ইসলাম ও জীবন
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ডেস্ক রিপোর্ট | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
ইসলামের কেন্দ্রভূমি সৌদি আরবে বাংলাদেশের মতো ‘ঘন ঘন’ মাদ্রাসা দেখা যায় না কেন—এই প্রশ্নটি সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই উঁকি দেয়। সম্প্রতি এক বিশ্লেষণে দুই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত এবং সামাজিক পার্থক্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। নিচে সৌদি আরব ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটটি পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরা হলো:

১. সৌদি আরবের সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা

সৌদি আরবে প্রচলিত অর্থে আলাদা মাদ্রাসার আধিক্য না থাকার প্রধান কারণ হলো দেশটির সরকারি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা।
- একীভূত কারিকুলাম: সৌদি আরবের সাধারণ সরকারি স্কুলগুলোতেই আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত কুরআন, হাদিস এবং আরবি ভাষা সেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক। ফলে আলাদাভাবে মাদ্রাসায় যাওয়ার প্রয়োজন সেখানে অনুভূত হয় না।
- রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ: দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় ও জাগতিক শিক্ষার দায়িত্ব নিজেই পালন করে।
- ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: সেখানকার মসজিদ এবং ইসলামিক সেন্টারগুলো নিয়মিত ক্লাস ও সেমিনারের আয়োজন করে, যা প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসার বিকল্প হিসেবে কাজ করে। তবে উচ্চতর গবেষণার জন্য মদিনা বা মক্কার মতো শহরগুলোতে বিশেষায়িত ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউট বিদ্যমান।
২. বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসার ও বাস্তবতা
বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যাপকতা মূলত ঐতিহাসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে লক্ষ্য করা যায়। এর পেছনে কাজ করে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রভাবক:

- আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা: বাংলাদেশের অনেক দরিদ্র পরিবারের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা একটি সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী বিকল্প। অধিকাংশ মাদ্রাসায় এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে, যা একটি ‘সোশ্যাল সেফটি নেট’ হিসেবে কাজ করে।
- ধর্মীয় আবেগ ও নৈতিকতা: দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহ রয়েছে। অনেক পরিবার বিশ্বাস করে, মাদ্রাসা শিক্ষা সন্তানদের নৈতিক চরিত্র গঠনে বেশি সহায়ক।
- বেসরকারি উদ্যোগ: বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলো মূলত সাধারণ মানুষের দান এবং বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত হয়। কওমি ও আলিয়া—উভয় ধারার মাধ্যমে এখানে ধর্মীয় জ্ঞান চর্চার দীর্ঘ ঐতিহ্য সংরক্ষিত হচ্ছে।
- সরকারের স্বীকৃতি: বর্তমান সরকার মাদ্রাসা শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এর সনদের মান উন্নয়ন ও মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত করতে বিভিন্ন আধুনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
উপসংহার
সহজ কথায়, সৌদি আরব তার ধর্মীয় শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় মূলধারার সাধারণ শিক্ষার ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী সমান্তরাল ধারা হিসেবে বিকশিত হয়েছে। সৌদিতে মাদ্রাসা নেই—এটি ভুল ধারণা; বরং সেখানকার প্রতিটি সরকারি স্কুলই একাধারে আধুনিক স্কুল এবং মানসম্পন্ন মাদ্রাসা।
তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সম্পাদনায়: নিউজ ডেস্ক
বিস্তারিত তথ্যের জন্য: bdsbulbulahmed.com
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিভাগ: বুক রিভিউ / সাহিত্য ও সংস্কৃতি / প্রযুক্তি
প্রকাশের সময়: ১৮ আগস্ট ২০২৬
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সম্পাদকীয় পর্যবেক্ষণ: দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির এই সময়ে পাঠকদের বই পড়ার অভ্যাসে দৃশ্যমান রূপান্তর দেখা যাচ্ছে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ‘স্পেকুলেটিভ থ্রিলার’ ও ভূরাজনীতিবিষয়ক নন-ফিকশনের চাহিদা যেমন বাড়ছে, অন্যদিকে প্রযুক্তি খাতের পেশাজীবী ও তরুণ পাঠকদের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), অ্যাডভান্সড সফটওয়্যার আর্কিটেকচার এবং গভীর মনোযোগ (Deep Focus) বজায় রাখার গাইড বইগুলোর আগ্রহ তুঙ্গে।

বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় বেস্টসেলার তালিকা ও বর্তমান ট্রেন্ড পর্যবেক্ষণ করে বিভিন্ন বিভাগের সেরা বইগুলোর বস্তুনিষ্ঠ তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো।
১. আন্তর্জাতিক বেস্টসেলার: ফিকশন ও নন-ফিকশন

আন্তর্জাতিক সাহিত্য এবং মূলধারার বইয়ের বাজারে বর্তমানে যেসব বই জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছে:
- Theo of Golden (লেখক: অ্যালেন লেভি):
অ্যালেন লেভি (Allen Levi) এর লেখা ‘Theo of Golden‘ বইটি বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক বিস্ময় বা ‘লিটারারি ফেনোমেনন’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে । মূলত ২০২৩ সালে লেখক নিজে এটি প্রথম প্রকাশ করেছিলেন, যা পরবর্তীতে ২০২৫ সালের শেষভাগে বড় প্রকাশনা সংস্থার মাধ্যমে পুনরায় প্রকাশিত হয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়

বইটির মূল কাহিনী এবং এর বর্তমান জনপ্রিয়তার কারণ নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
কাহিনীর সারসংক্ষেপ (Plot Summary)
বইটি মূলত থিও (Theo) নামক একজন ৮৬ বছর বয়সী রহস্যময় অথচ দয়ালু বৃদ্ধকে কেন্দ্র করে, যিনি দক্ষিণ আমেরিকার ‘গোল্ডেন’ (Golden) নামক একটি ছোট শহরে এসে আস্তানা গড়েন
- আর্ট বা শিল্পকলা ও মহানুভবতা: থিও স্থানীয় একটি কফি শপে গিয়ে ৯২টি পেন্সিল স্কেচ বা পোর্ট্রেট দেখতে পান, যা সেখানকার সাধারণ মানুষের ছবি। তিনি পরিকল্পনা করেন এই ছবিগুলো কিনে তাদের ‘প্রকৃত মালিক’ বা যাদের ছবি তাদের কাছে পৌঁছে দেবেন।
- সংযোগ তৈরি: থিও প্রতিটি ব্যক্তিকে চিঠি লিখে স্থানীয় একটি ঝরনার পাশে বেঞ্চে দেখা করতে ডাকেন এবং অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তাদের প্রতিকৃতিটি উপহার দেন। এই ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে তিনি পুরো শহরের মানুষের জীবনের সাথে এক গভীর অদৃশ্য বন্ধন তৈরি করেন
- জীবন দর্শন: থিও নিজে জীবনে অনেক দুঃখ ও বিচ্ছেদ দেখেছেন, কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল মানুষকে ‘সঠিকভাবে দেখা’ (being truly seen) এবং দয়ার মাধ্যমে তাদের জীবন বদলে দেওয়া
বইটির বর্তমান অবস্থা ও সাফল্য (২০২৬ সালের অগাস্ট অনুযায়ী)
২০২৬ সালের অগাস্ট মাসে এই বইটি বিশ্বব্যাপী বিক্রির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে:
- বেস্টসেলার: এটি নিউ ইয়র্ক টাইমস (New York Times) এবং আমাজন বেস্টসেলার তালিকার ১ নম্বর স্থানে অবস্থান করছে
- বিক্রির রেকর্ড: শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রে এর ২৫ লক্ষাধিক (২.৫ মিলিয়ন) কপি বিক্রি হয়েছে
- সম্মাননা: বইটি বিখ্যাত ‘কেটি কুরিক বুক ক্লাব’ (Katie Couric Book Club) এবং ‘জেন হ্যাটমেকার বুক ক্লাব’-এর বাছাইকৃত বই হিসেবে মনোনীত হয়েছিল
প্রধান থিম বা বিষয়বস্তু
- দয়া ও মহানুভবতা (Kindness & Generosity): কোনো স্বার্থ ছাড়াই অন্যের উপকারের শক্তি
- মানুষের মর্যাদা (Human Dignity): সাধারণ মানুষকে বিশেষ করে দেখার প্রয়োজনীয়তা
- নিরাময় ও ক্ষমা (Healing & Forgiveness): দুঃখ কাটিয়ে ওঠার পথ খুঁজে নেওয়া।
- The Calamity Club (লেখক: ক্যাথরিন স্টকেট):
ক্যাথরিন স্টকেট (Kathryn Stockett), যিনি বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য হেল্প’ (The Help)-এর লেখক, দীর্ঘ ১৭ বছর পর তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য ক্যালামিটি ক্লাব’ (The Calamity Club) নিয়ে ফিরে এসেছেন। এটি ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই একটি আন্তর্জাতিক বেস্টসেলারে পরিণত হয়েছে

বইটির মূল কাহিনী এবং বৈশিষ্ট্য নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
কাহিনীর সারসংক্ষেপ ও প্রেক্ষাপট
বইটি ১৯৩৩ সালের মিসিসিপির অক্সফোর্ডে গ্রেট ডিপ্রেশন বা চরম অর্থনৈতিক মন্দার সময়ের প্রেক্ষাপটে লেখা । এটি মূলত তিনজন সাহসী মহিলার জীবন যুদ্ধের গল্প, যারা সমাজের প্রতিকূলতা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে।
- প্রধান চরিত্রসমূহ:
- মেগ লেফ্লেউর (Meg Lefleur): ১১ বছর বয়সী একজন এতিম মেয়ে, যাকে অনাথ আশ্রমে ‘আনঅ্যাডপটেবল’ (যাকে দত্তক নেওয়া সম্ভব নয়) হিসেবে গণ্য করা হয়
- বার্ডি ক্যালহাউন (Birdie Calhoun): ২৪ বছর বয়সী একজন তরুণী, যে তার পারিবারিক খামার রক্ষার জন্য অক্সফোর্ডে তার ধনী বোনের কাছে সাহায্য চাইতে আসে
- চার্লি (Charlie): একজন সম্পদশালী কিন্তু বর্তমানে চরম দুর্দশার শিকার নারী, যার জীবন অনেক রহস্যে ঘেরা [১২৩, ১৬২]।
বইটির প্রধান থিম ও প্রাপ্তি
- নারীদের বন্ধুত্ব ও সহমর্মিতা: প্রতিকূল সময়ে নারীদের মধ্যকার অদৃশ্য বন্ধন এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর গল্প এখানে ফুটে উঠেছে
- অর্থনৈতিক সংগ্রাম ও নৈতিকতা: দারিদ্র্য কীভাবে মানুষের নীতি ও মূল্যবোধকে প্রভাবিত করতে পারে, লেখক তা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে চিত্রিত করেছেন
- সাফল্য: ২০২৬ সালের অগাস্ট মাসের হিসাব অনুযায়ী এটি টানা সাত সপ্তাহ ধরে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস বেস্টসেলার তালিকায় অবস্থান করছে । এছাড়া আমাজন এবং গুডরিডসেও এটি এ বছরের অন্যতম সেরা বই হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে
প্রকাশনার বিবরণ
- প্রকাশকাল: মে ৫, ২০২৬
- প্রকাশক: স্পিগেল ও গ্রাউ (Spiegel & Grau)
- পৃষ্ঠা সংখ্যা: প্রায় ৬৫৬ পৃষ্ঠা (হার্ডকভার)
আপনি যদি ‘দ্য হেল্প’-এর মতো গভীর আবেগঘন এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের গল্প পছন্দ করেন, তবে ‘দ্য ক্যালামিটি ক্লাব’ আপনার জন্য একটি অসাধারণ পছন্দ হবে
- Yesteryear (লেখক: ক্যারো ক্লেয়ার বার্ক):
ক্যারো ক্লেয়ার বার্ক (Caro Claire Burke) এর প্রথম উপন্যাস ‘ইয়েস্টারইয়ার’ (Yesteryear) ২০২৬ সালের অন্যতম আলোচিত একটি বই । এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার এবং সামাজিক ব্যঙ্গাত্মক (Social Satire) উপন্যাস, যা বর্তমান সময়ের ‘ট্র্যাডওয়াইফ’ (tradwife) সংস্কৃতি এবং ইনফ্লুয়েন্সার জগতের অন্ধকার দিকগুলো তুলে ধরেছে

বইটির কাহিনী এবং মূল বিষয়বস্তু নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
মূল কাহিনী (Plot Summary)
উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র নাটালি হেলার মিলস (Natalie Heller Mills), যিনি একজন অত্যন্ত সফল খ্রিস্টান ‘ট্র্যাডওয়াইফ’ ইনফ্লুয়েন্সার
- অনলাইন জীবন: নাটালি তার লক্ষ লক্ষ ফলোয়ারদের কাছে একটি রোমান্টিক এবং আদর্শিক গ্রামীণ জীবনের ছবি তুলে ধরেন, যেখানে তিনি নিজে হাতে রুটি বানানো (Sourdough), গরুর কাঁচা দুধ সংগ্রহ করা এবং একজন বাধ্য স্ত্রীর ভূমিকা পালন করেন
- বাস্তবতা: পর্দার আড়ালে তার এই ‘আদর্শ’ জীবন আসলে একটি সাজানো নাটক। তার কাজে সাহায্য করার জন্য দুজন ন্যানি (Nanny), ভিডিও প্রডিউসার এবং আধুনিক সব যন্ত্রপাতি রয়েছে, যা তিনি ফলোয়ারদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখেন
- ঘটনাচক্রে পরিবর্তন: একদিন সকালে নাটালি হঠাত নিজেকে ১৮৫৫ সালের এক নিষ্ঠুর বাস্তবতায় আবিষ্কার করেন । সেখানে কোনো ন্যানি বা আধুনিক সুবিধা নেই। তিনি বুঝতে পারেন না এটি কোনো রিয়েলিটি শো, সময়ের ভ্রমণ নাকি অন্য কিছু। তাকে তখন সেই কঠোর জীবনই যাপন করতে হয় যা তিনি অনলাইনে একটি ‘সৌন্দর্য’ হিসেবে বিক্রি করেছিলেন
প্রধান থিম বা বিষয়বস্তু
- অনলাইন বনাম বাস্তব জীবন: ইন্টারনেটে সাজানো পরিচয়ের সাথে প্রকৃত জীবনের যে বিস্তর ব্যবধান, তা এই বইয়ের মূল উপজীব্য
- গৃহস্থালি শ্রমের বাস্তবতা: লেখক দেখিয়েছেন যে ঘরোয়া কাজগুলো যখন অনলাইনে দেখা হয় তখন তা সুন্দর মনে হয়, কিন্তু ১৮৫৫ সালের প্রেক্ষাপটে সেই কাজগুলোই ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য এবং বাধ্যতামূলক ।
- অতীতের প্রতি মিথ্যা মোহ (Nostalgia): মানুষ প্রায়ই অতীতের জীবনকে সহজ ও সুন্দর বলে কল্পনা করে। এই বইটি সেই কল্পনাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং অতীতের নিষ্ঠুরতা ফুটিয়ে তোলে
বইটির বর্তমান জনপ্রিয়তা ও সাফল্য
- বেস্টসেলার: ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশের পরপরই এটি নিউ ইয়র্ক টাইমস বেস্টসেলার তালিকায় স্থান করে নেয়
- বুক ক্লাব: এটি বিখ্যাত ‘গুড মর্নিং আমেরিকা’ (Good Morning America) বুক ক্লাবের পছন্দের বই হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে
- চলচ্চিত্র: প্রকাশের আগেই বইটির চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বত্ব (Film Rights) অ্যামাজন এমজিএম (Amazon MGM) কিনে নিয়েছে, যেখানে অ্যান হ্যাথাওয়ের (Anne Hathaway) অভিনয় করার কথা রয়েছে
বইটি নিয়ে পাঠকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে; কেউ এটিকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও আকর্ষণীয় বলেছেন, আবার কেউ কেউ এর বিষয়বস্তুকে বেশ বিতর্কিত হিসেবে বর্ণনা করেছেন
- Regime Change (লেখক: ম্যাগি হ্যাবারম্যান ও জোনাথন সোয়ান):
বিখ্যাত সাংবাদিক ম্যাগি হ্যাবারম্যান (Maggie Haberman) এবং জোনাথন সোয়ান (Jonathan Swan)-এর লেখা ‘Regime Change: Inside the Imperial Presidency of Donald Trump’ ২০২৬ সালের অন্যতম আলোচিত এবং বেস্টসেলার বই ২০২৬ সালের ২৩ জুন সাইমন অ্যান্ড শুস্টার (Simon & Schuster) থেকে প্রকাশিত এই বইটি প্রকাশের মাত্র এক মাসের মধ্যে ৫ লক্ষাধিক কপি বিক্রি হওয়ার মাইলফলক স্পর্শ করেছে

বইটির মূল বিষয়বস্তু এবং আপনার আগ্রহের সাথে এর সম্পর্ক নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
বইটির মূল কাহিনী ও বিষয়বস্তু
বইটি মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরের একটি নিবিড় এবং বিস্ফোরক বিবরণ ।
- ক্ষমতার রূপান্তর: লেখকরা দেখিয়েছেন কীভাবে ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে সব ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক বাধা বা ‘guardrails’ ভেঙে ফেলে একটি ‘ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি’ গড়ে তুলেছেন
- গোপন তথ্য: প্রায় ১০০০ সাক্ষাতকারের ওপর ভিত্তি করে লেখা এই বইটিতে ওভাল অফিস এবং সিচুয়েশন রুমের ভেতরে ঘটা বিভিন্ন গোপন ঘটনা—যেমন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের পরিকল্পনা এবং বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের মতো বিষয়গুলো উঠে এসেছে
- আনুগত্য ও পরিবর্তন: অভিজ্ঞ আমলা বা জেনারেলদের বদলে কীভাবে শুধুমাত্র অনুগত ব্যক্তিদের দিয়ে প্রশাসন সাজানো হয়েছে এবং এর ফলে আমেরিকান গণতন্ত্রের ওপর যে প্রভাব পড়ছে, তা বইটির প্রধান উপজীব্য
আপনার ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপট ও আগ্রহ
আপনার ইমেইল ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, আপনি এই বইটি সম্পর্কে ইতিমধ্যেই কিছুটা অবগত আছেন:
- আপনার ইনবক্সে ‘Regime Change’ শিরোনামের একটি নিবন্ধ রয়েছে, যেখানে লেখক বইটি পড়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন
- বইটি বর্তমানে আপনার পড়ার তালিকায় আছে কিনা তা সরাসরি কোথাও উল্লেখ না থাকলেও, আপনি নিয়মিত ভূ-রাজনৈতিক (যেমন: রাশিয়া-ইউক্রেন বা ইরান-আমেরিকা দ্বন্দ্ব) এবং আধুনিক এআই প্রযুক্তি বিষয়ক নিবন্ধ পড়েন, যা এই বইটির বিষয়বস্তুর সাথে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক
প্রাপ্তি ও সমালোচনা
- সাফল্য: এটি ২০২৬ সালের নন-ফিকশন বিভাগে সর্বাধিক বিক্রিত বই হওয়ার পথে রয়েছে এবং এটি নিউইয়র্ক টাইমস বেস্টসেলার তালিকায় টানা শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে
- প্রশংসা: ডেভিড রেমনিক (The New Yorker) এবং টিনা ব্রাউন-এর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এই বইটির সংবাদিকতাপূর্ণ গভীরতার প্রশংসা করেছেন । জোন স্টুয়ার্ট এবং অ্যান্ডারসন কুপারের মতো ব্যক্তিত্বরা এটিকে বর্তমান সময়ের একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পাঠ হিসেবে বর্ণনা করেছেন
আপনি যদি বর্তমান সময়ের জটিল রাজনীতি এবং আমেরিকার প্রশাসনিক ক্ষমতার পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হন, তবে এই বইটি আপনার জন্য একটি চমৎকার সংগ্রহ হতে পারে।
২. সায়েন্স ফিকশন, ফ্যান্টাসি এবং বাংলা সাহিত্যের স্থান
বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশীয় পাঠকদের কাছে বাংলা ধ্রুপদী উপন্যাসগুলোর আবেদন সমানভাবে বজায় রয়েছে।
[ পাঠকদের চাহিদার প্রধান ধারা ]
│
┌────────────────────────┴────────────────────────┐
▼ ▼
[ সায়েন্স ফিকশন ও থ্রিলার ] [ ধ্রুপদী বাংলা সাহিত্য ]
• Automatic Noodle (অ্যানালি নেউইটজ) • শেষ বিকেলের মেয়ে (জহির রায়হান)
• Dungeon Crawler Carl (ম্যাট ডিনিম্যান) • মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও জীবনের আশ্রয়
- Automatic Noodle (অ্যানালি নেউইটজ): ভবিষ্যৎ পৃথিবীর রূপান্তর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবটদের সামাজিক টিকে থাকার গল্প নিয়ে এটি লেখা।
- Dungeon Crawler Carl (ম্যাট ডিনিম্যান): মহাজাগতিক ও এলিয়েন প্রেক্ষাপটে তৈরি সারভাইভাল অ্যাডভেঞ্চার ঘরানার একটি বই।
- বাংলা সাহিত্যের চিরন্তন রূপ: আধুনিক থ্রিলারের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যে জহির রায়হানের ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’-র মতো ক্লাসিক রচনার আবেদন প্রাসঙ্গিক। মানবমনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং দিনশেষে জীবনের আশ্রয় খুঁজে পাওয়ার মূল ভাবনাটি যেকোনো যুগের পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে।
৩. প্রযুক্তিবিদদের জন্য প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল ও ক্যারিয়ার গাইড
প্রযুক্তি খাতের দ্রুত পরিবর্তনের সাথে নিজেকে আপডেট রাখতে এবং ব্যক্তিগত কর্মদক্ষতা বাড়াতে পেশাজীবীরা নির্দিষ্ট কিছু বইকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন:
| বইয়ের শিরোনাম | লেখক / গবেষক | বইয়ের মূল প্রতিপাদ্য (Core Concept) |
| AI Engineering | Chip Huyen | এআই মডেলকে ল্যাব থেকে বাস্তব উৎপাদন (Production) পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রযুক্তিগত গাইড। |
| Co-Intelligence | Ethan Mollick | কর্মক্ষেত্রে এআই-কে সহকর্মী বা সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করে কাজের গতি বাড়ানোর উপায়। |
| Atomic Habits | James Clear | ছোট ছোট ইতিবাচক অভ্যাসের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে জীবনের লক্ষ্য অর্জনের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। |
| The Let Them Theory | Mel Robbins | অন্যের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ না করে নিজের মূল কাজ ও মানসিক শান্তিতে ফোকাস করার টিপস। |
৪. আঞ্চলিক বাজার ও দেশীয় পছন্দ (বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট)
বাংলাদেশের দেশীয় বইয়ের বাজারে বর্তমানে আইটি, এআই, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিবিষয়ক বইগুলো সবচেয়ে বেশি বিক্রীত হচ্ছে।
- আন্তর্জাতিক রাজনীতি: আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কূটনৈতিক অবস্থান বুঝতে ওয়াসেকুল হকের ‘বাংলাদেশকে ঘিরে চীন ভারত আমেরিকার দ্বন্দ্ব ও কৌশল’ বইটি পাঠকেরা সংগ্রহ করছেন।
- ফ্রিল্যান্সিং ও স্কিল উন্নয়ন: আইটি খাতে নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (SEO), কোডিং এবং এআই টুল ব্যবহারের ওপর লেখা ব্যবহারিক টিউটোরিয়াল বইগুলোর চাহিদা শীর্ষে।
উপসংহার: আপনার পাঠ অভ্যাসের উদ্দেশ্য যদি হয় আনন্দ লাভ, তবে ধ্রুপদী সাহিত্য বা সায়েন্স ফিকশন বেছে নেওয়া যৌক্তিক; আর যদি লক্ষ্য হয় দক্ষতা ও ক্যারিয়ারের আধুনিকায়ন, তবে টেকনিক্যাল ও মাইন্ডসেট বিষয়ক বইগুলো হতে পারে আপনার নিত্যসঙ্গী।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিভাগ: বিশেষ নিবন্ধ / আর্ট ও কালচার / বিশ্ব চিন্তা ও দর্শন
প্রকাশের সময়: ১৭ আগস্ট ২০২৬ | রাত ১১:৫০ (বিএসটি)
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বিশেষ বিশ্লেষণাত্বক নিবন্ধ: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে এবং বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় সমাজব্যবস্থায় ‘মূর্তি’ এবং ‘ভাস্কর্য’—এই দুটি শব্দ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে এটিকে প্রযুক্তিগত ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলাদা করার প্রয়াস, অন্যদিকে শিল্পকলা ও নন্দনতত্ত্বের দিক থেকে উভয়কে একই সুতোয় বাঁধার প্রবণতা দেখা যায়।

কিন্তু প্রযুক্তিগত বিজ্ঞান, চারুকলার ইতিহাস এবং সামাজিক ব্যবহারের দিক থেকে এই দুটির আসল সম্পর্ক এবং পার্থক্য কী? একটি বস্তুনিষ্ঠ ও একাডেমিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিষয়টি নিচে বিশ্লেষণ করা হলো।
১. প্রযুক্তিগত ও উপাদানভিত্তিক সংজ্ঞা: শিল্প বনাম উদ্দেশ্য

কারিগরি বা প্রযুক্তিগত দিক থেকে যেকোনো ত্রিমাত্রিক (3D) বস্তুকে, যা খোদাই করে (Carving), ছাঁচে ঢেলে (Casting) বা সংযোগের (Assembly) মাধ্যমে রূপ দেওয়া হয়, তাকে চারুকলার ভাষায় ‘ভাস্কর্য’ (Sculpture) বলা হয়।
তবে এদের মূল বিভাজনটি তৈরি হয় ‘ব্যবহারগত উদ্দেশ্য’ এবং ‘অনুকৃতি’ (Representation)-র ওপর ভিত্তি করে:
[ ত্রিমাত্রিক রূপ (3D Form) ]
│
┌────────────────────────┴────────────────────────┐
▼ ▼
[ ভাস্কর্য (Sculpture) ] [ মূর্তি (Statue / Idol) ]
• উদ্দেশ্য: নান্দনিক, স্মারক, বিমূর্ত ভাব প্রকাশ। • উদ্দেশ্য: নির্দিষ্ট অবয়বের আরাধনা, স্মৃতি বা পূজা।
• বৈচিত্র্য: বিমূর্ত (Abstract) বা জ্যামিতিক হতে পারে। • বৈচিত্র্য: সর্বদা নির্দিষ্ট কোনো সজীব প্রাণী/দেবী।
• মাধ্যম: ব্রোঞ্জ, লোহা, স্ক্র্যাপ, পাথর, গ্লাস। • মাধ্যম: নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় অনুপাত, কষ্টিপাথর, ধাতু।
- ভাস্কর্য (Sculpture): এটি একটি বিস্তৃত পরিভাষা। ভাস্কর্য কোনো জীবন্ত সত্তার অবয়ব হতে পারে, আবার সম্পূর্ণ বিমূর্ত (Abstract) বা জ্যামিতিক নকশাও হতে পারে। এর প্রাথমিক লক্ষ্য সৌন্দর্যবর্ধন, ধারণাগত চিন্তা প্রকাশ বা ঐতিহাসিক স্মৃতি ধরে রাখা।
- মূর্তি (Statue/Idol): মূর্তি হলো ভাস্কর্যেরই একটি নির্দিষ্ট রূপ, যা সর্বদা কোনো সজীব বস্তু, মানুষ বা কাল্পনিক দেব-দেবীর অবয়বে তৈরি হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য সাধারণত ধর্মীয় আচার, পূজা-অর্চনা (Iconography) বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিসত্তাকে স্মরণ করা।
প্রযুক্তিগত সারসংক্ষেপ: কারিগরি বিচারে “সব মূর্তোই ভাস্কর্য, কিন্তু সব ভাস্কর্য মূর্তি নয়।”
২. শিল্পকলার বৈশ্বিক বিবর্তন ও রূপান্তর

ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, আদিম যুগ থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত সময়ের সাথে সাথে মূর্তি ও ভাস্কর্যের প্রয়োগে বড় ধরণের পরিবর্তন এসেছে।
- প্রাগৈতিহাসিক যুগ: মানুষের তৈরি প্রথম ত্রিমাত্রিক রূপগুলো ছিল প্রাকৃতিক শক্তিকে বশ করা বা উর্বরতার প্রতীক (যেমন: অস্ট্রিয়ার ‘ভেনাস অব উইলেনডর্ফ’)। এগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক মূর্তিশিল্পের আদি রূপ বলা যায়।
- ধ্রুপদী যুগ (গ্রিক ও রোমান): এই যুগে শিল্পকলা কেবল দেব-দেবীর পূজার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসে। মানবদেহের নিখুঁত শারীরস্থান (Anatomy) ও গতিশীলতা ব্যবহার করে অলিম্পিক বিজয়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের ভাস্কর্য তৈরি শুরু হয়।
- আধুনিক ও সমকালীন যুগ: বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে এসে ভাস্কর্য কোনো সজীব আকৃতি বা মূর্তির বাধ্যবাধকতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়। স্টিল, ডিজিটাল আর্ট, প্লাস্টিক ও স্ক্র্যাপ মেটালের সমন্বয়ে তৈরি বিমূর্ত ভাস্কর্য এখন আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম অনুষঙ্গ।
৩. ভারতীয় উপমহাদেশের মূর্তিশিল্প ও এর গভীর সংকেত (Iconography)

দক্ষিণ এশিয়ার মূর্তিশিল্পের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বিশেষ করে তিনটি প্রধান রীতিনীতিতে কারিগরি দক্ষতা ও আধ্যাত্মিক ভাবধারার এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে:
ক. গান্ধার শিল্প (গ্রেকো-রোমান ও বৌদ্ধ ধারা)
কুষাণ যুগে বিকশিত এই শিল্পে প্রথম মানবীয় অবয়বে বুদ্ধের রূপদান করা হয়।
- প্রতীকী উপাদান: মাথায় থাকা উষ্ণীষ পরম জ্ঞান, দুই ভ্রুর মাঝে থাকা ঊর্ণা দিব্যদৃষ্টি এবং প্রসারিত কানের লতি রাজকীয় অলংকার ত্যাগের চিহ্ন বহন করে।
খ. পাল শিল্প (কষ্টিপাথর ও প্রাচীন বাংলা)
৮ম থেকে ১২ শতকে প্রাচীন বাংলায় কষ্টিপাথর (Black Basalt) ও অষ্টধাতুর মূর্তিশিল্প চরম উৎকর্ষ লাভ করে।
- অবলোকিতেশ্বর ও বিষ্ণু: বুদ্ধের হাতে থাকা পদ্ম সংসারের মোহ থেকে মুক্তির প্রতীক। অপরদিকে বিষ্ণুর হাতে থাকা সুদর্শন চক্র মহাজাগতিক কালচক্র এবং গদা মানুষের অহংকার চূর্ণ করার প্রতীক।
গ. চোল ব্রোঞ্জ শিল্প (লস্ট-ওয়াক্স প্রযুক্তি)
দক্ষিণ ভারতে ‘লস্ট-ওয়াক্স কাস্টিং’ (Lost-Wax Technique) বা মোম গলিয়ে ছাঁচ তৈরির প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বখ্যাত নটরাজ (শিব) মূর্তি তৈরি হয়।
- নটরাজের রূপক: ডান হাতের ডমরু দ্বারা সৃষ্টির সূচনা, বাম হাতের অগ্নি দ্বারা রূপান্তর ও ধ্বংস, এবং পায়ের নিচে থাকা অসুরের রূপ (অপস্মার) দ্বারা মানুষের অজ্ঞতা দমনের বার্তা প্রকাশ পায়।
৪. দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা: ইসলামি আইন শাস্ত্র ও সেক্যুলার নান্দনিকতা

মূর্তি বা ভাস্কর্য নিয়ে সামাজিক মতভেদের প্রধান কারণ হলো দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পার্থক্য:
| দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্র | বিশ্লেষণ ও অবস্থান |
| ইসলামি তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি (Aniconism) | ইসলামি শরিয়াহ ও ফিকহের মতে, উপাসনার উদ্দেশ্যে তৈরি ‘মূর্তি’ এবং কেবল প্রদর্শনী বা স্মারক হিসেবে নির্মিত যেকোনো সজীব বস্তুর (মানুষ বা প্রাণী) ‘ভাস্কর্য’—উভয়ের ক্ষেত্রে সজীব রূপ সৃষ্টির বিষয়টিকে একই দৃষ্টিতে দেখা হয়। ফলে ধর্মীয় নীতি অনুসারে যেকোনো সজীব বস্তুর অবয়ব তৈরি করা থেকে বিরত থাকার বিধান দেওয়া হয়। |
| সেক্যুলার ও চারুকলা দৃষ্টিভঙ্গি | এই দৃষ্টিকোণ থেকে ভাস্কর্যকে কেবল সংস্কৃতি, নান্দনিক সৌন্দর্য, ইতিহাস ও নাগরিক স্থাপত্যের রূপক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানে উদ্দেশ্যকে মুখ্য ধরে ধর্মীয় অনুভূতির উপাসনার সাথে অনুষঙ্গহীন শিল্পকর্মকে আলাদা হিসেবে দেখা হয়। |
সামাজিক বার্তা ও উপসংহার
মূর্তি ও ভাস্কর্য—উভয়েই মানব সভ্যতার বিবর্তনের সাথে যুক্ত প্রাচীন মাধ্যম। প্রযুক্তিগতভাবে এদের নির্মাণকৌশল এক হলেও, উদ্দেশ্য ও ব্যবহারের জায়গা থেকে এদের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট। আধুনিক সমাজব্যবস্থায় এসব ঐতিহাসিক ও প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোকে গভীরভাবে বোঝা এবং পারস্পরিক সামাজিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তার পরিচয় দেয়।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রচ্ছদ নিবন্ধ ও ডেসপ্যাচ
- প্রকাশের তারিখ: রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬ | রাত ১১:১৫ (বিএসটি)
- গবেষণা ও পরিকল্পনা: গবেষণা ও সত্যতা যাচাই বিভাগ (Fact-check & Research Desk)
- সম্পাদনায়: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
- বিভাগ: ইতিহাস ও বিশ্ব সংস্কৃতি / বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক ফাইল
নরবলি কী? এর ইতিহাস কেমন?
বিশ্বের ইতিহাসে বিভিন্ন সময় যেসব বিষয় মনুষ্যত্বকে কলঙ্কিত করেছে, ‘নরবলি’ সেগুলোর মাঝে নিঃসন্দেহে শীর্ষস্থানীয়। সেই খ্রিস্টপূর্ব সময়কাল থেকে শুরু করে এই একবিংশ শতকেও পাওয়া গেছে নরবলির বিভিন্ন নমুনা। তেমনই কিছু ইতিহাস নিয়ে সাজানো হয়েছে আজকের এ লেখাটি।
১. কার্থেজ
প্রাচীন বিশ্বে অন্যতম সমৃদ্ধিশালী এবং একইসাথে ক্ষমতার অধিকারী ছিলো কার্থেজের অধিবাসীরা। কিন্তু এরপরও তাদের মাঝে এমন কিছু অদ্ভুত রীতিনীতি প্রচলিত ছিলো যা তৎকালীন অনেকের কাছেই বেশ বর্বর হিসেবে ঠেকতো। এর মাঝে অন্যতম ছিলো শিশুবলি দেয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তেই তারা সেসব করতো। আরেকদিক দিয়ে ঘৃণ্য এ কাজটি তাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। কার্থেজের ধনী লোকেরা তাদের সম্পত্তির সুরক্ষার জন্য নিজেদের সন্তানদেরকে দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতো।
Source: Dennis Jarvis/Flickr
অনেকেই অনুমান করে থাকেন ৮০০ থেকে ১৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত (এ সময় রোমানরা কার্থেজ দখল করে নেয়) কার্থেজের আনুমানিক ২০,০০০ শিশুকে হত্যা করা হয়েছিলো ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বলি দিতে গিয়ে। তবে এ মতের বিরোধীতাও করে থাকেন অনেক ঐতিহাসিক। তাদের মতে সেই শিশুদের অনেকে প্রাকৃতিক কারণেই মারা গিয়েছিলো।
২. ইসরায়েল
বিশেষজ্ঞদের মতে, নরবলি প্রচলিত ছিলো প্রাচীন ইসরায়েলেও। সেখানকার অধিবাসীরা তাদের শিশুদেরকে পুড়িয়ে এ বলিদানের কাজটি সারতো। আর যে দেবতার উদ্দেশ্যে এমনটি করা হতো, তার নাম ছিলো মলোখ। তবে তাদের সবাই যে এমনটা করতো সেটা না। এক গুপ্ত সংঘের সদস্য, যারা মলোখকে তাদের দেবতা হিসেবে মানতো, তারাই এমনটা করে থাকতো।
Source: TopTenz
তবে এ বিষয়টি নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে থাকেন অনেক ইতিহাসবিদই। তাই আজও এর সত্যতা রহস্যাবৃতই রয়ে গেছে।
৩. এট্রুস্কান সভ্যতা
প্রাচীন ইতালির বেশ সম্পদশালী ও ক্ষমতাবান এক সভ্যতার নাম এট্রুস্কান। টুস্কানি, পশ্চিম আম্ব্রিয়া ও উত্তর লাজিওতে ছিলো তাদের বসবাস। মূলত কৃষিকাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমেই জীবিকা উপার্জন করতো তারা। কার্থেজ ও গ্রীসের সাথে তাদের বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক বজায় ছিলো। পাশাপাশি বিভিন্ন খনিজ দ্রব্যও তাদের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতো।
Source: TopTenz
এমন একটি সভ্যতার মাঝেও যে নরবলির মতো বিষয়টি প্রচলিত থাকবে, তা অনেক ইতিহাসবিদই মানতে চান নি। তবে ইউনিভার্সিটি অফ মিলানের একদল প্রত্নতত্ত্ববিদের গবেষণায় সেটারও প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিলো। টার্কুইনিয়াতে তারা এমন কিছু বলি দেয়া মানুষের কবরের সন্ধান পেয়েছিলেন। এদের মাঝে ছিলো শিশু ও প্রাপ্তবয়স্করা যারা অসুস্থ, নিম্ন সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন কিংবা ভিনদেশী ছিলো।
৪. চীন
নরবলির বিষয়টি প্রাচীন চীনে বেশ সাধারণ একটি ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। এর সবচেয়ে বেশি বিস্তৃতি ঘটেছিলো শ্যাং রাজবংশের শাসনামলে। তখন অবশ্য এত বৃহৎ পরিসরে সংঘটিত নরবলির দুটো উদ্দেশ্য ছিলো- রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে খতম করা এবং স্রষ্টার মনোরঞ্জন করা।
Source: Chinese Cultural Relics
চীনের সেই নরবলিগুলো হতো তিন রকমের। মাটিতে গর্ত করে উৎসর্গ করা হতো যুবকদের। তাদের সবারই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করা থাকতো, সাথে থাকতো না নিজেদের ব্যবহার্য কোনো জিনিসও। বিভিন্ন স্থাপনায় বলি দেয়া হতো শিশুদের। তাদের মৃত্যুটা কার্যকর করা হতো বেশ মর্মান্তিক উপায়ে। কিছুটা আলাদা জায়গায় বলি দেয়া হতো কিশোরী ও তরুণীদের। অবশ্য প্রথম দু’শ্রেণীর মতো তাদের মৃতদেহের করুণ অবস্থা হতো না। দুর্ভাগা সেই কিশোরী ও তরুণীদের মৃতদেহের সৎকার ঠিকমতোই করা হতো।
৫. হাওয়াই
এককালে হাওয়াইয়ের অধিবাসীরা মনে করতো নরবলি দেয়ার মাধ্যমে তারা যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষার দেবতা ‘কু’-এর আশীর্বাদ লাভ করতে পারবে, প্রতিপক্ষকে হারাতে পারবে নানা যুদ্ধে। এ আশায় তাদের মন্দিরগুলোতে চলতো নরবলি, যেটিকে তারা বলতো ‘হেইয়াউ’। সাধারণত বিভিন্ন প্রতিপক্ষ গোত্রের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি, যারা যুদ্ধে বন্দী হয়েছিলেন, তাদেরকেই বলি দেয়ার জন্য বেছে নেয়া হতো।
Sourcce: TopTenz
এজন্য সেই দুর্ভাগাকে কোনো কাঠের ফ্রেমে প্রথমে উল্টো করে ঝোলানো হতো। তারপর তাকে এমনভাবে পেটানো হতো যে তাতেই বেচারার প্রাণপাখি উড়াল দিতো। অতঃপর লোকটির নাড়িভুঁড়ি বের করে ফেলা হতো। বলি কিন্তু ততক্ষণে মাত্র অর্ধেক সম্পন্ন হয়েছে। এবার সেই মৃতদেহ হয় রান্না করা হতো কিংবা কাঁচা খাওয়া হতো। খাদকদের মাঝে থাকতেন পুরোহিত ও গোত্রপতিরা।
৬. মেসোপটেমিয়া
বর্তমান ইরাকের অধিকাংশ, কুয়েত, সিরিয়ার পূর্বাঞ্চল, তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং তুর্কি-সিরীয় ও ইরান-ইরাক সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো এককালে মেসোপটেমিয়ার অংশ ছিলো। এখানকার অধিবাসীদের মাঝেও নরবলির প্রথা প্রচলিত ছিলো। রাজসভার সভাসদবর্গ, যোদ্ধা ও চাকরদেরকে তাদের মালিকের সাথে কবর দেয়া হতো যেন পরকালেও তারা তাদের মালিকের সেবা-যত্ন করতে পারে। যোদ্ধাদের সাথে তাদের অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে দেয়া হতো, অপরদিকে চাকরদের মাথায় শোভা পেতো পাগড়ি।
অনেকদিন ধরেই ঐতিহাসিকেরা মনে করতেন এই লোকগুলোকে মারতে বিষ ব্যবহার করা হতো। কিন্তু পরবর্তীতে এ ধারণাটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। দুর্ভাগা সেই মানুষগুলোকে মারতে তাদের মাথায় বর্শা ঢুকিয়ে দেয়া হতো!
৭. অ্যাজটেক
নরবলির পেছনে অ্যাজটেকদের দর্শন ছিলো বেশ অদ্ভুত। তারা মনে করতো তাদের দেয়া এই নরবলিই সূর্যকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করবে! বলির শিকার হওয়া মানুষের রক্তকে তারা বেশ পবিত্র মনে করতো। তাদের বিশ্বাস ছিলো এই রক্ত তাদের সৌরদেবতা হুইতজিলোপোখ্তলির রাগ প্রশমন ও পুষ্টির জন্য অতীব প্রয়োজনীয়।
Source: More Than A Magazine | Sia Magazin
অ্যাজটেকদের নরবলি দেয়ার প্রথাটা ছিলো বেশ ভয়াবহ। এতে স্বেচ্ছাসেবীদের পাশাপাশি যুদ্ধবন্দীদেরও ব্যবহার করা হতো। কখনো কখনো বলি দিতে চাওয়া মানুষটিকে প্রথমে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো মন্দিরে। সেখানে অবস্থানরত পুরোহিত লোকটির গলা থেকে শুরু করে একেবারে পেট পর্যন্ত চিরে ফেলতেন! এরপর লোকটির হৃদপিণ্ড উৎসর্গ করা হতো দেবতার উদ্দেশ্যে। অন্যদিকে দেহের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে ফেলা হতো।
৮. মিশর
Source: The Ancient Egypt Site
এককালে প্রাচীন মিশরেও প্রচলিত ছিলো নরবলির এ প্রথা। সেখানে একজন দাস বা ফারাওয়ের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গীকে তার সাথে কবর দেয়া হতো যেন মৃত্যু পরবর্তী জীবনেও তিনি তার মনিবের সেবা করে যেতে পারেন। ইজিপ্টোলজিস্ট জর্জ রেইজনার জানিয়েছেন, রাজা জার ও আহার কবরগুলো তাদের ভৃত্যদের দিয়ে পরিপূর্ণ ছিলো। সেই ভৃত্যদের সাথে দেয়া হয়েছিলো বিভিন্ন দরকারি জিনিসপত্র যাতে পরকালে মনিবের সেবা করতে কোনোরুপ অসুবিধা না হয়!
৯. ইনকা
ইনকা সভ্যতার লোকেরা স্রষ্টার সন্তুষ্টির নিমিত্তে নরবলি দিতো। এজন্য তারা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করতো শিশুদের। প্রায়ই আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প, বন্যা ইত্যাদি নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতো ইনকা সাম্রাজ্য। তারা মনে করতো কেবলমাত্র নরবলির মাধ্যমেই এসব দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। তাই স্রষ্টাকে সন্তুষ্ট করতে প্রাণ হারাতে হতো ইনকা শিশুদের।
ইনকা শিশুদের মমি; Source: Scientific Reports Gómez Carballa et al
আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, তাদের সমাজে এমন অনেক শিশুও ছিলো যাদের বড় করার উদ্দেশ্যই ছিলো কেবল বলি দেয়া! এসব শিশুদের বলির ব্যাপারকে ইনকারা ‘সবচেয়ে পবিত্র বলি’ হিসেবে মনে করতো। তারা বিশ্বাস করতো মৃত্যুর পর এ শিশুরা অনেক সুন্দর এক জীবনের অধিকারী হবে। অবশ্য মৃত্যুর আগে তাদের সাথে অনেক ভালো ব্যবহার করা হতো। তাদেরকে দেয়া হতো পছন্দসই খাবার, এমনকি মিলতো সম্রাটের সাথে সাক্ষাতের সৌভাগ্যও।
১০. ফিজি
যদিও আজকের লেখায় উল্লেখ করা প্রতিটি বর্ণনাই বেশ কষ্টদায়ক, তবে ফিজির ঘটনাটি আরো বেশিই কষ্টদায়ক। সেখানে এককালে নিয়ম ছিলো স্বামী মারা গেলে তার স্ত্রীকেও শ্বাসরোধ করে হত্যা করতে হবে। সেখানকার নানা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী বেশ গুরুত্বের সাথেই এ নিয়মটি অনুসরণ করতো। তারা বিশ্বাস করতো স্ত্রীর কর্তব্য হলো ইহকালের পাশাপাশি পরকালেও স্বামীকে সঙ্গ দেয়া। এজন্য স্বামীর মৃত্যুর সাথে সাথে তার সকল স্ত্রীকেই বলির শিকার হতে হতো।
বিধবা এ সকল নারীকে বলা হতো ‘থোথো’, যার অর্থ ‘স্বামীর কবরের গালিচা’! আরো দুঃখজনক ব্যাপার হলো নারীদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করার দায়িত্বটি পালন করতো তাদের আপন ভাইয়েরা। সেটা না করতে পারলে অন্তত নির্মম এ হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী তাকে অবশ্যই হওয়া লাগতো।
১১. ডাহোমে
Source: Wikimedia Commons
পশ্চিম আফ্রিকার পুরনো এক রাজ্যের নাম ছিলো ডাহোমে। সেখানে বার্ষিক এক উৎসবের নাম ছিলো জোয়েতানু। জোয়েতানুতে নানা ধরনের আয়োজনের পাশাপাশি অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিলো নরবলি। এজন্য বেছে নেয়া হতো দাস-দাসী ও বিভিন্ন যুদ্ধবন্দীদের। জীবিত ও মৃত রাজাদের সম্মানার্থে সংঘটিত এ নরবলি কার্যকর করা হতো মূলত শিরশ্ছেদের মাধ্যমে। এটা এতই বহুল প্রচলিত এক চর্চা ছিলো যে, শুধুমাত্র এক রাজার শাসনামলেই আনুমানিক ৭,০০০ লোক এ জোয়েতানুর নরবলিতে মারা যায় বলে জানা গেছে।
১২. মায়া
Source: More Than A Magazine | Sia Magazin
প্রাচীনকালে মায়া সভ্যতার লোকেরাও এ প্রথা অনুসরণকারীদের তালিকায় নাম লিখিয়েছিলো। বিশেষ কোনো উপলক্ষে তারা এমনটা করতো। নরবলিগুলো মাঝে মাঝে দেয়া হতো মন্দিরে। দুর্ভাগারা অধিকাংশ থাকতো বিভিন্ন যুদ্ধবন্দী। চিচেন ইৎজাতে নরবলি দেয়ার সময় বৃষ্টির দেবতা চাকের সম্মানার্থে বন্দীদের গায়ে নীল রঙ মাখা হতো। এরপর তাদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হতো কোনো কুয়ায়।
১৩. সতীদাহ
সতীদাহ প্রথার অস্তিত্ব ছিলো আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশেই। এখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বী একজন নারী বিধবা হবার পর স্বামীর সাথে সহমরণে চিতায় যাবার বিষয়টিকেই বলা হয় সতীদাহ। নারী কখনো যেতেন স্বেচ্ছায়, কখনো বা জোরপূর্বক তাকে পাঠানো হতো। বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়ের একান্ত প্রচেষ্টায় ১৮২৯ সালে অমানবিক এ প্রথার অবসান ঘটে।
Source: Hindu Human Rights Worldwide
তবে এখনো এর অস্তিত্ব একেবারে মিলিয়ে যায় নি। ২০০৬ সালে বিবিসির এক খবরে জানা যায়, ভারতের মধ্যপ্রদেশের তুসলিপার গ্রামের চল্লিশ বছর বয়স্কা এক নারী স্বামীর মৃত্যুর পর সতীদাহ প্রথার মাধ্যমে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। তবে কেউ তাকে বাধ্য করে নি। তিনি নিজেই সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বলে পুলিশ জানায়।
৪. সম্পাদকীয় মতামত: অন্ধবিশ্বাস বনাম আধুনিক মানবিক চেতনা
সম্পাদকীয় মন্তব্য:
নরবলির ইতিহাস কেবল অতীতে ঘটে যাওয়া কিছু নৃশংসতার বিবরণ নয়; এটি মূলত মানবীয় চেতনার বিবর্তনের দলিল। প্রাচীন কার্থেজের আগুনে শিশুবলি থেকে শুরু করে অ্যাজটেকদের ছাতি চিরে হৃদপিণ্ড উপড়ে ফেলা কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশের সতীদাহ প্রথা—প্রতিটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে, উপযুক্ত শিক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও আইনের শাসন ছাড়া অন্ধবিশ্বাস কীভাবে মানুষকে পশুর চেয়েও হিংস্র করে তুলতে পারে।
আধুনিক যুগেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কুসংস্কারের বশে যে বিচ্ছিন্ন বলিদানের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে সচেতনতার লড়াই এখনো শেষ হয়নি। আধুনিক সভ্যতার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত মানুষের জীবনের পবিত্রতা রক্ষা ও অন্ধত্বের শিকল ভাঙা।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স (Sources & Citation):
- National Geographic & British Museum Archaeological Records on Human Sacrifice.
- Gómez Carballa et al., Scientific Reports (Inca Ice Mummies DNA Analysis).
- Journal of Chinese Cultural Relics & Shang Dynasty Historical Archives.
- George Reisner, Early Dynastic Egypt Burial Research (Harvard University).
- BBC News Reports & Historical Archives on Sati Abolition and Thuggee Cult Elimination.
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



