ইতিহাস
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
“রাজা” উপাধি: দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় আকবর ১৮৩১ সালে ইংল্যান্ড গমনের সময় তাকে ‘রাজা’ উপাধি খানা প্রদান করেন।
রাজা রামমোহন রায় এর জীবনীঃ
‘সতীর সর্বস্ব পতি, সতী শুধু পতিময়, বিধাতার প্রেমরাজ্যে সতত সতীর জয়’। আনোয়ারা উপন্যাসে নজিবুর রহমানের উক্তিখানি বাঙালি পতিভক্ত নারীর মনে মুগ্ধতা ছড়াবে। কিন্তু আজ থেকে দুশত বছর আগে পতিভক্ত ও সতী প্রমাণের জন্য যে সহমরণ প্রথা প্রচলিত ছিল। তা শুনলে আজো গা শিউরে ওঠে নিশ্চয়ই। তবে একই সঙ্গে যে নামটি স্মৃতিপটে চিত্রায়িত হবে, সেটি রাজা রামমোহন রায়।
গুপ্ত যুগের পূর্ব থেকে চলে আসা কুসংস্কারাচ্ছন্ন সতীদাহ প্রথা বিলোপ হয় ১৯ শতকের গোড়ার দিকের শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়ের আন্দোলনে। হাজার বছরের চলে আসা চিতায় সহমরণ প্রথার সমূলে উত্পাটনই শুধু নয়, শিক্ষা ও ধর্ম সংস্কার, ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা, বাঙালির অধিকার আদায়, সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠাসহ উল্লেখযোগ্য কর্মযজ্ঞ তাকে দিয়েছে যুগ পরিবর্তনকারী মনীষীর খেতাব। ঊনবিংশ শতকের শুরুতে এসে বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনে পুনরায় যে নতুন জাগরণ সৃষ্টি হয়, তাকে বঙ্গীয় রেনেসাঁ বলা যেতে পারে। পেত্রার্ক ও বোকাচ্চিও যেমন ইতালির রেনেসাঁর অগ্রদূত ছিলেন, তেমনি রাজা রামমোহন রায় ছিলেন বঙ্গীয় বা ভারতীয় রেনেসাঁর পথিকৃত্।
নাম তার রাম মোহন, উপাধি রাজা, আর পারিবারিক পদবি রায়। তবে তিনি ‘রাজা রামমোহন রায়’ নামেই প্রসিদ্ধি পেয়েছেন। ১৭৭২, মতান্তরে ৭৪ সালের ২২ মে অধুনা পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার কৃষ্ণনগরের কাছে রাধানগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা রামাকান্ত রায়, মায়ের নাম তারিণী দেবী। দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় আকবর ১৮৩১ সালে ইংল্যান্ড গমনের সময় তাকে ‘রাজা’ উপাধি খানা প্রদান করেন। তিনি গুরুমশায়ের পাঠশালায় হাতেখড়ি নেন। পাটনাতে আরবি ও পারসি, এবং কাশিতে সংস্কৃত ভাষায় ব্যুত্পত্তি লাভ করেন। বহুভাষার জ্ঞান নিঃসন্দেহে তাকে ভাষাবিদের তকমাটাও জুড়ে দেয়। রাজা রামমোহন রায় সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, ইংরেজি ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জনের পাশাপাশি হিব্রু, গ্রিক, সিরীয় প্রভৃতি ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করেন।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু হয়। এবং বিভিন্ন দায়িত্বপূর্ণ পদে উন্নীত হন। ১৮০৫ থেকে ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি রংপুর কালেক্টরেটে জেলা কালেক্টর মি. ডিগবির অধীনে দেওয়ানের কাজ করেন। এক পর্যায়ে রংপুরের কালেক্টরেটও হয়েছিলেন।
ইসলাম খ্রিস্ট ও বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান ছিল। রামমোহনের প্রথম দিকের রচনাগুলো ছিল আরবি ও ফারসি ভাষায়। বিভিন্ন ধর্মের আলোচনায় পরিপূর্ণ তাঁর প্রথম গবেষণামূলক গ্রন্থটি হলো ‘মানযারাতুল আদিয়ান’ এটি কখনো ছাপা হয়নি ও পরে হারিয়ে গেছে।
আরবি ভাষায় শিরোনাম ও মুখবন্ধসংবলিত ফারসি ভাষায় লিখিত তাঁর গবেষণামূলক আরেকটি গ্রন্থ হলো ‘তুহফাত-উল-মুওয়াহিহদীন’-এ গ্রন্থটিতে রামমোহন ঘোষণা করেন যে, ‘কোনো রকম পার্থক্য ব্যতিরেকে সকল ধর্মেই সচরাচর কিছু ভ্রান্ত মত চর্চা পরিদৃষ্ট হয়।’ এবং মত পোষণ করেন যে, কোন প্রেরিত পুরুষ, ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও প্রত্যাদেশের সাহায্য ছাড়াই নিজস্ব কর্মক্ষমতার মাধ্যমে সর্বজনীন সর্বোত্কৃষ্ট সত্তাকে অনুধাবন করা সম্ভব।
গ্রন্থটি ১৮০৩-০৪ সালে মুর্শিদাবাদে প্রকাশিত হয়। তখন তিনি মুর্শিদাবাদে বাস করতেন। গ্রন্থটিতে মূলত একেশ্বরবাদের কথা প্রাধান্য পেয়েছে। তুহফাত প্রকাশিত হওয়ার কয়েক বছর পূর্বে রামমোহন হিন্দুদের সনাতন প্রতিমা পূজা মেনে নিতে অস্বীকার করেন এবং যুগ যুগ ধরে চলে আসা কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু প্রথা ও আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি সমালোচনামুখর ছিলেন।
একেশ্বরবাদের ওপর ভিত্তি করে যে ধর্মমত তিনি প্রতিষ্ঠা করেন তার নাম ‘ব্রাহ্মধর্মমত’ এ ধর্ম উপাসনার উদ্দেশ্যে ১৮১৫ সালে আত্মীয় সভা নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। রামমোহন রায়ের বিপ্লবী চিন্তার ফসল হিন্দু ধর্ম সংস্কার আন্দোলন। তিনি প্রতিমা পূজা বর্জন করেন এবং বিশ্বাস করতেন এক সর্বজনীন ঈশ্বর পূজায়। তিনি ১৮২৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ব্রাহ্মসভা, যা পরবর্তী সময়ে ব্রাহ্মসমাজ নামে পরিচিতি লাভ করে। রামমোহনের ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা মৌলিক হলেও তা ইসলাম ও খ্রিস্ট ধর্ম দ্বারা খানিকটা প্রভাবিত হয়েছিল।
রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কার আন্দোলনের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ। সনাতন হিন্দু ধর্মে প্রচলিত অমানবিক ও নির্মম সহমরণ প্রথার বিরুদ্ধে তিনি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। প্রথানুযায়ী স্বামীর মৃত্যু হলে তার সঙ্গে একই চিতায় পুড়ে মরে ‘সতী’ হতে হতো স্ত্রীকে। তখনকার দিনে পতি মরলে চিতায় আত্মাহুতি দান পুণ্য বলে গণ্য হতো। আসলে কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বিধবাকে পুড়িয়ে মারা হতো তাদের সম্পত্তির লোভে।
১৮১৮ সালে গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছে প্রথমবার কলকাতার নাগরিকদের স্বাক্ষরসংবলিত সতীদাহ প্রথা বাতিলের আবেদন করা হয়। ১৮২৫-এর অক্টোবরে কলকাতায় একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত ব্যক্তির সঙ্গে তার স্ত্রীকেও সহমরণ দেয়া হয়। এতে কলকাতার কিছু সচেতন মানুষ এবং ইংরেজরা ক্ষুব্ধ হয়।
তখন রামমোহন সতীদাহ শাস্ত্রীয় বিধান নয়, তা প্রমাণ করে বাংলায় ও ইংরেজিতে বই প্রকাশ করেন, যাতে সরকারের দৃষ্টিগোচর হয় এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার মূলমন্ত্র মানুষ অনুধাবন করতে পারে। সংবাদপত্রে সতীদাহর বিরুদ্ধে প্রবন্ধ লিখে আন্দোলন চালান। এই সময় রামমোহনের অনুসারীরা জোরালো প্রতিবাদ করে। সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে রামমোহনের লেখা বই বিলেতে প্রকাশিত হলে ইংল্যান্ডেও সতীদাহ প্রথা বাতিলের দাবি ওঠে। তখন বাংলার গভর্নর ছিলেন, লর্ড হামহাস্ট। তার স্ত্রী ছিলেন একজন মনস্বিনী এবং সংস্কৃতিমনা। তিনিও এর প্রতিবাদ করেন। জনরোষ এড়াতে গভর্নর সতীদাহ প্রথা পুরোপুরি রহিত না করে কৌশলে কিছু নিয়ম চালু করলেন। সেগুলো হচ্ছে, কোনো সহগমনার্থিনী বিধবাকে স্বামীর দেহের সঙ্গে ছাড়া অন্য কোনোভাবে দগ্ধ করা যাবে না। সহগমনার্থিনী বিধবাদের স্বয়ং ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে এসে অনুমতি নিতে হবে সহমরণের জন্য। অন্যের দ্বারা দরখাস্ত দিয়ে অনুমতি নিলে চলবে না। সতীর সহমরণে সহায়তাকারী কোনো ব্যক্তি সরকারি চাকরি পাবে না। সহমৃতার কোনো সম্পত্তি থাকলে সরকার তা বাজেয়াপ্ত করে সরকারি সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করবে।
এই বিধি চালু হলে হিন্দু সমাজের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সহস্র মানুষের স্বাক্ষর নিয়ে সরকারি বিধি রহিত করার আবেদন করা হয়। তখন রামমোহন রায় লিখলেন ‘কৌমুদী’ গ্রন্থের ব্যাখ্যা ও প্রবর্ত্তক নিবর্ত্তকের সম্বাদ। তিনি লিখলেন, ‘শাস্ত্রানুসারে সহমরণ হিন্দু বিধবাদের শ্রেষ্ঠ কর্তব্য নয়। তার লেখাটি ইংরেজরাও পেল। জনমত গঠিত হতে থাকল। ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে লর্ড বেন্টিক সতীদাহ প্রথা বাতিলের আইন করেন। প্রগতিশীল হিন্দুগোষ্ঠী এই আইনকে অভিনন্দন জানালেও এর বিরুদ্ধে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ গণস্বাক্ষর করে তা ইংল্যান্ডে পাঠায় প্রিভি কাউন্সিলের কাছে। রামমোহন ইংল্যান্ডে গিয়ে হিন্দুদের ওই আবেদনের বিরুদ্ধে পাল্টা আবেদন করেন। প্রিভি কাউন্সিল রক্ষণশীল হিন্দুদের আবেদন খারিজ করে দেয়। তার অক্লান্ত চেষ্টার ফলে ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিংক আইন পাস করে সতীদাহ প্রথা রহিত করেন। রামমোহনের চেষ্টায় ইংরেজ সরকারের আইনের সাহায্যে নিষ্ঠুর প্রথাটি বন্ধ হয়।
ভারতবর্ষে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন ছিল। পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে ডেভিড হেয়ারের সহায়তায় ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে কলেজটির নাম পরিবর্তন করে প্রেসিডেন্সি কলেজ নামকরণ করা হয়। এবং ১৮২৩ সালে রাজা রামমোহন রায় নিজ অর্থ ব্যয়ে কলকাতায় অ্যাংলো হিন্দু স্কুল গড়ে তোলেন।
ভারতীয় উপমহাদেশের আধুনিক সাংবাদিকতার পথপ্রদর্শক তিনি। রামমোহন জনকল্যাণের ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে পেরেছিলেন। তার প্রেরণায় ১৮১৮ সালে আত্মীয়সভার সদস্য হরচন্দ্র রায়ও গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য বাংলা ভাষার সর্বপ্রথম সংবাদপত্র ‘বেঙ্গল গেজেট’ (সাপ্তাহিক) প্রকাশ করেন। ১৮২১ সালে ইংরেজি বাংলা দ্বৈত ভাষার ব্রাহ্মণিক্যাল ম্যাগাজিন ‘ব্রাহ্মণ সেবধি’ বাংলা ভাষার সংবাদপত্র ‘সম্বাদ কৌমুদি’ (১৮২১) এবং ফারসি ভাষায় প্রকাশিত হয় মিরাত্ উল আখবার নামক একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। এছাড়া ১৮২৯ সালে তারা কয়েকজন মিলে আরেকটি চতুর্ভাষী (ইংরেজি-বাংলা-ফারসি-হিন্দি) সাপ্তাহিক প্রকাশ করেন নাম ‘বেঙ্গল হেরাল্ড’। তার সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল সমাজের কুসংস্কার, অনাচার অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা। জনসাধারণের সমস্যা, অভাব, অভিযোগ কর্তৃপক্ষের নজরে আনা। সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে সচেতন করা।
১৮২৬ সালে হিন্দু-মুসলিম উভয়পক্ষের হয়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছে জুরি অ্যাক্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায় থেকে জুরি নির্বাচনের জন্য দাবি জানান। পূর্বে বিচার ব্যবস্থায় এ দুই সম্প্রদায়ের কাউকেই রাখা হতো না।
বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার জমিদার ও প্রজাদের স্বার্থবিরোধী সরকারের রাজস্ব নীতির বিরুদ্ধে রামমোহন ও তাঁর বন্ধুরা গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংকের নিকট ১৮২৯ সালে আরেকটি আবেদনপত্র পেশ করেন। প্রধানত রামমোহন রায়ের উদ্যোগে বিদেশী সরকারের নীতির বিরুদ্ধে জনসাধারণের প্রতিবাদগুলোর মধ্যেই জাতীয় চেতনাবোধের প্রাথমিক প্রকাশ পরিদৃষ্ট হয়।
ব্রিটিশদের প্রবর্তিত ভূমি ব্যবস্থায় কৃষকের দুর্দশার কথা তিনি ব্রিটিশ সংসদে উপস্থাপন করেন। পিতার সম্পদে নারীর অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা, বহুবিবাহ প্রথা বন্ধে সরব ছিলেন। তত্কালীন ব্রাহ্মণ সমাজের প্রথানুসারে বাবার নির্দেশে তাকে নয় বছর বয়সের মধ্যেই তিনবার বিয়ে করতে হয়। নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই পরবর্তী জীবনে তিনি বহুবিবাহ প্রথার তীব্র নিন্দা এবং বিরোধিতা করেন। তার ব্যক্তিগত উইলে শর্ত ছিল তার পুত্রদের মধ্য হতে কেউ এক স্ত্রী বর্তমান থাকাকালীন দ্বিতীয় বিবাহ করলে তার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চায়ও রাজা রামমোহন রায় নিজেকে একজন ব্যাকরণবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার লেখনীতে ফুটে উঠেছে অন্ধভাবে অদৃষ্টবাদের পরিবর্তে মানবনির্ভরতা, সাময়িকপত্র ও গদ্য সাহিত্যের বিকাশ। ১৮২৬ সালে তিনি ইংরেজিতে বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন। পরবর্তীতে ১৮৩৩ সালে স্কুল অব বুক সোসাইটির জন্য গ্রন্থটিকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়। নাম দেয়া হয় ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’ এটিই বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম কোনো ব্যাকরণ গ্রন্থ। পাঠপুস্তকের বাইরে তিনিই বাংলা গদ্য ব্যবহার শুরু করেছিলেন। পূর্বে উল্লিখিত গ্রন্থগুলো ছাড়া তার রচিত অন্যান্য সাহিত্য কর্মগুলো হলো পঞ্চোপনিষত্ (১৮১৬-১৮১৯), উত্সবানন্দ বিদ্যাবাগীশের সহিত বিচার (১৮১৬), ভট্টাচার্যের সহিত বিচার (১৮১৭), প্রবর্ত্তক নিবর্ত্তকের সম্বাদ (১৮১৮), আত্মনাত্মবিবেচক (১৮১৯), কবিতাকারের সহিত বিচার (১৮২০), ব্রাহ্মণ সেবধি ও মিসিনারী সম্বাদ (১৮২১), পাদরি ও শিষ্য সম্বাদ (১৮২৩), গুরুপাদুকা (১৮২৩), প্রার্থনা পত্র (১৮২৩), পথ্যপ্রদান (১৮২৩), কায়স্থের সহিত মদ্যপান বিষয়ক বিচার (১৮২৬), বজ সূচি (১৮২৭) ব্রাহ্মোপাসনা (১৮২৮), ব্রহ্মসঙ্গীত (১৮২৮), অনুষ্ঠান (১৮২৯), সহমরণ বিষয় (১৮২৯), ক্ষুদ্রপত্রী এবং গৌড়ীয় ব্যাকরণ (১৮৩৩); ৩. হিন্দি ভাষায় বেদান্ত গ্রন্থ (১৮১৫), বেদান্তসার (১৮১৫), সুব্রহ্মণ্য শাস্ত্রীর সহিত বিচার (১৮২০) ইত্যাদি। এ ছাড়াও ইংরেজি ভাষায় কিছু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।
১৮৩০ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি কলকাতা থেকে বিলেত যাত্রা করেন। ১৮৩১ সালের ৮ এপ্রিল রামমোহন লিভারপুলে পৌঁছান। রামমোহন রায় ১৮৩১ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের দূত হিসেবে যুক্তরাজ্য ভ্রমণ করেন। ১৮৩২ সালের শেষের দিকে কিছুদিনের জন্য তিনি ফ্রান্সেও গিয়েছিলেন। ১৮৩৩ সালে এই মনীষী মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয়ে ব্রিস্টলের কাছে স্টেপল্?টনে মৃত্যুবরণ করেন। ব্রিস্টলে আর্নস ভ্যাল সমাধিস্থলে তাঁকে কবর দেয়া হয়। ১৯৯৭ সালে মধ্য ব্রিস্টলে তাঁর একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। ২০০৪ সালে বিবিসির জরিপকৃত সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় রাজা রামমোহন রায়ের অবস্থান দশম।
বাঙালির মধ্যে জাতীয় চেতনার উন্মেষ সাধনে রামমোহন রায়ের ভূমিকার কথা আজও সশ্রদ্ধচিত্তে উচ্চারিত হয়। তাঁর মাধ্যমেই বাঙালি সর্বপ্রথম মতৈক্য পোষণ করে সংঘবদ্ধ হয় এবং তাঁদের নিজস্ব মতামত প্রদানে সক্ষম ও উত্সাহী হয়। রামমোহন রায় বাঙালিকে জাতি হিসেবে আত্মপরিচয় সমৃদ্ধ করতে চেষ্টা করেছেন।
রামমোহন রায় সম্পর্কে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তি হলো, ‘বর্তমান বঙ্গসমাজের ভিত্তি স্থাপন করিয়াছেন রামমোহন রায়। আমরা সমস্ত বঙ্গবাসী তাঁহার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী, তাঁহার নির্মিত ভবনে বাস করিতেছি। তিনি আমাদের জন্য যে কত করিয়াছেন, কত করিতে পারিয়াছেন, তাহা ভালো করিয়া আলোচনা করিয়া দেখিলে তাঁহার প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি ও বিশ্বাস জন্মিবে। আমাদিগকে যদি কেহ বাঙালি বলিয়া অবহেলা করে আমরা বলিব, রামমোহন রায় বাঙালি ছিলেন।’ এই তো রামমোহন রায়।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
অর্থনীতি ও জাতীয় নীতি বিশ্লেষণ | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ১২ জুন ২০২৬
জাতীয় বাজেট কেবল কিছু শুষ্ক সংখ্যার হিসাব কিংবা আয়-ব্যয়ের খতিয়ান নয়, এটি একটি দেশের রাজনৈতিক দর্শন, সার্বভৌমত্ব এবং সামাজিক পরিস্থিতির এক একটি জীবন্ত দলিল। বাংলাদেশের বাজেটের সুদীর্ঘ ইতিহাসে ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছর একটি অত্যন্ত অনন্য, জটিল এবং ব্যতিক্রমী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. এ. আর. মল্লিক (আজিজুর রহমান মল্লিক) কর্তৃক উপস্থাপিত এই বাজেটটি যেমন ছিল আকারের দিক থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের একটি সাহসী পদক্ষেপ, তেমনি এর ভেতরের অর্থনৈতিক কৌশল এবং উপস্থাপনা শৈলীও ছিল রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য নজির।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ যখন প্রথম দশকের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ার লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন বাজেটের দর্শন এবং মেকানিজম ছিল এক রকম। আর আজ ২০২৬ সালের জুন মাসে দাঁড়িয়ে যখন দেশের নতুন অর্থবছর (২০২৬-২৭)-এর প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করা হয়েছে, তখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এসেছে এক মহাকাব্যিক পরিবর্তন। ড. এ. আর. মল্লিকের সেই ১,৫৪৯.৪৮ কোটি টাকার বাজেট এবং ২০২৬ সালের জুনে ঘোষিত বর্তমান সরকারের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার (৯.৩৮ ট্রিলিয়ন) মেগা বাজেটের মধ্যে একটি নিবিড় তুলনামূলক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. এক নজরে দুই বাজেটের মূল উপাত্ত ও সংখ্যাতাত্ত্বিক তুলনা

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের বাজেট কেবল আকারেই বাড়েনি, বরং এর অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও অর্থনীতির ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। নিচে একটি তুলনামূলক ছক দেওয়া হলো:
| অর্থনৈতিক নির্দেশক (Indicators) | ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের বাজেট | ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট | পরিবর্তনের ধরন ও রূপান্তর |
| বাজেটের মোট আকার | ১,৫৪৯.৪৮ কোটি টাকা | ৯,৩৮,০০০ কোটি টাকা (৯.৩৮ ট্রিলিয়ন) | প্রায় ৬০৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। |
| উন্নয়ন বাজেট (ADP) | প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা | ২,৩০,০০০ কোটি টাকার বেশি (চলতি মেয়াদে) | ভৌত এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশাল বরাদ্দ বৃদ্ধি। |
| রাজস্ব/অনুন্নয়ন ব্যয় | প্রায় ৫৯৯.২৪ কোটি টাকা | ৬,০৮,০০০ কোটি টাকা (অনূমিত) | রাষ্ট্রীয় পরিচালনা ও সেবার পরিধি ব্যাপক বৃদ্ধি। |
| বাজেট উপস্থাপনের মাধ্যম | সংসদে সরাসরি সম্পূর্ণ সাধু ভাষায় পঠিত। | মাল্টিমিডিয়া ও আধুনিক ডাটা অ্যানালিটিক্সসহ চলিত ভাষায়। | আভিজাত্য বনাম আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। |
| মূল অর্থনৈতিক দর্শন | যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও সমাজতান্ত্রিক ত্রাণ-ভিত্তিক। | মুক্তবাজার অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ইকোনমি লক্ষ্য। | বেঁচে থাকার লড়াই থেকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার স্বপ্ন। |
২. গভীর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ (Macroeconomic Analysis)
ক. স্বনির্ভরতা বনাম বৈদেশিক নির্ভরতার চিত্র বদল:
- ১৯৭৫-৭৬ এর চিত্র: তৎকালীন সময়ে ড. এ. আর. মল্লিকের উন্নয়ন বাজেটের সিংহভাগই (প্রায় ৭৫% থেকে ৮০%) আসত বৈদেশিক সাহায্য, অনুদান এবং বিদেশী ঋণের মাধ্যমে। বাংলাদেশ তখন সম্পূর্ণ “সাহায্য-নির্ভর” (Aid-dependent) একটি দেশ ছিল। নিজস্ব সম্পদ সীমিত থাকায় বৈশ্বিক দাতাগোষ্ঠীর সিদ্ধান্তের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করত।
- ২০২৬ এর চিত্র: বর্তমানের ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেটে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, বাজেটের সিংহভাগ অর্থই এখন দেশের নিজস্ব কর (NBR Tax) এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসে। বৈদেশিক ঋণ এখন বাজেটের ঘাটতি পূরণের একটি সহায়ক মাধ্যম মাত্র (ঘাটতি প্রাক্কলন ২.৪৩ লাখ কোটি টাকা), যা প্রমাণ করে বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিকভাবে কতটা স্বাবলম্বী।
খ. ব্যয়ের অগ্রাধিকার পরিবর্তন (Sectoral Shifts):
- ১৯৭৫-৭৬ এর অগ্রাধিকার: সেই সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের খাদ্য ঘাটতি দূর করা এবং মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ। তাই বাজেটে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ খাতে। এর পাশাপাশি ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা (রেলওয়ে ও ব্রিজ) মেরামতের জন্য বড় অংকের বরাদ্দ রাখা হয়েছিল।
- ২০২৬ এর অগ্রাধিকার: ২০২৬ সালের বাজেটে শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ থাকা হয়নি। এখনকার বড় বরাদ্দ যায় মেগা অবকাঠামো (পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র), বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, তথ্য-প্রযুক্তি (আইটি সেক্টর) এবং সামাজিক security বা নিরাপত্তা বেষ্টনীতে। ২০২৬ সালের বাংলাদেশ এখন উন্নত ও স্মার্ট অবকাঠামো বিনির্মাণের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
গ. জীবনযাত্রার মান ও মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব:
১৯৭৫ সালের ১,৫৪৯ কোটি টাকা এবং ২০২৬ সালের ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার এই বিশাল পার্থক্যের পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি হলো দেশের জিডিপি (GDP)-র আকার বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি (Inflation)। ১৯৭৫ সালে যে পণ্যটির দাম ছিল ১ টাকা, মুদ্রাস্ফীতির কারণে আজ তার মূল্য বহু গুণ বেড়েছে। তবে একই সাথে মানুষের মাথাপিছু আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই রাষ্ট্র আজ এত বড় বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সাহস দেখাতে পারছে।
৩. বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যতিক্রম: সম্পূর্ণ সাধু ভাষায় বাজেট বক্তৃতা

বাংলাদেশের বাজেট বক্তৃতার ইতিহাসে ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের বাজেটটি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে আছে এর ভাষারীতি ও উপস্থাপন শৈলীর কারণে।
- ব্যতিক্রমী উদ্যোগ: তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. এ. আর. মল্লিক বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম এবং একমাত্র অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাঁর পুরো বাজেট বক্তৃতাটি সম্পূর্ণ সাধু ভাষায় পেশ করেছিলেন।
- ভাষাগত গাম্ভীর্য: সাধারণত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিবরণী চলিত ভাষায় পেশ করা হলেও, ড. মল্লিক বাংলা ভাষার তৎকালীন প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যাকরণগত আভিজাত্য বজায় রেখে অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ সাধু ভাষায় এই বাজেট উপস্থাপন করেন, যা দেশের সংসদীয় ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি স্থায়ী ব্যতিক্রমী রেকর্ড হিসেবে গণ্য হয়।
৪. political বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও এই বাজেটের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের এই বাজেটটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম দ্রুততম এবং স্পর্শকাতর পটপরিবর্তনের সাক্ষী।
- বাজেট পেশের সময়কাল: ড. এ. আর. মল্লিক এই বাজেটটি পেশ করেছিলেন ১৯৭৫ সালের জুন মাসে। এটি ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) সরকারের সময়কার শেষ বাজেট।
- বাস্তবায়নের সময়কাল: বাজেটটি পাস হওয়ার মাত্র দুই মাসের মাথায়, অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। ফলে, ড. মল্লিকের পেশ করা এই বাজেটটি প্রণয়ন হয়েছিল এক রাজনৈতিক দর্শনে, কিন্তু এর চূড়ান্ত বাস্তবায়ন ঘটেছিল ১৫ আগস্ট পরবর্তী সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সামরিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। এই কারণেও এই বাজেটকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ‘উত্তাল মেয়াদের বাজেট’ বলা হয়।
৫. রাজনৈতিক দর্শন ও শাসন ব্যবস্থার রূপান্তর
- ১৯৭৫-৭৬ এর প্রেক্ষাপট: সেটি ছিল যুদ্ধোত্তর রাজনৈতিক পুনর্গঠন এবং পরবর্তীতে এক উত্তাল রাজনৈতিক পরিবর্তনের বছর। রাষ্ট্র তখন সমাজতান্ত্রিক ধারার অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সচল ছিল।
- ২০২৬ এর প্রেক্ষাপট: ২০২৬ সালের নতুন সরকার ও বাজেট সম্পূর্ণ মুক্তবাজার অর্থনীতি (Free-market economy) এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। এখনকার মূল দর্শন হলো “অর্থনৈতিক লোকসানি রাষ্ট্র” থেকে বের হয়ে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা, প্রযুক্তির প্রসার ঘটানো এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করার দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখা তৈরি করা।
পরিচিতি: অর্থমন্ত্রী ড. এ. আর. মল্লিক

ড. আজিজুর রহমান মল্লিক (ড. এ. আর. মল্লিক) ছিলেন একাধারে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ এবং কুশলী টেকনোক্র্যাট।
- তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য (Founder Vice-Chancellor) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
- ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসে (বিশেষ করে ভারতে) ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’র সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে এবং তহবিল সংগ্রহে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
- দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি প্রথমে共和国 বা প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ আমলা (যুগ্ম-সচিব ও রাষ্ট্রদূত) এবং পরবর্তীতে টেকনোক্র্যাট কোটায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের গুরুদায়িত্ব পালন করেন।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত মূল্যায়ন
১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের ১,৫৪৯ কোটি টাকার বাজেটটি যদি বাংলাদেশের শৈশবকালীন “হামাগুড়ি” দেওয়ার গল্প হয়, তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেটটি হলো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের “সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দৌড়ানোর” প্রত্যয়। ভাষার আভিজাত্য থেকে শুরু করে ডলারের অঙ্কে রূপান্তর—সব মিলিয়ে এই দুই বাজেটের ব্যবধান আসলে একটি তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে স্বাবলম্বী ও উদীয়মান অর্থনৈতিক সিংহ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের ৫০ বছরের জীবন্ত ইতিহাস। ড. এ. আর. মল্লিকের সেই সাধু ভাষার বাজেট বক্তৃতা এবং এর পেছনের রাজনৈতিক ওঠানামা প্রমাণ করে যে, আমাদের জাতীয় বাজেট কেবল কিছু সংখ্যার হিসাব নয়, এটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও ইতিহাসের এক একটি বাঁক বদলের গল্প।
নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও তথ্যের সূত্রসমূহ (Sources)
১. বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) আর্কাইভ: স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ থেকে শুরু করে ২০২৬-২৭ অর্থবছর পর্যন্ত জাতীয় বাজেট ও অর্থমন্ত্রীদের বক্তৃতা সংকলন এবং বার্ষিক প্রতিবেদন।
২. জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও পরিকল্পনা কমিশন রেকর্ডস: ঐতিহাসিক সংসদীয় কার্যবিবরণী, প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, ১৯৭৫ সালের অর্থ বিলের নথিপত্র এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ঐতিহাসিক ডাটাবেজ।
দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, জাতীয় বাজেট এবং সমসাাময়িক ভূ-রাজনীতির এমন সব গভীর ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ পড়তে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে
বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তি
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
রাজনীতি ও জাতীয় কূটনীতি ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ১২ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন যেমন গৌরবময় ও অর্জনে ভরা, তেমনি তা তীব্র সমালোচনা, বিতর্ক এবং রাজনৈতিক রসালাপে ভরপুর। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে রাজপথের আপসহীন নেতৃত্ব থেকে শুরু করে গৃহবধূ থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার এক অনন্য ইতিহাস রয়েছে তাঁর।
১২ জুন ২০২৬ তারিখে এসে যখন তাঁর রাজনৈতিক অধ্যায়কে মূল্যায়ন করা হয়, তখন তাঁর নেওয়া দেশের কাঠামোগত ইতিবাচক নীতিগুলোর পাশাপাশি তাঁর আমলের তীব্র রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা ও অন্দরমহলের নানা বিতর্কিত অধ্যায়ও সমানভাবে সামনে চলে আসে। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
প্রথম অংশ: রাষ্ট্র গঠনে অবদানের খতিয়ান (ইতিবাচক দিকসমূহ)

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পেছনে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের বেশ কিছু সুদূরপ্রসারী ও ইতিবাচক অবদান রয়েছে, যা দেশের উন্নয়ন সূচকে বড় ভূমিকা রেখেছে:
১. নারী শিক্ষার বিপ্লব ও উপবৃত্তি প্রবর্তন:
নব্বইয়ের দশকে গ্রামীণ নারীদের স্কুলমুখী করতে এবং বাল্যবিয়ে রোধে তাঁর সরকার দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা এবং বিশেষ উপবৃত্তি (Stipend) চালু করে। এই একটিমাত্র পলিসি বাংলাদেশের নারী শিক্ষার হারে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল।
২. অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও যমুনা সেতু:
উত্তরবঙ্গের সাথে সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক দূরত্ব ঘুচিয়ে দেওয়া ‘যমুনা বহুমুখী সেতু’ (বঙ্গবন্ধু সেতু)-র সিংহভাগ অর্থায়ন ও নির্মাণ কাজ তাঁর সরকারের (১৯৯১-৯৬) আমলেই বাস্তবায়িত হয়েছিল, যা দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
৩. মুক্তবাজার অর্থনীতি ও মিডিয়ার আধুনিকায়ন:
তাঁর আমলেই বাংলাদেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির দ্বার উন্মুক্ত হয় এবং তথ্য-প্রযুক্তির আধুনিকায়নের সূচনা ঘটে। বেসরকারি খাতে টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও এবং মোবাইল ফোন কোম্পানির লাইসেন্স দেওয়ার মাধ্যমে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছিল।
৪. কৃষি খাতের সংস্কার ও সামাজিক বনায়ন:
কৃষকদের জন্য সারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা, সেচ কাজে শুল্ক ছাড় এবং গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ‘সামাজিক বনায়ন’ কর্মসূচিকে দেশব্যাপী জনপ্রিয় আন্দোলনে রূপ দিয়েছিল তাঁর সরকার।
দ্বিতীয় অংশ: ক্ষমতার অন্দরমহলের ব্যর্থতা, সমালোচনা ও রসালাপ
ইতিহাসের পাতায় বেগম খালেদা জিয়ার অবদান যেমন সত্য, ঠিক তেমনি তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়কার কিছু সিদ্ধান্ত, বক্তব্য এবং ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে আজ তীব্র সমালোচনা ও রসালো ট্রোলের খোরাক জুগিয়েছে। সমালোচকদের দৃষ্টিতে এবং রাজনৈতিক রসালাপে তাঁর জীবনের সেই অধ্যায়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সংসদীয় বক্তব্য ও ২১ আগস্টের ‘ভ্যানিটি ব্যাগ’ তত্ত্ব:

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় সমালোচনা ছিল সংসদে দাঁড়িয়ে বা জনসভায় দেওয়া কিছু বক্তব্য, যা গোয়েন্দা তথ্যের চেয়ে লোককাহিনির মতো শোনাত। বিশেষ করে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পর সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি দাবি করেছিলেন যে—”শেখ হাসিনা নিজেই তাঁর ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিলেন এবং ট্রাকে করে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন।” একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এমন অবাস্তব ও কৌতুকপূর্ণ বক্তব্য তৎকালীন সময়ে দেশের বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকে তীব্র প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল এবং আজও তা ট্রোলের প্রধান উৎস।
২. সংসদ আর সংসারের ‘তালগোল’:

নব্বইয়ের দশকে রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ গৃহবধূ থেকে হুট করে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর অনেকেই মন্তব্য করেছিলেন যে, তিনি দেশের শাসনভার আর পারিবারিক অনুভূতির মধ্যে ‘তালগোল’ পাকিয়ে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে ২০০১ সালের মেয়াদে তাঁর দুই সন্তানের, বিশেষ করে তারেক রহমানের ‘হাওয়া ভবন’ কেন্দ্রিক সমান্তরাল প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার তাঁর সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও সমালোচনার কারণ হিসেবে দেখা হয়।
৩. “ঈদের পর আন্দোলন” এবং ঐতিহাসিক ডেডলাইন:

বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরোধী দলে থাকাকালীন সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার “ইনশাল্লাহ, ঈদের পর কঠোর আন্দোলন শুরু হবে”—এই বক্তব্যটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় একটি প্রবাদে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর রোজা এবং কোরবানি ঈদের পর আন্দোলনের এই ধারাবাহিক ‘ডেডলাইন’ বা আলটিমেটাম সাধারণ মানুষ এবং ট্রোল পেজগুলোর কাছে এক পরম জনপ্রিয় ও মজাদার রসালাপে রূপ নিয়েছে।
৪. অনমনীয় জেদ ও ‘ননদ-ভাবি’র চিরস্থায়ী যুদ্ধ:

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার সম্পর্ককে আমজনতা প্রায়শই বাঙালি সংস্কৃতির চিরন্তন ‘ননদ-ভাবি’র ঝগড়ার সাথে তুলনা করে রসাস্বাদন করে থাকে। তবে এই অনমনীয় জেদ কখনো কখনো সব ধরনের রাজনৈতিক সৌজন্যতাকে ধূলিসাৎ করেছে। ২০১৫ সালে বেগম জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন সমবেদনা জানাতে তাঁর গুলশানের কার্যালয়ে যান, তখন ভেতর থেকে গেট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং প্রধানমন্ত্রীকে বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে ফিরে যেতে হয়। রাজনীতিতে এই “আপসহীন” জেদ সাধারণ মানুষের কাছে চরম রাজনৈতিক অনাচারের এক অনন্য নজির হিসেবে সমালোচিত।
৫. জামায়াত প্রীতি ও ‘মৌলবাদ’ দূরীকরণের তত্ত্ব:

২০০১ সালের নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দল জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট গঠন এবং তাদের মন্ত্রিত্ব দেওয়া খালেদা জিয়ার অন্যতম বড় রাজনৈতিক সমালোচনা। ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলা হয়ে থাকে যে, জামায়াতের নেতাদের সাথে এমন সখ্যতার মাধ্যমে তিনি হয়তো তাদের ‘উদারপন্থী’ বানাতে চেয়েছিলেন এবং বাঙালি নারীকে নিকাবের বাইরে এনে এক অদ্ভুত ‘নারীবাদ’ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন! কিন্তু বাস্তবে এই জোট দেশে উগ্রবাদের বিস্তার ঘটিয়েছিল বলেই আন্তর্জাতিক মহলের ধারণা।

পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত মূল্যায়ন
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাজপথের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তাঁর অবদান যেমন অস্বীকার করার উপায় নেই, তেমনি ক্ষমতার মসনদে বসে অন্দরমহলের দুর্নীতি ও কৌতুকপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য তাঁর ভাবমূর্তিকে বহুলাংশে ম্লান করেছে। ভালো আর মন্দের এই দোলাচলেই নির্মিত হয়েছে তাঁর বর্ণাঢ্য এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক জীবন।
নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও তথ্যের সূত্রসমূহ (Sources)
১. বাংলাদেশ পলিটিক্যাল হিস্ট্রি ও পলিসি রিভিউ: ১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদের সরকারি উন্নয়ন গ্যাজেট ও জাতীয় সংসদ কার্যবিবরণী আর্কাইভ।
২. আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীক্ষা: দক্ষিণ এশীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বাংলাদেশের সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা।
দেশের রাজনীতি, ইতিহাস এবং সমসাময়িক ভূ-রাজনীতির এমন সব তথ্যবহুল ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ পড়তে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতি ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ১১ জুন ২০২৬
বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ‘বাংলাদেশের রাজনীতি’-র থেকে ‘রাজনীতির বাংলাদেশ’ বলাটাই হয়তো বেশি গ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশ আজ এক জটিল রাজনীতির পাঁকে পড়ে গিয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিশ্বমঞ্চে ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, দেশি-বিদেশি নানা শক্তির টক্করের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এই ভূখণ্ড। চীন, পাকিস্তান, ভারত এবং পর্দার আড়ালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থের দ্বন্দ্বে এক জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে, যার কুপ্রভাব আগামী দিনে দৃশ্যমান হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার এই দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ৪টি খণ্ডের মেরুকরণ এবং আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাব নিয়ে একটি গভীর পর্যবেক্ষণমূলক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ৪ খণ্ড ও ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্তমানে দেশের শাসন ক্ষমতায় রয়েছে বিএনপি। তবে ক্ষমতার এই নতুন বিন্যাসের ভেতরেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রধানত ৪টি খণ্ডে বিভক্ত এবং তাদের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন স্পষ্ট:
- ক্ষমতায় বিএনপি ও তাদের কৌশল: দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। তবে ক্ষমতায় বসার পর তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণ, ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া ‘জুলাই চার্টার’ বা সাংবিধানিক সংস্কারের অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করা।
- মুহাম্মদ ইউনূসের মেয়াদের পর ছাত্রদল: ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সফলভাবে নির্বাচন দিয়ে বিএনপির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। তবে আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছাত্ররা এখন নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে দেশের জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে। তবে অভিজ্ঞতাহীন এই তরুণ নেতৃত্ব দীর্ঘমেয়াদে কতটা রাজনৈতিক পরিপক্বতা দেখাতে পারে, তার ওপর তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
- আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থা: শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে চরম কোণঠাসা। তবে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব, জোট গড়ার ক্ষমতা ও একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক (বিশেষ করে সংখ্যালঘু সমীকরণ ও দীর্ঘদিনের দলীয় সমর্থক) একেবারে মুছে যায়নি। গত কয়েক মাসে ইতিহাসের কাটা ঘা বা ক্ষত কিছুটা হলেও শুকিয়েছে, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ বর্তমান ছাত্রনেতারাও অনুধাবন করতে পারছেন। একই সাথে, বাংলাদেশে হিন্দু ভোটারের সংখ্যা ১০%-এর কম হলেও নির্বাচনী অংকে তা মোটেও অ-গুরুত্বপূর্ণ নয়।
২. রাজনীতিতে ‘চিরস্থায়ী শত্রু বা মিত্র’ বলে কিছু নেই

রাজনীতি বিষয়টি সরল নয়, বরং অত্যন্ত জটিল। আন্তর্জাতিক শক্তি বা অভ্যন্তরীণ হাওয়া যতই পক্ষে থাকুক না কেন—গাছে উঠতে না জানলে বা শক্ত ডাল জড়িয়ে ধরে থাকার পরিপক্বতা না থাকলে ক্ষমতা ধরে রাখা যায় না। ছাত্ররা জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করলেও অভিজ্ঞতার অভাবে তাদের অন্যদের ওপর নির্ভরশীল থাকতেই হবে; কারণ জন্ম নিয়েই কোনো শিশু হাঁটতে পারে না। অন্যদের অবলম্বন তাকে করতেই হয়।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় ঘটতে পারে দলগুলোর কৌশলগত জোটে। বিএনপি নীতিগতভাবে ভারতবিরোধী অবস্থান দেখালেও মূলত তারা ক্ষমতাবিরোধী নয়। ক্ষমতার জন্য ভারতের সমর্থন বা সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তারা প্রকাশ্যে ভারতবিরোধিতা করলেও প্রকৃত অর্থে বা পর্দার আড়ালে তা করবে না। বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার স্বার্থে চরম আদেশিক বিপরীত মেরুর দলও (যেমন ভারতের মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ও মিমের পরোক্ষ সমীকরণ কিংবা ঔরঙ্গজেবের বিরোধিতার ইতিহাস) এক হয়ে যায়। সেই হিসেবে, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা ও ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজনে ভবিষ্যতে অভিজ্ঞ ও পরিপক্ব দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যদি এক থালায় বা জোটে বসে, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। উভয় দলই যথেষ্ট পরিপক্ব এবং অভিজ্ঞ।
৩. আন্তর্জাতিক শক্তির আগ্রাসন ও ‘ভবিষ্যতের সিরিয়া’ হওয়ার শঙ্কা়

বাংলাদেশের এই অভ্যন্তরীণ বিন্যাস ও অস্থিরতার সুযোগ নিচ্ছে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো।
- ত্রিমুখী চাপ: এখানে পাকিস্তান নতুন করে এন্ট্রি নেওয়ার চেষ্টা করছে, পাশাপাশি ভারতের শক্তিশালী গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক নজরদারি তো রয়েছেই। এর সাথে যুক্ত হয়েছে লাভের গন্ধে ছটফট করা aggression বা আগ্রাসী চীন এবং চীন-বিরোধী ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
- ঝুঁকির মেঘ: এই বহুপাক্ষিক ভূ-রাজনৈতিক টানাটানি যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে সিরিয়ার মতো বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর প্রক্সি-ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
তবে ভারত নিজের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা ও শিলিগুড়ি করিডোরের (চিকেনস নেক) সুরক্ষার স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশকে কখনোই হাতছাড়া হতে দিতে চাইবে না। ভারত নিজের প্রভাব খাটিয়ে এখানে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ বা তাদের অনুকূল সরকার ধরে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। আর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ‘ভারতবিরোধী সরকার’ কীভাবে সময়ের প্রয়োজনে ‘ভারতপন্থী’ হয়ে ওঠে, তার উদাহরণ দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন কিছু নয়। ভারতের জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি করার চেষ্টা চালানো হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে যে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে, তার বার্তা তিস্তা, যমুনা ও পদ্মার জলবণ্টন এবং প্রাকৃতিক ভূগোলের ওপরই নির্ভর করে। প্রকৃতির ওপর যেমন মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই, আন্তর্জাতিক আইনের নিয়ন্ত্রণও অনেক সময় পরাশক্তিগুলোর ওপর খাটে না।
৪. দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক অস্থিতিশীলতা: পাকিস্তান ও নেপাল প্রসঙ্গ

বাংলাদেশের বাইরে পুরো দক্ষিণ এশিয়া জুড়েই এখন এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অস্থিরতা চলছে:
পাকিস্তানের শোচনীয় দশা:
ইসলামাবাদ বর্তমানে ত্রিমুখী ঝামেলা, চরম অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে হিমশিম খাচ্ছে। ভারত ইতিমধ্যে পাক-অধিকৃত কাশ্মীর (POK) পুনরুদ্ধারের ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে, আফগানিস্তান খাইবার পখতুনখোয়া নিয়ে চাপ দিচ্ছে এবং ঐতিহাসিকভাবে শোষিত ও বঞ্চিত বেলুচিস্তান নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে আন্দোলন তীব্র করছে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনার শিকার বেলুচিস্তানের এই স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দাবি এবং আফগান সীমান্তের অস্থিতিশীলতা সামলাতে পাকিস্তানের পেছনে চীনের সমর্থন থাকলেও ইসলামাবাদ পুরোপুরি হিমশিম খাচ্ছে।
নেপালের রাজতন্ত্রের পুনরুত্থান ও হিন্দুরাষ্ট্রের দাবি:
নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক বড় ধরনের আদর্শিক মোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নেপালে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে গণতন্ত্র আনার বয়স ২০ বছরও পার হয়নি, কিন্তু এই অল্প সময়ে এতবার সরকার পরিবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে যে দেশটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। ফলে উন্নতির আশায় ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র আনা হলেও তা নেপালের জন্য হিতে বিপরীত বা অভিশাপ হয়েছে। বর্তমানে নেপালী হিন্দুরা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর আস্থা হারিয়ে পুনরায় রাজতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন এবং নেপালকে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষণার দাবি তুলছেন, যা তাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জোরালো ও সমর্থনযোগ্য হয়ে উঠছে।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত विश्लेषण
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এখন এক অত্যন্ত সংবেদনশীল মোড় পার করছে। পাকিস্তান দেউলিয়া হওয়ার পথে, নেপাল তার পরিচয়ের সংকটে ভুগছে, আর বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন রাজনৈতিক মোড়ে। এই পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ দলগুলোর ক্ষমতার লোভ বা বিদেশী শক্তির ওপর অন্ধ নির্ভরশীলতা দেশের সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করতে পারে। বাংলাদেশকে যদি ‘ভবিষ্যতের সিরিয়া’ হওয়া থেকে বাঁচতে হয়, তবে ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও তথ্যের সূত্রসমূহ (Sources)
১. দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা সমীক্ষা: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কৌশলগত কূটনীতি গবেষণা সেল (South Asian Strategic Studies)।
২. আঞ্চলিক সীমান্ত ও রাজনৈতিক ডাটা: দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক রদবদল, বেলুচিস্তান সংকট এবং নেপালের সাংবিধানিক রূপান্তর বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদন।
দেশ-বিদেশের রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক কূটনীতির এমন সব নিরপেক্ষ ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণ পড়তে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে



