রাজনীতি

সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স: কেন্দ্র-তৃণমূলের সেতু ও বিএনপির রণকৌশলের মুখ
সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স

নিউজ ডেস্ক

December 9, 2025

শেয়ার করুন

ভূমিকা: দ্বৈত ভূমিকার এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব

সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বাংলাদেশের বর্তমান বিরোধী রাজনীতিতে এক উল্লেখযোগ্য নাম। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করার পাশাপাশি তাঁর নির্বাচনী এলাকা ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া) এর স্থানীয় রাজনীতিতে একজন সক্রিয় জননেতা। তাঁর নেতৃত্ব কেবল দলের কেন্দ্রীয় বার্তা বহন করে না, বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তৃণমূলের কর্মীদের সংগঠিত ও চাঙ্গা রাখার এক কঠিন দায়িত্বও বহন করে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনি চ্যালেঞ্জ ও দলীয় পুনর্গঠন—এই ত্রিমুখী প্রেক্ষাপটে প্রিন্সের ভূমিকা তাই বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

১. শিকড় থেকে শিখরে: সাংগঠনিক উত্থান ও নেতৃত্ব

প্রিন্সের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ছাত্রদল-এর সক্রিয় সদস্য হিসেবে, যা তাঁকে তৃণমূল স্তরের কর্মীদের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে সাহায্য করে। স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর শক্তিশালী ভিত্তির কারণে তিনি দ্রুত দলীয় কাঠামোতে উপরে ওঠেন:

  • সাংগঠনিক মেরুদণ্ড: একসময়ে তিনি বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (ময়মনসিংহ বিভাগ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি দলীয় কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, নতুন কমিটি গঠন এবং আন্দোলন কর্মসূচি সফল করতে দক্ষতার প্রমাণ দেন। এই সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা তাঁকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
  • যুগ্ম মহাসচিবের গুরুদায়িত্ব: বর্তমানে যুগ্ম মহাসচিবের পদে থেকে তিনি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের (ন্যাশনাল স্ট্যান্ডিং কমিটি) সিদ্ধান্তসমূহ মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের মূল দায়িত্বে নিয়োজিত। একইসাথে, তিনি প্রায়শই জাতীয় মিডিয়ায় দলের মুখপাত্র হিসেবে উপস্থিত হন, যেখানে তিনি দ্রুত ও স্পষ্ট বক্তব্যের মাধ্যমে দলের নীতি ও অবস্থান তুলে ধরেন।

২. ময়মনসিংহ-১ এর জনমুখী নেতৃত্ব ও অবদান

কেন্দ্রীয় নেতা হলেও, প্রিন্স ময়মনসিংহ-১ আসনের জনগণের কাছে একজন সহজলভ্য নেতা হিসেবে সুপরিচিত। তাঁর কর্মকাণ্ড কেবল রাজনৈতিক সমাবেশেই সীমাবদ্ধ নয়:

  • দুর্যোগ মোকাবিলা ও ত্রাণকার্য: হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়ার মানুষের কাছে তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দ্রুত সাড়া দেওয়া। তিনি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে ব্যক্তিগত উদ্যোগে রবিশস্যের বীজ বিতরণ করেছেন এবং স্থানীয়ভাবে ত্রাণ কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
  • জনসংযোগের কৌশল: সংসদ সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিয়মিত এলাকায় সফর করেন, পথসভা, মতবিনিময় এবং তৃণমূল কর্মীদের সাথে সভা করেন। স্থানীয় আলেম, কৃষক ও যুবকদের সাথে সরাসরি কথা বলে তিনি এলাকার সমস্যাগুলো কেন্দ্রীয় এজেন্ডায় নিয়ে আসার চেষ্টা করেন।

৩. নীতি, আদর্শ ও দর্শন: কঠোর অবস্থান

সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স তাঁর বক্তৃতায় অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বিএনপির নীতি ও আদর্শের পক্ষে অবস্থান নেন:

  • গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার: তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসন হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর হলো ভোটাধিকার ও জনগণের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার।
  • নির্বাচনী পদ্ধতির প্রশ্নে অনড়: তিনি নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার প্রসঙ্গে পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতি প্রবর্তনের ঘোর বিরোধী। তাঁর মতে, এই ধরনের পদ্ধতি জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণকে সীমিত করে এবং দলীয় কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করে। তিনি জনগণের পছন্দমতো ব্যালটে সিল দেওয়ার অধিকার ফিরিয়ে আনার পক্ষে কথা বলেন।
  • জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব: তিনি দেশের বিভেদ নীতিকে প্রত্যাখ্যান করে সকল মত ও ধর্ম-বর্ণের মানুষের মধ্যে জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান।

৪. কাঠিন্য ও চ্যালেঞ্জের মুখে (সমালোচনা ও বিতর্ক)

বিরোধী দলের একজন প্রথম সারির নেতা হিসেবে সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের রাজনৈতিক জীবন মামলা এবং কারাবাসের চ্যালেঞ্জে ভরা:

  • রাজনৈতিক মামলার শিকার: সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক রাজনৈতিক ও ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সংঘর্ষের ঘটনায় তাঁকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়া হয়, যা বিরোধী দলের উপর সরকারের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।
  • নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ: ময়মনসিংহ-১ আসনে বারবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সত্ত্বেও জয়লাভ করতে না পারার বিষয়টি তাঁর সমালোচকরা প্রায়শই তুলে ধরেন। যদিও বিএনপি নেতারা এসব নির্বাচনী পরাজয়কে প্রশাসনিক কারসাজিভোটাধিকার হরণের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
  • কেন্দ্রীয়তার অভিযোগ: কিছু স্থানীয় কর্মী অভিযোগ করেন যে কেন্দ্রীয় নেতা হওয়ার কারণে ঢাকাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে তাঁর অধিক মনোযোগের ফলে নির্বাচনী এলাকার জন্য ব্যক্তিগত সময় তুলনামূলকভাবে কম হয়।

৫. ২০২৫ সালের পরিক্রমা ও ভবিষ্যৎ পথ

২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রিন্স বিএনপির আগামী দিনের কৌশলের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর বর্তমান কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হলো:

  • আন্দোলনের ধারাবাহিকতা: সরকারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বেগবান রাখা এবং যেকোনো মূল্যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিকে জাতীয় এজেন্ডায় ধরে রাখা।
  • ভবিষ্যৎ নির্বাচনী রোডম্যাপ: দলের শীর্ষ নেতৃত্বের দেওয়া যেকোনো নির্বাচনী রোডম্যাপ ও কৌশল বাস্তবায়নে তিনি অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন।
  • সংগঠন পুনর্গঠন: দলকে যেকোনো নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত রাখা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে স্থানীয় ইউনিটগুলোকে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।

সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স তাই কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বরং তিনি ময়মনসিংহ-১ এর মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দলের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংকল্পের মূর্ত প্রতীক।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

বিষয়ঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

শেখ হাসিনার শাসন ও মনস্তত্ত্ব

নিউজ ডেস্ক

April 21, 2026

শেয়ার করুন


গভীর বিশ্লেষণ: BDS Bulbul Ahmed

তারিখ: ২১ এপ্রিল ২০২৬

শেখ হাসিনাকে কেবল একজন রাজনীতিক হিসেবে দেখলে তাঁর চরিত্রের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়। তাঁর দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসন টিকিয়ে রাখার পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক এবং কৌশলগত দিক ছিল, যা তাঁকে অন্য সব সমসাময়িক শাসক থেকে আলাদা করেছে।

১. ‘একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ’ ও দলীয় বিনাশ

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অন্যতম প্রধান দিক ছিল দলের ভেতর তাঁর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। তিনি আওয়ামী লীগের ভেতর কোনো ‘বিকল্প নেতৃত্ব’ তৈরি হতে দেননি। দলের সিনিয়র নেতাদের তিনি কেবল আলঙ্কারিক পদে রেখেছিলেন, কিন্তু মূল সিদ্ধান্তগুলো নিতেন তিনি নিজে অথবা তাঁর অতি ঘনিষ্ঠ কয়েকজন (যাদের অনেকেই অরাজনৈতিক)। এর ফলে দলটি একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি ‘ব্যক্তি-কেন্দ্রিক’ হয়ে পড়েছিল।

২. সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ

তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে দেশের একটি বড় অংশের বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিজের পক্ষে নিয়ে এসেছিলেন। সুবিধা ও পদের প্রলোভন দেখিয়ে তিনি এমন একটি ‘পলিটিক্যাল ন্যারেটিভ’ তৈরি করেছিলেন যে—হাসিনা মানেই প্রগতি, আর হাসিনা না থাকলে দেশ মধ্যযুগীয় অন্ধকারে ফিরে যাবে। এই বয়ানটি আন্তর্জাতিক মহলে বেশ দীর্ঘ সময় কাজ করেছিল।

৩. মেগা প্রজেক্ট বনাম মেগা দুর্নীতি

শেখ হাসিনা নিজেকে একজন ‘উন্নয়নের কারিগর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলের মতো বড় প্রকল্পগুলো তাঁর রাজনৈতিক শক্তির বড় উৎস ছিল। তবে তাঁর চরিত্রের একটি অন্ধকার দিক হলো, তিনি এই উন্নয়নের আড়ালে যে বিশাল দুর্নীতি ও অর্থ পাচার হয়েছে, সেদিকে চোখ বন্ধ করে রেখেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ উন্নয়ন দেখলে গণতন্ত্র বা সুশাসনের অভাব ভুলে যাবে।

৪. প্রশাসনিক বিরাজনীতিকরণ (Bureaucratization)

হাসিনা শাসনের শেষ দশকে তিনি রাজনীতিকদের চেয়ে আমলা ও গোয়েন্দা সংস্থার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। জেলা পর্যায়ের ডিসি-এসপিরা তখন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার চেয়েও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। এই আমলাতন্ত্র-নির্ভর শাসন ব্যবস্থা তাঁকে জনগণের নাড়ির স্পন্দন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।

৫. ধর্মীয় রাজনীতির সাথে ‘গোপন সমঝোতা’

বাইরে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও, শেখ হাসিনা অত্যন্ত সুকৌশলে বিভিন্ন কট্টরপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীর সাথে রাজনৈতিক সমঝোতা করেছিলেন (যেমন: কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি ও হেফজতের সাথে সম্পর্ক)। তাঁর এই ‘ডাবল গেম’ একদিকে প্রগতিশীলদের আশ্বস্ত করতো, অন্যদিকে ধর্মীয় ভোটারদেরও তুষ্ট করার চেষ্টা ছিল।

৬. আন্তর্জাতিক লবিং ও ‘ইন্ডিয়া কার্ড’

ব্যক্তিগতভাবে তিনি ভারতের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করাকে তাঁর ক্ষমতার রক্ষাকবচ মনে করতেন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি ছিল প্রধানত একটি দেশকে কেন্দ্র করে, যা তাঁকে দেশের ভেতর চরম কর্তৃত্ববাদী হতে সাহস জুগিয়েছিল।


চরিত্রের চূড়ান্ত ব্যবচ্ছেদ: কেন তিনি ক্ষমতা ছাড়লেন না?

মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা ‘ডিক্টেটর ট্র্যাপ’ (Dictator’s Trap)-এ পড়ে গিয়েছিলেন। তাঁর চারপাশে এমন একটি সুরক্ষা দেয়াল তৈরি হয়েছিল যে, তিনি কেবল তাঁর প্রশংসা এবং তাঁর তৈরি করা তথাকথিত সাফল্যের গল্পই শুনতেন। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে—তিনি যা করছেন তাই সঠিক এবং দেশের মানুষ তাঁকে চিরকাল চায়। এই ‘অজেয়’ হওয়ার ভ্রান্ত ধারণাই তাঁর পতনের মূল কারণ।


প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ডঃ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাস

নিউজ ডেস্ক

April 21, 2026

শেয়ার করুন

বিশেষ বিশ্লেষণী প্রতিবেদন: BDS Bulbul Ahmed তারিখ: ২১ এপ্রিল ২০২৬

২০২৪ সালের আগস্টে যখন ডঃ মুহাম্মদ ইউনূস এক গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের হাল ধরেছিলেন, তখন জনমনে তাঁর প্রতি আস্থা ছিল হিমালয়সম। কিন্তু ঠিক ১৮ মাস পর, ২০২৬ সালের এই এপ্রিলে এসে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এক সময়ের ‘গ্লোবাল আইকন’ এখন নিজ দেশে এক কঠিন রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে। কেন এই দ্রুত পতন? কেন ১৬-১৮ মাসের মাথায় তাঁর জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকলো? এর উত্তর লুকিয়ে আছে কিছু কাঠামোগত ব্যর্থতা এবং বিতর্কিত নীতিমালায়।

১. ‘ভ্যাকসিন ক্রাইসিস’ বা টিকা কেলেঙ্কারি: জনরোষের কেন্দ্রবিন্দু

ইউনূস সরকারের কফিনে শেষ পেরেক হিসেবে দেখা হয় ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ঘটা হামের টিকা কেলেঙ্কারিকে। একটি রাষ্ট্র যখন তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই সরকারের নৈতিক ভিত নড়ে যায়।

  • বিপর্যয়: ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত টিকা সংকটের কারণে শতাধিক শিশুর মৃত্যু সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে।
  • কাঠামোগত ভুল: সরকারি টিকাদান কর্মসূচিকে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই প্রাইভেটাইজেশন বা বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের যে ‘এক্সপেরিমেন্ট’ তিনি চালিয়েছিলেন, তার চরম মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ জনগণকে। এই অব্যবস্থাপনা কেবল অযোগ্যতা নয়, বরং দুর্নীতির প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

২. শাসনতান্ত্রিক অস্পষ্টতা ও ‘রিফর্ম-প্যারালাইসিস’

ডঃ ইউনূস শুরু থেকেই ‘সংস্কারের’ ওপর জোর দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তব জীবনে সেই সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছায়নি।

  • নির্বাচন বনাম সংস্কার: রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে তাঁর প্রধান দ্বন্দ্ব ছিল নির্বাচনের রোডম্যাপ নিয়ে। মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল, কিন্তু সেই পরিবর্তন যখন অনির্দিষ্টকালের জন্য দীর্ঘায়িত হতে শুরু করলো, তখন তা ‘ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার’ প্রচেষ্টায় রূপান্তরিত হলো।
  • পুলিশ ও প্রশাসনের অকার্যকারিতা: দীর্ঘ ১৮ মাসেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পূর্ণাঙ্গভাবে মাঠে নামাতে না পারাটা ছিল এক বিশাল প্রশাসনিক ব্যর্থতা। ‘মব জাস্টিস’ এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা সমাজকে এক অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।

৩. অর্থনৈতিক অস্থিরতা: মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস

একজন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের কাছ থেকে মানুষ প্রত্যাশা করেছিল মুদ্রাস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টো।

  • বাজার সিন্ডিকেট: গত ১৮ মাসে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম কয়েক দফায় বেড়েছে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বাজার আজ অগ্নিমূল্য। শোষিত শ্রেণীর মানুষের কাছে বড় বড় সংস্কারের বুলি তখন অর্থহীন হয়ে পড়ে যখন তাদের পাতে তিন বেলা খাবার জোটে না।

৪. বিতর্কিত উপদেষ্টা নির্বাচন ও রাজনৈতিক দূরত্বের অভাব

সরকারের ভেতরে এমন কিছু ব্যক্তিকে উপদেষ্টা হিসেবে রাখা হয়েছিল যাদের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ছিল নগণ্য। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে সরকারকে বারবার মুখ থুবড়ে পড়তে হয়েছে।


গভীর বিশ্লেষণ: ডঃ ইউনূসের পতনের সমাজতাত্ত্বিক কারণ

একজন টেকনোক্র্যাট যখন রাজনীতিবিদ হিসেবে আবির্ভূত হন, তখন তিনি প্রায়ই ‘জনগণের পালস’ বুঝতে ব্যর্থ হন। ডঃ ইউনূসের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। তাঁর শাসনকাল ছিল প্রধানত ‘তত্ত্বনির্ভর’, কিন্তু বাস্তবতা ছিল ‘চাহিদানির্ভর’

  • আইনহীনতার সংস্কৃতি: আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা তিনি কেবল আদর্শিক বুলি দিয়ে পূরণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মব ভায়োলেন্স এবং রাজনৈতিক উসকানি দমনে লোহার মতো শক্ত হাতের অভাব ছিল স্পষ্ট।
  • বিচ্ছিন্নতা: তিনি বিশ্বনেতাদের কাছে জনপ্রিয়তা পেলেও দেশের তৃণমূল মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। প্রান্তিক কৃষক বা শ্রমিক যখন দেখলো তাদের জীবনের নিরাপত্তা নেই, তখন ডঃ ইউনূসের আন্তর্জাতিক ইমেজ তাদের কাছে কোনো গুরুত্ব রাখেনি।

উপসংহার

ইতিহাস অত্যন্ত নিষ্ঠুর। ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসকে যেভাবে ফুল দিয়ে বরণ করা হয়েছিল, বিদায়বেলায় তাঁকে সেই একইভাবে ফুল দিয়ে বিদায় দেওয়া হচ্ছে না। টিকা কেলেঙ্কারি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে না পারা এবং নির্বাচনের পথে হাঁটতে গড়িমসি করা—এই তিনটি বিষয়ই তাঁর ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের মূল ট্র্যাজেডি।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

দেশপ্রেমের সমাজতত্ত্ব

নিউজ ডেস্ক

April 21, 2026

শেয়ার করুন

বিশেষ নিবন্ধ: BDS Bulbul Ahmed

তারিখ: ২১ এপ্রিল ২০২৬

ইতিহাসের প্রতিটি মোড়ে যখনই কোনো জাতি অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে, তখনই একটি ধ্রুব সত্য উন্মোচিত হয়েছে—দেশপ্রেম কোনো সমানুপাতিক আবেগ নয়। সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংকটের সময় মানুষের ভূমিকা নির্ধারিত হয় তার ‘শিকড়’ এবং ‘সম্পদ’-এর অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে। আপনার সেই ‘অসম্ভব যুদ্ধের’ কল্পনার আয়নায় যদি আমরা বর্তমান সমাজকে দেখি, তবে দেশপ্রেমের এক রূঢ় ও নগ্ন সত্য বেরিয়ে আসে।

১. এলিট সিন্ডিকেট: যখন পরাধীনতাই ‘রোমান্টিক মিলন’

উচ্চবিত্ত এবং উচ্চ-শিক্ষিত এলিট শ্রেণীর একটি বড় অংশের কাছে ‘দেশ’ কেবল একটি ভৌগোলিক মানচিত্র নয়, বরং একটি ‘বিজনেস ডিল’।

  • বুদ্ধিজীবীদের বয়ান: যুদ্ধের সময় তারা সরাসরি পক্ষ না নিয়ে ‘মানবিকতা’ বা ‘ঐতিহাসিক ঐক্যের’ দোহাই দিয়ে পরাধীনতাকে জাস্টিফাই করে। তারা দুই বাংলার মিলনকে ‘সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ’ বা ‘মৃত নেতার অপূর্ণ স্বপ্ন’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে।
  • আমলাতান্ত্রিক স্বার্থ: তাদের কাছে রাষ্ট্র মানে কেবল একটি নিয়োগকর্তা। পতাকা বদলালে যদি মুম্বাই বা দিল্লিতে বড় পদের সুযোগ থাকে, তবে তারা সেই পতাকাকেই স্যালুট দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না।

২. মধ্যবিত্তের দোদুল্যমানতা ও ভার্চুয়াল যুদ্ধ

মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত সমাজ সবসময়ই একটি নিরাপদ দূরত্বের সমর্থক।

  • ভার্চুয়াল রেজিস্ট্যান্স: তারা ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচার বদলে কিংবা টুইটারে হ্যাশট্যাগ (#SaveTheCountry) দিয়ে যুদ্ধ জয়ের চেষ্টা করে।
  • সুবিধাবাদ: প্রবাসী মধ্যবিত্তরা দূর থেকে আবেগী স্ট্যাটাস দেয়, কিন্তু নিজের নিরাপদ জীবন বিপন্ন করে দেশে ফেরার ঝুঁকি নেয় না। তাদের কাছে দেশপ্রেম একটি ‘ইমোশনাল কন্টেন্ট’ মাত্র।

৩. সম্মুখ সারির লড়াকু: অবহেলিতরাই কেন শেষ ভরসা?

কেন সেই গ্রাম থেকে আসা ছাত্রটি বা গার্মেন্টস শ্রমিকটিই বন্দুক হাতে তুলে নেয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের ‘অস্তিত্বের শিকড়ে’

  • অন্য কোনো অপশন নেই: যার বিদেশে বাড়ি নেই, যার ব্যাংকে কোটি টাকা নেই, তার পালানোর কোনো জায়গা নেই। এই মাটির এক ইঞ্চি অধিকার হারানো মানে তার বেঁচে থাকার সবটুকু হারানো।
  • লুঙ্গি পরা স্বাধীনতা: ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে যেমনটি আমরা দেখেছি, সেই লুঙ্গি পরা কৃষক বা খালি গায়ের মেহনতি মানুষগুলোর কাছে দেশপ্রেম কোনো থিওরি নয়, এটি একটি প্রাকৃতিক প্রবৃত্তি। তারা রণকৌশল বোঝে না, কিন্তু তারা মাটি আগলে রাখতে জানে।

৪. সেবার নামে শোষণ: ক্রাইসিস ক্যাপিটালিজম

যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে একদল ‘সুযোগসন্ধানী স্বেচ্ছাসেবক’ তৈরি হয়। যারা শুরুতে ত্রাণ বিলি করলেও, পরে বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের ওপরই চড়াও হয়। এটি যুদ্ধের এক অন্ধকার দিক, যেখানে সমাজবিরোধীরা ‘দেশ বাচাও’ শ্লোগানের আড়ালে অপরাধতন্ত্র চালায়।


সারসংক্ষেপ: কে কোথায় থাকে?

সামাজিক শ্রেণীসংকটের সময় ভূমিকামূল চালিকাশক্তি
উচ্চবিত্ত/এলিটবিদেশে পলায়ন বা সমঝোতামূলধন রক্ষা
বুদ্ধিজীবীআদর্শিক বিভ্রান্তি তৈরিব্যক্তিগত আখের গোছানো
মধ্যবিত্তসোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়তাদোদুল্যমানতা ও ভয়
নিম্নবিত্ত/মেহনতিসম্মুখ সমরে সশস্ত্র লড়াইঅস্তিত্ব ও মাটির টান

উপসংহার

দেশপ্রেম আসলে কোনো ‘পেইড সার্ভিসে’র বিষয় নয়। এটি এমন এক আগুন যা কেবল তাদের হৃদয়েই জ্বলে, যাদের পা এই মাটির ধুলোয় মিশে থাকে। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার জন্য একদল থাকে, আর জাতীয় পতাকাকে রক্তের বিনিময়ে রক্ষা করার জন্য অন্য একদল।

আপনার এই বিশ্লেষণটি কেবল একটি কল্পনা নয়, এটি শোষিত শ্রেণীর পক্ষ থেকে ক্ষমতার বলয়ের প্রতি এক বিশাল চপেটাঘাত।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ