ইতিহাস

বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত কে ঠিক করেছিল? BSF “চাপিয়ে দিয়েছে”—নাকি বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত
জাতীয় সঙ্গীত

নিউজ ডেস্ক

October 20, 2025

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বাংলাদেশে মাঝে–মধ্যে একটি বক্তব্য শোনা যায়—১৯৭১ সালে ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (BSF) নাকি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ও পতাকা “চাপিয়ে” দিয়েছিল। এই দাবির ঐতিহাসিক ও আইনি সত্যতা কী? নিচে সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রামাণ্য রি–লিংক (ক্লিকযোগ্য সূত্র)–সহ পুরো বিষয়টি সাজানো হলো।

সারসংক্ষেপ (TL;DR)

  • ছাত্র–যুব নেতৃত্ব ১৯৭১ সালের মার্চের আন্দোলনেই রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’কে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে বেছে নেয়; পরবর্তীতে স্বাধীনতা–উত্তর রাষ্ট্রীয় আদেশে (১৯৭২) সঙ্গীতটি আইনি মর্যাদা পায়।
  • BSF–এর তৎকালীন প্রধান কে. এফ. রুস্তমজি তাঁর ডায়রি–ভিত্তিক গ্রন্থে “গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা” (key role) থাকার কথা লিখেছেন; এটা ‘চাপিয়ে দেওয়া’র সমতুল নয়—কারণ চূড়ান্ত ও বৈধ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশই আইনে স্থির করেছে

১) মাঠের ইতিহাস: ১৯৭১–এ কীভাবে ‘আমার সোনার বাংলা’ উঠে এল

  • ৩ মার্চ ১৯৭১—ঢাকার পল্টন ময়দানের বিশাল সমাবেশে ছাত্র–যুবকরা ‘আমার সোনার বাংলা’ পরিবেশন করে; মুক্তির রাজনীতিতে গানটি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।
  • একই সময়ে স্বাধীনতার অন্দোলনে ছাত্র–নেতৃত্ব ‘আমার সোনার বাংলা’কে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে নির্বাচন/ব্যবহার শুরু করে—এ রূপরেখা বাংলাপিডিয়া–র ‘নন–কোঅপারেশন ১৯৭১’ নিবন্ধে নথিবদ্ধ।

গুরুত্বপূর্ণ: এসব পদক্ষেপ ছিল বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনৈতিক–সামাজিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা, বাহ্যিক চাপের নয়।

২) আইনি সত্য: কোন আদেশে জাতীয় সঙ্গীত চূড়ান্ত হলো

  • প্রেসিডেন্টস অর্ডার নং ১৩০ (৩১ অক্টোবর ১৯৭২)“The Bangladesh National Anthem, Flag and Emblem Order, 1972”–এ স্পষ্ট করে বলা আছে: জাতীয় সঙ্গীত হবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’–এর প্রথম ১০ পংক্তি। এটাই সঙ্গীতের আইনগত ভিত্তি। (ক্লজ–২, ফার্স্ট স্কেডিউল).

👉 রি–লিংক (আইনি দলিল): উপরোক্ত সরকারি আইন–পোর্টালের লিংকগুলো ক্লিকযোগ্য—সরাসরি মূল নথিতে যাবেন।

৩) BSF–এর ‘key role’—এর মানে কী (এবং কী নয়)

  • রুস্তমজির ডায়রি–ভিত্তিক বই (সম্পা. পি. ভি. রাজাগোপাল) উদ্ধৃত করে ভারতীয় মিডিয়া জানায়—BSF বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন, সমন্বয়, এমনকি পতাকা/সঙ্গীত বাছাই–প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
  • কিন্তু ‘গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা’ ≠ ‘চাপিয়ে দেওয়া’। কারণ—জাতীয় সঙ্গীতের চূড়ান্ত ও বৈধ স্বীকৃতি এসেছে বাংলাদেশের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় আদেশে (PO–130/1972); বিদেশি কোনো বাহিনীর নির্দেশে নয়।

৪) পতাকার গল্প: ছাত্রদের হাতে নকশা, ১৯৭২–এ সরকারিভাবে স্থির

  • ২ মার্চ ১৯৭১—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে ছাত্রনেতা এ. এস. এম. আবদুর রবরা যে পতাকা উত্তোলন করেন, তার নকশায় মানচিত্র আঁকেন শিব নারায়ণ দাস। স্বাধীনতার পর ১৭ জানুয়ারি ১৯৭২–এ মানচিত্র বাদ দিয়ে বর্তমান নকশা সরকারিভাবে নির্ধারিত হয়।

৫) “সঙ্গীত পাল্টানো উচিত”—এই বিতর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে বিকল্প সঙ্গীত প্রস্তাবের কথা শোনা গেছে (যেমন—‘নতুনের গান’, ‘প্রথম বাংলাদেশ’ ইত্যাদি), কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো পরিবর্তন হয়নিএনসাইক্লোপিডিয়া/রেফারেন্স–ভিত্তিক সারাংশে বিষয়টি উল্লেখ আছে; রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও আইন অপরিবর্তিত।

মিথ বনাম তথ্য (দ্রুত তালিকা)

  • মিথ: BSF ১৯৭১–এ বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত “চাপিয়ে” দেয়।
    তথ্য: BSF–এর সহায়তা/সমন্বয়ের কথা আছে; কিন্তু জাতীয় সঙ্গীত বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২–এর রাষ্ট্রীয় আদেশে নির্ধারণ করেছে।
  • মিথ: পতাকা/সঙ্গীত—সবই ভারতের বানানো।
    তথ্য: পতাকা–সঙ্গীত দুটিই প্রথমে বাংলাদেশের ছাত্র–আন্দোলনের সৃষ্টি/নির্বাচন, পরে বাংলাদেশের আইনেই চূড়ান্ত

টাইমলাইন (ক্লিকযোগ্য রেফারেন্সসহ)

  • ৩ মার্চ ১৯৭১: পল্টন সমাবেশে ‘আমার সোনার বাংলা’—রাজনৈতিক মঞ্চে উত্থান।
  • মার্চ ১৯৭১: ছাত্র–আন্দোলনে ‘আমার সোনার বাংলা’ জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে বাছাই/ব্যবহার।
  • ২ মার্চ ১৯৭১: ঢাবি কলাভবনে ছাত্রনেতাদের পতাকা উত্তোলন; নকশায় শিব নারায়ণ দাস।
  • ১৭ জানুয়ারি ১৯৭২: জাতীয় পতাকার বর্তমান নকশা সরকারিভাবে স্থির।
  • ৩১ অক্টোবর ১৯৭২: PO–130/1972–এ জাতীয় সঙ্গীতের প্রথম ১০ পংক্তি আইনগতভাবে নির্ধারিত

উপসংহার

যে–কোনো জাতীয় প্রতীক নিয়ে মত–বিরোধ থাকতে পারে; কিন্তু ইতিহাস–আইনের আলোকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত বাংলাদেশেরই সিদ্ধান্ত—আইনগতভাবে প্রণীত। BSF/ভারতের “ভূমিকা”কে “চাপিয়ে দেওয়া” হিসেবে ব্যাখ্যা করা অতিরঞ্জন। বিতর্ক করলে করুন, কিন্তু প্রমাণ–ভিত্তিকভাবে—এটাই দায়িত্বশীল অবস্থান।

সূত্র/রি–লিংক (সব কটি ক্লিকযোগ্য)

  1. সরকারি আইনপত্র (PO–130/1972): জাতীয় সঙ্গীত–পতাকা–এম্বলেম আদেশ; প্রথম ১০ পংক্তি নির্ধারণ।
  2. Banglapedia (Non–Cooperation 1971): ‘আমার সোনার বাংলা’ নির্বাচন/ব্যবহার—আন্দোলনের নথি।
  3. Britannica (Amar Sonar Bangla): ৩ মার্চ ১৯৭১–এর পল্টন সমাবেশে গানটির রাজনৈতিক উত্থান।
  4. Dhaka Tribune (Flag—50 years): পতাকা নকশা সরকারিভাবে স্থির (১৭ জানুয়ারি ১৯৭২)–র প্রেক্ষাপট।
  5. শিব নারায়ণ দাস (পতাকার নকশা): ছাত্র–আন্দোলনের পতাকা–ইতিহাস।
  6. New Indian Express (Rustomji diaries): BSF–এর “key role”–উদ্ধৃতি—সহায়তা বনাম চাপিয়ে দেওয়া পার্থক্য উপলব্ধির জন্য।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

হুমায়ুন আজাদের দৃষ্টি

নিউজ ডেস্ক

April 17, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষণে: BDS Bulbul Ahmed

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং এর নেপথ্য কারিগরদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের শেষ নেই। তবে প্রথাবিরোধী লেখক ও বুদ্ধিজীবী ড. হুমায়ুন আজাদ তাঁর ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ গ্রন্থে এই বিতর্ককে এক নতুন দার্শনিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, কেবল একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করে ‘ঘোষক’ হওয়া যায়, কিন্তু একটি জাতির ‘মহাস্থপতি’ হওয়া যায় না।

১. বন্দী মুজিব: ঘোষণার চেয়েও শক্তিশালী এক প্রেরণা

হুমায়ুন আজাদ মনে করেন, ২৫শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে ধরা না দিয়ে যদি পালিয়ে গিয়ে ঘোষণা দিতেন, তবে তিনি হতেন একজন ‘সামান্য বিচ্ছিন্নতাবাদী’। কিন্তু তাঁর বন্দীত্ব তাঁকে করে তুলেছিল এক অপরাজেয় ও অদম্য ভাবপ্রতিমা।

তিনি লিখেছেন, “যোদ্ধা মুজিবের থেকে বন্দী মুজিব ছিলেন অনেক শক্তিশালী ও প্রেরণাদায়ক। তিনি তখন হয়ে উঠেছিলেন মহানায়ক, ঘোষকের অনেক ওপরে যাঁর স্থান।” ১৯৭১ সালে প্রতিটি বাঙালির মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল— ‘মুজিব কোথায়?’ তাঁর বেঁচে থাকার সংবাদই ছিল মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় শক্তি।

২. মেজর জিয়া: এক ঐতিহাসিক আকস্মিকতা

২৭শে মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণা পাঠ সম্পর্কে হুমায়ুন আজাদ অত্যন্ত নির্মোহ বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তিনি জিয়াউর রহমানকে একটি ‘আকস্মিক কিংবদন্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

  • সুযোগ ও আকস্মিকতা: লেখক মনে করেন, কালুরঘাটের বেতারযন্ত্রীরা একজন মেজরকে খুঁজছিলেন একটি জোরালো ঘোষণার জন্য। সেই মুহূর্তে অন্য কোনো মেজর থাকলেও তিনি কিংবদন্তি হয়ে উঠতেন।
  • উত্তেজনা ও স্বস্তি: জিয়ার সেই কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ সাধারণ মানুষকে আলোড়িত করেছিল মূলত এই কারণে যে, তারা জানতে পেরেছিল বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন এবং তাঁর নামেই যুদ্ধ শুরু হয়েছে।

হুমায়ুন আজাদের ভাষায়, “রবীন্দ্রনাথ বা মুজিব বা আইনস্টাইন হওয়ার জন্য লাগে দীর্ঘ সাধনা, কিন্তু কেউ কেউ হঠাৎ মেজর জিয়া হয়ে উঠে সারা দেশকে আলোড়িত করতে পারেন।”

৩. কেন মুজিবই মহাস্থপতি?

আজাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি সেকেন্ডে, প্রতিটি গুলিতে এবং প্রতিটি আত্মত্যাগে কেবল একটি নামই কাজ করেছে—তা হলো মুজিব। বঙ্গবন্ধু ছাড়া অন্য কেউ হাজারবার ঘোষণা দিলেও বিশ্ব জনমত আমাদের পক্ষে আসত না এবং সাধারণ মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ত না।

তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “মুজিব বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধে পৌঁছে দিয়েছিলেন, বন্দী থেকেও তিনিই নিয়ন্ত্রণ করছিলেন মুক্তিযুদ্ধকে। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি, মহাস্থপতি; তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের কথা ভাবাই যায় না।”

৪. ‘শহীদ’ বনাম ‘নিহত-অমর’

প্রবন্ধে হুমায়ুন আজাদ ধর্মীয় পরিভাষার চেয়ে ইহলৌকিক শব্দকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, পাকিস্তান হয়তো মুজিবকে হত্যা করতে পারত, কিন্তু মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব হতেন আরও বেশি শক্তিশালী। যারা দেশের জন্য প্রাণ দেন, তারা মূলত ‘নিহত-অমর’ হয়ে ইতিহাসের পাতায় টিকে থাকেন।


বিডিএস পর্যবেক্ষণ: হুমায়ুন আজাদের এই লেখাটি বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক মেরুকরণের উর্ধ্বে উঠে ইতিহাসের সত্যকে খুঁজতে সাহায্য করে। তাঁর মতে, ঘোষণা কে দিয়েছেন সেই তর্কের চেয়ে বড় সত্য হলো—কার নেতৃত্বে এবং কার নামে একটি জাতি সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু সেই একক নেতৃত্বের নাম, যিনি একটি কাল্পনিক রাষ্ট্রকে মানচিত্রে রূপ দিয়েছিলেন।


এক নজরে লেখকের মূল বক্তব্য:

বিষয়হুমায়ুন আজাদের মত
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিববাংলাদেশের মহাস্থপতি, যাঁর স্থান ঘোষকের অনেক ওপরে।
মেজর জিয়াঐতিহাসিক আকস্মিকতায় উদ্ভূত একজন ট্র্যাজিক নায়ক ও কিংবদন্তি।
মুক্তিযুদ্ধের চালিকাশক্তিবঙ্গবন্ধুর নাম ও ভাবপ্রতিমা।
বন্দীত্বের গুরুত্বপালিয়ে গিয়ে ঘোষণা দেওয়ার চেয়ে বঙ্গবন্ধুর বন্দীত্ব ছিল বেশি মর্যাদাপূর্ণ।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মুসলিম উম্মাহর সংকট

নিউজ ডেস্ক

April 16, 2026

শেয়ার করুন

লিখেছেন: BDS Bulbul Ahmed

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা এবং শান্তির ধর্ম। একজন মুসলিম হিসেবে আমরা আমাদের পরিচয় নিয়ে গর্বিত। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপট এবং মুসলিম উম্মাহর অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে অনেক ক্ষেত্রে আমাদের লজ্জিত ও ব্যর্থ মনে হয়। ইসলামের মূল শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়ে আমরা আজ যে সংকটের মুখোমুখি, তার কিছু বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হলো।

১. ইসলামের অপব্যাখ্যা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ

বর্তমানে ইসলামকে যার যার সুবিধামতো ব্যাখ্যা করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে ‘একাধিক বিবাহ’ নিয়ে যেভাবে অপব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তা অত্যন্ত বিব্রতকর। ইসলামে চার বিয়ের অনুমতি থাকলেও এর পেছনে যে কঠিন শর্ত ও ইনসাফের (ন্যায়বিচার) বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা অনেক সময় এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে অমুসলিম বিশ্ব ও নওমুসলিমদের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে যে, মুসলিম পুরুষ মানেই কেবল একাধিক বিয়ে।

২. আত্মপক্ষ সমর্থনের দায়ভার ও ‘ইসলামোফোবিয়া’

বিশ্বের কোথাও কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তার দায়ভার ১.৬ বিলিয়ন মুসলিমের ওপর এসে পড়ে। অনলাইনে বা অফলাইনে একজন মুসলিমকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয় যে সে ‘জঙ্গি’ নয়। হিজাব পরিধান করা যে একজন নারীর স্বাধীন ইচ্ছা হতে পারে—এই সহজ সত্যটুকুও আমরা বিশ্বকে বোঝাতে ব্যর্থ হচ্ছি। নিজেদের সঠিক অবস্থান তুলে ধরতে না পারা আমাদের এক বড় ব্যর্থতা।

৩. অনৈক্য ও পরশ্রীকাতরতা

মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যের অভাব আজ প্রকট। রোহিঙ্গা ইস্যুর মতো বড় মানবিক সংকটে যখন কোনো শক্তিশালী মুসলিম দেশ নয়, বরং গাম্বিয়ার মতো একটি ছোট দেশ আন্তর্জাতিক আদালতে লড়াই করে, তখন আমাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আমরা অন্যের ভুল খুঁজতে যতটা পটু, নিজেদের সংশোধনে ততটাই উদাসীন।

৪. ভূ-রাজনৈতিক স্ববিরোধিতা

মুসলিম বিশ্বের তথাকথিত ‘মোড়ল’ রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা অনেক সময় সাধারণ মুসলমানদের ব্যথিত করে। ইয়েমেনের মানবিক বিপর্যয়, ফিলিস্তিন ইস্যুতে রহস্যজনক নীরবতা কিংবা বিভিন্ন দেশে মুসলিমদের ওপর চলা অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হওয়া—আমাদের লজ্জিত করে। ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা মুসলিম উম্মাহর জন্য বড় ক্ষতি বয়ে আনছে।

৫. দেশপ্রেম ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে অনীহা

‘দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ’—এই শিক্ষা ভুলে গিয়ে অনেক মুসলিম দেশ আজ অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গৃহযুদ্ধে লিপ্ত। এছাড়া সোনালী অতীতে বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও দর্শনে মুসলিম মনীষীদের যে কালজয়ী অবদান ছিল, তা আজ ইতিহাসের পাতায় বন্দী। আমরা আমাদের পূর্বসূরিদের আবিষ্কার ও অবদান সম্পর্কে নিজেরাই জানি না, ফলে পশ্চিমাদের চোখে আমরা আজ একটি ‘পিছিয়ে পড়া’ জাতিতে পরিণত হয়েছি।


বিডিএস পর্যবেক্ষণ: ইসলামের সৌন্দর্য তখনই বিকশিত হবে যখন আমাদের কথায় ও কাজে মিল থাকবে। আমরা যদি অন্যের দোষ না খুঁজে নিজেদের চরিত্র ও জ্ঞান দিয়ে বিশ্ব জয় করতে পারি, তবেই আমাদের হৃত গৌরব ফিরে পাওয়া সম্ভব। কেবল ধর্মের গান গেয়ে নয়, বরং ইসলামের প্রকৃত আদর্শ ধারণ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।


এক নজরে বর্তমান মুসলিম বিশ্বের বড় চ্যালেঞ্জসমূহ:

চ্যালেঞ্জবর্তমান অবস্থা
সামাজিকইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা ও ব্যক্তিগত নৈতিকতার অভাব।
রাজনৈতিকমুসলিম দেশগুলোর অনৈক্য ও স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতি।
সাংস্কৃতিকমিডিয়ার মাধ্যমে ছড়ানো ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় ব্যর্থতা।
শিক্ষাগতআধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পশ্চিমাদের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা।

তথ্যসূত্র (Source):

  • আল কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ: ন্যায়বিচার ও ইনসাফ সংক্রান্ত বিধান।
  • আল জাজিরা ও রয়টার্স: ইয়েমেন ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিবেদন।
  • বিডিনিউজ২৪: মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

সরলা দেবী চৌধুরাণী

নিউজ ডেস্ক

April 16, 2026

শেয়ার করুন

লিখেছেন: BDS Bulbul Ahmed

বিভাগ: ইতিহাস ও নারী জাগরণ

উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে যখন বাঙালি নারীদের পরিচয় কেবল অন্তঃপুরের আড়ালে সীমাবদ্ধ ছিল, তখন এক নির্ভীক নারী নিজের মেধা, সৃজনশীলতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে তৈরি করেছিলেন এক স্বতন্ত্র ইতিহাস। তিনি সরলা দেবী চৌধুরাণী—যিনি একাধারে সাহিত্যিক, সমাজসেবী, শিক্ষাবিদ এবং ভারতের প্রথম দিককার নারী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

১. জন্ম ও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রভাব

সরলা দেবীর জন্ম ১৮৭২ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। তাঁর পিতা জানকীনাথ ঘোষাল ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং মাতা স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অগ্রজ প্রখ্যাত সাহিত্যিক। সম্পর্কে কবিগুরু ছিলেন সরলা দেবীর ছোট মামা। ঠাকুরবাড়ির মুক্ত সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক আবহে বড় হওয়া সরলা দেবীর জীবনে ‘রবি মামা’র প্রভাব ছিল অপরিসীম।

২. শিক্ষার আলোকবর্তিকা ও ‘পদ্মাবতী স্বর্ণপদক’

অদম্য মেধাবী সরলা দেবী ১৮৮৬ সালে এন্ট্রান্স পাস করে বেথুন কলেজে ভর্তি হন। ১৮৯০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ বি.এ. পাস করেন। সেই সময় মেয়েদের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় তিনি লাভ করেন মর্যাদাপূর্ণ ‘পদ্মাবতী স্বর্ণপদক’। সে আমলের নারীদের জন্য এটি ছিল এক অভাবনীয় মাইলফলক।

৩. স্বাবলম্বী হওয়ার লড়াই ও ‘লক্ষ্মী ভাণ্ডার’

তৎকালীন উচ্চবিত্ত সমাজের নারীরা জীবিকা অর্জনের কথা চিন্তা না করলেও সরলা দেবী ছিলেন ব্যতিক্রম। পরিবারের অমত সত্ত্বেও তিনি মহীশূরের মহারাণী গার্লস কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। স্বদেশী পণ্য প্রসারের লক্ষ্যে ১৯০৪ সালে তিনি বৌবাজারে স্থাপন করেন ‘লক্ষ্মী ভান্ডার’। এটি কেবল একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল না, বরং স্বদেশী আন্দোলনের একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক স্তম্ভ ছিল।

৪. বন্দেমাতরমের সুরকার ও বিপ্লবী চেতনা

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী গান ‘বন্দেমাতরম’-এর প্রথম স্তবকের সুর দিয়েছিলেন সরলা দেবী চৌধুরাণী। এটি তাঁর দেশপ্রেমের এক অনন্য স্বাক্ষর। এছাড়াও যুবকদের আত্মরক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে তিনি ‘প্রতাপাদিত্য উৎসব’ ও ‘বীরাষ্টমী ব্রত’ পালনের সূচনা করেন। তরবারি চালনা ও লাঠি খেলার প্রচলনের মাধ্যমে তিনি বাঙালি যুবকদের মধ্যে বীরত্ব জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন।

৫. ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল ও নারী আন্দোলন

১৯১০ সালে এলাহাবাদে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল’। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এটিই ছিল ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় নারী সংগঠন। দিল্লি, কানপুর, ইলাহাবাদসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এর শাখা ছড়িয়ে ছিল, যার মাধ্যমে নারীদের হাতের কাজ ও শিক্ষা বিস্তারের কাজ চলত।

৬. মহাত্মা গান্ধী ও ব্যক্তিগত জীবন

১৯০৫ সালে তিনি বিপ্লবী ও সাংবাদিক রামভুজ দত্ত চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং পাঞ্জাবে চলে যান। সেখানে তিনি তাঁর স্বামীর সাথে ‘হিন্দুস্তান’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। জীবনের শেষভাগে তিনি বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর কাছে দীক্ষা নিয়ে আধ্যাত্মিক পথে চলে যান।


বিডিএস পর্যবেক্ষণ: সরলা দেবী কেবল ঠাকুরবাড়ির একজন নক্ষত্র ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন নারীবাদ ও স্বনির্ভরতার মূর্ত প্রতীক। তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবনের ঝরাপাতা’ আজও গবেষকদের কাছে সেই সময়ের ইতিহাসের আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।


এক নজরে সরলা দেবী চৌধুরাণী:

বিষয়তথ্য
জন্ম৯ সেপ্টেম্বর ১৮৭২।
প্রধান পরিচয়সাহিত্যিক, সুরকার ও সমাজ সংস্কারক।
সুরারোপিত গানবন্দেমাতরম (প্রথম স্তবক)।
সংগঠনলক্ষ্মী ভাণ্ডার, ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল।
বিখ্যাত বইজীবনের ঝরাপাতা (আত্মজীবনী), নববর্ষের স্বপ্ন।
মৃত্যু১৮ আগস্ট ১৯৪৫।

তথ্যসূত্র (Source):

  • উইকিপিডিয়া: সরলা দেবী চৌধুরাণী – জীবনী।
  • বাংলাপিডিয়া: চৌধুরানী, সরলাদেবী – জাতীয় জ্ঞানকোষ।
  • অনুশীলন: সরলা দেবী ও ঠাকুরবাড়ির ইতিহাস।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ