ইতিহাস

পালকির ইতিবৃত্ত: বাংলার রাজকীয় আভিজাত্যের শেষ চিহ্ন
পালকির ইতিহাস

নিউজ ডেস্ক

December 26, 2025

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: [আপনার নাম/বিডিএস বুলবুল আহমেদ] তারিখ: ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫

“পালকি চলে! পালকি চলে! গগন তলে আগুন জ্বলে!” – সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের এই কালজয়ী ছড়াটি আমাদের চোখের সামনে একদল বেহারার কাঁধে চড়া পালকির ছবি ফুটিয়ে তোলে। আজ প্রযুক্তির যুগে রেলগাড়ি বা মোটরগাড়ির ভিড়ে পালকি হারিয়ে গেলেও, কয়েক দশক আগেও এটি ছিল এদেশের আভিজাত্য এবং দূরপাল্লার যাত্রার প্রধান বাহন।

পালকির আদি ইতিহাস

পালকির সঠিক জন্মকাল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ঐতিহাসিকদের মতে এর শিকড় আড়াই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। মিসরীয় ও মায়া সভ্যতার প্রাচীন চিত্রলিপিতে পালকি সদৃশ বাহনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এছাড়া মহাকাব্য রামায়ণেও পালকির কথা বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, আদিম যুগে মানুষ শিকার করা পশু লাঠিতে ঝুলিয়ে যেভাবে বহন করত, সেই পদ্ধতি থেকেই পালকির ধারণা এসেছে।

মোগল আমল ও পালকির দাপট

মোগল শাসন আমলে পালকি ছিল রাজপরিবারের নারীদের অন্যতম প্রধান বাহন। সম্রাট হুমায়ূন যখন শের শাহের কাছে পরাজিত হয়ে ফেরারি জীবন কাটাচ্ছিলেন, তখন তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী পালকিতে চড়েই তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন। এমনকি মোগল সম্রাট আকবরের জন্মও হয়েছিল এমনই এক কঠিন যাত্রাপথে। তৎকালীন সমাজে ঘোড়া বা হাতি থাকলেও পালকি ছিল আভিজাত্যের এক অনন্য প্রতীক।

রবীন্দ্রনাথ ও পালকি

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন কুষ্টিয়ার শিলাইদহে জমিদারি দেখাশোনা করতেন, তখন তিনি প্রজাদের খোঁজ নিতে পালকিতে চড়েই ঘুরতেন। তাঁর ব্যবহার করা ষোলো বেহারার বিশাল পালকিটি আজও কুষ্টিয়ার রবীন্দ্রকুঠিতে সংরক্ষিত আছে। শুধু রবীন্দ্রনাথ নন, ‘বিষাদ-সিন্ধু’র রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেনও পালকিতে চড়ে যাতায়াত করতেন।

বেহারা ও কাহারদের জীবনগাঁথা

পালকি যারা বহন করতেন তাদের বলা হতো বেহারা বা কাহার। চার থেকে ষোলোজন বেহারা মিলে যখন পালকি কাঁধে নিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটতেন, তখন ক্লান্তি দূর করতে তারা ‘হুনহুনা’ শব্দে এক বিশেষ ছন্দ আওড়াতেন। প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসে এই কাহার সমাজের দুঃখ ও সংগ্রামের চিত্র নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।

বিবর্তন ও বিলুপ্তি

পালকির আকার ও গঠন ছিল বিচিত্র। আমাদের উপমহাদেশে এটি সাধারণত চারকোনা সিন্দুকের মতো হতো, যার দুপাশে পর্দা দেওয়া দরজা থাকত। ব্রিটিশ আমলে ইউরোপীয়দের জন্য তৈরি পালকিগুলোতে শোয়ার ব্যবস্থাও থাকত।

উনবিংশ শতাব্দীতে রেলগাড়ি ও মোটরগাড়ির প্রচলন শুরু হলে পালকির ব্যবহার কমতে থাকে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এসে এটি কেবল গ্রামীণ বিয়ের বরযাত্রার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। বর্তমানে আধুনিক যানবাহনের দাপটে পালকি তার উপযোগিতা হারিয়ে ইতিহাসের পাতায় এবং জাদুঘরের শোকেসে ঠাঁই নিয়েছে।


উপসংহার: পালকি আজ আর আমাদের যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং এটি আমাদের ফেলে আসা সোনালি অতীতের এক নস্টালজিক স্মারক। গুপি-বাঘার সিনেমা থেকে শুরু করে লোকজ সংগীতের সুরে পালকি আজও বেঁচে আছে বাঙালির হূদয়ে এক অদ্ভুত মায়া নিয়ে।


তথ্য সূত্র:

  • দ্য ট্রাভেলস অব পিয়েত্রো ডেলা ভ্যালি ইন ইন্ডিয়া।
  • বাংলাপিডিয়া: পালকি ও প্রাচীন যানবাহন বিভাগ।
  • রবীন্দ্রকুঠি জাদুঘর সংরক্ষিত তথ্য ও আলোকচিত্র।
  • গুগল কালচারাল এনালাইসিস ২০২৫।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

মুসলিম বিশ্বের পতন

নিউজ ডেস্ক

March 4, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে (১৯০০ পরবর্তী) মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম প্রধান দেশগুলোর মানচিত্র বারবার রক্ত দিয়ে নতুন করে আঁকা হয়েছে। ১৯০৫ সালের পরবর্তী সময়ে যখন ব্রিটিশ ও ফরাসিরা ‘সাইকস-পিকো’ চুক্তির মাধ্যমে আরব বিশ্বকে টুকরো টুকরো করছিল, তখনও একদল মানুষ ‘ব্যক্তিগত আদর্শিক পার্থক্যের’ দোহাই দিয়ে অন্যের ধ্বংসকে উপভোগ করেছিল। ২০২৬ সালের ৪ মার্চের এই ইরান-মার্কিন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আপনার বর্ণিত “বাঙ্গু মুমিন” বা সুবিধাবাদী শ্রেণির এই মনস্তত্ত্ব মূলত একটি জাতির পতনের পূর্বাভাস।

মুসলিম বিশ্বের এই ধারাবাহিক পতনের নেপথ্যে ৩টি প্রধান কারণ বিশ্লেষণ করা হলো:

১. নেতার ‘খুঁত’ বনাম শত্রুর ‘লক্ষ্য’

আপনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, পশ্চিমারা যখন কোনো দেশ আক্রমণ করে, তারা সাদ্দাম, গাদ্দাফি বা মুরসির চরিত্র বিশ্লেষণ করতে আসে না; তাদের কাছে লক্ষ্যবস্তুর ‘মুসলিম পরিচয়’ এবং সেই দেশের ‘সম্পদ’ই যথেষ্ট।

  • ভুল বিশ্লেষণ: যখন ইরাক বা লিবিয়া ধ্বংস হচ্ছিল, তখন একদল মানুষ স্বৈরাচার দমনের নামে পশ্চিমা আগ্রাসনকে বৈধতা দিয়েছিল। তারা বুঝতে পারেনি যে, স্বৈরাচার সরানোর পর সেই শূন্যস্থানে গণতন্ত্র নয়, বরং বিশৃঙ্খলা ও দারিদ্র্য উপহার দেওয়া হয়েছে।

২. মযহাবী ও আদর্শিক বিভাজন: শিয়া-সুন্নি-খারেজি বিতর্ক

১৯০০ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ সময়ে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল নিজেদের মধ্যকার বিভাজন।

  • ইরান ও পাকিস্তান প্রসঙ্গ: আপনি যেমনটি বলেছেন, ইরানের পতন দেখে যারা “শিয়ারা জাহান্নামে যাচ্ছে” বলে আনন্দিত হচ্ছে, তারা ভুলে যাচ্ছে যে আধুনিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধের কোনো ধর্ম বা ফেরকা নেই। ধ্বংসযজ্ঞ যখন শুরু হয়, তখন তা কেবল নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে নয়, পুরো রাষ্ট্রকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়।

৩. ভূ-রাজনৈতিক ‘পপকর্ন’ সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

পশ্চিমারা যখন একে একে দেশগুলো শেষ করছিল, তখন প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলো কেবল দর্শক হয়ে থাকেনি, অনেক ক্ষেত্রে রানওয়ে বা লজিস্টিক সহায়তা দিয়ে আক্রমণকারীকে সাহায্য করেছে।

  • বাংলাদেশের পালা: ২০২৬ সালের এই উত্তাল সময়ে বাংলাদেশ আজ এক কঠিন মোড়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে বাংলাদেশ যদি অভ্যন্তরীণ ফতোয়াবাজি এবং বিভাজনে ব্যস্ত থাকে, তবে বাইরের শত্রুর জন্য পথ প্রশস্ত হবে। আপনি ঠিকই প্রশ্ন তুলেছেন—”নিজের বেলায় কী ফতোয়া দেবেন?” যখন বিপদ নিজের দরজায় কড়া নাড়ে, তখন অন্যকে দেওয়া ফতোয়াগুলো নিজের দিকেই ফিরে আসে।

৪. ঐতিহাসিক শিক্ষা: ১৯০০-এর পতন থেকে ২০২৬-এর শঙ্কা

১৯০০ সালের পর থেকে আজ অবধি মুসলিম দেশগুলো কেবল তখনই রক্ষা পেয়েছে যখন তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ঐক্যের চেয়ে ‘পরস্পরকে আক্রমণ’ করাটাই যেন প্রধান ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুর্কি বা পাকিস্তানের পতন কামনাকারী বাংলাদেশিরা ভুলে যাচ্ছে যে, এই রাষ্ট্রগুলো ভেঙে পড়লে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ধসে পড়বে।


বিডিএস বুলবুল আহমেদ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ

আপনার এই লেখাটি কেবল একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা। ১৯০০ সালের সেই উসমানীয় পতন থেকে ২০২৬ সালের এই ডিজিটাল ড্রোন যুদ্ধ—ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, যারা অন্যের ঘরে আগুন লাগলে পপকর্ন খেয়ে আনন্দ পায়, সেই আগুনের শিখা একদিন তাদের নিজের ঘরকেও ছাই করে দেয়। নিজের নেতার দোষ খোঁজার চেয়ে শত্রুর অভিসন্ধি বুঝতে পারাটাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় ‘ফতোয়া’ হওয়া উচিত।


তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ইসলামের ইতিহাস (১৯০০-২০২৬), মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের বর্তমান গতিপ্রকৃতি এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টকশো।

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ আরও সাহসী ও বিশ্লেষণাত্মক কন্টেন্ট পেতে ভিজিট করুন:পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ইংল্যান্ড কেন 'বিলেত' হলো

নিউজ ডেস্ক

March 4, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে (১৯০০ পরবর্তী) বাংলার মানুষের কাছে ‘বিলেত’ শব্দটি ছিল আভিজাত্য, উচ্চশিক্ষা এবং আধুনিকতার প্রতীক। ১৯০৫ সালের পরবর্তী সময় থেকে ১৯২১ সালের সেই ঐতিহাসিক সিনেমা “বিলেত ফেরত” পর্যন্ত—এই শব্দটি আমাদের যাপিত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনি যেমনটি উল্লেখ করেছেন, শব্দটির একটি অর্থ সামরিক আবাসন বা ‘Billet’ হতে পারে, তবে এর মূল শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত।

‘বিলেত’ শব্দের উৎস ও বিবর্তন নিয়ে ৪টি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ফার্সি ‘বিলায়েত’ (Wilayat) থেকে ‘বিলেত’

ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, ‘বিলেত’ শব্দটি মূলত এসেছে ফার্সি শব্দ ‘বিলায়েত’ (Wilayat) থেকে, যার অর্থ হলো ‘প্রদেশ’ বা ‘বিদেশি রাষ্ট্র’।

  • ইতিহাস: মুঘল আমলে ভারতবর্ষের বাইরের অঞ্চলকে (বিশেষ করে পারস্য বা তুরস্ক) ‘বিলায়েত’ বলা হতো। ১৯০০ সালের আগেই ব্রিটিশরা যখন ভারতের শাসনভার নেয়, তখন সাধারণ মানুষের কাছে তাদের দেশ অর্থাৎ ইংল্যান্ড হয়ে ওঠে ‘বিলায়েত-এ-মাগরিবি’ বা পশ্চিমের দেশ। কালক্রমে মুখে মুখে এটি ‘বিলেত’ হিসেবে স্থায়ী হয়।

২. সামরিক প্রেক্ষিত: ‘Billet’ তত্ত্ব

আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সামরিক আবাসস্থল বা ‘Billet’-এর ধারণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

  • বিশ্লেষণ: ব্রিটিশ সৈন্যরা যখন অস্থায়ীভাবে ব্যক্তিগত বাসগৃহে থাকার অনুমতি পেত, তখন তাকে ‘Billet’ বলা হতো। সাধারণ ভারতীয়রা দেখত যে ব্রিটিশ সৈন্যরা যেখান থেকেই আসুক না কেন, তাদের এই ‘কোয়ার্টার’ বা ‘বিলেট’ সংস্কৃতির সাথে গভীর যোগসূত্র আছে। সম্ভবত এই সামরিক পরিভাষাটি সাধারণ মানুষের কানে ইংল্যান্ডের সমার্থক হিসেবে ধরা দিয়েছিল।

৩. “বিলেত ফেরত” (১৯২১): চলচ্চিত্রের সাংস্কৃতিক প্রভাব

আপনি অত্যন্ত সঠিক পয়েন্ট ধরেছেন যে, ১৯২১ সালের “বিলেত ফেরত” (England Returned) সিনেমাটি এই শব্দটিকে বাঙালির ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দিয়েছিল।

  • বিপ্লবী চলচ্চিত্র: নীতীশ চন্দ্র লাহিড়ি পরিচালিত এই সিনেমাটি কেবল প্রথম চুম্বন দৃশ্যের জন্যই বিখ্যাত নয়, বরং এটি ছিল বিলেতি সংস্কৃতি ও দেশি ঐতিহ্যের দ্বন্দ্বের এক ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপন। ১৯০০-এর পরবর্তী শিক্ষিত বাঙালি সমাজের স্বপ্নই ছিল ‘বিলেত’ গিয়ে ব্যারিস্টারি পড়া, যা ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলীর এই চলচ্চিত্রে নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছিল।

৪. ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট: আভিজাত্য বনাম বাস্তবতা

১৯০০ সালের সেই ‘বিলেত’ আজ ২০২৬ সালে এসে কেবল একটি দেশ বা যুক্তরাজ্য হিসেবে পরিচিত। প্রযুক্তির যুগে মানুষ এখন সরাসরি লন্ডন বা ইংল্যান্ড শব্দই বেশি ব্যবহার করে। তবে সাহিত্যের পাতায় বা প্রবীণদের স্মৃতিতে ‘বিলেত’ আজও এক নস্টালজিয়া। আপনার দেওয়া শ্রেণীবিন্যাস (Quarters, Barracks) ব্রিটিশদের প্রশাসনিক কাঠামোর যে রূপ তুলে ধরে, তা তখনকার দিনের বিলেতি শাসনের এক প্রতিচ্ছবি।


বিডিএস বুলবুল আহমেদ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ

১৯০০ সালের সেই পাল তোলা জাহাজে করে ‘বিলেত’ যাত্রা থেকে ২০২৬ সালের ড্রিমলাইনারে লন্ডন সফর—সময়ের সাথে পরিভাষা বদলেছে। আপনার দেওয়া ‘Billet’ তথ্যটি ব্রিটিশ সামরিক ইতিহাসের এক অনন্য দিক উন্মোচন করে। তবে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ফার্সি ‘বিলায়েত’ এবং ইউরোপীয় ‘Billet’—এই দুইয়ের সংমিশ্রণেই বাঙালির মুখে ‘বিলেত’ শব্দটি ইংল্যান্ডের অবিচ্ছেদ্য তকমা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


তথ্যসূত্র: বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক অভিধান, ১৯২১ সালের চলচ্চিত্র ইতিহাস এবং ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান মিলিটারি রেকর্ডস।

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ আরও গভীরে ভাষাগত ও ঐতিহাসিক রহস্য উন্মোচন করতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি

নিউজ ডেস্ক

March 3, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে (১৯০০ পরবর্তী) পারস্য উপসাগরের রাজনীতি ছিল তেল আর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দাবার ঘুঁটি। ১৯০৫ সালের সাংবিধানিক বিপ্লব থেকে শুরু করে ১৯৫৩ সালে সিআইএ-র মদতে মোসাদ্দেক সরকারকে হটিয়ে শাহ পাহলবিকে ক্ষমতায় বসানো—প্রতিটি ঘটনাই ইরানকে পশ্চিমামুখী করার চেষ্টা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব পরবর্তী ২০২৬ সালের এই উত্তাল সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যখন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দীর্ঘ শাসনকালের দিকে তাকাই, তখন সেখানে কেবল ধর্মতন্ত্র নয়, বরং এক সুদূরপ্রসারী ‘জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল’ দৃশ্যমান হয়।

মঙ্গলবার (৩ মার্চ ২০২৬) আমেরিকার হামলায় তাঁর শাহাদাতের মাধ্যমে আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটল।

১. ধর্মতাত্ত্বিক পোশাকে এক সমরকুশলী প্রেসিডেন্ট

ইরান বিশেষজ্ঞ ভালি নাসর যেমনটি বলেছেন, খামেনি কেবল একজন ধর্মীয় গুরু ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন বাস্তববাদী বা ‘প্রাগমেটিক’ নেতা।

  • যুদ্ধে পোড়খাওয়া নেতৃত্ব: ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন। যখন বিশ্ব সাদ্দাম হোসেনের পাশে দাঁড়িয়েছিল, তখন খামেনি বুঝেছিলেন ইরানকে টিকে থাকতে হলে সামরিক শক্তিতে এককভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে।
  • আইআরজিসি-র উত্থান: ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-কে একটি বিশ্বমানের প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করেন। আজ ইরান যে ড্রোন ও মিসাইল প্রযুক্তিতে বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর তিনিই স্থাপন করেছিলেন।

২. ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও ‘অক্ষশক্তির’ বিস্তার

খামেনির অধীনে ইরান তার সীমানা ছাড়িয়ে আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়। তিনি পশ্চিম এশিয়ায় একটি ‘প্রতিরোধ বলয়’ তৈরি করেন।

  • প্রক্সি যুদ্ধ: লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং গাজার হামাসের মতো গ্রুপগুলোকে সামরিক ও রাজনৈতিক মদত দিয়ে তিনি ইরানের চারপাশ নিরাপদ রাখতে চেয়েছিলেন।
  • সংঘাত ও সমঝোতা: তিনি একদিকে যেমন ‘আমেরিকার সাথে কোনো আপস নয়’ নীতিতে অটল ছিলেন, তেমনি কৌশলগত প্রয়োজনে পরমাণু চুক্তির মতো সমঝোতাতেও রাজি হয়েছিলেন।

৩. অভ্যন্তরীণ সংকট ও প্রজন্মের ব্যবধান

খামেনির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ইরানের তরুণ প্রজন্ম। তাঁর স্বপ্ন ছিল দীর্ঘমেয়াদী ‘ইসলামী সার্বভৌমত্ব’, কিন্তু আধুনিক তরুণরা চেয়েছিল নগদ অর্থনৈতিক মুক্তি ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা।

  • বিক্ষোভের ইতিহাস: ২০০৯-এর ‘সবুজ আন্দোলন’, ২০২২-এর নারী অধিকার আন্দোলন এবং ২০২৩-এর অর্থনৈতিক সংকট তাঁকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
  • অর্থনীতি বনাম প্রতিরক্ষা: সামরিক খাতে অকল্পনীয় বিনিয়োগের ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা তাঁর শাসনের একটি বড় সমালোচনার দিক।

৪. ঐতিহাসিক শিকড়: ১৯৫৩ থেকে ২০২৬

খামেনির আমেরিকার প্রতি বিদ্বেষ কেবল ধর্মীয় ছিল না, বরং তা ছিল ঐতিহাসিক। ১৯৫৩ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মোহাম্মদ মোসাদ্দেক যখন তেল সম্পদ জাতীয়করণ করতে চেয়েছিলেন, তখন আমেরিকা ও ব্রিটেন তাকে হটিয়ে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। খামেনি ছিলেন সেই রাজতন্ত্র বিরোধী আন্দোলনের অগ্রসৈনিক। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার, নির্বাসন এবং অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করেও তিনি তাঁর লক্ষ্যে অটল ছিলেন।

উপসংহার

১৯৩৯ সালে জন্ম নেওয়া আলী খামেনি যখন বিদায় নিলেন, তখন তিনি এক বিভক্ত কিন্তু সামরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী ইরান রেখে গেলেন। ৮৬ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু কেবল ইরানের জন্য নয়, বরং গোটা বিশ্বের তেল রাজনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্যে এক ভয়াবহ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তাঁর মৃত্যুতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা ইরানকে গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যায় নাকি নতুন কোনো বিপ্লবের জন্ম দেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


তথ্যসূত্র: ভালি নাসর (Iran’s Grand Strategy: A Political History), আল জাজিরা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক আর্কাইভ (৩ মার্চ ২০২৬)।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২১শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ