আন্তর্জাতিক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ উপযোগি ইতিহাস কলাম | ১৬ মে, ২০২৬ প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
চট্টগ্রাম/ঢাকা: বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস এক দিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দশকের পর দশক ধরে চলা স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ের এক দীর্ঘ ও গৌরবময় অধ্যায়। তেমনই একটি ঐতিহাসিক টার্নিং পয়েন্ট বা মোড় ঘোরানো অধ্যায় ছিল ১৯৬৪ সাল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব খানের সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে চট্টগ্রামের (তৎকালীন চিটাগাং) পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সম্মিলিত বিরোধী দল (COP)-এর প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে এক অবিস্মরণীয় নির্বাচনী জনসভা। আর এই ঐতিহাসিক গণজোয়ারের নেপথ্যের মূল কারিগর, দূরদর্শী সংগঠক ও চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিলেন তরুণ ও তেজস্বী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান।
১. আইয়ুবের ‘বেসিক ডেমোক্রেসি’ বনাম ‘মাদার-ই-মিল্লাত’

১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারির মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল আইয়ুব খান নিজের গদি টিকিয়ে রাখতে ‘বেসিক ডেমোক্রেসি’ বা মৌলিক গণতন্ত্র নামের এক ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু করেন। এই স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়তে ১৯৬৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পাকিস্তানের সমস্ত বিরোধী দল একজোট হয়ে ‘কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি’ (সিওপি) গঠন করে। তারা আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে প্রার্থী করেন কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন এবং আপসহীন নেত্রী ফাতেমা জিন্নাহকে।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ফাতেমা জিন্নাহকে সমর্থন করা ছিল মূলত আইয়ুবের সামরিক স্বৈরাচারের পতন ঘটানো এবং বাঙালির আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আদায়ের কৌশলের একটি বড় অংশ। আর এই প্রচারণাকে সফল করতে ফাতেমা জিন্নাহর প্রধান সহযাত্রী ও অভিভাবক হিসেবে পুরো পূর্ব পাকিস্তান চষে বেড়ান আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান।
২. চট্টগ্রামের পল্টন ময়দান: জনসমুদ্র ও শেখ মুজিবের বজ্রকণ্ঠ

১৯৬৪ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে ফাতেমা জিন্নাহর পূর্ব পাকিস্তান সফরকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম অভূতপূর্ব এক রাজনৈতিক জোয়ারের সাক্ষী হয়। ফাতেমা জিন্নাহ যখন ট্রেনে করে চট্টগ্রামে পৌঁছান, তখন স্টেশনে লাখো মানুষের ঢল নামে।
- যৌথ নেতৃত্বের অটুট বন্ধন: শেখ মুজিবুর রহমান নিজে সার্বক্ষণিকভাবে ফাতেমা জিন্নাহর পাশে ছায়ার মতো ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের স্থানীয় সিংহহৃদয় নেতা এম এ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরী এবং এম এ হান্নানকে সাথে নিয়ে এই সফরের সার্বিক আয়োজন, জনসভার মাঠের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন।
- মঞ্চের মূল চালিকাশক্তি: পল্টন ময়দানের সেই বিশাল জনসভায় প্রধান আকর্ষণ ফাতেমা জিন্নাহ হলেও, উপস্থিত জনতাকে উদ্বেলিত করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ বজ্রকণ্ঠে আইয়ুব খানের সামরিক স্বৈরাচার এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। তিনি ফাতেমা জিন্নাহকে “মাদার-ই-মিল্লাত” (জাতির মা) হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রতিটি বাঙালিকে স্বৈরাচারের প্রতীক ‘ফুলের’ বিরুদ্ধে বিরোধী দলের নির্বাচনী প্রতীক ‘লণ্ঠন’ মার্কায় ভোট দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান।
৩. আইয়ুবপন্থী মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা ও বাঙালির প্রতিরোধ

ফাতেমা জিন্নাহ ও শেখ মুজিবের এই অভূতপূর্ব যৌথ জনপ্রিয়তা দেখে আইয়ুব খানের অনুগত কনভেনশন মুসলিম লীগ এবং সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, তৎকালীন সরকারি তোষামোদকারী গণমাধ্যমগুলো (যেমন দৈনিক পাকিস্তান ও বিভিন্ন পাক্ষিক সাময়িকী) এই আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে চরম নোংরা ও নেতিবাচক প্রচারণায় মেতে ওঠে।
আইয়ুবপন্থী গণমাধ্যম ও সরকারি চামচামিরা ফাতেমা জিন্নাহকে “ভারতের দালাল” এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর “অন্ধ অনুসারী ও সহচর” হিসেবে ব্যঙ্গচিত্র (কার্টুন) ও কলামের মাধ্যমে অপপ্রচার করত। বিরোধী দলকে হেয় প্রতিপন্ন করতে তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন কুরুচিপূর্ণ ও কুৎসিত শব্দচয়ন ব্যবহার করত। কিন্তু সরকারি নিষেধাজ্ঞা, ভয়ভীতি এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে চট্টগ্রামের আপামর জনতা নিজেদের বুকে দিয়ে ফাতেমা জিন্নাহ ও শেখ মুজিবের কাফেলাকে পাহারা দিয়ে জনসভাস্থলে নিয়ে গিয়েছিল, যা আইয়ুবের ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
৪. ৬-দফার ভিত্তিভূমি: এই নির্বাচনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

১৯৬৪ সালের এই ঐতিহাসিক নির্বাচন ও নির্বাচনী সফরটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট ছিল:
- এটি বাঙালি জাতিকে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো সরাসরি রাজপথে বুক চিতিয়ে নামার সাহস ও সুযোগ করে দেয়।
- এই সফল সফরের পরই শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানে একক, অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং স্বাধিকার আন্দোলনের প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজের অবস্থানকে আকাশচুম্বী করে তোলেন।
- ঐতিহাসিকদের মতে, ১৯৬৪ সালের এই মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং গণসংযোগের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ‘বাঙালির মুক্তির সনদ’ খ্যাত ৬-দফা আন্দোলন ঘোষণা করেছিলেন।
তথ্যসূত্র ও ঐতিহাসিক আর্কাইভ (Sources):
১. জাতীয় আর্কাইভ ও ইতিহাস গ্রন্থাবলি: ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জীবন ও রাজনীতি’ এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ডায়েরি (১৯৬৪-৬৫)। ২. ঐতিহাসিক দলিল: ১৯৬৪ সালের কনভেনশন মুসলিম লীগ বনাম সিওপি (COP) নির্বাচনী ইশতেহার ও ফলাফল বিবরণী। ৩. চট্টগ্রাম স্থানীয় ইতিহাস উইং: মরহুম এম এ আজিজ ও জহুর আহমদ চৌধুরীর রাজনৈতিক স্মৃতিচারণমূলক সংকলন।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
বিষয়ঃ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতা ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২৬
ইসলাম একটি গতিশীল এবং বৈশ্বিক ধর্ম। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলিমের মূল আকিদা বা বিশ্বাস এক হলেও, ভৌগোলিক বিস্তার, ঐতিহাসিক বিবর্তন এবং পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আইনি ব্যাখ্যার (Jurisprudence) ভিন্নতার কারণে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভিন্ন শাখা, উপ-শাখা এবং মাযহাবের সৃষ্টি হয়েছে। ইসলামের একটি বিখ্যাত হাদিস অনুযায়ী, মুসলিম উম্মাহ ভবিষ্যতে ৭৩টি দলে বা ফিরকায় বিভক্ত হবে, যার মধ্যে কেবল একটি দল সঠিক বা নাজাতপ্রাপ্ত (ফিরকায়ে নাজিয়াহ) হবে।

বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহর প্রধান বিভাজন এবং বিশেষ করে বাংলাদেশে হানাফি মাযহাবের একচ্ছত্র প্রভাব ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের একটি পূর্ণাঙ্গ ও বস্তুনিষ্ঠ রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ইসলামের প্রধান শাখা ও উপ-শাখাসমূহ
সমগ্র বিশ্বের মুসলিম জনসংখ্যা মূলত দুটি প্রধান এবং একটি ছোট স্বতন্ত্র শাখায় বিভক্ত:
ক. সুন্নি ইসলাম (Sunni Islam):
বিশ্বের মোট মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ সুন্নি শাখার অনুসারী। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর গণতান্ত্রিক বা পরামর্শভিত্তিক (শুরা) খলিফা নির্বাচনের নীতিতে তারা বিশ্বাসী। সুন্নিরা মূলত দুটি প্রেক্ষাপটে বিভক্ত:
- ফেকহ বা মাযহাব (আইনগত স্কুল): হানাফি, শাফিঈ, মালিকি এবং হাম্বলি—এই চারটি প্রধান মাযহাবে তারা বিভক্ত।
- আকিদাগত ধারা: ঐতিহ্যবাহী আশআরি ও মাতুরিদি আকিদা; সরাসরি কুরআন-হাদিসপন্থী সালাফি/আহলে হাদিস এবং উপমহাদেশীয় দেওবন্দি ও বেরেলভি ধারা।
খ. শিয়া ইসলাম (Shia Islam):
মোট মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ১০ থেকে ১৩ শতাংশ শিয়া শাখার অন্তর্গত। তারা বিশ্বাস করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পর তাঁর জামাতা হযরত আলী (রা.) এবং তাঁর বংশধরেরাই (ইমামগণ) মুসলিম সমাজের প্রকৃত ঐশ্বরিক নেতা। এরা প্রধানত তিনটি উপ-শাখায় বিভক্ত:
- ইসনা আশারিয়া (Twelvers): শিয়াদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দল (৮৫%)। ইরান, ইরাক ও আজারবাইজানে এরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।
- ইসমাইলি (Ismailis): আগা খান হলেন এই ধারার একটি বড় অংশের বর্তমান ইমাম।
- জায়েদি (Zaidis): এরা মূলত ইয়েমেনে বসবাস করে এবং আকিদাগতভাবে সুন্নিদের খুব কাছাকাছি।
গ. স্বতন্ত্র শাখা ও আধ্যাত্মিক ধারা:
- ইবাদি (Ibadi): ওমানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এই ধারার অনুসারী, যা সুন্নি বা শিয়া কোনো দলেই পড়ে না।
- সুফিবাদ (Sufism): এটি কোনো আলাদা ফিরকা নয়, বরং এটি ইসলামের আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক ধারা (যেমন: চিশতিয়া, কাদেরিয়া, নকশবন্দিয়া), যা সুন্নি বা শিয়া উভয় দরের মুসলিমরাই চর্চা করতে পারেন।
২. সুন্নি ইসলামের চার মাযহাব: ব্যবহারিক পার্থক্যের তুলনা

সুন্নিদের চার মাযহাব কোনো ভিন্ন ধর্ম নয়, বরং এগুলো ইসলামের মূল বিশ্বাসকে অক্ষুণ্ণ রেখে দৈনন্দিন ইবাদত ও আইনি খুঁটিনাটি ব্যাখ্যার ৪টি পদ্ধতি। হাদিস পৌঁছানোর ভিন্নতা, হাদিস গ্রহণের শর্ত এবং যুক্তি (কিয়াস) বা স্থানীয় প্রথার ব্যবহারের কারণে এদের মধ্যে কিছু ব্যবহারিক পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
| মাসয়ালা বা বিষয় | হানাফি মাযহাব | শাফিঈ, মালিকি ও হাম্বলি মাযহাব |
| রফু ইয়াদাইন (হাত তোলা) | রুকুতে যাওয়া বা ওঠার সময় হাত তোলা হয় না। কেবল নামাজের শুরুতে তোলা হয়। | রুকুতে যাওয়ার আগে এবং রুকু থেকে ওঠার পর হাত তোলা সুন্নাত। |
| বিসমিল্লাহ জোরে পড়া | নামাজে সূরা ফাতেহার আগে ‘বিসমিল্লাহ’ মনে মনে পড়া হয়। | শাফিঈ মাযহাবে জাহরি (জোরে পড়ার) নামাজে বিসমিল্লাহ জোরে পড়া হয়। |
| সমুদ্রের খাবার | মাছ ছাড়া সমুদ্রের অন্য কোনো জলজ প্রাণী (যেমন: কাঁকড়া, স্কুইড) খাওয়া জায়েজ নয়। | সমুদ্রের সব ধরণের জীব, জলজ প্রাণী ও মাছ খাওয়া সম্পূর্ণ জায়েজ। |
| ওজু ভঙ্গের কারণ | শরীর থেকে রক্ত বা পুঁঁজ বের হয়ে গড়িয়ে পড়লে ওজু ভেঙে যায়। | শাফিঈ মাযহাবে রক্তে ওজু ভাঙে না, তবে নিজের স্ত্রী বা কোনো নারীকে স্পর্শ করলে ওজু ভেঙে যায়। |
| নামাজে হাত বাঁধার স্থান | পুরুষদের জন্য নাভির নিচে হাত বাঁধতে হয়। | বুকের ওপর বা নাভির ওপরে হাত বাঁধতে হয় (মালিকি মাযহাবে অনেকে হাত ছেড়েও নামাজ পড়েন)। |
চার ইমামের পারস্পরিক শ্রদ্ধা: এই চারজন ইমাম (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফিঈ এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল) একে অপরের শিক্ষক বা ছাত্র ছিলেন এবং গভীর শ্রদ্ধাবোধ পোষণ করতেন। তাঁদের সবারই মূল কথা ছিল—“যদি কোনো সহীহ হাদিস পাও, তবে সেটিই আমার মাযহাব।”
৩. বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: হানাফি মাযহাবের আধিপত্য ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য

বাংলাদেশসহ সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় ৯০% বা তার বেশি সুন্নি মুসলিম হানাফি মাযহাব অনুসরণ করেন। উপমহাদেশে হানাফি ফেকহের এই একচ্ছত্র প্রভাবের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে:
- মুসলিম শাসকদের রাজকীয় সমর্থন: সুলতানি ও মোঘল আমলের শাসকেরা মধ্য এশিয়া থেকে এসেছিলেন, যারা ব্যক্তিগতভাবে হানাফি ছিলেন এবং হানাফি ফেকহকেই আদালতের রাষ্ট্রীয় আইন করেছিলেন (যেমন: সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে রচিত ফাতাওয়া-এ-আলমগীরী)।
- সুফি সাধকদের অবদান: খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (র.), হযরত শাহ জালাল (র.)-এর মতো মহান সুফি সাধকেরা হানাফি ধারার অনুসারী ছিলেন। ফলে তাঁদের মাধ্যমে যারা ইসলাম গ্রহণ করেন, তারা প্রাকৃতিকভাবেই হানাফি মাযহাব আপন করে নেন।
- উদারতা ও সহজবোধ্যতা: ইমাম আবু হানিফা (র.) আইনি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে স্থানীয় সংস্কৃতি ও মানুষের সুবিধাকে (কিয়াস) গুরুত্ব দেওয়ায় অমুসলিম প্রধান এই অঞ্চলে নতুন মুসলিমদের জন্য এটি সহজ ও মানানসই ছিল।
- মাদ্রাসা শিক্ষার প্রভাব: উপমহাদেশের ইসলামি শিক্ষার প্রধান দুই ধারা—দেওবন্দি (কওমি) এবং বেরেলভি—উভয়ই হানাফি মাযহাবের কঠোর অনুসারী।
বাংলাদেশে বর্তমান ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও ফিকহী পরিবর্তন:
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হানাফি মাযহাব প্রধান হলেও, আধুনিক বাংলাদেশে বেশ কিছু বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে:
১. শিয়া সম্প্রদায়: মোট মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ১% থেকে ২% শিয়া (জাফরি/ইসনা আশারিয়া)। পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক হোসাইনী দালান ইমামবারা-কে কেন্দ্র করে তারা মহরমে পবিত্র আশুরা ও তাজিয়া মিছিল নির্বিঘ্নে পালন করেন।
২. আহলে হাদিস / সালাফি ধারা: কোনো নির্দিষ্ট মাযহাব না মেনে সরাসরি কুরআন ও সহীহ হাদিস অনুসরণের এই ধারার ব্যাপক উত্থান ঘটেছে (বিশেষ করে রাজশাহী ও উত্তরবঙ্গে)।
৩. প্রবাসী ও বিশ্বায়নের প্রভাব: মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সময় প্রবাস জীবন কাটিয়ে অনেক বাংলাদেশি দেশে ফিরে হানাফি মাযহাবের পাশাপাশি শাফিঈ বা হাম্বলি মাযহাবের কিছু আমল (যেমন: নামাজে জোরে আমিন বলা বা রফু ইয়াদাইন) ব্যক্তিগত জীবনে চর্চা করছেন।
৪. তরুণ প্রজন্মের ফিকহী বৈচিত্র্য: ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম মদিনা বা আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারদের লেকচার শুনে অন্ধ অনুকরণ না করে, দলিলের ভিত্তিতে অন্য মাযহাবের শক্তিশালী মাসয়ালাগুলোকেও ব্যক্তিগত জীবনে গ্রহণ করছেন।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত মূল্যায়ন
ইসলামের বিভিন্ন মাযহাব ও উপ-শাখা মূলত একই বৃক্ষের ভিন্ন ভিন্ন শাখা। বাংলাদেশে হানাফি মাযহাবের ঐতিহাসিক ভিত্তি অত্যন্ত সুদৃঢ় হলেও, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি এবং ধর্মীয় সহনশীলতার কারণে শিয়া, সালাফি কিংবা অন্যান্য মাযহাবের আমলগত বৈচিত্র্য এখন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করছে। মূল বিশ্বাসের একতাই মুসলিম উম্মাহর আসল শক্তি, আর এই বৈচিত্র্য আসলে ইসলামের আইনি ও বুদ্ধিবৃত্তিক উদারতারই বহিঃপ্রকাশ।
নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও তথ্যের সূত্রসমূহ (Sources)
১. ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও আল-আজহার আল-শরিফ আর্কাইভ: ইসলামের ইতিহাস, সুন্নি চার মাযহাবের ফিকহী উৎস এবং উপমহাদেশের ইসলাম প্রচারের ঐতিহাসিক দলিল।
২. “ফাতাওয়া-এ-আলমগীরী” ও মোঘল জুডিশিয়াল রেকর্ডস: ভারতীয় উপমহাদেশে হানাফি আইনের প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাস।
ইসলামের ইতিহাস, ফিকহ শাস্ত্রের গভীর ব্যাখ্যা এবং সমসাময়িক ধর্মীয় তত্ত্বের এমন তথ্যবহুল ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ পড়তে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতা ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২৬
যিনি মাত্র ৩৯ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবন পরিধিতে বিশ্বমঞ্চে সনাতন ধর্মের উদারতা ও ভারতীয় দর্শনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিলেন, তিনি বীর সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ। ১৯০২ সালের ৪ঠা জুলাই বেলুড় মঠে এই মহান মহাপুরুষের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর প্রয়াণের সেই অন্তিম মুহূর্তের নিয়মতান্ত্রিকতা এবং বিশ্ব কাঁপানো শিকাগো বক্তৃতার মূল দর্শন—আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

স্বামী বিবেকানন্দের শেষ দিনের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী, তাঁর জীবনদর্শন এবং ১৮৯৩ সালের সেই বিশ্বজয়ী শিকাগো ভাষণের গভীর বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. শেষ দিনের ঐতিহাসিক ঘটনা (৪ঠা জুলাই, ১৯০২)

বেলুড় মঠে স্বামী বিবেকানন্দের জীবনের শেষ দিনটি ছিল অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক, কর্মমুখর এবং গভীর আধ্যাত্মিকতায় ভরপুর। দিনলিপিটি পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, তিনি যেন আগেই নিজের বিদায়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন:
- ভোরবেলা ও দীর্ঘ ধ্যান: তিনি অত্যন্ত ভোরে শয্যা ত্যাগ করেন। এরপর বেলুড় মঠের মন্দিরে প্রবেশ করে সম্পূর্ণ একা একা প্রায় ৩ ঘণ্টা ধরে গভীর ধ্যানমগ্ন থাকেন।
- তৃপ্তিময় মধ্যাহ্নভোজ: দুপুরের খাবারের সময় তিনি মঠের অন্যান্য সন্ন্যাসীদের সাথে একসাথে বসেন। সেদিন বেলুড় ঘাটে জেলেদের নৌকা থেকে আনা টাটকা ইলিশ মাছের পদ দিয়ে অত্যন্ত তৃপ্তি সহকারে তিনি মধ্যাহ্নভোজ সম্পন্ন করেন।
- বেদ ও ব্যাকরণ পাঠদান: দুপুরের বিশ্রামের পর তিনি মঠের তরুণ ব্রহ্মচারীদের জড়ো করেন। সেখানে প্রায় ৩ ঘণ্টা ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে ‘শুক্ল যজুর্বেদ’ এবং সংস্কৃত ব্যাকরণ শিক্ষা দেন।
- বিকেলের ভ্রমণ ও মঠের ভবিষ্যৎ: বিকেলে তিনি মঠের অন্যতম প্রধান সন্ন্যাসী স্বামী প্রেমানন্দের সাথে মঠের বাইরে প্রায় দুই মাইল পথ হেঁটে ভ্রমণ করেন। এই দীর্ঘ পদযাত্রায় তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা এবং পরবর্তী কর্মপন্থা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন।
- সন্ধ্যা ও মহাসমাধি: সন্ধ্যা ৭টায় তিনি নিজের কক্ষে প্রবেশ করেন এবং ধ্যানে বসেন। নির্দেশ দেন কেউ যেন তাঁকে বিরক্ত না করে। ঠিক রাত ৯টা ১০ মিনিটে তিনি একটি দীর্ঘ ও গভীর শ্বাস নেন এবং চিরতরে নীরব হয়ে যান। চিকিৎসকদের মতে, তীব্র ধ্যানের মানসিক চাপ এবং দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতার কারণে মস্তিষ্কের রক্তনালী ফেটে গিয়ে (Apoplexy/Brain Hemorrhage) তাঁর প্রয়াণ ঘটে, যাকে যোগশাস্ত্রে ‘মহাসমাধি’ বলা হয়।
২. ১৮৯৩ সালের শিকাগো বক্তৃতা: বিশ্বজয়ের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত

১৮৯৩ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর আমেরিকার শিকাগোয় অনুষ্ঠিত বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় (Parliament of Religions) স্বামী বিবেকানন্দের দেওয়া ভাষণটি পৃথিবীর ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। তাঁর সেই বক্তৃতার মূল বিষয় ও তাৎপর্য ছিল নিম্নরূপ:
ক. সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধ:

বক্তৃতার শুরুতেই তৎকালীন চিরাচরিত আনুষ্ঠানিক সম্বোধন এড়িয়ে তিনি সমবেত জনতাকে “আমেরিকার ভাই ও বোনেরা” (Sisters and Brothers of America) বলে সম্বোধন করেন। এই সাতটি শব্দের ভেতরের আন্তরিকতা উপস্থিত প্রায় সাত হাজার দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে এবং তারা দাঁড়িয়ে সমবেত করতালির মাধ্যমে তাঁকে অভূতপূর্ব অভিনন্দন জানান। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে, ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে সমস্ত মানবজাতি মূলত এক অখণ্ড পরিবার।
খ. হিন্দুধর্মের উদারতা ও সহনশীলতা:
তিনি বিশ্বমঞ্চে হিন্দুধর্মের দুটি প্রধান স্তম্ভ সগৌরবে তুলে ধরেন:
- পরমতসহিষ্ণুতা (Tolerance): হিন্দুধর্ম অন্য কোনো ধর্মমতকে ভুল বা মিথ্যা বলে না, বরং প্রতিটি পথকেই সত্য বলে শ্রদ্ধা করে।
- সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা (Universal Acceptance): তিনি গর্ব প্রকাশ করে বলেন, তিনি এমন এক সনাতন ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যা যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর সমস্ত উৎপীড়িত, নির্যাতিত এবং শরণার্থীতে (যেমন পার্সি এবং ইহুদিরা) নিজের বুকে আশ্রয় দিয়েছে।
গ. সব ধর্মের গন্তব্য এক ঈশ্বরের কাছে:
বিবেকানন্দ পবিত্র শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একটি বিখ্যাত শ্লোক উদ্ধৃত করে বলেন, “যে যেভাবে ঈশ্বরের আরাধনা করুক না কেন, শেষ পর্যন্ত তা ঈশ্বরের কাছেই পৌঁছায়।” তিনি একটি চমৎকার রূপক ব্যবহার করে বলেন—বিভিন্ন উৎস থেকে উৎপন্ন নদীগুলো যেমন আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত একই মহাসমুদ্রে গিয়ে মিশে যায়, ঠিক তেমনি মানুষের বেছে নেওয়া ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় পথ ও মতও শেষ পর্যন্ত সেই এক পরম ঈশ্বরের দিকেই ধাবিত হয়।
ঘ. কূপমণ্ডূকতা ও সংকীর্ণতার সমালোচনা:
ধর্মীয় গোঁড়ামিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি “কুয়োর ব্যাঙের গল্প” (The Story of the Frog in the Well) বলেন। একটি ব্যাঙ যেমন তার কুয়োটাকেই পুরো পৃথিবী মনে করে এবং বাইরের বিশাল সমুদ্রকে বিশ্বাস করতে চায় না, ঠিক তেমনি বিভিন্ন ধর্মের মানুষরা নিজেদের ছোট গণ্ডির বাইরে চিন্তা করতে পারে না। তিনি এই ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও দেওয়াল ভেঙে ফেলার আহ্বান জানান।
ঙ. ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার অবসান:
তিনি তীব্র কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, দীর্ঘকাল ধরে এই পৃথিবীতে ধর্মান্ধতা, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা এবং হিংস্রতা রাজত্ব করেছে। এর ফলে পৃথিবী বারবার মানব রুধিরে রঞ্জিত হয়েছে এবং মানব সভ্যতার অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই ধর্মসভার পবিত্র ঘণ্টাধ্বনি যেন পৃথিবীর সমস্ত ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং তরবারি বা কলমের মাধ্যমে হওয়া সব ধরণের নিপীড়নের চূড়ান্ত অবসান ঘটায়।
৩. স্বামী বিবেকানন্দের মূল দর্শন
বিবেকানন্দের জীবনদর্শন কোনো আকাশকুসুম কল্পনা ছিল না, তা ছিল অত্যন্ত বাস্তবমুখী ও কর্মমুখী, যা মানুষের সুপ্ত আত্মাকে জাগিয়ে তোলে:
- জীবে প্রেম: “জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর”—এটিই ছিল তাঁর দর্শনের মূল ভিত্তি। শোষিত, পীড়িত ও দরিদ্র মানুষের সেবা করাই ঈশ্বরের আসল উপাসনা।
- আত্মবিশ্বাস ও শক্তি: তিনি মনে করতেন, নিজের ভেতরের শক্তির ওপর বিশ্বাস না রেখে ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা যায় না। তিনি বলতেন—”দুর্বলতাই পাপ, দুর্বলতাই মৃত্যু।”
- নিষ্কাম কর্মযোগ: ফলের আশা না করে সমাজ ও দেশের কল্যাণে নিজের কর্তব্য পালন করার ওপর তিনি সর্বোচ্চ জোর দিয়েছিলেন।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত মূল্যায়ন
স্বামী বিবেকানন্দের শেষ দিনের নিয়মতান্ত্রিকতা এবং শিকাগো মঞ্চের বিশ্বজয়ী বাণী প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল একজন সন্ন্যাসী ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানবতাবাদের এক মহান দূত। তাঁর সেই সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধ এবং পরমতসহিষ্ণুতার বার্তা আজকের অশান্ত পৃথিবীতে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তিনি নশ্বর দেহ ত্যাগ করে মহাসমাধি লাভ করলেও, তাঁর প্রতিটি বাণী ও আদর্শ বিশ্ববাসীর পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।
নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও তথ্যের সূত্রসমূহ (Sources)
১. রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের অফিশিয়াল রেকর্ডস: স্বামী বিবেকানন্দের শেষ দিনলিপি এবং ১৮৯৩ সালের শিকাগো বিশ্ব ধর্ম মহাসভার মূল ভাষণ ও চিঠিপত্রের সংকলন।
২. জাতীয় আর্কাইভ ও সাহিত্য একাডেমি নথিপত্র: স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ও বাণী, এবং ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ঐতিহাসিক ডিজিটাল ডেটাবেজ।
মনীষীদের জীবনী, ইতিহাস এবং সমসাময়িক ধর্মীয় ও দার্শনিক তত্ত্বের এমন গভীর ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণ পড়তে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
অর্থনীতি ও জাতীয় নীতি বিশ্লেষণ | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ১২ জুন ২০২৬
জাতীয় বাজেট কেবল কিছু শুষ্ক সংখ্যার হিসাব কিংবা আয়-ব্যয়ের খতিয়ান নয়, এটি একটি দেশের রাজনৈতিক দর্শন, সার্বভৌমত্ব এবং সামাজিক পরিস্থিতির এক একটি জীবন্ত দলিল। বাংলাদেশের বাজেটের সুদীর্ঘ ইতিহাসে ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছর একটি অত্যন্ত অনন্য, জটিল এবং ব্যতিক্রমী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. এ. আর. মল্লিক (আজিজুর রহমান মল্লিক) কর্তৃক উপস্থাপিত এই বাজেটটি যেমন ছিল আকারের দিক থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের একটি সাহসী পদক্ষেপ, তেমনি এর ভেতরের অর্থনৈতিক কৌশল এবং উপস্থাপনা শৈলীও ছিল রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য নজির।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ যখন প্রথম দশকের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ার লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন বাজেটের দর্শন এবং মেকানিজম ছিল এক রকম। আর আজ ২০২৬ সালের জুন মাসে দাঁড়িয়ে যখন দেশের নতুন অর্থবছর (২০২৬-২৭)-এর প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করা হয়েছে, তখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এসেছে এক মহাকাব্যিক পরিবর্তন। ড. এ. আর. মল্লিকের সেই ১,৫৪৯.৪৮ কোটি টাকার বাজেট এবং ২০২৬ সালের জুনে ঘোষিত বর্তমান সরকারের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার (৯.৩৮ ট্রিলিয়ন) মেগা বাজেটের মধ্যে একটি নিবিড় তুলনামূলক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. এক নজরে দুই বাজেটের মূল উপাত্ত ও সংখ্যাতাত্ত্বিক তুলনা

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের বাজেট কেবল আকারেই বাড়েনি, বরং এর অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও অর্থনীতির ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। নিচে একটি তুলনামূলক ছক দেওয়া হলো:
| অর্থনৈতিক নির্দেশক (Indicators) | ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের বাজেট | ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট | পরিবর্তনের ধরন ও রূপান্তর |
| বাজেটের মোট আকার | ১,৫৪৯.৪৮ কোটি টাকা | ৯,৩৮,০০০ কোটি টাকা (৯.৩৮ ট্রিলিয়ন) | প্রায় ৬০৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। |
| উন্নয়ন বাজেট (ADP) | প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা | ২,৩০,০০০ কোটি টাকার বেশি (চলতি মেয়াদে) | ভৌত এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশাল বরাদ্দ বৃদ্ধি। |
| রাজস্ব/অনুন্নয়ন ব্যয় | প্রায় ৫৯৯.২৪ কোটি টাকা | ৬,০৮,০০০ কোটি টাকা (অনূমিত) | রাষ্ট্রীয় পরিচালনা ও সেবার পরিধি ব্যাপক বৃদ্ধি। |
| বাজেট উপস্থাপনের মাধ্যম | সংসদে সরাসরি সম্পূর্ণ সাধু ভাষায় পঠিত। | মাল্টিমিডিয়া ও আধুনিক ডাটা অ্যানালিটিক্সসহ চলিত ভাষায়। | আভিজাত্য বনাম আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। |
| মূল অর্থনৈতিক দর্শন | যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও সমাজতান্ত্রিক ত্রাণ-ভিত্তিক। | মুক্তবাজার অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ইকোনমি লক্ষ্য। | বেঁচে থাকার লড়াই থেকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার স্বপ্ন। |
২. গভীর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ (Macroeconomic Analysis)
ক. স্বনির্ভরতা বনাম বৈদেশিক নির্ভরতার চিত্র বদল:
- ১৯৭৫-৭৬ এর চিত্র: তৎকালীন সময়ে ড. এ. আর. মল্লিকের উন্নয়ন বাজেটের সিংহভাগই (প্রায় ৭৫% থেকে ৮০%) আসত বৈদেশিক সাহায্য, অনুদান এবং বিদেশী ঋণের মাধ্যমে। বাংলাদেশ তখন সম্পূর্ণ “সাহায্য-নির্ভর” (Aid-dependent) একটি দেশ ছিল। নিজস্ব সম্পদ সীমিত থাকায় বৈশ্বিক দাতাগোষ্ঠীর সিদ্ধান্তের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করত।
- ২০২৬ এর চিত্র: বর্তমানের ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেটে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, বাজেটের সিংহভাগ অর্থই এখন দেশের নিজস্ব কর (NBR Tax) এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসে। বৈদেশিক ঋণ এখন বাজেটের ঘাটতি পূরণের একটি সহায়ক মাধ্যম মাত্র (ঘাটতি প্রাক্কলন ২.৪৩ লাখ কোটি টাকা), যা প্রমাণ করে বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিকভাবে কতটা স্বাবলম্বী।
খ. ব্যয়ের অগ্রাধিকার পরিবর্তন (Sectoral Shifts):
- ১৯৭৫-৭৬ এর অগ্রাধিকার: সেই সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের খাদ্য ঘাটতি দূর করা এবং মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ। তাই বাজেটে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ খাতে। এর পাশাপাশি ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা (রেলওয়ে ও ব্রিজ) মেরামতের জন্য বড় অংকের বরাদ্দ রাখা হয়েছিল।
- ২০২৬ এর অগ্রাধিকার: ২০২৬ সালের বাজেটে শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ থাকা হয়নি। এখনকার বড় বরাদ্দ যায় মেগা অবকাঠামো (পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র), বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, তথ্য-প্রযুক্তি (আইটি সেক্টর) এবং সামাজিক security বা নিরাপত্তা বেষ্টনীতে। ২০২৬ সালের বাংলাদেশ এখন উন্নত ও স্মার্ট অবকাঠামো বিনির্মাণের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
গ. জীবনযাত্রার মান ও মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব:
১৯৭৫ সালের ১,৫৪৯ কোটি টাকা এবং ২০২৬ সালের ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার এই বিশাল পার্থক্যের পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি হলো দেশের জিডিপি (GDP)-র আকার বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি (Inflation)। ১৯৭৫ সালে যে পণ্যটির দাম ছিল ১ টাকা, মুদ্রাস্ফীতির কারণে আজ তার মূল্য বহু গুণ বেড়েছে। তবে একই সাথে মানুষের মাথাপিছু আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই রাষ্ট্র আজ এত বড় বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সাহস দেখাতে পারছে।
৩. বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যতিক্রম: সম্পূর্ণ সাধু ভাষায় বাজেট বক্তৃতা

বাংলাদেশের বাজেট বক্তৃতার ইতিহাসে ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের বাজেটটি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে আছে এর ভাষারীতি ও উপস্থাপন শৈলীর কারণে।
- ব্যতিক্রমী উদ্যোগ: তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. এ. আর. মল্লিক বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম এবং একমাত্র অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাঁর পুরো বাজেট বক্তৃতাটি সম্পূর্ণ সাধু ভাষায় পেশ করেছিলেন।
- ভাষাগত গাম্ভীর্য: সাধারণত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিবরণী চলিত ভাষায় পেশ করা হলেও, ড. মল্লিক বাংলা ভাষার তৎকালীন প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যাকরণগত আভিজাত্য বজায় রেখে অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ সাধু ভাষায় এই বাজেট উপস্থাপন করেন, যা দেশের সংসদীয় ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি স্থায়ী ব্যতিক্রমী রেকর্ড হিসেবে গণ্য হয়।
৪. political বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও এই বাজেটের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের এই বাজেটটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম দ্রুততম এবং স্পর্শকাতর পটপরিবর্তনের সাক্ষী।
- বাজেট পেশের সময়কাল: ড. এ. আর. মল্লিক এই বাজেটটি পেশ করেছিলেন ১৯৭৫ সালের জুন মাসে। এটি ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) সরকারের সময়কার শেষ বাজেট।
- বাস্তবায়নের সময়কাল: বাজেটটি পাস হওয়ার মাত্র দুই মাসের মাথায়, অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। ফলে, ড. মল্লিকের পেশ করা এই বাজেটটি প্রণয়ন হয়েছিল এক রাজনৈতিক দর্শনে, কিন্তু এর চূড়ান্ত বাস্তবায়ন ঘটেছিল ১৫ আগস্ট পরবর্তী সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সামরিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। এই কারণেও এই বাজেটকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ‘উত্তাল মেয়াদের বাজেট’ বলা হয়।
৫. রাজনৈতিক দর্শন ও শাসন ব্যবস্থার রূপান্তর
- ১৯৭৫-৭৬ এর প্রেক্ষাপট: সেটি ছিল যুদ্ধোত্তর রাজনৈতিক পুনর্গঠন এবং পরবর্তীতে এক উত্তাল রাজনৈতিক পরিবর্তনের বছর। রাষ্ট্র তখন সমাজতান্ত্রিক ধারার অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সচল ছিল।
- ২০২৬ এর প্রেক্ষাপট: ২০২৬ সালের নতুন সরকার ও বাজেট সম্পূর্ণ মুক্তবাজার অর্থনীতি (Free-market economy) এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। এখনকার মূল দর্শন হলো “অর্থনৈতিক লোকসানি রাষ্ট্র” থেকে বের হয়ে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা, প্রযুক্তির প্রসার ঘটানো এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করার দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখা তৈরি করা।
পরিচিতি: অর্থমন্ত্রী ড. এ. আর. মল্লিক

ড. আজিজুর রহমান মল্লিক (ড. এ. আর. মল্লিক) ছিলেন একাধারে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ এবং কুশলী টেকনোক্র্যাট।
- তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য (Founder Vice-Chancellor) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
- ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসে (বিশেষ করে ভারতে) ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’র সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে এবং তহবিল সংগ্রহে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
- দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি প্রথমে共和国 বা প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ আমলা (যুগ্ম-সচিব ও রাষ্ট্রদূত) এবং পরবর্তীতে টেকনোক্র্যাট কোটায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের গুরুদায়িত্ব পালন করেন।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত মূল্যায়ন
১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের ১,৫৪৯ কোটি টাকার বাজেটটি যদি বাংলাদেশের শৈশবকালীন “হামাগুড়ি” দেওয়ার গল্প হয়, তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেটটি হলো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের “সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দৌড়ানোর” প্রত্যয়। ভাষার আভিজাত্য থেকে শুরু করে ডলারের অঙ্কে রূপান্তর—সব মিলিয়ে এই দুই বাজেটের ব্যবধান আসলে একটি তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে স্বাবলম্বী ও উদীয়মান অর্থনৈতিক সিংহ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের ৫০ বছরের জীবন্ত ইতিহাস। ড. এ. আর. মল্লিকের সেই সাধু ভাষার বাজেট বক্তৃতা এবং এর পেছনের রাজনৈতিক ওঠানামা প্রমাণ করে যে, আমাদের জাতীয় বাজেট কেবল কিছু সংখ্যার হিসাব নয়, এটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও ইতিহাসের এক একটি বাঁক বদলের গল্প।
নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও তথ্যের সূত্রসমূহ (Sources)
১. বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) আর্কাইভ: স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ থেকে শুরু করে ২০২৬-২৭ অর্থবছর পর্যন্ত জাতীয় বাজেট ও অর্থমন্ত্রীদের বক্তৃতা সংকলন এবং বার্ষিক প্রতিবেদন।
২. জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও পরিকল্পনা কমিশন রেকর্ডস: ঐতিহাসিক সংসদীয় কার্যবিবরণী, প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, ১৯৭৫ সালের অর্থ বিলের নথিপত্র এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ঐতিহাসিক ডাটাবেজ।
দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, জাতীয় বাজেট এবং সমসাাময়িক ভূ-রাজনীতির এমন সব গভীর ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ পড়তে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে



