ইতিহাস

নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যু রহস্য ও তাঁর অমর অবদান: ইতিহাসের এক অমীমাংসিত অধ্যায়
নবাব সলিমুল্লাহ

নিউজ ডেস্ক

August 26, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)

সম্পাদনা ও গবেষণা: ইতিহাস ও গবেষণা বিভাগ

প্রকাশের তারিখ: ২৭ আগস্ট, ২০২৬

প্রকাশের সময়: দুপুর ১২:৩০ মিনিট (বিএসটি)

মূল বিষয়শ্রেণী (Category): ইতিহাস ও ঐতিহ্য / রাজনীতি / বাংলাদেশ

অবিভক্ত বাংলার মুসলিম সমাজকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে, শিক্ষা বিস্তার ও অধিকার আদায়ে যাঁর ভূমিকা সবচেয়ে অগ্রণী, তিনি নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ। ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি মাত্র ৪৪ বছর বয়সে কলকাতার চৌরঙ্গী রোডের নিজ বাসভবনে তিনি হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যু সাধারণ অসুস্থতা নাকি কোনো গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র—তা নিয়ে আজও ইতিহাসে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা-কল্পনা রয়েছে।

কীভাবে মারা গিয়েছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ? (মৃত্যু ও রহস্য)

সরকারি ও চিকিৎসাগত রেকর্ডে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদরোগ বা স্ট্রোক উল্লেখ করা হলেও, সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও পারিপার্শ্বিক ঘটনার কারণে তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিষ প্রয়োগের শক্ত সন্দেহ ঘনীভূত হয়:

নবাব সলিমুল্লাহ ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতার চৌরঙ্গী রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে মারা যান। প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসে তাঁর মৃত্যুকে স্বাভাবিক বা অসুস্থতাজনিত বলা হলেও, সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ঘটনার আকস্মিকতার কারণে তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে বিষপ্রয়োগে হত্যাকাণ্ড বা গভীর ষড়যন্ত্রের জোরালো গুঞ্জন রয়েছে।

মৃত্যুর ঘটনা ও প্রধান রহস্যসমূহ

  • আকস্মিক অসুস্থতা ও গুঞ্জন: মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত নবাব সুস্থ ছিলেন। মৃত্যুর দিন রাতে হঠাৎ তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং দ্রুতই তাঁর মৃত্যু হয়। সমসাময়িক রাজনৈতিক মহলে এবং পরবর্তী সময়ে বহু গবেষকের লেখায় দাবি করা হয়, ব্রিটিশদের কোনো গোপন নীলনকশার অংশ হিসেবে অথবা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দ্বারা তাঁকে খাবারে বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
  • রাজনৈতিক বিরোধের প্রেক্ষাপট: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ নবাব সলিমুল্লাহর একক প্রচেষ্টায় সফল হয়েছিল। কিন্তু ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার হিন্দুদের তীব্র আন্দোলনের মুখে মুসলিমদের স্বার্থ উপেক্ষা করে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করে। এর ফলে ব্রিটিশ সরকারের সাথে নবাবের চরম বিরোধ তৈরি হয়। তিনি ব্রিটিশদের দেওয়া ‘জি.সি.আই.ই’ (GCIE) উপাধি বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং বড় ধরনের ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, যা ব্রিটিশদের জন্য উদ্বেগের কারণ ছিল।
  • মরদেহ নিয়ে চরম গোপনীয়তা: ১৯১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি নবাবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী খাজা শামসুল হকের ডায়েরির বিবরণ থেকে জানা যায়, নবাবের মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ পরিবারের কোনো সদস্য বা স্বজনদের স্পর্শ করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি মৃত্যুর পর তাঁর মুখমণ্ডল দেখতেও বাধা দেওয়া হয়েছিল।
  • কঠোর নিরাপত্তা ও জানাজা: কলকাতা থেকে বিশেষ স্টিমারে করে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও কঠোর পুলিশি পাহারায় তাঁর মরদেহ ঢাকায় আনা হয়। সাধারণ মানুষকে মরদেহ দেখতে দেওয়া হয়নি এবং অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে ঢাকার বেগমবাজারে জানাজা শেষে তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে (উর্দু রোড) দাফন করা হয়।
  • সশস্ত্র পাহারা: দাফনের পর প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত নবাব সলিমুল্লাহর কবরটি সশস্ত্র গুর্খা সৈন্য এবং ব্রিটিশ পুলিশ দিয়ে দিন-রাত পাহারা দেওয়া হয়েছিল, যা একটি স্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে অত্যন্ত নজিরবিহীন। ধারণা করা হয়, ময়নাতদন্তের জন্য কেউ যেন লাশ চুরি বা উত্তোলন করতে না পারে, সেজন্যই এই পাহারা বসানো হয়েছিল।

যদিও ব্রিটিশ সরকার বা তৎকালীন তদন্তে এই মৃত্যুকে হৃদরোগ বা স্বাভাবিক অসুস্থতা হিসেবে ফাইল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তবুও এই ঐতিহাসিক উপাত্ত ও অস্বাভাবিক ঘটনাগুলোর কারণে আজও নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুকে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বা অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে গণ্য করা হয়।

পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠন

পূর্ববঙ্গ ও আসাম (Eastern Bengal and Assam) ছিল ব্রিটিশ ভারতের একটি স্বল্পস্থায়ী প্রদেশ, যা ১৯০৫ সালের ঐতিহাসিক বঙ্গভঙ্গ (Partition of Bengal) আন্দোলনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল। নবাব স্যার সলিমুল্লাহর একক প্রচেষ্টা এবং মুসলিম সমাজের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই নতুন প্রদেশটি আত্মপ্রকাশ করে।

নিচে এই প্রদেশ গঠনের পটভূমি, কাঠামো এবং এর প্রভাব বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. প্রদেশ গঠনের পটভূমি ও কারণ

  • প্রশাসনিক বিশালতা: অবিভক্ত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি (বাংলা, বিহার ও ওড়িশা) ছিল আয়তনে বিশাল এবং এর জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৮৫ লাখ। একজন গভর্নরের পক্ষে এই বিশাল অঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা ও শাসনভার পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
  • পূর্ববঙ্গের অবহেলা ও অনগ্রসরতা: তৎকালীন সমস্ত সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কলকারখানা ছিল কলকাতা-কেন্দ্রিক। ফলে পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) অর্থনীতি, শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা চরমভাবে ভেঙে পড়েছিল।
  • নবাব সলিমুল্লাহর ভূমিকা: ১৯০৪ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন ঢাকা সফরে এলে নবাব সলিমুল্লাহ পূর্ববঙ্গের মানুষের দুর্দশা তুলে ধরেন। তিনি জোরালো যুক্তি দেখান যে, ঢাকাকে কেন্দ্র করে আলাদা প্রদেশ না হলে এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন সম্ভব নয়।

২. প্রদেশ গঠন ও ভৌগোলিক কাঠামো (১৯০৫)

১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর লর্ড কার্জনের চূড়ান্ত আদেশে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে বিভক্ত করে নতুন প্রদেশ ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ গঠন করা হয়।

  • ভৌগোলিক এলাকা: ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিভাগ, মালদহ, ত্রিপুরা এবং সমগ্র আসাম অঞ্চল নিয়ে এই প্রদেশ গঠিত হয়।
  • রাজধানী ও জনসংখ্যা: নতুন প্রদেশের রাজধানী করা হয় ঢাকা এবং গ্রীষ্মকালীন রাজধানী করা হয় আসামের শিলংকে। প্রদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ৩ কোটি ১০ লাখ, যার মধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখ ছিলেন মুসলিম এবং ১ কোটি ২০ লাখ ছিলেন হিন্দু। ফলে এটি একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে পরিণত হয়।
  • প্রথম গভর্নর: স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার (Sir Bampfylde Fuller) এই নতুন প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন।

৩. নতুন প্রদেশের প্রভাব ও উন্নয়ন

প্রদেশটি গঠিত হওয়ার পর মাত্র ৬ বছরে পূর্ববঙ্গে ব্যাপক পরিবর্তন আসে:

  • ঢাকার আধুনিকায়ন: দীর্ঘকাল পর ঢাকা পুনরায় রাজধানীর মর্যাদা পাওয়ায় এখানে কার্জন হল, হাইকোর্ট ভবন, সেক্রেটারিয়েট (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ অংশ) এবং গভর্নমেন্ট হাউস নির্মিত হয়। ঢাকার রাস্তাঘাট ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে।
  • শিক্ষার প্রসার: পূর্ববঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল, কলেজ এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মুসলিম সমাজের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ এক লাফে অনেক বেড়ে যায়।
  • অর্থনৈতিক জোয়ার: চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকায়ন করা হয় এবং ঢাকার সাথে অন্যান্য জেলার রেল ও নৌযোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটে। ফলে পাট ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

৪. প্রদেশের বিলুপ্তি বা বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১)

মুসলিমরা এই প্রদেশ গঠনে খুশি হলেও কলকাতার হিন্দু সম্প্রদায়, আইনজীবী এবং জাতীয় কংগ্রেস এটিকে ‘বঙ্গমাতা’র অঙ্গচ্ছেদ হিসেবে আখ্যায়িত করে তীব্র ‘স্বদেশী আন্দোলন’ ও ব্রিটিশ-বিরোধী সহিংস আন্দোলন শুরু করে।

তীব্র আন্দোলনের মুখে এবং ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জের ভারত সফর উপলক্ষে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লির দরবারে আকস্মিকভাবে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলে ১৯১২ সালের ১ এপ্রিল থেকে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ প্রদেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং ঢাকা আবার তার রাজধানীর মর্যাদা হারায়।

নবাব সলিমুল্লাহর জোরালো দাবিতে লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ নামে নতুন প্রদেশ গঠন করেন এবং ঢাকাকে এর রাজধানী করা হয়।

অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা

অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ (All India Muslim League) ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার শাহবাগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল。 এটি ছিল ব্রিটিশ ভারতে মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের প্রথম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল, যার হাত ধরেই পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়。

নিচে এই ঐতিহাসিক দলটির প্রতিষ্ঠা, পটভূমি এবং গুরুত্ব সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

১. প্রতিষ্ঠার পটভূমি

  • বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন (১৯০৫): ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হওয়ার পর পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে নতুন আশার আলো জাগে。 কিন্তু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং কলকাতার হিন্দু সমাজ এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু করলে মুসলিম নেতৃত্ব বুঝতে পারেন, তাদের অধিকার রক্ষার জন্য নিজস্ব একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল প্রয়োজন。
  • শিমলা ডেপুটেশন (১৯০৬): ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর স্যার আগা খানের নেতৃত্বে ৩৫ জন বিশিষ্ট মুসলিম নেতার একটি প্রতিনিধি দল শিমলায় বড়লাট লর্ড মিন্টোর সাথে সাক্ষাৎ করেন。 তাঁরা মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা ও চাকরিতে কোটার দাবি জানান, যা ইতিবাচক সাড়া পায়。

২. ঐতিহাসিক সম্মেলন ও প্রতিষ্ঠা

  • এডুকেশনাল কনফারেন্স: ১৯০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর আমন্ত্রণে ঢাকার শাহবাগে ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স’ অনুষ্ঠিত হয়。
  • রাজনৈতিক দলের প্রস্তাব: কনফারেন্সের শেষ দিন, ৩০ ডিসেম্বর, নবাব সলিমুল্লাহ মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষায় একটি স্থায়ী রাজনৈতিক দল গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন。
  • সমর্থন ও অনুমোদন: এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেন হাকিম আজমল খান, জাফর আলী খান এবং মাওলানা মোহাম্মদ আলী。 উপস্থিত প্রায় ৩,০০০ প্রতিনিধি সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রস্তাব অনুমোদন করেন এবং ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’ আত্মপ্রকাশ করে。

৩. প্রথম নেতৃত্ব ও সদর দপ্তর

  • প্রথম সভাপতি (অস্থায়ী): ঢাকার এই ঐতিহাসিক সভায় সভাপতিত্ব করেন নবাব ভিকার-উল-মূলক
  • প্রথম স্থায়ী সভাপতি: ১৯০৮ সালে করাচি অধিবেশনে স্যার আগা খানকে দলের প্রথম স্থায়ী সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।
  • প্রধান কার্যালয়: দলটির প্রথম সদর দপ্তর বা কেন্দ্রীয় কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল উত্তর প্রদেশের লখনউ শহরে।

৪. মুসলিম লীগের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

দলটি মূলত তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল:

  • ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভারতের মুসলিমদের আনুগত্য বৃদ্ধি করা এবং সরকারের নীতি সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা。
  • ভারতের মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা এবং তাদের দাবি ও আশা-আকাঙ্ক্ষা সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে তুলে ধরা。
  • মুসলিম লীগের মূল উদ্দেশ্যের ক্ষতি না করে ভারতের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে সম্প্রীতি বজায় রাখা。

নবাব সলিমুল্লাহর দূরদর্শিতা এবং ঢাকার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগই পরবর্তীতে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে。

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল মূলত ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদের (বাতিল) ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে সৃষ্ট তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণ। নবাব স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে পূর্ববঙ্গের নেতৃবৃন্দের জোরালো ও আপসহীন দাবির মুখেই ব্রিটিশ সরকার ঢাকায় এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয়েছিল।

নিচে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবির পটভূমি ও ইতিহাস সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

১. দাবির মূল পটভূমি (বঙ্গভঙ্গ রদ, ১৯১১)

  • মুসলিমদের হতাশা: ১৯০৫ সালে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ প্রদেশ গঠনের পর ঢাকায় শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটছিল। কিন্তু ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতার হিন্দু নেতা ও কংগ্রেসের তীব্র আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ সরকার আকস্মিকভাবে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করে।
  • অধিকার হরণ: বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে ঢাকা আবার তার রাজধানীর মর্যাদা হারায় এবং পূর্ববঙ্গ পুনরায় কলকাতার অধীনে চলে যায়। এতে পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজ চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও প্রতারিত বোধ করে।

২. লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে ঐতিহাসিক স্মারকলিপি (১৯১২)

  • নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্ব: বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের শান্ত করতে ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি ভারতের ভাইসরয় বা বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে আসেন।
  • দাবি উত্থাপন: ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরীসহ ১৯ জন বিশিষ্ট নেতার একটি প্রতিনিধি দল লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
  • ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়: প্রতিনিধি দলটি বড়লাটের কাছে জোরালো দাবি জানান যে, বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে পূর্ববঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থার যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ঢাকায় অবিলম্বে একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

৩. ব্রিটিশ সরকারের সম্মতি ও নাথান কমিটি

  • বড়লাটের ঘোষণা: মুসলিম নেতাদের তীব্র ক্ষোভ ও যৌক্তিক দাবির মুখে লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন এবং ২ ফেব্রুয়ারি সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা জারি করা হয়।
  • কলকাতার হিন্দু মহলের বিরোধিতা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন কলকাতার একদল হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও নেতা (যাঁদের মধ্যে ড. রাসবিহারী ঘোষ, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী এবং স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় অন্যতম)। তাঁদের যুক্তি ছিল, ঢাকার মতো জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে শিক্ষার মান কমে যাবে এবং এটি হবে “টাকা অপচয়”।
  • নাথান কমিটি গঠন: সমস্ত বিরোধিতা উপেক্ষা করে ১৯১২ সালের মে মাসে ব্যারিস্টার রবার্ট নাথানের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের ‘নাথান কমিটি’ গঠন করা হয়, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রূপরেখা ও খসড়া তৈরি করে।

নবাব সলিমুল্লাহর অটল দাবি এবং ৬০০ একর জমি দানের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে দীর্ঘ লড়াই শেষে ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার যাত্রা শুরু করে।

আকস্মিক প্রয়াণ

নবাব স্যার সলিমুল্লাহর আকস্মিক প্রয়াণ (মৃত্যু) ছিল তৎকালীন বাংলার রাজনীতির অন্যতম বড় ধাক্কা এবং একটি গভীর রহস্য। ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতার চৌরঙ্গী রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. মৃত্যুর আকস্মিকতা ও সন্দেহ

নবাব সলিমুল্লাহ মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ সুস্থ ও কর্মক্ষম ছিলেন। ১৬ জানুয়ারি রাতে ডিনারের পর তিনি হঠাৎ তীব্র পেটের ব্যথায় আক্রান্ত হন এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়। কোনো পূর্ব অসুস্থতা ছাড়া একজন শীর্ষ নেতার এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো বাংলায় খাবারে বিষপ্রয়োগের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।

২. রাজনৈতিক বিরোধ ও কারণ

১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার মুসলিমদের স্বার্থ উপেক্ষা করে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করার পর থেকে নবাব সলিমুল্লাহর সাথে ব্রিটিশ রাজের চরম দূরত্ব তৈরি হয়।

  • তিনি ব্রিটিশদের দেওয়া ‘জি.সি.আই.ই’ (GCIE) উপাধি বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
  • তিনি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলনের ছক আঁকছিলেন।
  • ধারণা করা হয়, তাঁর এই কঠোর অবস্থান ব্রিটিশ শাসক বা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের জন্য বড় হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

৩. নজিরবিহীন গোপনীয়তা ও পাহারা

নবাবের প্রয়াণের পর ব্রিটিশ সরকারের কিছু রহস্যজনক আচরণ এই সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দেয়:

  • মরদেহ স্পর্শে নিষেধাজ্ঞা: তাঁর মৃত্যুর পর কলকাতার বাড়িতে স্বজনদের লাশ স্পর্শ করতে বা মুখ দেখতে বাধা দেওয়া হয়েছিল।
  • কঠোর প্রহরায় ঢাকা আনা: ময়নাতদন্ত ছাড়াই অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে বিশেষ স্টিমারে করে পুলিশি পাহারায় তাঁর মরদেহ ঢাকায় আনা হয়।
  • কবর পাহারা: দাফনের পর প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত তাঁর কবরটি সশস্ত্র গুর্খা সৈন্য দিয়ে দিন-রাত পাহারা দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল অত্যন্ত নজিরবিহীন। অনেকের মতে, মৃত্যুর আসল কারণ আড়াল করতে কেউ যেন লাশ তুলে পুনরায় পরীক্ষা (Post-mortem) করতে না পারে, সেজন্যই এই পাহারা বসানো হয়েছিল।

নবাব সলিমুল্লাহর এই আকস্মিক প্রয়াণ পূর্ববঙ্গের মুসলিম জাগরণকে সাময়িকভাবে স্থবির করে দিয়েছিল এবং বাংলার ইতিহাসে এটি আজও একটি অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নবাব পরিবারের ঐতিহাসিক অবদান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং ঢাকার আধুনিকায়নে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ও তাঁর পরিবারের ঐতিহাসিক অবদান অবিস্মরণীয়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে এই পরিবারের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও বিশাল ত্যাগ যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি ঢাকাকে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার মূল কারিগরও ছিলেন এই নবাবরা।

নিচে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার সার্বিক উন্নয়নে নবাব পরিবারের ঐতিহাসিক অবদানসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় নবাব পরিবারের অবদান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি রচিত হয়েছিল নবাব স্যার সলিমুল্লাহর আপসহীন দাবি এবং তাঁর পরিবারের বিশাল ত্যাগের ওপর।

  • রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণের দাবি: ১৯১১ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করলে পূর্ববঙ্গের মুসলিমরা চরমভাবে ক্ষুব্ধ হয়। এর প্রতিবাদে ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ভারতের বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে দেখা করেন। বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ এবং পূর্ববঙ্গের শিক্ষার অনগ্রসরতা দূর করতে তাঁরা ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোরালো দাবি জানান।
  • বিশাল জমি দান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য নবাব সলিমুল্লাহ এবং তাঁর পরিবার ঢাকার রমনা এলাকায় তাঁদের নিজস্ব জমিদারি থেকে প্রায় ৬০০ একর নিষ্কর জমি সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে দান করেন। এই বিশাল জমির ওপরই আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস অবস্থিত।
  • অর্থনৈতিক ও মানসিক সহায়তা: বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরির জন্য গঠিত ‘নাথান কমিটি’ (Nathan Committee)-র অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ। যদিও ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি চালুর আগেই ১৯১৫ সালে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়, তবে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাঁর পরিবার ব্রিটিশ সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে গেছে।
  • স্মৃতি ও স্বীকৃতি: নবাব সলিমুল্লাহর এই ঐতিহাসিক অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এবং অন্যতম ঐতিহ্যবাহী আবাসিক হলের নাম রাখা হয় ‘সলিমুল্লাহ মুসলিম হল’ (SM Hall)

২. ঢাকার আধুনিকায়ন ও সমাজকল্যাণে নবাব পরিবারের অবদান

শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রেই নয়, বর্তমান ঢাকাকে একটি আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে নবাব পরিবারের অবদান অপরিসীম। ১৮৭৫ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে বংশানুক্রমিক ‘নবাব’ উপাধি পাওয়ার পর এই পরিবার ঢাকার চেহারা বদলে দেয়।

  • বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার স্টেশন (নবাব আব্দুল গণি): ঊনবিংশ শতাব্দীতে ঢাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট ছিল এবং কলেরা-টাইফয়েডের মতো মহামারি লেগেই থাকত। নবাব খাজা আব্দুল গণি ১৮৭৪ সালে বুড়িগঙ্গার তীরে নিজস্ব অর্থায়নে ‘ঢাকা ওয়াটার ওয়ার্কস’ বা পানির ফিল্টার স্টেশন স্থাপন করেন, যা ঢাকাবাসীকে প্রথম বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের সুযোগ করে দেয়।
  • প্রথম বিদ্যুৎ ব্যবস্থা (নবাব খাজা আহসানুল্লাহ): ১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর নবাব খাজা আহসানুল্লাহর উদ্যোগে এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ে ঢাকার আহসান মঞ্জিলে প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো হয়। পরবর্তীতে তাঁর অর্থায়নেই ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রাজপথে বৈদ্যুতিক বাতির আলো ছড়িয়ে পড়ে।
  • চিকিৎসা খাতের উন্নয়ন: ঢাকার স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে নবাব পরিবার বিপুল অর্থ অনুদান দিয়েছিল। তৎকালীন মিটফোর্ড হাসপাতাল (বর্তমান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল) এবং লেডি ডাফরিন হাসপাতালের উন্নয়নে এই পরিবার নিয়মিত অর্থ ও জমি দান করত।
  • যোগাযোগ ও সংস্কৃতির বিকাশ: ঢাকায় প্রথম ঘোড়ার গাড়ি (টমটম) এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসারে নবাবদের ভূমিকা ছিল প্রধান। এছাড়া আহসান মঞ্জিলকে কেন্দ্র করে নাটক, থিয়েটার, কাওয়ালি এবং সাহিত্য চর্চার এক বিশাল সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।
  • আহসান মঞ্জিল: বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত এই রাজকীয় প্রাসাদটি ছিল ঢাকার নবাবদের বাসস্থান এবং পূর্ববঙ্গের রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু, যা বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অধীনে একটি অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।

আহসান মঞ্জিল পরিদর্শনের আধুনিক তথ্য

আহসান মঞ্জিল জাদুঘর বর্তমানে সম্পূর্ণ অনলাইন ই-টিকিট ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হচ্ছে এবং ২০২৩ সালে সংস্কারের পর এর গ্যালারিগুলোকে আধুনিক রূপ দেওয়া হয়েছে। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ঢাকার এই ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদটি পরিদর্শনের জন্য ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট ও আধুনিক তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

১. অনলাইন ই-টিকিট কাটার নিয়ম ও মূল্য

আহসান মঞ্জিলে প্রবেশের জন্য এখন আর কাউন্টারে কোনো টিকিট বিক্রি করা হয় না। দর্শনার্থীদের মোবাইল বা কম্পিউটারের মাধ্যমে অগ্রিম টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হয়।

  • অফিসিয়াল ওয়েবসাইট: টিকিট কাটার জন্য আহসান মঞ্জিল ই-টিকিট পোর্টাল (ahsanmanzilticket.gov.bd) ভিজিট করতে হবে।
  • টিকিটের মূল্য তালিকা:
    • দেশী প্রাপ্তবয়স্ক দর্শনার্থী: ৪০ টাকা (অনলাইন চার্জসহ প্রায় ৪২ টাকা)
    • শিশু (১২ বছরের কম): ২০ টাকা
    • সার্কভুক্ত দেশের পর্যটক: ৩০০ টাকা
    • অন্যান্য বিদেশী পর্যটক: ৫০০ টাকা
    • (বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রতিবন্ধী দর্শনার্থীদের জন্য কোনো টিকিটের প্রয়োজন হয় না।)

২. বর্তমান সময়সূচি (২০২৬)

সপ্তাহের একেক দিন আহসান মঞ্জিলের পরিদর্শনের সময় ভিন্ন হয়ে থাকে:

  • শনিবার থেকে বুধবার: সকাল ১০:৩০ টা থেকে বিকাল ০৪:৩০ টা পর্যন্ত (অনলাইনে টিকিট কেনার শেষ সময় বিকাল ৪:০০ টা)।
  • শুক্রবার: বিকাল ০৩:০০ টা থেকে সন্ধ্যা ০৭:০০ টা পর্যন্ত (অনলাইনে টিকিট কেনার শেষ সময় সন্ধ্যা ৬:০০ টা)।
  • সাপ্তাহিক বন্ধ: প্রতি বৃহস্পতিবার আহসান মঞ্জিল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। এছাড়া অন্যান্য প্রধান সরকারি ছুটির দিনগুলোতেও এটি বন্ধ থাকে।

৩. আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও ভেতরের পরিবেশ

  • ডিজিটাল গ্যালারি: আহসান মঞ্জিলের মোট ২৩টি গ্যালারিকে আধুনিক আলো ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে দর্শনার্থীদের জন্য উপযোগী করা হয়েছে। এখানে নবাব আমলের রাজকীয় আসবাবপত্র, ডাইনিং রুম, নাচঘর, ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র এবং ঐতিহাসিক দুর্লভ আলোকচিত্র সংরক্ষিত আছে।
  • নিরাপত্তা ও নিষেধাজ্ঞা: প্রাসাদের মূল ভবনের ভেতরে সব ধরনের ক্যামেরা, ট্রাইপড এবং ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ নিষেধ (মহিলাদের ছোট পার্স বাদে)। কাউন্টারের পাশে লকার রুমে এগুলো জমা রাখতে হয়। ভবনের ভেতরে ছবি বা সেলফি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তবে বাইরের বিশাল সবুজ বাগান ও সিঁড়িতে ছবি তোলা যায়।
  • সহজ যাতায়াত: পুরান ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের খুব কাছেই এর অবস্থান। যানজট এড়াতে ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে গুলিস্থান এসে সেখান থেকে রিকশা বা সিএনজি নিয়ে আহসান মঞ্জিল পৌঁছানো সবচেয়ে সহজ।

বাংলার শিক্ষা, রাজনীতির রূপরেখা পরিবর্তন ও অধিকার আদায়ে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া এই মহান নেতার মৃত্যু ইতিহাসের পাতায় আজও এক রহস্যময় অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে

নিউজ ডেস্ক

September 10, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিনিধি : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
বিভাগ (Category): জাতীয়

নিজস্ব প্রতিবেদক, অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশের সময় ও তারিখ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,

স্থান: ঢাকা

ঢাকা: মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ (১৯৩৯-১৯৪৫)-এর ফলাফলে যে সামরিক শক্তিটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল, তা হলো অবিভক্ত ভারতের সামরিক বাহিনী। বিশ্বজুড়ে তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপস্থিতি থাকলেও, যুদ্ধের ময়দানে মিত্রবাহিনীর অন্যতম মূল শক্তি ছিল ভারতীয় তরুণরা। বর্তমান ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ একত্রিত হয়ে এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শক্তির যুদ্ধ হলেও ভারতীয় সেনাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক সামরিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছে।

ইতিহাসের সর্ববৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী

১৯৩৯ সালে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তখন অবিভক্ত ভারতীয় সাঁজোয়া বহরে সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র ২ লাখের কাছাকাছি। কিন্তু ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়া নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২৫ লাক্ষে (২.৫ মিলিয়ন)।

এই বিশাল সামরিক সমাবেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—এতে কোনো বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ (Conscription) ছিল না। সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই বাহিনীটি ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ‘অল-ভলান্টিয়ার আর্মি’ বা স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী হিসেবে বিশ্ব রেকর্ডে স্থান করে নেয়।

[১৯৩৯: ২ লাখ সৈন্য] ──► স্বেচ্ছাসেবী অংশগ্রহণ ──► [১৯৪৫: ২৫ লাখ সৈন্য (সর্ববৃহৎ ভলান্টিয়ার বাহিনী)]

তিন মহাদেশের রণক্ষেত্র ও বীরত্বের চিহ্ন

ভারতীয় সৈন্যরা কেবল এশিয়ার মাটিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তারা এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ—এই তিন মহাদেশের বিভিন্ন দুর্গম ও প্রতিকূল যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে লড়াই করেছেন।

  • আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য অভিযান: উত্তর আফ্রিকায় জার্মানি ও ইতালির যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে এবং মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানে ভারতীয় সৈন্যরা কৌশলগত সাফল্য এনে দেন।
  • ইতালি অভিযান ও মন্টি ক্যাসিনো: ইউরোপের ইতালি অভিযানে মিত্রবাহিনীর জয়ে ভারতীয়দের ভূমিকা ছিল অসামান্য। বিশেষ করে রক্তক্ষয়ী ‘ব্যাটল অফ মন্টি ক্যাসিনো’ মুক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের পরাক্রম বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়।
  • বার্মা ও ইম্ফল-কোহিমার যুদ্ধ: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মিত্রবাহিনীর অবস্থান টিকিয়ে রাখতে ভারতীয় সৈন্যরা বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) অভিযানে অংশ নেন। ১৯৪৪ সালে ভারতের ইম্ফল ও কোহিমার যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ লড়াই চালিয়ে তারা জাপানি বাহিনীর ভারত আক্রমণের চূড়ান্ত আগ্রাসন রুখে দেন।

যুদ্ধের ময়দানে অসাধারণ সাহসিকতা ও বীরত্ব প্রদর্শনের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতীয় সৈন্যদের ৩১টি ‘ভিক্টোরিয়া ক্রস’ (ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ সম্মাননা) প্রদান করা হয়, যা সমগ্র মিত্রবাহিনীর অর্জিত মোট ভিক্টোরিয়া ক্রসের প্রায় ১৫ শতাংশ।

ক্ষয়ক্ষতি ও বাংলার ছিয়াত্তরের মন্বন্তর

এই যুদ্ধে বিজয় অর্জন করতে গিয়ে ভারতীয় বাহিনীকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রায় ৮৭,০০০ থেকে ৮৯,০০০ ভারতীয় সৈন্য শহীদ হন। এছাড়া হাজার হাজার সেনা গুরুতর আহত হন এবং একটি বিশাল অংশ শত্রু শিবিরে বন্দী হিসেবে আটক থাকেন।

সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি এই যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব পড়েছিল তৎকালীন বাংলায়। যুদ্ধের রশদ ও খাদ্যসামগ্রী যুদ্ধক্ষেত্রে জোগাতে গিয়ে তৈরি হয় ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ বা দুর্ভিক্ষ। প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও যুদ্ধের বলি হয়ে বাংলায় প্রায় ৩০ লাখ সাধারণ বেসামরিক নাগরিক অনাহারে প্রাণ হারান।

[দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ] ──► রসদ ও খাদ্য স্থানান্তর ──► ১৯৪৩-এর বাংলা দুর্ভিক্ষ ──► ৩০ লাখ বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু

দ্বিমুখী ধারা: ব্রিটিশ রাজ বনাম আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যদের অবস্থান দুটি ভিন্ন ও ঐতিহাসিক ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল:

১. ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনী: একটি বিশাল অংশ ব্রিটিশ পতাকাতলে থেকে মিত্রবাহিনীর হয়ে অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায়।

২. আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA): অন্যদিকে, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় জাপানিদের হাতে বন্দী হওয়া হাজার হাজার ব্রিটিশ-ভারতীয় সৈন্য নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আহবানে সাড়া দিয়ে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এ যোগ দেন। তারা অক্ষশক্তির সমর্থন নিয়ে ব্রিটিশদের হাত থেকে জন্মভূমিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সরাসরি ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

স্বাধীনতার সূচনা ও ইতিহাসের মূল্যায়ন

যুদ্ধের সমাপ্তি এবং ভারতীয় সেনাদের রাজনৈতিক সচেতনতা ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভকে ত্বরান্বিত করতে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ কমান্ডার-ইন-চিফ ফিল্ড মার্শাল ক্লদ অচিনলেক স্বীকার করেছিলেন যে, ভারতীয় সৈন্যদের অসামান্য অবদান ছাড়া ব্রিটেন দুটি বিশ্বযুদ্ধের কোনোটিতেই জয়লাভ করতে পারত না।

স্বাধীনতার পর বহু বছর ধরে এই ইতিহাসকে কিছুটা আড়ালে রাখা হয়েছিল—কেননা রাজনৈতিকভাবে এটিকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি রক্ষার যুদ্ধ হিসেবে দেখা হতো। তবে আধুনিক সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশ্ব রাজনীতি পুনর্গঠনে এবং স্বাধীন উপমহাদেশের ভিত্তি তৈরিতে ২৫ লাখ ভারতীয় সেনার এই মহাকাব্যিক বীরত্ব ও আত্মত্যাগ ছিল অন্যতম প্রধান ভিত্তিপ্রস্তর।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ব্লু স্টার

নিউজ ডেস্ক

September 10, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
বিভাগ (Category): আন্তর্জাতিক, ইতিহাস
প্রকাশের তারিখ: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তথ্যসূত্র (Sources): Encyclopaedia Britannica, BBC আর্কাইভ প্রতিবেদন, ভারতীয় সরকারি নথি ও সংসদীয় বিবৃতি, শিখ ঐতিহাসিক সংকলন (SikhiWiki), সমসাময়িক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ।

অপারেশন ব্লু স্টার ছিল ১৯৮৪ সালের জুন মাসে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি সামরিক অভিযান, যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে পাঞ্জাবের অমৃতসরে অবস্থিত শিখ ধর্মের পবিত্রতম স্থান স্বর্ণমন্দির (হরমন্দির সাহিব) কমপ্লেক্সে পরিচালিত হয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ার আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ও গভীর প্রভাব ফেলা ঘটনা হিসেবে বিবেচিত এই অভিযান শুধু পাঞ্জাবের রাজনীতিই নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সমীকরণকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করেছে।

পটভূমি: ১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া অসন্তোষ

১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া অসন্তোষের পটভূমি মূলত ভারতের স্বাধীনতার পর পাঞ্জাবের ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অধিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান বিভাজনের সময় শিখ সম্প্রদায় ভারতে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে খুব দ্রুতই তাদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হতে শুরু করে।

এই অসন্তোষের মূল কারণ এবং ঘটনাক্রম নিচে দেওয়া হলো:

  • পাঞ্জাবি সুবা আন্দোলন: স্বাধীনতার পর ভারত সরকার ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে। শিখদের মূল দাবি ছিল পাঞ্জাবি ভাষী অঞ্চলগুলোকে নিয়ে ‘পাঞ্জাবি সুবা’ বা একটি পৃথক রাজ্য গঠন করা। তবে তৎকালীন নেহেরু সরকার শুরুতে এই দাবি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, যা শিখদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৬৬ সালে পাঞ্জাবকে ভেঙে পাঞ্জাবিভাষী পাঞ্জাব এবং হিন্দিভাষী হরিয়ানা রাজ্য গঠন করা হয়।
  • চণ্ডীগড় এবং জলবণ্টন নিয়ে বিরোধ: ১৯৬৬ সালের বিভাজনের সময় পাঞ্জাবের ঐতিহাসিক শহর চণ্ডীগড়কে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা—উভয় রাজ্যের যৌথ রাজধানী এবং একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করা হয়। শিখদের দাবি ছিল চণ্ডীগড়কে পুরোপুরি পাঞ্জাবের অন্তর্ভুক্ত করা। এর পাশাপাশি পাঞ্জাবের নদীগুলোর পানির একটি বড় অংশ অন্য রাজ্যে সরিয়ে নেওয়ার কারণে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
  • আনন্দপুর সাহিব প্রস্তাব (১৯৭৩): ১৯৭৩ সালে শিখদের প্রধান রাজনৈতিক দল শিরোমণি আকালি দল ‘আনন্দপুর সাহিব প্রস্তাব’ উত্থাপন করে। এই প্রস্তাবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সীমিত করে পাঞ্জাবকে আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার দাবি জানানো হয়। এর মধ্যে ছিল প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ ছাড়া অন্য সব বিষয়ে রাজ্যের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এবং শিখ ধর্মের বিশেষ স্বীকৃতি। তবে তৎকালীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এটিকে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রস্তাব হিসেবে গণ্য করে প্রত্যাখ্যান করে।
  • ধর্মীয় ও সামাজিক রূপান্তর: ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে পাঞ্জাবে ‘সবুজ বিপ্লব’ বা কৃষিক্ষেত্রে বিশাল উন্নতি হয়। এর ফলে অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটলেও যুবসমাজের মধ্যে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব এবং শিখ ধর্মীয় রীতিনীতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। এই প্রেক্ষাপটে জারনাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের মতো ধর্মীয় প্রচারকরা শিখদের ঐতিহ্যগত ও গোঁড়া ধর্মীয় রীতিনীতিতে ফিরে আসার আহ্বান জানান, যা গ্রামীণ ও অসন্তুষ্ট শিখ যুবকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া এই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় অসন্তোষই পরবর্তীতে আশির দশকে খালিস্তান আন্দোলন এবং অপারেশন ব্লু স্টারের মতো চরম সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে মোড় নেয়।

জার্নেল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের উত্থান

জারনাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের উত্থান ছিল আধুনিক ভারতের ইতিহাসে অন্যতম একটি জটিল ও প্রভাববিস্তারকারী অধ্যায়। একজন সাধারণ গ্রামীণ ধর্মীয় প্রচারক থেকে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে তিনি শিখ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন [১.২.২, ১.২.৫]।

তাঁর এই নাটকীয় উত্থানের মূল ধাপ ও কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • দমদমি টাকশালের প্রধান পদ লাভ: ১৯৪৭ সালে জন্ম নেওয়া ভিন্দ্রানওয়ালে শুরুতে পাঞ্জাবের একটি ঐতিহ্যবাহী শিখ ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘দমদমি টাকশাল’-এ ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন । ১৯৭৭ সালে এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান করতার সিং খলসার আকস্মিক মৃত্যুর পর ভিন্দ্রানওয়ালেকে দমদমি টাকশালের পরবর্তী প্রধান বা ‘সন্ত’ হিসেবে ঘোষণা করা হয় । এখান থেকেই তাঁর জনসাধারণের সামনে আসার সুযোগ তৈরি হয় ।
  • ধর্মীয় সংস্কার ও জনপ্রিয়তা: টাকশালের প্রধান হয়ে তিনি পাঞ্জাবের গ্রামে গ্রামে ঘুরে কট্টর শিখ ধর্মের প্রচার শুরু করেন। তিনি শিখ যুবসমাজকে মাদক, তামাক ও মদ্যপান ত্যাগ করার আহ্বান জানান এবং শিখ ধর্মের মৌলিক রীতিনীতি (যেমন চুল ও দাড়ি না কাটা) কঠোরভাবে মেনে চলতে বলেন । আধুনিকায়নের ফলে দিকভ্রান্ত গ্রামীণ যুবসমাজ এবং প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে তাঁর এই আহ্বান ব্যাপক সাড়া ফেলে।
  • ১৯৭৮ সালের অমৃতসর সংঘর্ষ: ১৯৭৮ সালের ১৩ এপ্রিল বৈশাখী দিবসে অমৃতসরে ভিন্দ্রানওয়ালের অনুসারীদের সাথে ‘নিরঙ্কারী’ নামক একটি শিখ উপদলের বড় ধরণের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষে ভিন্দ্রানওয়ালের পক্ষের বেশ কয়েকজন শিখ মারা যান । এই ঘটনার পর ভিন্দ্রানওয়ালে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে এবং শিখদের সুরক্ষায় আরও উগ্র ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নেন, যা তাঁকে শিখ উগ্রপন্থীদের প্রধান নেতায় পরিণত করে।
  • কংগ্রেসের রাজনৈতিক সমর্থন ও ব্যবহার: ভিন্দ্রানওয়ালের উত্থানের পেছনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের একাংশের পরোক্ষ ভূমিকা ছিল । পাঞ্জাবের আঞ্চলিক শিখ দল ‘শিরোমণি আকালি দল’-এর রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করার জন্য ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র সঞ্জয় গান্ধী এবং কংগ্রেস নেতা জ্ঞানী জৈল সিং প্রথম দিকে ভিন্দ্রানওয়ালেকে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা প্রশ্রয় ও সমর্থন দিয়েছিলেন। তবে কংগ্রেসের এই কৌশল পরবর্তীতে বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়, কারণ ভিন্দ্রানওয়ালে খুব দ্রুতই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ লাইনের বাইরে চলে যান
  • লালা জগত নারায়ণের হত্যাকাণ্ড ও গ্রেফতারের নাটক: ১৯৮১ সালে পাঞ্জাবের উগ্রপন্থা বিরোধী প্রভাবশালী সংবাদপত্র সম্পাদক লালা জগত নারায়ণ নিহত হন । এই হত্যাকাণ্ডে ভিন্দ্রানওয়ালের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি হলে তিনি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণের জন্য কঠোর শর্ত দেন । পরবর্তীতে প্রমাণের অভাবে তিনি যখন জেল থেকে মুক্তি পান, তখন শিখদের একটি বড় অংশের কাছে তিনি এমন এক ‘নায়ক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন যিনি সরাসরি ভারত সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে জয়ী হয়েছেন ।
  • চরমপন্থা ও স্বর্ণমন্দির দখল: ১৯৮২ সালের পর থেকে ভিন্দ্রানওয়ালে আকালি দলের সাথে যুক্ত হয়ে পাঞ্জাবের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ‘ধরম যুদ্ধ মোর্চা’ আন্দোলন শুরু করেন । গ্রেফতার এড়াতে এবং নিজের সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তিনি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে শিখদের পবিত্রতম স্থান স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থান নেন এবং পরবর্তীতে আকাল তখত ভবনটি দখল করে সেটিকে দুর্গে পরিণত করেন ।

স্বর্ণমন্দিরের ভেতর থেকে তাঁর সমান্তরাল শাসন এবং সশস্ত্র আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবেই ১৯৮৪ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী সেখানে ‘অপারেশন ব্লু স্টার’ পরিচালনা করতে বাধ্য হয়, যেখানে তিনি নিহত হন ।

অভিযানের বিবরণ (১ জুন – ৮ জুন, ১৯৮৪)

১৯৮৪ সালের ১ থেকে ৮ জুন তারিখের মধ্যে প্রধান ভিন্ন ভিন্ন ভিন্ন ভিন্ন দিনকে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দিনগুলোতে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির অবরুদ্ধ থেকে শুরু করা পুরো চত্বর নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ করা হয় :

১ জুন ১৯৮৪: প্রাথমিক গোলাবর্ষণ ও অবরোধ

  • দুপুরের দিকে স্বর্ণমন্দির চত্বরের বাইরে অবস্থান নেওয়া আধাসামরিক বাহিনী এবং ভেতর থেকে শিখ চরমপন্থীদের মধ্যে প্রথম বড় ধরণের বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়
  • এই প্রাথমিক গোলাবর্ষণে স্বর্ণমন্দিরের মূল ভবন ও লঙ্গরখানার দেয়ালে বেশ কিছু গুলির আঘাত লাগে [১.২.৩]। এই সংঘর্ষে ১১ জন নিহত এবং ২৫ জন আহত হন [

২ জুন ১৯৮৪: রাজ্য অবরুদ্ধ ও কার্ফিউ

  • ভারতীয় সেনাবাহিনী পাঞ্জাবের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় এবং পুরো রাজ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় ।
  • রাজ্যজুড়ে কড়া কার্ফিউ জারি করা হয় এবং সড়ক ও রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয় । সব বিদেশী সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যমকে পাঞ্জাব থেকে বের করে দেওয়া হয় ।

৩ জুন ১৯৮৪: তীর্থযাত্রীদের অবরুদ্ধ হওয়া

  • এই দিনটি ছিল শিখদের পঞ্চম গুরু, গুরু অর্জুন দেবের শহীদ দিবস । এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কারণে হাজার হাজার সাধারণ শিখ তীর্থযাত্রী আগে থেকেই স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থান করছিলেন ।
  • কার্ফিউর কারণে প্রায় ১০ হাজার তীর্থযাত্রী মন্দিরের ভেতরে আটকা পড়েন । সামরিক বাহিনী পুরো স্বর্ণমন্দিরের প্রবেশ ও নিকাশ পথগুলো চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে ।

৪ জুন ১৯৮৪: বড় ধরণের আক্রমণ শুরু

  • সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে স্বর্ণমন্দিরের উগ্রপন্থীদের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে ভারী অস্ত্র ও মর্টার দিয়ে গোলাবর্ষণ শুরু করা হয়।
  • মন্দিরের বাইরের প্রাচীর এবং রামগড়িয়া বুঙ্গাসহ বেশ কয়েকটি ওয়াচ টাওয়ার ধ্বংস করে দেওয়া হয়, যাতে ভেতরে থাকা উগ্রপন্থীদের নজরদারি বন্ধ করা যায়। ভেতর থেকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হলেও শিখ চরমপন্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করে।

৫ জুন ১৯৮৪: মূল চত্বরে প্রবেশ ও তীব্র প্রতিরোধ

  • রাত ১০টার দিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডো এবং পদাতিক বাহিনী মূল মন্দির চত্বরের ভেতরে (পরিক্রমা এলাকায়) প্রবেশের চেষ্টা করে।
  • মেজর জেনারেল কে এস ব্রার এবং জেনারেল সুন্দরজীর নেতৃত্বে সেনারা ভেতরে ঢুকলে জারনাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের সামরিক উপদেষ্টা সাবেক মেজর জেনারেল সাবেগ সিংয়ের সুপরিকল্পিত হালকা ও মাঝারি মেশিনগানের প্রতিরোধের মুখে পড়ে। তীব্র প্রতিরক্ষার কারণে সেনাবাহিনীর প্রথম দিকের কমান্ডো অপারেশন ব্যর্থ হয় এবং বহু সেনা সদস্য হতাহত হন।

৬ জুন ১৯৮৪: ট্যাংকের ব্যবহার ও আকাল তখত ধ্বংস

  • প্রথম সারির পদাতিক বাহিনী চরমপন্থীদের বাঙ্কার ও সুরক্ষিত অবস্থানগুলো ভাঙতে ব্যর্থ হলে, ৬ জুন ভোরের দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে মূল চত্বরের ভেতরে ভারী বিজয়ন্ত ট্যাংক প্রবেশ করানো হয় ।
  • ট্যাংকের ১০৫ মিলিমিটার কামানের শক্তিশালী গোলাবর্ষণে শিখদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও প্রশাসনিক আসন ‘আকাল তখত’ ভবনটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় । এই দিনই ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে জারনাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে, সাবেগ সিং এবং আমরিক সিংয়ের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় ।

৭ জুন ১৯৮৪: তল্লাশি ও ছোটখাটো প্রতিরোধ দমন

  • স্বর্ণমন্দিরের মূল প্রতিরোধ ভেঙে পড়ার পর সেনাবাহিনী পুরো কমপ্লেক্সের প্রতিটি ঘর, বেজমেন্ট এবং সুড়ঙ্গে তল্লাশি অভিযান শুরু করে।
  • আকাল তখতের আশেপাশের বিভিন্ন গোপন বাঙ্কারে লুকিয়ে থাকা বাকি চরমপন্থীদের সাথে সেনাবাহিনীর বিক্ষিপ্ত বন্দুকযুদ্ধ চলতে থাকে এবং অনেকেই আত্মসমর্পণ করতে শুরু করে।

৮ জুন ১৯৮৪: সম্পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা

  • ৮ জুনের মধ্যে স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্সের ভেতরের সব ধরণের প্রতিরোধ পুরোপুরি দমন করা হয় এবং পুরো চত্বরটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে
  • তবে এই অভিযানের সময় বা এর পরপরই স্বর্ণমন্দির প্রাঙ্গণে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘শিখ রেফারেন্স লাইব্রেরি’ আগুনে পুড়ে যায়, যার ফলে বহু প্রাচীন ও অমূল্য শিখ পাণ্ডুলিপি ধ্বংস হয়ে যায় ।

এই ৮ দিনের তীব্র লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে স্বর্ণমন্দিরের মূল সামরিক অপারেশনটি সমাপ্ত হয়, যা পরবর্তীতে পাঞ্জাবে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেয়

হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক

অপারেশন ব্লু স্টারে কত মানুষ মারা গিয়েছিলেন, সেই হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভারত সরকার এবং শিখ সংগঠন ও স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে শুরু থেকেই তীব্র বিতর্ক ও মতপার্থক্য রয়েছে । ঘটনার সময় গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় কোনো নিরপেক্ষ পরিসংখ্যান তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

হতাহতের সংখ্যা নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রধান দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

ভারত সরকারের অফিশিয়াল হিসাব (শ্বেতপত্র):

  • ১৯৮৪ সালের জুলাই মাসে ভারত সরকার কর্তৃক প্রকাশিত শ্বেতপত্র বা অফিশিয়াল রিপোর্ট অনুযায়ী, স্বর্ণমন্দির চত্বরের ভেতরে সব মিলিয়ে ৪৯৩ জন চরমপন্থী ও বেসামরিক লোক নিহত হয়েছিলেন ।
  • এই অভিযানে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ৪ জন অফিসারসহ মোট ৮৩ জন সেনা সদস্য নিহত এবং ২৪৯ জন আহত হন বলে সরকারি নথিতে উল্লেখ করা হয় ।

শিখ সংগঠন ও স্বাধীন সংস্থাগুলোর দাবি:

  • শিখ সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংগঠন এই সরকারি তথ্যকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে । তাদের দাবি অনুযায়ী, অভিযানে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার, যার একটি বড় অংশই ছিল সাধারণ শিখ তীর্থযাত্রী ।
  • যেহেতু ৫ জুন শিখদের পঞ্চম গুরু, গুরু অর্জুন দেবের শহীদ দিবসের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছিল, তাই আগে থেকেই মন্দিরের ভেতরে প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি সাধারণ মানুষ আটকা পড়েছিলেন । আক্রমণের সময় তারা ক্রসফায়ারে পড়ে প্রাণ হারান ।

মানবাধিকার সংস্থা ও সাংবাদিকদের অনুমান:

  • বিভিন্ন স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্স এবং এর আশেপাশের এলাকায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ এর কাছাকাছি ছিল । কোনো কোনো নিরপেক্ষ মানবাধিকার ফোরামের মতে, মোট নিহতের সংখ্যা ১০,০০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল ।
  • প্রখ্যাত সাংবাদিকদের একাংশের মতে, ঘটনার পর প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে তড়িঘড়ি করে শত শত মরদেহ ট্রাকে করে নিয়ে গণকবর বা একসঙ্গে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল (সিক্রেট মাস ক্রিমেশন), যার কারণে প্রকৃত সংখ্যাটি কখনো অফিশিয়ালি সামনে আসেনি ।

এমনকি পরবর্তীতে পাঞ্জাবের তৎকালীন গভর্নর বি ডি পান্ডে সহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সরকারের দেওয়া ৭০০ বা ৮০০ জনের হতাহতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং জানান যে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা অন্তত ১,২০০ বা তার বেশি ছিল । এই তথ্যের বিশাল ব্যবধানের কারণেই অপারেশন ব্লু স্টারকে কেন্দ্র করে হতাহতের সংখ্যাটি আজও একটি বড় বিতর্কের বিষয়

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব: ইন্দিরা গান্ধী হত্যা ও পরবর্তী সহিংসতা

অপারেশন ব্লু স্টার শিখ সম্প্রদায়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের জন্ম দেয়, যা ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। এর মাত্র চার মাস পর, ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁরই দুই শিখ দেহরক্ষী কর্তৃক নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের পরপরই ভারতজুড়ে, বিশেষত দিল্লিতে, ভয়াবহ শিখবিরোধী দাঙ্গা সংঘটিত হয়, যাতে বহু নিরীহ শিখ নাগরিক প্রাণ হারান — যা ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

চার দশক পরের প্রাসঙ্গিকতা

২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও অপারেশন ব্লু স্টার দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে একটি স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ হয়ে আছে। প্রতি বছর জুন মাসে এর বার্ষিকীতে অমৃতসরে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়, আর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শিখ প্রবাসী সম্প্রদায়ের রাজনীতিতে এই ঘটনার স্মৃতি এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে ভারত সরকারের দৃষ্টিতে এটি জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে — এই দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গিই ঘটনাটিকে আজও একটি জটিল ও বিতর্কিত ঐতিহাসিক অধ্যায়ে পরিণত করে রেখেছে।

উপসংহার

১৯৫০-এর দশকের পাঞ্জাবি স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক টানাপোড়েন কীভাবে ১৯৮৪ সালে একটি পবিত্র ধর্মীয় স্থানে সামরিক অভিযানে রূপ নিল, আর তার পরিণতিতে কীভাবে একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নিহত হলেন এবং ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সংঘটিত হলো — অপারেশন ব্লু স্টার তারই একটি মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত। এই ঘটনা আজও ধর্ম, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মধ্যকার জটিল সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মুদ্রা

নিউজ ডেস্ক

September 9, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant & Economic Content Analyst)

বিভাগ (Category): অর্থনীতি প্রকাশের তারিখ: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

তথ্যসূত্র (Sources): আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ইতিহাস সংকলন, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ প্রতিবেদন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ট্রেডিং ইকোনমিক্স এবং প্রাসঙ্গিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ।


ঢাকা: প্রশ্নটা শুনতে সহজ, কিন্তু উত্তরটা লুকিয়ে আছে বিংশ শতাব্দীর কিছু সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে। “সরকার তো নিজেই টাকা ছাপায়, তাহলে ইচ্ছেমতো ছাপিয়ে সব সমস্যার সমাধান করে ফেলে না কেন?”—এই প্রশ্ন প্রায় সবার মনেই একবার না একবার এসেছে। উত্তর জানতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ইতিহাসের সেইসব অধ্যায়ে, যেখানে ঠিক এই কাজটাই করা হয়েছিল—এবং ফলাফল ছিল ভয়াবহ।

এক টুকরো রুটির জন্য ঠেলাগাড়ি ভর্তি টাকা: জার্মানির ১৯২৩

১৯২৩ সালে জার্মানির ‘হাইপার-ইনফ্লেশন’ (Hyperinflation) মানব ইতিহাসের অন্যতম এক চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়, যেখানে এক টুকরো রুটি বা সামান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে মানুষকে আক্ষরিক অর্থেই ঠেলাগাড়ি বা স্যুটকেসভর্তি টাকা নিয়ে বাজারে যেতে হতো [১]।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির মুদ্রা ‘মার্ক’ (Mark) তার সমস্ত মূল্য হারিয়ে কাগজের টুকরোয় পরিণত হয়েছিল [১]। এই নির্মম বাস্তবতার পেছনের কারণ এবং এর কিছু অবিশ্বাস্য ঐতিহাসিক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

১. কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল?

  • যুদ্ধের বিশাল ঋণ ও জরিমানা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর ১৯১৯ সালের ‘ভার্সাই চুক্তি’ অনুযায়ী জার্মানির ওপর মিত্রবাহিনী (বিশেষ করে ফ্রান্স ও ব্রিটেন) বিশাল অঙ্কের যুদ্ধক্ষতিপূরণ বা জরিমানা চাপিয়ে দেয়।
  • নির্বিচারে টাকা ছাপানো: এই বিপুল পরিমাণ জরিমানা শোধ করার মতো কোনো স্বর্ণ বা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ জার্মানির ছিল না। সংকট কাটাতে জার্মান সরকার কোনো উৎপাদন না বাড়িয়েই দিন-রাত দেদারসে কাগজের মুদ্রা (মার্ক) ছাপাতে শুরু করে [১]।
  • মুদ্রার ধস: বাজারে কাগজের নোটের বন্যা বয়ে যাওয়ার কারণে মুদ্রার মান অবিশ্বাস্য দ্রুততায় কমতে থাকে। ১৯১৪ সালে যেখানে ৪ মার্কে ১ ডলার পাওয়া যেত, ১৯২৩ সালের নভেম্বরের মধ্যে তা দাঁড়ায় ৪.২ ট্রিলিয়ন (৪,২০০,০০০,০০০,০০০) মার্কে ১ ডলার!

২. ১৯২৩ সালের কিছু অবিশ্বাস্য ও নির্মম বাস্তব চিত্র

  • ঠেলাগাড়ির ব্যবহার: কাগজের নোটের মান এতই কমে গিয়েছিল যে, একটি পাউরুটি বা এক কেজি আলু কিনতে কোটি কোটি মার্কের প্রয়োজন হতো। পকেটে বা মানিব্যাগে সেই টাকা আস্ত না বলে মানুষ ঠেলাগাড়ি, বড় লন্ড্রি ঝুড়ি বা স্যুটকেস ভরে টাকা নিয়ে বাজারে যেত [১]।
  • টাকা গোনার চেয়ে ওজন করা সস্তা: দোকানে কেনাকাটার সময় দোকানিরা টাকা গুনে নেওয়ার সময় পেতেন না। তারা স্কেলে মেপে কিলোগ্রাম বা পাউন্ড হিসেবে টাকা জমা নিতেন।
  • কয়লার চেয়ে টাকা পোড়ানো সাশ্রয়ী: শীতকালে ঘর গরম রাখার জন্য কয়লা বা কাঠ কেনার চেয়ে কাগজের নোট পুড়িয়ে আগুন পোহানো অনেক বেশি সস্তা ছিল। গৃহিণীরা ঘরের উনুন ধরাতে বা রান্নার কাজে টাকার বান্ডিল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতেন।
  • বাচ্চাদের খেলার সামগ্রী: নোটের কোনো মূল্য না থাকায় অনেক পরিবারে শিশুদের খেলার জন্য ঘুড়ি বানাতে বা ঘর সাজানোর ওয়ালপেপার হিসেবে কোটি কোটি মার্কের নোট দেয়াল তৈরিতে আঠা দিয়ে লাগানো হতো।
  • দিনে দুইবার বেতন: মুদ্রাস্ফীতি প্রতি ঘণ্টায় বাড়ত। সকালে যে বেতনের টাকা দিয়ে একটি জুতো কেনা যেত, বিকেলে তা দিয়ে হয়তো একটি ডিমও পাওয়া যেত না। তাই শ্রমিকদের দিনে দুইবার বেতন দেওয়া হতো এবং বেতন পাওয়ার সাথে সাথে তারা কাজ ফেলে বাজারে ছুটতেন, যাতে টাকাটা কাগজের টুকরো হওয়ার আগেই কিছু কিনে ফেলা যায়।

৩. এই সংকট থেকে জার্মানির মুক্তি

১৯২৩ সালের শেষের দিকে জার্মানি তাদের পুরনো কারেন্সি ‘মার্ক’ সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়। এরপর ‘রেন্টেনমার্ক’ (Rentenmark) নামে একটি নতুন মুদ্রা চালু করা হয়, যার ভিত্তি ছিল দেশের বন্ধকী জমি ও শিল্পসম্পদ। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে জার্মানির অর্থনীতি স্থিতিশীলতায় ফেরে।

যখন নোটের চেয়ে সস্তা ছিল জ্বালানি কাঠ: হাঙ্গেরি ১৯৪৬

জার্মানির ১৯২৩ সালের অর্থনৈতিক সংকট যদি রূপকথার মতো শোনায়, তবে ১৯৪৬ সালের হাঙ্গেরির ‘হাইপার-ইনফ্লেশন’ (Hyperinflation) ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে চরম ও ভয়ংকর অর্থনৈতিক বিপর্যয় জার্মানি বা জিম্বাবুয়ে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে আজ পর্যন্ত নথিভুক্ত সবচেয়ে দ্রুতগতির এবং ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী হাঙ্গেরিতে

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, হাঙ্গেরির মুদ্রা ‘পেঙ্গো’ (Pengő) তার সমস্ত ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে আক্ষরিক অর্থেই আবর্জনায় পরিণত হয়েছিল । কাগজের নোটের মান এত নিচে নেমে গিয়েছিল যে, শীতের রাতে ঘর গরম রাখতে জ্বালানি কাঠ বা কয়লা কেনার চেয়ে কাগজের নোটের বান্ডিল পোড়ানো অনেক বেশি সস্তা ও সাশ্রয়ী ছিল

নিচে এই অবিশ্বাস্য ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির মূল চিত্রগুলো তুলে ধরা হলো:

১. ইতিহাসের দ্রুততম ও চরম মুদ্রাস্ফীতি

  • প্রতি ১৫ ঘণ্টায় দাম দ্বিগুণ: ১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে হাঙ্গেরির মাসিক মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৪১.৯ কোয়াড্রিলিয়ন শতাংশ (৪১.৯ এর পর ১৪টি শূন্য) ! এর মানে বাজারে প্রতি ১৫ ঘণ্টায় পণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়ে যেত
  • সকালের বেতন বিকেলে পকেটমানি: একজন শ্রমিক সকালে যে বেতন পেতেন, দুপুরের মধ্যে তার ৪০% মান কমে যেত এবং রাতের খাবারের সময় নাগাদ তা স্রেফ পকেটমানিতে পরিণত হতো । মানুষ বেতন পাওয়ার সাথে সাথে বাজারে দৌড়াতেন, কারণ কয়েক ঘণ্টা দেরি করলেই সেই টাকা দিয়ে আর কিছুই কেনা সম্ভব হতো না

২. কাগজের নোটের চেয়ে জ্বালানি কাঠ দামি হওয়ার কারণ

  • কাগজের চেয়ে সস্তা টাকা: হাঙ্গেরির মুদ্রা এতটাই মূল্যহীন হয়ে পড়েছিল যে, সমপরিমাণ মূল্যের জ্বালানি কাঠ, সাধারণ কয়লা বা এমনকি সাধারণ লেখার সাদা কাগজ কিনতে যে পরিমাণ নোট দিতে হতো, তার চেয়ে সেই নোটগুলো সরাসরি আগুনে পুড়িয়ে ফেলা অনেক লাভজনক ছিল
  • রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার সামগ্রী: সে সময় হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের রাস্তায় সাধারণ মানুষ কোটি কোটি পেঙ্গোর নোট ফেলে দিত। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা থেকে ময়লার মতো টাকার নোটের স্তূপ ডাস্টবিনে ফেলতেন।
  • নোটের সাহায্যে আগুন জ্বালানো: ইতিহাসের কিছু বিখ্যাত ছবিতে দেখা যায় হাঙ্গেরির নারীরা তাঁদের উনুন ধরাতে বা সিগারেটে আগুন ধরাতে ম্যাচের কাঠির বদলে জ্বলন্ত পেঙ্গো নোটের মোড়ক ব্যবহার করছেন

৩. পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ অঙ্কের নোট

মুদ্রাস্ফীতির সাথে তাল মেলাতে হাঙ্গেরির কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকার অঙ্কের পেছনে একের পর এক শূন্য বসাতে থাকে তারা প্রথমে ‘মিলপেঙ্গো’ (১০ লাখ পেঙ্গো) এবং পরে ‘বিলপেঙ্গো’ (১ লাখ কোটি পেঙ্গো) চালু করে । হাঙ্গেরিই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রচলিত হওয়া সর্বোচ্চ অঙ্কের নোট ছাপিয়েছিল, যার মান ছিল ১০০ কুইন্টিলিয়ন (১০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ বা ১০^২০) পেঙ্গো !

৪. কেন হয়েছিল এই বিপর্যয়?

  • যুদ্ধের ধ্বংসলীলা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হাঙ্গেরির প্রায় ৪০% জাতীয় সম্পদ এবং ৯০% শিল্পকারখানা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়
  • সোভিয়েত দখলদারিত্ব ও জরিমানা: যুদ্ধের পর হাঙ্গেরি সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং তাদের ওপর বিশাল অঙ্কের যুদ্ধক্ষতিপূরণ চাপানো হয় । এই খরচ মেটাতে কোনো ব্যাক-আপ ছাড়াই হাঙ্গেরির সরকার দিন-রাত নির্বিচারে টাকা ছাপাতে শুরু করে, যা অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়

৫. যেভাবে এলো মুক্তি

১৯৪৬ সালের ১লা আগস্ট হাঙ্গেরি সরকার এক ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নেয় । তারা মৃতপ্রায় কারেন্সি ‘পেঙ্গো’ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে । এর পরিবর্তে ‘ফোরিন্ট’ (Forint) নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন মুদ্রা চালু করা হয় । ১টি নতুন ফোরিন্ট পেতে হাঙ্গেরীয়দের দিতে হয়েছিল ৪০০ অক্ট্রিলিয়ন (৪-এর পিঠে ২৯টি শূন্য) পুরনো পেঙ্গো ! এই মুদ্রা পরিবর্তনের মাধ্যমে হাঙ্গেরির অর্থনীতিতে আবার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরে আসে ।

একুশ শতকের উদাহরণ: জিম্বাবুয়ে ও ভেনেজুয়েলা

ইতিহাসের এই শিক্ষা যে শুধু অতীতের বিষয় নয়, তার প্রমাণ মিলেছে একুশ শতকেও। ২০০০-এর দশকে জিম্বাবুয়ের সরকার সরকারি ব্যয় মেটাতে অবিরাম টাকা ছাপাতে থাকে, যার ফলে দেশটির মুদ্রাস্ফীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে শেষ পর্যন্ত ১০০ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যমানের নোট পর্যন্ত ছাপাতে হয়েছিল—যা বাস্তবে কার্যত মূল্যহীন ছিল। একই ধরনের সংকট দেখা গেছে ভেনেজুয়েলায়, যেখানে তেল রাজস্ব কমে যাওয়ার পর সরকার ঘাটতি পূরণে ব্যাপক হারে মুদ্রা ছাপায়, ফলে দেশের মুদ্রার মূল্য কার্যত ধসে পড়ে এবং লাখো মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়।

অর্থনীতির সহজ নিয়ম: টাকা বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ে, টাকার মূল্য কমে

এই সব ঘটনার পেছনে কাজ করে একটি সহজ কিন্তু কঠোর অর্থনৈতিক নিয়ম। একটি দেশের অর্থনীতিতে পণ্য ও সেবার পরিমাণ যদি স্থির থাকে, কিন্তু টাকার সরবরাহ হঠাৎ বহুগুণ বেড়ে যায়, তাহলে একই পরিমাণ পণ্য কেনার জন্য মানুষের হাতে বেশি টাকা চলে আসে। ফলে বিক্রেতারা দাম বাড়িয়ে দেন, কারণ চাহিদা বেড়ে গেলেও উৎপাদন বাড়েনি। এই প্রক্রিয়া একবার শুরু হলে থামানো কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ মানুষ যখন বুঝতে পারে টাকার মূল্য দ্রুত কমছে, তখন তারা যত দ্রুত সম্ভব টাকা খরচ করে ফেলতে চায়—যা দামকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এভাবেই তৈরি হয় একটি ধ্বংসাত্মক চক্র।

তাহলে সরকার ঋণ নেয় কেন, টাকা ছাপায় না কেন?

এই প্রশ্নের উত্তরও লুকিয়ে আছে উপরের উদাহরণগুলোর মধ্যে। সরকার যখন আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ঋণ নেয়, তখন সেই অর্থ বাজারে থাকা বিদ্যমান টাকারই পুনর্বণ্টন হয়—নতুন করে টাকা ছাপানো হয় না, তাই মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে। বিপরীতে, নতুন টাকা ছাপিয়ে খরচ মেটানো মানে অর্থনীতিতে “বাস্তব উৎপাদন” ছাড়াই টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া, যা সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। এই কারণেই আধুনিক অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বতন্ত্র রাখার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে—যাতে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক চাপে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন না হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: সতর্কতার পাঠ

বাংলাদেশ ব্যাংকও একই আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও বিনিময় হারের চাপের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মুদ্রানীতি নিয়ে আলোচনা বেড়েছে, যেখানে অর্থনীতিবিদরা বারবার সতর্ক করেছেন—অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ স্বল্পমেয়াদে সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে—ঠিক যেভাবে তা ঘটেছিল জার্মানি, হাঙ্গেরি, জিম্বাবুয়ে ও ভেনেজুয়েলায়।

উপসংহার

ইতিহাস বারবার একই শিক্ষা দিয়েছে—মুদ্রা ছাপানো কোনো জাদুকরী সমাধান নয়, বরং এটি একটি দ্বিধারী তলোয়ার। সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত মুদ্রা সরবরাহ অর্থনীতিকে সচল রাখে, কিন্তু লাগামহীন মুদ্রা সরবরাহ একটি দেশের সমগ্র অর্থব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিতে পারে কয়েক মাসের মধ্যেই। এই কারণেই আধুনিক বিশ্বের প্রতিটি দায়িত্বশীল সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা সরবরাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ও নিয়ন্ত্রিত নীতি অনুসরণ করে চলে।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২৭শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ