ইতিহাস
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ঐতিহাসিক প্রতিবেদক | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
সময়টা তখন ১৯৪৭ এর দিকে। মৃত সাগরের উত্তর-পশ্চিম তীর ঘেঁষে অবস্থিত কুমরান গুহা। এই গুহাতেই পাথর নিক্ষেপ করার খেলায় মত্ত দুই বেদুইন বালক। মেষ চড়ানোর বায়না ধরে প্রায়ই এদিকটায় চলে আসে দুই ভাই মিলে। হঠাৎ বড় একটা পাথর ছোঁড়ার পর অদ্ভুত রকমের শব্দ হলো। প্রথমদিকে তারা মনের ভুল ভেবে উড়িয়ে দিলেও, প্রতিটি পাথর নিক্ষেপের পর একই রকম শব্দ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল মাটির তৈরি কিছু একটা ভেঙে গেছে। দুই বালক খেলা থেমে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়লো।
বাতাসে ভেসে আসা মৃত সাগরের লোনা গন্ধ আর পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়া বিকেলের সূর্য চারিদিক করে তুলেছিল রহস্যময়। তখনো সন্ধ্যা হতে অনেক দেরি। তাই এই অদ্ভুত শব্দের উৎস জানার জন্য দুজনে মিলে ঢুকে পড়লো গুহার ভেতর।
সেদিন সেই দুই বালকের সাহসী পদক্ষেপ উন্মোচন করে দিল এক গুপ্ত ইতিহাস। তারা গুহার ভেতর প্রবেশ করে উদ্ধার করলো বড় বড় মাটির পাত্র। পাত্র গুলো উল্টে দিতেই মাটিতে ছড়িয়ে পড়লো অগণিত চামড়ার তৈরি স্ক্রোল। এরকম প্রায় ৭টি বড় পাত্র ভর্তি স্ক্রোল উদ্ধার করলো দুজন মিলে। তখন বাইরের আকাশে সূর্য প্রায় অস্ত যাই-যাই করছে। দুই বালক ছুটে চলে গেল বেদুইন পল্লীর দিকে। চিৎকার করতে লাগলো হাত-পা ছুঁড়ে, “গুপ্তধন! গুপ্তধন!”
বেদুইন সর্দার সব শুনে রাতটা অপেক্ষা করলেন। পরদিন ভোর হতেই দলে দলে কুমরান গুহাতে হানা দিলেন। উদ্ধার করে নিয়ে আসলেন শত শত স্ক্রোল। আশেপাশের সব গুহাতে তল্লাশী চালানো যখন শেষ, তখন বেদুইনদের ঝুলিতে স্ক্রোলের সংখ্যা ৯০০ ছুঁই ছুঁই করছে। জেরুজালেমে তীর্থের উদ্দেশ্যে অনেক মানুষ জড়ো হতেন। এই খবর চারিদিকে ছড়িয়ে গেলে সবাই বেদুইন পল্লীতে ছুটে আসলেন। এভাবেই মানবসভ্যতার চোখের আড়াল হয়ে থাকা রহস্যময় ডেড সী স্ক্রোল নতুন করে ফিরে আসলো আমাদের মাঝে; সাথে নিয়ে এলো এক অজানা ইতিহাস!
সেই দুই বেদুইন, যারা বাল্যকালে খেলার সময় স্ক্রোলগুলো উদ্ধার করেন।
ডেড সী স্ক্রোল কী?
‘ডেড সী স্ক্রোল’ নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে উঠে বিখ্যাত মৃত সাগরের ছবি। নামকরণ থেকে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, স্ক্রোলগুলো সম্ভবত মৃত সাগর থেকে উদ্ধারকৃত অথবা এর সাথে কোন যোগসূত্রতা রয়েছে। কিন্তু এই স্ক্রোলগুলোর নাম প্রথমদিকে ডেড সী স্ক্রোল ছিল না। প্রথমে একে ‘কুমরান গুহার স্ক্রোল’ নামে ডাকা হলেও এর অনুসন্ধানস্থল সকল গুহা মৃত সাগরের তীর ঘেষে অবস্থিত হওয়ায় এর নাম হয়ে যায় ‘ডেড সী স্ক্রোল’।
কুমরান গুহা থেকে অদূরেই অবস্থিত মৃত সাগর দিগন্তের সাথে মিশে আছে।
প্যাপিরাস পাতার তৈরি শক্ত কাগজ এবং বুনো শূকরের চামড়ার উপর গাঢ় কালি দিয়ে লেখা স্ক্রোলগুলো গুহার আঁধার থেকে স্থান পেল প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণাগারে। ততদিনে এতটুকু জানা হয়ে গেছে যে, স্ক্রোলগুলো অতিপ্রাচীন হিব্রু-বাইবেলের পান্ডুলিপি যা হিব্রু, আরমানি আর গ্রিক ভাষায় লেখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত বাইবেলের মধ্যে এই স্ক্রোলগুলো প্রাচীনতম।
এখানে জানিয়ে রাখা ভালো, ‘হিব্রু-বাইবেল’ দ্বারা ইহুদি গ্রন্থ তানাখ এর শিপারা এবং খ্রিস্টান ওল্ড টেস্টামেন্টের আনুশাসনিক বাণী সম্বলিত পান্ডুলিপিকে বুঝায়।
তখন এর পাঠোদ্ধারের পাশাপাশি চলছিল নানান জল্পনা-কল্পনা। কে বা কারা এই স্ক্রোলগুলো এই গুহাতে লুকিয়ে রেখেছে? কেন রেখেছে? স্ক্রোলগুলো কি শুধু হিব্রু-বাইবেলেরই অংশ? নাকি রোমাঞ্চকর কিছু লুকিয়ে আছে এর মাঝে?
প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান
প্রথমদিকে বেদুইনরাই ছিলেন একমাত্র অনুসন্ধানকারী। ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তারাই সকল স্ক্রোল উদ্ধার করেন। বেদুইনদের কাছে স্ক্রোলগুলো ছিল আয়-উপার্জনের মাধ্যম। তারা শিক্ষিত না হলেও এতটুকু নিশ্চিত ছিলেন যে, এই ধুলিমাখা ছেঁড়া পান্ডুলিপি তাদের কাছে মূল্যহীন হলেও গণ্যমান্য সাহেবরা চড়াদামে কিনে নিবেন। তাদের এই ব্যবসাতে প্রথম হস্তক্ষেপ করে জর্ডানের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ।
তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান ল্যাঙ্কেস্টার হার্দিং সকল স্ক্রোল জর্ডান সরকারের অধীনে আনার লক্ষ্যে অভিযান পরিচালনা করেন। সরকারি অর্থায়নে অনুসন্ধান পুরোদমে চলছিল। কিন্তু বেদুইনরাও থেমে যাননি। তারাও তাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রাখেন।
১৯৫১ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত জর্ডান সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক অনুসন্ধান করেন ফরাসী ধর্মযাজক ফাদার রলা দ্য ভুঁ। তিনি সর্বমোট ১১টি গুহা চিহ্নিত করেন এবং এর উৎপত্তিস্থল, মালিকানা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণায় ভূমিকা পালন করেন। ১১টি গুহার মধ্যে ৫টি গুহার বেশিরভাগ স্ক্রোলই তখন বেদুইনদের দখলে ছিল। তারা সেগুলো বিভিন্ন দেশের হিব্রু যাজক এবং ইসরাইলিদের কাছে বিক্রয় করে দেন।
মার স্যামুয়েল এর সেই বিজ্ঞপ্তি।
এর মধ্যে সিরিয়ান বিশপ মার স্যামুয়েল তার ক্রয়কৃত চারটি স্ক্রোল ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বিক্রয়ের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। এই বিজ্ঞপ্তি ইসরাইলি সামরিক বাহিনী প্রধান ইয়েগাল ইদিনের নজরে আসে। তার পিতা এল সুকেনিক ছিলেন হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য অধ্যাপক। তিনি ২৫০,০০০ ডলারের বিনিময়ে সেগুলো কিনে নেন। এর পরেই ইসরাইল এবং জর্ডান পৃথক পৃথকভাবে এই স্ক্রোল নিয়ে গবেষণায় নেমে পড়ে।
স্ক্রোল গবেষণায় মগ্ন অধ্যাপক সুকেনিক।
প্রাথমিক প্রশ্নোত্তরের খোঁজে
গবেষকদের প্রথম লক্ষ্য ছিল অতি দ্রুত কিছু প্রাথমিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা। স্বাভাবিকভাবেই তখন সকলের মনে কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, কে বা কারা এই স্ক্রোলগুলো এখানে রেখে গেল? কখন লেখা হয়েছিল এই স্ক্রোলগুলো? কী লেখা আছে সেখানে?
এই সব প্রশ্নের উত্তর বের করার ক্ষেত্রে প্রথম সফলতার মুখ দেখেন ইসরাইলি অধ্যাপক সুকেনিক। তিনি এগুলোর বয়স বের করতে সক্ষম হন। তিনি বলেন, ইহুদিদের ঐতিহাসিক দ্বিতীয় মন্দির যুগে প্রথম লেখা হয় এই স্ক্রোলগুলো। তবে অন্য বিজ্ঞানীরা এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও পরবর্তীতে সুকেনিকের তথ্য সত্য বলে মেনে নেন সবাই। সেই অনুযায়ী সময়টা খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দী থেকে ১০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। অবাক করা ব্যাপার হলেও সত্য, আধুনিক যুগে কার্বন ডেটিং এর ফলাফলও সুকেনিকের অনুমানকে সমর্থন করে।
কিন্তু কারা এই পাণ্ডুলিপিগুলো সংকলন করেছিলেন, এ নিয়ে এখন পর্যন্ত বিতর্কে লিপ্ত আছেন গবেষকরা। অনেকের মতে, রোমান বাহিনীর হাতে কুমরান এলাকা পতনের পূর্বে এখানে বসবাসরত ইহুদিদের দ্বারা এগুলো সংকলিত। তখন ইহুদিদের চারটি বড় গোত্রের মধ্যে ইসেন সম্প্রদায়ের পণ্ডিতগণ এগুলো সংকলন করেন বলে ধারণা করা হয়। রোমানদের আক্রমণের পর সেগুলো এই গুহার মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয় এবং এটাকে ‘মিনি পাঠাগার’ হিসেবে ব্যবহার করেন ইহুদি ধর্মানুসারীরা।
মহামূল্যবান ডেড সী স্ক্রলের একটি পাণ্ডূলিপি।
এছাড়া বাকি গোত্রদেরও বাদ দেয়া হয়নি সম্ভাব্য সংকলকের তালিকা থেকে। আবার অনেকের মতে, এগুলো সকলের সম্মিলিত প্রয়াস। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো মেলেনি।
ইসরাইল বিতর্ক এবং স্ক্রোলের পাঠোদ্ধার
বেদুইনদের ব্যবসার সুবাদে ততদিনে স্ক্রোল ছড়িয়ে গেছে বিভিন্ন দেশের গবেষকদের কাছে। যদিও সিংহভাগ স্ক্রোল জর্ডান এবং ইসরাইলের হস্তগত ছিল, কিন্তু বাকিরাও হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন না। বড় বড় গবেষকরা বিভিন্ন তথ্য উদ্ধার করতে লাগলেন স্ক্রোল ঘেঁটে।
তবে সেগুলো একই তথ্য বিভিন্ন রূপে জানানো ছাড়া তেমন কোন ঝড় তুলতে পারেনি বিশ্ব দরবারে। এক্ষেত্রে ইসরাইলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন সবাই।
অপরদিকে ইসরাইলে তখন গবেষকদের মধ্যে প্রশাসনিক কারণে কলহ চলছিল। ড. জন স্ত্রাঙ্গলের নেতৃত্বে হাতেগোণা কয়েকজন গবেষক ছাড়া আর কেউ স্ক্রোল নিয়ে কাজ করার অনুমতি পাননি। এমনকি স্ক্রোল সম্পর্কিত আলোকচিত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও ছিল কড়াকড়ি। ১৯৭৭ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গেজা ভারমেস এটাকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় একাডেমিক কেলেঙ্কারি বলেন।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পাঠোদ্ধার করছেন এক তরুণ গবেষক।
তৎকালীন শীর্ষ গবেষক হার্শেল শ্যাঙ্কস প্রায় তিন দশক ধরে এ নিয়ে আইনী লড়াই করেন। দীর্ঘদিনের লড়াই শেষে ১৯৯১ সালে ইসরাইলের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগীয় প্রধান ইমানুয়েল তভ সর্বপ্রথম স্ক্রোল গবেষণার ফল এবং পাণ্ডুলিপি অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীদের জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা করেন।
এরপর ঝিমিয়ে পড়া গবেষকদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা দেখা গেল। কাজে লেগে পড়লেন সবাই। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বদৌলতে দ্রুত বেশিরভাগ পাণ্ডুলিপির পাঠ পুনরোদ্ধার সম্ভব হলো। এক এক করে প্রকাশিত হতে থাকলো সকল স্ক্রোলের মার্জিত পাণ্ডুলিপি।
সমস্ত পাণ্ডুলিপিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়- বাইবেলিক এবং নন-বাইবেলিক। এর মধ্যে ১০ কপি ঈসায়ী, ৩০ কপি শামের কিতাব এবং ২৫ কপি দ্বিতীয় বিবরণ সম্পর্কিত হিব্রু দলিল রয়েছে। গবেষকদের মতে, স্ক্রোলগুলো মূলত হিব্রু বাইবেলের পান্ডুলিপি হলেও সম্পূর্ণ বাইবেলের The Book of Esther অধ্যায়ের কোনো পান্ডুলিপি এর মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
নতুন টেস্টামেন্টের ঈসায়ী থেকে এগুলো ১০০০ বছর পুরাতন। তবে যিশুখ্রিস্টের আগমনবার্তা সম্পর্কিত জশুয়ার ভবিষ্যদ্বাণী হিব্রু শামের কিতাবে রয়েছে, যা এর আগে কোথাও দেখা যায়নি। ওল্ড টেস্টামেন্টের অনেক দূর্লভ ও হারিয়ে যাওয়া তথ্য এই স্ক্রোলের মাধ্যমে জানা সম্ভব হয়েছে। এ থেকে অনেকে ধারণা করেন, খ্রিস্টধর্মের শুরু হয়েছে এই স্ক্রোলগুলোর মাধ্যমে। তবে এই বিষয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ বিতর্ক চললেও সঠিকভাবে কোন কিছু জানা যায়নি।
আর নন-বাইবেলিক অংশে বিভিন্ন আইন-কানুন, রীতিনীতি, ব্যবসায়িক কাগজপত্র এবং কিছু ব্যক্তিগত পুঁথি রয়েছে। গবেষকদের মতে, কুমরান গুহার বিরানভূমি আগে ঠিক এরকম ছিল না। এখানে বড় সম্প্রদায় বাস করতো। কুমরান নামে গোটা একটা সভ্যতার অস্তিত্বের কথা জানা যায় স্ক্রোল থেকে।
এছাড়া ১৬টি সামরিক চিঠিপত্র পাওয়া যায়, যেগুলো বার কুখবা নামে পরিচিত। ‘বাবাথা’ নামক এক ইহুদির ব্যক্তিগত নথি সম্বলিত কয়েকটি পাণ্ডুলিপিও পাওয়া যায়। নব্যপ্রস্তর যুগের বিভিন্ন হাতিয়ারের অংশবিশেষও উদ্ধার করা হয় বলে জানান গবেষকরা।
প্রায় ৪০% এর মতো স্ক্রোল থেকে পাঠোদ্ধার করা অসম্ভব বলে জানান ইসরাইলি গবেষকগণ। ১৯৯১ সালের নভেম্বর মাসে Biblical Archaeological Society প্রথমবারের মতো পাণ্ডুলিপি বিষয়ক প্রদর্শনীর আয়োজন করে। তবে ১৯৯৪ এর শেষের দিকে ইসরাইলি পুরাতত্ত্ববিদরা পরীক্ষার মাধ্যমে কিছু গ্রিক পাণ্ডুলিপি কুমরান সম্প্রদায় বহির্ভুত বলে নিশ্চিত হন। তবে সেগুলো ঠিক কোন উদ্দেশ্যে সেখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, তার উত্তর এখনো বের করা সম্ভব হয়নি।
সতর্কতার সাথে ভেঙে যাওয়া অংশ জোড়া লাগানো হচ্ছে।
ইসরাইল প্রদত্ত ছবি নিয়ে হান্টিংটন লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ প্রথম কম্পিউটার অ্যানালাইসিস সম্পাদন করেন। এর মাধ্যমে দুর্বোধ্য অনেক পাণ্ডুলিপির নিখোঁজ অংশের সম্ভাব্য পাঠোদ্ধার সম্পন্ন করা হয়।
ডেড সী স্ক্রোলের পাঠোদ্ধারের মাধ্যমে ওল্ড টেস্টামেন্টের অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসে, যা র্যাবাই তত্ত্ব এবং জুডাতত্ত্বের নতুন দিক উন্মোচন করে। যিশুখ্রিস্টের আগমন এবং প্রাথমিক খ্রিস্টান ধর্মের অনেক অজানা তথ্যও জানা যায়। প্রাচীন ইহুদি ধর্মের সাথে খ্রিস্টানদের ওল্ড টেস্টামেন্ট এর সূক্ষ যোগসূত্রতাও পাওয়া যায় এগুলো থেকে।
রহস্যময় কপার স্ক্রোল এবং গুপ্তধনের সন্ধান
ধর্মীয় স্ক্রোলগুলো ইসরাইলিদের হাতে থাকলেও সবচেয়ে রহস্যময় স্ক্রোল তখন জর্ডানীদের হস্তগত ছিল। অন্যান্য স্ক্রোলের মতো তা প্যাপিরাস পাতা বা চামড়ার উপর লিখিত ছিল না। সেটা লেখা হয়েছিল তামার তৈরি পাতের উপর। যাকে ইতিহাসবিদগণ The Copper Scroll নামে চিনেন
একে পাণ্ডুলিপি বললেও ভুল হবে। কারণ এর মাঝে লেখার সাথে আছে খোদাই করা কয়েকটি মানচিত্র। আসলে এটা ছিল একাধিক গুপ্তধনের নকশা। ১৯৫২ সালে অনুসন্ধান অভিযানের সময় এক জর্ডানী পুরাতত্ত্ববিদ ৩ নং গুহার ভেতর থেকে এটি উদ্ধার করেন।
জাদুঘরে কাঁচের ক্যাবিনেটে রক্ষিত রহস্যময় কপার স্ক্রোল।
জর্ডান সরকার তখন কড়া নিরাপত্তায় স্ক্রোলটিকে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যালেগ্রো-এর নিকট প্রেরণ করেন। অ্যালেগ্রো পরীক্ষার মাধ্যমে বুঝতে পারেন স্ক্রোলটি একটি গুপ্তধনের মানচিত্র। তিনি তৎক্ষণাৎ স্ক্রোলের রহস্য সমাধানে লেগে যান। পরবর্তীতে জর্ডান সরকারের নির্দেশে ১৯৬০ সালে অ্যালেগ্রোর গবেষণার ফলাফল জার্নাল আকারে প্রকাশ করা হয়।
অ্যালেগ্রোর জার্নালে ঢুঁ মেরে জানা যায় যে, স্ক্রলে মোট ৬৩ টি স্থানের নির্দেশনা রয়েছে। স্ক্রোলের ভাষ্যমতে সেগুলো সোনা আর রুপা বোঝাই করা কুঠুরি, যার সর্বমোট পরিমাণ কয়েক টনের কাছাকাছিও যেতে পারে। স্ক্রোলটি যেন বছরের পর বছর টিকে থাকে সেজন্য এটা তামার পাতের উপর লেখা হয় বলে জানান অ্যালেগ্রো।
স্ক্রোলের নির্দেশনায় স্পষ্টাকারে স্থানগুলোর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কপার স্ক্রোল থেকে হুবহু অনুবাদ করা আলোচিত একটি লাইন তুলে ধরলাম, “যেখানে লবণের স্তূপ, সেখান থেকে প্রথম সিঁড়ির নিচে চার হাত গভীরে ৪১ টালি রূপা”।
আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে সহজ মনে হলেও গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া এতো সহজ নয়। কারণ, মানচিত্রের এসব নির্দেশনা তখনকার গুহাবাসীদের জন্য লেখা হয়েছিল। কেউ নিজের ঘরের মতো গুহাগুলোকে না চিনলে, তার পক্ষে এই অবস্থানগুলো বের করা প্রায় অসম্ভব। তাই, এখনকার কারো জন্য এত সহজ নয় এর সন্ধান করা। উপরন্তু স্ক্রোল মোতাবেক গুপ্তধনের প্রথম অবস্থানের সাথে বাকিগুলোর যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই প্রথম অবস্থানই বের করা সম্ভব হয়ে উঠেনি
কপার স্ক্রোলের একাংশ।
তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, দুই হাজার বছর আগেই রোমানরা হয়তো সকল গুপ্তধন লুট করে ফেলেছেন। এর পক্ষে প্রমাণও দিয়েছেন অনেকেই। কিন্তু এই প্রমাণ কি আর অনুসন্ধান থামাতে পারে! এখনো সবধরনের সূত্র নিয়ে পরীক্ষা করে যাচ্ছেন পুরাতত্ত্ববিদরা।
আর এই মহামূল্যবান কপার স্ক্রোল নিয়ে সাহিত্যকরাও মনের মাধুরী মিশিয়ে আপন কল্পনার মাধ্যমে রোমাঞ্চকর অভিযান পরিচালনা করে রচনা করেছেন বেশ কিছু উপন্যাস। এর মধ্যে Nathaniel Norsen Weinreb এর The Copper Scroll এবং Lionel Davidson এর A long way to Shiloh বিখ্যাত।
মালিকানা বিরোধ
প্রথমদিকে ধর্মীয় স্ক্রোল মনে হলেও কপার স্ক্রোলের সন্ধান আরো রোমাঞ্চকর রহস্যের হাতছানি দিচ্ছে ইতিহাসবিদদের। এরই জের ধরে ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় ইসরাইল জর্ডান থেকে প্রায় ১৫০০ এর মতো স্ক্রোল নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। ইসরাইলের রকফেলার জাদুঘরে কড়া নিরাপত্তায় শুরু হয় গবেষণা।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক শুরু হয় যখন ইসরাইল স্ক্রোলগুলোর অনুবাদ প্রকাশ করতে দীর্ঘ ৪০ বছর বিলম্ব করে। এদিকে জর্ডান সরকারও বসে থাকেনি। তারাও বরাবরই জর্ডানকে স্ক্রোলগুলোর বৈধ মালিক হিসেবে দাবি করে আসছে।
কানাডায় ডেড সী স্ক্রোল প্রদর্শনীর একটি কেবিনেট।
বর্তমানে জর্ডানের দখলে রয়েছে কপার স্ক্রোলসহ মাত্র ২৫টি স্ক্রোল! এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফিলিস্তিন, কানাডা এবং সিরিয়ার বিভিন্ন গবেষণাগার এবং প্রতিষ্ঠানের নিকট বেশ কয়েকটি স্ক্রোল হস্তগত আছে।
অপরদিকে সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘ নিরাপত্তা নীতির ২৩৩৪ অনুশাসনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র Veto প্রদান না করায়, ইসরাইল স্ক্রোলগুলোর অধিকার হারাতে পারেন বলে মনে করেন টাইমস অফ ইসরাইলের বিশেষজ্ঞরা। তবে স্ক্রোলের ব্যাপারে ইসরাইলের মাত্রাতিরিক্ত গোপনীয়তা ব্যাপারটিকে রহস্যময় করে তুলেছে।
২০১০ সালে জর্ডান সরকার কানাডায় ইসরাইল আয়োজিত স্ক্রোল প্রদর্শনী বয়কট করে এবং সেগুলো পুনরায় দখলে নেওয়ার সংকল্প জানায়। বর্তমানে জর্ডান, ইসরাইল , ফিলিস্তিন , কানাডা এবং সিরিয়া স্ক্রোলগুলোর মালিকানার বিষয়ে স্নায়ুযুদ্ধে লিপ্ত আছে, যা সমাধা হওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখেন না বিশেষজ্ঞরা।
টাইম ম্যাগাজিনের মতে, ডেড সী স্ক্রোল ইতিহাসের অন্যতম সেরা অনুসন্ধান। রাজনৈতিক বিরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া খ্যাত ইসরাইলের অতিমাত্রায় গোপনীয়তার কারণে উন্মুক্ত বিশ্ব বঞ্চিত হচ্ছে অজানা সব রোমাঞ্চকর তথ্য থেকে।
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইল অনুসন্ধানকারী দল ১২ নং গুহার সন্ধান পান বলে দাবি করেন। এর মাধ্যমে গবেষণায় এক নতুন সম্ভাবনার দেখা দেয়। কিন্তু এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি কর্তৃপক্ষ
যতই দিন গড়াচ্ছে, ততই ঘনীভূত হয়ে পড়ছে রহস্য। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিচরণের যুগে ইসরাইলের এরূপ মনোভাব নিন্দাজনক। তবে আশা করা যায়, ভবিষ্যতে কোন তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপে হয়তো এই সমস্যার সমাধান হবে এবং বিশ্বদরবারে উন্মোচিত হবে স্ক্রোলের রহস্য।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স: ১. Dead Sea Scrolls: The Living Manuscripts of the Dead Sea – মূল গবেষণা প্রবন্ধ। ২. Israel Antiquities Authority (IAA) – ডিজিটাল লাইব্রেরি আর্কাইভ। ৩. Biblical Archaeological Society – বিশেষ প্রদর্শনী রিপোর্ট। ৪. ‘ইতিহাসের সন্ধানে’ (টক-শো) – মধ্যপ্রাচ্যের প্রত্নতাত্ত্বিক রাজনীতি বিষয়ক পর্ব।
সম্পাদনায়: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিজ্ঞান ও মহাবিশ্ব ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant)
সর্বশেষ আপডেট: ২২ জুন ২০২৬
আমাদের চারপাশের পৃথিবী এবং এর বাইরের মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত এমন সব অবিশ্বাস্য ঘটনার জন্ম দিচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। সাধারণ চোখে প্রকৃতিকে যেমনটা মনে হয়, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ততটাই নিখুঁত বিজ্ঞান ও রোমাঞ্চ।
নিচে পৃথিবী, মহাকাশ এবং জীবজগতের এমন ৮টি আকর্ষণীয় ও বৈজ্ঞানিক তথ্য তুলে ধরা হলো, যা আপনাকে নতুন করে ভাবাবে:
১. প্রতি সেকেন্ডে ১০০ বার বিদ্যুৎ চমকানো

আমরা সাধারণত ঝড়-বৃষ্টির সময় দু-একবার বিদ্যুৎ চমকাতে বা মেঘ ডাকতে দেখি। কিন্তু বৈজ্ঞানিক তথ্য হলো—এই পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮.৬ মিলিয়ন (৮৬ লক্ষ) বার বজ্রপাত বা বিদ্যুৎ চমকায়! এর সহজ সমীকরণ হলো, প্রতি সেকেন্ডে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও প্রায় ১০০ বারেরও বেশি বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
২. পানিতে ভাসমান অলৌকিক পাথর: পিউমিস

পাথর মানেই তা ভারী হবে এবং পানিতে ডুবে যাবে—এটিই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু পিউমিস (Pumice) হলো পৃথিবীর একমাত্র ব্যতিক্রমী পাথর যা পানিতে অনায়েসে ভেসে থাকে। মূলত আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় নির্গত লাভা দ্রুত ঠাণ্ডা হওয়ার সময় এর ভেতরে প্রচুর বাতাস বা গ্যাস আটকে যায়। ফলে পাথরটির ভেতরে অসংখ্য ছোট ছোট ছিদ্র তৈরি হয় এবং এর ঘনত্ব পানির চেয়ে কম হওয়ায় এটি পানিতে ভাসতে পারে।
৩. উটের চোখের সুরক্ষায় ‘তিনটি পাতা’ বা পলক

মরুভূমির তীব্র ঝড় এবং উড়ো ধুলাবালি থেকে চোখকে সুরক্ষিত রাখতে প্রকৃতির এক অদ্ভুত সৃষ্টি হলো উট। তীব্র ধূলিঝড়ের মধ্যেও যেন উট অনায়াসে চলাচল করতে পারে, সেজন্য উটের চোখে সাধারণ মানুষের মতো দুটি নয়, বরং তিনটি চোখের পাতা (Eyelids) থাকে। এর মধ্যে একটি পাতা এতটাই পাতলা যে, সেটি বন্ধ রাখলেও উট তার চারপাশ স্পষ্ট দেখতে পায়।
৪. রেজর ব্লেড গলিয়ে দেওয়ার মতো পাকস্থলীর অ্যাসিড

মানুষের পাকস্থলীতে খাদ্য পরিপাক বা হজম করার জন্য যে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (HCl) থাকে, তা অত্যন্ত শক্তিশালী। রসায়নের স্কেলে এর পিএইচ (pH) মাত্রা সাধারণত ১ থেকে ২ এর মধ্যে হয়ে থাকে। জীববিজ্ঞানীদের মতে, এই অ্যাসিডের তীব্রতা এতটাই বেশি যে এটি একটি আস্ত স্টিলের রেজর ব্লেডকেও পুরোপুরি গলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে!
৫. মহাকাশে পানি ফোটানোর অদ্ভুত দৃশ্য

সাধারণত পৃথিবীতে যখন আমরা পানি ফুটাই, তখন বাষ্পীভূত হয়ে পানির ফোঁটাগুলো ছোট ছোট বুদবুদ আকারে অনবরত উপরে উঠে আসে। কিন্তু শূন্য মহাকর্ষ বা গ্র্যাভিটিহীন মহাকাশে কেউ পানি ফোটাতে গেলে এমনটা একদমই হবে না। সেখানে উত্তপ্ত পানি ছোট ছোট বুদবুদ হওয়ার পরিবর্তে সবগুলো মিলে একটি মাত্র দানবাকৃতির বা বিশাল ফোঁটায় রূপান্তরিত হবে।
৬. রাতের ঘুম এবং স্বপ্নের গোলকধাঁধা

এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন যিনি রাতে ঘুমানোর পর মাত্র একটি স্বপ্ন দেখেন। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একজন সুস্থ মানুষ প্রতি রাতে ঘুমের মধ্যে কমপক্ষে ৫ থেকে ৭টি স্বপ্ন দেখেন। এমনকি কারো কারো ক্ষেত্রে স্বপ্নের এই সংখ্যাটি এক ডজনও (১২টি) ছাড়িয়ে যায়! তবে ঘুম থেকে ওঠার পর মানুষ তার দেখা স্বপ্নের প্রায় ৯০ শতাংশই ভুলে যায়।
৭. বরফের ক্রিস্টাল বের হওয়া আগ্নেয়গিরি: মাউন্ট ইরেবাস

আগ্নেয়গিরি বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ফুটন্ত লাল লাভা। কিন্তু অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে অবস্থিত পৃথিবীর অন্যতম সচল ও রহস্যময় আগ্নেয়গিরি মাউন্ট ইরেবাস (Mount Erebus)। এই আগ্নেয়গিরিটি অনন্য কারণ এর লাভা হ্রদের উত্তপ্ত গ্যাসের সাথে তীব্র শীতের সংস্পর্শে আসার ফলে এটি থেকে লাভার পাশাপাশি অনবরত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বরফের ক্রিস্টাল বা খণ্ড নির্গত হয়।
৮. ৫ লক্ষ ভূমিকম্পের বার্ষিক পরিসংখ্যান

আমাদের এই শান্ত পৃথিবীর মাটির নিচে টেকটোনিক প্লেটগুলো প্রতিনিয়ত নড়াচড়া করছে। যার ফলে পৃথিবীতে প্রতিবছর প্রায় ৫,০০,০০০ (৫ লক্ষ) বার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। তবে আশার কথা হলো, এর মধ্যে আমরা সাধারণ মানুষ মাত্র ১,০০,০০০ (১ লক্ষ) টি টের পেয়ে থাকি এবং এর মধ্যে গড়ে মাত্র ১০০টি ভূমিকম্প পৃথিবীর বুকে বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম হয়।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ
বিজ্ঞান এবং প্রকৃতির এই রহস্যগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নিখিল বিশ্ব কতটা নিখুঁত নিয়মে আবর্তিত হচ্ছে। আপনি যত বেশি জানবেন, প্রকৃতির প্রতি আপনার বিস্ময় ততটাই বেড়ে যাবে।
বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের রহস্য, সমসাময়িক প্রযুক্তি এবং শিক্ষণীয় তথ্যের নিখুঁত ও নিরপেক্ষ আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের অফিশিয়াল পোর্টাল পালস বাংলাদেশ-এ।
আপনার জন্য একটি ফলো-আপ প্রশ্ন: এই ৮টি রোমাঞ্চকর তথ্যের মধ্যে কোন বিষয়টি আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি অবিশ্বাস্য বা আশ্চর্যজনক মনে হয়েছে? কমেন্ট করে আমাদের জানান!
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
ফ্যাক্ট-চেক ও সম্পাদনা: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant)
সর্বশেষ আপডেট: ২২ জুন ২০২৬
আমাদের চিরচেনা এই বাংলাদেশ বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে কতটা প্রভাব বিস্তার করে আছে, তা আমরা অনেকেই পুরোপুরি জানি না। রাজনীতি, কূটনীতি, ফ্যাশন কিংবা প্রকৃতির অপার বিস্ময়—সবখানেই জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম। নিচে বাংলাদেশ ও বাঙালিদের সম্পর্কে এমন কিছু অসাধারণ তথ্য তুলে ধরা হলো, যার কিছু হয়তো আপনার জানা, আর কিছু তথ্য আপনাকে নতুন করে ভাবাবে:
১. সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় স্থানে বাংলাদেশ

কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে প্রযুক্তির ছোঁয়া এবং কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এসেছে এক অভূতপূর্ব সাফল্য। চীন ও ভারতের পরই বর্তমানে বিশ্বমঞ্চে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয় স্থান অধিকার করে আছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি বৈশ্বিক রফতানিতেও অবদান রাখছে।
২. বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল এবং জাপানের চিরকৃতজ্ঞতা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক সামরিক আদালতে (টোকিও ট্রায়াল) একমাত্র বাঙালি তথা এশীয় বিচারপতি ছিলেন রাধাবিনোদ পাল। তিনি আন্তর্জাতিক আইনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে রায় দিয়েছিলেন যে, তৎকালীন আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে একপাক্ষিকভাবে কেবল জাপানিদের যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত করা ন্যায়সংগত নয়। তাঁর এই অকুতোভয় ও সুবিচারের রায়ের কারণে জাপান এক বিরাট ক্ষতিপূরণের বোঝা ও গ্লানি থেকে মুক্তি পায়। এই ঐতিহাসিক উপকারের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ জাপান চিরকাল বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে থাকার প্রতিজ্ঞা করেছে।
৩. বিশ্বের সবচেয়ে বড় উপসাগর: বঙ্গোপসাগর

আমাদের দক্ষিণে অবস্থিত বঙ্গোপসাগর (Bay of Bengal) হলো পৃথিবীর বৃহত্তম উপসাগর। এর বিস্তৃতি এবং ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বর্তমান বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
৪. আন্তর্জাতিক ফ্যাশন আইকন: বিবি রাসেল

জর্জিও আরমানি বা পিয়েরে কারডিনের মতো বিশ্ববিখ্যাত ডিজাইনারদের পাশে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন আমাদের দেশীয় ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল। ইউরোপের র্যাম্প মডেলিং কাঁপানোর পর তিনি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প এবং খাদি কাপড়কে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ায় এক মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন।
৫. দৈনিক পত্রিকার বিশাল সমাহার

বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগৎ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিবন্ধিত ও প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা ২,৮০০-এরও বেশি, যা দেশের মানুষের তথ্যের প্রতি আগ্রহ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার এক অনন্য নজির।
৬. নদীর দেশ বাংলাদেশ

বাংলাদেশে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নদী। ছোট-বড়, শাখা ও উপনদী মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রায় ৭,০০০টি নদী রয়েছে, যা বিশ্বের আর কোনো দেশের ভৌগোলিক ইতিহাসে সত্যি বিরল।
একটু সংশোধন: মালয়েশিয়ার রাজনীতি ও বাঙালি সংযোগের সঠিক ইতিহাস
ইন্টারনেটে মালয়েশিয়ার কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে নিয়ে কিছু ভুল তথ্য বা ‘মিথ’ প্রচলিত আছে, যা একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের সংশোধন করে নেওয়া উচিত:
- ডা. মাহাথির মোহাম্মদ: মালয়েশিয়ার আধুনিকায়নের রূপকার মাহাথির বিন মোহাম্মদের দাদা (পিতার দিক থেকে) ছিলেন একজন ভারতীয় মুসলিম (কেরালা থেকে আগত), যিনি একজন মালয় নারীকে বিয়ে করেছিলেন। তাই তিনি মূলত মালয় ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত, বাংলাদেশি নন।
- খায়ের জামালউদ্দিন চৌধুরী: মালয়েশিয়ার সাবেক যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী খায়ের জামালউদ্দিনের জন্ম কুয়েতে হলেও তাঁর পৈতৃক পরিবার মালয়েশিয়ারই নাগরিক। তাঁর নামের শেষে ‘চৌধুরী’ পদবিটি যুক্ত থাকার কারণে ইন্টারনেটে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ে যে তিনি বাংলাদেশি, যা আসলে সঠিক নয়।
- চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর: চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হলেও, এটি একমাত্র “প্রাকৃতিক সমুদ্র বন্দর” নয়। পৃথিবীর আরও অনেক বিখ্যাত বন্দর (যেমন- সিডনি হারবার বা নিউইয়র্ক হারবার) প্রাকৃতিক বন্দর হিসেবে স্বীকৃত। তবে এটি আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ
বাঙালিদের মেধা, সততা এবং এই ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক সম্পদ সবসময়ই বিশ্বমঞ্চে আমাদের এক আলাদা পরিচয় এনে দিয়েছে। সঠিক ইতিহাস জানা এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সমসাময়িক ইতিহাস এবং ক্যারিয়ারের সব গুরুত্বপূর্ণ আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের অফিশিয়াল পোর্টাল পালস বাংলাদেশ-এ।
আপনার জন্য একটি ফলো-আপ প্রশ্ন: এই তথ্যগুলোর মধ্যে কোন বিষয়টি আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি আশ্চর্যজনক বা নতুন মনে হয়েছে? কমেন্ট করে আমাদের জানান!
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ইতিহাসের পাতা থেকে | বিশেষ ফিচার
ডেস্ক রিপোর্ট, পালস বাংলাদেশ
সর্বশেষ আপডেট: ২০ জুন ২০২৬
ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণে বাঙালি এবং বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও সামরিক অবদান চিরকাল বিশ্বমঞ্চে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণক্ষেত্রে একজন অকুতোভয় নারীর বজ্রকণ্ঠ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর কূটনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ—সবখানেই জড়িয়ে আছে রোমাঞ্চকর সব ইতিহাস।
হিটলারের নাৎসি বাহিনীকে কাঁপিয়ে দেওয়া ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক নারী স্নাইপার

“ভদ্রলোকরা, আপনারা কি ভাবেন না যে, আমার পিঠের পিছনে আমার উপর ভর করে আপনারা অনেকক্ষণ ধরে লুকিয়ে আছেন?”
১৯৪২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে হাজার হাজার পুরুষের সামনে দাঁড়িয়ে এই বজ্রকণ্ঠের ঐতিহাসিক উক্তিটি করেছিলেন মাত্র ২৫ বছর বয়সী এক তরুণী। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ও সফল নারী স্নাইপার লেফটেন্যান্ট লুডমিলা পাভলিচেনকো (Lyudmila Pavlichenko)। যিনি একা হাতে ৩০৯ জন নাৎসি সেনাকে খতম করেছিলেন।

ক) নার্স নয়, স্নাইপার হওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রায় ২,০০০ নারীকে স্নাইপার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল, যাদের মধ্যে লুডমিলা ছিলেন সবচেয়ে সেরা। শুরুর দিকে সেনাবাহিনীতে তাঁকে নার্স হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং একটি কঠিন অডিশন বা ট্রায়ালের মুখোমুখি হয়ে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের নিখুঁত নিশানাভেদের দক্ষতা প্রমাণ করেন।
খ) মাত্র এক বছরে ৩০৯টি “কনফার্মд কিল”
স্নাইপার হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার পর ওডেসায় লড়াইকালীন প্রথম ৭৫ দিনের মধ্যেই লুডমিলা ১৮৭ জন শত্রুকে পরাস্ত করেন। মাত্র এক বছরের মধ্যে তাঁর নিশ্চিত হত্যার (Confirmed Kills) সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০৯ জনে, যার মধ্যে ৩৬ জন ছিলেন খোদ জার্মানদের তুখোড় স্নাইপার!
সামরিক পরিভাষায় “কনফার্মড কিল” কী?
যুদ্ধক্ষেত্রে একজন স্নাইপার কাউকে গুলি করলেই সেটি রেকর্ডে যোগ হয় না। একটি হত্যাকাণ্ড তখনই “কনফার্মড” বা নিশ্চিত হিসেবে গণ্য করা হয়, যখন কোনো স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ বা কোনো সামরিক অফিসার সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে প্রমাণ দেন। ফলে, সাক্ষী ছাড়া লুডমিলা আসলে আরও কত নাৎসি সেনা খতম করেছিলেন, তার প্রকৃত সংখ্যা হয়তো ৩০৯ এর চেয়েও অনেক বেশি ছিল।
গ) হিটলারের বাহিনীর ভয় এবং চকোলেটের লোভনীয় প্রস্তাব
লুডমিলার নিখুঁত নিশানার কারণে জার্মান নাৎসি বাহিনীর কাছে তিনি এক আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠেন। জার্মানরা তাঁকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওয়ান-টু-ওয়ান রেডিও ব্রডকাস্টের মাধ্যমে বিলাসবহুল ঘর-সংসার, উচ্চপদস্থ সামরিক পদ এবং প্রচুর পরিমাণে চকোলেটের অফার দিতে শুরু করে।
এই সমস্ত লোভনীয় প্রস্তাব যখন লুডমিলা একবাক্যে প্রত্যাখ্যান করেন, তখন ক্ষিপ্ত জার্মানরা রেডিওতে তাকে হুমকি দিয়ে বলে, তাকে বন্দি করতে পারলে “৩০৯ টুকরো” করা হবে। এই হুমকি শুনে লুডমিলা পরে হেসে বলেছিলেন, “বাহ! এমনকি ওরাও তাহলে আমার নিখুঁত স্কোরটা ভালোভাবে জানত!”
ঘ) হোয়াইট হাউসে প্রথম সোভিয়েত নাগরিক
যুদ্ধের একপর্যায়ে আহত হওয়ার পর লুডমিলাকে সম্মুখ যুদ্ধ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং তাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের একজন বিশেষ দূত হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পাঠানো হয়। তিনি ইতিহাসে প্রথম সোভিয়েত নাগরিক হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ পান এবং তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ও ফার্স্ট লেডি এলিয়েনর রুজভেল্টের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন দেশের ঐতিহাসিক অবদান
১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার পর বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক বিশাল মেরুকরণ তৈরি হয়। একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়ক, সমাজতান্ত্রিক পরাশক্তি, সাহসী কূটনীতিবিদ এবং অকুতোভয় সাংবাদিকদের অবদান ছিল আকাশচুম্বী।
১. ভারত এবং ইন্দিরা গান্ধী: সর্বাত্মক কূটনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান ছিল সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও বহুমুখী। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে এবং পাকিস্তানি গণহত্যার চিত্র বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে প্রধানতম ভূমিকা পালন করেন:
- আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দৌড়ঝাঁপ: ২৫ মার্চ কালরাতের গণহত্যার পর, ২৭ মার্চ ভারতের লোকসভায় তিনি এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে ভাষণ দেন এবং ৩১ মার্চ মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাস করান। মে মাসে বেলগ্রেডের বিশ্বশান্তি কংগ্রেসে ইন্দিরা গান্ধীর বাণীতে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানালে ৮০টি দেশের প্রতিনিধিরা তা সাদরে গ্রহণ করেন।
- ম্যারাথন বিশ্ব সফর: ২৪ অক্টোবর থেকে তিনি ১৯ দিনের এক ম্যারাথন বিশ্ব সফরে বের হন এবং ব্রাসেলস, ভিয়েনা, ব্রিটেন, আমেরিকা (প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সাথে ১২৫ মিনিটের বৈঠক), ফ্রান্স ও জার্মানিতে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করার আহ্বান জানান।
- সামরিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা: ভারতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থীর জন্য তিনি আশ্রয় ও খাদ্য নিশ্চিত করেন। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর লোকসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
- জে এফ আর জ্যাকব (লে. জেনারেল): একাত্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অব স্টাফ হিসেবে তিনি সীমান্ত এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প স্থাপন, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও রসদ জোগান দেওয়া এবং যৌথ সংস্কৃতির নকশা তৈরিতে অসামান্য অবদান রাখেন। ১৬ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের পেছনেও তাঁর বিশাল ভূমিকা ছিল।
২. সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া): আন্তর্জাতিক ভেটো ও ভূরাজনৈতিক ঢাল

তৎকালীন পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক ঢাল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল:
- জাতিসংঘে ঐতিহাসিক ভেটো: বাংলাদেশের বিজয় যখন সুনিশ্চিত, তখন পাকিস্তানের মিত্র রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র ও চীন জাতিসংঘের security council বা নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তোলে। সোভিয়েত ইউনিয়ন সেই প্রস্তাবে পরপর ‘ভেটো’ (Veto) প্রদান করে মার্কিন-চীন চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেয়। রাশিয়া এই ভেটো না দিলে বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় অর্জন বিলম্বিত বা নেতিবাচক খাতে মোড় নিতে পারত।
- মার্কিন সপ্তম নৌ-বহর প্রতিহত: বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌ-বহর পাঠানোর সিদ্ধান্তকে রাশিয়ার সক্রিয় নৌ-উপস্থিতি ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই থমকে যেতে হয়েছিল।
- পুনর্গঠনে রুশ অবদান: যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাইন ও ধ্বংসাবশেষ অপসারণ করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ নিজেদের জীবনও উৎসর্গ করেন।
৩. আমেরিকা: সরকারের বিরোধিতা সত্ত্বেও মার্কিন নাগরিকদের অকৃত্রিম সমর্থন

১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রিহার্ড নিক্সনের রিপাবলিকান সরকার পাকিস্তানের পক্ষে থাকলেও, আমেরিকার সাধারণ জনগণ, সিনেটর, কবি ও শিল্পীরা বাংলাদেশের পক্ষে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন:
- সিনেটর এডওয়ার্ড ‘টেড’ কেনেডি: মার্কিন প্রশাসনের পাকিস্তান তোষণ নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি গণহত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানান। ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলো স্বচক্ষে পরিদর্শন করে মার্কিন সিনেটে ‘ক্রাইসিস ইন সাউথ এশিয়া’ শিরোনামে এক ঐতিহাসিক রিপোর্ট জমা দেন, যেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যার বিবরণ ছিল।
- কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: ১ আগস্ট ১৯৭১ তারিখে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে ভারতের সেতারসম্রাট রবিশঙ্কর এবং বিটলস ব্যান্ডের জর্জ হ্যারিসন পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় এই চ্যারিটি কনসার্টের আয়োজন করেন। ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ, আল্লারাখা খাঁ, বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটনদের সুরের মূর্ছনায় unarmed বাঙালিদের ওপর চালানো পৈশাচিকতা বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয় এবং জর্জ হ্যারিসনের বিখ্যাত ‘বাংলাদেশ’ গানটি বিশ্বকে নাড়া দেয়।
- অ্যালেন গিন্সবার্গ: এই মার্কিন কবি বাংলাদেশের শরণার্থীদের হাহাকার নিয়ে লিখেছিলেন বিখ্যাত দীর্ঘ কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। যা পড়ে বিশ্বজুড়ে অজস্র মানুষের চোখ অশ্রুসজল হয়েছিল।
৪. যুক্তরাজ্য ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কলমযোদ্ধারা

লন্ডন ছিল বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক প্রচারণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র, যেখানে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের অবদান ছিল অনন্য:
- অ্যান্থনি মাসকারেনহাস: এই পাকিস্তানি সাংবাদিক একাত্তরের এপ্রিলে বাংলাদেশে এসে গণহত্যার চাক্ষুষ তথ্য সংগ্রহ করেন এবং দেশ থেকে পালিয়ে লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকায় ১৩ জুন তা প্রকাশ করেন। তাঁর লেখা ‘দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ’ বইটির মাধ্যমে বিশ্ববাসী প্রথম পাকিস্তানের আসল বর্বরতার কথা জানতে পারে।
- সায়মন ড্রিং: ডেইলি টেলিগ্রাফের এই তরুণ সাংবাদিক ২৫ মার্চের পর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে লুকিয়ে থেকে ঢাকার বুকে চালানো ধ্বংসযজ্ঞের প্রত্যক্ষ ছবি ও বিবরণ সংগ্রহ করেন। ব্যাংকক থেকে তাঁর প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘ট্যাঙ্কস ক্রাশ রিভল্ট ইন পাকিস্তান’ পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
- সিডনি শ্যানберг: নিউইয়র্ক টাইমসের এই সাংবাদিকও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে ২৫ মার্চের হত্যাকাণ্ড সশরীরে দেখেন এবং যুদ্ধজুড়ে তাঁর পাঠানো অসংখ্য শরণার্থী-ভিত্তিক প্রতিবেদন পুরো বিশ্বকে নাড়া দেয়।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ
ইতিহাসের এই ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, বীরত্ব এবং সত্যের পক্ষে লড়াইয়ের কোনো ভৌগোলিক সীমানা থাকে না। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই মহান বন্ধুদের অকৃত্রিম সহায়তাই আজ আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনের পথকে ত্বরান্বিত করেছিল।
আন্তর্জাতিক ইতিহাস, সমসাময়িক কূটনীতি এবং জাতীয় খবরের নিখুঁত ও নিরপেক্ষ আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের পালস বাংলাদেশ পোর্টালে।



