ইসলামিক শিক্ষা

সলিমুল্লাহ খানের 'ঠাকুরের সহিত বিচার': রবীন্দ্রনাথের বানানে হ্রস্ব-ঈ ও দীর্ঘ-ঈ-এর বিতর্ক
সলিমুল্লাহ খান

নিউজ ডেস্ক

November 4, 2025

শেয়ার করুন

সলিমুল্লাহ খানের “ঠাকুরের সহিত বিচার” প্রবন্ধটি কেবল বানান নিয়ে নয়, বরং বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণের ঐতিহাসিক বিবর্তন এবং আধুনিকীকরণের প্রক্রিয়া নিয়ে একটি দার্শনিক বিতর্ক। প্রবন্ধটিতে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বানান সংস্কারের দুটি প্রধান দিকের সমালোচনা করেছেন: ‘কি’ বনাম ‘কী’-এর পার্থক্যকরণ এবং স্ত্রীলিঙ্গ শব্দের দীর্ঘ ঈ-কারের ব্যবহার নিয়ে।

১. ‘কি’ বনাম ‘কী’ বিতর্ক: মূল অসঙ্গতি ও সলিমুল্লাহর যুক্তি

সলিমুল্লাহ খানের প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের বানানে সবচেয়ে বেশি হাইলাইট করা অসঙ্গতিটি ছিল অব্যয় ‘কি’ (হ্রস্ব ই-কার) এবং সর্বনাম ‘কী’ (দীর্ঘ ঈ-কার)-এর পার্থক্যকরণ

রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাবিত নিয়মসলিমুল্লাহ খানের পর্যবেক্ষণ ও যুক্তিগুরুত্বপূর্ণ সংযোগ (Re-linked Concept)
উদ্দেশ্য: বাক্যের অর্থ দ্রুত ও সহজে বোঝার জন্য বানানে ভেদ আনা জরুরি। (“তুমি কি যাবে?” বনাম “তুমি কী খাবে?”)ঐতিহাসিক অসারতা: তিনি দেখান যে চর্যাপদ থেকে শুরু করে বঙ্কিমচন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন দত্ত পর্যন্ত কেউই অর্থভেদে ‘কি’ লেখেননি। তাঁরা কেবল হ্রস্ব ‘ই’ (কি) ব্যবহার করতেন এবং প্রসঙ্গের মাধ্যমে অর্থের পার্থক্য বোঝা যেত।প্রসঙ্গই ব্যাকরণ: তাঁর মতে, প্রসঙ্গই শব্দের অর্থ নির্ধারণের প্রধান নিয়ামক, বানান পরিবর্তন নয়। রবীন্দ্রনাথের এই প্রস্তাবটি প্রাচীন ব্যাকরণগত ঐতিহ্যকে অনুসরণ করেনি।
ব্যাকরণগত ভিত্তি: অব্যয় ‘কি’ এবং সর্বনাম ‘কী’ দুটি স্বতন্ত্র শব্দজাতিরামমোহনের দৃষ্টান্ত: তিনি রামমোহন রায়ের বাংলা ব্যাকরণের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘কি’ শব্দটি মূলত একটাই। কারকভেদে এর রূপের সামান্য পরিবর্তন হয় মাত্র (যেমন: কিসের, কিসেতে)।মূল শব্দ এক: ‘কি’ হলো মূল শব্দ, এবং এর ভিন্ন ভিন্ন রূপগুলি (যেমন ‘কী’ রূপে দীর্ঘ-ঈ-কার ব্যবহার) অযৌক্তিক

২. অন্যান্য অসঙ্গতি: স্ত্রীলিঙ্গ ও ‘ন’/’ণ’ প্রয়োগ

আপনার প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, সলিমুল্লাহ খান আরও দুটি ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের বানানে অসঙ্গতি তুলে ধরেছিলেন:

ক. স্ত্রীলিঙ্গ শব্দের দীর্ঘ ঈ-কার নিয়ে বিতর্ক

সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসারে, স্ত্রীলিঙ্গবাচক তৎসম শব্দে সাধারণত দীর্ঘ ঈ-কার (যেমন: জননী, ছাত্রী, ঘোটকী) ব্যবহৃত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও এই প্রথার পক্ষে থাকলেও, প্রাকৃতজ শব্দ বা কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে তিনি হ্রস্ব ই-কারের ব্যবহারের পক্ষপাতী ছিলেন।

  • সলিমুল্লাহর যুক্তি: প্রবন্ধে তিনি সেইসব শব্দের আলোচনা করেন, যেখানে ব্যাকরণের প্রাচীন সনন্দ বা নিয়ম থাকা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ হ্রস্ব ‘ই’-এর দিকে ঝুঁকেছেন। যেমন: ঘোটকীর দীর্ঘ-ঈ-তে দাবি আছে; সে ব্যাকরণের প্রাচীন সনন্দ দেখাইতে পারে—কিন্তু ঘুড়ির তাহা নাই। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ব্যাকরণ যখন দীর্ঘ-ঈ-এর দাবি সমর্থন করে, তখন কেন ব্যতিক্রম আনা হলো?

খ. ‘ন’ ও ‘ণ’ (দন্ত্য ও মূর্ধন্য) এর প্রয়োগ

তৎসম শব্দের বানানে মূর্ধন্য ‘ণ’-এর ব্যবহার একটি কঠোর নিয়ম মেনে চলে। সলিমুল্লাহ খান রবীন্দ্রনাথের কিছু বানানে এই ‘ন’ ও ‘ণ’-এর প্রয়োগেও অসঙ্গতি দেখিয়েছেন। এই অসঙ্গতি মূলত তৎসম শব্দে ণত্ব বিধানের নিয়মকে সম্পূর্ণরূপে অনুসরণ না করার ফল।

৩. সলিমুল্লাহর নির্দোষ প্রচেষ্টা: একজন বৈয়াকরণিকের দৃষ্টি

সলিমুল্লাহ খানের এই প্রবন্ধকে রবীন্দ্রনাথের “ভুল ধরা” হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল বাংলা বানানকে একটি যৌক্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা

  • বিচারের উদ্দেশ্য: সলিমুল্লাহ খান স্পষ্ট করেন যে রবীন্দ্রনাথ একজন কবি ও সাহিত্যিক ছিলেন, কোনো বৈয়াকরণিক নন। একজন ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে তিনি কেবল বাংলা বানানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে সেই অসঙ্গতিগুলি তুলে ধরেছেন, যা আধুনিকীকরণের নামে বাংলা ব্যাকরণের প্রাচীন ও সুপ্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্য থেকে দূরে সরে গেছে।
  • গঠনমূলকতা: এই প্রবন্ধের মূল ব্যাকরণগত মূল্য হলো এটি সংস্কৃত ব্যাকরণ, ঐতিহাসিক ভাষা ব্যবহার এবং আধুনিক বানান সংস্কারের মধ্যে একটি যোগসূত্র (রি-লিঙ্ক) স্থাপনের চেষ্টা করেছে, যা বাংলা বানানের ভিত্তি নিয়ে আজও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি

১. সলিমুল্লাহ খান, “ঠাকুরের সহিত বিচার – বাংলা বানানে হ্রস্ব ইকার”। শিল্পসাহিত্য বিষয়ক পত্রিকা ‘নতুনধারা’, ৮ম সংখ্যা, ১৫ জুন ২০১০।

২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলা বানানবিধি (তাঁর প্রস্তাবিত নিয়মাবলী)।

৩. অমরবই.কম (Amarboi.com) -এ প্রকাশিত সলিমুল্লাহ খানের প্রবন্ধের অংশ বিশেষ।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

হলুদ সাংবাদিকতা

নিউজ ডেস্ক

May 23, 2026

শেয়ার করুন

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬: বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তোলে হলুদ সাংবাদিকতা (Yellow Journalism)। সহজ কথায়, হলুদ সাংবাদিকতা বলতে মূলত বোঝায়—কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাই না করে, কোনো নির্ভরযোগ্য খোঁজ-খবর বা গবেষণা ছাড়াই স্রেফ কাটতি বাড়ানো, ভিউ বা ক্লিক পাওয়ার উদ্দেশ্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অতিরঞ্জিত, ভিত্তিহীন ও চটকদার সংবাদ পরিবেশন করা।

আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আমরা যে ‘ক্লিকবেইট’ (Clickbait) হেডলাইন বা ভুয়ো খবরের (Fake News) ছড়াছড়ি দেখি, তা মূলত এই হলুদ সাংবাদিকতারই আধুনিক ও ডিজিটাল সংস্করণ, যা জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে মুখ্য ভূমিকা রাখছে।

জোসেফ পুলিৎজার বনাম উইলিয়াম হার্স্ট: হলুদ সাংবাদিকতার জন্মকথা

অনেকেই হয়তো জানেন না, আধুনিক সাংবাদিকতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরস্কার যার নামে দেওয়া হয়, সেই জোসেফ পুলিৎজারের হাত ধরেই এই নেতিবাচক ধারার জন্ম হয়েছিল। ১৯ শতকের শেষের দিকে (১৮৯০-এর দশকে) আমেরিকার নিউইয়র্কের দুটি শীর্ষ পত্রিকার মধ্যে পাঠক টানার এক নোংরা ও তীব্র বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়:

  • জোসেফ পুলিৎজার-এর পত্রিকা: New York World
  • উইলিয়াম র্যান্ডলফ হার্স্ট-এর পত্রিকা: New York Journal

এই দুই প্রকাশকের লড়াইয়ে পত্রিকার কাটতি বাড়াতে তারা সত্য খবরের চেয়ে চাঞ্চল্যকর অপরাধ, কেলেঙ্কারি ও কাল্পনিক মুখরোচক গল্প বেশি ছাপতে শুরু করেন। তৎকালীন সময়ে তাদের পত্রিকায় জনপ্রিয় একটি কমিক স্ট্রিপ ছিল, যার মূল চরিত্রের নাম ছিল ‘দ্য ইয়েলো কিড’ (The Yellow Kid)। এই ইয়েলো কিড কমিকটি দুই পত্রিকাই নিজেদের কাটতি বাড়াতে ব্যবহার করত। সেই ‘ইয়েলো কিড’ থেকেই মূলত এই সস্তা ও নীতিহীন সংবাদ পরিবেশনার নাম হয়ে যায় “Yellow Journalism” বা হলুদ সাংবাদিকতা।

কেন হলুদ সাংবাদিকতা কোনো দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না?

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সুস্থ সমাজের চতুর্থ স্তম্ভ হলো গণমাধ্যম। কিন্তু হলুদ সাংবাদিকতা সেই স্তম্ভকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। এর প্রধান ৩টি ক্ষতিকর দিক নিচে দেওয়া হলো:

  • সামাজিক বিশৃঙ্খলা: কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খবর প্রকাশের ফলে সমাজে দাঙ্গা, বিভ্রান্তি ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে।
  • জনগণের আস্থা হারানো: যখন মূলধারার গণমাধ্যমগুলো চটকদার ও ভিত্তিহীন সংবাদ দেয়, তখন সাধারণ মানুষ সামগ্রিকভাবে সৎ ও নিষ্ঠাবান সাংবাদিকদের ওপর থেকেও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে।
  • গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হওয়া: জনমতকে ভুল পথে চালিত করে অপরাধীকে নির্দোষ এবং নির্দোষকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়ার এক ভয়ঙ্কর ক্ষমতা রয়েছে এই হলুদ সাংবাদিকতার।

এক নজরে হলুদ সাংবাদিকতা বনাম বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা

হলুদ সাংবাদিকতা এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা সংবাদ পরিবেশনের দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ধারা। নিচে এদের মূল পার্থক্যগুলো এক নজরে দেওয়া হলো:

১. মূল লক্ষ্য

  • হলুদ সাংবাদিকতা: চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে পত্রিকার বিক্রি বাড়ানো, ভিউ বা ক্লিক (Clickbait) অর্জন করা এবং মুনাফা লাভ।
  • বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা: সমাজ ও সাধারণ মানুষকে সঠিক, সত্য এবং নিরপেক্ষ তথ্য জানিয়ে সচেতন করা।

২. তথ্যের সত্যতা

  • হলুদ সাংবাদিকতা: গুজব, অতিরঞ্জিত ঘটনা, ভিত্তিহীন গুঞ্জন এবং স্ক্যান্ডালকে প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
  • বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা: যাচাইকৃত তথ্য, নির্ভরযোগ্য সূত্র, প্রমাণ এবং সরেজমিন গবেষণার ওপর ভিত্তি করে সংবাদ তৈরি হয়।

৩. শিরোনাম ও ভাষা

  • হলুদ সাংবাদিকতা: পাঠককে প্রলুব্ধ করতে চটকদার, উসকানিমূলক, বিভ্রান্তিকর এবং অতিরঞ্জিত শিরোনাম ব্যবহার করা হয়।
  • বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা: সহজ, সরল, মার্জিত এবং ঘটনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাস্তবসম্মত শিরোনাম ব্যবহার করা হয়।

৪. নিরপেক্ষতা ও নৈতিকতা

  • হলুদ সাংবাদিকতা: ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে কোনো এক পক্ষের হয়ে পক্ষপাতমূলক আচরণ করা হয় এবং নৈতিকতা উপেক্ষিত হয়।
  • বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা: ব্যক্তিগত আবেগ বা স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সব পক্ষের বক্তব্য সমানভাবে তুলে ধরা হয় এবং সাংবাদিকতার নীতিমালা মেনে চলা হয়।

৫. সামাজিক প্রভাব

  • হলুদ সাংবাদিকতা: সমাজে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, বিশৃঙ্খলা এবং কোনো ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদাহানি ঘটাতে পারে।
  • বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা: জনমত গঠন, দুর্নীতি প্রকাশ এবং সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।

সারসংক্ষেপ: সাংবাদিকদের সততা ও নৈতিকতার প্রয়োজনীয়তা

আমাদের নিজস্ব বিশ্লেষণ বলে, নীতিহীন সাংবাদিকতা সমাজের জন্য এক নীরব বিষের মতো। বর্তমান কর্পোরেট ও ডিজিটাল যুগে ভিউ এবং লাইক পাওয়ার এই অন্ধ ইঁদুরদৌড় বন্ধ হওয়া জরুরি। সাংবাদিকদের পেশাগত বুদ্ধিমত্তা, নৈতিকতা এবং সর্বোচ্চ সততার সহিত কাজ করা উচিত। কারণ একটি সত্য খবর যেমন সমাজকে বদলে দিতে পারে, ঠিক তেমনি একটি হলুদ বা মিথ্যা খবর পুরো দেশকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

প্রতিবেদক: Senior SEO Consultant BDS Bulbul Ahmed

হলুদ সাংবাদিকতা কী, সাংবাদিকতার ইতিহাস, জোসেফ পুলিৎজার ও উইলিয়াম হার্স্টের লড়াই এবং গণমাধ্যমের নৈতিকতা সংক্রান্ত গভীর, গবেষণাধর্মী ও এসইও ফ্রেন্ডলি কন্টেন্ট পড়তে নিয়মিত চোখ রাখুন পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

শিক্ষার্থীর সংখ্যায় বিশ্বের বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজ ডেস্ক

May 19, 2026

শেয়ার করুন

মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬: বিশ্বজুড়ে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ এবং দূরশিক্ষণ বা ওপেন এডুকেশন (Open Education) ব্যবস্থার জনপ্রিয়তার কারণে বর্তমান যুগে কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা লাখের ঘর ছাড়িয়ে কোটিতে গিয়ে ঠেকেছে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিসংখ্যান এবং প্রাতিষ্ঠানিক ডেটা অনুযায়ী, বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে ভারতের ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (IGNOU)-এ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪০ লক্ষাধিক, যা একে বিশ্বমঞ্চে এককভাবে শিক্ষার্থী ভর্তির দিক থেকে সর্ববৃহৎ অ্যাকাডেমিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দিয়েছে। এই ধরনের বিশাল ছাত্র-ছাত্রী বিশিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক পরিভাষায় ‘মেগা-ইউনিভার্সিটি’ (Mega-University) বলা হয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: দূরশিক্ষণ ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বব্যাপী উত্থান

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এবং বিশেষ করে আশির দশক থেকে উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষার চাহিদা মেটাতে বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। প্রথাগত বা নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর (Regular Campus) বাইরে গিয়ে কর্মজীবী, প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা এবং আর্থিক সংকটে থাকা ছাত্র-ছাত্রীদের দোরগোড়ায় শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই উন্মুক্ত ও দূরশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়।

১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের আল্লামা ইকবাল উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৮৫ সালে ভারতের ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় এক বিশাল শিক্ষাবিপ্লব ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালে বাংলাদেশেও ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ এবং ‘বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার একমাত্র নির্ভরযোগ্য ঠিকানায় পরিণত হয়েছে।

তথ্যসমৃদ্ধ গভীর বিশ্লেষণ: শিক্ষার্থীর সংখ্যায় বিশ্বের বৃহত্তম ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা

আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা মনিটরিং সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সর্বশেষ পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ ১৫টি বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

শিক্ষার্থীর সংখ্যা হিসেবে বিশ্বের বৃহত্তম ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ভারতের ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভার্সিটি (IGNOU), যেখানে প্রায় ৭০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এই তালিকায় ২য় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৩য় স্থানে রয়েছে তুরস্কের আনাদোলু ইউনিভার্সিটি।

শিক্ষার্থী সংখ্যা এবং প্রতিষ্ঠানের ধরনসহ বিশ্বের বৃহত্তম ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

ক্রমিক নং
বিশ্ববিদ্যালয়ের নামঅবস্থান (দেশ)আনুমানিক শিক্ষার্থী সংখ্যাশিক্ষা পদ্ধতি
ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভার্সিটি (IGNOU)ভারত৭০ লক্ষাধিকদূরশিক্ষণ
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশবাংলাদেশ২১ লক্ষাধিকঅধিভুক্ত কলেজ ও দূরশিক্ষণ
ক্যালিফোর্নিয়া কমিউনিটি কলেজেস সিস্টেমমার্কিন যুক্তরাষ্ট্র১৮ থেকে ২১ লক্ষাধিকপাবলিক সিস্টেম
আনাদোলু ইউনিভার্সিটিতুরস্ক১৯ থেকে ২০ লক্ষাধিকদূরশিক্ষণ
আল্লামা ইকবাল ওপেন ইউনিভার্সিটিপাকিস্তান১০ থেকে ১৬ লক্ষাধিকদূরশিক্ষণ
ইসলামিক আজাদ ইউনিভার্সিটিইরান১০ থেকে ১১ লক্ষাধিকহাইব্রিড
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সিস্টেমমার্কিন যুক্তরাষ্ট্র৭ লক্ষ ৮০ হাজারপাবলিক সিস্টেম
ইউনিভার্সিটি অব তেহরান / পেয়াম-ই-নুরইরান৭ লক্ষাধিকদূরশিক্ষণ
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক (SUNY) সিস্টেমমার্কিন যুক্তরাষ্ট্র৭ লক্ষ ৫৬ হাজারপাবলিক সিস্টেম
১০ট্রিবুভ্যান ইউনিভার্সিটিনেপাল৫ লক্ষ ৬০ হাজারট্রেডিশনাল ও পাবলিক
১১টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটি সিস্টেমমার্কিন যুক্তরাষ্ট্র৭ লক্ষ ৩০ হাজারপাবলিক সিস্টেম
১২ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকা (UNISA)দক্ষিণ আফ্রিকা৪ লক্ষাধিকদূরশিক্ষণ
১৩ওপেন ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্যযুক্তরাজ্য২ লক্ষাধিকদূরশিক্ষণ
১৪কায়রো ইউনিভার্সিটিমিশর২ লক্ষ ২০ হাজারট্রেডিশনাল
১৫কারুয়েন বিশ্ববিদ্যালয় (University of al-Qarawiyyin)মরোক্কো২ লক্ষাধিকট্রেডিশনাল

এই বিশাল তালিকাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্বের বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিংহভাগই মুক্ত ও দূরশিক্ষণ (Open and Distance Learning) পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। তবে বিস্তারিত জানতে আপনি উইকিপিডিয়া এবং ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ সাইটগুলোতে বিস্তারিত তালিকা ও তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া দেখতে পারেন।

সাধারণত, এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দিতে মাল্টিমিডিয়া, অনলাইন পোর্টাল এবং বিস্তৃত স্টাডি সেন্টারের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। অন্যদিক, সাধারণ ক্যাম্পাসভিত্তিক বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি (ASU), যেখানে ক্যাম্পাসে প্রায় ৯৫ হাজারের বেশি নিয়মিত শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে।

শীর্ষ মেগা-ইউনিভার্সিটিগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত বৈচিত্র্য

মেগা-ইউনিভার্সিটিগুলোর মূল বৈচিত্র্য তাদের দূরশিক্ষণ পদ্ধতি, বিশাল শিক্ষার্থী সংখ্যা এবং সাশ্রয়ী উচ্চশিক্ষা কাঠামোতে প্রকাশ পায়। দূরশিক্ষণ (Distance Learning) পদ্ধতিতে এক লক্ষের বেশি শিক্ষার্থী থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মেগা-ইউনিভার্সিটি বলা হয়। এগুলো প্রথাগত উচ্চশিক্ষার দেয়াল ভেঙে বিশ্বজুড়ে শিক্ষা বিস্তারে কাজ করছে।

নিচে মেগা-ইউনিভার্সিটিগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত বৈচিত্র্যের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

শীর্ষ মেগা-ইউনিভার্সিটিগুলোর তুলনামূলক চিত্র

বিশ্ববিদ্যালয়ের নামঅবস্থানশিক্ষার্থী সংখ্যা (আনুমানিক)মূল কাঠামোগত বৈচিত্র্য
ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভার্সিটি (IGNOU)ভারত৪০ লক্ষ+বিশ্বের সর্ববৃহৎ দূরশিক্ষণ নেটওয়ার্ক এবং উন্মুক্ত পাঠ্যক্রম।
আলাউদ্দীন ইসলামিক ইউনিভার্সিটিইন্দোনেশিয়া১০ লক্ষ+বৃহৎ ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বিত ক্যাম্পাস নেটওয়ার্ক।
আনাদোলু ইউনিভার্সিটিতুরস্ক২০ লক্ষ+ইউরোপ-মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বিস্তৃত পরীক্ষা কেন্দ্র ও ডিজিটাল লার্নিং।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়বাংলাদেশ২০ লক্ষ+হাজারেরও বেশি অধিভুক্ত কলেজের মাধ্যমে পরিচালিত শিক্ষা কাঠামো।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি)বাংলাদেশ৪ লক্ষ+মিডিয়া, টিভি ও আঞ্চলিক উপ-কেন্দ্রের মাধ্যমে গণশিক্ষা।
দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটিযুক্তরাজ্য১.৭ লক্ষ+বিশ্বের প্রথম সফল ও আধুনিক দূরশিক্ষণ মডেলের পথপ্রদর্শক।

প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত বৈচিত্র্যের মূল দিকসমূহ

  • অধিভুক্তি বনাম দূরশিক্ষণ কাঠামো: কিছু বিশ্ববিদ্যালয় (যেমন: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়) সরাসরি ক্লাস নেয় না, বরং শত শত সরকারি-বেসরকারি কলেজ নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে IGNOU বা বাউবি মূলত দূরশিক্ষণ ও নিজস্ব স্টাডি সেন্টারের মাধ্যমে শিক্ষা দেয়।
  • প্রযুক্তিগত রূপান্তর: আধুনিক মেগা-ইউনিভার্সিটিগুলো কাগজের বইয়ের বদলে এখন লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (LMS), মোবাইল অ্যাপ ও অনলাইন লাইভ ক্লাসের ওপর বেশি নির্ভরশীল।
  • ভৌগোলিক সীমানা: যুক্তরাজ্যের The Open University বা তুরস্কের Anadolu University কোনো নির্দিষ্ট শহরে সীমাবদ্ধ নয়। এদের আঞ্চলিক শাখা এবং পরীক্ষা কেন্দ্র পুরো দেশ এমনকি মহাদেশ জুড়ে বিস্তৃত থাকে।
  • নমনীয় শিক্ষাক্রম: এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য হলো ‘ওপেন এন্ট্রি’ বা উন্মুক্ত ভর্তি নীতি। এখানে যেকোনো বয়সের মানুষ নিজের সুবিধাজনক সময়ে (Flexible timing) পরীক্ষা দিয়ে ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেন।
  • কম পরিচালন ব্যয়: বিশাল শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও এদের মূল প্রশাসনিক অবকাঠামো অত্যন্ত ছোট হয়। ফলে তারা অত্যন্ত কম খরচে প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা দিতে পারে।

মেগা-ইউনিভার্সিটিগুলোর এই বৈচিত্র্যময় কাঠামো সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে কমনওয়েলথ অফ লার্নিং (Commonwealth of Learning) এর ওপেন অ্যান্ড ডিসট্যান্স লার্নিং (ODL) সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো দেখতে পারেন।

ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও মেগা-ইউনিভার্সিটির চ্যালেঞ্জসমূহ

মেগা-ইউনিভার্সিটিগুলোর ভবিষ্যৎ রূপরেখা মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও হাইব্রিড শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল হলেও এদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার গুণগত মান ধরে রাখা ও উচ্চ ড্রপ-আউট হার নিয়ন্ত্রণ করা। বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে শিক্ষা দেওয়ার কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তি ও কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

নিচে মেগা-ইউনিভার্সিটিগুলোর ভবিষ্যৎ রূপরেখা এবং প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

ভবিষ্যৎ রূপরেখা (Future Roadmap)

  • এআই চালিত ব্যক্তিগত শিক্ষা (AI-Powered Personalized Learning): লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষকের পক্ষে আলাদা মনোযোগ দেওয়া অসম্ভব। তাই ভবিষ্যৎ রূপরেখায় এআই টিউটর এবং চ্যাটবট ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা প্রতিটি শিক্ষার্থীর শেখার গতি অনুযায়ী আলাদা গাইডলাইন দেবে।
  • হাইব্রিড ও ব্লেন্ডেড মডেল: সম্পূর্ণ অনলাইন বা দূরশিক্ষণের পরিবর্তে এখন অনলাইন ও সরাসরি ক্লাসের সমন্বয়ে ‘ব্লেন্ডেড লার্নিং’ মডেলের দিকে ঝুঁকছে মেগা-ইউনিভার্সিটিগুলো।
  • ক্ষুদ্র ও পেশাদার ডিগ্রি (Micro-credentials): ৩ বা ৪ বছরের প্রথাগত ডিগ্রির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রের জন্য উপযোগী ছোট ছোট মেয়াদি সার্টিফিকেট কোর্স এবং পেশাদার দক্ষতা উন্নয়নের কোর্সে জোর দেওয়া হচ্ছে।
  • ভার্চুয়াল ল্যাব ও মেটাভার্স: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শিক্ষার্থীদের জন্য অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR) ব্যবহার করে ঘরে বসেই ল্যাবরেটরির বাস্তব অভিজ্ঞতা দেওয়ার কাজ চলছে।
  • গ্লোবাল লার্নিং হাব: ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের মধ্যে যৌথ ক্রেডিট ট্রান্সফার ও ডিগ্রি প্রোগ্রাম চালু করছে। [1]

প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ (Key Challenges)

  • শিক্ষার গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ (Quality Assurance): লাখ লাখ শিক্ষার্থীর খাতা মূল্যায়ন, পরীক্ষা নেওয়া এবং সমমানের শিক্ষা নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত (Teacher-Student Ratio) অত্যন্ত কম হওয়ায় শিক্ষার মান প্রায়ই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
  • উচ্চ ড্রপ-আউট হার (High Drop-out Rates): প্রথাগত বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কঠোর তদারকি না থাকায় এবং স্ব-উদ্যোগে পড়াশোনা করতে হওয়ায় মেগা-ইউনিভার্সিটিগুলোতে কোর্স সম্পন্ন না করেই পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার হার অনেক বেশি।
  • ডিজিটাল বিভাজন (Digital Divide): উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট খরচ, দুর্বল নেটওয়ার্ক এবং ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনের অভাব অনলাইন শিক্ষার মূল লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করছে।
  • অ্যাক্রেডিটেশন ও কর্মসংস্থানে গ্রহণযোগ্যতা: অনেক দেশেই এখনও দূরশিক্ষণ বা ওপেন ইউনিভার্সিটির ডিগ্রিকে প্রথাগত নিয়মিত ডিগ্রির সমান মর্যাদা দেওয়া হয় না, যা শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানে বৈষম্য তৈরি করে।
  • সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা গোপনীয়তা: বিশাল ডাটাবেজে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য, পরীক্ষার রেকর্ড এবং আর্থিক লেনদেনের নিরাপত্তা বজায় রাখা আইটি কাঠামোর জন্য একটি বড় পরীক্ষা।

দূরশিক্ষণ ও মেগা-ইউনিভার্সিটির এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ এবং নীতি নির্ধারণী বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ইউনেস্কোর ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হাইয়ার এডুকেশন (UNESCO-IESALC) এর গবেষণা প্রতিবেদনগুলো দেখতে পারেন।

প্রতিবেদক: Senior SEO Consultant BDS Bulbul Ahmed

বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং, সাধারণ জ্ঞান এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের গভীর ও প্রফেশনাল ইনফরমেশনাল কন্টেন্ট পড়তে নিয়মিত ভিজিট করুন পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

স্বপ্ন বিক্রির আড়ালে কোচিং বাণিজ্য

নিউজ ডেস্ক

May 6, 2026

শেয়ার করুন

বিশেষ বিশ্লেষণী প্রতিবেদন | ৩০ এপ্রিল ২০২৬

ঢাকা: বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষা এখন সেবার বদলে মুনাফা অর্জনের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরে ক্লিনিক ও হাসপাতালের পাশাপাশি কোচিং সেন্টারগুলো এখন ব্যবসার অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। ভর্তি পরীক্ষার মৌসুমকে কেন্দ্র করে এই কোচিং সেন্টারগুলোর অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতারণার চিত্র দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

১. মেধাবী শিক্ষার্থী ‘ক্রয়’ ও বিজ্ঞাপনী মিথ্যাচার

কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো তারা নিজেদের সাফল্য প্রমাণ করতে শীর্ষ মেধাবীদের ‘ক্রয়’ করে থাকে।

  • মিথ্যা সুনাম: ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হওয়া শিক্ষার্থীদের মোটা অংকের টাকা দিয়ে নিজেদের কোচিংয়ের ছাত্র হিসেবে পরিচয় দিতে বাধ্য করা হয়।
  • একাধিক দাবি: অনেক সময় দেখা যায়, একজন শিক্ষার্থীকে একাধিক কোচিং সেন্টার তাদের ব্যানারে ব্যবহার করছে, যা সাধারণ অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সাথে চরম প্রতারণা।

২. কৃতিত্বের ভাগীদার, কিন্তু ব্যর্থতার দায়হীনতা

কোচিংগুলোর মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা। তাদের দাবি:

  • কোনো শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করলে কোচিং সেন্টারগুলো তার সব কৃতিত্ব নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
  • কিন্তু যখন হাজার হাজার শিক্ষার্থী চান্স পায় না, তখন তার কোনো দায়ভার বা ব্যর্থতার কারণ ব্যাখ্যা করতে তারা আগ্রহী থাকে না।

৩. ‘টাকা হাতানো’র বহুমুখী ফাঁদ

ভর্তি হওয়ার সময় বড় অংকের ফি নেওয়ার পরও কোচিংগুলোর অর্থলিপ্সা থামে না।

  • বই ও মডেল টেস্ট বাণিজ্য: নিয়মিত ভর্তির বাইরেও নতুন নতুন বই, তথাকথিত ‘মডেল কোশ্চেন’ এবং স্পেশাল টেস্টের নামে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
  • মিথ্যা অনুপ্রেরণা: কোচিংয়ের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের এমন এক মায়াজাল দেখান যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলেই চাকরি নিশ্চিত—যা বাস্তবতার চেয়ে অনেক ভিন্ন।

৪. সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট খবর

এই অস্থির সময়ের মধ্যেই দেশের রাজনীতি ও অন্যান্য খাতেও বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে:

  • রাজনৈতিক বিবর্তন: এনসিপিতে (জাতীয় নাগরিক পার্টি) সম্প্রতি ড. মোহাম্মদ নাদিমুর রহমান সহ বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি যোগ দিয়েছেন।
  • হজ আপডেট: এ বছর বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৮,৫০০ জন হজযাত্রী সৌদি আরবে হজ পালনের অনুমতি পেয়েছেন।
  • সাংস্কৃতিক ও ক্যারিয়ার: অভিনেত্রী ও মডেল নীলা ইসরাফিল ডিএসসিসি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থিতার ঘোষণা দিয়েছেন, যিনি এর আগে প্রায় ৫০টি বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন।

৫. বিশ্লেষণ: মুক্তি কোথায়?

বিশ্লেষকদের মতে, কোচিং বাণিজ্যের এই জঘন্য মানসিকতা বন্ধ করতে হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ব্যবধান কমাতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাণিজ্যিকীকরণের হাত থেকে রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।


তথ্যসূত্র ও এনালাইসিস: ১. বাংলাদেশ হজ অফিস ও পরিচালক মো. লোকমান হোসেনের প্রেস ব্রিফিং – মে ২০২৬ ২. জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) রাজনৈতিক যোগদানের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ৩. নীলা ইসরাফিলের নির্বাচনী ঘোষণা ও ক্যারিয়ার প্রোফাইল ৪. বিডিএস নিউজ সোশ্যাল ও এডুকেশন ডেস্ক অ্যানালাইসিস

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com WhatsApp: +8801829349380

১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ