ইতিহাস
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant & Political Analyst)
বিভাগ (Category): রাজনীতি, জাতীয়
প্রকাশের তারিখ: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তথ্যসূত্র (Sources): উইকিপিডিয়া, দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন, বিএসএস, বিবিসি বাংলা এবং সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের প্রতিবেদন।
ঢাকা: ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রকাশ্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে শপথ নিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান—দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। এই শপথগ্রহণ কেবল একটি রাজনৈতিক পালাবদল ছিল না; বরং এটি ছিল সতেরো বছরের নির্বাসিত জীবন, শতাধিক মামলা, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কের এক নাটকীয় পরিণতি। তারেক রহমানের এই উত্থানকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গভীরে।
শিকড়: মুক্তিযুদ্ধ ও জিয়া পরিবারের রাষ্ট্রক্ষমতায় আগমন

শিকড়: মুক্তিযুদ্ধ ও জিয়া পরিবারের রাষ্ট্রক্ষমতায় আগমন অধ্যায়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়া পরিবারের উত্থান, ভিত্তি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে আসার ঐতিহাসিক পটভূমিকে নির্দেশ করে। এই শিকড় মূলত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রোথিত হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক যাত্রার মূল ধাপগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।
১. কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র এবং স্বাধীনতার ঘোষণা
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাত্রে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বর গণহত্যা শুরু করে, তখন সারা দেশ এক গভীর অনিশ্চয়তা ও নেতৃত্বহীনতার মধ্যে নিমজ্জিত হয়। এই সংকটময় মুহূর্তে ২৬শে মার্চ এবং পরবর্তী ২৭শে মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এই ঘোষণাটি যুদ্ধক্ষেত্রের সামরিক কর্মকর্তা, সাধারণ জনতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পূর্ব বাংলার সশস্ত্র প্রতিরোধের এক বৈধ নৈতিক ভিত্তি এনে দেয়। এটি ছিল রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের আত্মপ্রকাশের প্রথম ও প্রধান ঐতিহাসিক শিকড়।
২. সম্মুখসমর ও ‘জেড ফোর্স’ গঠন
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মেজর জিয়াউর রহমান প্রথমে ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে ১১ নম্বর সেক্টরের প্রধান হন। জুলাই মাসে তাঁর নামের প্রথম অক্ষর মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রথম নিয়মিত সামরিক ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’ গঠিত হয়। তাঁর ক্ষুরধার রণকৌশল ও বীরত্বপূর্ণ কমান্ডের অধীনে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অসংখ্য সম্মুখসমরে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধে এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীর উত্তম’-এ ভূষিত করে।
৩. নেপথ্যের শক্তি হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া
মেজর জিয়া যখন সম্মুখসমরে ব্যস্ত, তখন তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দুই সন্তানসহ ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গৃহবন্দী ও অবরুদ্ধ হন। যুদ্ধ চলাকালে মেজর জিয়ার মনোবল ভাঙতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তাঁর ওপর তীব্র মানসিক চাপ প্রয়োগ করে। কিন্তু কোনো রকম আপস না করে চরম প্রতিকূলতার মধ্যে পরিবারকে আগলে রাখা এবং তথ্য গোপন রাখার অনমনীয় মনোভাবের কারণে তাঁকে অবদমিত করা সম্ভব হয়নি। এই ত্যাগ ও মানসিক দৃঢ়তা জিয়া পরিবারের সামগ্রিক রাজনৈতিক ভিত্তিকে আরও মজবুত করে।
৪. ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তন ও সিপাহি-জনতার বিপ্লব
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে এক চরম অস্থিতিশীলতা ও একের পর এক পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়। ৩রা নভেম্বর এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয়। এর চার দিন পর, ৭ই নভেম্বর কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে এবং সাধারণ সিপাহি ও জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ঐতিহাসিক ‘সিপাহি-জনতা বিপ্লব’ সংঘটিত হয়। এই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।
৫. রাষ্ট্রক্ষমতায় আগমন এবং রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠা
৭ই নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান প্রথমে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেন। অবশেষে ১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন ঘটান এবং ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর এক নতুন রাজনৈতিক দর্শনের প্রবর্তন করেন, যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রক্ষমতায় জিয়া পরিবারের প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি স্থায়ী রূপ লাভ করে।
রাজনীতিতে উত্থান ও বিতর্কিত অধ্যায়

রাজনীতিতে উত্থান ও বিতর্কিত অধ্যায় অংশটি জিয়া পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্ম, বিশেষ করে তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী, ঝোড়ো এবং সমালোচিত সময়কালকে নির্দেশ করে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে একদিকে যেমন তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে রাজনীতিতে একচ্ছত্র প্রভাব তৈরি হয়, অন্যদিকে তেমনি দুর্নীতি, সমান্তরাল শাসনকেন্দ্র পরিচালনা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর বিতর্কিত অধ্যায়েরও জন্ম হয়।
এই অধ্যায়ের মূল দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।
১. সাংগঠনিক উত্থান ও তৃণমূল রাজনীতি বিকেন্দ্রীকরণ
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিশাল বিজয়ের পর তারেক রহমান দলের ভেতরে নিজের অবস্থান প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে শুরু করেন। ২০০২ সালে তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। এরপর তিনি প্রথাগত ড্রয়িংরুম রাজনীতি ভেঙে দেশজুড়ে তৃণমূল প্রতিনিধি সম্মেলনের এক অভিনব কর্মসূচি শুরু করেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ নেতাকর্মীদের সরাসরি ঢাকায় এসে শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে তিনি দলের ভেতর এক তরুণ ও অনুগত কর্মী বাহিনী গড়ে তোলেন, যা তাঁকে দলের অলিখিত প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করে।
২. ‘হাওয়া ভবন’ এবং সমান্তরাল শাসনকেন্দ্রের বিতর্ক
তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকটি ছিল ঢাকার বনানীতে অবস্থিত তাঁর রাজনৈতিক কার্যালয় ‘হাওয়া ভবন’। অভিযোগ ওঠে যে, তৎকালীন সরকারের মূল প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয় হলেও, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণ, বড় বড় সরকারি টেন্ডার, আমলাদের পদায়ন এবং বদলির সিদ্ধান্তগুলো এই হাওয়া ভবন থেকেই নিয়ন্ত্রিত হতো। সমালোচক এবং তৎকালীন বিরোধী দলগুলোর মতে, এটি সরকারের ভেতরে এক সমান্তরাল ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার উৎস হিসেবে কাজ করেছিল, যা প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ভেঙে ফেলে।
৩. ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ
এই সময়কালে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ব্যবসায়িক সহযোগীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিদ্যুৎ খাত, তার ও যোগাযোগ খাতসহ বিভিন্ন মেগা প্রজেক্টে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে খাম্বা লিমিটেডের মাধ্যমে দেশজুড়ে বিদ্যুতের খুঁটি বসানোর নামে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগটি সে সময় জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও সে সময় হাওয়া ভবন কেন্দ্রিক আর্থিক কেলেঙ্কারির নানা তথ্য উঠে আসে, যা তাঁর ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
৪. ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলা ও রাষ্ট্রীয় মদদের অভিযোগ
তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার ও বিতর্কিত অধ্যায়টি ঘটে ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট। ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় অভিযোগ ওঠে যে, এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও হামলাকারীদের নেপথ্য আশ্রয়দাতা ছিলেন তারেক রহমান এবং হাওয়া ভবনেই এই হামলার চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি হয়েছিল। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে চরম সহিংসতা ও দুই দলের মধ্যকার স্থায়ী শত্রুতার দেয়াল তুলে দেয়।
৫. ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়
২০০১-২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার ফলে বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন ও সিভিল আমলাতন্ত্রে দলীয়করণের যে নতুন মাত্রা যোগ হয়, তার পেছনে তারেক রহমানের প্রভাব বলয়কে দায়ী করা হয়। যোগ্যতার চেয়ে চাটুকারিতা ও হাওয়া ভবনের প্রতি আনুগত্যই পদোন্নতির মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। ভিন্নমত দমন ও গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণের কারণে এই শাসনামলটি সাধারণ নাগরিক সমাজের কাছে একটি ভয়ের রাজত্ব হিসেবে সমালোচিত হয়, যা পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ১/১১-এর জরুরি অবস্থা জারির প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।
দীর্ঘ নির্বাসন: রাজনীতি পরিচালনার এক ভিন্ন অধ্যায়

তারেক রহমানের নির্বাসন: রাজনীতি পরিচালনার এক ভিন্ন অধ্যায় শিরোনামটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত অধ্যায়কে নির্দেশ করে। ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেপ্তার ও কারাবরণের পর, ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে (লন্ডন) পাড়ি জমান। এরপর থেকে দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাসে বা স্বনির্বাসিত জীবনে থেকেও দূর নিয়ন্ত্রিত উপায়ে প্রযুক্তির সহায়তায় দল পরিচালনা করে তিনি এক নতুন ধারার রাজনীতি গড়ে তোলেন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায় এবং ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা তথা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই দীর্ঘ নির্বাসনের দিনগুলো এবং রাজনীতি পরিচালনার ভিন্নধর্মী কৌশলগুলোর মূল দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
১. নির্বাসনের পটভূমি ও দলের নেতৃত্ব গ্রহণ
- লন্ডনে অবস্থান (২০০৮-২০২৫): ২০০৮ সালে দেশ ছাড়ার পর দীর্ঘ সময় তিনি লন্ডনে অবস্থান করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও সাজা দেওয়া হয়, যা বিএনপি সবসময় “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে দাবি করে এসেছে।
- ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব (২০১৮): ২০১৮ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ হওয়ার পর, তারেক রহমান লন্ডন থেকেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন।
২. ভার্চুয়াল যুগে দূর নিয়ন্ত্রিত রাজনীতি (Remote Politics)
- প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার: সশরীরে উপস্থিত না থেকেও ভিডিও কনফারেন্স, জুম মিটিং এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটি থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন।
- দলীয় শৃঙ্খলা ও পুনর্গঠন: নির্বাসনে থাকা অবস্থাতেই তিনি বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন, নতুন কমিটি গঠন এবং দেশব্যাপী বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের দিকনির্দেশনা প্রবাস থেকেই নিখুঁতভাবে পরিচালনা করেন।
৩. আন্তর্জাতিক জনমত ও কূটনৈতিক তৎপরতা
- কূটনৈতিক যোগাযোগ: লন্ডনে অবস্থানকালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট মেম্বার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
- নতুন রাজনৈতিক বার্তা: প্রবাসে থাকাকালীন সময়ে তিনি বিএনপির ভাবমূর্তি উন্নয়নে কাজ করেন এবং প্রতিহিংসার রাজনীতির বাইরে এসে “রাষ্ট্র সংস্কার” ও “জনগণের অধিকারের” ওপর জোর দেন।
৪. ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ও ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ
- স্বদেশ প্রত্যাবর্তন (ডিসেম্বর ২০২৫): ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো বাতিল বা প্রত্যাহার করা হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ২৫শে ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে তিনি বীরের বেশে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
- ২০২৬-এর নির্বাচন ও প্রধানমন্ত্রিত্ব: ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। দীর্ঘ নির্বাসন এবং বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
প্রত্যাবর্তন, দলীয় নেতৃত্ব ও ক্ষমতার পথে

তারেক রহমানের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন, দলীয় নেতৃত্বের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতা আরোহণের ঘটনাটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস বা নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে তিনি কেবল দেশে ফিরে আসেননি, বরং অত্যন্ত সফলভাবে দলের নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছেন এবং নিজে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
তারেক রহমানের নির্বাসন থেকে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর এই যাত্রাপথকে মূলত নিচের ৪টি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
১. নির্বাসন থেকে ভার্চুয়াল রাজনীতি ও দলীয় পুনর্গঠন
- ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব: ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে (লন্ডন) যাওয়ার পর থেকে তিনি প্রবাসে ছিলেন। ২০১৮ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ হলে তিনি দলের ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ হিসেবে মূল দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।
- দূর নিয়ন্ত্রিত বা ভার্চুয়াল রাজনীতি (Remote Politics): আট হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থান করেও তিনি প্রযুক্তির (জুম, ভিডিও কনফারেন্স) সর্বোচ্চ ব্যবহার করে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের সাথে সরাসরি যুক্ত হন। এই দীর্ঘ সময়ে দলের ভাঙন রোধ করা এবং দলীয় শৃঙ্খলা কঠোরভাবে বজায় রাখা তাঁর দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়।
- জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা: ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসে থেকেই তিনি আন্দোলনকে বেগবান করতে এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতন নিশ্চিত করতে তাঁর দলীয় নেতাকর্মীদের দিকনির্দেশনা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন
২. রাজসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও দলের পূর্ণ নেতৃত্ব গ্রহণ
- ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন (২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫): ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর উচ্চ আদালত কর্তৃক বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলা থেকে খালাস পাওয়ার পর, ২০২৫ সালের ২৫শে ডিসেম্বর তারেক রহমান তাঁর পরিবারসহ বীরের বেশে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ঢাকার বিমানবন্দরসহ পুরো রাজধানীতে লাখ লাখ মানুষের ঢল তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে এক রাজসিক রূপ দেয়।
- চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ (৯ জানুয়ারি, ২০২৬): প্রবাসে থাকার সময় তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থাকলেও, মা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ২০২৬ সালের ৯ই জানুয়ারি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে তারেক রহমানকে দলটির পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করে।
৩. ২০২৬ সালের নির্বাচন ও অভূতপূর্ব বিজয়
- নির্বাচনী প্রচারণা ও ‘৩১ দফা রূপরেখা’: দেশে ফেরার পরপরই তারেক রহমান নির্বাচনের প্রস্তুতিতে মনোযোগ দেন। তিনি রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য তাঁর দলের বিখ্যাত ‘৩১ দফা রূপরেখা’ এবং ‘We Have a Plan’ স্লোগানের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম (Gen-Z) ও সাধারণ মানুষের কাছে একটি আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতির বার্তা পৌঁছে দেন।
- ভূমিধস বিজয়: ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমান বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ দুটি আসন থেকেই বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন (পরবর্তীতে তিনি বগুড়া-৬ আসনটি ছেড়ে দেন)। তাঁর জাদুকরী নেতৃত্বে বিএনপি এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দীর্ঘ ২০ বছর পর আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে।
৪. প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ও ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ
- প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ (১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬): নির্বাচন জয়ের পর ২০২৬ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে চলা দুই নারী নেত্রীর (খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা) পালাক্রমিক শাসনের অবসান ঘটে এবং এক নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা হয়।
২০২৬ সালের নির্বাচন ও প্রধানমন্ত্রীর আসনে আরোহণ

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়, এবং পরের দিন নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার মধ্য দিয়ে ১৩তম জাতীয় সংসদ গঠিত হয়। নির্বাচনের পূর্বে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণেও তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী পদের শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। নির্বাচনের ফলাফলের পাঁচ দিন পর, ১৭ ফেব্রুয়ারি, তিনি বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান, এবং তাঁর সঙ্গে মন্ত্রিসভার আরও ৩০ জন সদস্যও শপথ নেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই শপথ অনুষ্ঠান বঙ্গভবনের অভ্যন্তরে নয়, বরং জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জনগণের সামনে উন্মুক্তভাবে অনুষ্ঠিত হয়—যা প্রতীকীভাবে এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বার্তা দেয় বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট: ২০২৬ সালে তারেক রহমানের সরকার

শপথ গ্রহণের পর তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা—বাংলাদেশের ২৪তম মন্ত্রিসভা—দ্রুত দপ্তর বণ্টন সম্পন্ন করে কার্যক্রম শুরু করে, যেখানে ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পান। ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে কোনো পুরুষ ব্যক্তি সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেন, যা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তিনি টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্বের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন, যা আন্তর্জাতিক পরিসরে তাঁর অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে।
বিশ্লেষণ: এক পারিবারিক রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার প্রতিফলন
তারেক রহমানের দীর্ঘ নির্বাসন, ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, এবং ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ কেবলই কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য “পারিবারিক রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা” বা বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের এক ধ্রুপদী প্রতিফলন।
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের মূল রাজনৈতিক ধারাটি দুটি প্রধান পরিবারের সমান্তরাল উত্তরাধিকারের ওপর ভিত্তি করে আবর্তিত হয়েছে। তারেক রহমানের বর্তমান অবস্থানকে তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার আলোকেই নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী দর্শনের উত্তরাধিকার
- দলীয় ভিত্তি ও জাতীয়তাবাদ: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান। তাঁর রাজনীতিতে আগমন এবং ক্ষমতা আরোহণের মূল চালিকাশক্তি ছিল তাঁর বাবার তৈরি করা “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ”-এর আদর্শ ও এর বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী।
- তৃণমূল সংযোগের অনুকরণ: শহীদ জিয়া যেভাবে গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে তৃণমূলের মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন করেছিলেন, তারেক রহমানও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে (বিশেষ করে ২০০১-২০০৬ মেয়াদে) দেশব্যাপী “তৃণমূল সম্মেলন” এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে বাবার সেই রাজনীতির মডেল পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন।
২. খালেদা জিয়ার আপসহীন সংগ্রামের উত্তরাধিকার
- সংকটকালে দলের হাল ধরা: ঠিক যেভাবে ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর এক চরম সংকটময় মুহূর্তে বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে এসে দলের ভাঙন রোধ করেছিলেন, একইভাবে ২০১৮ সালে খালেদা জিয়ার কারাবরণের পর প্রবাসে থাকা অবস্থাতেই তারেক রহমান বিএনপির ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ হিসেবে দলের হাল ধরেন।
- প্রতীকী নেতৃত্ব ও আবেগীয় সংযোগ: বাংলাদেশের রাজনীতিতে “জিয়া পরিবার” সমর্থকদের কাছে এক বিশাল আবেগের নাম। বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ অসুস্থতা ও প্রয়াণের পর তারেক রহমানের মধ্যে সমর্থকেরা সেই একই আপসহীন ও অবিচল নেতৃত্বের ছায়া খুঁজে পেয়েছে, যা দলটিকে কঠিন পরিস্থিতিতেও ঐক্যবদ্ধ রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
৩. ধারাবাহিকতার সমান্তরালে আধুনিকায়ন (Evolution)
পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখলেও তারেক রহমানের রাজনীতি পরিচালনার কৌশল ছিল সম্পূর্ণ আধুনিক ও ভিন্নধর্মী:
- ভার্চুয়াল ও দূর নিয়ন্ত্রিত রাজনীতি: প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে তিনি দীর্ঘ ১৭ বছর সুদূর লন্ডন থেকে আধুনিক প্রযুক্তির (জুম, স্কাইপ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম) সাহায্যে দল পরিচালনা করেছেন—যা পারিবারিক ধারাবাহিকতার ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা।
- তরুণ প্রজন্মের সাথে সংযোগ: ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি প্রথাগত প্রতিহিংসার রাজনীতির বাইরে এসে ‘রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা’ এবং নতুন ভিশনের কথা বলে নতুন প্রজন্মের (Gen-Z) আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করার চেষ্টা করেছেন।
৪. দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির সাধারণ সমীকরণ
- নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা ও উত্তরাধিকার: নেহেরু-গান্ধী পরিবার (ভারত), ভুট্টো পরিবার (পাকিস্তান) কিংবা শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের (বাংলাদেশ) মতোই তারেক রহমানের এই ক্ষমতায় আরোহণ প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের একতাবদ্ধ রাখার জন্য একটি সুপরিচিত “পারিবারিক মুখ বা প্রতীক” এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
উপসংহার:
তারেক রহমানের ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো মূলত শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক আদর্শ, বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন ভাবমূর্তি এবং তারেক রহমানের নিজস্ব আধুনিক কৌশলগত দূরদর্শিতার এক ত্রিমাত্রিক সমন্বয়। এটি প্রমাণ করে যে, সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে রাজনীতির কৌশল বদলালেও, পারিবারিক লিগ্যাসি বা ধারাবাহিকতা এখনও বাংলাদেশের ক্ষমতার পট পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান মেরুদণ্ড।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): ইতিহাস, বাঙালি সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আন্দোলন
- প্রকাশের তারিখ: ১২ অক্টোবর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): ১৯৬৫ সালের যুদ্ধভিত্তিক ঐতিহাসিক দলিল, খাজা শাহাবুদ্দীনের বেতার নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত ঘোষণা, এবং বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রামাণ্য ইতিহাস।
বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াই এবং রাজনৈতিক মুক্তির ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অবিচ্ছেদ্য প্রেরণার নাম। বিশেষ করে পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭-১৯৭১) যখনই বাঙালির জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আগ্রাসনের “কালো মেঘ” ঘনিয়ে এসেছে, তখনই রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছিলেন প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।
সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সেই লড়াইয়ে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা ও প্রাসঙ্গিকতার মূল দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানে। তারা বাঙালি সংস্কৃতিকে “ইসলাম-বিরোধী” বা “ভারতীয় সংস্কৃতি” হিসেবে তকমা দিয়ে তা মুছে ফেলার চেষ্টা করে। এই কৃত্রিম সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রসাহিত্য ও রবীন্দ্রসংগীত বাঙালির জন্য আত্মপরিচয় রক্ষার ঢাল হিসেবে কাজ করেছিল।
২. রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও বুদ্ধিজীবীদের লড়াই
১৯৬১ সালে বিশ্বকবির জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে পাকিস্তানি সরকার নানা বাধা সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে বাঙালি তাদের সংস্কৃতির ওপর সরাসরি চরম আঘাত হিসেবে গণ্য করে।
- এর প্রতিবাদে তৎকালীন পূর্ব বাংলার কবি, লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
- ছায়ানটের মতো সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন ও রবীন্দ্রসংগীতের চর্চাকে আন্দোলনের রূপ দেয়।
- এই লড়াইটি কেবল গান গাওয়ার অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছিল পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ সংগ্রাম।
৩. রাজনৈতিক আন্দোলনে রবীন্দ্রচেতনা
রাজনৈতিক শোষণের কালো মেঘ যখনই পূর্ব বাংলার আকাশকে গ্রাস করতে চেয়েছিল, তখনই রবীন্দ্রসংগীত বাঙালির মুক্তিকামী চেতনাকে উজ্জীবিত করেছে।
- ছয় দফা ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান: ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি জনসভায় রবীন্দ্রসংগীতের পরিবেশনা ছিল নিয়মিত ঘটনা।
- জাতীয় সংগীতের রূপরেখা: ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গানটি গেয়ে বাঙালি তাদের স্বাধীন সত্তার জানান দেয়, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্থান পায়।
৪. অন্ধত্ব ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে আলোকবর্তিকা
রবীন্দ্রনাথের দর্শন তার ভাল দিক কি কি ?
রবীন্দ্রনাথের দর্শন ছিল মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। পাকিস্তানি শাসকেরা যখন ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে বাঙালিদের বিভক্ত করতে চেয়েছিল, তখন রবীন্দ্র রচনাবলী বাঙালিকে শিখিয়েছে কীভাবে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে উদার ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন করতে হয়।

সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াই ও রাজনৈতিক মুক্তি অর্জনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দর্শন ও তার সৃষ্টির ইতিবাচক বা ভালো দিকগুলো ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। বাঙালির চেতনা গঠনে তার চিন্তাধারার প্রধান ভালো দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- অসাম্প্রদায়িক চেতনা: রবীন্দ্রনাথের পুরো দর্শনই ছিল মানুষের জয়গানে মুখর। তিনি ধর্ম, বর্ণ বা জাতির সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। পাকিস্তানি শাসকেরা যখন ধর্মকে পুঁজি করে বিভেদ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, তখন তাঁর এই অসাম্প্রদায়িক চিন্তা বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সাহায্য করেছে।
- মানবিক মূল্যবোধ ও উদারতা: তাঁর সাহিত্য ও কবিতা মানুষকে কূপমণ্ডূকতা, অন্ধত্ব এবং কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে উদার হতে অনুপ্রাণিত করে। এটি সমাজের গোঁড়ামি দূর করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
- ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অহংকার: রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাকে বিশ্বদরবারে এক অনন্য মর্যাদায় আসীন করেছেন। তাঁর সমৃদ্ধ সাহিত্যকর্মের কারণেই বাঙালি নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করার সাহস এবং শক্তি পেয়েছিল।
- প্রতিরোধের মানসিকতা: তাঁর গান ও কবিতা (যেমন: “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে” বা “সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান”) যেকোনো অন্যায়, শোষণ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এবং প্রতিবাদ করার সাহস জোগায়।
- প্রকৃতি ও স্বদেশের প্রতি নিখাদ প্রেম: তাঁর প্রতিটি দেশাত্মবোধক গান মানুষের মনে দেশের মাটির প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং দায়বদ্ধতা তৈরি করে, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দেশের মানুষের জন্য চরম আত্মত্যাগের মূল অনুপ্রেরণা ছিল।
রবীন্দ্রনাথের নেতিবাচক প্রচার ও সমালোচনার দিকগুলো
রবীন্দ্রনাথের চিন্তা, সাহিত্য এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদে তাঁর প্রভাবের কোনো বস্তুগত বা নৈতিক “খারাপ দিক” ছিল না। তবে, পাকিস্তান আমলের শাসকগোষ্ঠী ও কট্টরপন্থী মহল রবীন্দ্রচর্চাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিল এবং রবীন্দ্রচেতনার অতি-ব্যবহার নিয়ে পরবর্তী সময়ে কিছু সমাজতাত্ত্বিক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

সেই নেতিবাচক প্রচার ও সমালোচনার দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- পাকিস্তান সরকারের চোখে “ভারতের সাংস্কৃতিক আধিপত্য”: পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এবং তৎকালীন কট্টরপন্থী বুদ্ধিজীবীরা রবীন্দ্রনাথকে একজন “অমুসলিম এবং ভারতীয় কবি” হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, রবীন্দ্রচর্চার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানরা তাদের ইসলামী সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং ভারতের সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে মেনে নিচ্ছে।
- বাঙালি সংস্কৃতির বুর্জোয়া বা উচ্চবিত্ত রূপায়ণ: সমাজতাত্ত্বিক ও বামপন্থী সমালোচকদের একাংশের মতে, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও দর্শন মূলত জোড়াসাঁকোর জমিদার পরিবারের জমিদারি আমেজ এবং উচ্চবিত্ত (বুর্জোয়া) শ্রেণির জীবনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। ফলে পাকিস্তানি আমলে রবীন্দ্রচর্চাকে যখন বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান প্রতীক করা হয়, তখন তা সাধারণ খেটে খাওয়া গ্রামীণ মানুষের সংস্কৃতির চেয়ে শহুরে উচ্চ-মধ্যবিত্তের সংস্কৃতিকেই বেশি প্রতিনিধিত্ব করেছিল।
- অন্যান্য দেশীয় উপাদান উপেক্ষিত হওয়ার বিতর্ক: স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, বাঙালির সাংস্কৃতিক মুক্তির লড়াইয়ে রবীন্দ্রনাথের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীলতার কারণে বাংলার নিজস্ব লোকসংস্কৃতি (যেমন: লালন, হাসন রাজা বা গ্রামীণ লোকগান) এবং কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী ও গণমুখী চেতনা সাময়িকভাবে কিছুটা কম গুরুত্ব পেয়েছিল।
সংক্ষেপে, রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় কোনো ত্রুটি ছিল না; বরং তাঁর সৃষ্টিকে তৎকালীন পাকিস্তানি রাজনীতি যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছিল এবং পরবর্তীকালে রবীন্দ্রচর্চাকে যেভাবে শ্রেণি-স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে, সমালোচনাগুলো মূলত সেই চর্চাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত।
পাকিস্তান আমলে খাজা শাহাবুদ্দিনের রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধের যুক্তিগুলো
১৯৬৭ সালের ২২ জুন পাকিস্তানের তৎকালীন তথ্য ও বেতার মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন জাতীয় পরিষদে বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধের ঘোষণা দেন । এই সিদ্ধান্তের পেছনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের কট্টরপন্থী তল্পিবাহকদের প্রধান যুক্তিগুলো ছিল মূলত রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি ।
তাদের উত্থাপিত প্রধান যুক্তিগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- “পাকিস্তানের আদর্শের” পরিপন্থী: খাজা শাহাবুদ্দিনের মূল আনুষ্ঠানিক যুক্তি ছিল যে, রবীন্দ্রনাথের গান ও সৃষ্টি “পাকিস্তানি আদর্শের” (Ideology of Pakistan) সাথে খাপ খায় না । তিনি দাবি করেছিলেন, রেডিও-টেলিভিশনে এমন কোনো কিছু প্রচার করা যাবে না যা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শ ও সাংস্কৃতিক মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করে।
- রবীন্দ্রনাথ আমাদের সংস্কৃতির অংশ নন: জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে খাজা শাহাবুদ্দিন সরাসরি মন্তব্য করেছিলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির কেউ নন” । তাঁর যুক্তি ছিল, যেহেতু রবীন্দ্রনাথ একজন অমুসলিম এবং তাঁর জীবন ও কর্মের মূল ভিত্তি ছিল অবিভক্ত ভারত (বিশেষ করে হিন্দু সংস্কৃতি-ঘেঁষা), তাই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তানের জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে তাকে গণ্য করা যায় না ।
- “মুসলিম তমদ্দুন” বা ইসলামী সংস্কৃতির অবমাননা: সরকারের পক্ষ থেকে এবং তাদের সমর্থক কট্টরপন্থী বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, রবীন্দ্রসংগীতের ভাষা, সুর ও ধারণা পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম ঐতিহ্য বা “মুসলিম তমদ্দুনকে” অবজ্ঞা করে । তাদের মতে, রবীন্দ্রচর্চা বজায় রাখার অর্থ হলো পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া।
- ভারতের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও রাজনৈতিক প্রচার: ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর এই রবীন্দ্র-বিরোধী মনোভাব আরও চরম আকার ধারণ করে । পাকিস্তানি শাসকদের যুক্তি ছিল, পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীতের জনপ্রিয়তা আসলে ভারতের মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যেরই অংশ। তারা দাবি করেছিল, রবীন্দ্রচর্চাকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচারণা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে
বাঙালির প্রতিক্রিয়া:
খাজা শাহাবুদ্দিনের এই সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক যুক্তিগুলোকে বাঙালি বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন । তৎকালীন পূর্ব বাংলার শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদলিপি প্রকাশ করেন এবং ছায়ানটের মতো সংগঠনগুলোর মাধ্যমে রবীন্দ্রসংগীতকে পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে প্রধান সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রতীক বানিয়ে তোলেন
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): বিজ্ঞানের ইতিহাস, দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব
- প্রকাশের তারিখ: ১১ অক্টোবর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): Stanford Encyclopedia of Philosophy, Nobel Prize Archives, এবং Isaac Newton’s Theological Manuscripts.
সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের ধর্মীয়, ঈশ্বরসংক্রান্ত ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাস নিয়ে ইতিহাসবিদ, বিজ্ঞান লেখক এবং গবেষকদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে ব্যাপক আলোচনা ও গবেষণা চলমান। অনেক বিজ্ঞানী তাঁদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ডায়েরি বা ব্যক্তিগত চিঠিপত্রে লিপিবদ্ধ করেছেন, যা পরবর্তীতে তাঁদের মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস কেবল “আস্তিক” বা “নাস্তিক”—এই দুটি সরলরেখায় সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা প্রথাগত ঈশ্বরে বিশ্বাস (Theism/Deism), সর্বেশ্বরবাদ (Pantheism/Spinoza’s God), এবং সংশয়বাদ (Agnosticism)-এর মতো বহুমাত্রিক দর্শনে বিভক্ত ছিল।
১. প্রথাগত ঈশ্বরে বিশ্বাসী ও প্রজ্ঞাবান দেউইস্ট (Theist / Deist)
সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানীদের একটি বিশাল অংশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে মহাবিশ্বের সুনির্দিষ্ট গাণিতিক নিয়ম ও সুশৃঙ্খল নকশার পেছনে একজন স্রষ্টা বা প্রজ্ঞাবান সত্তা বিদ্যমান:
স্যার আইজ্যাক নিউটন (Sir Isaac Newton)

- স্যার আইজ্যাক নিউটন (Sir Isaac Newton):স্যার আইজ্যাক নিউটনের জীবনের এই দিকটি সত্যিই অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। আমরা তাকে আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী হিসেবে জানলেও, ঐতিহাসিক তথ্য ও তাঁর নিজস্ব পাণ্ডুলিপি প্রমাণ করে যে তিনি বিজ্ঞানের চেয়ে ধর্মতত্ত্ব, বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী এবং অ্যালকেমি (Alchemy) চর্চায় অনেক বেশি সময় ব্যয় করেছিলেন। নিউটন এবং তাঁর এই ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও চমৎকার তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
- বিপুল পরিমাণ ধর্মীয় লেখা: নিউটন জীবদ্দশায় যত পৃষ্ঠা লিখেছেন, তার সিংহভাগই ছিল ধর্মতত্ত্ব ও বাইবেলের ব্যাখ্যার ওপর। আনুমানিক হিসাবে, তিনি বিজ্ঞানের চেয়ে ধর্ম বিষয়ে প্রায় কয়েক গুণ বেশি (প্রায় ৩০ লক্ষ শব্দ) লিখে গেছেন।
- ধর্মকে বিজ্ঞানের পরিপূরক ভাবা: নিউটনের কাছে বিজ্ঞান এবং ধর্ম আলাদা কোনো বিষয় ছিল না। তিনি মনে করতেন, মহাবিশ্বের প্রাকৃতিক নিয়মগুলো (যেমন অভিকর্ষ বা গতির সূত্র) আবিষ্কার করার অর্থ হলো ঈশ্বরের তৈরি করা নকশাকে আরও ভালোভাবে অনুধাবন করা।
- মহাবিশ্বের সুশৃঙ্খলতা (Order of the Universe): আপনার উল্লেখ করা Principia গ্রন্থের উক্তিটি নিউটনের মূল দর্শনকে প্রকাশ করে। তিনি মনে করতেন, গ্রহগুলোর নিখুঁত কক্ষপথ এবং মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা কোনো দুর্ঘটনা হতে পারে না; এর পেছনে একজন ‘মহাজাগতিক স্থপতি’ (Divine Architect) রয়েছেন।
- পৃথিবীর ধ্বংসের সময় গণনা: বাইবেলের বুক অব ড্যানিয়েল (Book of Daniel) এবং বুক অব রেভেলেশন (Book of Revelation) গভীরভাবে অধ্যয়ন করে নিউটন একটি হিসাব করেছিলেন। তাঁর গণনা অনুযায়ী, ২০৬০ সালের আগে এই পৃথিবী ধ্বংস বা বড় কোনো পরিবর্তনের মুখোমুখি হবে না। অবশ্য তিনি এটি ভবিষ্যৎবাণী হিসেবে নয়, বরং উগ্র ভবিষ্যৎবাণীকারীদের ভুল প্রমাণ করার জন্য হিসাব করেছিলেন।
- নিউটনের এই গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্বাসই তাকে প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনে অনুপ্রাণিত করেছিল। বিজ্ঞান জগতের আরেক মহানায়ক আলবার্ট আইনস্টাইনও নিউটনের এই চিন্তাধারার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন।
গ্যালিলিও গ্যালিলি ও জোহানেস কেপলার:

- গ্যালিলিও গ্যালিলি ও জোহানেস কেপলার:গ্যালিলিও গ্যালিলি এবং জোহানেস কেপলার—উভয়েই আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং তারা দুজনেই বিজ্ঞান চর্চাকে ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখতেন।
- এই দুই মহান বিজ্ঞানীর আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক দর্শনের মূল দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
- গ্যালিলিও গ্যালিলি এবং ঈশ্বরের ‘দুই গ্রন্থ’ দর্শন
- গ্যালিলিও চার্চের সাথে দ্বন্দ্বে জড়ালেও (সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বের কারণে), তিনি নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস কখনো হারাননি।
- প্রকৃতি ও বাইবেল: গ্যালিলিও একটি বিখ্যাত তত্ত্ব দিয়েছিলেন যে, ঈশ্বর মানুষের জন্য দুটি বই লিখেছেন—একটি হলো পবিত্র বাইবেল (The Book of Scripture) এবং অন্যটি হলো প্রকৃতি (The Book of Nature)। তিনি বলতেন, বাইবেল লেখা হয়েছে রূপক ভাষায় যাতে সাধারণ মানুষ নৈতিক পথ খুঁজে পায়, আর প্রকৃতি লেখা হয়েছে গণিতের ভাষায়। দুটিই যেহেতু একই ঈশ্বরের সৃষ্টি, তাই সত্যিকারের বিজ্ঞান এবং সত্যিকারের ধর্ম কখনো একে অপরের বিরোধী হতে পারে না।
- একটি বিখ্যাত উক্তি: গ্যালিলিও লিখেছিলেন, “আমি এটা বিশ্বাস করতে বাধ্য নই যে, যে ঈশ্বর আমাদের ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি ও বিবেক দিয়েছেন, তিনি আমাদের এগুলোর ব্যবহার বন্ধ রাখতে বলেছেন।”
- জোহানেস কেপলার এবং ‘ঈশ্বরের চিন্তা’
- কেপলার প্রথমে ধর্মতত্ত্ব (Theology) নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন এবং যাজক হতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানে আসেন, তবে তার উদ্দেশ্য ছিল আধ্যাত্মিক।
- মহাজাগতিক জ্যামিতি: কেপলার বিশ্বাস করতেন যে ঈশ্বর একজন মহান জ্যামিতিক কারিগর। তিনি যখন গ্রহের গতি সম্পর্কিত তিনটি বিখ্যাত সূত্র আবিষ্কার করেন, তখন তিনি আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে লিখেছিলেন যে, তিনি মূলত “ঈশ্বরের চিন্তাকে তাঁর পেছনে পেছনে পুনরায় ভাবছেন” (Thinking God’s thoughts after Him)।
- উপাসনা হিসেবে বিজ্ঞান: কেপলার বিজ্ঞান চর্চাকে ঈশ্বরের এক ধরণের উপাসনা বা আরাধনা মনে করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মহাবিশ্বের গাণিতিক সামঞ্জস্য আবিষ্কার করার মাধ্যমে মানুষ ঈশ্বরের বুদ্ধিমত্তার সরাসরি প্রমাণ পায়।
- এই দুই বিজ্ঞানীর জীবন ও দর্শন প্রমাণ করে যে, সপ্তদশ শতকের বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূচনা নাস্তিকতা থেকে হয়নি, বরং সৃষ্টিজগতের সুশৃঙ্খল নিয়মগুলোর পেছনে একজন বুদ্ধিমান সৃষ্টিকর্তাকে খোঁজার গভীর আগ্রহ থেকে হয়েছিল।
ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ও ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ:

- ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ও ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ: ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক এবং ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ-এর বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার মধ্যকার গভীর সম্পর্কের দর্শনের শ্রেষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। পদার্থের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরমাণু জগত নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তারা দুজনেই প্রকৃতির এমন এক সুশৃঙ্খল নকশা ও রহস্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যা তাদের মহাবিশ্বের পেছনে একটি উচ্চতর চেতনার অস্তিত্ব বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছিল।
- এই দুই নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানীর চিন্তাধারাকে সংক্ষেপে এভাবে বিশ্লেষণ করা যায়:
- ১. ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক (Max Planck): বিজ্ঞান ও ধর্মের পরিপূরকতা
- ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক বিশ্বাস করতেন যে বিজ্ঞান ও ধর্ম একে অপরের শত্রু নয়, বরং তারা একই সত্যকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার দুটি মাধ্যম।
- যুক্তি ও বিশ্বাস: তাঁর মতে, বিজ্ঞান মানুষকে বস্তুগত জগতের কার্যকারণ বুঝতে সাহায্য করে (যার প্রতীক হলো ‘যুক্তি’), আর ধর্ম মানুষকে জীবনের নৈতিক দিক ও মূল্যবোধ শেখায় (যার প্রতীক হলো ‘বিশ্বাস’)।
- একটি বিখ্যাত দর্শন: ১৯৩৭ সালে তাঁর এক বিখ্যাত বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, “উভয় বিজ্ঞান এবং ধর্মের জন্য ঈশ্বরের অস্তিত্বই সমস্ত চিন্তার সূচনা।” তিনি মনে করতেন, পদার্থের গভীরে এমন কোনো স্বাধীন শক্তি নেই, বরং সমস্ত ম্যাটার বা পদার্থের পেছনে একটি সচেতন ও বুদ্ধিমান মনের (Conscious and Intelligent Mind) অস্তিত্ব রয়েছে।
- ২. ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ (Werner Heisenberg): পাত্রের তলায় ঈশ্বরের অপেক্ষা
- হাইজেনবার্গের এই উক্তিটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় ও গভীর ভাবার্থপূর্ণ একটি উক্তি। এর পেছনের মূল ভাবটি হলো:
- অল্প বিদ্যার ফাঁদ: একজন মানুষ যখন বিজ্ঞান পড়া শুরু করে এবং প্রকৃতির ওপরের স্তরের কিছু নিয়ম (যেমন অভিকর্ষ বা রাসায়নিক বিক্রিয়া) শেখে, তখন তার মনে হতে পারে সবকিছুই যান্ত্রিক এবং এর জন্য কোনো সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন নেই। এটিই হলো বিজ্ঞানের পাত্র থেকে নেওয়া “প্রথম ঢোক”, যা মানুষকে সাময়িকভাবে নাস্তিক বা অহংকারী করে তুলতে পারে।
- গভীর সত্যের সন্ধান: কিন্তু সেই মানুষটিই যখন বিজ্ঞানের গভীরে প্রবেশ করে—যেমনটা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অনিশ্চয়তা তত্ত্ব (Uncertainty Principle) বা মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করতে গেলে হয়—তখন সে দেখে যে প্রকৃতির নিয়মগুলো কত নিখুঁত, গাণিতিক এবং রহস্যময়। বিজ্ঞানের সেই চূড়ান্ত গভীরতাই হলো “পাত্রের তলা”, যেখানে পৌঁছালে মানুষ প্রকৃতির এই মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তার সামনে নত হতে বাধ্য হয়।
- কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের এই দুই পথপ্রদর্শকের চিন্তাভাবনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিজ্ঞান যত আধুনিক ও সূক্ষ্ম হয়েছে, বিজ্ঞানীদের একাংশের মধ্যে মহাবিশ্বের পেছনের মূল চালিকাশক্তিকে জানার আধ্যাত্মিক আগ্রহ ততটাই তীব্র হয়েছে।
২. স্পিনোজার ঈশ্বর ও সার্বজনীন সুশৃঙ্খলা (Pantheism)
অনেকে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ঈশ্বর বা মানুষের রূপ দেওয়া স্রষ্টায় বিশ্বাস করতেন না, কিন্তু প্রকৃতির সুনির্দিষ্ট সৌন্দর্য ও ভৌত নিয়মকে ঈশ্বর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন:

[প্রথাগত ব্যক্তিগত ঈশ্বর প্রত্যাখ্যান] ➔ [মহাজাগতিক সুশৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণ] ➔ [প্রকৃতির নিয়মকেই ঈশ্বর মানা (Pantheism)]
- আলবার্ট আইনস্টাইন (Albert Einstein): আইনস্টাইন স্পষ্ট করেছিলেন যে তিনি কোনো ব্যক্তিগত প্রাতিষ্ঠানিক ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না যিনি মানুষের বিচার করেন। তিনি বলতেন, “আমি স্পিনোজার ঈশ্বরে বিশ্বাস করি, যিনি বিদ্যমান সকল বস্তুর সুশৃঙ্খল সামঞ্জস্যের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করেন।” তিনি মহাবিশ্বের গাণিতিক নিখুঁত ভাবকে এক ধরণের আধ্যাত্মিক বিস্ময় (Cosmic Religious Feeling) বলে মনে করতেন।
৩. সংশয়বাদী ও বিবর্তনীয় দৃষ্টিভঙ্গি (Agnostic / Skeptic)
কিছু বিজ্ঞানী প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সরাসরি নাস্তিক হওয়ার চেয়ে নিজেদের সংশয়বাদী (Agnostic) বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন:
| বিজ্ঞানী ও ক্ষেত্র | বিশ্বাসের ধরন | প্রধান বক্তব্য ও ঐতিহাসিক প্রমাণ |
| চার্লস ডারউইন (বিবর্তনবাদ) | সংশয়বাদী (Agnostic) | জীবনের শেষভাগে তিনি জানান যে তিনি কখনোই চরম নাস্তিক ছিলেন না; বরং মহাবিশ্বের উৎপত্তি মানুষের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে সম্পূর্ণ বোঝা অসম্ভব বলে নিজেকে ‘Agnostic’ মনে করতেন। |
| নিকোলা টেসলা (তড়িৎ প্রকৌশল) | বৈদিক ও বিশ্বজনীন চেতনা | টেসলা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অনুশাসন না মানলেও বৈদিক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন এবং পুরো মহাবিশ্বকে শক্তি, কম্পন ও স্পন্দনের এক মহান উৎস মনে করতেন। |
| মাদাম কুরি (তেজস্ক্রিয়তা) | ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদী | ব্যক্তিগত জীবনে পারিবারিক বিয়োগান্তক ঘটনার পর তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম থেকে দূরে সরে আসেন এবং বিজ্ঞান ও মানবসেবায় জীবন উৎসর্গ করেন। |
সংক্ষেপিত পর্যালোচনা
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, আধুনিক বিজ্ঞানের জন্ম ও বিকাশ ঘটেছে এমন বহু ভাবুকের হাত ধরে, যারা ঈশ্বর বা মহাজাগতিক চেতনায় গভীর আস্থাশীল ছিলেন। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস নিয়ে কট্টর কোনো একপেশে সিদ্ধান্ত টানার সুযোগ নেই; বরং সত্য অনুসন্ধান ও প্রকৃতিকে গভীরভাবে জানার ভালোবাসাই তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসে পৌঁছে দিয়েছিল।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): সুশাসন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সামাজিক বিশ্লেষণ
- প্রকাশেশনের তারিখ: ১১ অক্টোবর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD), পলিটিক্যাল সায়েন্স রিভিউ, এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ডাইনামিকস ডাটা।
রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন প্রণয়ন এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সরাসরি রাজনীতির মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই একজন সচেতন নাগরিকের জন্য রাজনীতি থেকে দূরে থাকা বা নির্লিপ্ত থাকা কার্যত নিজের জীবনযাত্রার নিয়ন্ত্রণ অন্য কারও হাতে সঁপে দেওয়ার শামিল।
১. একজন সচেতন নাগরিকের কেন রাজনীতি করা বা সচেতন হওয়া উচিত?

রাষ্ট্রের সকল কর্মকাণ্ড নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। তাই সচেতন নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকা অত্যন্ত জরুরি:
[নাগরিক সচেতনতা ও ভূমিকা] ➔ [সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ] ➔ [দুর্নীতি প্রতিরোধ] ➔ [মৌলিক অধিকার সুরক্ষা]
- দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব: আপনার প্রাত্যহিক জীবনের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিত্যপণ্যের বাজারদর, কর কাঠামো এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন সবকিছুই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল।
- গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতা শক্তিশালীকরণ: শিক্ষিত ও সৎ মানুষের নিষ্ক্রিয়তা মূলত অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করে। সচেতন নাগরিকদের অংশগ্রহণ সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনে।
- অধিকার আদায় ও অনিয়ম প্রতিরোধ: নিজের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা এবং প্রশাসনিক অনিয়ম রুখে দাঁড়াতে রাজনৈতিক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।
২. মানুষ কিছুটা বিত্তবান হলেই কেন রাজনীতিবিদ হতে চায়?

সমাজে অর্থ ও রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্ক বহুকাল ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে। বিত্তবান ব্যক্তিদের রাজনীতিতে আসার পেছনে কিছু বাস্তব ও বৈচিত্র্যময় কারণ কাজ করে:
| প্রধান দিক | নেপথ্য কারণ ও বাস্তব রূপরেখা |
| সামাজিক ক্ষমতা ও মর্যাদা | অর্থ মানুষকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিলেও সরাসরি প্রশাসনিক নীতি-নির্ধারণী ক্ষমতা দেয় না। বিত্তবানরা সমাজে শীর্ষ মর্যাদা ও ক্ষমতা পেতে রাজনৈতিক পদে আসেন। |
| সম্পদ সুরক্ষা ও ব্যবসার বিস্তার | রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নিজের ব্যবসা প্রসারিত করা, সরকারি ঠিকাদারি, বাণিজ্যিক লাইসেন্স পাওয়া এবং অর্জিত সম্পদ সুরক্ষিত রাখা সহজ হয়। |
| আইন ও নীতিতে প্রভাব | নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অনুকূলে কর নীতি ও আইন গঠনে ভূমিকা রাখতে ধনী ব্যক্তিরা আইনসভায় ঢুকতে চান। |
| ব্যয়বহুল নির্বাচনী ব্যবস্থা | বর্তমান যুগে নির্বাচন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় সাধারণ যোগ্য প্রার্থীর চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোও অর্থবিত্তসম্পন্ন প্রার্থীদের মনোনয়ন দিতে অগ্রাধিকার দেয়। |
| আইনি ‘রক্ষাকবচ’ | রাজনৈতিক পরিচয় বা পদবী অনেক সময় বাণিজ্যিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব খাটাতে এবং আইনি চাপ থেকে সুরক্ষা পেতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। |
৩. রাজনীতিতে সচেতন হতে কি কোনো রাজনৈতিক দল পছন্দ করা অত্যাবশ্যক?
একদমই নয়। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশ বা রাজনীতি নিয়ে সচেতন থাকার জন্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের লেবেল লাগানো বা কোনো দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রকাশ করা মোটেও প্রয়োজনীয় নয়।
প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা বিচার
পদ্ধতি ১
অন্ধভাবে দলীয় প্রতীক না দেখে প্রার্থীর ব্যক্তিগত সততা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, অতীত ভূমিকা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড দেখে ভোট প্রদান করা।
ইস্যু-ভিত্তিক সমর্থন ও সমালোচনা
পদ্ধতি ২
যেকোনো দলের ভালো নীতিকে (যেমন: পরিবেশ সুরক্ষা বা স্বাস্থ্য সংস্কার) সমর্থন করা এবং ক্ষতিকর সিদ্ধান্তের গঠনমূলক সমালোচনা করা।
সুশীল সমাজ ও নাগরিক আন্দোলন
পদ্ধতি ৩
দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকে সামাজিক সংগঠন বা মানবাধিকার সংস্থার মাধ্যমে সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করা।
স্বাধীন বা ফ্লোটিং ভোটারের ভূমিকা
পদ্ধতি ৪
কোনো দলের ক্যাডার বা অন্ধ সমর্থক না হয়ে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ রাখা। আধুনিক গণতন্ত্রে এই ‘ফ্লোটিং ভোটাররাই’ যেকোনো নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
সংক্ষেপিত পর্যালোচনা
রাজনীতি কোনো নির্দিষ্ট দলীয় কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্যের সাথে যুক্ত। কোনো দলের দাসত্ব না করেও কেবল সচেতন, নিরপেক্ষ ও সৎ নাগরিক হিসেবে নিজের ভোটাধিকার এবং গঠনমূলক মতামত প্রকাশ করাই হলো একটি উন্নত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান শক্তি।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



