আন্তর্জাতিক

অপারেশন ডায়ামন্ড ( Operation Diamond )
মোসাদের 'অপারেশন ডায়মন্ড

নিউজ ডেস্ক

December 6, 2025

শেয়ার করুন

শত্রুর দেশে সিঁদ কেটে যুদ্ধবিমান ‘চুরি’, সোভিয়েতের তৈরি অত্যাধুনিক জেট গায়েব করে আরবের আকাশের দখল নেয় ইহুদিরা!

গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকে ইরাক থেকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি মিগ-২১ লড়াকু জেট ‘চুরি’ করে নিয়ে আসে ইহুদি গুপ্তচরবাহিনী মোসাদ। রুদ্ধশ্বাস সেই অভিযানের পোশাকি নাম ছিল ‘অপারেশন ডায়মন্ড’।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

এ যেন কোনও জনপ্রিয় হলিউড চলচ্চিত্র বা ওয়েব সিরিজ়ের চিত্রনাট্য, যেখানে শত্রু দেশের অত্যাধুনিক লড়াকু জেট ‘চুরি’ করে পালাবে এক দুঃসাহসী গুপ্তচর! কিন্তু কোনও কল্পকাহিনি নয়। গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকে জীবন বাজি রেখে এমনই এক রুদ্ধশ্বাস অভিযান চালায় মোসাদ, যা আরব দুনিয়ার যাবতীয় হিসাব উল্টে দিয়েছিল। ঘটনার এক বছরের মাথায় বিখ্যাত ছ’দিনের যুদ্ধে ত্রিমুখী জোটকে হেলায় হারিয়ে দিতে তাই কোনও সমস্যা হয়নি ইজ়রায়েলের।

ইহুদিদের ওই অভিযানের পোশাকি নাম ছিল ‘অপারেশন ডায়মন্ড’। ১৯৬৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে যা শুরু করে ইজ়রায়েলি গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ। এতে সাফল্য আসে ১৯৬৬ সালের ১৬ অগস্ট। ইরাকি বিমানবাহিনীর থেকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) তৈরি মিগ-২১ লড়াকু জেট উড়িয়ে নিজেদের ঘাঁটিতে নিয়ে আসে তারা। এই ‘চুরি’তে তেল আভিভের পাশাপাশি সুবিধা পেয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও। মস্কোর তৈরি যুদ্ধবিমানটির শক্তি এবং দুর্বলতা সংক্রান্ত যাবতীয় খুঁটিনাটি হস্তগত করে ওয়াশিংটন।

১৯৫৯ সালে সাবেক সোভিয়েত বিমানবাহিনীতে শামিল হয় মিগ-২১ লড়াকু জেট। কর্মজীবনের গোড়াতেই ভিয়েতনাম যুদ্ধে (১৯৫৫-’৭৫ সাল) শক্তি প্রদর্শন করে মস্কোর ওই ‘ব্রহ্মাস্ত্র’। এর সঙ্গে আকাশের লড়াইয়ে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলি এঁটে উঠতে পারেনি। ফলে অস্ত্রের বাজারে হু-হু করে বাড়তে থাকে মিগ-২১-এর কদর। ১৯৬১-’৬২ সালের মধ্যেই ক্রেমলিনের সাধের জেটটি আমদানি করে ফেলে একাধিক উপসাগরীয় আরব দেশ। ফলে প্রমাদ গোনে ইজ়রায়েল।

উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলিকে মিগ-২১ সরবরাহের নেপথ্যে তৎকালীন সোভিয়েত নেতৃত্বের ছিল অন্য ছক। ওই সময়ে আমেরিকার সঙ্গে ‘ঠান্ডা লড়াই’য়ে জড়িয়ে পড়ে মস্কো। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন প্রভাব কমাতে মরিয়া হয়ে ওঠে ক্রেমলিন। এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ ‘বন্ধু’ হিসাবে পরিচিত ইহুদিদের বিপদ বাড়াতে বিন্দুমাত্র দেরি করেনি তারা। ছক কষেই আরব দুনিয়ায় দেদার অস্ত্র বিক্রি করতে থাকেন সোভিয়েত নেতৃত্ব, যে তালিকায় ছিল মিগ-২১ জেটও।

মস্কোর এই বিপজ্জনক নীতি আঁচ করে নিতে ইহুদিদের বেশি সময় লাগেনি। তত দিনে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী বিমানবাহিনী তৈরি করে ফেলেছে ইজ়রায়েল। ফলে লড়াইয়ের গোড়াতেই শত্রুর আকাশ দখল করে ফেলার চাবিকাঠি ছিল তাঁদের হাতে। সেই সুবিধা হারিয়ে ফেললে তেল আভিভ যে অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়বে, তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি ইহুদি প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়েনের। আর তাই গুপ্তচরবাহিনী মোসাদকে শত্রুর ঘরে সিঁদ দিয়ে মিগ-২১ চুরির নির্দেশ দেন তিনি।

ওই সময়ে আরব দুনিয়ার দু’টি দেশের বায়ুসেনার বহরে ছিল মিগ-২১। তার মধ্যে একটি হল ইজ়রায়েলের প্রতিবেশী মিশর। আর তাই সোভিয়েত জেটটিকে চুরি করতে প্রথমে ‘পিরামিডের দেশ’কেই পাখির চোখ করে মোসাদ। এই কাজের দায়িত্ব জিন থমাস নামের এক এজেন্টকে দেয় ইহুদিদের গুপ্তচরবাহিনী। আদিব হান্না নামে কায়রোর এক লড়াকু জেট পাইলটের সঙ্গে খুব দ্রুত যোগাযোগ করে ফেলেন তিনি। ১০ লক্ষ ডলার ঘুষের বিনিময়ে মিগ-২১কে ইজ়রায়েলে উড়িয়ে নিয়ে যেতে রাজি হন আদিব।

থমাস যখন অভিযানের জাল গুটিয়ে এনেছেন, তখনই বিশ্বাসঘাতকতা করে বসেন ওই মিশরীয় পাইলট। ইহুদিদের যাবতীয় পরিকল্পনা কায়রোর সরকারের কাছে ফাঁস করে দেন তিনি। আদিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী থমাস-সহ পাঁচ জনকে গ্রেফতার করে ‘পিরামিডের দেশের’ পুলিশ। বিচারে মৃত্যুদণ্ড হয় তাঁদের। এর পর ইজ়রায়েলি গুপ্তচরদের ফাঁসিতে ঝোলাতে দেরি করেননি তৎকালীন মিশরীয় প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের।

মিশরের অভিযান ব্যর্থ হলেও হতোদ্যম হয়নি মোসাদ। বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন উদ্যমে কাজে লেগে পড়ে তারা। ‘পিরামিডের দেশ’ থেকে মিগ-২১ ‘চুরি’ করা একরকম অসম্ভব বুঝতে পেরে এ বার ইরাকের দিকে নজর ঘোরায় ইজ়রায়েলি গুপ্তচরবাহিনী। বাগদাদ বিমানবাহিনীর দু’জন পাইলটকে এই কাজের জন্য বিপুল টাকার লোভ দেখানো হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত এ ব্যাপারে রাজি হননি তাঁরা। ফলে ভেস্তে যায় তেল আভিভের দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও।

‘অপারেশন ডায়মন্ড’-এর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে ব্রিটিশ সাংবাদিক গর্ডন থমাসের লেখা ‘গিডিয়ান’স স্পাইস’ নামের বইতে। তাঁর দাবি, পর পর দু’বার ব্যর্থ হয়ে মোসাদ যখন কোনও কূলকিনারা পাচ্ছে না, ঠিক তখনই দেবদূতের মতো প্যারিসের দূতাবাসে হাজির হন এক ইহুদি এজেন্ট। ইরাকি বিমানবাহিনীর লড়াকু জেটের পাইলট মুনির রেদফার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি। ডলারের বিনিময়ে তাঁকে বশ করা যাবে বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন তিনি।

প্যারিসের দূতাবাস থেকে এই খবর মোসাদের সদর দফতরে পৌঁছোতেই হাতে চাঁদ পায় ইজ়রায়েল। এতটুকু সময় নষ্ট না করে রেদফার ব্যাপারে খোঁজখবর শুরু করে তারা। জানা যায়, খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তিনি। তা ছাড়া বিদ্রোহের অভিযোগ তুলে কুর্দ জনজাতির উপর হামলার জন্যও বাগদাদের সরকারের উপর বেজায় খাপ্পা ছিলেন ওই ইরাকি জেট পাইলট। আর তাই দেশ ছাড়ার ফিকির খুঁজছিলেন তিনি।

১৯৬৪ সালে এ-হেন রেদফার সঙ্গে যোগাযোগ করতে ‘জর্জ বেকন’ ছদ্মনামে একজন এজেন্টকে বাগদাদে পাঠায় মোসাদ। ইরাকে পৌঁছে নিজেকে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচয় দেন তিনি। সংশ্লিষ্ট জেট পাইলটের সঙ্গে দেখা করতে তাঁকে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। শেষে ফোরাত নদীর তীরে একটি পার্কে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন রেদফা। সেখানে একটি বেঞ্চে বসে কথা বলেন দু’জনে।

ইহুদি এজেন্টকে ইরাকি জেট পাইলট জানিয়ে দেন, মিগ-২১ ‘চুরি’র পারিশ্রমিক হিসাবে ১০ লক্ষ ডলার নেবেন তিনি। এই অর্থ তাঁর সুইস ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে পাঠাতে হবে ইজ়রায়েলকে। তা ছাড়া শর্ত হিসাবে পরিবারের ৪৩ জন সদস্যের নিরাপত্তার আশ্বাস চেয়েছিলেন রেদফা, যা দিতে রাজি হয়ে যায় তেল আভিভ। ফলে ধীরে ধীরে গতি পেতে থাকে ‘অপারেশন ডায়মন্ড’।

পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে রেদফার পরিবারের সদস্যদের ইরাক থেকে বার করে আনেন ইহুদি এজেন্টরা। তাঁদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হয়। তাঁকে টাকা দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন ইজ়রায়েলের তৎকালীন সামরিক প্রধান অ্যাইজ়্যাক রবিন। সুইস ব্যাঙ্কে ডলার পাঠানোর আগে বাগদাদের জেট পাইলটকে ডেকে পাঠান তিনি। ইহুদিভূমিতে পৌঁছে ‘চুরি’ করা লড়াকু জেট কোথায় অবতরণ করবে, তা দেখে নেন রেদফা।

অভিযানের কিছু দিন আগে স্ত্রী এবং কন্যাকে নিয়ে প্যারিসে যান ওই ইরাকি জেট পাইলট। সেখানেও ইহুদি এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। এর পর তাঁর পরিকল্পনার কথা স্ত্রীকে জানান রেদফা। এতে রেগে গিয়ে সব কিছু ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দেন রেদফার স্ত্রী। কোনওমতে তাঁকে শান্ত করেন ইজ়রায়েলি গুপ্তচরেরা। দেশে ফিরে স্ত্রীকে ইরান সীমান্তে পাঠিয়ে দেন রেদফা। সেখান থেকে কুর্দ বিদ্রোহীদের সাহায্যে সাবেক পারস্য দেশে ঢোকেন তিনি।

ইরান থেকে নিরাপদে রেদফার স্ত্রীকে ইহুদিভূমিতে নিয়ে আসে মোসাদ। এর পর মিগ-২১ ‘চুরি’ করার ক্ষেত্রে তাঁর সামনে আর কোনও বাধাই ছিল না। ১৯৬৬ সালের ১৬ অগস্ট প্রশিক্ষণের সময় সংশ্লিষ্ট জেটটি নিয়ে চম্পট দেন তিনি। প্রথমে তুরস্কের দিকে উড়ে যান রেদফা। সেখানে মাঝ-আকাশে তেল ভরে জর্ডনের উপর দিয়ে উড়ে ইজ়রায়েলে বিমান নিয়ে নামেন তিনি। গোটা অপারেশনে সময় লেগেছিল এক ঘণ্টার সামান্য বেশি।

মিগ-২১ নিয়ে রেদফা জর্ডনের আকাশে ঢুকতেই তাঁর জেট চিহ্নিত করে ফেলে সেখানকার বিমানবাহিনী। ওই সময়ে মাথা ঠান্ডা রেখে নিজেকে সিরিয়ার পাইলট বলে পরিচয় দেন তিনি। বলেন, প্রশিক্ষণ মিশন চলাকালীন রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে তাঁর জেট। ফলে সংশ্লিষ্ট মিগ-২১কে তাড়া করার কোনও তাগিদ জর্ডনের বায়ুসেনা অনুভব করেনি। রেদফাও নির্বিঘ্নে সেটা নিয়ে ইহুদিভূমিতে চলে আসতে পেরেছিলেন।

এর পর ইরাক থেকে চুরি করে আনা মিগ-২১-এর খুঁটিনাটি জানতে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীদের সাহায্য নিয়েছিল ইজ়রায়েল। অন্য দিকে এই ঘটনায় মস্কোর সঙ্গে বাগদাদের সম্পর্কে চিড় ধরে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ওই সময় ইহুদি বিমানবাহিনীর বহরে ছিল ফরাসি জেট মিরাজ়। ধারে ও ভারে সোভিয়েত যুদ্ধবিমানটির তুলনায় এর শক্তি ছিল অনেকটাই কম।

১৯৬৭ সালের জুনে ছ’দিনের যুদ্ধে আরব দুনিয়ার তিনটি দেশের সম্মিলিত বাহিনীকে পুরোপুরি পর্যুদস্ত করে ইজ়রায়েল। শুধু তা-ই নয়, মিশরের থেকে সিনাই উপদ্বীপ ও গাজ়া, সিরিয়ার থেকে গোলান মালভূমি এবং জর্ডনের ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক কব্জা করে ইহুদিবাহিনী। এই সাফল্যের নেপথ্যে ছিল আকাশযুদ্ধে তেল আভিভের অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠা, চার বছর আগে যার পরিকল্পনা করেছিলেন দূরদর্শী ডেভিন বেন-গুরিয়েন এবং মোসাদের গুপ্তচরেরা।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

শেখ হাসিনার ‘বিজেপি

নিউজ ডেস্ক

March 13, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

রাজনীতির মাঠে ‘স্মৃতিশক্তি’ বড় বিচিত্র এক বিষয়। প্রয়োজন ফুরোলে বা সমীকরণ বদলে গেলে নেতারা কত দ্রুত অতীতকে মুছে ফেলে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারেন, তার বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শেখ হাসিনার একদা করা বিজেপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার তুলনা। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি অতীতে এই দুই দলকেই একই রাজনৈতিক চরিত্রের বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। অথচ সময়ের বিবর্তনে সেই বিজেপি আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক অনিবার্য শক্তিকেন্দ্র।

১. ‘স্মৃতিশক্তি যখন রাজনীতির দাস’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন রাষ্ট্রনায়কের বক্তব্য শুধু বর্তমানের জন্য হয় না, তা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে। জামায়াতে ইসলামীর সাথে বিজেপিকে একই পাল্লায় মাপার সেই মন্তব্যটি মূলত বাবরি মসজিদ ইস্যু এবং তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ছিল। কিন্তু বর্তমানে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের যে ‘ফ্যাভিকল’ বন্ধন, তাতে এই পুরনো মন্তব্য যেন এক অমীমাংসিত অস্বস্তি। নরেন্দ্র মোদীর ‘অজ্ঞতা’ আসলে কোনো বিস্মৃতি নয়, বরং এটি কূটনীতির এক বিশেষ কৌশল—যেখানে অস্বস্তিকর অতীতকে উপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

২. আদভানি কানেকশন: এক রহস্যময় অতীত

প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, জামায়াত নেতাদের ভারত সফর এবং লালকৃষ্ণ আদভানির সাথে তাদের সংযোগ একদা বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিতর্কের ঝড় তুলেছিল। এখন প্রশ্ন উঠছে, যে দলটি ভারতের তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপির সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করেছিল, সেই দলটিই কেন পরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবল ভারতবিরোধী মেরুকরণের প্রধান শক্তি হয়ে উঠল? এই প্যারাডক্সটিই আজকের রাজনীতির সবচেয়ে বড় রহস্য।

৩. সোশ্যাল মিডিয়া ও ট্রল সংস্কৃতির প্রভাব

ডিজিটাল যুগে কিছুই হারিয়ে যায় না। নেটিজেনরা আজ পুরনো নিউজ ক্লিপিং খুঁড়ে বের করছেন, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য এক বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করছে। বিজেপির মতো শক্তিশালী দলের সাথে জামায়াতের তুলনাকে এখন ট্রলাররা ‘পলিটিক্যাল স্যাটায়ার’ হিসেবে দেখছেন। এটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ এখন রাজনীতির এই ‘ইউ-টার্ন’গুলোকে বেশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতেই পর্যবেক্ষণ করে।

৪. সুবিধাবাদ নাকি পরিস্থিতির দাবি?

রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই—এই প্রবাদের বাস্তব রূপ আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি। শেখ হাসিনার সেই সময়কার ‘লিবারেল’ ইমেজ বনাম বর্তমানের ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা—এই দুটি সত্তার সংঘাতই আসলে আমাদের বর্তমান কূটনীতির সারমর্ম। মোদীজির ‘বিস্মৃতি’ আসলে সেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞারই অংশ, যেখানে বন্ধুত্বের খাতিরে অতীতকে ঝেড়ে ফেলে ভবিষ্যতের লক্ষ্যপূরণই প্রধান কাজ।

বিডিএস বুলবুল আহমেদ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ:

রাজনৈতিক স্মৃতির এই সংকট কেবল শেখ হাসিনা বা নরেন্দ্র মোদীর নয়, এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক চিরন্তন রূপ। ইতিহাস যখন রাজনীতির দাস হয়ে যায়, তখন সত্যের চেয়ে সুবিধার পাল্লাই ভারি থাকে। আজকের এই ট্রল বা বিতর্ক হয়তো কিছুদিন পর চাপা পড়ে যাবে, কিন্তু এটি আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল যে, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বা মিত্র বাড়াতে নেতারা কত সহজে নিজের পুরনো অবস্থান বদলে ফেলতে পারেন। আর সাধারণ মানুষ? তারা কেবলই দর্শক, যারা এই ‘ইতিহাসের বিস্মৃতি’ দেখে মুচকি হাসে!


বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

দেশের রাজনৈতিক বিবর্তন ও সমসাময়িক খবরের গভীর বিশ্লেষণ পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

সূত্র: ১. তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদপত্রের আর্কাইভ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রতিবেদন। ২. দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক ও ক্ষমতার পালাবদল বিষয়ক বিশ্লেষণ।

ইরান-ইসরায়েল

নিউজ ডেস্ক

March 13, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

ইরান ও ইসরায়েলের সম্পর্কের সমীকরণটি আধুনিক ভূ-রাজনীতির অন্যতম জটিল ও রহস্যময় অধ্যায়। ১৯৫০-এর দশকে যে ইরান ছিল ইসরায়েলের কৌশলগত মিত্র, আজ সেই ইরান ও ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান দুই শত্রু রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এই বৈরিতার মূল কারণ কি কেবল ধর্মীয় আদর্শ, নাকি এর পেছনে রয়েছে টিকে থাকার গভীর রাজনৈতিক প্রকৌশল?

১. ঐতিহাসিক বাঁকবদল: মিত্র থেকে শত্রু

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগ পর্যন্ত ইরান ছিল ইসরায়েলের অন্যতম মিত্র। তৎকালীন শাহের শাসনামলে ইরান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং সোভিয়েত প্রভাব ঠেকানোর জন্য তারা গোপন সামরিক সহযোগিতা বজায় রাখত। এমনকি ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও ইসরায়েল থেকে গোপনে অস্ত্র কেনার ইতিহাস রয়েছে ইরানের। তবে আয়াতুল্লাহ খোমেনীর ক্ষমতা গ্রহণের পর এই সম্পর্কের খোলনলচে বদলে যায়। তেহরানে অবস্থিত ইসরায়েলি দূতাবাসকে প্যালেস্টাইনের দূতাবাসে রূপান্তর করার মাধ্যমে ইরান স্পষ্ট করে দেয় তাদের নতুন রাজনৈতিক এজেন্ডা।

২. দ্বন্দ্বে আদর্শ বনাম বাস্তব রাজনীতি

ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে কোনো সাধারণ সীমান্ত না থাকা সত্ত্বেও কেন এই চরম শত্রুতা?

  • পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা: ইসরায়েলের মূল ভয় হলো ইরানের পারমাণবিক ক্ষমতা। নেতানিয়াহুর ভাষায় ইরানকে ‘মিথ্যাবাদী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তারা নিয়মিত ইরানি বিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তাদের টার্গেট করছে।
  • অস্তিত্বের সংকট: ইরান ইসরায়েলকে ‘ছোট শয়তান’ এবং আমেরিকাকে ‘গ্রেট শয়তান’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। এই বয়ানটি ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে অভ্যন্তরীণভাবে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে এবং তরুণ প্রজন্মের মাঝে ‘অ্যান্টি-জায়নিস্ট’ আবেগ জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করে।

৩. ছায়াযুদ্ধ (Proxy War): টিকে থাকার কৌশল

সরাসরি যুদ্ধের সামর্থ্য বা আকাঙ্ক্ষা—দুইয়ের অভাবেই ইরান ও ইসরায়েল সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়ে ‘ছায়াযুদ্ধ’ চালিয়ে যাচ্ছে।

  • ইরানের প্রক্সি: লেবাননের হিজবুল্লাহ, সিরিয়ার শিয়া মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুতিদের মাধ্যমে ইসরায়েলের সীমান্তে অস্থিরতা তৈরি করা ইরানের কৌশল।
  • ইসরায়েলের মোসাদ: মোসাদের নিখুঁত গোয়েন্দা সক্ষমতা ইরানের পরমাণু কর্মসূচীকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। জেনারেল ও বিজ্ঞানীদের হত্যা ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

৪. মৌলবাদ ও ক্ষমতার টিকে থাকা

রাজনীতিবিদদের জন্য ‘কাল্পনিক শত্রু’ তৈরি করা একটি চিরাচরিত কৌশল। যেমনটা বিভিন্ন দেশে জাতীয়তাবাদী দলগুলো করে থাকে, ইরানও তেমনি ইসরায়েল বিরোধিতাকে পুঁজি করে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ও দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপকে আড়াল করছে। অন্যদিকে, উগ্রপন্থী ইহুদিদের জন্য ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ বা নিরাপত্তার ইস্যুটি তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।

বিডিএস বুলবুল আহমেদ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ:

ইরান ও ইসরায়েলের দ্বন্দ্ব কেবল দুটি রাষ্ট্রের যুদ্ধ নয়, এটি ক্ষমতার টিকে থাকার লড়াই। ইরান জানে সরাসরি যুদ্ধ করলে তারা দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের উন্নত প্রযুক্তি ও মার্কিন সমর্থিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে টিকতে পারবে না। একইভাবে ইসরায়েলও জানে, ইরানকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব নয়। ফলে এই ‘ছায়াযুদ্ধ’ই যেন উভয় রাষ্ট্রের জন্য ‘কমফোর্ট জোন’। যতদিন পর্যন্ত এই শত্রুতা তাদের নিজ নিজ দেশে জনমত গঠন ও ক্ষমতায় টিকে থাকতে সাহায্য করবে, ততদিন সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে এই উত্তেজনাকর শীতল যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে।


বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বিশ্ব রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের গভীর বিশ্লেষণ পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।


সূত্র: ১. ইরান ও ইসরায়েলের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক রেকর্ডসমূহ। ২. আধুনিক ভূ-রাজনীতি ও প্রক্সি যুদ্ধের কৌশল বিষয়ক গবেষণাপত্র। ৩. ইরান-কনট্রা চুক্তি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।

ট্রাম্প-এপস্টিন গোল্ডেন মূর্তি

নিউজ ডেস্ক

March 13, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হলো শিল্পকলা। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মলের সামনে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জেফরি এপস্টিনকে নিয়ে তৈরি গোল্ডেন মূর্তিটি বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল ও প্রথাগত মিডিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। টাইটানিক সিনেমার সেই বিখ্যাত পোজকে পুঁজি করে তৈরি করা এই ‘কিং অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ মূর্তিটি কেবল একটি ভাস্কর্য নয়, বরং এটি আধুনিক রাজনৈতিক সমালোচনার এক অনন্য উদাহরণ।

১. ব্যাঙ্গাত্মক শিল্প ও জনমতের বহিঃপ্রকাশ

শিল্পের কাজই হলো সমাজের অসঙ্গতিকে ব্যঙ্গ বা রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরা। ট্রাম্প ও এপস্টিনের এই মূর্তিটি নির্মাণ করে এর নির্মাতারা কী বার্তা দিতে চেয়েছেন, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।

  • প্রতীকী অর্থ: ভুঁড়ির চাপের নিচে এপস্টিনের এই বাঁকা হয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি যেন ক্ষমতার ভার এবং বিতর্কিত সম্পর্কের এক দৃশ্যমান রূপক।
  • ভ্যানিটি ও ক্ষমতা: স্বর্ণালী রঙের ব্যবহার এখানে প্রাচুর্য ও আভিজাত্যের চেয়ে বরং ‘ভ্যানিটি’ বা দম্ভের প্রতি ইঙ্গিত দিচ্ছে।

২. বাক-স্বাধীনতা বনাম সেন্সরশিপ

আপনার পর্যবেক্ষণের সাথে একমত হওয়া যায় যে, সিভিক লিবার্টি বা নাগরিক স্বাধীনতা যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশের মেরুদণ্ড।

  • সহনশীলতার পরীক্ষা: রাষ্ট্রনায়ক বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে এমন কড়া ট্রল বা শিল্পকর্ম তৈরি করার পর যদি প্রশাসন তা মুখ বুজে হজম করে, তবেই বোঝা যায় সেই দেশের বাক-স্বাধীনতা কতটা মজবুত।
  • আমাদের প্রেক্ষাপট: উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনীতিতে এখনো এমন শিল্পকর্ম বা ট্রল করার ক্ষেত্রে যে ভীতি কাজ করে, তা আমাদের সিভিক লিবার্টির সীমাবদ্ধতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। সেন্সরশিপ-মুক্ত সমাজ না থাকলে একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ থমকে যায়।

৩. ট্রল সংস্কৃতির প্রভাব

বর্তমান বিশ্বে মেম (Meme) বা ট্রল হলো জনপ্রিয় রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা। যখন কোনো নেতাকে বা কোনো ইস্যুকে নিয়ে এমন ‘নেক্সট লেভেল ফ্যান্টাসি’ তৈরি হয়, তখন সাধারণ জনগণ নিজের অজান্তেই রাজনীতির জটিল অংশগুলোকে বুঝতে পারে। আপনার প্রস্তাবিত ‘নেতানিয়াহু-ট্রাম্প টাট্টু ঘোড়া’র দৃশ্যটি বা এমন যেকোনো কাল্পনিক রূপক আসলে শাসকের ক্ষমতাকে ‘ডি-মিথোলাইজ’ বা ক্ষমতা থেকে দেবতুল্য ভাবমূর্তি সরিয়ে মানুষে রূপান্তর করতে সাহায্য করে।

বিডিএস বুলবুল আহমেদ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ:

মূর্তির সৌন্দর্য বা এর কুৎসিত দিক নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু এটি যে একটি ‘পাওয়ারফুল স্টেটমেন্ট’, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিকেও যখন এমন বিদ্রূপের শিকার হতে হয়, তখন এটিই প্রমাণ করে যে—ক্ষমতা চূড়ান্ত নয়, বরং জনগণ ও শিল্পই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী। আমাদের সমাজে যদি একদিন এমন রাজনৈতিক পরিপক্কতা আসে, যেখানে শিল্পীকে তার শিল্পের জন্য নির্যাতনের শিকার হতে হবে না—সেটাই হবে প্রকৃত গণতান্ত্রিক বিজয়।

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বিশ্ব রাজনীতি ও সমাজকাঠামোর গভীর বিশ্লেষণ পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

সূত্র: ১. ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মলের রাজনৈতিক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদন। ২. রাজনৈতিক বিদ্রূপ ও বাক-স্বাধীনতা বিষয়ক তুলনামূলক সমাজতাত্ত্বিক আলোচনা।

৩রা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ