উদ্ভাবন ও ভবিষ্যৎ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ বিশ্লেষণে: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
মাঝে মাঝে এমন হয়—খালি মনে করে একটি ভরা গ্লাস উঁচু করেছেন, আর অমনি পানি ছিটকে পড়ল। আবার খালি গ্লাসকে ভরা মনে করে টান দিতেই সেটি দ্রুত আপনার মুখের কাছে চলে এল। কেন এমন হয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের মস্তিষ্কের এক জটিল গাণিতিক হিসাবের মধ্যে।

১. গ্লাসের গাণিতিক সমীকরণ: যা আপনার মস্তিষ্ক এক নিমেষে সমাধান করে
একটি স্থির পানির গ্লাস টেবিল থেকে তুলে ঠোঁটের কাছে আনার পেছনে যে পরিমাণ পদার্থবিজ্ঞান কাজ করে, তা একজন তুখোড় গণিতবিদের সমাধান করতেও অন্তত ৫ থেকে ১০ মিনিট সময় লাগবে। হিসাবটা লক্ষ্য করুন:
- গ্লাসের ভর ($m$): প্রায় ৩০০ গ্রাম।
- প্রাথমিক বেগ ($u$): ০ (স্থির)।
- প্রক্ষেপণ পথ: উপবৃত্তাকার।
- জটিলতা: গ্লাসটিকে কত বল ($F$) প্রয়োগ করলে সেটি এক সেকেন্ডের কম সময়ে আপনার ঠোঁটে পৌঁছাবে এবং সেখানে পুনরায় বেগ শূন্য হবে?
এই জটিল Dynamics বা গতিবিদ্যার অঙ্কটি করতে আপনার মস্তিষ্ক এক সেকেন্ডও সময় নেয় না! আপনি যখন গ্লাসের দিকে তাকান, আপনার চোখ এবং মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই ক্যালকুলেশন সম্পন্ন করে হাতকে নির্দেশ পাঠায়।
২. ১৯০০ থেকে ২০২৬: মস্তিস্ক বনাম সুপার কম্পিউটার

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে (১৯০০-এর দশকে) মানুষের শরীরতত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা ছিল খুবই প্রাথমিক। কিন্তু ২০২৪-২৫ সালের এআই (AI) বিপ্লব এবং ২০২৬ সালের আধুনিক নিউরোসায়েন্স আমাদের দেখাচ্ছে যে, একটি মানুষের মস্তিষ্ক বর্তমানের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপার কম্পিউটারের চেয়েও লক্ষ গুণ বেশি কার্যকর।
একটি সুপার কম্পিউটার চালাতে যেখানে বিশাল দালান, হাজার হাজার ওয়াট বিদ্যুৎ এবং কুলিং সিস্টেম লাগে, সেখানে মানুষের মস্তিষ্ক মাত্র ২০ ওয়াট শক্তিতে (একটি ছোট বাল্বের সমান) চলে। অথচ এর প্রসেসিং ক্ষমতা মহাবিশ্বের যেকোনো যন্ত্রের চেয়ে জটিল।
৩. গুগল এনালাইসিস ও বর্তমান প্রেক্ষাপট (২০২৬)
গুগল সার্চ ট্রেন্ডস এবং গ্লোবাল মেন্টাল হেলথ রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে মানুষের মনোযোগের সময়সীমা (Attention Span) কমলেও মস্তিষ্কের সুপ্ত ক্ষমতা ব্যবহারের আগ্রহ বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। বিশেষ করে ২০২৪ সালের পরবর্তী সময়ে মানুষ প্রযুক্তির পাশাপাশি নিজের ‘মেন্টাল প্রোডাক্টিভিটি’ নিয়ে অনেক বেশি সচেতন। এনালাইসিস বলছে, যারা প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট ব্রেইন এক্সারসাইজ বা মেডিটেশন করেন, তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে দ্রুত হয়।
৪. দৈনন্দিন জীবনের অলৌকিক গণিত

কেবল গ্লাস তোলাই নয়; হাঁটাচলা, দৌড়ানো কিংবা ক্রিকেট মাঠে ক্যাচ ধরার কথা ভাবুন। একটি বল কোন দিকে কত বেগে আসছে, বাতাস কোন দিকে বইছে, আর আপনাকে কত দ্রুত দৌড়ালে সেটি ধরা যাবে—এই Projectile Motion-এর অঙ্ক আপনার মস্তিষ্ক দৌড়ানো অবস্থাতেই করে ফেলছে। ১৩০০ গ্রাম ওজনের এই মাখনের মতো নরম বস্তুটি আসলে স্রষ্টার এক অনন্য কুদরত।
৫. ২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয়
বিজ্ঞানীদের মতে, আমরা আমাদের মস্তিষ্কের সক্ষমতার খুব সামান্য অংশ ব্যবহার করি। ২০২৬ সালের এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সফল হতে হলে মস্তিষ্কের সঠিক যত্ন নেওয়া অপরিহার্য। পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার এবং অপ্রয়োজনীয় ডিজিটাল আসক্তি বর্জন করলে আপনার মস্তিষ্কের এই ‘সুপার কম্পিউটার’ আরও দ্রুত কাজ করবে।
পরিশেষে: নিজের মস্তিষ্ককে অবমূল্যায়ন করবেন না। এটি শহরের সমান বড় কোনো সুপার কম্পিউটারের চেয়েও দামী। এই নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করুন এবং একে সঠিক ও সৃজনশীল কাজে ব্যবহার করুন।
তথ্যসূত্র ও এনালাইসিস:
- গুগল সার্চ ট্রেন্ডস ২০২৬: ‘Human Brain Capacity vs AI’ এনালাইসিস।
- নিউরোসায়েন্স জার্নাল (Neuroscience Journal): মস্তিস্কের প্রসেসিং পাওয়ার সংক্রান্ত প্রতিবেদন।
- এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ (MIT Technology Review): ২০২৬ সালের আধুনিক নিউরো-কম্পিউটিং।
- সায়েন্টিফিক আমেরিকান (Scientific American): হিউম্যান ডাইনামিক্স ও ফিজিক্স।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
বিষয়ঃ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রযুক্তি প্রতিবেদক | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
ঢাকা: বর্তমান যুগ স্মার্টফোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আর হাই-ডেফিনিশন পর্দার যুগ। প্রযুক্তির এই বিশালত্বের ভিড়ে আমরা ‘ক্যালকুলেটর’ নামক ক্ষুদ্র যন্ত্রটির গুরুত্বের কথা প্রায় ভুলেই গেছি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, পকেটে থাকা সামান্য একটি চিপ কীভাবে চোখের পলকে বিশাল অংকের গুণ বা ভাগ করে ফেলে? আজ আমরা উন্মোচন করব ক্যালকুলেটরের ভেতরের সেই বিস্ময়কর ইলেকট্রনিক মহাযজ্ঞ।

১. মানুষের ভাষা বনাম মেশিনের ভাষা: বাইনারি রহস্য
মানুষের হাতে ১০টি আঙুল থাকায় আমরা ‘ডেসিমাল’ বা ১০ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতিতে (০-৯) অভ্যস্ত। কিন্তু ক্যালকুলেটর একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র, যা কেবল বিদ্যুতের উপস্থিতি (On) এবং অনুপস্থিতি (Off) বোঝে। সম্প্রতি জনপ্রিয় বিজ্ঞানভিত্তিক টক-শো ‘টেক জংশন ২০২৬’-এ বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করেছেন যে, ক্যালকুলেটর মূলত একটি ‘বাইনারি ক্যালকুলেটিং মেশিন’। এর সার্কিটগুলো শুধু ০ এবং ১-এর সংকেত বোঝে। আমরা যখন কিপ্যাডে কোনো সংখ্যা চাপি, ক্যালকুলেটর সেটিকে সঙ্গে সঙ্গে বাইনারি কোডে রূপান্তর করে নেয়।
২. যোগের মাধ্যমেই সব হিসেব!

শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি যে, ক্যালকুলেটর মূলত কেবল যোগ করতে জানে। এর ভেতরের গাণিতিক বিন্যাস এমনভাবে তৈরি যে:
- বিয়োগ: ১০ থেকে ৫ বিয়োগ করতে বললে ক্যালকুলেটর ১০-এর সাথে (-৫) যোগ করে।
- গুণ: কোনো সংখ্যাকে গুণ করতে বললে এটি নির্ধারিত সংখ্যাটিকে বারবার যোগ করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
৩. লজিক গেট: ক্যালকুলেটরের ‘মগজ’

এই সব যোগ-বিয়োগের পেছনে মূল কারিগর হলো অসংখ্য ক্ষুদ্রাকৃতির লজিক গেট (Logic Gate)। এই গেটগুলো আসলে হাজার হাজার ট্রানজিস্টর দিয়ে তৈরি এক ধরণের বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক সুইচ। গত বছরের ‘সায়েন্স ডেইলি’-র একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, একটি সাধারণ পকেট ক্যালকুলেটরেও কয়েক হাজার ট্রানজিস্টর থাকে যা আলোর গতিতে ডেটা প্রসেস করে। আপনি যখন সমান (=) চিহ্ন চাপেন, এই লজিক গেটগুলো বাইনারি ফলাফলকে পুনরায় ডেসিমালে রূপান্তর করে আমাদের সামনে পেশ করে।
৪. সেভেন-সেগমেন্ট ডিসপ্লে: সংখ্যা দেখার জাদু
হিসেব শেষ হওয়ার পর সংখ্যাগুলো স্ক্রিনে দেখানোর জন্য ব্যবহৃত হয় সেভেন-সেগমেন্ট এল ই ডি (7-Segment Display)। প্রতিটি ডিজিট দেখানোর জন্য সাতটি ছোট ছোট আলোর বার থাকে। বাইনারি ফলাফল অনুযায়ী নির্দিষ্ট বারগুলো জ্বলে উঠে আমাদের পরিচিত ডেসিমাল সংখ্যা (০-৯) তৈরি করে। এটি এমন এক নিখুঁত প্রযুক্তি যা গত কয়েক দশকেও অপরিবর্তিত থেকেছে।
৫. ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ
অ্যাবাকাস থেকে শুরু করে বিশাল আকারের মেকানিক্যাল মেশিন, আর আজকের সোলার চালিত স্লিম ক্যালকুলেটর—এই বিবর্তন কয়েকশ বছরের। যদিও স্মার্টফোনে এখন সব অ্যাপ পাওয়া যায়, তবুও প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ীদের কাছে ডেডিকেটেড ক্যালকুলেটরের নির্ভুলতা আজও অতুলনীয়।
উপসংহার:
একটি ক্ষুদ্র ক্যালকুলেটর আমাদের শেখায় যে, মহাবিশ্বের সবচেয়ে জটিল সমস্যাগুলোকেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লজিক বা অংশের (যেমন ০ ও ১) মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। তাই ক্যালকুলেটর ভাঙার প্রয়োজন নেই, এর ভেতরের অদৃশ্য লজিকই আমাদের আধুনিক পৃথিবীর বড় বড় হিসেব নিকেশের মেরুদণ্ড।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স: ১. HowStuffWorks – Logic Circuits and Binary System Report. ২. সায়েন্স ডেইলি (Science Daily) – বিবর্তন ও ট্রানজিস্টর প্রযুক্তি আর্কাইভ। ৩. টেক জংশন ২০২৬ (টিভি টক-শো) – ‘অদৃশ্য প্রযুক্তির কার্যকারিতা’ পর্ব। ৪. গুগল টেকনিক্যাল লজিক অ্যানালাইসিস ডেটাবেস।
বিশ্লেষণে: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
সংস্কৃতি প্রতিবেদক | ১ মে ২০২৬
ঢাকা: প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) লোগো কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রতীক নয়, বরং এর প্রতিটি রেখায় মিশে আছে এদেশের ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা এবং মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত কয়েক দফায় পরিবর্তিত হয়েছে এই লোগো। আজ আমরা আলোকপাত করব সেই বিবর্তনের ধারায়।
১. ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের লোগো

১৯২১ সালে যাত্রা শুরুর সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোতে ব্রিটিশ ছাপ স্পষ্ট ছিল। তখন লোগোতে ছিল চাঁদ-তারা ও স্বস্তিকা (卐) চিহ্ন। এর ট্যাগলাইন ছিল ইংরেজিতে— “Truth Shall Prevail”। তবে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর এবং পাকিস্তান আমলের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বস্তিকা চিহ্নটি বাদ দেওয়া হয়। সেখানে আরবি হরফে বই এবং বাংলার চিরচেনা নদী-নৌকার দৃশ্য সংযোজন করা হয়েছিল।
২. ১৯৭২: জয়নুল আবেদীনের সেই পেন্সিল স্কেচ

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৎকালীন উপাচার্য শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের শরণাপন্ন হলে তিনি লোগোর একটি পেন্সিল খসড়া বা স্কেচ তৈরি করে দেন। তিনি নিজে গ্রাফিক ডিজাইনার না হওয়ায় তাঁর ছাত্র এবং যোগ্য উত্তরসূরি শিল্পী সমরজিৎ রায়চৌধুরীকে এটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার দায়িত্ব দেন। এই লোগোতেই প্রথমবারের মতো বাংলা লিপি এবং ‘শিক্ষাই আলো’ স্লোগানটি যুক্ত করা হয়। এর মূল বৈশিষ্ট্য ছিল ‘সূর্যরশ্মিতে শাপলা’।
৩. ১৯৭৩: বর্তমান লোগো ও শিল্পী সমরজিৎ রায়চৌধুরী

১৯৭২ সালের লোগোটি সর্বজনীনভাবে পছন্দ না হওয়ায় ১৯৭৩ সালে পুনরায় সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শিল্পী সমরজিৎ রায়চৌধুরী বর্তমান লোগোটি তিনটি অংশে সাজান:
- ওপরের অংশ: একটি প্রজ্বলিত প্রদীপের আলো এবং তার ওপরে লেখা ‘শিক্ষাই আলো’।
- ডান পাশ: একটি সজাগ চোখ। শিল্পী সমরজিৎ রায়চৌধুরীর মতে, এই চোখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী সচেতন ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতীক। চোখের মনিতে স্থান পেয়েছে বাংলা স্বরবর্ণের প্রথম অক্ষর ‘অ’।
- বাম পাশ: জাতীয় ফুল শাপলা, যা আমাদের প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের প্রতীক।
৪. কারিগর পরিচিতি: একুশে পদকপ্রাপ্ত সমরজিৎ রায়চৌধুরী

এই লোগোর রূপকার সমরজিৎ রায়চৌধুরী ১৯৩৭ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ছিলেন। ৪৩ বছর শিক্ষকতার পর ২০০৩ সালে তিনি অবসর নেন। কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো নয়, বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের অঙ্গসজ্জা করা শিল্পীদের মধ্যেও তিনি ছিলেন অন্যতম। শিল্পকলায় তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৪ সালে তিনি ‘একুশে পদক’ লাভ করেন।
উপসংহার: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোর প্রতিটি অংশ আমাদের শিক্ষা ও চেতনার ধারক। ১৯২১ থেকে ১৯৫২, আর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩—এই পরিবর্তনের প্রতিটি বাঁক আসলে আমাদের জাতীয় পরিচয় নির্মাণের এক একটি ধাপ। বর্তমানের এই লোগোটি আগামী বহু শতাব্দী ধরে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও সংগ্রামের আলো হয়ে পথ দেখাবে।
তথ্যসূত্র: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর্কাইভ, শিল্পী সমরজিৎ রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার এবং চারুকলা অনুষদ রেকর্ড। সংগ্রহ ও উপস্থাপনা: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সম্পাদনায়: নিউজ ডেস্ক
বিস্তারিত তথ্যের জন্য: bdsbulbulahmed.com
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: [BDS Bulbul Ahmed]
বিভাগ: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি / ইতিহাস
উৎস: (প্রথম আলো ও ঐতিহাসিক আর্কাইভের সহায়তায়)
১৮৯৩ সালের শিকাগো ওয়ার্ল্ড ফেয়ার। পুরো মেলা প্রাঙ্গণ এক মায়াবী আলোয় ঝলমল করছে। মানুষ বিস্ময়ে দেখছে ‘পরিবর্তী বিদ্যুৎ’ বা এসি কারেন্টের জাদু। যার হাত ধরে এই আলোকসজ্জা, তিনি ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় এবং প্রতিভাবান বিজ্ঞানী— নিকোলা টেসলা। এডিসনের সমবিদ্যুৎ (DC) যখন জঞ্জাল আর সীমাবদ্ধতায় আটকে ছিল, তখন টেসলা পৃথিবীকে দেখালেন চিকন তারে মাইলকে মাইল বিদ্যুৎ পাঠানোর স্বপ্ন।
১. মেধাবী ছাত্র থেকে ‘ডিগ্রিহীন’ প্রকৌশলী

১৮৫৬ সালে বর্তমান ক্রোয়েশিয়ার এক গ্রামে জন্ম নেওয়া টেসলা ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অনন্য। গণিতের জটিল ইন্টিগ্র্যাল ক্যালকুলাস তিনি মুখে মুখেই সমাধান করে ফেলতেন। হাইস্কুলের চার বছরের কোর্স শেষ করেছিলেন মাত্র তিন বছরে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় টেসলা দাবি করেন, কমিউটেটর ছাড়াই ডায়নামো তৈরি সম্ভব। তাঁর এই অদম্য জেদ আর অধ্যাপকদের সাথে মতভেদের কারণে শেষ পর্যন্ত ডিগ্রি ছাড়াই তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করতে হয়।
২. এডিসনের সাথে সংঘাত ও ‘আমেরিকান কৌতুক’

১৮৮৪ সালে টেসলা যখন নিউইয়র্কে টমাস আলভা এডিসনের কোম্পানিতে যোগ দেন, তখন সূচিত হয় বিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত দ্বৈরথ। এডিসনের ডিসি জেনারেটরের দক্ষতা বাড়ানোর কাজ সফলভাবে শেষ করার পর টেসলাকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৫০ হাজার ডলার দিতে অস্বীকার করেন এডিসন। এডিসন রসিকতা করে বলেন, “তুমি আমেরিকান কৌতুক বোঝোনি।” এই অভিমানে টেসলা পদত্যাগ করেন এবং শুরু হয় ‘কারেন্ট ওয়ার’ বা বিদ্যুতের যুদ্ধ।
৩. বিনা তারে বিদ্যুৎ ও টেসলা কয়েল

টেসলার সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল তারবিহীন বিদ্যুৎ সঞ্চালন। ১৮৯৩ সালের প্রদর্শনীতে তিনি দেখান, কোনো তারের সংযোগ ছাড়াই একটি বাতি জ্বালানো সম্ভব। তাঁর স্বপ্ন ছিল ‘ওয়ার্ল্ড ওয়্যারলেস সিস্টেম’, যার মাধ্যমে পুরো পৃথিবী বিনা তারে বিদ্যুৎ ও তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবে। যদিও অর্থের অভাবে তাঁর ‘ওয়ার্ডেনক্লিফ টাওয়ার’ প্রকল্প সফল হয়নি, তবে আজকের রেডিও এবং ওয়াই-ফাই প্রযুক্তির ভিত্তি সেই টেসলা কয়েল।
৪. ৩০০ পেটেন্টের অধিকারী এক নিঃস্ব জাদুকর

রেডিওর আবিষ্কারক হিসেবে আমরা মার্কনিকে চিনলেও, মার্কনি টেসলার ১৭টি পেটেন্ট ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৪৩ সালে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট টেসলাকেই রেডিওর প্রকৃত উদ্ভাবক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এক্স-রে থেকে শুরু করে রিমোট কন্ট্রোল নৌকা, এমনকি আজকের হেলিকপ্টারের আদি ধারণা—সবই ছিল টেসলার মস্তিষ্কের অবদান। অথচ ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন দারুণ অর্থকষ্টে। শেষ জীবনে নিউইয়র্কার হোটেলের একটি কক্ষে পায়রাদের সাথে সময় কাটিয়ে ১৯৪৩ সালে তিনি মারা যান।
৫. টেসলার বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ

বিজ্ঞানীরা ১৯৬০ সালে চৌম্বক ক্ষেত্রের এককের নাম দিয়েছেন ‘টেসলা’। আজ যখন আমরা বৈদ্যুতিক গাড়ির কথা শুনি, সেই বিখ্যাত ‘Tesla’ কোম্পানির নামটিও এই মহান বিজ্ঞানীর প্রতি সম্মান জানিয়ে রাখা। আজকের স্মার্ট দুনিয়া যে বেতার তরঙ্গে চলে, তার প্রতিটি স্পন্দনে মিশে আছে নিকোলা টেসলার নাম।
এক নজরে নিকোলা টেসলা
| বিষয় | তথ্য |
| জন্ম | ১০ জুলাই ১৮৫৬, ক্রোয়েশিয়া। |
| আবিষ্কার | এসি বিদ্যুৎ, ইন্ডাকশন মোটর, টেসলা কয়েল, রেডিওর মূল নকশা। |
| পেটেন্ট সংখ্যা | প্রায় ৩০০টি। |
| সম্মাননা | চৌম্বক ক্ষেত্রের একক ‘টেসলা’ (T)। |
| মৃত্যু | ৭ জানুয়ারি ১৯৪৩, নিউ ইয়র্ক। |
বি.ডি.এস ডিজিটাল এডিটোরিয়াল ইনসাইট: নিকোলা টেসলার জীবন আমাদের শেখায় যে, উদ্ভাবন কেবল ব্যবসার জন্য নয়, বরং মানবজাতির কল্যাণের জন্য হওয়া উচিত। টেসলা হয়তো ব্যবসা বোঝেননি, কিন্তু তিনি ভবিষ্যৎ বুঝেছিলেন। তাঁর সেই ভবিষ্যৎ আজ আমাদের বর্তমান।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



