অর্থনীতি
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ঢাকা, ১৫ এপ্রিল ২০২৬: বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯০০ সালের সেই উত্তাল স্বদেশী আন্দোলন থেকে ২০২৬ সালের এই ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ উত্তর পুনর্গঠন—প্রতিটি পর্যায়ই ছিল অগ্নিপরীক্ষা। দীর্ঘ ১৬ বছরের অপশাসন ও অর্থপাচারের ফলে ভঙ্গুর হয়ে পড়া অর্থনীতিকে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেভাবে কক্ষপথে ফেরাচ্ছে, তা বিশ্ব অর্থনীতিবিদদের কাছে এক গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল গত ৬ মাসে ৬২ হাজার কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ নয়, বরং প্রতিটি খাতে একটি টেকসই ‘সিস্টেম’ বা পাইপলাইন তৈরিতে সরকার যে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছে, তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।

১. ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ



আওয়ামী আমলের সবচেয়ে বড় ক্ষত ছিল ব্যাংকিং খাতের হরিলুট। ২০২৬ সালের বর্তমান রিপোর্ট অনুযায়ী:
- বোর্ড পুনর্গঠন: এস আলম ও অন্যান্য বিতর্কিত গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলোর বোর্ড ভেঙে দিয়ে দক্ষ ও সৎ পেশাদারদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটি আমানতকারীদের মনে আস্থা ফেরানোর প্রধান ‘সিস্টেম’ হিসেবে কাজ করেছে।
- টাস্কফোর্স গঠন: পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আন্তর্জাতিক ল’ ফার্ম এবং এফবিআই-এর (FBI) সহায়তা নিতে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে, যা ইতিমধ্যেই ৬৩৫ কোটি টাকা উদ্ধারে সক্ষম হয়েছে।
২. এনার্জি খাতের ‘অন্ধকার’ থেকে উত্তরণ
গত এক দশকে বিদ্যুৎ খাতের দায়মুক্তি আইন ব্যবহার করে যে লুটপাট হয়েছে, তা বন্ধে সরকার বড় পদক্ষেপ নিয়েছে:
- দায়মুক্তি আইন বাতিল: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষ বিধান আইন বাতিল করে প্রতিটি চুক্তির স্বচ্ছতা যাচাই (Audit) শুরু হয়েছে। এর ফলে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।
- নবায়নযোগ্য জ্বালানি: ২০২৬ সালের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, সোলার ও উইন্ড পাওয়ারের জন্য নতুন পাইপলাইন তৈরি করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুতের দাম কমাতে সাহায্য করবে।
৩. বিচারহীনতার সংস্কৃতি বনাম দ্রুত বিচার
১৯০০ সালের সেই শ্লথ বিচার ব্যবস্থার জায়গায় সরকার এখন ‘প্রযুক্তি ও গতি’ (Speed & Tech) যুক্ত করেছে:
- জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিগত সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে।
- দ্রুত বিচার ব্যবস্থা: ধর্ষণের মতো সংবেদনশীল অপরাধের ক্ষেত্রে ১৫ দিনের তদন্ত ও ৯০ দিনের বিচারের যে পাইপলাইন তৈরি করা হয়েছে, তা দেশের আইনী ইতিহাসে এক মাইলফলক।
৪. কূটনৈতিক বিজয় ও ‘ইউনূস ফ্যাক্টর’
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আসন্ন ৪ দিনের সফর কেবল একটি কূটনৈতিক সফর নয়, এটি ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত ইমেজের ওপর বিশ্ব সম্প্রদায়ের আস্থার প্রতীক।
- ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আমেরিকার সাপোর্ট: জিএসপি (GSP) সুবিধা পুনর্বহাল এবং নতুন বিনিয়োগের জন্য ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলো বাংলাদেশকে এখন অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ১৯০০ সালের সেই সাহায্য-নির্ভর ভূখণ্ড আজ ২০২৬ সালে ‘পার্টনারশিপ’ নির্ভর দেশে রূপান্তরিত হচ্ছে।
৫. দ্রব্যমূল্য ও ‘সিন্ডিকেট’ ভাঙার যুদ্ধ
রমজানে এবং তার পরবর্তী সময়ে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার সফল হয়েছে কারণ:
- চাঁদাবাজি বন্ধ: হাইওয়ে এবং পাইকারি বাজারে থাকা রাজনৈতিক চাঁদাবাজির পাইপলাইনগুলো ভেঙে দেওয়ায় সরাসরি কৃষকের পণ্য এখন ভোক্তাদের হাতে পৌঁছাচ্ছে।
- ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা: খাদ্যপণ্যে ভর্তুকি ১২% বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা হয়েছে।
উপসংহার: সাফল্যের প্রকৃত পাইপলাইন হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। গাধার মতো গুজব ছড়িয়ে বা জেলাসি করে ২০২৬ সালের এই অগ্রযাত্রাকে থামানো সম্ভব নয়। ড. ইউনূসের সরকার কেবল দেশ চালাচ্ছে না, তারা আগামী ৫০ বছরের একটি আধুনিক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের ‘সিস্টেম’ ডিজাইন করছে। এই সরকারকে সাহস দেওয়া এবং সঠিক তথ্যের প্রচার করা আমাদের প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের দায়িত্ব।
সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৬, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC) আপডেট, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) বুলেটিন, ইউএনডিপি (UNDP) বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপোর্ট এবং ২০২৬ সালের গুগল ইকোনমিক ট্রেন্ডস।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): সুশাসন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সামাজিক বিশ্লেষণ
- প্রকাশেশনের তারিখ: ১১ অক্টোবর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD), পলিটিক্যাল সায়েন্স রিভিউ, এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ডাইনামিকস ডাটা।
রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন প্রণয়ন এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সরাসরি রাজনীতির মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই একজন সচেতন নাগরিকের জন্য রাজনীতি থেকে দূরে থাকা বা নির্লিপ্ত থাকা কার্যত নিজের জীবনযাত্রার নিয়ন্ত্রণ অন্য কারও হাতে সঁপে দেওয়ার শামিল।
১. একজন সচেতন নাগরিকের কেন রাজনীতি করা বা সচেতন হওয়া উচিত?

রাষ্ট্রের সকল কর্মকাণ্ড নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। তাই সচেতন নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকা অত্যন্ত জরুরি:
[নাগরিক সচেতনতা ও ভূমিকা] ➔ [সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ] ➔ [দুর্নীতি প্রতিরোধ] ➔ [মৌলিক অধিকার সুরক্ষা]
- দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব: আপনার প্রাত্যহিক জীবনের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিত্যপণ্যের বাজারদর, কর কাঠামো এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন সবকিছুই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল।
- গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতা শক্তিশালীকরণ: শিক্ষিত ও সৎ মানুষের নিষ্ক্রিয়তা মূলত অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করে। সচেতন নাগরিকদের অংশগ্রহণ সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনে।
- অধিকার আদায় ও অনিয়ম প্রতিরোধ: নিজের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা এবং প্রশাসনিক অনিয়ম রুখে দাঁড়াতে রাজনৈতিক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।
২. মানুষ কিছুটা বিত্তবান হলেই কেন রাজনীতিবিদ হতে চায়?

সমাজে অর্থ ও রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্ক বহুকাল ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে। বিত্তবান ব্যক্তিদের রাজনীতিতে আসার পেছনে কিছু বাস্তব ও বৈচিত্র্যময় কারণ কাজ করে:
| প্রধান দিক | নেপথ্য কারণ ও বাস্তব রূপরেখা |
| সামাজিক ক্ষমতা ও মর্যাদা | অর্থ মানুষকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিলেও সরাসরি প্রশাসনিক নীতি-নির্ধারণী ক্ষমতা দেয় না। বিত্তবানরা সমাজে শীর্ষ মর্যাদা ও ক্ষমতা পেতে রাজনৈতিক পদে আসেন। |
| সম্পদ সুরক্ষা ও ব্যবসার বিস্তার | রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নিজের ব্যবসা প্রসারিত করা, সরকারি ঠিকাদারি, বাণিজ্যিক লাইসেন্স পাওয়া এবং অর্জিত সম্পদ সুরক্ষিত রাখা সহজ হয়। |
| আইন ও নীতিতে প্রভাব | নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অনুকূলে কর নীতি ও আইন গঠনে ভূমিকা রাখতে ধনী ব্যক্তিরা আইনসভায় ঢুকতে চান। |
| ব্যয়বহুল নির্বাচনী ব্যবস্থা | বর্তমান যুগে নির্বাচন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় সাধারণ যোগ্য প্রার্থীর চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোও অর্থবিত্তসম্পন্ন প্রার্থীদের মনোনয়ন দিতে অগ্রাধিকার দেয়। |
| আইনি ‘রক্ষাকবচ’ | রাজনৈতিক পরিচয় বা পদবী অনেক সময় বাণিজ্যিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব খাটাতে এবং আইনি চাপ থেকে সুরক্ষা পেতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। |
৩. রাজনীতিতে সচেতন হতে কি কোনো রাজনৈতিক দল পছন্দ করা অত্যাবশ্যক?
একদমই নয়। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশ বা রাজনীতি নিয়ে সচেতন থাকার জন্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের লেবেল লাগানো বা কোনো দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রকাশ করা মোটেও প্রয়োজনীয় নয়।
প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা বিচার
পদ্ধতি ১
অন্ধভাবে দলীয় প্রতীক না দেখে প্রার্থীর ব্যক্তিগত সততা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, অতীত ভূমিকা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড দেখে ভোট প্রদান করা।
ইস্যু-ভিত্তিক সমর্থন ও সমালোচনা
পদ্ধতি ২
যেকোনো দলের ভালো নীতিকে (যেমন: পরিবেশ সুরক্ষা বা স্বাস্থ্য সংস্কার) সমর্থন করা এবং ক্ষতিকর সিদ্ধান্তের গঠনমূলক সমালোচনা করা।
সুশীল সমাজ ও নাগরিক আন্দোলন
পদ্ধতি ৩
দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকে সামাজিক সংগঠন বা মানবাধিকার সংস্থার মাধ্যমে সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করা।
স্বাধীন বা ফ্লোটিং ভোটারের ভূমিকা
পদ্ধতি ৪
কোনো দলের ক্যাডার বা অন্ধ সমর্থক না হয়ে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ রাখা। আধুনিক গণতন্ত্রে এই ‘ফ্লোটিং ভোটাররাই’ যেকোনো নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
সংক্ষেপিত পর্যালোচনা
রাজনীতি কোনো নির্দিষ্ট দলীয় কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্যের সাথে যুক্ত। কোনো দলের দাসত্ব না করেও কেবল সচেতন, নিরপেক্ষ ও সৎ নাগরিক হিসেবে নিজের ভোটাধিকার এবং গঠনমূলক মতামত প্রকাশ করাই হলো একটি উন্নত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান শক্তি।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
বিশেষ প্রতিবেদন:
একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে ১৯৭১ সালে মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করলেও, বাংলাদেশের ইতিহাসের শিকড় হাজার বছরের পুরোনো। গঙ্গা-পদ্মার উর্বর পলল ভূমি থেকে শুরু করে নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা রক্ষা এবং সবশেষে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব অর্জন—এই দীর্ঘ যাত্রাপথই মূলত বাংলাদেশের বিবর্তনীয় ইতিহাস।

১. পলল ভূমি ও নদীকেন্দ্রিক জনপদের সূচনা
ভৌগোলিক দিক থেকে প্রাচীন অবিভক্ত বাংলার পূর্ব অংশকে বলা হতো ‘গঙ্গাহৃদয়’। হিমালয় থেকে নেমে আসা গঙ্গা নদী যখন এই অঞ্চলে প্রবেশ করে ‘পদ্মা’ নাম ধারণ করে, তখন তার বয়ে আনা পলিমাটি দিয়েই গঠিত হয় পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম এই ব-দ্বীপ। প্রাকৃতিকভাবেই এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি গড়ে ওঠে নদী ও কৃষিকে কেন্দ্র করে। নদীমাতৃক এই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যই এখানকার মানুষকে একদিকে করেছে সহনশীল, অন্যদিকে দিয়েছে সংগ্রামী চেতনা।
২. সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ধর্মীয় রূপান্তর
প্রাচীনকাল থেকেই পূর্ববঙ্গ ছিল নানা সংস্কৃতির মিলনমেলা। প্রথম দিকে হিন্দু ও বৌদ্ধ রাজাদের শাসনাধীন থাকা এই অঞ্চলে পরবর্তীতে আরব বণিক ও সুফি-সাধকদের হাত ধরে ইসলামের আগমন ঘটে। এখানকার একটি বিশাল জনগোষ্ঠী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও তারা তাদের হাজার বছরের আদি ও অকৃত্রিম বাঙালি সংস্কৃতিকে বর্জন করেনি। মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার পাশাপাশি জীবনযাত্রায়, ভাষায় ও লোকজ উৎসবে তারা অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যকে লালন করেছে। ধর্মীয়ভাবে মুসলমান হলেও মানসিকভাবে তারা সবসময় ‘বাঙালি’ পরিচয়টিকেই ধারণ করেছে।
৩. ১৯৪৭-এর দেশভাগ ও পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতা
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যখন ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়, তখন পূর্ববঙ্গ সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির দেশ পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হতে বাধ্য হয় (পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে)। কিন্তু শুরুতেই মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি শাসকেরা বাঙালির নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানে এবং বাংলাকে ‘হিন্দুয়ানি ভাষা’ আখ্যা দিয়ে তা মুছে ফেলার চেষ্টা করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের দাঁতভাঙা জবাব দেয়।
৪. স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়
ভাষা আন্দোলনের পর থেকে শুরু হয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধিকার আন্দোলন। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার দীর্ঘ দুই দশকের শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং স্বকীয় পরিচয় রক্ষার দাবিতে বাংলার সাধারণ মানুষ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একাত্ম হয়। ৯ মাসের এক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ এবং আন্তর্জাতিক (বিশেষ করে ভারতের) প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র—বাংলাদেশ।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর; ইরাকের স্থানীয় সময় ভোর ৬টা বেজে ৬ মিনিটে বাগদাদের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কার্যকর করা হয় দেশটির দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুদণ্ড । এই ঘটনার পর দুই দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, কিন্তু বিশ্ব রাজনীতি এবং সাধারণ মানুষের মনে আজও একটি বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—”সাদ্দাম হোসেন কি আসলেই একজন অপরাধী হিসেবে দোষী ছিলেন, নাকি তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার এক নির্দোষ নেতা?”
আইনি নথি, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন এবং ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাদ্দাম হোসেনকে সম্পূর্ণ “নির্দোষ” বলার কোনো সুযোগ নেই । তবে তাকে যেভাবে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল, সেই প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার মানদণ্ডে মারাত্মকভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।

নৃশংসতার ইতিহাস: যে সব অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন সাদ্দাম
২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর অভিযানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সাদ্দাম হোসেনকে বিচারের মুখোমুখি করতে গঠিত হয় ‘ইরাকি স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল’ (IST) । এই আদালতে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিক লোমহর্ষক ও অমানবিক অপরাধের অকাট্য প্রমাণ মেলে
১. দুজাইল হত্যাকাণ্ড (১৯৮২): সাদ্দাম হোসেনের ওপর চালানো একটি ব্যর্থ সামরিক হামলার প্রতিশোধ হিসেবে দুজাইল নামক শিয়া অধ্যুষিত শহরের ১৪৮ জন সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা, নির্যাতন এবং শত শত পরিবারকে অবৈধভাবে নির্বাসিত করা হয় । এই নির্দিষ্ট মামলাতেই তাকে আদালত সর্বোচ্চ শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে ।
২. আনফাল অভিযান ও কুর্দি গণহত্যা (১৯৮৮): উত্তর ইরাকে বসবাসকারী কুর্দি জনগোষ্ঠীর ওপর সাদ্দাম সরকারের নির্দেশে পরিচালিত সামরিক অভিযানে রাসায়নিক গ্যাস ব্যবহার করা হয় । হালাবজা শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় ১ লক্ষাধিক কুর্দি বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করা হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনে চরম মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃত ।
৩. স্বৈরতান্ত্রিক দমনপীড়ন: তার ২৪ বছরের শাসনামলে রাজনৈতিক বিরোধী, শিয়া মতাবলম্বী এবং ভিন্নমতের হাজার হাজার মানুষকে গুম ও নির্বিচারে হত্যা করার রাজসাক্ষ্য ও গণকবরের সন্ধান মেলে ।
যে কারণে বিচার প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত
সাদ্দাম হোসেনের অপরাধের তালিকা দীর্ঘ হলেও, তার বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়াটিকে জাতিসংঘ (UN) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (Amnesty International)-এর মতো বড় বড় আন্তর্জাতিক সংস্থা সরাসরি “ত্রুটিপূর্ণ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে [১.১.৬, ১.৩.৫]। সমালোচনার মূল কারণগুলো হলো:
- প্রহসনমূলক আদালত (Show Trial): অনেক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এই আদালতটি নিরপেক্ষ ছিল না । সাদ্দামের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা একাধিক আইনজীবীকে বিচার চলাকালীন অপহরণ ও হত্যা করা হয়েছিল, যা আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের মৌলিক অধিকারকে খর্ব করে ।
- তড়িঘড়ি করে মৃত্যুদণ্ড: সাদ্দামের বিরুদ্ধে কুর্দি গণহত্যার (আনফাল অভিযান) বিচার কাজ চলাকালীনই দুজাইল মামলার রায়কে ভিত্তি করে তড়িঘড়ি করে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয় । ফলে কুর্দি জনগণের ওপর চালানো বৃহত্তর অপরাধের সম্পূর্ণ সত্য উন্মোচিত হওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায় ।
- মর্যাদাহীন ফাঁসির দৃশ্য: ঈদের দিন ভোরে সাদ্দামের ফাঁসি কার্যকরের সময় জল্লাদ ও উপস্থিত শিয়া কর্মকর্তাদের উপহাসমূলক আচরণ এবং ফাঁসির অবৈধ গোপন ভিডিও ফাঁস হওয়া পুরো আইনি প্রক্রিয়াকে একটি “পেশাদার বিচার” অপেক্ষা “রাজনৈতিক লিঞ্চিং বা প্রতিশোধ” হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরে
চূড়ান্ত মূল্যায়ন
ঐতিহাসিক ও আইনি বাস্তবতার নিরিখে সাদ্দাম হোসেনকে কোনোভাবেই ‘নির্দোষ’ বলা যায় না, কারণ তার হাত ইরাকের লাখো নিরীহ মানুষের রক্তে রঞ্জিত ছিল । কিন্তু একই সাথে মার্কিন আগ্রাসনের পর ইরাকে যে তথাকথিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল, তা বিশ্ববাসীকে একটি সুষ্ঠু ও প্রভাবমুক্ত বিচার উপহার দিতে ব্যর্থ হয় । ফলে সাদ্দাম হোসেন নিজের কৃতকর্মের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েও ত্রুটিপূর্ণ বিচার ব্যবস্থার কারণে এক শ্রেণীর মানুষের কাছে “সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শহীদ” হিসেবে প্রতীকী রূপ পেয়ে যান ।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



