ইতিহাস

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কে প্রতিষ্ঠা করেন? শুরুতে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা কত ছিল জেনে নিন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজ ডেস্ক

May 26, 2026

শেয়ার করুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। ব্রিটিশ সরকারের ১৯১২ সালের রাজকীয় ঘোষণার পর ১৯২১ সালের ১ জুলাই এই বিশ্ববিদ্যালয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রতিষ্ঠার শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ছিল ৮৭৭ জন। তৎকালীন সময়ে কোনো ছাত্রী সরাসরি ভর্তি না হলেও পরবর্তীতে প্রথম ছাত্রী হিসেবে লীলা নাগ ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে ইতিহাস গড়েন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কে প্রতিষ্ঠা করেন: মূল উদ্যোক্তাদের তালিকা

অনেকেই মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা একক কোনো ব্যক্তি, তবে মূলত এটি ছিল যৌথ প্রচেষ্টার ফসল। প্রতিষ্ঠার পেছনে ৩ জন মুসলিম নেতার অবদান সবচেয়ে বেশি:

  • নবাব স্যার সলিমুল্লাহ: তিনিই প্রথম পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের শিক্ষার আলো ছড়াতে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোর দাবি তোলেন।
  • নবাব স্যার সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী: বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আর্থিক সহায়তা এবং ব্রিটিশদের সাথে লবিংয়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
  • শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক: রাজনৈতিক ও আইনিভাবে ব্রিটিশ সরকারকে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য করার পেছনে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

শুরুর দিকের অনুষদ, বিভাগ ও শিক্ষক সংখ্যা

১৯২১ সালের ১ জুলাই যখন “প্রাচ্যের অক্সফোর্ড” খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্লাস শুরু হয়, তখন এর অ্যাকাডেমিক কাঠামো ছিল অত্যন্ত গোছানো:

  • অনুষদ ও বিভাগ: শুরুতে এর অনুষদ (Faculty) ছিল মাত্র ৩টি—কলা (Arts), বিজ্ঞান (Science) এবং আইন (Law)। আর মোট বিভাগ ছিল ১২টি।
  • শিক্ষক ও হল সংখ্যা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য (VC) ছিলেন স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ। শুরুর দিকে শিক্ষক ছিলেন ৬০ জন এবং শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য হল ছিল মাত্র ৩টি (সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা হল ও জগন্নাথ হল)।

প্রথম শিক্ষাবর্ষের (১৯২১) মূল পরিসংখ্যান ম্যাট্রিক্স

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষাবর্ষের (১৯২১ সালের ১ জুলাই) মূল পরিসংখ্যান নিচে ম্যাট্রিক্স বা ছক আকারে তুলে ধরা হলো:

মূল পরিসংখ্যান ম্যাট্রিক্স (১৯২১)

সূচক / খাত বিবরণ ও সংখ্যা
মোট অনুষদ (Faculties)৩টি (কলা, বিজ্ঞান ও আইন অনুষদ)
মোট বিভাগ (Departments)১২টি
মোট ছাত্র সংখ্যা (Students)৮৭৭ জন (মতান্তরে ৮৪৭ জন)
ছাত্রী সংখ্যা (Female Students)১ জন (লীলা নাগ)
মোট শিক্ষক সংখ্যা (Teachers)৬০ জন
আবাসিক হল/ছাত্রাবাস (Halls)৩টি (সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা হল ও জগন্নাথ হল)
প্রথম উপাচার্য (Vice-Chancellor)স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ (পি. জে. হার্টগ)

অনুষদ ও বিভাগসমূহের বিস্তারিত বিভাজন

  • কলা অনুষদ (৮টি বিভাগ): সংস্কৃত ও বাংলা, ইংরেজি, শিক্ষা, ইতিহাস, আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ, ফারসি ও উর্দু, দর্শন, এবং অর্থনীতি ও রাজনীতি.
  • বিজ্ঞান অনুষদ (৩টি বিভাগ): পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, এবং গণিত.
  • আইন অনুষদ (১টি বিভাগ): আইন বিভাগ.

এই ক্ষুদ্র অবকাঠামো ও পরিসংখ্যান নিয়ে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তৎকালীন পূর্ববঙ্গে উচ্চশিক্ষার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অথবা এর প্রথম সমাবর্তন (১৯২৩) সংক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট তথ্য জানতে চাইলে নিচে লিখে জানাতে পারেন।

আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ: একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও এসইও এক্সপার্ট হিসেবে সাধারণ জ্ঞানের এই ডাটাগুলো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমি দেখেছি—বিভিন্ন পরীক্ষায় একক নাম হিসেবে ‘নবাব স্যার সলিমুল্লাহ’ অপশনে বেশি থাকে। তবে স্যার সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর অবদানও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জমিদারির অংশ পর্যন্ত বাজি রেখেছিলেন। তাই কপি-পেস্ট করে পাবলিশ করার আগে অপশনগুলো ভালোভাবে দেখে নেওয়া উচিত।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

নদী

নিউজ ডেস্ক

October 8, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)

বিশেষ প্রতিবেদন:

একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে ১৯৭১ সালে মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করলেও, বাংলাদেশের ইতিহাসের শিকড় হাজার বছরের পুরোনো। গঙ্গা-পদ্মার উর্বর পলল ভূমি থেকে শুরু করে নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা রক্ষা এবং সবশেষে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব অর্জন—এই দীর্ঘ যাত্রাপথই মূলত বাংলাদেশের বিবর্তনীয় ইতিহাস।

১. পলল ভূমি ও নদীকেন্দ্রিক জনপদের সূচনা


ভৌগোলিক দিক থেকে প্রাচীন অবিভক্ত বাংলার পূর্ব অংশকে বলা হতো ‘গঙ্গাহৃদয়’। হিমালয় থেকে নেমে আসা গঙ্গা নদী যখন এই অঞ্চলে প্রবেশ করে ‘পদ্মা’ নাম ধারণ করে, তখন তার বয়ে আনা পলিমাটি দিয়েই গঠিত হয় পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম এই ব-দ্বীপ। প্রাকৃতিকভাবেই এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি গড়ে ওঠে নদী ও কৃষিকে কেন্দ্র করে। নদীমাতৃক এই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যই এখানকার মানুষকে একদিকে করেছে সহনশীল, অন্যদিকে দিয়েছে সংগ্রামী চেতনা।

২. সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ধর্মীয় রূপান্তর
প্রাচীনকাল থেকেই পূর্ববঙ্গ ছিল নানা সংস্কৃতির মিলনমেলা। প্রথম দিকে হিন্দু ও বৌদ্ধ রাজাদের শাসনাধীন থাকা এই অঞ্চলে পরবর্তীতে আরব বণিক ও সুফি-সাধকদের হাত ধরে ইসলামের আগমন ঘটে। এখানকার একটি বিশাল জনগোষ্ঠী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও তারা তাদের হাজার বছরের আদি ও অকৃত্রিম বাঙালি সংস্কৃতিকে বর্জন করেনি। মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার পাশাপাশি জীবনযাত্রায়, ভাষায় ও লোকজ উৎসবে তারা অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যকে লালন করেছে। ধর্মীয়ভাবে মুসলমান হলেও মানসিকভাবে তারা সবসময় ‘বাঙালি’ পরিচয়টিকেই ধারণ করেছে।

৩. ১৯৪৭-এর দেশভাগ ও পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতা
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যখন ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়, তখন পূর্ববঙ্গ সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির দেশ পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হতে বাধ্য হয় (পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে)। কিন্তু শুরুতেই মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি শাসকেরা বাঙালির নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানে এবং বাংলাকে ‘হিন্দুয়ানি ভাষা’ আখ্যা দিয়ে তা মুছে ফেলার চেষ্টা করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের দাঁতভাঙা জবাব দেয়।

৪. স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়
ভাষা আন্দোলনের পর থেকে শুরু হয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধিকার আন্দোলন। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার দীর্ঘ দুই দশকের শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং স্বকীয় পরিচয় রক্ষার দাবিতে বাংলার সাধারণ মানুষ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একাত্ম হয়। ৯ মাসের এক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ এবং আন্তর্জাতিক (বিশেষ করে ভারতের) প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র—বাংলাদেশ।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

সাদ্দাম হোসেন

নিউজ ডেস্ক

October 8, 2026

শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর; ইরাকের স্থানীয় সময় ভোর ৬টা বেজে ৬ মিনিটে বাগদাদের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কার্যকর করা হয় দেশটির দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুদণ্ড । এই ঘটনার পর দুই দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, কিন্তু বিশ্ব রাজনীতি এবং সাধারণ মানুষের মনে আজও একটি বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—”সাদ্দাম হোসেন কি আসলেই একজন অপরাধী হিসেবে দোষী ছিলেন, নাকি তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার এক নির্দোষ নেতা?”

আইনি নথি, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন এবং ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাদ্দাম হোসেনকে সম্পূর্ণ “নির্দোষ” বলার কোনো সুযোগ নেই । তবে তাকে যেভাবে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল, সেই প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার মানদণ্ডে মারাত্মকভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।

নৃশংসতার ইতিহাস: যে সব অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন সাদ্দাম
২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর অভিযানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সাদ্দাম হোসেনকে বিচারের মুখোমুখি করতে গঠিত হয় ‘ইরাকি স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল’ (IST) । এই আদালতে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিক লোমহর্ষক ও অমানবিক অপরাধের অকাট্য প্রমাণ মেলে

১. দুজাইল হত্যাকাণ্ড (১৯৮২): সাদ্দাম হোসেনের ওপর চালানো একটি ব্যর্থ সামরিক হামলার প্রতিশোধ হিসেবে দুজাইল নামক শিয়া অধ্যুষিত শহরের ১৪৮ জন সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা, নির্যাতন এবং শত শত পরিবারকে অবৈধভাবে নির্বাসিত করা হয় । এই নির্দিষ্ট মামলাতেই তাকে আদালত সর্বোচ্চ শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে ।


২. আনফাল অভিযান ও কুর্দি গণহত্যা (১৯৮৮): উত্তর ইরাকে বসবাসকারী কুর্দি জনগোষ্ঠীর ওপর সাদ্দাম সরকারের নির্দেশে পরিচালিত সামরিক অভিযানে রাসায়নিক গ্যাস ব্যবহার করা হয় । হালাবজা শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় ১ লক্ষাধিক কুর্দি বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করা হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনে চরম মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃত ।


৩. স্বৈরতান্ত্রিক দমনপীড়ন: তার ২৪ বছরের শাসনামলে রাজনৈতিক বিরোধী, শিয়া মতাবলম্বী এবং ভিন্নমতের হাজার হাজার মানুষকে গুম ও নির্বিচারে হত্যা করার রাজসাক্ষ্য ও গণকবরের সন্ধান মেলে ।

যে কারণে বিচার প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত
সাদ্দাম হোসেনের অপরাধের তালিকা দীর্ঘ হলেও, তার বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়াটিকে জাতিসংঘ (UN) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (Amnesty International)-এর মতো বড় বড় আন্তর্জাতিক সংস্থা সরাসরি “ত্রুটিপূর্ণ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে [১.১.৬, ১.৩.৫]। সমালোচনার মূল কারণগুলো হলো:

  • প্রহসনমূলক আদালত (Show Trial): অনেক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এই আদালতটি নিরপেক্ষ ছিল না । সাদ্দামের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা একাধিক আইনজীবীকে বিচার চলাকালীন অপহরণ ও হত্যা করা হয়েছিল, যা আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের মৌলিক অধিকারকে খর্ব করে ।
  • তড়িঘড়ি করে মৃত্যুদণ্ড: সাদ্দামের বিরুদ্ধে কুর্দি গণহত্যার (আনফাল অভিযান) বিচার কাজ চলাকালীনই দুজাইল মামলার রায়কে ভিত্তি করে তড়িঘড়ি করে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয় । ফলে কুর্দি জনগণের ওপর চালানো বৃহত্তর অপরাধের সম্পূর্ণ সত্য উন্মোচিত হওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায় ।
  • মর্যাদাহীন ফাঁসির দৃশ্য: ঈদের দিন ভোরে সাদ্দামের ফাঁসি কার্যকরের সময় জল্লাদ ও উপস্থিত শিয়া কর্মকর্তাদের উপহাসমূলক আচরণ এবং ফাঁসির অবৈধ গোপন ভিডিও ফাঁস হওয়া পুরো আইনি প্রক্রিয়াকে একটি “পেশাদার বিচার” অপেক্ষা “রাজনৈতিক লিঞ্চিং বা প্রতিশোধ” হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরে

চূড়ান্ত মূল্যায়ন
ঐতিহাসিক ও আইনি বাস্তবতার নিরিখে সাদ্দাম হোসেনকে কোনোভাবেই ‘নির্দোষ’ বলা যায় না, কারণ তার হাত ইরাকের লাখো নিরীহ মানুষের রক্তে রঞ্জিত ছিল । কিন্তু একই সাথে মার্কিন আগ্রাসনের পর ইরাকে যে তথাকথিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল, তা বিশ্ববাসীকে একটি সুষ্ঠু ও প্রভাবমুক্ত বিচার উপহার দিতে ব্যর্থ হয় । ফলে সাদ্দাম হোসেন নিজের কৃতকর্মের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েও ত্রুটিপূর্ণ বিচার ব্যবস্থার কারণে এক শ্রেণীর মানুষের কাছে “সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শহীদ” হিসেবে প্রতীকী রূপ পেয়ে যান ।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ব্রিটিশ ভারতের দুঃসহ ইতিহাস

নিউজ ডেস্ক

October 6, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বিভাগ: ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রকাশের তারিখ: ৬ অক্টোবর, ২০২৬

আন্দামানেরসেলুলার জেল বা কালাপানি ছিল ব্রিটিশ ভারতের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও নিঃসঙ্গ একটি ঔপনিবেশিক কারাগার, যেখানে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ওপর চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন।

আন্দামানের সেলুলার জেলের ইতিহাস এবং বন্দীদের জীবন সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

জেলের নির্মাণ ও গঠন

  • অবস্থান: এটি ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের পোর্ট ব্লেয়ারে অবস্থিত।
  • নির্মাণকাল: ব্রিটিশরা ১৮৯৩ থেকে ১৯০৬ সালের মধ্যে বর্মা (বর্তমান মিয়ানমার) থেকে আনা লাল পোড়ামাটির ইট দিয়ে এই জেল নির্মাণ করে।
  • কাঠামো: জেলের মূল ভবনটির ৭টি শাখা বা উইং এবং মাঝখানে একটি উচুঁ প্রহরা মিনার ছিল, যা দেখতে অনেকটা সাইকেলের চাকার স্পোকের মতো। এতে প্রায় ৬৯৮টি বা প্রায় ৭০০টি পৃথক সেল বা কক্ষ ছিল।

সেলুলার জেলের সেল ও বন্দীদের জীবন

  • নিঃসঙ্গ সেল: প্রতিটি সেল বা কক্ষ ছিল মাত্র ১৪.৯ ফুট লম্বা ও ৮.৯ ফুট চওড়া। বন্দীদের একে অপরের সাথে যোগাযোগের কোনো উপায় ছিল না, কারণ প্রতিটি সেল এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে এক বন্দী অন্য বন্দীকে দেখতে না পায়।
  • কালাপানির সাজা: সমুদ্র পার হয়ে এই দ্বীপে পাঠানোকে সামাজিক ও আত্মীয়স্বজন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার প্রতীক মনে করা হতো।
  • অমানুষিক নির্যাতন: বন্দীদের দিয়ে কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করানো হতো, যেমন—নারকেল পিষে তেল বের করা। নির্দিষ্ট কোটা পূরণ করতে না পারলে অকথ্য শারীরিক নির্যাতন, বেত্রাঘাত ও হাতকড়া পরিয়ে রাখা হতো। [1]
  • অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ: বন্দীদের অত্যন্ত নিম্নমানের ও অস্বাস্থ্যকর খাবার দেওয়া হতো। সেলে কোনো শৌচাগার ছিল না।

বিখ্যাত বন্দী ও আন্দোলন

  • বন্দী ব্যক্তিত্ব: এই জেলে বন্দি ছিলেন বটুকেশ্বর দত্ত, উল্লাসকর দত্ত, বিনায়ক দামোদর সাভারকর-এর মতো নামকরা বিপ্লবীরা।
  • অনশন ও প্রতিবাদ: অধিকার আদায়ের জন্য ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে বন্দীরা ১৯৩২ থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে দীর্ঘ অনশন করেন।
  • জেল খালি হওয়া: পরবর্তীতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিবাদের মুখে ১৯৩৯ সালের মধ্যে ব্রিটিশ সরকার এই জেল খালি করে দিতে বাধ্য হয়। সেলুলার জেলের ইতিহাস সম্পর্কে আরও জানতে আপনি এই উৎসটি দেখতে পারেন। ১৯৭৯ সালে এটিকে জাতীয় স্মৃতিসৌধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

সেলুলার জেলের নরকীয় স্থাপত্য ও মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতা

সেলুলার জেলের স্থাপত্যকেবল পাথর আর ইটের কোনো সাধারণ কাঠামো ছিল না; এটি ছিল বন্দীদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলার জন্য ব্রিটিশ প্রকৌশলীদের দ্বারা পরিকল্পিত একটি নরকীয় ফাঁদ। জেরেমি বেনথামের ‘প্যানোপটিকন’ (Panopticon) ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই কারাগারের মূল উদ্দেশ্যই ছিল শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি বন্দীদের মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতা (Psychological Isolation) এবং চরম একাকীত্বের অতল গহ্বরে ঠেলে দেওয়া।

নিচে সেলুলার জেলের সেই কুখ্যাত স্থাপত্য কৌশল ও মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

১. প্যানোপটিকন নকশা ও সার্বক্ষণিক নজরদারি

  • কেন্দ্রীয় প্রহরা মিনার: জেলের কেন্দ্রস্থলে একটি বিশাল ওয়াচ-টাওয়ার বা প্রহরা মিনার ছিল। এই মিনার থেকে সাইকেলের চাকার স্পোকের মতো ৭টি দীর্ঘ তিনতলা ভবন (উইং) চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।
  • একমুখী দৃশ্যমানতা: সেন্ট্রাল টাওয়ারে দাঁড়িয়ে রক্ষীরা সবকটি উইং এবং সেলের দরজার ওপর নজর রাখতে পারত। কিন্তু সেলের ভেতরে থাকা বন্দীরা কখনোই দেখতে পেত না যে রক্ষীরা তাদের দিকে তাকিয়ে আছে কিনা। এই সার্বক্ষণিক অদৃশ্য নজরদারির ভয় বন্দীদের মনে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করত।

২. কৌশলী স্থাপত্য: একে অপরকে না দেখার ব্যবস্থা

  • মুখোমুখি সেলের অনুপস্থিতি: একটি উইংয়ের সেলের সামনে কোনো কক্ষ ছিল না; বরং প্রতিটি উইংয়ের সামনের অংশ মুখ করে থাকত অন্য একটি উইংয়ের পেছনের দেয়ালের দিকে। এর ফলে কোনো বন্দী সেলের লোহার শিকের সামনে এসে দাঁড়ালেও অন্য কোনো বন্দীর মুখ দেখার সুযোগ পেত না।
  • যোগাযোগের সম্পূর্ণ পথ বন্ধ: বন্দীরা যাতে চোখের ইশারায় বা ফিসফিস করে কথা বলতে না পারে, সেই লক্ষ্যেই এই নকশা করা হয়েছিল। মানুষ সামাজিক জীব, কিন্তু এখানে অন্য কোনো মানুষের মুখ না দেখতে পাওয়াটাই ছিল এক বড় মানসিক শাস্তি।

৩. সেলের ভেতরের নরক

  • আকার ও আলো-বাতাস: প্রতিটি সেল ছিল মাত্র ১৪.৯ ফুট × ৮.৯ ফুট আয়তনের। ওপরের দিকে কেবল একটি ছোট ভেন্টিলেটর বা ঘুলঘুলি ছিল, যা দিয়ে সামান্য আলো-বাতাস আসত।
  • উচ্চ দরজা ও শিক: সেলের ভারী কাঠের দরজা এবং লোহার শিকগুলো এমনভাবে তৈরি ছিল যে, বন্দী নিজের ঘরের ভেতরটা ছাড়া বাইরের দুনিয়ার কিছুই দেখতে পেত না।
  • পয়ঃনিষ্কাশনহীনতা: সেলের ভেতরে কোনো শৌচাগার ছিল না। বন্দীদের মাটির ছোট পাত্র দেওয়া হতো। মলমূত্রের দুর্গন্ধে ভরা সেই ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে বছরের পর বছর একা থাকা মানুষের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট ছিল।

৪. মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতা ও এর প্রভাব

  • নামহীন পরিচয়: বন্দীদের তাদের নিজস্ব নাম ধরে ডাকা হতো না। তাদের বুকে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো একটি নম্বর সংবলিত বিল্লা বা টিকিট। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বন্দীদের ব্যক্তিত্ব ও আত্মপরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা করা হতো।
  • ‘কালাপানি’র ভয় ও একাকীত্ব: চারদিকে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত উত্তাল সমুদ্র। বন্দীরা জানত যে এখান থেকে পালানো অসম্ভব। এই চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার বোধ এবং চরম একাকীত্ব অনেক বন্দীকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিত কিংবা তারা পাগল হয়ে যেতেন।
  • শ্রমের মাধ্যমে মানসিক অবদমন: ঘানিতে তেল পেষার মতো অমানুষিক শারীরিক খাটুনির পর যখন একজন বন্দীকে আবার সেই নিঝুম, অন্ধকার সেলে একা আটকে রাখা হতো, তখন ক্লান্তি এবং একাকীত্ব মিলে তাদের মনকে পুরোপুরি অবশ করে দিত।

ব্রিটিশদের তৈরি এই সেলুলার জেল ছিল স্থাপত্যের এমন এক কালো অধ্যায়, যেখানে ইট-পাথরের দেয়ালকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে মানুষের আত্মাকে পিষে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল।

অমানবিক শ্রম ও দৈহিক নির্যাতন

আন্দামানের সেলুলার জেলে বন্দীদের কেবল বন্দী করে রাখাই হতো না, বরং তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে ধ্বংস করার জন্য ব্রিটিশরা অমানুষিক কঠোর শ্রম ও নির্মম দৈহিক নির্যাতনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। রাজনৈতিক বন্দীদের সাধারণ কয়েদিদের চেয়েও অনেক বেশি নিকৃষ্ট এবং কঠোর সাজা দেওয়া হতো।

নিচে সেলুলার জেলের সেই অমানবিক শ্রম এবং পৈশাচিক দৈহিক নির্যাতনের রূপ তুলে ধরা হলো:

১. ঘানিতে তেল পেষার অমানবিক শ্রম

  • পশুর পরিবর্তে মানুষ: এই জেলের সবচেয়ে কুখ্যাত শাস্তি ছিল বন্দীদের দিয়ে ঘানি টানানো। সাধারণত যে কাজ বলদ বা গবাদি পশু দিয়ে করানো হতো, তা করানো হতো ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দিয়ে।
  • দৈনিক কোটা: প্রতিটি বন্দীকে প্রতিদিন ৩০ পাউন্ড (প্রায় ১৪ কেজি) নারকেল তেল অথবা সরিষা পিষে তেল বের করতে হতো।
  • ক্লান্তির চরম সীমা: সকাল থেকে শুরু করে বন্দীরা তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত অবস্থায় তেলের ঘানি পিষে চলতেন। সামান্য গতি কমলেই পিঠে পড়ত চাবুকের আঘাত। শরীর যখন আর চলত না, তখন অনেক বন্দী অজ্ঞান হয়ে ঘানির ওপরই পড়ে যেতেন।

২. নারকেলের ছোবড়া ছাঁটা ও দড়ি তৈরি

  • রক্তাক্ত হাত: বন্দীদের শুকনো নারকেলের শক্ত খোসা পিটিয়ে ভেতরের ছোবড়া বের করতে হতো এবং তা দিয়ে দড়ি তৈরি করতে হতো। খোসা পিটানোর জন্য কোনো ভালো সরঞ্জাম দেওয়া হতো না।
  • ক্ষতবিক্ষত আঙুল: শক্ত ছোবড়া টানাটানি করতে করতে বন্দীদের হাতের চামড়া উঠে যেত, আঙুল কেটে রক্ত পড়ত। কিন্তু রক্ত পড়া সত্ত্বেও তাদের কাজ থামানোর অনুমতি ছিল না। কাজ শেষ না হলে মিলত না রাতের খাবার।

৩. পৈশাচিক দৈহিক নির্যাতন

  • চাবুক ও বেত্রাঘাত (Flogging): জেলের নিয়ম সামান্য ভঙ্গ করলে বা দৈনিক কাজের কোটা পূরণ করতে না পারলে বন্দীদের নগ্ন করে টিকটিকি ফ্রেমের (Whipping Post) সাথে বেঁধে নির্মমভাবে বেত্রাঘাত করা হতো। চাবুকের আঘাতে পিঠের চামড়া উঠে রক্তগঙ্গা বয়ে যেত।
  • শৃঙ্খলের বিভিন্ন রূপ: বন্দীদের সাধারণ শিকল ছাড়াও লোহার ভারী বেড়ী পরিয়ে রাখা হতো। এর মধ্যে ছিল ‘ডান্ডা বেরি’ (পা দুটির মাঝখানে একটি লোহার ডান্ডা আটকে রাখা হতো, যাতে বন্দী পা ভাঁজ করতে বা ঠিকমতো হাঁটতে না পারে) এবং ‘খারি বেরি’ (হাতে-পায়ে শৃঙ্খল দিয়ে দেয়ালের সাথে চব্বিশ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা)।
  • মলত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা: কাজের সময় বন্দীদের শৌচাগারে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। বহু বন্দী মলমূত্র ত্যাগের বেগ চেপে রেখে তীব্র শারীরিক যন্ত্রণার শিকার হতেন, আবার অনেকে বাধ্য হয়ে কাজের জায়গাতেই মলমূত্র ত্যাগ করতেন, যা ছিল চরম অপমানজনক।

৪. চিকিৎসায় অবহেলা ও অনাহার

  • অখাদ্য পরিবেশন: বন্দীদের যে চাল বা রুটি দেওয়া হতো, তাতে বালি, পাথর ও পোকা থাকত। বুনো ঘাস সেদ্ধ করে সবজি হিসেবে দেওয়া হতো। বৃষ্টির নোংরা ও পোকাযুক্ত পানি পান করতে দেওয়া হতো।
  • অসুস্থতায় শাস্তি: অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে বন্দীরা আমাশয়, ম্যালেরিয়া এবং যক্ষ্মায় আক্রান্ত হতেন। কিন্তু ব্রিটিশ জেল চিকিৎসকরা বন্দীদের অসুস্থতাকে “বাহানা” বলে উড়িয়ে দিতেন এবং অসুস্থ শরীর নিয়েও কাজ না করলে উল্টো চাবুক মারতেন।

এই চরম দৈহিক ও মানসিক নির্যাতনের ফলে বহু বন্দী জেলের ভেতরেই মৃত্যুবরণ করেন, অনেকেই চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান, আর উল্লাসকর দত্তের মতো অনেক বিপ্লবী তীব্র যন্ত্রণায় একপর্যায়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।

৩টি ইউনিক ও প্রাক্টিক্যাল ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি

সেলুলার জেলের ইতিহাসকে সাধারণত কেবলই একটি “নির্যাতন কেন্দ্র” হিসেবে দেখা হয়। তবে গভীর ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার আলোয় বিশ্লেষণ করলে, এই কারাগারকে কেন্দ্র করে ৩টি ইউনিক ও প্রাক্টিক্যাল ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি (Historical Perspectives) উন্মোচিত হয়, যা তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতি এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক ভিন্ন রূপরেখা তুলে ধরে:

১. ‘পেনাল সেটেলমেন্ট’ বা অপরাধী উপনিবেশের মাধ্যমে ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য (Geo-political Dominance)

সাধারণত মনে করা হয় সেলুলার জেল কেবল বন্দীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বৃহৎ ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, এটি ছিল ব্রিটিশদের বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত নৌ-ঘাঁটি ও ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি প্রাক্টিক্যাল বাহানা।

  • দৃষ্টিভঙ্গি: ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা বুঝতে পারে যে মূল ভূখণ্ডে বিদ্রোহী ও বন্দীদের রাখা বিপজ্জনক। তারা আন্দামানকে বেছে নেয় একটি ‘পেনাল কলোনি’ বা অপরাধী উপনিবেশ হিসেবে।
  • বাস্তব রূপ: বন্দীদের দিয়ে জেলের চারপাশের জঙ্গল পরিষ্কার করানো, রাস্তাঘাট বানানো, পোর্ট ব্লেয়ার বন্দর তৈরি এবং ঔপনিবেশিক অবকাঠামো নির্মাণের কাজ করানো হতো। অর্থাৎ, যে বন্দীরা ব্রিটিশ শাসন উপড়ে ফেলতে চেয়েছিল, তাদেরই বিনামূল্যে দাস-শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করে ব্রিটিশরা বঙ্গোপসাগরের বুকে তাদের সাম্রাজ্যবাদী সীমান্ত ও নৌ-আধিপত্য সুরক্ষিত করেছিল।

২. মনস্তাত্ত্বিক ল্যাবরেটরি এবং ‘কারাগার বিজ্ঞান’-এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা (Criminological Experimentation)

সেলুলার জেল কেবল আকস্মিক অত্যাচারের জায়গা ছিল না, এটি ছিল ব্রিটিশদের মনস্তাত্ত্বিক শাসন ও আধুনিক কারাগার বিজ্ঞানের (Penology) একটি পরিকল্পিত ল্যাবরেটরি।

  • দৃষ্টিভঙ্গি: ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইউরোপে বন্দীদের সংশোধনের চেয়ে “মনস্তাত্ত্বিক অবদমন ও পরিচয় মুছে ফেলা” (De-individualization)-র তত্ত্ব জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। সেলুলার জেল ছিল সেই পশ্চিমা অপরাধবিজ্ঞানের প্রাক্টিক্যাল প্রয়োগক্ষেত্র।
  • বাস্তব রূপ: একজন মানুষকে সমাজ, পরিবার, এমনকি সহযোদ্ধাদের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন (Isolated) করে দিলে তার ভেতরের দ্রোহী সত্তা কতদিনে ভেঙে পড়ে—ব্রিটিশরা এখানে তার মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা চালাত। বন্দীদের নাম কেড়ে নিয়ে নম্বর দেওয়া, সেলগুলোর এমন স্থাপত্য যাতে কেউ কাউকে দেখতে না পায়—এগুলো কোনো রাগ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল না, বরং এটি ছিল বন্দীদের মস্তিষ্ককে নিষ্ক্রিয় করার একটি ঠান্ডা মাথার বৈজ্ঞানিক ছক।

৩. বন্দীদের বৈচিত্র্য ও ‘মিনি ইন্ডিয়া’র মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী ঐক্যের জন্ম (Cross-Cultural Nationalism)

ব্রিটিশরা ভেবেছিল ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের, বিভিন্ন ভাষার ও জাতের বিপ্লবীদের আন্দামানের দ্বীপে এনে আলাদা করে রাখলে তাদের আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তব ফলাফল হয়েছিল সম্পূর্ণ উল্টো।

  • দৃষ্টিভঙ্গি: সেলুলার জেল অনিচ্ছাকৃতভাবেই ভারতের প্রথম ‘ক্রস-কালচারাল ন্যাশনালিস্ট হাব’ বা অখণ্ড ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল।
  • বাস্তব রূপ: পাঞ্জাবের গদর পার্টির বিপ্লবী, বাংলার অনুশীলন ও যুগান্তর সমিতির সদস্য, এবং মহারাষ্ট্রের সাভারকরের মতো বুদ্ধিজীবীরা এখানে একসঙ্গে বন্দি ছিলেন। কড়া পাহারা সত্ত্বেও জেলের দেয়াল টোকা দেওয়ার কোড ল্যাঙ্গুয়েজ (Thumping Code) বা পায়খানার পাত্রের নিচে চিরকুট লুকিয়ে তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতেন। বিভিন্ন অঞ্চলের বিপ্লবীদের এই গোপন মিথস্ক্রিয়া তাদের আঞ্চলিক আন্দোলনকে একটি অখণ্ড ‘সর্বভারতীয় সমাজতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী’ রূপ দিতে সাহায্য করেছিল। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর এই বন্দীরাই ভারতের মূল ভূখণ্ডে গিয়ে আরও সংগঠিত গণআন্দোলন গড়ে তোলেন।

তথ্যসূত্র (Sources)

  • National Archives of India (British Political Department Records)
  • R.C. Majumdar, Penal Settlement in Andaman
  • Cellular Jail National Memorial Archives, Port Blair

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২৪শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ