বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তি

বাংলাদেশের অনুসরণীয় তরুণ ব্যক্তিত্ব কারা? আইকনদের অনুপ্রেরণামূলক তালিকা
তরুণ ব্যক্তিত্ব

নিউজ ডেস্ক

May 28, 2026

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের অনুসরণীয় তরুণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে এমন কিছু তরুণদের উল্লেখ করা যায়, যারা প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়ে সমাজ, রাজনীতি, শিক্ষা এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন। তরুণ প্রজন্মের সামনে আজ যারা নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছেন, তাদের কর্মযজ্ঞ এবং মেধা যুবসমাজকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করছে।

নিচে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখা ৭ জন তরুণ আইকন এবং ব্যক্তিত্বের বিস্তারিত প্রোফাইল তুলে ধরা হলো:

১. রাজনীতি ও ছাত্র নেতৃত্ব: নুরুল হক নুর

ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে উঠে আসা অন্যতম প্রধান ও আলোচিত তরুণ ছাত্রনেতা। ২০১৮ সালের সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতৃত্ব দিয়ে লাইমলাইটে আসা নুর বর্তমানে গণঅধিকার পরিষদের একাংশের সভাপতি হিসেবে মূলধারার রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।

বিডিএস বুলবুল আহমেদের বিশেষ প্রতিবেদনে নুরুল হক নুরের রাজনীতি ও ছাত্র নেতৃত্বের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ছাত্র নেতৃত্ব ও ডাকসু নির্বাচন

  • আন্দোলনের সূচনা: ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রধান মুখ হিসেবে সারা দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগ ও দাবির প্রতিনিধিত্ব করেন নুরুল হক নুর।
  • ঐতিহাসিক বিজয়: ২০১৯ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে দীর্ঘ ২৮ বছর পর ছাত্রলীগের শক্তিশালী প্যানেলকে পরাজিত করে ভিপি (সহ-সভাপতি) নির্বাচিত হন। এটি ছিল তার ছাত্র নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট।

২. মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ ও ‘গণঅধিকার পরিষদ’

  • নতুন রাজনৈতিক দল: ছাত্র রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে ২০২১ সালে তিনি ‘গণঅধিকার পরিষদ’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং এর সদস্য সচিব হন।
  • নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও বিভাজন: ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে দলের আর্থিক স্বচ্ছতা এবং শীর্ষ নেতাদের সাথে নীতিগত মতবিরোধের জেরে গণঅধিকার পরিষদ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক অংশের কাউন্সিলে নুর সভাপতি নির্বাচিত হন।

৩. রাজনৈতিক আদর্শ ও আন্দোলনের কৌশল

  • অধিকার-ভিত্তিক স্লোগান: নুর মূলত অধিকার আদায়, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সংস্কারের কথা বলে তরুণদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হন।
  • সরকার বিরোধী অবস্থান: তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর সমালোচক হিসেবে তিনি মাঠে সক্রিয় ছিলেন। যার ফলে বিভিন্ন সময় হামলা, মামলা এবং কারাবরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে।

৪. সমালোচনা ও বিতর্ক

  • বিদেশি সংযোগের অভিযোগ: ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের কথিত সদস্য সাফাদি-র সাথে বৈঠক এবং কাতার-দুবাই সফরের সময় প্রবাসী ও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে অর্থ সংগ্রহের বিষয়ে তাকে নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়।
  • অনভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক অস্থিরতা: সমালোচকদের মতে, বড় ছাত্র আন্দোলন পরিচালনা করতে পারলেও প্রথাগত রাজনৈতিক দল পরিচালনায় দূরদর্শিতা ও সাংগঠনিক পরিপক্বতার অভাব রয়েছে তার।

২. সামাজিক সোচ্চার ও আইনি লড়াই: ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন

ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বাংলাদেশের সমসাময়িক সামাজিক আন্দোলন ও আইনি লড়াইয়ের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ও বহুল আলোচিত ব্যক্তিত্ব। সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী ফেসবুক লাইভকে হাতিয়ার করে সমাজের নানা অসঙ্গতি, দুর্নীতি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করে দেশজুড়ে তুমুল পরিচিতি লাভ করেন। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে হবিগঞ্জ-৪ আসন থেকে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমানে তিনি একাধিক মামলায় কারাবন্দী অবস্থায় আইনি লড়াই চালাচ্ছেন।

বিডিএস булবুল আহমেদের বিশেষ প্রতিবেদনে ব্যারিস্টার সুমনের সামাজিক জাগরণ ও আইনি লড়াইয়ের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ‘ফেসবুক লাইভ’ এবং সামাজিক জাগরণ

  • অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সোচ্চার: রাস্তাঘাটের ত্রুটি, যত্রতত্র ময়লা ফেলা, সরকারি কাজের অনিয়ম কিংবা পল্লী বিদ্যুতের খুঁটির মতো জনদুর্ভোগের স্থানগুলো থেকে সরাসরি ফেসবুক লাইভ করে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন তিনি। তার এই তাৎক্ষণিক লাইভ আন্দোলনের কারণে অনেক সমস্যার দ্রুত সমাধান হয়েছে।
  • স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক কাজ: নিজ এলাকা চুনারুঘাট ও মাধবপুরে নিজস্ব অর্থায়নে এবং তরুণদের সাথে নিয়ে শতাধিক কাঠের সেতু ও কালভার্ট সংস্কার এবং নদী পরিষ্কারের মাধ্যমে তিনি এক অনন্য সামাজিক নজির স্থাপন করেন。

২. উচ্চ আদালতে জনস্বার্থে মামলা (PIL)

  • জনস্বার্থে আইনি লড়াই: সামাজিক অসঙ্গতির পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে তিনি অসংখ্য জনস্বার্থমূলক মামলা লড়েছেন。 এর মধ্যে ঢাকার ফুটওভার ব্রিজে হকার উচ্ছেদ, জাল সনদধারী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে তার রিট আবেদনগুলো ব্যাপক আলোচিত হয়।
  • দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান: পুলিশের সাবেক আইজিপিসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করে এবং উচ্চ আদালতে আইনি পদক্ষেপ নিয়ে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজের শক্ত অবস্থান দেখিয়েছেন।

৩. ব্যারিস্টার সুমন ফুটবল একাডেমি ও যুব উন্নয়ন

  • ক্রীড়াঙ্গনে অবদান: দেশের ফুটবলের গৌরব ফিরিয়ে আনতে এবং তরুণ সমাজকে মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে তিনি ‘ব্যারিস্টার সুমন ফুটবল একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই একাডেমির মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার দেশীয় ফুটবলের মূল ধারায় উঠে আসার সুযোগ পায়।

৪. ২০২৪-২০২৬: সংসদ সদস্য পদ এবং বর্তমান কারাবাস

  • স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে বিজয়: ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বড় ব্যবধানে তৎকালীন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য (MP) নির্বাচিত হন।
  • বর্তমান আইনি জটিলতা: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অক্টোবরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় হত্যাচেষ্টা মামলায় ঢাকার মিরপুর থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে (কেরানীগঞ্জ) বন্দী রয়েছেন। কারাবন্দী অবস্থাতেই তিনি সুপ্রিম কোর্ট থেকে আংশিক জামিন পেলেও অন্যান্য মামলার জটিলতায় এখনো মুক্তি পাননি, এবং সম্প্রতি জেলখানা থেকেই বাংলাদেশ বার কাউন্সিল নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

৩. এডুটেক ও ডিজিটাল শিক্ষা: আয়মান সাদিক

আয়মান সাদিক বাংলাদেশের এডুটেক (EdTech) বা ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থার বিপ্লবের প্রধান পথপ্রদর্শক এবং আধুনিক তরুণ সমাজের অন্যতম শীর্ষ অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তিত্ব। ২০১৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ (IBA)-তে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি মাত্র একটি সাধারণ ওয়েবক্যাম ও হোয়াইটবোর্ড নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ১০ মিনিট স্কুল (10 Minute School), যা আজ ২০২৬ সালে এসে দেশের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

বিশেষ প্রতিবেদনে আয়মান সাদিক এবং তার ডিজিটাল শিক্ষা বিপ্লবের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. বাংলাদেশে ‘এডুটেক’ ধারণার প্রবর্তন

  • শিক্ষার সহজলভ্যতা: প্রথাগত কোচিং সেন্টারের উচ্চ ব্যয় এবং ঢাকা-কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্য দূর করতে আয়মান সাদিক অনলাইনের মাধ্যমে বিনামূল্যে মানসম্মত শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেন।
  • ডিজিটাল ক্লাসরুম: ইউটিউব ও ফেসবুকের মাধ্যমে একাডেমিক সিলেবাসের কঠিন বিষয়গুলোকে সহজ ও অ্যানিমেটেড ভিডিওর মাধ্যমে উপস্থাপন করে তিনি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি ভীতি দূর করেন।

২. প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর ও বৈশ্বিক স্বীকৃতি

  • বিনিয়োগ ও আধুনিকায়ন: ফ্রি কন্টেন্ট থেকে শুরু করে ১০ মিনিট স্কুল এখন লাইভ ক্লাস, স্মার্টবুক, কুইজ এবং একাডেমিক অনলাইন ব্যাচ ২০২৬-এর মতো আধুনিক পেইড মডেলে রূপান্তরিত হয়েছে। বৈশ্বিক ও দেশীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল থেকে বড় অংকের বিনিয়োগ এনে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে একটি সফল স্টার্টআপে রূপ দিয়েছেন।
  • আন্তর্জাতিক পুরস্কার: ডিজিটাল শিক্ষায় অবদানের জন্য তিনি সম্মানজনক ব্রিটিশ রানীর ‘কুইন্স ইয়াং লিডারস অ্যাওয়ার্ড (২০১৮)’ এবং ফোর্বসের বিখ্যাত ‘৩০ অনূর্ধ্ব ৩০ এশিয়া (Forbes 30 Under 30 Asia)’ তালিকায় স্থান পান।

৩. দক্ষতা উন্নয়ন বা ‘স্কিলস ডেভেলপমেন্ট’

  • প্রথাগত শিক্ষার বাইরে: শুধু পাঠ্যবইয়ের পড়াশোনা নয়, বরং আধুনিক কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা যেমন—পাবলিক স্পিকিং, প্রেজেন্টেশন, সিভি রাইটিং এবং কমিউনিকেশন স্কিলস-এর ওপর কোর্স চালু করে তিনি লাখ লাখ তরুণকে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করছেন।
  • লেখক হিসেবে ভূমিকা: তরুণদের মানসিক বিকাশ ও পড়াশোনার কৌশল নিয়ে তার লেখা ‘স্টুডেন্ট হ্যাকস’, ‘কমিউনিকেশন হ্যাকস’ এবং ‘ভাল্লাগে না’ বইগুলো তরুণ পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

৪. সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জ ও সংকট উত্তরণ

  • বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা: ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির পটভূমিতে টেন মিনিট স্কুলের ৫ কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগ প্রস্তাব সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ার মতো বড় সংকটে পড়েছিলেন তিনি। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর নতুন বাংলাদেশে তিনি তার প্ল্যাটফর্মকে আরও স্বাধীন ও প্রযুক্তি-নির্ভর করে পুনর্গঠন করেছেন।
  • এআই (AI) চালিত শিক্ষা: ২০২৬ সালের বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আয়মান সাদিকের নেতৃত্বে টেন মিনিট স্কুল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) ব্যবহার করে পার্সোনালাইজড লার্নিং বা শিক্ষার্থীর মেধা অনুযায়ী ব্যক্তিগত পড়াশোনার নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করছে।

৪. বিজ্ঞান ও গণিত চর্চা: চমক হাসান

চমক হাসান বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্মের কাছে বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষাকে আনন্দময় ও ভীতিহীন করে তোলার এক জাদুকরী ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম। প্রথাগত মুখস্থনির্ভর এবং নীরস শিক্ষাপদ্ধতির বাইরে গিয়ে তিনি গল্প, কবিতা, সুর আর অ্যানিমেশনের মেলবন্ধনে গণিত এবং বিজ্ঞানকে তরুণদের কাছে একটি জনপ্রিয় বিনোদন বা ‘ইনফোটেইনমেন্ট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বুয়েট থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ও গবেষণা পেশার পাশাপাশি তিনি অনলাইনে এক বিশাল শিক্ষা বিপ্লব পরিচালনা করছেন।

চমক হাসান এবং তার বিজ্ঞান ও গণিত চর্চার প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ‘গণিতের রঙ্গে’ ও ভিজ্যুয়াল লার্নিং বিপ্লব

  • ভীতি দূরীকরণ: ২০১২ সাল থেকে শুরু করা ‘গণিতের রঙ্গে হাসিখুশি গণিত’ এবং ‘চটপটে গণিত’ ভিডিও সিরিজের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে গণিত কোনো মুখস্থ করার বিষয় নয়, বরং এটি অনুভবের বিষয়।
  • সহজ উপস্থাপনা: জ্যামিতির জটিল উপপাদ্য, ক্যালকুলাসের কঠিন সমীকরণ কিংবা ত্রিকোণমিতির সূত্রগুলোকে তিনি চমৎকার সব বাস্তব উদাহরণ এবং ছন্দের সাহায্যে শিক্ষার্থীদের মগজে গেঁথে দেন।

২. জনপ্রিয় বিজ্ঞান ও গণিতের জনপ্রিয় বইসমূহ

রকমারি ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, জটিল বিষয়কে সহজ ভাষায় রূপান্তর করে তরুণ ও শিশুদের জন্য চমক হাসান এ পর্যন্ত প্রায় ১৪টি সাড়া জাগানো বই লিখেছেন। তার উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • অঙ্ক ভাইয়া: গণিতের মৌলিক আনন্দ ও ধাঁধা নিয়ে লেখা অন্যতম জনপ্রিয় বই।
  • নিমিখ পানে (১ম ও ২য় খণ্ড): ক্যালকুলাসের কঠিন জগৎকে সহজ বাংলায় ভ্রমণের গল্প।
  • গল্পে জল্পে জেনেটিক্স: ডিএনএ, আরএনএ এবং জীববিজ্ঞানের জটিল সূত্রগুলোকে গল্পের ছলে উপস্থাপন।
  • নিবিড় গণিত ও যুক্তিফাঁদে ফড়িং: গণিতের ভেতরের গভীর দর্শন ও কুযুক্তির বেড়াজাল ভাঙার কৌশল।

৩. বিজ্ঞানচেতনা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই

  • যুক্তিভিত্তিক সমাজ: চমক হাসান শুধু সমীকরণ শেখান না, বরং সমাজে ছড়িয়ে থাকা অপবিজ্ঞান, গুজব এবং কুযুক্তির বিরুদ্ধে বৈজ্ঞানিক যুক্তি দিয়ে সমাজকে সচেতন করার কাজ করেন।
  • কোর্স ও লাইভ সেশন: শিক্ষক.কম-সহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ফ্রিতে কোর্স নেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি লাইভে এসে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন জটিল প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তিনি বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম তৈরিতে ভূমিকা রাখছেন।

৪. বিজ্ঞান ও শিল্পের মেলবন্ধন (সঙ্গীত ক্যারিয়ার)

  • বহুমাত্রিক প্রতিভা: চমক হাসানের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো তিনি একাধারে বিজ্ঞানী, গণিতবিদ এবং অত্যন্ত গুণী সঙ্গীতশিল্পী ও গীতিকার। তিনি বিশ্বাস করেন, বিজ্ঞান আর শিল্পের বিভাজন আসলে কৃত্রিম; দুটোই মানুষের কল্পনাশক্তি থেকে আসে।
  • চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা: কলকাতার জনপ্রিয় বাংলা চলচ্চিত্র ‘বাবা বেবি ও’ এবং ‘ফাটাফাটি’-তে সঙ্গীত পরিচালক ও গায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তিনি দুই বাংলাতেই ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

৫. প্রোগ্রামিং ও মোটিভেশন: ঝংকার মাহবুব

ঝংকার মাহবুব বাংলাদেশের টেক-এডুকেশন বা এডুটেক (EdTech) সেক্টরের এক অত্যন্ত জনপ্রিয়, দূরদর্শী এবং সফল আইটি শিক্ষাগুরু, যিনি কোডিং এবং সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাকে সাধারণ তরুণদের কাছে সহজ ও আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। প্রথাগত এবং জটিল কোডিং টিউটোরিয়ালের চেনা ছক ভেঙে রসাত্মক, বাস্তবসম্মত এবং চমৎকার হিউমারাস উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি কোটি তরুণকে ফ্রন্টএন্ড এবং ফুল-স্ট্যাক ওয়েব ডেভেলপমেন্ট শিখতে অনুপ্রাণিত করেছেন। তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় এডুটেক প্ল্যাটফর্ম প্রোগ্রামিং হিরো (Programming Hero)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO)।

ঝংকার মাহবুবের ক্যারিয়ার, অনন্য শিক্ষাপদ্ধতি এবং দেশের প্রযুক্তি শিক্ষায় তার অবদানের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ‘প্রোগ্রামিং হিরো’ এবং দেশের বৃহত্তম আইটি বুটক্যাম্প

  • সহজ আইটি শিক্ষা: কোডিং বা ওয়েব ডেভেলপমেন্টের মতো কঠিন জিনিসকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজ করতে তিনি Programming Hero মোবাইল অ্যাপ এবং পরবর্তীতে কমপ্লিট ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোর্স চালু করেন।
  • ক্যারিয়ার প্লেসমেন্ট ও সাফল্য: তার নির্দেশনায় গত কয়েক বছরে প্রায় ৫৮০০-এর বেশি শিক্ষার্থী সফলভাবে আইটি সেক্টরে চাকরি এবং ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার শুরু করেছেন। তাদের নিবিড় ২৪/৭ ডেডিকেটেড সাপোর্ট সিস্টেম তরুণদের আইটি সেক্টরে প্রবেশের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

২. লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ: ‘হাবলু’ ও ‘বলদ টু বস’ সিরিজ

রকমারি ডটকমের তথ্য অনুসারে, বাংলা ভাষায় প্রোগ্রামিংয়ের কাঠখোট্টা বিষয়গুলোকে অতি সাধারণ উদাহরণ ও গল্পের ছলে বুঝাতে ঝংকার মাহবুব বেশ কয়েকটি কালজয়ী বেস্ট-সেলার বই লিখেছেন। তাঁর জনপ্রিয় বইগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • হাবলুদের জন্য প্রোগ্রামিং: নতুনদের জন্য প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজের (জাভাস্ক্রিপ্ট) বেসিক বোঝার সেরা গাইডলাইন।
  • প্রোগ্রামিংয়ের বলদ টু বস: ডেটা স্ট্রাকচার ও অ্যালগরিদমের কঠিন বিষয়গুলোকে সহজ করার বই।
  • রিচার্জ ইয়োর ডাউন ব্যাটারি: তরুণ প্রজন্মের ডিপ্রেশন দূর করা এবং ক্যারিয়ারে ফোকাসড থাকার জন্য মোটিভেশনাল বই।
  • প্যারাময় লাইফের প্যারাসিটামল: জীবনের দৈনন্দিন প্যারা বা সমস্যাগুলোকে পজিটিভভাবে ডিল করার কৌশল।

৩. শিক্ষাগত যোগ্যতা ও গ্লোবাল ক্যারিয়ার

  • বুয়েট থেকে যাত্রা: ঝংকার মাহবুব বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (IPE) এ স্নাতক সম্পন্ন করেন।
  • যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা ও চাকরি: পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা State University থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে (CS) স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি শিকাগো ও সান ফ্রান্সিসকোতে বিখ্যাত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ‘নিলসেন (Nielsen)’-এ সিনিয়র ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে দক্ষতার সাথে কাজ করেছে

৪. ২০২৬ সালের প্রেক্ষিত: এআই (AI) এবং ভবিষ্যৎ আইটি গাইডলাইন

  • এআই-চালিত প্রোগ্রামিং: ২০২৬ সালের বর্তমান এআই ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লবের যুগে দাঁড়িয়ে ঝংকার মাহবুব তার শিক্ষার্থীদের AI Driven Full Stack Web Engineer হিসেবে তৈরি করছেন, যাতে চার্টজিপিটি বা অন্যান্য আধুনিক এআই টুল ব্যবহার করে কোডিংয়ের গতি বহুগুণ বাড়ানো যায়।
  • ভবিষ্যৎ আইটি জব মার্কেট: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের চাকরি প্রতিস্থাপন করবে কি না—এই বিষয়ক বিতর্কে তিনি তরুণদেরকে কেবল প্রথাগত কোডার না হয়ে বরং সমস্যা সমাধানকারী বা Problem Solver হয়ে ওঠার পরামর্শ দিচ্ছেন।

৬. তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক মেন্টর: শাব্বির আহসান

শাব্বির আহসান বাংলাদেশের তরুণ সমাজের আত্ম-উন্নয়ন (Self-Development), ক্যারিয়ার গাইডলাইন এবং মোটিভেশনাল ঘরানার ধারায় এক অত্যন্ত জনপ্রিয়, ব্যতিক্রমী ও পাঠকপ্রিয় লেখক। প্রথাগত লেখকদের চেয়ে আলাদা জীবন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই ব্যক্তিত্ব তাঁর বাস্তবমুখী লেখনী, গভীর জীবনবোধ এবং ফেসবুকের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনামূলক লেখার মাধ্যমে লাখ লাখ তরুণের জীবন গঠনে মেন্টর হিসেবে ভূমিকা রাখছেন।

শাব্বির আহসানের বর্ণাঢ্য জীবন ও তাঁর সাহিত্য চর্চার প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. বহুমুখী ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবন

  • সামরিক বাহিনীর অভিজ্ঞতা: ১৯৬৮ সালে জন্মগ্রহণ করা শাব্বির আহসান ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এ ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং মেজর পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় অবসর নেন। তিনি ১৯৯০-১৯৯১ সালে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ (গ্যালফ ওয়ার) এবং কঙ্গোতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করেছেন।
  • কর্পোরেট ও গ্লোবাল সেক্টর: সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ (IBA) থেকে ফিন্যান্স ও ম্যানেজমেন্টে এমবিএ (MBA) ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর বিশ্বব্যাংক (World Bank)-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় পরামর্শক (Consultant) হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ করেন।

২. সাড়া জাগানো বই: ‘ভাইরে আপুরে!!!’ ও আত্ম-উন্নয়ন ধারা

অন্যান্য পেশাদার মোটিভেশনাল লেখকদের মতো আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখানো নয়, বরং কঠিন বাস্তবতাকে কীভাবে বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করতে হবে—তা উঠে এসেছে তাঁর বইয়ে। রকমারি ডটকমের তথ্য অনুযায়ী তাঁর শীর্ষ পাঠকপ্রিয় বইগুলো হলো:

  • ভাইরে/আপুরে!!! (বই, লেখাপড়া, জীবন): এটি মূলত তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জনপ্রিয় ও দিকনির্দেশনামূলক লেখার সংকলন। বিশেষ করে ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ, পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারের জন্য এই বইটিকে একটি ‘মাস্ট-রিড’ বা অবশ্য পাঠ্য মনে করা হয়।
  • দ্য পিসকিপার (The Peacekeeper): জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত থাকার সময় তাঁর রোমাঞ্চকর, ঝুঁকিপূর্ণ ও মানবিক অভিজ্ঞতার সত্য ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে লেখা একটি অনন্য বই, যা ২০০৭ সালে প্রথম যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।

৩. সোশ্যাল মিডিয়া ডিলিউশন থেকে দূরে থাকার বার্তা

  • বাস্তববাদী দর্শন: তিনি বিশ্বাস করেন তরুণ সমাজ ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়ায় যতটা সময় দেয়, তার সিংহভাগই আসলে অপচয়। নিজের দক্ষতা বা ‘সেলফ-ডেভেলপমেন্ট’-এর জন্য বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই।
  • অনলাইন থেকে দূরত্ব: জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর এই দর্শনকে নিজের জীবনেও কঠোরভাবে বজায় রেখেছেন। নিজের কর্মব্যস্ততা ও আত্মউন্নয়নের স্বার্থে তিনি বর্তমানে কোনো পাবলিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন না এবং তাঁর পাঠকরাই তাঁর নামে বিভিন্ন ফ্যান গ্রুপ পরিচালনা করেন। [

৭. বস্তুনিষ্ঠ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সাংবাদিকতা: খালেদ মহিউদ্দিন

খালেদ মুহিউদ্দীন বাংলাদেশের সমসাময়িক সাংবাদিকতা ও টকশো উপস্থাপনার জগতে এক অত্যন্ত প্রভাবশালী, নির্ভীক এবং তুমুল জনপ্রিয় নাম।ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের ‘আজকের বাংলাদেশ’ এবং জার্মানভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ডয়চে ভেলে (DW) বাংলার ‘খালেদ মুহিউদ্দীন জানতে চায়’ টকশোর মাধ্যমে তিনি দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের কাছে এক অনন্য গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেন। বর্তমানে ২০২৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘ঠিকানা নিউজ’-এর সাথে যুক্ত থেকে তাঁর জনপ্রিয় ডিজিটাল টকশো ‘ঠিকানায় খালেদ মুহিউদ্দীন’ ও ‘উচিত কথা’ সফলভাবে পরিচালনা করছেন।

সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীনের ক্যারিয়ার ও তাঁর টকশো সংস্কৃতির প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. বহুমুখী ক্যারিয়ার ও সিভিল সার্ভিসের অভিজ্ঞতা

  • সাংবাদিকতার শুরু: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে তিনি ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় যোগ দেন। পরবর্তীতে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমেও (bdnews24.com) নিউজ এডিটর হিসেবে কাজ করেন।
  • ম্যাজিস্ট্রেসি ও বিশ্বব্যাংক: ২০তম বিসিএস (BCS) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। তবে স্বাধীন সাংবাদিকতার টানে সরকারি চাকরি ছেড়ে পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক এবং পুরোদস্তুর গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

২. টকশোতে ‘কাউন্টার কোয়েশ্চেন’ বা তীক্ষ্ণ প্রশ্নবাণ

  • চেনা ছক ভাঙা: বাংলাদেশে প্রথাগত টকশোর চেনা এবং আরামদায়ক পরিবেশ ভেঙে রাজনৈতিক অতিথিদের সরাসরি কঠিন ও অপ্রস্তুতকর প্রশ্ন বা ‘কাউন্টার কোয়েশ্চেন’ করার সংস্কৃতি তিনি জনপ্রিয় করে তোলেন।
  • নিরপেক্ষ অবস্থান: সমসাময়িক রাজনীতির কঠিন বিশ্লেষণ নিয়ে সাজানো তাঁর নতুন আয়োজন ‘উচিত কথা’ টকশোতে দেশের চলমান আইনি সংস্কার, মব জাস্টিস এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য-অনৈক্য নিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত নিরপেক্ষ ও কড়া সমালোচনা করে যাচ্ছেন।

৩. আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও ডয়চে ভেলে (DW)

  • বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম: ২০১৯ সালে তিনি জার্মানির আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। ডয়চে ভেলেতে থাকাকালীন তাঁর বিশেষ সাক্ষাৎকার ও লাইভ টকশোগুলো দুই বাংলা এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি বাঙালি দর্শকের মাঝে বিপুল সাড়া ফেলে। ২০২৪ সালে ডয়চে ভেলে ছেড়ে তিনি উত্তর আমেরিকাভিত্তিক ঠিকানা নিউজে যোগ দেন।

৪. ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষিত ও সমসাময়িক অবস্থান

  • ডিজিটাল মিডিয়া ও স্বাধীন মতামত: ২০২৬ সালের বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে টেলিভিশন পর্দার চেয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে (ইউটিউব ও ফেসবুক) তাঁর উপস্থিতি সবচেয়ে জোরালো। সমসাময়িক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, বিগত সরকারের আমলে সাংবাদিকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ, বর্তমান সরকারের আইন ও শাসন সংস্কারের গতিপ্রকৃতি নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণধর্মী কনটেন্টগুলো তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
  • লেখক হিসেবে ভূমিকা: সাংবাদিকতার পাশাপাশি খালেদ মুহিউদ্দীন একজন মননশীল লেখক। বিভিন্ন সময়ে দেশীয় রাজনীতি, সমাজ এবং তাঁর সাংবাদিক জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ৯টি বই প্রকাশিত হয়েছে।

ক্ষেত্রভিত্তিক তরুণ ব্যক্তিত্বদের কুইক সামারি ম্যাট্রিক্স

বিগত ২৫ বছরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ধারায় নিজ নিজ ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক অবদান রাখা বাংলাদেশের ৬ জন শীর্ষ তরুণ ও সমসাময়িক ব্যক্তিত্বের একটি কুইক সামারি ম্যাট্রিক্স বা তুলনামূলক ছক নিচে উপস্থাপন করা হলো।

বিডিএস বুলবুল আহমেদের বিশেষ প্রতিবেদনে এই ব্যক্তিত্বদের মূল কাজের ক্ষেত্র, তাদের অনন্য অবদান এবং ২০২৬ সালের বর্তমান সময়ে তাদের সামাজিক প্রভাব এক নজরে তুলে ধরা হলো।

ক্ষেত্রভিত্তিক ব্যক্তিত্বদের কুইক সামারি ম্যাট্রিক্স

ব্যক্তিত্বের নামমূল কাজের ক্ষেত্রপ্রধান উদ্যোগ/অবদানঅনন্য শিক্ষাদান বা কাজের পদ্ধতি২০২৬ সালের বর্তমান অবস্থান ও প্রভাব
নুরুল হক নুররাজনীতি ও ছাত্র নেতৃত্বভিপি (ডাকসু), প্রতিষ্ঠাতা (গণঅধিকার পরিষদ)অধিকার-ভিত্তিক আন্দোলন ও সরাসরি মাঠের রাজনীতিগণঅধিকার পরিষদের একাংশের সভাপতি হিসেবে মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয়।
ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনসামাজিক আন্দোলন ও আইনি লড়াইসুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, সাবেক সংসদ সদস্য (MP)‘ফেসবুক লাইভ’ এর মাধ্যমে সামাজিক অসঙ্গতি প্রকাশ ও জনস্বার্থে মামলা (PIL)বর্তমানে একাধিক মামলায় কারাবন্দী অবস্থায় কারাগার থেকেই আইনি লড়াই চালাচ্ছেন।
আয়মান সাদিকএডুটেক ও ডিজিটাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও (১০ মিনিট স্কুল)অ্যানিমেটেড ভিডিও, স্মার্টবুক ও অনলাইন ব্যাচের মাধ্যমে শিক্ষাকে সহজীকরণকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত পার্সোনালাইজড লার্নিং প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষায় রূপান্তর।
চমক হাসানবিজ্ঞান ও গণিত চর্চালেখক, সঙ্গীতশিল্পী ও গবেষক (যুক্তরাষ্ট্র)গল্প, কবিতা, সুর ও ছন্দের মেলবন্ধনে ভিজ্যুয়াল লার্নিং বা ‘ইনফোটেইনমেন্ট’যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণার পাশাপাশি অনলাইন কোর্স ও জনপ্রিয় বিজ্ঞানচর্চার বইয়ের মাধ্যমে সক্রিয়।
ঝংকার মাহবুবটেক-এডুকেশন ও প্রোগ্রামিংপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও (প্রোগ্রামিং হিরো)রসাত্মক উপস্থাপন, বাস্তবসম্মত হিউমার এবং হাবলু সিরিজ বইএআই যুগে তরুণদের ‘AI Driven Full Stack Web Engineer’ ও প্রবলেম সলভার হিসেবে তৈরি করছেন।
শাব্বির আহসানআত্ম-উন্নয়ন ও ক্যারিয়ার গাইডলাইনলেখক (প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা ও আইবিএ এমবিএ)বাস্তবমুখী ও কঠিন জীবনবোধের লেখনী (বই: ‘ভাইরে আপুরে!!!’)সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সম্পূর্ণ দূরে থেকে বই ও গভীর জীবন দর্শনের মাধ্যমে তরুণদের মেন্টরিং।
খালেদ মুহিউদ্দীনসাংবাদিকতা ও টকশো উপস্থাপনাপ্রবীণ সাংবাদিক, টকশো হোস্ট (ঠিকানা নিউজ)অতিথিদের সরাসরি কঠিন ও অপ্রস্তুতকর ‘কাউন্টার কোয়েশ্চেন’ করার সংস্কৃতিডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জনপ্রিয় টকশো ‘উচিত কথা’ এবং ‘ঠিকানায় খালেদ মুহিউদ্দীন’ এর মাধ্যমে স্বাধীন মতামত প্রকাশ।

আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ: একজন সচেতন নাগরিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমি মনে করি—এই তরুণরা প্রমাণ করেছেন যে, কোনো বড় প্রাতিষ্ঠানিক সাপোর্ট ছাড়াও সদিচ্ছা এবং মেধা থাকলে সমাজকে বদলে দেওয়া সম্ভব। নুরুল হক নুরের মতো তরুণরা যখন দেশের মূলধারার রাজনীতিতে পরিবর্তনের ডাক দেন, কিংবা আয়মান সাদিক ও ঝংকার মাহবুবরা যখন পুরো দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজড করেন, তখন বোঝা যায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল। তরুণদের উচিত ফেসবুক স্ক্রোলিং বা সস্তা বিনোদনে সময় নষ্ট না করে, এই আইকনদের কর্মজীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

মনোহর আইচ রুটিন,

নিউজ ডেস্ক

October 15, 2026

শেয়ার করুন

  • প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
  • বিভাগ (Category): ক্রীড়ার ইতিহাস, ফিটনেস ও স্বাস্থ্য সচেতনতা
  • প্রকাশের তারিখ: ১৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • তথ্যসূত্র (Sources): NABBA World Bodybuilding Archives, Indian Bodybuilding Records, এবং Historic Sport Chronicles.

বাঙালির শৌর্য, বীরত্ব এবং শারীরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্বের কথা বললেই যাঁদের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়, তাঁদের মধ্যে বিশ্বশ্রী মনোহর আইচ এবং মনতোষ রায় অন্যতম। প্রতিকূলতাকে জয় করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে লাল-সবুজের ও ব্রিটিশ ভারতের পতাকা উড়িয়ে তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন যে দৃঢ় মনোবল থাকলে উচ্চতা বা ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কখনো সাফল্যের অন্তরায় হতে পারে না।

১. বিশ্বশ্রী মনোহর আইচের শরীরচর্চার রুটিন (Workout Routine)

মনোহর আইচ (১৭ মার্চ ১৯১২ – ৫ জুন ২০১৬), যিনি তার মাত্র ৪ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতা এবং অবিশ্বাস্য পেশীবহুল শরীরের জন্য বিশ্বজুড়ে “পকেট হারকিউলিস” (Pocket Hercules) নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন, ১৯৫২ সালে ভারতের জন্য দ্বিতীয় মিস্টার ইউনিভার্স (Mr. Universe) শিরোপা জয় করেন। ১০৪ বছর বছর বাঁচার পেছনে তার কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, স্টেরয়েড ও সাপ্লিমেন্টমুক্ত সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক শরীরচর্চার রুটিন এবং সাধারণ জীবনযাত্রা আজীবন অনন্য অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে।

তার শরীরচর্চার রুটিন এবং দৈনন্দিন লাইফস্টাইলকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:

১. প্রাথমিক জীবন ও জেলখানার কঠোর ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম (ক্যালিস্থেনিক্স)

  • ১২ বছর বয়সে শুরু: শৈশবে কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মনোহর আইচের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। নিজের শক্তি ফিরে পেতে মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই তিনি পুশ-আপ, স্কোয়াট, পুল-আপ, লেগ রেইজ এবং সিট-আপের মতো বডিওয়েট ব্যায়াম শুরু করেন। ওই বয়সেই তিনি প্রতি সেটে প্রায় ১০০টি করে রেপস (Reps) দিতে পারতেন。
  • কারাগারে ১২ ঘণ্টার সাধনা: ১৯৪২ সালে রয়্যাল এয়ার ফোর্সে যোগ দেওয়ার পর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তাকে কারাগারে বন্দি করা হয়। কারাগারে কোনো জিমের সরঞ্জাম বা ওজন (Weights) ছিল না। সেখানে তিনি দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে কঠোর ফ্রি-হ্যান্ড এবং ক্যালিস্থেনিক্স ব্যায়াম করতেন, যা তার শরীরের মজবুত ভিত্তি গড়ে তুলেছিল।

২. পাওয়ার বডিবিল্ডিং ও জিমের রুটিন (যৌবন ও প্রতিযোগিতার সময়)

পরবর্তীতে যখন তিনি পুরোদমে ওয়েট ট্রেনিং শুরু করেন, তখন আধুনিক জটিল মেশিনের চেয়ে প্রাচীন ভারতীয় ব্যায়ামপদ্ধতি এবং ভারী ‘কম্পাউন্ড এক্সারসাইজ’-এর ওপর জোর দিতেন।

  • সকালের ওয়ার্কআউট: তিনি প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে টানা ৯০ মিনিট শরীরচর্চা করতেন।
  • প্রিয় ব্যায়ামসমূহ: তিনি পূর্ণাঙ্গ বডি ওয়ার্কআউটের অনুসারী ছিলেন। তার মূল রুটিনে থাকত ভারী স্কোয়াট (Squats), ডন-বৈঠক (Push-ups & Squats), বেঞ্চ প্রেস (Bench Press), ওভারহেড শোল্ডার প্রেস (Overhead Press), বারবেল রো (Barbell Rows), এবং বারবেল কার্ল (Barbell Curls)।
  • পাওয়ার স্টান্টের প্রস্তুতি: দাঁত দিয়ে স্টিল বাঁকানো, তরবারির ডগায় পেট ঠেকিয়ে রাখা কিংবা বুক দিয়ে লোহার রড বাঁকানোর মতো অবিশ্বাস্য সব স্টান্ট প্রদর্শনের জন্য তিনি ঘাড় ও কোর মাসল মজবুত করার বিশেষ ব্যায়াম করতেন।

৩. শেষ বয়সের রক্ষণাবেক্ষণ রুটিন (Maintenance Schedule)

  • বয়স ৯০ পার হওয়ার পরও তিনি ব্যায়াম করা থামাননি। তবে শেষের দিকে হৃদযন্ত্রের মৃদু সমস্যার কারণে তিনি ভারী ওজন তোলা বন্ধ করে দেন।
  • শেষ বয়সে তিনি কেবল শরীরের ফিটনেস ধরে রাখতে হালকা ওজনের ডাম্বেল এবং বেশি রেপসের ৬ থেকে ৭টি ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করতেন। এমনকি ১০০ বছর পার করার পরও তিনি তার জিমের ছাত্রদের নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ব্যায়াম শেখাতেন।

ডায়েট ও লাইফস্টাইল: দীর্ঘায়ুর গোপন চাবিকাঠি

মনোহর আইচ কোনো আধুনিক প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট বা স্টেরয়েড ব্যবহার করেননি। তার সুস্থ ১০৪ বছর বাঁচার মূল রহস্য ছিল খাঁটি বাঙালি খাবার:

  • খাদ্যাভ্যাস: সকালের নাস্তায় দুধ, চিঁড়ে এবং কফি। দুপুরে ও রাতে একদম সাধারণ ভাত, ডাল, নানা রকম তরকারি এবং টাটকা মাছের ঝোল। এছাড়া তার খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে দুধ, ফলমূল (আম, কাঁঠাল, ডাব) এবং শাকসবজি থাকত।
  • নেশামুক্তি: তিনি জীবনে কখনো মদ্যপান বা ধূমপান করেননি।
  • মানসিক প্রশান্তি: তিনি সবসময় বলতেন, “আমি কখনোই কোনো ধরনের মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তাকে প্রশ্রয় দিই না। তরুণ বয়স থেকে উপার্জনের জন্য অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে, তবে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, আমি সবসময় হাসিখুশি থেকেছি।”

২. এশিয়ার প্রথম মিস্টার ইউনিভার্স: মনতোষ রায়

মনতোষ রায় (২১ অক্টোবর ১৯১৭ – ২৯ জুন ২০০৫) ছিলেন একজন প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি বডিবিল্ডার বা শরীরচর্চাবিদ, যিনিএশিয়ার প্রথম মিস্টার ইউনিভার্স (Mr. Universe) খেতাব অর্জনের গৌরব লাভ করেন। ১৯৫১ সালে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতায় তিনি “গ্রুপ ৩ অ্যামেচার” (শর্ট মেন ডিভিশন) বিভাগে এই বিশ্বসেরা শিরোপা জয় করেছিলেন।

তার জীবন ও কীর্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রারম্ভিক জীবন ও সাধনা

  • জন্ম: ১৯১৭ সালের ২১শে অক্টোবর তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার মেঘনা নদীর তীরবর্তী গজারিয়া গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
  • শৈশব ও সংগ্রাম: চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বড় হওয়া মনতোষ রায় মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই শরীরচর্চা শুরু করেন।
  • গুরু: তিনি বিখ্যাত বডিবিল্ডার এবং যোগগুরু বিষ্ণুচরণ ঘোষের (মহর্ষি পরমহংস যোগানন্দের ছোট ভাই) শিষ্য ছিলেন। গুরুর ছবি সামনে রেখে দ্রোণাচার্যের একলব্যের মতো নিষ্ঠা নিয়ে তিনি প্রথম দিকে ব্যায়াম সাধনা চালিয়ে যেতেন।

বডিবিল্ডিং ক্যারিয়ার ও সাফল্য

  • ১৯৩৯ সালে প্রথম প্রতিযোগিতায় নেমে সফল না হলেও তিনি দমে যাননি, বরং অনুশীলনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেন।
  • ১৯৪২ সালে তিনি ‘ইস্ট ইন্ডিয়ান বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপ’ এবং ১৯৪৭ সালে ‘অল ইন্ডিয়া বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপ’ জয় করেন।
  • মিস্টার ইউনিভার্স জয় (১৯৫১): লন্ডনের মঞ্চে তার সুগঠিত ও নান্দনিক শরীর দেখে দর্শকেরা মুগ্ধ হয়ে যান। বিশেষ করে তার ‘যীশু খ্রিস্ট’ পোজের (Jesus Christ posing routine) প্রদর্শনীটি অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রতিযোগিতা শেষে তার অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করত।

অবদান ও পরবর্তী জীবন

  • মিস্টার ইউনিভার্স জেতার পর ভারতে ফিরে তিনি ‘ইন্ডিয়ান বডিবিল্ডিং ফেডারেশন’ গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন এবং এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।
  • তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ল কলেজে আইন বিভাগে শরীরচর্চা ও যোগব্যায়ামের শিক্ষকতা করেন। পাশাপাশি তিনি শরীরচর্চার ওপর বইও লিখেছেন।
  • খালি হাতে স্টিলের রড বাঁকানোর মতো অবিশ্বাস্য শারীরিক শক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি।
  • তার মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র মলয় রায় (যিনি নিজে ৮ বারের মিস্টার ইন্ডিয়া এবং অর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত বডিবিল্ডার) পিতার প্রতিষ্ঠিত মাল্টিজিমটি পরিচালনা করেন। উল্লেখ্য, মলয় রায়কে সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ চলচ্চিত্রে কাশীর হোটেলের সেই ব্যায়ামবীরের ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখা গিয়েছিল।

২০০৫ সালের ২৯শে জুন কলকাতার একটি নার্সিং হোমে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৮৮ বছর বয়সে এই কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

৩. বাংলার শক্তিচর্চার আরেক রত্ন: গোবর গোহ

গোবর গোহ (জন্মনাম: যতীন চরণ গুহ; ১৩ মার্চ ১৮৯২ – ২ জানুয়ারি ১৯৭২) ছিলেন বাংলার শক্তিচর্চা ও কুস্তির ইতিহাসের এক অবিসংবাদিত কিংবদন্তি। ১৯২১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কুস্তি প্রতিযোগিতায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অ্যাড স্যানটেলকে (Ad Santel) পরাজিত করে তিনি প্রথম এশীয় হিসেবে বিশ্ব পেশাদার কুস্তি চ্যাম্পিয়নশিপ (World Light Heavyweight Championship) জয়ের এক অনন্য ও ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেন।

শরীরচর্চা ও কুস্তির ক্ষেত্রে তার পারিবারিক ঐতিহ্য, অবিশ্বাস্য শারীরিক ক্ষমতা এবং অবদান নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

পারিবারিক ঐতিহ্য ও হাতেখড়ি

  • কুস্তিগীর পরিবার: গোবর গোহ জন্মসূত্রে কলকাতার এক বিখ্যাত কুস্তিগীর পরিবারে এসেছিলেন। তার ঠাকুরদাদা আম্বিকা চরণ গুহ (অম্বু বাবু) ছিলেন বাংলার কুস্তি আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, যার আখড়ায় নামী-দামী সব কুস্তিগীর তৈরি হতেন।
  • প্রশিক্ষণ: শৈশবেই নিজের কাকা এবং তৎকালীন ভারতের অন্যতম সেরা কুস্তিগীর ক্ষেত্রচরণ গুহের কাছ থেকে তিনি কুস্তির প্রাথমিক পাঠ নেন। পরবর্তীতে তিনি বিখ্যাত কুস্তিগীর রহমানী পালোয়ানের কাছেও তালিম নেন।

কুস্তি ক্যারিয়ার ও আন্তর্জাতিক সাফল্য

  • ইউরোপ সফর (১৯১০-১৯১৩): মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ইউরোপ সফরে যান। সেখানে ইতালি, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স এবং অস্ট্রিয়ার সেরা কুস্তিগীরদের পরাজিত করে বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দেন। ১৯১৩ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক প্রতিযোগিতায় তিনি তৎকালীন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জর্জ হ্যাকেনস্মিডকে (George Hackenschmidt) কুস্তির চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন।
  • বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন শিরোপা (১৯২১): ১৯২০ সালে তিনি পুনরায় ইউরোপ ও আমেরিকা সফরে যান। ১৯২১ সালের ৩০ আগস্ট সান ফ্রান্সিসকোতে তৎকালীন ওয়ার্ল্ড লাইট হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন অ্যাড স্যানটেলের মুখোমুখি হন গোবর গোহ। ১ ঘণ্টা ৩ মিনিট স্থায়ী এক রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর তিনি স্যানটেলকে পরাস্ত করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের বেল্ট নিজের করে নেন।
  • শারীরিক গঠন: ৬ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতা এবং প্রায় ১২০ কেজি ওজনের গোবর গোহের সুগঠিত শরীর ও পেশীর সঞ্চালনা দেখে পশ্চিমা বিশ্ব হতবাক হয়ে গিয়েছিল।

কুস্তির নিজস্ব শৈলী ও অবদান

  • ‘গোহ স্টাইল’ উদ্ভাবন: তিনি ভারতীয় কুস্তির ঐতিহ্যবাহী কৌশলগুলোর সাথে পশ্চিমা ‘ক্যাচ-অ্যাস-ক্যাচ-ক্যান’ (Catch-as-catch-can) ও গ্রেকো-রোমান শৈলীর এক চমৎকার মিশ্রণ ঘটিয়ে কুস্তির একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব ঘরানা তৈরি করেন, যা কুস্তি মহলে ‘গোহ স্টাইল’ নামে পরিচিত ছিল।
  • আখড়া প্রতিষ্ঠা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি: ১৯৩৬ সালে তিনি কলকাতার হেদুয়ার কাছে (গোয়াবাগান এলাকায়) নিজের পারিবারিক আখড়াটি নতুন রূপে প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজ ‘গোবর গুহ’স জিমনেসিয়াম’ নামে পরিচিত। তার এই আখড়া থেকেই তৈরি হয়েছিলেন ভারতের বহু নামী কুস্তিগীর এবং পরবর্তীতে অলিম্পিয়ানরা।

কুস্তির পাশাপাশি তিনি ফুটবল এবং সংগীতের দারুণ অনুরাগী ছিলেন। বাংলার যুবসমাজকে শক্তিচর্চায় উদ্বুদ্ধ করার পেছনে এই বীর কুস্তিগীরের অবদান চিরস্মরণীয়। ১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি এই মহান ক্রীড়াবিদ কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সংক্ষেপিত পর্যালোচনা

মনোহর আইচ, মনতোষ রায় এবং গোবর গোহ—এই কিংবদন্তিরা প্রমাণ করেছেন যে শারীরিক সুস্থতা, অদম্য ইচ্ছা এবং সঠিক শৃঙ্খলার কাছে প্রতিকূল পরিস্থিতিও হার মানে। তাঁদের বর্ণাঢ্য জীবন ও প্রাকৃতিক শরীরচর্চার পদ্ধতি বর্তমান প্রজন্মের ফিটনেস প্রেমীদের জন্য এক অন্তহীন অনুপ্রেরণা।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

রবীন্দ্রনাথ

নিউজ ডেস্ক

October 12, 2026

শেয়ার করুন

  • প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
  • বিভাগ (Category): ইতিহাস, বাঙালি সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আন্দোলন
  • প্রকাশের তারিখ: ১২ অক্টোবর, ২০২৬
  • তথ্যসূত্র (Sources): ১৯৬৫ সালের যুদ্ধভিত্তিক ঐতিহাসিক দলিল, খাজা শাহাবুদ্দীনের বেতার নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত ঘোষণা, এবং বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রামাণ্য ইতিহাস।

বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াই এবং রাজনৈতিক মুক্তির ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অবিচ্ছেদ্য প্রেরণার নাম। বিশেষ করে পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭-১৯৭১) যখনই বাঙালির জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আগ্রাসনের “কালো মেঘ” ঘনিয়ে এসেছে, তখনই রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছিলেন প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।

সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সেই লড়াইয়ে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা ও প্রাসঙ্গিকতার মূল দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানে। তারা বাঙালি সংস্কৃতিকে “ইসলাম-বিরোধী” বা “ভারতীয় সংস্কৃতি” হিসেবে তকমা দিয়ে তা মুছে ফেলার চেষ্টা করে। এই কৃত্রিম সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রসাহিত্য ও রবীন্দ্রসংগীত বাঙালির জন্য আত্মপরিচয় রক্ষার ঢাল হিসেবে কাজ করেছিল।

২. রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও বুদ্ধিজীবীদের লড়াই

১৯৬১ সালে বিশ্বকবির জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে পাকিস্তানি সরকার নানা বাধা সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে বাঙালি তাদের সংস্কৃতির ওপর সরাসরি চরম আঘাত হিসেবে গণ্য করে।

  • এর প্রতিবাদে তৎকালীন পূর্ব বাংলার কবি, লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
  • ছায়ানটের মতো সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন ও রবীন্দ্রসংগীতের চর্চাকে আন্দোলনের রূপ দেয়।
  • এই লড়াইটি কেবল গান গাওয়ার অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছিল পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ সংগ্রাম।

৩. রাজনৈতিক আন্দোলনে রবীন্দ্রচেতনা

রাজনৈতিক শোষণের কালো মেঘ যখনই পূর্ব বাংলার আকাশকে গ্রাস করতে চেয়েছিল, তখনই রবীন্দ্রসংগীত বাঙালির মুক্তিকামী চেতনাকে উজ্জীবিত করেছে।

  • ছয় দফা ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান: ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি জনসভায় রবীন্দ্রসংগীতের পরিবেশনা ছিল নিয়মিত ঘটনা।
  • জাতীয় সংগীতের রূপরেখা: ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গানটি গেয়ে বাঙালি তাদের স্বাধীন সত্তার জানান দেয়, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্থান পায়।

৪. অন্ধত্ব ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে আলোকবর্তিকা

রবীন্দ্রনাথের দর্শন তার ভাল দিক কি কি ?

রবীন্দ্রনাথের দর্শন ছিল মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। পাকিস্তানি শাসকেরা যখন ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে বাঙালিদের বিভক্ত করতে চেয়েছিল, তখন রবীন্দ্র রচনাবলী বাঙালিকে শিখিয়েছে কীভাবে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে উদার ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন করতে হয়।

সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াই ও রাজনৈতিক মুক্তি অর্জনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দর্শন ও তার সৃষ্টির ইতিবাচক বা ভালো দিকগুলো ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। বাঙালির চেতনা গঠনে তার চিন্তাধারার প্রধান ভালো দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • অসাম্প্রদায়িক চেতনা: রবীন্দ্রনাথের পুরো দর্শনই ছিল মানুষের জয়গানে মুখর। তিনি ধর্ম, বর্ণ বা জাতির সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। পাকিস্তানি শাসকেরা যখন ধর্মকে পুঁজি করে বিভেদ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, তখন তাঁর এই অসাম্প্রদায়িক চিন্তা বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সাহায্য করেছে।
  • মানবিক মূল্যবোধ ও উদারতা: তাঁর সাহিত্য ও কবিতা মানুষকে কূপমণ্ডূকতা, অন্ধত্ব এবং কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে উদার হতে অনুপ্রাণিত করে। এটি সমাজের গোঁড়ামি দূর করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
  • ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অহংকার: রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাকে বিশ্বদরবারে এক অনন্য মর্যাদায় আসীন করেছেন। তাঁর সমৃদ্ধ সাহিত্যকর্মের কারণেই বাঙালি নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করার সাহস এবং শক্তি পেয়েছিল।
  • প্রতিরোধের মানসিকতা: তাঁর গান ও কবিতা (যেমন: “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে” বা “সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান”) যেকোনো অন্যায়, শোষণ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এবং প্রতিবাদ করার সাহস জোগায়।
  • প্রকৃতি ও স্বদেশের প্রতি নিখাদ প্রেম: তাঁর প্রতিটি দেশাত্মবোধক গান মানুষের মনে দেশের মাটির প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং দায়বদ্ধতা তৈরি করে, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দেশের মানুষের জন্য চরম আত্মত্যাগের মূল অনুপ্রেরণা ছিল।

রবীন্দ্রনাথের নেতিবাচক প্রচার ও সমালোচনার দিকগুলো

রবীন্দ্রনাথের চিন্তা, সাহিত্য এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদে তাঁর প্রভাবের কোনো বস্তুগত বা নৈতিক “খারাপ দিক” ছিল না। তবে, পাকিস্তান আমলের শাসকগোষ্ঠী ও কট্টরপন্থী মহল রবীন্দ্রচর্চাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিল এবং রবীন্দ্রচেতনার অতি-ব্যবহার নিয়ে পরবর্তী সময়ে কিছু সমাজতাত্ত্বিক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

সেই নেতিবাচক প্রচার ও সমালোচনার দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • পাকিস্তান সরকারের চোখে “ভারতের সাংস্কৃতিক আধিপত্য”: পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এবং তৎকালীন কট্টরপন্থী বুদ্ধিজীবীরা রবীন্দ্রনাথকে একজন “অমুসলিম এবং ভারতীয় কবি” হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, রবীন্দ্রচর্চার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানরা তাদের ইসলামী সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং ভারতের সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে মেনে নিচ্ছে।
  • বাঙালি সংস্কৃতির বুর্জোয়া বা উচ্চবিত্ত রূপায়ণ: সমাজতাত্ত্বিক ও বামপন্থী সমালোচকদের একাংশের মতে, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও দর্শন মূলত জোড়াসাঁকোর জমিদার পরিবারের জমিদারি আমেজ এবং উচ্চবিত্ত (বুর্জোয়া) শ্রেণির জীবনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। ফলে পাকিস্তানি আমলে রবীন্দ্রচর্চাকে যখন বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান প্রতীক করা হয়, তখন তা সাধারণ খেটে খাওয়া গ্রামীণ মানুষের সংস্কৃতির চেয়ে শহুরে উচ্চ-মধ্যবিত্তের সংস্কৃতিকেই বেশি প্রতিনিধিত্ব করেছিল।
  • অন্যান্য দেশীয় উপাদান উপেক্ষিত হওয়ার বিতর্ক: স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, বাঙালির সাংস্কৃতিক মুক্তির লড়াইয়ে রবীন্দ্রনাথের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীলতার কারণে বাংলার নিজস্ব লোকসংস্কৃতি (যেমন: লালন, হাসন রাজা বা গ্রামীণ লোকগান) এবং কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী ও গণমুখী চেতনা সাময়িকভাবে কিছুটা কম গুরুত্ব পেয়েছিল।

সংক্ষেপে, রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় কোনো ত্রুটি ছিল না; বরং তাঁর সৃষ্টিকে তৎকালীন পাকিস্তানি রাজনীতি যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছিল এবং পরবর্তীকালে রবীন্দ্রচর্চাকে যেভাবে শ্রেণি-স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে, সমালোচনাগুলো মূলত সেই চর্চাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত।

পাকিস্তান আমলে খাজা শাহাবুদ্দিনের রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধের যুক্তিগুলো

১৯৬৭ সালের ২২ জুন পাকিস্তানের তৎকালীন তথ্য ও বেতার মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন জাতীয় পরিষদে বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধের ঘোষণা দেন । এই সিদ্ধান্তের পেছনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের কট্টরপন্থী তল্পিবাহকদের প্রধান যুক্তিগুলো ছিল মূলত রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি ।

তাদের উত্থাপিত প্রধান যুক্তিগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • “পাকিস্তানের আদর্শের” পরিপন্থী: খাজা শাহাবুদ্দিনের মূল আনুষ্ঠানিক যুক্তি ছিল যে, রবীন্দ্রনাথের গান ও সৃষ্টি “পাকিস্তানি আদর্শের” (Ideology of Pakistan) সাথে খাপ খায় না । তিনি দাবি করেছিলেন, রেডিও-টেলিভিশনে এমন কোনো কিছু প্রচার করা যাবে না যা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শ ও সাংস্কৃতিক মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করে।
  • রবীন্দ্রনাথ আমাদের সংস্কৃতির অংশ নন: জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে খাজা শাহাবুদ্দিন সরাসরি মন্তব্য করেছিলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির কেউ নন” । তাঁর যুক্তি ছিল, যেহেতু রবীন্দ্রনাথ একজন অমুসলিম এবং তাঁর জীবন ও কর্মের মূল ভিত্তি ছিল অবিভক্ত ভারত (বিশেষ করে হিন্দু সংস্কৃতি-ঘেঁষা), তাই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তানের জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে তাকে গণ্য করা যায় না ।
  • “মুসলিম তমদ্দুন” বা ইসলামী সংস্কৃতির অবমাননা: সরকারের পক্ষ থেকে এবং তাদের সমর্থক কট্টরপন্থী বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, রবীন্দ্রসংগীতের ভাষা, সুর ও ধারণা পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম ঐতিহ্য বা “মুসলিম তমদ্দুনকে” অবজ্ঞা করে । তাদের মতে, রবীন্দ্রচর্চা বজায় রাখার অর্থ হলো পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া।
  • ভারতের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও রাজনৈতিক প্রচার: ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর এই রবীন্দ্র-বিরোধী মনোভাব আরও চরম আকার ধারণ করে । পাকিস্তানি শাসকদের যুক্তি ছিল, পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীতের জনপ্রিয়তা আসলে ভারতের মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যেরই অংশ। তারা দাবি করেছিল, রবীন্দ্রচর্চাকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচারণা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে

বাঙালির প্রতিক্রিয়া:
খাজা শাহাবুদ্দিনের এই সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক যুক্তিগুলোকে বাঙালি বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন । তৎকালীন পূর্ব বাংলার শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদলিপি প্রকাশ করেন এবং ছায়ানটের মতো সংগঠনগুলোর মাধ্যমে রবীন্দ্রসংগীতকে পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে প্রধান সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রতীক বানিয়ে তোলেন

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

বিশ্বসেরা বিজ্ঞানী

নিউজ ডেস্ক

October 11, 2026

শেয়ার করুন

  • প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
  • বিভাগ (Category): বিজ্ঞানের ইতিহাস, দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব
  • প্রকাশের তারিখ: ১১ অক্টোবর, ২০২৬
  • তথ্যসূত্র (Sources): Stanford Encyclopedia of Philosophy, Nobel Prize Archives, এবং Isaac Newton’s Theological Manuscripts.

সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের ধর্মীয়, ঈশ্বরসংক্রান্ত ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাস নিয়ে ইতিহাসবিদ, বিজ্ঞান লেখক এবং গবেষকদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে ব্যাপক আলোচনা ও গবেষণা চলমান। অনেক বিজ্ঞানী তাঁদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ডায়েরি বা ব্যক্তিগত চিঠিপত্রে লিপিবদ্ধ করেছেন, যা পরবর্তীতে তাঁদের মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস কেবল “আস্তিক” বা “নাস্তিক”—এই দুটি সরলরেখায় সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা প্রথাগত ঈশ্বরে বিশ্বাস (Theism/Deism), সর্বেশ্বরবাদ (Pantheism/Spinoza’s God), এবং সংশয়বাদ (Agnosticism)-এর মতো বহুমাত্রিক দর্শনে বিভক্ত ছিল।

১. প্রথাগত ঈশ্বরে বিশ্বাসী ও প্রজ্ঞাবান দেউইস্ট (Theist / Deist)

সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানীদের একটি বিশাল অংশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে মহাবিশ্বের সুনির্দিষ্ট গাণিতিক নিয়ম ও সুশৃঙ্খল নকশার পেছনে একজন স্রষ্টা বা প্রজ্ঞাবান সত্তা বিদ্যমান:

স্যার আইজ্যাক নিউটন (Sir Isaac Newton)

  • স্যার আইজ্যাক নিউটন (Sir Isaac Newton):স্যার আইজ্যাক নিউটনের জীবনের এই দিকটি সত্যিই অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। আমরা তাকে আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী হিসেবে জানলেও, ঐতিহাসিক তথ্য ও তাঁর নিজস্ব পাণ্ডুলিপি প্রমাণ করে যে তিনি বিজ্ঞানের চেয়ে ধর্মতত্ত্ব, বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী এবং অ্যালকেমি (Alchemy) চর্চায় অনেক বেশি সময় ব্যয় করেছিলেন। নিউটন এবং তাঁর এই ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও চমৎকার তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
  • বিপুল পরিমাণ ধর্মীয় লেখা: নিউটন জীবদ্দশায় যত পৃষ্ঠা লিখেছেন, তার সিংহভাগই ছিল ধর্মতত্ত্ব ও বাইবেলের ব্যাখ্যার ওপর। আনুমানিক হিসাবে, তিনি বিজ্ঞানের চেয়ে ধর্ম বিষয়ে প্রায় কয়েক গুণ বেশি (প্রায় ৩০ লক্ষ শব্দ) লিখে গেছেন।
  • ধর্মকে বিজ্ঞানের পরিপূরক ভাবা: নিউটনের কাছে বিজ্ঞান এবং ধর্ম আলাদা কোনো বিষয় ছিল না। তিনি মনে করতেন, মহাবিশ্বের প্রাকৃতিক নিয়মগুলো (যেমন অভিকর্ষ বা গতির সূত্র) আবিষ্কার করার অর্থ হলো ঈশ্বরের তৈরি করা নকশাকে আরও ভালোভাবে অনুধাবন করা।
  • মহাবিশ্বের সুশৃঙ্খলতা (Order of the Universe): আপনার উল্লেখ করা Principia গ্রন্থের উক্তিটি নিউটনের মূল দর্শনকে প্রকাশ করে। তিনি মনে করতেন, গ্রহগুলোর নিখুঁত কক্ষপথ এবং মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা কোনো দুর্ঘটনা হতে পারে না; এর পেছনে একজন ‘মহাজাগতিক স্থপতি’ (Divine Architect) রয়েছেন।
  • পৃথিবীর ধ্বংসের সময় গণনা: বাইবেলের বুক অব ড্যানিয়েল (Book of Daniel) এবং বুক অব রেভেলেশন (Book of Revelation) গভীরভাবে অধ্যয়ন করে নিউটন একটি হিসাব করেছিলেন। তাঁর গণনা অনুযায়ী, ২০৬০ সালের আগে এই পৃথিবী ধ্বংস বা বড় কোনো পরিবর্তনের মুখোমুখি হবে না। অবশ্য তিনি এটি ভবিষ্যৎবাণী হিসেবে নয়, বরং উগ্র ভবিষ্যৎবাণীকারীদের ভুল প্রমাণ করার জন্য হিসাব করেছিলেন।
  • নিউটনের এই গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্বাসই তাকে প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনে অনুপ্রাণিত করেছিল। বিজ্ঞান জগতের আরেক মহানায়ক আলবার্ট আইনস্টাইনও নিউটনের এই চিন্তাধারার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন।

গ্যালিলিও গ্যালিলি ও জোহানেস কেপলার:

  • গ্যালিলিও গ্যালিলি ও জোহানেস কেপলার:গ্যালিলিও গ্যালিলি এবং জোহানেস কেপলার—উভয়েই আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং তারা দুজনেই বিজ্ঞান চর্চাকে ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখতেন।
  • এই দুই মহান বিজ্ঞানীর আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক দর্শনের মূল দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
  • গ্যালিলিও গ্যালিলি এবং ঈশ্বরের ‘দুই গ্রন্থ’ দর্শন
  • গ্যালিলিও চার্চের সাথে দ্বন্দ্বে জড়ালেও (সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বের কারণে), তিনি নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস কখনো হারাননি।
  • প্রকৃতি ও বাইবেল: গ্যালিলিও একটি বিখ্যাত তত্ত্ব দিয়েছিলেন যে, ঈশ্বর মানুষের জন্য দুটি বই লিখেছেন—একটি হলো পবিত্র বাইবেল (The Book of Scripture) এবং অন্যটি হলো প্রকৃতি (The Book of Nature)। তিনি বলতেন, বাইবেল লেখা হয়েছে রূপক ভাষায় যাতে সাধারণ মানুষ নৈতিক পথ খুঁজে পায়, আর প্রকৃতি লেখা হয়েছে গণিতের ভাষায়। দুটিই যেহেতু একই ঈশ্বরের সৃষ্টি, তাই সত্যিকারের বিজ্ঞান এবং সত্যিকারের ধর্ম কখনো একে অপরের বিরোধী হতে পারে না।
  • একটি বিখ্যাত উক্তি: গ্যালিলিও লিখেছিলেন, “আমি এটা বিশ্বাস করতে বাধ্য নই যে, যে ঈশ্বর আমাদের ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি ও বিবেক দিয়েছেন, তিনি আমাদের এগুলোর ব্যবহার বন্ধ রাখতে বলেছেন।”
  • জোহানেস কেপলার এবং ‘ঈশ্বরের চিন্তা’
  • কেপলার প্রথমে ধর্মতত্ত্ব (Theology) নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন এবং যাজক হতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানে আসেন, তবে তার উদ্দেশ্য ছিল আধ্যাত্মিক।
  • মহাজাগতিক জ্যামিতি: কেপলার বিশ্বাস করতেন যে ঈশ্বর একজন মহান জ্যামিতিক কারিগর। তিনি যখন গ্রহের গতি সম্পর্কিত তিনটি বিখ্যাত সূত্র আবিষ্কার করেন, তখন তিনি আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে লিখেছিলেন যে, তিনি মূলত “ঈশ্বরের চিন্তাকে তাঁর পেছনে পেছনে পুনরায় ভাবছেন” (Thinking God’s thoughts after Him)।
  • উপাসনা হিসেবে বিজ্ঞান: কেপলার বিজ্ঞান চর্চাকে ঈশ্বরের এক ধরণের উপাসনা বা আরাধনা মনে করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মহাবিশ্বের গাণিতিক সামঞ্জস্য আবিষ্কার করার মাধ্যমে মানুষ ঈশ্বরের বুদ্ধিমত্তার সরাসরি প্রমাণ পায়।
  • এই দুই বিজ্ঞানীর জীবন ও দর্শন প্রমাণ করে যে, সপ্তদশ শতকের বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূচনা নাস্তিকতা থেকে হয়নি, বরং সৃষ্টিজগতের সুশৃঙ্খল নিয়মগুলোর পেছনে একজন বুদ্ধিমান সৃষ্টিকর্তাকে খোঁজার গভীর আগ্রহ থেকে হয়েছিল।

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ও ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ:

  • ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ও ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ: ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক এবং ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ-এর বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার মধ্যকার গভীর সম্পর্কের দর্শনের শ্রেষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। পদার্থের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরমাণু জগত নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তারা দুজনেই প্রকৃতির এমন এক সুশৃঙ্খল নকশা ও রহস্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যা তাদের মহাবিশ্বের পেছনে একটি উচ্চতর চেতনার অস্তিত্ব বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছিল।
  • এই দুই নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানীর চিন্তাধারাকে সংক্ষেপে এভাবে বিশ্লেষণ করা যায়:
  • ১. ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক (Max Planck): বিজ্ঞান ও ধর্মের পরিপূরকতা
  • ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক বিশ্বাস করতেন যে বিজ্ঞান ও ধর্ম একে অপরের শত্রু নয়, বরং তারা একই সত্যকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার দুটি মাধ্যম।
  • যুক্তি ও বিশ্বাস: তাঁর মতে, বিজ্ঞান মানুষকে বস্তুগত জগতের কার্যকারণ বুঝতে সাহায্য করে (যার প্রতীক হলো ‘যুক্তি’), আর ধর্ম মানুষকে জীবনের নৈতিক দিক ও মূল্যবোধ শেখায় (যার প্রতীক হলো ‘বিশ্বাস’)।
  • একটি বিখ্যাত দর্শন: ১৯৩৭ সালে তাঁর এক বিখ্যাত বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, “উভয় বিজ্ঞান এবং ধর্মের জন্য ঈশ্বরের অস্তিত্বই সমস্ত চিন্তার সূচনা।” তিনি মনে করতেন, পদার্থের গভীরে এমন কোনো স্বাধীন শক্তি নেই, বরং সমস্ত ম্যাটার বা পদার্থের পেছনে একটি সচেতন ও বুদ্ধিমান মনের (Conscious and Intelligent Mind) অস্তিত্ব রয়েছে।
  • ২. ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ (Werner Heisenberg): পাত্রের তলায় ঈশ্বরের অপেক্ষা
  • হাইজেনবার্গের এই উক্তিটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় ও গভীর ভাবার্থপূর্ণ একটি উক্তি। এর পেছনের মূল ভাবটি হলো:
  • অল্প বিদ্যার ফাঁদ: একজন মানুষ যখন বিজ্ঞান পড়া শুরু করে এবং প্রকৃতির ওপরের স্তরের কিছু নিয়ম (যেমন অভিকর্ষ বা রাসায়নিক বিক্রিয়া) শেখে, তখন তার মনে হতে পারে সবকিছুই যান্ত্রিক এবং এর জন্য কোনো সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন নেই। এটিই হলো বিজ্ঞানের পাত্র থেকে নেওয়া “প্রথম ঢোক”, যা মানুষকে সাময়িকভাবে নাস্তিক বা অহংকারী করে তুলতে পারে।
  • গভীর সত্যের সন্ধান: কিন্তু সেই মানুষটিই যখন বিজ্ঞানের গভীরে প্রবেশ করে—যেমনটা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অনিশ্চয়তা তত্ত্ব (Uncertainty Principle) বা মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করতে গেলে হয়—তখন সে দেখে যে প্রকৃতির নিয়মগুলো কত নিখুঁত, গাণিতিক এবং রহস্যময়। বিজ্ঞানের সেই চূড়ান্ত গভীরতাই হলো “পাত্রের তলা”, যেখানে পৌঁছালে মানুষ প্রকৃতির এই মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তার সামনে নত হতে বাধ্য হয়।
  • কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের এই দুই পথপ্রদর্শকের চিন্তাভাবনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিজ্ঞান যত আধুনিক ও সূক্ষ্ম হয়েছে, বিজ্ঞানীদের একাংশের মধ্যে মহাবিশ্বের পেছনের মূল চালিকাশক্তিকে জানার আধ্যাত্মিক আগ্রহ ততটাই তীব্র হয়েছে।

২. স্পিনোজার ঈশ্বর ও সার্বজনীন সুশৃঙ্খলা (Pantheism)

অনেকে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ঈশ্বর বা মানুষের রূপ দেওয়া স্রষ্টায় বিশ্বাস করতেন না, কিন্তু প্রকৃতির সুনির্দিষ্ট সৌন্দর্য ও ভৌত নিয়মকে ঈশ্বর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন:

[প্রথাগত ব্যক্তিগত ঈশ্বর প্রত্যাখ্যান] ➔ [মহাজাগতিক সুশৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণ] ➔ [প্রকৃতির নিয়মকেই ঈশ্বর মানা (Pantheism)]
  • আলবার্ট আইনস্টাইন (Albert Einstein): আইনস্টাইন স্পষ্ট করেছিলেন যে তিনি কোনো ব্যক্তিগত প্রাতিষ্ঠানিক ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না যিনি মানুষের বিচার করেন। তিনি বলতেন, “আমি স্পিনোজার ঈশ্বরে বিশ্বাস করি, যিনি বিদ্যমান সকল বস্তুর সুশৃঙ্খল সামঞ্জস্যের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করেন।” তিনি মহাবিশ্বের গাণিতিক নিখুঁত ভাবকে এক ধরণের আধ্যাত্মিক বিস্ময় (Cosmic Religious Feeling) বলে মনে করতেন।

৩. সংশয়বাদী ও বিবর্তনীয় দৃষ্টিভঙ্গি (Agnostic / Skeptic)

কিছু বিজ্ঞানী প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সরাসরি নাস্তিক হওয়ার চেয়ে নিজেদের সংশয়বাদী (Agnostic) বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন:

বিজ্ঞানী ও ক্ষেত্রবিশ্বাসের ধরনপ্রধান বক্তব্য ও ঐতিহাসিক প্রমাণ
চার্লস ডারউইন (বিবর্তনবাদ)সংশয়বাদী (Agnostic)জীবনের শেষভাগে তিনি জানান যে তিনি কখনোই চরম নাস্তিক ছিলেন না; বরং মহাবিশ্বের উৎপত্তি মানুষের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে সম্পূর্ণ বোঝা অসম্ভব বলে নিজেকে ‘Agnostic’ মনে করতেন।
নিকোলা টেসলা (তড়িৎ প্রকৌশল)বৈদিক ও বিশ্বজনীন চেতনাটেসলা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অনুশাসন না মানলেও বৈদিক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন এবং পুরো মহাবিশ্বকে শক্তি, কম্পন ও স্পন্দনের এক মহান উৎস মনে করতেন।
মাদাম কুরি (তেজস্ক্রিয়তা)ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদীব্যক্তিগত জীবনে পারিবারিক বিয়োগান্তক ঘটনার পর তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম থেকে দূরে সরে আসেন এবং বিজ্ঞান ও মানবসেবায় জীবন উৎসর্গ করেন।

সংক্ষেপিত পর্যালোচনা

ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, আধুনিক বিজ্ঞানের জন্ম ও বিকাশ ঘটেছে এমন বহু ভাবুকের হাত ধরে, যারা ঈশ্বর বা মহাজাগতিক চেতনায় গভীর আস্থাশীল ছিলেন। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস নিয়ে কট্টর কোনো একপেশে সিদ্ধান্ত টানার সুযোগ নেই; বরং সত্য অনুসন্ধান ও প্রকৃতিকে গভীরভাবে জানার ভালোবাসাই তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসে পৌঁছে দিয়েছিল।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

১লা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ