খাদ্য

সজনে পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা: ১৯৫০ থেকে ২০২৫—প্রকৃতির ‘মিরাকল’ যখন আধুনিক বিজ্ঞানের কাঠগড়ায়
সজনে পাতা

নিউজ ডেস্ক

December 24, 2025

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ তারিখ: ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫

বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে ১৯৫০-এর দশকেও যে সজনে গাছটি ছিল কেবল ডাল-তরকারির অনুষঙ্গ, ২০২৫ সালে এসে সেই সজনে পাতাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান বলছে ‘সুপারফুড’ বা ‘মিরাকল ট্রি’। বর্তমানের এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ভেজাল খাবারের যুগে সজনে পাতা হয়ে উঠেছে সাশ্রয়ী পুষ্টির প্রধান উৎস। তবে এর অসাধারণ উপকারিতার আড়ালে কিছু গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও রয়েছে, যা জানা না থাকলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

১. সজনে পাতার পুষ্টির মানচিত্র (পুষ্টিঘনত্ব)

সজনে পাতা কেন অনন্য? কারণ এতে এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা সাধারণ সবজিতে দুষ্প্রাপ্য। সমপরিমাণ ওজনে তুলনা করলে সজনে পাতায় রয়েছে:

  • ভিটামিন সি: কমলার চেয়ে ৭ গুণ বেশি।
  • ভিটামিন এ: গাজরের চেয়ে ৪ গুণ বেশি।
  • ক্যালসিয়াম: দুধের চেয়ে ৪ গুণ বেশি।
  • পটাশিয়াম: কলার চেয়ে ৩ গুণ বেশি।
  • প্রোটিন: দইয়ের চেয়ে ২ গুণ বেশি।

২. প্রধান উপকারিতাসমূহ (Benefits)

  • রক্তশূন্যতা দূরীকরণ: এতে প্রচুর আয়রন রয়েছে। ভিটামিন সি থাকায় এই আয়রন শরীর দ্রুত শোষণ করতে পারে, যা অ্যানিমিয়া রোগীদের জন্য মহৌষধ।
  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: গবেষণায় দেখা গেছে, সজনে পাতায় থাকা আইসোথিওসায়ানেটস ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায় এবং রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
  • হাড় ও দাঁতের সুরক্ষা: দুধের বিকল্প হিসেবে সজনে পাতা ক্যালসিয়ামের এক বিশাল উৎস, যা হাড়ের ক্ষয় রোধ করে।
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি: এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও জিংক উপাদান শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে তুলে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।
  • উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল: এটি রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করে।

৩. স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অপকারিতা (Side Effects)

প্রাকৃতিক হলেও সবার জন্য সজনে পাতা নিরাপদ নয়। বিশেষ করে নিচের ক্ষেত্রগুলোতে এটি বিপজ্জনক হতে পারে:

  • কিডনি রোগী: সজনে পাতায় উচ্চমাত্রার পটাশিয়াম থাকে। কিডনি রোগীদের শরীর অতিরিক্ত পটাশিয়াম বের করতে পারে না, যা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ (Cardiac Arrest) করতে পারে।
  • থাইরয়েড সমস্যা: এতে গোট্রোজেনিক উপাদান থাকে যা থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে বাধা দেয়। হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্তদের জন্য এটি ক্ষতিকর।
  • ওষুধের সাথে মিথস্ক্রিয়া: যারা রক্ত পাতলা করার ওষুধ (যেমন- ওয়ারফারিন) খান, তাদের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ। সজনে পাতার ভিটামিন-কে ওষুধের কার্যকারিতা কমিয়ে রক্ত জমাট বাঁধিয়ে দিতে পারে।
  • গর্ভাবস্থা: সজনে পাতার শিকড় বা অতিরিক্ত পাতা জরায়ু সংকোচন ঘটাতে পারে, যা গর্ভাবস্থার শুরুতে গর্ভপাতের ঝুঁকি তৈরি করে।

৪. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ১৯৫০ থেকে ২০২৫

১৯৫০-এর দশকে বাংলার দুর্ভিক্ষ ও অপুষ্টি দূরীকরণে গ্রামবাংলার এই সজনে গাছটি ছিল নীরব যোদ্ধা। সময়ের আবর্তে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এই নতুন বাংলাদেশে মানুষ যখন স্বাস্থ্যের বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন, তখন সজনে পাতার পাউডার বা ‘মোরিঙ্গা পাউডার’ এখন একটি আন্তর্জাতিক রফতানি পণ্য। ১৯৫০ সালে যা ছিল অবহেলিত, ২০২৫ সালে তা বিশ্বজুড়ে কয়েক বিলিয়ন ডলারের শিল্প।

৫. গ্রহণের সঠিক পদ্ধতি ও সতর্কতা

  • পরিমাণ: সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দিনে ১ চা চামচ (৫ গ্রাম) সজনে পাতার গুঁড়া বা এক কাপ রান্না করা পাতা যথেষ্ট।
  • সতর্কতা: সজনে পাতার সাথে চা বা কফি পান করবেন না, কারণ এতে থাকা ট্যানিন আয়রন ও ক্যালসিয়াম শোষণে বাধা দেয়।
  • পরামর্শ: দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত থাকলে বা কোনো নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এটি ডায়েটে যোগ করুন।

তথ্যসূত্র (References):

১. World Health Organization (WHO): Moringa oleifera as a nutritional supplement for developing countries. ২. National Institutes of Health (NIH): Therapeutic Potential of Moringa oleifera Leaves in Chronic Diseases. ৩. Journal of Food Science and Technology (2025): Nutritional density and Anti-nutritional factors in Moringa leaves. ৪. বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI): সজনে পাতার চাষ পদ্ধতি ও পুষ্টিগুণ নির্দেশিকা (২০২৪-২৫)। ৫. International Journal of Molecular Sciences: Isothiocyanates and glucose metabolism.

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

পুদিনা পাতা

নিউজ ডেস্ক

August 12, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ

পুদিনা পাতা আমাদের দেশে অতি পরিচিত এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি সতেজকারী উপাদান। বোরহানি, সালাদ, ফলের জুস কিংবা স্মুদিতে এর ব্যবহার যেমন স্বাদ বাড়ায়, তেমনি এর মনমাতানো সুগন্ধ যেকোনো পানীয়তে নতুন মাত্রা যোগ করে। স্বাভাবিক পরিমাণে কাঁচা পুদিনা পাতা খাওয়া পুরোপুরি নিরাপদ হলেও অতিরিক্ত গ্রহণ বা কৃত্রিম সিরাপ ব্যবহারে কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিতে পারে।

কাঁচা পুদিনা পাতা, বাণিজ্যিক পুদিনা সিরাপের অপকারিতা এবং এটি খেলে ওজন বাড়ে কি না—তার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. খুব বেশি কাঁচা পুদিনা পাতা খেলে যেসব সমস্যা হতে পারে

সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে প্রতিদিন ৫ থেকে ১০টি তাজা কাঁচা পাতা খাওয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ। তবে অতিরিক্ত খেলে যেসকল সমস্যা দেখা দেয়:

  • এসিডিটি ও বুক জ্বালাপোড়া (Heartburn & GERD): পুদিনা পাতায় থাকা ‘মেন্থল’ পাকস্থলী ও খাদ্যনালীর সংযোগস্থলের পেশিকে (Lower Esophageal Sphincter) অতিরিক্ত শিথিল করে দেয়। ফলে পাকস্থলীর অ্যাসিড সহজেই ওপরের দিকে উঠে আসে। যাদের গ্যাস্ট্রিক, আলসার বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা আছে, তাদের বুক জ্বালাপোড়া ও টক ঢেকুর বেড়ে যায়।
  • অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া: কিছু মানুষের মেন্থলে অ্যালার্জি থাকে। সরাসরি কাঁচা পাতা বেশি চিবিয়ে খেলে মুখে চুলকানি, ঠোঁট বা জিহ্বা ফুলে যাওয়া এবং ত্বকে র‍্যাশ দেখা দিতে পারে।
  • রক্তে সুগার অতিরিক্ত কমে যাওয়া: পুদিনা পাতা প্রাকৃতিকভাবে রক্তের শর্করা কমায়। তাই যারা ডায়াবেটিসের ওষুধ খাচ্ছেন, তারা বেশি কাঁচা পাতা খেলে রক্তের সুগার বিপজ্জনকভাবে কমে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে।
  • গর্ভাবস্থায় জরায়ুর ওপর প্রভাব: অতিরিক্ত কাঁচা পুদিনা পাতা জরায়ুর পেশ সংকুচিত করতে পারে, যা গর্ভাবস্থায় ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

২. পুদিনা সিরাপ খেলে কী কী সমস্যা হতে পারে?

বাজার থেকে কেনা বা প্রক্রিয়াজাত পুদিনা সিরাপে পুদিনার ঘনীভূত নির্যাসের পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ ও চিনি থাকে, যা নিচের সমস্যাগুলো তৈরি করে:

  • তীব্র এসিডিটি ও অ্যাসিড রিফ্লাক্স: প্রসেসড সিরাপে মেন্থলের ঘনত্ব বেশি থাকায় তা পাকস্থলীর অ্যাসিডিক লেভেল দ্রুত বাড়িয়ে দেয়।
  • লিভার ও কিডনির ওপর চাপ: অতিরিক্ত ঘনীভূত সিরাপ নিয়মিত খেলে এর কৃত্রিম কেমিক্যাল ও উপাদান লিভার ও কিডনির স্বাভাবিক কার্যকারিতায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
  • ওষুধের সাথে ক্ষতিকর ইন্টারঅ্যাকশন: উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা লিভারের নিয়মিত ওষুধের প্রভাবকে পুদিনার তীব্র নির্যাস কমিয়ে বা বাড়িয়ে দিতে পারে।
  • ব্লাড সুগারের তারতম্য: বাণিজ্যিক সিরাপে ব্যবহৃত অতিরিক্ত চিনি ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করা হঠাৎ বাড়িয়ে দেয়।

৩. পুদিনা পাতা বা সিরাপ খেলে কি মোটা হওয়া যায়?

উত্তর: না, প্রাকৃতিকভাবে পুদিনা পাতা খেলে মোটা হওয়া যায় না।

  • বাস্তবতা: পুদিনা পাতা একটি লো-ক্যালরি উপাদান, যা মেটাবলিজম বাড়িয়ে চর্বি গলাতে সাহায্য করে। তাই এটি ওজন কমানোর জন্যই বেশি কার্যকর।
  • সিরাপের বিভ্রান্তি: বাজারে যে মিষ্টি পুদিনা সিরাপ পাওয়া যায়, তাতে প্রচুর কৃত্রিম চিনি বা হাই-ফ্রুক্টোজ কর্ন সিরাপ থাকে। কেউ যদি এই সিরাপ খেয়ে ওজন বাড়াতে চান, তবে তা স্বাস্থ্যকর পেশি গঠন না করে পেটে ক্ষতিকর ফ্যাট ও ভুঁড়ি বাড়াবে।
  • স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন বাড়ানোর উপায়: মোটা হতে চাইলে পুদিনা সিরাপের ওপর নির্ভর না করে প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবার—যেমন ডিম, দুধ, কলা, বাদাম, ছাতু, খেজুর ও ওটস খাওয়া উচিত।

৪. ব্যবহারের সঠিক নিয়ম ও সতর্কতা

১. বিশুদ্ধ পানিতে ধোয়া: কাঁচা পাতায় থাকা ধুলোবালি ও ব্যাকটেরিয়া দূর করতে জুস বা বোরহানিতে ব্যবহারের আগে ভালো করে ধুয়ে নিন [সূত্র: CDC Produce Safety Guidelines]। ২. সংবেদনশীল শিশুদের ক্ষেত্রে: শিশুদের পরিপাকতন্ত্র পূর্ণাঙ্গ ও পরিপক্ক না হওয়ায় তাদের সরাসরি কাঁচা পাতা বা ঘন এসেন্স দেওয়া অনুচিত [সূত্র: American Academy of Pediatrics]। ৩. পরিমিত সেবন: পানীয়ের স্বাদ ও গন্ধের জন্য মাত্র কয়েকটি পাতাই যথেষ্ট, অতিরিক্ত ব্যবহারের প্রয়োজন নেই [সূত্র: Dietary Guidelines for Health]।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

টিকটিকি

নিউজ ডেস্ক

August 7, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ

দেওয়ালে বা সিলিংয়ে ঝুলে থাকা টিকটিকির লেজ খসে পড়া কিংবা কেটে যাওয়া লেজের লাফালাফি করা কেবল একটি অবাক করা দৃশ্যই নয়, এর পেছনে রয়েছে প্রকৃতির এক অদ্ভুত ও বৈজ্ঞানিক কৌশল। আবার অন্যদিকে, ঘরে টিকটিকির উপদ্রব বাড়লে তা আমাদের স্বাস্থ্য ও খাবারের সুরক্ষার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এই আর্টিকেলে আমরা টিকটিকির লেজ খসে পড়ার আসল রহস্য, প্রাকৃতিক উপায়ে ঘর থেকে টিকটিকি তাড়ানোর পদ্ধতি এবং টিকটিকি কামড়ালে বা খাবারে পড়লে করণীয় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করব।

১. টিকটিকির লেজ খসে পড়ার বৈজ্ঞানিক কারণ (Autotomy)

বিজ্ঞানের ভাষায় টিকটিকির আত্মরক্ষার্থের জন্য নিজ থেকে অঙ্গ বিচ্ছিন্ন করার এই প্রাকৃতিক ক্ষমতাকে ‘অটোটমি’ (Autotomy) বা ‘স্ব-অঙ্গচ্ছেদ’ বলা হয়।

[ শিকারি প্রাণীর আক্রমণ (বিড়াল/পাখি) ]
                   │
                   ▼
[ লেজের কশেরুকার ফাটল অংশে (Fracture Plane) চাপ ]
                   │
                   ▼
[ পেশির দ্রুত স্বয়ংক্রিয় সংকোচন (রক্তপাতহীন বিচ্ছেদ) ]
                   │
                   ▼
[ বিচ্ছিন্ন লেজের স্বয়ংক্রিয় স্পন্দন ও শিকারি বিভ্রান্ত ]
                   │
                   ▼
[ নিরাপদ পলায়ন ও কিছুদিন পর তরুণাস্থির (Cartilage) লেজ গজানো ]

প্রধান কারণসমূহ:

  • শিকারির দৃষ্টি সরানো: বিড়াল, পাখি বা অন্য কোনো প্রাণী টিকটিকির লেজ ধরে ফেললে, জীবন বাঁচাতে টিকটিকি লেজটি খসিয়ে দেয়।
  • বিচ্ছিন্ন লেজের স্পন্দন: স্নায়ুতন্ত্রের অবশিষ্টাংশ (Spinal Cord Motor Centers)-এর কারণে লেজটি খসে পড়ার পরও বেশ কিছুক্ষণ মাটিতে পড়ে লাফালাফি করতে থাকে। ফলে শিকারি প্রাণী বিভ্রান্ত হয়ে সেই লেজের দিকে নজর দেয় এবং টিকটিকিটি চট করে পালিয়ে যায়।
  • বিশেষ কশেরুকা ও রক্তপাত না হওয়া: টিকটিকির লেজের মেরুদণ্ডে নির্দিষ্ট কিছু ‘ফ্র্যাকচার প্লেন’ (Fracture Planes) বা ফাটল থাকে, যা খুব হালকা সংযোগযুক্ত। লেজ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সাথে সাথেই ধমনী ও পেশিগুলো বন্ধ হয়ে যায়, ফলে রক্তপাত হয় না।
  • পুনরায় লেজ গজানো: লেজ খসে পড়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নতুন লেজ গাজায়, তবে এটি হাড় দিয়ে তৈরি না হয়ে প্রধানত তরুণাস্থি (Cartilage) দিয়ে গঠিত হয়।

২. ঘর থেকে প্রাকৃতিকভাবে টিকটিকি তাড়ানোর উপায়

টিকটিকি অতিরিক্ত ঠান্ডা এবং কোনো কোনো উপাদানের তীব্র বা ঝাঁঝালো গন্ধ সহ্য করতে পারে না। কেমিক্যাল ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে টিকটিকি দূর করার সেরা পদ্ধতিগুলো নিচে দেওয়া হলো:

ক) তীব্র গন্ধের ব্যবহার

  • ডিমের খোসা: ডিমের গন্ধকে টিকটিকি ভয় পায়। ঘরের কোণে বা ভেন্টিলেটরে ডিমের ফাঁকা খোসা রেখে দিলে সে অঞ্চল এড়িয়ে চলে।
  • রসুন ও পেঁয়াজের রস: রসুনের কোয়া কোণায় ঝুলিয়ে রাখা কিংবা পেঁয়াজের রস পানিতে মিশিয়ে দেওয়ালে স্প্রে করলে এর তীব্র গন্ধে টিকটিকি পালিয়ে যায়।
  • গোলমরিচের স্প্রে: পানিতে গোলমরিচ বা লাল মরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে স্প্রে বোতলে নিয়ে দেওয়াল ও আসবাবপত্রের পেছনে ছিটান।
  • ন্যাপথলিন বল: আলমারির নিচে, ড্রয়ার বা কোণে ন্যাপথলিন রেখে দিলে টিকটিকির আগমন কমে যায়।

খ) পরিবেশগত পরিবর্তন

  • বরফ ঠান্ডা পানি: টিকটিকি শীতল রক্তের প্রাণী। এর গায়ে হঠাৎ বরফ ঠান্ডা পানি স্প্রে করলে তা সাময়িকভাবে অবশ হয়ে পড়ে, যা সহজে ঘর থেকে বের করা সম্ভব হয়।
  • পোকা-মাকড় নিয়ন্ত্রণ: ঘরে লাইটের আলো কমানো এবং ছোট পোকা নিয়ন্ত্রণ করলে খাবারের অভাবে টিকটিকি নিজে থেকেই চলে যায়।
  • তাপমাত্রা কমানো: এসি থাকলে ঘরের তাপমাত্রা ২৫° সেলসিয়াসের নিচে রাখলে টিকটিকি টিকতে পারে না।

৩. টিকটিকি কামড়ালে বা খাবারে পড়লে করণীয়

টিকটিকি বিষাক্ত প্রাণী নয় এবং সাধারণত কামড়ায় না। তবে এদের লালা, মলমূত্র ও ত্বকে সালমোনেলা (Salmonella) নামক ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা মানবদেহে প্রবেশ করলে তীব্র পেটব্যথা ও ফুড পয়েন্টনিং হতে পারে।

[ টিকটিকির স্পর্শ বা কামড় ]
           │
           ├───► ১. অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবান ও হালকা গরম পানিতে ধোয়া (৫-১০ মিনিট)
           │
           ├───► ২. অ্যান্টিসেপটিক মলম (Dettol/Savlon/Neomycin) ব্যবহার
           │
           └───► ৩. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে টিটেনাস (Toxoid) ইনজেকশন নেওয়া

ক) টিকটিকি কামড়ালে পদক্ষেপ:

  1. ক্ষতস্থান ধোয়া: গরম পানি ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবান দিয়ে ক্ষতস্থানটি অন্তত ৫-১০ মিনিট ভালো করে ধুয়ে ফেলুন।
  2. অ্যান্টিসেপটিক দেওয়া: ধোয়ার পর স্থানটি শুকিয়ে অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বা লিকুইড দিন এবং পরিষ্কার ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে রাখুন।
  3. টিটেনাস শট: ক্ষত গভীর হলে এবং গত ৫ বছরে টিটেনাস নেওয়া না থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী টিটেনাস শট নিন।

খ) খাবারে টিকটিকি পড়লে বা মুখ দিলে:

  • খাবার ফেলে দিন: কোনো খাবারে টিকটিকি মুখ দিলে বা মরে পড়ে থাকলে সেটি কখনোই খাওয়া যাবে না, খাবারটি পুরোপুরি ফেলে দিতে হবে।
  • বাসনপত্র পরিচ্ছন্ন করা: সংশ্লিষ্ট পাত্রটি সাবান ও গরম পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
  • অসাবধানতাবশত খেয়ে ফেললে: তীব্র পেটে ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া বা জ্বর শুরু হলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

উপসংহার

টিকটিকির লেজ খসে পড়া প্রকৃতিতে বিবর্তিত একটি চমৎকার বৈজ্ঞানিক আত্মরক্ষা কৌশল। বাসা-বাড়িতে একে মারার জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক উপায় অনুসরণ করা যেমন নিরাপদ, তেমনি খাবারের ক্ষেত্রে টিকটিকির ব্যাকটেরিয়া থেকে সতর্ক থাকাও অত্যন্ত জরুরি।

তথ্যসূত্র (References)

  1. Journal of Herpetology: Mechanisms and Physiology of Tail Autotomy in Reptiles.
  2. Centers for Disease Control and Prevention (CDC): Reptiles and Salmonella Risk Guidelines.
  3. Biological Sciences Study Reports: Natural Repellents and Environmental Control for Domestic Geckos.

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

দাউদ

নিউজ ডেস্ক

August 5, 2026

শেয়ার করুন

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞান ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

আমাদের দেশে গরম, অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং বর্ষার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ত্বকের যেসব চর্মরোগ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তার মধ্যে অন্যতম হলো সাধারণ চুলকানি এবং দাউদ বা রিংওয়ার্ম (Ringworm)। শরীরের চ্যাপ্টা ও ঢাকা জায়গাগুলোতে (যেমন—কুঁচকি, বগল, কোমর ও পায়ের ভাজ) এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় সচেতন না হলে কিংবা ভুল চিকিৎসার আশ্রয় নিলে দাউদ ক্রমশ পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

দাউদ কী এবং কেন হয়?

অনেকে দাউদকে পোকা বা কৃমিজনিত সংক্রমণ মনে করলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, এটি মূলত ‘ডার্মাটোফাইট’ (Dermatophytes) নামক এক প্রকার ছত্রাকজনিত সংক্রমণ (Fungal Infection)। এই ছত্রাকগুলো মানুষের ত্বকের মৃত কোষ, চুল এবং নখে থাকা ‘কেরাটিন’ নামক প্রোটিন খেয়ে বেঁচে থাকে।

সংক্রমণের প্রধান কারণ ও ঝুঁকি:

  • ঘাম ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ: শরীরের চাপা ভাঁজে ঘাম জমে থাকা এবং ত্বক ঠিকমতো পরিষ্কার ও শুকনো না রাখা।
  • সরাসরি সংক্রামিত হওয়া: আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত তোয়ালে, জামাকাপড়, সাবান, চিরুনি বা অন্তর্বাস ব্যবহার করলে।
  • গৃহপালিত পশুর মাধ্যমে: সংক্রামিত কুকুর বা বিড়ালের সংস্পর্শে আসা।
  • সংবেদনশীল ত্বক: যাঁদের ত্বক অতিরিক্ত সংবেদনশীল বা যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম।

প্রধান লক্ষণসমূহ

  • গোল চাকার দাগ: ত্বকের ওপর গোল চাকার মতো লালচে আংটির আকার নেয়, যার চারপাশ কিছুটা উঁচু ও খসখসে হয়।
  • তীব্র চুলকানি: আক্রান্ত স্থানে প্রচণ্ড চুলকানি ও জ্বালা-পোড়া অনুভূত হয়।
  • আংশিক চামড়া ওঠা: আক্রান্ত স্থানে খুশকির মতো আবরণ বা ছোট ছোট ফোসকা পড়তে পারে।

দাউদ ও চুলকানির বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি (CDC)-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী দাউদের ধরন ও তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়:

১. টপিকাল অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম (বাহ্যিক ব্যবহারের জন্য)

সংক্রমণ শরীরের সীমিত অংশে থাকলে নিম্নের ওভার-দ্য-কাউন্টার (OTC) অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিমগুলো দিনে ২ বার ব্যবহার করা যায় (লক্ষণ কমে গেলেও ডাক্তারদের পরামর্শে অন্তত ২-৪ সপ্তাহ ব্যবহার চালিয়ে যেতে হয়):

  • ক্লোট্রিমাজোল (Clotrimazole 1%)
  • টারবিনাফাইন (Terbinafine 1%)
  • কেটোকোনাজল (Ketoconazole 2%)

২. ওরাল অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ (গুরুতর বা মাথার ত্বকের জন্য)

সংক্রমণ যদি নখে বা মাথার ত্বকে (Tinea Capitis) ছড়ায়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টারবিনাফাইন বা ইট্রাকোনাজল (Itraconazole)-এর মতো মুখে খাওয়ার ওষুধ ১ থেকে ৩ মাস পর্যন্ত গ্রহণ করতে হতে পারে।

বিশেষ সতর্কবার্তা (CDC নির্দেশিত): দাউদের চুলকানি কমাতে ভুলও কোনো স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিম (Steroid Cream) ব্যবহার করবেন না। স্টেরয়েড সাময়িকভাবে চুলকানি কমালেও ত্বকের স্থানীয় প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়; ফলে ছত্রাক আরও দ্রুত ও মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

তাৎক্ষণিক উপশমে কার্যকর ঘরোয়া যত্ন

  • অ্যালোভেরা জেল: তাজা অ্যালোভেরার প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপটিক উপাদান চুলকানি ও জ্বালাপোড়া দ্রুত কমায়।
  • কাঁচা হলুদ ও রসুন: কাঁচা হলুদের কার্কুমিন এবং রসুনের অ্যালিসিন পেস্ট করে আক্রান্ত স্থানে ১০-১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেললে তা ফাঙ্গাস প্রতিরোধে সাহায্য করে।
  • কোল্ড কম্প্রেস (বরফ সেঁক): চুলকানি মাত্রাতিরিক্ত হলে একটি পরিষ্কার সুতি ভেজা কাপড় বা আইস প্যাক দিয়ে চেপে ধরলে চুলকানি প্রশমিত হয়।
  • ক্যালামাইন লোশন: সাধারণ চুলকানির ক্ষেত্রে ডার্মাটোলজিস্টের পরামর্শে ক্যালামাইন লোশন ব্যবহার করা যেতে পারে।

চিরতরে মুক্তি ও প্রতিরোধে জীবনযাত্রার পরিবর্তন

১. ত্বক পরিষ্কার ও শুষ্ক রাখুন: গোসল বা ব্যায়ামের পর শরীরের প্রতিটি ভাঁজ ভালোভাবে মুছে শুকনো রাখুন।

২. সুতির ঢিলেঢালা পোশাক: আঁটসাঁট জিন্স বা সিন্থেটিক কাপড় এড়িয়ে সুতি ও বাতাস চলাচল করতে পারে এমন পোশাক পরুন।

৩. ব্যক্তিগত জিনিস শেয়ার না করা: গামছা, তোয়ালে, চিরুনি, সাবান ও জামাকাপড় পরিবারের অন্য কারো সাথে শেয়ার করা বন্ধ করুন।

৪. নখ ছোট রাখা: চুলকানোর সময় নখের মাধ্যমে ফাঙ্গাস যেন শরীরের অন্য অংশে না ছড়ায়, তাই নখ ছোট রাখুন।

তথ্যসূত্র (Sources)

  • World Health Organization (WHO): Ringworm (Tinea) Fact Sheet
  • Centers for Disease Control and Prevention (CDC): Treatment of Ringworm Guidelines
  • National Center for Biotechnology Information (NCBI) – StatPearls: Tinea Corporis Clinical Treatment
  • জাতীয় শিক্ষক বাতায়ন (বাংলাদেশ সরকারি ওয়েব পোর্টাল): দাদের সতর্কীকরণ ও প্রতিরোধ নির্দেশিকা

বিষয়ঃ

১৭ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ