অপরাধ

বাদশাহ শাহজাহান ও মমতাজ মহলের কতজন সন্তান ছিল? সম্পূর্ণ ইতিহাস
শাহজাহান ও মমতাজ

নিউজ ডেস্ক

September 12, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
বিভাগ (Category): ইতিহাস
প্রকাশের তারিখ: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তথ্যসূত্র (Sources): মুঘল সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক সংকলন, প্রথম আলো, যুগান্তর ও অন্যান্য ইতিহাসভিত্তিক প্রকাশনা

মুঘল সম্রাট শাহজাহান এবং তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বেগম মমতাজ মহলের মোট ১৪ জন সন্তান ছিল।

তাঁদের ১৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে মমতাজ মহল এই ১৪টি সন্তানের জন্ম দেন, যার মধ্যে ৮ জন পুত্র সন্তান এবং ৬ জন কন্যা সন্তান ছিল। তবে অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, এই ১৪ জন সন্তানের মধ্যে ৭ জনই জন্মগ্রহণের সময় বা শৈশবেই মারা যান। বাকি ৭ জন সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।

১৬৩১ সালে বুরহানপুরে তাঁদের ১৪তম সন্তান গওহর আরা বেগম-এর জন্ম দিতে গিয়েই মমতাজ মহলের মৃত্যু হয়।

জীবিত থাকা ৭ সন্তানের নাম:

  • জাহানারা বেগম (কন্যা)
  • দারা শিকোহ (পুত্র)
  • শাহ সুজা (পুত্র)
  • রওশন আরা বেগম (কন্যা)
  • ঔরঙ্গজেব (পুত্র – যিনি পরবর্তীতে মুঘল সম্রাট হন)
  • মুরাদ বক্স (পুত্র)
  • গওহর আরা বেগম (কন্যা)

মুঘল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় হলো সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজ মহলের সন্তানদের মধ্যকার সিংহাসন দখলের রক্তাক্ত যুদ্ধ এবং মমতাজের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত তাজমহলের ইতিহাস। নিচে এই দুটি বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:


১. সন্তানদের ইতিহাস: দারা শিকোহ বনাম ঔরঙ্গজেব

শাহজাহান ও মমতাজের ৪ পুত্র (দারা শিকোহ, শাহ সুজা, ঔরঙ্গজেব এবং মুরাদ বক্স) প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছিলেন। ১৬৫৭ সালে সম্রাট শাহজাহান গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে এই চার ভাইয়ের মধ্যে দিল্লির সিংহাসন দখলের এক নৃশংস যুদ্ধ শুরু হয়, যার মূল দুই চরিত্র ছিলেন দারা শিকোহ এবং ঔরঙ্গজেব।

দারা শিকোহ (জ্যেষ্ঠ পুত্র ও উত্তরাধিকারী)

  • ব্যক্তিত্ব ও স্বভাব: দারা শিকোহ ছিলেন অত্যন্ত উদারমনা, কবি, দার্শনিক এবং সুফি ভাবধারার মানুষ। তিনি হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের দর্শনের মধ্যে মিল খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি উপনিষদ ও ভগবদ গীতা ফার্সি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন।
  • শাহজাহানের পছন্দ: জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে শাহজাহান তাঁকে অসম্ভব ভালোবাসতেন এবং নিজের উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। দারা বেশিরভাগ সময় আগ্রার দরবারে বাবার কাছাকাছি থাকতেন।
  • দুঃখজনক পরিণতি: ধর্মীয় উদারতার কারণে কট্টরপন্থী মুঘল আমির ও রাজন্যবর্গ দারার ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। ১৬৫৮ সালের সামুগড়ের যুদ্ধে ঔরঙ্গজেবের চতুর রণকৌশলের কাছে দারা পরাজিত হন। পরে ঔরঙ্গজেব তাঁকে বন্দি করেন এবং ‘ইসলাম অবমাননার’ অভিযোগ এনে ১৬৫৯ সালে তাঁর শিরোচ্ছেদ (মৃত্যুদণ্ড) করেন।

ঔরঙ্গজেব (ষষ্ঠ সন্তান ও পরবর্তী সম্রাট)

  • ব্যক্তিত্ব ও স্বভাব: দারা শিকোহ-এর সম্পূর্ণ বিপরীত ছিলেন ঔরঙ্গজেব। তিনি ছিলেন একজন প্রখর বুদ্ধিমান, কঠোর পরিশ্রমী, অত্যন্ত দক্ষ সামরিক কমান্ডার এবং কট্টর সুন্নি মুসলিম।
  • সিংহাসন আরোহণ: সামরিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি একে একে অন্য তিন ভাই—দারা শিকোহ, শাহ সুজা এবং মুরাদ বক্সকে পরাজিত ও নিশ্চিহ্ন করেন। তিনি নিজের বৃদ্ধ পিতা শাহজাহানকে আগ্রা দুর্গে বন্দি করে ১৬৫৮ সালে নিজেকে মুঘল সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন এবং ‘আলমগীর’ উপাধি নেন।
  • শাসনকাল: তিনি প্রায় ৪৯ বছর ভারত শাসন করেন এবং তাঁর সময়ে মুঘল সাম্রাজ্যের সীমানা সর্বকালের মধ্যে সবচেয়ে বড় আকার ধারণ করেছিল।

২. তাজমহল নির্মাণের ইতিহাস

পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম এই নিদর্শনটি কেবল একটি স্থাপত্য নয়, এটি ছিল সম্রাট শাহজাহানের পক্ষ থেকে তাঁর প্রয়াত স্ত্রী মমতাজ মহলের প্রতি ভালোবাসার এক অমর মহাকাব্য।

নির্মাণের পটভূমি

১৬৩১ সালে দাক্ষিণাত্যের (বর্তমান মধ্যপ্রদেশ) বুরহানপুরে তাঁদের ১৪তম সন্তান গওহর আরা বেগমের জন্ম দিতে গিয়ে মমতাজ মহল মারা যান। প্রিয় বেগমের মৃত্যুতে শাহজাহান মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে, ইতিহাসবিদদের মতে, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তাঁর মাথার চুল ও দাড়ি পেকে সাদা হয়ে গিয়েছিল। মৃত্যুর আগে মমতাজ শাহজাহানের কাছে দুটি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন—তিনি যেন আর বিয়ে না করেন এবং তাঁর জন্য এমন এক সমাধি তৈরি করেন যা বিশ্ববাসী চিরকাল মনে রাখবে। সেই প্রতিজ্ঞা থেকেই তাজমহল নির্মাণের সূচনা।

নির্মাণশৈলী ও তথ্য

  • সময়কাল: ১৬৩২ সালে যমুনা নদীর তীরে এর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং মূল সমাধিটি ১৬৪৩ সালের দিকে শেষ হলেও পুরো প্রাঙ্গণ (বাগান, মসজিদ ইত্যাদি) সম্পন্ন হতে ১৬৫৩ সাল পর্যন্ত (প্রায় ২২ বছর) সময় লেগেছিল।
  • স্থপতি ও শ্রমিক: তাজমহলের প্রধান স্থপতি ছিলেন ওস্তাদ আহমদ লাহোরি। এই বিশাল স্থাপত্যটি তৈরিতে ভারত, পারস্য (ইরান) এবং মধ্য এশিয়া থেকে আসা প্রায় ২০,০০০ শ্রমিক ও কারিগর দিনরাত কাজ করেছিলেন।
  • উপাদান: তাজমহল তৈরিতে রাজস্থানের মাকরানা থেকে আনা বিশুদ্ধ সাদা মার্বেল পাথর ব্যবহার করা হয়েছিল। এছাড়া চীন, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান থেকে আনা ২৮ ধরণের মূল্যবান ও আধো-মূল্যবান মণি-মুক্তা পাথরের গায়ে খোদাই করে (Pietra Dura পদ্ধতিতে) নকশা করা হয়েছিল।
  • ব্যয়ভার: তৎকালীন সময়ে এটি নির্মাণে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ রুপি ব্যয় হয়েছিল, যা বর্তমান যুগের হিসাবে বিলিয়ন ডলারের সমান।

শেষ পরিণতি

১৬৬৬ সালে আগ্রা দুর্গে বন্দি অবস্থায় শাহজাহান মারা যান। বন্দিদশায় দুর্গের জানালা দিয়ে তিনি যমুনার তীরে তাজমহলের দিকে তাকিয়ে দিন কাটাতেন। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে ঔরঙ্গজেব তাঁকে তাজমহলের ভেতরে মমতাজ মহলের কবরের ঠিক পাশেই সমাহিত করেন।

যদি ভারতের উত্তরপ্রদেশে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি দেখার পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে টিকিট বুকিং এবং ভ্রমণের বিস্তারিত তথ্যের জন্য Taj Mahal Official Website ঘুরে দেখতে পারেন।

মুঘল সামজ্যের উত্তর কোল্ডারে কিছু নেপথ্য পথ এবং তাজমহলকে একপক্ষ সবথেকে বড় বড় “কালো তাজমহ”-এর গুঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা:


১. “কালো তাজমহল” (The Black Taj Mahal) এর গুঞ্জন ও আসল রহস্য

তাজমহলের ঠিক উল্টো দিকে, যমুনা নদীর অপর পাড়ে সম্রাট শাহজাহান নিজের জন্য হুবহু একই রকম একটি কালো মার্বেল পাথরের তাজমহল বানাতে চেয়েছিলেন—এটি ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর এবং আলোচিত গুঞ্জন।

  • গুঞ্জনের সূত্রপাত: ১৬৬৫ সালে ফরাসি পর্যটক জিন-ব্যাপটিস্ট তাভার্নিয়ার (Jean-Baptiste Tavernier) আগ্রা ভ্রমণ করেন। তিনি তাঁর ভ্রমণকাহিনিতে প্রথম উল্লেখ করেন যে, শাহজাহান যমুনার ওপারে নিজের জন্য একটি কালো তাজমহল নির্মাণ শুরু করেছিলেন, কিন্তু ছেলে ঔরঙ্গজেব তাঁকে বন্দি করায় সেই কাজ আর এগোতে পারেনি.
  • মাহতাব বাগ (Mahtab Bagh): তাজমহলের ঠিক বিপরীতে যমুনার ওপারে একটি বাগান রয়েছে, যার নাম ‘মাহতাব বাগ’। সেখানে খননকার্য চালিয়ে বেশ কিছু কালো মার্বেল পাথরের টুকরো পাওয়া যায়, যা এই গুঞ্জনকে আরও উসকে দেয়।
  • বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা ও সত্যতা: ১৯৯০-এর দশকে ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া’ (ASI) মাহতাব বাগে ব্যাপক খননকার্য চালায়। প্রত্নতাত্ত্বিকরা পরীক্ষা করে দেখেন যে, সেখানে পাওয়া কালো পাথরগুলো আসলে কোনো কালো মার্বেল ছিল না। সেগুলো ছিল মূল সাদা মার্বেল পাথর, যা যমুনার পানি, শৈবাল এবং দূষণের কারণে কালচে রঙ ধারণ করেছিল।
  • আসল উদ্দেশ্য: ইতিহাসবিদদের মতে, শাহজাহান কোনো কালো তাজমহল বানাতে চাননি। মাহতাব বাগটি তৈরি করা হয়েছিল এমনভাবে যাতে রাতে চাঁদের আলোয় যমুনার পানিতে মূল সাদা তাজমহলের একটি সুন্দর প্রতিচ্ছবি (Reflection) দেখা যায়।

২. তাজমহলের ভেতরের গোপন কক্ষ ও বন্ধ দরজার রহস্য

তাজমহলের মূল কাঠামোর নিচে এবং প্রাঙ্গণে বেশ কিছু বন্ধ ঘর এবং গোপন সুড়ঙ্গ রয়েছে, যা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটি নিয়ে নানা ধরণের তত্ত্ব প্রচলিত আছে:

  • ভেতরের ২২টি কক্ষ: তাজমহলের মূল বেদির নিচে যমুনা নদীর দিকে মুখ করা ২২টি গোপন ঘর রয়েছে। গুঞ্জন রয়েছে যে, এই কক্ষগুলোতে হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি বা মুঘল আমলের গোপন নথি লুকানো আছে।
  • আসল বৈজ্ঞানিক কারণ: প্রত্নতাত্ত্বিক ও স্থপতিদের মতে, এই কক্ষগুলো মূলত তাজমহলের বিশাল কাঠামোর জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি (Foundation) হিসেবে কাজ করে। যমুনা নদীর পানি ও মাটির আর্দ্রতা যাতে মূল মার্বেল পাথরের কোনো ক্ষতি করতে না পারে, সেজন্য এই আর্চ বা কক্ষগুলো তৈরি করে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। নিরাপত্তার স্বার্থে এবং পাথরের ক্ষয় রুখতে এগুলো বন্ধ রাখা হয়।

৩. রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের নেপথ্য কাহিনী: ভাইদের নাটকীয় পরিণতি

দারা শিকোহ এবং ঔরঙ্গজেবের যুদ্ধ ছাড়াও, বাকি দুই ভাই—শাহ সুজা এবং মুরাদ বক্স-এর পরিণতিও ছিল অত্যন্ত নাটকীয়:

  • মুরাদ বক্সের ট্র্যাজেডি: ঔরঙ্গজেব যখন দারা শিকোহ-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন, তখন তিনি ছোট ভাই মুরাদের সাথে জোট বেঁধেছিলেন। ঔরঙ্গজেব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, যুদ্ধের পর মুরাদকে সাম্রাজ্যের এক-তৃতীয়াংশ দেওয়া হবে। কিন্তু দারা পরাজিত হওয়ার পর, এক রাতে ঔরঙ্গজেব মুরাদকে মদ্যপান করিয়ে অচেতন করেন এবং বন্দি করেন। পরবর্তীতে ১৬৬১ সালে গোয়ালিয়র দুর্গে মুরাদকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
  • শাহ সুজার নিখোঁজ রহস্য: শাহ সুজা ছিলেন বাংলার সুবেদার (গভর্নর)। তিনি নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করে আগ্রার দিকে এগিয়ে যান, কিন্তু খজওয়ার যুদ্ধে ঔরঙ্গজেবের কাছে পরাজিত হন। এরপর ঔরঙ্গজেবের মীর জুমলার তাড়া খেয়ে তিনি সপরিবারে বাংলার রাজমহল ও ঢাকা হয়ে আরাকান (বর্তমান মিয়ানমার) রাজ্যে আশ্রয় নেন। সেখানে আরাকানের রাজার সাথে এক দ্বন্দ্বে শাহ সুজা এবং তাঁর পুরো পরিবার নির্মমভাবে নিহত বা নিখোঁজ হন। ইতিহাসে তাঁর শেষ পরিণতি আজও একটি বড় রহস্য।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জুলাই জাতীয় সনদ

নিউজ ডেস্ক

October 24, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant & Political Analyst)

বিভাগ (Category): রাজনীতি, জাতীয়

প্রকাশের তারিখ: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

তথ্যসূত্র (Sources): জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ সংক্রান্ত দলিল, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের (NCC) প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর সরকারি বিবৃতি এবং প্রথম আলো, সমকাল, বিডিনিউজ২৪ বাংলার প্রতিবেদন।


ঢাকা: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোয় যে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফসল ছিল ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কমিশন ও দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে প্রণীত এই সনদ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক জাতীয় গণভোটে প্রায় ৬৮.২৬ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পায়। কিন্তু স্বাক্ষরের এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে দেশের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে গভীর মেরুকরণ—যা বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি।

জুলাই সনদে কী আছে?

সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যার মধ্যে ৪৮টি বাস্তবায়নের জন্য সরাসরি সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন। সনদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা প্রবর্তন, যেখানে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক হারে গঠিত হবে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও মেয়াদে স্পষ্ট সীমারেখা টানা হয়েছে—একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকতে পারবেন না, এবং প্রধানমন্ত্রী পদে থাকাকালীন একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের দায়িত্বও পালন করতে পারবেন না। জাতীয় নির্বাচনের সময় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করার প্রস্তাবও সনদের একটি মূল স্তম্ভ। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০ সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের বাজেট ও অনাস্থা প্রস্তাব ব্যতীত অন্যান্য বিলে দলীয় সিদ্ধান্তের বিপরীতে স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও সনদে গুরুত্ব পেয়েছে।

সনদে কী নেই বা অস্পষ্ট রয়ে গেছে?

ব্যাপক পরিসরের এই সংস্কার প্রস্তাবনার পরও সনদে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, সংবিধানের মৌলিক চারটি মূলনীতি পরিবর্তন বা পরিমার্জনের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো চূড়ান্ত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নারী অধিকার, গণমাধ্যম, শ্রম অধিকার ও স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের দেওয়া সুনির্দিষ্ট সুপারিশগুলো জাতীয় ঐকমত্য কমিশন (NCC) এই সনদে পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত করেনি—এগুলোকে দ্বিতীয় ধাপের সংস্কার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংসদে নারীর আসন সংখ্যা বাড়ানোর সাধারণ প্রতিশ্রুতি থাকলেও সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা চূড়ান্ত হয়নি। আর সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট সময়সীমার অনুপস্থিতি—গণভোটে জয়লাভের পর ঠিক কবে নাগাদ এই সংস্কারগুলো আইনি রূপ পাবে, তার কোনো বাধ্যতামূলক সময়সীমা রাজনৈতিক সংকটের কারণে কার্যত থমকে গেছে।

দুই পক্ষের অবস্থান: কোথায় মূল বিরোধ?

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন স্পষ্টভাবে দুটি পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি ও তাদের মিত্র দলগুলোর অবস্থান হলো, জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবগুলো অবশ্যই বাস্তবায়িত হতে হবে, তবে তা দেশের বিদ্যমান সাংবিধানিক ও সংসদীয় কাঠামোর মধ্য দিয়েই করতে হবে। তাদের যুক্তি, রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশের মাধ্যমে সংসদকে বাইপাস করে পৃথক কোনো ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করা আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে; বরং সংবিধান সংশোধনের কাজ নির্বাচিত সংসদের স্বাভাবিক সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটাভুটির মাধ্যমেই সম্পন্ন হওয়া উচিত। বিএনপি নিজেকে সনদের অন্যতম স্বাক্ষরকারী হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, তারা সনদের মূল চেতনার বিরোধী নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রেখে প্রচলিত সংসদীয় পদ্ধতিতেই এটি বাস্তবায়ন করতে চায়।

অন্যদিকে সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের দাবি হলো, গণভোটের রায় অনুযায়ী সনদকে হুবহু এবং দ্রুততার সাথে কার্যকর করতে হবে। তাদের মতে, যেহেতু দেশের প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি মানুষ গণভোটে সনদের পক্ষে রায় দিয়েছেন, তাই কোনো নির্বাচিত সংসদ বা রাজনৈতিক দলের এই গণরায়কে বিলম্বিত করার বা একে সাধারণ সংশোধনী প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত করার নৈতিক অধিকার নেই। তারা অভিযোগ করছে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ক্ষমতার রাজনীতির কারণে সংস্কার প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে, যা জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনার সঙ্গে এক ধরনের আপসের শামিল। এই পক্ষের যুক্তি হলো, পুরনো সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে সংশোধনী আনলে ভবিষ্যতে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার পুনর্বাসনের ঝুঁকি থেকে যায়—তাই সনদে প্রস্তাবিত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর মাধ্যমেই নতুন আইনি রূপরেখা প্রণয়ন করা উচিত।

বর্তমান পরিস্থিতি: অনিশ্চয়তা অব্যাহত

২০২৬ সালের অক্টোবরে এসেও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রশ্নে স্পষ্ট কোনো সমাধান আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিবেদনে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও বিতর্কের খবর উঠে এসেছে, এবং স্বচ্ছতা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-ও সংস্কার বাস্তবায়নের গতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গণভোটের ফলাফলের সাথে বাস্তবায়নের সময়রেখার সম্পর্ক নিয়েও সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এসেছে। এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দেয় যে, একটি সংস্কার সনদে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা যতটা কঠিন, তার চেয়েও বেশি জটিল হতে পারে সেই ঐকমত্যকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া।

বিশ্লেষণ: গণভোট বনাম সাংবিধানিক প্রক্রিয়া—একটি চিরন্তন দ্বন্দ্ব

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে এই বিতর্ক আসলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি চিরন্তন প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে এসেছে—প্রত্যক্ষ গণরায় (গণভোট) এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্বমূলক প্রক্রিয়া (সংসদ)-এর মধ্যে কোনটির অগ্রাধিকার থাকা উচিত। বিএনপির অবস্থান সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার যুক্তিতে দাঁড়িয়ে, যেখানে জামায়াত-এনসিপি জোটের অবস্থান সরাসরি জনরায়ের অগ্রাধিকারের যুক্তিতে প্রতিষ্ঠিত। উভয় অবস্থানেরই নিজস্ব গণতান্ত্রিক যুক্তি রয়েছে, এবং এই দ্বন্দ্বের সমাধান কীভাবে হয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামোর চরিত্র।

উপসংহার

জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কারের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে স্বীকৃত, যা গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমর্থনও অর্জন করেছে। তবে এই বিপুল জনসমর্থন সত্ত্বেও বাস্তবায়নের পথ মসৃণ হয়নি—বরং তা পরিণত হয়েছে দেশের বর্তমান রাজনীতির অন্যতম বড় মেরুকরণের ক্ষেত্রে। আগামী দিনগুলোতে এই বিতর্কের সমাধান কীভাবে হয়, তা শুধু সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎই নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থিতিশীলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

নতুন শ্রমবাজার আপডেট ২০২৬

নিউজ ডেস্ক

October 23, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিনিধি ও তথ্যের বিবরণ:BDS Bulbul AHmed

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

প্রকাশের সময় ও তারিখ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২০ অপরাহ্ন

স্থান: অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা

বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানে এশিয়ার শীর্ষ চার অর্থনৈতিক পরাশক্তি—মালয়েশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং থাইল্যান্ডের শ্রমবাজার নিয়ে একযোগে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী শ্রমবাজারগুলোর পাশাপাশি বিকল্প ও উচ্চ আয়ের গন্তব্য হিসেবে এই দেশগুলোর সাথে একের পর এক যুগান্তকারী চুক্তি ও সরকারি নীতিগত পরিবর্তন প্রবাসীদের জন্য দক্ষ ও সুরক্ষিত কর্মসংস্থানের বিশাল ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

২০২৬ সালের অক্টোবর মাসের সর্বশেষ সরকারি ঘোষণা ও আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী চার দেশের শ্রমবাজারের সুনির্দিষ্ট আপডেট নিচে তুলে ধরা হলো:

মালয়েশিয়া: উন্মুক্ত হলো শ্রমবাজার, ১০ হাজার কর্মী যাচ্ছেন শূন্য খরচে

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য অফিশিয়ালি পুনরায় চালু হয়েছে।

  • সর্বশেষ আপডেট: প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মালয়েশিয়া সরকার কর্মী নিয়োগে স্বচ্ছতা আনতে বাংলাদেশের ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত (Enlisted) করেছে, যার মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘বোয়েসেল’ (BOESL) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
  • শূন্য অভিবাসন ব্যয় (Zero Cost): বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে ১০,০০০ বাংলাদেশি কর্মীকে সম্পূর্ণ ‘শূন্য খরচে’ (Free of Cost) নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়েছে।
  • পরিকল্পনা: আগামী ৬ মাসে ধাপে ধাপে বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে প্রায় ২,০০,০০০ কর্মী নিয়োগের রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। মূলত উৎপাদন, কনস্ট্রাকশন ও সেবা খাতে এই কর্মীরা কাজ পাবেন।

জাপান: ঐতিহাসিক চুক্তি, ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে সরাসরি কর্মী নিয়োগ

দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি ও অভিবাসী সুরক্ষায় জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশ একটি যুগান্তকারী মেমোরেন্ডাম অব কো-অপারেশন (MoC) সম্পাদন করেছে।

  • সর্বশেষ আপডেট: গত ১৭ অক্টোবর ২০২৬-এ দুই দেশের মধ্যে ‘ইএসডিপি-এমওসি’ (ESDP-MOC – Memorandum of Cooperation on Employment Skills Development) চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির প্রথম মেয়াদ ৫ বছর, যা পরবর্তীতে আরও ৫ বছরের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে (মোট ১০ বছর)।
  • নিয়োগের সময়কাল: এই নতুন কাঠামোর অধীনে আগামী ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে সরাসরি বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেবে জাপান।
  • সুযোগ ও অধিকার: চুক্তির শর্তানুযায়ী, জাপানে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীরা জাপানের স্থানীয় নাগরিকদের সমপরিমাণ আইনি সুরক্ষা, বেতন-ভাতা এবং নারী-পুরুষের সমান কর্মক্ষেত্রের অধিকার পাবেন। ৫ বছরে ১ লক্ষাধিক দক্ষ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া: নির্মাণ ও মৌসুমি খাতে সুযোগ বৃদ্ধির জোর প্রচেষ্টা

ইপিএস (Employment Permit System) বা সরকারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে।

  • সর্বশেষ আপডেট: ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর সিউলে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘ন্যাশনাল এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন’ (NESA) এবং ‘কন্সট্রাকশন অ্যাসোসিয়েশন অব কোরিয়া’ (CAK) এর সাথে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর একটি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
  • নতুন কাজের ক্ষেত্র: প্রথাগত ম্যানুফ্যাকচারিং ও কৃষি খাতের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার বড় বড় নির্মাণশিল্প (Construction Sector) এবং স্বল্পমেয়াদি মৌসুমি কর্মসংস্থানে (Seasonal Jobs) বাংলাদেশি দক্ষ কর্মীদের যুক্ত করার বিষয়ে কোরিয়ান কর্তৃপক্ষ ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।
  • পূর্বশর্ত: কোরিয়ায় যাওয়ার জন্য ব্যবহারিক কোরিয়ান ভাষা শিক্ষা (EPS-TOPIK) এবং কর্মক্ষেত্রভিত্তিক কারিগরি দক্ষতা অর্জন করা বাধ্যতামূলক।

৪. থাইল্যান্ড: কারিগরি ও ট্যুরিজম খাতে নতুন উইন্ডো

সাধারণত থাইল্যান্ডে বাংলাদেশিদের শ্রমবাজার সেভাবে পরিচিত না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সরকারিভাবে এই বাজার উন্মোচনের বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে

  • সর্বশেষ আপডেট: মধ্যপ্রাচ্যের ওপর একক নির্ভরতা কমাতে থাইল্যান্ডের সেবা খাত, বিশেষ করে ট্যুরিজম, হসপিটালিটি এবং নির্দিষ্ট কিছু টেকনিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্টে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ ও আধা-দক্ষ কর্মী নেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা চুক্তি ও কূটনৈতিক আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

চার দেশের শ্রমবাজারের তুলনামূলক চিত্র

দেশনিয়োগের মূল মাধ্যমপ্রধান চাহিদাসম্পন্ন খাতসমূহমূল যোগ্যতা/প্রয়োজনীয়তা
মালয়েশিয়া৩৩৮টি অনুমোদিত বেসরকারি ও সরকারি এজেন্সিউৎপাদন (Manufacturing), নির্মাণ ও প্ল্যান্টেশনমেডিকেল ফিটনেস এবং সাধারণ কাজের অভিজ্ঞতা
জাপাননতুন ESDP-MOC চুক্তির আওতাভুক্ত প্রক্রিয়াকেয়ারগিভিং, নির্মাণ, এভিয়েশন ও গার্মেন্টসজাপানি ভাষা দক্ষতা এবং নির্দিষ্ট কাজের টেকনিক্যাল জ্ঞান
দক্ষিণ কোরিয়াসরাসরি সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘বোয়েসেল’ (BOESL)ম্যানুফ্যাকচারিং, নির্মাণশিল্প এবং কৃষিকোরীয় ভাষা (EPS-TOPIK) এবং পেশাভিত্তিক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ
থাইল্যান্ডজি-টু-জি (G2G) ও অনুমোদিত সরকারি কাঠামোহসপিটালিটি, সেবা শিল্প এবং টেকনিক্যাল কাজইংরেজি বা থাই ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ উন্নত দেশগুলোতে কেয়ারগিভার, নির্মাণকর্মী এবং আইটি প্রফেশনাল হিসেবে যাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম (সিস্টেম) অনুসরণ করতে হয়। নিচে প্রতিটি কাজের জন্য নির্দিষ্ট আবেদন প্রক্রিয়া, যোগ্যতা এবং সঠিক সিস্টেমের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

কেয়ারগিভার (Caregiver) বা সেবামূলক পেশা

জাপানে বয়স্কদের সেবা করার জন্য বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে প্রচুর কেয়ারগিভার নেওয়া হচ্ছে।

  • প্রধান সিস্টেম: জাপানের ক্ষেত্রে এটি মূলত দুটি সিস্টেমে হয়—SSW (Specified Skilled Worker) এবং TITP (Technical Intern Training Program)। এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল (BOESL) মাঝে মাঝে বিশেষ সার্কুলার দেয়।
  • প্রয়োজনীয় যোগ্যতা:
    • ভাষা দক্ষতা: জাপানি ভাষার দক্ষতা পরীক্ষা JLPT N4 অথবা JFT-Basic A2 পাস করতে হবে।
    • কারিগরি দক্ষতা: নার্সিং বা সেবামূলক কাজের ওপর Caregiving Skills Evaluation Test পাস করতে হবে (SSW-এর জন্য)।
  • আবেদন প্রক্রিয়া: ভাষা ও দক্ষতার সার্টিফিকেট অর্জনের পর জাপানের অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি (যেমন বোয়েসেল বা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত বৈধ এজেন্সি) এর মাধ্যমে জাপানি কোম্পানির সাথে ইন্টারভিউ দিয়ে ভিসা প্রসেস করতে হয়।

নির্মাণকর্মী (Construction Worker)

মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ায় কনস্ট্রাকশন খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের বিশাল চাহিদা রয়েছে।

  • প্রধান সিস্টেম:
    • দক্ষিণ কোরিয়া: সম্পূর্ণ সরকারি EPS (Employment Permit System) এর মাধ্যমে।
    • মালয়েশিয়া: সরকারের অনুমোদিত ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে (যার মধ্যে বোয়েসেলও অন্তর্ভুক্ত)।
  • প্রয়োজনীয় যোগ্যতা:
    • দক্ষিণ কোরিয়া: কোরিয়ান ভাষার পরীক্ষা EPS-TOPIK পাস করতে হবে এবং নির্মাণকাজের বেসিক ট্রেনিং থাকতে হবে।
    • মালয়েশিয়া: শারীরিক সক্ষমতা, মেডিকেল ফিটনেস এবং বিএমইটি (BMET) ডাটাবেজে নাম নিবন্ধন থাকতে হবে।
  • আবেদন প্রক্রিয়া: কোরিয়ার জন্য বোয়েসেলের (BOESL) ওয়েবসাইটে যখন কনস্ট্রাকশন খাতের সার্কুলার দেবে, তখন আবেদন করে লটারি বা ভাষা পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। মালয়েশিয়ার জন্য অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে বা সরকারি জিরো-কস্ট পুলে নাম নিবন্ধন করে অগ্রসর হতে হবে।

আইটি প্রফেশনাল (IT Professional / Engineer)

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় আইটি খাতের চাকরিগুলো উচ্চ বেতনের এবং এটি সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক।

  • প্রধান সিস্টেম: এটি মূলত সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগ (Direct Corporate Hiring) এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল (BOESL)-এর বিশেষ টেকনিক্যাল রিক্রুটমেন্ট ড্রাইভের মাধ্যমে হয়ে থাকে।
  • প্রয়োজনীয় যোগ্যতা:
    • শিক্ষাগত যোগ্যতা: কম্পিউটার সায়েন্স (CSE), আইটি বা রিলেটেড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি।
    • দক্ষতা: সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডাটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি বা নেটওয়ার্কিংয়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা।
    • ভাষা: জাপানের জন্য সাধারণত JLPT N3 বা N2 লেভেল খোঁজা হয়। তবে কিছু গ্লোবাল কোম্পানিতে শুধু ইংরেজি (TOEFL/IELTS) জানলেও সুযোগ মেলে।
  • আবেদন প্রক্রিয়া: বোয়েসেল প্রতি বছর জাপান ও কোরিয়ার আইটি কোম্পানির জন্য সরাসরি নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এছাড়া Daijob, Wantedly, LinkedIn-এর মতো আন্তর্জাতিক জব পোর্টাল ব্যবহার করে সরাসরি জাপানি বা কোরিয়ান কোম্পানিতে স্পন্সরশিপ ভিসার জন্য আবেদন করা যায়।

তিনটি বিষয়ের একটি সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক ছক

পেশামূল গন্তব্য দেশপ্রধান মাধ্যম (System)ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব
কেয়ারগিভারজাপানSSW / TITP (সরকারি ও বৈধ প্রাইভেট এজেন্সি)খুবই উচ্চ (N4 বা সমমান আবশ্যক)
নির্মাণকর্মীদক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়াEPS (কোরিয়া) / অনুমোদিত এজেন্সি (মালয়েশিয়া)মাঝারি থেকে উচ্চ (কোরিয়ার জন্য বাধ্যতামূলক)
আইটি প্রফেশনালজাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসরাসরি কোম্পানি ইন্টারভিউ / BOESL সার্কুলারমাঝারি (ইংরেজি বা বেসিক ভাষা জানলে অগ্রাধিকার)

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশে আইটি প্রফেশনাল (Software Engineer, Web Developer, Data Scientist, Cyber Security Expert ইত্যাদি) হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত চমৎকার এবং দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত লাভজনক। এই খাতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এখানে কোনো লটারি বা শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা নেই; সম্পূর্ণ মেধা ও কারিগরি দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে ভিসা পাওয়া যায়।

একজন আইটি প্রফেশনাল হিসেবে বিদেশ যাওয়ার জন্য আপনাকে প্রধানত ২টি অফিশিয়াল সিস্টেম অনুসরণ করতে হবে:

সরকারি মাধ্যম: বোয়েসেল (BOESL) আইটি রিক্রুটমেন্ট

বাংলাদেশ সরকারের একমাত্র রাষ্ট্রীয় জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান BOESL (Bangladesh Overseas Employment and Services Limited) প্রতি বছর জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন নামী আইটি কোম্পানির সাথে যৌথভাবে “Direct Hiring Drive” বা সরাসরি নিয়োগ মেলার আয়োজন করে।

  • পদ্ধতি: বোয়েসেল তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে (boesl.gov.bd) সার্কুলার দেয়। সেখানে দেওয়া লিংকে আপনার রিজিউমি/সিভি (Resume) জমা দিতে হয়।
  • বাছাই প্রক্রিয়া: কোম্পানির প্রতিনিধিরা প্রাথমিক সিভি শর্টলিস্ট করে সরাসরি বা অনলাইনের মাধ্যমে টেকনিক্যাল ইন্টারভিউ এবং কোডিং টেস্ট নেন।
  • সুবিধা: সরকারি মাধ্যমে হওয়ায় কোনো বাড়তি এজেন্সির খরচ বা প্রতারিত হওয়ার ভয় থাকে না। ভিসা প্রসেসিং খুব দ্রুত ও স্বচ্ছ হয়।

প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম: সরাসরি আন্তর্জাতিক জব পোর্টাল (Direct Hiring)

জাপান ও কোরিয়ার অনেক গ্লোবাল কোম্পানি এখন বিশ্বজুড়ে দক্ষ কর্মী খুঁজছে, যারা সরাসরি স্পন্সরশিপ ভিসা (যেমন জাপানের জন্য Engineer/Specialist in Humanities/International Services Visa) দিয়ে কর্মী নিয়ে যায়।

  • পদ্ধতি: আপনাকে আন্তর্জাতিক জব পোর্টালগুলোতে নিয়মিত চোখ রাখতে হবে এবং আপনার প্রোফাইল অনুযায়ী আবেদন করতে হবে।
  • সেরা কিছু প্ল্যাটফর্ম:
    • জাপানের জন্য: Daijob.com, Wantedly, TokyoDev, Japan Dev, এবং LinkedIn.
    • দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য: Seoul Startups, Wanted.co.kr, এবং LinkedIn.

সফলভাবে যাওয়ার জন্য ৩টি মূল প্রস্তুতি (Action Plan)

যদি আপনি ২০২৭ সালের মধ্যে একজন আইটি প্রফেশনাল হিসেবে বিদেশে যেতে চান, তবে আজ থেকেই এই ৩টি বিষয়ে প্রস্তুতি শুরু করুন:

  • ক. শক্তিশালী টেকনিক্যাল পোর্টফোলিও: আপনার GitHub প্রোফাইল অত্যন্ত চমৎকার হতে হবে। আপনি যে প্রযুক্তিতে (যেমন: Python, JavaScript, Java, DevOps, Multi-Cloud) দক্ষ, তার প্রাক্টিক্যাল প্রজেক্টগুলো পোর্টফোলিওতে প্রদর্শন করুন।
  • খ. গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড সিভি (Resume): জাপানি বা কোরিয়ান কোম্পানিগুলোর জন্য সিভি হতে হবে এক বা সর্বোচ্চ দুই পৃষ্ঠার, যা হবে সম্পূর্ণ অ্যাকশন-অরিয়েন্টেড (আপনি কোন প্রজেক্টে কী ভূমিকা রেখেছেন এবং তার আউটপুট কী ছিল)।
  • গ. ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা:
    • জাপান: কিছু কোম্পানি শুধু ইংরেজিতে কর্মী নিলেও, আপনি যদি JLPT N3 বা N2 লেভেলের জাপানি ভাষা শিখে রাখেন, তবে আপনার চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা ৯০% বেড়ে যাবে এবং বেতনও অনেক বেশি হবে।
    • দক্ষিণ কোরিয়া: ইংরেজি জানা বাধ্যতামূলক, পাশাপাশি কোরিয়ান ভাষার বেসিক (TOPIK Level 2/3) জানা থাকলে ইন্টারভিউতে বিশাল অ্যাডভান্টেজ পাওয়া যায়।
  • আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
রেমিট্যান্স

নিউজ ডেস্ক

October 23, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিনিধি ও তথ্যের বিবরণ:বিডিএস বুল্বুল আহমেদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশের সময় ও তারিখ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১১ অপরাহ্ন

স্থান: ঢাকা

। তবে কষ্টার্জিত এই অর্থ দেশে পাঠানোর আগে কোন মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়া যাবে, তা জানা অত্যন্ত জরুরি। এক্সচেঞ্জ রেট, পাঠানোর ফি এবং সরকারি প্রণোদনার সঠিক হিসাব মিলিয়ে টাকা পাঠানোর সেরা মাধ্যমগুলোর বিস্তারিত গাইডলাইন নিচে তুলে ধরা হলো।

১. সরকারি প্রণোদনার সুনির্দিষ্ট হিসাব

বৈধ উপায়ে দেশে রেমিট্যান্স পাঠালে প্রবাসীদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ আর্থিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে:

  • সাধারণ নগদ প্রণোদনা: বাজেট ২০২৬-২৭ অনুযায়ী, বৈধ পথে আসা রেমিট্যান্সের ওপর পূর্বের ন্যায় ২.৫% সরকারি নগদ প্রণোদনা বহাল রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ টাকার বিপরীতে আড়াই টাকা সরকার অতিরিক্ত প্রদান করে।
  • প্রবাসী কার্ডের অতিরিক্ত সুবিধা: বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া ডিজিটাল প্রবাসী কার্ডের আওতায় থাকা কর্মীরা রেমিট্যান্স প্রেরণে ৩% পর্যন্ত নগদ প্রণোদনা উপভোগ করতে পারছেন।
  • ভ্যাট সংক্রান্ত বিভ্রান্তি: প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের ওপর ৭.৫% বা ১৫% ভ্যাট কাটার তথ্যটি সম্পূর্ণ একটি গুজব এবং ভিত্তিহীন। প্রবাসীদের কাছ থেকে দেশে টাকা আসার পর কোনো বাড়তি কর কেটে নেওয়া হয় না।

২. টাকা পাঠানোর ৩টি প্রধান মাধ্যম: ফি ও সুবিধা

বাংলাদেশে প্রবাসীদের টাকা পাঠানোর মাধ্যমগুলোকে প্রধানত তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়:

ক. ডিজিটাল মানি ট্রান্সফার অ্যাপস (Wise, Taptap Send, Remitly ইত্যাদি)

সহজ ইন্টারফেস ও দ্রুত লেনদেনের কারণে বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রবাসীদের কাছে এগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয়।

  • ফি ও খরচ: সাধারণত ১% থেকে ১.৫% পর্যন্ত সার্ভিস চার্জ কাটে। তবে নির্দিষ্ট কিছু আন্তর্জাতিক অ্যাপে বড় অঙ্কের লেনদেনে কোনো ফি নেওয়া হয় না বা ফি অত্যন্ত নগণ্য থাকে।
  • এক্সচেঞ্জ রেট: এই অ্যাপগুলো মিড-মার্কেট রেটের খুব কাছাকাছি এক্সচেঞ্জ রেট প্রদান করে, যা প্রবাসীদের জন্য বেশ লাভজনক।
  • টাকা পৌঁছানোর সময়: ইনস্ট্যান্ট বা সর্বোচ্চ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ওয়ালেটে টাকা চলে যায়।

খ. মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস (bKash, Nagad)

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা পরিবারের কাছে মুহূর্তের মধ্যে টাকা পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম। আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার অর্গানাইজেশন (MTO) ও বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ হাউজের পার্টনারশিপের মাধ্যমে সরাসরি প্রবাসী অ্যাপ থেকে দেশে এমএফএস ওয়ালেটে টাকা পাঠানো যায়।

  • ফি ও খরচ: কাতার, ইতালি, ওমান ও যুক্তরাজ্যের মতো কিছু দেশ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক কারণে পাঠানোর খরচ গড়ে ১.২০% থেকে ১.৪৫% পর্যন্ত উন্নীত হলেও সৌদি আরব, কুয়েত, যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুর থেকে পাঠানোর খরচ তুলনামূলক কম।
  • সুবিধা: সরাসরি মোবাইল নম্বরে টাকা চলে আসায় ব্যাংকে যাওয়ার ঝামেলা থাকে না। এছাড়া মূল টাকার সাথে সরকারি ২.৫% প্রণোদনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যোগ হয়ে যায়।
  • ক্যাশ আউট সুবিধা: রেমিট্যান্সের টাকা তোলার ক্ষেত্রে পার্টনার ব্যাংকগুলোর এটিএম (ATM) বুথ থেকে প্রতি হাজারে মাত্র ৭ টাকা খরচে ক্যাশ আউট করার বিশেষ সুযোগ পাওয়া যায়।

গ. প্রথাগত ব্যাংকিং চ্যানেল (অনলাইন রেমিট্যান্স অ্যাকাউন্ট ও সরাসরি ব্যাংক ট্রান্সফার)

বড় অঙ্কের অর্থ কিংবা স্থায়ী সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে ব্যাংকিং চ্যানেল সবচেয়ে নিরাপদ মাধ্যম। বর্তমানে এনআরবি (NRB) অ্যাকাউন্ট বা বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে বিদেশ থেকেই ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।

  • ফি ও খরচ: সরাসরি ব্যাংক টু ব্যাংক ট্রান্সফারে একটি নির্দিষ্ট ফ্ল্যাট ফি (যেমন: ১০ থেকে ২০ ডলার/ইউরো/রিয়াল) কাটা হতে পারে। তবে এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর বিশেষ অফারে অনেক সময় জিরো ফি সুবিধা পাওয়া যায়।
  • এক্সচেঞ্জ রেট: বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঘোষিত অফিশিয়াল রেট অনুযায়ী হিসাব করা হয়।
  • টাকা পৌঁছানোর সময়: সরাসরি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে টাকা পাঠালে তাৎক্ষণিক ক্রেডিট হয়, তবে অন্য ব্যাংকের ক্ষেত্রে BEFTN বা ক্লিয়ারিং সিস্টেমের কারণে ১ থেকে ২ কার্যদিবস সময় লাগতে পারে।

৩. সেরা মাধ্যম নির্বাচনের তুলনামূলক ছক

ফিচারের ধরণডিজিটাল অ্যাপস (Wise / Taptap)মোবাইল ব্যাংকিং (bKash / Nagad)প্রথাগত কমার্শিয়াল ব্যাংক
অর্থ স্থানান্তরের সময়দ্রুত (কয়েক মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা)তাৎক্ষণিক (২৪/৭ ইনস্ট্যান্ট)১ থেকে ২ কার্যদিবস (অন্য ব্যাংক হলে)
এক্সচেঞ্জ রেট সুবিধাচমৎকার ও প্রতিযোগিতামূলকভালো (মার্কেট রেট অনুযায়ী)ব্যাংক ও দিনভেদে কিছুটা কম-বেশি হয়
লুকানো চার্জ বা ফিঅত্যন্ত কমকম থেকে মাঝারিবড় অঙ্কে সাশ্রয়ী, ছোট অঙ্কে ফ্ল্যাট ফি
কাদের জন্য উপযুক্তযারা স্মার্টফোন ব্যবহার করে সেরা এক্সচেঞ্জ রেট চান।গ্রামে থাকা পরিবারের জরুরি খরচের জন্য ছোট অঙ্কের অর্থ পাঠাতে।জায়গা-জমি কেনা, ফিক্সড ডিপোজিট বা বড় অঙ্কের পারিবারিক সঞ্চয়ের জন্য।

প্রবাসী রেমিট্যান্স প্রেরকদের জন্য ৩টি গুরুত্বপূর্ণ টিপস:

  1. এক্সেঞ্জ রেট ও ফি-র সমন্বয় দেখুন: অনেক সময় কোনো মাধ্যম ফি জিরো দেখালেও এক্সচেঞ্জ রেট কিছুটা কমিয়ে দেয়। তাই টাকা পাঠানোর সময় ফাইনাল পে-আউট অ্যামাউন্ট (সব ফি কাটার পর দেশে প্রাপক মোট কত টাকা পাবেন) তুলনা করে নিন।
  2. ছুটির দিন হিসাব করুন: ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাপ্তাহিক ছুটি (শুক্রবার ও শনিবার) এবং আপনার অবস্থানরত দেশের ছুটির দিনটি হিসাব করে টাকা পাঠান, যেন জরুরি সময়ে অর্থ আটকে না থাকে।
  3. এনআরবি বন্ড ও সঞ্চয়পত্র: আপনি যদি ব্যাংকিং চ্যানেলে বড় অঙ্কের টাকা পাঠান, তবে সেই অর্থ দিয়ে প্রবাসীদের জন্য বিশেষ ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ড বা ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন, যা সাধারণ ব্যাংকিংয়ের চেয়ে বেশি মুনাফা নিশ্চিত করে।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

১২ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ