ইসলাম ও জীবন

আদম (আ.)-এর পৃথিবীতে আগমন: কেন সরাসরি নয়, বরং গাছের মাধ্যমে?
আদম (আ.)-এর জান্নাত থেকে বিদায়

নিউজ ডেস্ক

March 29, 2026

শেয়ার করুন

বিশেষ বিশ্লেষণ: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (সিনিয়র ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিস্ট ও গবেষক)

যুগ যুগ ধরে হজরত আদম (আ.)-এর জান্নাত থেকে পৃথিবীতে আসা নিয়ে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। অনেকেই মনে করেন এটি ছিল কেবল একটি ভুলের শাস্তি। কিন্তু গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর পেছনে ছিল মহান আল্লাহর এক অনন্য মহিমা ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।

১. নিষিদ্ধ গাছ না কি জান্নাতের ‘এক্সিট ডোর’ (Exit Door)?

আমরা অনেকেই সেই গাছটিকে কেবল একটি ‘নিষিদ্ধ বস্তু’ হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবিকভাবে বিষয়টি হলো—সেই ফলটি ছিল জান্নাত থেকে বের হওয়ার একটি উপায় বা মাধ্যম। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ওটা ছিল জান্নাতের ‘Logout’ বা ‘Exit’ অপশন।

আল্লাহ আদম (আ.)-কে পৃথিবীতে পাঠানোর পরিকল্পনা আগে থেকেই করেছিলেন (সুরা বাকারা: ৩০)। কিন্তু আল্লাহ ‘রহমানুর রাহিম’ বা পরম দয়ালু বলেই তিনি নিজ হাতে আদমকে জান্নাত থেকে বের করে দেননি। বরং একটি ব্যবস্থা রেখেছিলেন যাতে আদম (আ.) নিজ ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে এই পরিবর্তনের মুখোমুখি হন।

২. কেন আল্লাহ নিষেধ করেছিলেন?

আল্লাহ আদম (আ.)-কে ভালোবেসেই সাবধান করেছিলেন। আমরা যেমন আমাদের সন্তানদের বিপদের পথে যেতে নিষেধ করি, আল্লাহও তেমনি আদমকে সাবধান করেছিলেন। বিষয়টি এমন নয় যে ফলটি বিষাক্ত ছিল, বরং ফলটি খাওয়ার অর্থই ছিল জান্নাতের আরামদায়ক জীবন ছেড়ে পৃথিবীর কঠিন পরীক্ষার রাজ্যে পা রাখা। আল্লাহ চেয়েছিলেন আদম যেন সাবধান থাকে, কারণ পৃথিবীর জীবন ছিল অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।

৩. আদম (আ.)-এর সারল্য ও ইবলিসের প্রবঞ্চনা

আদম (আ.) ছিলেন প্রথম সৃষ্টি। তিনি আমাদের মতো পৃথিবীর জটিলতা বা ধূর্ততা দেখেননি। তাঁর মন ছিল নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ ও সরল। ইবলিস যখন মিথ্যে কসম খেয়ে তাঁকে প্রলুব্ধ করল, তখন সেই সরলতার কারণেই তিনি এর পেছনের রহস্য ধরতে পারেননি। তিনি ফলটি খেয়েছিলেন অবাধ্যতার জন্য নয়, বরং শয়তানের প্রবঞ্চনায় পড়ে ‘চিরকাল জান্নাতে থাকার’ আকাঙ্ক্ষায়।

৪. আল্লাহর পরিকল্পনা বনাম মানুষের পরীক্ষা

আল্লাহ জানতেন আদম (আ.) সেই ফলটি খাবেন। তবে এটি ছিল এক মহান মহড়া।

  • ভুল ও তওবা: আল্লাহ মানুষকে শিখিয়েছেন যে ভুল করলে কীভাবে তওবা করে আবার তাঁর কাছে ফিরে আসতে হয়।
  • পৃথিবীর অভিজ্ঞতা: সরাসরি পৃথিবীতে না পাঠিয়ে জান্নাতে কিছুকাল রাখার উদ্দেশ্য ছিল আদম ও তাঁর সন্তানদের এটা বোঝানো যে—“তোমাদের আসল ঠিকানা জান্নাত, পৃথিবী কেবল একটি পরীক্ষার কেন্দ্র।”

আরও পড়ুন:২০২৬ সালে বিশ্বের সামরিক ক্ষমতার মহড়া: অস্ত্রের সংখ্যা না কি প্রযুক্তির জয়?


উপসংহার: ফেরার পথ খোলা আছে

আদম (আ.) নিজের ইচ্ছায় (শয়তানের ধোঁকায় পড়ে হলেও) জান্নাতের ‘এক্সিট’ বাটনটি প্রেস করেছিলেন। আর আল্লাহ তাঁর দয়ায় আমাদের জন্য ‘রি-এন্ট্রি’ (Re-entry) বা পুনরায় প্রবেশের পথ খোলা রেখেছেন ‘ঈমান’ ও ‘নেক আমল’-এর মাধ্যমে। তাই এই ঘটনাটি কোনো বিয়োগান্তক গল্প নয়, বরং জান্নাতে ফিরে যাওয়ার এক দীর্ঘ অভিযানের শুরু।


তথ্যসূত্র ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (References):

  • আল-কুরআন: সুরা বাকারা (আয়াত ৩০-৩৮), সুরা আরাফ (আয়াত ১৯-২৭)।
  • তাফসীরে ইবনে কাসীর ও মাআরেফুল কুরআন: আদম (আ.)-এর সৃষ্টি ও পৃথিবীতে আগমনের প্রেক্ষাপট।
  • বিডিএস ডিজিটাল রিসার্চ: আধ্যাত্মিক বিষয়বস্তু ও যৌক্তিক দর্শনের মেলবন্ধন।

সাংবাদিকেরনাম: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

কোরবানির পশুতে যেসব ত্রুটি থাকা যাবে না

নিউজ ডেস্ক

May 18, 2026

শেয়ার করুন

১৯ মে ২০২৬: ইসলাম ধর্মে কোরবানি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পশু জবেহ করার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। তবে কোরবানির পশুতে যেসব ত্রুটি থাকা যাবে না, সে বিষয়ে শরিয়তের কঠোর ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। অন্ধত্ব, অতিরিক্ত রোগাক্রান্ত বা পঙ্গু পশুর মাধ্যমে কোরবানি আদায় করা ইসলামে সম্পূর্ণ নাজায়েজ। তাই কোরবানি সহিহ হওয়ার জন্য পশুটিকে অবশ্যই নির্দিষ্ট বয়সসীমা পার হতে হবে এবং সেটি বড় ধরনের যেকোনো শারীরিক ও দৃশ্যমান দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত হতে হবে।

ঐতিহাসিক ও ইসলামিক প্রেক্ষাপট: পশুর বয়সসীমা ও শরিয়তের নিয়ম

ইসলামের ফিকহ শাস্ত্রের অন্যতম নির্ভরযোগ্য আকর গ্রন্থ ‘হিদায়া’ অনুযায়ী, সব ধরনের গৃহপালিত পশু দিয়ে কোরবানি করা জায়েজ নয়। কোরবানির জন্য কেবল উট, গরু, মহিষ, দুম্বা, ভেড়া ও ছাগল নির্ধারিত। ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী এসব পশুর একটি নির্দিষ্ট বয়স পূর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক:

  • ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা: কমপক্ষে ১ বছর পূর্ণ হতে হবে।
  • গরু ও মহিষ: কমপক্ষে ২ বছর পূর্ণ হতে হবে।
  • উট: কমপক্ষে ৫ বছর পূর্ণ হতে হবে।

পশুর বয়স যদি এই নির্ধারিত সীমার চেয়ে একদিনও কম হয়, তবে তার দ্বারা কোরবানি করা শরিয়ত অনুযায়ী বৈধ বা জায়েজ হবে না।

তথ্যসমৃদ্ধ গভীর বিশ্লেষণ: পশুর যেসব ত্রুটি থাকলে কোরবানি হবে না

পবিত্র হাদিস শরিফ এবং ইসলামি আইনবিদদের নিখুঁত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোরবানির পশুকে অবশ্যই সুস্থ ও হৃষ্টপুষ্ট হতে হবে। পশুর মধ্যে প্রধান যে ১৩টি ত্রুটি থাকলে কোরবানি দেওয়া যাবে না, তার একটি কাঠামোগত তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

১. দৃষ্টিশক্তিহীনতা: পশুর চোখ সম্পূর্ণ অন্ধ হওয়া বা দৃষ্টিশক্তি না থাকা।

২. শ্রবণশক্তিহীনতা: কান ঠিক থাকলেও শোনার ক্ষমতা পুরোপুরি লোপ পাওয়া।

৩. চরম জীর্ণশীর্ণতা: পশু অত্যন্ত দুর্বল, হাড্ডিসার এবং জীর্ণশীর্ণ হওয়া।

৪. অক্ষম পঙ্গুত্ব: এই পরিমাণ লেংড়া বা পঙ্গু হওয়া যে, পশুটি জবেহ করার স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না।

৫. কাটা লেজ: পশুর লেজের বেশির ভাগ অংশ কাটা থাকা।

৬. জন্মগত কান না থাকা: জন্মের সময় থেকেই পশুর মাথায় কোনো কান না থাকা।

৭. কাটা কান: পশুর কানের বেশির ভাগ অংশ কোনো কারণে কাটা থাকা।

৮. শিং উপড়ে যাওয়া: শিং একেবারে গোড়াসহ উপড়ে বা ভেঙে যাওয়া (তবে আংশিক ভাঙলে বা জন্মগত শিং না থাকলে সমস্যা নেই)।

৯. পাগল হওয়া: মানসিক ভারসাম্যহীনতা বা পাগল হওয়ার কারণে ঘাস-পানি ঠিকমতো না খাওয়া।

১০. দাঁত না থাকা: পশুর মুখের বেশির ভাগ দাঁত পড়ে যাওয়া বা না থাকা।

১১. স্তনের দুধ শুকিয়ে যাওয়া: কোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণে ওলানের বা স্তনের দুধ পুরোপুরি শুকিয়ে যাওয়া।

১২. ছাগলের কাটা স্তন: ছাগলের ক্ষেত্রে দুটি দুধের বা ওলানের যেকোনো একটি কাটা থাকা।

১৩. গরু-মহিষের কাটা স্তন: গরু বা মহিষের ক্ষেত্রে চারটি দুধের যেকোনো দুটি কাটা থাকা।


হাদিসের আলোকে নিষিদ্ধ চার ধরনের পশু

হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানি না হওয়ার জন্য প্রধান চারটি শারীরিক ত্রুটিকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন। এই বৈশ্বিক ও চিরন্তন ইসলামিক গাইডলাইনটি নিচে তুলে ধরা হলো:

+------------------------------------+--------------------------------------------------+
| নিষিদ্ধ পশুর ধরন (হাদিস অনুযায়ী)  | ত্রুটির স্পষ্ট বা বাস্তব রূপ                     |
+------------------------------------+--------------------------------------------------+
| স্পষ্ট অন্ধ বা টেরা পশু             | যার চোখের অন্ধত্ব বা গুরুতর সমস্যা স্পষ্ট দেখা যায়|
| স্পষ্ট রোগাক্রান্ত পশু             | যে রোগ বা ইনফেকশনের কারণে পশু অত্যন্ত দুর্বল      |
| স্পষ্ট পঙ্গু বা লেংড়া পশু          | যে খুঁড়িয়ে হাঁটে এবং দলের সাথে চলতে পারে না      |
| অঙ্গভঙ্গ বা গুরুতর আহত পশু          | যার কোনো অঙ্গ (যেমন পা বা হাড়) ভেঙে গেছে বা জখম  |
+------------------------------------+--------------------------------------------------+

ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও পশু ক্রয়ের ক্ষেত্রে সতর্কতা

কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহর দরবারে সর্বোত্তম ও নিখুঁত জিনিসটি উৎসর্গ করা। বর্তমান ডিজিটাল যুগে পশুর হাটে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে পশু না কিনে, উপরে উল্লেখিত ১৩টি ত্রুটি ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, বাহ্যিক সুন্দর দেখার চেয়ে পশুর অভ্যন্তরীণ সুস্থতা এবং শরিয়তের বয়সসীমা রক্ষা করা কোরবানি কবুল হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত।


তথ্যসূত্র ও নির্ভরযোগ্য সোর্স: ১. ফিকহ শাস্ত্রের বিখ্যাত গ্রন্থ: হিদায়া, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা: ১০৩

২. পবিত্র হাদিস গ্রন্থ: সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নম্বর: ৩১৪৪ (পশুর ত্রুটি ও কোরবানি অধ্যায়)।

৩. সমসাময়িক ইসলামিক ফতোয়া বোর্ড এবং আন্তর্জাতিক ফিকহ একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত হজ ও কোরবানি বিষয়ক নির্দেশিকা (২০২৬)।


প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী

নিউজ ডেস্ক

May 17, 2026

শেয়ার করুন

১৯৪৭ সালে পবিত্র হজ পালন করতে গিয়ে মক্কার হারাম শরীফের ইমাম সাহেবের খুতবায় সুক্ষ্ম ইলমি ভুল ধরেছিলেন বাংলাদেশের সিলেটের কানাইঘাটের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.)। হাদিসশাস্ত্র ও আরবি ব্যাকরণে তাঁর এই অসাধারণ পাণ্ডিত্য দেখে তৎকালীন আরবের বিখ্যাত আলেমরা পুরোপুরি তাক লাগিয়ে যান। এমনকি তৎকালীন সৌদি আরবের বাদশাহ স্বয়ং তাঁর দেশের রাষ্ট্রীয় সংবিধান আল্লামা বায়মপুরীর সামনে পেশ করে কোনো ভুল আছে কি না তা যাচাই করতে বলেন এবং আল্লামা বায়মপুরী (রহ.) সেই সংবিধানে অন্তত ১৪টি বিষয় সংশোধনযোগ্য বলে চিহ্নিত করেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি শুধু সিলেট অঞ্চল নয়, বরং গোটা উপমহাদেশের ওলামায়ে কেরামের ইলমি শ্রেষ্ঠত্বের এক অনন্য দলিল।

নিচে এই ক্ষণজন্মা হাদিস বিশারদ, রাজনীতিক ও মহান সংস্কারকের জন্ম, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এবং ঐতিহাসিক অবদান বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

জন্ম ও বংশ পরিচয়

আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) ১৩২৭ হিজরি মোতাবেক ১৯০৭ সালের মহররম মাসে এক জুমার দিনে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বায়মপুর গ্রামের (বর্তমান কানাইঘাট পৌরসভার অন্তর্গত) এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

  • পিতা: কারী আলিম বিন কারী দানিশ মিয়া।
  • মাতা: হাফেজা সুফিয়া বেগম।

তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। শৈশবেই তাঁর পিতা মারা যাওয়ায় মায়ের একক তত্ত্বাবধানে তিনি লালিত-পালিত হন। মাত্র সাত বছর বয়সে মায়ের কাছে পবিত্র কোরআন শরীফ শিক্ষার মাধ্যমে তাঁর পড়াশোনার হাতেখড়ি হয়, যার পাশাপাশি তিনি বাংলা ও উর্দু ভাষাও আয়ত্ত করেন।

শিক্ষাজীবন এবং দেওবন্দের গৌরবোজ্জ্বল রেকর্ড

কানাইঘাট ইসলামিয়া মাদরাসা (বর্তমান দারুল উলুম কানাইঘাট) থেকে মাত্র ১০ বছর বয়সে প্রাথমিক ও পরবর্তীতে মাধ্যমিক পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। এরপর কিছুদিন শিক্ষকতা করলেও উচ্চশিক্ষার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় তিনি ভারতে পাড়ি জমান।

  • ভারতে প্রথম পর্ব: রামপুর আলিয়া মাদরাসায় ৫ বছর এবং মিরাঠ আলিয়া মাদরাসায় ২ বছর পড়াশোনা করেন। এই ৭ বছরে তিনি হাদিস, তাফসির, ফেকাহ, আকাইদ ও দর্শন শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ছাত্র অবস্থাতেই তিনি দরসে নেজামির কঠিন কিতাব ‘কাফিয়া’-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ ইযাহুল মাতালিব রচনা করে মেধার পরিচয় দেন।
  • দারুল উলূম দেওবন্দের রেকর্ড: ১৯৩৬ সালে তিনি বিশ্ববিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষাপীঠ দারুল উলূম দেওবন্দে ভর্তি হন। দেওবন্দে দেড় বছর অত্যন্ত সুখ্যাতির সঙ্গে হাদিসের ওপর সর্বোচ্চ ডিগ্রি (দাওরায়ে হাদিস) গ্রহণ করেন। মেধা তালিকায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং কয়েকটি বিষয়ে মোট নম্বরের চেয়েও বেশি নম্বর পেয়ে রেকর্ড গড়েন। তাঁর বোখারি শরিফের পরীক্ষার খাতা দেওবন্দ কর্তৃপক্ষ দীর্ঘকাল বিশেষভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছিল।

কর্মজীবন ও সিলেটের ‘দ্বিতীয় দারুল উলূম দেওবন্দ’

দেওবন্দের শিক্ষা সমাপ্ত করে দেশে ফেরার সময় তাঁর উস্তাদ সাইয়েদ হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) বলেছিলেন—“আব ইলম সিলেট কি তরফ জা রহা হায়” (এখন জ্ঞানবত্তা সিলেটের দিকে যাচ্ছে)।

  • শিক্ষকতা: প্রথমে ভারতের বদরপুর ও রামপুর আলিয়া মাদরাসায় এবং পরে দেশে ফিরে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসায় শাইখুল হাদিস হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে সিলেটের গাছবাড়ী জামিউল উলুম কামিলা মাদরাসায় শাইখুল হাদিসের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর একক যোগ্যতায় তৎকালীন সময়ে গাছবাড়ী মাদরাসাকে ‘দ্বিতীয় দারুল উলূম দেওবন্দ’ বলা হতো।
  • দারুল উলূম কানাইঘাট: ১৯৫৩ সালে তিনি নিজ জন্মস্থান কানাইঘাট ইসলামিয়া মাদরাসায় যোগ দিয়ে এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘দারুল উলূম কানাইঘাট’। ১৯৫৪ সালে এখানে তিনিই প্রথম দাওরায়ে হাদিসের (টাইটেল) ক্লাস চালু করেন এবং আমৃত্যু এখানে হাদিসের খিদমত করেন।
  • দেওবন্দের শায়খুল হাদিসের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান: ১৯৫৭ সালে দেওবন্দের শায়খুল হাদিস মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর দেওবন্দের শূন্য পদে যে ৩ জন বৈশ্বিক আলেমের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল, আল্লামা বায়মপুরী ছিলেন তাদের অন্যতম। কিন্তু মাতৃভূমির খিদমত ছেড়ে তিনি দেওবন্দে যেতে রাজি হননি।
  • শিক্ষা বোর্ড গঠন: পূর্ব সিলেটের সব মাদরাসাকে এক প্লাটফর্মে আনতে ১৯৫৩ সালে তিনি ‘পূর্ব সিলেট আযাদ দীনি আরবী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড’ গঠন করেন। বর্তমানে এই বোর্ডের অধীনে প্রায় ১৭৫টি মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে।

রাজনৈতিক জীবন ও সংসদের ঐতিহাসিক ভূমিকা

রাজনীতিতে তিনি ছিলেন তাঁর উস্তাদ মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর একনিষ্ঠ অনুসারী এবং জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সারির নেতা।

  • এমএনএ (MNA) নির্বাচিত: ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ (পার্লামেন্ট) নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘চেয়ার’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে এমএনএ (মেম্বার অব ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৬৫ ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
  • সংসদে ঐতিহাসিক অবদান:
    • রাষ্ট্রের নামকরণে পাকিস্তান প্রজাতন্ত্রের পরিবর্তে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান’ লেখায় প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
    • “কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন করা যাবে না”—এই মূল নীতিটি তিনিই পাকিস্তানের সংসদে উত্থাপন করেছিলেন।
    • তাঁর তীব্র দাবির মুখে আইয়ূব সরকার একটি অর্ডিন্যান্স থেকে ইসলামবিরোধী ধারা বাতিল করতে বাধ্য হয়।
    • পূর্ব পাকিস্তানে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তিনিই সর্বপ্রথম পার্লামেন্টে তুলে ধরেন।

অমর রচনাবলী

দ্বীনি খিদমতের পাশাপাশি লেখালেখিতেও তাঁর অবদান ছিল অতুলনীয়। তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে:

১. ফাতহুল কারীম ফি সিয়াসাতিন্নাবিয়ীল আমীন: রাজনীতি বিষয়ে আরবিতে লেখা একটি ঐতিহাসিক অমর গ্রন্থ (যা পরবর্তীতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে ‘ইসলামের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার’ নামে অনূদিত হয়)। ২. আল-فুরক্বান বাইনাল হক্বে ওয়াল বাতিল ফি ইলমিত তাসাউফে ওয়াল ইহসান (তাসাউফ সংক্রান্ত কিতাব)। ৩. আল ফুরক্বান বাইনা আউলিয়াইর রহমান ও আউলিয়াইশ শাইতান। ৪. সত্যের আলো (দুই খণ্ডে)। ৫. ইসলামে ভোট ও ভোটের অধিকার। ৬. ইজহারে হক্ব এবং সেমাউল কোরআন

আধ্যাত্মিক জীবন ও ইন্তেকালের কারামাত

তিনি হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.) এবং উস্তাদ হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর কাছ থেকে আধ্যাত্মিক ফয়েজ হাসিল করেন। পরবর্তীতে মাওলানা ইয়াকুব বদরপুরী (রহ.)-এর কাছে বায়াত হয়ে খেলাফত লাভ করেন।

  • ইন্তেকাল: ১৩৯০ হিজরীর ১০ জিলহজ মোতাবেক ১৯৭১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ঈদুল আজহার রাতে এই মহান অলিয়ে কামেল ইন্তেকাল করেন। কানাইঘাট দারুল উলুম মাদরাসার সামনেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।
  • কবর থেকে সুগন্ধি বের হওয়ার কারামাত: দাফনের পর টানা কয়েকদিন এবং পরবর্তীতে তিন মাস পর আবারও তাঁর কবর থেকে অলৌকিক সুগন্ধি বের হতে থাকে। এমনকি ইন্তেকালের দীর্ঘ ৪০ বছর পর, ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে আবারও তাঁর কবর থেকে তীব্র সুগন্ধি বের হতে শুরু করলে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং হাজার হাজার মানুষ তা দেখার জন্য ভিড় জমান।

তাঁর স্মৃতি ও অবদানের সম্মানার্থে বর্তমান কানাইঘাট উপজেলা সদরে সুরমা নদীর উপর নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ সেতুটির নাম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী সেতু রাখা হয়েছে।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স (References)

১. মূল গ্রন্থ: ফাতহুল কারীম ফি সিয়াসাতিন্নাবিয়ীল আমীন (অনুবাদ: ইসলামের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার), ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। ২. জীবনী ও স্মারকগ্রন্থ: আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) স্মারকগ্রন্থ, উলামা পরিষদ বাংলাদেশ। ৩. সংসদীয় রেকর্ড: পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি (National Assembly of Pakistan) ১৯৬২-১৯৬৫ এর সংসদীয় কার্যবিবরণী ও প্রস্তাবনাসমূহ। ২. প্রাতিষ্ঠানিক আর্কাইভ: দারুল উলূম দেওবন্দ (ভারত) এবং দারুল উলূম কানাইঘাট (সিলেট) এর শিক্ষা সমাপনী রেকর্ড ও শতবর্ষী স্মারক। ৫. সরকারি তথ্য বাতায়ন: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কানাইঘাট উপজেলা পোর্টাল (প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব অনুচ্ছেদ)।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

জিহাদ মানে কি

নিউজ ডেস্ক

May 8, 2026

শেয়ার করুন

ইসলামিক ডেস্ক | ০৮ মে ২০২৬

বর্তমান বিশ্বে ইসলাম নিয়ে যে কয়টি শব্দ সবচেয়ে বেশি ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রচারের শিকার, তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘জিহাদ’। ইসলামবিদ্বেষী ও উগ্রপন্থীরা অনেক সময়ই জিহাদকে খুন, অরাজকতা বা নিরপরাধ মানুষ হত্যার সমার্থক হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জিহাদ আসলে একটি সুশৃঙ্খল, আধ্যাত্মিক এবং আদর্শিক সংগ্রামের নাম।

জিহাদ শব্দের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ

‘জিহাদ’ আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো—পরিশ্রম করা, চেষ্টা করা বা কোনো লক্ষ্য অর্জনে সর্বোচ্চ সংগ্রাম করা। ইসলামী পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের প্রবৃত্তি (নফস), অন্যায়, দুর্নীতি এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকেই জিহাদ বলা হয়।

জিহাদের প্রকারভেদ: বড় জিহাদ বনাম ছোট জিহাদ

ইসলামে জিহাদকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে: ১. জিহাদে আকবর (বড় জিহাদ): এটি হলো নিজের কু-প্রবৃত্তি বা নফসের বিরুদ্ধে লড়াই। লোভ, অহংকার, মিথ্যা ও পাপাচার থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে আল্লাহর অনুগত রাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সবচেয়ে বড় জিহাদ হলো নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করা।” (বায়হাকি) ২. জিহাদে আসগর (ছোট জিহাদ): এটি হলো শারীরিক বা সামরিক সংগ্রাম। যখন মুসলিম সমাজ বা রাষ্ট্র আক্রান্ত হয়, তখন আত্মরক্ষা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করা।

পবিত্র কোরআন কী বলে?

পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে জিহাদের ব্যাপকতা বর্ণিত হয়েছে:

  • আল্লাহর পথে সর্বাত্মক চেষ্টা: “আর তোমরা আল্লাহর পথে চেষ্টা-সংগ্রাম কর, যেভাবে সংগ্রাম করার হক।” (সূরা হাজ্জ, আয়াত: ৭৮)। এই আয়াতে কেবল যুদ্ধের কথা বলা হয়নি, বরং ইবাদত, ধৈর্য এবং চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্যের কথা বলা হয়েছে।
  • ত্যাগ ও ঈমান: “যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে ধন-সম্পদ ও জীবন দিয়ে জিহাদ করেছে।” (সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৭২)। এখানে সমাজ গঠন ও ত্যাগের গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে।

জিহাদ বনাম ফিতনা (বিশৃঙ্খলা)

ইসলামে নিরপরাধ মানুষ হত্যা বা সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, “আর ফিতনা (অন্যায়-অত্যাচার বা বিশৃঙ্খলা) হত্যা থেকেও গুরুতর।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৯১)। অর্থাৎ, জিহাদ আসে ফিতনা দূর করতে, ফিতনা ছড়াতে নয়।

ইসলামে যুদ্ধেরও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং উপাসনালয়ে থাকা মানুষদের ওপর আক্রমণ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সুতরাং যারা নিরপরাধ মানুষ হত্যা করে তাকে জিহাদ বলে চালিয়ে দেয়, তারা ইসলামের শিক্ষার বিপরীত কাজ করে।

উপসংহার

জিহাদ মানেই রক্তপাত নয়। জিহাদ মানে সমাজ থেকে মাদক, জুয়া, ব্যভিচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। জিহাদ মানে নিজের চরিত্রকে সুন্দর করা। অর্থাৎ, অন্যায়ের সামনে আপসহীন থেকে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য জান-মাল ও মেধা দিয়ে চেষ্টা করাই হলো প্রকৃত জিহাদ।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ