ইতিহাস

রাজা রামমোহন রায়: সমাজ সংস্কারক থেকে 'রাজা' উপাধি লাভের ইতিহাস
রামমোহন রায়

নিউজ ডেস্ক

December 11, 2025

শেয়ার করুন

“রাজা” উপাধি: দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় আকবর ১৮৩১ সালে ইংল্যান্ড গমনের সময় তাকে ‘রাজা’ উপাধি খানা প্রদান করেন

রাজা রামমোহন রায় এর জীবনীঃ

‘সতীর সর্বস্ব পতি, সতী শুধু পতিময়, বিধাতার প্রেমরাজ্যে সতত সতীর জয়’। আনোয়ারা উপন্যাসে নজিবুর রহমানের উক্তিখানি বাঙালি পতিভক্ত নারীর মনে মুগ্ধতা ছড়াবে। কিন্তু আজ থেকে দুশত বছর আগে পতিভক্ত ও সতী প্রমাণের জন্য যে সহমরণ প্রথা প্রচলিত ছিল। তা শুনলে আজো গা শিউরে ওঠে নিশ্চয়ই। তবে একই সঙ্গে যে নামটি স্মৃতিপটে চিত্রায়িত হবে, সেটি রাজা রামমোহন রায়।

গুপ্ত যুগের পূর্ব থেকে চলে আসা কুসংস্কারাচ্ছন্ন সতীদাহ প্রথা বিলোপ হয় ১৯ শতকের গোড়ার দিকের শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়ের আন্দোলনে। হাজার বছরের চলে আসা চিতায় সহমরণ প্রথার সমূলে উত্পাটনই শুধু নয়, শিক্ষা ও ধর্ম সংস্কার, ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা, বাঙালির অধিকার আদায়, সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠাসহ উল্লেখযোগ্য কর্মযজ্ঞ তাকে দিয়েছে যুগ পরিবর্তনকারী মনীষীর খেতাব। ঊনবিংশ শতকের শুরুতে এসে বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনে পুনরায় যে নতুন জাগরণ সৃষ্টি হয়, তাকে বঙ্গীয় রেনেসাঁ বলা যেতে পারে। পেত্রার্ক ও বোকাচ্চিও যেমন ইতালির রেনেসাঁর অগ্রদূত ছিলেন, তেমনি রাজা রামমোহন রায় ছিলেন বঙ্গীয় বা ভারতীয় রেনেসাঁর পথিকৃত্।

নাম তার রাম মোহন, উপাধি রাজা, আর পারিবারিক পদবি রায়। তবে তিনি ‘রাজা রামমোহন রায়’ নামেই প্রসিদ্ধি পেয়েছেন। ১৭৭২, মতান্তরে ৭৪ সালের ২২ মে অধুনা পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার কৃষ্ণনগরের কাছে রাধানগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা রামাকান্ত রায়, মায়ের নাম তারিণী দেবী। দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় আকবর ১৮৩১ সালে ইংল্যান্ড গমনের সময় তাকে ‘রাজা’ উপাধি খানা প্রদান করেন। তিনি গুরুমশায়ের পাঠশালায় হাতেখড়ি নেন। পাটনাতে আরবি ও পারসি, এবং কাশিতে সংস্কৃত ভাষায় ব্যুত্পত্তি লাভ করেন। বহুভাষার জ্ঞান নিঃসন্দেহে তাকে ভাষাবিদের তকমাটাও জুড়ে দেয়। রাজা রামমোহন রায় সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, ইংরেজি ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জনের পাশাপাশি হিব্রু, গ্রিক, সিরীয় প্রভৃতি ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করেন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু হয়। এবং বিভিন্ন দায়িত্বপূর্ণ পদে উন্নীত হন। ১৮০৫ থেকে ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি রংপুর কালেক্টরেটে জেলা কালেক্টর মি. ডিগবির অধীনে দেওয়ানের কাজ করেন। এক পর্যায়ে রংপুরের কালেক্টরেটও হয়েছিলেন।

ইসলাম খ্রিস্ট ও বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান ছিল। রামমোহনের প্রথম দিকের রচনাগুলো ছিল আরবি ও ফারসি ভাষায়। বিভিন্ন ধর্মের আলোচনায় পরিপূর্ণ তাঁর প্রথম গবেষণামূলক গ্রন্থটি হলো ‘মানযারাতুল আদিয়ান’ এটি কখনো ছাপা হয়নি ও পরে হারিয়ে গেছে।

আরবি ভাষায় শিরোনাম ও মুখবন্ধসংবলিত ফারসি ভাষায় লিখিত তাঁর গবেষণামূলক আরেকটি গ্রন্থ হলো ‘তুহফাত-উল-মুওয়াহিহদীন’-এ গ্রন্থটিতে রামমোহন ঘোষণা করেন যে, ‘কোনো রকম পার্থক্য ব্যতিরেকে সকল ধর্মেই সচরাচর কিছু ভ্রান্ত মত চর্চা পরিদৃষ্ট হয়।’ এবং মত পোষণ করেন যে, কোন প্রেরিত পুরুষ, ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও প্রত্যাদেশের সাহায্য ছাড়াই নিজস্ব কর্মক্ষমতার মাধ্যমে সর্বজনীন সর্বোত্কৃষ্ট সত্তাকে অনুধাবন করা সম্ভব।

গ্রন্থটি ১৮০৩-০৪ সালে মুর্শিদাবাদে প্রকাশিত হয়। তখন তিনি মুর্শিদাবাদে বাস করতেন। গ্রন্থটিতে মূলত একেশ্বরবাদের কথা প্রাধান্য পেয়েছে। তুহফাত প্রকাশিত হওয়ার কয়েক বছর পূর্বে রামমোহন হিন্দুদের সনাতন প্রতিমা পূজা মেনে নিতে অস্বীকার করেন এবং যুগ যুগ ধরে চলে আসা কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু প্রথা ও আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি সমালোচনামুখর ছিলেন।

একেশ্বরবাদের ওপর ভিত্তি করে যে ধর্মমত তিনি প্রতিষ্ঠা করেন তার নাম ‘ব্রাহ্মধর্মমত’ এ ধর্ম উপাসনার উদ্দেশ্যে ১৮১৫ সালে আত্মীয় সভা নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। রামমোহন রায়ের বিপ্লবী চিন্তার ফসল হিন্দু ধর্ম সংস্কার আন্দোলন। তিনি প্রতিমা পূজা বর্জন করেন এবং বিশ্বাস করতেন এক সর্বজনীন ঈশ্বর পূজায়। তিনি ১৮২৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ব্রাহ্মসভা, যা পরবর্তী সময়ে ব্রাহ্মসমাজ নামে পরিচিতি লাভ করে। রামমোহনের ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা মৌলিক হলেও তা ইসলাম ও খ্রিস্ট ধর্ম দ্বারা খানিকটা প্রভাবিত হয়েছিল।

রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কার আন্দোলনের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ। সনাতন হিন্দু ধর্মে প্রচলিত অমানবিক ও নির্মম সহমরণ প্রথার বিরুদ্ধে তিনি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। প্রথানুযায়ী স্বামীর মৃত্যু হলে তার সঙ্গে একই চিতায় পুড়ে মরে ‘সতী’ হতে হতো স্ত্রীকে। তখনকার দিনে পতি মরলে চিতায় আত্মাহুতি দান পুণ্য বলে গণ্য হতো। আসলে কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বিধবাকে পুড়িয়ে মারা হতো তাদের সম্পত্তির লোভে।

১৮১৮ সালে গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছে প্রথমবার কলকাতার নাগরিকদের স্বাক্ষরসংবলিত সতীদাহ প্রথা বাতিলের আবেদন করা হয়। ১৮২৫-এর অক্টোবরে কলকাতায় একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত ব্যক্তির সঙ্গে তার স্ত্রীকেও সহমরণ দেয়া হয়। এতে কলকাতার কিছু সচেতন মানুষ এবং ইংরেজরা ক্ষুব্ধ হয়।

তখন রামমোহন সতীদাহ শাস্ত্রীয় বিধান নয়, তা প্রমাণ করে বাংলায় ও ইংরেজিতে বই প্রকাশ করেন, যাতে সরকারের দৃষ্টিগোচর হয় এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার মূলমন্ত্র মানুষ অনুধাবন করতে পারে। সংবাদপত্রে সতীদাহর বিরুদ্ধে প্রবন্ধ লিখে আন্দোলন চালান। এই সময় রামমোহনের অনুসারীরা জোরালো প্রতিবাদ করে। সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে রামমোহনের লেখা বই বিলেতে প্রকাশিত হলে ইংল্যান্ডেও সতীদাহ প্রথা বাতিলের দাবি ওঠে। তখন বাংলার গভর্নর ছিলেন, লর্ড হামহাস্ট। তার স্ত্রী ছিলেন একজন মনস্বিনী এবং সংস্কৃতিমনা। তিনিও এর প্রতিবাদ করেন। জনরোষ এড়াতে গভর্নর সতীদাহ প্রথা পুরোপুরি রহিত না করে কৌশলে কিছু নিয়ম চালু করলেন। সেগুলো হচ্ছে, কোনো সহগমনার্থিনী বিধবাকে স্বামীর দেহের সঙ্গে ছাড়া অন্য কোনোভাবে দগ্ধ করা যাবে না। সহগমনার্থিনী বিধবাদের স্বয়ং ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে এসে অনুমতি নিতে হবে সহমরণের জন্য। অন্যের দ্বারা দরখাস্ত দিয়ে অনুমতি নিলে চলবে না। সতীর সহমরণে সহায়তাকারী কোনো ব্যক্তি সরকারি চাকরি পাবে না। সহমৃতার কোনো সম্পত্তি থাকলে সরকার তা বাজেয়াপ্ত করে সরকারি সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করবে।

এই বিধি চালু হলে হিন্দু সমাজের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সহস্র মানুষের স্বাক্ষর নিয়ে সরকারি বিধি রহিত করার আবেদন করা হয়। তখন রামমোহন রায় লিখলেন ‘কৌমুদী’ গ্রন্থের ব্যাখ্যা ও প্রবর্ত্তক নিবর্ত্তকের সম্বাদ। তিনি লিখলেন, ‘শাস্ত্রানুসারে সহমরণ হিন্দু বিধবাদের শ্রেষ্ঠ কর্তব্য নয়। তার লেখাটি ইংরেজরাও পেল। জনমত গঠিত হতে থাকল। ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে লর্ড বেন্টিক সতীদাহ প্রথা বাতিলের আইন করেন। প্রগতিশীল হিন্দুগোষ্ঠী এই আইনকে অভিনন্দন জানালেও এর বিরুদ্ধে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ গণস্বাক্ষর করে তা ইংল্যান্ডে পাঠায় প্রিভি কাউন্সিলের কাছে। রামমোহন ইংল্যান্ডে গিয়ে হিন্দুদের ওই আবেদনের বিরুদ্ধে পাল্টা আবেদন করেন। প্রিভি কাউন্সিল রক্ষণশীল হিন্দুদের আবেদন খারিজ করে দেয়। তার অক্লান্ত চেষ্টার ফলে ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিংক আইন পাস করে সতীদাহ প্রথা রহিত করেন। রামমোহনের চেষ্টায় ইংরেজ সরকারের আইনের সাহায্যে নিষ্ঠুর প্রথাটি বন্ধ হয়।

ভারতবর্ষে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন ছিল। পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে ডেভিড হেয়ারের সহায়তায় ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে কলেজটির নাম পরিবর্তন করে প্রেসিডেন্সি কলেজ নামকরণ করা হয়। এবং ১৮২৩ সালে রাজা রামমোহন রায় নিজ অর্থ ব্যয়ে কলকাতায় অ্যাংলো হিন্দু স্কুল গড়ে তোলেন।

ভারতীয় উপমহাদেশের আধুনিক সাংবাদিকতার পথপ্রদর্শক তিনি। রামমোহন জনকল্যাণের ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে পেরেছিলেন। তার প্রেরণায় ১৮১৮ সালে আত্মীয়সভার সদস্য হরচন্দ্র রায়ও গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য বাংলা ভাষার সর্বপ্রথম সংবাদপত্র ‘বেঙ্গল গেজেট’ (সাপ্তাহিক) প্রকাশ করেন। ১৮২১ সালে ইংরেজি বাংলা দ্বৈত ভাষার ব্রাহ্মণিক্যাল ম্যাগাজিন ‘ব্রাহ্মণ সেবধি’ বাংলা ভাষার সংবাদপত্র ‘সম্বাদ কৌমুদি’ (১৮২১) এবং ফারসি ভাষায় প্রকাশিত হয় মিরাত্ উল আখবার নামক একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। এছাড়া ১৮২৯ সালে তারা কয়েকজন মিলে আরেকটি চতুর্ভাষী (ইংরেজি-বাংলা-ফারসি-হিন্দি) সাপ্তাহিক প্রকাশ করেন নাম ‘বেঙ্গল হেরাল্ড’। তার সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল সমাজের কুসংস্কার, অনাচার অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা। জনসাধারণের সমস্যা, অভাব, অভিযোগ কর্তৃপক্ষের নজরে আনা। সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে সচেতন করা।

১৮২৬ সালে হিন্দু-মুসলিম উভয়পক্ষের হয়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছে জুরি অ্যাক্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায় থেকে জুরি নির্বাচনের জন্য দাবি জানান। পূর্বে বিচার ব্যবস্থায় এ দুই সম্প্রদায়ের কাউকেই রাখা হতো না।

বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার জমিদার ও প্রজাদের স্বার্থবিরোধী সরকারের রাজস্ব নীতির বিরুদ্ধে রামমোহন ও তাঁর বন্ধুরা গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংকের নিকট ১৮২৯ সালে আরেকটি আবেদনপত্র পেশ করেন। প্রধানত রামমোহন রায়ের উদ্যোগে বিদেশী সরকারের নীতির বিরুদ্ধে জনসাধারণের প্রতিবাদগুলোর মধ্যেই জাতীয় চেতনাবোধের প্রাথমিক প্রকাশ পরিদৃষ্ট হয়।

ব্রিটিশদের প্রবর্তিত ভূমি ব্যবস্থায় কৃষকের দুর্দশার কথা তিনি ব্রিটিশ সংসদে উপস্থাপন করেন। পিতার সম্পদে নারীর অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা, বহুবিবাহ প্রথা বন্ধে সরব ছিলেন। তত্কালীন ব্রাহ্মণ সমাজের প্রথানুসারে বাবার নির্দেশে তাকে নয় বছর বয়সের মধ্যেই তিনবার বিয়ে করতে হয়। নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই পরবর্তী জীবনে তিনি বহুবিবাহ প্রথার তীব্র নিন্দা এবং বিরোধিতা করেন। তার ব্যক্তিগত উইলে শর্ত ছিল তার পুত্রদের মধ্য হতে কেউ এক স্ত্রী বর্তমান থাকাকালীন দ্বিতীয় বিবাহ করলে তার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চায়ও রাজা রামমোহন রায় নিজেকে একজন ব্যাকরণবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার লেখনীতে ফুটে উঠেছে অন্ধভাবে অদৃষ্টবাদের পরিবর্তে মানবনির্ভরতা, সাময়িকপত্র ও গদ্য সাহিত্যের বিকাশ। ১৮২৬ সালে তিনি ইংরেজিতে বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন। পরবর্তীতে ১৮৩৩ সালে স্কুল অব বুক সোসাইটির জন্য গ্রন্থটিকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়। নাম দেয়া হয় ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’ এটিই বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম কোনো ব্যাকরণ গ্রন্থ। পাঠপুস্তকের বাইরে তিনিই বাংলা গদ্য ব্যবহার শুরু করেছিলেন। পূর্বে উল্লিখিত গ্রন্থগুলো ছাড়া তার রচিত অন্যান্য সাহিত্য কর্মগুলো হলো পঞ্চোপনিষত্ (১৮১৬-১৮১৯), উত্সবানন্দ বিদ্যাবাগীশের সহিত বিচার (১৮১৬), ভট্টাচার্যের সহিত বিচার (১৮১৭), প্রবর্ত্তক নিবর্ত্তকের সম্বাদ (১৮১৮), আত্মনাত্মবিবেচক (১৮১৯), কবিতাকারের সহিত বিচার (১৮২০), ব্রাহ্মণ সেবধি ও মিসিনারী সম্বাদ (১৮২১), পাদরি ও শিষ্য সম্বাদ (১৮২৩), গুরুপাদুকা (১৮২৩), প্রার্থনা পত্র (১৮২৩), পথ্যপ্রদান (১৮২৩), কায়স্থের সহিত মদ্যপান বিষয়ক বিচার (১৮২৬), বজ সূচি (১৮২৭) ব্রাহ্মোপাসনা (১৮২৮), ব্রহ্মসঙ্গীত (১৮২৮), অনুষ্ঠান (১৮২৯), সহমরণ বিষয় (১৮২৯), ক্ষুদ্রপত্রী এবং গৌড়ীয় ব্যাকরণ (১৮৩৩); ৩. হিন্দি ভাষায় বেদান্ত গ্রন্থ (১৮১৫), বেদান্তসার (১৮১৫), সুব্রহ্মণ্য শাস্ত্রীর সহিত বিচার (১৮২০) ইত্যাদি। এ ছাড়াও ইংরেজি ভাষায় কিছু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

১৮৩০ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি কলকাতা থেকে বিলেত যাত্রা করেন। ১৮৩১ সালের ৮ এপ্রিল রামমোহন লিভারপুলে পৌঁছান। রামমোহন রায় ১৮৩১ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের দূত হিসেবে যুক্তরাজ্য ভ্রমণ করেন। ১৮৩২ সালের শেষের দিকে কিছুদিনের জন্য তিনি ফ্রান্সেও গিয়েছিলেন। ১৮৩৩ সালে এই মনীষী মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয়ে ব্রিস্টলের কাছে স্টেপল্?টনে মৃত্যুবরণ করেন। ব্রিস্টলে আর্নস ভ্যাল সমাধিস্থলে তাঁকে কবর দেয়া হয়। ১৯৯৭ সালে মধ্য ব্রিস্টলে তাঁর একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। ২০০৪ সালে বিবিসির জরিপকৃত সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় রাজা রামমোহন রায়ের অবস্থান দশম।

বাঙালির মধ্যে জাতীয় চেতনার উন্মেষ সাধনে রামমোহন রায়ের ভূমিকার কথা আজও সশ্রদ্ধচিত্তে উচ্চারিত হয়। তাঁর মাধ্যমেই বাঙালি সর্বপ্রথম মতৈক্য পোষণ করে সংঘবদ্ধ হয় এবং তাঁদের নিজস্ব মতামত প্রদানে সক্ষম ও উত্সাহী হয়। রামমোহন রায় বাঙালিকে জাতি হিসেবে আত্মপরিচয় সমৃদ্ধ করতে চেষ্টা করেছেন।

রামমোহন রায় সম্পর্কে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তি হলো, ‘বর্তমান বঙ্গসমাজের ভিত্তি স্থাপন করিয়াছেন রামমোহন রায়। আমরা সমস্ত বঙ্গবাসী তাঁহার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী, তাঁহার নির্মিত ভবনে বাস করিতেছি। তিনি আমাদের জন্য যে কত করিয়াছেন, কত করিতে পারিয়াছেন, তাহা ভালো করিয়া আলোচনা করিয়া দেখিলে তাঁহার প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি ও বিশ্বাস জন্মিবে। আমাদিগকে যদি কেহ বাঙালি বলিয়া অবহেলা করে আমরা বলিব, রামমোহন রায় বাঙালি ছিলেন।’ এই তো রামমোহন রায়।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

বিএনপির সংকট

নিউজ ডেস্ক

March 15, 2026

শেয়ার করুন


২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের মানুষের চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষায় এক আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে। মানুষ এখন আর শুধু ‘বাপ-মায়ের পরিচয়’ দিয়ে নেতৃত্ব মেনে নিতে নারাজ। এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে তারেক রহমান কেন বড় সংকটের মুখে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বইছে সমালোচনার ঝড়। চলুন নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করি তারেক রহমানের নেতৃত্বের কিছু প্রশ্নবিদ্ধ দিক।

১. শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক দূরত্ব

আধুনিক বিশ্বে একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নেতার যে একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড প্রয়োজন, তারেক রহমানের ক্ষেত্রে তা নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। উইকিপিডিয়া ও অন্যান্য তথ্যমতে, তিনি গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন এমন কোনো দাপ্তরিক রেকর্ড নেই। অক্সফোর্ড বা ক্যামব্রিজের মতো বিশ্বসেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় গত ১৭ বছরে তাঁকে কোনো সেমিনার বা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় দেখা যায়নি, যা একজন বৈশ্বিক নেতার জন্য অপরিহার্য ছিল।

২. লন্ডনের ১৭ বছর: নীরবতা না ইমেজ সংকট?

দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে অবস্থান করলেও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর বলিষ্ঠ উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। প্রবাসী ছাত্র বা বুদ্ধিজীবীদের মাঝে তিনি নিজের কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক ইমেজ তৈরি করতে পারেননি। প্রশ্ন উঠেছে, একজন নেতা হয়েও কেন তিনি আন্তর্জাতিক জনমত তৈরিতে ব্যর্থ হলেন?

৩. জীবনযাত্রার ব্যয় ও আয়ের উৎস নিয়ে ধোঁয়াশা

লন্ডনের মতো ব্যয়বহুল শহরে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে বসবাস করার জন্য প্রয়োজন বিপুল অর্থ। কিন্তু তারেক রহমান সেখানে কী ব্যবসা বা চাকরি করেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা জনসমক্ষে নেই। একজন পাবলিক লিডারের আয়ের উৎস স্বচ্ছ না থাকাটা রাজনৈতিক নৈতিকতার পরিপন্থী বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

৪. ৯০-এর আন্দোলন ও রাজনৈতিক অনুপস্থিতি

১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে যখন বেগম খালেদা জিয়া রাজপথে জীবন বাজি রেখে লড়ছিলেন, তখন ২৫ বছরের টগবগে যুবক তারেক রহমান ছিলেন পর্দার আড়ালে। তাঁর জীবনে রাজপথের লড়াইয়ের চেয়ে ‘ক্ষমতায় বসে রাজনীতি’ করার ইতিহাসই বেশি স্পষ্ট, যা ২০০১ সালের ‘হাওয়া ভবন’ কেন্দ্রিক রাজনীতিতে প্রমাণিত হয়েছে।

৫. নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা বনাম উত্তরাধিকার

জুলাই বিপ্লবের পর আজকের তরুণ সমাজ মেধা এবং কাজের ভিত্তিতে নেতৃত্ব দেখতে চায়। ডাকসু বা জাকসু নির্বাচনের সাম্প্রতিক ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মানুষ এখন আর বংশপরম্পরার রাজনীতিতে আস্থা রাখছে না। তারেক রহমানের আশেপাশে থাকা ব্যক্তিদের ইমেজও তাঁর নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।


গুগল অ্যানালাইসিস ও নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র (Sources):

১. উইকিপিডিয়া ও বায়োগ্রাফি রেকর্ড: তারেক রহমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রারম্ভিক রাজনৈতিক জীবন। ২. আন্তর্জাতিক মিডিয়া আর্কাইভ (বিবিসি, আল-জাজিরা): গত ১৭ বছরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারেক রহমানের উপস্থিতি ও বক্তব্যের রেকর্ড। ৩. নির্বাচন কমিশন ও হলফনামা রেকর্ড (২০০১, ২০০৮): তৎকালীন সময়ে বিএনপি নেতৃত্বের সম্পদ ও আয়ের বিবরণের তুলনা। ৪. বিডিএস বুলবুল আহমেদ সোশ্যাল অ্যানালিটিকস: জুলাই বিপ্লব পরবর্তী জেনারেশন জেড (Gen-Z) এর রাজনৈতিক পছন্দ ও নেতৃত্বের প্যারামিটার বিশ্লেষণ।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মেজর হাফিজ

নিউজ ডেস্ক

March 15, 2026

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একজন মানুষ কি খুঁজে পাওয়া সম্ভব, যিনি একাধারে রণাঙ্গনের শ্রেষ্ঠ বীর, বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তি এবং একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক? অবিশ্বাস্য মনে হলেও, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নতুন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ঠিক তেমনই এক জীবন্ত রূপকথা।

তারেক রহমানের এই একটি মনোনয়ন বাংলাদেশের রাজনীতির সব সমীকরণ বদলে দিয়েছে। কেন মেজর হাফিজকে বলা হয় ‘অলরাউন্ডার অফ দ্য সেঞ্চুরি’? চলুন জেনে নিই তাঁর জীবনের ৫টি রোমাঞ্চকর তথ্য।

১. বঞ্চিত এক ‘বীরশ্রেষ্ঠ’?

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়, মেজর হাফিজ ছিলেন যশোর সেনানিবাসের সেই অকুতোভয় বাঙালি অফিসার, যিনি প্রথম বিদ্রোহের পতাকা উড়িয়েছিলেন। তাঁর রণকৌশল আর সাহসিকতা দেখে সহযোদ্ধারা তাঁকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাব দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। শুধুমাত্র রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে তিনি সর্বোচ্চ খেতাব পাননি, কিন্তু সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তিনি ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ হয়েই আছেন।

২. পাকিস্তান দলের একমাত্র বাঙালি অধিনায়ক ও ‘দ্রুততম মানব’

আপনি কি জানেন, ফুটবল মাঠেও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজা?

  • তিনি পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের নেতৃত্ব দেওয়া ইতিহাসের একমাত্র বাঙালি।
  • ষাটের দশকে ট্র্যাকে তিনি ছিলেন দেশের ‘দ্রুততম মানব’ (Fastest Man)।
  • অ্যাথলেটিক্স, হকি আর ফুটবল—তিন জায়গাতেই তাঁর সমান শ্রেষ্ঠত্ব ছিল, যা বিশ্বের খুব কম মানুষেরই আছে।

৩. যখন তিনি ম্যারাডোনার ‘বিচারক’ হলেন!

সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি হলো বিশ্ব ফুটবলে তাঁর প্রভাব। ১৯৯৪ সালে যখন ফুটবল জাদুকর দিয়েগো ম্যারাডোনা ডোপ কেলেঙ্কারিতে জড়ান, তখন ফিফা যে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত বোর্ড গঠন করেছিল, তার অন্যতম সদস্য ছিলেন এই মেজর হাফিজ। ফিফাতে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল আকাশচুম্বী।

৪. ৭ বারের এমপি ও বর্তমান স্পিকার

রাজনীতির মাঠেও তিনি ক্লীন ইমেজের প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়ার ডাকে রাজনীতিতে এসে ভোলার লালমোহন-তজুমদ্দিন আসন থেকে টানা ৭ বার তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ২০২৬ সালের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁকে স্পিকারের আসনে বসানো সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য এক বড় প্রাপ্তি।

৫. আগামী দিনের রাষ্ট্রপতি?

সামরিক ডিসিপ্লিন, ফুটবল মাঠের গতি আর রাজনীতির প্রজ্ঞা—এই তিনের সংমিশ্রণ মেজর হাফিজকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর নাম আসার সম্ভাবনা প্রবল।


গুগল এনালাইসিস ও নির্ভরযোগ্য সূত্র (Sources):

  • বিএফএফ ও ফিফা আর্কাইভ: ম্যারাডোনা ডোপ টেস্ট ইনভেস্টিগেশন বোর্ড (১৯৯৪) মেম্বার লিস্ট।
  • মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়: বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্তদের অফিশিয়াল গেজেট।
  • সংসদ সচিবালয়: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার মনোনয়ন ও নির্বাচনী ইতিহাস।
  • বিডিএস বুলবুল আহমেদ পলিটিক্যাল অ্যানালিটিকস ২০২৬: বর্তমান সরকারের সংস্কার ও সংসদীয় নেতৃত্ব বিশ্লেষণ।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

শেখ হাসিনার ‘বিজেপি

নিউজ ডেস্ক

March 13, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

রাজনীতির মাঠে ‘স্মৃতিশক্তি’ বড় বিচিত্র এক বিষয়। প্রয়োজন ফুরোলে বা সমীকরণ বদলে গেলে নেতারা কত দ্রুত অতীতকে মুছে ফেলে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারেন, তার বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শেখ হাসিনার একদা করা বিজেপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার তুলনা। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি অতীতে এই দুই দলকেই একই রাজনৈতিক চরিত্রের বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। অথচ সময়ের বিবর্তনে সেই বিজেপি আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক অনিবার্য শক্তিকেন্দ্র।

১. ‘স্মৃতিশক্তি যখন রাজনীতির দাস’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন রাষ্ট্রনায়কের বক্তব্য শুধু বর্তমানের জন্য হয় না, তা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে। জামায়াতে ইসলামীর সাথে বিজেপিকে একই পাল্লায় মাপার সেই মন্তব্যটি মূলত বাবরি মসজিদ ইস্যু এবং তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ছিল। কিন্তু বর্তমানে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের যে ‘ফ্যাভিকল’ বন্ধন, তাতে এই পুরনো মন্তব্য যেন এক অমীমাংসিত অস্বস্তি। নরেন্দ্র মোদীর ‘অজ্ঞতা’ আসলে কোনো বিস্মৃতি নয়, বরং এটি কূটনীতির এক বিশেষ কৌশল—যেখানে অস্বস্তিকর অতীতকে উপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

২. আদভানি কানেকশন: এক রহস্যময় অতীত

প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, জামায়াত নেতাদের ভারত সফর এবং লালকৃষ্ণ আদভানির সাথে তাদের সংযোগ একদা বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিতর্কের ঝড় তুলেছিল। এখন প্রশ্ন উঠছে, যে দলটি ভারতের তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপির সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করেছিল, সেই দলটিই কেন পরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবল ভারতবিরোধী মেরুকরণের প্রধান শক্তি হয়ে উঠল? এই প্যারাডক্সটিই আজকের রাজনীতির সবচেয়ে বড় রহস্য।

৩. সোশ্যাল মিডিয়া ও ট্রল সংস্কৃতির প্রভাব

ডিজিটাল যুগে কিছুই হারিয়ে যায় না। নেটিজেনরা আজ পুরনো নিউজ ক্লিপিং খুঁড়ে বের করছেন, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য এক বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করছে। বিজেপির মতো শক্তিশালী দলের সাথে জামায়াতের তুলনাকে এখন ট্রলাররা ‘পলিটিক্যাল স্যাটায়ার’ হিসেবে দেখছেন। এটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ এখন রাজনীতির এই ‘ইউ-টার্ন’গুলোকে বেশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতেই পর্যবেক্ষণ করে।

৪. সুবিধাবাদ নাকি পরিস্থিতির দাবি?

রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই—এই প্রবাদের বাস্তব রূপ আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি। শেখ হাসিনার সেই সময়কার ‘লিবারেল’ ইমেজ বনাম বর্তমানের ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা—এই দুটি সত্তার সংঘাতই আসলে আমাদের বর্তমান কূটনীতির সারমর্ম। মোদীজির ‘বিস্মৃতি’ আসলে সেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞারই অংশ, যেখানে বন্ধুত্বের খাতিরে অতীতকে ঝেড়ে ফেলে ভবিষ্যতের লক্ষ্যপূরণই প্রধান কাজ।

বিডিএস বুলবুল আহমেদ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ:

রাজনৈতিক স্মৃতির এই সংকট কেবল শেখ হাসিনা বা নরেন্দ্র মোদীর নয়, এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক চিরন্তন রূপ। ইতিহাস যখন রাজনীতির দাস হয়ে যায়, তখন সত্যের চেয়ে সুবিধার পাল্লাই ভারি থাকে। আজকের এই ট্রল বা বিতর্ক হয়তো কিছুদিন পর চাপা পড়ে যাবে, কিন্তু এটি আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল যে, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বা মিত্র বাড়াতে নেতারা কত সহজে নিজের পুরনো অবস্থান বদলে ফেলতে পারেন। আর সাধারণ মানুষ? তারা কেবলই দর্শক, যারা এই ‘ইতিহাসের বিস্মৃতি’ দেখে মুচকি হাসে!


বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

দেশের রাজনৈতিক বিবর্তন ও সমসাময়িক খবরের গভীর বিশ্লেষণ পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

সূত্র: ১. তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদপত্রের আর্কাইভ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রতিবেদন। ২. দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক ও ক্ষমতার পালাবদল বিষয়ক বিশ্লেষণ।

৩রা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ