ইতিহাস
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ভূমিকা: বাংলা সাহিত্যের এক নিবেদিত প্রাণ
আজ, ৩ নভেম্বর, বাংলার সাহিত্য ও গবেষণার জগতে এক অবিস্মরণীয় নাম, আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন-এর শুভ জন্মতিথি। তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ এবং বাংলা লোকসাহিত্য উদ্ধার ও সংরক্ষণের মহান কারিগর। তিনি কেবল গ্রন্থ প্রণয়ন করেননি, বরং প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্য ও সাহিত্যকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর কাজ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে এক নতুন দিগন্ত দিয়েছে।
১. একজন পথিকৃৎ গবেষকের উত্থান
দীনেশচন্দ্র সেনের প্রাথমিক জীবন শুরু হয় সাধারণ পরিবেশে। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ঢাকা জেলার সুয়াপুর গ্রামে এবং জন্ম মাতুলালয়ে, মানিকগঞ্জ জেলার বগজুরি গ্রামে। পিতা ঈশ্বরচন্দ্র সেন ছিলেন মানিকগঞ্জ আদালতের উকিল।
- শিক্ষাজীবন: জগন্নাথ স্কুল থেকে এনট্রান্স (১৮৮২) এবং ঢাকা কলেজ থেকে এফ.এ (১৮৮৫) পাসের পর, বহিরাগত ছাত্র হিসেবে তিনি ১৮৮৯ সালে বি.এ ডিগ্রি লাভ করেন।
- কর্মজীবনের সূচনা: ১৮৮৭ সালে সিলেটের হবিগঞ্জ স্কুলে কর্মজীবন শুরু করে তিনি পরবর্তীতে কুমিল্লার শম্ভুনাথ ইনস্টিটিউশন (১৮৮৯) ও ভিক্টোরিয়া স্কুলের (১৮৯০) প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।
২. গবেষণায় দীনেশচন্দ্রের অক্ষয় কীর্তি
কিশোর বয়স থেকেই দীনেশচন্দ্র সেনের সাহিত্য-অনুরাগ এবং দেশের সংস্কৃতির প্রতি গভীর মমতা ছিল, যা তাঁকে অতীতের প্রতি আগ্রহী করে তোলে।
ক. ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ (১৮৯৬)
কুমিল্লায় অবস্থানকালে তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রাচীন বাংলার পুথি সংগ্রহ শুরু করেন। এই ব্যাপক শ্রমসাধ্য কাজের ফসল হিসেবে ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আকরগ্রন্থ ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের পথিকৃৎ এই সুশৃঙ্খল ও ধারাবাহিক গবেষণাগ্রন্থটি প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনা করে। এ অসাধারণ গ্রন্থের মাধ্যমে দীনেশচন্দ্র সেন এ বিষয়ে ‘পথিকৃৎ’-এর সম্মান ও পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি লাভ করেন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ সমকালের পণ্ডিতদের প্রশংসা অর্জন করেন।
খ. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯০৫-১৯৩২)
দীনেশচন্দ্রের মেধা ও গবেষণার গভীরতা তাঁকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করে।
- পরীক্ষক ও রীডার: উপাচার্য স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আহবানে তিনি প্রথমে বিএ পরীক্ষার বাংলা বিষয়ের পরীক্ষক (১৯০৫) এবং পরে রীডার পদে (১৯০৯) নিযুক্তি লাভ করেন।
- ‘History of Bengali Language and Literature’ (১৯১১): এই গ্রন্থটি তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। এর জন্য তিনি পাশ্চাত্যের গবেষক ও সাহিত্য-সমালোচকদের কাছ থেকে ভূয়সী প্রশংসা লাভ করেন।
- বিভাগীয় প্রধান: ১৯২০ সালে যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ নামে একটি নতুন বিভাগ খোলা হয়, তখন তিনি এর প্রধান নিযুক্ত হন। ১৯৩২ সালে অবসর নেওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি যোগ্যতার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করেন।
গ. লোকসাহিত্য উদ্ধার: মৈমনসিংহ-গীতিকা
দীনেশচন্দ্র সেনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান হলো বিলুপ্তপ্রায় লোকসাহিত্য উদ্ধার ও সংরক্ষণ।
- মৈমনসিংহ-গীতিকা ও পূবর্ববঙ্গ-গীতিকা: ১৯১৩ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘রামতনু লাহিড়ী রিসার্চ ফেলোশিপ’ পেয়ে মৈমনসিংহ-গীতিকাসহ পূবর্ববঙ্গ-গীতিকা (চার খন্ড, ১৯২৩-১৯৩২) সংকলন ও সম্পাদনা করেন।
- বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন: এর ইংরেজি ভাষ্য ‘Eastern Bengal Ballads’ (চার খন্ড, ১৯২৩-১৯৩২) প্রকাশের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের সমৃদ্ধ লোকসাহিত্যকে বিশ্ববাসীর সামনে সফলভাবে উপস্থাপন করেন। তাঁর এই কাজ বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়।
৩. সৃজনশীলতা ও আত্মজীবনী
গবেষণার পাশাপাশি সৃজনশীল লেখক হিসেবেও দীনেশচন্দ্র সেনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
- সৃজনশীল কাজ: তাঁর প্রথম গ্রন্থ ছিল ‘কুমার ভূপেন্দ্রসিংহ’ (১৮৯০), যা একটি আখ্যান কাব্য। সব মিলে তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা ৬০-এর বেশি।
- আত্মজীবনী: তাঁর ‘ঘরের কথা ও যুগসাহিত্য’ (১৯২২) গ্রন্থটি বাংলা জীবনী সাহিত্যের ইতিহাসে একটি মূল্যবান সংযোজন। এতে তিনি নিজের বেড়ে ওঠা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতসহ তাঁর সাহিত্যিক জীবনের কথা অত্যন্ত সরল ও মনোহর ভাষায় বিবৃত করেছেন।
- সাংস্কৃতিক ইতিহাস: ‘বৃহৎ বঙ্গ’ (দুই খন্ড, ১৯৩৫) গ্রন্থটি বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস নিয়ে লেখা একটি আকরগ্রন্থ।
৪. সম্মাননা ও স্বীকৃতি
বাংলা সাহিত্য ও গবেষণায় তাঁর অনবদ্য অবদানের জন্য দীনেশচন্দ্র সেন একাধিকবার সম্মানিত হয়েছেন:
- ১৯২১ সালে: ভারত সরকার কর্তৃক ‘রায়বাহাদুর’ উপাধি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিলিট ডিগ্রি লাভ করেন।
- ১৯৩১ সালে: তিনি জগত্তারিণী স্বর্ণপদক লাভ করেন।
৫. প্রধান গ্রন্থসমূহ (এক নজরে)
দীনেশচন্দ্র সেনের প্রধান ও উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থ:
- গবেষণা ও ইতিহাস: বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, বৃহৎ বঙ্গ (১ম ও ২য় খণ্ড), প্রাচীন বাঙ্গলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান, The Vaisnava Literature of Medieval Bengal, History of Bengali Language and Literature।
- লোকসাহিত্য: মৈমনসিংহ গীতিকা, বাংলার পুরনারী, Ramayani Katha, The Folk Literature of Bengal।
- আত্মজীবনী ও প্রবন্ধ: ঘরের কথা ও যুগসাহিত্য, আশুতোষ-স্মৃতিকথা।
উপসংহার: দীনেশচন্দ্রের উত্তরাধিকার
আজ এই মহান মনীষীর জন্মদিনে, আমরা তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য, লোকসাহিত্য রক্ষার নিরলস প্রচেষ্টা এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনায় তাঁর পথিকৃৎ ভূমিকাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। তাঁর কাজগুলো বাংলা ভাষার মূল শেকড়কে শক্তিশালী করেছে এবং ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য দিকনির্দেশনা হয়ে থাকবে।
সূত্র:
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা: দীনেশচন্দ্র সেন আর্কাইভস ও ফেলোশিপ রেকর্ড।
- বাংলাপিডিয়া: আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন নিবন্ধ।
- বাংলাদেশ ও ভারতের ঐতিহাসিক সাহিত্য গবেষণা জার্নাল।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ বিশ্লেষণ: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (সিনিয়র ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিস্ট )
ঢাকা, ১০ এপ্রিল ২০২৬: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টেবিলে বাংলাদেশ এখন এক কুশলী খেলোয়াড়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া সেই কালজয়ী দর্শন—‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’—নীতিকে পুঁজি করে ২০২৬ সালের জটিল বিশ্ব রাজনীতিতেও বাংলাদেশ নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের ‘সবচেয়ে ভালো বন্ধু’ রাষ্ট্র আসলে কে?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, বাংলাদেশ সেই মানুষটির মতো, যে গ্রুপের সবার সাথেই সুসম্পর্ক রাখে। কারণ সে জানে, জীবনে কে কখন কাজে লাগবে তা আগে থেকে বলা কঠিন।
১. ভারত: নাড়ির টানে বাঁধা পুরোনো বন্ধু

ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কটা সেই পুরোনো দিনের। ১৯৭১ সালের কঠিন সময়ে ভারতের অবদান এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন তৈরি করেছে। সীমান্ত ইস্যু বা পানি বণ্টন নিয়ে মাঝেমধ্যে মনোমালিন্য হলেও, দিল্লির সাথে ঢাকার সম্পর্কটি সবসময়ই একটি ‘স্পেশাল’ মর্যাদা পায়। ২০২৬-এর নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এই ঐতিহাসিক টান অটুট রয়েছে।

২. চীন: উন্নয়নের ‘ক্যাশ-রিচ’ পার্টনার

যখনই বড় কোনো অবকাঠামো, ব্রিজ বা টানেলের কথা আসে, তখনই বাংলাদেশের চোখের সামনে ভেসে ওঠে চীনের মুখ। এই বন্ধুটি বেশ হেল্পফুল এবং বড় বড় প্রজেক্টে অর্থায়নে কার্পণ্য করে না। বাংলাদেশ জানে, দেশের উন্নয়নের গতি সচল রাখতে বেইজিংয়ের সাথে অর্থনৈতিক বন্ধুত্বের কোনো বিকল্প নেই।
৩. জাপান: নিঃস্বার্থ ও নীরব কর্মবীর

জাপান হচ্ছে সেই বন্ধু, যে খুব বেশি কথা বলে না কিন্তু একদম কাজের মানুষ। মেট্রো রেল থেকে শুরু করে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর—বাংলাদেশের রূপান্তরের পেছনে জাপানের অবদান অত্যন্ত স্বচ্ছ ও বিতর্কহীন। কোনো ভূ-রাজনৈতিক শর্ত ছাড়াই জাপান সবসময় বাংলাদেশের পাশে থেকেছে।
৪. যুক্তরাষ্ট্র: নিয়মের কড়াকড়ি ও বড় বাজার

যুক্তরাষ্ট্র সেই বন্ধু, যে সবসময় পাশে থাকার আশ্বাস দেয় কিন্তু সাথে একগাদা ‘রুল বুক’ বা নিয়ম ধরিয়ে দেয়। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নে ওয়াশিংটন সবসময়ই একটি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনার প্রেক্ষাপটে ঢাকার সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
বিডিএস পর্যবেক্ষণ (BDS Analysis):
২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ এখন আর কোনো নির্দিষ্ট একটি রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে নেই। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালির উত্তেজনার মাঝে বাংলাদেশ যেভাবে সবার সাথে ব্যালেন্স করছে, তা অসাধারণ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি, চীন-জাপান থেকে বিনিয়োগ এবং পশ্চিমা দেশগুলো থেকে রপ্তানি সুবিধা—সবগুলোকেই বাংলাদেশ সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। সোজা কথায়, বাংলাদেশ এখন ‘স্মার্ট ডিপ্লোম্যাসি’র এক সফল উদাহরণ।
তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা (Sources):
- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (বাংলাদেশ): বৈদেশিক নীতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রেস রিলিজ।
- ডয়েচে ভেলে ও রয়টার্স: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি বিষয়ক প্রতিবেদন (এপ্রিল ২০২৬)।
- মহাসাগরীয় ও কৌশলগত গবেষণা কেন্দ্র: ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান।
- বিডিএস ডিজিটাল এজেন্সি জিওপলিটিক্যাল ডাটা ব্যাংক।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (সিনিয়র ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিস্ট )
আজ ১২ মার্চ ২০২৬। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ক্ষণজন্মা রাজনীতিবিদের চলে যাওয়ার দিন। যিনি কেবল একজন মন্ত্রী ছিলেন না, ছিলেন এক বিশাল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। মশিউর রহমান যাদু মিয়া—যাঁর নাম শুনলে ভেসে ওঠে এক আপসহীন নেতার ছবি, যিনি রাজপথ থেকে সংসদ পর্যন্ত সর্বত্র ছিলেন সমান তেজস্বী।

১. ছাত্র রাজনীতি থেকে জাতীয় মঞ্চে উত্থান
১৯২৪ সালে নীলফামারীর ডিমলায় জন্মগ্রহণ করা এই নেতা ছাত্রজীবনেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন। তেভাগা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৪৬-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ—সবখানেই যাদু মিয়ার উপস্থিতি ছিল অনন্য। তিনি ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। পরবর্তীকালে মওলানা ভাসানীর হাত ধরে ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
২. মজলুম জননেতার সুযোগ্য উত্তরসূরি
মওলানা ভাসানীর অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন যাদু মিয়া। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের বিরোধী দলের উপ-নেতা থাকাকালীন আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তাঁর ভূমিকা এবং ইয়াহিয়া খানকে ‘গাদ্দার’ বলার দুঃসাহস তাঁকে গণমানুষের নায়কে পরিণত করেছিল।
৩. ফারাক্কা লং মার্চ ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভিত্তি
১৯৭৬ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চের মূল সাংগঠনিক দায়িত্ব ছিল যাদু মিয়ার কাঁধে। ভাসানীর মৃত্যুর পর তিনি ন্যাপের হাল ধরেন। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অনুরোধে তিনি দেশ গড়ার কাজে যুক্ত হন।
৪. বিএনপি গঠন ও প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদায় ‘সিনিয়র মন্ত্রী’
যাদু মিয়া ছিলেন আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম স্থপতি। ন্যাপের কার্যক্রম স্থগিত করে প্রগতিশীল, দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠনে তিনি মূল ভূমিকা পালন করেন। জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদায় সিনিয়র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
৫. এক ঐতিহাসিক প্রস্থান
১২ মার্চ ১৯৭৯ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর চিকিৎসায় ভারত ও পাকিস্তান থেকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আনা হলেও নিয়তির অমোঘ লিখন পাল্টানো যায়নি। তাঁর মৃত্যুতে তৎকালীন সময়ে এক বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল।
বিডিএস পর্যবেক্ষণ: যাদু মিয়া ছিলেন এমন একজন নেতা যিনি কেবল দল গঠন করেননি, দিয়েছেন এক দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক দর্শন। আজকের ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটেও তাঁর সেই ‘দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী শক্তি’র ঐক্যের ডাক সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি ছিলেন উত্তরের চরাঞ্চলের মানুষের কাছে আশীর্বাদস্বরূপ, যাঁর নামানুসারে আজও টিকে আছে ‘যাদুর চর’।
মশিউর রহমান যাদু মিয়া: এক নজরে (১৯২৪-১৯৭৯)
| পর্যায় | রাজনৈতিক ভূমিকা ও অবদান |
| জন্ম | ৯ জুলাই ১৯২৪, ডিমলা, নীলফামারী। |
| আন্দোলন | তেভাগা আন্দোলন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন। |
| উপাধি | ‘যাদু মিয়া’ নামে সমধিক পরিচিত। |
| সাফল্য | পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের বিরোধী দলের উপ-নেতা (১৯৬২)। |
| অবদান | ফারাক্কা লং মার্চের সাংগঠনিক কমিটির চেয়ারম্যান (১৯৭৬)। |
| রাষ্ট্রীয় পদ | সিনিয়র মন্ত্রী (প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদায়), জিয়াউর রহমান সরকার। |
| জীবনাবসান | ১২ মার্চ ১৯৭৯, ঢাকা। |
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
গবেষণা ও বিশ্লেষণ: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (সিনিয়র ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিস্ট)
ঢাকা, ৭ এপ্রিল ২০২৬: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে ‘বীর উত্তম’ খেতাবপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহের কেবল একজন সমরনায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন রাজনৈতিক দার্শনিক। তাঁর জীবন এবং ১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাইয়ের সেই বিতর্কিত ফাঁসি—বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বিশাল ক্ষত। আজ আমরা বিশ্লেষণ করব কেন তাহেরকে ‘বাংলার চে গুয়েভারা’ বলা হয় এবং কেন তাঁর বিচারকে পরবর্তীতে উচ্চ আদালত ‘ঠাণ্ডা মাথার খুন’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
১. সম্মুখ সমর থেকে ১১ নম্বর সেক্টরের রূপকার

১৯৬১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া তাহের ছিলেন একজন গেরিলা যুদ্ধের বিশেষজ্ঞ। ১৯৭১ সালে যখন দেশ আক্রান্ত, তখন নিজের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে তিনি ভারত সীমান্তে পাড়ি দেন। ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে তিনি গড়ে তোলেন ছাত্র-কৃষক-শ্রমিকদের নিয়ে এক দুর্ধর্ষ গেরিলা বাহিনী। ২রা নভেম্বর কামালপুরের সম্মুখ সমরে নিজের বাম পা হারানো তাহের প্রমাণ করেছিলেন—সেক্টর কমান্ডাররা কেবল ওয়াকিটকিতে নির্দেশ দেন না, তাঁরা বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেন।
২. ৭ই নভেম্বরের সিপাহি বিপ্লব ও ১২ দফা দাবি

১৯৭৫ সালের অস্থির সময়ে ৩রা নভেম্বর যখন জিয়াউর রহমান বন্দি হন, তখন তাহেরের নেতৃত্বে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ ৭ই নভেম্বর এক গণ-অভ্যুত্থান ঘটায়। এই বিপ্লবের মূল ভিত্তি ছিল ১২ দফা দাবি, যার মধ্যে ছিল:
- শ্রেণিহীন সেনাবাহিনী: অফিসার ও জোয়ানদের মধ্যকার ঔপনিবেশিক ভেদাভেদ দূর করা।
- ব্যাটম্যান প্রথা বিলোপ: ব্যক্তিগত কাজে সৈনিকদের দাসের মতো ব্যবহার বন্ধ করা।
- গণবাহিনী গঠন: সেনাবাহিনীকে শোষিত মানুষের স্বার্থ রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর।
- দুর্নীতি দমন: পাচারকৃত টাকা ফেরত আনা এবং রাজবন্দিদের মুক্তি।
৩. জিয়াউর রহমান বনাম কর্নেল তাহের: এক ট্র্যাজিক বিশ্বাসঘাতকতা

জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পর তাহের আশা করেছিলেন ১২ দফা বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যায়। জিয়াউর রহমান সংহতি প্রকাশের বদলে দমানোর নীতি গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তাহেরকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার’ অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় এবং এক গোপন সামরিক আদালতে তাঁর বিচার শুরু হয়।
৪. প্রহসনের বিচার ও উচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক রায় (সূত্র বিশ্লেষণ)
২০১১ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক যুগান্তকারী রায়ে কর্নেল তাহেরের গোপন বিচারকে ‘অবৈধ ও অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করে।
- সূত্র ১ (High Court Verdict, 2011): রায়ে আদালত স্পষ্ট করে বলেছে যে, তাহেরের ফাঁসি ছিল একটি ‘ঠাণ্ডা মাথার রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’ (Cold-blooded murder)।
- সূত্র ২ (Lawrence Lifschultz): প্রখ্যাত সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ তাঁর ‘Bangladesh: The Unfinished Revolution’ বইয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন কীভাবে এই বিচারের কোনো আইনি ভিত্তি ছিল না।
৫. শেষ মুহূর্তের বীরত্ব: এক অমর মহাকাব্য
ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে তাহেরের আচরণ ছিল কিংবদন্তীতুল্য। তিনি তওবা পড়তে অস্বীকার করে বলেছিলেন, “আমি কোনো পাপ করিনি, আমি কেন তওবা পড়ব?” হাসিমুখে ফজলি আম খেয়ে এবং নিজের জুতা-প্যান্ট গুছিয়ে তিনি নিজেই ফাঁসির দড়ি তুলে নিয়েছিলেন। তাঁর শেষ কথা ছিল— “বিদায় দেশবাসী। বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।”
বিডিএস পর্যবেক্ষণ: ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যখন জাতীয় ঐক্য খুঁজি, তখন কর্নেল তাহেরের সেই ‘শ্রেণিহীন সমাজ’ ও ‘জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র’-এর স্বপ্ন আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো সম্ভব হলেও তাঁর আদর্শকে স্তব্ধ করা যায়নি। ইতিহাসের আদালতে আজ কর্নেল তাহের একজন বিজয়ী বীর।
তথ্যসূত্র (References for Verification):
- সুপ্রিম কোর্টের রায় (২০১১): রিট পিটিশন নং-৬৭৮৭/২০১০ (কর্নেল তাহেরের বিচার অবৈধ ঘোষণা)।
- Lawrence Lifschultz: Bangladesh: The Unfinished Revolution (Oxford University Press).
- Anwar Hossain: Sun up, Sun down: My days with Colonel Taher.
- মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আর্কাইভ: ১১ নম্বর সেক্টরের যুদ্ধের ঘটনাবলি ও বীর উত্তম খেতাবপত্র।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।




একটি রেসপন্স
Thanks for sharing. I read many of your blog posts, cool, your blog is very good. https://accounts.binance.info/en/register?ref=JHQQKNKN