ইসলাম ও জীবন

কোরবানির পশুতে যেসব ত্রুটি থাকা যাবে না: ইসলাম ও হাদিসের স্পষ্ট বিধান
কোরবানির পশুতে যেসব ত্রুটি থাকা যাবে না

নিউজ ডেস্ক

May 18, 2026

শেয়ার করুন

১৯ মে ২০২৬: ইসলাম ধর্মে কোরবানি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পশু জবেহ করার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। তবে কোরবানির পশুতে যেসব ত্রুটি থাকা যাবে না, সে বিষয়ে শরিয়তের কঠোর ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। অন্ধত্ব, অতিরিক্ত রোগাক্রান্ত বা পঙ্গু পশুর মাধ্যমে কোরবানি আদায় করা ইসলামে সম্পূর্ণ নাজায়েজ। তাই কোরবানি সহিহ হওয়ার জন্য পশুটিকে অবশ্যই নির্দিষ্ট বয়সসীমা পার হতে হবে এবং সেটি বড় ধরনের যেকোনো শারীরিক ও দৃশ্যমান দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত হতে হবে।

ঐতিহাসিক ও ইসলামিক প্রেক্ষাপট: পশুর বয়সসীমা ও শরিয়তের নিয়ম

ইসলামের ফিকহ শাস্ত্রের অন্যতম নির্ভরযোগ্য আকর গ্রন্থ ‘হিদায়া’ অনুযায়ী, সব ধরনের গৃহপালিত পশু দিয়ে কোরবানি করা জায়েজ নয়। কোরবানির জন্য কেবল উট, গরু, মহিষ, দুম্বা, ভেড়া ও ছাগল নির্ধারিত। ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী এসব পশুর একটি নির্দিষ্ট বয়স পূর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক:

  • ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা: কমপক্ষে ১ বছর পূর্ণ হতে হবে।
  • গরু ও মহিষ: কমপক্ষে ২ বছর পূর্ণ হতে হবে।
  • উট: কমপক্ষে ৫ বছর পূর্ণ হতে হবে।

পশুর বয়স যদি এই নির্ধারিত সীমার চেয়ে একদিনও কম হয়, তবে তার দ্বারা কোরবানি করা শরিয়ত অনুযায়ী বৈধ বা জায়েজ হবে না।

তথ্যসমৃদ্ধ গভীর বিশ্লেষণ: পশুর যেসব ত্রুটি থাকলে কোরবানি হবে না

পবিত্র হাদিস শরিফ এবং ইসলামি আইনবিদদের নিখুঁত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোরবানির পশুকে অবশ্যই সুস্থ ও হৃষ্টপুষ্ট হতে হবে। পশুর মধ্যে প্রধান যে ১৩টি ত্রুটি থাকলে কোরবানি দেওয়া যাবে না, তার একটি কাঠামোগত তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

১. দৃষ্টিশক্তিহীনতা: পশুর চোখ সম্পূর্ণ অন্ধ হওয়া বা দৃষ্টিশক্তি না থাকা।

২. শ্রবণশক্তিহীনতা: কান ঠিক থাকলেও শোনার ক্ষমতা পুরোপুরি লোপ পাওয়া।

৩. চরম জীর্ণশীর্ণতা: পশু অত্যন্ত দুর্বল, হাড্ডিসার এবং জীর্ণশীর্ণ হওয়া।

৪. অক্ষম পঙ্গুত্ব: এই পরিমাণ লেংড়া বা পঙ্গু হওয়া যে, পশুটি জবেহ করার স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না।

৫. কাটা লেজ: পশুর লেজের বেশির ভাগ অংশ কাটা থাকা।

৬. জন্মগত কান না থাকা: জন্মের সময় থেকেই পশুর মাথায় কোনো কান না থাকা।

৭. কাটা কান: পশুর কানের বেশির ভাগ অংশ কোনো কারণে কাটা থাকা।

৮. শিং উপড়ে যাওয়া: শিং একেবারে গোড়াসহ উপড়ে বা ভেঙে যাওয়া (তবে আংশিক ভাঙলে বা জন্মগত শিং না থাকলে সমস্যা নেই)।

৯. পাগল হওয়া: মানসিক ভারসাম্যহীনতা বা পাগল হওয়ার কারণে ঘাস-পানি ঠিকমতো না খাওয়া।

১০. দাঁত না থাকা: পশুর মুখের বেশির ভাগ দাঁত পড়ে যাওয়া বা না থাকা।

১১. স্তনের দুধ শুকিয়ে যাওয়া: কোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণে ওলানের বা স্তনের দুধ পুরোপুরি শুকিয়ে যাওয়া।

১২. ছাগলের কাটা স্তন: ছাগলের ক্ষেত্রে দুটি দুধের বা ওলানের যেকোনো একটি কাটা থাকা।

১৩. গরু-মহিষের কাটা স্তন: গরু বা মহিষের ক্ষেত্রে চারটি দুধের যেকোনো দুটি কাটা থাকা।


হাদিসের আলোকে নিষিদ্ধ চার ধরনের পশু

হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানি না হওয়ার জন্য প্রধান চারটি শারীরিক ত্রুটিকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন। এই বৈশ্বিক ও চিরন্তন ইসলামিক গাইডলাইনটি নিচে তুলে ধরা হলো:

+------------------------------------+--------------------------------------------------+
| নিষিদ্ধ পশুর ধরন (হাদিস অনুযায়ী)  | ত্রুটির স্পষ্ট বা বাস্তব রূপ                     |
+------------------------------------+--------------------------------------------------+
| স্পষ্ট অন্ধ বা টেরা পশু             | যার চোখের অন্ধত্ব বা গুরুতর সমস্যা স্পষ্ট দেখা যায়|
| স্পষ্ট রোগাক্রান্ত পশু             | যে রোগ বা ইনফেকশনের কারণে পশু অত্যন্ত দুর্বল      |
| স্পষ্ট পঙ্গু বা লেংড়া পশু          | যে খুঁড়িয়ে হাঁটে এবং দলের সাথে চলতে পারে না      |
| অঙ্গভঙ্গ বা গুরুতর আহত পশু          | যার কোনো অঙ্গ (যেমন পা বা হাড়) ভেঙে গেছে বা জখম  |
+------------------------------------+--------------------------------------------------+

ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও পশু ক্রয়ের ক্ষেত্রে সতর্কতা

কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহর দরবারে সর্বোত্তম ও নিখুঁত জিনিসটি উৎসর্গ করা। বর্তমান ডিজিটাল যুগে পশুর হাটে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে পশু না কিনে, উপরে উল্লেখিত ১৩টি ত্রুটি ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, বাহ্যিক সুন্দর দেখার চেয়ে পশুর অভ্যন্তরীণ সুস্থতা এবং শরিয়তের বয়সসীমা রক্ষা করা কোরবানি কবুল হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত।


তথ্যসূত্র ও নির্ভরযোগ্য সোর্স: ১. ফিকহ শাস্ত্রের বিখ্যাত গ্রন্থ: হিদায়া, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা: ১০৩

২. পবিত্র হাদিস গ্রন্থ: সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নম্বর: ৩১৪৪ (পশুর ত্রুটি ও কোরবানি অধ্যায়)।

৩. সমসাময়িক ইসলামিক ফতোয়া বোর্ড এবং আন্তর্জাতিক ফিকহ একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত হজ ও কোরবানি বিষয়ক নির্দেশিকা (২০২৬)।


প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ডোনাল্ড ট্রাম্প

নিউজ ডেস্ক

May 28, 2026

শেয়ার করুন

কুরবানির পশুর নাম মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে রাখা এবং পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে তা ফেরত নেওয়ার ঘটনাটিতে আসলে দুই দিকেই যুক্তি দেখানো সম্ভব।

স্বাভাবিক অবস্থায়, অন্য যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট যদি ক্ষমতায় থাকত, তবে এই ঘটনাকে এক প্রকার ‘প্যারানয়া’ বা অতি-সতর্কতা বলাই যুক্তিযুক্ত হতো। কারণ সাধারণত কোনো দেশে কোন পশুর নাম কী রাখা হলো, তা নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধানরা মাথা ঘামান না এবং নিজস্ব বাকস্বাধীনতার মুখোশ ধরে রাখার জন্যও তারা এসব ঘটনা এড়িয়ে যান। খোদ আমেরিকার ভেতরেও কেউ কোনো পশুর নাম প্রেসিডেন্টের নামে রাখলে সেখানে রাষ্ট্র আইনি বাধা দেয় না।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্য সাধারণ প্রেসিডেন্টদের মতো নন; তিনি অত্যন্ত খামখেয়ালি এবং তাঁর ব্যক্তিগত ইগো বা অহংবোধ প্রচণ্ড। অনেক সময় দেখা যায়, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তও তিনি দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় স্বার্থের কথা চিন্তা করে নেন না, বরং জাস্ট নিজের ব্যক্তিগত ইগোর কারণে নিয়ে বসেন।

“লো-ভ্যালু রিস্ক, হাই-কস্ট কনসিকুয়েন্স”: ভাইরাল নিউজ ও ট্রাম্পের সম্ভাব্য রিঅ্যাকশন

ডিজিটাল এবং সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে ‘ট্রাম্প’ নামের মহিষটি যেভাবে ভাইরাল হয়েছে, তাতে নিশ্চিতভাবেই ধরে নেওয়া যায় যে এটিকে কুরবানি দেওয়ার পরের নিউজ এবং ভিডিও-ও ব্যাপকভাবে ভাইরাল হবে।

যদি আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো “ট্রাম্পকে কুরবানি দিলো বাংলাদেশ” টাইপ হেডলাইন করতে থাকে এবং সেই সাথে রক্তমাখা ছবি বা ভিডিও শেয়ার হতে থাকে, তবে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। কোনো অতি-উৎসাহী বা উস্কানিমূলক সাংবাদিক যদি হোয়াইট হাউজের প্রেস ব্রিফিংয়ে ট্রাম্পকে এই ব্যাপারে প্রশ্ন করে বসেন, তবে তিনি কীরকম রিঅ্যাক্ট করবেন, তা আগে থেকে অনুমান করা অসম্ভব।

ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকির ক্ষেত্রসমূহ

একটি তুচ্ছ পশুর নামকে কেন্দ্র করে আমেরিকা নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশ আক্রমণ করবে না কিংবা বড় কোনো অর্থনৈতিক অবরোধও দেবে না। কিন্তু আমেরিকার বৈশ্বিক সফট পাওয়ার এবং অর্থনীতি এতই বিশাল যে, তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব অসন্তুষ্ট হলে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে অনেক দিকেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলায় পড়তে হতে পারে। সম্ভাব্য ঝুঁকির ক্ষেত্রগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • নতুন ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপ: ট্রাম্প প্রশাসন যদি বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস)-এর ওপর নতুন কোনো শুল্ক বা ট্যারিফ আরোপ করতে চায়, তখন এই ধরণের ঘটনা কুনজর তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
  • গোপন চুক্তি করার বাধ্যবাধকতা: তৈরি পোশাক বা অন্য কোনো বড় সেক্টরকে মার্কিন কুনজর থেকে রক্ষা করার জন্য তখন দেখা যাবে সরকারকে পর্দার আড়ালে আরও কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত বা গোপন চুক্তি করতে হচ্ছে।
  • দুর্বল কূটনৈতিক অবস্থান: কুরবানির পশু হাটে বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্রীয় চাপে তা ক্রেতার কাছ থেকে ফেরত আনা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমাদের কূটনৈতিক দুর্বল অবস্থানকেই নির্দেশ করে।

সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ বনাম বিকল্প সমাধানের ম্যাট্রিক্স

কুরবানির পশুর নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ রাখা নিয়ে সৃষ্ট আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক জটিলতা নিরসনে বাংলাদেশ সরকার তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নারায়ণগঞ্জের রাবেয়া এগ্রো ফার্মে লালন-পালন করা প্রায় ৭০০ কেজি ওজনের একটি বিরল সাদা (অ্যালবিনো) মহিষের সোনালি চুল ও চোখের অবয়ব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে মিল থাকায় খামারিরা শখের বশে এর নাম রাখেন ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। পশুর হাটে বিক্রির পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হলে এবং ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন আপত্তির পর সরকার আইনশৃঙ্খলা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষায় দ্রুত হস্তক্ষেপ করে।

নিচে সরকারের গৃহীত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ এবং এর বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদী টেকসই সমাধানের একটি তুলনামূলক ম্যাট্রিক্স বা ছক উপস্থাপন করা হলো।

সরকারের গৃহীত বর্তমান পদক্ষেপসমূহ

  • কুরবানি বন্ধের নির্দেশ: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নির্দেশনায় ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে মহিষটির কুরবানি স্থগিত করা হয়।
  • সরকারি হেফাজতে গ্রহণ: কেরানীগঞ্জ মডেল থানা পুলিশ ও প্রশাসন ক্রেতা মনিরুজ্জামান সামিরের বাড়ি থেকে মহিষটিকে সরকারি হেফাজতে নিয়ে আসে।
  • ক্ষতিপূরণ ও বিকল্প পশুর নিশ্চয়তা: মহিষটির ক্রয়মূল্য (৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা) ফেরত দেওয়া অথবা সমমূল্যের অন্য কুরবানির পশু ক্রেতাকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
  • জাতীয় চিড়িয়াখানায় স্থানান্তর: বিরল প্রজাতির এই অ্যালবিনো মহিষটিকে সাধারণ মানুষের আকর্ষণ এবং রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ঢাকার মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানায় স্থানান্তর করা হয়েছে।

সরকারি পদক্ষেপ বনাম বিকল্প সমাধানের মূল্যায়ন ম্যাট্রিক্স

বিবেচ্য বিষয় সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ (রিয়াক্টিভ মোড)বিকল্প দীর্ঘমেয়াদী সমাধান (প্রোঅ্যাক্টিভ মোড)
মূল ফোকাসসংকট বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার পর তা দমন করা।হাটে পশু তোলার আগেই নীতিমালার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি।
কূটনৈতিক প্রভাবসাময়িকভাবে ভুল বোঝাবুঝি বা কূটনৈতিক অস্বস্তি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।রাষ্ট্রপ্রধানদের নাম ব্যবহারে স্থায়ী আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকলে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে।
খামারি ও ক্রেতার স্বার্থসরকারি হস্তক্ষেপে শেষ মুহূর্তে ক্রেতা বা বিক্রেতা কিছুটা মানসিক ও প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হন।শুরু থেকেই নিয়ম জানা থাকলে খামারিরা এমন নাম দিয়ে ভাইরাল করার ঝুঁকি নিতেন না।
বাজেট ও রাষ্ট্রীয় ব্যয়সরকারি তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ বা বিকল্প পশু দেওয়ার কারণে আকস্মিক ব্যয় বৃদ্ধি পায়।রাষ্ট্রীয় কোনো আর্থিক ক্ষতি বা বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজন পড়ে না।
ভাইরাল সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রণআংশিক সফল, তবে নাম পরিবর্তনের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা বা ট্রলিং পুরোপুরি বন্ধ করা যায় না।প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং ডিজিটাল সিকিউরিটি সেলের মাধ্যমে পশুর নামকরণে সেন্সরশিপ বা গাইডলাইন তৈরি করা।

আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ: একজন সচেতন নাগরিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমি মনে করি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই হস্তক্ষেপের পদ্ধতিটি সাধারণ মানুষের কাছে দেখতে ভালো না ঠেকলেও, এর পেছনের বৃহত্তর কৌশলগত গুরুত্বকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ক্ষমতার ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় বাংলাদেশ আমেরিকার সামনে একটি দুর্বল অবস্থানে রয়েছে—এই সত্যটি আমাদের মেনে নিতেই হবে। সরকার হয়তো আইনি জটিলতা বা পুলিশ পাঠিয়ে ভিডিও নিষিদ্ধ করার মতো ঝামেলাপূর্ণ প্রক্রিয়ায় যেতে চায়নি। ব্যবসায়ী ও ক্রেতাকে আর্থিক মূল্য পরিশোধ বা সমমূল্যের পশু কিনে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিষয়টির তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তি করাকেই তারা সবচেয়ে সহজ ও কম ঝুঁকিপূর্ণ সমাধান মনে করেছে। এটি হয়তো সরকারের একটি অপ্রিয় কাজ, কিন্তু ভাইরাল নিউজের এই যুগে তারা একটি “Low-value risk, high-cost consequence” অর্থাৎ একটি তুচ্ছ বিষয় থেকে বড় ধরণের অর্থনৈতিক মাশুল দেওয়ার ঝুঁকিতে যেতে চায়নি।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২৫ বছরে মানুষের উন্নতি নাকি অবৈধ অর্থ উপার্জন

নিউজ ডেস্ক

May 28, 2026

শেয়ার করুন

২০০১ সালে ঢাকার নয়াবাজার কুরবানির পশুর হাটে একটি বিশাল গরুর দাম হাঁকানো হয়েছিল ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, কিন্তু চড়া দামের কারণে দুঃখজনকভাবে গরুটি তখন বিক্রি হয়নি।

ঠিক ২৫ বছর পর ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের হাটে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা দামের গরুও অনায়াসে বিক্রি হচ্ছে এবং মানুষ তা কুরবানি দিচ্ছে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে একে ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নতি বা স্বাবলম্বিতা মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, দুর্নীতি এবং লোক দেখানো সংস্কৃতির এক অন্ধকার সত্য।

২৫ বছরের ব্যবধানে সমাজ ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ৫টি প্রধান রূপ

বিগত আড়াই দশকে দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লেও সমাজের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরে সততা ও বিবেকের চরম বিপর্যয় ঘটেছে। সচেতন নাগরিকদের বিশ্লেষণে এই অবক্ষয়ের ৫টি বড় ক্ষেত্র নিচে দেওয়া হলো:

  • রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতি: দেশের রাজনীতি আজ অনেকাংশেই নীতিহীন দুর্নীতিবাজদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ফলে সিন্ডিকেট, টেন্ডারবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
  • শিক্ষা খাতের বাণিজ্যিকীকরণ: যে শিক্ষক সমাজকে মনে করা হতো জাতির মেরুদণ্ড, তাদের একটি বড় অংশ আজ শিক্ষার নামে প্রকাশ্য ব্যবসায় নেমেছে। নৈতিক শিক্ষাদানের চেয়ে কোচিং বাণিজ্য ও গাইড বইয়ের সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়েছেন অনেকে।
  • চিকিৎসা খাতের অমানবিক রূপ: চিকিৎসকদের অধিকাংশই আজ সেবার মানসিকতা ভুলে অমানবিক ধান্ধাবাজিতে লিপ্ত। অপারেশন থিয়েটারে আশঙ্কাজনক রোগীকে ঢুকিয়ে বাইরে অপেক্ষমাণ স্বজনদের জিম্মি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা এখন নিত্যদিনের চিত্র।
  • শিক্ষিত শ্রেণির প্রতারণা ও জালিয়াতি: দুঃখজনক হলেও সত্য, এই ২৫ বছরে শিক্ষিত ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যেই জালিয়াতি, ব্যাংক ও কর ফাঁকি এবং দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ গড়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
  • লোক দেখানো ধর্মীয় সংস্কৃতি: ২৫ বছর আগে মানুষ সৎ উপায়ে আয় করত বলে দেড় লাখ টাকা দিয়ে গরু কেনার সামর্থ্য সবার ছিল না। আর এখন লাখ লাখ টাকার অবৈধ কালো টাকা সাদা করতে ও সমাজে দেখনদারি প্রতিষ্ঠা করতে ৩০-৫০ লাখ টাকার গরু কুরবানি দেওয়া হচ্ছে, অথচ পাশের বস্তির গরিবের কপালে আধা কেজি মাংসও জোটে না।

মূল্যবোধের বিবর্তন: ২০০১ বনাম ২০২৬ সালের সামাজিক চিত্র

২০০১ সাল থেকে ২০২৬ সাল—এই ২৫ বছরে প্রযুক্তির বিস্ফোরণ, বিশ্বায়ন এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধে এক আমূল ও যুগান্তকারী বিবর্তন ঘটেছে। ২০০১ সালের সমাজ যেখানে ছিল যৌথ পরিবার, সামনাসামনি যোগাযোগ এবং ঐতিহ্যগত রীতিনীতি-কেন্দ্রিক; ২০২৬ সালের সমাজ সেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, ডিজিটাল সংযোগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত এক দ্রুতগতির বাস্তবতায় রূপান্তরিত হয়েছে।

নিচে ২০০১ এবং ২০২৬ সালের সামাজিক চিত্র ও মূল্যবোধের প্রধান তুলনামূলক দিকগুলো তুলে ধরা হলো:

১. পারিবারিক কাঠামো ও বন্ধন

  • ২০০১ সালের চিত্র: সমাজে যৌথ পরিবারের আধিপত্য ছিল। পরিবারের বড়দের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত বলে গণ্য করা হতো এবং পারস্পরিক সহনশীলতা ও ত্যাগের মূল্যবোধকে উচ্চে রাখা হতো।
  • ২০২৬ সালের চিত্র: একক পরিবারের (Nuclear Family) সংখ্যা এখন সর্বাধিক। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (Individualism) ও নিজস্ব গোপনীয়তার (Privacy) মূল্যবোধ বৃদ্ধি পাওয়ায় পারিবারিক বন্ধনের চেয়ে নিজের ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত বিকাশকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

২. যোগাযোগ ও সামাজিকতা

  • ২০০১ সালের চিত্র: মানুষ সশরীরে আড্ডা, চিঠি, ল্যান্ডফোন এবং পাড়া-প্রতিবেশীর বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখত। সামাজিকতা ছিল গভীর ও আন্তরিক।
  • ২০২৬ সালের চিত্র: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ) এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটির যুগে সামাজিকতা এখন ‘স্ক্রিন’-নির্ভর। মানুষের অগাধ ডিজিটাল যোগাযোগ থাকলেও বাস্তব জীবনে একাকীত্ব এবং মানসিক দূরত্ব অনেক বেড়েছে।

৩. লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন

  • ২০০১ সালের চিত্র: কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও সমাজে পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রভাব ছিল প্রবল। নারীর মূল মূল্যায়ন হতো মূলত পারিবারিক দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে।
  • ২০২৬ সালের চিত্র: অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন এক নতুন স্তরে পৌঁছেছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নেতৃত্ব এবং স্বাবলম্বিতার ক্ষেত্রে নারীরা এখন সমান অংশীদার, যা সনাতন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দিয়েছে।

৪. তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা ও সহনশীলতা

  • ২০০১ সালের চিত্র: তথ্যের প্রধান উৎস ছিল সংবাদপত্র এবং টেলিভিশন। মানুষ যেকোনো খবর বা সামাজিক রীতিনীতির প্রতি সহজে বিশ্বাস স্থাপন করত এবং সমাজে এক ধরনের সামষ্টিক শৃঙ্খলা বজায় থাকত।
  • ২০২৬ সালের চিত্র: তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের কারণে মানুষ অনেক বেশি সচেতন ও প্রশ্নপ্রবণ। তবে এর পাশাপাশি ভুয়ো খবর (Fake News) এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদমের কারণে মানুষের মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা কমেছে এবং মেরুকরণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

৫. বিনোদন ও সংস্কৃতির ধরন

  • ২০০১ সালের চিত্র: বিনোদন ছিল সামষ্টিক। বিটিভি, সিনেমা হল, বই পড়া, রেডিও শোনা কিংবা মাঠে খেলাধুলার মাধ্যমে মানুষ বিনোদন খুঁজত, যা দেশীয় সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।
  • ২০২৬ সালের চিত্র: বিনোদন এখন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও ওটিটি (OTT) এবং অনলাইন গেম-ভিত্তিক। বিশ্বায়নের প্রভাবে দেশীয় সংস্কৃতির সাথে ওয়েস্টার্ন বা গ্লোবাল সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটেছে, যা তরুণ প্রজন্মের জীবনযাত্রায় স্পষ্ট।

২০০১ বনাম ২০২৬: এক নজরে সামাজিক মূল্যবোধ

সূচক২০০১ সালের সমাজ২০২৬ সালের সমাজ
মূল চেতনাসামষ্টিকতা ও ঐতিহ্যব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও আধুনিকতা
সম্পর্কের ভিত্তিসশরীরে উপস্থিতি ও আবেগডিজিটাল উপস্থিতি ও উপযোগিতা
তরুণদের লক্ষ্যপারিবারিক ও সামাজিক স্থায়িত্ববৈশ্বিক ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা
নৈতিকতাসামাজিক অনুশাসন-ভিত্তিকযুক্তি ও ব্যক্তিগত অধিকার-ভিত্তিক

সংক্ষেপে বলা যায়, ২০০১ সালের সরল ও সামষ্টিক মূল্যবোধ থেকে বেরিয়ে ২০২৬ সালের সমাজ অনেক বেশি গতিশীল, প্রযুক্তি-নির্ভর এবং অধিকার-সচেতন হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তন যেমন আমাদের অনেক সুযোগ এনে দিয়েছে, তেমনই যান্ত্রিকতা ও একাকীত্বের মতো নতুন সামাজিক চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে।

আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ: একজন সচেতন নাগরিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে সমাজের এই ভেতরকার পচন আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। একটি দেশের জিডিপি বা মাথাপিছু আয় বাড়লেই তাকে প্রকৃত উন্নয়ন বলা যায় না, যদি না সেই দেশের মানুষের নৈতিকতা ও মানবিকতার সূচক উন্নত হয়। ২৫ বছর আগের মধ্যবিত্তের যে সৎ সাহস ছিল, আজকের করপোরেট ও প্রভাবশালী মহলের সেই অন্তরাত্মা নেই। লাখ লাখ টাকা খরচ করে পশুর হাটে যে ‘শো-অফ’ বা দেখনদারি আমরা দেখছি, তা আসলে ত্যাগের মহিমাকে ম্লান করে দিচ্ছে। সমাজ থেকে এই সিন্ডিকেট, প্রাতিষ্ঠানিক ঘুষ এবং পেশাজীবীদের ধান্ধাবাজি বন্ধ করতে না পারলে এই তথাকথিত উন্নয়ন কেবল মুষ্টিমেয় কিছু অপরাধীর পকেটই ভারী করবে, সাধারণ শোষিত মানুষের কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী

নিউজ ডেস্ক

May 17, 2026

শেয়ার করুন

১৯৪৭ সালে পবিত্র হজ পালন করতে গিয়ে মক্কার হারাম শরীফের ইমাম সাহেবের খুতবায় সুক্ষ্ম ইলমি ভুল ধরেছিলেন বাংলাদেশের সিলেটের কানাইঘাটের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.)। হাদিসশাস্ত্র ও আরবি ব্যাকরণে তাঁর এই অসাধারণ পাণ্ডিত্য দেখে তৎকালীন আরবের বিখ্যাত আলেমরা পুরোপুরি তাক লাগিয়ে যান। এমনকি তৎকালীন সৌদি আরবের বাদশাহ স্বয়ং তাঁর দেশের রাষ্ট্রীয় সংবিধান আল্লামা বায়মপুরীর সামনে পেশ করে কোনো ভুল আছে কি না তা যাচাই করতে বলেন এবং আল্লামা বায়মপুরী (রহ.) সেই সংবিধানে অন্তত ১৪টি বিষয় সংশোধনযোগ্য বলে চিহ্নিত করেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি শুধু সিলেট অঞ্চল নয়, বরং গোটা উপমহাদেশের ওলামায়ে কেরামের ইলমি শ্রেষ্ঠত্বের এক অনন্য দলিল।

নিচে এই ক্ষণজন্মা হাদিস বিশারদ, রাজনীতিক ও মহান সংস্কারকের জন্ম, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এবং ঐতিহাসিক অবদান বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

জন্ম ও বংশ পরিচয়

আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) ১৩২৭ হিজরি মোতাবেক ১৯০৭ সালের মহররম মাসে এক জুমার দিনে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বায়মপুর গ্রামের (বর্তমান কানাইঘাট পৌরসভার অন্তর্গত) এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

  • পিতা: কারী আলিম বিন কারী দানিশ মিয়া।
  • মাতা: হাফেজা সুফিয়া বেগম।

তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। শৈশবেই তাঁর পিতা মারা যাওয়ায় মায়ের একক তত্ত্বাবধানে তিনি লালিত-পালিত হন। মাত্র সাত বছর বয়সে মায়ের কাছে পবিত্র কোরআন শরীফ শিক্ষার মাধ্যমে তাঁর পড়াশোনার হাতেখড়ি হয়, যার পাশাপাশি তিনি বাংলা ও উর্দু ভাষাও আয়ত্ত করেন।

শিক্ষাজীবন এবং দেওবন্দের গৌরবোজ্জ্বল রেকর্ড

কানাইঘাট ইসলামিয়া মাদরাসা (বর্তমান দারুল উলুম কানাইঘাট) থেকে মাত্র ১০ বছর বয়সে প্রাথমিক ও পরবর্তীতে মাধ্যমিক পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। এরপর কিছুদিন শিক্ষকতা করলেও উচ্চশিক্ষার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় তিনি ভারতে পাড়ি জমান।

  • ভারতে প্রথম পর্ব: রামপুর আলিয়া মাদরাসায় ৫ বছর এবং মিরাঠ আলিয়া মাদরাসায় ২ বছর পড়াশোনা করেন। এই ৭ বছরে তিনি হাদিস, তাফসির, ফেকাহ, আকাইদ ও দর্শন শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ছাত্র অবস্থাতেই তিনি দরসে নেজামির কঠিন কিতাব ‘কাফিয়া’-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ ইযাহুল মাতালিব রচনা করে মেধার পরিচয় দেন।
  • দারুল উলূম দেওবন্দের রেকর্ড: ১৯৩৬ সালে তিনি বিশ্ববিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষাপীঠ দারুল উলূম দেওবন্দে ভর্তি হন। দেওবন্দে দেড় বছর অত্যন্ত সুখ্যাতির সঙ্গে হাদিসের ওপর সর্বোচ্চ ডিগ্রি (দাওরায়ে হাদিস) গ্রহণ করেন। মেধা তালিকায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং কয়েকটি বিষয়ে মোট নম্বরের চেয়েও বেশি নম্বর পেয়ে রেকর্ড গড়েন। তাঁর বোখারি শরিফের পরীক্ষার খাতা দেওবন্দ কর্তৃপক্ষ দীর্ঘকাল বিশেষভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছিল।

কর্মজীবন ও সিলেটের ‘দ্বিতীয় দারুল উলূম দেওবন্দ’

দেওবন্দের শিক্ষা সমাপ্ত করে দেশে ফেরার সময় তাঁর উস্তাদ সাইয়েদ হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) বলেছিলেন—“আব ইলম সিলেট কি তরফ জা রহা হায়” (এখন জ্ঞানবত্তা সিলেটের দিকে যাচ্ছে)।

  • শিক্ষকতা: প্রথমে ভারতের বদরপুর ও রামপুর আলিয়া মাদরাসায় এবং পরে দেশে ফিরে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসায় শাইখুল হাদিস হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে সিলেটের গাছবাড়ী জামিউল উলুম কামিলা মাদরাসায় শাইখুল হাদিসের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর একক যোগ্যতায় তৎকালীন সময়ে গাছবাড়ী মাদরাসাকে ‘দ্বিতীয় দারুল উলূম দেওবন্দ’ বলা হতো।
  • দারুল উলূম কানাইঘাট: ১৯৫৩ সালে তিনি নিজ জন্মস্থান কানাইঘাট ইসলামিয়া মাদরাসায় যোগ দিয়ে এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘দারুল উলূম কানাইঘাট’। ১৯৫৪ সালে এখানে তিনিই প্রথম দাওরায়ে হাদিসের (টাইটেল) ক্লাস চালু করেন এবং আমৃত্যু এখানে হাদিসের খিদমত করেন।
  • দেওবন্দের শায়খুল হাদিসের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান: ১৯৫৭ সালে দেওবন্দের শায়খুল হাদিস মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর দেওবন্দের শূন্য পদে যে ৩ জন বৈশ্বিক আলেমের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল, আল্লামা বায়মপুরী ছিলেন তাদের অন্যতম। কিন্তু মাতৃভূমির খিদমত ছেড়ে তিনি দেওবন্দে যেতে রাজি হননি।
  • শিক্ষা বোর্ড গঠন: পূর্ব সিলেটের সব মাদরাসাকে এক প্লাটফর্মে আনতে ১৯৫৩ সালে তিনি ‘পূর্ব সিলেট আযাদ দীনি আরবী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড’ গঠন করেন। বর্তমানে এই বোর্ডের অধীনে প্রায় ১৭৫টি মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে।

রাজনৈতিক জীবন ও সংসদের ঐতিহাসিক ভূমিকা

রাজনীতিতে তিনি ছিলেন তাঁর উস্তাদ মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর একনিষ্ঠ অনুসারী এবং জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সারির নেতা।

  • এমএনএ (MNA) নির্বাচিত: ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ (পার্লামেন্ট) নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘চেয়ার’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে এমএনএ (মেম্বার অব ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৬৫ ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
  • সংসদে ঐতিহাসিক অবদান:
    • রাষ্ট্রের নামকরণে পাকিস্তান প্রজাতন্ত্রের পরিবর্তে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান’ লেখায় প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
    • “কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন করা যাবে না”—এই মূল নীতিটি তিনিই পাকিস্তানের সংসদে উত্থাপন করেছিলেন।
    • তাঁর তীব্র দাবির মুখে আইয়ূব সরকার একটি অর্ডিন্যান্স থেকে ইসলামবিরোধী ধারা বাতিল করতে বাধ্য হয়।
    • পূর্ব পাকিস্তানে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তিনিই সর্বপ্রথম পার্লামেন্টে তুলে ধরেন।

অমর রচনাবলী

দ্বীনি খিদমতের পাশাপাশি লেখালেখিতেও তাঁর অবদান ছিল অতুলনীয়। তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে:

১. ফাতহুল কারীম ফি সিয়াসাতিন্নাবিয়ীল আমীন: রাজনীতি বিষয়ে আরবিতে লেখা একটি ঐতিহাসিক অমর গ্রন্থ (যা পরবর্তীতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে ‘ইসলামের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার’ নামে অনূদিত হয়)। ২. আল-فুরক্বান বাইনাল হক্বে ওয়াল বাতিল ফি ইলমিত তাসাউফে ওয়াল ইহসান (তাসাউফ সংক্রান্ত কিতাব)। ৩. আল ফুরক্বান বাইনা আউলিয়াইর রহমান ও আউলিয়াইশ শাইতান। ৪. সত্যের আলো (দুই খণ্ডে)। ৫. ইসলামে ভোট ও ভোটের অধিকার। ৬. ইজহারে হক্ব এবং সেমাউল কোরআন

আধ্যাত্মিক জীবন ও ইন্তেকালের কারামাত

তিনি হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.) এবং উস্তাদ হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর কাছ থেকে আধ্যাত্মিক ফয়েজ হাসিল করেন। পরবর্তীতে মাওলানা ইয়াকুব বদরপুরী (রহ.)-এর কাছে বায়াত হয়ে খেলাফত লাভ করেন।

  • ইন্তেকাল: ১৩৯০ হিজরীর ১০ জিলহজ মোতাবেক ১৯৭১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ঈদুল আজহার রাতে এই মহান অলিয়ে কামেল ইন্তেকাল করেন। কানাইঘাট দারুল উলুম মাদরাসার সামনেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।
  • কবর থেকে সুগন্ধি বের হওয়ার কারামাত: দাফনের পর টানা কয়েকদিন এবং পরবর্তীতে তিন মাস পর আবারও তাঁর কবর থেকে অলৌকিক সুগন্ধি বের হতে থাকে। এমনকি ইন্তেকালের দীর্ঘ ৪০ বছর পর, ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে আবারও তাঁর কবর থেকে তীব্র সুগন্ধি বের হতে শুরু করলে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং হাজার হাজার মানুষ তা দেখার জন্য ভিড় জমান।

তাঁর স্মৃতি ও অবদানের সম্মানার্থে বর্তমান কানাইঘাট উপজেলা সদরে সুরমা নদীর উপর নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ সেতুটির নাম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী সেতু রাখা হয়েছে।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স (References)

১. মূল গ্রন্থ: ফাতহুল কারীম ফি সিয়াসাতিন্নাবিয়ীল আমীন (অনুবাদ: ইসলামের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার), ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। ২. জীবনী ও স্মারকগ্রন্থ: আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) স্মারকগ্রন্থ, উলামা পরিষদ বাংলাদেশ। ৩. সংসদীয় রেকর্ড: পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি (National Assembly of Pakistan) ১৯৬২-১৯৬৫ এর সংসদীয় কার্যবিবরণী ও প্রস্তাবনাসমূহ। ২. প্রাতিষ্ঠানিক আর্কাইভ: দারুল উলূম দেওবন্দ (ভারত) এবং দারুল উলূম কানাইঘাট (সিলেট) এর শিক্ষা সমাপনী রেকর্ড ও শতবর্ষী স্মারক। ৫. সরকারি তথ্য বাতায়ন: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কানাইঘাট উপজেলা পোর্টাল (প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব অনুচ্ছেদ)।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ