আন্তর্জাতিক

অপারেশন ডায়ামন্ড ( Operation Diamond )
মোসাদের 'অপারেশন ডায়মন্ড

নিউজ ডেস্ক

December 6, 2025

শেয়ার করুন

শত্রুর দেশে সিঁদ কেটে যুদ্ধবিমান ‘চুরি’, সোভিয়েতের তৈরি অত্যাধুনিক জেট গায়েব করে আরবের আকাশের দখল নেয় ইহুদিরা!

গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকে ইরাক থেকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি মিগ-২১ লড়াকু জেট ‘চুরি’ করে নিয়ে আসে ইহুদি গুপ্তচরবাহিনী মোসাদ। রুদ্ধশ্বাস সেই অভিযানের পোশাকি নাম ছিল ‘অপারেশন ডায়মন্ড’।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

এ যেন কোনও জনপ্রিয় হলিউড চলচ্চিত্র বা ওয়েব সিরিজ়ের চিত্রনাট্য, যেখানে শত্রু দেশের অত্যাধুনিক লড়াকু জেট ‘চুরি’ করে পালাবে এক দুঃসাহসী গুপ্তচর! কিন্তু কোনও কল্পকাহিনি নয়। গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকে জীবন বাজি রেখে এমনই এক রুদ্ধশ্বাস অভিযান চালায় মোসাদ, যা আরব দুনিয়ার যাবতীয় হিসাব উল্টে দিয়েছিল। ঘটনার এক বছরের মাথায় বিখ্যাত ছ’দিনের যুদ্ধে ত্রিমুখী জোটকে হেলায় হারিয়ে দিতে তাই কোনও সমস্যা হয়নি ইজ়রায়েলের।

ইহুদিদের ওই অভিযানের পোশাকি নাম ছিল ‘অপারেশন ডায়মন্ড’। ১৯৬৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে যা শুরু করে ইজ়রায়েলি গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ। এতে সাফল্য আসে ১৯৬৬ সালের ১৬ অগস্ট। ইরাকি বিমানবাহিনীর থেকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) তৈরি মিগ-২১ লড়াকু জেট উড়িয়ে নিজেদের ঘাঁটিতে নিয়ে আসে তারা। এই ‘চুরি’তে তেল আভিভের পাশাপাশি সুবিধা পেয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও। মস্কোর তৈরি যুদ্ধবিমানটির শক্তি এবং দুর্বলতা সংক্রান্ত যাবতীয় খুঁটিনাটি হস্তগত করে ওয়াশিংটন।

১৯৫৯ সালে সাবেক সোভিয়েত বিমানবাহিনীতে শামিল হয় মিগ-২১ লড়াকু জেট। কর্মজীবনের গোড়াতেই ভিয়েতনাম যুদ্ধে (১৯৫৫-’৭৫ সাল) শক্তি প্রদর্শন করে মস্কোর ওই ‘ব্রহ্মাস্ত্র’। এর সঙ্গে আকাশের লড়াইয়ে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলি এঁটে উঠতে পারেনি। ফলে অস্ত্রের বাজারে হু-হু করে বাড়তে থাকে মিগ-২১-এর কদর। ১৯৬১-’৬২ সালের মধ্যেই ক্রেমলিনের সাধের জেটটি আমদানি করে ফেলে একাধিক উপসাগরীয় আরব দেশ। ফলে প্রমাদ গোনে ইজ়রায়েল।

উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলিকে মিগ-২১ সরবরাহের নেপথ্যে তৎকালীন সোভিয়েত নেতৃত্বের ছিল অন্য ছক। ওই সময়ে আমেরিকার সঙ্গে ‘ঠান্ডা লড়াই’য়ে জড়িয়ে পড়ে মস্কো। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন প্রভাব কমাতে মরিয়া হয়ে ওঠে ক্রেমলিন। এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ ‘বন্ধু’ হিসাবে পরিচিত ইহুদিদের বিপদ বাড়াতে বিন্দুমাত্র দেরি করেনি তারা। ছক কষেই আরব দুনিয়ায় দেদার অস্ত্র বিক্রি করতে থাকেন সোভিয়েত নেতৃত্ব, যে তালিকায় ছিল মিগ-২১ জেটও।

মস্কোর এই বিপজ্জনক নীতি আঁচ করে নিতে ইহুদিদের বেশি সময় লাগেনি। তত দিনে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী বিমানবাহিনী তৈরি করে ফেলেছে ইজ়রায়েল। ফলে লড়াইয়ের গোড়াতেই শত্রুর আকাশ দখল করে ফেলার চাবিকাঠি ছিল তাঁদের হাতে। সেই সুবিধা হারিয়ে ফেললে তেল আভিভ যে অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়বে, তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি ইহুদি প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়েনের। আর তাই গুপ্তচরবাহিনী মোসাদকে শত্রুর ঘরে সিঁদ দিয়ে মিগ-২১ চুরির নির্দেশ দেন তিনি।

ওই সময়ে আরব দুনিয়ার দু’টি দেশের বায়ুসেনার বহরে ছিল মিগ-২১। তার মধ্যে একটি হল ইজ়রায়েলের প্রতিবেশী মিশর। আর তাই সোভিয়েত জেটটিকে চুরি করতে প্রথমে ‘পিরামিডের দেশ’কেই পাখির চোখ করে মোসাদ। এই কাজের দায়িত্ব জিন থমাস নামের এক এজেন্টকে দেয় ইহুদিদের গুপ্তচরবাহিনী। আদিব হান্না নামে কায়রোর এক লড়াকু জেট পাইলটের সঙ্গে খুব দ্রুত যোগাযোগ করে ফেলেন তিনি। ১০ লক্ষ ডলার ঘুষের বিনিময়ে মিগ-২১কে ইজ়রায়েলে উড়িয়ে নিয়ে যেতে রাজি হন আদিব।

থমাস যখন অভিযানের জাল গুটিয়ে এনেছেন, তখনই বিশ্বাসঘাতকতা করে বসেন ওই মিশরীয় পাইলট। ইহুদিদের যাবতীয় পরিকল্পনা কায়রোর সরকারের কাছে ফাঁস করে দেন তিনি। আদিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী থমাস-সহ পাঁচ জনকে গ্রেফতার করে ‘পিরামিডের দেশের’ পুলিশ। বিচারে মৃত্যুদণ্ড হয় তাঁদের। এর পর ইজ়রায়েলি গুপ্তচরদের ফাঁসিতে ঝোলাতে দেরি করেননি তৎকালীন মিশরীয় প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের।

মিশরের অভিযান ব্যর্থ হলেও হতোদ্যম হয়নি মোসাদ। বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন উদ্যমে কাজে লেগে পড়ে তারা। ‘পিরামিডের দেশ’ থেকে মিগ-২১ ‘চুরি’ করা একরকম অসম্ভব বুঝতে পেরে এ বার ইরাকের দিকে নজর ঘোরায় ইজ়রায়েলি গুপ্তচরবাহিনী। বাগদাদ বিমানবাহিনীর দু’জন পাইলটকে এই কাজের জন্য বিপুল টাকার লোভ দেখানো হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত এ ব্যাপারে রাজি হননি তাঁরা। ফলে ভেস্তে যায় তেল আভিভের দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও।

‘অপারেশন ডায়মন্ড’-এর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে ব্রিটিশ সাংবাদিক গর্ডন থমাসের লেখা ‘গিডিয়ান’স স্পাইস’ নামের বইতে। তাঁর দাবি, পর পর দু’বার ব্যর্থ হয়ে মোসাদ যখন কোনও কূলকিনারা পাচ্ছে না, ঠিক তখনই দেবদূতের মতো প্যারিসের দূতাবাসে হাজির হন এক ইহুদি এজেন্ট। ইরাকি বিমানবাহিনীর লড়াকু জেটের পাইলট মুনির রেদফার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি। ডলারের বিনিময়ে তাঁকে বশ করা যাবে বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন তিনি।

প্যারিসের দূতাবাস থেকে এই খবর মোসাদের সদর দফতরে পৌঁছোতেই হাতে চাঁদ পায় ইজ়রায়েল। এতটুকু সময় নষ্ট না করে রেদফার ব্যাপারে খোঁজখবর শুরু করে তারা। জানা যায়, খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তিনি। তা ছাড়া বিদ্রোহের অভিযোগ তুলে কুর্দ জনজাতির উপর হামলার জন্যও বাগদাদের সরকারের উপর বেজায় খাপ্পা ছিলেন ওই ইরাকি জেট পাইলট। আর তাই দেশ ছাড়ার ফিকির খুঁজছিলেন তিনি।

১৯৬৪ সালে এ-হেন রেদফার সঙ্গে যোগাযোগ করতে ‘জর্জ বেকন’ ছদ্মনামে একজন এজেন্টকে বাগদাদে পাঠায় মোসাদ। ইরাকে পৌঁছে নিজেকে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচয় দেন তিনি। সংশ্লিষ্ট জেট পাইলটের সঙ্গে দেখা করতে তাঁকে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। শেষে ফোরাত নদীর তীরে একটি পার্কে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন রেদফা। সেখানে একটি বেঞ্চে বসে কথা বলেন দু’জনে।

ইহুদি এজেন্টকে ইরাকি জেট পাইলট জানিয়ে দেন, মিগ-২১ ‘চুরি’র পারিশ্রমিক হিসাবে ১০ লক্ষ ডলার নেবেন তিনি। এই অর্থ তাঁর সুইস ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে পাঠাতে হবে ইজ়রায়েলকে। তা ছাড়া শর্ত হিসাবে পরিবারের ৪৩ জন সদস্যের নিরাপত্তার আশ্বাস চেয়েছিলেন রেদফা, যা দিতে রাজি হয়ে যায় তেল আভিভ। ফলে ধীরে ধীরে গতি পেতে থাকে ‘অপারেশন ডায়মন্ড’।

পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে রেদফার পরিবারের সদস্যদের ইরাক থেকে বার করে আনেন ইহুদি এজেন্টরা। তাঁদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হয়। তাঁকে টাকা দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন ইজ়রায়েলের তৎকালীন সামরিক প্রধান অ্যাইজ়্যাক রবিন। সুইস ব্যাঙ্কে ডলার পাঠানোর আগে বাগদাদের জেট পাইলটকে ডেকে পাঠান তিনি। ইহুদিভূমিতে পৌঁছে ‘চুরি’ করা লড়াকু জেট কোথায় অবতরণ করবে, তা দেখে নেন রেদফা।

অভিযানের কিছু দিন আগে স্ত্রী এবং কন্যাকে নিয়ে প্যারিসে যান ওই ইরাকি জেট পাইলট। সেখানেও ইহুদি এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। এর পর তাঁর পরিকল্পনার কথা স্ত্রীকে জানান রেদফা। এতে রেগে গিয়ে সব কিছু ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দেন রেদফার স্ত্রী। কোনওমতে তাঁকে শান্ত করেন ইজ়রায়েলি গুপ্তচরেরা। দেশে ফিরে স্ত্রীকে ইরান সীমান্তে পাঠিয়ে দেন রেদফা। সেখান থেকে কুর্দ বিদ্রোহীদের সাহায্যে সাবেক পারস্য দেশে ঢোকেন তিনি।

ইরান থেকে নিরাপদে রেদফার স্ত্রীকে ইহুদিভূমিতে নিয়ে আসে মোসাদ। এর পর মিগ-২১ ‘চুরি’ করার ক্ষেত্রে তাঁর সামনে আর কোনও বাধাই ছিল না। ১৯৬৬ সালের ১৬ অগস্ট প্রশিক্ষণের সময় সংশ্লিষ্ট জেটটি নিয়ে চম্পট দেন তিনি। প্রথমে তুরস্কের দিকে উড়ে যান রেদফা। সেখানে মাঝ-আকাশে তেল ভরে জর্ডনের উপর দিয়ে উড়ে ইজ়রায়েলে বিমান নিয়ে নামেন তিনি। গোটা অপারেশনে সময় লেগেছিল এক ঘণ্টার সামান্য বেশি।

মিগ-২১ নিয়ে রেদফা জর্ডনের আকাশে ঢুকতেই তাঁর জেট চিহ্নিত করে ফেলে সেখানকার বিমানবাহিনী। ওই সময়ে মাথা ঠান্ডা রেখে নিজেকে সিরিয়ার পাইলট বলে পরিচয় দেন তিনি। বলেন, প্রশিক্ষণ মিশন চলাকালীন রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে তাঁর জেট। ফলে সংশ্লিষ্ট মিগ-২১কে তাড়া করার কোনও তাগিদ জর্ডনের বায়ুসেনা অনুভব করেনি। রেদফাও নির্বিঘ্নে সেটা নিয়ে ইহুদিভূমিতে চলে আসতে পেরেছিলেন।

এর পর ইরাক থেকে চুরি করে আনা মিগ-২১-এর খুঁটিনাটি জানতে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীদের সাহায্য নিয়েছিল ইজ়রায়েল। অন্য দিকে এই ঘটনায় মস্কোর সঙ্গে বাগদাদের সম্পর্কে চিড় ধরে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ওই সময় ইহুদি বিমানবাহিনীর বহরে ছিল ফরাসি জেট মিরাজ়। ধারে ও ভারে সোভিয়েত যুদ্ধবিমানটির তুলনায় এর শক্তি ছিল অনেকটাই কম।

১৯৬৭ সালের জুনে ছ’দিনের যুদ্ধে আরব দুনিয়ার তিনটি দেশের সম্মিলিত বাহিনীকে পুরোপুরি পর্যুদস্ত করে ইজ়রায়েল। শুধু তা-ই নয়, মিশরের থেকে সিনাই উপদ্বীপ ও গাজ়া, সিরিয়ার থেকে গোলান মালভূমি এবং জর্ডনের ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক কব্জা করে ইহুদিবাহিনী। এই সাফল্যের নেপথ্যে ছিল আকাশযুদ্ধে তেল আভিভের অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠা, চার বছর আগে যার পরিকল্পনা করেছিলেন দূরদর্শী ডেভিন বেন-গুরিয়েন এবং মোসাদের গুপ্তচরেরা।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Vantablack

নিউজ ডেস্ক

July 10, 2026

শেয়ার করুন

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিল্পকলা ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

কন্টেন্ট লেখক ও প্রধান সম্পাদক: বিডিএস ভুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant)

সর্বশেষ আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬

মহাবিশ্বের ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বরের নাম আমরা সবাই শুনেছি, যা তার ভেতর দিয়ে যাওয়া সমস্ত আলোকে গিলে ফেলে। কিন্তু পৃথিবীতেই যদি এমন কোনো উপাদান তৈরি করা যায় যা অবিকল ব্ল্যাক হোলের মতো আচরণ করবে? ন্যানো-প্রযুক্তির এক অবিশ্বাস্য বিস্ময় হলো ভ্যান্টাব্ল্যাক (Vantablack)। এটি কোনো সাধারণ আলকাতরা, রং বা কৃত্রিম পিগমেন্ট নয়; এটি হলো ল্যাবরেটরিতে তৈরি এমন এক আণবিক কাঠামো, যা মানুষের দেখার অনুভূতিকেই চ্যালেঞ্জ করে।

আমি বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant), আমার দীর্ঘ ৬ বছরের ডিজিটাল কন্টেন্ট ও স্ট্রাকচারিং অভিজ্ঞতার আলোকে ভ্যান্টাব্ল্যাকের নিখুঁত বিজ্ঞান, এর বিস্ময়কর সামরিক ও মহাকাশ ব্যবহার এবং শিল্পকলার ইতিহাসের সবচেয়ে হাস্যকর ও আলোচিত ‘কালার-ওয়ার’ বা রঙের যুদ্ধ নিয়ে একটি সম্পূর্ণ তথ্যবহুল ‘রিলিজ-রেডি’ মেগা গাইডলাইন নিচে উপস্থাপন করছি।

পার্ট ১: ভ্যান্টাব্ল্যাক-এর পেছনের আণবিক বিজ্ঞান

২০১৪ সালে ব্রিটিশ ন্যানোটেকনোলজি কোম্পানি সুরি ন্যানোসিস্টেমস (Surrey NanoSystems) সম্পূর্ণ কৃত্রিমভাবে এই উপাদানটি উদ্ভাবন করে। ভ্যান্টাব্ল্যাক দৃশ্যমান আলোর ৯৯.৯৬৫% পর্যন্ত শোষণ করে নিতে পারে।

নামের রহস্য ও গঠন:

VANTA শব্দটির একটি সুনির্দিষ্ট পূর্ণরূপ রয়েছে: Vertically Aligned NanoTube Arrays (উল্লম্বভাবে সারিবদ্ধ ন্যানোটিউব বিন্যাস)।

  • কার্বন ন্যানোটিউবের জঙ্গল: অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল বা কোনো নির্দিষ্ট তলের ওপর মাইক্রোস্কোপিক কার্বন ন্যানোটিউব খাড়াভাবে সাজিয়ে এটি তৈরি করা হয়। এই ন্যানোটিউবগুলো মানুষের মাথার একটি চুলের চেয়েও প্রায় ১০,০০০ গুণ পাতলা। প্রতি বর্গ সেন্টিমিটারে কোটি কোটি ন্যানোটিউব একদম সোজা হয়ে একটি আমাজন জঙ্গলের মতো ঘন বিন্যাস তৈরি করে।
  • আলোর গোলকধাঁধা ও তাপে রূপান্তর: যখন কোনো আলোককণা বা ফোটন (Photon) এই স্তরের ওপর পড়ে, তখন তা ন্যানোটিউবগুলোর ফাঁকে প্রবেশ করে আটকা পড়ে যায়। আলোটি ন্যানোটিউবের দেয়ালে ক্রমাগত ধাক্কা খেতে খেতে (Bouncing) একপর্যায়ে সম্পূর্ণ শোষিত হয় এবং তাপ শক্তিতে (Heat) রূপান্তরিত হয়ে হারিয়ে যায়।

ত্রিমাত্রিকতা গায়েব: যেহেতু কোনো আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে ফিরে আসতে পারে না, তাই মানুষের মস্তিষ্ক এর গভীরতা, কোণ বা টেক্সচার দেখতে পায় না। যেকোনো ত্রিমাত্রিক (3D) বস্তুর ওপর এটি প্রলেপ দিলে সেটির সমস্ত কার্ভ বা ভাঁজ গায়েব হয়ে যায় এবং এটিকে একটি দ্বিমাত্রিক (2D) ফ্ল্যাট শূন্য গহ্বর বা ব্ল্যাক হোলের মতো মনে হয়।

পার্ট ২: বিএমডব্লিউ-এর ম্যাজিক — ‘দ্যা ব্ল্যাক হোল কার’

২০১৯ সালে বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান BMW তাদের ‘X6’ মডেলের একটি স্পোর্টস কারকে ভ্যান্টাব্ল্যাক-এর একটি বিশেষ সংস্করণ (Vantablack VBX2) দিয়ে আবৃত করে ফ্রাঙ্কফুর্ট মোটর শো-তে প্রদর্শন করে।

গাড়িটির বডি লাইনের সমস্ত কার্ভ, ডিজাইন এবং পেশীবহুল অবয়ব ভ্যান্টাব্ল্যাকের কারণে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। শুধুমাত্র হেডলাইট, গ্রিল, গ্লাস এবং চাকা ছাড়া পুরো বডি ছিল সম্পূর্ণ আলোহীন অন্ধকার। দেখে মনে হচ্ছিল একটি পরাবাস্তব বা সাই-ফাই চলচ্চিত্রের যান রাস্তার ওপর ভেসে আছে।

এটি কেন বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হয় না?

বিএমডব্লিউ এটি কেবল একটি কনসেপ্ট বা প্রদর্শনী গাড়ি হিসেবে তৈরি করেছিল। সাধারণ গাড়িতে এটি ব্যবহার করা অসম্ভব, কারণ ভ্যান্টাব্ল্যাক অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মানুষের হাত বা সামান্য ছোঁয়া লাগলেই এর ন্যানো-কাঠামো ভেঙে যায়। তাছাড়া, রাতে রাস্তায় এই গাড়ি চালানো চরম বিপজ্জনক, কারণ অন্য কোনো চালক একে অন্ধকারের বুকে দেখতেই পাবে না।

পার্ট ৩: মহাকাশ বিজ্ঞান এবং সামরিক প্রযুক্তিতে ভ্যান্টাব্ল্যাক

ভ্যান্টাব্ল্যাক কেবল গাড়ি বা প্রদর্শনীর জিনিস নয়, এর আসল ও অত্যন্ত সংবেদনশীল ব্যবহার রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রতিরক্ষা খাতে:

১. মহাকাশ গবেষণায় (Space & Astronomy)

  • আলোক বিচ্যুতি দূর করা (Stray Light Reduction): মহাশূন্যের গভীরের অত্যন্ত আবছা বা ক্ষীণ আলোর কোনো গ্যালাক্সির ছবি তোলার সময় টেলিস্কোপের ভেতরের যন্ত্রাংশে সূর্যের আলো বা অন্য কোনো উজ্জ্বল নক্ষত্রের আলো প্রতিফলিত হয়ে বাধা সৃষ্টি করে (যাকে Stray Light বলে)। টেলিস্কোপের ভেতরের দেয়ালে ভ্যান্টাব্ল্যাক-এর প্রলেপ দিলে তা সমস্ত অপ্রয়োজনীয় আলো শুষে নেয়। ফলে বিজ্ঞানীরা দূরবর্তী গ্রহের অত্যন্ত স্পষ্ট ও নিখুঁত ছবি পান।
  • ইনফ্রারেড সেন্সরের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি: এটি কেবল দৃশ্যমান আলোই নয়, বরং অবলোহিত বা ইনফ্রারেড (Infrared) রশ্মিও চমৎকারভাবে শোষণ করতে পারে। তাই মহাকাশযানের ইনফ্রারেড ক্যামেরা ও সেন্সরের সংবেদনশীলতা বাড়াতে এটি ব্যবহৃত হয়।
  • চরম আবহাওয়া সহনশীলতা: মহাশূন্যের শূন্যতা বা ভ্যাকুয়ামে (Vacuum) এটি থেকে কোনো গ্যাস নির্গত (Outgassing) হয় না, যা টেলিস্কোপের লেন্স বা সেন্সর নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করে।

২. সামরিক ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে (Military & Defense)

  • থার্মাল ক্যামোফ্লেজ (Thermal Camouflage): আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষ রাতের বেলা সৈন্য বা যুদ্ধযান খোঁজার জন্য থার্মাল ক্যামেরা বা নাইট-ভিশন গগলস ব্যবহার করে, যা শরীরের বা ইঞ্জিনের তাপ (Infrared Radiation) সনাক্ত করে। ভ্যান্টাব্ল্যাক যেহেতু আলো ও তাপ দুটোই শুষে নেয় এবং কোনো বিকিরণ বাইরে যেতে দেয় না, তাই এর প্রলেপ থাকা ড্রোন বা যুদ্ধযান থার্মাল ক্যামেরায় ধরা পড়ে না।
  • স্টেলথ ড্রোনের অদৃশ্যতা: রাতের বেলা নিখুঁত অভিযানের জন্য সামরিক ড্রোনে ভ্যান্টাব্ল্যাক ব্যবহার করা হয়। এটি রাতের আকাশের অন্ধকারের সাথে ড্রোনকে এমনভাবে মিশিয়ে দেয় যে, শক্তিশালী সার্চলাইট দিয়েও মাটিতে থাকা শত্রুরা একে খালি চোখে দেখতে পায় না।

পার্ট ৪: অ্যানিশ কাপুর বনাম স্টুয়ার্ট সেম্পল — ইতিহাসের অদ্ভুত ‘রঙের যুদ্ধ’

শিল্পকলা বা আর্টের ইতিহাসে ভ্যান্টাব্ল্যাক নিয়ে ঘটে গেছে এক নাটকীয়, হাস্যকর এবং দীর্ঘস্থায়ী বিবাদ। এটি মূলত কোনো রঙের ওপর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তার বিরুদ্ধে সাধারণ শিল্পীদের প্রতিবাদের গল্প।

১. একচ্ছত্র অধিকারের সূচনা (২০১৬)

বিখ্যাত ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান ভাস্কর অ্যানিশ কাপুর (যিনি শিকাগোর বিখ্যাত ‘The Bean’ ভাস্কর্যের জন্য পরিচিত) ভ্যান্টাব্ল্যাক উপাদানটির প্রেমে পড়েন। ২০১৬ সালে তিনি এর প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান Surrey NanoSystems এর সাথে একটি বিশেষ চুক্তি করেন। চুক্তি অনুযায়ী, শিল্পকলা বা শৈল্পিক ব্যবহারের (Artistic use) ক্ষেত্রে কেবল অ্যানিশ কাপুরই একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে ভ্যান্টাব্ল্যাক ব্যবহার করতে পারবেন। অন্য কোনো শিল্পী এই উপাদানটি ছুঁয়েও দেখতে পারবেন না। এই একচেটিয়া স্বৈরাচারী চুক্তির কারণে বিশ্বজুড়ে সাধারণ শিল্পীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন।

২. স্টুয়ার্ট সেম্পলের ‘গোলাপি’ পাল্টা আক্রমণ

অ্যানিশ কাপুরের এই আচরণের প্রতিবাদ জানাতে মাঠে নামেন আরেক ব্রিটিশ শিল্পী স্টুয়ার্ট সেম্পল। তিনি ল্যাবে তৈরি অত্যন্ত শক্তিশালী পিগমেন্ট দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে উজ্জ্বল গোলাপি রঙ তৈরি করেন, যার নাম দেওয়া হয় “দ্যা পিংকেস্ট পিংক” (The Pinkest Pink)

তিনি এই রঙটি তার অনলাইন শপে মাত্র ৩.৯৯ ডলারে বিক্রির জন্য উন্মুক্ত করেন। তবে তিনি একটি ঐতিহাসিক শর্ত জুড়ে দেন: পৃথিবীর যে কেউ এটি কিনতে পারবে, কেবল অ্যানিশ কাপুর ছাড়া! ওয়েবসাইট থেকে রঙটি কেনার সময় প্রত্যেক ক্রেতাকে একটি আইনি ঘোষণায় টিক দিতে হতো যে—“আমি অ্যানিশ কাপুর নই, আমি কোনোভাবেই তার সাথে যুক্ত নই, এবং আমি এই রঙটি কোনোভাবেই অ্যানিশ কাপুরের হাতে পৌঁছাতে দেব না।”

৩. মধ্যমা প্রদর্শন ও কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি

বিতর্কটি চরম নোংরা রূপ নেয় যখন অ্যানিশ কাপুর কোনো এক অবৈধ উপায়ে সেই ‘পিংকেস্ট পিংক’ রঙটি জোগাড় করে ফেলেন। তিনি তার ইনস্টাগ্রামে একটি ছবি পোস্ট করেন, যেখানে দেখা যায় তার হাতের মাঝখানের আঙুলটি (Middle finger) সেই গোলাপি রঙে চুবানো এবং ক্যাপশনে লেখা ছিল—“Up yours” (একটি বহুল প্রচলিত গালি)।

এই অভদ্রতাপূর্ণ আচরণের জবাব স্টুয়ার্ট সেম্পলও দেন শৈল্পিকভাবে। তিনি কাঁচের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে চকচকে উপাদান ‘ডায়মন্ড ডাস্ট’ (Diamond Dust) বাজারে ছাড়েন এবং কাপুরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “এবার আঙুল চুবিয়ে দেখাও!” (কারণ কাঁচের গুঁড়োয় আঙুল চুবালে হাত কেটে যাবে)।

৪. ব্ল্যাক ৩.০ এবং ৪.০ এর জন্ম ও প্রতিশোধ

সেম্পল এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি সাধারণ শিল্পীদের জন্য ভ্যান্টাব্ল্যাকের বিকল্প তৈরি করার পণ নেন। তিনি ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে তৈরি করেন Black 2.0 এবং পরবর্তীতে Black 3.0 ও 4.0

  • এটি সাধারণ অ্যাক্রিলিক পেইন্টের মতো ব্রাশ দিয়ে সরাসরি ক্যানভাসে ব্যবহার করা যায় (যা ভ্যান্টাব্ল্যাকের মতো জটিল ল্যাব প্রসেস নয়)।
  • এটি দৃশ্যমান আলোর ৯৯% এর বেশি শোষণ করতে পারে এবং এটিতে চমৎকার ‘ব্ল্যাক চেরি’র সুবাস দেওয়া হয়েছিল।
  • যথারীতি এই ব্ল্যাক পেইন্টের বোতলের গায়েও বড় করে লেখা ছিল—“অ্যানিশ কাপুর এটি কোনোভাবেই ব্যবহার করতে পারবেন না।”

৫. নামের আইনি পরিবর্তন (২০২৪)

এই লড়াইয়ের সবচেয়ে নাটকীয় মোড় আসে ২০২৪ সালের অক্টোবরে। স্টুয়ার্ট সেম্পল ভ্যান্টাব্ল্যাক পাওয়ার একটি আইনি ফাঁকফোকর বের করার জন্য নিজের নাম পরিবর্তন করে অফিশিয়ালি বা আইনিভাবে নিজেই ‘অ্যানিশ কাপুর’ নাম ধারণ করেন! তিনি যুক্তি দেন যে, যেহেতু চুক্তি অনুযায়ী কেবল অ্যানিশ কাপুরই ভ্যান্টাব্ল্যাক পাবেন, তাই এখন থেকে তিনিও এটি পাওয়ার যোগ্য। অবশ্য পরবর্তীতে ২০২৫ সালের দিকে এই বহুল সাড়া জাগানো বিবাদের অবসান ঘটে এবং তিনি পুনরায় নিজের নাম স্টুয়ার্ট সেম্পলে ফিরিয়ে নিয়ে যান।

উপসংহার: এমআইটি (MIT) এর ইঞ্জিনিয়াররা ২০১৯ সালে দুর্ঘটনাবশত এমন একটি উপাদান তৈরি করেছেন যা আলোর ৯৯.৯৯৫% শোষণ করতে পারে (যা ভ্যান্টাব্ল্যাকের চেয়েও ১০ গুণ বেশি কালো!)। তবে শিল্পের ইতিহাসের এই অদ্ভুত যুদ্ধটি প্রমাণ করে যে, মানুষের সৃজনশীলতা ও বিজ্ঞানকে কোনো অর্থ বা আইনি প্রাচীর দিয়ে কখনো একচেটিয়াভাবে বন্দি করে রাখা যায় না।

বিজ্ঞান, মহাকাশ, আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্পের এমন সব রোমাঞ্চকর এবং অজানা অধ্যায়ের নিখুঁত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নিয়মিত পড়তে চোখ রাখুন আমাদের অফিশিয়াল পোর্টাল পালস বাংলাদেশ-এ। আপনার নিজস্ব কোনো প্ল্যাটফর্মের এসইও অপ্টিমাইজেশন ও প্রফেশনাল কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজির জন্য সরাসরি ভিজিট করতে পারেন আমার নিজস্ব সাইট bdsbulbulahmed.com-এ।

গিনেস

নিউজ ডেস্ক

July 9, 2026

শেয়ার করুন

তথ্যপ্রযুক্তি, সমাজ ও ক্রীড়া ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

কন্টেন্ট লেখক ও প্রধান সম্পাদক: বিডিএস বুল্বুল আহমেদ (Senior SEO Consultant)

সর্বশেষ আপডেট: ১০ জুলাই ২০২৬

বিশ্বের বুকে লাল-সবুজের পতাকাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন আমাদের দেশের সূর্যসন্তানেরা। ব্যক্তিগত প্রতিভা থেকে শুরু করে দলগত দেশপ্রেম—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশিরা নিজেদের নাম খোদাই করেছেন গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের (Guinness World Records) পাতায়।

আমি বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant), আমার দীর্ঘ ৬ বছরের প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ও ডেটা অ্যানালাইসিসের অভিজ্ঞতায় গিনেস বুকে বাংলাদেশের অফিশিয়াল রেকর্ডের পরিসংখ্যান, শীর্ষ রেকর্ডধারী ব্যক্তি এবং আপনি নিজে কীভাবে গিনেস রেকর্ডের জন্য আবেদন করবেন, তার একটি সম্পূর্ণ ‘রিলিজ-রেডি’ মেগা কন্টেন্ট নিয়ে হাজির হয়েছি।

পর্ব ১: এ পর্যন্ত কতজন বাংলাদেশী গিনেস রেকর্ড করেছেন?

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট দেশের মোট রেকর্ডধারীর একক বা অফিশিয়াল সংখ্যা সরাসরি প্রকাশ করে না। তবে বিভিন্ন সময়ে গিনেসের অফিশিয়াল ডেটাবেজ ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত একক প্রচেষ্টা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বা দলগত জাতীয় আয়োজন মিলিয়ে বাংলাদেশী ব্যক্তি ও উদ্যোগের মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০টিরও বেশি রেকর্ড গিনেস বুকে স্থান পেয়েছে।

ব্যক্তিগতভাবে অনেকে একাধিকবার রেকর্ড করায় ব্যক্তির সংখ্যার চেয়ে বাংলাদেশে মোট রেকর্ডের সংখ্যাটিই বেশি গৌরবময়।

পর্ব ২: গিনেস বুকে বাংলাদেশের সেরা কিছু রেকর্ড ও রেকর্ডধারী

বাংলাদেশের ঝুলিতে থাকা কিছু ঐতিহাসিক দলগত এবং বিষ্ময়কর ব্যক্তিগত রেকর্ডের বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হলো:

১. দলগত ও জাতীয় গৌরবের বিশ্বরেকর্ডসমূহ

  • লাখো কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত (২০১৪): ২৬ মার্চ ২০১৪, স্বাধীনতা দিবসে ঢাকার জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ২,৫৪,৬৮১ জন মানুষ একসাথে গেয়েছিলেন ‘আমার সোনার বাংলা’। এটি গিনেস বুকে বিশাল এক দলগত রেকর্ড হিসেবে স্থান পায়।
  • বিশ্বের বৃহত্তম মানব পতাকা (২০১৩): ১৬ ডিসেম্বর ২০১৩, বিজয় দিবসে ঢাকার শেরেবাংলা নগরের প্যারেড গ্রাউন্ডে ২৭,১১৭ জন মানুষের অংশগ্রহণে তৈরি হয় বিশ্বের বৃহত্তম মানব জাতীয় পতাকা (Largest Human National Flag)।
  • লংগেস্ট সিঙ্গেল লাইন অব বাইসাইকেল মুভিং (২০১৭): ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭, বিজয় দিবসে ‘বিডি সাইকেলিস্ট’ সংগঠনের উদ্যোগে ৩০০ ফিট রাস্তায় ১,১৮৬ জন সাইক্লিস্ট একক লাইনে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বসনিয়ার রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়েন।
  • ৪৮ ঘণ্টার দীর্ঘতম সাইক্লিং রিলে (২০২১): ‘TeamBDC’-এর ৪ জন বাংলাদেশী সাইক্লিস্ট—দ্রাবির আলম, তানভীর আহমেদ, মোহাম্মদ আলাউদ্দীন এবং রকিবুল ইসলাম—৪৮ ঘণ্টায় ১,৬৭০.৩৩৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এই টিম রেকর্ডটি অর্জন করেন।
  • রিকশার নগরী ঢাকা (২০১৫): গিনেস বুক ২০১৫ সালের প্রকাশনায় ঢাকাকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি রিকশা চলাচলকারী শহর হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যেখানে যাতায়াতের মোট ৪০ শতাংশই রিকশাকেন্দ্রিক।

২. ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বজয়ী কয়েকজন বাংলাদেশী

  • জোবেরা রহমান লিনু (প্রথম বাংলাদেশী): ২০০২ সালের ২৪ মে গিনেস বুক তাঁকে স্বীকৃতি দেয়। জাতীয় টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় ১৯৭৭ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে রেকর্ড ১৬ বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে তিনি প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে গিনেস বুকে নাম লেখান।
  • কনক কর্মকার (বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রেকর্ডধারী): কনক কর্মকার ভিন্ন ভিন্ন অনন্য ক্যাটাগরিতে এ পর্যন্ত ২৩ বার বিশ্বরেকর্ড করেছেন! তাঁর উল্লেখযোগ্য রেকর্ডের মধ্যে রয়েছে—কপালে ২৫ মিনিট গিটার ব্যালেন্স করা, থুতনিতে গিটার ব্যালেন্স করা এবং কপালে ১,১৫০টি প্লাস্টিক গ্লাস রাখা।
  • আব্দুল হালিম (ফুটবলে হ্যাটট্রিক রেকর্ড): মাগুরা ও বগুড়ার এই কৃতি সন্তান মাথায় ফুটবল ব্যালেন্স করে একাধিক রেকর্ড গড়েছেন। মাথায় বল নিয়ে সবচেয়ে দীর্ঘ দূরত্ব (১৫.২ কিলোমিটার) হাঁটা এবং মাথায় বল নিয়ে দ্রুততম সময়ে রোলার স্কেটিং জুতা পরে ১০০ মিটার অতিক্রম করার মতো হ্যাটট্রিক রেকর্ড রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।
  • মাহমুদুল হাসান ফয়সাল: মাগুরার এই তরুণ এক মিনিটে হাতে বাস্কেটবল এবং ফুটবল ঘোরানোসহ বল কন্ট্রোলিংয়ের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে একাধিক বিশ্বরেকর্ড করেছেন।
  • কয়েন টাওয়ারের রেকর্ড (নিপা ও আয়মান): বরিশালের নুসরাত জাহান নিপা এক মিনিটে সবচেয়ে বেশি কয়েন দিয়ে টাওয়ার তৈরির রেকর্ড করেছিলেন, যা পরবর্তীতে চট্টগ্রামের ১৬ বছর বয়সী কিশোর আয়মান মোহাম্মদ (১ মিনিটে ৭৫টি কয়েন স্তুপ করে) ভেঙে নিজের নামে করে নেন।

পর্ব ৩: আপনি কীভাবে গিনেস রেকর্ডের জন্য আবেদন করবেন? (ধাপ-বাই-ধাপ গাইড)

আপনার মধ্যে যদি এমন কোনো অনন্য প্রতিভা বা আইডিয়া থাকে যা বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিতে পারে, তবে আপনিও সম্পূর্ণ অনলাইন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গিনেস বুকে আবেদন করতে পারেন। নিচে এর ৬টি মূল ধাপ দেওয়া হলো:

১. রেকর্ড ক্যাটাগরি নির্বাচন

  • বিদ্যমান রেকর্ড (Existing Record): গিনেসের ওয়েবসাইটে আগে থেকেই আছে এমন কোনো রেকর্ড ভাঙার চ্যালেঞ্জ নিতে পারেন।
  • নতুন রেকর্ড (New Record): সম্পূর্ণ নতুন কোনো আইডিয়া নিয়ে আবেদন করতে পারেন। তবে আইডিয়াটি অবশ্যই পরিমাপযোগ্য (Measurable), প্রমাণযোগ্য (Verifiable) এবং বৈশ্বিক মানের হতে হবে।

২. অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট তৈরি

  • প্রথমে গিনেসের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট guinnessworldrecords.com-এ যান।
  • সেখানে আপনার নাম ও ইমেইল দিয়ে একটি ফ্রি অ্যাকাউন্ট (Sign Up) তৈরি করুন।

৩. আবেদন জমা দেওয়া (Application Submission)

  • লগ-ইন করার পর “Apply for a record” বাটনে ক্লিক করুন।
  • নির্দিষ্ট ফর্মটি নিখুঁতভাবে পূরণ করুন।
  • আবেদনের খরচ: সাধারণ বা স্ট্যান্ডার্ড অ্যাপ্লিকেশনের জন্য গিনেস কর্তৃপক্ষ কোনো ফি নেয় না (এটি সম্পূর্ণ ফ্রি)। তবে সাধারণ আবেদনের ক্ষেত্রে গাইডলাইন পেতে সাধারণত ১২ সপ্তাহ (প্রায় ৩ মাস) সময় লাগে।
  • প্রায়োরিটি অ্যাপ্লিকেশন (Priority Application): আপনি যদি দ্রুত রেসপন্স চান, তবে নির্দিষ্ট ফি (৫০০ থেকে ৮০০ ইউএস ডলারের কাছাকাছি) দিয়ে প্রায়োরিটি আবেদন করতে পারেন, যেখানে ৫ কার্যদিবসের মধ্যে সাড়া পাওয়া যায়।

৪. অফিশিয়াল গাইডলাইন বা নিয়মাবলী সংগ্রহ

  • আপনার আবেদনটি গিনেস টিম গ্রহণ করলে তারা আপনাকে একটি বিস্তারিত ইমেইল ও গাইডলাইন (Rules & Guidelines) পাঠাবে। সেখানে স্পষ্ট লেখা থাকবে রেকর্ড করার সময় কী কী নিয়ম মানতে হবে এবং কী কী প্রমাণ জমা দিতে হবে।

৫. রেকর্ড প্রদর্শন ও প্রমাণ সংগ্রহ (Evidence Gathering)

গাইডলাইন পাওয়ার পর আপনাকে আপনার রেকর্ডটি করে দেখাতে হবে এবং নিচের প্রমাণগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ডিজিটাল ফরম্যাটে রেকর্ড করতে হবে:

  • ভিডিও ও ছবি: পুরো রেকর্ডের স্পষ্ট এবং কোনো প্রকার কাটছাঁট ছাড়া (Uncut) ভিডিও এবং হাই-কোয়ালিটি ছবি।
  • টাইমশীট বা লগবুক: রেকর্ড সম্পন্ন করার সঠিক সময়ের নিখুঁত হিসাব।
  • স্বাধীন সাক্ষী (Independent Witnesses): সমাজে সম্মানিত বা পেশাদার দুইজন ব্যক্তি (যেমন- সরকারি কর্মকর্তা, আইনজীবী, ডাক্তার বা শিক্ষক) যারা আপনার রেকর্ডের সময় উপস্থিত থেকে সত্যতা নিশ্চিত করে লিখিত স্টেটমেন্ট দেবেন।

৬. চূড়ান্ত অনুমোদন ও সার্টিফিকেট অর্জন

  • সংগৃহীত সব ভিডিও, ছবি এবং কাগজপত্রের ডিজিটাল কপি আপনার গিনেস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ওয়েবসাইটে আপলোড করুন।
  • গিনেস টিম এই প্রমাণগুলো যাচাই-বাছাই করতে আবার ১২ সপ্তাহ সময় নেবে। সবকিছু আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সফল প্রমাণিত হলে তারা আপনাকে অফিশিয়াল বিজয়ী ঘোষণা করবে এবং ডাকযোগে একটি মর্যাদাপূর্ণ অফিশিয়াল গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড সার্টিফিকেট পাঠাবে।

বাংলাদেশ ও বিশ্বমঞ্চের এমন সব রোমাঞ্চকর রেকর্ড, বিজ্ঞান ও সমসাময়িক তথ্যের নিয়মিত আপডেট পেতে চোখ রাখুন আমাদের অফিশিয়াল পোর্টাল পালস বাংলাদেশ-এ। আপনার ব্যবসার জন্য প্রফেশনাল এসইও কনসালটেশন বা ডিজিটাল কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজি তৈরি করতে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন আমার সাথে bdsbulbulahmed.com সাইটে।

পৃথিবীর এমন ১০টি রোমাঞ্চকর রহস্যময় ঘটনা যার ব্যাখ্যা বিজ্ঞান আজও দিতে পারেনি।

নিউজ ডেস্ক

July 8, 2026

শেয়ার করুন

লাইফস্টাইল ও রোমাঞ্চ ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

কন্টেন্ট লেখক ও প্রধান সম্পাদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant)

সর্বশেষ আপডেট: ০৮ জুলাই ২০২৬

প্রকৃতি রহস্য পছন্দ করে। নিজেকে সে আগলে রাখে নানা ধরনের রহস্যের বেড়াজালে। কিছু রহস্যের সমাধান মানুষ করতে পারলেও, কিছু ঘটনা চিরকাল অমীমাংসিতই থেকে যায়। বিশ্বের বাঘা বাঘা বিজ্ঞানী, গবেষক এবং তদন্তকারী সংস্থাও যুগের পর যুগ চেষ্টা করে এগুলোর কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পাননি।

আমি বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant), আমার দীর্ঘ ৬ বছরের বৈশ্বিক ডেটা ও আন্তর্জাতিক কন্টেন্ট অ্যানালাইসিসের অভিজ্ঞতায় বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি করা এমন ১০টি শীর্ষ ঐতিহাসিক ও অলৌকিক অমীমাংসিত রহস্য নিয়ে একটি সম্পূর্ণ ‘রিলিজ-রেডি’ মেগা কন্টেন্ট আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি।

পর্ব ১: ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ৫টি বৈশ্বিক রহস্য

বিশ্বের ইতিহাস ও ভূগোলের এমন কিছু ঘটনা যা দশকের পর দশক ধরে বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে রেখেছে:

১. বারমুডা ট্রায়াঙ্গল (Bermuda Triangle)

আটলান্টিক মহাসাগরের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে (মিয়ামি, বারমুডা ও পুয়ের্তো রিকোর মাঝের এলাকা) বহু বছর ধরে বেশ কিছু জাহাজ এবং বিমান কোনো কারণ ছাড়াই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গেছে। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, নিখোঁজ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তেও চালকেরা কোনো বিপদ সংকেত (SOS) পাঠাতে পারেননি। আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা এই নিখোঁজ হওয়ার পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রাকৃতিক বা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

২. ভয়নিচ পাণ্ডুলিপি (Voynich Manuscript)

যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহে থাকা প্রায় ৬০০ বছর পুরোনো এই হাতে লেখা বইটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোগ্রাফিক রহস্য। বইটিতে এমন এক ভাষা এবং লিপি ব্যবহার করা হয়েছে, যা পৃথিবীর কোনো জানা ভাষা, কোড বা ব্যাকরণের সাথে মেলে না। এর ভেতরে থাকা অদ্ভুত গাছপালা, ল্যাবরেটরি ও জ্যোতির্বিদ্যার রঙিন ছবিগুলোও সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও অবাস্তব।

৩. ডায়াটলভ পাস দুর্ঘটনা (Dyatlov Pass Incident)

১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার উরাল পর্বতমালার ডায়াটলভ পাস নামক স্থানে ৯ জন অভিজ্ঞ রুশ পর্বতারোহী অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে মারা যান। মাঝরাতে মাইনাস তাপমাত্রায় তারা নিজেদের তাঁবু ভেতর থেকে ব্লেড দিয়ে কেটে সম্পূর্ণ খালি গায়ে ও খালি পায়ে বাইরে মাইনাস ৩০ ডিগ্রি ঠাণ্ডায় দৌড়ে পালিয়েছিলেন। পরে তাদের লাশ উদ্ধার করা হলে দেখা যায়, কারও কারও খুলি ও হাড় প্রচণ্ড আঘাতে ভাঙা, অথচ বাইরে চামড়ায় বা শরীরে কোনো আঘাতের দাগ ছিল না!

৪. জ্যাক দ্য রিপার (Jack the Ripper)

১৮৮৮ সালে লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল এলাকার রাস্তায় এক ভয়ংকর সিরিয়াল কিলারের আবির্ভাব ঘটে, যাকে ইতিহাসে ‘জ্যাক দ্য রিপার’ নামে ডাকা হয়। তিনি অত্যন্ত নিখুঁত ও নির্মম উপায়ে বেশ কয়েকজন নারীকে গলা কেটে হত্যা করেছিলেন। খুনি নিজেই পুলিশকে চিঠি পাঠিয়ে চ্যালেঞ্জ করত। কিন্তু স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের শত চেষ্টা এবং পুলিশি তদন্তের পরও তার আসল পরিচয় আজ পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

৫. দ্য হাম: অদ্ভুত গুঞ্জন শব্দ (The Hum)

১৯৬০ সালের দশক থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের (বিশেষ করে আমেরিকা, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশে) মানুষ ঘরের ভেতরে বা শান্ত পরিবেশে এক ধরনের একটানা, নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সির গুঞ্জন শব্দ শুনতে পায়। এটি অনেকটা দূরবর্তী কোনো ভারী ডিজেল ইঞ্জিনের শব্দের মতো শোনায়। অবাক করা বিষয় হলো, এই শব্দ কোনো মাইক্রোফোনে রেকর্ড হয় না, শুধু মানুষের কানেই ধরা পড়ে। গবেষকেরা এর সুনির্দিষ্ট উৎস আজও খুঁজে পাননি।

পর্ব ২: প্রকৃতির ৫টি অলৌকিক ও বাস্তব রহস্যময় ঘটনা

লাইফস্টাইল ও জীবনধারাবিষয়ক ওয়েবসাইট ব্রাইটসাইড-এর সৌজন্যে নিচে এমন ৫টি ঘটনার বিবরণ দেওয়া হলো, যা সাধারণ মানুষের চোখের সামনে ঘটলেও বিজ্ঞান আজও এর সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি:

৬. নাচের মহামারী (The Dancing Plague)

ঘটনাকাল: জুলাই, ১৫১৮ | স্থান: স্ট্রাসবার্গ, ফ্রান্স

মিসেস ত্রোফফেয়া নামের এক নারী হঠাৎ রাস্তায় নেমে অদ্ভুতভাবে নাচতে শুরু করেন। এক সপ্তাহ পর আরো ৩৪ জন ব্যক্তি এবং এক মাস পর শত শত লোক সেই অবিরাম নাচে যোগ দেয়। ক্লান্তি, হার্ট অ্যাটাক ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগে এই নাচের মিছিলে প্রাণ হারায় প্রায় ৪০০ জন মানুষ। এক মাস ধরে না খেয়ে অবিরাম নাচতে থাকা কোনো মানুষের পক্ষে অসম্ভব হলেও, এর কোনো মনস্তাত্ত্বিক কারণ বিজ্ঞানীরা বের করতে পারেননি।

৭. ভবিষ্যৎ থেকে আসা সময় ভ্রমণকারী! (The Time Traveler)

ঘটনাকাল: ২০০৩ সাল | স্থান: যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির দায়ে অ্যান্ড্রু কার্লসসিন নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে। তিনি মাত্র ৮০০ ডলার পুঁজি নিয়ে শেয়ারবাজারে ১২৬টি চরম ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন করে রাতারাতি ৩৫০ মিলিয়ন (৩৫ কোটি) ডলার আয় করেন। আটকের পর অ্যান্ড্রু দাবি করেন, তিনি ২২৫৬ সালের পৃথিবী থেকে টাইম মেশিনে চেপে ২০০৩ সালে এসেছেন। আদালতে তাঁর এই বক্তব্য ধোপে না টিকলেও, কিছুদিন পর কঠোর নজরদারির জেলখানা থেকে তিনি বেমালুম হাওয়া হয়ে যান!

৮. ব্রালরনে জাদুঘরের ছবি (The Time Traveling Hipster)

ঘটনাকাল: ১৯৪১ সাল | স্থান: কানাডা

১৯৪১ সালে কানাডার গোল্ড ব্রিজ পুনর্নির্মাণের সময় একটি ছবি তোলা হয়। ব্রালরনে জাদুঘরে সংরক্ষিত এই ছবিতে ভিড়ের মধ্যে একজন যুবককে দেখা যায়, যার পোশাক-আশাক মোটেও ১৯৪১ সালের সমসাময়িক ছিল না। তাঁর পরনে ছিল আধুনিক চেইন লাগানো হুডি, গ্রাফিক টি-শার্ট এবং সবচেয়ে অবাক করা বিষয়—তাঁর হাতে ধরা ছিল বর্তমান সময়ের আধুনিক ডিএসএলআর (DSLR) ক্যামেরার মতো দেখতে একটি ডিভাইস!

৯. হিমায়িত বালিকা (The Frozen Girl)

ঘটনাকাল: ২০ ডিসেম্বর, ১৯৮০ | স্থান: মিনেসোটা, যুক্তরাষ্ট্র

মাইনাস ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১৯ বছর বয়সী তরুণী জিন হিলিয়ার্ড তুষারঝড়ের কবলে পড়ে প্রায় ৬ ঘণ্টা বরফের মধ্যে অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন। যখন তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, তখন তাঁর শরীর বরফের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং বেঁচে থাকার কোনো লক্ষণ ছিল না। চামড়া এতটাই শক্ত ছিল যে চিকিৎসকেরা শরীরে ইনজেকশন পর্যন্ত ফোটাতে পারছিলেন না। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে, ৩ দিন পর জিন অলৌকিকভাবে হাত-পা নাড়াতে শুরু করেন এবং ৬ সপ্তাহ পর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরে যান।

১০. ঘরের ভেতরের বৃষ্টি মানব (The Rain Man)

ঘটনাকাল: ১৯৮৩ সাল | স্থান: পেনসিলভেনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

ডন ডেকার নামের এক যুবক তাঁর দাদার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফিরে আসার সাথে সাথেই অলৌকিকভাবে বাড়ির ছাদ ও দেয়াল ফুঁড়ে বৃষ্টির মতো পানি পড়া শুরু হয়। অথচ সেখানে কোনো পানির পাইপ বা লিক ছিল না। ডনকে যখন ঘর থেকে বের করে পাশের একটি পিৎজা রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন বাড়ির বৃষ্টি সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যায়; কিন্তু পিৎজা রেস্টুরেন্টের ছাদ ও দেয়াল ফুঁড়ে আবার বৃষ্টি শুরু হয়! ডনের উপস্থিতির সাথে এই বৃষ্টির কী সম্পর্ক ছিল, বিজ্ঞান আজও তা জানে না।

এক নজরে ১০টি অমীমাংসিত রহস্যের সংক্ষিপ্ত চার্ট:

রহস্যের নামপ্রধান স্থান/দেশরহস্যের মূল ধরণবৈজ্ঞানিক অবস্থা
বারমুডা ট্রায়াঙ্গলআটলান্টিক মহাসাগরজাহাজ ও বিমান নিখোঁজ হওয়াকোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই
ভয়নিচ পাণ্ডুলিপিইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় (ইউরোপ)অচেনা ভাষার প্রাচীন বইকোড আজ পর্যন্ত ভাঙা যায়নি
ডায়াটলভ পাসরাশিয়াপর্বতারোহীদের অদ্ভুত মৃত্যুসরকারিভাবে অমীমাংসিত
জ্যাক দ্য রিপারযুক্তরাজ্য (লন্ডন)সিরিয়াল কিলারের পরিচয়খুনি অজ্ঞাত রয়ে গেছে
দ্য হাম (The Hum)বিশ্বব্যাপীঅদ্ভুত গুঞ্জন শব্দউৎসের সন্ধান মেলেনি
নাচের মহামারীফ্রান্সঅনবরত নাচ এবং মৃত্যুমনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাহীন
অ্যান্ড্রু কার্লসসিনযুক্তরাষ্ট্রশেয়ারবাজার ও জেল থেকে গায়েবটাইম ট্রাভেলের দাবি
টাইম ট্রাভেলার ছবিকানাডা১৯৪১ সালের ছবিতে আধুনিক মানুষছবির সত্যতা প্রমাণিত, ব্যক্তি অজ্ঞাত
জিন হিলিয়ার্ডযুক্তরাষ্ট্রমাইনাস ২২ ডিগ্রিতে জমে গিয়েও জীবিতচিকিৎসাবিজ্ঞানের অলৌকিক ঘটনা
ডন ডেকারযুক্তরাষ্ট্রমানুষের উপস্থিতিতে ছাদ থেকে বৃষ্টিপ্যারানরমাল বা ব্যাখ্যাতীত

প্রকৃতি, বিজ্ঞান এবং মহাবিশ্বের এমন আরও রোমাঞ্চকর রহস্য ও সত্য ঘটনা সবার আগে জানতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের অফিশিয়াল পোর্টাল পালস বাংলাদেশ-এ। ডিজিটাল মার্কেটিং ও কন্টেন্ট অপ্টিমাইজেশনের জন্য সরাসরি আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন আমার নিজস্ব সাইট bdsbulbulahmed.com-এ।

২৭শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ