শিক্ষা

৩২টি মস্তিষ্ক ও ৩০০ দাঁতের বিস্ময়কর জীব ‘জোঁক’: চিকিৎসাবিজ্ঞানে কেন এর এত কদর?
জোঁক

নিউজ ডেস্ক

June 4, 2026

শেয়ার করুন

লাইফস্টাইল ও স্বাস্থ্য ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ প্রকাশিত: ৪ জুন ২০২৬

বর্ষাকালে বা স্যাঁতসেঁতে মাটিতে হাঁটতে গিয়ে পায়ে জোঁক লাগেনি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। জোঁক দেখলেই সাধারণ মানুষের মনে এক ধরণের আতঙ্ক বা অস্বস্তি কাজ করে। কিন্তু আপনি কি জানেন, যাকে আমরা ক্ষতিকর বা রক্তচোষা ভাবছি, সেই জোঁক আসলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক পরম বন্ধু? শুধু তাই নয়, এই ছোট্ট প্রাণীটির শারীরিক গঠন এবং বেঁচে থাকার প্রক্রিয়াটি যেকোনো কল্পবিজ্ঞানকেও হার মানায়।

আজ জোঁকের শরীরের ভেতরের এমন কিছু জানা-অজানা বিস্ময়কর তথ্য এবং এর অবিশ্বাস্য ওষুধি গুণাবলী নিয়ে পালস বাংলাদেশ-এর পাঠকদের জন্য বিশেষ আয়োজন।

রক্ত চোষার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ওষুধি জাদু

একটি প্রাপ্তবয়স্ক জোঁক সাধারণত এক কামড়ে ২ থেকে ১৫ মিলিলিটার পর্যন্ত রক্ত শুষে নিতে পারে। তবে রক্ত চোষার চেয়ে বড় বিষয় হলো, রক্ত চোষার সময় জোঁক তার মুখ থেকে এক বিশেষ ধরণের লালা মানুষের রক্তে মিশিয়ে দেয়। এই লালার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আসল ম্যাজিক:

  • রক্তের দুষ্টি দূরীকরণ: জোঁকের লালায় হিরুডিন (Hirudin), ক্যালিক্রেইন ও ক্যালিনের মতো অত্যন্ত কার্যকরী কিছু প্রাকৃতিক উৎসেচক বা এনজাইম থাকে। এগুলো রক্তে প্রবেশ করে রক্তের ভেতরের ক্ষতিকর উপাদান বা দুষ্টি দূর করতে সরাসরি সাহায্য করে।
  • জীবাণু ধ্বংসকারী প্রোটিন: জোঁকের শরীর থেকে ‘ডেস্টাবিলেস’ (Destabilase) নামের এক ধরণের বিশেষ প্রোটিন মানুষের দেহে প্রবেশ করে, যা শরীরের ভেতরে থাকা বহু জেদি ও ক্ষতিকর জীবাণুকে নিমেষেই মেরে ফেলে।
  • নতুন রক্ত সঞ্চালন ও সুগার নিয়ন্ত্রণ: শরীরের কোনো অংশে ক্ষত বা পচন ধরলে জোঁক সেখানকার দূষিত রক্ত দ্রুত শুষে নেয় এবং ওই অংশে নতুন ও সুস্থ রক্ত সঞ্চালনে সাহায্য করে। এমনকি এটি রক্তে শর্করার (Sugar) মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
  • বাতের ব্যথা বা জয়েন্ট পেইন উপশম: জয়েন্ট পেইনে বা বাতের ব্যথায় দারুণ কাজ করে আধুনিক ‘জোঁক থেরাপী’। ব্যথার জায়গায় কিছুক্ষণ জোঁক রাখলে সেখানকার রক্ত সরবরাহের দ্রুত উন্নতি ঘটে এবং ব্যথা কমে যায়।

জোঁক সম্পর্কে ৫টি অবিশ্বাস্য ও অজানা তথ্য

জোঁক সম্পর্কে ৫টি অবিশ্বাস্য এবং অত্যন্ত চমৎকার তথ্য নিচে দেওয়া হলো, যা সাধারণ মানুষের কাছে অনেকটাই অজানা:

১. এদের শরীরে ৩২টি মস্তিষ্ক রয়েছে

জোঁকের শরীর বাইরে থেকে দেখতে একটি একক অংশ মনে হলেও, এর অভ্যন্তরীণ গঠন ৩১ বা ৩২টি খণ্ডে বিভক্ত। প্রতিটি খণ্ডের নিজস্ব গ্যাংগ্লিয়ন বা স্নায়ু কেন্দ্র রয়েছে, যা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। এই অনন্য স্নায়ুতন্ত্রের কারণে বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন যে, একটি জোঁকের শরীরে ৩২টি মস্তিষ্ক রয়েছে।

২. এদের মুখে শত শত ধারালো দাঁত থাকে

রক্ত চোষার জন্য জোঁকের সাধারণত তিনটি চোয়াল থাকে। প্রতিটি চোয়ালে প্রায় ১০০টি করে অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও ধারালো দাঁত থাকে। অর্থাৎ, একটি জোঁকের মুখে প্রায় ৩০০টি দাঁত থাকে। এরা যখন কামড় দেয়, তখন চোয়ালগুলো করাতের মতো চামড়া কেটে রক্ত বের করে আনে।

৩. কামড়ালেও কোনো ব্যথা অনুভূত হয় না

জোঁক যখন কামড় দেয় বা রক্ত চোষে, তখন মানুষ বা প্রাণী সাধারণত কোনো ব্যথা টের পায় না। এর কারণ হলো, জোঁকের লালা রসে এক ধরণের প্রাকৃতিক অবশকারী উপাদান (Anesthetic) থাকে। কামড়ানোর সাথে সাথে এরা ওই স্থানটি অবশ করে দেয়, যাতে শিকার টের না পায় এবং তারা শান্তিতে রক্ত চোষা শেষ করতে পারে।

৪. রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় না (হিরুডিন)

জোঁকের লালায় ‘হিরুডিন’ (Hirudin) নামক একটি বিশেষ প্রোটিন থাকে, যা রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয় (Anticoagulant)। এর ফলে জোঁক যতক্ষণ কামড়ে ধরে রাখে, রক্ত তরল থাকে এবং অবিরত প্রবাহিত হতে থাকে। এমনকি জোঁক শরীর থেকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও হিরুডিনের কারণে বেশ কিছুক্ষণ ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়া বন্ধ হয় না।

৫. এক পেট রক্ত খেয়ে এরা এক বছর না খেয়ে থাকতে পারে

জোঁক তাদের শরীরের ওজনের চেয়ে প্রায় ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি রক্ত একবারে চুষে নিতে পারে। এদের পরিপাকতন্ত্র অত্যন্ত ধীরগতির। একবার পেট পুরে রক্ত খাওয়ার পর সেই রক্ত হজম করতে এবং তা থেকে শক্তি পেতে এদের কয়েক মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। ফলে মাত্র একবার রক্ত খেয়ে এরা অনায়াসে এক বছর পর্যন্ত না খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে।


আধুনিক চিকিৎসায় ‘জোঁক থেরাপি’ (Leech Therapy)

আধুনিক চিকিৎসায় ‘জোঁক থেরাপি’ (যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘হিরুডোথেরাপি’ বা Hirudotherapy নামে পরিচিত) একটি অত্যন্ত কার্যকর এবং স্বীকৃত পদ্ধতি। বিশেষ করে প্লাস্টিক সার্জারি, মাইক্রোসার্জারি এবং রক্তনালীর ব্লকেজ দূর করতে সার্জনরা বিশ্বজুড়ে জীবন্ত জোঁক ব্যবহার করছেন। ২০০৪ সালে আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA) জোঁককে একটি ‘মেডিকেল ডিভাইস’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়।

আধুনিক চিকিৎসায় জোঁক থেরাপির মূল ভূমিকা এবং মেকানিজম নিচে দেওয়া হলো:

১. প্লাস্টিক ও পুনর্গঠনমূলক সার্জারি (Plastic & Reconstructive Surgery)

কাটা আঙুল, কান বা স্তন জোড়া লাগানোর মতো জটিল মাইক্রোসার্জারির পর ধমনী (Artery) রক্ত সরবরাহ করলেও অনেক সময় শিরাগুলো (Veins) ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। ফলে ক্ষতস্থানে রক্ত জমে নীল হয়ে যায় এবং কোষগুলো মারা যেতে শুরু করে (Venous Congestion)।

  • এই সময় ওই স্থানে জোঁক বসানো হয়।
  • জোঁক জমে থাকা দূষিত রক্ত চুষে নিয়ে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করে এবং নতুন টিস্যু বা কোষকে বাঁচিয়ে তোলে।

২. রক্ত জমাট বাঁধা রোধ (Blood Clot Prevention)

জোঁকের লালা রসে ‘হিরুডিন’ (Hirudin) এবং ‘ক্যালিন’ (Calin) নামক এনজাইম থাকে। এগুলো মানবদেহের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাকৃতিক অ্যান্টি-কোয়াগুল্যান্ট বা রক্ত জমাট-রোধী উপাদান। জোঁক কামড়ানোর ফলে এই উপাদানগুলো রক্তনালীতে প্রবেশ করে রক্তকে তরল রাখে এবং ক্ষতিকর ক্লট বা চাকা তৈরিতে বাধা দেয়।

৩. রক্তনালী প্রসারিত করা ও রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি

জোঁকের লালায় এক ধরণের ‘ভাসোডিলেটর’ (Vasodilator) উপাদান থাকে, যা মানুষের রক্তনালীগুলোকে চওড়া বা প্রসারিত করে। এর ফলে আক্রান্ত স্থানে এবং তার আশেপাশে অক্সিজেন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ রক্তের প্রবাহ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়, যা দ্রুত ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করে।

৪. ব্যথানাশক ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণ

জোঁকের লালায় প্রাকৃতিক অবশকারী উপাদান (Anesthetic) এবং প্রদাহ-রোধী (Anti-inflammatory) উপাদান থাকে। এটি বাতের ব্যথা (Osteoarthritis) এবং জয়েন্টের ক্রনিক প্রদাহ বা ফোলা ভাব কমাতে দারুণ কাজ করে। অনেক দেশে হাঁটুর ব্যথার চিকিৎসায় সরাসরি জোঁক থেরাপি দেওয়া হয়।

৫. কার্ডিওভাসকুলার ও ডায়াবেটিক ফুট কেয়ার

হৃদরোগ বা পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজের কারণে যাদের রক্ত সঞ্চালনে সমস্যা হয়, তাদের চিকিৎসায় জোঁকের লালা থেকে তৈরি ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এছাড়া ডায়াবেটিসের কারণে পায়ে পচন ধরা (Diabetic Foot Ulcer) রোগীদের ক্ষেত্রে জোঁক থেরাপি দিয়ে অঙ্গটি কেটে ফেলা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে।

সতর্কতা ও মেডিকেল জোঁক

চিকিৎসায় সাধারণ পুকুর বা ডোবার জোঁক কখনোই ব্যবহার করা হয় না। এর জন্য গবেষণাগারে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত পরিবেশে চাষ করা বিশেষ প্রজাতির জোঁক (Hirudo medicinalis) ব্যবহার করা হয়। সংক্রামক ব্যাধি ছড়ানো রোধ করতে একটি জোঁক কেবল একজন রোগীর ক্ষেত্রেই একবারই ব্যবহার করা হয় এবং ব্যবহারের পর তা ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

মেডিকেল গ্রেড জোঁক এবং সাধারণ বুনো জোঁকের মধ্যে এই পার্থক্য এবং কঠোর নিয়মগুলো মেনে চলার প্রধান কারণগুলো নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

১. সংক্রমণের ভয়াবহ ঝুঁকি এড়ানো

পুকুর, খাল-বিল বা ডোবার বুনো জোঁক নানাবিধ ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং পরজীবী (Parasite) বহন করে। বিশেষ করে এদের অন্ত্রে Aeromonas hydrophila নামক একটি ব্যাকটেরিয়া প্রাকৃতিকভাবেই থাকে। বুনো জোঁক সরাসরি মানুষের ক্ষতস্থানে বসালে এই ব্যাকটেরিয়া রক্তে প্রবেশ করে মারাত্মক সংক্রমণ, গ্যাংগ্রিন বা সেপসিস (Sepsis) তৈরি করতে পারে।

২. ল্যাবরেটরিতে নিয়ন্ত্রিত চাষ (Biosecure Environment)

মেডিকেল জোঁক বা Hirudo medicinalis সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত ল্যাবরেটরিতে বৈজ্ঞানিক উপায়ে লালন-পালন করা হয়। এদের নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় যেন এদের শরীরে কোনো প্যাথোজেন বা রোগজীবাণু না থাকে। ফলে এগুলো মানুষের চিকিৎসার জন্য পুরোপুরি নিরাপদ হয়।

৩. ‘একবার ব্যবহারযোগ্য’ বা সিঙ্গেল-ইউজ নীতি

সিরিঞ্জের সুই বা ব্লেডের মতো মেডিকেল জোঁককেও চিকিৎসায় ‘সিঙ্গেল-ইউজ’ (Single-use) বা একবার ব্যবহারযোগ্য ডিভাইস হিসেবে গণ্য করা হয়।

  • একজন রোগীর রক্ত চোষার পর সেই জোঁকের লালা ও পাকস্থলীতে ওই রোগীর রক্তের কণা থেকে যায়।
  • ওই একই জোঁক যদি অন্য কাউকে কামড়ায়, তবে প্রথম রোগীর শরীর থেকে এইচআইভি (HIV), হেপাটাইটিস বি বা সি-এর মতো রক্তবাহিত মারাত্মক রোগ দ্বিতীয় রোগীর শরীরে সংক্রমিত হতে পারে।

৪. ব্যবহারের পর মানবিক ও নিরাপদ ধ্বংসকরণ

চিকিৎসা শেষে জোঁকগুলোকে সাধারণত ৭০% অ্যালকোহল বা বিশেষ জীবাণুনাশক দ্রবণে ডুবিয়ে অত্যন্ত দ্রুত ও ব্যথাহীনভাবে মেরে ফেলা হয় (Euthanasia)। এরপর সেগুলোকে ‘বায়োমেডিকেল বর্জ্য’ (Biomedical Waste) হিসেবে হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী নিরাপদে পুড়িয়ে বা মাটিচাপা দিয়ে ধ্বংস করা হয়, যাতে পরিবেশ বা অন্য কোনো প্রাণী সংক্রমিত না হয়।

বিজ্ঞানের এই কঠোর স্বাস্থ্যবিধির কারণেই আজ প্রাচীন ‘রক্তমোক্ষণ’ বা ব্লাডলেটিং পদ্ধতিটি আধুনিক প্লাস্টিক সার্জারিতে এত নিরাপদ ও সফলভাবে অবদান রাখছে।

জোঁকের কামড়ে লবণ দিলে কেন এরা মারা যায়, তার আসল বৈজ্ঞানিক কারণ হলো অসমোসিস (Osmosis) বা অভিস্রবণ প্রক্রিয়া

লবণ কীভাবে জোঁকের ওপর কাজ করে, তা নিচে সংক্ষেপে বুলেটের মাধ্যমে দেওয়া হলো:

  • আর্দ্র চামড়া: জোঁকের ত্বক অত্যন্ত পাতলা এবং সবসময় ভেজা বা আর্দ্র থাকে।
  • লবণের আক্রমণ: জোঁকের গায়ে লবণ দিলে লবণের ঘনত্ব বাইরের দিকে অনেক বেড়ে যায়।
  • জলবিয়োজন: অভিস্রবণ নিয়মানুযায়ী, ভেতরের কম ঘনত্বের পানি চামড়া ভেদ করে বাইরে চলে আসে।
  • কোষের মৃত্যু: মুহূর্তের মধ্যে জোঁকের শরীরের সমস্ত পানি শোষিত হয়ে কোষগুলো সংকুচিত হয়ে যায়।
  • তাৎক্ষণিক মৃত্যু: তীব্র ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতার কারণে জোঁক ছটফট করে মারা যায়।

এটি মূলত একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া নয়, বরং একটি নিখুঁত ভৌত প্রক্রিয়া (Physical Process)

আপনার মন্তব্য জানান: জোঁকের ১০টি চোখ কিংবা ৩২টি মস্তিষ্কের এই অদ্ভুত বৈজ্ঞানিক তথ্যটি আপনার কাছে কেমন লাগলো? জোঁক থেরাপি সম্পর্কে আপনার কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা মতামত থাকলে নিচে কমেন্ট করুন।

প্রকৃতির এমন সব নিখুঁত বিস্ময়, জীবজগতের জানা-অজানা রোমাঞ্চকর তথ্য, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং আধুনিক বিজ্ঞানের নিত্যনতুন আবিষ্কারের বিবরণ নিয়মিত পড়তে ভিজিট করুন পালস বাংলাদেশ | pulsebangladesh.com

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

নবাবজাদি পরিবানু

নিউজ ডেস্ক

May 31, 2026

শেয়ার করুন

পুরান ঢাকার নবাব পরিবারের ইতিহাস মানেই শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজকল্যাণে নারীদের এক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। আর এই মহীয়সী নারীদের তালিকায় অন্যতম একটি নাম হলো নবাবজাদি পরিবানু। ঢাকার বিখ্যাত ‘পরিবাক’ এলাকাটির নামকরণ এবং নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

১. জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

নবাবজাদি পরিবানু ১৮৮৪ সালের ১ জুলাই পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন।

  • পিতা: ঢাকার বিখ্যাত নবাব খাজা আহসান উল্লাহ।
  • মাতা: কামরুন্নেসা বেগম।

তিনি কোনো প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে না গেলেও, तत्कालीन পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী গৃহশিক্ষক ও গৃহপরিচারিকার নিকট থেকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আরবি, ফারসি এবং ইংরেজি ভাষায় শিক্ষাগ্রহণ করেন।

২. দৃঢ় মনোবল ও জমিদারির কাজকর্ম

পরিবানু কেবল গৃহকোণে আবদ্ধ বিদুষী নারীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ় মনোবলের অধিকারী।

  • ঘোড়সওয়ারি: তৎকালীন সময়ে একজন মুসলিম সম্ভ্রান্ত নারী হয়েও তিনি চমৎকারভাবে ঘোড়ায় চড়া শিখেছিলেন।
  • উত্তরাধিকারী হওয়ার পরিকল্পনা: তাঁর মেধা ও যোগ্যতায় মুগ্ধ হয়ে পিতা নবাব আহসান উল্লাহ তাঁকে জমিদারির নানাবিধ কাজকর্ম শেখান। এমনকি এক পর্যায়ে পরিবানুকে তাঁর জমিদারির মূল উত্তরাধিকারী করার পরিকল্পনাও নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নবাব বাহাদুরের আকস্মিক মৃত্যুর কারণে সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবে রূপ নিতে পারেনি।

৩. ‘পরিবাক’ নামকরণের নেপথ্য ইতিহাস

১৯০০ সালে নবাব পরিবারের খাজা ভোলা মিয়ার পুত্র খাজা বদরুদ্দিনের সাথে পরিবানুর বিয়ে সম্পন্ন হয় এবং বিয়ের পর তিনি ঢাকার দিলখুশায় বসবাস শুরু করেন। তাঁর হাত ধরেই জন্ম নেয় আজকের ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা ‘পরিবাক’।

  • شاہবাগ বাগানবাড়ির নিয়ন্ত্রণ: ১৯১৯ সালে পরিবানু ৬০ বিঘা জমিসহ ঢাকার শাহবাগ বাগানবাড়ির দক্ষিণাংশ তৎকালীন নবাব হাবিবুল্লাহর কাছ থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।
  • নারীদের জন্য উন্মুক্ত উদ্যান: বাগানটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর, তিনি ঢাকার সম্ভ্রান্ত মহিলাদের বিনোদন ও বেড়ানোর জন্য প্রতি শনিবার সেটি উন্মুক্ত রাখার বিশেষ ব্যবস্থা করেন।
  • পরিবাক নামের উৎপত্তি: পরিবানুর নাম এবং তাঁর এই সুন্দর বাগানবাড়ির ঐতিহ্য থেকেই পরবর্তীকালে পুরো এলাকাটি জনমুখে ‘পরিবাক’ নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

৪. নারী শিক্ষায় অবদান: কামরুন্নেসা গার্লস হাই স্কুল

ঢাকায় নারী শিক্ষার প্রসারে নবাবজাদি পরিবানুর অবদান চিরস্মরণীয়। ১৯২৪ সালে ঢাকার নারীদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে ‘কামরুন্নেসা গার্লস হাই স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই স্কুলটির প্রতিষ্ঠা এবং এর সার্বিক উন্নয়নে নবাবজাদি পরিবানু এবং তাঁর অপর বোনেরা মিলে তৎকালীন সময়ে লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করেন, যা নারী শিক্ষার ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক।

৫. এক নজরে নবাবজাদি পরিবানুর জীবন ও কর্ম ম্যাট্রিক্স

ঢাকার নবাব পরিবারের অন্যতম বিদুষী ও দূরদর্শী নারী নবাবজাদি পরিবানু-র জীবন ও সমাজসেবামূলক কাজের বিবরণ নিচে একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো :

পরিমাপক (Criteria) নবাবজাদি পরিবানুর জীবন ও কর্মের বিবরণ
জন্ম ও বংশ পরিচয়১ জুলাই ১৮৮৪ সালে পুরান ঢাকার আহসান মঞ্জিলে জন্ম । পিতা: নবাব খাজা আহসান উল্লাহ এবং মাতা: কামরুন্নেসা বেগম
ব্যতিক্রমী শিক্ষা ও দক্ষতাগৃহশিক্ষকের কাছে আরবি, ফারসি ও ইংরেজি শেখেন । অনন্য দক্ষতার কারণে ঘোড়সওয়ারী এবং জমিদারির কাজও শিখেছিলেন
বিবাহ ও পারিবারিক জীবন১৯০০ সালে নবাব পরিবারের খাজা ভোলা মিয়ার পুত্র খাজা বদরুদ্দিনের সাথে বিয়ে হয় । তিনি দিলকুশায় বসবাস করতেন
‘পরিববাগ’ এলাকার রূপকার১৯১৯ সালে শাহবাগ বাগানবাড়ির ৬০ বিঘা জমি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন । সম্ভ্রান্ত নারীদের বিনোদনের জন্য প্রতি শনিবার বাগানটি উন্মুক্ত রাখতেন, যা থেকে এলাকাটি পরবর্তীতে পরিপাগ নামে পরিচিত হয়
শিক্ষা বিস্তারে অবদান১৯২৪ সালে ঢাকার টিকাটুলিতে নারীদের শিক্ষার জন্য নিজের মায়ের নামে কামরুন্নেসা গার্লস হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন । এই স্কুলের উন্নয়নে তিনি ও তাঁর বোনেরা মিলে তৎকালীন সময়ে লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করেন
মৃত্যু১৯৫৮ সালে এই বিদুষী নারী মৃত্যুবরণ করেন

ম্যাট্রিক্সের মূল সারসংক্ষেপ

নবাবজাদি পরিবানু ছিলেন নারী শিক্ষার অগ্রদূত এবং সেকালের একজন প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব । তাঁর প্রতিষ্ঠিত কামরুন্নেসা গার্লস হাই স্কুলটি ১৯৪৭ সালে সরকারি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হয় এবং এটি আজও পুরান ঢাকার অন্যতম বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নারী শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে

৬. জীবনাবসান ও শ্রদ্ধাঞ্জলি

এই মহীয়সী ও বিদুষী নারী ১৯৫৮ সালের ২৩ অক্টোবর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর তাঁকে ঢাকার বেগমবাজারের নবাব পরিবারের পারিবারিক গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। ঢাকার ইতিহাস ও নারীর ক্ষমতায়নের এই নীরব রূপকারের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ

একজন ইতিহাস ও কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবে আমি মনে করি, ঢাকার স্থানীয় ইতিহাস (Local History) নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের জন্য নবাবজাদি পরিবানুর মতো চরিত্রগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নামকরণের পেছনে যে কত রোমাঞ্চকর এবং গৌরবময় ইতিহাস লুকিয়ে আছে, তার এক অনন্য প্রমাণ হলো ‘পরিবাক’। ১৯২৪ সালে তাঁর ও তাঁর বোনেদের দেওয়া লক্ষাধিক টাকার অনুদানই আজকের কামরুন্নেসা গার্লস স্কুলের ভিত্তি, যা তৎকালীন মুসলিম সমাজে নারী শিক্ষার অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করেছিল। এই ধরণের ঐতিহাসিক কন্টেন্টগুলো ইন্টারনেটে সঠিক তথ্যসহ ডিজিটাল আর্কাইভ হিসেবে থাকা অত্যন্ত জরুরি।

অনুমোদিত লেখক: BDS Bulbul Ahmed

ইতিহাস ও কন্টেন্ট অ্যানালিস্ট

আমার কাজের পোর্টফোলিও ও ডিজিটাল গ্রোথ স্ট্র্যাটেজি দেখতে ভিজিট করুন: bdsbulbulahmed.com

সাবিলা নূর ও সাকিব

নিউজ ডেস্ক

May 31, 2026

শেয়ার করুন

আমাদের সমাজে যুগ যুগ ধরে একটা গৎবাঁধা ধারণা প্রচলিত আছে— “আগে পড়ালেখা শেষ করো, ভালো সার্টিফিকেট নাও, তারপর ভালো চাকরি পাবে।” কিন্তু বর্তমান যুগের বাস্তব চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। চলুন সাবিলা নূর এবং সাকিব আল হাসানের মতো সফল ব্যক্তিত্বদের ক্যারিয়ার বিশ্লেষণ করে বিষয়টি সহজভাবে বোঝা যাক:

সাবিলা নূর (Sabila Nur): সাবিলা নূর তাঁর অভিনয় প্রতিভাকে আঁকড়ে না ধরে কেবল গতানুগতিক পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকলে হয়তো সাধারণ দশজনের মতো একটি চাকরি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হতো। তবে তিনি তাঁর প্যাশনকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন এবং পাশাপাশি পড়াশোনাতেও নিজেকে অনন্য প্রমাণ করেছেন।

সাবিলা নূরের শিক্ষাজীবন ও অন্যান্য অর্জন:

অনন্য ফলাফল: আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি) থেকে ইংরেজি সাহিত্যে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন।

গৌরবোজ্জ্বল সিজিপিএ: তিনি সিজিপিএ ৪.০০ এর মধ্যে অবিশ্বাস্য ৩.৯৭ পয়েন্ট অর্জন করেছেন।

স্বীকৃতি: পড়াশোনায় অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে ‘ড. আনোয়ারুল আবেদিন লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়েছে।

সামঞ্জস্য রক্ষা: তিনি শুটিংয়ের ব্যস্ততার মাঝেও ক্লাসে শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করে পড়াশোনা ও অভিনয়—দুটোতেই অসাধারণ ভারসাম্য বজায় রেখেছেন।

তাঁর এই জীবন থেকে এটি স্পষ্ট যে, পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের ভালো লাগা বা প্যাশনকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে জীবনের চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে ফেলা সম্ভব।

সাবিলা নূরের ক্যারিয়ারের এই অনুপ্রেরণামূলক যাত্রা এবং তাঁর অভিনয়ের দক্ষতার পেছনের গল্প সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে:

সাকিব আল হাসান (Sakib Al-Hasan): সাকিব আল হাসান যদি ক্রিকেটের চেয়ে শুধু গতানুগতিক পড়াশোনাকে প্রাধান্য দিতেন, তবে বাংলাদেশ আজ একজন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারকে পেত না। ক্রিকেটের প্রতি তাঁর একাগ্রতাই তাঁকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

সাকিব আল হাসানের শিক্ষাজীবন ও সাফল্যের কিছু মূল দিক:

দীর্ঘ ১৪ বছরের লড়াই: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তীব্র ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি পড়াশোনা পুরোপুরি ছেড়ে দেননি এবং দীর্ঘ ১৪ বছর পর বিবিএ (BBA) সম্পন্ন করেন।

আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (AIUB): এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি তাঁর গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন।

সমাবর্তনে অংশ গ্রহণ: ২০২৩ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১তম সমাবর্তনে তিনি সশরীরে উপস্থিত থেকে গ্র্যাজুয়েশন সার্টিফিকেট গ্রহণ করেন।

ক্যারিয়ার ও স্কিলের ভারসাম্য: খেলার মাঠে শতভাগ মনোযোগ ধরে রেখেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে সদিচ্ছা থাকলে দুই ক্ষেত্রেই সফল হওয়া সম্ভব।

সাকিবের এই যাত্রা তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি বড় শিক্ষা—নিজের মূল প্রতিভা বা স্কিলকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েও কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য পূরণ করা যায়।

এই দুটি উদাহরণ প্রমাণ করে যে, টাকা বা ক্যারিয়ার গড়ার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে বেছে নেওয়া বর্তমান যুগে একটি ভুল ইনভেস্টমেন্ট (Bad Investment)। কারণ, বর্তমান গ্লোবাল মার্কেট চলে স্কিল বা দক্ষতার ওপর, কোনো কাগজের সার্টিফিকেটের ওপর নয়।

পড়ালেখা কি তবে প্রয়োজন নেই?

পড়াশোনা অবশ্যই প্রয়োজন এবং এর গুরুত্ব অপরিসীম। সাবিলা নূর বা সাকিব আল হাসানের উদাহরণ এটি প্রমাণ করে না যে পড়ালেখা অপ্রয়োজনীয়, বরং এটি দেখায় যে পড়াশোনা ও মেধার সঠিক সমন্বয় কীভাবে মানুষকে সফলতার শীর্ষে নিয়ে যায়।

পড়াশোনা কেন প্রয়োজন এবং এটি কীভাবে আমাদের সাহায্য করে, তা নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

১. ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাভাবনার বিকাশ

  • পড়াশোনা মানুষের জ্ঞান ও দূরদর্শিতা বৃদ্ধি করে।
  • এটি সঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য করতে শেখায়।
  • যেকোনো পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিক সক্ষমতা তৈরি করে।

২. সংকটে ব্যাকআপ বা বিকল্প পথ

  • মানুষের ক্যারিয়ারে যেকোনো সময় চোট, দুর্ঘটনা বা বিপর্যয় আসতে পারে।
  • এমন পরিস্থিতিতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একটি শক্তিশালী বিকল্প বা ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করে।
  • সাকিব বা সাবিলা উভয়েই কিন্তু শত ব্যস্ততার মাঝেও তাঁদের গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন এই দূরদর্শিতা থেকেই।

৩. সামাজিক মর্যাদা ও নেটওয়ার্কিং

  • উচ্চশিক্ষা সমাজে মানুষের গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা বৃদ্ধি করে।
  • বিশ্ববিদ্যালয় জীবন একজন মানুষকে বিভিন্ন গুণী মানুষের সাথে পরিচিত হতে এবং বড় নেটওয়ার্ক তৈরি করতে সাহায্য করে।

৪. মেধা ও প্রতিভাকে শাণিত করা

  • প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষের সুপ্ত প্রতিভাকে আরও সুশৃঙ্খল ও পেশাদার রূপ দিতে সাহায্য করে।
  • যেমন, সাবিলা নূরের ইংরেজি সাহিত্যের পড়াশোনা তাঁর চরিত্রের গভীরতা বুঝতে এবং অভিনয়ে বৈচিত্র্য আনতে সাহায্য করেছে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, পড়ালেখা হলো একটি শক্তিশালী ভিত্তি। শুধু পড়ালেখা করে জবের পেছনে না ছুটে, শিক্ষার আলো বুকে নিয়ে নিজের ভেতরের বিশেষ প্রতিভা বা স্কিলকে (যেমন: খেলাধুলা, অভিনয়, ফ্রিল্যান্সিং বা ব্যবসা) জাগিয়ে তোলাই হলো আসল সফলতা।

বর্তমান যুগে শিক্ষার্থীদের করণীয়: পড়াশোনার পাশাপাশি ক্যারিয়ার

বর্তমান যুগে শিক্ষার্থীদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তবমুখী দক্ষতা বা স্কিল অর্জন করা। শুধু সনাতন সার্টিফিকেটের ওপর নির্ভর করে এখনকার প্রতিযোগিতামূলক জব মার্কেটে টিকে থাকা কঠিন।

পড়াশোনার পাশাপাশি ক্যারিয়ার গঠনে বর্তমান যুগে একজন শিক্ষার্থীর করণীয় পদক্ষেপগুলো নিচে দেওয়া হলো:

১. ডিমান্ডিং টেকনিক্যাল স্কিল বা দক্ষতা অর্জন

  • যেকোনো একটি বিষয় বেছে নেওয়া: নিজের আগ্রহ অনুযায়ী গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডেটা অ্যানালিটিক্স বা কন্টেন্ট রাইটিং শিখুন।
  • অনলাইন রিসোর্সের ব্যবহার: ইউটিউব, কোর্সেরা, উডেমি বা বিভিন্ন দেশীয় প্ল্যাটফর্ম থেকে ফ্রি বা পেইড কোর্স করে নিজেকে দক্ষ করুন।
  • এআই (AI) টুলের ব্যবহার: চ্যাটজিপিটি বা মিডজার্নির মতো আধুনিক এআই টুলগুলো কীভাবে নিজের কাজে ব্যবহার করতে হয় তা শিখুন। []

২. একাডেমিক পড়াশোনায় ভারসাম্য বজায় রাখা

  • সিজিপিএ ঠিক রাখা: পড়াশোনা একদম ছেড়ে দেওয়া যাবে না; অন্তত একটি স্ট্যান্ডার্ড সিজিপিএ (যেমন ৩.০০+) বজায় রাখুন।
  • সময় ব্যবস্থাপনা: প্রতিদিনের রুটিনে পড়াশোনা এবং স্কিল চর্চার জন্য নির্দিষ্ট সময় ভাগ করে নিন।

৩. প্রফেশনাল নেটওয়ার্কিং ও যোগাযোগ দক্ষতা

  • লিঙ্কডইন (LinkedIn) প্রোফাইল: ছাত্রাবস্থাতেই একটি প্রফেশনাল লিঙ্কডইন প্রোফাইল খুলুন এবং নিজের কাজের স্যাম্পল সেখানে শেয়ার করুন।
  • যোগাযোগের ভাষা: বাংলা লেখার পাশাপাশি ইংরেজিতে কথা বলা এবং লেখার দক্ষতা (Communication Skill) দারুণভাবে বাড়াতে হবে।

৪. ফ্রিল্যান্সিং বা পার্ট-টাইম জব

  • মার্কেটপ্লেসে কাজ: প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি আপওয়ার্ক (Upwork) বা ফাইভারের (Fiverr) মতো প্ল্যাটফর্মে ছোটখাটো কাজ বা ইন্টার্নশিপ করার চেষ্টা করুন।
  • বাস্তব অভিজ্ঞতা: এটি পড়াশোনা শেষ করার আগেই আপনাকে কর্পোরেট বা কাজের দুনিয়া সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা দেবে।

৫. মেন্টর এবং কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস

  • বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাব: বিতর্ক ক্লাব, বিজনেস ক্লাব বা আইটি ক্লাবের সাথে যুক্ত হোন। এটি লিডারশিপ স্কিল বাড়ায়।
  • মেন্টর খোঁজা: নিজের সেক্টরের অভিজ্ঞ বড় ভাই বা বিশেষজ্ঞদের অনুসরণ করুন এবং তাঁদের থেকে পরামর্শ নিন।

পড়াশোনা আপনাকে একটি শক্তিশালী ভিত্তি দেবে, আর আপনার বাড়তি স্কিল বা দক্ষতা আপনাকে সবার চেয়ে এগিয়ে রাখবে।

এক নজরে সার্টিফিকেট বনাম প্রাকটিক্যাল স্কিল ম্যাট্রিক্স

সার্টিফিকেট এবং প্রাকটিক্যাল স্কিল (ব্যবহারিক দক্ষতা)—দুটোরই ক্যারিয়ারে নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। নিচে একটি তুলনামূলক ম্যাট্রিক্সের মাধ্যমে এক নজরে এদের পার্থক্য ও গুরুত্ব তুলে ধরা হলো:

পরিমাপক (Criteria)প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট (Degree/Certificate)প্রাকটিক্যাল স্কিল (Practical Skill)
মূল সংজ্ঞাপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও পরীক্ষা পাসের প্রমাণপত্র।বাস্তবে কোনো কাজ নিখুঁতভাবে করার যোগ্যতা।
ভূমিকাচাকরির ইন্টারভিউয়ের দরজা খোলার চাবিকাঠি।চাকরিতে টিকে থাকা এবং প্রমোশন পাওয়ার মূল হাতিয়ার।
অর্জনের মাধ্যমস্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় (দীর্ঘমেয়াদি)।কোর্স, ইন্টার্নশিপ, ফ্রিল্যান্সিং ও বাস্তব কাজ (স্বল্পমেয়াদি)।
মূল্যায়ন পদ্ধতিসিজিপিএ (CGPA), গ্রেড এবং পরীক্ষার নম্বর।পোর্টফোলিও, কাজের স্যাম্পল এবং লাইভ ডেমো।
স্থায়িত্বএকবার অর্জন করলে আজীবন অপরিবর্তিত থাকে।প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে প্রতিনিয়ত আপডেট করতে হয়।
কর্পোরেট ভ্যালুএন্ট্রি-লেভেল বা ফ্রেশার হিসেবে চাকরিতে ঢোকার সুযোগ বাড়ায়।দ্রুত ক্যারিয়ার গ্রোথ এবং উচ্চ বেতনের নিশ্চয়তা দেয়।

সংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত (The Verdict)

  • সার্টিফিকেট হলো আপনার যোগ্যতার প্রাথমিক পরিচয়পত্র, যা আপনাকে লাইনে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেয়।
  • প্রাকটিক্যাল স্কিল হলো আপনার আসল শক্তি, যা আপনাকে প্রতিযোগিতায় বিজয়ী করে।

বর্তমান যুগের সেরা ফর্মুলা হলো: সার্টিফিকেটের শক্ত ভিত্তি + প্রাকটিক্যাল স্কিলের ধারালো অস্ত্র।

আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ: ডিজিটাল মার্কেটিং এবং এসইও (SEO) ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘ ৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে ২৫০টিরও বেশি প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোতে আমি একটা বিষয় খুব স্পষ্ট দেখেছি— অনেক মাস্টার্স পাস করা তরুণ ২০-৩০ হাজার টাকার একটা চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন, আবার ১৮-২০ বছরের একজন কলেজ পড়ুয়া তরুণ শুধুমাত্র ভালো এসইও বা আইটি স্কিল থাকার কারণে ঘরে বসেই প্রতি মাসে সম্মানজনক অংকের টাকা আয় করছেন। তাই যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে। পড়াশোনা অবশ্যই করবেন নিজেকে সমৃদ্ধ করার জন্য, কিন্তু ক্যারিয়ার বা অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য ছাত্রজীবন থেকেই নিজের কোনো একটি দক্ষতাকে (Skill) প্রফেশনাল লেভেলে নিয়ে যেতে হবে।

অনুমোদিত লেখক: BDS Bulbul Ahmed

সিনিয়র এসইও কনসালটেন্ট ও টিম লিডার

ডিজিটাল গ্রোথ, টেকনিক্যাল এসইও এবং কন্টেন্ট অপ্টিমাইজেশন স্ট্র্যাটেজি দেখতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজ ডেস্ক

May 26, 2026

শেয়ার করুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। ব্রিটিশ সরকারের ১৯১২ সালের রাজকীয় ঘোষণার পর ১৯২১ সালের ১ জুলাই এই বিশ্ববিদ্যালয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রতিষ্ঠার শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ছিল ৮৭৭ জন। তৎকালীন সময়ে কোনো ছাত্রী সরাসরি ভর্তি না হলেও পরবর্তীতে প্রথম ছাত্রী হিসেবে লীলা নাগ ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে ইতিহাস গড়েন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কে প্রতিষ্ঠা করেন: মূল উদ্যোক্তাদের তালিকা

অনেকেই মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা একক কোনো ব্যক্তি, তবে মূলত এটি ছিল যৌথ প্রচেষ্টার ফসল। প্রতিষ্ঠার পেছনে ৩ জন মুসলিম নেতার অবদান সবচেয়ে বেশি:

  • নবাব স্যার সলিমুল্লাহ: তিনিই প্রথম পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের শিক্ষার আলো ছড়াতে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোর দাবি তোলেন।
  • নবাব স্যার সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী: বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আর্থিক সহায়তা এবং ব্রিটিশদের সাথে লবিংয়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
  • শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক: রাজনৈতিক ও আইনিভাবে ব্রিটিশ সরকারকে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য করার পেছনে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

শুরুর দিকের অনুষদ, বিভাগ ও শিক্ষক সংখ্যা

১৯২১ সালের ১ জুলাই যখন “প্রাচ্যের অক্সফোর্ড” খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্লাস শুরু হয়, তখন এর অ্যাকাডেমিক কাঠামো ছিল অত্যন্ত গোছানো:

  • অনুষদ ও বিভাগ: শুরুতে এর অনুষদ (Faculty) ছিল মাত্র ৩টি—কলা (Arts), বিজ্ঞান (Science) এবং আইন (Law)। আর মোট বিভাগ ছিল ১২টি।
  • শিক্ষক ও হল সংখ্যা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য (VC) ছিলেন স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ। শুরুর দিকে শিক্ষক ছিলেন ৬০ জন এবং শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য হল ছিল মাত্র ৩টি (সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা হল ও জগন্নাথ হল)।

প্রথম শিক্ষাবর্ষের (১৯২১) মূল পরিসংখ্যান ম্যাট্রিক্স

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষাবর্ষের (১৯২১ সালের ১ জুলাই) মূল পরিসংখ্যান নিচে ম্যাট্রিক্স বা ছক আকারে তুলে ধরা হলো:

মূল পরিসংখ্যান ম্যাট্রিক্স (১৯২১)

সূচক / খাত বিবরণ ও সংখ্যা
মোট অনুষদ (Faculties)৩টি (কলা, বিজ্ঞান ও আইন অনুষদ)
মোট বিভাগ (Departments)১২টি
মোট ছাত্র সংখ্যা (Students)৮৭৭ জন (মতান্তরে ৮৪৭ জন)
ছাত্রী সংখ্যা (Female Students)১ জন (লীলা নাগ)
মোট শিক্ষক সংখ্যা (Teachers)৬০ জন
আবাসিক হল/ছাত্রাবাস (Halls)৩টি (সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা হল ও জগন্নাথ হল)
প্রথম উপাচার্য (Vice-Chancellor)স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ (পি. জে. হার্টগ)

অনুষদ ও বিভাগসমূহের বিস্তারিত বিভাজন

  • কলা অনুষদ (৮টি বিভাগ): সংস্কৃত ও বাংলা, ইংরেজি, শিক্ষা, ইতিহাস, আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ, ফারসি ও উর্দু, দর্শন, এবং অর্থনীতি ও রাজনীতি.
  • বিজ্ঞান অনুষদ (৩টি বিভাগ): পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, এবং গণিত.
  • আইন অনুষদ (১টি বিভাগ): আইন বিভাগ.

এই ক্ষুদ্র অবকাঠামো ও পরিসংখ্যান নিয়ে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তৎকালীন পূর্ববঙ্গে উচ্চশিক্ষার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অথবা এর প্রথম সমাবর্তন (১৯২৩) সংক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট তথ্য জানতে চাইলে নিচে লিখে জানাতে পারেন।

আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ: একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও এসইও এক্সপার্ট হিসেবে সাধারণ জ্ঞানের এই ডাটাগুলো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমি দেখেছি—বিভিন্ন পরীক্ষায় একক নাম হিসেবে ‘নবাব স্যার সলিমুল্লাহ’ অপশনে বেশি থাকে। তবে স্যার সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর অবদানও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জমিদারির অংশ পর্যন্ত বাজি রেখেছিলেন। তাই কপি-পেস্ট করে পাবলিশ করার আগে অপশনগুলো ভালোভাবে দেখে নেওয়া উচিত।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ