ইতিহাস

ডেড সি স্ক্রোল: গুহার আঁধারে লুকিয়ে থাকা ৩০০০ বছরের ‘জীবন্ত’ ইতিহাস
ডেড সি স্ক্রোল

নিউজ ডেস্ক

May 2, 2026

শেয়ার করুন

ঐতিহাসিক প্রতিবেদক | ৩০ এপ্রিল ২০২৬

সময়টা তখন ১৯৪৭ এর দিকে। মৃত সাগরের উত্তর-পশ্চিম তীর ঘেঁষে অবস্থিত কুমরান গুহা। এই গুহাতেই পাথর নিক্ষেপ করার খেলায় মত্ত দুই বেদুইন বালক। মেষ চড়ানোর বায়না ধরে প্রায়ই এদিকটায় চলে আসে দুই ভাই মিলে। হঠাৎ বড় একটা পাথর ছোঁড়ার পর অদ্ভুত রকমের শব্দ হলো। প্রথমদিকে তারা মনের ভুল ভেবে উড়িয়ে দিলেও, প্রতিটি পাথর নিক্ষেপের পর একই রকম শব্দ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল মাটির তৈরি কিছু একটা ভেঙে গেছে। দুই বালক খেলা থেমে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়লো।

বাতাসে ভেসে আসা মৃত সাগরের লোনা গন্ধ আর পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়া বিকেলের সূর্য চারিদিক করে তুলেছিল রহস্যময়। তখনো সন্ধ্যা হতে অনেক দেরি। তাই এই অদ্ভুত শব্দের উৎস জানার জন্য দুজনে মিলে ঢুকে পড়লো গুহার ভেতর।

সেদিন সেই দুই বালকের সাহসী পদক্ষেপ উন্মোচন করে দিল এক গুপ্ত ইতিহাস। তারা গুহার ভেতর প্রবেশ করে উদ্ধার করলো বড় বড় মাটির পাত্র। পাত্র গুলো উল্টে দিতেই মাটিতে ছড়িয়ে পড়লো অগণিত চামড়ার তৈরি স্ক্রোল। এরকম প্রায় ৭টি বড় পাত্র ভর্তি স্ক্রোল উদ্ধার করলো দুজন মিলে। তখন বাইরের আকাশে সূর্য প্রায় অস্ত যাই-যাই করছে। দুই বালক ছুটে চলে গেল বেদুইন পল্লীর দিকে। চিৎকার করতে লাগলো হাত-পা ছুঁড়ে, “গুপ্তধন! গুপ্তধন!”

বেদুইন সর্দার সব শুনে রাতটা অপেক্ষা করলেন। পরদিন ভোর হতেই দলে দলে কুমরান গুহাতে হানা দিলেন। উদ্ধার করে নিয়ে আসলেন শত শত স্ক্রোল। আশেপাশের সব গুহাতে তল্লাশী চালানো যখন শেষ, তখন বেদুইনদের ঝুলিতে স্ক্রোলের সংখ্যা ৯০০ ছুঁই ছুঁই করছে। জেরুজালেমে তীর্থের উদ্দেশ্যে অনেক মানুষ জড়ো হতেন। এই খবর চারিদিকে ছড়িয়ে গেলে সবাই বেদুইন পল্লীতে ছুটে আসলেন। এভাবেই মানবসভ্যতার চোখের আড়াল হয়ে থাকা রহস্যময় ডেড সী স্ক্রোল নতুন করে ফিরে আসলো আমাদের মাঝে; সাথে নিয়ে এলো এক অজানা ইতিহাস!

সেই দুই বেদুইন, যারা বাল্যকালে খেলার সময় স্ক্রোলগুলো উদ্ধার করেন।

ডেড সী স্ক্রোল কী?

‘ডেড সী স্ক্রোল’ নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে উঠে বিখ্যাত মৃত সাগরের ছবি। নামকরণ থেকে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, স্ক্রোলগুলো সম্ভবত মৃত সাগর থেকে উদ্ধারকৃত অথবা এর সাথে কোন যোগসূত্রতা রয়েছে। কিন্তু এই স্ক্রোলগুলোর নাম প্রথমদিকে ডেড সী স্ক্রোল ছিল না। প্রথমে একে ‘কুমরান গুহার স্ক্রোল’ নামে ডাকা হলেও এর অনুসন্ধানস্থল সকল গুহা মৃত সাগরের তীর ঘেষে অবস্থিত হওয়ায় এর নাম হয়ে যায় ‘ডেড সী স্ক্রোল’।

কুমরান গুহা থেকে অদূরেই অবস্থিত মৃত সাগর দিগন্তের সাথে মিশে আছে।

প্যাপিরাস পাতার তৈরি শক্ত কাগজ এবং বুনো শূকরের চামড়ার উপর গাঢ় কালি দিয়ে লেখা স্ক্রোলগুলো গুহার আঁধার থেকে স্থান পেল প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণাগারে। ততদিনে এতটুকু জানা হয়ে গেছে যে, স্ক্রোলগুলো অতিপ্রাচীন হিব্রু-বাইবেলের পান্ডুলিপি যা হিব্রু, আরমানি আর গ্রিক ভাষায় লেখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত বাইবেলের মধ্যে এই স্ক্রোলগুলো প্রাচীনতম।

এখানে জানিয়ে রাখা ভালো, ‘হিব্রু-বাইবেল’ দ্বারা ইহুদি গ্রন্থ তানাখ এর শিপারা এবং খ্রিস্টান ওল্ড টেস্টামেন্টের আনুশাসনিক বাণী সম্বলিত পান্ডুলিপিকে বুঝায়।

তখন এর পাঠোদ্ধারের পাশাপাশি চলছিল নানান জল্পনা-কল্পনা। কে বা কারা এই স্ক্রোলগুলো এই গুহাতে লুকিয়ে রেখেছে? কেন রেখেছে? স্ক্রোলগুলো কি শুধু হিব্রু-বাইবেলেরই অংশ? নাকি রোমাঞ্চকর কিছু লুকিয়ে আছে এর মাঝে?

প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান

প্রথমদিকে বেদুইনরাই ছিলেন একমাত্র অনুসন্ধানকারী। ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তারাই সকল স্ক্রোল উদ্ধার করেন। বেদুইনদের কাছে স্ক্রোলগুলো ছিল আয়-উপার্জনের মাধ্যম। তারা শিক্ষিত না হলেও এতটুকু নিশ্চিত ছিলেন যে, এই ধুলিমাখা ছেঁড়া পান্ডুলিপি তাদের কাছে মূল্যহীন হলেও গণ্যমান্য সাহেবরা চড়াদামে কিনে নিবেন। তাদের এই ব্যবসাতে প্রথম হস্তক্ষেপ করে জর্ডানের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ।

তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান ল্যাঙ্কেস্টার হার্দিং সকল স্ক্রোল জর্ডান সরকারের অধীনে আনার লক্ষ্যে অভিযান পরিচালনা করেন। সরকারি অর্থায়নে অনুসন্ধান পুরোদমে চলছিল। কিন্তু বেদুইনরাও থেমে যাননি। তারাও তাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রাখেন।

১৯৫১ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত জর্ডান সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক অনুসন্ধান করেন ফরাসী ধর্মযাজক ফাদার রলা দ্য ভুঁ। তিনি সর্বমোট ১১টি গুহা চিহ্নিত করেন এবং এর উৎপত্তিস্থল, মালিকানা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণায় ভূমিকা পালন করেন। ১১টি গুহার মধ্যে ৫টি গুহার বেশিরভাগ স্ক্রোলই তখন বেদুইনদের দখলে ছিল। তারা সেগুলো বিভিন্ন দেশের হিব্রু যাজক এবং ইসরাইলিদের কাছে বিক্রয় করে দেন।

মার স্যামুয়েল এর সেই বিজ্ঞপ্তি।

এর মধ্যে সিরিয়ান বিশপ মার স্যামুয়েল তার ক্রয়কৃত চারটি স্ক্রোল ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বিক্রয়ের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। এই বিজ্ঞপ্তি ইসরাইলি সামরিক বাহিনী প্রধান ইয়েগাল ইদিনের নজরে আসে। তার পিতা এল সুকেনিক ছিলেন হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য অধ্যাপক। তিনি ২৫০,০০০ ডলারের বিনিময়ে সেগুলো কিনে নেন। এর পরেই ইসরাইল এবং জর্ডান পৃথক পৃথকভাবে এই স্ক্রোল নিয়ে গবেষণায় নেমে পড়ে।

স্ক্রোল গবেষণায় মগ্ন অধ্যাপক সুকেনিক।

প্রাথমিক প্রশ্নোত্তরের খোঁজে

গবেষকদের প্রথম লক্ষ্য ছিল অতি দ্রুত কিছু প্রাথমিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা। স্বাভাবিকভাবেই তখন সকলের মনে কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, কে বা কারা এই স্ক্রোলগুলো এখানে রেখে গেল? কখন লেখা হয়েছিল এই স্ক্রোলগুলো? কী লেখা আছে সেখানে?

এই সব প্রশ্নের উত্তর বের করার ক্ষেত্রে প্রথম সফলতার মুখ দেখেন ইসরাইলি অধ্যাপক সুকেনিক। তিনি এগুলোর বয়স বের করতে সক্ষম হন। তিনি বলেন, ইহুদিদের ঐতিহাসিক দ্বিতীয় মন্দির যুগে প্রথম লেখা হয় এই স্ক্রোলগুলো। তবে অন্য বিজ্ঞানীরা এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও পরবর্তীতে সুকেনিকের তথ্য সত্য বলে মেনে নেন সবাই। সেই অনুযায়ী সময়টা খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দী থেকে ১০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। অবাক করা ব্যাপার হলেও সত্য, আধুনিক যুগে কার্বন ডেটিং এর ফলাফলও সুকেনিকের অনুমানকে সমর্থন করে।

কিন্তু কারা এই পাণ্ডুলিপিগুলো সংকলন করেছিলেন, এ নিয়ে এখন পর্যন্ত বিতর্কে লিপ্ত আছেন গবেষকরা। অনেকের মতে, রোমান বাহিনীর হাতে কুমরান এলাকা পতনের পূর্বে এখানে বসবাসরত ইহুদিদের দ্বারা এগুলো সংকলিত। তখন ইহুদিদের চারটি বড় গোত্রের মধ্যে ইসেন সম্প্রদায়ের পণ্ডিতগণ এগুলো সংকলন করেন বলে ধারণা করা হয়। রোমানদের আক্রমণের পর সেগুলো এই গুহার মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয় এবং এটাকে ‘মিনি পাঠাগার’ হিসেবে ব্যবহার করেন ইহুদি ধর্মানুসারীরা।

মহামূল্যবান ডেড সী স্ক্রলের একটি পাণ্ডূলিপি।

এছাড়া বাকি গোত্রদেরও বাদ দেয়া হয়নি সম্ভাব্য সংকলকের তালিকা থেকে। আবার অনেকের মতে, এগুলো সকলের সম্মিলিত প্রয়াস। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো মেলেনি।

ইসরাইল বিতর্ক এবং স্ক্রোলের পাঠোদ্ধার

বেদুইনদের ব্যবসার সুবাদে ততদিনে স্ক্রোল ছড়িয়ে গেছে বিভিন্ন দেশের গবেষকদের কাছে। যদিও সিংহভাগ স্ক্রোল জর্ডান এবং ইসরাইলের হস্তগত ছিল, কিন্তু বাকিরাও হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন না। বড় বড় গবেষকরা বিভিন্ন তথ্য উদ্ধার করতে লাগলেন স্ক্রোল ঘেঁটে।

তবে সেগুলো একই তথ্য বিভিন্ন রূপে জানানো ছাড়া তেমন কোন ঝড় তুলতে পারেনি বিশ্ব দরবারে। এক্ষেত্রে ইসরাইলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন সবাই।

অপরদিকে ইসরাইলে তখন গবেষকদের মধ্যে প্রশাসনিক কারণে কলহ চলছিল। ড. জন স্ত্রাঙ্গলের নেতৃত্বে হাতেগোণা কয়েকজন গবেষক ছাড়া আর কেউ স্ক্রোল নিয়ে কাজ করার অনুমতি পাননি। এমনকি স্ক্রোল সম্পর্কিত আলোকচিত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও ছিল কড়াকড়ি। ১৯৭৭ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গেজা ভারমেস এটাকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় একাডেমিক কেলেঙ্কারি বলেন।

অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পাঠোদ্ধার করছেন এক তরুণ গবেষক।

তৎকালীন শীর্ষ গবেষক হার্শেল শ্যাঙ্কস প্রায় তিন দশক ধরে এ নিয়ে আইনী লড়াই করেন। দীর্ঘদিনের লড়াই শেষে ১৯৯১ সালে ইসরাইলের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগীয় প্রধান ইমানুয়েল তভ সর্বপ্রথম স্ক্রোল গবেষণার ফল এবং পাণ্ডুলিপি অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীদের জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা করেন।

এরপর ঝিমিয়ে পড়া গবেষকদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা দেখা গেল। কাজে লেগে পড়লেন সবাই। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বদৌলতে দ্রুত বেশিরভাগ পাণ্ডুলিপির পাঠ পুনরোদ্ধার সম্ভব হলো। এক এক করে প্রকাশিত হতে থাকলো সকল স্ক্রোলের মার্জিত পাণ্ডুলিপি।

সমস্ত পাণ্ডুলিপিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়- বাইবেলিক এবং নন-বাইবেলিক। এর মধ্যে ১০ কপি ঈসায়ী, ৩০ কপি শামের কিতাব এবং ২৫ কপি দ্বিতীয় বিবরণ সম্পর্কিত হিব্রু দলিল রয়েছে। গবেষকদের মতে, স্ক্রোলগুলো মূলত হিব্রু বাইবেলের পান্ডুলিপি হলেও সম্পূর্ণ বাইবেলের The Book of Esther অধ্যায়ের কোনো পান্ডুলিপি এর মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

নতুন টেস্টামেন্টের ঈসায়ী থেকে এগুলো ১০০০ বছর পুরাতন। তবে যিশুখ্রিস্টের আগমনবার্তা সম্পর্কিত জশুয়ার ভবিষ্যদ্বাণী হিব্রু শামের কিতাবে রয়েছে, যা এর আগে কোথাও দেখা যায়নি। ওল্ড টেস্টামেন্টের অনেক দূর্লভ ও হারিয়ে যাওয়া তথ্য এই স্ক্রোলের মাধ্যমে জানা সম্ভব হয়েছে। এ থেকে অনেকে ধারণা করেন, খ্রিস্টধর্মের শুরু হয়েছে এই স্ক্রোলগুলোর মাধ্যমে। তবে এই বিষয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ বিতর্ক চললেও সঠিকভাবে কোন কিছু জানা যায়নি।

আর নন-বাইবেলিক অংশে বিভিন্ন আইন-কানুন, রীতিনীতি, ব্যবসায়িক কাগজপত্র এবং কিছু ব্যক্তিগত পুঁথি রয়েছে। গবেষকদের মতে, কুমরান গুহার বিরানভূমি আগে ঠিক এরকম ছিল না। এখানে বড় সম্প্রদায় বাস করতো। কুমরান নামে গোটা একটা সভ্যতার অস্তিত্বের কথা জানা যায় স্ক্রোল থেকে।

এছাড়া ১৬টি সামরিক চিঠিপত্র পাওয়া যায়, যেগুলো বার কুখবা নামে পরিচিত। ‘বাবাথা’ নামক এক ইহুদির ব্যক্তিগত নথি সম্বলিত কয়েকটি পাণ্ডুলিপিও পাওয়া যায়। নব্যপ্রস্তর যুগের বিভিন্ন হাতিয়ারের অংশবিশেষও উদ্ধার করা হয় বলে জানান গবেষকরা।

প্রায় ৪০% এর মতো স্ক্রোল থেকে পাঠোদ্ধার করা অসম্ভব বলে জানান ইসরাইলি গবেষকগণ। ১৯৯১ সালের নভেম্বর মাসে Biblical Archaeological Society প্রথমবারের মতো পাণ্ডুলিপি বিষয়ক প্রদর্শনীর আয়োজন করে। তবে ১৯৯৪ এর শেষের দিকে ইসরাইলি পুরাতত্ত্ববিদরা পরীক্ষার মাধ্যমে কিছু গ্রিক পাণ্ডুলিপি কুমরান সম্প্রদায় বহির্ভুত বলে নিশ্চিত হন। তবে সেগুলো ঠিক কোন উদ্দেশ্যে সেখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, তার উত্তর এখনো বের করা সম্ভব হয়নি।

সতর্কতার সাথে ভেঙে যাওয়া অংশ জোড়া লাগানো হচ্ছে।

ইসরাইল প্রদত্ত ছবি নিয়ে হান্টিংটন লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ প্রথম কম্পিউটার অ্যানালাইসিস সম্পাদন করেন। এর মাধ্যমে দুর্বোধ্য অনেক পাণ্ডুলিপির নিখোঁজ অংশের সম্ভাব্য পাঠোদ্ধার সম্পন্ন করা হয়।

ডেড সী স্ক্রোলের পাঠোদ্ধারের মাধ্যমে ওল্ড টেস্টামেন্টের অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসে, যা র‍্যাবাই তত্ত্ব এবং জুডাতত্ত্বের নতুন দিক উন্মোচন করে। যিশুখ্রিস্টের আগমন এবং প্রাথমিক খ্রিস্টান ধর্মের অনেক অজানা তথ্যও জানা যায়। প্রাচীন ইহুদি ধর্মের সাথে খ্রিস্টানদের ওল্ড টেস্টামেন্ট এর সূক্ষ যোগসূত্রতাও পাওয়া যায় এগুলো থেকে।

রহস্যময় কপার স্ক্রোল এবং গুপ্তধনের সন্ধান

ধর্মীয় স্ক্রোলগুলো ইসরাইলিদের হাতে থাকলেও সবচেয়ে রহস্যময় স্ক্রোল তখন জর্ডানীদের হস্তগত ছিল। অন্যান্য স্ক্রোলের মতো তা প্যাপিরাস পাতা বা চামড়ার উপর লিখিত ছিল না। সেটা লেখা হয়েছিল তামার তৈরি পাতের উপর। যাকে ইতিহাসবিদগণ The Copper Scroll নামে চিনেন

একে পাণ্ডুলিপি বললেও ভুল হবে। কারণ এর মাঝে লেখার সাথে আছে খোদাই করা কয়েকটি মানচিত্র। আসলে এটা ছিল একাধিক গুপ্তধনের নকশা। ১৯৫২ সালে অনুসন্ধান অভিযানের সময় এক জর্ডানী পুরাতত্ত্ববিদ ৩ নং গুহার ভেতর থেকে এটি উদ্ধার করেন।

জাদুঘরে কাঁচের ক্যাবিনেটে রক্ষিত রহস্যময় কপার স্ক্রোল।

জর্ডান সরকার তখন কড়া নিরাপত্তায় স্ক্রোলটিকে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যালেগ্রো-এর নিকট প্রেরণ করেন। অ্যালেগ্রো পরীক্ষার মাধ্যমে বুঝতে পারেন স্ক্রোলটি একটি গুপ্তধনের মানচিত্র। তিনি তৎক্ষণাৎ স্ক্রোলের রহস্য সমাধানে লেগে যান। পরবর্তীতে জর্ডান সরকারের নির্দেশে ১৯৬০ সালে অ্যালেগ্রোর গবেষণার ফলাফল জার্নাল আকারে প্রকাশ করা হয়।

অ্যালেগ্রোর জার্নালে ঢুঁ মেরে জানা যায় যে, স্ক্রলে মোট ৬৩ টি স্থানের নির্দেশনা রয়েছে। স্ক্রোলের ভাষ্যমতে সেগুলো সোনা আর রুপা বোঝাই করা কুঠুরি, যার সর্বমোট পরিমাণ কয়েক টনের কাছাকাছিও যেতে পারে। স্ক্রোলটি যেন বছরের পর বছর টিকে থাকে সেজন্য এটা তামার পাতের উপর লেখা হয় বলে জানান অ্যালেগ্রো।

স্ক্রোলের নির্দেশনায় স্পষ্টাকারে স্থানগুলোর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কপার স্ক্রোল থেকে হুবহু অনুবাদ করা আলোচিত একটি লাইন তুলে ধরলাম, “যেখানে লবণের স্তূপ, সেখান থেকে প্রথম সিঁড়ির নিচে চার হাত গভীরে ৪১ টালি রূপা”।

আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে সহজ মনে হলেও গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া এতো সহজ নয়। কারণ, মানচিত্রের এসব নির্দেশনা তখনকার গুহাবাসীদের জন্য লেখা হয়েছিল। কেউ নিজের ঘরের মতো গুহাগুলোকে না চিনলে, তার পক্ষে এই অবস্থানগুলো বের করা প্রায় অসম্ভব। তাই, এখনকার কারো জন্য এত সহজ নয় এর সন্ধান করা। উপরন্তু স্ক্রোল মোতাবেক গুপ্তধনের প্রথম অবস্থানের সাথে বাকিগুলোর যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই প্রথম অবস্থানই বের করা সম্ভব হয়ে উঠেনি

কপার স্ক্রোলের একাংশ।

তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, দুই হাজার বছর আগেই রোমানরা হয়তো সকল গুপ্তধন লুট করে ফেলেছেন। এর পক্ষে প্রমাণও দিয়েছেন অনেকেই। কিন্তু এই প্রমাণ কি আর অনুসন্ধান থামাতে পারে! এখনো সবধরনের সূত্র নিয়ে পরীক্ষা করে যাচ্ছেন পুরাতত্ত্ববিদরা।

আর এই মহামূল্যবান কপার স্ক্রোল নিয়ে সাহিত্যকরাও মনের মাধুরী মিশিয়ে আপন কল্পনার মাধ্যমে রোমাঞ্চকর অভিযান পরিচালনা করে রচনা করেছেন বেশ কিছু উপন্যাস। এর মধ্যে Nathaniel Norsen Weinreb এর The Copper Scroll এবং Lionel Davidson এর A long way to Shiloh বিখ্যাত।

মালিকানা বিরোধ

প্রথমদিকে ধর্মীয় স্ক্রোল মনে হলেও কপার স্ক্রোলের সন্ধান আরো রোমাঞ্চকর রহস্যের হাতছানি দিচ্ছে ইতিহাসবিদদের। এরই জের ধরে ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় ইসরাইল জর্ডান থেকে প্রায় ১৫০০ এর মতো স্ক্রোল নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। ইসরাইলের রকফেলার জাদুঘরে কড়া নিরাপত্তায় শুরু হয় গবেষণা।

সবচেয়ে বড় বিতর্ক শুরু হয় যখন ইসরাইল স্ক্রোলগুলোর অনুবাদ প্রকাশ করতে দীর্ঘ ৪০ বছর বিলম্ব করে। এদিকে জর্ডান সরকারও বসে থাকেনি। তারাও বরাবরই জর্ডানকে স্ক্রোলগুলোর বৈধ মালিক হিসেবে দাবি করে আসছে।

কানাডায় ডেড সী স্ক্রোল প্রদর্শনীর একটি কেবিনেট।

বর্তমানে জর্ডানের দখলে রয়েছে কপার স্ক্রোলসহ মাত্র ২৫টি স্ক্রোল! এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফিলিস্তিন, কানাডা এবং সিরিয়ার বিভিন্ন গবেষণাগার এবং প্রতিষ্ঠানের নিকট বেশ কয়েকটি স্ক্রোল হস্তগত আছে।

অপরদিকে সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘ নিরাপত্তা নীতির ২৩৩৪ অনুশাসনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র Veto প্রদান না করায়, ইসরাইল স্ক্রোলগুলোর অধিকার হারাতে পারেন বলে মনে করেন টাইমস অফ ইসরাইলের বিশেষজ্ঞরা। তবে স্ক্রোলের ব্যাপারে ইসরাইলের মাত্রাতিরিক্ত গোপনীয়তা ব্যাপারটিকে রহস্যময় করে তুলেছে।

২০১০ সালে জর্ডান সরকার কানাডায় ইসরাইল আয়োজিত স্ক্রোল প্রদর্শনী বয়কট করে এবং সেগুলো পুনরায় দখলে নেওয়ার সংকল্প জানায়। বর্তমানে জর্ডান, ইসরাইল , ফিলিস্তিন , কানাডা এবং সিরিয়া স্ক্রোলগুলোর মালিকানার বিষয়ে স্নায়ুযুদ্ধে লিপ্ত আছে, যা সমাধা হওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখেন না বিশেষজ্ঞরা।

টাইম ম্যাগাজিনের মতে, ডেড সী স্ক্রোল ইতিহাসের অন্যতম সেরা অনুসন্ধান। রাজনৈতিক বিরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া খ্যাত ইসরাইলের অতিমাত্রায় গোপনীয়তার কারণে উন্মুক্ত বিশ্ব বঞ্চিত হচ্ছে অজানা সব রোমাঞ্চকর তথ্য থেকে।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইল অনুসন্ধানকারী দল ১২ নং গুহার সন্ধান পান বলে দাবি করেন। এর মাধ্যমে গবেষণায় এক নতুন সম্ভাবনার দেখা দেয়। কিন্তু এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি কর্তৃপক্ষ

যতই দিন গড়াচ্ছে, ততই ঘনীভূত হয়ে পড়ছে রহস্য। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিচরণের যুগে ইসরাইলের এরূপ মনোভাব নিন্দাজনক। তবে আশা করা যায়, ভবিষ্যতে কোন তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপে হয়তো এই সমস্যার সমাধান হবে এবং বিশ্বদরবারে উন্মোচিত হবে স্ক্রোলের রহস্য।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স: ১. Dead Sea Scrolls: The Living Manuscripts of the Dead Sea – মূল গবেষণা প্রবন্ধ। ২. Israel Antiquities Authority (IAA) – ডিজিটাল লাইব্রেরি আর্কাইভ। ৩. Biblical Archaeological Society – বিশেষ প্রদর্শনী রিপোর্ট। ৪. ‘ইতিহাসের সন্ধানে’ (টক-শো) – মধ্যপ্রাচ্যের প্রত্নতাত্ত্বিক রাজনীতি বিষয়ক পর্ব।

সম্পাদনায়: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

বুয়েট

নিউজ ডেস্ক

May 5, 2026

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক | ৩০ এপ্রিল ২০২৬

ঢাকা: বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) কেবল তার অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষের জন্যই নয়, বরং তার ভৌগোলিক অবস্থানের পেছনে থাকা সুদীর্ঘ ইতিহাসের জন্যও আলোচিত। বুয়েট ক্যাম্পাসের একটি বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবে শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তির সাথে যুক্ত, যা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে আইনি ও সাংস্কৃতিক আলোচনা বিদ্যমান。

ঐতিহাসিক পটভূমি: বিশাল দেবোত্তর সম্পত্তি

শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী মন্দির ঢাকার অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা。 আদি যুগে এই মন্দিরের সীমানা এবং দেবোত্তর সম্পত্তির পরিমাণ ছিল বিশাল。 ব্রিটিশ আমল এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে পর্যন্ত মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ ও ধর্মীয় কাজের জন্য মাইলের পর মাইল বিস্তৃত খোলা জমি, বাগান এবং পুকুর উৎসর্গ করা হয়েছিল。

বুয়েট ক্যাম্পাসের সম্প্রসারণ ও জমি অধিগ্রহণ

১৯৫০-এর দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার জনস্বার্থে এবং শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করে。 এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তির একটি বড় অংশ রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিগ্রহণ করা হয়। বুয়েট ক্যাম্পাসের বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিম দিকের এলাকা এবং তৎসংলগ্ন আবাসিক হলগুলোর জমি একসময় ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মালিকানাধীন ছিল。

ক্ষতিপূরণ ও আইনি বিতর্ক

জমির ক্ষতিপূরণ বা বাজারমূল্য পরিশোধের বিষয়টি আজও একটি অমীমাংসিত ঐতিহাসিক অধ্যায়。

  • সরকারি নথিপত্র: তৎকালীন ভূমি অধিগ্রহণ আইন (Land Acquisition Act)-এর অধীনে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে জমিটি নেওয়া হয়েছিল এবং নিয়মানুযায়ী একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্ষতিপূরণ বরাদ্দ করা হয়。
  • অস্পষ্টতা: ঐতিহাসিকদের মতে, তৎকালীন সময়ে মন্দিরের সেবায়েতরা সেই ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করেছিলেন কি না বা সেই মূল্যটি তৎকালীন বাজারদরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট অস্পষ্টতা রয়েছে。
  • ধর্মীয় আইনি অবস্থান: হিন্দু সম্প্রদায়ের দাবি অনুযায়ী, দেবোত্তর সম্পত্তি হস্তান্তর করা ধর্মীয় আইনের পরিপন্থী এবং এই জমিগুলো যথাযথ ক্ষতিপূরণ ছাড়াই বা নামমাত্র মূল্যে নেওয়া হয়েছিল。

বর্তমান বাস্তবতা ও পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া

ঢাকেশ্বরী মন্দির কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেছে。 ১. জমি পুনরুদ্ধার: ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দফায় দফায় প্রায় ১.৫ বিঘা জমি সরকার মন্দির কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়েছে。 ২. অ্যাকাডেমিক অবকাঠামো: বুয়েট বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে যাওয়া মূল ক্যাম্পাস এলাকার জমিগুলো আর ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়নি, কারণ সেখানে এখন স্থায়ী অ্যাকাডেমিক অবকাঠামো বিদ্যমান。 ৩. বিকল্প সুবিধা: সরকার বিভিন্ন সময়ে মন্দিরের উন্নয়নে অনুদান এবং বিকল্প সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আসছে。


তথ্যসূত্র: ১. ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও ঢাকেশ্বরী মন্দির সংরক্ষণ রিপোর্ট ২. ভূমি অধিগ্রহণ আইন ও দেবোত্তর সম্পত্তি বিষয়ক নথিপত্র ৩. বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের ঐতিহাসিক স্মারকলিপি

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

বাংলাদেশের অবকাঠামো কি পাকিস্তান আমলেরই দান?

নিউজ ডেস্ক

May 4, 2026

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন | ৩০ এপ্রিল ২০২৬ অনুসন্ধানী ডেস্ক

ঢাকা: দীর্ঘ ৫৪ বছরের স্বাধীন পথচলায় বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বুদ্ধিজীবী মহল, বিভিন্ন টকশো এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে আসছে— বাংলাদেশের প্রকৃত অবকাঠামোগত ভিত্তি কি পাকিস্তান আমলেই স্থাপিত হয়েছিল? ব্রিটিশদের ২০০ বছরের অবজ্ঞা এবং পরবর্তী ২৪ বছরের পাকিস্তান আমলের উন্নয়নের পরিসংখ্যান বর্তমান প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের এক নতুন দুয়ার খুলে দিচ্ছে।

গত ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদরা যখন বাংলাদেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের গোড়াপত্তন নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন উঠে আসে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। সেই আলোচনার সূত্র ধরে এবং ঐতিহাসিক নথিপত্র বিশ্লেষণ করে আমাদের আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।

১. ব্রিটিশ আমলের অবজ্ঞা ও কলকাতার ‘দাদা-বাবু’ সংস্কৃতি

১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭—এই ১৯০ বছরে ব্রিটিশরা পূর্ব বাংলাকে কেবল কাঁচামাল সংগ্রহের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছে। কলকাতার প্রভাবশালী ‘দাদা-বাবু’ বা এলিট শ্রেণি কখনোই চায়নি ঢাকা বা পূর্ব বাংলা উন্নত হোক।

  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২১): ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর পূর্ব বাংলার মুসলমানদের শান্ত করতে ১৯১২ সালে লর্ড হার্ডিঞ্জ এটি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন।
    • ইতিহাস ও বিরোধিতা: এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কলকাতার প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী মহল। তাদের যুক্তি ছিল, পূর্ব বাংলার কৃষিনির্ভর মানুষের জন্য উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নেই। কলকাতার তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জি পর্যন্ত এর বিপক্ষে ছিলেন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯২১ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই ছিল ব্রিটিশ আমলের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়।

২. পাকিস্তান আমলের ২৪ বছর: উচ্চশিক্ষার মহাবিপ্লব

ইতিহাস আমাদের শেখায় পাকিস্তান ২৪ বছর শোষণ করেছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের আধুনিক উচ্চশিক্ষা ও প্রকৌশল খাতের মেরুদণ্ড এই ২৪ বছরেই তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের ইতিহাস:

পাকিস্তান আমলে মোট ৫টি বড় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়:

  1. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৩): উত্তরবঙ্গের মানুষের প্রাণের দাবি মেটাতে ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ড. ইতরাত হোসেন জুবেরী ছিলেন এর প্রথম উপাচার্য।
  2. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৬): প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে পরিচিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর কার্যক্রম শুরু করে।
  3. জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭০): দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এটি ঢাকার অদূরে সাভারে প্রতিষ্ঠিত হয়।
  4. জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৮): মূলত ১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ কলেজকে ১৯৬৮ সালে সরকারিকরণ করা হয়, যা আজ পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়।
  5. বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬১): ময়মনসিংহে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষা:

বর্তমানে বাংলাদেশে ৫টি প্রধান সরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যার ৪টিই (৮০%) পাকিস্তান আমলের অবদান।

  • বুয়েট (BUET – ১৯৬২): ১৮৭৬ সালের সার্ভে স্কুল থেকে ১৯৬২ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়।
  • রুয়েট (১৯৬৪), চুয়েট (১৯৬৮), কুয়েট (১৯৬৯): এই আঞ্চলিক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলো পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে নির্মিত হয়। পরবর্তী ৫০ বছরে বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র ১টি নতুন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)।

৩. চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্য খাতের গোড়াপত্তন

ব্রিটিশদের ২০০ বছরে মাত্র ১টি মেডিকেল (ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ১৯৪৬) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিপরীতে পাকিস্তান আমলে ৮টি সরকারি মেডিকেল কলেজ তৈরি হয়।

নাম ও ইতিহাস:

  1. চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (১৯৫৭): বন্দর নগরীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল কাম কলেজ।
  2. রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (১৯৫৮): উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্যসেবার প্রাণকেন্দ্র।
  3. ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (১৯৬২): ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে প্রতিষ্ঠিত এক ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান।
  4. সিলেট এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ (১৯৬২): তৎকালে সিলেট মেডিকেল কলেজ নামে পরিচিত ছিল।
  5. স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (১৯৬৩): মিডফোর্ড হাসপাতালের ওপর ভিত্তি করে এটি গড়ে ওঠে।
  6. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক IPGMR – ১৯৬৬): স্নাতকোত্তর চিকিৎসা গবেষণার জন্য এটি পাকিস্তান আমলেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
  7. শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (১৯৬৮): দক্ষিণবঙ্গের মানুষের আস্থার প্রতীক।
  8. রংপুর মেডিকেল কলেজ (১৯৭০): পাকিস্তান আমলের শেষ বড় উপহার।

৪. বিশেষায়িত ও কারিগরি শিক্ষা

পাকিস্তান আমলে কারিগরি শিক্ষায় যে জোয়ার এসেছিল, তা স্বাধীনতার পরের ৫০ বছরে অনেকটা ম্লান।

  • পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট: পাকিস্তান সরকার ২৪ বছরে ১৭টি পলিটেকনিক করেছিল। বাংলাদেশ ৫০ বছরে করেছে ৩২টি।
  • ক্যাডেট কলেজ: ফৌজদারহাট (১৯৫৮), মির্জাপুর (১৯৬৩), ঝিনাইদহ (১৯৬৩) এবং রাজশাহী (১৯৬৫)—এই ৪টি ঐতিহাসিক ক্যাডেট কলেজ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়।
  • বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি (১৯৬২): নৌ-অফিসার ও ইঞ্জিনিয়ার তৈরির জন্য এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক বুটেক্স – ১৯৫০): এটি ‘ইস্ট পাকিস্তান টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট’ হিসেবে যাত্রা শুরু করে।

৫. শিল্পায়ন ও ভারী অবকাঠামো

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির প্রধান শক্তিগুলো পাকিস্তান আমলের পরিকল্পনার ফসল।

  • শিল্পনগরী: তেজগাঁও, হাজারীবাগ এবং খালিশপুর শিল্প এলাকা পাকিস্তান আমলে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়।
  • আদমজী জুট মিল (১৯৫১): নারায়ণগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বের বৃহত্তম পাটকল।
  • চন্দ্রঘোনা পেপার মিল (১৯৫৩): এশিয়ার বৃহত্তম কাগজ কল।
  • ইস্টার্ন রিফাইনারি (১৯৬৮): দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার যা আজও সচল।
  • জাতীয় স্থাপনা: সংসদ ভবন, সচিবালয়, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, কুর্মিটোলা বিমানবন্দর (বর্তমান শাহজালাল) এবং বাইতুল মোকাররম মসজিদ—প্রতিটিই পাকিস্তান আমলের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা।

৬. পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ: বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা

১৯৭১-এর যুদ্ধের পর পাকিস্তান ‘ঘাস খেয়ে হলেও’ পারমাণবিক বোমা তৈরির শপথ নিয়েছিল। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলছে।

  • পারমাণবিক অস্ত্র: ১৭০টি ওয়ারহেড এবং শাহীন-৩ (২৭৫০ কিমি পাল্লার) মিসাইল নিয়ে পাকিস্তান এখন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
  • বিমান বাহিনী: জেএফ-১৭ থান্ডার এবং জে-১০সি নিয়ে তারা বিশ্বের সপ্তম শক্তিশালী বাহিনী। সৌদি আরবের নিরাপত্তার দায়িত্বও তাদের ওপর ন্যস্ত।
  • কূটনীতি: বর্তমানে পাকিস্তান ইরান ও আমেরিকার মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘বিগ প্লেয়ার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বিপরীতে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে তথাকথিত ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নিয়ে যতটা মাতামাতি করেছে, অবকাঠামোগত স্বনির্ভরতা ও আধুনিকায়নে কি ততটা এগোতে পেরেছে? আজ সংসদে আধুনিকতা বড় নাকি চেতনা বড়—তা নিয়ে শত শত অধিবেশন পার হয়ে যাচ্ছে।

উপসংহার ও পর্যালোচনা

ইতিহাস কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়। ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শোষণ এবং ২৪ বছরের পাকিস্তান আমলের বৈষম্যের গল্প যেমন সত্য, তেমনি এই অঞ্চলের আধুনিক অবকাঠামোর গোড়াপত্তন যে পাকিস্তান আমলেই হয়েছিল—তাও অস্বীকার করার উপায় নেই। ব্রিটিশ আমলে যেখানে মাত্র ১২% শিক্ষিত ছিল, পাকিস্তান আমলে তা দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করে।

আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমাদের মূল্যায়ন করা উচিত, আমরা কি কেবল আগের আমলের করা প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করেই দায়িত্ব শেষ করছি, নাকি নতুন প্রজন্মের জন্য প্রকৃত আধুনিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে পারছি?

তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা: ১. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ঐতিহাসিক ডাটা। ২. ড. এম.এ. রহিম, বাংলাদেশের ইতিহাস (১৭৫৭-১৯৭১)। ৩. আল-জাজিরা ও এনডিটিভি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা রিপোর্ট ২০২৬। ৪. বিগত ২৬-২৮ এপ্রিল ২০২৬-এর টেলিভিশন টকশো ‘ইতিহাসের সত্য’।

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ভিত্তি থেকে শিখরে

নিউজ ডেস্ক

May 3, 2026

শেয়ার করুন

বিডিএস নিউজ ডেস্ক | ৩০ এপ্রিল ২০২৬

ঢাকা: একটি জাতিরাষ্ট্রের উন্নয়ন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাসের এক ধারাবাহিক পরিক্রমা। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যখন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে সমৃদ্ধির পরবর্তী ধাপে পা রাখছে, তখন ইতিহাসের ধূলো ঝেড়ে আলোচনা উঠছে—আজকের এই আধুনিক অবকাঠামোর গোড়াপত্তন ও বিকাশের নেপথ্য কারিগর কারা? ১৯৪৭-এর দেশভাগ থেকে ১৯৭১-এর মুক্তি সংগ্রাম এবং বর্তমানের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’—প্রতিটি অধ্যায়ই একে অপরের পরিপূরক।

১. প্রাতিষ্ঠানিক গোড়াপত্তন: পাকিস্তান আমলের উত্তরাধিকার (১৯৪৭–১৯৭১)

ব্রিটিশদের ২০০ বছরের শাসনামলে পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ) শিক্ষা ও অবকাঠামোতে চরম অবহেলার শিকার ছিল। ১৯২১ সালে অনেক বাধা পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরে এ অঞ্চলে উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি কাঠামোর ব্যাপক বিস্তার ঘটে।

  • শিক্ষা ও প্রযুক্তি: বর্তমানের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠগুলোর বড় অংশই পাকিস্তান আমলের অবদান। ৪টি প্রধান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট, রুয়েট, চুয়েট ও কুয়েট) এবং গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ও মেডিকেল কলেজগুলো ১৯৪৯ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ইস্ট পাকিস্তান টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট’ (বর্তমান বুটেক্স) ছিল এ অঞ্চলের বস্ত্র শিল্পের প্রথম সোপান।
  • নগরায়ন ও স্থাপত্য: কমলাপুর রেলস্টেশন, শেরেবাংলা নগরের সেকেন্ড ক্যাপিটাল পরিকল্পনা, এমনকি যমুনা সেতুর প্রাথমিক প্রশাসনিক অনুমোদন (১৯৬৬) পাকিস্তান আমলেই সম্পন্ন হয়েছিল। ঢাকা জাদুঘর থেকে শুরু করে ধানমন্ডি-বনানীর মতো আবাসিক এলাকার পত্তনও ওই সময়েই ঘটে।
  • শিল্পায়ন: আদমজী জুট মিল, কর্ণফুলী পেপার মিল এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির মতো ভারী শিল্পগুলো এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড তৈরি করেছিল।

২. স্বনির্ভরতার যুদ্ধ: ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে ‘উদীয়মান বাঘ’

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ এক প্রায় অসম্ভব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। তৎকালীন অনেক অর্থনীতিবিদ হতাশাবাদ ব্যক্ত করলেও, গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ নিজেকে বিশ্বমঞ্চে এক ‘উন্নয়ন বিস্ময়’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

  • খাদ্য ও কৃষি: পাকিস্তান আমলে যে অঞ্চল খাদ্য ঘাটতিতে ছিল, আজ ১৮ কোটি মানুষের দেশে বাংলাদেশ ধান, মাছ ও সবজি উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি।
  • অবকাঠামোগত বিপ্লব: নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। এছাড়া মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশটিকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পথে নিয়ে যাচ্ছে।
  • পোশাক শিল্প ও সামাজিক সূচক: বিশ্ব বাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক হিসেবে বাংলাদেশ আজ অজেয়। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সূচকে অনেক ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোকেও বাংলাদেশ পেছনে ফেলেছে।

৩. ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ভিন্ন পথ

বর্তমান ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ দুটি ভিন্ন ধারায় উন্নয়ন করেছে। পাকিস্তান সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে শক্তিশালী হয়েছে। তাদের রয়েছে অত্যাধুনিক পারমাণবিক অস্ত্রাগার (শাহীন-৩, গৌরী মিসাইল) এবং চীনের সহযোগিতায় তৈরি শক্তিশালী বিমান বাহিনী। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সামরিক শক্তির চেয়ে অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

৪. ব্রিটিশ বনাম উত্তর-স্বাধীনতা যুগ: একটি পরিসংখ্যানগত পাঠ

ব্রিটিশদের ২০০ বছরে যেখানে মাত্র ১টি বিশ্ববিদ্যালয় ও ১টি মেডিকেল কলেজ ছিল, সেখানে বর্তমানে বাংলাদেশে ১৬০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শতাধিক মেডিকেল কলেজ রয়েছে। পাকিস্তান আমলে স্বাক্ষরিত হওয়া ১৭টি পলিটেকনিকের বিপরীতে আজ ৪৯টি সরকারি পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠান কারিগরি শিক্ষা দিচ্ছে।


বিশ্লেষকের পর্যবেক্ষণ

উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। ১৯৪৭-এর পর যে অবকাঠামোগত বীজ বপন করা হয়েছিল, ১৯৭১-এর স্বাধীনতার পর তাকে আধুনিক প্রযুক্তি ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে আজকের মহীরুহে পরিণত করেছে এ দেশের মানুষ। পাকিস্তান আমলের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি হয় ‘ভিত্তি’, তবে স্বাধীন বাংলাদেশের অর্জন হলো সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আকাশ ছোঁয়ার এক ‘সাফল্য গাঁথা’।


তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স (Reference List):

  1. ঐতিহাসিক দলিল: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং ঐতিহাসিক শিক্ষা গেজেট।
  2. বই: ‘বাংলাদেশ: উন্নয়নের বিস্ময়’ – আতিউর রহমান।
  3. বই: ‘The Economy of Pakistan’ – বিভিন্ন গবেষক (ঐতিহাসিক তথ্য)।
  4. নিবন্ধ: ‘Social Development in Bangladesh’ – অমর্ত্য সেন (২০১৩/২০১৫ বক্তৃতা)।
  5. আন্তর্জাতিক তথ্য: বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ কান্ট্রি প্রোফাইল ২০২৬।
  6. টকশো: এনটিভি ও সময় টিভির ‘রাজনীতি ও উন্নয়ন’ বিশেষ আলাপচারিতা।

নিউজ ডেস্ক: বিডিএস ডিজিটাল মিডিয়া

সার্বিক তত্ত্বাবধানে: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com

২৫শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ