ইসলাম ও জীবন
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ প্রতিবেদন: [BDS Bulbul Ahmed]
তারিখ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬
মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী কেবল একজন বক্তা নন, বরং তিনি একজন আধুনিক ইসলামি গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর জীবন ও কর্মকাণ্ড নিয়ে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে তুলে ধরা হলো:

১. আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও গবেষণার গভীরতা

মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর তিনি মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি (IIUM) থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে ইসলামের প্রয়োগ।
- পিএইচডি (PhD): তিনি মালয়েশিয়া থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার একটি বড় অংশ ছিল কুরআনিক সায়েন্স এবং আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার সাথে এর সম্পর্ক।
- ভাষাগত দক্ষতা: তিনি বাংলা ছাড়াও ইংরেজি এবং আরবি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন, যা তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একজন দক্ষ বক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২. কেন তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা? (The Unique Factor)

আজহারী সাহেবের আলোচনার স্টাইল প্রথাগত বক্তাদের চেয়ে ভিন্ন হওয়ার কয়েকটি কারণ:
- তথ্যনির্ভর আলোচনা: তিনি কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং ইতিহাসের তথ্যসূত্র ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দিয়ে কথা বলেন। তাঁর আলোচনায় প্রায়ই আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সাথে কুরআনের আয়াতের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
- তরুণদের মনস্তত্ত্ব: তিনি বর্তমান সময়ের তরুণদের সমস্যা যেমন—ডিপ্রেশন, বিয়ে, ক্যারিয়ার এবং মাদকাসক্তি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। তিনি ‘পাওয়ার অব পজিটিভিটি’ এবং ‘উত্তম চরিত্র’ গঠনের ওপর জোর দেন।
- ডিজিটাল রিচ: বাংলাদেশে ইসলামি প্রচারের ক্ষেত্রে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যার ভিডিওগুলো সিনেমাটিক কোয়ালিটিতে ইউটিউবে প্রকাশিত হয়, যা ভিজ্যুয়াল মিডিয়াতে ইসলামি বিষয়বস্তুকে জনপ্রিয় করতে সাহায্য করেছে।
৩. মানবিক ও সংস্কারমূলক কাজ
তিনি কেবল মাহফিলেই সীমাবদ্ধ নন। তিনি তাঁর বয়ানের মাধ্যমে যৌতুক প্রথা, নারী নির্যাতন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি অনেক সময় তাঁর মাহফিলের অর্থ দিয়ে অসহায় মানুষকে সাহায্য করার আহ্বান জানান এবং নিজে প্রত্যক্ষভাবে বিভিন্ন মানবিক কাজে যুক্ত থাকেন।
৪. বর্তমান অবস্থান: প্রবাসী জীবন ও বিশ্বব্যাপী দাওয়াত
ব্যক্তিগত ও পরিবেশগত কারণে তিনি বর্তমানে বিদেশে (প্রধানত মালয়েশিয়া ও যুক্তরাজ্যে) অবস্থান করলেও প্রযুক্তির সহায়তায় তিনি দেশের মানুষের সাথে অবিচ্ছিন্ন। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন বড় বড় কনফারেন্সে তিনি বর্তমানে গেস্ট স্পিকার হিসেবে আমন্ত্রিত হন।
বিশ্বস্ত তথ্যের উৎস (Sources for Verification):
- অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া: তাঁর ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ এবং ইউটিউব চ্যানেল (Mizanur Rahman Azhari)।
- বিশ্ববিদ্যালয় রেকর্ড: মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় এবং মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি (IIUM)-এর গ্র্যাজুয়েট ডাটাবেজ।
- গণমাধ্যম: বিবিসি বাংলা এবং আল-জাজিরার মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত ফিচার ও সাক্ষাৎকার।
- প্রকাশিত বই: তাঁর লেখা বা তাঁর সম্পাদিত বিভিন্ন ইসলামি প্রকাশনা।
বিডিএস সম্পাদকীয় মন্তব্য: মিজানুর রহমান আজহারীর এই বিপুল জনপ্রিয়তার পেছনে তাঁর শিক্ষা ও বিনয় বড় ভূমিকা রেখেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, আধুনিক ও উচ্চশিক্ষিত হয়েও ইসলামের দাওয়াতের কাজকে আরও সুন্দরভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ প্রতিবেদক | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
চেন্নাই/ঢাকা: ভারতীয় বিনোদন জগতে ‘বিগ স্টার’ বিতর্কটি সাধারণত শাহরুখ খান, সালমান খান বা প্রভাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ২০২৬ সালের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট থালাপ্যাথি বিজয়কে (Vijay) এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আজ ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দাঁড়িয়ে এটি আর কেবল চলচ্চিত্র বিষয়ক আলোচনা নয়, বরং ভারতের ক্ষমতার সমীকরণে বিজয়ের প্রভাব এখন একটি অনস্বীকার্য বাস্তব সত্য।
১. লয়াল ফ্যানবেস ও ‘বিজয় ফ্যাক্টর’

কোভিড-১৯ মহামারীর সংকটকালে যখন সালমান খানের মতো তারকারা ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মে ঝুঁকছিলেন, তখন বিজয় তার ‘মাস্টার’ (Master) সিনেমার জন্য বড় ওটিটি অফার প্রত্যাখ্যান করে থিয়েটার এক্সপেরিয়েন্সকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন।
- বক্স অফিস আধিপত্য: বিজয়ের সিনেমা যেমন—Beast, Varisu কিংবা সাম্প্রতিক The GOAT সমালোচকদের দৃষ্টিতে গড়পড়তা হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় ৪০০ কোটিরও বেশি আয় করেছে।
- অডিয়েন্স পুল: যেখানে বড় বাজেটের প্যান-ইন্ডিয়া সিনেমার সাফল্য নির্ভর করে বিশাল মার্কেটিংয়ের ওপর, সেখানে বিজয়ের কেবল নামই তামিলনাড়ু ও দক্ষিণ ভারতের মার্কেট রিকভার করার জন্য যথেষ্ট।
২. রাজনীতির নতুন সূর্য: ভোটব্যাংকে রূপান্তর

বিজয় তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ‘জনতার নেতা’র যে ইমেজ গড়ে তুলেছিলেন, তা ২০২৬ সালের নির্বাচনে তার দল তামিলগা ভেট্টি কাঝাগাম (TVK)-কে বিপুল সাফল্য এনে দিয়েছে।
- ভোট শেয়ার: প্রাথমিক ফলাফল ও বুথ ফেরত জরিপ অনুযায়ী, তামিলনাড়ুর নতুন প্রজন্মের (Gen Z) ভোটারদের সিংহভাগেরই প্রথম পছন্দ ছিল বিজয়।
- আঞ্চলিক প্রভাব: ডিএমকে (DMK) এবং এআইএডিএমকে (AIADMK)-এর মতো পুরনো শক্তিগুলোর ভিড়ে বিজয় ১০৬টির বেশি আসনে জয়লাভ করে একক বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।
৩. বিতর্ক ও টিকে থাকার লড়াই
ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে অসংখ্য ঝড় তাকে দমাতে পারেনি।
- দুর্ঘটনা ও তদন্ত: ২০২৫ সালের শেষের দিকে কারুর জেলায় তার রাজনৈতিক র্যালিতে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে ৪১ জন ভক্তের মৃত্যু এবং এ ঘটনায় সিবিআই (CBI) জিজ্ঞাসাবাদ তাকে কঠিন চাপের মুখে ফেলেছিল।
- ব্যক্তিগত সংকট: স্ত্রী সঙ্গীতার সাথে বিবাহবিচ্ছেদ এবং ব্যক্তিগত জীবনের গুঞ্জনকে ছাপিয়ে তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় অটল ছিলেন।
৪. বিশ্লেষণ: শাহরুখ-প্রভাস বনাম বিজয়

বিশ্লেষকদের মতে, শাহরুখ খান বা প্রভাসের ইন্টারন্যাশনাল মার্কেট হয়তো অনেক বড়, কিন্তু লোকাল লেভেলে বিজয়ের মতো ‘অডিয়েন্স পুল’ এবং রাজনৈতিক ভোটব্যাংক আর কারো নেই। উত্তর ভারতীয় কোনো তারকার ক্ষেত্রে এমন বিতর্ক ক্যারিয়ার ধ্বংসের কারণ হতে পারত, কিন্তু বিজয়ের লয়াল ফ্যানবেস তাকে প্রতিবারই সুরক্ষা দিয়েছে।
তথ্যসূত্র ও এনালাইসিস: ১. তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক ফলাফল রেকর্ড ২. বক্স অফিস ইন্ডিয়া ও রয়টার্স বিনোদন ডেস্ক এনালাইসিস – ২০২৬ ৩. অ্যাক্সিওস (Axios) ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পলিটিক্যাল ডেস্ক রিসার্চ ৪. তামিলগা ভেট্টি কাঝাগাম (TVK) সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তি
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিনোদন ডেস্ক | ০৪ মে ২০২৬
বলিউডে সালমান খান কেবল একজন অভিনেতা নন, তিনি একটি আস্ত প্রতিষ্ঠান। গত তিন দশকে বহু নবাগতকে তিনি যেমন প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তেমনি তাঁর বিরাগভাজন হয়ে অনেক জনপ্রিয় তারকাকেও ইন্ডাস্ট্রি থেকে কার্যত নির্বাসিত হতে হয়েছে। ‘ভাইজান’-এর সাথে পাঙ্গা নেওয়ার পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার কিছু কালজয়ী উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. বিবেক ওবেরয়: একটি সংবাদ সম্মেলন ও একটি ক্যারিয়ারের ইতি

সালমান খানের সাথে শত্রুতার তালিকায় সবার উপরে থাকবে বিবেক ওবেরয়-এর নাম। ঐশ্বরিয়া রাইয়ের প্রেমে মজে বিবেক ২০০৩ সালে একটি বিস্ফোরক সংবাদ সম্মেলন করেন। যেখানে তিনি সালমানের বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগ তোলেন। এরপর থেকেই বিবেকের উজ্জ্বল ক্যারিয়ারে গ্রহণ লাগে। বারবার ক্ষমা চেয়েও আজ পর্যন্ত ভাইজানের ‘গুড বুক’-এ ফিরতে পারেননি তিনি।
২. অরিজিৎ সিং: এক মুহূর্তের রসিকতা ও দীর্ঘস্থায়ী দূরত্ব

পুরস্কার মঞ্চে সালমানের সঞ্চালনা নিয়ে রসিকতা করাটা অরিজিতের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। “ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম” বলায় সালমান তাকে কালো তালিকাভুক্ত করেন। পরবর্তীতে অরিজিৎ প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে বড় পোস্ট দিলেও সালমান তাঁকে ‘সুলতান’ মুভি থেকে বাদ দেন। যদিও অরিজিৎ বর্তমান বিশ্বের এক নম্বর গায়ক, কিন্তু ভাইজানের সিনেমায় তাঁর প্রবেশাধিকার আজও সীমিত।
৩. সঞ্জয় লীলা বানসালি ও হৃতিক রোশন: ‘গুজারিশ’ বিতর্ক

সঞ্জয় লীলা বানসালি সালমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। কিন্তু ‘গুজারিশ’ মুভি নিয়ে সালমানের বিতর্কিত মন্তব্য তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরায়। ছবির অভিনেতা হৃতিক রোশনও এই অপমানে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। সালমান বলেছিলেন— “ছবিটি দেখতে কোনো মাছিও যায়নি।” সেই থেকে বানসালি-সালমান জুটিকে আর পর্দায় দেখা যায়নি।
৪. হিমেশ রেশামিয়া: গুরুর অবাধ্য হওয়ার ফল

হিমেশকে বলিউডে ব্রেক দিয়েছিলেন সালমানই। কিন্তু জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকাকালীন হিমেশ যখন সালমানের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন, তখন ভাইজান তাঁর ওপর থেকে হাত তুলে নেন। এরপর হিমেশকে আর বড় কোনো প্রজেক্টে দেখা যায়নি এবং ধীরে ধীরে তিনি গান থেকে দূরে সরে যান।
৫. ঐশ্বরিয়া রাই ও শাহরুখ খান: ‘চালতে চালতে’র সেই কালো রাত

ঐশ্বরিয়া রাইয়ের সাথে বিচ্ছেদের পর সালমান মারমুখী হয়ে ওঠেন। ‘চালতে চালতে’ মুভির সেটে গিয়ে গোলমাল করায় শাহরুখ খানের সাথেও সালমানের তুমুল ঝগড়া হয়। এর ফলে ঐশ্বরিয়া সিনেমাটি হারান এবং শাহরুখ-সালমান সম্পর্ক দীর্ঘ ৫ বছরের জন্য ‘কোল্ড ওয়ার’-এ রূপ নেয়। যদিও এখন শাহরুখের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক ফিরেছে, কিন্তু ঐশ্বরিয়া ও সালমান আজও একে অপরকে এড়িয়ে চলেন।
পরিশেষ
সালমান খান যেমন বড় মনের মানুষ হিসেবে পরিচিত (বিয়িং হিউম্যান), তেমনি নিজের আত্মসম্মান বা ‘ইগো’র প্রশ্নে তিনি আপোষহীন। তাই তো বলিউডে একটি অলিখিত নিয়ম রয়েছে— “ভাইজানকে খ্যাপানোর পরিণতি কখনও সুখকর হয় না।”
তথ্য সংকলনে: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার
ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
ভাইজানের এই ‘পাওয়ার গেম’ নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত মত কী? আপনি কি মনে করেন বলিউডে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখাটা সঠিক?
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ঐতিহাসিক প্রতিবেদক | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
সময়টা তখন ১৯৪৭ এর দিকে। মৃত সাগরের উত্তর-পশ্চিম তীর ঘেঁষে অবস্থিত কুমরান গুহা। এই গুহাতেই পাথর নিক্ষেপ করার খেলায় মত্ত দুই বেদুইন বালক। মেষ চড়ানোর বায়না ধরে প্রায়ই এদিকটায় চলে আসে দুই ভাই মিলে। হঠাৎ বড় একটা পাথর ছোঁড়ার পর অদ্ভুত রকমের শব্দ হলো। প্রথমদিকে তারা মনের ভুল ভেবে উড়িয়ে দিলেও, প্রতিটি পাথর নিক্ষেপের পর একই রকম শব্দ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল মাটির তৈরি কিছু একটা ভেঙে গেছে। দুই বালক খেলা থেমে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়লো।
বাতাসে ভেসে আসা মৃত সাগরের লোনা গন্ধ আর পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়া বিকেলের সূর্য চারিদিক করে তুলেছিল রহস্যময়। তখনো সন্ধ্যা হতে অনেক দেরি। তাই এই অদ্ভুত শব্দের উৎস জানার জন্য দুজনে মিলে ঢুকে পড়লো গুহার ভেতর।
সেদিন সেই দুই বালকের সাহসী পদক্ষেপ উন্মোচন করে দিল এক গুপ্ত ইতিহাস। তারা গুহার ভেতর প্রবেশ করে উদ্ধার করলো বড় বড় মাটির পাত্র। পাত্র গুলো উল্টে দিতেই মাটিতে ছড়িয়ে পড়লো অগণিত চামড়ার তৈরি স্ক্রোল। এরকম প্রায় ৭টি বড় পাত্র ভর্তি স্ক্রোল উদ্ধার করলো দুজন মিলে। তখন বাইরের আকাশে সূর্য প্রায় অস্ত যাই-যাই করছে। দুই বালক ছুটে চলে গেল বেদুইন পল্লীর দিকে। চিৎকার করতে লাগলো হাত-পা ছুঁড়ে, “গুপ্তধন! গুপ্তধন!”
বেদুইন সর্দার সব শুনে রাতটা অপেক্ষা করলেন। পরদিন ভোর হতেই দলে দলে কুমরান গুহাতে হানা দিলেন। উদ্ধার করে নিয়ে আসলেন শত শত স্ক্রোল। আশেপাশের সব গুহাতে তল্লাশী চালানো যখন শেষ, তখন বেদুইনদের ঝুলিতে স্ক্রোলের সংখ্যা ৯০০ ছুঁই ছুঁই করছে। জেরুজালেমে তীর্থের উদ্দেশ্যে অনেক মানুষ জড়ো হতেন। এই খবর চারিদিকে ছড়িয়ে গেলে সবাই বেদুইন পল্লীতে ছুটে আসলেন। এভাবেই মানবসভ্যতার চোখের আড়াল হয়ে থাকা রহস্যময় ডেড সী স্ক্রোল নতুন করে ফিরে আসলো আমাদের মাঝে; সাথে নিয়ে এলো এক অজানা ইতিহাস!
সেই দুই বেদুইন, যারা বাল্যকালে খেলার সময় স্ক্রোলগুলো উদ্ধার করেন।
ডেড সী স্ক্রোল কী?
‘ডেড সী স্ক্রোল’ নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে উঠে বিখ্যাত মৃত সাগরের ছবি। নামকরণ থেকে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, স্ক্রোলগুলো সম্ভবত মৃত সাগর থেকে উদ্ধারকৃত অথবা এর সাথে কোন যোগসূত্রতা রয়েছে। কিন্তু এই স্ক্রোলগুলোর নাম প্রথমদিকে ডেড সী স্ক্রোল ছিল না। প্রথমে একে ‘কুমরান গুহার স্ক্রোল’ নামে ডাকা হলেও এর অনুসন্ধানস্থল সকল গুহা মৃত সাগরের তীর ঘেষে অবস্থিত হওয়ায় এর নাম হয়ে যায় ‘ডেড সী স্ক্রোল’।
কুমরান গুহা থেকে অদূরেই অবস্থিত মৃত সাগর দিগন্তের সাথে মিশে আছে।
প্যাপিরাস পাতার তৈরি শক্ত কাগজ এবং বুনো শূকরের চামড়ার উপর গাঢ় কালি দিয়ে লেখা স্ক্রোলগুলো গুহার আঁধার থেকে স্থান পেল প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণাগারে। ততদিনে এতটুকু জানা হয়ে গেছে যে, স্ক্রোলগুলো অতিপ্রাচীন হিব্রু-বাইবেলের পান্ডুলিপি যা হিব্রু, আরমানি আর গ্রিক ভাষায় লেখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত বাইবেলের মধ্যে এই স্ক্রোলগুলো প্রাচীনতম।
এখানে জানিয়ে রাখা ভালো, ‘হিব্রু-বাইবেল’ দ্বারা ইহুদি গ্রন্থ তানাখ এর শিপারা এবং খ্রিস্টান ওল্ড টেস্টামেন্টের আনুশাসনিক বাণী সম্বলিত পান্ডুলিপিকে বুঝায়।
তখন এর পাঠোদ্ধারের পাশাপাশি চলছিল নানান জল্পনা-কল্পনা। কে বা কারা এই স্ক্রোলগুলো এই গুহাতে লুকিয়ে রেখেছে? কেন রেখেছে? স্ক্রোলগুলো কি শুধু হিব্রু-বাইবেলেরই অংশ? নাকি রোমাঞ্চকর কিছু লুকিয়ে আছে এর মাঝে?
প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান
প্রথমদিকে বেদুইনরাই ছিলেন একমাত্র অনুসন্ধানকারী। ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তারাই সকল স্ক্রোল উদ্ধার করেন। বেদুইনদের কাছে স্ক্রোলগুলো ছিল আয়-উপার্জনের মাধ্যম। তারা শিক্ষিত না হলেও এতটুকু নিশ্চিত ছিলেন যে, এই ধুলিমাখা ছেঁড়া পান্ডুলিপি তাদের কাছে মূল্যহীন হলেও গণ্যমান্য সাহেবরা চড়াদামে কিনে নিবেন। তাদের এই ব্যবসাতে প্রথম হস্তক্ষেপ করে জর্ডানের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ।
তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান ল্যাঙ্কেস্টার হার্দিং সকল স্ক্রোল জর্ডান সরকারের অধীনে আনার লক্ষ্যে অভিযান পরিচালনা করেন। সরকারি অর্থায়নে অনুসন্ধান পুরোদমে চলছিল। কিন্তু বেদুইনরাও থেমে যাননি। তারাও তাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রাখেন।
১৯৫১ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত জর্ডান সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক অনুসন্ধান করেন ফরাসী ধর্মযাজক ফাদার রলা দ্য ভুঁ। তিনি সর্বমোট ১১টি গুহা চিহ্নিত করেন এবং এর উৎপত্তিস্থল, মালিকানা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণায় ভূমিকা পালন করেন। ১১টি গুহার মধ্যে ৫টি গুহার বেশিরভাগ স্ক্রোলই তখন বেদুইনদের দখলে ছিল। তারা সেগুলো বিভিন্ন দেশের হিব্রু যাজক এবং ইসরাইলিদের কাছে বিক্রয় করে দেন।
মার স্যামুয়েল এর সেই বিজ্ঞপ্তি।
এর মধ্যে সিরিয়ান বিশপ মার স্যামুয়েল তার ক্রয়কৃত চারটি স্ক্রোল ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বিক্রয়ের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। এই বিজ্ঞপ্তি ইসরাইলি সামরিক বাহিনী প্রধান ইয়েগাল ইদিনের নজরে আসে। তার পিতা এল সুকেনিক ছিলেন হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য অধ্যাপক। তিনি ২৫০,০০০ ডলারের বিনিময়ে সেগুলো কিনে নেন। এর পরেই ইসরাইল এবং জর্ডান পৃথক পৃথকভাবে এই স্ক্রোল নিয়ে গবেষণায় নেমে পড়ে।
স্ক্রোল গবেষণায় মগ্ন অধ্যাপক সুকেনিক।
প্রাথমিক প্রশ্নোত্তরের খোঁজে
গবেষকদের প্রথম লক্ষ্য ছিল অতি দ্রুত কিছু প্রাথমিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা। স্বাভাবিকভাবেই তখন সকলের মনে কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, কে বা কারা এই স্ক্রোলগুলো এখানে রেখে গেল? কখন লেখা হয়েছিল এই স্ক্রোলগুলো? কী লেখা আছে সেখানে?
এই সব প্রশ্নের উত্তর বের করার ক্ষেত্রে প্রথম সফলতার মুখ দেখেন ইসরাইলি অধ্যাপক সুকেনিক। তিনি এগুলোর বয়স বের করতে সক্ষম হন। তিনি বলেন, ইহুদিদের ঐতিহাসিক দ্বিতীয় মন্দির যুগে প্রথম লেখা হয় এই স্ক্রোলগুলো। তবে অন্য বিজ্ঞানীরা এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও পরবর্তীতে সুকেনিকের তথ্য সত্য বলে মেনে নেন সবাই। সেই অনুযায়ী সময়টা খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দী থেকে ১০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। অবাক করা ব্যাপার হলেও সত্য, আধুনিক যুগে কার্বন ডেটিং এর ফলাফলও সুকেনিকের অনুমানকে সমর্থন করে।
কিন্তু কারা এই পাণ্ডুলিপিগুলো সংকলন করেছিলেন, এ নিয়ে এখন পর্যন্ত বিতর্কে লিপ্ত আছেন গবেষকরা। অনেকের মতে, রোমান বাহিনীর হাতে কুমরান এলাকা পতনের পূর্বে এখানে বসবাসরত ইহুদিদের দ্বারা এগুলো সংকলিত। তখন ইহুদিদের চারটি বড় গোত্রের মধ্যে ইসেন সম্প্রদায়ের পণ্ডিতগণ এগুলো সংকলন করেন বলে ধারণা করা হয়। রোমানদের আক্রমণের পর সেগুলো এই গুহার মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয় এবং এটাকে ‘মিনি পাঠাগার’ হিসেবে ব্যবহার করেন ইহুদি ধর্মানুসারীরা।
মহামূল্যবান ডেড সী স্ক্রলের একটি পাণ্ডূলিপি।
এছাড়া বাকি গোত্রদেরও বাদ দেয়া হয়নি সম্ভাব্য সংকলকের তালিকা থেকে। আবার অনেকের মতে, এগুলো সকলের সম্মিলিত প্রয়াস। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো মেলেনি।
ইসরাইল বিতর্ক এবং স্ক্রোলের পাঠোদ্ধার
বেদুইনদের ব্যবসার সুবাদে ততদিনে স্ক্রোল ছড়িয়ে গেছে বিভিন্ন দেশের গবেষকদের কাছে। যদিও সিংহভাগ স্ক্রোল জর্ডান এবং ইসরাইলের হস্তগত ছিল, কিন্তু বাকিরাও হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন না। বড় বড় গবেষকরা বিভিন্ন তথ্য উদ্ধার করতে লাগলেন স্ক্রোল ঘেঁটে।
তবে সেগুলো একই তথ্য বিভিন্ন রূপে জানানো ছাড়া তেমন কোন ঝড় তুলতে পারেনি বিশ্ব দরবারে। এক্ষেত্রে ইসরাইলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন সবাই।
অপরদিকে ইসরাইলে তখন গবেষকদের মধ্যে প্রশাসনিক কারণে কলহ চলছিল। ড. জন স্ত্রাঙ্গলের নেতৃত্বে হাতেগোণা কয়েকজন গবেষক ছাড়া আর কেউ স্ক্রোল নিয়ে কাজ করার অনুমতি পাননি। এমনকি স্ক্রোল সম্পর্কিত আলোকচিত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও ছিল কড়াকড়ি। ১৯৭৭ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গেজা ভারমেস এটাকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় একাডেমিক কেলেঙ্কারি বলেন।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পাঠোদ্ধার করছেন এক তরুণ গবেষক।
তৎকালীন শীর্ষ গবেষক হার্শেল শ্যাঙ্কস প্রায় তিন দশক ধরে এ নিয়ে আইনী লড়াই করেন। দীর্ঘদিনের লড়াই শেষে ১৯৯১ সালে ইসরাইলের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগীয় প্রধান ইমানুয়েল তভ সর্বপ্রথম স্ক্রোল গবেষণার ফল এবং পাণ্ডুলিপি অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীদের জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা করেন।
এরপর ঝিমিয়ে পড়া গবেষকদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা দেখা গেল। কাজে লেগে পড়লেন সবাই। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বদৌলতে দ্রুত বেশিরভাগ পাণ্ডুলিপির পাঠ পুনরোদ্ধার সম্ভব হলো। এক এক করে প্রকাশিত হতে থাকলো সকল স্ক্রোলের মার্জিত পাণ্ডুলিপি।
সমস্ত পাণ্ডুলিপিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়- বাইবেলিক এবং নন-বাইবেলিক। এর মধ্যে ১০ কপি ঈসায়ী, ৩০ কপি শামের কিতাব এবং ২৫ কপি দ্বিতীয় বিবরণ সম্পর্কিত হিব্রু দলিল রয়েছে। গবেষকদের মতে, স্ক্রোলগুলো মূলত হিব্রু বাইবেলের পান্ডুলিপি হলেও সম্পূর্ণ বাইবেলের The Book of Esther অধ্যায়ের কোনো পান্ডুলিপি এর মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
নতুন টেস্টামেন্টের ঈসায়ী থেকে এগুলো ১০০০ বছর পুরাতন। তবে যিশুখ্রিস্টের আগমনবার্তা সম্পর্কিত জশুয়ার ভবিষ্যদ্বাণী হিব্রু শামের কিতাবে রয়েছে, যা এর আগে কোথাও দেখা যায়নি। ওল্ড টেস্টামেন্টের অনেক দূর্লভ ও হারিয়ে যাওয়া তথ্য এই স্ক্রোলের মাধ্যমে জানা সম্ভব হয়েছে। এ থেকে অনেকে ধারণা করেন, খ্রিস্টধর্মের শুরু হয়েছে এই স্ক্রোলগুলোর মাধ্যমে। তবে এই বিষয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ বিতর্ক চললেও সঠিকভাবে কোন কিছু জানা যায়নি।
আর নন-বাইবেলিক অংশে বিভিন্ন আইন-কানুন, রীতিনীতি, ব্যবসায়িক কাগজপত্র এবং কিছু ব্যক্তিগত পুঁথি রয়েছে। গবেষকদের মতে, কুমরান গুহার বিরানভূমি আগে ঠিক এরকম ছিল না। এখানে বড় সম্প্রদায় বাস করতো। কুমরান নামে গোটা একটা সভ্যতার অস্তিত্বের কথা জানা যায় স্ক্রোল থেকে।
এছাড়া ১৬টি সামরিক চিঠিপত্র পাওয়া যায়, যেগুলো বার কুখবা নামে পরিচিত। ‘বাবাথা’ নামক এক ইহুদির ব্যক্তিগত নথি সম্বলিত কয়েকটি পাণ্ডুলিপিও পাওয়া যায়। নব্যপ্রস্তর যুগের বিভিন্ন হাতিয়ারের অংশবিশেষও উদ্ধার করা হয় বলে জানান গবেষকরা।
প্রায় ৪০% এর মতো স্ক্রোল থেকে পাঠোদ্ধার করা অসম্ভব বলে জানান ইসরাইলি গবেষকগণ। ১৯৯১ সালের নভেম্বর মাসে Biblical Archaeological Society প্রথমবারের মতো পাণ্ডুলিপি বিষয়ক প্রদর্শনীর আয়োজন করে। তবে ১৯৯৪ এর শেষের দিকে ইসরাইলি পুরাতত্ত্ববিদরা পরীক্ষার মাধ্যমে কিছু গ্রিক পাণ্ডুলিপি কুমরান সম্প্রদায় বহির্ভুত বলে নিশ্চিত হন। তবে সেগুলো ঠিক কোন উদ্দেশ্যে সেখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, তার উত্তর এখনো বের করা সম্ভব হয়নি।
সতর্কতার সাথে ভেঙে যাওয়া অংশ জোড়া লাগানো হচ্ছে।
ইসরাইল প্রদত্ত ছবি নিয়ে হান্টিংটন লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ প্রথম কম্পিউটার অ্যানালাইসিস সম্পাদন করেন। এর মাধ্যমে দুর্বোধ্য অনেক পাণ্ডুলিপির নিখোঁজ অংশের সম্ভাব্য পাঠোদ্ধার সম্পন্ন করা হয়।
ডেড সী স্ক্রোলের পাঠোদ্ধারের মাধ্যমে ওল্ড টেস্টামেন্টের অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসে, যা র্যাবাই তত্ত্ব এবং জুডাতত্ত্বের নতুন দিক উন্মোচন করে। যিশুখ্রিস্টের আগমন এবং প্রাথমিক খ্রিস্টান ধর্মের অনেক অজানা তথ্যও জানা যায়। প্রাচীন ইহুদি ধর্মের সাথে খ্রিস্টানদের ওল্ড টেস্টামেন্ট এর সূক্ষ যোগসূত্রতাও পাওয়া যায় এগুলো থেকে।
রহস্যময় কপার স্ক্রোল এবং গুপ্তধনের সন্ধান
ধর্মীয় স্ক্রোলগুলো ইসরাইলিদের হাতে থাকলেও সবচেয়ে রহস্যময় স্ক্রোল তখন জর্ডানীদের হস্তগত ছিল। অন্যান্য স্ক্রোলের মতো তা প্যাপিরাস পাতা বা চামড়ার উপর লিখিত ছিল না। সেটা লেখা হয়েছিল তামার তৈরি পাতের উপর। যাকে ইতিহাসবিদগণ The Copper Scroll নামে চিনেন
একে পাণ্ডুলিপি বললেও ভুল হবে। কারণ এর মাঝে লেখার সাথে আছে খোদাই করা কয়েকটি মানচিত্র। আসলে এটা ছিল একাধিক গুপ্তধনের নকশা। ১৯৫২ সালে অনুসন্ধান অভিযানের সময় এক জর্ডানী পুরাতত্ত্ববিদ ৩ নং গুহার ভেতর থেকে এটি উদ্ধার করেন।
জাদুঘরে কাঁচের ক্যাবিনেটে রক্ষিত রহস্যময় কপার স্ক্রোল।
জর্ডান সরকার তখন কড়া নিরাপত্তায় স্ক্রোলটিকে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যালেগ্রো-এর নিকট প্রেরণ করেন। অ্যালেগ্রো পরীক্ষার মাধ্যমে বুঝতে পারেন স্ক্রোলটি একটি গুপ্তধনের মানচিত্র। তিনি তৎক্ষণাৎ স্ক্রোলের রহস্য সমাধানে লেগে যান। পরবর্তীতে জর্ডান সরকারের নির্দেশে ১৯৬০ সালে অ্যালেগ্রোর গবেষণার ফলাফল জার্নাল আকারে প্রকাশ করা হয়।
অ্যালেগ্রোর জার্নালে ঢুঁ মেরে জানা যায় যে, স্ক্রলে মোট ৬৩ টি স্থানের নির্দেশনা রয়েছে। স্ক্রোলের ভাষ্যমতে সেগুলো সোনা আর রুপা বোঝাই করা কুঠুরি, যার সর্বমোট পরিমাণ কয়েক টনের কাছাকাছিও যেতে পারে। স্ক্রোলটি যেন বছরের পর বছর টিকে থাকে সেজন্য এটা তামার পাতের উপর লেখা হয় বলে জানান অ্যালেগ্রো।
স্ক্রোলের নির্দেশনায় স্পষ্টাকারে স্থানগুলোর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কপার স্ক্রোল থেকে হুবহু অনুবাদ করা আলোচিত একটি লাইন তুলে ধরলাম, “যেখানে লবণের স্তূপ, সেখান থেকে প্রথম সিঁড়ির নিচে চার হাত গভীরে ৪১ টালি রূপা”।
আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে সহজ মনে হলেও গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া এতো সহজ নয়। কারণ, মানচিত্রের এসব নির্দেশনা তখনকার গুহাবাসীদের জন্য লেখা হয়েছিল। কেউ নিজের ঘরের মতো গুহাগুলোকে না চিনলে, তার পক্ষে এই অবস্থানগুলো বের করা প্রায় অসম্ভব। তাই, এখনকার কারো জন্য এত সহজ নয় এর সন্ধান করা। উপরন্তু স্ক্রোল মোতাবেক গুপ্তধনের প্রথম অবস্থানের সাথে বাকিগুলোর যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই প্রথম অবস্থানই বের করা সম্ভব হয়ে উঠেনি
কপার স্ক্রোলের একাংশ।
তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, দুই হাজার বছর আগেই রোমানরা হয়তো সকল গুপ্তধন লুট করে ফেলেছেন। এর পক্ষে প্রমাণও দিয়েছেন অনেকেই। কিন্তু এই প্রমাণ কি আর অনুসন্ধান থামাতে পারে! এখনো সবধরনের সূত্র নিয়ে পরীক্ষা করে যাচ্ছেন পুরাতত্ত্ববিদরা।
আর এই মহামূল্যবান কপার স্ক্রোল নিয়ে সাহিত্যকরাও মনের মাধুরী মিশিয়ে আপন কল্পনার মাধ্যমে রোমাঞ্চকর অভিযান পরিচালনা করে রচনা করেছেন বেশ কিছু উপন্যাস। এর মধ্যে Nathaniel Norsen Weinreb এর The Copper Scroll এবং Lionel Davidson এর A long way to Shiloh বিখ্যাত।
মালিকানা বিরোধ
প্রথমদিকে ধর্মীয় স্ক্রোল মনে হলেও কপার স্ক্রোলের সন্ধান আরো রোমাঞ্চকর রহস্যের হাতছানি দিচ্ছে ইতিহাসবিদদের। এরই জের ধরে ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় ইসরাইল জর্ডান থেকে প্রায় ১৫০০ এর মতো স্ক্রোল নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। ইসরাইলের রকফেলার জাদুঘরে কড়া নিরাপত্তায় শুরু হয় গবেষণা।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক শুরু হয় যখন ইসরাইল স্ক্রোলগুলোর অনুবাদ প্রকাশ করতে দীর্ঘ ৪০ বছর বিলম্ব করে। এদিকে জর্ডান সরকারও বসে থাকেনি। তারাও বরাবরই জর্ডানকে স্ক্রোলগুলোর বৈধ মালিক হিসেবে দাবি করে আসছে।
কানাডায় ডেড সী স্ক্রোল প্রদর্শনীর একটি কেবিনেট।
বর্তমানে জর্ডানের দখলে রয়েছে কপার স্ক্রোলসহ মাত্র ২৫টি স্ক্রোল! এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফিলিস্তিন, কানাডা এবং সিরিয়ার বিভিন্ন গবেষণাগার এবং প্রতিষ্ঠানের নিকট বেশ কয়েকটি স্ক্রোল হস্তগত আছে।
অপরদিকে সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘ নিরাপত্তা নীতির ২৩৩৪ অনুশাসনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র Veto প্রদান না করায়, ইসরাইল স্ক্রোলগুলোর অধিকার হারাতে পারেন বলে মনে করেন টাইমস অফ ইসরাইলের বিশেষজ্ঞরা। তবে স্ক্রোলের ব্যাপারে ইসরাইলের মাত্রাতিরিক্ত গোপনীয়তা ব্যাপারটিকে রহস্যময় করে তুলেছে।
২০১০ সালে জর্ডান সরকার কানাডায় ইসরাইল আয়োজিত স্ক্রোল প্রদর্শনী বয়কট করে এবং সেগুলো পুনরায় দখলে নেওয়ার সংকল্প জানায়। বর্তমানে জর্ডান, ইসরাইল , ফিলিস্তিন , কানাডা এবং সিরিয়া স্ক্রোলগুলোর মালিকানার বিষয়ে স্নায়ুযুদ্ধে লিপ্ত আছে, যা সমাধা হওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখেন না বিশেষজ্ঞরা।
টাইম ম্যাগাজিনের মতে, ডেড সী স্ক্রোল ইতিহাসের অন্যতম সেরা অনুসন্ধান। রাজনৈতিক বিরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া খ্যাত ইসরাইলের অতিমাত্রায় গোপনীয়তার কারণে উন্মুক্ত বিশ্ব বঞ্চিত হচ্ছে অজানা সব রোমাঞ্চকর তথ্য থেকে।
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইল অনুসন্ধানকারী দল ১২ নং গুহার সন্ধান পান বলে দাবি করেন। এর মাধ্যমে গবেষণায় এক নতুন সম্ভাবনার দেখা দেয়। কিন্তু এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি কর্তৃপক্ষ
যতই দিন গড়াচ্ছে, ততই ঘনীভূত হয়ে পড়ছে রহস্য। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিচরণের যুগে ইসরাইলের এরূপ মনোভাব নিন্দাজনক। তবে আশা করা যায়, ভবিষ্যতে কোন তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপে হয়তো এই সমস্যার সমাধান হবে এবং বিশ্বদরবারে উন্মোচিত হবে স্ক্রোলের রহস্য।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স: ১. Dead Sea Scrolls: The Living Manuscripts of the Dead Sea – মূল গবেষণা প্রবন্ধ। ২. Israel Antiquities Authority (IAA) – ডিজিটাল লাইব্রেরি আর্কাইভ। ৩. Biblical Archaeological Society – বিশেষ প্রদর্শনী রিপোর্ট। ৪. ‘ইতিহাসের সন্ধানে’ (টক-শো) – মধ্যপ্রাচ্যের প্রত্নতাত্ত্বিক রাজনীতি বিষয়ক পর্ব।
সম্পাদনায়: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com



