালের আগস্টে স্বৈরাচারের পতনের পর এই বন্দিশালা থেকে বেশ কয়েকজন দীর্ঘ বছর পর জীবিত মুক্ত হন।
- বিচারবহির্ভূত হত্যা বা ক্রসফায়ার: গুমের পাশাপাশি ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজিয়ে হাজার হাজার বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়, যার ফলে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে র্যাবের ওপর বিশেষ নিষেধাজ্ঞা (Sanction) জারি করা হয়।
মেগা প্রজেক্ট বনাম মেগা দুর্নীতি ও গুম: সংক্ষেপিত তুলনা
| সূচক | মেগা প্রজেক্ট (দৃশ্যমান দিক) | মেগা দুর্নীতি ও গুম (অন্ধকার দিক) |
|---|---|---|
| অবকাঠামো ও অর্থনীতি | নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেল নির্মাণ। | প্রাক্কলিত ব্যয়ের কয়েক গুণ বেশি মূল্যে মেগা লুটপাট ও ব্যাংক দেউলিয়াত্ব। |
| নাগরিক জীবন | দ্রুত যোগাযোগ ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার সূচনা। | বাকস্বাধীনতা হরণ (DSA আইন), গুমের ভয় এবং ‘আয়নাঘর’ আতঙ্ক। |
| মানবাধিকার ও সুশাসন | আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের বৈশ্বিক প্রচারণা। | ১,৪০০-এর বেশি ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যা ও ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত রূপ [thediplomat.com]। |
ঐতিহাসিক পতন:
উন্নয়নের মোড়কে মেগা দুর্নীতি, গুমের আতঙ্ক এবং জনগণের ভোটাধিকার পুরোপুরি কেড়ে নেওয়ার এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সরকার নির্বিচারে ১,৪০০-এর বেশি মানুষকে গুলি করে হত্যা করলেও শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট ২০২৪-এ শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও ভারতে পলায়নের মধ্য দিয়ে এই চরম কর্তৃত্ববাদী মেয়াদের অবসান ঘটে
৪. স্থানীয় নির্বাচন ও তৃণমূল রাজনীতির গভীর বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৬ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থানীয় সরকার নির্বাচন (সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ) এবং তৃণমূল রাজনীতি দলটির ক্ষমতা সারণী ধরে রাখার সবচেয়ে বড় ভিত্তি ছিল। তবে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ২০২৫ সালে দলটির কার্যক্রমের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা এবং নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক বিধিমালা দলটির তৃণমূল কাঠামোকে সম্পূর্ণ অস্তিত্ব সংকটের মুখে ফেলেছে [bn.wikipedia.org]।
নিচে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও তৃণমূল রাজনীতির ভালো (ইতিবাচক) ও মন্দ (নেতিবাচক) দিকগুলোর একটি গভীর বিশ্লেষণমূলক রূপরেখা তুলে ধরা হলো:
ভালো দিকসমূহ: তৃণমূলের ক্ষমতায়ন ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক
দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকাকালীন এবং এর পূর্বেও বিরোধী দলে থাকার সময়, আওয়ামী লীগ গ্রামীণ পর্যায় পর্যন্ত একটি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল:
১. দেশের বৃহত্তম সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক
- ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত কমিটি: দেশের প্রতিটি ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সুনির্দিষ্ট কমিটি ও কর্মী বাহিনী ছিল। এই তৃণমূল নেটওয়ার্কের কারণে দলটি যেকোনো সময় দেশজুড়ে দ্রুত রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারত।
- পারিবারিক ও ঐতিহ্যগত আনুগত্য: গ্রামীণ বাংলাদেশে বহু পরিবার বংশানুক্রমিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত। এই “স্থায়ী ভোটব্যাংক” ও পারিবারিক ঐতিহ্য দলটিকে স্থানীয় নির্বাচনে সবসময় সুবিধাজনক অবস্থানে রাখত।
২. স্থানীয় সরকার কাঠামোর উন্নয়ন ও বাজেট বৃদ্ধি
- ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষমতায়ন: আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর (বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা) বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়।
- গ্রামীণ অবকাঠামোগত রূপান্তর: “আমার গ্রাম, আমার শহর” প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ রাস্তাঘাট পাকা করা, শতভাগ বিদ্যুতায়ন এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা তৃণমূল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া দলটির স্থানীয় রাজনীতির একটি বড় ইতিবাচক দিক ছিল।
মন্দ দিকসমূহ: একচ্ছত্র আধিপত্য, সহিংসতা ও ‘নৌকা’ বিতর্ক
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের দীর্ঘ শাসনামলে দলটির স্থানীয় রাজনীতি ও নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের শিকার হয়:
১. দলীয় প্রতীকে নির্বাচন ও তৃণমূলের কোন্দল
- ‘নৌকা’ মার্কা বনাম বিদ্রোহী প্রার্থী: ২০১৫ সালে আইন সংশোধন করে স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে (নৌকা, ধানের শীষ ইত্যাদি) করার নিয়ম চালু করা হয়। এর ফলে স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে যোগ্য প্রার্থীর চেয়ে কেন্দ্রের ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ প্রধান হয়ে ওঠে।
- অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষয়ী সংঘাত: বিএনপি-জামায়াতসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো স্থানীয় নির্বাচন বর্জন করায়, আওয়ামী লীগের বনাম আওয়ামী লীগের (বিদ্রোহী প্রার্থী) মাঝেই দেশজুড়ে নির্বাচন ঘিরে শত শত সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
২. ভোটের সংস্কৃতি ধ্বংস ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়
- ভোট ডাকাতি ও প্রশাসন নির্ভরতা: জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবহার করে ভোটকেন্দ্র দখল ও ব্যালট সিল মারার সংস্কৃতি চালু করা হয়।
- চেয়ারম্যানদের ‘বিনা ভোটে’ জয়: শত শত ইউনিয়ন ও উপজেলায় বিরোধী কোনো প্রার্থীকে দাঁড়াতেই দেওয়া হয়নি। ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য করে শত শত আওয়ামী লীগ নেতা বিনা ভোটেই চেয়ারম্যান ও মেয়র নির্বাচিত হন, যা তৃণমূলের জবাবদিহিতা শূন্যে নামিয়ে আনে।
৩. তৃণমূলের দুর্নীতি ও পেশী শক্তির দাপট
- টিআর, কাবিখা ও ভাতার টাকা আত্মসাৎ: গ্রামীণ গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত টিআর (টেস্ট রিলিফ), কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) এবং ওএমএস-এর চাল দলীয় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মাধ্যমে হরিলুট করা হয়। সামাজিক নিরাপত্তা খাতের (বয়স্ক বা বিধবা ভাতা) কার্ড দেওয়ার বিনিময়ে তৃণমূলের দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
বর্তমান ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপট: তৃণমূলের অস্তিত্ব সংকট
২০২৪ সালের আগস্টে কেন্দ্র থেকে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর এবং ২০২৫ সালের মে মাসে দলটির ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা ও নিবন্ধন স্থগিতের পর তৃণমূল রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন শূন্যতা তৈরি হয়েছে:
- নেতৃত্বহীন ও পলাতক তৃণমূল: স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রায় ৯৫% আওয়ামীপন্থী মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউপি চেয়ারম্যানরা আত্মগোপনে রয়েছেন বা বরখাস্ত হয়েছেন। ফলে দলটির চেইন অব কমান্ড বা নেতৃত্বের কোনো কাঠামো বর্তমানে মাঠপর্যায়ে অবশিষ্ট নেই।
- আইনি অঙ্গীকারনামার বাধ্যবাধকতা: নির্বাচন কমিশনের নতুন বিধিমালা (২০২৬) অনুযায়ী, স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে হলে প্রার্থীদের অঙ্গীকারনামা দিতে হবে যে তারা নিষিদ্ধ বা স্থগিত থাকা কোনো দলের (যেমন- আওয়ামী লীগ) সাথে যুক্ত নন। ফলে ছদ্মবেশে বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের স্থানীয় রাজনীতিতে ফেরার পথ সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে।
সমাপ্তি:
আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতি একসময় দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলেও, অতিরিক্ত ক্ষমতার লোভ, নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস এবং তৃণমূলের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে তা সাধারণ মানুষের কাছে চরম ঘৃণার বিষয়ে পরিণত হয়। ফলস্বরূপ, কেন্দ্র থেকে ক্ষমতাচ্যুতির সাথে সাথেই দলটির শক্তিশালী তৃণমূল নেটওয়ার্ক তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সিনিয়র এসইও কনসালটেন্ট ও কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট
তথ্যসূত্র ও সমসাময়িক বিষয়ের গভীর বিশ্লেষণের জন্য ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইট।




