ইতিহাস
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা
প্রকাশিত: মে ১৩, ২০২৬
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও এর সামরিক বিন্যাস নিয়ে সোশাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রায়শই একটি প্রশ্ন বা বিতর্ক দেখা যায়— “মেজর জিয়াউর রহমানকে কেন ১নং সেক্টর কমান্ডারের পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছিল?” বিভিন্ন রাজনৈতিক টকশো এবং সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক আলোচনাগুলোতে এই বিষয়টি নিয়ে নানামুখী বিতর্ক ডালপালা মেলেছে। তবে মুক্তিযুদ্ধের দালিলিক ইতিহাস, মুজিবনগর সরকারের গ্যাজেট এবং সামরিক রণকৌশল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মেজর জিয়াউর রহমানকে কোনো ‘শাস্তিমূলক’ বা ‘প্রশাসনিক’ কারণে ১নং সেক্টর থেকে অপসারণ করা হয়নি; বরং যুদ্ধের কৌশলগত প্রয়োজনে তাকে আরও বড় বড় দায়িত্ব দিয়ে পদোন্নতি ও বদলি করা হয়েছিল।
রণকৌশল পরিবর্তন ও সেক্টর বিন্যাস (এপ্রিল-জুন ১৯৭১)
১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তের হারিণায় আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ১নং সেক্টর। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী এবং ফেনী নদী সংলগ্ন এলাকা নিয়ে গঠিত এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সেক্টরের প্রথম কমান্ডার নিযুক্ত হন মেজর জিয়াউর রহমান। ২৫ মার্চ রাতে চট্টগ্রামে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা এবং কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করার কারণে এই অঞ্চলে তার তুমুল গ্রহণযোগ্যতা ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ ছিল।

পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের জুন মাসের ১০ থেকে ১৭ তারিখ পর্যন্ত কলকাতার থিয়েটার রোডের ৮ নম্বর সদর দপ্তরে প্রধান সেনাপতি কর্নেল (পরবর্তীতে জেনারেল) এম এ জি ওসমানীর সভাপতিত্বে ঐতিহাসিক ‘সেক্টর কমান্ডারস কনফারেন্স’ অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত এবং গুগল এনালিটিক্যাল ডাটাবেজে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক আর্কাইভ অনুযায়ী, জুন মাসের শেষ সপ্তাহে পুরো যুদ্ধকে গেরিলা মোড থেকে নিয়মিত ও প্রথাগত যুদ্ধ বা ‘কনভেনশনাল ওয়ারফেয়ারে’ (Conventional Warfare) রূপান্তরের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করা হয়।

‘জেড ফোর্স’ গঠন ও বৃহত্তর সামরিক পদোন্নতি
যুদ্ধক্ষেত্রের এই নতুন কৌশল বাস্তবায়নের জন্য মুক্তিবাহিনীর নিয়মিত প্রথম ৩টি ব্যাটালিয়নকে (১ম, ৩য় এবং ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট) একীভূত করে প্রথম পদাতিক ব্রিগেড (Regular Infantry Brigade) গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
- ব্রিগেড কমান্ডারের দায়িত্ব: ১৯৭১ সালের ৭ জুলাই মুজিবনগর সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরকারি প্রজ্ঞাপন বা গ্যাজেট অনুযায়ী এই প্রথম সামরিক ব্রিগেড গঠিত হয়। জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে এবং জিয়াউর রহমানের নামের প্রথম আদ্যক্ষর (Z) অনুসারে এই ব্রিগেডের নামকরণ করা হয় ‘জেড ফোর্স’ (Z Force) এবং মেজর জিয়াকে এর ব্রিগেড কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়।
- পদমর্যাদার পরিবর্তন: ব্রিগেড কমান্ডের গুরুদায়িত্ব পাওয়ার পর মেজর জিয়াউর রহমানকে মেজর পদবি থেকে পদোন্নতি দিয়ে তৎকালীন অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ‘লেফটেন্যান্ট কর্নেল’ (Lieutenant Colonel) করা হয়।
একটি পূর্ণাঙ্গ ব্রিগেডের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ১নং সেক্টরের আঞ্চলিক অপারেশন পরিচালনা করা একজন অফিসারের পক্ষে অসম্ভব ছিল। তাই রণকৌশলগত কারণেই তাকে ১নং সেক্টরের আঞ্চলিক কমান্ডের দায়িত্ব থেকে অবমুক্ত করে ভারতের মেঘালয়ের তুরা (Tura) এবং তেলডালা হেডকোয়ার্টারে বদলি করা হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হন ১নং সেক্টরের সাব-ক্যাপ্টেন এবং তৎকালীন বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম (পরবর্তীতে মেজর ও বীর উত্তম)।
১১নং সেক্টরের অতিরিক্ত গুরুদায়িত্ব

১নং সেক্টর ছাড়ার পরপরই মেজর জিয়াকে কেবল জেড ফোর্সের দায়িত্বেই রাখা হয়নি, বরং ১৯৭১ সালের জুন মাসের শেষ সপ্তাহে (২৬ জুন) বৃহত্তর ময়মনসিংহ এবং টাঙ্গাইল অঞ্চল নিয়ে গঠিত নবগঠিত ১১নং সেক্টরের কমান্ডারের অতিরিক্ত দায়িত্বও দেওয়া হয়। অর্থাৎ, ১নং সেক্টর থেকে তাকে সরানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল তাকে যুদ্ধের কেন্দ্রীয় ফ্রন্টলাইনে নিয়ে আসা এবং ঢাকা দখলের মূল রুটের (কামালপুর-জামালপুর-টাঙ্গাইল) সামরিক নিয়ন্ত্রণ তার হাতে ছেড়ে দেওয়া।
টকশো ও ঐতিহাসিকদের বিশ্লেষণ
সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে এই বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে প্রখ্যাত যুদ্ধ ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, “মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কমান্ড বদল একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এস ফোর্সের কমান্ডার শফিউল্লাহ বা কে ফোর্সের খালেদ মোশাররফকেও তাদের প্রাথমিক সেক্টর থেকে সরিয়ে ব্রিগেডের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এটিকে অপবাদ বা অপসারণ হিসেবে প্রচার করা ঐতিহাসিক অজ্ঞতা বৈ কিছু নয়।”
গুগল বুকস এবং সমকালীন সংবাদপত্রের আর্কাইভ ঘেঁটে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানী তার ডায়েরি ও পরবর্তী বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে মেজর জিয়ার এই বদলিকে ‘যুদ্ধের স্বার্থে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং সময়োপযোগী সামরিক পুনর্বিন্যাস’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন。
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, দালিলিক প্রমাণ স্পষ্ট করে যে, মেজর জিয়াউর রহমানকে ১নং সেক্টর থেকে ‘অপসারণ’ বা বরখাস্ত করা হয়নি। বরং, সেক্টর কমান্ডারের চেয়ে বহুগুণ উচ্চতর এবং সম্মানজনক ‘ব্রিগেড কমান্ডার’ পদে পদোন্নতি দিয়ে তাকে জেড ফোর্সের অধিনায়কত্ব এবং সাময়িকভাবে ১১নং সেক্টরের নেতৃত্ব প্রদান করা হয়েছিল।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:
১. উইকিপিডিয়া ও মুক্ত বিশ্বকোষ:Z Force (Bangladesh) – Wikipedia
২. জাতীয় তথ্যকোষ:War of Liberation, The – Banglapedia
৩. বিবিসি বাংলা বিশেষ প্রতিবেদন:মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে কেন ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল? – BBC
৪. মিলিটারি ইতিহাস ও গ্যাজেট:Major Zia’s war – Bangla Outlook
৫. সরকারি তথ্যচিত্র ও দালিলিক ইতিহাস:সংগ্রামের নোটবুক আর্কাইভ ১৯৭১
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিজয় দিবস কী?
১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় দিন। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালের এই দিনে বাঙালি জাতি তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ২৪ বছরের শোষণ, নিপীড়ন ও পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ‘বাংলাদেশ’-এর অভ্যুদয় ঘটায়। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট দিন নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় ও মুক্তি অর্জনের চূড়ান্ত দলিল।

ঐতিহাসিক পটভূমি: কেন এই যুদ্ধ ও বিজয়?
১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য চাপিয়ে দেয়।
- ভাষা আন্দোলন (১৯৫২): বাঙালি সংস্কৃতির ওপর প্রথম আঘাত এলে বুকের রক্ত দিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
- রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য: পূর্ব পাকিস্তান থেকে উৎপাদিত সিংহভাগ রাজস্ব পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করা হতো। কিন্তু দেশের নীতিনির্ধারণী ও সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য।
- ১৯৭০-এর নির্বাচন ও বিশ্বাসঘাতকতা: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি জান্তা সরকার বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানায়।
- ২৫শে মার্চের গণহত্যা ও স্বাধীনতা ঘোষণা: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে নিরীহ বাঙালিদের ওপর ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা শুরু করে। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।
চূড়ান্ত বিজয়: ১৬ই ডিসেম্বরের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত

দীর্ঘ ৯ মাস ধরে বাংলাদেশের গেরিলা বাহিনী (মুক্তিযোদ্ধা) এবং নিয়মিত সামরিক বাহিনী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ডিসেম্বরের শুরুতে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ কমান্ড ‘মিত্রবাহিনী’ গঠিত হলে যুদ্ধ চূড়ান্ত রূপ নেয়।
- ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ: ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি তার অধীনস্থ ৯৩,০০০ সৈন্যসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন।
- দলিল স্বাক্ষর: যৌথ বাহিনীর পক্ষে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সেনা কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। এ সময় বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিবাহিনীর উপ-প্রধান সেনাপতি গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার।
বিজয় দিবস কেন পালন করা হয়? (তাৎপর্য ও উদ্দেশ্য)

১. সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্বীকৃতি: এই বিজয়ের নেপথ্যে রয়েছে ৩০ লক্ষ শহীদের প্রাণ এবং ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের চরম আত্মত্যাগ। তাদের এই ঋণ ও বীরত্বকে চিরকাল স্মরণ রাখতে প্রতি বছর বিজয় দিবস উদ্যাপিত হয়।
২. জাতীয় বীরদের সম্মান প্রদর্শন: বীরশ্রেষ্ঠ, বীরউত্তম, বীরবিক্রম ও বীরপ্রতীকসহ সকল সাধারণ বীর মুক্তিযোদ্ধা, যারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন, তাদের প্রতি রাষ্ট্রীয়ভাবে গভীর কৃতজ্ঞতা জানানো এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
৩. চেতনার নবায়ন: নতুন প্রজন্মের মাঝে দেশপ্রেমের উদ্রেক করা, বিজয়ের সঠিক ইতিহাস ছড়িয়ে দেওয়া এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে এটি পালন করা হয়।
৪. শোষণমুক্ত সমাজের অঙ্গীকার: একটি অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ‘সোনার বাংলা’ গড়ার যে মূল লক্ষ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, প্রতি বছর বিজয় দিবসে সেই লক্ষ্য পূরণের শপথ পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
রাষ্ট্রীয়ভাবে বিজয় দিবস উদযাপনের প্রধান কর্মসূচি

- তোপধ্বনি ও জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা: ১৬ই ডিসেম্বর প্রত্যূষে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসের সূচনা ঘটে। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ সর্বস্তরের মানুষ শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
- জাতীয় পতাকা উত্তোলন: দেশের সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।
- কুচকাওয়াজ ও এয়ার শো: ঢাকার জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর অংশগ্রহণে বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলো আকাশে বিশেষ মহড়া বা ‘এয়ার শো’ প্রদর্শন করে।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ প্রতিবেদন | ১২ মে ২০২৬
ঢাকা: বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও টেলিভিশন টক শোর দুনিয়ায় গত দুই দশকে যে ক’জন ব্যক্তিত্ব নিজেদের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তাঁদের মধ্যে খালেদ মহিউদ্দিন অন্যতম। প্রখর মেধা, সাহসিকতা এবং সোজাসাপ্টা প্রশ্ন করার বিশেষ শৈলী তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছে। বর্তমানে জার্মানিভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ডয়চে ভেলে (DW) বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনি বৈশ্বিক ও দেশীয় রাজনীতিতে এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর।

১. জন্ম ও শিক্ষা জীবন

খালেদ মহিউদ্দিনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। তাঁর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি ও সাফল্যের শুরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে:
- উচ্চশিক্ষা: তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
- বিদেশি ডিগ্রি: উচ্চতর শিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে যান এবং ওয়েস্টমিনিস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নালিজম’ বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেন।
২. পেশাদার জীবনের পথচলা ও উত্থান

নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে খালেদ মহিউদ্দিনের সাংবাদিকতা জীবনের শুরু হয়:
- সংবাদপত্র: তিনি দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ‘প্রথম আলো’-তে কাজ করেছেন। সেখানে তাঁর রাজনৈতিক ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
- টেলিভিশন ও টক শো: পরবর্তীতে তিনি ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন’-এ যোগ দেন। এখানে তাঁর সঞ্চালিত টক শো ‘আজকের বাংলাদেশ’ তাঁকে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এনে দেয়। তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি, “পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক প্রশ্ন করছি…” আজও দর্শকদের কাছে তাঁর সিগনেচার স্টাইল হিসেবে পরিচিত।
- আন্তর্জাতিক পর্যায়: বর্তমানে তিনি জার্মানির বন শহরে ডয়চে ভেলে (DW) বাংলায় কর্মরত। তাঁর সঞ্চালিত জনপ্রিয় ডিজিটাল শো ‘খালেদ মহিউদ্দিন জানতে চায়’ সমসাময়িক রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত অনুষ্ঠান।
৩. উল্লেখযোগ্য কাজ ও সাফল্য

খালেদ মহিউদ্দিনের সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো নিরপেক্ষতা ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ:
- সাহসী সাংবাদিকতা: ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের মুখের ওপর সরাসরি ও যৌক্তিক প্রশ্ন করার সাহস তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
- সাফল্য ও লেখালেখি: সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি একজন সুপরিচিত লেখক। তাঁর লেখা ‘নিয়ন্ত্রণরেখা’ এবং ‘মুখোমুখি’ বইগুলো রাজনৈতিক বিশ্লেষণের জন্য বেশ সমাদৃত।
- মেন্টরশিপ: তিনি অসংখ্য তরুণ সাংবাদিককে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং বাংলাদেশে আধুনিক টক শো ফরম্যাট চালুর ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
৪. সমালোচনা ও বিতর্ক
যেকোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের মতো খালেদ মহিউদ্দিনকেও বিভিন্ন সময় সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে:
- পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ: রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন সময় তাঁর বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে। বিশেষ করে তাঁর কড়া প্রশ্নের কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ের সমর্থকদের কাছে তিনি মাঝেমধ্যেই সমালোচিত হন।
- সঞ্চালনার শৈলী: অনেক সমালোচক মনে করেন, তিনি অনেক সময় অতিথিকে পর্যাপ্ত কথা বলতে না দিয়ে নিজেই বেশি সময় নেন। তবে তাঁর ভক্তদের মতে, সত্য বের করে আনার জন্য এটি তাঁর একটি বিশেষ কৌশল।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রোলিং: কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কারণে তাঁকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার শিকার হতে হয়েছে, যদিও তিনি সেগুলোকে তাঁর পেশাদারিত্বের অংশ হিসেবেই দেখেন।
৫. বর্তমান অবস্থান

খালেদ মহিউদ্দিন এখন কেবল একজন সাংবাদিক নন, বরং ডিজিটাল মিডিয়ার একজন অন্যতম ইনফ্লুয়েন্সার। তিনি মনে করেন, সাংবাদিকতা মানেই হলো জনগণের পক্ষে ক্ষমতাবানদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো।
- রেফারেন্স: ডয়চে ভেলে (DW) বাংলা আর্কাইভ, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন এবং বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ বিশ্লেষণ | ১২ মে ২০২৬
ঢাকা: ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত করার সরকারি সিদ্ধান্ত দেশের শিক্ষাঙ্গন ও রাজনীতিতে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কেন এখন খালেদা জিয়াকে পাঠ্যবইয়ে আনা হচ্ছে? এর পাশাপাশি মওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা বা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো জাতীয় নেতাদের অবস্থান কী হবে? আর শেখ হাসিনার অধ্যায় কি মুছে যাবে নাকি থাকবে?—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে সচেতন নাগরিকরা।

১. খালেদা জিয়াকে কেন অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে? (সরকারের যুক্তি)
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণে খালেদা জিয়ার ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি মনে করা হচ্ছে:
- নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান: ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ‘আপসহীন’ ভূমিকা অনস্বীকার্য। আধুনিক বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে উত্তরণের ইতিহাসে তাঁর অবদান বাদ দিয়ে নব্বইয়ের দশকের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা অসম্ভব।
- প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী: বাংলাদেশের প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর ক্ষমতায় আরোহণ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক, যা নারী ক্ষমতায়ন অধ্যায়ে গুরুত্ব বহন করে।
- ভারসাম্য রক্ষা: গত ১৫ বছর পাঠ্যবইয়ে শুধুমাত্র একটি বিশেষ রাজনৈতিক বলয়ের ইতিহাস প্রাধান্য পেয়েছে বলে বর্তমান সরকার মনে করে। ফলে একটি অংশগ্রহণমূলক ইতিহাস তৈরিতে খালেদা জিয়ার নাম অন্তর্ভুক্ত করাকে তারা ‘ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা’ হিসেবে দেখছে।
২. ভাসানী, শেরে বাংলা ও সোহরাওয়ার্দী: উপেক্ষিত মহাজনেরা কি গুরুত্ব পাবেন?

অনেকেরই প্রশ্ন—খালেদা জিয়াকে যুক্ত করা হলে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতাদের ইতিহাস কি আরও স্পষ্টভাবে আসবে না?
- ঐতিহাসিক বাস্তবতা: বিগত শিক্ষাক্রমগুলোতে এই তিন নেতার অবদান কিছুটা সংক্ষিপ্ত করা হয়েছিল। শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত জাতীয় ঐক্য গড়তে হলে এই তিন জন নেতার সংগ্রামী জীবনকে আরও বড় পরিসরে পাঠ্যবইয়ে আনা জরুরি। বিশেষ করে কৃষক-শ্রমিকের অধিকার এবং পাকিস্তানের মুসলিম লীগের বিপরীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি তৈরিতে তাদের ভূমিকা ছাড়া বাংলাদেশের শেকড় বোঝা অসম্ভব।
৩. শেখ হাসিনার অধ্যায় কি বাদ পড়বে?

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পাঠ্যবই থেকে শেখ হাসিনার নাম বা অবদান বাদ দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে। এনসিটিবি সূত্র বলছে:
- ইতিহাসের নির্মোহ মূল্যায়ন: ইতিহাস থেকে কাউকে পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তবে বিগত ১৫ বছরের শাসনামলে তাঁর অতিরিক্ত মহিমান্বিত করা অধ্যায়গুলোতে বড় ধরণের ‘কাঁচি’ চালানো হতে পারে। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তাঁর শাসনের নেতিবাচক দিকগুলোও ইতিহাসের অংশ হিসেবে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৪. গুগল অ্যানালাইসিস ও জনমত
গুগল ট্রেন্ডস এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালাইসিস করলে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ মনে করে:
- ব্যক্তিপূজা নয়, ইতিহাস হোক বস্তুনিষ্ঠ: পাঠ্যবই কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রচারপত্র হওয়া উচিত নয়।
- সামগ্রিক ইতিহাস: শেখ মুজিব, ভাসানী, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া বা শেখ হাসিনা—প্রত্যেকেরই সবল ও দুর্বল দিকগুলো যেন শিক্ষার্থীরা জানতে পারে, এমন একটি ‘ব্যালেন্সড’ কারিকুলামের দাবি এখন তুঙ্গে।
তথ্যসূত্র (References):
- এনসিটিবি সংবাদ সম্মেলন: মে ২০২৬-এর সরকারি ব্রিফিং।
- টক শো রেফারেন্স: সম্প্রতি ‘চ্যানেল আই’ ও ‘নিউজ ২৪’-এ পাঠ্যবই পরিমার্জন নিয়ে বিশেষ আলোচনা।
- আগের রেফারেন্স: ২০১২ ও ২০২৩ সালের শিক্ষাক্রমের তুলনামূলক বিশ্লেষণ।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



