ইতিহাস

প্রয়ান দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি: কবি ও সাহিত্যিক সুফিয়া কামাল (১৯১১-১৯৯৯)
সুফিয়া কামাল

নিউজ ডেস্ক

November 20, 2025

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে সুফিয়া কামালের অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, লেখক এবং সমাজসংগ্রামী। সুফিয়া কামাল তাঁর জীবনে নারীদের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন, নারীর স্বাধীনতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। তাঁর সাহিত্য শুধু বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, সমাজে নারীদের অবস্থান উন্নত করতে তার ভূমিকা অসামান্য।

পরিবারে প্রতিবন্ধকতা এবং শুরুর পথ

সুফিয়া কামাল যে পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেখানে নারীশিক্ষার কোনো জায়গা ছিল না। পরিবারে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু এই প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও সুফিয়া কামাল নিজে শেখার প্রচেষ্টা চালান। তাঁর মা সাবেরা বেগম ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তি, যিনি নিজস্ব ধৈর্য এবং সহনশীলতা দিয়ে সুফিয়াকে বাংলা ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। সুফিয়া কামাল বলেন, তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘কেয়ার কাঁটা’ তিনি মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে উৎসর্গ করেন।

সাহিত্যচর্চার সূচনা

১৯২৬ সালে সুফিয়া কামালের প্রথম কবিতা “বাসন্তী” সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কলকাতায় সওগাত পত্রিকার সম্পাদক নাসিরউদ্দিনের কাছে সুফিয়া কামাল প্রথম যেবার যান, তিনি বোরখা পরেছিলেন। নাসিরউদ্দিন তাঁর কবিতা পড়ে বলেছিলেন, “কবিতা লিখতে চাও, বোরখা খোলো।” এই কথা সুফিয়া কামালের মনে গভীর প্রভাব ফেলে, এবং তিনি জীবনে আর কোনোদিন বোরখা পরেননি।

বেগম রোকেয়া এবং তাঁর প্রভাব

কলকাতায় থাকাকালীন সুফিয়া কামাল বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে পরিচিত হন। রোকেয়ার চিন্তাধারা এবং কাজ সুফিয়া কামালের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। রোকেয়ার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’-এ যোগদান করে তিনি মুসলিম নারীদের সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী হন এবং নারীদের সমাজে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতে উদ্বুদ্ধ হন।

সাহিত্যিক যাত্রা এবং দেশবিভাগ

১৯৩৭ সালে সুফিয়া কামালের প্রথম গল্পের সংকলন ‘কেয়ার কাঁটা’ প্রকাশিত হয়। তার কবিতা ও গল্পে সমাজের অন্ধকার দিক এবং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে তিনি সচেতনতা তৈরি করেন। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর, সুফিয়া কামাল ঢাকায় চলে আসেন এবং ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ভাষা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণে তাকে উৎসাহিত করার জন্য তিনি নারীদের নিয়ে আন্দোলন পরিচালনা করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় সুফিয়া কামাল

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সুফিয়া কামাল তার বাসভবন সংলগ্ন গোটা ধানমন্ডি এলাকার পাকিস্তানি বাহিনীর নিরাপত্তা হেফাজতে ছিলেন। তিনি নিজে সপরিবারে নিরাপদে অবস্থান করেন, তবে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার সমর্থন ছিল অবিচলিত। তিনি অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় তার সাহসিকতা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য স্থান অর্জন করেছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে নারীজাগরণ

স্বাধীনতার পর সুফিয়া কামাল নারীদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে থাকেন। ১৯৫৬ সালে ‘কচিকাঁচার মেলা’ নামে একটি শিশু সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭০ সালে মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করে নারীদের একত্রিত করার কাজ শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

সুফিয়া কামাল তাঁর জীবনে ৫০টিরও বেশি পুরস্কার লাভ করেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬২), একুশে পদক (১৯৭৬), বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯২), স্বাধীনতা দিবস পদক (১৯৯৭) ইত্যাদি।

তাঁর সাহিত্যকর্ম

  • কাব্যগ্রন্থ: সাঁঝের মায়া (১৯৩৮), মায়া কাজল (১৯৫১)
  • গল্প: কেয়ার কাঁটা (১৯৩৭)
  • স্মৃতিকথা: একাত্তুরের ডায়েরি (১৯৮৯)

উপসংহার

সুফিয়া কামালের অবদান বাংলার সাহিত্য ও সমাজে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার সাহিত্য, সংগ্রাম এবং সমাজে প্রভাবিত কাজগুলির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, একজন নারী কেবল সাহিত্যের মাধ্যমে নয়, বরং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনেও অবদান রাখতে পারেন।

সূত্র:

  1. “সুফিয়া কামাল: বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের পথপ্রদর্শক,” বাংলা একাডেমী
  2. “সুফিয়া কামালের সাহিত্য ও সংগ্রাম,” জাতীয় কবিতা পরিষদ
  3. “বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সুফিয়া কামালের অবদান,” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

প্রাচীন সরকারি স্কুল

নিউজ ডেস্ক

August 26, 2026

শেয়ার করুন

  • প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
  • বিভাগ (Category): শিক্ষা ও ইতিহাস / বাংলাদেশ
  • প্রকাশের তারিখ: ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • তথ্যসূত্র (Sources): জাতীয় তথ্য বাতায়ন, জেলা রেকর্ড ও ঐতিহাসিক শিক্ষাসংক্রান্ত নথি

উপমহাদেশে আধুনিক ইংরেজি শিক্ষা ও বিজ্ঞান চর্চার মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে। তৎকালীন জেলাভিত্তিক শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ঐতিহাসিক ‘জিলা স্কুল’ ও ‘কলেজিয়েট স্কুল’ সমূহ।

শতবর্ষের প্রাচীর টপকে আজও ঐতিহ্য ও শিক্ষার আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় প্রাচীন সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো।

বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন সরকারি স্কুল: রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল (১৮২৮)

বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবস্থিত সর্বপ্রাচীন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় হলো রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল

  • প্রতিষ্ঠাকাল: ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দ।
  • প্রারম্ভিক ইতিহাস: এটি প্রথমে ‘বোয়ালিয়া ইংলিশ স্কুল’ (Boalia English School) নামে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে ১৮৩৬ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংকের আমলে সরকার এটি অধিগ্রহণ করে সরকারি রূপ দেয়।
  • নামকরণ: ১৮৭৩ সালে এই স্কুলের সাথে কলেজ শাখা যুক্ত করা হলে এর নতুন নামকরণ হয় ‘রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল’। এখান থেকেই পরবর্তীতে বিখ্যাত ‘রাজশাহী কলেজ’-এর উৎপত্তি ঘটে।

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ৭টি প্রাচীন জিলা স্কুল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

প্রতিষ্ঠানের নামপ্রতিষ্ঠার বছরঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বিশেষত্ব
বরিশাল জিলা স্কুল১৮২৯বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন জিলা স্কুল। মি. এন. ডব্লিউ গ্যারেটের উদ্যোগে ‘বরিশাল ইংলিশ স্কুল’ নামে শুরু হয়। ১৮৫৩ সালে এটি সরকারি জিলা স্কুলের মর্যাদা পায়।
রংপুর জিলা স্কুল১৮৩২লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক কর্তৃক “জমিদারদের স্কুল” হিসেবে ভিত্তিস্থাপন। পরবর্তীতে কোচবিহারের রাজার অর্থায়নে স্থায়ী ভবন তৈরি হয়।
ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল১৮৩৫ঢাকা অঞ্চলের প্রথম সরকারি হাই স্কুল। ‘ঢাকা ইংলিশ সেমিনারি’ নামে বুড়িগঙ্গার তীরে নীলকুঠির বাংলোতে এর ক্লাস শুরু হয়েছিল।
কুমিল্লা জিলা স্কুল১৮৩৭ইংরেজ শিক্ষক এইচ জি লেজিস্টার এটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজেই প্রথম প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।
যশোর জিলা স্কুল১৮৩৮৩ ফেব্রুয়ারি ‘যশোর মডেল স্কুল’ নামে যাত্রা শুরু। বিখ্যাত বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন।
নোয়াখালী জিলা স্কুল১৮৫০নদীভাঙনের সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকার ইতিহাস। মেঘনার ভাঙনে বহুবার স্থানান্তরিত হয়ে ১৯৫৩ সালে বর্তমান মাইজদীতে স্থায়ী রূপ পায়।
ময়মনসিংহ জিলা স্কুল১৮৫৩১৮৪৬ সালে ‘হার্ডিঞ্জ স্কুল’ নামে শুরু হয়। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর পিতা ভগবানচন্দ্র বসু এর প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন।

কেন জিলা স্কুলগুলো শিক্ষার ইতিহাসে অনন্য?

  • শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি: তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষার সমন্বয়ে আধুনিক মেধা তৈরিতে এসব প্রতিষ্ঠান মূল ভূমিকা রেখেছিল।
  • ঐতিহাসিক অবদান: এই বিদ্যালয়গুলোর আঙিনা থেকে উঠে এসেছেন বহু কালজয়ী বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ ও গবেষক, যাঁরা ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

নবাব সলিমুল্লাহ

নিউজ ডেস্ক

August 26, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)

সম্পাদনা ও গবেষণা: ইতিহাস ও গবেষণা বিভাগ

প্রকাশের তারিখ: ২৭ আগস্ট, ২০২৬

প্রকাশের সময়: দুপুর ১২:৩০ মিনিট (বিএসটি)

মূল বিষয়শ্রেণী (Category): ইতিহাস ও ঐতিহ্য / রাজনীতি / বাংলাদেশ

অবিভক্ত বাংলার মুসলিম সমাজকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে, শিক্ষা বিস্তার ও অধিকার আদায়ে যাঁর ভূমিকা সবচেয়ে অগ্রণী, তিনি নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ। ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি মাত্র ৪৪ বছর বয়সে কলকাতার চৌরঙ্গী রোডের নিজ বাসভবনে তিনি হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যু সাধারণ অসুস্থতা নাকি কোনো গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র—তা নিয়ে আজও ইতিহাসে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা-কল্পনা রয়েছে।

কীভাবে মারা গিয়েছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ? (মৃত্যু ও রহস্য)

সরকারি ও চিকিৎসাগত রেকর্ডে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদরোগ বা স্ট্রোক উল্লেখ করা হলেও, সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও পারিপার্শ্বিক ঘটনার কারণে তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিষ প্রয়োগের শক্ত সন্দেহ ঘনীভূত হয়:

নবাব সলিমুল্লাহ ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতার চৌরঙ্গী রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে মারা যান। প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসে তাঁর মৃত্যুকে স্বাভাবিক বা অসুস্থতাজনিত বলা হলেও, সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ঘটনার আকস্মিকতার কারণে তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে বিষপ্রয়োগে হত্যাকাণ্ড বা গভীর ষড়যন্ত্রের জোরালো গুঞ্জন রয়েছে।

মৃত্যুর ঘটনা ও প্রধান রহস্যসমূহ

  • আকস্মিক অসুস্থতা ও গুঞ্জন: মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত নবাব সুস্থ ছিলেন। মৃত্যুর দিন রাতে হঠাৎ তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং দ্রুতই তাঁর মৃত্যু হয়। সমসাময়িক রাজনৈতিক মহলে এবং পরবর্তী সময়ে বহু গবেষকের লেখায় দাবি করা হয়, ব্রিটিশদের কোনো গোপন নীলনকশার অংশ হিসেবে অথবা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দ্বারা তাঁকে খাবারে বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
  • রাজনৈতিক বিরোধের প্রেক্ষাপট: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ নবাব সলিমুল্লাহর একক প্রচেষ্টায় সফল হয়েছিল। কিন্তু ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার হিন্দুদের তীব্র আন্দোলনের মুখে মুসলিমদের স্বার্থ উপেক্ষা করে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করে। এর ফলে ব্রিটিশ সরকারের সাথে নবাবের চরম বিরোধ তৈরি হয়। তিনি ব্রিটিশদের দেওয়া ‘জি.সি.আই.ই’ (GCIE) উপাধি বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং বড় ধরনের ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, যা ব্রিটিশদের জন্য উদ্বেগের কারণ ছিল।
  • মরদেহ নিয়ে চরম গোপনীয়তা: ১৯১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি নবাবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী খাজা শামসুল হকের ডায়েরির বিবরণ থেকে জানা যায়, নবাবের মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ পরিবারের কোনো সদস্য বা স্বজনদের স্পর্শ করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি মৃত্যুর পর তাঁর মুখমণ্ডল দেখতেও বাধা দেওয়া হয়েছিল।
  • কঠোর নিরাপত্তা ও জানাজা: কলকাতা থেকে বিশেষ স্টিমারে করে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও কঠোর পুলিশি পাহারায় তাঁর মরদেহ ঢাকায় আনা হয়। সাধারণ মানুষকে মরদেহ দেখতে দেওয়া হয়নি এবং অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে ঢাকার বেগমবাজারে জানাজা শেষে তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে (উর্দু রোড) দাফন করা হয়।
  • সশস্ত্র পাহারা: দাফনের পর প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত নবাব সলিমুল্লাহর কবরটি সশস্ত্র গুর্খা সৈন্য এবং ব্রিটিশ পুলিশ দিয়ে দিন-রাত পাহারা দেওয়া হয়েছিল, যা একটি স্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে অত্যন্ত নজিরবিহীন। ধারণা করা হয়, ময়নাতদন্তের জন্য কেউ যেন লাশ চুরি বা উত্তোলন করতে না পারে, সেজন্যই এই পাহারা বসানো হয়েছিল।

যদিও ব্রিটিশ সরকার বা তৎকালীন তদন্তে এই মৃত্যুকে হৃদরোগ বা স্বাভাবিক অসুস্থতা হিসেবে ফাইল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তবুও এই ঐতিহাসিক উপাত্ত ও অস্বাভাবিক ঘটনাগুলোর কারণে আজও নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুকে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বা অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে গণ্য করা হয়।

পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠন

পূর্ববঙ্গ ও আসাম (Eastern Bengal and Assam) ছিল ব্রিটিশ ভারতের একটি স্বল্পস্থায়ী প্রদেশ, যা ১৯০৫ সালের ঐতিহাসিক বঙ্গভঙ্গ (Partition of Bengal) আন্দোলনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল। নবাব স্যার সলিমুল্লাহর একক প্রচেষ্টা এবং মুসলিম সমাজের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই নতুন প্রদেশটি আত্মপ্রকাশ করে।

নিচে এই প্রদেশ গঠনের পটভূমি, কাঠামো এবং এর প্রভাব বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. প্রদেশ গঠনের পটভূমি ও কারণ

  • প্রশাসনিক বিশালতা: অবিভক্ত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি (বাংলা, বিহার ও ওড়িশা) ছিল আয়তনে বিশাল এবং এর জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৮৫ লাখ। একজন গভর্নরের পক্ষে এই বিশাল অঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা ও শাসনভার পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
  • পূর্ববঙ্গের অবহেলা ও অনগ্রসরতা: তৎকালীন সমস্ত সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কলকারখানা ছিল কলকাতা-কেন্দ্রিক। ফলে পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) অর্থনীতি, শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা চরমভাবে ভেঙে পড়েছিল।
  • নবাব সলিমুল্লাহর ভূমিকা: ১৯০৪ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন ঢাকা সফরে এলে নবাব সলিমুল্লাহ পূর্ববঙ্গের মানুষের দুর্দশা তুলে ধরেন। তিনি জোরালো যুক্তি দেখান যে, ঢাকাকে কেন্দ্র করে আলাদা প্রদেশ না হলে এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন সম্ভব নয়।

২. প্রদেশ গঠন ও ভৌগোলিক কাঠামো (১৯০৫)

১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর লর্ড কার্জনের চূড়ান্ত আদেশে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে বিভক্ত করে নতুন প্রদেশ ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ গঠন করা হয়।

  • ভৌগোলিক এলাকা: ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিভাগ, মালদহ, ত্রিপুরা এবং সমগ্র আসাম অঞ্চল নিয়ে এই প্রদেশ গঠিত হয়।
  • রাজধানী ও জনসংখ্যা: নতুন প্রদেশের রাজধানী করা হয় ঢাকা এবং গ্রীষ্মকালীন রাজধানী করা হয় আসামের শিলংকে। প্রদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ৩ কোটি ১০ লাখ, যার মধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখ ছিলেন মুসলিম এবং ১ কোটি ২০ লাখ ছিলেন হিন্দু। ফলে এটি একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে পরিণত হয়।
  • প্রথম গভর্নর: স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার (Sir Bampfylde Fuller) এই নতুন প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন।

৩. নতুন প্রদেশের প্রভাব ও উন্নয়ন

প্রদেশটি গঠিত হওয়ার পর মাত্র ৬ বছরে পূর্ববঙ্গে ব্যাপক পরিবর্তন আসে:

  • ঢাকার আধুনিকায়ন: দীর্ঘকাল পর ঢাকা পুনরায় রাজধানীর মর্যাদা পাওয়ায় এখানে কার্জন হল, হাইকোর্ট ভবন, সেক্রেটারিয়েট (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ অংশ) এবং গভর্নমেন্ট হাউস নির্মিত হয়। ঢাকার রাস্তাঘাট ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে।
  • শিক্ষার প্রসার: পূর্ববঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল, কলেজ এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মুসলিম সমাজের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ এক লাফে অনেক বেড়ে যায়।
  • অর্থনৈতিক জোয়ার: চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকায়ন করা হয় এবং ঢাকার সাথে অন্যান্য জেলার রেল ও নৌযোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটে। ফলে পাট ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

৪. প্রদেশের বিলুপ্তি বা বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১)

মুসলিমরা এই প্রদেশ গঠনে খুশি হলেও কলকাতার হিন্দু সম্প্রদায়, আইনজীবী এবং জাতীয় কংগ্রেস এটিকে ‘বঙ্গমাতা’র অঙ্গচ্ছেদ হিসেবে আখ্যায়িত করে তীব্র ‘স্বদেশী আন্দোলন’ ও ব্রিটিশ-বিরোধী সহিংস আন্দোলন শুরু করে।

তীব্র আন্দোলনের মুখে এবং ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জের ভারত সফর উপলক্ষে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লির দরবারে আকস্মিকভাবে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলে ১৯১২ সালের ১ এপ্রিল থেকে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ প্রদেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং ঢাকা আবার তার রাজধানীর মর্যাদা হারায়।

নবাব সলিমুল্লাহর জোরালো দাবিতে লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ নামে নতুন প্রদেশ গঠন করেন এবং ঢাকাকে এর রাজধানী করা হয়।

অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা

অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ (All India Muslim League) ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার শাহবাগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল。 এটি ছিল ব্রিটিশ ভারতে মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের প্রথম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল, যার হাত ধরেই পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়。

নিচে এই ঐতিহাসিক দলটির প্রতিষ্ঠা, পটভূমি এবং গুরুত্ব সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

১. প্রতিষ্ঠার পটভূমি

  • বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন (১৯০৫): ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হওয়ার পর পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে নতুন আশার আলো জাগে。 কিন্তু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং কলকাতার হিন্দু সমাজ এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু করলে মুসলিম নেতৃত্ব বুঝতে পারেন, তাদের অধিকার রক্ষার জন্য নিজস্ব একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল প্রয়োজন。
  • শিমলা ডেপুটেশন (১৯০৬): ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর স্যার আগা খানের নেতৃত্বে ৩৫ জন বিশিষ্ট মুসলিম নেতার একটি প্রতিনিধি দল শিমলায় বড়লাট লর্ড মিন্টোর সাথে সাক্ষাৎ করেন。 তাঁরা মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা ও চাকরিতে কোটার দাবি জানান, যা ইতিবাচক সাড়া পায়。

২. ঐতিহাসিক সম্মেলন ও প্রতিষ্ঠা

  • এডুকেশনাল কনফারেন্স: ১৯০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর আমন্ত্রণে ঢাকার শাহবাগে ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স’ অনুষ্ঠিত হয়。
  • রাজনৈতিক দলের প্রস্তাব: কনফারেন্সের শেষ দিন, ৩০ ডিসেম্বর, নবাব সলিমুল্লাহ মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষায় একটি স্থায়ী রাজনৈতিক দল গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন。
  • সমর্থন ও অনুমোদন: এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেন হাকিম আজমল খান, জাফর আলী খান এবং মাওলানা মোহাম্মদ আলী。 উপস্থিত প্রায় ৩,০০০ প্রতিনিধি সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রস্তাব অনুমোদন করেন এবং ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’ আত্মপ্রকাশ করে。

৩. প্রথম নেতৃত্ব ও সদর দপ্তর

  • প্রথম সভাপতি (অস্থায়ী): ঢাকার এই ঐতিহাসিক সভায় সভাপতিত্ব করেন নবাব ভিকার-উল-মূলক
  • প্রথম স্থায়ী সভাপতি: ১৯০৮ সালে করাচি অধিবেশনে স্যার আগা খানকে দলের প্রথম স্থায়ী সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।
  • প্রধান কার্যালয়: দলটির প্রথম সদর দপ্তর বা কেন্দ্রীয় কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল উত্তর প্রদেশের লখনউ শহরে।

৪. মুসলিম লীগের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

দলটি মূলত তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল:

  • ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভারতের মুসলিমদের আনুগত্য বৃদ্ধি করা এবং সরকারের নীতি সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা。
  • ভারতের মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা এবং তাদের দাবি ও আশা-আকাঙ্ক্ষা সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে তুলে ধরা。
  • মুসলিম লীগের মূল উদ্দেশ্যের ক্ষতি না করে ভারতের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে সম্প্রীতি বজায় রাখা。

নবাব সলিমুল্লাহর দূরদর্শিতা এবং ঢাকার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগই পরবর্তীতে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে。

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল মূলত ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদের (বাতিল) ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে সৃষ্ট তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণ। নবাব স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে পূর্ববঙ্গের নেতৃবৃন্দের জোরালো ও আপসহীন দাবির মুখেই ব্রিটিশ সরকার ঢাকায় এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয়েছিল।

নিচে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবির পটভূমি ও ইতিহাস সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

১. দাবির মূল পটভূমি (বঙ্গভঙ্গ রদ, ১৯১১)

  • মুসলিমদের হতাশা: ১৯০৫ সালে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ প্রদেশ গঠনের পর ঢাকায় শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটছিল। কিন্তু ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতার হিন্দু নেতা ও কংগ্রেসের তীব্র আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ সরকার আকস্মিকভাবে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করে।
  • অধিকার হরণ: বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে ঢাকা আবার তার রাজধানীর মর্যাদা হারায় এবং পূর্ববঙ্গ পুনরায় কলকাতার অধীনে চলে যায়। এতে পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজ চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও প্রতারিত বোধ করে।

২. লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে ঐতিহাসিক স্মারকলিপি (১৯১২)

  • নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্ব: বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের শান্ত করতে ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি ভারতের ভাইসরয় বা বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে আসেন।
  • দাবি উত্থাপন: ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরীসহ ১৯ জন বিশিষ্ট নেতার একটি প্রতিনিধি দল লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
  • ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়: প্রতিনিধি দলটি বড়লাটের কাছে জোরালো দাবি জানান যে, বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে পূর্ববঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থার যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ঢাকায় অবিলম্বে একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

৩. ব্রিটিশ সরকারের সম্মতি ও নাথান কমিটি

  • বড়লাটের ঘোষণা: মুসলিম নেতাদের তীব্র ক্ষোভ ও যৌক্তিক দাবির মুখে লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন এবং ২ ফেব্রুয়ারি সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা জারি করা হয়।
  • কলকাতার হিন্দু মহলের বিরোধিতা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন কলকাতার একদল হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও নেতা (যাঁদের মধ্যে ড. রাসবিহারী ঘোষ, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী এবং স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় অন্যতম)। তাঁদের যুক্তি ছিল, ঢাকার মতো জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে শিক্ষার মান কমে যাবে এবং এটি হবে “টাকা অপচয়”।
  • নাথান কমিটি গঠন: সমস্ত বিরোধিতা উপেক্ষা করে ১৯১২ সালের মে মাসে ব্যারিস্টার রবার্ট নাথানের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের ‘নাথান কমিটি’ গঠন করা হয়, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রূপরেখা ও খসড়া তৈরি করে।

নবাব সলিমুল্লাহর অটল দাবি এবং ৬০০ একর জমি দানের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে দীর্ঘ লড়াই শেষে ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার যাত্রা শুরু করে।

আকস্মিক প্রয়াণ

নবাব স্যার সলিমুল্লাহর আকস্মিক প্রয়াণ (মৃত্যু) ছিল তৎকালীন বাংলার রাজনীতির অন্যতম বড় ধাক্কা এবং একটি গভীর রহস্য। ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতার চৌরঙ্গী রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. মৃত্যুর আকস্মিকতা ও সন্দেহ

নবাব সলিমুল্লাহ মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ সুস্থ ও কর্মক্ষম ছিলেন। ১৬ জানুয়ারি রাতে ডিনারের পর তিনি হঠাৎ তীব্র পেটের ব্যথায় আক্রান্ত হন এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়। কোনো পূর্ব অসুস্থতা ছাড়া একজন শীর্ষ নেতার এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো বাংলায় খাবারে বিষপ্রয়োগের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।

২. রাজনৈতিক বিরোধ ও কারণ

১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার মুসলিমদের স্বার্থ উপেক্ষা করে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করার পর থেকে নবাব সলিমুল্লাহর সাথে ব্রিটিশ রাজের চরম দূরত্ব তৈরি হয়।

  • তিনি ব্রিটিশদের দেওয়া ‘জি.সি.আই.ই’ (GCIE) উপাধি বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
  • তিনি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলনের ছক আঁকছিলেন।
  • ধারণা করা হয়, তাঁর এই কঠোর অবস্থান ব্রিটিশ শাসক বা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের জন্য বড় হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

৩. নজিরবিহীন গোপনীয়তা ও পাহারা

নবাবের প্রয়াণের পর ব্রিটিশ সরকারের কিছু রহস্যজনক আচরণ এই সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দেয়:

  • মরদেহ স্পর্শে নিষেধাজ্ঞা: তাঁর মৃত্যুর পর কলকাতার বাড়িতে স্বজনদের লাশ স্পর্শ করতে বা মুখ দেখতে বাধা দেওয়া হয়েছিল।
  • কঠোর প্রহরায় ঢাকা আনা: ময়নাতদন্ত ছাড়াই অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে বিশেষ স্টিমারে করে পুলিশি পাহারায় তাঁর মরদেহ ঢাকায় আনা হয়।
  • কবর পাহারা: দাফনের পর প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত তাঁর কবরটি সশস্ত্র গুর্খা সৈন্য দিয়ে দিন-রাত পাহারা দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল অত্যন্ত নজিরবিহীন। অনেকের মতে, মৃত্যুর আসল কারণ আড়াল করতে কেউ যেন লাশ তুলে পুনরায় পরীক্ষা (Post-mortem) করতে না পারে, সেজন্যই এই পাহারা বসানো হয়েছিল।

নবাব সলিমুল্লাহর এই আকস্মিক প্রয়াণ পূর্ববঙ্গের মুসলিম জাগরণকে সাময়িকভাবে স্থবির করে দিয়েছিল এবং বাংলার ইতিহাসে এটি আজও একটি অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নবাব পরিবারের ঐতিহাসিক অবদান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং ঢাকার আধুনিকায়নে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ও তাঁর পরিবারের ঐতিহাসিক অবদান অবিস্মরণীয়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে এই পরিবারের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও বিশাল ত্যাগ যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি ঢাকাকে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার মূল কারিগরও ছিলেন এই নবাবরা।

নিচে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার সার্বিক উন্নয়নে নবাব পরিবারের ঐতিহাসিক অবদানসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় নবাব পরিবারের অবদান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি রচিত হয়েছিল নবাব স্যার সলিমুল্লাহর আপসহীন দাবি এবং তাঁর পরিবারের বিশাল ত্যাগের ওপর।

  • রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণের দাবি: ১৯১১ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করলে পূর্ববঙ্গের মুসলিমরা চরমভাবে ক্ষুব্ধ হয়। এর প্রতিবাদে ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ভারতের বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে দেখা করেন। বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ এবং পূর্ববঙ্গের শিক্ষার অনগ্রসরতা দূর করতে তাঁরা ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোরালো দাবি জানান।
  • বিশাল জমি দান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য নবাব সলিমুল্লাহ এবং তাঁর পরিবার ঢাকার রমনা এলাকায় তাঁদের নিজস্ব জমিদারি থেকে প্রায় ৬০০ একর নিষ্কর জমি সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে দান করেন। এই বিশাল জমির ওপরই আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস অবস্থিত।
  • অর্থনৈতিক ও মানসিক সহায়তা: বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরির জন্য গঠিত ‘নাথান কমিটি’ (Nathan Committee)-র অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ। যদিও ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি চালুর আগেই ১৯১৫ সালে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়, তবে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাঁর পরিবার ব্রিটিশ সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে গেছে।
  • স্মৃতি ও স্বীকৃতি: নবাব সলিমুল্লাহর এই ঐতিহাসিক অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এবং অন্যতম ঐতিহ্যবাহী আবাসিক হলের নাম রাখা হয় ‘সলিমুল্লাহ মুসলিম হল’ (SM Hall)

২. ঢাকার আধুনিকায়ন ও সমাজকল্যাণে নবাব পরিবারের অবদান

শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রেই নয়, বর্তমান ঢাকাকে একটি আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে নবাব পরিবারের অবদান অপরিসীম। ১৮৭৫ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে বংশানুক্রমিক ‘নবাব’ উপাধি পাওয়ার পর এই পরিবার ঢাকার চেহারা বদলে দেয়।

  • বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার স্টেশন (নবাব আব্দুল গণি): ঊনবিংশ শতাব্দীতে ঢাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট ছিল এবং কলেরা-টাইফয়েডের মতো মহামারি লেগেই থাকত। নবাব খাজা আব্দুল গণি ১৮৭৪ সালে বুড়িগঙ্গার তীরে নিজস্ব অর্থায়নে ‘ঢাকা ওয়াটার ওয়ার্কস’ বা পানির ফিল্টার স্টেশন স্থাপন করেন, যা ঢাকাবাসীকে প্রথম বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের সুযোগ করে দেয়।
  • প্রথম বিদ্যুৎ ব্যবস্থা (নবাব খাজা আহসানুল্লাহ): ১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর নবাব খাজা আহসানুল্লাহর উদ্যোগে এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ে ঢাকার আহসান মঞ্জিলে প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো হয়। পরবর্তীতে তাঁর অর্থায়নেই ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রাজপথে বৈদ্যুতিক বাতির আলো ছড়িয়ে পড়ে।
  • চিকিৎসা খাতের উন্নয়ন: ঢাকার স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে নবাব পরিবার বিপুল অর্থ অনুদান দিয়েছিল। তৎকালীন মিটফোর্ড হাসপাতাল (বর্তমান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল) এবং লেডি ডাফরিন হাসপাতালের উন্নয়নে এই পরিবার নিয়মিত অর্থ ও জমি দান করত।
  • যোগাযোগ ও সংস্কৃতির বিকাশ: ঢাকায় প্রথম ঘোড়ার গাড়ি (টমটম) এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসারে নবাবদের ভূমিকা ছিল প্রধান। এছাড়া আহসান মঞ্জিলকে কেন্দ্র করে নাটক, থিয়েটার, কাওয়ালি এবং সাহিত্য চর্চার এক বিশাল সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।
  • আহসান মঞ্জিল: বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত এই রাজকীয় প্রাসাদটি ছিল ঢাকার নবাবদের বাসস্থান এবং পূর্ববঙ্গের রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু, যা বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অধীনে একটি অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।

আহসান মঞ্জিল পরিদর্শনের আধুনিক তথ্য

আহসান মঞ্জিল জাদুঘর বর্তমানে সম্পূর্ণ অনলাইন ই-টিকিট ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হচ্ছে এবং ২০২৩ সালে সংস্কারের পর এর গ্যালারিগুলোকে আধুনিক রূপ দেওয়া হয়েছে। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ঢাকার এই ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদটি পরিদর্শনের জন্য ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট ও আধুনিক তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

১. অনলাইন ই-টিকিট কাটার নিয়ম ও মূল্য

আহসান মঞ্জিলে প্রবেশের জন্য এখন আর কাউন্টারে কোনো টিকিট বিক্রি করা হয় না। দর্শনার্থীদের মোবাইল বা কম্পিউটারের মাধ্যমে অগ্রিম টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হয়।

  • অফিসিয়াল ওয়েবসাইট: টিকিট কাটার জন্য আহসান মঞ্জিল ই-টিকিট পোর্টাল (ahsanmanzilticket.gov.bd) ভিজিট করতে হবে।
  • টিকিটের মূল্য তালিকা:
    • দেশী প্রাপ্তবয়স্ক দর্শনার্থী: ৪০ টাকা (অনলাইন চার্জসহ প্রায় ৪২ টাকা)
    • শিশু (১২ বছরের কম): ২০ টাকা
    • সার্কভুক্ত দেশের পর্যটক: ৩০০ টাকা
    • অন্যান্য বিদেশী পর্যটক: ৫০০ টাকা
    • (বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রতিবন্ধী দর্শনার্থীদের জন্য কোনো টিকিটের প্রয়োজন হয় না।)

২. বর্তমান সময়সূচি (২০২৬)

সপ্তাহের একেক দিন আহসান মঞ্জিলের পরিদর্শনের সময় ভিন্ন হয়ে থাকে:

  • শনিবার থেকে বুধবার: সকাল ১০:৩০ টা থেকে বিকাল ০৪:৩০ টা পর্যন্ত (অনলাইনে টিকিট কেনার শেষ সময় বিকাল ৪:০০ টা)।
  • শুক্রবার: বিকাল ০৩:০০ টা থেকে সন্ধ্যা ০৭:০০ টা পর্যন্ত (অনলাইনে টিকিট কেনার শেষ সময় সন্ধ্যা ৬:০০ টা)।
  • সাপ্তাহিক বন্ধ: প্রতি বৃহস্পতিবার আহসান মঞ্জিল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। এছাড়া অন্যান্য প্রধান সরকারি ছুটির দিনগুলোতেও এটি বন্ধ থাকে।

৩. আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও ভেতরের পরিবেশ

  • ডিজিটাল গ্যালারি: আহসান মঞ্জিলের মোট ২৩টি গ্যালারিকে আধুনিক আলো ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে দর্শনার্থীদের জন্য উপযোগী করা হয়েছে। এখানে নবাব আমলের রাজকীয় আসবাবপত্র, ডাইনিং রুম, নাচঘর, ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র এবং ঐতিহাসিক দুর্লভ আলোকচিত্র সংরক্ষিত আছে।
  • নিরাপত্তা ও নিষেধাজ্ঞা: প্রাসাদের মূল ভবনের ভেতরে সব ধরনের ক্যামেরা, ট্রাইপড এবং ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ নিষেধ (মহিলাদের ছোট পার্স বাদে)। কাউন্টারের পাশে লকার রুমে এগুলো জমা রাখতে হয়। ভবনের ভেতরে ছবি বা সেলফি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তবে বাইরের বিশাল সবুজ বাগান ও সিঁড়িতে ছবি তোলা যায়।
  • সহজ যাতায়াত: পুরান ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের খুব কাছেই এর অবস্থান। যানজট এড়াতে ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে গুলিস্থান এসে সেখান থেকে রিকশা বা সিএনজি নিয়ে আহসান মঞ্জিল পৌঁছানো সবচেয়ে সহজ।

বাংলার শিক্ষা, রাজনীতির রূপরেখা পরিবর্তন ও অধিকার আদায়ে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া এই মহান নেতার মৃত্যু ইতিহাসের পাতায় আজও এক রহস্যময় অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

পুরো পৃথিবী শাসনকারী দুই মুসলিম বাদশা

নিউজ ডেস্ক

August 25, 2026

শেয়ার করুন

বিভাগ: বিশেষ গাইড / ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ | ইসলামিক রিসার্চ ও এসইও এডিটর

ইসলামিক ইতিহাস, তাফসির ও বিভিন্ন বর্ণনা অনুসারে—পৃথিবীর ইতিহাসে শুরু থেকে এ পর্যন্ত মাত্র চারজন শাসক সমগ্র বিশ্বের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য ও শাসন ক্ষমতা লাভ করতে পেরেছিলেন। বিখ্যাত মুফাসসির আল্লামা ইবনে কাসীর (রহ.) তাঁর ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত সূত্রে উল্লেখ করেছেন যে, এই চারজন বিশ্বশাসকের মধ্যে দুইজন ছিলেন মুমিন (মুসলিম) এবং দুইজন ছিলেন কাফির

যে দুই বিশ্বখ্যাত মুমিন ও মুসলিম বাদশা পুরো পৃথিবী শাসন করেছিলেন, তাঁরা হলেন—

১. হজরত সুলাইমান (আ.)

২. বাদশাহ জুলকারনাইন

(অন্যদিকে কাফির দুই শাসক ছিলেন নমরুদ এবং বাবেল বা ব্যবিলনের রাজা বখতে নেছার/নেবুচাদনেজার)।

নিচে এই দুই মহান মুমিন সম্রাটের শাসনব্যবস্থা ও পবিত্র কুরআনের রেফারেন্সসহ ইন-ডেপথ রূপরেখা তুলে ধরা হলো।

১. সমগ্র বিশ্ব শাসনকারী চার সম্রাটের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

                                [ বিশ্ব শাসনকারী চার সম্রাট ]
                                             │
        ┌────────────────────────────────────┴────────────────────────────────────┐
        ▼                                                                         ▼
 [ ১. মুমিন/মুসলিম শাসক ]                                                 [ ২. কাফির/অমুসলিম শাসক ]
  • হজরত সুলাইমান (আ.)                                                     • নমরুদ (ইব্রাহিম আ.-এর সাময়িক প্রতিপক্ষ)
  • বাদশাহ জুলকারনাইন                                                      • বখতে নেছার (নেবুচাদনেজার)

২. কুরআনের আলোকে দুই মুসলিম বাদশার শাসন ও ক্ষমতা

বাদশার নামশাসনামলের বিশেষ ক্ষমতাকুরআনের প্রধান রেফারেন্স
হজরত সুলাইমান (আ.)মানুষ, জিন, বাতাস এবং পশুপাখির ওপর অলৌকিক কর্তৃত্ব ও একচ্ছত্র শাসনসূরা আন-নামল (আয়াত ১৬, ১৮) & সূরা সাবা (আয়াত ১২)
বাদশাহ জুলকারনাইনপ্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার, ন্যায়বিচার ও ইয়াজুজ-মাজুজ প্রতিরোধে তামা-লোহার প্রাচীর নির্মাণসূরা আল-কাহফ (আয়াত ৮৩-৯৮)

৩. দুই মহান মুমিন শাসকের শাসন ব্যবস্থার বিস্তারিত বিবরণ

                           [ দুই মুমিন শাসকের ক্ষমতার উৎস ]
                                             │
       ┌─────────────────────────┬───────────┴───────────┬─────────────────────────┐
       ▼                         ▼                       ▼                         ▼
 [ পশুপাখির ভাষা ]         [ বাতাসের গতি ]         [ জিনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ]     [ বৈশ্বিক ন্যায়বিচার ]
  • সুলাইমান (আ.) কে          • এক মাসের পথ এক         • জ্বিন প্রজাতি তাঁর         • জুলকারনাইনের প্রাচ্য ও
    পাখির ভাষা শেখানো হয়।       দিনে অতিক্রম করতেন।       হুকুম মেনে কাজ করত।        প্রতীচ্যে ন্যায় শাসন।

১. হজরত সুলাইমান (আ.)

আল্লাহ তাআলা তাঁকে কেবল মানুষের ওপরই নয়, বরং সমগ্র জগত—যেমন জিন জাতি, বাতাস এবং সমস্ত পশুপাখির ওপর অলৌকিক ক্ষমতা দান করেছিলেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:

“সুলাইমান ছিল দাঊদের উত্তরাধিকারী এবং সে বলেছিল, ‘হে লোক সকল! আমাকে পাখির বুলি শেখানো হয়েছে এবং আমাকে সর্বপ্রকার বস্তু প্রদান করা হয়েছে। এ অবশ্যই সুস্পষ্ট অনুগ্রহ।'”(সূরা আন-নামল: ১৬)

২. বাদশাহ জুলকারনাইন

জুলকারনাইন ছিলেন একজন একত্ববাদী, ন্যায়পরায়ণ এবং অত্যন্ত শক্তিশালী মহান বাদশা। আল্লাহ তাঁকে পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত শাসন করার উপায়-উপকরণ ও ক্ষমতা দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বভ্রমণকালে উৎপীড়িত জাতিকে রক্ষার জন্য ইয়াজুজ ও মাজুজের হামলা থেকে বাঁচতে লোহা ও গলিত তামার তৈরি এক সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করে দেন।

“আমি তাকে পৃথিবীতে আধিপত্য দান করেছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের উপায়-উপকরণ দিয়েছিলাম।”(সূরা আল-কাহফ: ৮৪)

৪. শেষ বিচারে ইসলামিক শিক্ষা

১. ক্ষমতার আসল মালিক আল্লাহ: এই দুই মহীয়ান শাসকের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার মালিক হলেও তাঁরা কখনো অহংকারী হননি, বরং আল্লাহর শোকরগুযারি করেছেন।

২. ন্যায়বিচারের আদর্শ: রাষ্ট্র পরিচালনায় জুলকারনাইন ও সুলাইমান (আ.)-এর ন্যায়পরায়ণতা বিশ্বের সর্বকালের শাসকদের জন্য এক অনুপম দৃষ্টান্ত।

প্রতিবেদন পর্যালোচনার শেষ কথা: পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক প্রভাবশালী শাসক আসলেও সমগ্র বিশ্বকে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শাসনকারী প্রধান দুই মুসলিম ব্যক্তিত্ব হলেন হজরত সুলাইমান (আ.) ও বাদশাহ জুলকারনাইন।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

১২ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ