ইতিহাস

জিয়াউর রহমান দীর্ঘস্থায়ী শাসন করলে কেমন হতো আজকের বাংলাদেশ? একটি নির্মোহ ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক খতিয়ান
জিয়াউর রহমান

নিউজ ডেস্ক

June 3, 2026

শেয়ার করুন

ইনফোটেনমেন্ট ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ

প্রকাশিত: ৩ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গতিপথ পরিবর্তনকারী এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যদি ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে নির্মমভাবে নিহত না হতেন, তবে আজকের বাংলাদেশের চেহারা কেমন হতো? তিনি যদি আরও ২০ থেকে ৩০ বছর (অর্থাৎ ২০০০ বা২০১০ সাল পর্যন্ত) রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকতেন, তবে কি বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ার ‘সিঙ্গাপুর’ বা ‘মালয়েশিয়া’ হতে পারত?

ইতিহাসের কোনো ‘যদি’ বা ‘তবে’র সুনির্দিষ্ট উত্তর হয় না। তবে একজন রাষ্ট্রনায়কের দূরদর্শিতা, তাঁর গৃহীত নীতি এবং সমসাময়িক বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে জিয়াউর রহমানের দীর্ঘস্থায়ী শাসনের একটি বাস্তবসম্মত এবং নির্মোহ রূপরেখা দাঁড় করানো সম্ভব।

আজকের বিশেষ ফিচারে আমরা আলোচনা করব জিয়ার দীর্ঘ শাসনামল বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজব্যবস্থায় কী ধরনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারত।

১. অর্থনৈতিক রূপান্তর: মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের কাতার?

অনেকেই জিয়াউর রহমানকে মালয়েশিয়ার আধুনিক রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ কিংবা সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ-এর সমকক্ষ মনে করেন। তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থিতিশীল অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটত—এ কথা অনস্বীকার্য।

  • কৃষি বিপ্লব ও খাদ্য নিরাপত্তা: জিয়াউর রহমানের শুরু করা দেশব্যাপী ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ এবং গ্রামীণ অর্থনীতি-ভিত্তিক উৎপাদনশীলতা যদি আরও দুই দশক নিরবচ্ছিন্নভাবে চলত, তবে বাংলাদেশ আশির দশকের শেষেই খাদ্য উৎপাদনে সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করত। দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতিকে যেভাবে তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন, তার গতি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেত।
  • শিল্পায়ন ও তৈরি পোশাক খাতের বিকাশ: বাংলাদেশে আজকের তৈরি পোশাক শিল্পের (RMG) ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির (ম্যানপাওয়ার এক্সপোর্ট) প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই। তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে আশির দশকেই দেশে ব্যাপক বেসরকারীকরণ ও শিল্পায়ন ঘটত। ফলে, ২০২৬ সালের আজকের বাংলাদেশ হয়তো জিডিপি ও মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের সমকক্ষ অবস্থানে থাকত।

২. সফল জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও মানবসম্পদ উন্নয়ন

জিয়াউর রহমানই প্রথম দূরদর্শিতার সাথে জনসংখ্যাকে বাংলাদেশের ‘এক নম্বর সমস্যা’ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর নির্দেশে শুরু হয়েছিল জন্মনিয়ন্ত্রণের এক মহা পরিকল্পনা।

এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা যদি আরও ২০ বছর কঠোরভাবে রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে বজায় থাকত, তবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা আজ ১৭-১৮ কোটির পরিবর্তে হয়তো ১২ থেকে ১৩ কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। জনসংখ্যাকে ‘জনস্ফীতি’ না বানিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের কারণে মাথাপিছু সম্পদের বণ্টন আরও উন্নত হতো এবং দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান ও মাথাপিছু আয় আজকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হতো। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে যে সাফল্য দেখিয়েছে, তার পুরো কৃতিত্বই এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার।

৩. পররাষ্ট্রনীতি: মুসলিম বিশ্ব ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘মিডল পাওয়ার’

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল আকাশচুম্বী। তিনি ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে গঠিত ওআইসি (OIC) মধ্যস্থতাকারী টিমের অন্যতম শীর্ষ নেতা ছিলেন। এছাড়া আল-কুদস কমিটিতে তাঁর অনবদ্য ভূমিকার কারণে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী নেতা ইয়াসির আরাফাত বারবার বাংলাদেশ সফর করেছিলেন।

তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে:

  • সার্ক (SAARC) হতো আরও শক্তিশালী: জিয়াউর রহমানের মস্তিষ্কপ্রসূত ‘সার্ক’ দক্ষিণ এশিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্লকে পরিণত হতে পারত। এর ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্যে ভারতের একক আধিপত্যের ভারসাম্য বজায় থাকত।
  • ভূ-রাজনৈতিক শক্তি: মুসলিম বিশ্ব, মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিমা ব্লকের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাত এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশ একটি ‘মিডল পাওয়ার’ বা মধ্যম শক্তির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতো।

৪. রাজনীতির উল্টো পিঠ: বহুদলীয় গণতন্ত্র বনাম পুনর্বাসন বিতর্ক

ইতিহাসের খতিয়ান যেমন জিয়াউর রহমানের অভাবনীয় সাফল্যকে স্বীকৃতি দেয়, তেমনি তাঁর কিছু নীতিকে ঘিরে ঐতিহাসিক বিতর্ককেও সামনে আনে। রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে এই বিষয়গুলোর প্রভাব আরও সুদূরপ্রসারী হতে পারত:

  • ডানপন্থী রাজনীতির স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: একদলীয় শাসন বা বাকশাল ব্যবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করে ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’ চালু করা জিয়ার অন্যতম বড় রাজনৈতিক সাফল্য। তবে এই বহুদলীয় গণতন্ত্রের আড়ালে জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের মতো ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের যে প্রক্রিয়া তিনি শুরু করেছিলেন, তা অনেকেই ‘চাঁদের কলঙ্কের’ মতো দাগ হিসেবে দেখেন। তিনি আরও ২০-৩০ বছর ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডানপন্থী ও ধর্মীয় মেরুকরণের শিকড় আরও গভীরে প্রবেশ করত।
  • সামরিকায়িত বেসামরিক শাসন ও ভিন্নমত দমন: জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিল—তিনি ক্ষমতায় থাকার জন্য অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সহজে সহ্য করতেন না। তাঁর ৫ বছরের শাসনামলেই প্রায় ২০টির মতো ছোট-বড় সামরিক অভ্যুত্থান (Coup) হয়েছিল এবং তা দমনে বহু সেনা সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে হয়তো দেশ সম্পূর্ণ একটি “সামরিকায়িত বেসামরিক শাসনে” (Militarized Civilian Rule) রূপ নিত, যেখানে বাকস্বাধীনতা বা উদার গণতান্ত্রিক স্পেস সংকুচিত থাকত।

৫. দুর্নীতিমুক্ত শীর্ষ নেতৃত্ব বনাম প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতন্ত্র

ব্যক্তিগতভাবে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ নেই। তাঁর সততা, সাধারণ জীবনযাপন এবং ছেঁড়া গেঞ্জি ও ভাঙা সুটকেসের গল্প সর্বজনবিদিত। বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি এবং বিরোধী দলীয় নেতাদের মধ্যে আর্থিক দুর্নীতি চরম আকার ধারণ করলেও জিয়ার ব্যক্তিগত সততা আজও অনুকরণীয়।

তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে হয়তো রাষ্ট্রীয় শীর্ষ পর্যায়ে আর্থিক দুর্নীতি আজকের মতো এতটা নজিরবিহীন ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেত না। তবে, দীর্ঘস্থায়ী এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনে নিচের দিকের আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক সুবিধাভোগী শ্রেণীর মধ্যে এক ধরণের ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা তোষামোদের অর্থনীতি গড়ে ওঠার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বাংলাদেশের গঠনে ও উন্নয়নে জিয়াউর রহমানের প্রধান অবদানসমূহ:

জিয়াউর রহমান মাত্র ৫ বছর (১৯৭৬-১৯৮১) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। এই স্বল্প সময়ে তিনি যেসমস্ত যুগান্তকারী অবদান রেখে গেছেন, তা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:

১. অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও মুক্তবাজার অর্থনীতি

  • বেসরকারীকরণ: স্বাধীনতার পর দেশের সিংহভাগ শিল্পকারখানা রাষ্ট্রীয়করণ (Nationalized) করা হয়েছিল, যার ফলে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছিল। জিয়াউর রহমান এসে প্রথম মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু করেন এবং বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করেন।
  • তৈরি পোশাক শিল্প (RMG): বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের লাইসেন্স ও বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রথম তাঁর সময়েই দেওয়া হয়। ‘দেশ গার্মেন্টস’-এর মাধ্যমে এই খাতের সূচনা তাঁর হাত ধরেই হয়েছিল।
  • জনশক্তি রপ্তানি: মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে বাংলাদেশী শ্রমিক পাঠানোর আনুষ্ঠানিক ও সরকারি প্রক্রিয়া তিনি শুরু করেন, যা আজ আমাদের রেমিট্যান্সের মূল ভিত্তি।

২. কৃষি বিপ্লব ও স্বনির্ভরতা (খাল কাটা কর্মসূচি)

  • দেশব্যাপী খাল কাটা: কৃষিতে সেচ সুবিধা পৌঁছানোর জন্য তিনি নিজে কোদাল হাতে নিয়ে সারা দেশে “খাল কাটা কর্মসূচি” শুরু করেছিলেন। এর মাধ্যমে হাজার হাজার মাইল খাল খনন ও পুনর্খনন করা হয়, যা দেশের খাদ্য উৎপাদন হুটকরে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
  • গ্রাম সরকার ও পল্লি বিদ্যুৎ: গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে তিনি ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা এবং গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার জন্য ‘পল্লি বিদ্যুতায়ন বোর্ড’ (REB) গঠন করেন।

৩. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে ‘এক নম্বর সমস্যা’ ঘোষণা

  • স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল আশঙ্কাজনক। জিয়াউর রহমান দূরদর্শিতার সাথে জনসংখ্যাকে দেশের ১ নম্বর সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করেন।
  • তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবার পরিকল্পনার সামগ্রী ও সচেতনতা ছড়ানোর জন্য হাজার হাজার নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করেন। আজ মুসলিম বিশ্বের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের যে অভাবনীয় সাফল্য, তার মূল ভিত্তি এটিই।

৪. পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি

  • সার্ক (SAARC) প্রতিষ্ঠা: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য সার্ক গঠনের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা এবং উদ্যোক্তা ছিলেন জিয়াউর রহমান।
  • মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক: সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যুক্তকরণ এবং ওআইসি (OIC)-তে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান, যা পূর্বে অত্যন্ত শীতল ছিল।
  • জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশ: তাঁর সফল কূটনীতির ফলেই বাংলাদেশ ১৯৭৯ সালে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের (UN Security Council) অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল।

৫. জাতীয়তাবাদ ও বহুদলীয় গণতন্ত্র

  • বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ: তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের ভূখণ্ডের সব মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর তত্ত্ব দেন, যা দেশের সার্বভৌমত্বকে এক নতুন পরিচয় দেয়।
  • বহুদলীয় গণতন্ত্র: ১৯৭৫ সালের একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) বিলুপ্ত করে তিনি দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন এবং সব রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি করার অধিকার দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেন।

চূড়ান্ত মূল্যায়ন

সব মিলিয়ে বলা যায়, জিয়াউর রহমান যদি আরও ২০-৩০ বছর বেঁচে থেকে দেশ শাসন করতে পারতেন, তবে আজকের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত দিক থেকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, উন্নত ও সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রে পরিণত হতো—এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এর বিনিময়ে রাষ্ট্রকে হয়তো রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, বাকস্বাধীনতা এবং উদার পশ্চিমা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কিছুটা আপস করতে হতো। সহজ কথায়, আজকের বাংলাদেশ হয়তো দেখতে অনেকটা মাহাথিরের মালয়েশিয়া কিংবা আধুনিক ভিয়েতনামের মতো—একটি নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি হতো।

আপনার মতামত জানান:

জিয়াউর রহমান দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে আজকের বাংলাদেশ কেমন হতো বলে আপনি মনে করেন? আপনার মূল্যবান মতামত নিচে কমেন্ট করে জানান।

দেশ-বিদেশের রাজনীতি, ইতিহাস এবং সমসাময়িক বিষয়ের গভীর ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণমূলক কন্টেন্ট নিয়মিত পড়তে বুকমার্ক করে রাখুন আপনার পছন্দের তথ্যমাধ্যম পালস বাংলাদেশ | Pulse Bangladesh

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

শাহজাহান ও মমতাজ

নিউজ ডেস্ক

September 12, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
বিভাগ (Category): ইতিহাস
প্রকাশের তারিখ: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তথ্যসূত্র (Sources): মুঘল সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক সংকলন, প্রথম আলো, যুগান্তর ও অন্যান্য ইতিহাসভিত্তিক প্রকাশনা

মুঘল সম্রাট শাহজাহান এবং তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বেগম মমতাজ মহলের মোট ১৪ জন সন্তান ছিল।

তাঁদের ১৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে মমতাজ মহল এই ১৪টি সন্তানের জন্ম দেন, যার মধ্যে ৮ জন পুত্র সন্তান এবং ৬ জন কন্যা সন্তান ছিল। তবে অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, এই ১৪ জন সন্তানের মধ্যে ৭ জনই জন্মগ্রহণের সময় বা শৈশবেই মারা যান। বাকি ৭ জন সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।

১৬৩১ সালে বুরহানপুরে তাঁদের ১৪তম সন্তান গওহর আরা বেগম-এর জন্ম দিতে গিয়েই মমতাজ মহলের মৃত্যু হয়।

জীবিত থাকা ৭ সন্তানের নাম:

  • জাহানারা বেগম (কন্যা)
  • দারা শিকোহ (পুত্র)
  • শাহ সুজা (পুত্র)
  • রওশন আরা বেগম (কন্যা)
  • ঔরঙ্গজেব (পুত্র – যিনি পরবর্তীতে মুঘল সম্রাট হন)
  • মুরাদ বক্স (পুত্র)
  • গওহর আরা বেগম (কন্যা)

মুঘল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় হলো সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজ মহলের সন্তানদের মধ্যকার সিংহাসন দখলের রক্তাক্ত যুদ্ধ এবং মমতাজের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত তাজমহলের ইতিহাস। নিচে এই দুটি বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:


১. সন্তানদের ইতিহাস: দারা শিকোহ বনাম ঔরঙ্গজেব

শাহজাহান ও মমতাজের ৪ পুত্র (দারা শিকোহ, শাহ সুজা, ঔরঙ্গজেব এবং মুরাদ বক্স) প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছিলেন। ১৬৫৭ সালে সম্রাট শাহজাহান গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে এই চার ভাইয়ের মধ্যে দিল্লির সিংহাসন দখলের এক নৃশংস যুদ্ধ শুরু হয়, যার মূল দুই চরিত্র ছিলেন দারা শিকোহ এবং ঔরঙ্গজেব

দারা শিকোহ (জ্যেষ্ঠ পুত্র ও উত্তরাধিকারী)

  • ব্যক্তিত্ব ও স্বভাব: দারা শিকোহ ছিলেন অত্যন্ত উদারমনা, কবি, দার্শনিক এবং সুফি ভাবধারার মানুষ। তিনি হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের দর্শনের মধ্যে মিল খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি উপনিষদ ও ভগবদ গীতা ফার্সি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন।
  • শাহজাহানের পছন্দ: জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে শাহজাহান তাঁকে অসম্ভব ভালোবাসতেন এবং নিজের উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। দারা বেশিরভাগ সময় আগ্রার দরবারে বাবার কাছাকাছি থাকতেন।
  • দুঃখজনক পরিণতি: ধর্মীয় উদারতার কারণে কট্টরপন্থী মুঘল আমির ও রাজন্যবর্গ দারার ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। ১৬৫৮ সালের সামুগড়ের যুদ্ধে ঔরঙ্গজেবের চতুর রণকৌশলের কাছে দারা পরাজিত হন। পরে ঔরঙ্গজেব তাঁকে বন্দি করেন এবং ‘ইসলাম অবমাননার’ অভিযোগ এনে ১৬৫৯ সালে তাঁর শিরোচ্ছেদ (মৃত্যুদণ্ড) করেন।

ঔরঙ্গজেব (ষষ্ঠ সন্তান ও পরবর্তী সম্রাট)

  • ব্যক্তিত্ব ও স্বভাব: দারা শিকোহ-এর সম্পূর্ণ বিপরীত ছিলেন ঔরঙ্গজেব। তিনি ছিলেন একজন প্রখর বুদ্ধিমান, কঠোর পরিশ্রমী, অত্যন্ত দক্ষ সামরিক কমান্ডার এবং কট্টর সুন্নি মুসলিম।
  • সিংহাসন আরোহণ: সামরিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি একে একে অন্য তিন ভাই—দারা শিকোহ, শাহ সুজা এবং মুরাদ বক্সকে পরাজিত ও নিশ্চিহ্ন করেন। তিনি নিজের বৃদ্ধ পিতা শাহজাহানকে আগ্রা দুর্গে বন্দি করে ১৬৫৮ সালে নিজেকে মুঘল সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন এবং ‘আলমগীর’ উপাধি নেন।
  • শাসনকাল: তিনি প্রায় ৪৯ বছর ভারত শাসন করেন এবং তাঁর সময়ে মুঘল সাম্রাজ্যের সীমানা সর্বকালের মধ্যে সবচেয়ে বড় আকার ধারণ করেছিল।

২. তাজমহল নির্মাণের ইতিহাস

পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম এই নিদর্শনটি কেবল একটি স্থাপত্য নয়, এটি ছিল সম্রাট শাহজাহানের পক্ষ থেকে তাঁর প্রয়াত স্ত্রী মমতাজ মহলের প্রতি ভালোবাসার এক অমর মহাকাব্য

নির্মাণের পটভূমি

১৬৩১ সালে দাক্ষিণাত্যের (বর্তমান মধ্যপ্রদেশ) বুরহানপুরে তাঁদের ১৪তম সন্তান গওহর আরা বেগমের জন্ম দিতে গিয়ে মমতাজ মহল মারা যান। প্রিয় বেগমের মৃত্যুতে শাহজাহান মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে, ইতিহাসবিদদের মতে, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তাঁর মাথার চুল ও দাড়ি পেকে সাদা হয়ে গিয়েছিল। মৃত্যুর আগে মমতাজ শাহজাহানের কাছে দুটি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন—তিনি যেন আর বিয়ে না করেন এবং তাঁর জন্য এমন এক সমাধি তৈরি করেন যা বিশ্ববাসী চিরকাল মনে রাখবে। সেই প্রতিজ্ঞা থেকেই তাজমহল নির্মাণের সূচনা।

নির্মাণশৈলী ও তথ্য

  • সময়কাল: ১৬৩২ সালে যমুনা নদীর তীরে এর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং মূল সমাধিটি ১৬৪৩ সালের দিকে শেষ হলেও পুরো প্রাঙ্গণ (বাগান, মসজিদ ইত্যাদি) সম্পন্ন হতে ১৬৫৩ সাল পর্যন্ত (প্রায় ২২ বছর) সময় লেগেছিল।
  • স্থপতি ও শ্রমিক: তাজমহলের প্রধান স্থপতি ছিলেন ওস্তাদ আহমদ লাহোরি। এই বিশাল স্থাপত্যটি তৈরিতে ভারত, পারস্য (ইরান) এবং মধ্য এশিয়া থেকে আসা প্রায় ২০,০০০ শ্রমিক ও কারিগর দিনরাত কাজ করেছিলেন।
  • উপাদান: তাজমহল তৈরিতে রাজস্থানের মাকরানা থেকে আনা বিশুদ্ধ সাদা মার্বেল পাথর ব্যবহার করা হয়েছিল। এছাড়া চীন, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান থেকে আনা ২৮ ধরণের মূল্যবান ও আধো-মূল্যবান মণি-মুক্তা পাথরের গায়ে খোদাই করে (Pietra Dura পদ্ধতিতে) নকশা করা হয়েছিল।
  • ব্যয়ভার: তৎকালীন সময়ে এটি নির্মাণে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ রুপি ব্যয় হয়েছিল, যা বর্তমান যুগের হিসাবে বিলিয়ন ডলারের সমান।

শেষ পরিণতি

১৬৬৬ সালে আগ্রা দুর্গে বন্দি অবস্থায় শাহজাহান মারা যান। বন্দিদশায় দুর্গের জানালা দিয়ে তিনি যমুনার তীরে তাজমহলের দিকে তাকিয়ে দিন কাটাতেন। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে ঔরঙ্গজেব তাঁকে তাজমহলের ভেতরে মমতাজ মহলের কবরের ঠিক পাশেই সমাহিত করেন।

যদি ভারতের উত্তরপ্রদেশে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি দেখার পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে টিকিট বুকিং এবং ভ্রমণের বিস্তারিত তথ্যের জন্য Taj Mahal Official Website ঘুরে দেখতে পারেন।

মুঘল সামজ্যের উত্তর কোল্ডারে কিছু নেপথ্য পথ এবং তাজমহলকে একপক্ষ সবথেকে বড় বড় “কালো তাজমহ”-এর গুঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা:


১. “কালো তাজমহল” (The Black Taj Mahal) এর গুঞ্জন ও আসল রহস্য

তাজমহলের ঠিক উল্টো দিকে, যমুনা নদীর অপর পাড়ে সম্রাট শাহজাহান নিজের জন্য হুবহু একই রকম একটি কালো মার্বেল পাথরের তাজমহল বানাতে চেয়েছিলেন—এটি ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর এবং আলোচিত গুঞ্জন।

  • গুঞ্জনের সূত্রপাত: ১৬৬৫ সালে ফরাসি পর্যটক জিন-ব্যাপটিস্ট তাভার্নিয়ার (Jean-Baptiste Tavernier) আগ্রা ভ্রমণ করেন। তিনি তাঁর ভ্রমণকাহিনিতে প্রথম উল্লেখ করেন যে, শাহজাহান যমুনার ওপারে নিজের জন্য একটি কালো তাজমহল নির্মাণ শুরু করেছিলেন, কিন্তু ছেলে ঔরঙ্গজেব তাঁকে বন্দি করায় সেই কাজ আর এগোতে পারেনি.
  • মাহতাব বাগ (Mahtab Bagh): তাজমহলের ঠিক বিপরীতে যমুনার ওপারে একটি বাগান রয়েছে, যার নাম ‘মাহতাব বাগ’। সেখানে খননকার্য চালিয়ে বেশ কিছু কালো মার্বেল পাথরের টুকরো পাওয়া যায়, যা এই গুঞ্জনকে আরও উসকে দেয়।
  • বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা ও সত্যতা: ১৯৯০-এর দশকে ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া’ (ASI) মাহতাব বাগে ব্যাপক খননকার্য চালায়। প্রত্নতাত্ত্বিকরা পরীক্ষা করে দেখেন যে, সেখানে পাওয়া কালো পাথরগুলো আসলে কোনো কালো মার্বেল ছিল না। সেগুলো ছিল মূল সাদা মার্বেল পাথর, যা যমুনার পানি, শৈবাল এবং দূষণের কারণে কালচে রঙ ধারণ করেছিল।
  • আসল উদ্দেশ্য: ইতিহাসবিদদের মতে, শাহজাহান কোনো কালো তাজমহল বানাতে চাননি। মাহতাব বাগটি তৈরি করা হয়েছিল এমনভাবে যাতে রাতে চাঁদের আলোয় যমুনার পানিতে মূল সাদা তাজমহলের একটি সুন্দর প্রতিচ্ছবি (Reflection) দেখা যায়।

২. তাজমহলের ভেতরের গোপন কক্ষ ও বন্ধ দরজার রহস্য

তাজমহলের মূল কাঠামোর নিচে এবং প্রাঙ্গণে বেশ কিছু বন্ধ ঘর এবং গোপন সুড়ঙ্গ রয়েছে, যা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটি নিয়ে নানা ধরণের তত্ত্ব প্রচলিত আছে:

  • ভেতরের ২২টি কক্ষ: তাজমহলের মূল বেদির নিচে যমুনা নদীর দিকে মুখ করা ২২টি গোপন ঘর রয়েছে। গুঞ্জন রয়েছে যে, এই কক্ষগুলোতে হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি বা মুঘল আমলের গোপন নথি লুকানো আছে।
  • আসল বৈজ্ঞানিক কারণ: প্রত্নতাত্ত্বিক ও স্থপতিদের মতে, এই কক্ষগুলো মূলত তাজমহলের বিশাল কাঠামোর জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি (Foundation) হিসেবে কাজ করে। যমুনা নদীর পানি ও মাটির আর্দ্রতা যাতে মূল মার্বেল পাথরের কোনো ক্ষতি করতে না পারে, সেজন্য এই আর্চ বা কক্ষগুলো তৈরি করে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। নিরাপত্তার স্বার্থে এবং পাথরের ক্ষয় রুখতে এগুলো বন্ধ রাখা হয়।

৩. রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের নেপথ্য কাহিনী: ভাইদের নাটকীয় পরিণতি

দারা শিকোহ এবং ঔরঙ্গজেবের যুদ্ধ ছাড়াও, বাকি দুই ভাই—শাহ সুজা এবং মুরাদ বক্স-এর পরিণতিও ছিল অত্যন্ত নাটকীয়:

  • মুরাদ বক্সের ট্র্যাজেডি: ঔরঙ্গজেব যখন দারা শিকোহ-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন, তখন তিনি ছোট ভাই মুরাদের সাথে জোট বেঁধেছিলেন। ঔরঙ্গজেব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, যুদ্ধের পর মুরাদকে সাম্রাজ্যের এক-তৃতীয়াংশ দেওয়া হবে। কিন্তু দারা পরাজিত হওয়ার পর, এক রাতে ঔরঙ্গজেব মুরাদকে মদ্যপান করিয়ে অচেতন করেন এবং বন্দি করেন। পরবর্তীতে ১৬৬১ সালে গোয়ালিয়র দুর্গে মুরাদকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
  • শাহ সুজার নিখোঁজ রহস্য: শাহ সুজা ছিলেন বাংলার সুবেদার (গভর্নর)। তিনি নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করে আগ্রার দিকে এগিয়ে যান, কিন্তু খজওয়ার যুদ্ধে ঔরঙ্গজেবের কাছে পরাজিত হন। এরপর ঔরঙ্গজেবের মীর জুমলার তাড়া খেয়ে তিনি সপরিবারে বাংলার রাজমহল ও ঢাকা হয়ে আরাকান (বর্তমান মিয়ানমার) রাজ্যে আশ্রয় নেন। সেখানে আরাকানের রাজার সাথে এক দ্বন্দ্বে শাহ সুজা এবং তাঁর পুরো পরিবার নির্মমভাবে নিহত বা নিখোঁজ হন। ইতিহাসে তাঁর শেষ পরিণতি আজও একটি বড় রহস্য।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাস

নিউজ ডেস্ক

September 12, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
বিভাগ (Category): জাতীয়, আইন ও আদালত
প্রকাশের তারিখ: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তথ্যসূত্র (Sources): প্রথম আলো, ঢাকা ট্রিবিউন, ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশন, বিডি২৪রিপোর্ট, সময় নিউজ, আইএএনএস

বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র এবং ইসকনের (ISKCON) সাবেক সংগঠক চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী-এর গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে তাঁর মায়ের মৃত্যু ও প্যারোলে মুক্তি পাওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ নিচে পর্যায়ক্রমিক টাইমলাইন বা ঘটনাপ্রবাহ আকারে দেওয়া হলো:

১. ঘটনার সূত্রপাত ও দেশদ্রোহিতার মামলা (অক্টোবর ২০২৪)

  • ২৫ অক্টোবর, ২০২৪: সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে চট্টগ্রামের লালদিঘী মাঠে একটি বিশাল মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস.
  • ৩১ অক্টোবর, ২০২৪: ওই সমাবেশে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাকে অবমাননা করার অভিযোগ এনে দণ্ডবিধির আওতায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় একটি রাষ্ট্রদ্রোহ (Sedition) মামলা দায়ের করা হয়.

২. বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার (নভেম্বর ২০২৪)

  • ২৫ নভেম্বর, ২০২৪: ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফেরার পথে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডিবি পুলিশ চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গ্রেপ্তার করে.
  • ২৬ নভেম্বর, ২০২৪: তাঁকে চট্টগ্রামের মেট্রেপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাঁর জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন. এই আদেশকে কেন্দ্র করে আদালত চত্বরের বাইরে তাঁর অনুসারীদের সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তীব্র সংঘর্ষ হয় এবং ওই সহিংসতায় আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ নির্মমভাবে নিহত হন. এই হত্যাকাণ্ডের পর চিন্ময় কৃষ্ণের বিরুদ্ধে আরও নতুন মামলা দায়ের করা হয়.

৩. দীর্ঘ আইনি লড়াই ও কারাবাস (২০২৫)

  • জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি, ২০২৫: চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন সেশন জজ আদালত তাঁর জামিন আবেদন পুনরায় নাকচ করলে, তিনি হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করেন. ৪ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেন.
  • ৩০ এপ্রিল, ২০২৫: বাংলাদেশ হাইকোর্ট তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাসহ কয়েকটি মামলায় জামিন মঞ্জুর করেন. কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে চেম্বার আদালতে আপিল করলে জামিন আদেশটি স্থগিত (Stay) হয়ে যায়, যার ফলে তাঁর আর কারামুক্তি ঘটেনি.
  • পরবর্তীতে মোট ৬টি ফৌজদারি মামলার মধ্যে ৪টিতে জামিন পেলেও আইনি জটিলতায় প্রায় দুই বছর তিনি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী জীবন কাটান.

৪. মায়ের অসুস্থতা ও শেষ সাক্ষাৎ না পাওয়া (২০২৬)

  • জুলাই-আগস্ট, ২০২৬: চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের ৭১ বছর বয়সী মা সন্ধ্যা রানী ধর দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর পুণ্ডরীক ধামে চিকিৎসাধীন ছিলেন.
  • সেপ্টেম্বরের শুরুতে: মায়ের শারীরিক অবস্থার চরম অবণতি হলে, মৃত্যুর পূর্বে অন্তত একবার সন্তানকে দেখার শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি. পরিবার থেকে কর্তৃপক্ষের কাছে চিন্ময় কৃষ্ণের প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হলেও, মায়ের জীবিত অবস্থায় সেই অনুমতি মেলেনি.

৫. মায়ের মৃত্যু ও ৫ ঘণ্টার প্যারোলে মুক্তি (১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬)

  • ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (সকাল): সন্তানকে না দেখেই সকালবেলা পুণ্ডরীক ধামে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যা রানী ধর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন.
  • ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (দুপুর ২:৩০ – ৪:০০): মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে জরুরি ভিত্তিতে প্যারোলের আবেদন করেন. চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক (DC) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া মানবিক কারণে আইন অনুযায়ী ৫ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তির আদেশ জারি করেন.
  • ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বিকেল ৪:০০): বিকেল ৪টার দিকে কড়া পুলিশ পাহারায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সাময়িকভাবে মুক্তি দেওয়া হয়.

৬. অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও পুনরায় কারাগারে প্রত্যাবর্তন

  • প্যারোলে মুক্তি পেয়ে তিনি সরাসরি হাটহাজারীর শ্রী শ্রী পুণ্ডরীক ধাম আশ্রমে পৌঁছান. সেখানে মায়ের মরদেহ ছুঁয়ে বিদায় জানান এবং ধর্মীয় শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন.
  • এ সময় পুণ্ডরীক ধাম মন্দিরে রাধা-কৃষ্ণের মূর্তির পায়ে মাথা রেখে অশ্রুসিক্ত চোখে তাঁর প্রার্থনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আবেগঘন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে. ৫ ঘণ্টার নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কড়া পুলিশি নিরাপত্তায় তাঁকে পুনরায় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়.

চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর গ্রেপ্তার এবং পরবর্তী দীর্ঘ কারাবাসকে কেন্দ্র করে তাঁর মামলার বর্তমান আইনি স্থিতি এবং আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়াগুলোর বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

৭. মামলাগুলোর বর্তমান আইনি স্থিতি (Legal Status)

চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতা, হত্যা এবং সহিংসতাসহ মোট ৬টি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা নিম্নরূপ: [

  • চারটি মামলায় জামিন: ২০২৬ সালের আগস্ট মাসের শুরুতেই বাংলাদেশ হাইকোর্ট তাঁকে হত্যাচেষ্টা, ভাঙচুর এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার মতো ৪টি মামলায় জামিন মঞ্জুর করেন
  • রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় স্থগিতাদেশ: তাঁর প্রধান মামলাটি ছিল চট্টগ্রামের লালদিঘী মাঠে জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহ (Sedition) মামলা। এই মামলায় হাইকোর্ট প্রথমে জামিন দিলেও রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে চেম্বার আদালত তা স্থগিত (Stay) করে দেন। পরবর্তীতে হাইকোর্টে পুনরায় জামিনের আবেদন করা হলে ২০২৬ সালের জুনে তা খারিজ হয়ে যায় এবং আদালত সরকারকে রুল জারি করে এর ব্যাখ্যা চান।
  • আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলা: ২৫ নভেম্বর ২০২৪-এ তাঁর গ্রেপ্তারের পর দিন আদালত চত্বরে সংঘর্ষে সরকারি আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ নিহত হন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রামের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল চিন্ময় কৃষ্ণ দাসসহ ৩৯ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ (হত্যা) এবং ১০৯ (প্ররোচনা) ধারায় আনুষ্ঠানিক চার্জশিট গঠন করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে। সম্প্রতি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসেও আদালত তাঁকে এই হত্যা মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর (Shown Arrested) নির্দেশ দিয়েছেন।
  • কারামুক্তি না হওয়ার কারণ: ৬টি মামলার মধ্যে ৪টিতে জামিন পেলেও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার জামিন স্থগিত থাকা এবং আইনজীবী হত্যা মামলার বিচার চলমান থাকায় তিনি এখনো কারামুক্ত হতে পারেননি।

৮. আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া

চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেপ্তার এবং সনাতন স্বত্বাধিকারী আন্দোলনের ওপর এর প্রভাব আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ করে ভারত এবং বৈশ্বিক সনাতনী সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দেয়:

ক) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MEA, India) এর প্রতিক্রিয়া

  • তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ: গ্রেপ্তারের পর পরই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত কড়া ভাষায় একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়। তারা জানায়, “বাংলাদেশে চরমপন্থীদের দ্বারা সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর ক্রমাগত হামলা ও মন্দিরে ভাঙচুরের ঘটনার মধ্যেই একজন শান্তিকামী ধর্মীয় নেতাকে গ্রেপ্তার ও জামিন প্রত্যাখ্যানের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”
  • আইনি সুরক্ষার দাবি: ভারত সরকার ক্রমাগত বাংলাদেশ প্রশাসনের কাছে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তাঁর আইনি অধিকার বজায় রাখার দাবি জানিয়ে আসছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে বেশ বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়।

খ) ইসকন (ISKCON) এর প্রতিক্রিয়া

  • প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব ও বহিষ্কারের স্পষ্টীকরণ: ঘটনার শুরুতে একটি বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল কারণ ২০২৪ সালের জুলাই-অক্টোবরের দিকে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ইসকন বাংলাদেশ চ্যাপ্টার থেকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। ইসকন বাংলাদেশ সংবাদ সম্মেলনে জানায় যে, তাঁর ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক আন্দোলনের দায়ভার ইসকন বহন করবে না।
  • আন্তর্জাতিক ইসকনের সংহতি (Solidarity): তবে আন্তর্জাতিক স্তরে ইসকন (ISKCON, Inc.) এবং এর বৈশ্বিক নেতৃত্ব চিন্ময় কৃষ্ণের পাশে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক ইসকনের পক্ষ থেকে এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে পোস্ট করে তাঁর প্রতি পূর্ণ সংহতি ও তাঁর সুরক্ষার জন্য প্রার্থনা জানানো হয়।
  • আইনি অধিকারের দাবি ও সমালোচনা: ইসকনের কলকাতা শাখার ভাইস-প্রেসিডেন্ট রাধারমণ দাস একাধিক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ আদালতের জামিন নামঞ্জুরের সিদ্ধান্তকে “দুর্ভাগ্যজনক” বলে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন যে, চিন্ময় কৃষ্ণ হিন্দুদের ওপর হওয়া নির্যাতনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে সোচ্চার হওয়ায় তাঁকে অন্যায়ভাবে “সন্ত্রাসী” হিসেবে চিত্রায়িত করে টার্গেট করা হচ্ছে।

গ) অন্যান্য বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থা

  • গ্লোবাল হিন্দু ফেডারেশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও ধর্মীয় সংগঠন নিউ ইয়র্ক, লন্ডন এবং ভারতের বিভিন্ন শহরে চিন্ময় কৃষ্ণের মুক্তির দাবিতে এবং বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর গ্রেপ্তার এবং আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) পক্ষ থেকে বেশ কিছু স্পষ্ট ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে。 সরকারের প্রধান অবস্থান ও যুক্তিসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:

৯. সুনির্দিষ্ট অপরাধের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার (কোনো বিশেষ সম্প্রদায়কে টার্গেট করা হয়নি)

বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MoFA) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস বা সনাতনী আন্দোলনের জন্য গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাকে অবমাননা করার একটি সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রদ্রোহী অভিযোগ (Specific Sedition Charges) রয়েছে এবং সেই আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই তাঁকে পুলিশ আটক করেছে। সরকার জোর দিয়ে বলেছে, বাংলাদেশে আইনের শাসন বজায় রাখতে অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার হবে।

২. ভারতের বিবৃতির কড়া জবাব ও কূটনৈতিক অবস্থান

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MEA) যখন চিন্ময় কৃষ্ণের গ্রেপ্তার নিয়ে “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়, তখন বাংলাদেশ সরকার তার তীব্র দ্বিমত পোষণ করে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়:

  • ভারতের এই ধরণের মন্তব্য বানোয়াট ও অসত্য তথ্য ছড়ানোর শামিল।
  • এটি দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার পরিপন্থী (Contrary to the spirit of friendship)
  • বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিচারিক ব্যবস্থা ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং এতে বাইরের কোনো অযাচিত মন্তব্য বা হস্তক্ষেপ কাম্য নয়।

৩. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা

আন্তর্জাতিক মহলে যখন বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, “বাংলাদেশ সব ধর্মের মানুষের জন্য নিরাপদ”

  • সরকার জানিয়েছে, দেশের সকল নাগরিক—তাঁরা যে ধর্মেরই হোন না কেন—আইনের চোখে সমান এবং সবার ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় প্রশাসন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
  • আদালত চত্বরে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যার ঘটনার পর সরকার দেশের জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানায় এবং যেকোনো মূল্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে।

৪. মানবিক কারণে প্যারোলে মুক্তি প্রদান

আইনি জটিলতার কারণে জামিন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হলেও, সরকার মানবিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েছে। চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মায়ের মৃত্যুর পর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন (DC) কোনো প্রকার রাজনৈতিক বা আইনি জটিলতা তৈরি না করে সম্পূর্ণ মানবিক বিবেচনায় আইন মেনেই তাঁকে ৫ ঘণ্টার জরুরি প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করে, যাতে তিনি মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নিতে পারেন।

সহজ কথায়, বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হলো—আইন সবার জন্য সমান। চিন্ময় কৃষ্ণের বিচার সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া ও প্রচলিত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে হচ্ছে এবং একে রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়া অনুচিত

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে

নিউজ ডেস্ক

September 10, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিনিধি : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
বিভাগ (Category): জাতীয়

নিজস্ব প্রতিবেদক, অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশের সময় ও তারিখ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,

স্থান: ঢাকা

ঢাকা: মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ (১৯৩৯-১৯৪৫)-এর ফলাফলে যে সামরিক শক্তিটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল, তা হলো অবিভক্ত ভারতের সামরিক বাহিনী। বিশ্বজুড়ে তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপস্থিতি থাকলেও, যুদ্ধের ময়দানে মিত্রবাহিনীর অন্যতম মূল শক্তি ছিল ভারতীয় তরুণরা। বর্তমান ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ একত্রিত হয়ে এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শক্তির যুদ্ধ হলেও ভারতীয় সেনাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক সামরিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছে।

ইতিহাসের সর্ববৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী

১৯৩৯ সালে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তখন অবিভক্ত ভারতীয় সাঁজোয়া বহরে সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র ২ লাখের কাছাকাছি। কিন্তু ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়া নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২৫ লাক্ষে (২.৫ মিলিয়ন)।

এই বিশাল সামরিক সমাবেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—এতে কোনো বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ (Conscription) ছিল না। সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই বাহিনীটি ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ‘অল-ভলান্টিয়ার আর্মি’ বা স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী হিসেবে বিশ্ব রেকর্ডে স্থান করে নেয়।

[১৯৩৯: ২ লাখ সৈন্য] ──► স্বেচ্ছাসেবী অংশগ্রহণ ──► [১৯৪৫: ২৫ লাখ সৈন্য (সর্ববৃহৎ ভলান্টিয়ার বাহিনী)]

তিন মহাদেশের রণক্ষেত্র ও বীরত্বের চিহ্ন

ভারতীয় সৈন্যরা কেবল এশিয়ার মাটিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তারা এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ—এই তিন মহাদেশের বিভিন্ন দুর্গম ও প্রতিকূল যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে লড়াই করেছেন।

  • আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য অভিযান: উত্তর আফ্রিকায় জার্মানি ও ইতালির যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে এবং মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানে ভারতীয় সৈন্যরা কৌশলগত সাফল্য এনে দেন।
  • ইতালি অভিযান ও মন্টি ক্যাসিনো: ইউরোপের ইতালি অভিযানে মিত্রবাহিনীর জয়ে ভারতীয়দের ভূমিকা ছিল অসামান্য। বিশেষ করে রক্তক্ষয়ী ‘ব্যাটল অফ মন্টি ক্যাসিনো’ মুক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের পরাক্রম বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়।
  • বার্মা ও ইম্ফল-কোহিমার যুদ্ধ: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মিত্রবাহিনীর অবস্থান টিকিয়ে রাখতে ভারতীয় সৈন্যরা বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) অভিযানে অংশ নেন। ১৯৪৪ সালে ভারতের ইম্ফল ও কোহিমার যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ লড়াই চালিয়ে তারা জাপানি বাহিনীর ভারত আক্রমণের চূড়ান্ত আগ্রাসন রুখে দেন।

যুদ্ধের ময়দানে অসাধারণ সাহসিকতা ও বীরত্ব প্রদর্শনের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতীয় সৈন্যদের ৩১টি ‘ভিক্টোরিয়া ক্রস’ (ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ সম্মাননা) প্রদান করা হয়, যা সমগ্র মিত্রবাহিনীর অর্জিত মোট ভিক্টোরিয়া ক্রসের প্রায় ১৫ শতাংশ।

ক্ষয়ক্ষতি ও বাংলার ছিয়াত্তরের মন্বন্তর

এই যুদ্ধে বিজয় অর্জন করতে গিয়ে ভারতীয় বাহিনীকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রায় ৮৭,০০০ থেকে ৮৯,০০০ ভারতীয় সৈন্য শহীদ হন। এছাড়া হাজার হাজার সেনা গুরুতর আহত হন এবং একটি বিশাল অংশ শত্রু শিবিরে বন্দী হিসেবে আটক থাকেন।

সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি এই যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব পড়েছিল তৎকালীন বাংলায়। যুদ্ধের রশদ ও খাদ্যসামগ্রী যুদ্ধক্ষেত্রে জোগাতে গিয়ে তৈরি হয় ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ বা দুর্ভিক্ষ। প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও যুদ্ধের বলি হয়ে বাংলায় প্রায় ৩০ লাখ সাধারণ বেসামরিক নাগরিক অনাহারে প্রাণ হারান।

[দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ] ──► রসদ ও খাদ্য স্থানান্তর ──► ১৯৪৩-এর বাংলা দুর্ভিক্ষ ──► ৩০ লাখ বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু

দ্বিমুখী ধারা: ব্রিটিশ রাজ বনাম আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যদের অবস্থান দুটি ভিন্ন ও ঐতিহাসিক ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল:

১. ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনী: একটি বিশাল অংশ ব্রিটিশ পতাকাতলে থেকে মিত্রবাহিনীর হয়ে অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায়।

২. আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA): অন্যদিকে, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় জাপানিদের হাতে বন্দী হওয়া হাজার হাজার ব্রিটিশ-ভারতীয় সৈন্য নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আহবানে সাড়া দিয়ে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এ যোগ দেন। তারা অক্ষশক্তির সমর্থন নিয়ে ব্রিটিশদের হাত থেকে জন্মভূমিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সরাসরি ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

স্বাধীনতার সূচনা ও ইতিহাসের মূল্যায়ন

যুদ্ধের সমাপ্তি এবং ভারতীয় সেনাদের রাজনৈতিক সচেতনতা ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভকে ত্বরান্বিত করতে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ কমান্ডার-ইন-চিফ ফিল্ড মার্শাল ক্লদ অচিনলেক স্বীকার করেছিলেন যে, ভারতীয় সৈন্যদের অসামান্য অবদান ছাড়া ব্রিটেন দুটি বিশ্বযুদ্ধের কোনোটিতেই জয়লাভ করতে পারত না।

স্বাধীনতার পর বহু বছর ধরে এই ইতিহাসকে কিছুটা আড়ালে রাখা হয়েছিল—কেননা রাজনৈতিকভাবে এটিকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি রক্ষার যুদ্ধ হিসেবে দেখা হতো। তবে আধুনিক সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশ্ব রাজনীতি পুনর্গঠনে এবং স্বাধীন উপমহাদেশের ভিত্তি তৈরিতে ২৫ লাখ ভারতীয় সেনার এই মহাকাব্যিক বীরত্ব ও আত্মত্যাগ ছিল অন্যতম প্রধান ভিত্তিপ্রস্তর।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

৩০শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ