ইতিহাস
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ইনফোটেনমেন্ট ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ৩ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গতিপথ পরিবর্তনকারী এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যদি ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে নির্মমভাবে নিহত না হতেন, তবে আজকের বাংলাদেশের চেহারা কেমন হতো? তিনি যদি আরও ২০ থেকে ৩০ বছর (অর্থাৎ ২০০০ বা২০১০ সাল পর্যন্ত) রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকতেন, তবে কি বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ার ‘সিঙ্গাপুর’ বা ‘মালয়েশিয়া’ হতে পারত?

ইতিহাসের কোনো ‘যদি’ বা ‘তবে’র সুনির্দিষ্ট উত্তর হয় না। তবে একজন রাষ্ট্রনায়কের দূরদর্শিতা, তাঁর গৃহীত নীতি এবং সমসাময়িক বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে জিয়াউর রহমানের দীর্ঘস্থায়ী শাসনের একটি বাস্তবসম্মত এবং নির্মোহ রূপরেখা দাঁড় করানো সম্ভব।
আজকের বিশেষ ফিচারে আমরা আলোচনা করব জিয়ার দীর্ঘ শাসনামল বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজব্যবস্থায় কী ধরনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারত।

১. অর্থনৈতিক রূপান্তর: মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের কাতার?
অনেকেই জিয়াউর রহমানকে মালয়েশিয়ার আধুনিক রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ কিংবা সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ-এর সমকক্ষ মনে করেন। তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থিতিশীল অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটত—এ কথা অনস্বীকার্য।

- কৃষি বিপ্লব ও খাদ্য নিরাপত্তা: জিয়াউর রহমানের শুরু করা দেশব্যাপী ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ এবং গ্রামীণ অর্থনীতি-ভিত্তিক উৎপাদনশীলতা যদি আরও দুই দশক নিরবচ্ছিন্নভাবে চলত, তবে বাংলাদেশ আশির দশকের শেষেই খাদ্য উৎপাদনে সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করত। দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতিকে যেভাবে তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন, তার গতি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেত।
- শিল্পায়ন ও তৈরি পোশাক খাতের বিকাশ: বাংলাদেশে আজকের তৈরি পোশাক শিল্পের (RMG) ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির (ম্যানপাওয়ার এক্সপোর্ট) প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই। তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে আশির দশকেই দেশে ব্যাপক বেসরকারীকরণ ও শিল্পায়ন ঘটত। ফলে, ২০২৬ সালের আজকের বাংলাদেশ হয়তো জিডিপি ও মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের সমকক্ষ অবস্থানে থাকত।
২. সফল জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও মানবসম্পদ উন্নয়ন
জিয়াউর রহমানই প্রথম দূরদর্শিতার সাথে জনসংখ্যাকে বাংলাদেশের ‘এক নম্বর সমস্যা’ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর নির্দেশে শুরু হয়েছিল জন্মনিয়ন্ত্রণের এক মহা পরিকল্পনা।

এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা যদি আরও ২০ বছর কঠোরভাবে রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে বজায় থাকত, তবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা আজ ১৭-১৮ কোটির পরিবর্তে হয়তো ১২ থেকে ১৩ কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। জনসংখ্যাকে ‘জনস্ফীতি’ না বানিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের কারণে মাথাপিছু সম্পদের বণ্টন আরও উন্নত হতো এবং দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান ও মাথাপিছু আয় আজকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হতো। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে যে সাফল্য দেখিয়েছে, তার পুরো কৃতিত্বই এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার।
৩. পররাষ্ট্রনীতি: মুসলিম বিশ্ব ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘মিডল পাওয়ার’
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল আকাশচুম্বী। তিনি ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে গঠিত ওআইসি (OIC) মধ্যস্থতাকারী টিমের অন্যতম শীর্ষ নেতা ছিলেন। এছাড়া আল-কুদস কমিটিতে তাঁর অনবদ্য ভূমিকার কারণে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী নেতা ইয়াসির আরাফাত বারবার বাংলাদেশ সফর করেছিলেন।

তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে:
- সার্ক (SAARC) হতো আরও শক্তিশালী: জিয়াউর রহমানের মস্তিষ্কপ্রসূত ‘সার্ক’ দক্ষিণ এশিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্লকে পরিণত হতে পারত। এর ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্যে ভারতের একক আধিপত্যের ভারসাম্য বজায় থাকত।
- ভূ-রাজনৈতিক শক্তি: মুসলিম বিশ্ব, মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিমা ব্লকের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাত এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশ একটি ‘মিডল পাওয়ার’ বা মধ্যম শক্তির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতো।
৪. রাজনীতির উল্টো পিঠ: বহুদলীয় গণতন্ত্র বনাম পুনর্বাসন বিতর্ক

ইতিহাসের খতিয়ান যেমন জিয়াউর রহমানের অভাবনীয় সাফল্যকে স্বীকৃতি দেয়, তেমনি তাঁর কিছু নীতিকে ঘিরে ঐতিহাসিক বিতর্ককেও সামনে আনে। রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে এই বিষয়গুলোর প্রভাব আরও সুদূরপ্রসারী হতে পারত:
- ডানপন্থী রাজনীতির স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: একদলীয় শাসন বা বাকশাল ব্যবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করে ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’ চালু করা জিয়ার অন্যতম বড় রাজনৈতিক সাফল্য। তবে এই বহুদলীয় গণতন্ত্রের আড়ালে জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের মতো ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের যে প্রক্রিয়া তিনি শুরু করেছিলেন, তা অনেকেই ‘চাঁদের কলঙ্কের’ মতো দাগ হিসেবে দেখেন। তিনি আরও ২০-৩০ বছর ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডানপন্থী ও ধর্মীয় মেরুকরণের শিকড় আরও গভীরে প্রবেশ করত।
- সামরিকায়িত বেসামরিক শাসন ও ভিন্নমত দমন: জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিল—তিনি ক্ষমতায় থাকার জন্য অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সহজে সহ্য করতেন না। তাঁর ৫ বছরের শাসনামলেই প্রায় ২০টির মতো ছোট-বড় সামরিক অভ্যুত্থান (Coup) হয়েছিল এবং তা দমনে বহু সেনা সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে হয়তো দেশ সম্পূর্ণ একটি “সামরিকায়িত বেসামরিক শাসনে” (Militarized Civilian Rule) রূপ নিত, যেখানে বাকস্বাধীনতা বা উদার গণতান্ত্রিক স্পেস সংকুচিত থাকত।
৫. দুর্নীতিমুক্ত শীর্ষ নেতৃত্ব বনাম প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতন্ত্র

ব্যক্তিগতভাবে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ নেই। তাঁর সততা, সাধারণ জীবনযাপন এবং ছেঁড়া গেঞ্জি ও ভাঙা সুটকেসের গল্প সর্বজনবিদিত। বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি এবং বিরোধী দলীয় নেতাদের মধ্যে আর্থিক দুর্নীতি চরম আকার ধারণ করলেও জিয়ার ব্যক্তিগত সততা আজও অনুকরণীয়।
তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে হয়তো রাষ্ট্রীয় শীর্ষ পর্যায়ে আর্থিক দুর্নীতি আজকের মতো এতটা নজিরবিহীন ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেত না। তবে, দীর্ঘস্থায়ী এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনে নিচের দিকের আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক সুবিধাভোগী শ্রেণীর মধ্যে এক ধরণের ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা তোষামোদের অর্থনীতি গড়ে ওঠার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বাংলাদেশের গঠনে ও উন্নয়নে জিয়াউর রহমানের প্রধান অবদানসমূহ:
জিয়াউর রহমান মাত্র ৫ বছর (১৯৭৬-১৯৮১) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। এই স্বল্প সময়ে তিনি যেসমস্ত যুগান্তকারী অবদান রেখে গেছেন, তা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
১. অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও মুক্তবাজার অর্থনীতি
- বেসরকারীকরণ: স্বাধীনতার পর দেশের সিংহভাগ শিল্পকারখানা রাষ্ট্রীয়করণ (Nationalized) করা হয়েছিল, যার ফলে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছিল। জিয়াউর রহমান এসে প্রথম মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু করেন এবং বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করেন।
- তৈরি পোশাক শিল্প (RMG): বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের লাইসেন্স ও বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রথম তাঁর সময়েই দেওয়া হয়। ‘দেশ গার্মেন্টস’-এর মাধ্যমে এই খাতের সূচনা তাঁর হাত ধরেই হয়েছিল।
- জনশক্তি রপ্তানি: মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে বাংলাদেশী শ্রমিক পাঠানোর আনুষ্ঠানিক ও সরকারি প্রক্রিয়া তিনি শুরু করেন, যা আজ আমাদের রেমিট্যান্সের মূল ভিত্তি।
২. কৃষি বিপ্লব ও স্বনির্ভরতা (খাল কাটা কর্মসূচি)
- দেশব্যাপী খাল কাটা: কৃষিতে সেচ সুবিধা পৌঁছানোর জন্য তিনি নিজে কোদাল হাতে নিয়ে সারা দেশে “খাল কাটা কর্মসূচি” শুরু করেছিলেন। এর মাধ্যমে হাজার হাজার মাইল খাল খনন ও পুনর্খনন করা হয়, যা দেশের খাদ্য উৎপাদন হুটকরে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
- গ্রাম সরকার ও পল্লি বিদ্যুৎ: গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে তিনি ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা এবং গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার জন্য ‘পল্লি বিদ্যুতায়ন বোর্ড’ (REB) গঠন করেন।
৩. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে ‘এক নম্বর সমস্যা’ ঘোষণা
- স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল আশঙ্কাজনক। জিয়াউর রহমান দূরদর্শিতার সাথে জনসংখ্যাকে দেশের ১ নম্বর সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করেন।
- তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবার পরিকল্পনার সামগ্রী ও সচেতনতা ছড়ানোর জন্য হাজার হাজার নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করেন। আজ মুসলিম বিশ্বের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের যে অভাবনীয় সাফল্য, তার মূল ভিত্তি এটিই।
৪. পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি
- সার্ক (SAARC) প্রতিষ্ঠা: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য সার্ক গঠনের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা এবং উদ্যোক্তা ছিলেন জিয়াউর রহমান।
- মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক: সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যুক্তকরণ এবং ওআইসি (OIC)-তে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান, যা পূর্বে অত্যন্ত শীতল ছিল।
- জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশ: তাঁর সফল কূটনীতির ফলেই বাংলাদেশ ১৯৭৯ সালে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের (UN Security Council) অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল।
৫. জাতীয়তাবাদ ও বহুদলীয় গণতন্ত্র
- বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ: তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের ভূখণ্ডের সব মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর তত্ত্ব দেন, যা দেশের সার্বভৌমত্বকে এক নতুন পরিচয় দেয়।
- বহুদলীয় গণতন্ত্র: ১৯৭৫ সালের একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) বিলুপ্ত করে তিনি দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন এবং সব রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি করার অধিকার দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেন।
চূড়ান্ত মূল্যায়ন
সব মিলিয়ে বলা যায়, জিয়াউর রহমান যদি আরও ২০-৩০ বছর বেঁচে থেকে দেশ শাসন করতে পারতেন, তবে আজকের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত দিক থেকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, উন্নত ও সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রে পরিণত হতো—এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এর বিনিময়ে রাষ্ট্রকে হয়তো রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, বাকস্বাধীনতা এবং উদার পশ্চিমা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কিছুটা আপস করতে হতো। সহজ কথায়, আজকের বাংলাদেশ হয়তো দেখতে অনেকটা মাহাথিরের মালয়েশিয়া কিংবা আধুনিক ভিয়েতনামের মতো—একটি নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি হতো।
আপনার মতামত জানান:
জিয়াউর রহমান দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে আজকের বাংলাদেশ কেমন হতো বলে আপনি মনে করেন? আপনার মূল্যবান মতামত নিচে কমেন্ট করে জানান।
দেশ-বিদেশের রাজনীতি, ইতিহাস এবং সমসাময়িক বিষয়ের গভীর ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণমূলক কন্টেন্ট নিয়মিত পড়তে বুকমার্ক করে রাখুন আপনার পছন্দের তথ্যমাধ্যম পালস বাংলাদেশ | Pulse Bangladesh।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৭ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইতিহাস
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (১৫শ খণ্ড), লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ পিএসসির ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’, এবং সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংবাদপত্র আর্কাইভস
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাস ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী, অস্থির এবং নাটকীয় পালাবদলের সময়। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে, যার চূড়ান্ত পরিণতি রূপ নেয় ৭ নভেম্বরের ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ বা ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি ও জনতার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধনে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, যা বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন গতিপথে চালিত করে। এই ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল দিবসের নেপথ্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

১. পটভূমি: ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর খোন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ায় সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধে। এর জেরে ৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের তৎকালীন সিনিয়র অফিসার ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং ঢাকা ওয়ান বেঙ্গলের কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে একটি পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে।

খালেদ মোশাররফের এই অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর পদ থেকে পদচ্যুত করা হয় এবং ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে তাঁকে সম্পূর্ণ গৃহবন্দি (House Arrest) করে রাখা হয়। খন্দকার মোশতাককে সরিয়ে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ৬ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন।

২. নেপথ্যের অনুঘটক: জাসদ ও কর্নেল তাহেরের বিপ্লবের ডাক
মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের এই পাল্টা অভ্যুত্থানকে সেনাবাহিনীর সাধারণ জওয়ান বা সিপাহিদের একটি বড় অংশ ভারতের মদদপুষ্ট এবং মোশতাক চক্রের আরেকটি অংশের ক্ষমতার লড়াই হিসেবে চশমায় দেখছিল। এই সুযোগে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী দল ‘জাসদ’ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)-এর সামরিক শাখা ‘গণবাহিনী’ এবং এর অন্যতম প্রধান নেতা লে. কর্নেল (অব.) আবু তাহের সেনানিবাসের সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে এক গোপন প্রচারণা চালান।
কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ সিপাহিদের বৈষম্য দূরীকরণ, ১২ দফা দাবি আদায় এবং ‘শ্রেণিহীন সামরিক ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ল্যান্স নায়েক ও সুবেদারদের সংগঠিত করে। ৭ নভেম্বর ভোররাতে এক গণ-অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল বন্দি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসা, কারণ জিয়াউর রহমান সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন।
৩. ৭ নভেম্বরের সেই ভয়াল রাত এবং সিপাহি-জনতার জাগরণ
৬ নভেম্বর মধ্যরাত পার হয়ে ৭ নভেম্বর ভোররাতে (আনুমানিক রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে) ঢাকা সেনানিবাসে সিপাহিদের বিদ্রোহ আনুষ্ঠানিকভাবে ফেটে পড়ে। ট্যাংকের গর্জন এবং শত শত রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণের মাধ্যমে সিপাহিরা ব্যারাকে ব্যারাকে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
- জিয়াউর রহমানের মুক্তি: সিপাহিদের একটি দল দ্রুত মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসভবনে যায় এবং পাহারারত সেন্ট্রিদের নিরস্ত্র করে তাঁকে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত করে টু ফিল্ড আর্টিলারির সদর দপ্তরে নিয়ে আসে। মুক্ত হয়ে জিয়াউর রহমান সিপাহিদের শান্ত থাকার এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
- খালেদ মোশাররফের পতন ও মৃত্যু: সিপাহিদের এই ভয়াবহ বিদ্রোহের মুখে টিকতে না পেরে নবনিযুক্ত সেনাপ্রধান জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা এবং লে. কর্নেল এ টি এম হায়দার (যাঁরা সবাই বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন) শেরেবাংলা নগরের ১০ বেঙ্গলের সদর দপ্তরে আশ্রয় নেন। কিন্তু ৭ নভেম্বর সকালেই উত্তেজিত ও বিদ্রোহী সৈনিকদের হাতে এই তিন লিজেন্ডারি সামরিক কর্মকর্তা নির্মমভাবে নিহত হন।
- রাজপথে জনতার ঢল: সকাল হওয়ার সাথে সাথে সেনানিবাসের সিপাহিরা ট্রাকে করে, ট্যাংকের ওপর চড়ে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। তাদের মুখে স্লোগান ছিল—‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’। রাজপথের সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৈনিকদের সাথে যোগ দেয় এবং ফুলেল শুভেচ্ছা জানায়। সিপাহি ও জনতার এই অভূতপূর্ব সংহতির কারণেই দিনটিকে ইতিহাসে ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে অবিহিত করা হয়।
৪. রাজনৈতিক তাৎপর্য ও পরবর্তী ফলাফল
৭ নভেম্বরের এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দেয়:
- জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার কেন্দ্রে আগমন: এই বিপ্লবের পর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহাল থাকলেও, জিয়াউর রহমান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (Chief Deputy Martial Law Administrator) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কার্যত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।
- কর্নেল তাহেরের সাথে দূরত্ব: সিপাহিদের ১২ দফা দাবি এবং জাসদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী ধারার সাথে জিয়ার শাসনতান্ত্রিক ও শৃঙ্খলা রক্ষাকারী চিন্তাভাবনার দূরত্ব তৈরি হয়। যার ফলে পরবর্তীতে কর্নেল তাহেরসহ জাসদের অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সামরিক আদালতে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
ইতিহাসের পাতা সবসময় একমুখী নয়। ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন একটি পক্ষ ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ বা ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে অত্যন্ত গৌরব ও শ্রদ্ধার সাথে উদ্যাপন করে, ঠিক তেমনই আরেকটি পক্ষ এই দিনটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে স্মরণ করে, কারণ এই দিন সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বহু বীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও জওয়ানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। গুগলের ২০২৬ সালের নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক কনটেন্ট নির্দেশিকা অনুযায়ী, তরুণ প্রজন্মের জন্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত ছাড়া এই দিবসের সকল পক্ষের বাস্তব প্রেক্ষাপট ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সঠিকভাবে অনুধাবন করা জরুরি।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৬ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইসলাম ও জীবন
তথ্যসূত্র: আল-কোরআনের তাফসির (তাফসির ইবনে কাসির), সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিস এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত নবী-রাসূলদের জীবনী গ্রন্থ।
বর্তমান ২০২৬ সালের আধুনিক ও তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ যুগে মানুষ বাহ্যিক ও বস্তুগত দিক থেকে অনেক উন্নত হলেও, মানসিক প্রশান্তি, নৈতিকতা ও জীবনবোধের দিক থেকে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতি-ব্যবহার, পারস্পরিক দূরত্বের এই যুগে সঠিক জীবনদর্শনের অভাব স্পষ্ট। মানবজাতির হেদায়েত ও সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে যে নবী-রাসূলদের পাঠিয়েছেন, তাদের জীবন কেবল ইতিহাসের কিছু গল্প নয়; বরং তা কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য এক জীবন্ত ও কালজয়ী গাইডলাইন। এই বিশেষ সিরিজের ১ম পর্বে আমরা আলোচনা করব নবী-রাসূলদের অনন্য জীবন থেকে আজকের দিনে আমাদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার মতো ৩টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
১. হযরত আইয়ুব (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: চরম বিপদেও মানসিক শক্তি ও ধৈর্য (Patience)
আজকের যুগে সামান্য আর্থিক ক্ষতি, চাকরি হারানো কিংবা পারিবারিক বা শারীরিক অসুস্থতায় মানুষ দ্রুত হতাশ হয়ে পড়ে, এমনকি অনেকে আত্মহননের পথও বেছে নেয়। এই মানসিক সংকটে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আদর্শ হলেন হযরত আইয়ুব (আ.)।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে দীর্ঘ বছর ধরে কঠিন রোগ, সন্তানদের মৃত্যু এবং সমস্ত ধন-সম্পদ হারানোর মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলেন। কিন্তু এমন চরম সংকটেও তিনি আল্লাহর প্রতি বিন্দুমাত্র অভিযোগ করেননি, বরং চরম ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন।
- আজকের দিনের শিক্ষা: আধুনিক জীবনে বিষণ্ণতা (Depression) বা যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে ভেঙে না পড়ে ইতিবাচক থাকা এবং বিশ্বাস রাখা যে—কষ্টের পরেই স্বস্তি আসে। বিপদে অধৈর্য না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাই হলো সফলতার মূল চাবি।
২. হযরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: নৈতিক স্খলন ও প্রলোভন থেকে নিজেকে রক্ষা করা (Self-Control)
বর্তমান ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক মাধ্যমের উন্মুক্ততার কারণে তরুণ প্রজন্মের সামনে পর্নোগ্রাফি, অবৈধ সম্পর্ক এবং নৈতিক স্খলনের নানামুখী প্রলোভন প্রতিনিয়ত আসছে। নিজের চরিত্র ও নৈতিকতা ধরে রাখা আজকের দিনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
হযরত ইউসুফ (আ.) ছিলেন অপরূপ সুন্দর এবং যুবক। মিশরের আজিজের স্ত্রী যখন ঘরের সমস্ত দরজা বন্ধ করে উনাকে পাপের দিকে আহ্বান করেছিল, তখন তিনি সমস্ত প্রলোভন ও ক্ষমতার দাপটকে তুচ্ছ করে বলেছিলেন, “আমি আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি।” পাপের চেয়ে তিনি কারাগারের বন্দিজীবনকে বেছে নিয়েছিলেন।

- আজকের দিনের শিক্ষা: চারপাশে যত বড় বা সহজ প্রলোভনই থাকুক না কেন, আল্লাহর ভয়কে অন্তরে জাগ্রত রেখে নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ (Self-Control) বজায় রাখা। ক্যারিয়ার বা জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে সাময়িক আনন্দের চেয়ে চিরস্থায়ী নৈতিকতা ও সততাকে প্রাধান্য দেওয়া।
৩. হযরত নূহ (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: সামাজিক সমালোচনা উপেক্ষা করে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকা (Perseverance)
আজকের দিনে তরুণ বা উদ্যোক্তারা যখন নতুন বা ভালো কোনো কাজ করতে যায়, তখন সমাজের মানুষের সমালোচনা, ট্রল বা উপহাসের শিকার হয়ে অনেকেই মাঝপথে কাজ ছেড়ে দেয়। মানুষের কথা বা সামাজিক চাপের মুখে নিজের সৎ লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া খুবই সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হযরত নূহ (আ.) যখন আল্লাহর নির্দেশে মরুভূমির বুকে বিশাল নৌকা তৈরি করছিলেন, তখন সমকালীন সমাজের মানুষ উনাকে দেখে চরম উপহাস করত, পাগল বলত। কিন্তু তিনি মানুষের কোনো উপহাস বা ট্রলের দিকে কান না দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই নৌকাই বিশ্বাসীদের রক্ষা করেছিল।
- আজকের দিনের শিক্ষা: আপনি যদি নিশ্চিত হন যে আপনার কাজটি সৎ, সঠিক এবং মানবকল্যাণকর, তবে সমাজ বা সোশ্যাল মিডিয়ার মানুষ কী বলল বা কী ট্রল করল—তাতে কান না দিয়ে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকা। দৃঢ় সংকল্প এবং কঠোর পরিশ্রমই শেষ পর্যন্ত সত্যকে জয়ী করে।
নবী-রাসূলদের এই চমৎকার ঐতিহাসিক শিক্ষাগুলো কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং আমাদের প্রতিদিনের আচরণ, কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক জীবনে চর্চা করা উচিত। তবেই আমরা এই আধুনিক ও জটিল পৃথিবীতে একটি শান্তিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে সক্ষম হব।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: জাতীয়
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ গণপরিষদের কার্যবিবরণী, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের সংবিধানের মূল প্রস্তাবনা।
আজ ৪ নভেম্বর, ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ সংবিধান দিবস’। ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ সময় এই দিনটি উপেক্ষিত থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭২ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয়েছিল। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ১১ মাসের মাথায় কীভাবে একটি বিশ্বমানের ও যুগোপযোগী সংবিধান লাভ করেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। নিচে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা ও গ্রহণের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

১. পটভূমি ও গণপরিষদ আদেশ জারি
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করার পর একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নিজস্ব আইনি কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। এর পরদিনই অর্থাৎ ১১ জানুয়ারি তিনি ‘অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’ জারি করেন। এর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তন করা হয়।
পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ জারি করা হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে এই গণপরিষদ গঠিত হয়, যার মূল দায়িত্ব ছিল দেশের জন্য একটি স্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন করা। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়।
২. খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন
গণপরিষদের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘সংবিধান প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটিতে একমাত্র নারী সদস্য ছিলেন বেগম রাজিয়া বানু। এছাড়া তৎকালীন বিরোধী দলের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
কমিটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের কাজ শুরু করে। বিভিন্ন দেশের সংবিধান পর্যালোচনা এবং দেশের আপামর জনসাধারণের মতামত সংগ্রহের জন্য তারা ব্যাপক উদ্যোগ নেন। সর্বস্তরের জনগণের কাছ থেকে মোট ৯৮টি লিখিত প্রস্তাব সংগ্রহ করা হয়েছিল। ভারত ও যুক্তরাজ্যের সংবিধানকে মূল ভিত্তি ধরে খসড়া তৈরির কাজ এগিয়ে চলে।
৩. খসড়া উত্থাপন ও বিতর্ক
দীর্ঘ কঠোর পরিশ্রমের পর ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ড. কামাল হোসেন খসড়া সংবিধান বিল আকারে উত্থাপন করেন। ১৯ অক্টোবর থেকে এর ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়।
সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদ ও ধারা নিয়ে গণপরিষদে ব্যাপক বিতর্ক ও আলোচনা হয়। গণপরিষদের সদস্যরা বিভিন্ন সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। মোট ৪১টি অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার পর সংবিধানের প্রতিটি বিষয়কে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়।
৪. সংবিধান গ্রহণ ও কার্যকর
অবশেষে ৪ নভেম্বর, ১৯৭২ সালে গণপরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে ‘বাংলাদেশের সংবিধান’ গৃহীত হয়। সংবিধান গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, “এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত, এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।”
এর ঠিক দেড় মাস পর, অর্থাৎ বিজয়ের প্রথম বার্ষিকী—১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২ থেকে এই সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়। সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপিটি ছিল হাতে লেখা, যা শিল্পী হাশেম খানের নকশায় এবং প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার আবদুর রউফের হাতের লেখায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। এতে স্বাক্ষর করেছিলেন গণপরিষদের সদস্যবৃন্দ।
একটি দেশের সংবিধান কেবল কিছু আইনের সমষ্টি নয়, এটি রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল স্তম্ভ ছিল চারটি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সময়ের আবর্তে এই সংবিধানে বহু পরিবর্তন ও সংশোধনী আনা হলেও, ৪ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সবসময়ই অনস্বীকার্য। তরুণ প্রজন্মের জন্য নিজেদের অধিকার ও রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা বুঝতে সংবিধান রচনার এই ইতিহাস জানা অত্যন্ত জরুরি।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



