আন্তর্জাতিক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদনকারীর নাম:
বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রারম্ভিকা
ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস (ইসকন), যেটি সাধারণত “হরে কৃষ্ণ” নামে পরিচিত, একটি বৈশ্বিক ধর্মীয় সংগঠন, যা ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি শ্রী কৃষ্ণের উপাসনায় নিবেদিত একটি হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন, যা তাদের অনুগামীদের জন্য একান্তভাবে শ্রী কৃষ্ণের মহিমা প্রচারের উদ্দেশ্যে কাজ করে। তবে ইসকন-এর মূল লক্ষ্যের সীমানা কেবল ধর্মীয় উপদেশ দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাদের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে একেবারে মৌলবাদী ধারণা এবং সামাজিক পরিবর্তনের প্রতি আগ্রহ যা সময়ের সাথে সাথে বিপুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই প্রতিবেদনে আমরা ইসকন এর ইতিহাস, প্রতিষ্ঠার কারণ, উদ্দেশ্য এবং আধুনিক সমাজে তার প্রভাব নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো।
ইসকনের জন্ম ও ইতিহাস
ইসকন বা আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আচার্য প্রভুপাদ, যিনি শ্রী কৃষ্ণের দর্শনকে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে পরিচিত করার উদ্দেশ্যে ইসকন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শ্রী কৃষ্ণের প্রতি ভক্তি ও প্রেমের মাধ্যমে সমাজের কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্য ছিল ইসকনের। তবে ইসকনের জন্মের সাথে সাথে এর কার্যক্রমও বেশ বিতর্কিত হয়ে ওঠে, বিশেষ করে তার সদস্য সংগ্রহের পদ্ধতি এবং ধর্মীয় ধর্মান্তরিত করার প্রক্রিয়ার কারণে।
ইসকন প্রতিষ্ঠার পর দ্রুত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলে বিস্তার লাভ করতে থাকে। এর সদস্য সংগ্রহের প্রচেষ্টা এবং ধর্মান্তরের কৌশল গুলো অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কের জন্ম দেয়। ইসকনের সদস্যদের মধ্যে যারা এক সময় ধর্ম পরিবর্তন করেন, তারা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তন করে ইসকনের শ্রী কৃষ্ণের ধর্মে রূপান্তরিত হয়ে যান।
ইসকনের মূল লক্ষ্য
ইসকনের প্রধান লক্ষ্য ছিল শ্রী কৃষ্ণের মহিমা প্রচার করা এবং তার প্রেমে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। তবে এর সাথে সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু ধর্মের উপাসনা সিস্টেমের গঠনের মাধ্যমে এক নতুন সমাজ ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা। ইসকন সদস্যরা বিশ্বাস করেন যে শ্রী কৃষ্ণই সৃষ্টিকর্তা, এবং তার চর্চা ও ভক্তি মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবী শান্তিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কিন্তু ইসকন এর কার্যক্রম কেবল ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তারা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটানোর জন্যও বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়েছিল, যার মধ্যে ছিল মুসলিম, খ্রিস্টান এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা, যা তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি করেছিল।
ধর্মান্তরের কার্যক্রম ও বিতর্ক
ইসকন তাদের মূল বিশ্বাসের অংশ হিসেবে মানুষের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করেছে, যা তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তাদের কর্মীরা বিভিন্ন জায়গায় ধর্মান্তরিত কার্যক্রম পরিচালনা করতো, বিশেষ করে উপমহাদেশের দেশগুলোতে যেখানে হিন্দু ধর্মের চর্চা প্রচলিত। কিছু সময়, বিশেষ করে বাংলাদেশে, তারা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর এবং স্থানীয় জনগণের উপর চাপ সৃষ্টি করতো, তাদের ধর্ম পরিবর্তনের জন্য। এসব কার্যক্রমে অনেক সময় জনগণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল।
ইসকনের রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং প্রভাব
ইসকনের কার্যক্রম শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়, এটি রাজনৈতিক সম্পর্কও গড়ে তুলেছে বিভিন্ন দেশ এবং সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মের সাথে। বিশেষ করে ইসকন ভারতের সাথেও সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটায়। ইসকন মূলত ভারত ও ইসরায়েলের যৌথ পরিচালনায় চলা একটি সংগঠন হিসেবে পরিচিত, যা তাদের কর্মকাণ্ডকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে।
এছাড়াও, ইসকন দ্বারা প্রচলিত উগ্র হিন্দু মৌলবাদী ধারণা কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করেছে এবং এর প্রভাব বর্তমানে বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশে, লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ইসকনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
ইসকন-কে একাধিক বার উগ্র হিন্দু মৌলবাদী এবং জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাদের ধর্মান্তরিত কার্যক্রম এবং উগ্র প্রচারের ফলে অনেক ক্ষেত্রে দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়, যা দেশীয় শান্তি ও ঐক্যকে হুমকির মুখে ফেলে। ইসকন-এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো তাদের সদস্য সংগ্রহের পদ্ধতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাস চাপিয়ে দেয়া। ইসকনের কার্যক্রমে অনেকে বিশ্বাস করেন যে, এটি মূলত রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত একটি কার্যকরী প্ল্যাটফর্ম, যা অন্য ধর্মাবলম্বীদেরকে শোষণ করে তাদের নিজেদের লক্ষ্য পূরণের জন্য কাজ করে।
ইসকন-এর বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে, ইসকন একটি বৈশ্বিক ধর্মীয় গোষ্ঠী হলেও, এটি অনেক দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তারা এখনো তাদের ধর্মীয় প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তে তার কার্যক্রম বিস্তার করছে। ইসকনের জনপ্রিয়তা কিছু দেশে বাড়লেও, তাদের কার্যক্রম অনেকের কাছে অত্যন্ত বিতর্কিত এবং এই সংগঠনটির বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগও রয়েছে, বিশেষ করে তারা যেভাবে ধর্মান্তরের কাজ চালিয়েছে এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর উপর চাপ সৃষ্টি করেছে, তা অনেকেই মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে মনে করেন।
উপসংহার
ইসকন একটি বৈশ্বিক ধর্মীয় সংগঠন হলেও, এর কার্যক্রম এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনেক বিতর্ক রয়েছে। এর প্রতিষ্ঠা এবং তার পরবর্তী কার্যক্রমগুলি হিন্দু ধর্মের প্রচার এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের জন্য হলেও, তারা অন্য ধর্মের অনুসারীদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করেছে, যা অনেকেই গ্রহণ করেনি। এভাবে, ইসকন সমগ্র বিশ্বের মধ্যে একটি বিতর্কিত এবং উগ্রবাদী সংগঠন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
সূত্র
১. “ISKCON History and Controversies.” Encyclopedia Britannica
২. “International Society for Krishna Consciousness.” Wikipedia
৩. “Hindu Fundamentalism and ISKCON.” The Daily Star
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
অর্থনীতি ও জাতীয় নীতি বিশ্লেষণ | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ১২ জুন ২০২৬
জাতীয় বাজেট কেবল কিছু শুষ্ক সংখ্যার হিসাব কিংবা আয়-ব্যয়ের খতিয়ান নয়, এটি একটি দেশের রাজনৈতিক দর্শন, সার্বভৌমত্ব এবং সামাজিক পরিস্থিতির এক একটি জীবন্ত দলিল। বাংলাদেশের বাজেটের সুদীর্ঘ ইতিহাসে ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছর একটি অত্যন্ত অনন্য, জটিল এবং ব্যতিক্রমী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. এ. আর. মল্লিক (আজিজুর রহমান মল্লিক) কর্তৃক উপস্থাপিত এই বাজেটটি যেমন ছিল আকারের দিক থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের একটি সাহসী পদক্ষেপ, তেমনি এর ভেতরের অর্থনৈতিক কৌশল এবং উপস্থাপনা শৈলীও ছিল রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য নজির।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ যখন প্রথম দশকের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ার লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন বাজেটের দর্শন এবং মেকানিজম ছিল এক রকম। আর আজ ২০২৬ সালের জুন মাসে দাঁড়িয়ে যখন দেশের নতুন অর্থবছর (২০২৬-২৭)-এর প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করা হয়েছে, তখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এসেছে এক মহাকাব্যিক পরিবর্তন। ড. এ. আর. মল্লিকের সেই ১,৫৪৯.৪৮ কোটি টাকার বাজেট এবং ২০২৬ সালের জুনে ঘোষিত বর্তমান সরকারের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার (৯.৩৮ ট্রিলিয়ন) মেগা বাজেটের মধ্যে একটি নিবিড় তুলনামূলক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. এক নজরে দুই বাজেটের মূল উপাত্ত ও সংখ্যাতাত্ত্বিক তুলনা

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের বাজেট কেবল আকারেই বাড়েনি, বরং এর অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও অর্থনীতির ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। নিচে একটি তুলনামূলক ছক দেওয়া হলো:
| অর্থনৈতিক নির্দেশক (Indicators) | ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের বাজেট | ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট | পরিবর্তনের ধরন ও রূপান্তর |
| বাজেটের মোট আকার | ১,৫৪৯.৪৮ কোটি টাকা | ৯,৩৮,০০০ কোটি টাকা (৯.৩৮ ট্রিলিয়ন) | প্রায় ৬০৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। |
| উন্নয়ন বাজেট (ADP) | প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা | ২,৩০,০০০ কোটি টাকার বেশি (চলতি মেয়াদে) | ভৌত এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশাল বরাদ্দ বৃদ্ধি। |
| রাজস্ব/অনুন্নয়ন ব্যয় | প্রায় ৫৯৯.২৪ কোটি টাকা | ৬,০৮,০০০ কোটি টাকা (অনূমিত) | রাষ্ট্রীয় পরিচালনা ও সেবার পরিধি ব্যাপক বৃদ্ধি। |
| বাজেট উপস্থাপনের মাধ্যম | সংসদে সরাসরি সম্পূর্ণ সাধু ভাষায় পঠিত। | মাল্টিমিডিয়া ও আধুনিক ডাটা অ্যানালিটিক্সসহ চলিত ভাষায়। | আভিজাত্য বনাম আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। |
| মূল অর্থনৈতিক দর্শন | যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও সমাজতান্ত্রিক ত্রাণ-ভিত্তিক। | মুক্তবাজার অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ইকোনমি লক্ষ্য। | বেঁচে থাকার লড়াই থেকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার স্বপ্ন। |
২. গভীর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ (Macroeconomic Analysis)
ক. স্বনির্ভরতা বনাম বৈদেশিক নির্ভরতার চিত্র বদল:
- ১৯৭৫-৭৬ এর চিত্র: তৎকালীন সময়ে ড. এ. আর. মল্লিকের উন্নয়ন বাজেটের সিংহভাগই (প্রায় ৭৫% থেকে ৮০%) আসত বৈদেশিক সাহায্য, অনুদান এবং বিদেশী ঋণের মাধ্যমে। বাংলাদেশ তখন সম্পূর্ণ “সাহায্য-নির্ভর” (Aid-dependent) একটি দেশ ছিল। নিজস্ব সম্পদ সীমিত থাকায় বৈশ্বিক দাতাগোষ্ঠীর সিদ্ধান্তের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করত।
- ২০২৬ এর চিত্র: বর্তমানের ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেটে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, বাজেটের সিংহভাগ অর্থই এখন দেশের নিজস্ব কর (NBR Tax) এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসে। বৈদেশিক ঋণ এখন বাজেটের ঘাটতি পূরণের একটি সহায়ক মাধ্যম মাত্র (ঘাটতি প্রাক্কলন ২.৪৩ লাখ কোটি টাকা), যা প্রমাণ করে বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিকভাবে কতটা স্বাবলম্বী।
খ. ব্যয়ের অগ্রাধিকার পরিবর্তন (Sectoral Shifts):
- ১৯৭৫-৭৬ এর অগ্রাধিকার: সেই সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের খাদ্য ঘাটতি দূর করা এবং মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ। তাই বাজেটে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ খাতে। এর পাশাপাশি ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা (রেলওয়ে ও ব্রিজ) মেরামতের জন্য বড় অংকের বরাদ্দ রাখা হয়েছিল।
- ২০২৬ এর অগ্রাধিকার: ২০২৬ সালের বাজেটে শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ থাকা হয়নি। এখনকার বড় বরাদ্দ যায় মেগা অবকাঠামো (পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র), বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, তথ্য-প্রযুক্তি (আইটি সেক্টর) এবং সামাজিক security বা নিরাপত্তা বেষ্টনীতে। ২০২৬ সালের বাংলাদেশ এখন উন্নত ও স্মার্ট অবকাঠামো বিনির্মাণের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
গ. জীবনযাত্রার মান ও মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব:
১৯৭৫ সালের ১,৫৪৯ কোটি টাকা এবং ২০২৬ সালের ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার এই বিশাল পার্থক্যের পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি হলো দেশের জিডিপি (GDP)-র আকার বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি (Inflation)। ১৯৭৫ সালে যে পণ্যটির দাম ছিল ১ টাকা, মুদ্রাস্ফীতির কারণে আজ তার মূল্য বহু গুণ বেড়েছে। তবে একই সাথে মানুষের মাথাপিছু আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই রাষ্ট্র আজ এত বড় বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সাহস দেখাতে পারছে।
৩. বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যতিক্রম: সম্পূর্ণ সাধু ভাষায় বাজেট বক্তৃতা

বাংলাদেশের বাজেট বক্তৃতার ইতিহাসে ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের বাজেটটি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে আছে এর ভাষারীতি ও উপস্থাপন শৈলীর কারণে।
- ব্যতিক্রমী উদ্যোগ: তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. এ. আর. মল্লিক বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম এবং একমাত্র অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাঁর পুরো বাজেট বক্তৃতাটি সম্পূর্ণ সাধু ভাষায় পেশ করেছিলেন।
- ভাষাগত গাম্ভীর্য: সাধারণত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিবরণী চলিত ভাষায় পেশ করা হলেও, ড. মল্লিক বাংলা ভাষার তৎকালীন প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যাকরণগত আভিজাত্য বজায় রেখে অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ সাধু ভাষায় এই বাজেট উপস্থাপন করেন, যা দেশের সংসদীয় ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি স্থায়ী ব্যতিক্রমী রেকর্ড হিসেবে গণ্য হয়।
৪. political বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও এই বাজেটের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের এই বাজেটটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম দ্রুততম এবং স্পর্শকাতর পটপরিবর্তনের সাক্ষী।
- বাজেট পেশের সময়কাল: ড. এ. আর. মল্লিক এই বাজেটটি পেশ করেছিলেন ১৯৭৫ সালের জুন মাসে। এটি ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) সরকারের সময়কার শেষ বাজেট।
- বাস্তবায়নের সময়কাল: বাজেটটি পাস হওয়ার মাত্র দুই মাসের মাথায়, অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। ফলে, ড. মল্লিকের পেশ করা এই বাজেটটি প্রণয়ন হয়েছিল এক রাজনৈতিক দর্শনে, কিন্তু এর চূড়ান্ত বাস্তবায়ন ঘটেছিল ১৫ আগস্ট পরবর্তী সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সামরিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। এই কারণেও এই বাজেটকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ‘উত্তাল মেয়াদের বাজেট’ বলা হয়।
৫. রাজনৈতিক দর্শন ও শাসন ব্যবস্থার রূপান্তর
- ১৯৭৫-৭৬ এর প্রেক্ষাপট: সেটি ছিল যুদ্ধোত্তর রাজনৈতিক পুনর্গঠন এবং পরবর্তীতে এক উত্তাল রাজনৈতিক পরিবর্তনের বছর। রাষ্ট্র তখন সমাজতান্ত্রিক ধারার অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সচল ছিল।
- ২০২৬ এর প্রেক্ষাপট: ২০২৬ সালের নতুন সরকার ও বাজেট সম্পূর্ণ মুক্তবাজার অর্থনীতি (Free-market economy) এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। এখনকার মূল দর্শন হলো “অর্থনৈতিক লোকসানি রাষ্ট্র” থেকে বের হয়ে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা, প্রযুক্তির প্রসার ঘটানো এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করার দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখা তৈরি করা।
পরিচিতি: অর্থমন্ত্রী ড. এ. আর. মল্লিক

ড. আজিজুর রহমান মল্লিক (ড. এ. আর. মল্লিক) ছিলেন একাধারে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ এবং কুশলী টেকনোক্র্যাট।
- তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য (Founder Vice-Chancellor) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
- ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসে (বিশেষ করে ভারতে) ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’র সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে এবং তহবিল সংগ্রহে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
- দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি প্রথমে共和国 বা প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ আমলা (যুগ্ম-সচিব ও রাষ্ট্রদূত) এবং পরবর্তীতে টেকনোক্র্যাট কোটায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের গুরুদায়িত্ব পালন করেন।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত মূল্যায়ন
১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের ১,৫৪৯ কোটি টাকার বাজেটটি যদি বাংলাদেশের শৈশবকালীন “হামাগুড়ি” দেওয়ার গল্প হয়, তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেটটি হলো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের “সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দৌড়ানোর” প্রত্যয়। ভাষার আভিজাত্য থেকে শুরু করে ডলারের অঙ্কে রূপান্তর—সব মিলিয়ে এই দুই বাজেটের ব্যবধান আসলে একটি তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে স্বাবলম্বী ও উদীয়মান অর্থনৈতিক সিংহ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের ৫০ বছরের জীবন্ত ইতিহাস। ড. এ. আর. মল্লিকের সেই সাধু ভাষার বাজেট বক্তৃতা এবং এর পেছনের রাজনৈতিক ওঠানামা প্রমাণ করে যে, আমাদের জাতীয় বাজেট কেবল কিছু সংখ্যার হিসাব নয়, এটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও ইতিহাসের এক একটি বাঁক বদলের গল্প।
নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও তথ্যের সূত্রসমূহ (Sources)
১. বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) আর্কাইভ: স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ থেকে শুরু করে ২০২৬-২৭ অর্থবছর পর্যন্ত জাতীয় বাজেট ও অর্থমন্ত্রীদের বক্তৃতা সংকলন এবং বার্ষিক প্রতিবেদন।
২. জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও পরিকল্পনা কমিশন রেকর্ডস: ঐতিহাসিক সংসদীয় কার্যবিবরণী, প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, ১৯৭৫ সালের অর্থ বিলের নথিপত্র এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ঐতিহাসিক ডাটাবেজ।
দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, জাতীয় বাজেট এবং সমসাাময়িক ভূ-রাজনীতির এমন সব গভীর ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ পড়তে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতি ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ১১ জুন ২০২৬
বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ‘বাংলাদেশের রাজনীতি’-র থেকে ‘রাজনীতির বাংলাদেশ’ বলাটাই হয়তো বেশি গ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশ আজ এক জটিল রাজনীতির পাঁকে পড়ে গিয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিশ্বমঞ্চে ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, দেশি-বিদেশি নানা শক্তির টক্করের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এই ভূখণ্ড। চীন, পাকিস্তান, ভারত এবং পর্দার আড়ালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থের দ্বন্দ্বে এক জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে, যার কুপ্রভাব আগামী দিনে দৃশ্যমান হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার এই দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ৪টি খণ্ডের মেরুকরণ এবং আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাব নিয়ে একটি গভীর পর্যবেক্ষণমূলক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ৪ খণ্ড ও ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্তমানে দেশের শাসন ক্ষমতায় রয়েছে বিএনপি। তবে ক্ষমতার এই নতুন বিন্যাসের ভেতরেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রধানত ৪টি খণ্ডে বিভক্ত এবং তাদের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন স্পষ্ট:
- ক্ষমতায় বিএনপি ও তাদের কৌশল: দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। তবে ক্ষমতায় বসার পর তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণ, ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া ‘জুলাই চার্টার’ বা সাংবিধানিক সংস্কারের অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করা।
- মুহাম্মদ ইউনূসের মেয়াদের পর ছাত্রদল: ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সফলভাবে নির্বাচন দিয়ে বিএনপির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। তবে আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছাত্ররা এখন নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে দেশের জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে। তবে অভিজ্ঞতাহীন এই তরুণ নেতৃত্ব দীর্ঘমেয়াদে কতটা রাজনৈতিক পরিপক্বতা দেখাতে পারে, তার ওপর তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
- আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থা: শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে চরম কোণঠাসা। তবে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব, জোট গড়ার ক্ষমতা ও একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক (বিশেষ করে সংখ্যালঘু সমীকরণ ও দীর্ঘদিনের দলীয় সমর্থক) একেবারে মুছে যায়নি। গত কয়েক মাসে ইতিহাসের কাটা ঘা বা ক্ষত কিছুটা হলেও শুকিয়েছে, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ বর্তমান ছাত্রনেতারাও অনুধাবন করতে পারছেন। একই সাথে, বাংলাদেশে হিন্দু ভোটারের সংখ্যা ১০%-এর কম হলেও নির্বাচনী অংকে তা মোটেও অ-গুরুত্বপূর্ণ নয়।
২. রাজনীতিতে ‘চিরস্থায়ী শত্রু বা মিত্র’ বলে কিছু নেই

রাজনীতি বিষয়টি সরল নয়, বরং অত্যন্ত জটিল। আন্তর্জাতিক শক্তি বা অভ্যন্তরীণ হাওয়া যতই পক্ষে থাকুক না কেন—গাছে উঠতে না জানলে বা শক্ত ডাল জড়িয়ে ধরে থাকার পরিপক্বতা না থাকলে ক্ষমতা ধরে রাখা যায় না। ছাত্ররা জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করলেও অভিজ্ঞতার অভাবে তাদের অন্যদের ওপর নির্ভরশীল থাকতেই হবে; কারণ জন্ম নিয়েই কোনো শিশু হাঁটতে পারে না। অন্যদের অবলম্বন তাকে করতেই হয়।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় ঘটতে পারে দলগুলোর কৌশলগত জোটে। বিএনপি নীতিগতভাবে ভারতবিরোধী অবস্থান দেখালেও মূলত তারা ক্ষমতাবিরোধী নয়। ক্ষমতার জন্য ভারতের সমর্থন বা সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তারা প্রকাশ্যে ভারতবিরোধিতা করলেও প্রকৃত অর্থে বা পর্দার আড়ালে তা করবে না। বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার স্বার্থে চরম আদেশিক বিপরীত মেরুর দলও (যেমন ভারতের মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ও মিমের পরোক্ষ সমীকরণ কিংবা ঔরঙ্গজেবের বিরোধিতার ইতিহাস) এক হয়ে যায়। সেই হিসেবে, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা ও ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজনে ভবিষ্যতে অভিজ্ঞ ও পরিপক্ব দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যদি এক থালায় বা জোটে বসে, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। উভয় দলই যথেষ্ট পরিপক্ব এবং অভিজ্ঞ।
৩. আন্তর্জাতিক শক্তির আগ্রাসন ও ‘ভবিষ্যতের সিরিয়া’ হওয়ার শঙ্কা়

বাংলাদেশের এই অভ্যন্তরীণ বিন্যাস ও অস্থিরতার সুযোগ নিচ্ছে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো।
- ত্রিমুখী চাপ: এখানে পাকিস্তান নতুন করে এন্ট্রি নেওয়ার চেষ্টা করছে, পাশাপাশি ভারতের শক্তিশালী গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক নজরদারি তো রয়েছেই। এর সাথে যুক্ত হয়েছে লাভের গন্ধে ছটফট করা aggression বা আগ্রাসী চীন এবং চীন-বিরোধী ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
- ঝুঁকির মেঘ: এই বহুপাক্ষিক ভূ-রাজনৈতিক টানাটানি যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে সিরিয়ার মতো বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর প্রক্সি-ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
তবে ভারত নিজের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা ও শিলিগুড়ি করিডোরের (চিকেনস নেক) সুরক্ষার স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশকে কখনোই হাতছাড়া হতে দিতে চাইবে না। ভারত নিজের প্রভাব খাটিয়ে এখানে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ বা তাদের অনুকূল সরকার ধরে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। আর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ‘ভারতবিরোধী সরকার’ কীভাবে সময়ের প্রয়োজনে ‘ভারতপন্থী’ হয়ে ওঠে, তার উদাহরণ দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন কিছু নয়। ভারতের জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি করার চেষ্টা চালানো হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে যে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে, তার বার্তা তিস্তা, যমুনা ও পদ্মার জলবণ্টন এবং প্রাকৃতিক ভূগোলের ওপরই নির্ভর করে। প্রকৃতির ওপর যেমন মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই, আন্তর্জাতিক আইনের নিয়ন্ত্রণও অনেক সময় পরাশক্তিগুলোর ওপর খাটে না।
৪. দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক অস্থিতিশীলতা: পাকিস্তান ও নেপাল প্রসঙ্গ

বাংলাদেশের বাইরে পুরো দক্ষিণ এশিয়া জুড়েই এখন এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অস্থিরতা চলছে:
পাকিস্তানের শোচনীয় দশা:
ইসলামাবাদ বর্তমানে ত্রিমুখী ঝামেলা, চরম অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে হিমশিম খাচ্ছে। ভারত ইতিমধ্যে পাক-অধিকৃত কাশ্মীর (POK) পুনরুদ্ধারের ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে, আফগানিস্তান খাইবার পখতুনখোয়া নিয়ে চাপ দিচ্ছে এবং ঐতিহাসিকভাবে শোষিত ও বঞ্চিত বেলুচিস্তান নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে আন্দোলন তীব্র করছে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনার শিকার বেলুচিস্তানের এই স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দাবি এবং আফগান সীমান্তের অস্থিতিশীলতা সামলাতে পাকিস্তানের পেছনে চীনের সমর্থন থাকলেও ইসলামাবাদ পুরোপুরি হিমশিম খাচ্ছে।
নেপালের রাজতন্ত্রের পুনরুত্থান ও হিন্দুরাষ্ট্রের দাবি:
নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক বড় ধরনের আদর্শিক মোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নেপালে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে গণতন্ত্র আনার বয়স ২০ বছরও পার হয়নি, কিন্তু এই অল্প সময়ে এতবার সরকার পরিবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে যে দেশটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। ফলে উন্নতির আশায় ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র আনা হলেও তা নেপালের জন্য হিতে বিপরীত বা অভিশাপ হয়েছে। বর্তমানে নেপালী হিন্দুরা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর আস্থা হারিয়ে পুনরায় রাজতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন এবং নেপালকে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষণার দাবি তুলছেন, যা তাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জোরালো ও সমর্থনযোগ্য হয়ে উঠছে।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত विश्लेषण
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এখন এক অত্যন্ত সংবেদনশীল মোড় পার করছে। পাকিস্তান দেউলিয়া হওয়ার পথে, নেপাল তার পরিচয়ের সংকটে ভুগছে, আর বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন রাজনৈতিক মোড়ে। এই পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ দলগুলোর ক্ষমতার লোভ বা বিদেশী শক্তির ওপর অন্ধ নির্ভরশীলতা দেশের সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করতে পারে। বাংলাদেশকে যদি ‘ভবিষ্যতের সিরিয়া’ হওয়া থেকে বাঁচতে হয়, তবে ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও তথ্যের সূত্রসমূহ (Sources)
১. দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা সমীক্ষা: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কৌশলগত কূটনীতি গবেষণা সেল (South Asian Strategic Studies)।
২. আঞ্চলিক সীমান্ত ও রাজনৈতিক ডাটা: দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক রদবদল, বেলুচিস্তান সংকট এবং নেপালের সাংবিধানিক রূপান্তর বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদন।
দেশ-বিদেশের রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক কূটনীতির এমন সব নিরপেক্ষ ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণ পড়তে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও অভূতপূর্ব পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। “এক দেশ, এক নির্বাচন” (One Nation, One Election)—এনডিএ (NDA) শিবিরের দীর্ঘদিনের এই স্বপ্ন ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এবার তৃতীয় মোদি সরকারের আমলেই ঘটানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জোর দাবি করা হচ্ছে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বছরভর একের পর এক নির্বাচন চলতে থাকায় দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়—এই যুক্তিকে সামনে রেখেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশবাসীকে এই ঐতিহাসিক ব্যবস্থার সমর্থনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই মেগা প্রজেক্টের কাজের অগ্রগতি, প্রস্তাবিত রোডম্যাপ এবং এর বিপরীতে থাকা নানাবিধ জটিলতা নিয়ে একটি বিশেষ পর্যালোচনা নিচে তুলে ধরা হলো:
কীভাবে ও কবে থেকে কার্যকর হবে? রামনাথ কোবিন্দ কমিটির প্রস্তাব

এই মহাগুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াটি খতিয়ে দেখতে ও কার্যকর করতে ইতিমধ্যেই ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। উক্ত কমিটি ইতিমধ্যে তাদের চূড়ান্ত রিপোর্টও পেশ করেছে।
কমিটি ও আইন কমিশনের সম্ভাব্য প্রস্তাবনার মূল বিষয়গুলো হলো:
- প্রথম ধাপ: প্রাথমিকভাবে সারা দেশের লোকসভা এবং সবকটি राज्यों বিধানসভা নির্বাচন একই সাথে সম্পন্ন করা হবে।
- দ্বিতীয় ধাপ: লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরবর্তী ১০০ দিনের মধ্যে সমস্ত আঞ্চলিক বা স্থানীয় নির্বাচনগুলি একত্রে করা যেতে পারে।
- শুরুর সময়: আইনসভার তিনটি স্তর—অর্থাৎ লোকসভা, রাজ্য বিধানসভাসমূহ এবং পুরসভা, পৌর নিগম ও গ্রাম পঞ্চায়েতের মতো আঞ্চলিক প্রশাসনকে একই সুতোয় গেঁথে ২০২৯ সাল থেকে এই যৌথ নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করার কথা ভাবা হচ্ছে।
- বিকল্প আইনি ব্যবস্থা: যদি কোথাও কোনো নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়া যায় কিংবা সরকার গঠনের পর অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয়, তবে যাতে রাজনৈতিক সংকট তৈরি না হয়, সেজন্য নির্বাচনী ব্যবস্থায় জোট সরকার গঠনের বিশেষ বিধিও রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিরোধীদের আপত্তির মূল কারণ ও বাস্তব কিছু বড়

বিজেপি ও তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এই প্রক্রিয়া চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, দেশের বিরোধী দলগুলো এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক দল কিন্তু ইতিমধ্যেই এই ভাবনার তীব্র বিরোধিতা করেছে। তাদের মতে, সাংবিধানিক ও ব্যবহারিক নানাবিধ কারণে ভারতে এটি কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব। বিরোধীদের মূল আপত্তি ও চ্যালেঞ্জগুলো হলো:
১. স্থানীয় ইস্যু ও আঞ্চলিক দলগুলোর অস্তিত্বের সংকট:

আঞ্চলিক দলগুলির প্রধান আপত্তি হলো—তাদের আর্থিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতা বড় জাতীয় দলগুলির মতো বিপুল নয়। যদি একই সাথে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে প্রচারণায় বিপুল অর্থ ও সম্পদশালী দলগুলো অনেক এগিয়ে যাবে। এর ফলে জাতীয় ইস্যুগুলোই মূলত প্রচারের আলোয় চলে আসবে এবং জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় বা আঞ্চলিক সমস্যাগুলো পুরোপুরি ঢাকা পড়ে যাবে।
২. সাংবিধানিক ও আইনি অস্পষ্টতা:
বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, মোদি সরকারের এই খসড়া প্রস্তাবে মাঝপথে কোনো আইনসভা ভেঙে দেওয়া হলে কী হবে, রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে কিংবা মিলিজুলি সরকার গঠন নিয়ে আইনি কাঠামোর কোনো পরিষ্কার বা স্বচ্ছ রূপরেখা এখনও দেওয়া হয়নি।
৩. ইভিএম (EVM) সংকট ও বিশাল আর্থিক ব্যয়ভার:
বর্তমানে ভারতের নির্বাচন কমিশন একই ইভিএম মেশিন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বিভিন্ন राज्यों নির্বাচনে ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু একই সাথে সারা দেশে সমস্ত স্তরের নির্বাচন করতে গেলে এক ধাক্কায় কোটি কোটি নতুন ইভিএম ও আনুষঙ্গিক技术的 প্রয়োজন হবে।
- ব্যয়ভারের অংক: এই বিশাল সংখ্যক নতুন ইভিএম তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের বিপুল খরচের বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে—এর জন্য আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। তবে এই বিশাল তহবিলের সঠিক ব্যয়ভার কীভাবে বহন করা হবে, তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত বিশ্লেষণ
“এক দেশ, এক নির্বাচন” ব্যবস্থাটি যদি কেবল জাতীয় ইস্যুকে মুখ্য করে তোলে, তবে ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশের আঞ্চলিক দাবি-দাওয়াগুলো হারিয়ে যাওয়ার একটা বড় ঝুঁকি থেকে যায়, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বা সামাজিক ক্ষতের সৃষ্টি করতে পারে। লোকসভা নির্বাচনে একক দাপট কিছুটা ধাক্কা খাওয়ার পর বর্তমান মোদি সরকারের জন্য সব পক্ষকে এক টেবিলে আনা এবং এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করা নিঃসন্দেহে এক চরম পরীক্ষা। তবে সরকার যদি সমস্ত আইনি, আর্থিক ও আঞ্চলিক জটিলতা সঠিকভাবে সামলে এই প্রক্রিয়াটি সুসম্পন্ন করতে পারে, তবে সাধারণ নাগরিক হিসেবে ভারতের বিশাল একটি অংশ একে স্বাগত জানাবে।
নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও তথ্যের সূত্রসমূহ (Sources)
১. ভারতের নির্বাচন ও রাজনৈতিক ঘোষণা: ভারতের প্রধানমন্ত্রীর স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ এবং এনডিএ (NDA) সরকারের অভ্যন্তরীণ সূত্র।
২. রামনাথ কোবিন্দ কমিটি ও আইন কমিশন রিপোর্ট: কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচনী সংস্কার বিষয়ক বিশেষ কমিটির খসড়া প্রস্তাব ও ব্যয়নির্বাহ সংক্রান্ত সরকারি ডেটা।
উপদেশের ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির এমন সব বিশ্লেষণধর্মী খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে



