ইতিহাস

আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল কেন বিখ্যাত?
স্যার আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল

নিউজ ডেস্ক

November 29, 2025

শেয়ার করুন

স্যার মুহাম্মদ ইকবাল, আল্লামা ইকবাল নামে ব্যাপক পরিচিত ছিলেন।

বিভাগপূর্ব ভারতবর্ষের মুসলিম কবি, দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ, শিক্ষবিদ ও ব্যারিস্টার ছিলেন।তার ফার্সি ও উর্দু কবিতা আধুনিক যুগের ফার্সি ও উর্দু সাহিত্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাকে পাকিস্তানের আধ্যাতিক জনক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। ইকবাল তার ধর্মীয় ও ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের জন্যও বিশেষভাবে সমাদৃত ছিলেন।

জীবন ও কর্ম

আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল (জন্ম নভেম্বর ৯, ১৮৭৭; শিয়ালকোট, পাঞ্জাব – মৃত্যু: এপ্রিল ২১, ১৯৩৮) ছিলেন বিভাগপূর্ব ভারতবর্ষের মুসলিম কবি, দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ। তাঁর ফার্সি ও উর্দু কবিতা আধুনিক যুগের ফার্সি ও উর্দু সাহিত্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইকবাল তাঁর ধর্মীয় ও ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের জন্যও বিশেষভাবে সমাদৃত ছিলেন। তাঁর একটি বিখ্যাত চিন্তা দর্শন হচ্ছে ভারতের মুসলমানদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন। এই চিন্তাই বর্তমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। তাঁর নাম মুহাম্মদ ইকবাল হলেও তিনি আল্লামা ইকবাল হিসেবেই অধিক পরিচিত। আল্লামা শব্দের অর্থ হচ্ছে শিক্ষাবিদ । তাঁর ফার্সি সৃজনশীলতার জন্য ইরানেও তিনি ছিলেন সমধিক প্রসিদ্ধ; তিনি ইরানে ইকবাল-ই-লাহোরী নামে পরিচিত।

আল্লামা ইকবালের ১২৯৪ হিজরী ৩রা যিলকদ মোতাবেক ১৮৭৭ খৃস্টাব্দে ৯ই নভেম্বর বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের সিয়ালকোটে জন্মগ্রহণ করেন। আল্লামা ইকবালের পিতার নাম শেখ নূর মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন একজন সূফী-দরবেশ শ্রেণীর লোক। ইলমে তাছাউফের প্রতি তার ছিল প্রবল আকর্ষণ। নামায, রোযা, তাসবীহ-তাহলীল, মোরাকাবা-মোশাহাদার মাধ্যমে তিনি অতিবাহিত করতেন দিবসের অধিকাংশ সময়। শিখ শাসনের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে শিখ-মুসলিম দাঙ্গার সময় কাশ্মীর ছেড়ে সিয়ালকোটে বসতি স্থাপন করেন তিনি। আল্লামা ইকবালের মাতা ইমাম বিবিও ছিলেন পিতার মতই একজন ধর্মভীরু পরহেযগার মহিলা।

আল্লামা ইকবাল তাঁর ছেলের সাথে জাবেদ ইকবাল ১৯৩০ সালে।

(ইকবালের মা, যিনি ১৯১৪ সালের ৯ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। ইকবাল তাঁর মৃত্যুর পরে কাব্যিক আকারে প্যাথো অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন।)

শিক্ষা জীবন

পাঞ্জাবের বৃটিশ আর্মির কাছে শিখদের পরাজয়ের পর খ্রিষ্টান মিশনারীরা শিয়ালকোটে শিক্ষা প্রচারের উপর গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। এই সময়েই শিয়ালকোটে স্কটিশ মিশন কলেজ স্থাপিত হয়। ১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজ লিবারেল আর্টস্ এর কোর্সসমূহের অনেকগুলোতেই আরবি ও ফার্সি ভাষা মাধ্যমে শিক্ষাদান করা হতো। যদিও এই সময় বেশীর ভাগ স্কুলেই ফার্সি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। এই স্কটিশ মিশন কলেজেই ইকবাল সর্বপ্রথম আধুনিক শিক্ষা প্রাপ্ত হন।

ইকবাল তাঁর কাব্য প্রতিভার স্বীকৃতি পান তাঁর শিক্ষক সাইয়িদ মীর হাসানের কাছ থেকে। ১৮৯২ সালে ইকবাল স্কটিশ মিশন কলেজ হতে তাঁর পড়াশোন শেষ করেন। একই বৎসরে গুজরাটি চিকিৎসকের মেয়ে করিম বিবির সাথে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের বিচ্ছেদ হয় ১৯১৬ সালে । এই বিয়েতে ইকবালের তিনটি সন্তান ছিল।

১৮৮৫ সালে স্কটিশ মিশন কলেজের পড়াশোনা শেষ করে ইকবাল লাহোরের সরকারী কলেজে ভর্তি হন। দর্শন, ইংরেজি ও আরবি সাহিত্য নিয়ে তিনি পড়াশোনা করেন এখান থেকে তিনি স্বর্ণ পদক নিয়ে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। ১৮৯৯ সালে যখন তিনি মাষ্টার্স ডিগ্রী লাভ করেন ততদিনে তিনি সাহিত্য অঙ্গনে পরিচিত ব্যক্তিত্ব।

মাষ্টার্স ডিগ্রীতে পড়বার সময় ইকবাল স্যার টমাস আর্নল্ড এর সংস্পর্শে আসেন। এই শিক্ষাবিদ ইসলাম ও আধুনিক দর্শনে বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। ইকবালের কাছে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেছিলেন। স্যার টমাস আর্নল্ডই ইকবালকে ইউরোপে উচ্চ শিক্ষায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

দাম্পত্য জীবন
১৮৯৩ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে পারিবারিক প্রথা অনুযায়ি ইকবাল গুজরাটের সিভিল সার্জন খান বাহাদুর আতা মুহাম্মদের কন্যা করিম বিবি কে বিয়ে করেন। এই স্ত্রীর গর্ভে তাঁর কন্যা মেরাজ বিবি ও পুত্র আফতাব ইকবালের জন্ম হয়। এ স্ত্রীর সাথে তার মনোমালিন্য হলে তারা আলাদা বাস করতে থাকেন। প্রথম স্ত্রীর সাথে বিচ্ছিন্নতার পর এক কাশ্মিরী পরিবারের সরদার বেগম নামীয় মহিলার সাথে তাঁর দ্বিতীয় বিবাহ হয়। এই স্ত্রীকে তিনি বিবাহের চার বছর পর ঘরে তোলেন এবং তার গর্ভেই ১৯২৪ সালে জাবিদ ইকবালের জন্ম হয়। ইকবালের তৃতীয় বিবাহ ১৯১২ সালে লুধিয়ানানিবাসী মোখতার বিবি’র সাথে। সন্তান প্রসবকালে তার মৃত্যু হয়। শেষ জীবনে ইকবাল অসুস্থ হয়ে পড়েলে প্রথম স্ত্রী করিম বিবির ধারস্থ হন এবং মৃত্যু পর্যন্ত এই স্ত্রীই তাঁকে সঙ্গ দেন।

কর্মময় জীবন

১৯২৩ সালে বৃটিশ সরকার ইকবালকে নাইট খেতাব দিয়ে সম্মানিত করে। তার এই নাইট প্রাপ্তি ভক্ত অনুরাগীদের মাঝে ভূল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। বিরুদ্ধবাদী কবিরা ব্যাঙ্গাতœক কবিতা লিখে তাঁকে আক্রমণ করে। এমনকি তার বন্ধুরা চিঠি লিখে তার মতামত জানতে চায় এবং আশ্বস্ত হতে চায় ঘটনা যেন কোন ক্রমেই তাঁর স্বাধীন মতামত প্রকাশে কিংবা কওমের প্রতি খেদমতে বাঁধার সৃষ্টি না করে। আল্লামা ইকবাল বাকী জীবন কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করেগেছেন যে, তিনি কখনো দুর্দশাগ্রস্থ মুসমানদের কথা ভুলন নি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কালীন সময়ে উপ-মহাদেশের নৈরাজ্যপূর্ণ অবস্থা বিশেষ করে মুসলমানদের দু:খজনক চিত্র তাঁকে ব্যথিত করে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন, রাজনৈতিক েেত্র শক্তিশালী হওয়া ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুসলমানদেও উত্তরণ আর সম্ভব নয়। মুসলমানদের প্রতিটি সমস্যায় গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখার ল্েয আমৃত্যু রাজনীতির কঠিন ময়দানে বিচরণ করেন তিনি। তিনি ১৯২৬ সালে পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২৭ সালে বৃটিশ সরকার ভবিষ্যৎ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের পটভূমি তৈরীর প্রত্যাশায় “সাইমন কমিশন” প্রেরন করলে কংগ্রেস দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে আল্লামা ইকবাল নওয়াব জুলফিকার আলী খান ও মাওলানা মোহাম্মদ আলীর সাথে যৌথভাবে এক বিবৃতি প্রকাশ করে কমিশনকে সহযোগীতার আশ্বাস দেন। তিনি মুসলমানদের ল্য করে বলেন, যদি আমরা কমিশনকে সহায়তা না করি তবে বৃটিশরা মুসলমানদের স্বার্থকেই বিঘিœত করবে। আল্লামা ইকবালের এই ধারণা বৃটিশদের শাসন পরিচালনায় মুসলমানরা হারে হারে টের পেয়েছিল। বৃটিশরা সবসময় মুসলমানদের কাছ থেকে মতা দখল করার কারণে মুসলমানদেরকেই প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করছে। যা তাদের দীর্ঘ দিনের কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে।

মুসলমান শাসনের অবসানের পর কাশ্মীরের মুসলমানরা নানাবিধ নির্যাতন ও লাঞ্চনার শিকার হয়। অসহায় কাশ্মীরী মুসলমান ভাইদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য লাহোরে চলে আসা কাশ্মীরীরা আঞ্জুমান নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পর আল্লামা ইকবাল এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। যেহেতু তিনিও ছিলেন মুলতঃ কাশ্মীরী। তার পূর্বপুরুষ নির্যাতনের শিকার হয়েই কশ্মীর ছেড়ে চলে আসেন।
১৯৩০ সালের দিকে মুসলমানদের প্রতি যুলুম-নির্যাতন অত্যধিক পরিমাণে বেড়ে যায়। ডোগরা মহারাজার ক্রমবর্ধমান জুলুম, নির্যাতনের প্রতিবাদে লাহোরে সর্বভারতীয় কাশ্মীর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে কাশ্মীর প্রশাসনের অন্যায় নির্যাতনের সমালোচনা করে প্রস্তাব গৃহিত হয়। আল্লামা ইকবাল এই প্রস্তাবের প্রতি একাত্মতা পোষন করেন। এ সময় তিনি মুসলিম কনফারেন্সের সভাপতি ছিলেন। তিনি কাশ্মীরিদের সার্বিক সমস্যার কথা সরকারের কাছে যথাযথ ভবে তুলে ধরেন। এর প্রেেিত সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করলে কাশ্মীরিদের সমস্যা কিছুটা হলেও সমাধান হয়।

১৯৩২ সালে আলোয়ার রাজ্যের মহারাজা কর্তৃক নির্যাতিত মুসলমানগণ ‘খাদেমুল মুসলিমিন’ নামে একটি সংগঠন দাঁড় করালে মহারাজার সরকার এটিকে বেআইনী ঘোষণা করে। এ অন্যায় আদেশের প্রতিবাদে মুসলমানরা বিােভ করলে তাদের উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে শহীদ হন প্রায় এক শত মুসলমান। এরপর শুরু হয় গণ-গ্রেফতার। বাড়ী ঘরে ছেড়ে পালাতে থাকে মুসলমানগণ। এই অন্যায় আচরণের প্রতিকার চেয়ে আল্লামা ইকবাল ভাইসরয় লর্ড ওয়েলিংটনের নিকট একটি স্মারক লিপি পেশ করেন। পরিণতিতে মুসলমানগণ ফেরারী জীবন ছেড়ে বাড়ী ফেরার সুযোগ পায়।

১৯৩৬ সালে আল্লামা ইকবাল পাঞ্জাব মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারী বোর্ডের সভাপতি নিযুক্ত হন। একই সালে পাঞ্জাব মুসলিম লীগ পুনর্গঠনের লে অনুষ্ঠিত সভায় সর্ব-সম্মতিক্রমে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি ঘোষণা করা হয় তাকে। ১৯৩৮ সালে লাহোরে মসজিদের দখল নিয়ে শিখ-মুসলমান দাঙ্গার সময় আল্লামা ইকবাল মসজিদ পুনরুদ্ধারে শাহাদাত প্রত্যাশি মুসলমান যুবকদের উৎসাহ যোগান। এক কথায় ১৯২৬ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে আল্লামা ইকবাল মুসলমানদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

এরপরও কেউ কেউ আল্লামা ইকবালের রাজনৈতিক কার্যকলাপের সমালোচনা করেন। কিন্তু তৎকালীন পরিস্থিতির বিচারে একজন মুসলমানের এরচেয়ে কতটুকু বেশী করার সুযোগ ছিল তা কিন্তু প্রশ্ন সাপে। সার্বিক বিবেচনায় ভারতীয় মুসলমানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণে আল্লামা ইকবালের অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। তিনিই সর্ব প্রথম মুসলিম লীগের অধিবেশনে ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের দাবী উত্থাপন করেন। এই দাবীই পরবর্তীতে পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনের সূচনা করে।

সব চেয়ে বড় কথা হল আল্লামা ইকবাল কেবল মাত্র রাজনীতি নিয়েই ব্যস্ত থাকেন নি। জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার কাজ তিনি চালিয়ে যান সমান তালে। ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর মাসে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়েই ৬টি বক্তৃতা দেন তিনি। এর পরপরই বাঙ্গালুর হায়দারাবাদ এবং আলীগড়ে বক্তৃতা দেয়ার আমন্ত্রণ পান। তার এ সকল বক্তৃতা The Reconstruction of Religious Thought in Islam নামক পুস্তকে প্রকাশিত হয়। যা আল্লামা ইকবালের চিন্তার গভীরতার স্বাক্ষরক বহন করে।

রচনাবলী
ইকবাল গদ্য-পদ্য উভয় রচনাতেই ছিলেন সিদ্ধ হস্ত। তিনি ছিলেন মুক্তছন্দ কবি ও লেখক। তিনি লেখালেখি করেছেন বিভিন্ন বিষয়ের উপর। অর্থনীতির মত জটিল বিষয় থেকে শুরু করে আধ্যাত্মিকতার মতো বিমূর্ত বিষয় পর্যন্ত উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। গ্রন্থ রচনা ছাড়াও তিনি বিস্তর প্রবন্ধ লিখেছেন। রাজনৈতিক প্রয়োজনে তৈরী করতে হয়েছে বিবৃতি, দিতে হয়েছে সাাতকার। ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও পন্ডিতদের সাথে আজীবন চিঠিপত্র বিনিময় করেছেন তিনি। আল্লামা ইকবাল তার জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ সময় ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে রচনা করেন মাত্র ২৪টি কবিতা। তাও এর অধিকাংশই তার বন্ধু “মাখজান” সম্পাদক আব্দুল কাদিরের অনুরোধে। কবি-জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে ইকবাল উপর উর্দু কবি “দাগ”-এর প্রভাব ছিল প্রবল। পরবর্তীতে “কবি গালিব” ও “কবি হালী”-এর প্রভাবে গতানুগতিকা ছেড়ে তাঁর কবিতা সম্পূর্ণ নতুন খাতে প্রবাহিত হয়। আল্লামা ইকবাল সর্বপ্রথম ১৮৯৯ সালে লাহোরে “আঞ্জুমানে হিমায়াতে ইসলাম”-এর বার্ষিক সভায় জনসমে কবিতা পাঠ করেন। কবিতার শিরোনাম ছিল “নালায়ে ইয়াতিম” (অনাথের আর্তনাদ)। ১৯১১ সালের এপ্রিল মাসে একই সংগঠনের বার্ষিক সভায় তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী খন্ডকাব্য “শিকওয়া” পাঠ করেন। এর প্রভাবে আল্লামা ইকবালের আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয় ব্যাপকভাবে। এরই প্রেেিত তিনি রচনা করেন আরেকটি যুগান্তকারী খন্ডকাব্য “জাওয়াবে শিকওয়া”। এরপর একে রচনা করতে থাকেন অসংখ্য কবিতা। এই কবিতার মাধ্যমেই পাওয়া যায় তার চিন্তা-ধারার প্রকৃত পরিচয়। তার রচিত গ্রন্থাবলী হচ্ছে-

(১) ইলমুল ইকতিসাদ
অর্থনীতির উপর লেখা উর্দুভাষার প্রথম পুস্তক। তিনি এটি লাহোর সরকারী কলেজের সহকারী অধ্যাপক থাকাকালীন সময়ে রচনা করেন।

(২) তারিখ-ই-হিন্দ
বইটির মূল কপির সন্ধান পাওয়া যায়না এখন। এর একটি সংস্করণ অমৃতসর থেকে প্রকাশিত হয়।

(৩) আসরার-ই-খুদী
আল্লামা ইকবালের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে এই “আসরার-ই-খুদী”। এটি ১৯১৫ সালে প্রকাশিত হয়। এই বই প্রকাশের পর সাড়া পড়ে যায় সর্বত্র। কিন্তু সূফী তরীকার অনুসারীরা এই পুস্তক প্রকাশকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে গ্রহণ করেননি। কেননা ইকবাল এই গ্রন্থে সূফী কবি হাফিজ শিরাজীর তীব্র সমালোচনা করে ৩৫টি কবিতা লিখেছিলেন। উত্তেজনা এতই চরম আকার ধারণ করেছিল যে, ইকবালের চিন্তাধারার সমালোচনা কওে খান বাহাদুর পীরজাদা মোজাফফর আহমদ ‘ফজলে রাজ-ই-বেখুদী’ নামে একটি দীর্ঘ কবিতা প্রকাশ করেন। ইকবাল পরবর্তী সংস্করনে উল্লেখিত ৩৫টি কবিতা বাদ দিয়ে দেন। প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ আর,এ, নিকলসন ১৯২০ সালে এর ইংরেজী তরজমা করেন প্রকাশ করেন।

(৪) রমুযে বেখূদী
প্রকৃতপে আসরার-ই-খূদীরই ক্রম সম্প্রসারিত এই সংকলনটি ১৯১৮ সালে রমুযে বেখুদী নামে প্রকাশিত হয়। আর্থার জন আর্বারী এটি ইংরেজীতে অনুবাদ করেন।

(৫) পায়াম-ই-মাশারিক
এই বইটি প্রকাশিত হয় ১৯২৩। এ সময়ে ইকবাল কবি হিসেবে অর্জন করেছেন সর্বজন স্বীকৃতি। তাঁর কবিতা এগিয়ে চলেছে পূর্ণ-পরিনতির দিকে। তিনি এ কাব্যে পাশ্চাত্য দর্শনের পাশাপাশি প্রাচ্যের কোরআনী চিন্তার ফসলকেও তুলে এনেছেন। এই কাব্যাটি গ্যাটের চিন্তাধারার অনুসরণে রচনা করেন। এতে মোট আশিটি কবিতা সংকলিত হয়েছে।

(৬) বাঙ্গ-ই-দারা
ইকবালের কবি জীবনের শুরু উর্দু কবিতার হাত ধরে। আর এই কাব্যটি উর্দু কবিতা সংকলন। উর্দুতেই তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর শ্রেষ্ঠ দেশাতœবোধক এবং জনচিত্তে আগুন ধরানো কবিতাসমূহ। ১৯২৪ সালে তিনি বাঙ্গ-ই-দারা নামে এ সকল উর্দু কবিতার সংকলনটি প্রকাশ করেন। এ কাব্যের কবিতাগুলো দেশাত্ববোধক, প্রকৃতি প্রীতি ও ইসলামী অনুভূতি এই তিনটি অংশে বিভক্ত।

(৭) যবুর-ই-আযম
ইকবালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফার্সী কবিতা সংকলন যবুর-ই-আযম। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয়। এর দুটি অংশের প্রথম অংশে ুদ্র কবিতা ও গীত এবং দ্বিতীয় অংশের নাম গুলশান-ই-রাজ-ই-জাদীদ। এখানে ইকবাল তার বিশিষ্ট দার্শনিক ভঙ্গিতে বর্তমান পৃথিবীর সমস্যাবলীর।

চিন্তা ও দর্শন

ভারতের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন ব্যর্থ হলো। ব্রিটিশ রাজের সন্দেহের আঙুল গিয়ে পড়লো মুসলিমদের উপর। শুরু হলো নিপীড়নের নয়া ইতিহাস। বস্তুত তখন পৃথিবীতেই জাতিগতভাবে মুসলিমদের অবস্থা ভয়াবহ। বাইরে থেকে সাম্রাজ্যবাদের আঘাত আর ভেতর থেকে কুসংস্কারের দৌরাত্ম। এমন সিদ্ধান্তমূলক সময়েই ভারত ভূমিতে আগমন করলেন তিনি।

(তার লেখা পরবর্তী প্রজন্মের হৃদয়ে দিয়েছে বিপ্লবের শক্তি)

আল্লামা ইকবাল। ইউরোপে পরিচিত Poet of The East হিসেবে। তার লেখা পরবর্তী প্রজন্মের হৃদয়ে দিয়েছে বিপ্লবের শক্তি। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় দিয়েছে নতুন মাত্রা। আফগানিস্তান, ইরান, তুরস্ক থেকে শুরু করে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ইসলাম চিন্তকদের পুনরুজ্জীবনের প্রচেষ্টার পেছনে তার বাক্য অনুপ্রেরণার মতো। পাকিস্তানের আধ্যাত্মিক পিতা। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পেছনেও তার চিন্তা। খোদ সৈয়দ আলি খোমেনি ১৯৮৬ সালে ঘোষণা করেন,

“ইরান ইকবালের স্বপ্নের বাস্তবায়ন। আমরা তার দেখানো পথে হাঁটছি।”

১৯০৫ সালে পাড়ি জমান ইউরোপে। এই আবহাওয়া পরিবর্তন তাকে পুরোপুরি বদলে দিল। ম্যাকটাগার্ড এবং জেমস্ ওয়ার্ডের মতো দার্শনিকদের কাছে থেকে নেন দর্শনের পাঠ। ইতোমধ্যে লন্ডন থেকে করেন ব্যারেস্টারি।

১৯০৮ সালে প্রত্যাবর্তন করেন দেশে। লাহোর সরকারি কলেজে দর্শন এবং ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ধীরে ধীরে চাকুরি ইস্তফা দিয়ে পুরো দমে শুরু করেন আইন ব্যবসা। কারণ, তাতে মুক্তভাবে চিন্তা করার অবকাশ থাকে। কবিতায় আন্দোলন তোলে তরুণ রক্তে। কবিত্বকে ছাপিয়ে যায় দর্শন। কখনো কবিতায়, কখনো বক্তব্যে প্রকাশ করতে থাকেন মৌলিক দার্শনিক চিন্তা।

(লন্ডনে চৌধুরি রহমত আলি ও অন্যান্য মুসলিম নেতৃবৃন্দের সাথে ইকবাল)

কবিত্ব আর দার্শনিকতা সমাজ ও রাজনীতি থেকে বিমুখ করতে পারেনি। ১৯৩০ সালে মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এলাহাবাদ অধিবেশনে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমির আভাস দিলেন। বিলেতের গোলটেবিল বৈঠকে দেখা যায় তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রমাণ। পরবর্তী পদক্ষেপ আরো জাঁকজমকপূর্ণ হতে পারতো। কিন্তু জীবন তাকে আর সুযোগ দেয়নি।

চিন্তা

ছন্দবদ্ধ ভাষায় মনের ঐকান্তিক আবেগকে সামনে তুলে আনার সময় ইকবাল কবি। অবশ্য কবিতার মধ্যেই স্ফুরিত হয়েছে তার দর্শন। কবিত্ব কিংবা দর্শন তাকে জীবন বিচ্ছিন্ন সাধনায় আবদ্ধ করেনি। উপরন্তু মানুষকে তৈরি করে দিয়েছে মুক্তির রাস্তা। আত্মবিশ্বাসের বলে মানুষ জল স্থল অন্তরীক্ষে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জানান দেবে; ইকবালের মূল শ্লোগান সেটাই।

মানুষ আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি। ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশের মধ্য দিয়ে মানুষ ইনসানে কামেল বা পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হবে। দুর্বলতা কিংবা সমাজ বিমুখতার কোনো সুযোগ নেই সেখানে। মানুষ দুনিয়ায় এসেছে নতুন জীবন প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর দায়িত্ব নিয়ে। যেকোনো ত্যাগের বিনিময়ে সেই দায়িত্ব সম্পাদন করতে হবে। তার জন্য ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। তারানায়ে মিল্লাতে ইকবাল গেয়েছেন-

“আরব হামার চীন হামারা হিন্দুস্থা আমার
মুসলিম হ্যায় হাম ওয়াতান হ্যায় সারে জাহা হামারা।”
অর্থাৎ
আরব আমার ভারত আমার চীন আমার নয় গো পর
মুসলিম আমি সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে রয়েছে আমার ঘর।

ইকবালের চিন্তার মূল প্রেরণা ইসলামের প্রাণশক্তি। দার্শনিক নিৎশে এবং বার্গসৌঁ- এর প্রভাব থাকলেও জালাল উদ্দিন রুমিই তার ভাবগুরু। ছিল ইসলামি দর্শন এবং ইউরোপীয় চিন্তার মধ্যে সেঁতু বন্ধনের প্রয়াস। কোরান হাদিসে বিধৃত কর্মবাদ এবং পাশ্চাত্য দর্শনের মধ্যে গভীর ঐক্য উপলব্ধি করেছেন তিনি। সেই সাথে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন পশ্চিমা চিন্তায় আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের অভাবকে। ফলে কর্মবিমুখ আধ্যাত্মবোধ এবং আধ্যাত্মবোধ বিমুখ দর্শনচিন্তা উভয় দলই ইকবালের কলমে সমালোচিত।

(১৯২৯ সালে মাদ্রাজের গোখলে হলে বক্তৃতা শেষে নেতৃবৃন্দের কেন্দ্রে ইকবাল)

খুদি

ইকবালের দর্শনের বড় একটা অংশ জুড়ে আছে খুদি। খুদি বাস্তব সত্তা- যা নিজের জোরেই অস্তিত্বশীল। অতীন্দ্রিয় অনুভূতির মাধ্যমে আমরা এই সত্তার সাক্ষাৎ পেয়ে থাকি। প্যানথেইস্টিক দার্শনিকদের মধ্যে খুদির অস্তিত্ব অস্বীকারের প্রবণতা আছে। তাদের চোখে দৃশ্যমান জগৎ অবাস্তব এবং অলীক। জগৎ সত্তায় অস্বীকৃতি মানুষের নৈতিক, সামাজিক দায়িত্ব এবং আকাঙ্ক্ষার বিলুপ্তি ঘোষণা করে। ফলে জন্ম নেয় সীমাহীন কর্মহীনতা এবং জীবনবিরোধিতা।

ইকবালের ভাষ্যে, অতীন্দ্রিয় অনুভূতির মাধ্যমে আমরা খুদিকে সরাসরি জানতে পারি। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিরাট কাজ ও গভীর অনুভূতির সময় ওয়াকেবহাল হই খুদির অস্তিত্ব সম্পর্কে। ফলে সকল ক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেই খুদির প্রকাশ। খুদি ব্যক্তিত্বের আধার। ইচ্ছা, অনিচ্ছা, বিচার-বিবেচনা, সিদ্ধান্তের মধ্যে ক্রিয়াশীল।

খুদি বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও ক্রিয়াকে অনুভব করে নিজের মূল্যায়ন করে। ফলে খুদির অস্তিত্ব ইচ্ছাময়। প্রচেষ্টা ও ইচ্ছার দিকে মানুষ যতো অগ্রসর হয়; জীবনের পথে সে ততো উন্নত। ইচ্ছাময় জীবন সম্প্রসারণশীল। ইচ্ছার সম্প্রসারণের মধ্য দিয়েই খুদি শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের রূপ লাভ করে। গতিতে জীবন; স্থিতিতে মরণ।

ইতর প্রাণী সহজাত প্রবৃত্তির বশেই পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে থাকে। কিন্তু মানুষ উদ্দেশ্যের প্রেক্ষিতে পরিবেশকে করে নিয়ন্ত্রণ। পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণাধীন করার জন্য ও পরিবেশের উপর প্রভুত্ব স্থাপনের জন্য মানুষ তার ইচ্ছাকে সম্প্রসারিত এবং খুদিকে বিকশিত করে। তার মানে, খুদি কোরানের তাকদীর ধারণাকে অস্বীকার করে না। বরং মানুষকে আত্মপ্রত্যয়ী করে তোলে। তার চিন্তায় সৌন্দর্য প্রমাণের জন্য এই একটা গজলই যথেষ্ট।

জগৎ

দীর্ঘদিন ধরে দার্শনিকদের মধ্যে বহির্জগতের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয়। ইকবালের কাছে বহির্জগত বাস্তব। আমরা প্রত্যক্ষণের মাধ্যমে এমন এক সত্তার অস্তিত্ব অনুভব করি, যা অস্বীকার করা যায় না। আবার, প্রত্যেক প্রকার জ্ঞানের ক্ষেত্রেই ব্যক্তি এক বাস্তব সত্তার অস্তিত্ব অনুভব করে। জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়-এর দ্বৈত সত্তা প্রত্যেক জ্ঞানের জন্য অপরিহার্য। কাজের প্রচেষ্টা সচেতনতার শ্রেষ্ঠতম অবস্থা। কাজের প্রচেষ্টায় অবিরাম বিরোধী শক্তির বাঁধা আসে। এই বিরোধী শক্তি খুদি ছাড়া অন্য বস্তু। বাস্তব জীবন তাই খুদি ও পারিপার্শ্বিক জগতের নিরন্তর সংঘাত।

বিজ্ঞানীদের ভাষ্যে, জগৎ নিষ্ক্রিয় কণা পরমাণুর নামে সমবায়ে গঠিত। পদার্থ যেন পরমাণুর সমষ্টি ছাড়া কিছু না। দার্শনিক বার্কলে দেখিয়েছেন, বস্তু আসলে গুণ ছাড়া কিছু না; আর গুণ মনের প্রত্যক্ষণ মাত্র। অন্যদিকে এরিস্টটলিয় মতবাদে জগতকে নিশ্চল ও স্থির বিবেচনা করা হয়। ইকবাল এ ধরনের স্থির ও জড় জগতের ধারণায় বিশ্বাসী না। তার মতে, জগতের তাৎপর্য আছে, গতি আছে এবং উদ্দেশ্য আছে। জগতের নিয়ত পরিবর্তন এবং নবসৃষ্টির চাঞ্চল্য পূর্ববর্তী মতবাদগুলোতে উপেক্ষিত হয়েছে।

ইকবালের মতে, জগতে সকল পরিবর্তনের মূলগত সত্তা প্রাণ-প্রবাহ; যা প্রত্যেক বস্তুর মধ্যেই প্রবাহিত। মানুষের মধ্যে প্রাণ প্রবাহের প্রকাশ হলো ইচ্ছা। সমস্ত সৃষ্টি প্রক্রিয়ার মধ্যেই বেঁচে থাকার ইচ্ছা দেখা যায়। মানুষ শুধু বেঁচে থাকতে চায় না; জীবনকে উন্নত করার জন্য সংগ্রাম করে। ধর্ম, কলা, বিজ্ঞান এবং নীতি জীবনকে শক্তিশালী করার উপায় স্বরূপ। তাই ইকবালের মতে,

যা ব্যক্তিত্বকে শক্তিশালী করে, তা ভালো এবং যা ব্যক্তিত্বকে দুর্বল করে, তা-ই মন্দ।

খোদা

পরম সত্তা বস্তুত খুদি বা ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন সত্তা। তিনি অতুলনীয়; স্থান এবং কালের দ্বারা সীমাবদ্ধ না। পরম খুদি সৃজনশীল; সৃষ্টি তার স্বরূপের বিকাশ মাত্র। কোনো খুদিকেই চরিত্র ব্যতীত চিন্তা করা যায় না; তাই পরম খুদির চরিত্র আছে।

খোদা সর্বজ্ঞানী। সাধারণ জ্ঞানের ক্ষেত্রে যেমন কর্তা এবং কর্মের পার্থক্য চেতনা থাকে। খোদার ক্ষেত্রে এই দুইটি অভিন্ন। তিনি এক এবং বর্তমান মুহূর্তেই সমগ্র সৃষ্টিকে জানেন। আসলে খুদির নিকট অতীত কিংবা ভবিষ্যতও এক অনন্ত বর্তমান। অর্থাৎ বর্তমানের মধ্যেই অতীত ও ভবিষ্যত নিহিত। পরম খুদি সর্বশক্তিমান। তার মানেই এই না যে, তিনি সীমাহীন অন্ধতা, স্বেচ্ছাচার আর খেয়ালের বশবর্তী। এক বিশেষ অর্থে তিনি সীমিত নিজের স্বভাবের মধ্যে। খোদার এই শক্তি নিয়ম, ঐক্য ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। ইকবালের বহু লেখাতেই পরম সত্তার সাথে মানব সত্তার যোগাযোগ প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। রাহাত ফতেহ আলির কণ্ঠে ডুব দেয়া যেতে পারে ইকবালের ভাব অনুসন্ধানে।

ইকবালের ভাষ্যে, পরম খুদির সাথে সসীম খুদির সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব। তবে, পরম খুদির মধ্যে লুপ্ত হওয়া সসীম খুদির লক্ষ্য না। পরম খুদির মধ্যে সসীম খুদির বিলুপ্তির আরেক অর্থ খুদির বিনাশ। খুদির বিলুপ্তি ইসলামের মূল শিক্ষার বিরোধী। খুদির বিনাশ সাধিত হওয়ার মানে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং ক্রিয়াবলির কোন অর্থ না থাকা। জীবন অর্থহীন না।

বিকাশ

পারিপার্শ্বিকতার সাথে সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ব্যক্তিত্বের বিকাশ সম্ভব। নিষ্ক্রিয় ও কর্মবিমুখ যোগী জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি জীবনকে অস্বীকৃতির নামান্তর। ইকবাল তাই বৈরাগ্যের ঘোরবিরোধী। সম্পূর্ণ নিশ্চল জগৎ মানুষের দাসত্বের ইঙ্গিত বহন করে। জগৎ গতিশীল ও বর্ধিষ্ণু, মানুষ তার নিরন্তর সাধনা ও সক্রিয়তার সাহায্যে জগৎকে আপন আদর্শে গড়ে তুলবে। ফলে মুসলিম জাতির ক্ষয়িষ্ণু অবস্থার জন্য ইকবালের চোখে কর্মবিমুখতা আর নিষ্ক্রিয়তা দায়ী।

মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ কতিপয় বাহ্য ও অভ্যন্তরীণ শর্তের উপর নির্ভর করে। অতীত ইতিহাস ও কৃষ্টি খুদির বিকাশের পথে সহায়ক। কিন্তু অন্ধ অনুকরণ খুদিকে দুর্বল করে তুলে। খুদির বিকাশ অতীত আর বর্তমানের সমন্বয় করে। অতীত ঐতিহ্যে দাঁড়িয়ে বর্তমানের সীমাহীন সম্ভাব্যতার পতাকা উড়ায়। ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য প্রয়োজন নতুন উদ্দেশ্য সৃষ্টি ও তার বাস্তব রূপায়ণ। ইকবাল বলেন, ‘হৃদয়ে ইচ্ছা জাগ্রত রাখো, যাতে তোমার ধূলিকণা সৌধে পরিণত হয়।’ মুসলিম জাতির অধঃপতনে স্রষ্টার প্রতি অভিযোগ আকারে ‘শিকওয়া’ এবং সেই অভিযোগের জবাব ‘জওয়াবে শিকওয়া’-তে আছে ইকবালের বিশ্লেষণ। জনপ্রিয় দুইটাকে একসাথে শোনা যেতে পারে নাতাশা বেগ, ফরিদ আয়াজ এবং আবু মুহম্মদ ক্বাওয়ালের কণ্ঠে।

মুসলমানদের অধঃপতনের অন্যতম কারণ পরজগতকেই কেবল আগ্রহের বিষয় করে তোলা। এই ‍অতি অপার্থিবতা তাদের ইহজগতের শিকড় দুর্বল করে দিয়েছে। পৃথিবীতে স্বকীয়তায় প্রতিষ্ঠিত হতে হলে মুসলিম জাতিকে কর্মের পথে সক্রিয় ও উদ্দীপিত হতে হবে। ইহকাল এবং পরকাল- উভয়বিধ মঙ্গল লাভ ইসলামি জীবনাদর্শ। এই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হলেই পতন। ফলে ইকবাল এমন সমাজ প্রবর্তনের পক্ষপাতী যেখানে মানুষ পাবে আত্মবিকাশের পূর্ণ অধিকার। সমস্ত নিষ্পেষণের বাইরে গিয়ে থাকবে খুদির পূর্ণ বিকাশের সুযোগ। ইকবালের ভাষ্যে, সেই সমাজেই দার্শনিক নিৎশের স্বপ্ন দেখা সুপারম্যানের আবির্ভাব ঘটবে।

বাণী সমূহ

(১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল তিনি মৃত্যু বরন করেন।লাহোরের বাদশাহী মসজিদের প্রবেশপথে ইকবালের কবর।)

সবিশেষ

ইকবাল আধুনিক চিন্তাবিদদের মধ্যে যুগান্তকারী হিসাবে পরিগণিত। মুসলিম জাতির অধঃপতন তাকে পীড়া দিয়েছিল। এক সময়ের বিশ্ববিজয়ী মুসলিম জাতির অধোগতির কারণ খুঁজতে থাকেন নিয়ত। কবিতা ও দর্শনের মাধ্যমে সেই অধোগতির কারণ বিশ্লেষণ ও সমাধানের নির্দশনা দান করেন। জাতিকে আত্মকলহ, ক্ষুদ্র স্বার্থ ও বিভেদ ভুলে সাম্য, মৈত্রী ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের পতাকাতলে সমবেত হবার আহবান জানান।

ইকবাল নতুন সমাজ চেয়েছেন; যেখানে ইশকের মধ্য দিয়ে ইনসানিয়াত পূর্ণতা পাবে। সেই দিক থেকে ইকবাল বিপ্লবী। ইসলামের শিক্ষাকে দেখেছেন বৈপ্লবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। দেখিয়েছেন পশ্চিমা অভিজ্ঞতাবাদের সাথে ইসলামের বিরোধ নেই। বরং ইসলাম দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক আলোচনার অনুপ্রেরণা জাগিয়ে তুলে। কোরান ইহজগৎ আর পরজগতের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে মানবজীবনের সর্বোচ্চ মূল্যবোধসমূহের বাস্তব রূপায়ণের নির্দেশনা দেয়। ইকবালের সেই চিন্তাধারা শুধু মুসলিম জাতিকেই উদ্বুদ্ধ করেনি; বিশ্বের প্রগতিশীল মানবমনকেও আন্দোলিত করেছে। আধুনিক মুসলিম বিশ্বে জ্ঞানতাত্ত্বিক চর্চার যে উৎসাহ পরিলক্ষিত হচ্ছে; তার যুগস্রষ্টা আল্লামা ইকবাল। তাই আল্লামা ইকবাল বিখ্যাত তার চিন্তা, কাব্য ও দর্শনে।

তথ্যঃ ইন্টারনেট।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

কলমের নিব ভাঙা

নিউজ ডেস্ক

June 6, 2026

শেয়ার করুন

রাজনৈতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ

প্রকাশিত: 7 জুন ২০২৬

ফাঁসির আদেশ বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর বিচারকদের কলমের নিব ভেঙে ফেলার পেছনে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই, বরং এটি একটি ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও প্রতীকী প্রথা ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হওয়া এই প্রথার পেছনে মূলত চারটি গভীর মানসিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে:

১. দণ্ডটি যেন আর পরিবর্তন করা না যায় (প্রতীকী অর্থ)

একটি আইনি রায় বা আদেশ যখন বিচারক একবার লিখে স্বাক্ষর করে দেন, তখন আইনগতভাবে বিচারক নিজেই সেই রায় আর সংশোধন বা বাতিল করতে পারেন না। কলমের নিবটি ভেঙে ফেলার অর্থ হলো—যে রায় একবার দেওয়া হয়ে গেছে, তা চিরতরে চূড়ান্ত এবং ওই কলম দিয়ে সেই রায় আর কোনোভাবেই বদলানো সম্ভব নয়।

২. অনুশোচনা ও মানসিক দায়মুক্তি

ইসলামী আইন বা সাধারণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে, জীবন দেওয়ার মালিক একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। একজন মানুষ হয়ে অন্য একজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার আদেশ দেওয়া অত্যন্ত কঠিন এবং মানসিক চাপেরই কাজ। বিচারকরা এই নিব ভেঙে মূলত বোঝাতে চান যে, তারা আইনের শাসন বজায় রাখতে বাধ্য হয়ে এই আদেশ দিয়েছেন, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে একজন মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে চাননি। এটি এক ধরণের মানসিক দায়মুক্তির প্রতীক।

৩. কলমটিকে ‘অপবিত্রতা’ থেকে রক্ষা করা

যে কলমটি একজনের জীবন কেড়ে নেওয়ার বা ফাঁসির আদেশের মতো একটি চরম নির্মম কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, তা যেন পরবর্তীতে অন্য কোনো সাধারণ বা শুভ কাজে ব্যবহৃত না হয়, সেই ধারণা থেকে নিবটি নষ্ট করে দেওয়া হয়।

৪. ‘অপরাধের’ প্রতীকী সমাপ্তি

যেহেতু ফাঁসির আদেশ পাওয়া ব্যক্তিটি সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক বা ক্ষতিকর কোনো অপরাধ করেছে, তাই বিচারক নিবটি ভেঙে ফেলার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে এই বার্তা দেন যে—অপরাধীর অপরাধের অধ্যায়ের সাথে সাথে এই কলমের আয়ুও এখানেই শেষ হলো।

বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের বিচার ব্যবস্থায় ফাঁসি বা মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া এবং কিছু ঐতিহাসিক দিক নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনি প্রক্রিয়া

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (CrPC)-এর নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশে কোনো আসামির ফাঁসির রায় এক দিনের সিদ্ধান্তেই কার্যকর হয় না। এটি একটি দীর্ঘ এবং অত্যন্ত সতর্ক আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়

  • ডেথ রেফারেন্স (Death Reference): জেলা ও দায়রা জজ আদালত কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে আইন অনুযায়ী তা সরাসরি কার্যকর করা যায় না ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী, নিম্ন আদালতের এই রায় অনুমোদনের জন্য উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট বিভাগে) পাঠাতে হয়, যাকে ‘ডেথ রেফারেন্স’ বলা হয়
  • আপিল বিভাগ ও রিভিউ: হাইকোর্ট বিভাগ যদি নিম্ন আদালতের দেওয়া ফাঁসির রায় বহাল রাখে, তবে আসামির সুযোগ থাকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার [lawyersnjurists.com, researchgate.net]। আপিল বিভাগেও রায় বহাল থাকলে আসামি শেষ আইনি লড়াই হিসেবে ‘রিভিউ’ বা পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারেন।
  • রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা: সব আইনি প্রক্রিয়া (আপিল ও রিভিউ) খারিজ হয়ে যাওয়ার পর আসামির শেষ আশ্রয় থাকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কাছে সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘মার্সি পিটিশন’ বা প্রাণভিক্ষার আবেদন করা [old.seu.edu.bd]。 রাষ্ট্রপতি এই আবেদন নাকচ করে দিলে রায় কার্যকরের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয় [ntvbd.com]।
  • কারাগারের শেষ ধাপ: রাষ্ট্রপতির চিঠি কারাগারে পৌঁছানোর পর কারা কর্তৃপক্ষ আসামির পরিবারকে শেষবার দেখা করার সুযোগ দেয় [ntvbd.com]। রায় কার্যকরের আগে আসামির স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী তওবা বা শেষ প্রার্থনা করানো হয় [ntvbd.com]। আইনের নিয়ম অনুযায়ী (CrPC Section 368), আসামিকে “ঘাড়ের সাহায্যে ঝুলিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত” (Hanged by the neck until he be dead) ফাঁসি দেওয়া হয় [en.wikipedia.org]।

২. উপমহাদেশের বিচার ব্যবস্থার কিছু ঐতিহাসিক রায় ও মাইলফলক

ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর সময় পর্যন্ত এ অঞ্চলের বিচার ব্যবস্থায় কিছু ঐতিহাসিক মামলা সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে:

  • ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি (১৯০৮): ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সর্বকনিষ্ঠ বাঙালি বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। বিহারের মুজাফফরপুরে অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রফুল্ল চাকীর সাথে মিলে তিনি বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন। অল্পের জন্য কিংসফোর্ড বেঁচে গেলেও দুই ব্রিটিশ নারী নিহত হন। মাত্র ১৮ বছর ৭ মাস ১১ দিন বয়সে ফাঁসির মঞ্চে হাসিমুখে আত্মদান করেন তিনি।

মুজাফফরপুর ষড়যন্ত্র মামলা ও ফাঁসি

  • ঘটনা: ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল বিহারের মুজাফফরপুরে রাতের অন্ধকারে ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডের গাড়িতে বোমা ছোড়া হয়। কিন্তু সেই গাড়িতে কিংসফোর্ড না থাকায় মিসেস কেনেডি ও তাঁর কন্যা নিহত হন।
  • গ্রেপ্তার: ঘটনার পর প্রফুল্ল চাকী গ্রেপ্তারের আগে আত্মহত্যা করেন এবং ক্ষুদিরাম গ্রেপ্তার হন। বিচারে তাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। [
  • ফাঁসি: ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ভোর ৪টায় মুজাফফরপুর জেলে ক্ষুদিরামের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। [
  • সাহসিকতা: মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ ইচ্ছা জানতে চাওয়া হলে তিনি নির্ভীকভাবে বলেছিলেন, “আমি ভালো বোমা বানাতে পারি, মৃত্যুর আগে সারা ভারতবাসীকে সেটা শিখিয়ে দিয়ে যেতে চাই।”
  • বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড মামলা: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড মামলা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সহকারী এ এফ এম মোহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেন। ১৯৭৫ সালে জারি করা ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশের কারণে সুদীর্ঘ সময় এই হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ ছিল।

আইনি প্রতিবন্ধকতা ও বিচারের পথ উন্মুক্তকরণ

  • ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ: ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ খুনিদের আইনি সুরক্ষা দিতে এই অধ্যাদেশ জারি করেন।
  • অধ্যাদেশ বাতিল: ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১২ নভেম্বর জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বিচারের পথ উন্মুক্ত করে。
  • অভিযোগপত্র: ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি পুলিশের সিআইডি (CID) ২০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রথম চার্জশিট দাখিল করে।

বিচার প্রক্রিয়ার সময়রেখা ও রায়

  • নিম্ন আদালতের রায়: ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকার তৎকালীন জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল মামলার রায়ে ১৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেন।
  • হাইকোর্টের রায়: ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চের বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম ১২ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে বাকিদের খালাস দেন।
  • আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়: ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আসামিদের আপিল খারিজ করে চূড়ান্তভাবে ১২ জনের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখে

সাজা কার্যকরের সর্বশেষ অবস্থা

মামলায় চূড়ান্ত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জন আসামির মধ্যে এখন পর্যন্ত ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে, ১ জন বিদেশে পলাতক অবস্থায় মারা গেছেন এবং বাকি ৫ জন এখনও বিভিন্ন দেশে আত্মগোপন করে আছেন।

সাজা ও বর্তমান স্থিতি আসামিদের নামবিবরণ ও কার্যকরের সময়
ফাঁসি কার্যকর (প্রথম পর্যায়)১. সৈয়দ ফারুক রহমান
২. সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান
৩. বজলুল হুদা
৪. এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ
৫. মহিউদ্দিন আহমেদ
২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি দিবাগত রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে একযোগে এই ৫ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
ফাঁসি কার্যকর (দ্বিতীয় পর্যায়)৬. আবদুল মাজেদদীর্ঘকাল ভারতে পালিয়ে থাকার পর ২০২০ সালের এপ্রিলে ঢাকায় গ্রেপ্তার হন এবং ১২ এপ্রিল কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁর ফাঁসি কার্যকর হয়।
পলাতক অবস্থায় মৃত্যু७. আবদুল আজিজ পাশা২০০১ সালের ২ জুন জিম্বাবুয়েতে পলাতক থাকা অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে মারা যান।
এখনও পলাতক আসামি৮. খন্দকার আবদুর রশিদ
৯. শরিফুল হক ডালিম
১০. এ এম রাশেদ চৌধুরী (যুক্তরাষ্ট্র)
১১. এস এইচ বি এম নূর চৌধুরী (কানাডা)
১২. মোসলেম উদ্দিন
ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি থাকা সত্ত্বেও এই ৫ খুনিকে এখনো দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

এই বিচার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার মাধ্যমে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে গণ্য হয়।

  • মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল):

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত বিশেষ আদালত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের আমলে প্রণীত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর অধীনে এই আদালত পরিচালিত হয়ে আসছে।

ট্রাইব্যুনাল গঠনের ইতিহাস ও বিবর্তন

  • ১১৯৩ সালের আইন: ১৯৭৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য মূল আইনটি পাস করা হয়।
  • ২০১০ সালের পুনর্গঠন: মুক্তিযুদ্ধের ৩৯ বছর পর ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করা হয়।
  • ২০২৪ সালের রূপান্তর: ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচারের লক্ষ্যে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে। [

আইনি সংস্কার ও সাম্প্রতিক সংশোধনীসমূহ

বিচারের পরিধি বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে ট্রাইব্যুনাল আইনে ধারাবাহিক কিছু ঐতিহাসিক সংশোধন আনা হয়েছে:

  • রাজনৈতিক দল ও সংগঠন নিষিদ্ধকরণ: ২০২৫ সালের মে মাসে আইনে বড় সংশোধনী এনে ব্যক্তি ছাড়াও কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী করে তাদের নিবন্ধন বাতিল বা নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া হয়।
  • জনপ্রতিনিধিত্ব ও নির্বাচনে নিষেধাজ্ঞা: ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে জারি করা তৃতীয় সংশোধনী অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালে কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (Formal Charge) দাখিল হলে তিনি আর জাতীয় বা স্থানীয় কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না এবং সরকারি পদে বসতে পারবেন না।
  • গুমের (Enforced Disappearance) বিচার: ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পাস করে গুমের ঘটনাকে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক এক্তিয়ারভুক্ত করা হয়।

বিচার প্রক্রিয়ার মাইলফলক রায়সমূহ

১. ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার

২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের মোট ৫৭টি মামলার রায় দেয়। এর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ৬ জন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়:

  • জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা আব্দুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামী এবং মীর কাসেম আলী।
  • বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।

২. ২০২৪ সালের জুলাই গণহত্যার বিচার

অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ট্রাইব্যুনালে জুলাই বিপ্লবের গণহত্যা ও নির্যাতনের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা ও প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় দেয়।

ট্রাইব্যুনালের বর্তমান বিচারিক কাঠামো

পদের নাম বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব
চীফ প্রসিকিউটরঅ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
তদন্ত সংস্থাআন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তদন্ত সংস্থা
বিচারিক বেঞ্চট্রাইব্যুনাল-১ এবং ট্রাইব্যুনাল-২ (সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের সমন্বয়ে গঠিত)

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শিকার পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ইতিহাস, রাজনীতি ও সমসাময়িক বিষয়ের এমন চমৎকার ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণ নিয়মিত পড়তে ভিজিট করুন পালস বাংলাদেশ | Pulse Bangladesh

ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন ১৯৬৬

নিউজ ডেস্ক

June 6, 2026

শেয়ার করুন

বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৬৬ সালের জুন মাস ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা আইয়ুব-মোনায়েম খানের শোষণের শৃঙ্খল ভাঙতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ দাবির সপক্ষে এই দিনগুলোতে পূর্ব পাকিস্তান, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা পরিণত হয়েছিল এক অগ্নিগর্ভ রণক্ষেত্রে।

৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬: লাহোরে বাঙালির ‘ম্যাগনা কার্টা’ ঘোষণা

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে সম্মিলিত বিরোধী দলগুলোর এক কনভেনশনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন ও মুক্তির সনদ হিসেবে ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণ অরক্ষিত থাকায় বাঙালিদের মধ্যে যে চরম ক্ষোভের জন্ম নেয়, এটি ছিল তারই রাজনৈতিক বহিঃপ্রকাশ।

সাবজেক্ট কমিটির সভায় এই দাবি অগ্রাহ্য হলে বঙ্গবন্ধু সম্মেলন বয়কট করেন এবং পরবর্তীতে ২৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে এটি ঘোষণা করা হয়। পাকিস্তানি শাসকদের দীর্ঘদিনের শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এটি ছিল অধিকার আদায়ের এক যুগান্তকারী দলিল, যা ইতিহাসে বাঙালির ‘ম্যাগনা কার্টা’ বা মুক্তির মহাসনদ নামে পরিচিত।

ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি কী ছিল?

  • ১. শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি: লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে একটি ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থাকবে।
  • ২. কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা: কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে কেবল দুটি বিষয়—’প্রতিরক্ষা’ ও ‘পররাষ্ট্র বিষয়’। অন্যান্য সব বিষয় অঙ্গরাজ্যগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
  • ৩. মুদ্রা ও অর্থ বিষয়ক ক্ষমতা: দুই অঞ্চলের জন্য সহজে বিনিময়যোগ্য দুটি পৃথক মুদ্রা থাকবে, অথবা এক মুদ্রা থাকলে পূর্ব পাকিস্তানের পুঁজি যাতে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হতে না পারে, তার জন্য সুনির্দিষ্ট সংবিধিবদ্ধ ব্যবস্থা থাকতে হবে।
  • ৪. राजस्व, কর ও শুল্ক বিষয়ক ক্ষমতা: কর ও শুল্ক ধার্য করার চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। আদায়কৃত রাজস্বের একটি নির্দিষ্ট অংশ কেন্দ্রীয় সরকারকে দেওয়া হবে।
  • ৫. বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা: প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার ওপর সংশ্লিষ্ট রাজ্যের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ থাকবে এবং বিদেশের সাথে বাণিজ্য চুক্তির অধিকার পাবে।
  • ৬. আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা: পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার জন্য আধা-সামরিক বাহিনী (প্যারা-মিলিটারি) বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদের লাগাতার আন্দোলন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাস ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৬৬ সালের জুনের শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসজুড়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে লাগাতার মিছিল ও সমাবেশ করা হতে থাকে। তৎকালীন ছাত্রনেতাদের আহ্বানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হল থেকে হাজার হাজার সাধারণ শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে রাজপথে নেমে আসেন।

“ছয় দফা মানতে হবে”, “বাঙালির মুক্তি চাই”—এমন সব বজ্রকঠিন স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে কলাভবন, মধুর ক্যান্টিন এবং কার্জন হল প্রাঙ্গণ। ছাত্রদের এই লাগাতার আন্দোলনই মূলত ৭ জুনের ঐতিহাসিক হরতাল সফল করার মূল ভিত্তি প্রস্তুত করেছিল।

৭ই জুন: ঢাকার রাজপথে নারীদের অভূতপূর্ব মিছিল ও প্রতিরোধ

১৯৬৬ সালের ৭ই জুন ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবির সমর্থনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আহূত সর্বাত্মক হরতালে ঢাকার রাজপথে নারীদের অভূতপূর্ব মিছিল, পিকেটিং ও সাহসী প্রতিরোধ প্রথমবার প্রত্যক্ষ করে পুরো বিশ্ব। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের রক্তচক্ষু ও কারফিউ উপেক্ষা করে হাজার হাজার সাধারণ ও শ্রমজীবী নারী সেদিন অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন।

নারীদের ঐতিহাসিক প্রতিরোধের প্রধান দিকগুলো:

  • রাজপথে অভাবনীয় পিকেটিং: তেজগাঁও, সদরঘাট ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ গৃহিণী এবং বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা দলে দলে রাজপথে নেমে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইডেন কলেজের ছাত্রীরা লাঠি হাতে মিছিল নিয়ে ঢাকার প্রধান সড়কগুলো কাঁপিয়ে তোলেন।
  • তেজগাঁওয়ে নারী শ্রমিকদের বীরত্ব: ৭ই জুনের হরতালের অন্যতম মূল কেন্দ্র ছিল ঢাকার তেজগাঁও শিল্প এলাকা। পুলিশ যখন আন্দোলনকারীদের ওপর বেধড়ক লাঠিচার্জ ও গুলি শুরু করে, তখন এখানকার বিভিন্ন চটকল ও সুতাকলের হাজার হাজার নারী শ্রমিক ঝাঁটা, লাঠি ও ইট-পাটকেল নিয়ে পুলিশের ওপর চড়াও হন।
  • রেনেসাঁর অন্তরালে ফজিলাতুন্নেছা মুজিব: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা তখন কারাবন্দি। এই চরম সংকটে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবসহ অন্য নেতাদের পরিবারের নারীরা গোপনে সাধারণ নারী সমাজকে সংগঠিত করতে এবং হরতাল সফল করার বার্তা পৌঁছে দিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।

এই ৭ই জুনের সফল গণজাগরণই প্রমাণ করেছিল ৬ দফা শুধু শিক্ষিত মধ্যবিত্তের আন্দোলন নয়, এটি বাংলার খেটে খাওয়া সাধারণ নারী সমাজেরও বাঁচার দাবি।

আজ একুশে পদকপ্রাপ্ত সমাজসেবক জিয়াউল হকের ৯২তম জন্মদিন

ঐতিহাসিক এই উত্তাল দিনগুলোর স্মরণের মাঝেই আজ ৬ জুন, বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছিলেন এক অনন্য আলোকবর্তিকা। একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত সমাজসেবক এবং “বেচি দই, কিনি বই” খ্যাত মো: জিয়াউল হকের ৯২তম জন্মদিন আজ। তিনি ১৯৩৪ সালের ৬ জুন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট উপজেলার চামা মুশরিভুজা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

জীবনসংগ্রাম ও অনন্য আদর্শ:

  • “বেচি দই, কিনি বই”: অতি দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া জিয়াউল হক টাকার অভাবে পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা করতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে মাথায় ফেরি করে দই বিক্রি শুরু করলেও, অন্য কোনো শিশু যেন টাকার অভাবে ঝরে না পড়ে, সেই চিন্তা থেকে তিনি দই বিক্রির লভ্যাংশ দিয়ে বই কেনা শুরু করেন। বিগত ছয় দশক ধরে তিনি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে বই, খাতা ও শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ করছেন।
  • পারিবারিক লাইব্রেরি: শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে তিনি নিজের বাড়িতেই গড়ে তুলেছেন প্রায় ১৫,০০০ বইয়ের একটি বিশাল লাইব্রেরি, যা এলাকার সর্বস্তরের পাঠক ও শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত।
  • রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি: সমাজসেবামূলক কাজের জন্য ২০০৬ সালে তিনি দেশব্যাপী বিখ্যাত “সাদা মনের মানুষ” উপাধিতে ভূষিত হন। পরবর্তীতে সমাজসেবায় অবিনাশী ও নিঃস্বার্থ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০২৪ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ civilian সম্মাননা একুশে পদক প্রদান করে।

বাঙালির গৌরবময় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস, মহান মনীষীদের জীবনী এবং জাতীয় রাজনীতির সব বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন ও ব্রেকিং নিউজ সবার আগে নির্ভরযোগ্যভাবে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন পালস বাংলাদেশ | Pulse Bangladesh।ওয়েবসাইটে।

তথ্যসূত্র: এই বিশেষ ঐতিহাসিক ও জাতীয় প্রতিবেদনটি ১৯৬৬ সালের স্বাধিকার আন্দোলনের নথিপত্র, জাতীয় আর্কাইভ এবং বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়ক ডেস্কের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক মূল্যায়ন

নিউজ ডেস্ক

June 5, 2026

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ও মেরুকরণ সৃষ্টিকারী চরিত্র। তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়নে প্রধানত ব্যক্তিগত সততা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও বিতর্ক—এই দুটি পরস্পরবিরোধী দিক উঠে আসে।

ব্যক্তিগত সততা ও দেশপ্রেম

  • উচ্চ নৈতিক মান: জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত সততা ও নিয়মানুবর্তিতা তাঁর রাজনৈতিক ও সামরিক জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও সাধারণত তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনার সময় তাঁর ব্যক্তিগত দুর্নীতির অভিযোগ থেকে তাঁকে মুক্ত রাখেন।
  • কর্মীবান্ধব নেতৃত্ব: সাদাসিধে জীবনযাপন, কঠোর পরিশ্রম এবং দেশের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের মানসিকতা তাঁকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে একটি স্থায়ী আসন এনে দেয়।
  • অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দূরদর্শিতা: খাল খনন কর্মসূচি, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপগুলো আধুনিক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করতে ভূমিকা রেখেছিল বলে তাঁর সমর্থকরা মনে করেন।

আদর্শিক বিতর্ক ও সমালোচনা

  • বহুদলীয় গণতন্ত্র ও পুনর্বাসন: একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা থেকে ফিরিয়ে এনে তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে পুনর্বাসন করেন। তবে, এর ফলে স্বাধীনতাবিরোধী অনেক রাজনৈতিক শক্তিও রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ পায়, যা বাংলাদেশের আদর্শিক রাজনীতিতে গভীর বিতর্কের জন্ম দেয়।
  • বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ: তিনি ‘বাঙালি’ পরিচয়ের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রবর্তন করেন, যা সব ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে একটি ছাতার নিচে আনার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল। সমালোচকদের মতে, এটি মূল বাঙালি সংস্কৃতির স্বকীয়তা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিপন্থী ছিল।
  • সামরিক শাসন ও বিতর্কিত আইন: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাঁর ক্ষমতায় আরোহণ এবং পরবর্তীতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বলবৎ রাখার মতো বিষয়গুলো তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়।

জিয়াউর রহমান এমন এক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন যা একদিকে তাঁর সততা ও উন্নয়নের জন্য প্রশংসিত, অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক কৌশল ও গৃহীত পদক্ষেপের জন্য তীব্র আদর্শিক সমালোচনার সম্মুখীন

ব্যক্তিগত সততা ও জীবনযাপন

জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত সততা ও জীবনযাপন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত বিষয়। তাঁর অতি সাধারণ জীবনযাত্রার অনেক বিবরণ সমসাময়িক রাজনীতিবিদ এবং ইতিহাসবিদদের লেখায় উঠে এসেছে।

সাধারণ জীবনযাপন ও বাসস্থান

  • সরকারি বাসভবন বর্জন: রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও তিনি বিলাসবহুল বঙ্গভবনে বসবাস না করে ঢাকা সেনানিবাসের একটি সাধারণ মঈনুল রোডস্থ বাসভবনে থাকতেন
  • আসবাবপত্রের অভাব: তাঁর মৃত্যুর পর দেখা যায়, রাষ্ট্রপতির বাসভবনেও অত্যন্ত সাধারণ এবং সীমিত আসবাবপত্র ছিল [১]।
  • ভাঙা সুটকেস ও ছেঁড়া গেঞ্জি: তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের মধ্যে একটি ভাঙা সুটকেস এবং কয়েকটি ছেঁড়া গেঞ্জি পাওয়া যায়, যা তাঁর অতি সাধারণ জীবনযাপনের প্রতীক হিসেবে ব্যাপকভাবে আলোচিত ।

আর্থিক সততা

  • দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তি: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার পরও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি।
  • পরিবারের জন্য সম্পদ না রাখা: মৃত্যুর সময় তিনি তাঁর স্ত্রী বা সন্তানদের জন্য কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স, দামি গাড়ি বা বিলাসবহুল বাড়ি রেখে যাননি।
  • সরকারি তহবিলের সাশ্রয়: রাষ্ট্রীয় সফরে বিদেশে যাওয়ার সময় তিনি অত্যন্ত সীমিত খরচ করতেন এবং সরকারি অর্থের অপচয় কঠোরভাবে বন্ধ করেছিলেন।

কঠোর নিয়মানুবর্তিতা ও পরিশ্রম

  • দীর্ঘ কর্মঘণ্টা: তিনি প্রতিদিন প্রায় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করতেন এবং গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ফাইল পর্যালোচনা করতেন।
  • মাঠপর্যায়ে তদারকি: শীত-গ্রীষ্ম উপেক্ষা করে তিনি সরাসরি গ্রামে চলে যেতেন এবং সাধারণ মানুষের সাথে মাটিতে বসে কথা বলতেন।

জিয়াউর রহমানের এই সততা ও সাধারণ জীবনযাপন তাঁর সমর্থকদের কাছে তাঁকে এক অনন্য ও অনুকরণীয় নেতার মর্যাদা দিয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষাগত দক্ষতা নিয়ে বিতর্ক

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক মূল্যায়নে তাঁর ‘মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা’ এবং ‘ভাষাগত দক্ষতা’—এই দুটি বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘকাল ধরে গভীর বিতর্ক ও ভিন্নমত বিদ্যমান [১.২.২]।

১. মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক

মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কিছু দিক নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ রয়েছে [১.২.২]:

  • স্বাধীনতার ঘোষণা বিতর্ক: ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন [১.২.১, ১.২.৮]। তাঁর সমর্থক ও দল (বিএনপি)-এর মতে, এই ঘোষণা দিশেহারা বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল [১.২.১, ১.৩.৮]। অপরদিকে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ (আওয়ামী লীগ)-এর দাবি, তিনি ছিলেন কেবল একজন পাঠক বা ঘোষক, এবং স্বাধীনতার মূল কৃতিত্ব ও একক নেতৃত্ব সম্পূর্ণভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের।
  • সেক্টর কমান্ডার বনাম ‘আকস্মিক’ মুক্তিযোদ্ধা: জিয়াউর রহমান ১ নম্বর সেক্টর এবং পরবর্তীতে ‘জেড ফোর্স’-এর প্রধান হিসেবে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেন, যার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে রাষ্ট্রীয় ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয় [১.২.৭]। তবে সমালোচকদের একটি অংশ দাবি করে, তিনি ২৫ মার্চের আগে পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিদ্রোহ করেননি, বরং পাকিস্তানি জাহাজ ‘এমভি সোয়াত’ থেকে অস্ত্র খালাস করতে গিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আকস্মিকভাবে বিদ্রোহে যোগ দিতে বাধ্য হন [১.২.৪]। তাঁর সমর্থকরা এই তত্ত্বকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ইতিহাস বিকৃতি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন [১.২.৪, ১.২.৫]।

২. ভাষাগত দক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিতর্ক

জিয়াউর রহমানের শিক্ষা, বেড়ে ওঠা এবং দাপ্তরিক ভাষা ব্যবহারের ধরন নিয়েও এক ধরনের বিতর্ক রয়েছে:

  • বাংলা ভাষা ও শৈশব: জিয়াউর রহমানের শৈশব ও শিক্ষার একটি বড় অংশ কেটেছিল অবিভক্ত ভারতের কলকাতা এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের করাচিতে । করাচির ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করার কারণে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলা লেখার চর্চা তাঁর কম ছিল । এই কারণে সমালোচকরা প্রায়শই দাবি করেন যে তিনি শুদ্ধভাবে বাংলা পড়তে বা লিখতে পারতেন না । তবে জীবনীকারদের মতে, দাপ্তরিক কাজে তিনি ইংরেজি ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও বাংলা বলতে পারতেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সময় সব স্তরে বাংলা ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছিলেন।
  • জাতীয়তাবাদের ভাষাগত বনাম ভৌগোলিক রূপান্তর: ১৯৭২ সালের সংবিধানে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর মূল ভিত্তি ছিল মূলত ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক একক সত্তা । কিন্তু জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে একে পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রবর্তন করেন ধর্মনিরপেক্ষ ও ভাষাভিত্তিক সংস্কৃতির পরিবর্তে ভূখণ্ড এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের মিশ্রণে এই নতুন পরিচয় তৈরি করা হয়। সমালোচকদের মতে, এটি ভাষা আন্দোলনের মূল চেতনা ও ভাষাভিত্তিক বাঙালি পরিচয়কে অবমূল্যায়ন করার একটি রাজনৈতিক কৌশল ছিল

জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা ও তাঁর আদর্শিক দর্শন আজও বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান তর্কের উপাদান, যা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও ক্ষমতা দখল

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং তীব্র মেরুকরণ সৃষ্টিকারী অধ্যায় । এই ঘটনাপ্রবাহে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এবং তাঁর ক্ষমতায় আরোহণের প্রক্রিয়াকে প্রধানত দুটি বিপরীতমুখী রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা হয়

১. আওয়ামী লীগ ও সমালোচকদের মূল্যায়ন (হত্যাকাণ্ডের সুবিধাভোগী ও নেপথ্য কুশীলব)

এই দৃষ্টিকোণ থেকে জিয়াউর রহমানকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়

  • পূর্বজ্ঞাত ও পরোক্ষ সম্মতি: খুনি ফারুক ও রশিদের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার এবং মামলার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে দাবি করা হয়, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সম্পর্কে তৎকালীন উপ-সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান আগে থেকেই জানতেন । তিনি এতে সরাসরি অংশ না নিলেও “তোমরা সফল হলে আমার আপত্তি নেই” ধরনের মনোভাব দেখিয়ে পরোক্ষ সম্মতি দিয়েছিলেন
  • খুনিদের পুনর্বাসন ও পুরস্কৃতকরণ: ক্ষমতা গ্রহণের পর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে জড়িত ১২ জন সামরিক কর্মকর্তাকে বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে উচ্চপদে চাকরি ও কূটনৈতিক কূটনৈতিক সুবিধা দিয়ে পুরস্কৃত করেন
  • ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে আইনি রূপ: খন্দকার মোশতাক আহমেদ কর্তৃক জারিকৃত বিতর্কিত ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ ১৯৭৫’ (যা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার থেকে আইনি সুরক্ষা দিয়েছিল) ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংসদের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয় । এর ফলে দীর্ঘ ২১ বছর বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ রুদ্ধ ছিল
  • সংবিধান ধ্বংসকারী ও অবৈধ দখলদার: দেশের উচ্চ আদালত পরবর্তীতে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে এই সময়ের ক্ষমতা দখলকে অসাংবিধানিক ও জবরদখল হিসেবে আখ্যায়িত করেন

২. বিএনপি ও সমর্থকদের মূল্যায়ন (পরিস্থিতির দাবি ও শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারকারী)

জিয়াউর রহমানের সমর্থক ও রাজনৈতিক অনুসারীদের মতে, তিনি কোনো ষড়যন্ত্র বা হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন না, বরং একটি বিশৃঙ্খল জাতীয় সংকটের মুখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন

  • পেশাদারিত্ব ও আনুগত্য: সমর্থকরা দাবি করেন, জিয়াউর রহমান একজন সুশৃঙ্খল সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন। ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানটি ছিল জুনিয়র অফিসারদের একটি বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ, যার সাথে চেইন অব কমান্ডের বাইরে থাকা উপ-সেনাপ্রধান জিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো যোগসূত্র ছিল না।
  • ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব: ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। এরপর ৭ নভেম্বর কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সাধারণ সৈনিক ও জনতার এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান মুক্ত হন এবং সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নেতৃত্বের কেন্দ্রে চলে আসেন
  • সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা: জিয়াউর রহমান সরাসরি ক্ষমতা দখল করেননি; প্রথমে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদে রেখে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন এবং পরবর্তীতে সায়েমের পদত্যাগের পর আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন
  • ইনডেমনিটি পাসের ভিন্ন প্রেক্ষাপট: সমর্থকদের যুক্তি অনুযায়ী, ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত দেশে একাধিক সামরিক অভ্যুত্থান ও বিশৃঙ্খলা ঘটেছিল । সেই অস্থির সময়ে রাষ্ট্রের সার্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সামরিক বাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা ও আপস বজায় রাখার কৌশল হিসেবেই ওই সময় সংসদীয় আইনের মাধ্যমে পঞ্চম সংশোধনী পাস করতে হয়েছিল, যা এককভাবে কোনো খুনিকে রক্ষার উদ্দেশ্যে ছিল না

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় আরোহণ বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক জটিল সন্ধিক্ষণ, যা আজও দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক শিবিরের আদর্শিক দ্বন্দ্বের মূল কেন্দ্রবিন্দু

সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসন

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পুনরুত্থান এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান এবং তীব্র সমালোচিত একটি অধ্যায়। ১৯৭২ সালের সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে সরে এসে রাষ্ট্রীয় আদর্শে এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটিকে প্রধানত দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়।

১. আওয়ামী লীগ ও ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের মূল্যায়ন (সংবিধানের সাম্প্রদায়িকীকরণ ও পুনর্বাসন)

এই দৃষ্টিকোণ থেকে জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের মূল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক ভিত্তিকে ধ্বংস করার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হয়:

  • ধর্মনিরপেক্ষতা বিলোপ ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি: ১৯৭৭ সালে সামরিক ফরমানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান সংবিধানে আমূল পরিবর্তন আনেন। তিনি সংবিধানের অন্যতম মূল স্তম্ভ ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাতিল করেন এবং এর পরিবর্তে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” প্রতিস্থাপন করেন। একই সাথে বাহাত্তরের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন, যার ফলে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দল পুনরায় রাজনীতি করার আইনি অধিকার পায়।
  • শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ: বাংলাদেশের স্বাধীনতার সরাসরি বিরোধিতা করা এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে জাতিসংঘে ওকালতি করা মুসলিম লীগ নেতা শাহ আজিজুর রহমানকে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। এটিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে দেখা হয়।
  • গোলাম আযমের প্রত্যাবর্তন: ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের প্রধান অভিযুক্ত এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির গোলাম আযমকে ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানি পাসপোর্টে বাংলাদেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তিনি দেশেই অবস্থান করেন।
  • দালাল আইন বাতিল: ১৯৭২ সালে প্রণীত ‘দালাল আইন’ (Collaborators Act), যার অধীনে যুদ্ধাপরাধী ও পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগীদের বিচার চলছিল, ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তা বাতিল করা হয় এবং কারাবন্দি ও বিচারাধীন হাজার হাজার স্বাধীনতাবিরোধী মুক্তি পায়।

২. বিএনপি ও সমর্থকদের মূল্যায়ন (বহুদলীয় গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্য)

জিয়াউর রহমানের সমর্থক এবং দলীয় তাত্ত্বিকদের মতে, এই পদক্ষেপগুলো কোনো সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা থেকে নেওয়া হয়নি, বরং দেশের তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনে নেওয়া হয়েছিল:

  • প্রকৃত বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা: সমর্থকদের মতে, শেখ মুজিবুর রহমানের আমলের একদলীয় ‘বাকশাল’ ব্যবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করে সব মত ও পথের মানুষকে রাজনীতি করার অধিকার দেওয়াই ছিল জিয়ার লক্ষ্য। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের দলকে নিষিদ্ধ না রেখে চরম ডানপন্থী থেকে শুরু করে চরম বামপন্থী (যেমন জাসদ বা কমিউনিস্ট পার্টি)—সবাইকে রাজনৈতিক মূলধারায় ফিরিয়ে আনার কৌশল ছিল এটি।
  • জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ মূল্যবোধের স্বীকৃতি: বিএনপি দাবি করে, সংবিধানে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্তি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনসংখ্যার ধর্মীয় অনুভূতির প্রতিফলন ছিল, যা রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রকে পুরোপুরি নষ্ট করেনি, বরং রাষ্ট্রকে একটি টেকসই নৈতিক ভিত্তি দিয়েছিল।
  • জাতীয় সংহতি ও ক্ষমতার ভারসাম্য: যুদ্ধ-পরবর্তী বিভক্ত বাংলাদেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ কমিয়ে একটি ‘জাতীয় সংহতি’ বা ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন তৈরির উদ্দেশ্যে তিনি পূর্বের রাজনৈতিক বিরোধ ভুলে সবাইকে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করেছিলেন।

জিয়াউর রহমানের এই রাজনৈতিক পুনর্গঠন বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর দূরগামী প্রভাব ফেলে, যা আজও দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বনাম ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রধান বিভাজন রেখা হিসেবে কাজ করছে।

জাতীয় রাজনীতি, ইতিহাস এবং সমসাময়িক সব ব্রেকিং নিউজ ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ সবার আগে নির্ভরযোগ্যভাবে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন বাংলাদেশ প্রতিদিন ওয়েবসাইটে।

২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ