গল্প
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ভূমিকা:
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম অমর সাহিত্যিক ও অধ্যাপক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় শুধু তাঁর লেখনির জন্যই নয়, বরং তাঁর আচার-আচরণ এবং আড্ডার জন্যও খুব পরিচিত ছিলেন। তার সহজ সরল জীবনযাপন এবং দারুণ হাস্যরসের অনুভব মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। তবে, একবার তার বাড়িতে ইলিশ মাছের দাম নিয়ে যা ঘটেছিল, তা সত্যিই বেশ মজার ও শিক্ষণীয় ঘটনা হয়ে উঠেছিল।
ইলিশের স্বাদ ও দাম:
গল্পটি এমন— একদিন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তার বাড়িতে বিশাল সাইজের তাজা পদ্মার ইলিশ দেখে অত্যন্ত খুশি হন। পাকা মাছের গন্ধ আর রং দেখে তার মনটাই আনন্দে ভরে উঠেছিল। যেহেতু ইলিশ মাছ এক অমূল্য উপাদান, বিশেষত বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে, তাই তার স্ত্রী আশা জানতে চাইলেন ইলিশের দাম কত পড়েছে। নারায়ণ বাবু একটু বিজয়ী ভঙ্গিতে দাম বললেন, “সাড়ে চার টাকা সের।”
এটা শুনে, আশা প্রথমে একটু অবাক হলেও খুব খুশি হলেন। তিনি বললেন, “এত কম দাম! এটা তো অনেক ভালো লাগছে।” তবে, একটু হিসেব করে আশা জানতে চাইলেন— “অসীম মাছের সওয়া দু’সের ওজন, বাজারে তো এর দাম অন্তত সাত টাকা সের হবে।”
মাছের দরদাম:
এটাই ছিল তার মজার হাস্যরস। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় নিজের মাছ বিক্রির কৌশল নিয়ে এক কৌশলী মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বললেন, “আরে, আমি তো নবেন্দু ঘোষ-এর মতো ভাল দরদাম করতে জানি না, কিন্তু সে ভালো দাম করে। তুমি যদি মাছওলা হতেও সাত টাকা বললে, আমি তো সাড়ে সাত টাকা দিয়েই কিনে আসতাম।”
এখানে যে কথাটি আসল, তা হল নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় একটি অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক এবং দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্বের উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন। নবেন্দু ঘোষ ছিলেন তার আড্ডার বন্ধু, যারা সবকিছুতেই একে অপরকে সহায়তা করতেন, এবং এই ঘটনা সেই বন্ধুত্বের মজা পূর্ণরূপে প্রকাশ করেছে।
বাজারে সফর ও শ্রদ্ধা:
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তার বন্ধু নবেন্দু ঘোষ-কে মাছের বাজার দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে মাছের প্রতিটি জাতের গুণগত মান পর্যালোচনা করা হচ্ছিল। সেখানে বিভিন্ন মাছের দাম নিয়ে তারা আলোচনা করছিলেন, কিন্তু নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় যখন দেখতে পেলেন রজতশুভ্র ইলিশ, তার চোখ চকচক করে উঠল। তিনি পদ্মার ইলিশ নিয়ে খুব আগ্রহী হয়ে উঠলেন এবং খুব দ্রুত বাজারের দাম কমানোর প্রক্রিয়া শুরু করলেন।
ইলিশের মাছ বিক্রেতা তাকে মিষ্টি সুরে বললেন, “সাড়ে ছ’টাকা সের”। নারায়ণ বাবু একটু বাজারী কৌশলে বললেন, “না, পাঁচ টাকায় দাও।” তবে, বিক্রেতা সেটি সম্ভব না বলায়, শেষ পর্যন্ত তারা সাড়ে ছ’টাকা দিয়েই কিনে নিলেন। নবেন্দু ঘোষও একই সাইজের মাছ কিনলেন।
গল্পের মূল্যবান শিক্ষা:
একবার বাজার থেকে ফেরার পথে, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তার বন্ধু নবেন্দু ঘোষকে বললেন, “এটা একটু বেশি দাম হয়ে গেল!” তবে, নবেন্দু তাকে শান্ত রেখে বললেন, “কী হয়েছে? পদ্মার ইলিশ আমরা তো অপমান করতে পারি না। এটি আমাদের দেশের ঐতিহ্য।”
এটি ছিল এক অমূল্য শিক্ষা যে, কীভাবে আমরা কিছু সাশ্রয়ী সিদ্ধান্ত নিয়ে অভিজ্ঞান এবং ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে জীবনে চলতে পারি।
গৃহস্থালি পরামর্শ ও জীবনের বাস্তবতা:
এখানে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তার গিন্নি আশাকে অন্তর্নিহিত পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, “বাড়িতে গিয়ে আসল দামটা বলব না, বলব সাড়ে চার টাকা সের! কী বলো?”
এটা আসলে ছিল এক ধরনের হাস্যরস এবং জীবনযাত্রার একান্ত বাস্তবতা, যেখানে দামে মনোযোগ দেয়া ছাড়াও গৃহস্থালি সম্পর্কগুলোর মাধুর্য এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষিত বুঝতে হবে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের এই হাস্যরস আমাদের দেখায় যে, তিনি শুধু একজন সাহিত্যিক বা অধ্যাপকই নন, বরং তিনি একজন ব্যক্তিত্বপূর্ণ মানুষ যিনি তার রসবোধ এবং নীতির মাধ্যমে জীবনের কঠিন এবং মজা করা মুহূর্তগুলো মোকাবিলা করতেন।
উপসংহার:
এই গল্পটি শুধু ইলিশ মাছের দাম নিয়ে একটি হাস্যরসের ঘটনা নয়, এটি আমাদের জীবনে একটি মূল্যবান শিক্ষা দেয় যে, আমরা কীভাবে বন্ধু, পরিবার এবং জীবনকে আনন্দের সাথে সামলাতে পারি এবং কেন আমাদের রসবোধ ও হাস্যরসের প্রয়োজন রয়েছে।
এখানে, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তার জীবনের আনন্দদায়ক এবং বুদ্ধিদীপ্ত পন্থার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে, জীবনকে হাস্যরসে পূর্ণ রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
বিষয়ঃ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
নওগাঁ: ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে সম্রাট শাহজাহানের তাজমহলের কথা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তবে বাংলার নিভৃত পল্লী নওগাঁর ধামইরহাটে লুকিয়ে আছে এক অন্যরকম প্রেমগাথা। রূপকথার গল্পের মতো মনে হলেও, কথিত পাল বংশের রাজা চান্দিলাল পাল তাঁর প্রিয়তমা রানির জীবন বাঁচাতে ৩৬৫টি পুকুর খনন করে এক অবিস্মরণীয় নজির স্থাপন করেছিলেন। ১৯০০ সালের পুরনো নথি থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের পর্যটন সম্ভাবনা—সবক্ষেত্রেই এই ‘চকচান্দিরা’ গ্রামটি আজও কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।
৩৬৫ পুকুরের নেপথ্যে এক অলৌকিক প্রেম
অষ্টাদশ শতাব্দীর এই লোকগাঁথা অনুযায়ী, রাজা চান্দিলাল পাল তাঁর দ্বিতীয় রানিকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। হঠাৎ রানি এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে রাজ্যের কোনো কবিরাজই তাঁকে সুস্থ করতে পারছিলেন না। অবশেষে এক দক্ষ হাকিমের পরামর্শে রাজা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। হাকিমের বিধান ছিল— ৩৬৫টি পুকুর খনন করে রানিকে প্রতিদিন একটি নতুন পুকুরে স্নান করাতে হবে।
স্ত্রীর প্রতি অগাধ ভালোবাসায় রাজা কালক্ষেপণ না করে দ্রুত প্রজাদের সহায়তায় পুকুর খনন শুরু করেন। প্রতিদিন একটি করে পুকুর খনন হতো আর রানি সেখানে স্নান করতেন। এভাবে এক বছর পর রানি পূর্ণ সুস্থতা লাভ করেন। আজও নওগাঁর ধামইরহাটের ইসবপুর ইউনিয়নের চকচান্দিরা গ্রামে এই পুকুরগুলোর অস্তিত্ব রাজার সেই ভালোবাসার সাক্ষ্য দিচ্ছে।
‘দুই সতিনের পুকুর’ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (১৯০০-২০২৬)
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, রানি সুস্থ হওয়ার পর দুই রানিকে নিয়ে রাজা সুখে শান্তিতে বসবাস করতেন। তাঁদের স্নানের জন্য আলাদা দুটি পুকুর ছিল যা আজও ‘দুই সতিনের পুকুর’ নামে পরিচিত।
- ১৯০০ সাল থেকে বর্তমান: বিগত এক শতাব্দী ধরে এই পুকুরগুলো স্থানীয়দের কাছে বিস্ময় হয়ে আছে। ১৯০০ সালের শুরুর দিকের গেজেটিয়ারগুলোতেও এই অঞ্চলের প্রাচীন নিদর্শনের উল্লেখ পাওয়া যায়।
- ২০২৪-২০২৫ এর সংস্কার: ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান সরকার দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ও পর্যটন এলাকাগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৫ সাল জুড়ে বন বিভাগ এই পুকুর পাড়গুলোতে বিশাল বনায়ন কর্মসূচি পালন করেছে।
- ২০২৬: পর্যটন সম্ভাবনা: আজ ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে চকচান্দিরা গ্রামে ১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বন বিভাগের নিজস্ব সবুজ বনায়ন পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। বনের পাখির কলরব আর শান্ত দিঘিগুলোর পরিবেশ ভ্রমণপিপাসুদের মুগ্ধ করছে।
বক্তাদের ভাষ্য ও বর্তমান অবস্থা
এলাকার প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, তারা বাপ-দাদাদের কাছ থেকে এই গল্প শুনে আসছেন। তবে একটি বিষয় নিয়ে সবার আক্ষেপ রয়ে গেছে।
- স্থানীয়দের দাবি: “৩৬৫টি পুকুর দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো অনুন্নত। রাস্তাঘাট ভালো হলে এটি দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র হতে পারতো।”
- বিশ্লেষকদের মতে: “১৯০০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এই পুরাকীর্তিগুলো অবহেলিত। ২০২৬ সালে পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে হলে নওগাঁর এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা প্রয়োজন।”
উপসংহার: ইতিহাসের পাতায় চান্দিলাল পাল
রাজা চান্দিলাল পাল হয়তো শাহজাহানের মতো শ্বেতপাথরের তাজমহল গড়েননি, কিন্তু ৩৬৫টি পুকুর খনন করে প্রকৃতির মাঝে যে তাজমহল তিনি তৈরি করেছেন, তা অতুলনীয়। ভালোবাসার জন্য মানুষ কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে পারে, নওগাঁর এই পুকুরগুলো তার এক জীবন্ত প্রমাণ। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের দায়িত্ব এই অমূল্য সম্পদকে সংরক্ষণ করা।
বিশ্লেষণ: ঐতিহাসিকভাবে পাল বংশের শাসনের সাথে এই গল্পের যোগসূত্র পাওয়া যায়। যদিও অনেক ক্ষেত্রে এটি লোকজ বিশ্বাস, কিন্তু ৩৬৫টি পুকুরের বাস্তব উপস্থিতি প্রমাণ করে যে এর পেছনে বিশাল কোনো রাজকীয় উদ্যোগ ছিল। এটি কেবল প্রেমগাথা নয়, বরং প্রাচীন বাংলার জলাশয় ব্যবস্থাপনা ও প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য উদাহরণ।
সূত্র: নওগাঁ জেলা প্রত্নতাত্ত্বিক গাইড, স্থানীয় মৌখিক ইতিহাস ও লোকগাঁথা, বন বিভাগ রিপোর্ট (২০২৫-২৬), এবং বাংলাদেশ প্রতিদিন জেলা প্রতিনিধি প্রতিবেদন।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ঢাকা: বাঙালির পাতে ইলিশ মানেই এক উৎসবের আমেজ। কিন্তু এই ইলিশের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা কি কেবলই স্বাদের কারণে, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গূঢ় রহস্য? সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইলিশের গঠন এবং এর জনপ্রিয়তার পেছনে ‘ইলুমিনাতি’ বা কোনো বিশেষ চক্রান্তের তত্ত্ব নিয়ে মুখরোচক আলোচনা শুরু হয়েছে। ঘটনার গভীরে গিয়ে খতিয়ে দেখতেই বেরিয়ে এল চমকপ্রদ সব তথ্য, যা ১৯০০ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যন্ত বিস্তৃত।
সংখ্যা ও জ্যামিতিক বিশ্লেষণ: শুধুই কি কাকতালীয়?
ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া এক বিশ্লেষণে দাবি করা হচ্ছে, ইলিশ মাছের মাথাটি প্রায় ত্রিকোণাকার এবং ঠিক মাঝখানে একটি বড় চোখ থাকে—যা অনেকটা প্রাচীন রহস্যময় সংগঠন ‘ইলুমিনাতি’র লোগোর মতো। এখানেই শেষ নয়, বাংলা ‘ইলিশ’ লিখতে তিনটি বর্ণ লাগে, যা ত্রিকোণের তিন বাহুকে নির্দেশ করে বলে অনেকে মত দিচ্ছেন। এমনকি ইংরেজি ‘Ilish’ শব্দের বর্ণগুলোর সংখ্যাতাত্ত্বিক যোগফল (i=৯, l=১২, i=৯, s=১৯, h=৮) করলে দাঁড়ায় ৫৭। ৫ ও ৭ যোগ করলে হয় ১২, আর ১ ও ২ যোগ করলে হয় ৩। এই ‘৩’ সংখ্যাটি বারবার ফিরে আসায় অনেক নেটিজেন একে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হিসেবে দেখছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সম্পূর্ণ বিনোদনমূলক একটি তত্ত্ব, যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
১৯০০ থেকে ২০২৬: রাজনীতি ও ইলিশের কূটনীতি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বাঁকবদলে ইলিশ বারবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ১৯০০ সালের শুরুর দিকে যখন বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন দানা বাঁধছিল, তখন থেকেই ইলিশ ছিল পূর্ব বাংলার অর্থনীতির প্রাণ।
- ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা: মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং পরবর্তী দেশ গঠন প্রক্রিয়ায় ইলিশকে জাতীয় মাছ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে ইলিশকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
- পরবর্তী দশকগুলো: আশির ও নব্বইয়ের দশকে সামরিক শাসন ও এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়ও ইলিশ ছিল সাধারণ মানুষের আক্ষেপের নাম।
- ২০২৪-২০২৫: ছাত্র-জনতার বিপ্লব ও পটপরিবর্তন: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে এক নতুন রাজনৈতিক দিগন্তের সূচনা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০২৫ সাল জুড়ে ইলিশের পাচার রোধ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার জন্য ব্যাপক সংস্কারমূলক কাজ করা হয়।
- ২০২৬: বর্তমান প্রেক্ষাপট: আজ ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ সরকার ইলিশের অভয়াশ্রম রক্ষায় যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়েছিল, তা ফল দিতে শুরু করেছে। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সাল নাগাদ ইলিশের উৎপাদন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বক্তাদের ভাষ্য ও আলোচনা
বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সেমিনার ও টকশোতে ইলিশ নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে:
- ২০২৫ সালের এক অনুষ্ঠানে এক অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন: “ইলিশ কেবল মাছ নয়, এটি আমাদের জিডিপির ১ শতাংশের বেশি অবদান রাখা এক রাজনৈতিক শক্তি।”
- পরিবেশবাদীদের মতে: “১৯০০ সাল থেকে যে নদীমাতৃক বাংলাদেশের পরিচয় গড়ে উঠেছে, ইলিশ তার হৃদপিণ্ড। একে নিয়ে যেকোনো গুজব বা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব মূলত আমাদের সংস্কৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা।”
উপসংহার: সতর্কতা না কি উপভোগ?
ইলিশের জনপ্রিয়তার পেছনে কোনো ‘ষড়যন্ত্র’ থাকুক বা না থাকুক, বাঙালির রসনাবিলাসে এর কোনো বিকল্প নেই। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে যাতে ইলিশ নিয়ে কোনো ভিত্তিহীন গুজব আমাদের জাতীয় সম্পদকে হেয় না করে। ইলিশ খাওয়ার আগে বা নাম উচ্চারণের আগে ২০ বার ভাবার চেয়ে বড় ভাবনার বিষয় হওয়া উচিত—কিভাবে আমাদের এই অমূল্য সম্পদকে বিশ্ববাজারে আরও দামী করা যায়।
বিশ্লেষণ: ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, ১৯০০ সাল থেকে শুরু করে প্রতিটি রাজনৈতিক ক্রান্তিলগ্নে ইলিশ ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। ২০২৪-এর বিপ্লব পরবর্তী ২০২৬-এর এই সময়ে দাঁড়িয়ে ইলিশ নিয়ে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব মূলত জেনারেশন জেড বা তরুণ প্রজন্মের একটি হাস্যরসাত্মক সামাজিক মাধ্যম ট্রেন্ড। তবে এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই।
সূত্র: গুগল ট্রেন্ডস অ্যানালাইসিস (২০২৪-২০২৬), মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় রিপোর্ট, যুগান্তর ও বাংলাদেশ প্রতিদিন আর্কাইভ, এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সেমিনারের কার্যবিবরণী।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস শুধু ক্ষমতার পালাবদলের নয়, এ ইতিহাস সাধারণ মানুষের বঞ্চনা আর অধিকার আদায়ের। প্রখ্যাত কৃষক নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশ এবং মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সহচর মামদু শেখের সেই করুণ কাহিনী আজ ২০২৬ সালের দাঁড়িয়েও আমাদের সমাজব্যবস্থার গভীর ক্ষতকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
মামদু শেখের না পাওয়া: একটি দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস

সৈয়দ ইরফানুল বারীর লেখনীতে উঠে আসা মামদু শেখ ছিলেন মওলানা ভাসানীর প্রথম জীবনের মুরিদ। মানিকগঞ্জ থেকে শুরু করে আসামের ধুবরী, আর দেশভাগের পর দিনাজপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম—জীবনভর তিনি লড়াই করেছেন মহারাজ ও মহাজনদের বিরুদ্ধে। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যখন মওলানা ভাসানী তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী খাইতে চাস?”, মামদু শেখ ক্ষীণ স্বরে বলেছিলেন— “রসগোল্লা”।
কত ধান মাড়াই করা, কত আঁখ ভাঙা এই মানুষটি সারাজীবন অন্যের মুখে খাবার তুলে দিলেও নিজের জন্য একটি রসগোল্লা জোটাতে পারেননি। মওলানা ভাসানী সঠিকই বলেছিলেন, “মামদু শেখ যে জীবন দেখেছে, তাতে রসগোল্লাও একটি পরম পাওয়া।” এই যে সাধারণ মানুষের বঞ্চনা, এটাই বাংলাদেশের রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে বারবার।
১৯০০ থেকে ২০২৪: শোষণের রূপান্তর
বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে (১৯০০ সাল) আজ পর্যন্ত এই ভূখণ্ডের কৃষক ও সাধারণ মানুষ বারবার শোষিত হয়েছে। ব্রিটিশ আমলের জমিদার প্রথা, পাকিস্তান আমলের মহাজনী শাসন, আর পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন—সবই মামদু শেখদের বঞ্চিত করেছে। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূলত এই বঞ্চনা থেকে মুক্তির সংগ্রাম।
১৯৭১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক উত্থান-পতন ঘটেছে। ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তন, নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং সবশেষে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লব। এই প্রতিটি আন্দোলনের মূলে ছিল সাধারণ মানুষের অধিকার ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে নতুন বাংলাদেশের সূচনা হয়, তার উদ্দেশ্য ছিল মামদু শেখের মতো বঞ্চিতদের মুখে হাসি ফোটানো।
২০২৫-২০২৬: সংস্কার ও বর্তমান রাজনৈতিক আলোচনা
২০২৪-এর বিপ্লব পরবর্তী ২০২৫ সাল ছিল সংস্কারের বছর। আর আজ ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে দেশ যখন একটি নতুন নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন রাজনীতিবিদদের মুখে আবারও সেই প্রান্তিক মানুষের কথা শোনা যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তারা যা বলছেন:
- অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পর্ষদ: ২০২৫ সালের এক বিশেষ সংলাপে বক্তারা বলেছেন, “আমরা এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি করতে চাই যেখানে মামদু শেখের মতো কৃষকদের আর রসগোল্লার জন্য মৃত্যুশয্যায় আক্ষেপ করতে হবে না। সম্পদের সুষম বণ্টনই আমাদের লক্ষ্য।”
- বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ: ২০২৬ সালের শুরুতেই রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে কৃষকদের অধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বড় দলগুলোর নেতারা বলছেন, “বিগত দেড় দশকের লুটপাটের রাজনীতি শেষ করে আমরা জনগণের সেবক হতে চাই।”
- বিশ্লেষকদের অভিমত: প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ১৯০০ সাল থেকে শুরু করে ২০২৬ পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ে শোষণের ধরন পাল্টালেও সাধারণ মানুষের ভাগ্য পুরোপুরি বদলায়নি। মওলানা ভাসানীর সেই আপোষহীন রাজনীতি আজ বড় বেশি প্রয়োজন।
উপসংহার
মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, “তোমরা উপন্যাস নাটক পড়িয়া মানুষকে ভালোবাসো। ইহা তোমাদের একটি ফ্যাশন।” কিন্তু প্রকৃত রাজনীতি ফ্যাশন নয়, বরং মানুষের ক্ষুধার জ্বালা মেটানো। ২০২৬ সালের এই নতুন বাংলাদেশে আমরা কি পারব মামদু শেখদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করতে? উত্তরটি লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সততার ওপর।
সূত্র: ‘আমার ভালোবাসা মওলানা ভাসানী’ (সৈয়দ ইরফানুল বারী), যুগান্তর আর্কাইভ, গুগল নিউজ এবং বাংলাদেশ প্রতিদিনের সংগৃহীত তথ্য।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।




একটি রেসপন্স
https://shorturl.fm/6GTGf