ইতিহাস

বিশ্বের কিছু দুর্লভ ছবি: মানবসভ্যতার অদেখা ইতিহাসের জানালা
বিশ্বের কিছু দুর্লভ ঐতিহাসিক ছবি

নিউজ ডেস্ক

December 1, 2025

শেয়ার করুন

পৃথিবীর ইতিহাস শুধু শব্দের বয়ান নয়—ইতিহাসের গভীরতম সত্যকে তুলে ধরে কিছু সাদা–কালো, বিবর্ণ, ধূলোমলিন ছবি। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া সেই দুর্লভ ছবিগুলো আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় একেকটি যুগে, যেখানে রাষ্ট্র, রাজনীতি, যুদ্ধ, কবিতা, বিজ্ঞান এবং মানব সভ্যতার প্রতিটি গৌরবময় ও বেদনাদায়ক মুহূর্ত বন্দি হয়ে আছে সময়ের মধ‍্যে।

নিচে তুলে ধরা হলো বিশ্বের কিছু অত্যন্ত বিরল ও ঐতিহাসিক মূল্যবান ছবি, যা শুধু ছবি নয়—সভ্যতার দলিল।

১. ব্রিটিশ পুলিশের হাতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর শেষ গ্রেফতার (১৯৪০)

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নেতাজির গুরুত্ব অপরিসীম। তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং শেষ গ্রেফতারের ছবি ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
১৯৪০ সালের জুলাই মাসে ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে কলকাতার এলগিন রোডের বাসা থেকে আটক করে। এই ছবিটি অত্যন্ত বিরল কারণ এই ঘটনার পরপরই নেতাজির রাজনৈতিক পথ নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা, গৃহবন্দি অবস্থা থেকে নাটকীয় পলায়ন এবং পরবর্তীতে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের সূচনা—সবকিছুর সূচনা এই ঐতিহাসিক গ্রেফতারের পর।

এই ছবিটি আজ স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের অন্যতম মূল্যবান প্রমাণ।

২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আলবার্ট আইনস্টাইনের মহাশিল্প–মহাবিজ্ঞানের সাক্ষাৎ (১৯২৬)

বিশ্ব সাহিত্য ও বিশ্ববিজ্ঞানের দুই মহাতারকার এই সাক্ষাৎ সভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।
আইনস্টাইনের আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ ১৯২৬ সালে তাঁর বাড়িতে যান, এবং দু’জনের মধ্যে হয় অসাধারণ দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক আলোচনা—
মানব সত্তা, ঈশ্বর, সত্য, সৌন্দর্য, সময়—সব কিছু নিয়ে।

তাঁদের ছবিগুলো শুধু একটি সাক্ষাৎকারের দলিল নয়, বরং প্রমাণ—
বিজ্ঞান ও সাহিত্য দুই স্রোত মিলেই মানুষের সভ্যতা।

৩. ১৯৩০ সালে ভগত সিং, সুখদেব ও রাজগুরুর মৃত্যুদণ্ডের সরকারি পোস্টার

ভারতের তিন বিপ্লবী—ভগত সিং, সুখদেব, রাজগুরু—যাদের নাম আজও সংগ্রামের প্রতীক। ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁদের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে যে পোস্টার প্রকাশ করে, তা ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

এই পোস্টার দেখলে বোঝা যায় স্বাধীনতার জন্য তরুণ বিপ্লবীরা কত কঠিন মূল্য দিয়েছেন।
এটি আজও ফরেনসিক আর্কাইভে সংরক্ষিত এবং ইতিহাস গবেষণায় চরম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৪. বার্লিনে অ্যাডলফ হিটলারের সঙ্গে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর ছবি (১৯৪২)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়। জার্মানিতে গিয়ে নেতাজির নাজি শাসকের সঙ্গে বৈঠকের বিরল ছবি আজও অনেক বিতর্কের জন্ম দেয়।
এই বৈঠকের মধ্য দিয়েই নেতাজির পরবর্তী রাজনৈতিক কৌশল স্পষ্ট হয়:

  • ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগ্রহ
  • INA বা আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের ভিত্তি তৈরি
  • দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয়দের নিয়ে সশস্ত্র বাহিনী তৈরির পরিকল্পনা

হিটলার–নেতাজির একই ফ্রেমে থাকা এই ছবিটি বিশ্বের বিরলতম রাজনৈতিক দলিলগুলোর একটি।

৫. ড. জন মুরের তোলা তাজমহলের প্রথম দিকের ছবি (১৮৫০-এর দশক)

তাজমহলের আজকের ঝকমকে সাদা রূপ দেখলেও ১৮৫০–এর দশকের তোলা ছবিগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা দেখায়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ড. জন মুরে প্রথমবারের মতো তাজমহলকে ছবিতে বন্দি করেছিলেন।

ছবিতে স্পষ্ট দেখা যায়—

  • পরিবেশ অনেকটাই নির্জন
  • তাজমহলের চারপাশে আধুনিক বাগান তৈরির কাজ তখনো হয়নি
  • নির্মাণসামগ্রীর ক্ষয়চিহ্নও দেখা যায়

এসব ছবিই তাজমহলের প্রথম ভিজ্যুয়াল নথি।

৬. নির্মীয়মাণ হাওড়া ব্রিজ—১৯৩০-এর দশক

আজকের হাওড়া ব্রিজ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং বিস্ময়।
কিন্তু ১৯৩০–এর দশকে যখন এটি তৈরি হচ্ছিল, তখন ভারত ব্রিটিশদের অধীনে আর্থ–রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্য দিয়ে চলছিল।

নির্মাণাধীন হাওড়া ব্রিজের ছবি—

  • বিশাল স্টিল প্লেটে ভরপুর গঙ্গার তীর
  • শ্রমিকদের নিরলস পরিশ্রম
  • অপরূপ কাঠামোগত ডিজাইন

এই ছবিগুলো কলকাতার ইতিহাসকে নতুন প্রাণ দেয়।

৭. শান্তিনিকেতনে তিন কিংবদন্তি—মরিস গুইয়ার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন

একই ছবি তিনটি মহামানবকে এক ফ্রেমে ধরে—

  • বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
  • শিক্ষাবিদ ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন
  • ফরাসি শিল্প–তত্ত্ববিদ মরিস গুইয়ার

শান্তিনিকেতন সে সময় বিশ্বশিক্ষার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।
এই ছবি শিক্ষাঙ্গন ও শিল্পচর্চার বিশ্বায়নের এক ঐতিহাসিক প্রমাণ।

৮. ভারতের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন—৯ ডিসেম্বর ১৯৪৬

এই ছবি ভারতের সংবিধান যাত্রার সূচনা।
স্বাধীনতা লাভের আগেই গণপরিষদ প্রথম বৈঠক করে, যেখানে ছিলেন:

  • ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ
  • জওহরলাল নেহরু
  • বি.আর. আম্বেদকর
  • মৌলানা আজাদ
  • সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন

এই ছবি শুধু একটি সভার নয়—একটি নতুন রাষ্ট্র জন্ম নেওয়ার মুহূর্তের দলিল।

৯. দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের প্রথমদিকের ইঞ্জিন (১৮৮০-এর দশক)

বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করা দার্জিলিং “টয় ট্রেন” ১৮৮০-এর দশকে প্রথম চালু হয়।
এই পুরোনো ছবিতে দেখা যায়—

  • ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারদের ধাতব নকশা
  • পাহাড় কেটে তৈরি রেললাইন
  • হিমালয় পাদদেশে রেল পরিবহনের সূচনা

এটি ভারতের রেলওয়ে ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ।

উপসংহার

এই ছবিগুলো সময়কে থামিয়ে রেখেছে।
নেতাজির সংগ্রাম, রবীন্দ্রনাথ–আইনস্টাইনের সাক্ষাৎ, ভগত সিংয়ের রায়, তাজমহলের প্রথম নথি, হাওড়া ব্রিজের নির্মাণ, দার্জিলিং রেলের জন্ম—সব মিলিয়ে এগুলো মানব সভ্যতার একেকটি মূল্যবান মানচিত্র।

ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় নয়—ছবির অমর স্মৃতিতেও বেঁচে থাকে।
এইসব দুর্লভ ছবি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—

সময়ের ওপারে আছে এক বিস্ময়কর পৃথিবী, যা আজও আমাদের ভিতরে অনুরণন তোলে।


সূত্রসমূহ

১. Netaji Research Bureau Archives
২. British India Police Records
৩. The Nobel Prize Foundation Archives
৪. The Einstein Archives, Jerusalem
৫. National Archives of India
৬. German Federal Archives (Bundesarchiv)
৭. British Library Photo Collection
৮. Calcutta Municipal & TOI Historical Archives
৯. Visva-Bharati University Digital Collection
১০. Indian Railways Heritage Directorate

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

মেজর হাফিজ

নিউজ ডেস্ক

March 15, 2026

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একজন মানুষ কি খুঁজে পাওয়া সম্ভব, যিনি একাধারে রণাঙ্গনের শ্রেষ্ঠ বীর, বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তি এবং একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক? অবিশ্বাস্য মনে হলেও, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নতুন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ঠিক তেমনই এক জীবন্ত রূপকথা।

তারেক রহমানের এই একটি মনোনয়ন বাংলাদেশের রাজনীতির সব সমীকরণ বদলে দিয়েছে। কেন মেজর হাফিজকে বলা হয় ‘অলরাউন্ডার অফ দ্য সেঞ্চুরি’? চলুন জেনে নিই তাঁর জীবনের ৫টি রোমাঞ্চকর তথ্য।

১. বঞ্চিত এক ‘বীরশ্রেষ্ঠ’?

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়, মেজর হাফিজ ছিলেন যশোর সেনানিবাসের সেই অকুতোভয় বাঙালি অফিসার, যিনি প্রথম বিদ্রোহের পতাকা উড়িয়েছিলেন। তাঁর রণকৌশল আর সাহসিকতা দেখে সহযোদ্ধারা তাঁকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাব দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। শুধুমাত্র রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে তিনি সর্বোচ্চ খেতাব পাননি, কিন্তু সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তিনি ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ হয়েই আছেন।

২. পাকিস্তান দলের একমাত্র বাঙালি অধিনায়ক ও ‘দ্রুততম মানব’

আপনি কি জানেন, ফুটবল মাঠেও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজা?

  • তিনি পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের নেতৃত্ব দেওয়া ইতিহাসের একমাত্র বাঙালি।
  • ষাটের দশকে ট্র্যাকে তিনি ছিলেন দেশের ‘দ্রুততম মানব’ (Fastest Man)।
  • অ্যাথলেটিক্স, হকি আর ফুটবল—তিন জায়গাতেই তাঁর সমান শ্রেষ্ঠত্ব ছিল, যা বিশ্বের খুব কম মানুষেরই আছে।

৩. যখন তিনি ম্যারাডোনার ‘বিচারক’ হলেন!

সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি হলো বিশ্ব ফুটবলে তাঁর প্রভাব। ১৯৯৪ সালে যখন ফুটবল জাদুকর দিয়েগো ম্যারাডোনা ডোপ কেলেঙ্কারিতে জড়ান, তখন ফিফা যে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত বোর্ড গঠন করেছিল, তার অন্যতম সদস্য ছিলেন এই মেজর হাফিজ। ফিফাতে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল আকাশচুম্বী।

৪. ৭ বারের এমপি ও বর্তমান স্পিকার

রাজনীতির মাঠেও তিনি ক্লীন ইমেজের প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়ার ডাকে রাজনীতিতে এসে ভোলার লালমোহন-তজুমদ্দিন আসন থেকে টানা ৭ বার তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ২০২৬ সালের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁকে স্পিকারের আসনে বসানো সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য এক বড় প্রাপ্তি।

৫. আগামী দিনের রাষ্ট্রপতি?

সামরিক ডিসিপ্লিন, ফুটবল মাঠের গতি আর রাজনীতির প্রজ্ঞা—এই তিনের সংমিশ্রণ মেজর হাফিজকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর নাম আসার সম্ভাবনা প্রবল।


গুগল এনালাইসিস ও নির্ভরযোগ্য সূত্র (Sources):

  • বিএফএফ ও ফিফা আর্কাইভ: ম্যারাডোনা ডোপ টেস্ট ইনভেস্টিগেশন বোর্ড (১৯৯৪) মেম্বার লিস্ট।
  • মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়: বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্তদের অফিশিয়াল গেজেট।
  • সংসদ সচিবালয়: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার মনোনয়ন ও নির্বাচনী ইতিহাস।
  • বিডিএস বুলবুল আহমেদ পলিটিক্যাল অ্যানালিটিকস ২০২৬: বর্তমান সরকারের সংস্কার ও সংসদীয় নেতৃত্ব বিশ্লেষণ।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

শেখ হাসিনার ‘বিজেপি

নিউজ ডেস্ক

March 13, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

রাজনীতির মাঠে ‘স্মৃতিশক্তি’ বড় বিচিত্র এক বিষয়। প্রয়োজন ফুরোলে বা সমীকরণ বদলে গেলে নেতারা কত দ্রুত অতীতকে মুছে ফেলে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারেন, তার বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শেখ হাসিনার একদা করা বিজেপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার তুলনা। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি অতীতে এই দুই দলকেই একই রাজনৈতিক চরিত্রের বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। অথচ সময়ের বিবর্তনে সেই বিজেপি আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক অনিবার্য শক্তিকেন্দ্র।

১. ‘স্মৃতিশক্তি যখন রাজনীতির দাস’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন রাষ্ট্রনায়কের বক্তব্য শুধু বর্তমানের জন্য হয় না, তা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে। জামায়াতে ইসলামীর সাথে বিজেপিকে একই পাল্লায় মাপার সেই মন্তব্যটি মূলত বাবরি মসজিদ ইস্যু এবং তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ছিল। কিন্তু বর্তমানে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের যে ‘ফ্যাভিকল’ বন্ধন, তাতে এই পুরনো মন্তব্য যেন এক অমীমাংসিত অস্বস্তি। নরেন্দ্র মোদীর ‘অজ্ঞতা’ আসলে কোনো বিস্মৃতি নয়, বরং এটি কূটনীতির এক বিশেষ কৌশল—যেখানে অস্বস্তিকর অতীতকে উপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

২. আদভানি কানেকশন: এক রহস্যময় অতীত

প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, জামায়াত নেতাদের ভারত সফর এবং লালকৃষ্ণ আদভানির সাথে তাদের সংযোগ একদা বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিতর্কের ঝড় তুলেছিল। এখন প্রশ্ন উঠছে, যে দলটি ভারতের তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপির সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করেছিল, সেই দলটিই কেন পরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবল ভারতবিরোধী মেরুকরণের প্রধান শক্তি হয়ে উঠল? এই প্যারাডক্সটিই আজকের রাজনীতির সবচেয়ে বড় রহস্য।

৩. সোশ্যাল মিডিয়া ও ট্রল সংস্কৃতির প্রভাব

ডিজিটাল যুগে কিছুই হারিয়ে যায় না। নেটিজেনরা আজ পুরনো নিউজ ক্লিপিং খুঁড়ে বের করছেন, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য এক বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করছে। বিজেপির মতো শক্তিশালী দলের সাথে জামায়াতের তুলনাকে এখন ট্রলাররা ‘পলিটিক্যাল স্যাটায়ার’ হিসেবে দেখছেন। এটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ এখন রাজনীতির এই ‘ইউ-টার্ন’গুলোকে বেশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতেই পর্যবেক্ষণ করে।

৪. সুবিধাবাদ নাকি পরিস্থিতির দাবি?

রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই—এই প্রবাদের বাস্তব রূপ আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি। শেখ হাসিনার সেই সময়কার ‘লিবারেল’ ইমেজ বনাম বর্তমানের ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা—এই দুটি সত্তার সংঘাতই আসলে আমাদের বর্তমান কূটনীতির সারমর্ম। মোদীজির ‘বিস্মৃতি’ আসলে সেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞারই অংশ, যেখানে বন্ধুত্বের খাতিরে অতীতকে ঝেড়ে ফেলে ভবিষ্যতের লক্ষ্যপূরণই প্রধান কাজ।

বিডিএস বুলবুল আহমেদ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ:

রাজনৈতিক স্মৃতির এই সংকট কেবল শেখ হাসিনা বা নরেন্দ্র মোদীর নয়, এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক চিরন্তন রূপ। ইতিহাস যখন রাজনীতির দাস হয়ে যায়, তখন সত্যের চেয়ে সুবিধার পাল্লাই ভারি থাকে। আজকের এই ট্রল বা বিতর্ক হয়তো কিছুদিন পর চাপা পড়ে যাবে, কিন্তু এটি আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল যে, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বা মিত্র বাড়াতে নেতারা কত সহজে নিজের পুরনো অবস্থান বদলে ফেলতে পারেন। আর সাধারণ মানুষ? তারা কেবলই দর্শক, যারা এই ‘ইতিহাসের বিস্মৃতি’ দেখে মুচকি হাসে!


বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

দেশের রাজনৈতিক বিবর্তন ও সমসাময়িক খবরের গভীর বিশ্লেষণ পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

সূত্র: ১. তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদপত্রের আর্কাইভ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রতিবেদন। ২. দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক ও ক্ষমতার পালাবদল বিষয়ক বিশ্লেষণ।

ইরান-ইসরায়েল

নিউজ ডেস্ক

March 13, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

ইরান ও ইসরায়েলের সম্পর্কের সমীকরণটি আধুনিক ভূ-রাজনীতির অন্যতম জটিল ও রহস্যময় অধ্যায়। ১৯৫০-এর দশকে যে ইরান ছিল ইসরায়েলের কৌশলগত মিত্র, আজ সেই ইরান ও ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান দুই শত্রু রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এই বৈরিতার মূল কারণ কি কেবল ধর্মীয় আদর্শ, নাকি এর পেছনে রয়েছে টিকে থাকার গভীর রাজনৈতিক প্রকৌশল?

১. ঐতিহাসিক বাঁকবদল: মিত্র থেকে শত্রু

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগ পর্যন্ত ইরান ছিল ইসরায়েলের অন্যতম মিত্র। তৎকালীন শাহের শাসনামলে ইরান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং সোভিয়েত প্রভাব ঠেকানোর জন্য তারা গোপন সামরিক সহযোগিতা বজায় রাখত। এমনকি ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও ইসরায়েল থেকে গোপনে অস্ত্র কেনার ইতিহাস রয়েছে ইরানের। তবে আয়াতুল্লাহ খোমেনীর ক্ষমতা গ্রহণের পর এই সম্পর্কের খোলনলচে বদলে যায়। তেহরানে অবস্থিত ইসরায়েলি দূতাবাসকে প্যালেস্টাইনের দূতাবাসে রূপান্তর করার মাধ্যমে ইরান স্পষ্ট করে দেয় তাদের নতুন রাজনৈতিক এজেন্ডা।

২. দ্বন্দ্বে আদর্শ বনাম বাস্তব রাজনীতি

ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে কোনো সাধারণ সীমান্ত না থাকা সত্ত্বেও কেন এই চরম শত্রুতা?

  • পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা: ইসরায়েলের মূল ভয় হলো ইরানের পারমাণবিক ক্ষমতা। নেতানিয়াহুর ভাষায় ইরানকে ‘মিথ্যাবাদী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তারা নিয়মিত ইরানি বিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তাদের টার্গেট করছে।
  • অস্তিত্বের সংকট: ইরান ইসরায়েলকে ‘ছোট শয়তান’ এবং আমেরিকাকে ‘গ্রেট শয়তান’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। এই বয়ানটি ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে অভ্যন্তরীণভাবে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে এবং তরুণ প্রজন্মের মাঝে ‘অ্যান্টি-জায়নিস্ট’ আবেগ জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করে।

৩. ছায়াযুদ্ধ (Proxy War): টিকে থাকার কৌশল

সরাসরি যুদ্ধের সামর্থ্য বা আকাঙ্ক্ষা—দুইয়ের অভাবেই ইরান ও ইসরায়েল সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়ে ‘ছায়াযুদ্ধ’ চালিয়ে যাচ্ছে।

  • ইরানের প্রক্সি: লেবাননের হিজবুল্লাহ, সিরিয়ার শিয়া মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুতিদের মাধ্যমে ইসরায়েলের সীমান্তে অস্থিরতা তৈরি করা ইরানের কৌশল।
  • ইসরায়েলের মোসাদ: মোসাদের নিখুঁত গোয়েন্দা সক্ষমতা ইরানের পরমাণু কর্মসূচীকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। জেনারেল ও বিজ্ঞানীদের হত্যা ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

৪. মৌলবাদ ও ক্ষমতার টিকে থাকা

রাজনীতিবিদদের জন্য ‘কাল্পনিক শত্রু’ তৈরি করা একটি চিরাচরিত কৌশল। যেমনটা বিভিন্ন দেশে জাতীয়তাবাদী দলগুলো করে থাকে, ইরানও তেমনি ইসরায়েল বিরোধিতাকে পুঁজি করে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ও দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপকে আড়াল করছে। অন্যদিকে, উগ্রপন্থী ইহুদিদের জন্য ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ বা নিরাপত্তার ইস্যুটি তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।

বিডিএস বুলবুল আহমেদ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ:

ইরান ও ইসরায়েলের দ্বন্দ্ব কেবল দুটি রাষ্ট্রের যুদ্ধ নয়, এটি ক্ষমতার টিকে থাকার লড়াই। ইরান জানে সরাসরি যুদ্ধ করলে তারা দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের উন্নত প্রযুক্তি ও মার্কিন সমর্থিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে টিকতে পারবে না। একইভাবে ইসরায়েলও জানে, ইরানকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব নয়। ফলে এই ‘ছায়াযুদ্ধ’ই যেন উভয় রাষ্ট্রের জন্য ‘কমফোর্ট জোন’। যতদিন পর্যন্ত এই শত্রুতা তাদের নিজ নিজ দেশে জনমত গঠন ও ক্ষমতায় টিকে থাকতে সাহায্য করবে, ততদিন সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে এই উত্তেজনাকর শীতল যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে।


বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বিশ্ব রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের গভীর বিশ্লেষণ পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।


সূত্র: ১. ইরান ও ইসরায়েলের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক রেকর্ডসমূহ। ২. আধুনিক ভূ-রাজনীতি ও প্রক্সি যুদ্ধের কৌশল বিষয়ক গবেষণাপত্র। ৩. ইরান-কনট্রা চুক্তি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।

১লা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ