ইতিহাস
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: BDS বুলবুল আহমেদ
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে ওসমান পরিবার ও চুনকা পরিবারকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। শামীম ওসমান (আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য) এবং সেলিনা হায়াৎ আইভী (নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র)–এর মধ্যে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত নতুন নয়, বরং এর শেকড় গেঁথে আছে তাঁদের বাবাদের প্রজন্ম থেকে।
বাবাদের প্রজন্মের দ্বন্দ্ব
- ব্রিটিশ আমল থেকে খান সাহেব ওসমান আলীর পরিবার নারায়ণগঞ্জে প্রভাবশালী ছিল।
- পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের ভেতরে আলী আহমেদ চুনকা ও ওসমান আলীর পরিবারের মধ্যে চাপা দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
- ১৯৭২ সালের আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে।
- ১৯৭৩ সালের পৌরসভা নির্বাচনে চুনকা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জেতেন, ওসমান পরিবার নৌকার প্রার্থীকে সমর্থন করলেও হেরে যায়।
- ১৯৮০ সালে জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিয়ে আবার সংঘাত দেখা দেয়; চুনকা সরাসরি শামসুজ্জোহাকে হারিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নেন।
এরশাদ আমলে অবস্থান বদল
- শামসুজ্জোহার দুই ছেলে নাসিম ও সেলিম ওসমান জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন।
- কিন্তু আরেক ছেলে শামীম ওসমান আওয়ামী লীগে থেকে যান এবং ১৯৯৬ সালে প্রথমবার সাংসদ নির্বাচিত হন।
- ২০০১ সালে হেরে বিদেশে চলে যান, ২০০৯ সালে দেশে ফিরে আসেন।
আইভীর উত্থান
- আলী আহমেদ চুনকার মেয়ে সেলিনা হায়াৎ আইভী ২০০৩ থেকে ২০১১ পর্যন্ত পৌরসভার মেয়র ছিলেন।
- ২০১১ সালে পৌরসভা সিটি করপোরেশনে রূপান্তর হলে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেয় শামীম ওসমানকে।
- আইভী স্বতন্ত্র প্রার্থী হন এবং শামীম ওসমানকে হারিয়ে দেশের প্রথম নারী সিটি মেয়র নির্বাচিত হন।
- এরপর থেকেই দুজনের দ্বন্দ্ব তীব্র রূপ নেয়।
সম্পর্কের অবনতি
- শামীম ওসমানের সমর্থকরা আইভীর কুশপুত্তলিকা দাহ করে; শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি স্নায়ুযুদ্ধ।
- ২০১৪ সালে সংসদে শামীম ওসমান প্রকাশ্যে আইভীর সমালোচনা করেন।
- ২০১৬ সালে আইভী অভিযোগ করেন, শামীম বিএনপি প্রার্থীকে পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়েছেন। তবু আইভী নৌকা প্রতীকে জয়লাভ করেন।
- ২০১৮ সালে হকার উচ্ছেদ ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়, পরে আওয়ামী লীগের হস্তক্ষেপে শান্ত হয়।
- সর্বশেষ নির্বাচনেও শামীম ওসমান তৈমুর আলম খন্দকারকে সমর্থন করতে পারেন বলে গুঞ্জন ওঠে। পরে তিনি সংবাদ সম্মেলন করে শুধু বলেন “নৌকার পক্ষে থাকব”, তবে সরাসরি আইভীর নাম উল্লেখ করেননি।
উপসংহার
- শামীম ওসমান: ওসমান পরিবারের প্রভাবশালী প্রতিনিধি, বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য।
- সেলিনা হায়াৎ আইভী: আলী আহমেদ চুনকার কন্যা, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের জনপ্রিয় মেয়র।
অর্থাৎ, তাঁদের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত বাবাদের সময় থেকে, তবে ২০১১ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত রূপ নেয়। এই দ্বন্দ্ব আজও নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে বিভক্ত করে রেখেছে।
সূত্র
- নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাস, বাংলাদেশ প্রতিদিন আর্কাইভ
- স্থানীয় নির্বাচনী ফলাফল ১৯৭৩–২০১৮
- সংসদীয় কার্যবিবরণী ও গণমাধ্যম প্রতিবেদন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশের সময় ও তারিখ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, রাত ১১:৪৭
স্থান: ঢাকা / ইতিহাস ডেস্ক
১৯৪৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে অবিভক্ত বাংলার নোয়াখালী ও ত্রিপুরা (বর্তমান কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া) জেলায় সংঘটিত গণহত্যা ও ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ভারতের রাজনৈতিক গতিপথকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের মাত্র এক বছর আগে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিন (১০ অক্টোবর) শুরু হওয়া এই নজিরবিহীন নৃশংসতা অখণ্ড ভারতের রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে বঙ্গভঙ্গ ও ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনকে ত্বরান্বিত করে।

১. রাজনৈতিক প্রভাব ও বঙ্গভঙ্গের অনুঘটক
১৯৪৬ সালের নোয়াখালী হিন্দু গণহত্যা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে, বিশেষ করে বাঙালি হিন্দুদের মনস্তত্ত্বে এবং বঙ্গভঙ্গের (১৯৪৭) চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক অনুঘটক (Catalyst) হিসেবে কাজ করেছিল।
নিচে এর গভীর রাজনৈতিক প্রভাব এবং কীভাবে এটি বঙ্গভঙ্গকে ত্বরান্বিত করেছিল, তা বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো:
১. অখণ্ড বাংলার ধারণার অবসান
১৯৪৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত শরৎচন্দ্র বসু (কংগ্রেস) এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের (মুসলিম লীগ) মতো নেতারা “স্বাধীন অখণ্ড বাংলা” (United Sovereign Bengal) গঠনের স্বপ্ন দেখছিলেন। তাঁরা চেয়েছিলেন বাংলা যেন ভারত বা পাকিস্তান কোনো দেশেই যোগ না দিয়ে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
কিন্তু নোয়াখালী দাঙ্গার পর এই পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ভেস্তে যায়। নোয়াখালীর নৃশংসতা বাঙালি হিন্দু বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষের মনে এই গভীর প্রত্যয় তৈরি করে যে, মুসলিম লীগ সরকারের অধীনে বা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো স্বাধীন বাংলায় হিন্দুদের জানমালের কোনো নিরাপত্তা থাকবে না। ফলে অখণ্ড বাংলার দাবি চিরতরে চাপা পড়ে যায়।
২. হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের সুরবদল

নোয়াখালী দাঙ্গার আগে কংগ্রেস নীতিগতভাবে ভারতের যেকোনো প্রদেশ ভাগের বিরোধী ছিল। কিন্তু নোয়াখালীর ঘটনার পর ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা তীব্র আন্দোলন শুরু করে। তাদের স্পষ্ট দাবি ছিল—যদি ভারতকে ভাগ করে পাকিস্তান গড়তেই হয়, তবে বাংলাকেও ভাগ করে হিন্দুদের জন্য একটি পৃথক প্রদেশ (পশ্চিমবঙ্গ) তৈরি করতে হবে।
এই আন্দোলনের তীব্রতা দেখে জওহরলাল নেহেরু এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মতো শীর্ষ কংগ্রেস নেতারাও বুঝতে পারেন যে, হিন্দুদের সুরক্ষার জন্য বাংলা ভাগ অনিবার্য। ফলে কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে দেশভাগ এবং বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব মেনে নেয়।
৩. লীগ সরকারের নিষ্ক্রিয়তা ও আস্থার সংকট
তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মুসলিম লীগ সরকার নোয়াখালীর দাঙ্গা দমনে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিল। দাঙ্গা শুরু হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর পর্যন্ত সেখানে পুলিশ বা সামরিক বাহিনী পাঠানো হয়নি, এমনকি গণমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করে খবর চেপে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল।
লীগ সরকারের এই পক্ষপাতদুষ্ট ও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা ব্রিটিশ রাজপুরুষদের (যেমন বাংলার গভর্নর ফ্রেডরিক বারোজ) এবং কংগ্রেস নেতৃত্বের কাছে এটি প্রমাণ করে যে, অবিভক্ত বাংলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। এটি লর্ড মাউন্টব্যাটেনের দেশভাগের পরিকল্পনাকে দ্রুত বাস্তবায়নে সহায়তা করে।
৪. সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক বিভাজনের রূপরেখা (Radcliffe Line)
নোয়াখালীর ঘটনার পর বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে তীব্র দেশভাগের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়, যা ১৯৪৭ সালের জুন-জুলাই মাসে ‘Boundary Commission’ বা সীমানা নির্ধারণী কমিশনের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে। হিন্দু প্রধান জেলাগুলোকে ভারতের (পশ্চিমবঙ্গ) অন্তর্ভুক্ত করার এবং মুসলিম প্রধান জেলাগুলোকে পাকিস্তানের (পূর্ব পাকিস্তান) অন্তর্ভুক্ত করার যে মানচিত্র স্যার সিরিল র্যাডক্লিফ তৈরি করেছিলেন, তার পেছনে নোয়াখালী ও কলকাতার দাঙ্গার ভয়াবহ স্মৃতি সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি ছিল।
২. মহাত্মা গান্ধীর ঐতিহাসিক শান্তি মিশন

১৯৪৬ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ১৯৪৭ সালের ২ মার্চ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় চার মাস ব্যাপী মহাত্মা গান্ধীর নোয়াখালী সফর ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, মানবিক এবং ঐতিহাসিক শান্তি মিশন। ব্রিটিশ ভারতের চূড়ান্ত মুহূর্তে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প রুখতে তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার রাজনীতি ছেড়ে সাধারণ মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
এই ঐতিহাসিক শান্তি মিশনের মূল দিকগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. মিশনের পটভূমি ও গান্ধীজির আগমন
১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর (কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিন) নোয়াখালীতে ভয়াবহ হিন্দু গণহত্যা ও সহিংসতা শুরু হয়। চারদিকে যখন ব্যাপক লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের খবর ছড়াচ্ছিল, তখন দিল্লির রাজনৈতিক আলোচনা ফেলে গান্ধীজি বাংলায় আসার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪৬ সালের ৭ নভেম্বর তিনি নোয়াখালীর চৌমুহনীতে পৌঁছান। তাঁর আগমনের মূল উদ্দেশ্য ছিল দুটি:
- হিন্দুদের মন থেকে মৃত্যুর ভয় দূর করে নিজ ভিটেমাটিতে ধরে রাখা।
- মুসলিমদের মধ্যে অনুশোচনা ও অপরাধবোধ জাগ্রত করে সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনা।
২. “একাকী পথ চলো” এবং গ্রামীন পদযাত্রা
গান্ধীজি নোয়াখালীতে কোনো রাজনৈতিক প্রোটোকল বা সশস্ত্র নিরাপত্তা নেননি। তাঁর এই সফরটি ছিল সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক।
- খালি পায়ে পদযাত্রা: ১৯৪৭ সালের ২ জানুয়ারি থেকে তিনি নোয়াখালীর গ্রামগুলোতে খালি পায়ে হাঁটা শুরু করেন। তীব্র শীতের মধ্যে প্রায় ১১৬ মাইল পথ হেঁটে তিনি ৪৭টি প্রত্যন্ত গ্রাম পরিদর্শন করেন (যার মধ্যে শ্রীরামপুর, চণ্ডীপুর, জয়াগ ও রামগঞ্জ উল্লেখযোগ্য)।
- সহযোগীদের বিকেন্দ্রীকরণ: গান্ধীজি তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত অনুসারীদের (যেমন সুশীলা নায়ার, আভা গান্ধী, কানাইলাল ভট্টাচার্য) একসাথে না রেখে নির্দেশ দেন ভিন্ন ভিন্ন দাঙ্গাকবলিত গ্রামে একা একা গিয়ে থাকতে। তাঁদের কাজ ছিল স্থানীয় মুসলিমদের সাথে যোগাযোগ করা এবং হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। গান্ধীজি নিজে শ্রীরামপুর গ্রামে একটি ভাঙা বাড়িতে একা প্রায় দেড় মাস অবস্থান করেন।
৩. দৈনন্দিন রুটিন ও প্রার্থনা সভা
গান্ধীজির নোয়াখালীর দিনলিপি ছিল অত্যন্ত কঠোর ও নিয়মতান্ত্রিক:
- ভোরবেলা পদযাত্রা ও জনসংযোগ: প্রতিদিন ভোরে তিনি এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতেন। পথিমধ্যে দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি দেখতেন, ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলতেন এবং অশ্রু মুছিয়ে দিতেন।
- সর্বধর্ম প্রার্থনা সভা: প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি উন্মুক্ত স্থানে প্রার্থনা সভার আয়োজন করতেন। সেখানে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ সমবেত হতো। সভায় গীতা, কোরআন এবং বাইবেলের বাণী পাঠ করা হতো। তিনি তাঁর বক্তৃতায় বলতেন, “ঈশ্বর আর আল্লাহ একই শক্তি, একে অপরের ওপর অত্যাচার করা ঈশ্বরের অবমাননা।”
৪. স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও প্রতিকূলতা
গান্ধীজির এই মিশন মোটেও মসৃণ ছিল না, তাঁকে চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল:
- উগ্রপন্থীদের প্রতিবন্ধকতা: গোলাম সারোয়ার হুসাইনীর অনুসারী এবং মুসলিম লীগের কট্টরপন্থীরা গান্ধীজির এই শান্তি মিশনকে “হিন্দুদের রাজনৈতিক চাল” হিসেবে প্রচার করে। অনেক গ্রামে তাঁর হাঁটার রাস্তায় মানুষের মলমূত্র, কাচ এবং কাঁটা বিছিয়ে রাখা হতো। তিনি নিজ হাতে সেই নোংরা পরিষ্কার করে এগিয়ে যেতেন।
- সাধারণ মানুষের মন জয়: তাঁর এই অসীম ধৈর্য ও অহিংস মনোভাব ধীরে ধীরে স্থানীয় সাধারণ মুসলিমদের মন জয় করে। অনেক মুসলিম পরিবার তাঁর সভায় যোগ দিতে শুরু করে এবং নিজ প্রতিবেশীদের সুরক্ষার দায়িত্ব নেয়।
৫. জয়াগ আশ্রম প্রতিষ্ঠা (স্থায়ী স্মৃতি)
নোয়াখালীর জয়াগ গ্রামের জমিদার ও প্রথম বাঙালি ব্যারিস্টার হেমন্ত কুমার ঘোষ গান্ধীজির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি ও জমি গান্ধীজিকে দান করেন। ১৯৪৭ সালের ২৯ জানুয়ারি গান্ধীজি নিজ হাতে সেখানে ‘আম্বিকা কালিগঙ্গা চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’ গঠন করেন, যা পরবর্তীতে “নোয়াখালী গান্ধী আশ্রম” হিসেবে পরিচিতি পায়। এই আশ্রমটি আজও বাংলাদেশে মহাত্মা গান্ধীর শান্তি, অহিংসা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।
৬. মিশনের সমাপ্তি ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন
১৯৪৭ সালের ২ মার্চ বিহারে পুনরায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার খবর পেয়ে গান্ধীজি নোয়াখালী ত্যাগ করেন। যদিও এই মিশন দাঙ্গার ক্ষত পুরোপুরি নিরাময় করতে পারেনি বা দেশভাগ ঠেকাতে পারেনি, তবুও ঐতিহাসিকদের মতে, গান্ধীজির এই একক প্রচেষ্টার ফলেই নোয়াখালীতে বড় ধরনের দ্বিতীয় দাঙ্গা রদ করা সম্ভব হয়েছিল। মাউন্টব্যাটেন গান্ধীজির এই ভূমিকাকে মূল্যায়ন করে লিখেছিলেন—“The One-Man Boundary Force who kept the peace where 50,000 soldiers failed.” (যেখানে ৫০,০০০ সৈন্য ব্যর্থ হয়েছিল, সেখানে একাকী এক ব্যক্তি শান্তি বজায় রেখেছিলেন)।
৩. তৎকালীন গণমাধ্যমের সাহসিক ভূমিকা
১৯৪৬ সালের নোয়াখালী গণহত্যার সময় তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের জাতীয়তাবাদী ও স্বাধীনচেতা গণমাধ্যমগুলো (মূলত কলকাতাভিত্তিক সংবাদপত্র) যে সাহসী ও আপসহীন ভূমিকা পালন করেছিল, তা ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগ সরকার যখন এই সহিংসতার খবর ধামাচাপা দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, তখন এই সংবাদপত্রগুলো নিজেদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে সত্য উন্মোচন করেছিল।
তৎকালীন গণমাধ্যমের সেই ঐতিহাসিক ও সাহসী ভূমিকার বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সরকারি বিধিনিষেধ ও সেন্সরশিপ অমান্য করা
দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সরকার নোয়াখালী ও ত্রিপুরার বাস্তব পরিস্থিতি বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ আড়াল করতে কঠোর প্রেস সেন্সরশিপ বা “জরুরি সংবাদ নিয়ন্ত্রণ আইন” জারি করে। সংবাদপত্রে দাঙ্গার ছবি, সুনির্দিষ্ট এলাকার নাম বা হতাহতের সঠিক সংখ্যা প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু দ্য অমৃত বাজার পত্রিকা, যুগান্তর এবং আনন্দবাজার পত্রিকার মতো গণমাধ্যমগুলো এই আইনি হুমকি ও লাইসেন্স বাতিলের ঝুঁকি উপেক্ষা করে সাহসের সাথে সত্য প্রকাশ করে যেতে থাকে।
২. যুদ্ধক্ষেত্রের মতো ঝুঁকি নিয়ে মাঠপর্যায়ের রিপোর্টিং
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এবং চরম বিপজ্জনক নোয়াখালীর প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে সংবাদদাতাদের পাঠানো ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তা সত্ত্বেও বেশ কয়েকজন সাহসী সাংবাদিক ছদ্মবেশে এবং স্থানীয়দের সহায়তায় দাঙ্গাকবলিত এলাকায় প্রবেশ করেন:
- দ্য স্টেটস ম্যান (The Statesman): এই ইংরেজি দৈনিকটির তৎকালীন সম্পাদক ইয়ান স্টিফেনসন (Ian Stephens) নোয়াখালীর ভয়াবহতার সচিত্র বিবরণ প্রকাশে সবচেয়ে সাহসী ভূমিকা নেন। তাঁর নির্দেশে বিশেষ প্রতিনিধিরা দুর্গম এলাকায় গিয়ে জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ এবং নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের লোমহর্ষক বাস্তব চিত্র তুলে আনেন।
- অমৃত বাজার পত্রিকা (Amrita Bazar Patrika): এই পত্রিকার প্রতিনিধিরা মাঠপর্যায় থেকে তথ্য এনে ১৯৪৬ সালের ২৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে প্রকাশ করেন যে, প্রায় ১২০টি গ্রাম দাঙ্গাবাজদের দ্বারা অবরুদ্ধ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তারা সরাসরি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, এটি কোনো সাধারণ দাঙ্গা নয়, বরং সুপরিকল্পিত জাতিগত নিধনযজ্ঞ।
৩. সম্পাদকীয়র মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্তরে দৃষ্টি আকর্ষণ
শুধুমাত্র সংবাদ প্রকাশই নয়, এই পত্রিকাগুলো অত্যন্ত ঝাঁঝালো সম্পাদকীয় (Editorial) লিখে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসন এবং ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল:
- সংবাদপত্রগুলো লর্ড ওয়াভেলের কাছে সরাসরি প্রশ্ন তোলে যে, যখন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে ও বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, তখন ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী কেন নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
- কলকাতার সংবাদপত্রগুলোর এই অবিরাম লেখার ফলেই মূলত ভারতের তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান জওহরলাল নেহরু এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল নোয়াখালীর ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন এবং ব্রিটিশ সরকারকে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করেন।
৪. মহাত্মা গান্ধীর আগমন ত্বরান্বিত করা
গণমাধ্যমের এই সাহসী ও ধারাবাহিক প্রতিবেদনের কারণেই নোয়াখালীর মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র মহাত্মা গান্ধীর কাছে পৌঁছায়। ১৯৪৬ সালের অক্টোবরের শেষার্ধে পত্রিকার পাতাগুলো ওল্টালেই যখন পূর্ববঙ্গের আর্তনাদের চিত্র ফুটে উঠছিল, তখন গান্ধীজি দিল্লির রাজনৈতিক এজেন্ডা স্থগিত রেখে নোয়াখালীতে তাঁর ঐতিহাসিক শান্তি মিশন শুরু করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
৫. ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে জনমত গঠন
তৎকালীন সংবাদপত্রগুলো কেবল খবরই প্রকাশ করেনি, তারা দুর্গতদের জন্য তহবিল গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। লীলা রায়ের উদ্ধার অভিযান এবং ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের ত্রাণ তৎপরতার বিবরণ প্রতিনিয়ত ছেপে সাধারণ মানুষকে সাহায্য করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। এর ফলে কলকাতা ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ ত্রাণ সামগ্রী নোয়াখালীতে পাঠানো সম্ভব হয়েছিল।
৪. নারী নেত্রী লীলা রায়ের সাহসিক উদ্ধার অভিযান
১৯৪৬ সালের নোয়াখালী গণহত্যার অন্ধকারতম দিনগুলোতে নারী নেত্রী লীলা রায়ের (নাগ) সাহসিক উদ্ধার অভিযান ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে নারী নেতৃত্বের অন্যতম এক বীরত্বপূর্ণ ও গৌরবময় অধ্যায়। যখন নোয়াখালীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল, তখন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসের এই ঘনিষ্ঠ সহযোগী নিজের জীবনের পরোয়া না করে দাঙ্গাকবলিত এলাকায় প্রবেশ করেছিলেন।

লীলা রায়ের সেই ঐতিহাসিক ও রোমাঞ্চকর উদ্ধার অভিযানের মূল দিকগুলো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. দ্রুত সাড়া ও ‘ন্যাশনাল সার্ভিস ইনস্টিটিউট’ গঠন
১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর কলকাতার সংবাদপত্রগুলোতে যখন পূর্ববঙ্গের নারীদের ওপর নির্যাতন, অপহরণ ও জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের খবর আসতে শুরু করে, তখন লীলা রায় ঘরে বসে থাকতে পারেননি। তিনি অবিলম্বে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মীদের সংগঠিত করেন। দুর্গতদের উদ্ধার ও পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে তিনি দ্রুত ‘ন্যাশনাল সার্ভিস ইনস্টিটিউট’ (NSI) নামে একটি লড়াকু স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করেন।
২. দুর্গম ও বিপজ্জনক অঞ্চলে পদযাত্রা
মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালী পৌঁছানোর আগেই, ১৯৪৬ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে লীলা রায় তাঁর দল নিয়ে নোয়াখালীতে প্রবেশ করেন। তৎকালীন নোয়াখালীর রামগঞ্জ, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর ও বেগমগঞ্জের মতো থানাগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা দাঙ্গাবাজরা সম্পূর্ণ কেটে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।
- ৯০ মাইলের দুঃসাহসিক সফর: লীলা রায় এবং তাঁর নারী ও পুরুষ স্বেচ্ছাসেবকদের দলটি কোনো সামরিক বা পুলিশি নিরাপত্তা ছাড়াই পায়ে হেঁটে প্রায় ৯০ মাইল পথ পাড়ি দেন।
- ভাঙা রাস্তা, জঙ্গল এবং দাঙ্গাকারীদের সার্বক্ষণিক হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে তিনি চৌমুহনী থেকে শুরু করে একেবারে উপদ্রুত অঞ্চলের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত প্রতিটি গ্রামে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
৩. ১,৩০৭ জন নারীকে উদ্ধার ও আইনি লড়াই
লীলা রায়ের এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল অপহৃত, জোরপূর্বক বিবাহিত এবং অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা হিন্দু নারীদের মুক্ত করা।
- সরাসরি সংঘাত ও উদ্ধার: তিনি উগ্রপন্থীদের আস্তানা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের বাড়ি অবরুদ্ধ করে, কখনো স্থানীয় প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, আবার কখনো সরাসরি সাহসের সাথে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ১,৩০৭ জন অপহৃত ও ধর্মান্তরিত নারীকে উদ্ধার করেন।
- সাক্ষ্য প্রদান ও আইনি সুরক্ষা: তিনি কেবল নারীদের উদ্ধারই করেননি, বরং অপরাধীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের এবং ভুক্তভোগী নারীদের আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করেন। তাঁর এই কঠোর অবস্থানের কারণে স্থানীয় দাঙ্গাবাজ চক্রের মধ্যে এক ধরনের ভীতির সৃষ্টি হয়েছিল।
৪. ১৭টি ত্রাণ শিবির ও ‘মনস্তাত্ত্বিক’ পুনর্বাসন
উদ্ধারকৃত নারীদের সামাজিক ও মানসিকভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে ধর্মান্তরিত বা নির্যাতিত নারীদের সহজে গ্রহণ করা হতো না।
- লীলা রায় নোয়াখালী জুড়ে ১৭টি বৃহৎ ত্রাণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করেন।
- এই কেন্দ্রগুলোতে নারীদের কেবল আশ্রয়, অন্ন ও বস্ত্রই দেওয়া হয়নি, বরং তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে লাঠিখেলা, ছুরি চালানো এবং আত্মরক্ষার প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
- তিনি সমাজকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, এই নারীরা অপরাধী নন, বরং পরিস্থিতির শিকার; ফলে তাদের সসম্মানে পরিবারে ফিরিয়ে নিতে হবে।
৫. গান্ধীজির সাথে সমন্বয় ও স্বীকৃতি
মহাত্মা গান্ধী যখন ৭ নভেম্বর নোয়াখালীতে পৌঁছান, তখন লীলা রায় তাঁর কাজের বিবরণ ও উদ্ধারকৃত নারীদের কেস স্টাডি গান্ধীজির সামনে তুলে ধরেন। গান্ধীজি লীলা রায়ের এই অদম্য সাহস এবং সাংগঠনিক দক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। পরবর্তীতে বিশিষ্ট সমাজকর্মী সুহাসিনী দাসসহ বহু নারী কর্মী লীলা রায়ের তৈরি করা এই শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নোয়াখালীতে দীর্ঘমেয়াদী কাজ চালিয়ে যান।
৫. শরণার্থী সংকট ও চিরতরে বদলে যাওয়া জনমিতি
১৯৪৬ সালের নোয়াখালী গণহত্যা এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী ও স্থায়ী সামাজিক পরিণতি ছিল ব্যাপক শরণার্থী সংকট এবং পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) জনমিতির (Demography) চিরতরে বদলে যাওয়া। এই সহিংসতা কয়েক শতক ধরে গড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানকে ধ্বংস করে এক বিশাল জনসংখ্যাগত শূন্যতা তৈরি করেছিল।
এই শরণার্থী সংকট এবং তার ফলে সৃষ্ট স্থায়ী জনমিতিক পরিবর্তনের বিবরণ নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. অভূতপূর্ব শরণার্থী সংকট (The Refugee Crisis)
দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর জীবন ও ধর্ম রক্ষার্থে নোয়াখালী ও ত্রিপুরা জেলা থেকে বাঙালি হিন্দুদের এক অভূতপূর্ব ও গণ-দেশত্যাগ (Exodus) শুরু হয়।
- শরণার্থীর সংখ্যা: তৎকালীন সরকারি ও বেসরকারি হিসাব মতে, দাঙ্গার প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৭৫,০০০ হিন্দু মানুষ সম্পূর্ণ বাস্তুচ্যুত হন।
- প্রধান আশ্রয়স্থল: শরণার্থীরা প্রধানত পার্শ্ববর্তী করদ রাজ্য ত্রিপুরা (আগরতলা), আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা ও অসমাপ্ত জেলাগুলোতে আশ্রয় নেন। তৎকালীন ত্রিপুরার মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য তাঁর রাজ্যে আসা হাজার হাজার নোয়াখালীর শরণার্থীদের জন্য বিশেষ আশ্রয় শিবির খোলেন এবং রাজকোষ থেকে ত্রাণের ব্যবস্থা করেন।
- মানসিক আঘাত বা ট্রমা: এই শরণার্থীরা কেবল ঘরবাড়িই হারাননি, বরং জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ, পৈতা কেটে ফেলা, শাঁখা ভেঙে ফেলা এবং গোমাংস ভক্ষণে বাধ্য করার মতো গভীর মনস্তাত্ত্বিক ট্রমার শিকার হয়েছিলেন, যা তাঁদের নিজ ভূমিতে ফিরে আসার আত্মবিশ্বাস চিরতরে কমিয়ে দিয়েছিল।
২. ১৯৪৭-এর দেশভাগ ও মধ্যবিত্তের দেশত্যাগ
১৯৪৬ সালের এই ক্ষত শুকানোর আগেই ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারতের বিভাজন এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্ম হয়। নোয়াখালীর দাঙ্গার স্মৃতি হিন্দুদের মনে যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছিল, তার ফলে দেশভাগের পর দেশত্যাগের গতি আরও তীব্র হয়।
- নোয়াখালী অঞ্চলের শিক্ষিত, পেশাজীবী এবং জমিদার শ্রেণীর উচ্চবর্ণের হিন্দুরা (যেমন ডাক্তার, আইনজীবী, শিক্ষক ও ব্যবসায়ী) তাঁদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ফেলে বা নামমাত্র মূল্যে বিনিময় করে পশ্চিমবঙ্গে চলে যান।
- এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানের এই অঞ্চলে এক বিরাট সামাজিক ও অর্থনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, যা স্থানীয় সামাজিক ভারসাম্যকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
৩. ঐতিহাসিক বনাম বর্তমান জনমিতি (Structural Demographic Shift)
নোয়াখালী ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের জনসংখ্যার ধর্মীয় অনুপাত এই দাঙ্গা এবং তার পরবর্তী দশকগুলোর ধারাবাহিক অভিবাসনের কারণে সম্পূর্ণ উল্টে যায়:
- ব্রিটিশ আমলের জনমিতি (১৯৪১ সালের আদমশুমারি): ১৯৪১ সালের শুমারি অনুযায়ী, অবিভক্ত নোয়াখালী জেলায় মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২২ লক্ষাধিক, যার মধ্যে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৮% থেকে ২০%। কিছু সুনির্দিষ্ট পকেট বা থানা যেমন রামগঞ্জ, রায়পুর ও লক্ষ্মীপুরে হিন্দুদের অনুপাত আরও অনেক বেশি ছিল।
- পাকিস্তান আমলের জনমিতি (১৯৫১ ও ১৯৬১): ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা এবং পরবর্তীতে ১৯৫০ সালের পূর্ব পাকিস্তান দাঙ্গার পর এই হার দ্রুত কমতে থাকে। ১৯৬১ সালের মধ্যে নোয়াখালীতে হিন্দুদের জনসংখ্যা একক অঙ্কে (Single Digit) নেমে আসে।
- বর্তমান জনমিতি (২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে): পুরোনো নোয়াখালী জেলাটি বর্তমানে তিনটি প্রশাসনিক জেলায় (নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর) বিভক্ত। বাংলাদেশের সর্বশেষ শুমারি ও জনমিতিক উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলে বর্তমান হিন্দু জনসংখ্যা হ্রাস পেয়ে মাত্র ৪% থেকে ৫% এর কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। নোয়াখালীর যেসব গ্রাম একসময় দুর্গাপূজা, শাঁখারি শিল্প এবং হিন্দু সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল, সেগুলোর সিংহভাগই এখন সম্পূর্ণ মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকায় পরিণত হয়েছে।
৪. মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন
এই জনমিতিক পরিবর্তনের ফলে নোয়াখালী অঞ্চলের কয়েক শত বছরের পুরোনো মিশ্র সংস্কৃতি (Syncretic Culture) বিলুপ্ত হয়ে যায়। রায়বাহাদুর, জমিদার এবং প্রাচীন হিন্দু পরিবারগুলোর পরিত্যক্ত বিশাল বাড়িগুলো (যেমন দাসের বাড়ি, ঘোষের বাড়ি) কালের বিবর্তনে শত্রু সম্পত্তি (পরবর্তীতে অর্পিত সম্পত্তি) আইনে সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে যায় অথবা বেদখল হয়ে যায়। নোয়াখালীর জয়াগে অবস্থিত গান্ধী আশ্রমটি বর্তমানে এই অঞ্চলের সেই প্রাচীন বৈচিত্র্যময় ইতিহাসের এক নিঃসঙ্গ স্মারক হিসেবে টিকে আছে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): শিক্ষা ও ইতিহাস / বাংলাদেশ
- প্রকাশের তারিখ: ২৭ আগস্ট, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): জাতীয় তথ্য বাতায়ন, জেলা রেকর্ড ও ঐতিহাসিক শিক্ষাসংক্রান্ত নথি
উপমহাদেশে আধুনিক ইংরেজি শিক্ষা ও বিজ্ঞান চর্চার মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে। তৎকালীন জেলাভিত্তিক শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ঐতিহাসিক ‘জিলা স্কুল’ ও ‘কলেজিয়েট স্কুল’ সমূহ।
শতবর্ষের প্রাচীর টপকে আজও ঐতিহ্য ও শিক্ষার আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় প্রাচীন সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো।

বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন সরকারি স্কুল: রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল (১৮২৮)

বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবস্থিত সর্বপ্রাচীন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় হলো রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল।
- প্রতিষ্ঠাকাল: ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দ।
- প্রারম্ভিক ইতিহাস: এটি প্রথমে ‘বোয়ালিয়া ইংলিশ স্কুল’ (Boalia English School) নামে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে ১৮৩৬ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংকের আমলে সরকার এটি অধিগ্রহণ করে সরকারি রূপ দেয়।
- নামকরণ: ১৮৭৩ সালে এই স্কুলের সাথে কলেজ শাখা যুক্ত করা হলে এর নতুন নামকরণ হয় ‘রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল’। এখান থেকেই পরবর্তীতে বিখ্যাত ‘রাজশাহী কলেজ’-এর উৎপত্তি ঘটে।
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ৭টি প্রাচীন জিলা স্কুল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
| প্রতিষ্ঠানের নাম | প্রতিষ্ঠার বছর | ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বিশেষত্ব |
| বরিশাল জিলা স্কুল | ১৮২৯ | বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন জিলা স্কুল। মি. এন. ডব্লিউ গ্যারেটের উদ্যোগে ‘বরিশাল ইংলিশ স্কুল’ নামে শুরু হয়। ১৮৫৩ সালে এটি সরকারি জিলা স্কুলের মর্যাদা পায়। |
| রংপুর জিলা স্কুল | ১৮৩২ | লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক কর্তৃক “জমিদারদের স্কুল” হিসেবে ভিত্তিস্থাপন। পরবর্তীতে কোচবিহারের রাজার অর্থায়নে স্থায়ী ভবন তৈরি হয়। |
| ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল | ১৮৩৫ | ঢাকা অঞ্চলের প্রথম সরকারি হাই স্কুল। ‘ঢাকা ইংলিশ সেমিনারি’ নামে বুড়িগঙ্গার তীরে নীলকুঠির বাংলোতে এর ক্লাস শুরু হয়েছিল। |
| কুমিল্লা জিলা স্কুল | ১৮৩৭ | ইংরেজ শিক্ষক এইচ জি লেজিস্টার এটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজেই প্রথম প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। |
| যশোর জিলা স্কুল | ১৮৩৮ | ৩ ফেব্রুয়ারি ‘যশোর মডেল স্কুল’ নামে যাত্রা শুরু। বিখ্যাত বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। |
| নোয়াখালী জিলা স্কুল | ১৮৫০ | নদীভাঙনের সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকার ইতিহাস। মেঘনার ভাঙনে বহুবার স্থানান্তরিত হয়ে ১৯৫৩ সালে বর্তমান মাইজদীতে স্থায়ী রূপ পায়। |
| ময়মনসিংহ জিলা স্কুল | ১৮৫৩ | ১৮৪৬ সালে ‘হার্ডিঞ্জ স্কুল’ নামে শুরু হয়। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর পিতা ভগবানচন্দ্র বসু এর প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন। |
কেন জিলা স্কুলগুলো শিক্ষার ইতিহাসে অনন্য?
- শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি: তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষার সমন্বয়ে আধুনিক মেধা তৈরিতে এসব প্রতিষ্ঠান মূল ভূমিকা রেখেছিল।
- ঐতিহাসিক অবদান: এই বিদ্যালয়গুলোর আঙিনা থেকে উঠে এসেছেন বহু কালজয়ী বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ ও গবেষক, যাঁরা ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
সম্পাদনা ও গবেষণা: ইতিহাস ও গবেষণা বিভাগ
প্রকাশের তারিখ: ২৭ আগস্ট, ২০২৬
প্রকাশের সময়: দুপুর ১২:৩০ মিনিট (বিএসটি)
মূল বিষয়শ্রেণী (Category): ইতিহাস ও ঐতিহ্য / রাজনীতি / বাংলাদেশ
অবিভক্ত বাংলার মুসলিম সমাজকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে, শিক্ষা বিস্তার ও অধিকার আদায়ে যাঁর ভূমিকা সবচেয়ে অগ্রণী, তিনি নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ। ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি মাত্র ৪৪ বছর বয়সে কলকাতার চৌরঙ্গী রোডের নিজ বাসভবনে তিনি হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যু সাধারণ অসুস্থতা নাকি কোনো গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র—তা নিয়ে আজও ইতিহাসে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা-কল্পনা রয়েছে।
কীভাবে মারা গিয়েছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ? (মৃত্যু ও রহস্য)
সরকারি ও চিকিৎসাগত রেকর্ডে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদরোগ বা স্ট্রোক উল্লেখ করা হলেও, সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও পারিপার্শ্বিক ঘটনার কারণে তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিষ প্রয়োগের শক্ত সন্দেহ ঘনীভূত হয়:
নবাব সলিমুল্লাহ ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতার চৌরঙ্গী রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে মারা যান। প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসে তাঁর মৃত্যুকে স্বাভাবিক বা অসুস্থতাজনিত বলা হলেও, সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ঘটনার আকস্মিকতার কারণে তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে বিষপ্রয়োগে হত্যাকাণ্ড বা গভীর ষড়যন্ত্রের জোরালো গুঞ্জন রয়েছে।
মৃত্যুর ঘটনা ও প্রধান রহস্যসমূহ
- আকস্মিক অসুস্থতা ও গুঞ্জন: মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত নবাব সুস্থ ছিলেন। মৃত্যুর দিন রাতে হঠাৎ তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং দ্রুতই তাঁর মৃত্যু হয়। সমসাময়িক রাজনৈতিক মহলে এবং পরবর্তী সময়ে বহু গবেষকের লেখায় দাবি করা হয়, ব্রিটিশদের কোনো গোপন নীলনকশার অংশ হিসেবে অথবা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দ্বারা তাঁকে খাবারে বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
- রাজনৈতিক বিরোধের প্রেক্ষাপট: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ নবাব সলিমুল্লাহর একক প্রচেষ্টায় সফল হয়েছিল। কিন্তু ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার হিন্দুদের তীব্র আন্দোলনের মুখে মুসলিমদের স্বার্থ উপেক্ষা করে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করে। এর ফলে ব্রিটিশ সরকারের সাথে নবাবের চরম বিরোধ তৈরি হয়। তিনি ব্রিটিশদের দেওয়া ‘জি.সি.আই.ই’ (GCIE) উপাধি বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং বড় ধরনের ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, যা ব্রিটিশদের জন্য উদ্বেগের কারণ ছিল।
- মরদেহ নিয়ে চরম গোপনীয়তা: ১৯১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি নবাবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী খাজা শামসুল হকের ডায়েরির বিবরণ থেকে জানা যায়, নবাবের মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ পরিবারের কোনো সদস্য বা স্বজনদের স্পর্শ করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি মৃত্যুর পর তাঁর মুখমণ্ডল দেখতেও বাধা দেওয়া হয়েছিল।
- কঠোর নিরাপত্তা ও জানাজা: কলকাতা থেকে বিশেষ স্টিমারে করে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও কঠোর পুলিশি পাহারায় তাঁর মরদেহ ঢাকায় আনা হয়। সাধারণ মানুষকে মরদেহ দেখতে দেওয়া হয়নি এবং অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে ঢাকার বেগমবাজারে জানাজা শেষে তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে (উর্দু রোড) দাফন করা হয়।
- সশস্ত্র পাহারা: দাফনের পর প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত নবাব সলিমুল্লাহর কবরটি সশস্ত্র গুর্খা সৈন্য এবং ব্রিটিশ পুলিশ দিয়ে দিন-রাত পাহারা দেওয়া হয়েছিল, যা একটি স্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে অত্যন্ত নজিরবিহীন। ধারণা করা হয়, ময়নাতদন্তের জন্য কেউ যেন লাশ চুরি বা উত্তোলন করতে না পারে, সেজন্যই এই পাহারা বসানো হয়েছিল।
যদিও ব্রিটিশ সরকার বা তৎকালীন তদন্তে এই মৃত্যুকে হৃদরোগ বা স্বাভাবিক অসুস্থতা হিসেবে ফাইল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তবুও এই ঐতিহাসিক উপাত্ত ও অস্বাভাবিক ঘটনাগুলোর কারণে আজও নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুকে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বা অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে গণ্য করা হয়।
পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠন
পূর্ববঙ্গ ও আসাম (Eastern Bengal and Assam) ছিল ব্রিটিশ ভারতের একটি স্বল্পস্থায়ী প্রদেশ, যা ১৯০৫ সালের ঐতিহাসিক বঙ্গভঙ্গ (Partition of Bengal) আন্দোলনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল। নবাব স্যার সলিমুল্লাহর একক প্রচেষ্টা এবং মুসলিম সমাজের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই নতুন প্রদেশটি আত্মপ্রকাশ করে।
নিচে এই প্রদেশ গঠনের পটভূমি, কাঠামো এবং এর প্রভাব বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. প্রদেশ গঠনের পটভূমি ও কারণ
- প্রশাসনিক বিশালতা: অবিভক্ত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি (বাংলা, বিহার ও ওড়িশা) ছিল আয়তনে বিশাল এবং এর জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৮৫ লাখ। একজন গভর্নরের পক্ষে এই বিশাল অঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা ও শাসনভার পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
- পূর্ববঙ্গের অবহেলা ও অনগ্রসরতা: তৎকালীন সমস্ত সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কলকারখানা ছিল কলকাতা-কেন্দ্রিক। ফলে পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) অর্থনীতি, শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা চরমভাবে ভেঙে পড়েছিল।
- নবাব সলিমুল্লাহর ভূমিকা: ১৯০৪ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন ঢাকা সফরে এলে নবাব সলিমুল্লাহ পূর্ববঙ্গের মানুষের দুর্দশা তুলে ধরেন। তিনি জোরালো যুক্তি দেখান যে, ঢাকাকে কেন্দ্র করে আলাদা প্রদেশ না হলে এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন সম্ভব নয়।
২. প্রদেশ গঠন ও ভৌগোলিক কাঠামো (১৯০৫)
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর লর্ড কার্জনের চূড়ান্ত আদেশে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে বিভক্ত করে নতুন প্রদেশ ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ গঠন করা হয়।
- ভৌগোলিক এলাকা: ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিভাগ, মালদহ, ত্রিপুরা এবং সমগ্র আসাম অঞ্চল নিয়ে এই প্রদেশ গঠিত হয়।
- রাজধানী ও জনসংখ্যা: নতুন প্রদেশের রাজধানী করা হয় ঢাকা এবং গ্রীষ্মকালীন রাজধানী করা হয় আসামের শিলংকে। প্রদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ৩ কোটি ১০ লাখ, যার মধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখ ছিলেন মুসলিম এবং ১ কোটি ২০ লাখ ছিলেন হিন্দু। ফলে এটি একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে পরিণত হয়।
- প্রথম গভর্নর: স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার (Sir Bampfylde Fuller) এই নতুন প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন।
৩. নতুন প্রদেশের প্রভাব ও উন্নয়ন
প্রদেশটি গঠিত হওয়ার পর মাত্র ৬ বছরে পূর্ববঙ্গে ব্যাপক পরিবর্তন আসে:
- ঢাকার আধুনিকায়ন: দীর্ঘকাল পর ঢাকা পুনরায় রাজধানীর মর্যাদা পাওয়ায় এখানে কার্জন হল, হাইকোর্ট ভবন, সেক্রেটারিয়েট (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ অংশ) এবং গভর্নমেন্ট হাউস নির্মিত হয়। ঢাকার রাস্তাঘাট ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে।
- শিক্ষার প্রসার: পূর্ববঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল, কলেজ এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মুসলিম সমাজের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ এক লাফে অনেক বেড়ে যায়।
- অর্থনৈতিক জোয়ার: চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকায়ন করা হয় এবং ঢাকার সাথে অন্যান্য জেলার রেল ও নৌযোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটে। ফলে পাট ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
৪. প্রদেশের বিলুপ্তি বা বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১)
মুসলিমরা এই প্রদেশ গঠনে খুশি হলেও কলকাতার হিন্দু সম্প্রদায়, আইনজীবী এবং জাতীয় কংগ্রেস এটিকে ‘বঙ্গমাতা’র অঙ্গচ্ছেদ হিসেবে আখ্যায়িত করে তীব্র ‘স্বদেশী আন্দোলন’ ও ব্রিটিশ-বিরোধী সহিংস আন্দোলন শুরু করে।
তীব্র আন্দোলনের মুখে এবং ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জের ভারত সফর উপলক্ষে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লির দরবারে আকস্মিকভাবে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলে ১৯১২ সালের ১ এপ্রিল থেকে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ প্রদেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং ঢাকা আবার তার রাজধানীর মর্যাদা হারায়।
নবাব সলিমুল্লাহর জোরালো দাবিতে লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ নামে নতুন প্রদেশ গঠন করেন এবং ঢাকাকে এর রাজধানী করা হয়।
অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা
অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ (All India Muslim League) ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার শাহবাগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল。 এটি ছিল ব্রিটিশ ভারতে মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের প্রথম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল, যার হাত ধরেই পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়。
নিচে এই ঐতিহাসিক দলটির প্রতিষ্ঠা, পটভূমি এবং গুরুত্ব সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. প্রতিষ্ঠার পটভূমি
- বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন (১৯০৫): ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হওয়ার পর পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে নতুন আশার আলো জাগে。 কিন্তু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং কলকাতার হিন্দু সমাজ এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু করলে মুসলিম নেতৃত্ব বুঝতে পারেন, তাদের অধিকার রক্ষার জন্য নিজস্ব একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল প্রয়োজন。
- শিমলা ডেপুটেশন (১৯০৬): ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর স্যার আগা খানের নেতৃত্বে ৩৫ জন বিশিষ্ট মুসলিম নেতার একটি প্রতিনিধি দল শিমলায় বড়লাট লর্ড মিন্টোর সাথে সাক্ষাৎ করেন。 তাঁরা মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা ও চাকরিতে কোটার দাবি জানান, যা ইতিবাচক সাড়া পায়。
২. ঐতিহাসিক সম্মেলন ও প্রতিষ্ঠা
- এডুকেশনাল কনফারেন্স: ১৯০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর আমন্ত্রণে ঢাকার শাহবাগে ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স’ অনুষ্ঠিত হয়。
- রাজনৈতিক দলের প্রস্তাব: কনফারেন্সের শেষ দিন, ৩০ ডিসেম্বর, নবাব সলিমুল্লাহ মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষায় একটি স্থায়ী রাজনৈতিক দল গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন。
- সমর্থন ও অনুমোদন: এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেন হাকিম আজমল খান, জাফর আলী খান এবং মাওলানা মোহাম্মদ আলী。 উপস্থিত প্রায় ৩,০০০ প্রতিনিধি সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রস্তাব অনুমোদন করেন এবং ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’ আত্মপ্রকাশ করে。
৩. প্রথম নেতৃত্ব ও সদর দপ্তর
- প্রথম সভাপতি (অস্থায়ী): ঢাকার এই ঐতিহাসিক সভায় সভাপতিত্ব করেন নবাব ভিকার-উল-মূলক।
- প্রথম স্থায়ী সভাপতি: ১৯০৮ সালে করাচি অধিবেশনে স্যার আগা খানকে দলের প্রথম স্থায়ী সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।
- প্রধান কার্যালয়: দলটির প্রথম সদর দপ্তর বা কেন্দ্রীয় কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল উত্তর প্রদেশের লখনউ শহরে।
৪. মুসলিম লীগের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
দলটি মূলত তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল:
- ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভারতের মুসলিমদের আনুগত্য বৃদ্ধি করা এবং সরকারের নীতি সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা。
- ভারতের মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা এবং তাদের দাবি ও আশা-আকাঙ্ক্ষা সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে তুলে ধরা。
- মুসলিম লীগের মূল উদ্দেশ্যের ক্ষতি না করে ভারতের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে সম্প্রীতি বজায় রাখা。
নবাব সলিমুল্লাহর দূরদর্শিতা এবং ঢাকার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগই পরবর্তীতে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে。
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল মূলত ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদের (বাতিল) ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে সৃষ্ট তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণ। নবাব স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে পূর্ববঙ্গের নেতৃবৃন্দের জোরালো ও আপসহীন দাবির মুখেই ব্রিটিশ সরকার ঢাকায় এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয়েছিল।
নিচে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবির পটভূমি ও ইতিহাস সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. দাবির মূল পটভূমি (বঙ্গভঙ্গ রদ, ১৯১১)
- মুসলিমদের হতাশা: ১৯০৫ সালে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ প্রদেশ গঠনের পর ঢাকায় শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটছিল। কিন্তু ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতার হিন্দু নেতা ও কংগ্রেসের তীব্র আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ সরকার আকস্মিকভাবে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করে।
- অধিকার হরণ: বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে ঢাকা আবার তার রাজধানীর মর্যাদা হারায় এবং পূর্ববঙ্গ পুনরায় কলকাতার অধীনে চলে যায়। এতে পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজ চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও প্রতারিত বোধ করে।
২. লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে ঐতিহাসিক স্মারকলিপি (১৯১২)
- নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্ব: বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের শান্ত করতে ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি ভারতের ভাইসরয় বা বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে আসেন।
- দাবি উত্থাপন: ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরীসহ ১৯ জন বিশিষ্ট নেতার একটি প্রতিনিধি দল লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
- ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়: প্রতিনিধি দলটি বড়লাটের কাছে জোরালো দাবি জানান যে, বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে পূর্ববঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থার যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ঢাকায় অবিলম্বে একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৩. ব্রিটিশ সরকারের সম্মতি ও নাথান কমিটি
- বড়লাটের ঘোষণা: মুসলিম নেতাদের তীব্র ক্ষোভ ও যৌক্তিক দাবির মুখে লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন এবং ২ ফেব্রুয়ারি সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা জারি করা হয়।
- কলকাতার হিন্দু মহলের বিরোধিতা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন কলকাতার একদল হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও নেতা (যাঁদের মধ্যে ড. রাসবিহারী ঘোষ, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী এবং স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় অন্যতম)। তাঁদের যুক্তি ছিল, ঢাকার মতো জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে শিক্ষার মান কমে যাবে এবং এটি হবে “টাকা অপচয়”।
- নাথান কমিটি গঠন: সমস্ত বিরোধিতা উপেক্ষা করে ১৯১২ সালের মে মাসে ব্যারিস্টার রবার্ট নাথানের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের ‘নাথান কমিটি’ গঠন করা হয়, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রূপরেখা ও খসড়া তৈরি করে।
নবাব সলিমুল্লাহর অটল দাবি এবং ৬০০ একর জমি দানের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে দীর্ঘ লড়াই শেষে ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার যাত্রা শুরু করে।
আকস্মিক প্রয়াণ
নবাব স্যার সলিমুল্লাহর আকস্মিক প্রয়াণ (মৃত্যু) ছিল তৎকালীন বাংলার রাজনীতির অন্যতম বড় ধাক্কা এবং একটি গভীর রহস্য। ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতার চৌরঙ্গী রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. মৃত্যুর আকস্মিকতা ও সন্দেহ
নবাব সলিমুল্লাহ মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ সুস্থ ও কর্মক্ষম ছিলেন। ১৬ জানুয়ারি রাতে ডিনারের পর তিনি হঠাৎ তীব্র পেটের ব্যথায় আক্রান্ত হন এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়। কোনো পূর্ব অসুস্থতা ছাড়া একজন শীর্ষ নেতার এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো বাংলায় খাবারে বিষপ্রয়োগের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।
২. রাজনৈতিক বিরোধ ও কারণ
১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার মুসলিমদের স্বার্থ উপেক্ষা করে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করার পর থেকে নবাব সলিমুল্লাহর সাথে ব্রিটিশ রাজের চরম দূরত্ব তৈরি হয়।
- তিনি ব্রিটিশদের দেওয়া ‘জি.সি.আই.ই’ (GCIE) উপাধি বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
- তিনি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলনের ছক আঁকছিলেন।
- ধারণা করা হয়, তাঁর এই কঠোর অবস্থান ব্রিটিশ শাসক বা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের জন্য বড় হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
৩. নজিরবিহীন গোপনীয়তা ও পাহারা
নবাবের প্রয়াণের পর ব্রিটিশ সরকারের কিছু রহস্যজনক আচরণ এই সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দেয়:
- মরদেহ স্পর্শে নিষেধাজ্ঞা: তাঁর মৃত্যুর পর কলকাতার বাড়িতে স্বজনদের লাশ স্পর্শ করতে বা মুখ দেখতে বাধা দেওয়া হয়েছিল।
- কঠোর প্রহরায় ঢাকা আনা: ময়নাতদন্ত ছাড়াই অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে বিশেষ স্টিমারে করে পুলিশি পাহারায় তাঁর মরদেহ ঢাকায় আনা হয়।
- কবর পাহারা: দাফনের পর প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত তাঁর কবরটি সশস্ত্র গুর্খা সৈন্য দিয়ে দিন-রাত পাহারা দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল অত্যন্ত নজিরবিহীন। অনেকের মতে, মৃত্যুর আসল কারণ আড়াল করতে কেউ যেন লাশ তুলে পুনরায় পরীক্ষা (Post-mortem) করতে না পারে, সেজন্যই এই পাহারা বসানো হয়েছিল।
নবাব সলিমুল্লাহর এই আকস্মিক প্রয়াণ পূর্ববঙ্গের মুসলিম জাগরণকে সাময়িকভাবে স্থবির করে দিয়েছিল এবং বাংলার ইতিহাসে এটি আজও একটি অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নবাব পরিবারের ঐতিহাসিক অবদান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং ঢাকার আধুনিকায়নে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ও তাঁর পরিবারের ঐতিহাসিক অবদান অবিস্মরণীয়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে এই পরিবারের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও বিশাল ত্যাগ যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি ঢাকাকে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার মূল কারিগরও ছিলেন এই নবাবরা।

নিচে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার সার্বিক উন্নয়নে নবাব পরিবারের ঐতিহাসিক অবদানসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় নবাব পরিবারের অবদান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি রচিত হয়েছিল নবাব স্যার সলিমুল্লাহর আপসহীন দাবি এবং তাঁর পরিবারের বিশাল ত্যাগের ওপর।
- রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণের দাবি: ১৯১১ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করলে পূর্ববঙ্গের মুসলিমরা চরমভাবে ক্ষুব্ধ হয়। এর প্রতিবাদে ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ভারতের বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে দেখা করেন। বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ এবং পূর্ববঙ্গের শিক্ষার অনগ্রসরতা দূর করতে তাঁরা ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোরালো দাবি জানান।
- বিশাল জমি দান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য নবাব সলিমুল্লাহ এবং তাঁর পরিবার ঢাকার রমনা এলাকায় তাঁদের নিজস্ব জমিদারি থেকে প্রায় ৬০০ একর নিষ্কর জমি সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে দান করেন। এই বিশাল জমির ওপরই আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস অবস্থিত।
- অর্থনৈতিক ও মানসিক সহায়তা: বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরির জন্য গঠিত ‘নাথান কমিটি’ (Nathan Committee)-র অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ। যদিও ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি চালুর আগেই ১৯১৫ সালে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়, তবে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাঁর পরিবার ব্রিটিশ সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে গেছে।
- স্মৃতি ও স্বীকৃতি: নবাব সলিমুল্লাহর এই ঐতিহাসিক অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এবং অন্যতম ঐতিহ্যবাহী আবাসিক হলের নাম রাখা হয় ‘সলিমুল্লাহ মুসলিম হল’ (SM Hall)।
২. ঢাকার আধুনিকায়ন ও সমাজকল্যাণে নবাব পরিবারের অবদান
শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রেই নয়, বর্তমান ঢাকাকে একটি আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে নবাব পরিবারের অবদান অপরিসীম। ১৮৭৫ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে বংশানুক্রমিক ‘নবাব’ উপাধি পাওয়ার পর এই পরিবার ঢাকার চেহারা বদলে দেয়।
- বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার স্টেশন (নবাব আব্দুল গণি): ঊনবিংশ শতাব্দীতে ঢাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট ছিল এবং কলেরা-টাইফয়েডের মতো মহামারি লেগেই থাকত। নবাব খাজা আব্দুল গণি ১৮৭৪ সালে বুড়িগঙ্গার তীরে নিজস্ব অর্থায়নে ‘ঢাকা ওয়াটার ওয়ার্কস’ বা পানির ফিল্টার স্টেশন স্থাপন করেন, যা ঢাকাবাসীকে প্রথম বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের সুযোগ করে দেয়।
- প্রথম বিদ্যুৎ ব্যবস্থা (নবাব খাজা আহসানুল্লাহ): ১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর নবাব খাজা আহসানুল্লাহর উদ্যোগে এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ে ঢাকার আহসান মঞ্জিলে প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো হয়। পরবর্তীতে তাঁর অর্থায়নেই ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রাজপথে বৈদ্যুতিক বাতির আলো ছড়িয়ে পড়ে।
- চিকিৎসা খাতের উন্নয়ন: ঢাকার স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে নবাব পরিবার বিপুল অর্থ অনুদান দিয়েছিল। তৎকালীন মিটফোর্ড হাসপাতাল (বর্তমান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল) এবং লেডি ডাফরিন হাসপাতালের উন্নয়নে এই পরিবার নিয়মিত অর্থ ও জমি দান করত।
- যোগাযোগ ও সংস্কৃতির বিকাশ: ঢাকায় প্রথম ঘোড়ার গাড়ি (টমটম) এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসারে নবাবদের ভূমিকা ছিল প্রধান। এছাড়া আহসান মঞ্জিলকে কেন্দ্র করে নাটক, থিয়েটার, কাওয়ালি এবং সাহিত্য চর্চার এক বিশাল সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।
- আহসান মঞ্জিল: বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত এই রাজকীয় প্রাসাদটি ছিল ঢাকার নবাবদের বাসস্থান এবং পূর্ববঙ্গের রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু, যা বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অধীনে একটি অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
আহসান মঞ্জিল পরিদর্শনের আধুনিক তথ্য

আহসান মঞ্জিল জাদুঘর বর্তমানে সম্পূর্ণ অনলাইন ই-টিকিট ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হচ্ছে এবং ২০২৩ সালে সংস্কারের পর এর গ্যালারিগুলোকে আধুনিক রূপ দেওয়া হয়েছে। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ঢাকার এই ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদটি পরিদর্শনের জন্য ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট ও আধুনিক তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. অনলাইন ই-টিকিট কাটার নিয়ম ও মূল্য
আহসান মঞ্জিলে প্রবেশের জন্য এখন আর কাউন্টারে কোনো টিকিট বিক্রি করা হয় না। দর্শনার্থীদের মোবাইল বা কম্পিউটারের মাধ্যমে অগ্রিম টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হয়।
- অফিসিয়াল ওয়েবসাইট: টিকিট কাটার জন্য আহসান মঞ্জিল ই-টিকিট পোর্টাল (ahsanmanzilticket.gov.bd) ভিজিট করতে হবে।
- টিকিটের মূল্য তালিকা:
- দেশী প্রাপ্তবয়স্ক দর্শনার্থী: ৪০ টাকা (অনলাইন চার্জসহ প্রায় ৪২ টাকা)
- শিশু (১২ বছরের কম): ২০ টাকা
- সার্কভুক্ত দেশের পর্যটক: ৩০০ টাকা
- অন্যান্য বিদেশী পর্যটক: ৫০০ টাকা
- (বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রতিবন্ধী দর্শনার্থীদের জন্য কোনো টিকিটের প্রয়োজন হয় না।)
২. বর্তমান সময়সূচি (২০২৬)
সপ্তাহের একেক দিন আহসান মঞ্জিলের পরিদর্শনের সময় ভিন্ন হয়ে থাকে:
- শনিবার থেকে বুধবার: সকাল ১০:৩০ টা থেকে বিকাল ০৪:৩০ টা পর্যন্ত (অনলাইনে টিকিট কেনার শেষ সময় বিকাল ৪:০০ টা)।
- শুক্রবার: বিকাল ০৩:০০ টা থেকে সন্ধ্যা ০৭:০০ টা পর্যন্ত (অনলাইনে টিকিট কেনার শেষ সময় সন্ধ্যা ৬:০০ টা)।
- সাপ্তাহিক বন্ধ: প্রতি বৃহস্পতিবার আহসান মঞ্জিল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। এছাড়া অন্যান্য প্রধান সরকারি ছুটির দিনগুলোতেও এটি বন্ধ থাকে।
৩. আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও ভেতরের পরিবেশ
- ডিজিটাল গ্যালারি: আহসান মঞ্জিলের মোট ২৩টি গ্যালারিকে আধুনিক আলো ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে দর্শনার্থীদের জন্য উপযোগী করা হয়েছে। এখানে নবাব আমলের রাজকীয় আসবাবপত্র, ডাইনিং রুম, নাচঘর, ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র এবং ঐতিহাসিক দুর্লভ আলোকচিত্র সংরক্ষিত আছে।
- নিরাপত্তা ও নিষেধাজ্ঞা: প্রাসাদের মূল ভবনের ভেতরে সব ধরনের ক্যামেরা, ট্রাইপড এবং ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ নিষেধ (মহিলাদের ছোট পার্স বাদে)। কাউন্টারের পাশে লকার রুমে এগুলো জমা রাখতে হয়। ভবনের ভেতরে ছবি বা সেলফি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তবে বাইরের বিশাল সবুজ বাগান ও সিঁড়িতে ছবি তোলা যায়।
- সহজ যাতায়াত: পুরান ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের খুব কাছেই এর অবস্থান। যানজট এড়াতে ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে গুলিস্থান এসে সেখান থেকে রিকশা বা সিএনজি নিয়ে আহসান মঞ্জিল পৌঁছানো সবচেয়ে সহজ।
বাংলার শিক্ষা, রাজনীতির রূপরেখা পরিবর্তন ও অধিকার আদায়ে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া এই মহান নেতার মৃত্যু ইতিহাসের পাতায় আজও এক রহস্যময় অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



