ইতিহাস

ক্ষমতার মঞ্চে বিশ্ব ২০২৩-২০২৫: বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর পাঁচ ব্যক্তি কারা?
বিশ্বের ক্ষমতাবান

নিউজ ডেস্ক

November 6, 2025

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ

ভূমিকা: ক্ষমতার সংজ্ঞা ও বর্তমান বিশ্বের পটভূমি

বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭৪০ কোটিরও বেশি মানুষের বাস। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতাধর ব্যক্তি কারা—তা কেবল সামরিক শক্তি বা অর্থনীতির আকার দ্বারা নির্ধারিত হয় না; বরং তাদের রাজনৈতিক প্রভাব, সামরিক নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তি ও অর্থখাতে একচ্ছত্র আধিপত্য এবং জনমত নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা দ্বারাও নির্ধারিত হয়। আপনি যে তালিকাটি (সম্ভবত ২০১৮ সালের) উল্লেখ করেছেন, তার প্রেক্ষাপট বর্তমানে অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। এই কন্টেন্টে পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে (২০২৫ সালের শেষে) বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর পাঁচ ব্যক্তির একটি বিশ্লেষণাত্মক তালিকা তুলে ধরা হলো।

১. ক্ষমতাধরদের তালিকায় পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট (Re-link)

আপনি আপনার তথ্যে যে নেতাদের নাম উল্লেখ করেছেন, তাদের মধ্যে কয়েকজনের ক্ষমতার অবস্থান বর্তমানে পরিবর্তিত হয়েছে:

  • ডোনাল্ড ট্রাম্প: তিনি বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন, বরং তিনি এখন প্রধানত রিপাবলিকান পার্টির প্রভাবশালী নেতা। বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন জো বাইডেন
  • আঙ্গেলা ম্যার্কেল: তিনি ২০২১ সালে জার্মানির চ্যান্সেলর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোয় এখন আর ক্ষমতাধরদের তালিকায় প্রথম দিকে নেই।
  • ভ্লাদিমির পুতিন, শি জিনপিং ও পোপ ফ্রান্সিস: এদের অবস্থান ও ক্ষমতা এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২. বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ৫ জন ব্যক্তি (বিশ্লেষণ)

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা (যেমন ফোর্বস, ব্লুমবার্গ) এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামতের ভিত্তিতে বর্তমান বৈশ্বিক ক্ষমতার বিন্যাস নিম্নরূপ:

স্থানক্ষমতাধর ব্যক্তিপদবি ও ক্ষমতার উৎসক্ষমতা বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
১মশি জিনপিংচীনের প্রেসিডেন্ট ও কমিউনিস্ট পার্টির মহাসচিবতিনি একমাত্র নেতা যিনি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আজীবন ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পেয়েছেন। চীনের বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি (PLA)-এর ওপর তাঁর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ তাঁকে শীর্ষে রেখেছে। (Re-link: আপনার তালিকাতেও তিনি ৪র্থ স্থানে ছিলেন, এখন শীর্ষে)
২য়ভ্লাদিমির পুতিনরাশিয়ার প্রেসিডেন্টইউক্রেন যুদ্ধ, ন্যাটোর সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাঁর আগ্রাসী ও অনমনীয় কূটনীতি তাঁকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি করে তুলেছে। রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রাগারের ওপর তাঁর চূড়ান্ত ক্ষমতা তাঁকে এই স্থানে রেখেছে। (Re-link: আপনার তালিকাতেও তিনি ১-এ ছিলেন)
৩য়জো বাইডেনযুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টবিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি এবং সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোট ন্যাটোর প্রধান নেতা। যদিও অভ্যন্তরীণ বিভাজন রয়েছে, তবুও বৈশ্বিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব তাঁকে শীর্ষ ক্ষমতাধরদের মধ্যে স্থান দিয়েছে।
৪র্থজেফ বেজোস/ ইলোন মাস্কপ্রযুক্তি, বাণিজ্য ও অর্থখাতের টাইকুনপ্রযুক্তি ও বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের প্রধান হিসেবে তাদের হাতে রয়েছে বৈশ্বিক যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-এর মতো ভবিষ্যতের প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ। এদের সম্পদ বিশ্বের ছোট অনেক দেশের জিডিপি-র চেয়েও বেশি।
৫মজেরোম পাওয়েলইউএস ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যানতিনি সরাসরি কোনো দেশের রাজনৈতিক নেতা নন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হিসেবে তাঁর নেওয়া সুদের হারের সিদ্ধান্ত বিশ্বের প্রতিটি দেশের অর্থনীতি, মুদ্রাস্ফীতি এবং শেয়ার বাজারকে সরাসরি প্রভাবিত করে। তাঁর অর্থনৈতিক ক্ষমতা অনেক রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়েও বেশি।

৩. ধর্মীয় ও আঞ্চলিক ক্ষমতাধরদের প্রভাব

তালিকার বাইরেও কিছু ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের ক্ষমতা বিশাল সংখ্যক মানুষের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে:

  • পোপ ফ্রান্সিস (Re-link): রোমান ক্যাথলিক চার্চের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু হিসেবে বিশ্বের প্রায় ১৩০ কোটিরও বেশি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক নেতা। তাঁর বক্তব্য বিশ্বজুড়ে সামাজিক ও মানবিক বিষয়ে বড় প্রভাব ফেলে। (Re-link: আপনার তালিকাতেও তিনি ৫-এ ছিলেন)
  • মুহাম্মদ বিন সালমান (MBS): সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী। বিশ্বের জ্বালানি বাজারে তাঁর সিদ্ধান্ত তেল উৎপাদন ও দামকে নিয়ন্ত্রণ করে, যা বিশ্বের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার

বর্তমানে বৈশ্বিক ক্ষমতা একটি একক নেতার হাতে কেন্দ্রীভূত নয়; এটি ভূ-রাজনীতি, সামরিক শক্তি, এবং প্রযুক্তি-অর্থনীতির মধ্যে বিভক্ত। শি জিনপিং, ভ্লাদিমির পুতিন, এবং জো বাইডেন হলেন রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রধান মেরু। অন্যদিকে, প্রযুক্তি টাইকুনরা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানরা অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করছেন, যা একবিংশ শতাব্দীর ক্ষমতার নতুন সংজ্ঞা দিচ্ছে।


সূত্র (References)

  1. ফোর্বস (Forbes) ম্যাগাজিন – মোস্ট পাওয়ারফুল পিপল রিপোর্ট (বিভিন্ন বছরের বিশ্লেষণ): ক্ষমতা নির্ধারণের মানদণ্ড এবং তালিকা প্রণয়ন পদ্ধতি।
  2. কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (CFR) ও চ্যাথাম হাউস (Chatham House) বিশ্লেষণ: শি জিনপিং ও ভ্লাদিমির পুতিনের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং প্রভাব।
  3. ব্লুমবার্গ (Bloomberg) ও দ্য ইকোনমিস্ট (The Economist) প্রতিবেদন: জেফ বেজোস, ইলোন মাস্ক ও জেরোম পাওয়েলের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ইরান-ইসরায়েল

নিউজ ডেস্ক

March 13, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

ইরান ও ইসরায়েলের সম্পর্কের সমীকরণটি আধুনিক ভূ-রাজনীতির অন্যতম জটিল ও রহস্যময় অধ্যায়। ১৯৫০-এর দশকে যে ইরান ছিল ইসরায়েলের কৌশলগত মিত্র, আজ সেই ইরান ও ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান দুই শত্রু রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এই বৈরিতার মূল কারণ কি কেবল ধর্মীয় আদর্শ, নাকি এর পেছনে রয়েছে টিকে থাকার গভীর রাজনৈতিক প্রকৌশল?

১. ঐতিহাসিক বাঁকবদল: মিত্র থেকে শত্রু

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগ পর্যন্ত ইরান ছিল ইসরায়েলের অন্যতম মিত্র। তৎকালীন শাহের শাসনামলে ইরান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং সোভিয়েত প্রভাব ঠেকানোর জন্য তারা গোপন সামরিক সহযোগিতা বজায় রাখত। এমনকি ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও ইসরায়েল থেকে গোপনে অস্ত্র কেনার ইতিহাস রয়েছে ইরানের। তবে আয়াতুল্লাহ খোমেনীর ক্ষমতা গ্রহণের পর এই সম্পর্কের খোলনলচে বদলে যায়। তেহরানে অবস্থিত ইসরায়েলি দূতাবাসকে প্যালেস্টাইনের দূতাবাসে রূপান্তর করার মাধ্যমে ইরান স্পষ্ট করে দেয় তাদের নতুন রাজনৈতিক এজেন্ডা।

২. দ্বন্দ্বে আদর্শ বনাম বাস্তব রাজনীতি

ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে কোনো সাধারণ সীমান্ত না থাকা সত্ত্বেও কেন এই চরম শত্রুতা?

  • পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা: ইসরায়েলের মূল ভয় হলো ইরানের পারমাণবিক ক্ষমতা। নেতানিয়াহুর ভাষায় ইরানকে ‘মিথ্যাবাদী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তারা নিয়মিত ইরানি বিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তাদের টার্গেট করছে।
  • অস্তিত্বের সংকট: ইরান ইসরায়েলকে ‘ছোট শয়তান’ এবং আমেরিকাকে ‘গ্রেট শয়তান’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। এই বয়ানটি ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে অভ্যন্তরীণভাবে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে এবং তরুণ প্রজন্মের মাঝে ‘অ্যান্টি-জায়নিস্ট’ আবেগ জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করে।

৩. ছায়াযুদ্ধ (Proxy War): টিকে থাকার কৌশল

সরাসরি যুদ্ধের সামর্থ্য বা আকাঙ্ক্ষা—দুইয়ের অভাবেই ইরান ও ইসরায়েল সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়ে ‘ছায়াযুদ্ধ’ চালিয়ে যাচ্ছে।

  • ইরানের প্রক্সি: লেবাননের হিজবুল্লাহ, সিরিয়ার শিয়া মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুতিদের মাধ্যমে ইসরায়েলের সীমান্তে অস্থিরতা তৈরি করা ইরানের কৌশল।
  • ইসরায়েলের মোসাদ: মোসাদের নিখুঁত গোয়েন্দা সক্ষমতা ইরানের পরমাণু কর্মসূচীকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। জেনারেল ও বিজ্ঞানীদের হত্যা ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

৪. মৌলবাদ ও ক্ষমতার টিকে থাকা

রাজনীতিবিদদের জন্য ‘কাল্পনিক শত্রু’ তৈরি করা একটি চিরাচরিত কৌশল। যেমনটা বিভিন্ন দেশে জাতীয়তাবাদী দলগুলো করে থাকে, ইরানও তেমনি ইসরায়েল বিরোধিতাকে পুঁজি করে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ও দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপকে আড়াল করছে। অন্যদিকে, উগ্রপন্থী ইহুদিদের জন্য ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ বা নিরাপত্তার ইস্যুটি তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।

বিডিএস বুলবুল আহমেদ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ:

ইরান ও ইসরায়েলের দ্বন্দ্ব কেবল দুটি রাষ্ট্রের যুদ্ধ নয়, এটি ক্ষমতার টিকে থাকার লড়াই। ইরান জানে সরাসরি যুদ্ধ করলে তারা দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের উন্নত প্রযুক্তি ও মার্কিন সমর্থিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে টিকতে পারবে না। একইভাবে ইসরায়েলও জানে, ইরানকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব নয়। ফলে এই ‘ছায়াযুদ্ধ’ই যেন উভয় রাষ্ট্রের জন্য ‘কমফোর্ট জোন’। যতদিন পর্যন্ত এই শত্রুতা তাদের নিজ নিজ দেশে জনমত গঠন ও ক্ষমতায় টিকে থাকতে সাহায্য করবে, ততদিন সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে এই উত্তেজনাকর শীতল যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে।


বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বিশ্ব রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের গভীর বিশ্লেষণ পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।


সূত্র: ১. ইরান ও ইসরায়েলের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক রেকর্ডসমূহ। ২. আধুনিক ভূ-রাজনীতি ও প্রক্সি যুদ্ধের কৌশল বিষয়ক গবেষণাপত্র। ৩. ইরান-কনট্রা চুক্তি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।

নিউজ ডেস্ক

March 10, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়লাভের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তার ঢেউ লেগেছে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পাঠানো বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অভিনন্দন বার্তা দুটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।

১. শেখ হাসিনার চিঠির তাৎপর্য ও বিতর্ক

আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত চিঠিতে শেখ হাসিনা নিজেকে এখনো ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এটি কেবল একটি কূটনৈতিক শিষ্টাচার নয়, বরং এটি একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা:

  • ‘প্রধানমন্ত্রী’ দাবি: ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার এই দাবিটি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করার একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
  • ট্রাম্পের প্রশংসায় হাসিনা: ট্রাম্পের ‘অসাধারণ নেতৃত্বের গুণাবলী’র প্রশংসা করে তিনি ভবিষ্যতে একসাথে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এটি মূলত তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এবং মার্কিন প্রশাসনের সমর্থন আদায়ের একটি প্রচেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে।

২. ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অভিনন্দন ও বাস্তববাদিতা

অন্যদিকে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চিঠিটি ছিল রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় মোড়ানো এবং অত্যন্ত পরিমিত।

  • সহযোগিতার ইতিহাস: তিনি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন এবং ভবিষ্যতে অংশীদারিত্বকে আরও জোরদার করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
  • পার্থক্য: ইউনূসের বার্তাটি বর্তমান সরকারের সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতিফলন ঘটায়, যেখানে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবেই ট্রাম্পের সাথে কাজ করতে আগ্রহী।

৩. ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান

তারেক রহমানের সরকার এবং শেখ হাসিনার প্রশাসনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের সমীকরণ অতীতে ভিন্ন ছিল।

  • হাসিনার অভিযোগ: হাসিনা অতীতে অভিযোগ করেছিলেন যে, জো বাইডেন প্রশাসন তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর নেপথ্যে কাজ করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বারবার তা অস্বীকার করেছে।
  • ইউনূস ও বাইডেন: জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের সময় জো বাইডেনের সাথে ইউনূসের বৈঠক প্রমাণ করে যে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি মার্কিন প্রশাসনের একটি পরোক্ষ স্বীকৃতি ও সমর্থন রয়েছে।

৪. ভারত ও বাংলাদেশের ত্রিভুজ সম্পর্ক

যেহেতু শেখ হাসিনা বর্তমানে নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন, তাই ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের পর ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক কোন পথে এগোবে—তা এখন সবচেয়ে বড় কৌতুহলের বিষয়। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার প্রক্রিয়ার ওপর কী প্রভাব ফেলে, সেটিই দেখার অপেক্ষা।

বিডিএস বুলবুল আহমেদ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ:

শেখ হাসিনার চিঠিতে নিজেকে ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উপস্থাপন করাটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন কোনো প্রভাব ফেলবে কি না তা প্রশ্নসাপেক্ষ, কারণ ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক বাস্তবতাকে সামনে রেখেই কাজ করবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন প্রশাসন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার এজেন্ডাকে কীভাবে গ্রহণ করে, সেটাই হবে আগামী দিনের রাজনীতির মূল ফোকাস। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন নতুন করে পুনর্মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।


তথ্যসূত্র: দ্য প্রিন্ট, আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল এবং কূটনৈতিক সূত্র।

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ পেতে চোখ রাখুন: পালসবাংলাদেশ  ওয়েবসাইটে।

শ্রমের মর্যাদা

নিউজ ডেস্ক

March 10, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

আমাদের সমাজ কাঠামোতে শ্রমের বিভাজন এবং স্বীকৃতির অভাব বরাবরই এক বড় বৈষম্য। সম্প্রতি ঢাকা শহরের নর্দমা পরিষ্কারে নিয়োজিত একজন শ্রমিকের ছবি এবং বিপ্লবী নেত্রী রোজা লুক্সেমবার্গের একটি বিখ্যাত উক্তি যেন এক সুতোয় গাঁথা। একটি দৃশ্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে শ্রমিকের চরম অবমাননা, অন্যটি মনে করিয়ে দিচ্ছে ইতিহাসের সেই পুরনো বঞ্চনার কথা, যা আমরা আজও অস্বীকার করে চলেছি।

১. অন্ধকার নর্দমার অমানবিক বাস্তবতা

ঢাকার মতো জনবহুল শহরে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার বড় একটি অংশ এখনো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পরিষ্কার করা হয়। নর্দমার বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসরোধ হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে এবং কোনো প্রকার সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া মানুষ যখন বর্জ্যের মধ্যে নামে, তখন তা কেবল পেশাগত দায়িত্ব থাকে না, তা হয়ে ওঠে জীবন-মরণ লড়াই। এটি আধুনিক নগরায়ণের এক চরম ব্যর্থতা। রাষ্ট্র ও নগর কর্তৃপক্ষ কেন এখনো এই শ্রমিকদের যান্ত্রিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারছে না? এটি কি সদিচ্ছার অভাব, নাকি প্রান্তিক শ্রমিকের জীবনের মূল্য তাদের কাছে নগণ্য?

২. রোজা লুক্সেমবার্গের দর্শন ও ইতিহাসের ‘চুরি’

বিপ্লবী রোজা লুক্সেমবার্গ বলেছিলেন, “যেদিন নারীরা শ্রমের হিসাব চাইবে, সেদিন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে প্রাচীন চুরি ধরা পড়বে।” এই উক্তিটি কেবল নারীদের জন্য নয়, বরং সমাজের সেই সব মানুষের জন্য, যাদের শ্রম বছরের পর বছর অদৃশ্য থেকেছে। গৃহস্থালি কাজ থেকে শুরু করে নর্দমা পরিষ্কার পর্যন্ত—যাদের শ্রম ছাড়া এই শহর বা সভ্যতা এক মুহূর্ত অচল, তাদের শ্রমের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বা সামাজিক মর্যাদা নেই। এই যে শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি না দেওয়া, এটাই রোজা লুক্সেমবার্গের দৃষ্টিতে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘চুরি’।

৩. অদৃশ্য শ্রমের মেলবন্ধন

উভয় বিষয়কে একত্রে দেখলে স্পষ্ট হয় যে, আমাদের সমাজ সেই সব মানুষকে উপেক্ষা করতে অভ্যস্ত, যারা পর্দার অন্তরালে থেকে সবচেয়ে অপরিহার্য কাজগুলো করছেন। একদিকে নর্দমা পরিষ্কারকারী শ্রমিক, যার জীবনের ঝুকি নিয়ে করা কাজকে আমরা কেবল ‘অচ্ছুত’ বা ‘নিম্নমানের’ কাজ বলে উড়িয়ে দিই; অন্যদিকে নারীদের ঘরোয়া শ্রম, যা আজও ‘মূল্যহীন’ হিসেবে গণ্য হয়। এই দুটিই আমাদের কাঠামোগত বৈষম্যের উদাহরণ।

বিডিএস বুলবুল আহমেদ-এর চূড়ান্ত বিশ্লেষণ:

একটি মানবিক ও স্মার্ট সমাজ গড়তে হলে শ্রমের বিভাজন ও বঞ্চনার এই বৃত্ত ভাঙতে হবে।

  • সুরক্ষা ও প্রযুক্তি: নর্দমা পরিষ্কারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে মানুষের ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ করে সম্পূর্ণ যান্ত্রিক পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে।
  • শ্রমের হিসাব: সমাজের প্রতিটি স্তরে, বিশেষ করে প্রান্তিক শ্রমিক ও নারীদের শ্রমের সঠিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
  • মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি: শ্রমিকের জীবন ও মর্যাদা যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ—এই দর্শনে আমাদের রাষ্ট্রকে ফিরতে হবে।

ইতিহাসের পাতায় যাদের শ্রমকে ‘চুরি’ করা হয়েছে, তাদের প্রাপ্য সম্মান ও নিরাপত্তা দেওয়ার মাধ্যমেই আমরা একটি প্রকৃত সমতার সমাজ গড়তে পারি।


তথ্যসূত্র ও বিশ্লেষণ:

  • আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) – ‘পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা’ নীতিমালা।
  • রোজা লুক্সেমবার্গ ফাউন্ডেশন আর্কাইভ – সমাজতান্ত্রিক শ্রম ও নারী অধিকার বিষয়ক দর্শন।
  • বাংলাদেশের শ্রম আইন ২০০৬ (কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সংক্রান্ত ধারা)।

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

সামাজিক সমতা, মানবাধিকার ও শ্রমের মর্যাদা নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

১লা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ