ইতিহাস

আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল কেন বিখ্যাত?
স্যার আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল

নিউজ ডেস্ক

November 29, 2025

শেয়ার করুন

স্যার মুহাম্মদ ইকবাল, আল্লামা ইকবাল নামে ব্যাপক পরিচিত ছিলেন।

বিভাগপূর্ব ভারতবর্ষের মুসলিম কবি, দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ, শিক্ষবিদ ও ব্যারিস্টার ছিলেন।তার ফার্সি ও উর্দু কবিতা আধুনিক যুগের ফার্সি ও উর্দু সাহিত্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাকে পাকিস্তানের আধ্যাতিক জনক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। ইকবাল তার ধর্মীয় ও ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের জন্যও বিশেষভাবে সমাদৃত ছিলেন।

জীবন ও কর্ম

আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল (জন্ম নভেম্বর ৯, ১৮৭৭; শিয়ালকোট, পাঞ্জাব – মৃত্যু: এপ্রিল ২১, ১৯৩৮) ছিলেন বিভাগপূর্ব ভারতবর্ষের মুসলিম কবি, দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ। তাঁর ফার্সি ও উর্দু কবিতা আধুনিক যুগের ফার্সি ও উর্দু সাহিত্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইকবাল তাঁর ধর্মীয় ও ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের জন্যও বিশেষভাবে সমাদৃত ছিলেন। তাঁর একটি বিখ্যাত চিন্তা দর্শন হচ্ছে ভারতের মুসলমানদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন। এই চিন্তাই বর্তমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। তাঁর নাম মুহাম্মদ ইকবাল হলেও তিনি আল্লামা ইকবাল হিসেবেই অধিক পরিচিত। আল্লামা শব্দের অর্থ হচ্ছে শিক্ষাবিদ । তাঁর ফার্সি সৃজনশীলতার জন্য ইরানেও তিনি ছিলেন সমধিক প্রসিদ্ধ; তিনি ইরানে ইকবাল-ই-লাহোরী নামে পরিচিত।

আল্লামা ইকবালের ১২৯৪ হিজরী ৩রা যিলকদ মোতাবেক ১৮৭৭ খৃস্টাব্দে ৯ই নভেম্বর বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের সিয়ালকোটে জন্মগ্রহণ করেন। আল্লামা ইকবালের পিতার নাম শেখ নূর মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন একজন সূফী-দরবেশ শ্রেণীর লোক। ইলমে তাছাউফের প্রতি তার ছিল প্রবল আকর্ষণ। নামায, রোযা, তাসবীহ-তাহলীল, মোরাকাবা-মোশাহাদার মাধ্যমে তিনি অতিবাহিত করতেন দিবসের অধিকাংশ সময়। শিখ শাসনের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে শিখ-মুসলিম দাঙ্গার সময় কাশ্মীর ছেড়ে সিয়ালকোটে বসতি স্থাপন করেন তিনি। আল্লামা ইকবালের মাতা ইমাম বিবিও ছিলেন পিতার মতই একজন ধর্মভীরু পরহেযগার মহিলা।

আল্লামা ইকবাল তাঁর ছেলের সাথে জাবেদ ইকবাল ১৯৩০ সালে।

(ইকবালের মা, যিনি ১৯১৪ সালের ৯ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। ইকবাল তাঁর মৃত্যুর পরে কাব্যিক আকারে প্যাথো অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন।)

শিক্ষা জীবন

পাঞ্জাবের বৃটিশ আর্মির কাছে শিখদের পরাজয়ের পর খ্রিষ্টান মিশনারীরা শিয়ালকোটে শিক্ষা প্রচারের উপর গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। এই সময়েই শিয়ালকোটে স্কটিশ মিশন কলেজ স্থাপিত হয়। ১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজ লিবারেল আর্টস্ এর কোর্সসমূহের অনেকগুলোতেই আরবি ও ফার্সি ভাষা মাধ্যমে শিক্ষাদান করা হতো। যদিও এই সময় বেশীর ভাগ স্কুলেই ফার্সি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। এই স্কটিশ মিশন কলেজেই ইকবাল সর্বপ্রথম আধুনিক শিক্ষা প্রাপ্ত হন।

ইকবাল তাঁর কাব্য প্রতিভার স্বীকৃতি পান তাঁর শিক্ষক সাইয়িদ মীর হাসানের কাছ থেকে। ১৮৯২ সালে ইকবাল স্কটিশ মিশন কলেজ হতে তাঁর পড়াশোন শেষ করেন। একই বৎসরে গুজরাটি চিকিৎসকের মেয়ে করিম বিবির সাথে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের বিচ্ছেদ হয় ১৯১৬ সালে । এই বিয়েতে ইকবালের তিনটি সন্তান ছিল।

১৮৮৫ সালে স্কটিশ মিশন কলেজের পড়াশোনা শেষ করে ইকবাল লাহোরের সরকারী কলেজে ভর্তি হন। দর্শন, ইংরেজি ও আরবি সাহিত্য নিয়ে তিনি পড়াশোনা করেন এখান থেকে তিনি স্বর্ণ পদক নিয়ে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। ১৮৯৯ সালে যখন তিনি মাষ্টার্স ডিগ্রী লাভ করেন ততদিনে তিনি সাহিত্য অঙ্গনে পরিচিত ব্যক্তিত্ব।

মাষ্টার্স ডিগ্রীতে পড়বার সময় ইকবাল স্যার টমাস আর্নল্ড এর সংস্পর্শে আসেন। এই শিক্ষাবিদ ইসলাম ও আধুনিক দর্শনে বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। ইকবালের কাছে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেছিলেন। স্যার টমাস আর্নল্ডই ইকবালকে ইউরোপে উচ্চ শিক্ষায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

দাম্পত্য জীবন
১৮৯৩ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে পারিবারিক প্রথা অনুযায়ি ইকবাল গুজরাটের সিভিল সার্জন খান বাহাদুর আতা মুহাম্মদের কন্যা করিম বিবি কে বিয়ে করেন। এই স্ত্রীর গর্ভে তাঁর কন্যা মেরাজ বিবি ও পুত্র আফতাব ইকবালের জন্ম হয়। এ স্ত্রীর সাথে তার মনোমালিন্য হলে তারা আলাদা বাস করতে থাকেন। প্রথম স্ত্রীর সাথে বিচ্ছিন্নতার পর এক কাশ্মিরী পরিবারের সরদার বেগম নামীয় মহিলার সাথে তাঁর দ্বিতীয় বিবাহ হয়। এই স্ত্রীকে তিনি বিবাহের চার বছর পর ঘরে তোলেন এবং তার গর্ভেই ১৯২৪ সালে জাবিদ ইকবালের জন্ম হয়। ইকবালের তৃতীয় বিবাহ ১৯১২ সালে লুধিয়ানানিবাসী মোখতার বিবি’র সাথে। সন্তান প্রসবকালে তার মৃত্যু হয়। শেষ জীবনে ইকবাল অসুস্থ হয়ে পড়েলে প্রথম স্ত্রী করিম বিবির ধারস্থ হন এবং মৃত্যু পর্যন্ত এই স্ত্রীই তাঁকে সঙ্গ দেন।

কর্মময় জীবন

১৯২৩ সালে বৃটিশ সরকার ইকবালকে নাইট খেতাব দিয়ে সম্মানিত করে। তার এই নাইট প্রাপ্তি ভক্ত অনুরাগীদের মাঝে ভূল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। বিরুদ্ধবাদী কবিরা ব্যাঙ্গাতœক কবিতা লিখে তাঁকে আক্রমণ করে। এমনকি তার বন্ধুরা চিঠি লিখে তার মতামত জানতে চায় এবং আশ্বস্ত হতে চায় ঘটনা যেন কোন ক্রমেই তাঁর স্বাধীন মতামত প্রকাশে কিংবা কওমের প্রতি খেদমতে বাঁধার সৃষ্টি না করে। আল্লামা ইকবাল বাকী জীবন কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করেগেছেন যে, তিনি কখনো দুর্দশাগ্রস্থ মুসমানদের কথা ভুলন নি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কালীন সময়ে উপ-মহাদেশের নৈরাজ্যপূর্ণ অবস্থা বিশেষ করে মুসলমানদের দু:খজনক চিত্র তাঁকে ব্যথিত করে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন, রাজনৈতিক েেত্র শক্তিশালী হওয়া ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুসলমানদেও উত্তরণ আর সম্ভব নয়। মুসলমানদের প্রতিটি সমস্যায় গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখার ল্েয আমৃত্যু রাজনীতির কঠিন ময়দানে বিচরণ করেন তিনি। তিনি ১৯২৬ সালে পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২৭ সালে বৃটিশ সরকার ভবিষ্যৎ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের পটভূমি তৈরীর প্রত্যাশায় “সাইমন কমিশন” প্রেরন করলে কংগ্রেস দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে আল্লামা ইকবাল নওয়াব জুলফিকার আলী খান ও মাওলানা মোহাম্মদ আলীর সাথে যৌথভাবে এক বিবৃতি প্রকাশ করে কমিশনকে সহযোগীতার আশ্বাস দেন। তিনি মুসলমানদের ল্য করে বলেন, যদি আমরা কমিশনকে সহায়তা না করি তবে বৃটিশরা মুসলমানদের স্বার্থকেই বিঘিœত করবে। আল্লামা ইকবালের এই ধারণা বৃটিশদের শাসন পরিচালনায় মুসলমানরা হারে হারে টের পেয়েছিল। বৃটিশরা সবসময় মুসলমানদের কাছ থেকে মতা দখল করার কারণে মুসলমানদেরকেই প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করছে। যা তাদের দীর্ঘ দিনের কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে।

মুসলমান শাসনের অবসানের পর কাশ্মীরের মুসলমানরা নানাবিধ নির্যাতন ও লাঞ্চনার শিকার হয়। অসহায় কাশ্মীরী মুসলমান ভাইদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য লাহোরে চলে আসা কাশ্মীরীরা আঞ্জুমান নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পর আল্লামা ইকবাল এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। যেহেতু তিনিও ছিলেন মুলতঃ কাশ্মীরী। তার পূর্বপুরুষ নির্যাতনের শিকার হয়েই কশ্মীর ছেড়ে চলে আসেন।
১৯৩০ সালের দিকে মুসলমানদের প্রতি যুলুম-নির্যাতন অত্যধিক পরিমাণে বেড়ে যায়। ডোগরা মহারাজার ক্রমবর্ধমান জুলুম, নির্যাতনের প্রতিবাদে লাহোরে সর্বভারতীয় কাশ্মীর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে কাশ্মীর প্রশাসনের অন্যায় নির্যাতনের সমালোচনা করে প্রস্তাব গৃহিত হয়। আল্লামা ইকবাল এই প্রস্তাবের প্রতি একাত্মতা পোষন করেন। এ সময় তিনি মুসলিম কনফারেন্সের সভাপতি ছিলেন। তিনি কাশ্মীরিদের সার্বিক সমস্যার কথা সরকারের কাছে যথাযথ ভবে তুলে ধরেন। এর প্রেেিত সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করলে কাশ্মীরিদের সমস্যা কিছুটা হলেও সমাধান হয়।

১৯৩২ সালে আলোয়ার রাজ্যের মহারাজা কর্তৃক নির্যাতিত মুসলমানগণ ‘খাদেমুল মুসলিমিন’ নামে একটি সংগঠন দাঁড় করালে মহারাজার সরকার এটিকে বেআইনী ঘোষণা করে। এ অন্যায় আদেশের প্রতিবাদে মুসলমানরা বিােভ করলে তাদের উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে শহীদ হন প্রায় এক শত মুসলমান। এরপর শুরু হয় গণ-গ্রেফতার। বাড়ী ঘরে ছেড়ে পালাতে থাকে মুসলমানগণ। এই অন্যায় আচরণের প্রতিকার চেয়ে আল্লামা ইকবাল ভাইসরয় লর্ড ওয়েলিংটনের নিকট একটি স্মারক লিপি পেশ করেন। পরিণতিতে মুসলমানগণ ফেরারী জীবন ছেড়ে বাড়ী ফেরার সুযোগ পায়।

১৯৩৬ সালে আল্লামা ইকবাল পাঞ্জাব মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারী বোর্ডের সভাপতি নিযুক্ত হন। একই সালে পাঞ্জাব মুসলিম লীগ পুনর্গঠনের লে অনুষ্ঠিত সভায় সর্ব-সম্মতিক্রমে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি ঘোষণা করা হয় তাকে। ১৯৩৮ সালে লাহোরে মসজিদের দখল নিয়ে শিখ-মুসলমান দাঙ্গার সময় আল্লামা ইকবাল মসজিদ পুনরুদ্ধারে শাহাদাত প্রত্যাশি মুসলমান যুবকদের উৎসাহ যোগান। এক কথায় ১৯২৬ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে আল্লামা ইকবাল মুসলমানদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

এরপরও কেউ কেউ আল্লামা ইকবালের রাজনৈতিক কার্যকলাপের সমালোচনা করেন। কিন্তু তৎকালীন পরিস্থিতির বিচারে একজন মুসলমানের এরচেয়ে কতটুকু বেশী করার সুযোগ ছিল তা কিন্তু প্রশ্ন সাপে। সার্বিক বিবেচনায় ভারতীয় মুসলমানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণে আল্লামা ইকবালের অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। তিনিই সর্ব প্রথম মুসলিম লীগের অধিবেশনে ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের দাবী উত্থাপন করেন। এই দাবীই পরবর্তীতে পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনের সূচনা করে।

সব চেয়ে বড় কথা হল আল্লামা ইকবাল কেবল মাত্র রাজনীতি নিয়েই ব্যস্ত থাকেন নি। জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার কাজ তিনি চালিয়ে যান সমান তালে। ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর মাসে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়েই ৬টি বক্তৃতা দেন তিনি। এর পরপরই বাঙ্গালুর হায়দারাবাদ এবং আলীগড়ে বক্তৃতা দেয়ার আমন্ত্রণ পান। তার এ সকল বক্তৃতা The Reconstruction of Religious Thought in Islam নামক পুস্তকে প্রকাশিত হয়। যা আল্লামা ইকবালের চিন্তার গভীরতার স্বাক্ষরক বহন করে।

রচনাবলী
ইকবাল গদ্য-পদ্য উভয় রচনাতেই ছিলেন সিদ্ধ হস্ত। তিনি ছিলেন মুক্তছন্দ কবি ও লেখক। তিনি লেখালেখি করেছেন বিভিন্ন বিষয়ের উপর। অর্থনীতির মত জটিল বিষয় থেকে শুরু করে আধ্যাত্মিকতার মতো বিমূর্ত বিষয় পর্যন্ত উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। গ্রন্থ রচনা ছাড়াও তিনি বিস্তর প্রবন্ধ লিখেছেন। রাজনৈতিক প্রয়োজনে তৈরী করতে হয়েছে বিবৃতি, দিতে হয়েছে সাাতকার। ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও পন্ডিতদের সাথে আজীবন চিঠিপত্র বিনিময় করেছেন তিনি। আল্লামা ইকবাল তার জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ সময় ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে রচনা করেন মাত্র ২৪টি কবিতা। তাও এর অধিকাংশই তার বন্ধু “মাখজান” সম্পাদক আব্দুল কাদিরের অনুরোধে। কবি-জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে ইকবাল উপর উর্দু কবি “দাগ”-এর প্রভাব ছিল প্রবল। পরবর্তীতে “কবি গালিব” ও “কবি হালী”-এর প্রভাবে গতানুগতিকা ছেড়ে তাঁর কবিতা সম্পূর্ণ নতুন খাতে প্রবাহিত হয়। আল্লামা ইকবাল সর্বপ্রথম ১৮৯৯ সালে লাহোরে “আঞ্জুমানে হিমায়াতে ইসলাম”-এর বার্ষিক সভায় জনসমে কবিতা পাঠ করেন। কবিতার শিরোনাম ছিল “নালায়ে ইয়াতিম” (অনাথের আর্তনাদ)। ১৯১১ সালের এপ্রিল মাসে একই সংগঠনের বার্ষিক সভায় তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী খন্ডকাব্য “শিকওয়া” পাঠ করেন। এর প্রভাবে আল্লামা ইকবালের আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয় ব্যাপকভাবে। এরই প্রেেিত তিনি রচনা করেন আরেকটি যুগান্তকারী খন্ডকাব্য “জাওয়াবে শিকওয়া”। এরপর একে রচনা করতে থাকেন অসংখ্য কবিতা। এই কবিতার মাধ্যমেই পাওয়া যায় তার চিন্তা-ধারার প্রকৃত পরিচয়। তার রচিত গ্রন্থাবলী হচ্ছে-

(১) ইলমুল ইকতিসাদ
অর্থনীতির উপর লেখা উর্দুভাষার প্রথম পুস্তক। তিনি এটি লাহোর সরকারী কলেজের সহকারী অধ্যাপক থাকাকালীন সময়ে রচনা করেন।

(২) তারিখ-ই-হিন্দ
বইটির মূল কপির সন্ধান পাওয়া যায়না এখন। এর একটি সংস্করণ অমৃতসর থেকে প্রকাশিত হয়।

(৩) আসরার-ই-খুদী
আল্লামা ইকবালের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে এই “আসরার-ই-খুদী”। এটি ১৯১৫ সালে প্রকাশিত হয়। এই বই প্রকাশের পর সাড়া পড়ে যায় সর্বত্র। কিন্তু সূফী তরীকার অনুসারীরা এই পুস্তক প্রকাশকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে গ্রহণ করেননি। কেননা ইকবাল এই গ্রন্থে সূফী কবি হাফিজ শিরাজীর তীব্র সমালোচনা করে ৩৫টি কবিতা লিখেছিলেন। উত্তেজনা এতই চরম আকার ধারণ করেছিল যে, ইকবালের চিন্তাধারার সমালোচনা কওে খান বাহাদুর পীরজাদা মোজাফফর আহমদ ‘ফজলে রাজ-ই-বেখুদী’ নামে একটি দীর্ঘ কবিতা প্রকাশ করেন। ইকবাল পরবর্তী সংস্করনে উল্লেখিত ৩৫টি কবিতা বাদ দিয়ে দেন। প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ আর,এ, নিকলসন ১৯২০ সালে এর ইংরেজী তরজমা করেন প্রকাশ করেন।

(৪) রমুযে বেখূদী
প্রকৃতপে আসরার-ই-খূদীরই ক্রম সম্প্রসারিত এই সংকলনটি ১৯১৮ সালে রমুযে বেখুদী নামে প্রকাশিত হয়। আর্থার জন আর্বারী এটি ইংরেজীতে অনুবাদ করেন।

(৫) পায়াম-ই-মাশারিক
এই বইটি প্রকাশিত হয় ১৯২৩। এ সময়ে ইকবাল কবি হিসেবে অর্জন করেছেন সর্বজন স্বীকৃতি। তাঁর কবিতা এগিয়ে চলেছে পূর্ণ-পরিনতির দিকে। তিনি এ কাব্যে পাশ্চাত্য দর্শনের পাশাপাশি প্রাচ্যের কোরআনী চিন্তার ফসলকেও তুলে এনেছেন। এই কাব্যাটি গ্যাটের চিন্তাধারার অনুসরণে রচনা করেন। এতে মোট আশিটি কবিতা সংকলিত হয়েছে।

(৬) বাঙ্গ-ই-দারা
ইকবালের কবি জীবনের শুরু উর্দু কবিতার হাত ধরে। আর এই কাব্যটি উর্দু কবিতা সংকলন। উর্দুতেই তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর শ্রেষ্ঠ দেশাতœবোধক এবং জনচিত্তে আগুন ধরানো কবিতাসমূহ। ১৯২৪ সালে তিনি বাঙ্গ-ই-দারা নামে এ সকল উর্দু কবিতার সংকলনটি প্রকাশ করেন। এ কাব্যের কবিতাগুলো দেশাত্ববোধক, প্রকৃতি প্রীতি ও ইসলামী অনুভূতি এই তিনটি অংশে বিভক্ত।

(৭) যবুর-ই-আযম
ইকবালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফার্সী কবিতা সংকলন যবুর-ই-আযম। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয়। এর দুটি অংশের প্রথম অংশে ুদ্র কবিতা ও গীত এবং দ্বিতীয় অংশের নাম গুলশান-ই-রাজ-ই-জাদীদ। এখানে ইকবাল তার বিশিষ্ট দার্শনিক ভঙ্গিতে বর্তমান পৃথিবীর সমস্যাবলীর।

চিন্তা ও দর্শন

ভারতের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন ব্যর্থ হলো। ব্রিটিশ রাজের সন্দেহের আঙুল গিয়ে পড়লো মুসলিমদের উপর। শুরু হলো নিপীড়নের নয়া ইতিহাস। বস্তুত তখন পৃথিবীতেই জাতিগতভাবে মুসলিমদের অবস্থা ভয়াবহ। বাইরে থেকে সাম্রাজ্যবাদের আঘাত আর ভেতর থেকে কুসংস্কারের দৌরাত্ম। এমন সিদ্ধান্তমূলক সময়েই ভারত ভূমিতে আগমন করলেন তিনি।

(তার লেখা পরবর্তী প্রজন্মের হৃদয়ে দিয়েছে বিপ্লবের শক্তি)

আল্লামা ইকবাল। ইউরোপে পরিচিত Poet of The East হিসেবে। তার লেখা পরবর্তী প্রজন্মের হৃদয়ে দিয়েছে বিপ্লবের শক্তি। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় দিয়েছে নতুন মাত্রা। আফগানিস্তান, ইরান, তুরস্ক থেকে শুরু করে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ইসলাম চিন্তকদের পুনরুজ্জীবনের প্রচেষ্টার পেছনে তার বাক্য অনুপ্রেরণার মতো। পাকিস্তানের আধ্যাত্মিক পিতা। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পেছনেও তার চিন্তা। খোদ সৈয়দ আলি খোমেনি ১৯৮৬ সালে ঘোষণা করেন,

“ইরান ইকবালের স্বপ্নের বাস্তবায়ন। আমরা তার দেখানো পথে হাঁটছি।”

১৯০৫ সালে পাড়ি জমান ইউরোপে। এই আবহাওয়া পরিবর্তন তাকে পুরোপুরি বদলে দিল। ম্যাকটাগার্ড এবং জেমস্ ওয়ার্ডের মতো দার্শনিকদের কাছে থেকে নেন দর্শনের পাঠ। ইতোমধ্যে লন্ডন থেকে করেন ব্যারেস্টারি।

১৯০৮ সালে প্রত্যাবর্তন করেন দেশে। লাহোর সরকারি কলেজে দর্শন এবং ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ধীরে ধীরে চাকুরি ইস্তফা দিয়ে পুরো দমে শুরু করেন আইন ব্যবসা। কারণ, তাতে মুক্তভাবে চিন্তা করার অবকাশ থাকে। কবিতায় আন্দোলন তোলে তরুণ রক্তে। কবিত্বকে ছাপিয়ে যায় দর্শন। কখনো কবিতায়, কখনো বক্তব্যে প্রকাশ করতে থাকেন মৌলিক দার্শনিক চিন্তা।

(লন্ডনে চৌধুরি রহমত আলি ও অন্যান্য মুসলিম নেতৃবৃন্দের সাথে ইকবাল)

কবিত্ব আর দার্শনিকতা সমাজ ও রাজনীতি থেকে বিমুখ করতে পারেনি। ১৯৩০ সালে মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এলাহাবাদ অধিবেশনে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমির আভাস দিলেন। বিলেতের গোলটেবিল বৈঠকে দেখা যায় তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রমাণ। পরবর্তী পদক্ষেপ আরো জাঁকজমকপূর্ণ হতে পারতো। কিন্তু জীবন তাকে আর সুযোগ দেয়নি।

চিন্তা

ছন্দবদ্ধ ভাষায় মনের ঐকান্তিক আবেগকে সামনে তুলে আনার সময় ইকবাল কবি। অবশ্য কবিতার মধ্যেই স্ফুরিত হয়েছে তার দর্শন। কবিত্ব কিংবা দর্শন তাকে জীবন বিচ্ছিন্ন সাধনায় আবদ্ধ করেনি। উপরন্তু মানুষকে তৈরি করে দিয়েছে মুক্তির রাস্তা। আত্মবিশ্বাসের বলে মানুষ জল স্থল অন্তরীক্ষে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জানান দেবে; ইকবালের মূল শ্লোগান সেটাই।

মানুষ আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি। ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশের মধ্য দিয়ে মানুষ ইনসানে কামেল বা পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হবে। দুর্বলতা কিংবা সমাজ বিমুখতার কোনো সুযোগ নেই সেখানে। মানুষ দুনিয়ায় এসেছে নতুন জীবন প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর দায়িত্ব নিয়ে। যেকোনো ত্যাগের বিনিময়ে সেই দায়িত্ব সম্পাদন করতে হবে। তার জন্য ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। তারানায়ে মিল্লাতে ইকবাল গেয়েছেন-

“আরব হামার চীন হামারা হিন্দুস্থা আমার
মুসলিম হ্যায় হাম ওয়াতান হ্যায় সারে জাহা হামারা।”
অর্থাৎ
আরব আমার ভারত আমার চীন আমার নয় গো পর
মুসলিম আমি সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে রয়েছে আমার ঘর।

ইকবালের চিন্তার মূল প্রেরণা ইসলামের প্রাণশক্তি। দার্শনিক নিৎশে এবং বার্গসৌঁ- এর প্রভাব থাকলেও জালাল উদ্দিন রুমিই তার ভাবগুরু। ছিল ইসলামি দর্শন এবং ইউরোপীয় চিন্তার মধ্যে সেঁতু বন্ধনের প্রয়াস। কোরান হাদিসে বিধৃত কর্মবাদ এবং পাশ্চাত্য দর্শনের মধ্যে গভীর ঐক্য উপলব্ধি করেছেন তিনি। সেই সাথে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন পশ্চিমা চিন্তায় আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের অভাবকে। ফলে কর্মবিমুখ আধ্যাত্মবোধ এবং আধ্যাত্মবোধ বিমুখ দর্শনচিন্তা উভয় দলই ইকবালের কলমে সমালোচিত।

(১৯২৯ সালে মাদ্রাজের গোখলে হলে বক্তৃতা শেষে নেতৃবৃন্দের কেন্দ্রে ইকবাল)

খুদি

ইকবালের দর্শনের বড় একটা অংশ জুড়ে আছে খুদি। খুদি বাস্তব সত্তা- যা নিজের জোরেই অস্তিত্বশীল। অতীন্দ্রিয় অনুভূতির মাধ্যমে আমরা এই সত্তার সাক্ষাৎ পেয়ে থাকি। প্যানথেইস্টিক দার্শনিকদের মধ্যে খুদির অস্তিত্ব অস্বীকারের প্রবণতা আছে। তাদের চোখে দৃশ্যমান জগৎ অবাস্তব এবং অলীক। জগৎ সত্তায় অস্বীকৃতি মানুষের নৈতিক, সামাজিক দায়িত্ব এবং আকাঙ্ক্ষার বিলুপ্তি ঘোষণা করে। ফলে জন্ম নেয় সীমাহীন কর্মহীনতা এবং জীবনবিরোধিতা।

ইকবালের ভাষ্যে, অতীন্দ্রিয় অনুভূতির মাধ্যমে আমরা খুদিকে সরাসরি জানতে পারি। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিরাট কাজ ও গভীর অনুভূতির সময় ওয়াকেবহাল হই খুদির অস্তিত্ব সম্পর্কে। ফলে সকল ক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেই খুদির প্রকাশ। খুদি ব্যক্তিত্বের আধার। ইচ্ছা, অনিচ্ছা, বিচার-বিবেচনা, সিদ্ধান্তের মধ্যে ক্রিয়াশীল।

খুদি বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও ক্রিয়াকে অনুভব করে নিজের মূল্যায়ন করে। ফলে খুদির অস্তিত্ব ইচ্ছাময়। প্রচেষ্টা ও ইচ্ছার দিকে মানুষ যতো অগ্রসর হয়; জীবনের পথে সে ততো উন্নত। ইচ্ছাময় জীবন সম্প্রসারণশীল। ইচ্ছার সম্প্রসারণের মধ্য দিয়েই খুদি শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের রূপ লাভ করে। গতিতে জীবন; স্থিতিতে মরণ।

ইতর প্রাণী সহজাত প্রবৃত্তির বশেই পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে থাকে। কিন্তু মানুষ উদ্দেশ্যের প্রেক্ষিতে পরিবেশকে করে নিয়ন্ত্রণ। পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণাধীন করার জন্য ও পরিবেশের উপর প্রভুত্ব স্থাপনের জন্য মানুষ তার ইচ্ছাকে সম্প্রসারিত এবং খুদিকে বিকশিত করে। তার মানে, খুদি কোরানের তাকদীর ধারণাকে অস্বীকার করে না। বরং মানুষকে আত্মপ্রত্যয়ী করে তোলে। তার চিন্তায় সৌন্দর্য প্রমাণের জন্য এই একটা গজলই যথেষ্ট।

জগৎ

দীর্ঘদিন ধরে দার্শনিকদের মধ্যে বহির্জগতের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয়। ইকবালের কাছে বহির্জগত বাস্তব। আমরা প্রত্যক্ষণের মাধ্যমে এমন এক সত্তার অস্তিত্ব অনুভব করি, যা অস্বীকার করা যায় না। আবার, প্রত্যেক প্রকার জ্ঞানের ক্ষেত্রেই ব্যক্তি এক বাস্তব সত্তার অস্তিত্ব অনুভব করে। জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়-এর দ্বৈত সত্তা প্রত্যেক জ্ঞানের জন্য অপরিহার্য। কাজের প্রচেষ্টা সচেতনতার শ্রেষ্ঠতম অবস্থা। কাজের প্রচেষ্টায় অবিরাম বিরোধী শক্তির বাঁধা আসে। এই বিরোধী শক্তি খুদি ছাড়া অন্য বস্তু। বাস্তব জীবন তাই খুদি ও পারিপার্শ্বিক জগতের নিরন্তর সংঘাত।

বিজ্ঞানীদের ভাষ্যে, জগৎ নিষ্ক্রিয় কণা পরমাণুর নামে সমবায়ে গঠিত। পদার্থ যেন পরমাণুর সমষ্টি ছাড়া কিছু না। দার্শনিক বার্কলে দেখিয়েছেন, বস্তু আসলে গুণ ছাড়া কিছু না; আর গুণ মনের প্রত্যক্ষণ মাত্র। অন্যদিকে এরিস্টটলিয় মতবাদে জগতকে নিশ্চল ও স্থির বিবেচনা করা হয়। ইকবাল এ ধরনের স্থির ও জড় জগতের ধারণায় বিশ্বাসী না। তার মতে, জগতের তাৎপর্য আছে, গতি আছে এবং উদ্দেশ্য আছে। জগতের নিয়ত পরিবর্তন এবং নবসৃষ্টির চাঞ্চল্য পূর্ববর্তী মতবাদগুলোতে উপেক্ষিত হয়েছে।

ইকবালের মতে, জগতে সকল পরিবর্তনের মূলগত সত্তা প্রাণ-প্রবাহ; যা প্রত্যেক বস্তুর মধ্যেই প্রবাহিত। মানুষের মধ্যে প্রাণ প্রবাহের প্রকাশ হলো ইচ্ছা। সমস্ত সৃষ্টি প্রক্রিয়ার মধ্যেই বেঁচে থাকার ইচ্ছা দেখা যায়। মানুষ শুধু বেঁচে থাকতে চায় না; জীবনকে উন্নত করার জন্য সংগ্রাম করে। ধর্ম, কলা, বিজ্ঞান এবং নীতি জীবনকে শক্তিশালী করার উপায় স্বরূপ। তাই ইকবালের মতে,

যা ব্যক্তিত্বকে শক্তিশালী করে, তা ভালো এবং যা ব্যক্তিত্বকে দুর্বল করে, তা-ই মন্দ।

খোদা

পরম সত্তা বস্তুত খুদি বা ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন সত্তা। তিনি অতুলনীয়; স্থান এবং কালের দ্বারা সীমাবদ্ধ না। পরম খুদি সৃজনশীল; সৃষ্টি তার স্বরূপের বিকাশ মাত্র। কোনো খুদিকেই চরিত্র ব্যতীত চিন্তা করা যায় না; তাই পরম খুদির চরিত্র আছে।

খোদা সর্বজ্ঞানী। সাধারণ জ্ঞানের ক্ষেত্রে যেমন কর্তা এবং কর্মের পার্থক্য চেতনা থাকে। খোদার ক্ষেত্রে এই দুইটি অভিন্ন। তিনি এক এবং বর্তমান মুহূর্তেই সমগ্র সৃষ্টিকে জানেন। আসলে খুদির নিকট অতীত কিংবা ভবিষ্যতও এক অনন্ত বর্তমান। অর্থাৎ বর্তমানের মধ্যেই অতীত ও ভবিষ্যত নিহিত। পরম খুদি সর্বশক্তিমান। তার মানেই এই না যে, তিনি সীমাহীন অন্ধতা, স্বেচ্ছাচার আর খেয়ালের বশবর্তী। এক বিশেষ অর্থে তিনি সীমিত নিজের স্বভাবের মধ্যে। খোদার এই শক্তি নিয়ম, ঐক্য ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। ইকবালের বহু লেখাতেই পরম সত্তার সাথে মানব সত্তার যোগাযোগ প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। রাহাত ফতেহ আলির কণ্ঠে ডুব দেয়া যেতে পারে ইকবালের ভাব অনুসন্ধানে।

ইকবালের ভাষ্যে, পরম খুদির সাথে সসীম খুদির সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব। তবে, পরম খুদির মধ্যে লুপ্ত হওয়া সসীম খুদির লক্ষ্য না। পরম খুদির মধ্যে সসীম খুদির বিলুপ্তির আরেক অর্থ খুদির বিনাশ। খুদির বিলুপ্তি ইসলামের মূল শিক্ষার বিরোধী। খুদির বিনাশ সাধিত হওয়ার মানে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং ক্রিয়াবলির কোন অর্থ না থাকা। জীবন অর্থহীন না।

বিকাশ

পারিপার্শ্বিকতার সাথে সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ব্যক্তিত্বের বিকাশ সম্ভব। নিষ্ক্রিয় ও কর্মবিমুখ যোগী জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি জীবনকে অস্বীকৃতির নামান্তর। ইকবাল তাই বৈরাগ্যের ঘোরবিরোধী। সম্পূর্ণ নিশ্চল জগৎ মানুষের দাসত্বের ইঙ্গিত বহন করে। জগৎ গতিশীল ও বর্ধিষ্ণু, মানুষ তার নিরন্তর সাধনা ও সক্রিয়তার সাহায্যে জগৎকে আপন আদর্শে গড়ে তুলবে। ফলে মুসলিম জাতির ক্ষয়িষ্ণু অবস্থার জন্য ইকবালের চোখে কর্মবিমুখতা আর নিষ্ক্রিয়তা দায়ী।

মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ কতিপয় বাহ্য ও অভ্যন্তরীণ শর্তের উপর নির্ভর করে। অতীত ইতিহাস ও কৃষ্টি খুদির বিকাশের পথে সহায়ক। কিন্তু অন্ধ অনুকরণ খুদিকে দুর্বল করে তুলে। খুদির বিকাশ অতীত আর বর্তমানের সমন্বয় করে। অতীত ঐতিহ্যে দাঁড়িয়ে বর্তমানের সীমাহীন সম্ভাব্যতার পতাকা উড়ায়। ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য প্রয়োজন নতুন উদ্দেশ্য সৃষ্টি ও তার বাস্তব রূপায়ণ। ইকবাল বলেন, ‘হৃদয়ে ইচ্ছা জাগ্রত রাখো, যাতে তোমার ধূলিকণা সৌধে পরিণত হয়।’ মুসলিম জাতির অধঃপতনে স্রষ্টার প্রতি অভিযোগ আকারে ‘শিকওয়া’ এবং সেই অভিযোগের জবাব ‘জওয়াবে শিকওয়া’-তে আছে ইকবালের বিশ্লেষণ। জনপ্রিয় দুইটাকে একসাথে শোনা যেতে পারে নাতাশা বেগ, ফরিদ আয়াজ এবং আবু মুহম্মদ ক্বাওয়ালের কণ্ঠে।

মুসলমানদের অধঃপতনের অন্যতম কারণ পরজগতকেই কেবল আগ্রহের বিষয় করে তোলা। এই ‍অতি অপার্থিবতা তাদের ইহজগতের শিকড় দুর্বল করে দিয়েছে। পৃথিবীতে স্বকীয়তায় প্রতিষ্ঠিত হতে হলে মুসলিম জাতিকে কর্মের পথে সক্রিয় ও উদ্দীপিত হতে হবে। ইহকাল এবং পরকাল- উভয়বিধ মঙ্গল লাভ ইসলামি জীবনাদর্শ। এই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হলেই পতন। ফলে ইকবাল এমন সমাজ প্রবর্তনের পক্ষপাতী যেখানে মানুষ পাবে আত্মবিকাশের পূর্ণ অধিকার। সমস্ত নিষ্পেষণের বাইরে গিয়ে থাকবে খুদির পূর্ণ বিকাশের সুযোগ। ইকবালের ভাষ্যে, সেই সমাজেই দার্শনিক নিৎশের স্বপ্ন দেখা সুপারম্যানের আবির্ভাব ঘটবে।

বাণী সমূহ

(১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল তিনি মৃত্যু বরন করেন।লাহোরের বাদশাহী মসজিদের প্রবেশপথে ইকবালের কবর।)

সবিশেষ

ইকবাল আধুনিক চিন্তাবিদদের মধ্যে যুগান্তকারী হিসাবে পরিগণিত। মুসলিম জাতির অধঃপতন তাকে পীড়া দিয়েছিল। এক সময়ের বিশ্ববিজয়ী মুসলিম জাতির অধোগতির কারণ খুঁজতে থাকেন নিয়ত। কবিতা ও দর্শনের মাধ্যমে সেই অধোগতির কারণ বিশ্লেষণ ও সমাধানের নির্দশনা দান করেন। জাতিকে আত্মকলহ, ক্ষুদ্র স্বার্থ ও বিভেদ ভুলে সাম্য, মৈত্রী ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের পতাকাতলে সমবেত হবার আহবান জানান।

ইকবাল নতুন সমাজ চেয়েছেন; যেখানে ইশকের মধ্য দিয়ে ইনসানিয়াত পূর্ণতা পাবে। সেই দিক থেকে ইকবাল বিপ্লবী। ইসলামের শিক্ষাকে দেখেছেন বৈপ্লবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। দেখিয়েছেন পশ্চিমা অভিজ্ঞতাবাদের সাথে ইসলামের বিরোধ নেই। বরং ইসলাম দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক আলোচনার অনুপ্রেরণা জাগিয়ে তুলে। কোরান ইহজগৎ আর পরজগতের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে মানবজীবনের সর্বোচ্চ মূল্যবোধসমূহের বাস্তব রূপায়ণের নির্দেশনা দেয়। ইকবালের সেই চিন্তাধারা শুধু মুসলিম জাতিকেই উদ্বুদ্ধ করেনি; বিশ্বের প্রগতিশীল মানবমনকেও আন্দোলিত করেছে। আধুনিক মুসলিম বিশ্বে জ্ঞানতাত্ত্বিক চর্চার যে উৎসাহ পরিলক্ষিত হচ্ছে; তার যুগস্রষ্টা আল্লামা ইকবাল। তাই আল্লামা ইকবাল বিখ্যাত তার চিন্তা, কাব্য ও দর্শনে।

তথ্যঃ ইন্টারনেট।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

কর্ম

নিউজ ডেস্ক

August 28, 2026

শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন প্রকাশের সময় ও তারিখ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, রাত ১১:৫৫ স্থান: ঢাকা / অনলাইন ডেস্ক

মানবজাতির সুপ্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতি ও দর্শনে ‘কর্ম’ এবং ‘ধর্ম’—এই দুই উপাদান একে অপরের পরিপূরক ও গভীরভাবে সংযুক্ত। বৈশ্বিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে জীবনকে অর্থপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ করতে এ দুটিরই সমান আবশ্যকতা রয়েছে। ধর্মহীন কর্ম মানুষকে যেমন যান্ত্রিক ও অনৈতিক করে তুলতে পারে, তেমনি কর্মহীন ধর্ম মানুষকে অলস ও পরনির্ভরশীল করে তোলে। ফলে ধর্মীয়, নৈতিক কিংবা সামাজিক—যেকোনো দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই কর্ম ছাড়া ধর্মের অস্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

১. কর্ম ও ধর্মের পারস্পরিক পরিপূরকতা

সমাজবিজ্ঞান ও নীতিবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে, মানুষের প্রতিটি কাজই তার সামাজিক দায়িত্ব ও নৈতিক মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হয়।

  • সামাজিক দায়িত্বের আলোকে: চিকিৎসক, কৃষক বা শিক্ষকের মতো প্রতিটি পেশাজীবীর নিজ নিজ দায়িত্ব পালনই সমাজকে সচল রাখে। সমাজকে সচল রাখার এই কর্মই হলো সবচেয়ে বড় সামাজিক দায়িত্ব। আর ধর্মের সামাজিক শিক্ষা হলো মানবসেবা ও জীবের কল্যাণসাধন।
  • নৈতিক দায়িত্বের আলোতে: ধর্ম মানুষকে সততা ও জবাবদিহিতার শিক্ষা দেয়, যা অনৈতিক বা অপরাধমূলক কর্ম থেকে মানুষকে দূরে রাখে। অপরদিকে, নৈতিকতাহীন কর্ম (যেমন: ব্যবসায়িক স্বার্থে খাদ্যে ভেজাল দেওয়া) সমাজের চরম ক্ষতির কারণ হয়।
  • কর্মই ধর্মের বাস্তব রূপ: প্রার্থনা বা ইবাদত নিজেও একটি শারীরিক ও মানসিক কর্ম। ধর্মীয় কিতাব বা আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিতে কর্মের প্রয়োজন। এছাড়া আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন ও সৎ উপার্জনে কর্মের বিকল্প নেই।

২. হিন্দু নাকি ইসলাম: পৃথিবীতে কোন ধর্ম আগে এসেছে?

ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রশ্নের উত্তর দুটি ভিন্ন ধারায় বিভক্ত:

ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ (Historical Perspective) ইতিহাসবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক ও প্রাচীন লিখিত নথিপত্রের হিসাবে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রধান ধর্মগুলোর মধ্যে হিন্দু ধর্ম বা সনাতন ধর্ম সবচেয়ে প্রাচীন।

  • হিন্দু ধর্ম: আজ থেকে প্রায় ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ বছর আগে (খ্রিস্টপূর্ব ২৩০০-১৫০০ অব্দ) সিন্ধু সভ্যতার যুগে ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু ধর্মের বিকাশ ঘটে। এর পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘ঋগ্বেদ’ বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন টেক্সট।
  • ইসলাম ধর্ম: ঐতিহাসিক টাইমলাইন অনুযায়ী, ৭ম শতকে (৬১০ খ্রিস্টাব্দে) আরবের মক্কা নগরীতে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম ধর্মের প্রচার শুরু হয়।

ধর্মীয় আকীদা ও বিশ্বাসের দৃষ্টিকোণ (Theological Perspective)

  • ইসলামী বিশ্বাস: ইসলাম বিশ্বাস করে যে এটি কেবল ৭ম শতকে শুরু হওয়া নতুন কোনো ধর্ম নয়, বরং এটিই পৃথিবীর প্রথম ও আদি ধর্ম। ইসলামী আকিদা মতে, পৃথিবীর প্রথম মানুষ ও নবী হজরত আদম (আ.) ছিলেন এক আল্লাহর অনুসারী (মুসলিম)। যুগে যুগে আসা সব নবী-রাসুল মূলত একই বার্তা প্রচার করেছেন, যা ৭ম শতকে চূড়ান্ত পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছে।
  • সনাতন (হিন্দু) বিশ্বাস: হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী একে “সনাতন ধর্ম” বলা হয়, যার অর্থ ‘চিরন্তন’ বা ‘অনাদি’। এই ধর্ম বিশ্বাস করে যে মহাবিশ্ব বা সৃষ্টির মতোই তাদের ধর্মও চিরন্তন এবং এটি ঈশ্বরপ্রদত্ত।

৩. পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম কোনটি?

কোনো একক বৈজ্ঞানিক বা রাজনৈতিক মাপকাঠিতে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে সর্বজনীনভাবে ‘শ্রেষ্ঠ’ হিসেবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়; এটি সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তির নিজস্ব বিশ্বাস ও দর্শনের ওপর নির্ভর করে।

  • ইসলাম: একেশ্বরবাদ, কঠোর শৃংখলা, সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব এবং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধানের ওপর জোর দেয়।
  • হিন্দু ধর্ম: আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা, বহুত্ববাদ, উদারতা এবং প্রতিটি জীবের মধ্যে ঈশ্বরীয় সত্তা অনুভূতির ওপর গুরুত্ব দেয়।
  • বৌদ্ধ ধর্ম: অহিংসা, মৈত্রী, আত্মশুদ্ধি এবং মোক্ষ/নির্বাণ লাভের পথ দেখায়।
  • খ্রিস্ট ধর্ম: মানবজাতির প্রতি নিঃস্বার্থ প্রেম, ক্ষমা ও সহানুভূতির শিক্ষা দেয়।

সারসংক্ষেপ মনীষী ও চিন্তাবিদদের মতে, ধর্মের বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে তার ভেতরের মানবতাবাদী শিক্ষাটিই প্রধান। যে দর্শন বা আদর্শ মানুষকে হিংসা ও অহংকারমুক্ত করে সৎ কর্ম, নৈতিকতা ও মানবকল্যাণে উদ্বুদ্ধ করে—মানুষের কাছে সেই শিক্ষার প্রতিফলনই শ্রেষ্ঠত্ব হিসেবে পরিগণিত হয়।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

নোয়াখালী দাঙ্গা

নিউজ ডেস্ক

August 27, 2026

শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

প্রকাশের সময় ও তারিখ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, রাত ১১:৪৭

স্থান: ঢাকা / ইতিহাস ডেস্ক

১৯৪৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে অবিভক্ত বাংলার নোয়াখালী ও ত্রিপুরা (বর্তমান কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া) জেলায় সংঘটিত গণহত্যা ও ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ভারতের রাজনৈতিক গতিপথকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের মাত্র এক বছর আগে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিন (১০ অক্টোবর) শুরু হওয়া এই নজিরবিহীন নৃশংসতা অখণ্ড ভারতের রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে বঙ্গভঙ্গ ও ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনকে ত্বরান্বিত করে।

১. রাজনৈতিক প্রভাব ও বঙ্গভঙ্গের অনুঘটক

১৯৪৬ সালের নোয়াখালী হিন্দু গণহত্যা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে, বিশেষ করে বাঙালি হিন্দুদের মনস্তত্ত্বে এবং বঙ্গভঙ্গের (১৯৪৭) চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক অনুঘটক (Catalyst) হিসেবে কাজ করেছিল।

নিচে এর গভীর রাজনৈতিক প্রভাব এবং কীভাবে এটি বঙ্গভঙ্গকে ত্বরান্বিত করেছিল, তা বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো:

১. অখণ্ড বাংলার ধারণার অবসান

১৯৪৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত শরৎচন্দ্র বসু (কংগ্রেস) এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের (মুসলিম লীগ) মতো নেতারা “স্বাধীন অখণ্ড বাংলা” (United Sovereign Bengal) গঠনের স্বপ্ন দেখছিলেন। তাঁরা চেয়েছিলেন বাংলা যেন ভারত বা পাকিস্তান কোনো দেশেই যোগ না দিয়ে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

কিন্তু নোয়াখালী দাঙ্গার পর এই পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ভেস্তে যায়। নোয়াখালীর নৃশংসতা বাঙালি হিন্দু বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষের মনে এই গভীর প্রত্যয় তৈরি করে যে, মুসলিম লীগ সরকারের অধীনে বা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো স্বাধীন বাংলায় হিন্দুদের জানমালের কোনো নিরাপত্তা থাকবে না। ফলে অখণ্ড বাংলার দাবি চিরতরে চাপা পড়ে যায়।

২. হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের সুরবদল

নোয়াখালী দাঙ্গার আগে কংগ্রেস নীতিগতভাবে ভারতের যেকোনো প্রদেশ ভাগের বিরোধী ছিল। কিন্তু নোয়াখালীর ঘটনার পর ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা তীব্র আন্দোলন শুরু করে। তাদের স্পষ্ট দাবি ছিল—যদি ভারতকে ভাগ করে পাকিস্তান গড়তেই হয়, তবে বাংলাকেও ভাগ করে হিন্দুদের জন্য একটি পৃথক প্রদেশ (পশ্চিমবঙ্গ) তৈরি করতে হবে।

এই আন্দোলনের তীব্রতা দেখে জওহরলাল নেহেরু এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মতো শীর্ষ কংগ্রেস নেতারাও বুঝতে পারেন যে, হিন্দুদের সুরক্ষার জন্য বাংলা ভাগ অনিবার্য। ফলে কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে দেশভাগ এবং বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব মেনে নেয়।

৩. লীগ সরকারের নিষ্ক্রিয়তা ও আস্থার সংকট

তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মুসলিম লীগ সরকার নোয়াখালীর দাঙ্গা দমনে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিল। দাঙ্গা শুরু হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর পর্যন্ত সেখানে পুলিশ বা সামরিক বাহিনী পাঠানো হয়নি, এমনকি গণমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করে খবর চেপে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল।

লীগ সরকারের এই পক্ষপাতদুষ্ট ও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা ব্রিটিশ রাজপুরুষদের (যেমন বাংলার গভর্নর ফ্রেডরিক বারোজ) এবং কংগ্রেস নেতৃত্বের কাছে এটি প্রমাণ করে যে, অবিভক্ত বাংলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। এটি লর্ড মাউন্টব্যাটেনের দেশভাগের পরিকল্পনাকে দ্রুত বাস্তবায়নে সহায়তা করে।

৪. সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক বিভাজনের রূপরেখা (Radcliffe Line)

নোয়াখালীর ঘটনার পর বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে তীব্র দেশভাগের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়, যা ১৯৪৭ সালের জুন-জুলাই মাসে ‘Boundary Commission’ বা সীমানা নির্ধারণী কমিশনের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে। হিন্দু প্রধান জেলাগুলোকে ভারতের (পশ্চিমবঙ্গ) অন্তর্ভুক্ত করার এবং মুসলিম প্রধান জেলাগুলোকে পাকিস্তানের (পূর্ব পাকিস্তান) অন্তর্ভুক্ত করার যে মানচিত্র স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ তৈরি করেছিলেন, তার পেছনে নোয়াখালী ও কলকাতার দাঙ্গার ভয়াবহ স্মৃতি সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি ছিল।


২. মহাত্মা গান্ধীর ঐতিহাসিক শান্তি মিশন

১৯৪৬ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ১৯৪৭ সালের ২ মার্চ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় চার মাস ব্যাপী মহাত্মা গান্ধীর নোয়াখালী সফর ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, মানবিক এবং ঐতিহাসিক শান্তি মিশন। ব্রিটিশ ভারতের চূড়ান্ত মুহূর্তে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প রুখতে তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার রাজনীতি ছেড়ে সাধারণ মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

এই ঐতিহাসিক শান্তি মিশনের মূল দিকগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. মিশনের পটভূমি ও গান্ধীজির আগমন

১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর (কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিন) নোয়াখালীতে ভয়াবহ হিন্দু গণহত্যা ও সহিংসতা শুরু হয়। চারদিকে যখন ব্যাপক লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের খবর ছড়াচ্ছিল, তখন দিল্লির রাজনৈতিক আলোচনা ফেলে গান্ধীজি বাংলায় আসার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪৬ সালের ৭ নভেম্বর তিনি নোয়াখালীর চৌমুহনীতে পৌঁছান। তাঁর আগমনের মূল উদ্দেশ্য ছিল দুটি:

  • হিন্দুদের মন থেকে মৃত্যুর ভয় দূর করে নিজ ভিটেমাটিতে ধরে রাখা।
  • মুসলিমদের মধ্যে অনুশোচনা ও অপরাধবোধ জাগ্রত করে সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনা।

২. “একাকী পথ চলো” এবং গ্রামীন পদযাত্রা

গান্ধীজি নোয়াখালীতে কোনো রাজনৈতিক প্রোটোকল বা সশস্ত্র নিরাপত্তা নেননি। তাঁর এই সফরটি ছিল সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক।

  • খালি পায়ে পদযাত্রা: ১৯৪৭ সালের ২ জানুয়ারি থেকে তিনি নোয়াখালীর গ্রামগুলোতে খালি পায়ে হাঁটা শুরু করেন। তীব্র শীতের মধ্যে প্রায় ১১৬ মাইল পথ হেঁটে তিনি ৪৭টি প্রত্যন্ত গ্রাম পরিদর্শন করেন (যার মধ্যে শ্রীরামপুর, চণ্ডীপুর, জয়াগ ও রামগঞ্জ উল্লেখযোগ্য)।
  • সহযোগীদের বিকেন্দ্রীকরণ: গান্ধীজি তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত অনুসারীদের (যেমন সুশীলা নায়ার, আভা গান্ধী, কানাইলাল ভট্টাচার্য) একসাথে না রেখে নির্দেশ দেন ভিন্ন ভিন্ন দাঙ্গাকবলিত গ্রামে একা একা গিয়ে থাকতে। তাঁদের কাজ ছিল স্থানীয় মুসলিমদের সাথে যোগাযোগ করা এবং হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। গান্ধীজি নিজে শ্রীরামপুর গ্রামে একটি ভাঙা বাড়িতে একা প্রায় দেড় মাস অবস্থান করেন।

৩. দৈনন্দিন রুটিন ও প্রার্থনা সভা

গান্ধীজির নোয়াখালীর দিনলিপি ছিল অত্যন্ত কঠোর ও নিয়মতান্ত্রিক:

  • ভোরবেলা পদযাত্রা ও জনসংযোগ: প্রতিদিন ভোরে তিনি এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতেন। পথিমধ্যে দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি দেখতেন, ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলতেন এবং অশ্রু মুছিয়ে দিতেন।
  • সর্বধর্ম প্রার্থনা সভা: প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি উন্মুক্ত স্থানে প্রার্থনা সভার আয়োজন করতেন। সেখানে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ সমবেত হতো। সভায় গীতা, কোরআন এবং বাইবেলের বাণী পাঠ করা হতো। তিনি তাঁর বক্তৃতায় বলতেন, “ঈশ্বর আর আল্লাহ একই শক্তি, একে অপরের ওপর অত্যাচার করা ঈশ্বরের অবমাননা।”

৪. স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও প্রতিকূলতা

গান্ধীজির এই মিশন মোটেও মসৃণ ছিল না, তাঁকে চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল:

  • উগ্রপন্থীদের প্রতিবন্ধকতা: গোলাম সারোয়ার হুসাইনীর অনুসারী এবং মুসলিম লীগের কট্টরপন্থীরা গান্ধীজির এই শান্তি মিশনকে “হিন্দুদের রাজনৈতিক চাল” হিসেবে প্রচার করে। অনেক গ্রামে তাঁর হাঁটার রাস্তায় মানুষের মলমূত্র, কাচ এবং কাঁটা বিছিয়ে রাখা হতো। তিনি নিজ হাতে সেই নোংরা পরিষ্কার করে এগিয়ে যেতেন।
  • সাধারণ মানুষের মন জয়: তাঁর এই অসীম ধৈর্য ও অহিংস মনোভাব ধীরে ধীরে স্থানীয় সাধারণ মুসলিমদের মন জয় করে। অনেক মুসলিম পরিবার তাঁর সভায় যোগ দিতে শুরু করে এবং নিজ প্রতিবেশীদের সুরক্ষার দায়িত্ব নেয়।

৫. জয়াগ আশ্রম প্রতিষ্ঠা (স্থায়ী স্মৃতি)

নোয়াখালীর জয়াগ গ্রামের জমিদার ও প্রথম বাঙালি ব্যারিস্টার হেমন্ত কুমার ঘোষ গান্ধীজির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি ও জমি গান্ধীজিকে দান করেন। ১৯৪৭ সালের ২৯ জানুয়ারি গান্ধীজি নিজ হাতে সেখানে ‘আম্বিকা কালিগঙ্গা চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’ গঠন করেন, যা পরবর্তীতে “নোয়াখালী গান্ধী আশ্রম” হিসেবে পরিচিতি পায়। এই আশ্রমটি আজও বাংলাদেশে মহাত্মা গান্ধীর শান্তি, অহিংসা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।

৬. মিশনের সমাপ্তি ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

১৯৪৭ সালের ২ মার্চ বিহারে পুনরায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার খবর পেয়ে গান্ধীজি নোয়াখালী ত্যাগ করেন। যদিও এই মিশন দাঙ্গার ক্ষত পুরোপুরি নিরাময় করতে পারেনি বা দেশভাগ ঠেকাতে পারেনি, তবুও ঐতিহাসিকদের মতে, গান্ধীজির এই একক প্রচেষ্টার ফলেই নোয়াখালীতে বড় ধরনের দ্বিতীয় দাঙ্গা রদ করা সম্ভব হয়েছিল। মাউন্টব্যাটেন গান্ধীজির এই ভূমিকাকে মূল্যায়ন করে লিখেছিলেন—“The One-Man Boundary Force who kept the peace where 50,000 soldiers failed.” (যেখানে ৫০,০০০ সৈন্য ব্যর্থ হয়েছিল, সেখানে একাকী এক ব্যক্তি শান্তি বজায় রেখেছিলেন)।

৩. তৎকালীন গণমাধ্যমের সাহসিক ভূমিকা

১৯৪৬ সালের নোয়াখালী গণহত্যার সময় তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের জাতীয়তাবাদী ও স্বাধীনচেতা গণমাধ্যমগুলো (মূলত কলকাতাভিত্তিক সংবাদপত্র) যে সাহসী ও আপসহীন ভূমিকা পালন করেছিল, তা ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগ সরকার যখন এই সহিংসতার খবর ধামাচাপা দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, তখন এই সংবাদপত্রগুলো নিজেদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে সত্য উন্মোচন করেছিল।

তৎকালীন গণমাধ্যমের সেই ঐতিহাসিক ও সাহসী ভূমিকার বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. সরকারি বিধিনিষেধ ও সেন্সরশিপ অমান্য করা

দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সরকার নোয়াখালী ও ত্রিপুরার বাস্তব পরিস্থিতি বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ আড়াল করতে কঠোর প্রেস সেন্সরশিপ বা “জরুরি সংবাদ নিয়ন্ত্রণ আইন” জারি করে। সংবাদপত্রে দাঙ্গার ছবি, সুনির্দিষ্ট এলাকার নাম বা হতাহতের সঠিক সংখ্যা প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু দ্য অমৃত বাজার পত্রিকা, যুগান্তর এবং আনন্দবাজার পত্রিকার মতো গণমাধ্যমগুলো এই আইনি হুমকি ও লাইসেন্স বাতিলের ঝুঁকি উপেক্ষা করে সাহসের সাথে সত্য প্রকাশ করে যেতে থাকে।

২. যুদ্ধক্ষেত্রের মতো ঝুঁকি নিয়ে মাঠপর্যায়ের রিপোর্টিং

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এবং চরম বিপজ্জনক নোয়াখালীর প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে সংবাদদাতাদের পাঠানো ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তা সত্ত্বেও বেশ কয়েকজন সাহসী সাংবাদিক ছদ্মবেশে এবং স্থানীয়দের সহায়তায় দাঙ্গাকবলিত এলাকায় প্রবেশ করেন:

  • দ্য স্টেটস ম্যান (The Statesman): এই ইংরেজি দৈনিকটির তৎকালীন সম্পাদক ইয়ান স্টিফেনসন (Ian Stephens) নোয়াখালীর ভয়াবহতার সচিত্র বিবরণ প্রকাশে সবচেয়ে সাহসী ভূমিকা নেন। তাঁর নির্দেশে বিশেষ প্রতিনিধিরা দুর্গম এলাকায় গিয়ে জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ এবং নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের লোমহর্ষক বাস্তব চিত্র তুলে আনেন।
  • অমৃত বাজার পত্রিকা (Amrita Bazar Patrika): এই পত্রিকার প্রতিনিধিরা মাঠপর্যায় থেকে তথ্য এনে ১৯৪৬ সালের ২৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে প্রকাশ করেন যে, প্রায় ১২০টি গ্রাম দাঙ্গাবাজদের দ্বারা অবরুদ্ধ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তারা সরাসরি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, এটি কোনো সাধারণ দাঙ্গা নয়, বরং সুপরিকল্পিত জাতিগত নিধনযজ্ঞ।

৩. সম্পাদকীয়র মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্তরে দৃষ্টি আকর্ষণ

শুধুমাত্র সংবাদ প্রকাশই নয়, এই পত্রিকাগুলো অত্যন্ত ঝাঁঝালো সম্পাদকীয় (Editorial) লিখে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসন এবং ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল:

  • সংবাদপত্রগুলো লর্ড ওয়াভেলের কাছে সরাসরি প্রশ্ন তোলে যে, যখন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে ও বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, তখন ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী কেন নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
  • কলকাতার সংবাদপত্রগুলোর এই অবিরাম লেখার ফলেই মূলত ভারতের তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান জওহরলাল নেহরু এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল নোয়াখালীর ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন এবং ব্রিটিশ সরকারকে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করেন।

৪. মহাত্মা গান্ধীর আগমন ত্বরান্বিত করা

গণমাধ্যমের এই সাহসী ও ধারাবাহিক প্রতিবেদনের কারণেই নোয়াখালীর মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র মহাত্মা গান্ধীর কাছে পৌঁছায়। ১৯৪৬ সালের অক্টোবরের শেষার্ধে পত্রিকার পাতাগুলো ওল্টালেই যখন পূর্ববঙ্গের আর্তনাদের চিত্র ফুটে উঠছিল, তখন গান্ধীজি দিল্লির রাজনৈতিক এজেন্ডা স্থগিত রেখে নোয়াখালীতে তাঁর ঐতিহাসিক শান্তি মিশন শুরু করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।

৫. ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে জনমত গঠন

তৎকালীন সংবাদপত্রগুলো কেবল খবরই প্রকাশ করেনি, তারা দুর্গতদের জন্য তহবিল গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। লীলা রায়ের উদ্ধার অভিযান এবং ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের ত্রাণ তৎপরতার বিবরণ প্রতিনিয়ত ছেপে সাধারণ মানুষকে সাহায্য করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। এর ফলে কলকাতা ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ ত্রাণ সামগ্রী নোয়াখালীতে পাঠানো সম্ভব হয়েছিল।

৪. নারী নেত্রী লীলা রায়ের সাহসিক উদ্ধার অভিযান

১৯৪৬ সালের নোয়াখালী গণহত্যার অন্ধকারতম দিনগুলোতে নারী নেত্রী লীলা রায়ের (নাগ) সাহসিক উদ্ধার অভিযান ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে নারী নেতৃত্বের অন্যতম এক বীরত্বপূর্ণ ও গৌরবময় অধ্যায়। যখন নোয়াখালীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল, তখন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসের এই ঘনিষ্ঠ সহযোগী নিজের জীবনের পরোয়া না করে দাঙ্গাকবলিত এলাকায় প্রবেশ করেছিলেন।

লীলা রায়ের সেই ঐতিহাসিক ও রোমাঞ্চকর উদ্ধার অভিযানের মূল দিকগুলো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

১. দ্রুত সাড়া ও ‘ন্যাশনাল সার্ভিস ইনস্টিটিউট’ গঠন

১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর কলকাতার সংবাদপত্রগুলোতে যখন পূর্ববঙ্গের নারীদের ওপর নির্যাতন, অপহরণ ও জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের খবর আসতে শুরু করে, তখন লীলা রায় ঘরে বসে থাকতে পারেননি। তিনি অবিলম্বে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মীদের সংগঠিত করেন। দুর্গতদের উদ্ধার ও পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে তিনি দ্রুত ‘ন্যাশনাল সার্ভিস ইনস্টিটিউট’ (NSI) নামে একটি লড়াকু স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করেন।

২. দুর্গম ও বিপজ্জনক অঞ্চলে পদযাত্রা

মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালী পৌঁছানোর আগেই, ১৯৪৬ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে লীলা রায় তাঁর দল নিয়ে নোয়াখালীতে প্রবেশ করেন। তৎকালীন নোয়াখালীর রামগঞ্জ, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর ও বেগমগঞ্জের মতো থানাগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা দাঙ্গাবাজরা সম্পূর্ণ কেটে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।

  • ৯০ মাইলের দুঃসাহসিক সফর: লীলা রায় এবং তাঁর নারী ও পুরুষ স্বেচ্ছাসেবকদের দলটি কোনো সামরিক বা পুলিশি নিরাপত্তা ছাড়াই পায়ে হেঁটে প্রায় ৯০ মাইল পথ পাড়ি দেন।
  • ভাঙা রাস্তা, জঙ্গল এবং দাঙ্গাকারীদের সার্বক্ষণিক হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে তিনি চৌমুহনী থেকে শুরু করে একেবারে উপদ্রুত অঞ্চলের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত প্রতিটি গ্রামে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।

৩. ১,৩০৭ জন নারীকে উদ্ধার ও আইনি লড়াই

লীলা রায়ের এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল অপহৃত, জোরপূর্বক বিবাহিত এবং অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা হিন্দু নারীদের মুক্ত করা।

  • সরাসরি সংঘাত ও উদ্ধার: তিনি উগ্রপন্থীদের আস্তানা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের বাড়ি অবরুদ্ধ করে, কখনো স্থানীয় প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, আবার কখনো সরাসরি সাহসের সাথে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ১,৩০৭ জন অপহৃত ও ধর্মান্তরিত নারীকে উদ্ধার করেন
  • সাক্ষ্য প্রদান ও আইনি সুরক্ষা: তিনি কেবল নারীদের উদ্ধারই করেননি, বরং অপরাধীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের এবং ভুক্তভোগী নারীদের আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করেন। তাঁর এই কঠোর অবস্থানের কারণে স্থানীয় দাঙ্গাবাজ চক্রের মধ্যে এক ধরনের ভীতির সৃষ্টি হয়েছিল।

৪. ১৭টি ত্রাণ শিবির ও ‘মনস্তাত্ত্বিক’ পুনর্বাসন

উদ্ধারকৃত নারীদের সামাজিক ও মানসিকভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে ধর্মান্তরিত বা নির্যাতিত নারীদের সহজে গ্রহণ করা হতো না।

  • লীলা রায় নোয়াখালী জুড়ে ১৭টি বৃহৎ ত্রাণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করেন।
  • এই কেন্দ্রগুলোতে নারীদের কেবল আশ্রয়, অন্ন ও বস্ত্রই দেওয়া হয়নি, বরং তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে লাঠিখেলা, ছুরি চালানো এবং আত্মরক্ষার প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
  • তিনি সমাজকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, এই নারীরা অপরাধী নন, বরং পরিস্থিতির শিকার; ফলে তাদের সসম্মানে পরিবারে ফিরিয়ে নিতে হবে।

৫. গান্ধীজির সাথে সমন্বয় ও স্বীকৃতি

মহাত্মা গান্ধী যখন ৭ নভেম্বর নোয়াখালীতে পৌঁছান, তখন লীলা রায় তাঁর কাজের বিবরণ ও উদ্ধারকৃত নারীদের কেস স্টাডি গান্ধীজির সামনে তুলে ধরেন। গান্ধীজি লীলা রায়ের এই অদম্য সাহস এবং সাংগঠনিক দক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। পরবর্তীতে বিশিষ্ট সমাজকর্মী সুহাসিনী দাসসহ বহু নারী কর্মী লীলা রায়ের তৈরি করা এই শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নোয়াখালীতে দীর্ঘমেয়াদী কাজ চালিয়ে যান।

৫. শরণার্থী সংকট ও চিরতরে বদলে যাওয়া জনমিতি

১৯৪৬ সালের নোয়াখালী গণহত্যা এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী ও স্থায়ী সামাজিক পরিণতি ছিল ব্যাপক শরণার্থী সংকট এবং পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) জনমিতির (Demography) চিরতরে বদলে যাওয়া। এই সহিংসতা কয়েক শতক ধরে গড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানকে ধ্বংস করে এক বিশাল জনসংখ্যাগত শূন্যতা তৈরি করেছিল।

এই শরণার্থী সংকট এবং তার ফলে সৃষ্ট স্থায়ী জনমিতিক পরিবর্তনের বিবরণ নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. অভূতপূর্ব শরণার্থী সংকট (The Refugee Crisis)

দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর জীবন ও ধর্ম রক্ষার্থে নোয়াখালী ও ত্রিপুরা জেলা থেকে বাঙালি হিন্দুদের এক অভূতপূর্ব ও গণ-দেশত্যাগ (Exodus) শুরু হয়।

  • শরণার্থীর সংখ্যা: তৎকালীন সরকারি ও বেসরকারি হিসাব মতে, দাঙ্গার প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৭৫,০০০ হিন্দু মানুষ সম্পূর্ণ বাস্তুচ্যুত হন।
  • প্রধান আশ্রয়স্থল: শরণার্থীরা প্রধানত পার্শ্ববর্তী করদ রাজ্য ত্রিপুরা (আগরতলা), আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা ও অসমাপ্ত জেলাগুলোতে আশ্রয় নেন। তৎকালীন ত্রিপুরার মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য তাঁর রাজ্যে আসা হাজার হাজার নোয়াখালীর শরণার্থীদের জন্য বিশেষ আশ্রয় শিবির খোলেন এবং রাজকোষ থেকে ত্রাণের ব্যবস্থা করেন।
  • মানসিক আঘাত বা ট্রমা: এই শরণার্থীরা কেবল ঘরবাড়িই হারাননি, বরং জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ, পৈতা কেটে ফেলা, শাঁখা ভেঙে ফেলা এবং গোমাংস ভক্ষণে বাধ্য করার মতো গভীর মনস্তাত্ত্বিক ট্রমার শিকার হয়েছিলেন, যা তাঁদের নিজ ভূমিতে ফিরে আসার আত্মবিশ্বাস চিরতরে কমিয়ে দিয়েছিল।

২. ১৯৪৭-এর দেশভাগ ও মধ্যবিত্তের দেশত্যাগ

১৯৪৬ সালের এই ক্ষত শুকানোর আগেই ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারতের বিভাজন এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্ম হয়। নোয়াখালীর দাঙ্গার স্মৃতি হিন্দুদের মনে যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছিল, তার ফলে দেশভাগের পর দেশত্যাগের গতি আরও তীব্র হয়।

  • নোয়াখালী অঞ্চলের শিক্ষিত, পেশাজীবী এবং জমিদার শ্রেণীর উচ্চবর্ণের হিন্দুরা (যেমন ডাক্তার, আইনজীবী, শিক্ষক ও ব্যবসায়ী) তাঁদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ফেলে বা নামমাত্র মূল্যে বিনিময় করে পশ্চিমবঙ্গে চলে যান।
  • এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানের এই অঞ্চলে এক বিরাট সামাজিক ও অর্থনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, যা স্থানীয় সামাজিক ভারসাম্যকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।

৩. ঐতিহাসিক বনাম বর্তমান জনমিতি (Structural Demographic Shift)

নোয়াখালী ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের জনসংখ্যার ধর্মীয় অনুপাত এই দাঙ্গা এবং তার পরবর্তী দশকগুলোর ধারাবাহিক অভিবাসনের কারণে সম্পূর্ণ উল্টে যায়:

  • ব্রিটিশ আমলের জনমিতি (১৯৪১ সালের আদমশুমারি): ১৯৪১ সালের শুমারি অনুযায়ী, অবিভক্ত নোয়াখালী জেলায় মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২২ লক্ষাধিক, যার মধ্যে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৮% থেকে ২০%। কিছু সুনির্দিষ্ট পকেট বা থানা যেমন রামগঞ্জ, রায়পুর ও লক্ষ্মীপুরে হিন্দুদের অনুপাত আরও অনেক বেশি ছিল।
  • পাকিস্তান আমলের জনমিতি (১৯৫১ ও ১৯৬১): ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা এবং পরবর্তীতে ১৯৫০ সালের পূর্ব পাকিস্তান দাঙ্গার পর এই হার দ্রুত কমতে থাকে। ১৯৬১ সালের মধ্যে নোয়াখালীতে হিন্দুদের জনসংখ্যা একক অঙ্কে (Single Digit) নেমে আসে।
  • বর্তমান জনমিতি (২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে): পুরোনো নোয়াখালী জেলাটি বর্তমানে তিনটি প্রশাসনিক জেলায় (নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর) বিভক্ত। বাংলাদেশের সর্বশেষ শুমারি ও জনমিতিক উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলে বর্তমান হিন্দু জনসংখ্যা হ্রাস পেয়ে মাত্র ৪% থেকে ৫% এর কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। নোয়াখালীর যেসব গ্রাম একসময় দুর্গাপূজা, শাঁখারি শিল্প এবং হিন্দু সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল, সেগুলোর সিংহভাগই এখন সম্পূর্ণ মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকায় পরিণত হয়েছে।

৪. মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন

এই জনমিতিক পরিবর্তনের ফলে নোয়াখালী অঞ্চলের কয়েক শত বছরের পুরোনো মিশ্র সংস্কৃতি (Syncretic Culture) বিলুপ্ত হয়ে যায়। রায়বাহাদুর, জমিদার এবং প্রাচীন হিন্দু পরিবারগুলোর পরিত্যক্ত বিশাল বাড়িগুলো (যেমন দাসের বাড়ি, ঘোষের বাড়ি) কালের বিবর্তনে শত্রু সম্পত্তি (পরবর্তীতে অর্পিত সম্পত্তি) আইনে সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে যায় অথবা বেদখল হয়ে যায়। নোয়াখালীর জয়াগে অবস্থিত গান্ধী আশ্রমটি বর্তমানে এই অঞ্চলের সেই প্রাচীন বৈচিত্র্যময় ইতিহাসের এক নিঃসঙ্গ স্মারক হিসেবে টিকে আছে।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

অর্থ

নিউজ ডেস্ক

August 26, 2026

শেয়ার করুন

তথ্য ও প্রকাশনা সংক্রান্ত বক্স (Editorial Meta Box)

  • প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
  • বিভাগ (Category): ক্যারিয়ার ও জীবনধারা / আত্মউন্নয়ন
  • প্রকাশের তারিখ: ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • তথ্যসূত্র (Sources): বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (WEF), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং মনোবিজ্ঞান সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সাময়িকী।

জীবন ও ক্যারিয়ারে প্রকৃত স্থায়িত্ব আনার জন্য অর্থনৈতিক প্রাচুর্য, মানসিক সন্তুষ্টি এবং সময়ের সঙ্গে মানানসই জীবনদক্ষতার সঠিক সমন্বয় অপরিহার্য। বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় সফলতাকে কেবল ব্যাংকের ব্যালেন্স দিয়ে পরিমাপ করা হলেও, বিশ্বব্যাপী গবেষক ও মনস্তত্ত্ববিদদের মতে প্রকৃত সাফল্য হলো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, দৈহিক সুস্থতা এবং আত্মিক প্রশান্তির এক সুষম রূপরেখা।

অর্থ কি সফলতার একমাত্র মাপকাঠি? (মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি)

অর্থ মানুষকে জীবনধারণের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা দেয়, তবে এটি সফলতার একমাত্র চূড়ান্ত পরিণতি নয়। মার্কিন মনস্তাত্ত্বিক আব্রাহাম মাসলোর ‘চাহিদা সোপান তত্ত্ব’ (Maslow’s Hierarchy of Needs) অনুযায়ী মানুষের প্রাথমিক চাহিদা মেটানোর পর প্রধান প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায় আত্মমর্যাদা ও আত্মোপলব্ধি।

  • অর্থের ভূমিকা: আর্থিক সচ্ছলতা মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সহজ করে এবং জীবনযাত্রার সংকট হ্রাস করে।
  • যেখানে অর্থ অকার্যকর: পরম মানসিক শান্তি, গভীর সুসম্পর্ক, ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব এবং শারীরিক সুস্থতা কখনোই কেবল অর্থ দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়।
  • জাপানি ‘ইকিগাই’ (Ikigai) দর্শন: জাপানি এই জীবনদর্শন অনুযায়ী, কাজের মূল সার্থকতা আসে ৪টি বিষয়ের মিলবন্ধনে—আপনি যা ভালোবাসেন, যাতে আপনি দক্ষ, যার বাজারমূল্য রয়েছে এবং যা বিশ্ব বা সমাজের কল্যাণে আসে।

ব্যক্তিগত দক্ষতা ও সাফল্য অর্জনের বৈজ্ঞানিক কৌশল

সাফল্য লাভ কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; এটি একটি নির্দিষ্ট অভ্যাস ও শৃঙ্খলাবদ্ধতার ফল।

  1. ‘১ শতাংশ উন্নয়ন’ নীতি (Atomic Habits): প্রতিদিন নিজেকে যেকোনো বিষয়ে মাত্র ১% উন্নত করলে, চক্রবৃদ্ধি হারে (Compound Effect) বছর শেষে আপনি ৩৭ গুণ বেশি দক্ষ হয়ে উঠবেন।
  2. পমোডোরো টেকনিক (Pomodoro Technique): কাজের মনোযোগ অক্ষুণ্ন রাখতে ২৫ মিনিট পূর্ণ মনোযোগ সহকারে কাজ করুন এবং ৫ মিনিটের বিরতি নিন।
  3. টি-শেপড স্কিল (T-Shaped Skills): সাধারণ অনেক বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা রাখার পাশাপাশি যেকোনো একটি নির্দিষ্ট কারিগরি বা প্রফেশনাল বিষয়ে গভীর বিশেষজ্ঞতা (Mastery) অর্জন করুন।
  4. আর্থিক সাক্ষরতা (Financial Literacy): আয়ের একটি অংশ নিয়মিত সঞ্চয় করা, অপ্রয়োজনীয় আবেগপ্রসূত খরচ কমানো এবং সম্পদ বৃদ্ধির জন্য সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ শেখা জরুরি।

বাংলাদেশে যুব বেকারত্ব: বর্তমান চিত্র, কারণ ও সমাধান

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বাড়লেও কর্মসংস্থানের বাজারে দক্ষতার ঘাটতি এক বড় বড় চ্যালেঞ্জ। সঠিক দিকনির্দেশনা ও সময়োপযোগী পরিকল্পনার অভাব এর মূল কারণ।

আলোচনার বিষয়বর্তমান পরিস্থিতি ও মূল সমস্যাকার্যকরী উত্তরণের সমাধান
শিক্ষা ও চাকুরির অমিলপ্রচলিত ডিগ্রি থাকলেও করপোরেট চাহিদানুযায়ী ডেটা অ্যানালিটিক্স, আইটি, ডিজিটাল মার্কেটিং বা টেকনিক্যাল জ্ঞানের অভাব।পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক অনলাইন কোর্স ও ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্কিল তৈরি করা।
মাইন্ডসেটের সীমাবদ্ধতাকেবল সরকারি চাকুরির (BCS/Bank) প্রস্তুতির পেছনে জীবনের মূল্যবান ৪-৫ বছর অতিবাহিত করা।বিসিএস বা চাকুরির প্রস্তুতির সাথে সাথে বিকল্প আয়ের পথ বা ফ্রিল্যান্স স্কিল সচল রাখা।
স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা বাধাপর্যাপ্ত জামানতহীন ব্যাংক ঋণ না পাওয়া এবং আধুনিক বিজনেস মেন্টরশিপের অভাব।ছোট পরিসরে নিজস্ব দক্ষতা বিক্রি দিয়ে শুরু করা (Bootstrapping) এবং সরকারি ক্ষুদ্র ঋণ তহবিলের সদ্ব্যবহার।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও জীবনদর্শন

সাফল্যের মূল পথ কোনো অলৌকিক ম্যাজিক নয়, বরং এটি আপনার দৈনিক অভ্যাসের রূপরেখা। লক্ষ্য স্থির করুন, সময়ের অপচয় রোধে অহেতুক সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রোলিং কমান এবং নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক যত্নে মনোযোগ দিন। অর্থ জীবনকে গতিময় করবে, কিন্তু আপনার মানসিক শান্তি ও অর্জনই আপনাকে প্রকৃত সফল মানব হিসেবে গড়ে তুলবে।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

১৮ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ