অপরাধ

বিমানের এমডির ঘরে বিভীষিকা: গৃহপরিচারিকা শিশুর ওপর পৈশাচিক নির্যাতনের লোমহর্ষক চিত্র
বিমান এমডির ঘরে শিশু

নিউজ ডেস্ক

February 4, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

রাজধানীর একটি অভিজাত এলাকায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও তাঁর পরিবারের হাতে এক ১১ বছর বয়সী গৃহপরিচারিকা শিশুর ওপর অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। যে হাত দিয়ে দেশের সেবায় নেতৃত্ব দেওয়ার কথা, সেই পরিবারের সদস্যদের হাতেই খুন্তির ছেঁকা আর মারধরে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে এক অসহায় বাবার কলিজার টুকরো।

প্রতিশ্রুতির আড়ালে বন্দিশালা

গত বছরের জুন মাসে এক দরিদ্র হোটেল কর্মচারী বাবা নিজের ১১ বছরের মেয়েকে বিমান বাংলাদেশের এমডির বাসায় কাজে দিয়েছিলেন। প্রতিশ্রুতি ছিল—মেয়টিকে নিজের সন্তানের মতো দেখা হবে, ভাত-কাপড়ের পাশাপাশি তাকে পড়াশোনা করানো হবে এবং বড় হলে বিয়ের সব খরচ বহন করবে এমডি পরিবার। কিন্তু গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে বাবার সাথে মেয়ের দেখাই করতে দেওয়া হয়নি। প্রতিবারই ‘মেয়ে ভালো আছে’ বলে মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে বাবাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

আহত শিশুর আর্তনাদ ও নির্মম বাস্তবতা

গত জানুয়ারির শেষ দিকে মেয়েটি ‘অসুস্থ’ বলে খবর পাওয়ার পর বাবা ছুটে যান সেই আলিশান অট্টালিকার দ্বারে। কিন্তু ভেতরে ঢোকার অনুমতি মেলেনি তাঁর। সন্ধ্যা ৭টার দিকে ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত আর খুন্তির ছেঁকায় ঝলসে যাওয়া শরীর নিয়ে মেয়েটিকে যখন বাবার কোলে ছুড়ে দেওয়া হয়, তখন বেরিয়ে আসে এক বিভীষিকাময় সত্য। জানা যায়, প্রতিদিন ওই শিশুটিকে মারধর করা হতো এবং জ্বলন্ত খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছেঁকা দিয়ে গুরুতর জখম করা হয়েছে। অথচ এই শিশুটিকে নেওয়া হয়েছিল এমডি পরিবারের আরেকটি শিশুর খেয়াল রাখার জন্য।

গ্রেফতার ও বিচারের প্রশ্ন

ইতিমধ্যেই অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও তাঁর স্ত্রীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন—বিচার কি আদৌ হবে? অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, প্রভাবশালী কর্তারা গ্রেফতার হলেও কদিন পরেই জামিনে মুক্ত হয়ে যান। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি কি এবারও পুনরাবৃত্তি হবে?

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সামাজিক দায়বদ্ধতা (১৯০০-২০২৬)

বাংলার ইতিহাসে ১৯০০ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান ২০২৬ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম থেমে নেই। ১৯৪৭-এর দেশভাগ বা ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ—সবই ছিল শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর যখন দেশ সংস্কারের কথা হচ্ছে, তখন রাষ্ট্রের এক সর্বোচ্চ কর্মকর্তার পরিবারের এই পাশবিকতা প্রশ্ন তোলে—আমরা কি আসলেই সভ্য হতে পেরেছি?

ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহে মজনু শাহ যেমন শোষকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, আজ সময় এসেছে সমাজের এই শিক্ষিত ও অভিজাত রূপধারী শোষকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

বিষয়ঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস

নিউজ ডেস্ক

November 7, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৭ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইতিহাস
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (১৫শ খণ্ড), লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ পিএসসির ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’, এবং সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংবাদপত্র আর্কাইভস 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাস ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী, অস্থির এবং নাটকীয় পালাবদলের সময়। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে, যার চূড়ান্ত পরিণতি রূপ নেয় ৭ নভেম্বরের ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ বা ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি ও জনতার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধনে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, যা বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন গতিপথে চালিত করে। এই ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল দিবসের নেপথ্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো। 

১. পটভূমি: ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর খোন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ায় সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধে। এর জেরে ৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের তৎকালীন সিনিয়র অফিসার ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং ঢাকা ওয়ান বেঙ্গলের কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে একটি পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। 

খালেদ মোশাররফের এই অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর পদ থেকে পদচ্যুত করা হয় এবং ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে তাঁকে সম্পূর্ণ গৃহবন্দি (House Arrest) করে রাখা হয়। খন্দকার মোশতাককে সরিয়ে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ৬ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন। 

২. নেপথ্যের অনুঘটক: জাসদ ও কর্নেল তাহেরের বিপ্লবের ডাক
মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের এই পাল্টা অভ্যুত্থানকে সেনাবাহিনীর সাধারণ জওয়ান বা সিপাহিদের একটি বড় অংশ ভারতের মদদপুষ্ট এবং মোশতাক চক্রের আরেকটি অংশের ক্ষমতার লড়াই হিসেবে চশমায় দেখছিল। এই সুযোগে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী দল ‘জাসদ’ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)-এর সামরিক শাখা ‘গণবাহিনী’ এবং এর অন্যতম প্রধান নেতা লে. কর্নেল (অব.) আবু তাহের সেনানিবাসের সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে এক গোপন প্রচারণা চালান। 

কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ সিপাহিদের বৈষম্য দূরীকরণ, ১২ দফা দাবি আদায় এবং ‘শ্রেণিহীন সামরিক ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ল্যান্স নায়েক ও সুবেদারদের সংগঠিত করে। ৭ নভেম্বর ভোররাতে এক গণ-অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল বন্দি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসা, কারণ জিয়াউর রহমান সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। 

৩. ৭ নভেম্বরের সেই ভয়াল রাত এবং সিপাহি-জনতার জাগরণ
৬ নভেম্বর মধ্যরাত পার হয়ে ৭ নভেম্বর ভোররাতে (আনুমানিক রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে) ঢাকা সেনানিবাসে সিপাহিদের বিদ্রোহ আনুষ্ঠানিকভাবে ফেটে পড়ে। ট্যাংকের গর্জন এবং শত শত রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণের মাধ্যমে সিপাহিরা ব্যারাকে ব্যারাকে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। 

  • জিয়াউর রহমানের মুক্তি: সিপাহিদের একটি দল দ্রুত মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসভবনে যায় এবং পাহারারত সেন্ট্রিদের নিরস্ত্র করে তাঁকে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত করে টু ফিল্ড আর্টিলারির সদর দপ্তরে নিয়ে আসে। মুক্ত হয়ে জিয়াউর রহমান সিপাহিদের শান্ত থাকার এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান। 
  • খালেদ মোশাররফের পতন ও মৃত্যু: সিপাহিদের এই ভয়াবহ বিদ্রোহের মুখে টিকতে না পেরে নবনিযুক্ত সেনাপ্রধান জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা এবং লে. কর্নেল এ টি এম হায়দার (যাঁরা সবাই বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন) শেরেবাংলা নগরের ১০ বেঙ্গলের সদর দপ্তরে আশ্রয় নেন। কিন্তু ৭ নভেম্বর সকালেই উত্তেজিত ও বিদ্রোহী সৈনিকদের হাতে এই তিন লিজেন্ডারি সামরিক কর্মকর্তা নির্মমভাবে নিহত হন। 
  • রাজপথে জনতার ঢল: সকাল হওয়ার সাথে সাথে সেনানিবাসের সিপাহিরা ট্রাকে করে, ট্যাংকের ওপর চড়ে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। তাদের মুখে স্লোগান ছিল—‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’। রাজপথের সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৈনিকদের সাথে যোগ দেয় এবং ফুলেল শুভেচ্ছা জানায়। সিপাহি ও জনতার এই অভূতপূর্ব সংহতির কারণেই দিনটিকে ইতিহাসে ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে অবিহিত করা হয়। 

৪. রাজনৈতিক তাৎপর্য ও পরবর্তী ফলাফল
৭ নভেম্বরের এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দেয়: 

  • জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার কেন্দ্রে আগমন: এই বিপ্লবের পর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহাল থাকলেও, জিয়াউর রহমান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (Chief Deputy Martial Law Administrator) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কার্যত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। 
  • কর্নেল তাহেরের সাথে দূরত্ব: সিপাহিদের ১২ দফা দাবি এবং জাসদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী ধারার সাথে জিয়ার শাসনতান্ত্রিক ও শৃঙ্খলা রক্ষাকারী চিন্তাভাবনার দূরত্ব তৈরি হয়। যার ফলে পরবর্তীতে কর্নেল তাহেরসহ জাসদের অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সামরিক আদালতে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। 


ইতিহাসের পাতা সবসময় একমুখী নয়। ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন একটি পক্ষ ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ বা ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে অত্যন্ত গৌরব ও শ্রদ্ধার সাথে উদ্‌যাপন করে, ঠিক তেমনই আরেকটি পক্ষ এই দিনটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে স্মরণ করে, কারণ এই দিন সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বহু বীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও জওয়ানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। গুগলের ২০২৬ সালের নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক কনটেন্ট নির্দেশিকা অনুযায়ী, তরুণ প্রজন্মের জন্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত ছাড়া এই দিবসের সকল পক্ষের বাস্তব প্রেক্ষাপট ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সঠিকভাবে অনুধাবন করা জরুরি। 

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

জেল হত্যা দিবস

নিউজ ডেস্ক

November 3, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৩ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইতিহাস
তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট, বণিক বার্তা, প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪, বাংলা ট্রিবিউন ও যুগান্তরের প্রতিবেদন এবং আদালতের রায়-সংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদন

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত, কারণ নিহত নেতারা মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন এবং তাঁরা রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা অবস্থায় নিহত হন। প্রতি বছর ৩ নভেম্বর জাতীয় এই চার নেতার স্মরণে জেল হত্যা দিবস পালন করা হয়।

পটভূমি

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হন। এর পর এই চার নেতাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড বইয়ে লিখেছেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পরই চার নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। সেই সময় দেশ ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতায়। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরেই মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে একটি পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। আজ জেলহত্যা দিবস

ঘটনা

৩ নভেম্বর মধ্যরাতে কারাগারের ভেতরে গুলি চালিয়ে চার নেতাকে হত্যা করা হয়। গুলির পর তাঁদের বেয়নেট দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়। কিছু সূত্র সময়টি মধ্যরাত, কোনোটি ভোরের দিক বলে উল্লেখ করেছে। এই লেখায় আমরা সময়ের সূত্রভেদ নিশ্চিত করিনি।

চার নেতা কারা ছিলেন

নেতাভূমিকা
সৈয়দ নজরুল ইসলামমুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি
তাজউদ্দীন আহমদমুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী
ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীমুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং পরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী
এ এইচ এম কামারুজ্জামানমুজিবনগর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী bonikbartabonikbarta

মামলা ও আদালতের রায়

সময়ঘটনা
৪ নভেম্বর ১৯৭৫তৎকালীন কারা উপমহাপরিদর্শক কাজী আবদুল আউয়াল লালবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন।
১৯৭৫–১৯৯৬মামলার তদন্ত ২১ বছর স্থগিত ছিল।
১৯৯৬মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়
১৫ অক্টোবর ১৯৯৮২৩ বছর পর অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
২০ অক্টোবর ২০০৪ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত তিনজন পলাতক সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড, ১২ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় এবং পাঁচজনকে খালাস দেয়।
পরবর্তী সময়হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত কয়েকজনকে খালাস দেয়।
৩০ এপ্রিল ২০১৩আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখে। পরে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। জেলহত্যা দিবস আজ

রায়ের পর্যায়ভেদে আসামিদের সংখ্যা ও দণ্ডের বিবরণ বিভিন্ন সূত্রে সামান্য আলাদাভাবে এসেছে। এই লেখায় সূত্রে যেগুলো স্পষ্ট ও পরস্পরের সঙ্গে মেলে, কেবল সেগুলোই রাখা হয়েছে। বিস্তারিত তথ্যের জন্য সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশিত রায় দেখুন।

দিবসটি কেন স্মরণীয়

ঘটনাটি রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা বন্দীদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক হত্যার বিচারে দীর্ঘ বিলম্বের একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়। রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা অবস্থায় কারাগারের মতো সুরক্ষিত স্থানে চার নেতাকে হত্যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে বলে বিবেচিত। ইতিহাসের এই অধ্যায় নিয়ে মূল্যায়ন ও ব্যাখ্যায় ভিন্নমত থাকতে পারে। তবে হত্যাকাণ্ডের তারিখ, স্থান ও নিহতদের পরিচয় নিয়ে তথ্যসূত্রগুলোর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

জেল হত্যা দিবস কবে পালিত হয়?
প্রতি বছর ৩ নভেম্বর।

জেল হত্যায় কাদের হত্যা করা হয়?
সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান।

ঘটনাটি কোথায় ঘটে?
পুরান ঢাকার তৎকালীন কেন্দ্রীয় কারাগারে।

এই মামলার বিচার শেষ পর্যন্ত কীভাবে হয়েছে?
২০০৪ সালে বিচারিক আদালতের রায়, পরে হাইকোর্টের রায় এবং ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়েছে। বিস্তারিত উপরের টেবিলে দেওয়া আছে।

হালনাগাদ লগ

  • ৩ নভেম্বর ২০২৬,

তথ্যসূত্র

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ট্রয় নগরী

নিউজ ডেস্ক

October 3, 2026

শেয়ার করুন

  • প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
  • বিভাগ (Category): প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস ও বৈশ্বিক ইতিহাস
  • প্রকাশের তারিখ: ৩ অক্টোবর, ২০২৬
  • তথ্যসূত্র (Sources): হোমারের ইলিউড, হিসারলিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও মাইসিনীয় ইতিহাস রেকর্ডস।

ট্রয় নগরীর ধ্বংসের ইতিহাস একই সাথে গ্রীক মহাকাব্যের রোমাঞ্চ এবং প্রাচীন বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার এক জটিল মিশ্রণ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ জেনে এসেছে কেবল এক রূপবতী নারী, হেলেনকে কেন্দ্র করে এই যুদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, ট্রয়ের পতন কেবল কোনো রূপকথা নয়, বরং এটি ছিল ব্রোঞ্জ যুগের এক নির্মম ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধ।

মহাকাব্যের রূপকথা এবং ইতিহাসের বাস্তবতার তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:


১. মহাকাব্যের রূপকথা: ‘হেলেন অব ট্রয়’ এবং ট্রোজান হর্স

মহাকবি হোমারের ‘ইলিয়াড’ এবং পরবর্তীতে ল্যাটিন কবি ভর্জিলের ‘এনিড’ মহাকাব্যে ট্রয় যুদ্ধের যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা সম্পূর্ণ আবেগ, ঈশ্বর এবং প্রতিশোধের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

  • যুদ্ধের কারণ: স্পার্টার রানী হেলেনকে ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস অপহরণ (মতান্তরে হেলেন স্বেচ্ছায় পালিয়ে যান) করে ট্রয় নগরীতে নিয়ে আসেন। এই অপমান সইতে না পেরে গ্রীক রাজারা একজোট হয়ে ট্রয় আক্রমণ করেন।
  • স্থায়িত্ব ও সমাপ্তি: গ্রীকরা টানা ১০ বছর ট্রয় নগরী অবরোধ করে রাখে। অবশেষে বিখ্যাত ‘ট্রোজান হর্স’ (Trojan Horse) বা কাঠের ঘোড়ার কৌশলে গ্রীক সৈন্যরা শহরের ভেতরে প্রবেশ করে এবং ট্রয়কে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে।

২. ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা: আসল কারণ কী ছিল?

১৯ শতকে প্রত্নতাত্ত্বিক হেইনরিখ শ্লিম্যান বর্তমান তুরস্কের হিসারলিক (Hisarlik) নামক স্থানে প্রাচীন ট্রয় নগরীর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেন। এরপর থেকে ইতিহাসবিদরা এই যুদ্ধের পেছনে গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ খুঁজে পান:

┌────────────────────────────────────────────────────────┐
│             হিসারলিক (আধুনিক তুরস্ক) / প্রাচীন ট্রয়     │
│  (কৃষ্ণসাগর এবং ভূমধ্যসাগরের সংযোগস্থলে কৌশলগত অবস্থান)   │
└───────────────────────────┬────────────────────────────┘
                            │
            ┌───────────────┴───────────────┐
            ▼                               ▼
【অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ】               【বাণিজ্যিক শুল্ক】
 কৃষ্ণসাগরের বাণিজ্য পথ           গ্রীক বণিকদের ওপর অতিরিক্ত 
 এবং সোনা-রুপার খনি দখল           ট্যাক্স আরোপের প্রতিশোধ

  • কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান: ট্রয় নগরীটি অবস্থিত ছিল দার্দানেলেস প্রণালীর (Dardanelles Strait) ঠিক মুখে। এজিয়ান সাগর থেকে কৃষ্ণসাগরে যাওয়ার একমাত্র পথ ছিল এটি। তৎকালীন সময়ে এই পথ দিয়ে শস্য, সোনা, রূপা এবং কাঠের বিশাল বাণিজ্য হতো।
  • বাণিজ্যিক শুল্ক ও একচেটিয়া আধিপত্য: ট্রয় এই প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করত এবং গ্রীক বণিকদের জাহাজ থেকে ভারী শুল্ক (ট্যাক্স) আদায় করত। মাইসেনীয় গ্রীসের (Mycenaean Greece) রাজারা এই অর্থনৈতিক বাধা দূর করতে এবং কৃষ্ণসাগরের বাণিজ্যে নিজেদের একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।
  • আঞ্চলিক পরাশক্তিদের দ্বন্দ্ব: ব্রোঞ্জ যুগে ওই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল হিট্টি সাম্রাজ্য (Hittite Empire)। ট্রয় ছিল হিট্টিদের মিত্র। অন্যদিকে গ্রীকরা (আখাইয়ান) নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছিল। ফলে ট্রয় যুদ্ধ ছিল মূলত দুই আঞ্চলিক শক্তির শক্তির মহড়া।

৩. সরাসরি তুলনা: রূপকথা বনাম ইতিহাস

বৈশিষ্ট্যমহাকাব্যের রূপকথা (হোমারের ইলিয়াড)ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক সত্যতা
মূল কারণসুন্দরী হেলেনকে উদ্ধার এবং প্রেম-অপমান।দার্দানেলেস প্রণালীর বাণিজ্য পথ নিয়ন্ত্রণ এবং কর ব্যবস্থা।
মূল চরিত্রএকিলিস, হেক্টর, অ্যাগামেমনন এবং দেব-দেবী।মাইসেনীয় গ্রীক রাজা এবং ট্রোজান ও হিট্টি জোটের শাসকেরা।
নগরী ধ্বংসের কারণকাঠের ঘোড়ার ভেতরে লুকিয়ে থাকা গ্রীক সৈন্য।ভূমিকম্প অথবা দীর্ঘ অবরোধের পর ব্রোঞ্জ যুগের অবসানকালীন আক্রমণ।

গাণিতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত

প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে দেখা গেছে, ট্রয়ের ধ্বংসাবশেষে মোট ৯টি স্তর রয়েছে (Troy I থেকে Troy IX)। এর মধ্যে ‘Troy VIIa’ স্তরটিতে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড, যুদ্ধ এবং মানুষের কঙ্কালের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যার সময়কাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১১৮০ অব্দ। এই সময়টিই হোমারের বর্ণিত ট্রয় যুদ্ধের সময়ের সাথে মিলে যায়।

ট্রয় যুদ্ধের অন্যতম নায়ক একিলিস ও হেক্টরের দ্বন্দ্বের ইতিহাস

মহাকবি হোমারের ‘ইলিয়াড’-এর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং আবেগঘন অধ্যায় হলো গ্রীক বীর একিলিস এবং ট্রয়ের রাজপুত্র হেক্টরের দ্বৈরথ। এটি কেবল দুটি ভিন্ন শিবিরের সেরা দুই যোদ্ধার লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, বীরত্ব এবং নিয়তির (Fate) এক নির্মম মহাকাব্যিক উপাখ্যান।

নিচে একিলিস ও হেক্টরের এই ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের মূল পটভূমি ও পরিণতি তুলে ধরা হলো:


৪. দুই নায়কের ভিন্ন চরিত্র ও আদর্শ

এই দুই বীরের লড়াইটি অনন্য হওয়ার কারণ ছিল তাদের সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী চরিত্র এবং যুদ্ধক্ষেত্রের উদ্দেশ্য:

  • একিলিস (গ্রীকদের সেরা বীর): একিলিস ছিলেন অমরত্ব ও ব্যক্তিগত গৌরবের পূজারী। তার মা ছিলেন সমুদ্রদেবী থেটিস, যিনি তাকে জন্মের পর ‘স্টিক্স’ নদীতে ডুবিয়ে অমর করতে চেয়েছিলেন (কেবল তার গোড়ালি বা Achilles’ Heel শুকনো ছিল)। একিলিস ট্রয়ে এসেছিলেন কোনো দেশের টানে নয়, বরং ইতিহাসে নিজের নাম চিরস্মরণীয় করে রাখতে।
  • হেক্টর (ট্রয়ের প্রধান সেনাপতি): হেক্টর ছিলেন ট্রয়ের রাজা প্রিয়ামের জ্যেষ্ঠ পুত্র। তিনি একিলিসের মতো অর্ধ-ঈশ্বর ছিলেন না, ছিলেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু তিনি ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক, আদর্শ স্বামী ও পিতা। তার যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল নিজের পরিবার ও মাতৃভূমিকে গ্রীকদের হাত থেকে রক্ষা করা।

৫. দ্বন্দ্বের মূল কারণ: প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যু

যুদ্ধের প্রথম নয় বছর এই দুই বীরের মধ্যে সরাসরি কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না। একিলিস গ্রীকদের প্রধান রাজা অ্যাগামেমননের সাথে বিবাদের কারণে যুদ্ধ বর্জন করে তার তাঁবুতে বসে ছিলেন। একিলিস যুদ্ধ না করায় গ্রীকরা হেক্টরের পরাক্রমের কাছে একের পর এক পরাজিত হতে থাকে।

  • ছদ্মবেশে যুদ্ধ: একিলিসের প্রিয় বন্ধু (মতান্তরে ভাই বা প্রেমিক) প্যাট্রোক্লাস গ্রীকদের এই বিপর্যয় সহ্য করতে না পেরে একিলিসের বর্ম ও অস্ত্র পরে যুদ্ধক্ষেত্রে নামেন, যাতে শত্রুরা তাকে একিলিস ভেবে ভয় পায়।
  • হেক্টরের আঘাত: যুদ্ধক্ষেত্রে হেক্টর প্যাট্রোক্লাসকে একিলিস ভেবে ভুল করেন এবং দ্বন্দ্বযুদ্ধে তাকে হত্যা করেন। মৃত্যুর পর হেক্টর প্যাট্রোক্লাসের শরীর থেকে একিলিসের বিখ্যাত বর্মটি খুলে নিজের করে নেন।

৬. সেই মহাকাব্যিক দ্বৈরথ: ট্রয়ের দেয়ালের সামনে

বন্ধুর মৃত্যুর খবর পেয়ে একিলিস শোক ও প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি তার যুদ্ধ বর্জনের সিদ্ধান্ত ত্যাগ করেন। দেবতা হেফেস্টাসের তৈরি নতুন বর্ম ও অস্ত্র নিয়ে তিনি হেক্টরকে হত্যার উদ্দেশ্যে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করেন।

【 একিলিসের ক্ষোভ 】 ───► রণক্ষেত্রে গ্রীকদের প্রত্যাবর্তন
                              │
                              ▼
【 ট্রয় নগরীর ফটক 】 ───► হেক্টর ও একিলিসের মুখোমুখি অবস্থান
                              │
                              ▼
【 চরম পরিণতি 】 ──────► হেক্টরের মৃত্যু ও একিলিসের প্রতিশোধ
  • ভয় এবং তাড়া: একিলিস যখন ট্রয়ের দেয়ালের সামনে এসে হেক্টরকে আহ্বান করেন, তখন একিলিসের রণমূর্তি দেখে হেক্টরের মতো বীরও মুহূর্তের জন্য থমকে যান। একিলিস তাকে তাড়া করেন এবং তারা ট্রয় নগরীর দেয়ালের চারপাশে তিনবার দৌড়ান।
  • দেবতাদের ভূমিকা: দেবী অ্যাথেনা ট্রোজান বীর ডেফোবাসের ছদ্মবেশ ধরে হেক্টরকে আশ্বস্ত করেন যে তিনি তার পাশে আছেন। এই ধোঁকায় পড়ে হেক্টর পালানো বন্ধ করে একিলিসের মুখোমুখি হন। কিন্তু লড়াই শুরু হতেই অ্যাথেনা অদৃশ্য হয়ে যান, এবং হেক্টর বুঝতে পারেন তার নিয়তি নির্ধারিত হয়ে গেছে।
  • হেক্টরের পতন: হেক্টর একিলিসের পুরানো বর্মটি পরে ছিলেন। একিলিস সেই বর্মের একমাত্র দুর্বল স্থান—ঘাড় ও কণ্ঠনালীর মধ্যবর্তী ফাঁকা অংশটি জানতেন। একিলিস তার বর্শা দিয়ে হেক্টরের গলায় আঘাত করেন এবং ট্রয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

৭. যুদ্ধের নির্মমতা এবং শেষ সম্মান

মৃত্যুর পূর্বে হেক্টর একিলিসের কাছে অনুরোধ করেছিলেন, তার মরদেহ যেন উপযুক্ত মূল্যের বিনিময়ে তার বাবা রাজা প্রিয়ামের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ক্ষোভে অন্ধ একিলিস সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন।

  • মরদেহের অবমাননা: একিলিস হেক্টরের গোড়ালি ফুটো করে চামড়ার ফিতা দিয়ে তা নিজের রথের পেছনে বাঁধেন। এরপর ট্রয়ের দেয়ালের সামনে হেক্টরের মৃতদেহকে রথ দিয়ে টেনে হিঁচড়ে অপমান করেন।
  • রাজা প্রিয়ামের অনুনয়: হেক্টরের এই অবমাননা দেখে স্বয়ং দেবতারা ক্ষুব্ধ হন। এক রাতে বৃদ্ধ রাজা প্রিয়াম গোপনে একিলিসের তাঁবুতে আসেন। তিনি একিলিসের হাত চুম্বন করে তার সন্তানের লাশ ভিক্ষা চান। প্রিয়ামের এই পিতৃত্বের বেদনা একিলিসের মনকে গলিয়ে দেয়। একিলিস শান্ত হন, হেক্টরের লাশ ফিরিয়ে দেন এবং ট্রয়বাসীকে হেক্টরের শেষকৃত্যের জন্য ১২ দিনের যুদ্ধবিরতি উপহার দেন।

ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপক

ইতিহাসবিদদের মতে, এই দ্বৈরথটি আসলে ব্রোঞ্জ যুগের যুদ্ধের নির্মমতার একটি প্রতীক। হোমার এই দুই চরিত্রের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, যুদ্ধে কেউই পুরোপুরি জয়ী হয় না। হেক্টরকে হারিয়ে একিলিস সাময়িক প্রতিশোধ নিলেও, হেক্টরের মৃত্যুর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই প্যারিসের তীরে একিলিসের গোড়ালিতে আঘাত লাগে এবং তিনিও মারা যান।

ট্রোজান হর্স’ বা কাঠের ঘোড়ার মাধ্যমে ট্রয় ধ্বংসের চূড়ান্ত রাতটি যেমন ছিল

হোমারের মহাকাব্য এবং ল্যাটিন কবি ভর্জিলের ‘এনিড’-এর বর্ণনা অনুযায়ী, ‘ট্রোজান হর্স’ বা কাঠের ঘোড়ার মাধ্যমে ট্রয় ধ্বংসের চূড়ান্ত রাতটি ছিল প্রাচীন ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয়, রক্তক্ষয়ী এবং বিশ্বাসঘাতকতায় ভরা এক রাত। টানা ১০ বছর যে ট্রয় নগরীকে গ্রীকরা সামনাসামনি যুদ্ধে জয় করতে পারেনি, তা মাত্র এক রাতের বুদ্ধিমত্তা এবং চরম ছলাকলায় সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।

সেই চূড়ান্ত রাতের ঘটনাপ্রবাহ নিচে ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো:


৮. ফাঁদ এবং ট্রয়বাসীদের বিভ্রম

গ্রীকদের সেরা বুদ্ধিজাতা ওডিসিয়াস (Odysseus) একটি বিশাল কাঠের ঘোড়া তৈরির পরিকল্পনা করেন। ঘোড়াটির পেট ছিল ফাঁপা, যেখানে গ্রীকদের সেরা ৩০ জন সশস্ত্র সৈন্য লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

  • গ্রীকদের প্রস্থান: বাকি গ্রীকরা তাদের তাঁবু পুড়িয়ে দিয়ে জাহাজ নিয়ে কাছের তেনিদোস (Tenedos) দ্বীপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে, যেন মনে হয় তারা যুদ্ধ হেরে ফিরে গেছে।
  • সিননের মিথ্যাচার: সৈকতে গ্রীকরা ‘সিনন’ (Sinon) নামের এক সৈন্যকে রেখে যায়। সিনন ট্রয়বাসীদের বিশ্বাস করায় যে, এই ঘোড়াটি দেবী অ্যাথেনার উদ্দেশ্যে একটি পবিত্র উপহার। যদি ট্রয়বাসীরা এটি শহরের ভেতরে নিয়ে যায়, তবে ট্রয় চিরকাল অপরাজেয় থাকবে।
  • সতর্কবার্তা উপেক্ষা: ট্রয়ের পুরোহিত লাওকুন (Laocoon) এবং রাজকুমারী ক্যাসান্দ্রা চিৎকার করে সতর্ক করেছিলেন: “গ্রীকদের বিশ্বাস করো না, এমনকি তারা উপহার নিয়ে এলেও নয়।” কিন্তু দেবতারা ট্রয়ের পতন চেয়েছিলেন, তাই অলৌকিক সমুদ্র-সর্প এসে লাওকুনকে হত্যা করে এবং ট্রয়বাসীরা ক্যাসান্দ্রার ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্বাস করে না।

৯. উৎসবের রাত: যখন ট্রয় ঘুমিয়ে পড়ল

ঘোড়াটিকে ট্রয় নগরীর দুর্ভেদ্য দেয়াল ভেঙে ভেতরে নিয়ে আসা হয়। ১০ বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটেছে ভেবে পুরো ট্রয় নগরী আনন্দে মেতে ওঠে।

【 মধ্যরাত 】 ────────────────► ট্রয়বাসী মদ্যপ ও সুপ্ত
                                  │
                                  ▼
【 ঘোড়ার পেট থেকে প্রস্থান 】 ────► গ্রীক সৈন্যদের নিঃশব্দে আগমন
                                  │
                                  ▼
【 নগরীর ফটক উন্মোচন 】 ────────► তেনিদোস থেকে মূল গ্রীক বাহিনীর প্রবেশ

শহরের প্রতিটি মানুষ যখন মদ্যপ এবং গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন নেমে আসে সেই কালরাত। মধ্যরাতে সিনন লুকিয়ে থাকা গ্রীকদের সংকেত দেয় এবং কাঠের ঘোড়ার গোপন দরজা খুলে যায়। ওডিসিয়াস ও তার সৈন্যরা নিঃশব্দে নিচে নেমে আসে। তারা প্রথমেই ট্রয়ের প্রধান ফটকের প্রহরীদের হত্যা করে এবং ফটক পুরোপুরি খুলে দেয়। একই সাথে তেনিদোস দ্বীপে মশাল জ্বালিয়ে সংকেত পাঠানো হয়, যা দেখে মূল গ্রীক নৌবাহিনী দ্রুত ফিরে আসে এবং খোলা ফটক দিয়ে শহরে প্রবেশ করে।


১০. রক্তক্ষয়ী ধ্বংসযজ্ঞ এবং ট্রয়ের পতন

ঘুমন্ত ট্রয়বাসীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো শহর আগুনের শিখায় দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করে। যাকে ইতিহাসবিদ ও কবিরা “দি স্যাক অব ট্রয়” (The Sack of Troy) বলে অবিহিত করেছেন।

  • প্রাসাদ আক্রমণ ও হত্যাকাণ্ড: গ্রীকরা রাজপ্রাসাদে ঢুকে বৃদ্ধ রাজা প্রিয়ামকে নির্মমভাবে হত্যা করে। হেক্টরের শিশু সন্তান অ্যাস্টিয়ানাক্সকে দেয়াল থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়, যাতে সে বড় হয়ে প্রতিশোধ নিতে না পারে।
  • হেলেনকে উদ্ধার: স্পার্টার রাজা মেনিলেয়াস তরবারি হাতে হেলেনকে হত্যা করতে উদ্যত হন। কিন্তু হেলেনের অতুলনীয় রূপ দেখে তার সমস্ত ক্ষোভ গলে যায় এবং তিনি হেলেনকে পুনরায় নিজের রানী হিসেবে গ্রহণ করেন।
  • অগ্নিকাণ্ড ও লুণ্ঠন: ট্রয়ের ধনসম্পদ লুট করা হয়, নারীদের দাসী হিসেবে বন্দী করা হয় এবং পুরো নগরী পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। সকাল হওয়ার আগেই ব্রোঞ্জ যুগের অন্যতম সমৃদ্ধ ও অহংকারী ট্রয় সাম্রাজ্য কেবল ধোঁয়া ও কঙ্কালের স্তূপে পরিণত হয়।

ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক সত্যতা

আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকরা ট্রয়ের ‘Troy VIIa’ স্তরে যে পোড়া মাটির স্তর, ভাঙা ধনুক এবং কঙ্কাল পেয়েছেন, তা এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও আক্রমণের রাতের সত্যতা নিশ্চিত করে। তবে আধুনিক সামরিক ইতিহাসবিদদের মতে, ‘কাঠের ঘোড়া’ হয়তো কোনো রূপক ছিল। এটি হতে পারে দেয়াল ভাঙার কোনো প্রাচীন যন্ত্র (Battering Ram), যা দেখতে ঘোড়ার মতো ছিল, অথবা কোনো বড় ভূমিকম্পের প্রতীক, কারণ প্রাচীন গ্রীসে ঘোড়াকে সমুদ্র ও ভূমিকম্পের দেবতা পোসাইডনের প্রতীক মানা হতো।

মূল কথা: হেলেন হয়তো এই যুদ্ধের একটি তাৎক্ষণিক উস্কানি বা প্রতীকী কারণ (Casus belli) ছিলেন, যার মাধ্যমে গ্রীক রাজাদের একত্রিত করা সহজ হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের আসল কারণ ছিল অর্থনীতি, ভূ-রাজনীতি এবং সমুদ্রপথের ক্ষমতা দখল।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২৩শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ